সাদা বিষ এবং লাল চিনি
একটি বিষয় সবসময় মনে রাখতে হবে কোনো কিছু অতিরিক্ত ভালো নয়।তেমনি যদি চিনির কথা বলি,লাল চিনিতে কিছু ভালো পুষ্টি আছে শুনে গদগদ করে খাওয়া শুরু করে দিলে কিন্তু হবেনা। চিনি থেকে গুঁড় ভালো, গুড় থেকে মধু।
আজ আমি লাল চিনি নিয়ে আলোচনা করবো।অন্তত সাদা চিনি থেকে এর গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি বলেই আজ আপনাদের সাথে এ বিষয় আলোচনা করতে চলে আসলাম।তবে চলুন জেনে নেয়া যাক,লাল চিনির গুনাগুন-
বাংলাদেশ খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের পরীক্ষায় দেখা গেছে, আখ থেকে উৎপাদিত চিনিতে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ১৬০.৩২, পটাশিয়াম ১৪২.৯ ভাগ, শতকরা ৪৬ ভাগই থাকে সুক্রোজ, ফসফরাস ২.৫ থেকে ১০.৭৯, আয়রন ০.৪২ থেকে ৬ ভাগ, ম্যাগনেশিয়াম 0.১৫ থেকে ৩.৮৬ ভাগ, সোডিয়াম 0.৬ ভাগ। এছাড়াও পাওয়া যায় কপার, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক ও ভিটামিন বি।
এবার সংক্ষেপে উপকারিতা জেনে নেই-
#সম্পূর্ণ রাসায়নিক থেকে মুক্ত
সাদা চিনির বিপরীতে, ব্রাউন চিনি সম্পূর্ণ রাসায়নিক থেকে মুক্ত।ব্রাউন চিনির আখের রস থেকে প্রস্তুত করা হয় এবং এতে কেবলমাত্র গুড়ের একটি অল্প পরিমাণ থাকে যা ব্রাউন চিনির রঙ এবং স্বাদ সরবরাহ করে।
#গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রয়েছে
বাদামি চিনিতে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বিদ্যমান।এক চা চামচ ব্রাউন সুগার আপনাকে আপনার প্রতিদিনের প্রয়োজনের ক্যালসিয়ানের ২০% যোগান দিতে সক্ষম।গর্ভাবস্থায় রক্তাল্পতা প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য লাল চিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।তবে অতিরিক্ত গ্রহণ করা যাবেনা।
#ততক্ষণাত শক্তি দিবে
লাল চিনি আপনাকে স্বল্প সময়ের জন্য একটি প্রাকৃতিক শক্তি দিবে।আপনি যখন দুর্বল বোধ করবেন একটু লাল চিনি খেয়ে নিলেন।তবে বাদামী চিনি আপনাকে কেবল অল্প সময়ের জন্য শক্তি সরবরাহ করবে।
#হজম উন্নতিতে সহায়তা করে
ব্রাউন সুগার আপনার হজম উন্নতি করতে অত্যন্ত উপকারী।আদার টুকরা এবং কিছু ব্রাউন চিনির সাথে সিদ্ধ পানি পান করা কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
#আ্যন্টিসেপটিক হিসেবে-
ব্রাউন সুগার একটি অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি হিসাবে কাজ করে এবং এর অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্রমণ রোধ করতে পারে।তাই কোথাও হালকা কেটে গেলে সাবান পানি দিয়ে জায়গাটি ধুয়ে একটু লাল চিনি দিতে পারেন,কাজে দিবে।তবে অবশ্যই বড় কাটা আঘাতে এই কাজ করতে যাবেন না।
#ঋতুস্রাব নিয়মিত করে ও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য উপকারী
লাল চিনির পটাশিয়াম জরায়ু পেশী শিথিল করতে সহায়তা করে মাসিক নিয়মিতো করে।তাছাড়াও মহিলাদের জন্য প্রসবের পরে দ্রুত সুস্থ করতে ব্রাউন সুগার খুব ভাল। মহিলাদের প্রসবের পরে দূর্বলতা কাটিয়ে উঠতে বেশ সময় লাগে।তখন ব্রাউন চিনি সেবন করলে দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে সহায়তা করে।
#ত্বকের সুরক্ষায়
ব্রাউন সুগার আপনার ত্বককে হাইড্রেট এবং ময়শ্চারাইজ করতে এবং আপনার ত্বকের ফোলাভাব কমাতে অত্যন্ত উপকারী।এটি ত্বকের কোষগুলিকে নতুন করে তৈরি করে ত্বককে প্রাণবন্ত করতে সহায়তা করে। এটি ত্বকের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।
#হাঁপানি রোধ করে
লাল চিনির একটি বিশেষ উপকারিতা হ'ল হাঁপানি রোধ করা।হাঁপানি অ্যান্টি-অ্যালার্জিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ঘটে।তাই হাঁপানি রোগীদের সাদা চিনির বদলে লাল চিনি পরিমানমতো গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।দীর্ঘদিন থেকে বাদামি চিনি ঠান্ডা নিরাময়ের কার্যকর প্রতিকার হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বুঝতেই পারছেন এখন কেনো আমি লাল চিনি নিয়ে আপনাদের সামনে আজ হাজির হলাম।তবে সতর্ক লেখার মাঝেও করেছি এখনো করছি,অতিরিক্ত গ্রহণে কিন্তু মোটা হয়ে যাওয়া ছাড়াও রক্তে গ্লুকোজের পরিমান বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যার সম্মুখীন হবেন।তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী যেকোনো খাবার গ্রহণ করুন স্বাচ্ছন্দ্যে।আর যেকোনো প্রয়োজনে আমি তো আছিই।ভালো থাকুন,সুস্থ থাকুন।
করোনা_হারবে_শক্তিশালী_ইমিউনিটির_কাছে
#করোনা_হারবে_শক্তিশালী_ইমিউনিটির_কাছে
✔️WHO এর মতে কোভিড ১৯ ফুসফুসকে আক্রান্ত করে শরীরের অক্সিজেন সরবরাহ করতে ব্যাঘাত ঘটায়।তাই যারা ডায়েবেটিস,উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।করোনার টিকা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধির উপর বেঁচে থাকতে হবে,যাকে সহজে বলা যায় শক্তিশালী ইমিউনিটি।প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি,ডি,বি৬ এবং মিনারেলস জিংক,ম্যাগনেসিয়াম আপনাকে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করবে শক্তিশালী ইমিউনিটি হয়ে।
আসুন জেনে নেয়া যাক সহজলভ্য ও স্বস্তায় পাওয়া যায় এমন খাবারের নাম যাতে এসকল পুষ্টি বিদ্যমান রয়েছে।
⭕আমেরিকান ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশানের সুপারিশ অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি’র দৈনিক গ্রহণমাত্রা যথাক্রমে ৯০ ও ১০০ মিলিগ্রাম।ভিটামিন সি কে বলা হয় রোগ প্রতিরোধের রাজা।সি শুধু লেবুতে নয়,নানরকম শাকসবজিতেও বিদ্যমান।
যথা-
ফলমূল
আমড়া,আমলকি,জাম্বুরা,কমলা,জাম,বরই,পাকা পেঁপে,লেবু ইত্যাদি।
সবজি
কাঁচা মরিচ,করলা,কাকরোল,সজনে পাতা,মিষ্টি আলু,পাট শাক,কালো কঁচুশাক,পুঁইশাক,আলু ইত্যাদি।
প্রাণিজ খাবার
কলিজা, মাছের ডিম, ডিমের কুসুম ইত্যাদি ভিটামিন সি এর স্বল্প মাত্রার উৎস।।
⭕মজার তথ্য- সি যুক্ত ফলের মধ্যে লেবুতে সবচেয়ে কম ও আমলকিতে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন সি রয়েছে।
⭕আমাদের দেশের জনগনের ৯০ শতাংশই ভিটামিন ডি এর অভাবজনিত সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে মেয়েরা। প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি৩ পেতে সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ৩টার মধ্যে বারান্দায় কিছুক্ষণ রোদ গায়ে লাগিয়ে নিলেন এবং সম্ভব হলে ভিটামিন ডি৩ সাপ্লিমেন্টস নিতে পারেন, তবে তা শরীরের ঘাটতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে।
⭕ভিটামিন ডি জাতীয় খাবার যথা-
কড লিভার অয়েল, মাছের তেল, জায়ফল, লবঙ্গ, এলাচি, পোস্তদানা, গাজর, গোলমরিচ, হলুদ, জিরা, আদা, কাঁচামরিচ, রসুন, ডিমের কুসুম, দুধ, আখরোট, কাজু বাদাম ইত্যাদি।
⭕বি৬ জাতীয় খাবার
সোলা,ডিম,গরুর কলিজা,মাছ,পালংশাক ইত্যাদি।
⭕জিংক
ভাত, আটা, চিড়া, ডাল, ছোলা, পালংশাক, লালশাক, ডাল, বরবটি, আলু, খেজুর, ডিম, চিংড়ি, তেলাপিয়া, ছোটো মাছ, এলাচ, মিষ্টিকুমড়ার বিচি, সয়াবিন,কাজুবাদাম, সরিষা, পোস্তদানা, জিরা, আম, তেজপাতা, আনার ইত্যাদি।
⭕ম্যাগনেসিয়াম
পালংশাক, কলা, কুমড়োর বিচি, শীম, লাল আটা, ছোলা, কাজু বাদাম, কাঠ বাদাম, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী বীজ, অ্যাভোকাডো ইত্যাদি।
⭕✔️সবশেষে এসকল খাবারের পাশাপাশি প্রতিদিন ৬-৭ ঘন্টা ঘুম ও ৩০মিনিট ঘাম ঝড়িয়ে ব্যায়াম আপনাকে এই ধরনের সকল ভাইরাস হতে সুরক্ষিতো রাখতে সাহায্য করবে।তাই আসুন আমরা সাবধানে থাকি ও নিজেদের শক্তিশালী ইমিউনিটি তৈরি করি।
বেলুনে চড়ে মহাকাশ পাড়ি
বেলুনে চড়ে মহাকাশ ভ্রমণের মতো আশ্চর্য কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে চায় "স্পেস পারস্পেকটিভ" নামের বেসরকারী একটি মার্কিন সংস্থা৷ "স্পেসশিপ নেপচুন" নামের একটি উন্নতধরনের বেলুন ব্যবহার করে ২০২১ সালের প্রথমদিকে পরীক্ষামূলক ভাবে এটি চালু করা হবে৷
নিগেল গুড এবং পল প্রিস্টম্যান এর নেতৃত্বে লন্ডন ভিত্তিক ডিজাইন সংস্থা প্রিস্টম্যানগুড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক স্পেস পারস্পেকটিভের সাথে প্রকল্পটিতে কাজ করছে৷
প্রিস্টম্যানগুডের ডিজাইনার টিম মহাকাশযানটির অগ্রভাগে বসা যাত্রীদের অভিজ্ঞতা কল্পনা করে "ভিতরে থেকে বাইরে" কন্সেপ্ট নিয়ে নকশা করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রিস্টম্যানগুডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাইগেল গুড। গুডের মতে ডিজাইন টিমটি নিশ্চিত করতে চেয়েছিল যাত্রীরা যাতে ভ্রমণের সময় ৩৬০॰ ভিউ পায় এবং ভ্রমণের সময় যাত্রীরা চারপাশ ঘুরে দেখতে পারার মত পর্যাপ্ত জায়গা পায়৷ নাইগেল গুড আরো বলেন মহাকাশযানটির ওজন হ্রাস সহ ভিতরে পাইলটের জন্যে কার্যকরী পরিবেশের ব্যবস্থা করাটাও জরুরী ছিল৷ তাই সবকিছু ভেবেই বেলুনটির এমন নকশা করা হয়েছে৷ গেটওয়ে ফাউন্ডেশন এই মহাকাশযানে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক স্পেস হোটেল ডিজাইন করছে। ভন ব্রান স্পেস স্টেশন নামেও পরিচিত এই হোটেলটি ১৯০ মিটার ব্যাসের একটি চাকা নিয়ে গঠিত যা চাঁদে অনুভূত হওয়ার মতো মহাকর্ষ শক্তি তৈরি করতে ঘুরবে৷
আলাস্কার প্যাসিফিক স্পেসপোর্ট কমপ্লেক্স থেকে এই উচ্চ প্রযুক্তির বেলুনটিকে মহাকাশের উদ্দেশ্যে পাঠানো হবে৷ যেকোন বাণিজ্যিক বিমানের চেয়ে তিনগুন বেশি উপরে মানুষকে নিয়ে যেতে পারবে এই বিরাট বেলুন৷ ভূপৃষ্ঠ থেকে এক লাখ ফুট উপরের দুনিয়া কেমন সে আনন্দ উপভোগ করতে পারবে বেলুনে উঠা যাত্রীরা৷ বিশাল এই বেলুনে একসাথে আটজন করে পর্যটক উঠতে পারবে৷ এটি ঘন্টায় ১২ মাইল বেগে উড়ে যাবে মহাশূন্যের দিকে৷ ছয়ঘন্টা এই ভ্রমণ উপভোগ করতে পারবেন তারা৷ মহাকাশে বেলুনটি ঠিক আটলান্টিক মহাসাগরের উপরে গিয়ে অবস্থান করবে৷ স্পেসশিপ নেপচুন বেলুনে বার ও রেস্টরুমসহ নানা সুযোগ সুবিধা থাকবে৷
এখনো এই বেলুন সফরের টিকেটের দাম ঠিক করেননি তারা তবে অনুমান করা হচ্ছে একাক টি টিকেটের দাম পড়বে প্রায় ১,২৫,০০০ মার্কিন ডলার৷
গামা রে ব্লাস্ট
গামা রে ব্লাস্ট মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং উজ্জ্বল বিস্ফোরণ গুলোর মধ্যে একটি ধারণা করা হয় ব্ল্যাকহোল গঠনের সময় এই গামা রে উৎপন্ন হতে পারে। গামা রে মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয় , গামা রে কয়েক সেকেন্ডে যে পরিমান শক্তি উৎপন্ন করে আমাদের সূর্যের সে পরিমান শক্তি উৎপন্ন করতে প্রায় ১০ মিলিয়ন বছরের বেশি সময় লাগবে।
গামা রে ব্লাস্ট ১৯৬৭ সালে আমেরিকার বিমান বাহিনীর স্যাটেলাইট ভেলা সর্বপ্রথম সনাক্ত করেছিল গোপনীয় ভাবে সোভিয়েত পারমাণবিক পরীক্ষায় নজরদারি রাখার জন্য এই তদন্তটি করা হয়েছিল, তবে নাসার মতে সৌরজগতের ওপার থেকে আসা সবচেয়ে শক্তিশালী তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ - দ্যুতিময় গামা-রশ্মির ভেলা স্যাটেলাইটটি সন্ধান করেছিল ।
এরপর ১৯৯১ সাল নাগাদ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্রাস্ট অ্যান্ড ট্রান্সিয়েন্ট সোর্স এক্সপেরিমেন্ট (বিএটিএসই) দিয়ে কমপটন গামা রে অবজারভেটরি চালু করেছিলেন, যা প্রতিদিন প্রায় একটি নতুন গামা-রে ব্লাস্ট আবিষ্কার করেছিল। বিএটিএসই আবিষ্কার করেছে যে গামা-রে ব্লাস্টগুলো মহাকাশ জুড়ে সমানভাবে বিতরণ করছিল, অর্থাৎ গামা রে ব্লাস্ট মহাবিশ্বে যেকোন জায়গায় ঘটছিল, - অস্ট্রেলিয়ার স্নিনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি। BATSE আরও দেখিয়েছে যে স্বতন্ত্র স্বাক্ষর সহ দুটি ধরণের গামা-রে ফেটেছিল: যা 2 থেকে 30 সেকেন্ড স্থায়ী ছিল এবং যেগুলি 2 সেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য ফ্লাশ হয়েছিল
গামা-রে ফেটে ব্লাস্ট হয় কোথায় থেকে?
নাসার বিজ্ঞানীদের মত অনুসারে, গামা-রে বিস্ফোরণের দীর্ঘকালীন সংস্করণ হাইপারনোভা নামে অতিশক্তি সম্পন্ন সুপারনোভার সাথে জড়িত বলে প্রমাণিত হয়েছে, যা আমাদের সূর্যের ভর পাঁচ থেকে দশগুণ মধ্যে নক্ষত্রগুলি তাদের জীবন শেষ করে এবং ব্ল্যাখোলে ডুবে থাকে, নাসা জানিয়েছে। হাইপারনোভা্র সাধারণ সুপারনোভার চেয়ে 100 গুণ বেশি উজ্জ্বল এবং নক্ষত্র দ্বারা উৎপাদিত বলে মনে করা হয় যা বিশেষত দ্রুত ঘুরছে বা একটি বিশেষত শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্র রয়েছে, যা তাদের জ্বলনের জন্য অতিরিক্ত শক্তি জোগায়।
তবে স্বল্পমেয়াদী গামা-রে ব্লাস্টের ঘটনাগুলির 30% অংশ নিয়েছে, 2005 সাল পর্যন্ত এটি একটি রহস্য হিসাবে রয়ে গেছে, মূলত কারণ গামা রে ব্লাস্ট পর্যবেক্ষণের জন্য দ্রুত ও ক্ষণস্থায়ী।
২০০৪ সালে নাসার Neil Gehrels Swift Observatory ( পূর্বে নাম ছিল the Swift Gamma-Ray Burst Explorer) অবশেষে স্বল্পমেয়াদী গামা-রে ফেটে যাওয়ার পরে দেখার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছিল এবং বুঝতে পেরেছিল যে বিস্ফোরণটি সম্ভবত কখন এবং কোথায় হয়েছিল নিউট্রন স্টার হিসাবে পরিচিত দুটি আল্ট্রাডেন্স স্টার্লার এর সংঘর্ষ করে একটি ব্ল্যাকহোল গঠন করেছিল, অথবা যখন ব্ল্যাকহোল একটি নিউট্রন স্টার তার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছিল ।
এ জাতীয় গামা রে ব্লাস্ট এতটাই শক্তিশালী যে তারা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নামক মহাকাশ সময়ের ফ্যাব্রিকগুলিতে লহর তৈরি করে। গবেষকরা লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজারভেটরি (এলআইজিও) পরীক্ষা চালিয়েছেন যা এই সংঘর্ষগুলি থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গগুলি সনাক্ত করতে পারে, তারা ।
আশা করা যায় যে স্বল্পস্থায়ী গামা-রে বিস্ফোরণগুলির অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়াগুলি সম্পর্কে আরও আরও তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে
বিশাল রঙ্গীন পেখমের ময়ূর
বিশাল রঙ্গীন পেখমের ময়ূর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সবার। এর রঙের বিন্যাস, সৌন্দর্য্য এবং চালচলনে আভিজাত্য একে সবার থেকে আলাদা করে। ময়ূর তাই আঁকা হয় ক্যানভাসে, লেখা হয় কবিতায়, তার পালক স্থান পায় শখের সংগ্রহে। কিন্তু ময়ূরের সব গাম্ভীর্য্য শেষ হয়ে যায় তার কন্ঠস্বরে। আসুন জেনে নিই আমাদের সবার প্রিয় এই ময়ূর সম্পর্কে এমনই আরও মজার কিছু তথ্য।
১। শুধু পুরুষ ময়ুরকেই বলা হয়, "peacock". গোষ্টীগতভাবে এদের ইংরেজী নাম "peafowl"। নারী ম্যূরের নাম "peahen"। আর ময়ূর ছানাদের বলা হয় “pea chicks”। ময়ূর পরিবারকে বলা হয় "bevy"।
২। ময়ূর কিন্তু তার এই সুন্দর পেখম নিয়েই জন্মলাভ করে না। ৩ বছর বয়স পর্যন্ত পুরুষ ময়ূরের লাজ জন্মে না। এমনকি অনেক দিন পর্যন্ত এদের লিঙ্গই বোঝা যায় না। ময়ূর এবং ময়ূরী একদম একই রকম থাকে দেখতে। ৬ মাস বয়স থেকে ময়ূর রঙ বদলাতে শুরু করে।
৩। সৌভাগ্যজনকভাবে ময়ূর প্রতি বছর তাদের প্রজনন সময়ের পর পেখম বদলায়। তাই সেগুলো জড়ো করে সহজেই সংগ্রহ বা বিক্রী করা যায়। ময়ূরের পালক নিয়ে ব্যবসা করার জন্য ময়ূর মেরে ফেলবার প্রয়োজন হয় না।
৪। ময়ূর তার বন্য জীবনে গড়ে ২০ বছর বাঁচে।
৫। ময়ূর কিন্তু উড়তে পারে। বিশাল পেখম থাকা সত্ত্বেও তারা ভালই উড়তে পারে।
৬। ময়ূরের পেখম ৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এদের শরীরের ৬০ ভাগই হল পেখম।
৭। সচরাচর দেখা যায় না শিল্পীর তুলির আঁচড়ে। সব চিড়িয়াখানাতেও হয়ত দেখা মিলবে না। কিন্তু ধবধবে সাদা ময়ূর কিন্তু আছে। লিউসিজম নামক একটি প্রজনন ত্রুটির কারণে জেনেটিক মিউটেশন ঘটে এবং এর কারণে ময়ূরের ত্বক স্বাভাবিক রঙ হারায়। লিউসিজম আক্রান্ত প্রাণীদের চোখের রঙ অবশ্য স্বাভাবিক থাকে।
৮। মধ্যয্যগে ময়ূর ছিল আভিজাত্যপূর্ণ খাবার। এদের রোস্ট করে আবার পালক বসিয়ে সাজানো হত এবং খাবারের টেবিলে পরিবেশন করা হত। পাখিটি দেখতে যত সুন্দরই হোক না কেন, স্বাদে কিন্তু জঘন্য। সে সময় ফিজিয়ানরা খাবারটির সমালোচনা করেন কারণ ময়ূরের মাংস শক্ত এবং মোটা, হজমেও সমস্যা তৈরি করে।
৯। ময়ূর অনেক চতুর প্রাণী। সম্প্রতি এক গবেষণায় পাওয়া গেছে এই তথ্য। যখন ময়ূর কোন ময়ূরীর সাথে মিলিত হয় তখন তারা বিশেষ এক প্রকার শব্দ করে। গবেষক রোজলিন ডাকিন এবং রবার্ট মন্টগোমারি আবিষ্কার করেন যে, ময়ূর এই শব্দ বা ডাক অন্য সময়ও ব্যবহার করে আরও ময়ূরীকে আকর্ষণ করার জন্য। তারা বোঝাতে চায় যে তারা মিলিত হচ্ছে, কিন্তু আসলে তা নয়। শুধু দূর থেকে এই শব্দ শুনে ময়ূরীরা ভাবে সে মিলনে সক্ষম। এটাই তার বুদ্ধি।
১০। ময়ূরের পালক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্রিস্টালের মত গঠন দ্বারা আবৃত। এই ক্রিস্টালের আবরণের কারণেই এক ময়ূরের পালকে প্রতিফলিত হয় এত রঙ। হামিং বার্ড এবং শিমারি প্রজাপতির পাখাতেও একই ধরণের ক্রিস্টালের গঠন থাকে।
আইজ্যাক নিউটন
কিছুদিন আগে বিখ্যাত পদার্থবিদ্যার #জনক স্যার আইজ্যাক নিউটনের (Sir Isaac Newton) ৩৭৭তম জন্মদিন🎉 পেরিয়ে গেল। তার জন্মদিনের তারিখ নিয়ে ছিল বিভিন্ন মতবাদ, তর্ক-বিতর্ক। এই তর্ক-বিতর্কের ভিড়ে এই পোস্টটি আর দিয়ে পারেনি। তাই তার সবকিছু শেষ হওয়ার পর দেওয়া হলো। যে বিষয়টি নিয়ে সচারাচর অনেকেই আলোচনা করে না। তাই আজ জেনে নেওয়া যাক তার কিছু পাগলামির ইতিহাস।
🎊ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন। পদার্থবিজ্ঞান এবং ক্যালকুলাসে তার অবদান অনস্বীকার্য। তবে তার মেধার আলোয় ঢেকে গেছে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। তিনি ছিলেন কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ। বয়স বাড়ার সঙ্গে নিউটনের আগ্রহ ভাগ হয়ে যায় যুক্তিবিজ্ঞান এবং অযুক্তিক বিশ্বাসে। এসব বিশ্বাসকে তাড়া করে কম পাগলামিও করেননি তিনি।
🎁তাহলে এবার শুরু করা যাকঃ
🎈প্রথমে আসি, নিজের মাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে এসেছিলেন নিউটন।
নিউটন বেশ ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। বিজ্ঞানের প্রতি যতটুকু ভালোবাসা ছিল, বাইবেলের প্রতি তার চেয়েও কম নয়। ২০ বছর বয়সে নিজের ধার্মিক চিন্তা থেকে নিজের ৫৭ টি অপরাধের তালিকা বানান। এর মাঝে বেশিরভাগই ছিল ছোট ছোট কাজ, যা অপরাধ ভাবতেও দ্বিধা হয়। যেমনঃ চার্চে বসে আপেল খাওয়া, ছোট বোনকে ঘুষি মারা ইত্যাদি। কিন্তু এসব কাজকে পাপের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যেই হয়তোবা লুকিয়ে ছিল তার ভবিষ্যৎ পাগলামির আভাস। এই তালিকার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল নিউটন তার মা এবং সৎ বাবাকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন বলে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
💎এরপর আসি, পরশপাথরের খোঁজে নিউটন।
নিউটনের সময়ে পরশপাথর নিয়ে হৈ-হুল্লোড় কম হয়নি। অনেকের বিশ্বাস ছিল পরশপাথরের অস্তিত্ব আছে। আর বিশেষ প্রক্রিয়ায় তা তৈরি করা সম্ভব। এই অনেকের তালিকায় একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও ছিলেন তিনি হলেন নিউটন। পরশপাথর এমন বস্তু যার ছোঁয়ায় সাধারন ধাতু সোনায় পরিণত হয়। তার স্পর্শের পানি খেয়ে মানুষ হতে পারে অমর। জীবনের শেষের দিকে তার বিশ্বাস ছিল পরশপাথর আজগুবি কিছু নয় বরং পরিপূর্ণ বিজ্ঞান। অ্যালকেমির উপর যেখানে যে কাগজ পেয়েছেন পড়ে শেষ করেছেন। নিজের গবেষণাগারে তো সবসময় চেষ্টা করেই গেছেন অমরত্তের ঔষধ বানানো। ধারণা করা হয়, নিউটন পারদকে পরশ পাথরের মত ভাবতেন। নিজের কিছু লেখায় তিনি অন্য অ্যালকেমিস্টদের পারদ থেকে তৈরি বিশেষ ঔষধ এর কথা বলেই গেছেন। দিনের পর দিন তিনি নিজের ল্যাবে পারদ বাষ্প শুষে গেছেন। আরও ধারণা করা হয়, পারদের বিষাক্ত গ্যাসের প্রতিক্রিয়াতেই তার মাথা বিগড়ে গিয়েছিল। পারদের বিষ সারা শরীরে ছড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৭০ সালে নিউটনের চুলের নমুনা পরীক্ষা করে তাতে স্বাভাবিকের তুলনায় ৪০ গুণ বেশি পারদ পাওয়া গিয়েছিল।
💊এরপর আমরা আসি,
#এমারেল্ড ট্যাবলেটের রহস্য।
আইজ্যাক নিউটনের টুকরো অনেক লেখার মাঝ থেকে পাওয়া যায়, নিউটনের হাতে লেখা এমারেল্ড ট্যাবলেটের অনুবাদ। এখানে সংক্ষেপে জানিয়ে রাখা ভাল যে, এমারেল্ড ট্যাবলেট হলো আরেক রহস্যময় জিনিস। পান্নার চৌকো এ পাথরে কিছু লেখা খোঁদাই করা আছে। কিংবদন্তি অনুসারে এ লেখা স্বর্গীয়। কেউ কেউ বলেন এটা তৈরি করেছিল হার্মিস ট্রাইসমেজিস্টাস। তিনি হলেন পাগান অবতার। যিনি কিছুটা গ্রিক দেবতা হার্মিস, মিশরীয় দেবতা থর। বলা হয়, এ পাথরে খোদিত আছে বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য। মহাবিশ্বের আকারহীন প্রাথমিক উপাদান, যা কিনা সময়ের শুরুতে শুণ্যে গড়ে তুলেছিল সৃষ্টি। এমারেল্ড ট্যাবলেটের অনুবাদ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি করেছে। নিউটন সৃষ্টির রহস্য জানতে এমারেল্ড ট্যাবলেটের উপর ভরসা করেছিলেন। আর সেটি যে বড় ঠুনকো নয়, আর তিনি কেবল সময় কাটাতে অনুবাদ করেছেন তা কিন্তু নয়। তার প্রমাণ তিনি প্রাথমিক উপাদানের রহস্য ভেদ সবসময় করতে চেয়েছিলেন। কারণ সে উপাদান থেকে রূপান্তরিত হতে পারে যে কোন পদার্থই। নিউটনের এই অনুসন্ধানটিও পরশপাথর ধরনের কিছু তৈরিতে নিয়োজিত ছিল।
🔮সর্বশেষে, ২০৬০ সালে কেয়ামত।
🔎বাইবেল ঘেঁটে অংক কষে কেয়ামতের সাল জানতে পেরেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন নিউটন। তিনি বলেন, "২০৬০ সালে গেরস্থ থেকে ফেরেশতা নেমে আসবে। ব্যাবিলনের সাম্রাজ্য পতন হবে আর যীশুখ্রীষ্ট পুনরুজ্জীবন পাবে।" এ কথাগুলো মোটেও কোন ছদ্দবেশী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ছিল না। বরং তিনি আক্ষরিক অর্থে দাবি করেছিলেন ফেরেশতা নেমে এসে আকাশে উড়ে বেড়াবে। আত্মবিশ্বাসের সাথে নিউটন দাবি করেছিলেন কেয়ামত কিছুদিন পরে হতে পারে কিন্তু ২০৬০ সালের আগে হবে না। তার কাছে এটা ছিল আর দশটা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মত। শেষের দিকে নিউটন একেবারে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন। বেশিরভাগ সময় কাটাতেন আজগুবি সব রহস্যের পেছনে। বন্ধুদের সাথে দেখা হলে এমন সব কথা বলতেন, যার ফলে বন্ধুমহলে নিউটন খুব অপ্রিয় হয়ে পড়ে। ২৪ ঘন্টায় খুব বেশি হলে ১ ঘন্টা ঘুমাতেন। কখনো কখনো টানা পাঁচ দিন না ঘুমিয়েই পার করতেন। তেমন কিছু খেতেনও না। সম্ভবত এ কারণেই অনেক বেশি ঘোপ বা হ্যালুসিনেশনে পড়তে শুরু করেন তিনি। বন্ধুদের সাথে মাঝেমাঝে আক্রমনাত্মক ব্যবহার করে বসতেন। দার্শনিক জন লক (John Locke) অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দেখতে গিয়েছিলেন নিউটন। বলেছিলেন, "তুমি মরে গেলেই খুশি হব।" এর কারণ হিসেবে নিউটন বলেন, "লক তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।" মেরে ফেলার নয় বরং এই বয়সে নিউটনকে আবার বিয়ে দেওয়া। লককে দেওয়া এক চিঠিতে নিউটন আগের লেখা চিঠির বিষয়ে ক্ষমা চেয়ে বলেন, "তিনি আগে যা বলেছেন তার কিছুই মনে নেই, যদি খারাপ কিছু হয় লক যেন তাকে ক্ষমা করে।"
⚗️বিজ্ঞানকে শতবর্ষে এগিয়ে দেওয়া নিউটনই কত রকম কুসংস্কারে বাধা হয়েছিল ভাবতে অবাক লাগতে পারে। কিন্তু তার অবদানের কল্যাণে এত সব পাগলামি অনায়াসে ভুলে যাওয়া যায়।
পোস্টটি যাতে খুব বড় না হয়ে যায় এজন্য অনেক তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। আপনাদের কোন বিষয়ে জানার আগ্রহ থাকলে কমেন্ট বক্সে নক করতে পারেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, "যেখানে পাগলামি সেখানেই আবিষ্কার।"😁
বিজ্ঞানীদের নিয়ে মজার কিছু তথ্য 👻👻
১.তথ্য দিতে রাজি হননি বলে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্লামস্টিডের গবেষণাপত্র কেড়ে নিয়েছিলেন নিউটন
জ্ঞান-বুদ্ধিতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বলেই তাঁরা বিজ্ঞানী। তাঁদের অসাধারণ বুদ্ধির জোরেই পৃথিবী এত আধুনিক হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোই মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব কাণ্ড করে বসেন। কিছু কিছু কাণ্ড হয়তো অতি বোকারাও করবে না। কিছু অদ্ভুত কাজ আবার স্বজ্ঞানেই করেন স্রেফ মজা করার জন্য। নিউটন কত বড় বিজ্ঞানী, কত বড় মানুষ! কিন্তু তাঁর আচরণ ছিল হিংসুটের মতো। খুব ছোটবেলায় নিউটনের বাবা মারা যান। মা আরেকজনকে বিয়ে করে নিউটনকে ছেড়ে চলে যান। ভীষণ একা হয়ে পড়েন তিনি। এর প্রভাব পড়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনে। হিংসুটে ও বদমেজাজি হয়ে ওঠেন। গান, সিনেমা, নাটক, কবিতা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি ঘৃণা করতেন। তাই এসব থেকে নিজেকে সযত্নে সরিয়ে রাখতেন। তিনি কাউকে বিশ্বাস করতেন না, বন্ধু আর সহকর্মীদের সন্দেহের চোখে দেখতেন। নিউটন ‘না’ শব্দটা একেবারেই পছন্দ করতেন না। কেউ তাঁর বিরোধিতা করলেও খেপে যেতেন।
নিউটনের বিখ্যাত বই প্রিন্সিপিয়া অব ম্যাথমেটিকা। এটা পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বই বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। জন ফ্লামস্টিড অনেক তথ্য দিয়ে নিউটনকে এই বই লিখতে সহযোগিতা করেন। বইয়ের প্রথম সংস্করণের তথ্যসূত্রে একাধিক জায়গায় ফ্লামস্টিডের নাম ছিল। সেই ফ্লামস্টিডকেই নানাভাবে হেনস্তা করেন নিউটন।
বিজ্ঞানী সমাজে নিউটনের তখন বিরাট ক্ষমতা। লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে তাঁর দাপট ছিল। রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমির তথ্য-উপাত্ত বিভাগে নিযুক্ত ছিলেন ফ্লামস্টিড। নিউটন তাঁর কাছে ব্যক্তিগত গবেষণার জন্য কিছু তথ্য চান। কিন্তু এসব তথ্য কাউকে দেওয়ার অনুমতি ছিল না। তাই ফ্লামস্টিড সেগুলো দিতে অস্বীকার করেন। এতে নিউটন ভীষণ চটে যান। নিজের ক্ষমতাবলে তিনি রয়্যাল মানমন্দিরে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হন। ফ্লামস্টিডকে আবারও চাপ দেন তথ্য প্রকাশের জন্য। তিনি রাজি হননি। তখন নিউটন ফ্লামস্টিডের ব্যক্তিগত কিছু গবেষণাপত্র কেড়ে নেন। তারপর সেগুলো জার্নালে প্রকাশ করেন এডমন্ড হ্যালির নামে। হ্যালি ছিলেন ফ্লামস্টিডের জাতশত্রু। ফলে ফ্লামস্টিডও ভীষণ খেপে যান। নিউটনের বিরুদ্ধে গবেষণাপত্র চুরির অভিযোগে মামলা করেন। এতে আরও ক্ষুব্ধ হন নিউটন। প্রিন্সিপিয়া অব ম্যাথমেটিকা বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে যেখানে যেখানে ফ্লামস্টিডের নাম ছিল, সেগুলো সব বাদ দেন।
২.আইনস্টাইন সম্পর্কে অনেক বোকামির গল্প প্রচলিত আছে
আইনস্টাইন ছিলেন নিউটনের একেবারে উল্টো চরিত্রের। সাদাসিধে ভালো মানুষ যাকে বলে। কিছুটা বোকাও ছিলেন। তার বোকামির ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। আসলে আইনস্টাইন বিজ্ঞানের ভেতর এতটাই ডুবে থাকতেন, চারপাশের অন্য কিছুর দিকে তাঁর খেয়াল থাকত না। একদিন আইনস্টাইন কোথায় যেন গিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে এসে দরজায় নক করলেন। আইনস্টাইনের খ্যাতি তখন তুঙ্গে। সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, ছাত্র, গবেষকেরা ভিড় করতেন তাঁর বাসায়। বারবার দরজা খুলতে খুলতে বিরক্ত আইনস্টাইনের স্ত্রী। তাই আইনস্টাইন বাসায় না থাকলে তিনি ভেতর থেকে হেঁকে বলতেন, আইনস্টাইন বাসায় নেই। সেদিন বোধ হয় বিজ্ঞানী মহাশয় একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরেছিলেন। তাই দরজায় নক করতেই তাঁর স্ত্রী হেঁকে বললেন, ‘আইনস্টাইন বাড়ি নেই।’ এ কথা শুনে আত্মভোলা আইনস্টাইন চিন্তায় পড়ে গেলেন। তারপর রাস্তায় নেমে এলেন। আবার শুরু করলেন নিজের বাড়ি খোঁজা।
৩.অদ্ভুত এক কাণ্ড করে নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে দুটো নোবেল প্রাইজ বাঁচিয়েছিলেন নিলস বোর
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে। হিটলারের প্রচণ্ড রাগ ইহুদিদের ওপর। যেখানে ইহুদি পাচ্ছে ধরে ধরে মেরে ফেলছে হিটলারের নাৎসি বাহিনী। এমনকি নিজ দেশ জার্মানির বিজ্ঞানীরাও রেহাই পাচ্ছে না হিটলারের হাত থেকে। আলবার্ট আইনস্টাইন ইহুদি ছিলেন। হিটলারের ভয়ে তিনিও পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। যুদ্ধের ডামাডোলে আটকা পড়েন দুই পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভন লু ও ম্যাক্স ফ্রাঙ্ক। দুজনই নোবেল পেয়েছেন। দুজনই ইহুদি। নোবেল দেওয়া হয় সুইডেন থেকে। সুইডেন আবার হিটলারের শত্রু দেশ। শত্রুদের কাছ থেকে তাঁর দেশের দুই ইহুদি বিজ্ঞানী নোবেল নিয়েছেন! হিটলার সেটা মুখ বুজে সহ্য করবেন কেন। লু আর ফ্রাঙ্ককে ধরার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়ল নাৎসি বাহিনী। লু আর ফ্রাঙ্ক ভাবলেন, ধরা পড়লে নির্ঘাত মরতে হবে। সেই সঙ্গে নোবেল প্রাইজটাও কেড়ে নিয়ে নষ্ট করে ফেলবে হিটলারের সৈন্যরা। তাঁরা নিজেদের চেয়ে নোবেল প্রাইজ নিয়েই বেশি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। প্যাকেট ভরে মেডেল দুটো পাঠিয়ে দিলেন ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। সেখানে তাঁদের বন্ধু বিখ্যাত বিজ্ঞানী নিলস বোর বাস করতেন।
বোর মেডেল দুটো যত্ন করে লুকিয়ে রাখলেন। কিন্তু বেশি দিন নয়। কারণ, নাৎসি বাহিনী ডেনমার্কেও হামলা করেছে। যেকোনো সময় বোরের গবেষণাগারেও হামলা চালাতে পারে। তখন মেডেল দুটো বাঁচানোই মুশকিল হয়ে যাবে। বোর প্রথমে ভাবলেন, মেডেল দুটো মাটিতে পুঁতে রাখবেন। কিন্তু নাৎসিদের বিশ্বাস নেই। ওরা ঠিক মাটি খুঁড়ে বের করে ফেলবে। বোরের এক সহকারী ছিলেন। হাঙ্গেরিয়ান রসায়নবিদ জর্জ হাভাসি। তিনি বোরকে বুদ্ধি দিলেন সোনাগুলো গুলিয়ে তরল করে ফেলতে। যে সে তরলে সোনা গলে না। সোনা গলাতে লাগে রাজ অম্ল অ্যাকোয়া রেজিয়া। অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যাসিড। বোর আর হাভাসি তখন নোবেল মেডেল দুটো অ্যাকোয়া রেজিয়ার ভেতর ফেলে গলিয়ে ফেললেন। সোনা আর অ্যাসিড মিশে তখন হলুদ রঙের এক তরলে পরিণত হয়েছে। বোর সেই হলুদ তরল একটা বোতলে ভরে রেখে দিলেন আলমারিতে। তারপর কোপেনহেগেন থেকে তাঁরা পালিয়ে বাঁচলেন।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে হিটলার হেরে যান। বোর আর হাভাসি আবার কোপেনহেগেনে ফিরে আসেন। তাঁদের ল্যাবরেটরি লন্ডভন্ড করে রেখে গেছে নাৎসি সৈন্যরা। কিন্তু আলমারির কোণে সেই হলুদ তরলের বোতল একেবারে অক্ষত! মাথা মোটা নাৎসিরা ওর মর্ম কী বুঝবে! পরে নিলস বোরের ছেলে অ্যাগেই বোর অ্যাকোয়া রেজিয়া থেকে আবার সোনাগুলো পুনরুদ্ধার করেন। নিলস বোর সেই সোনা পাঠিয়ে দেন সুইডেনের নোবেল কমিটির কাছে। নোবেল কমিটি সেই সোনা দিয়ে আবার দুটো মেডেল তৈরি করে তাতে লু ও ফ্রাঙ্কের নাম লিখে পাঠিয়ে দেয় বোরের কাছে। এভাবেই রক্ষা পায় বিখ্যাত দুই বিজ্ঞানীর নোবেল প্রাইজ।
৪.মজার এক কথা লিখে বোরের চিঠির জবাব দিয়েছিলেন উলফ্যাং পাউলি
অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী উলফ্যাং পাউলি। ‘পাউলির অপবর্জন নীতি’ নামে একটা বিখ্যাত সূত্র আছে পদার্থবিজ্ঞানে। সূত্রটা তাঁরই আবিষ্কার। এই পাউলিই সর্বপ্রথম নিউট্রনো কণার ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তবে এর পেছনে নিলস বোরের অবদান আছে। সময়টা ১৯২৯ সাল। বোর তখন বিখ্যাত বনে গেছেন তাঁর পরমাণু মডেলের কারণে। বোর একটা পরামর্শ চেয়ে চিঠি লিখলেন পাউলিকে। পাউলি বোরের চেয়ে ১৫ বছরের ছোট। তা ছাড়া তত দিনে নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেছেন বোর। তবু ২৯ বছর বয়সী জুনিয়র বিজ্ঞানীর কাছে পরামর্শ কেন? কারণ, পাউলি স্পষ্ট বক্তা হিসেবে বিখ্যাত। কোনো বিজ্ঞানীর তত্ত্ব ঠিক মনে না করলে সরাসরি বলে ফেলতেন তাঁর বক্তব্য। তাঁর কটু মন্তব্যের ভয় পেতেন অনেক তরুণ বিজ্ঞানীও। এ জন্য বোর তাঁর তত্ত্ব পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছিলেন পাউলির কাছে। পাউলি বোরের ধারণার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। জবাবে লিখেছিলেন, ‘বিকিরণ বিষয়ে আপনার ধারণা মোটেও সন্তোষজনক নয়। আপাতত আপনার ধারণা ঘুমিয়ে থাকুক আর নক্ষত্ররা আলো দিক শান্তিতে...!’ বোরের মুখের ওপর এমন জবাব দেওয়ার সাহস তখন অনেক ডাকসাইটে বিজ্ঞানীরও ছিল না।
আইনস্টাইন
অসাধারণ বিজ্ঞানীদের বেশিরভাগ কাজ ই হয় "অ সাধারণ"। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনও এর ব্যতিক্রম নয়। এমনকি তার জন্মতারিখটিও চমকপ্রদ- 3.14 ! আপাদত সালটা বাদ থাক। এবার কিছু মজার ঘটনা জানা যাক এই "অ সাধারণ" বিজ্ঞানীর জীবনী থেকে 😃😃
"১.
আইনস্টাইনের এক সহকর্মী একদিন তাঁর টেলিফোন নম্বরটা চাইলেন। আইনস্টাইন তখন একটি টেলিফোন বই খুঁজে বের করলেন এবং সেই বই থেকে তাঁর নিজের নম্বরটা খুঁজতে লাগলেন।
সহকর্মী তাকে বললেন, ‘কী ব্যাপার, নিজের টেলিফোন নম্বরটাও মনে নেই আপনার।’
আইনস্টাইন বললেন, ‘না। তার দরকারই বা কী? যেটা আপনি বইতে পাবেন, সে তথ্যটা মুখস্থ করে মস্তিস্ক খরচ করবেন কেন?’
২.
আইনস্টাইন ছোটবেলায় তুলনামূলকভাবে অনেক দেরিতে কথা বলতে শেখেন। তাঁর বাবা মা এ ব্যাপারে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। একদিন রাতে খাবার টেবিলে বসে সকলে খাচ্ছেন, এমন সময় বালক আইনস্টাইন চিৎকার করে বললেন, 'এই স্যুপটা বড্ড গরম।'
তাঁর বাবা-মা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। ছেলের মুখে প্রথম কথা শুনে বাবা-মা বেশ অবাক হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আগে তুমি কথা বলো নি কেন?’
উত্তরে আইনস্টাইন বললেন, ‘কারণ এর আগে তো সব ঠিকই ছিল। স্যুপ কখনো গরম ছিল না।’
৩.
১৯৩১ সালে কৌতুক অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন আইনস্টাইনকে আমন্ত্রণ জানান তার একটি শো দেখার জন্য। তখন চ্যাপলিনের 'সিটি লাইটস্' সিনেমার প্রদর্শনী চলছিল। শো-এর পরে তারা দুজন শহরের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন চ্যাপলিন আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সবাই আমাকে সহজেই বোঝে, এজন্যই আমার এত জনপ্রিয়তা। কিন্তু মানুষ আপনাকে কেন এত পছন্দ করে বুঝলাম না।’
আইনস্টাইন সহাস্যে প্রত্যুত্তরে জানালেন, ‘কেউ আমাকে সহজে বুঝতে পারে না বলেই আমার এই জনপ্রিয়তা’।
৪.
একবার আইনস্টাইন ট্রেনে চেপে যাচ্ছিলেন। চেকার সকলের টিকিট চেক করার এক পর্যায়ে আইনস্টাইনের কাছে এসে টিকিট দেখতে চাইলেন। কিন্তু আইনস্টাইন তাঁর টিকিটটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। চেকার আইনস্টাইনকে চিনতে পেরে বললেন, ‘স্যার আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি। আপনি নিশ্চয়ই টিকিট কেটে উঠেছেন। আপনাকে টিকিট দেখাতে হবে না।’
আইনস্টাইন কিছুটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘না, না, ওটা আমাকে খুঁজে বের করতেই হবে। না পেলে আমি জানব কী করে যে আমি কোথায় যাচ্ছিলাম!’
৫.
আইনস্টাইনের কাছে একবার আপেক্ষিকতার সহজ ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হলো। উত্তরে আইনস্টাইন বললেন, ‘আপনার হাত একটা জ্বলন্ত চুলার উপর ধরে রাখুন, মনে হবে এক ঘন্টা পার হয়ে গেছে। কিন্তু একজন সুন্দরী মেয়ের পাশে একঘন্টা বসে থাকুন, আপনার কাছে মনে হবে মাত্র এক মিনিট পার হলো...এটাই আপেক্ষিকতা।’
৬.
একবার আইনস্টাইন বাইরে থেকে বাসায় ফিরে দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে তাঁর স্ত্রী ভাবলেন অন্য কেউ হয়তো আইনস্টাইনকে খুঁজতে এসেছেন, তাই তিনি বেশ বিরক্ত হয়ে চেচিয়ে বললেন, আইনস্টাইন বাড়িতে নেই। ব্যস, চিন্তিত আইনস্টাইন কোনো কথা না বলে উল্টো হাঁটা ধরলেন।
৭.
হাস্যরসপ্রিয় আইনস্টাইন তার যুগান্তকারী আপেক্ষিক তত্ত্বের আবিষ্কার নিয়ে একবার কৌতুক করে বলেছিলেন, আমার আপেক্ষিক তত্ত্ব সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। এবার জার্মানি বলবে আমি জার্মান আর ফরাসিরা বলবে আমি বিশ্বনাগরিক। কিন্তু যদি আমার তত্ত্ব মিথ্যা হতো তাহলে ফরাসিরা বলত আমি জার্মান আর জার্মানরা বলত আমি ইহুদি।
৮.
আপেক্ষিক তত্ত্বে বেশ জটিলতা এবং দুর্বোধ্যতা থাকার কারণে মুখরোচক কিছু কাহিনী ছড়িয়ে পড়ল। একদিন এক সুন্দরী তরুণী তার প্রেমিকের সাথে চার্চের ফাদারের পরিচয় করিয়ে দিল। পরদিন যখন মেয়েটি ফাদারের কাছে গেল, ফাদার তাকে কাছে ডেকে বললেন, তোমার প্রেমিককে আমার সব দিক থেকেই ভালো লেগেছে শুধু একটি বিষয় ছাড়া।
মেয়েটি কৌতুহলে জিজ্ঞাসা করল, কোন বিষয়? ফাদার বললেন, তার কোনো রসবোধ নেই। আমি তাকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের কথা জিজ্ঞাসা করেছি আর সে আমাকে তাই বোঝাতে আরম্ভ করল। হাসিতে ফেটে পড়ল মেয়েটি।
৯.
আইনস্টাইন আমেরিকায় গিয়েছেন, সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরল। একজন জিজ্ঞাসা করলো, আজকাল মেয়েরা কেন আপেক্ষিক তত্ত্ব নিয়ে এত আলোচনা করছে?আইনস্টাইন হাসতে হাসতে বললেন, মেয়েরা সব সময়ই নতুন কিছু পছন্দ করে। এই বছরের নতুন জিনিস হলো আপেক্ষিক তত্ত্ব।
১০.
একদিন সন্ধ্যাবেলায় প্রিন্সটনের ডিরেকটরের বাড়িতে ফোন এলো, 'দয়া করে যদি আইনস্টাইনের বাড়ির নম্বরটা জানান!' আইনস্টাইনের বাড়ির নম্বর কাউকে জানানো হবে না--কঠিন গলায় তা জানিয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন ডিরেকটর।
খানিক পরে আবার ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে শোনা গেল, 'আমি আইনস্টাইন বলছি, বাড়ির নম্বর আর রাস্তা দুটোই ভুলে গিয়েছি। যদি দয়া করে বলে দেন।'
১১.
১৯২১ সালে ফিলিস্তিন ভ্রমণে বেরিয়েছেন আইনস্টাইন। সেখানে ‘যুব সংঘ’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন ২২ বছর বয়সী এক তরুণী। সমাজের নানা বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করছিলেন আইনস্টাইন। একবার আইনস্টাইন তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা, এখানে নারী-পুরুষে সম্পর্ক কেমন?’ এ প্রশ্ন শুনে ওই তরুণী লজ্জায় পড়ে গেলেন। তিনি বললেন, ‘দেখুন অধ্যাপক, এখানে কিন্তু একজন পুরুষের একটিই স্ত্রী।’ একটু হেসে তাঁর হাতখানা ধরে আইনস্টাইন বললেন, 'না, না। আমার প্রশ্নটা ওভাবে নিয়ো না। আমরা পদার্থবিজ্ঞানীরা “সম্পর্ক” কথাটা দিয়ে সহজ কিছুকে বোঝাই। আমি আসলে জানতে চেয়েছি, এখানে কতজন নারী, আর কতজন পুরুষ!'
১২.
মানুষ মাত্রই কি ভুল হয়? নিজের ভুলভ্রান্তি নিয়ে কী ভাবতেন আইনস্টাইন?
১৯৩৫ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য আপনার কী কী দরকার?’ আইনস্টাইন বললেন, ‘একটা ডেস্ক, কিছু কাগজ আর একটা পেনসিল। সঙ্গে দরকার বড় একটা ডাস্টবিন, যেখানে আমার সব ভুল করা বা ভুলে ভরা কাগজগুলো ফেলব!’
১৩.
অনেকের কাছে অংকের সমার্থক শব্দ হলো--আতঙ্ক! একবার ১৫ বছর বয়সী এক তরুণী আইনস্টাইনের কাছে সাহায্য চাইল। গণিত বিষয়ে তার বাড়ির কাজ বা হোম ওয়ার্ক সে সঠিকভাবে করতে পারছিল না। আইনস্টাইন ওই তরুণীকে বলেছিলেন, ‘গণিতের সমস্যা নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করো না। তোমার কাছে গণিত যতটা কঠিন, আমার কাছে গণিত তার চেয়েও কঠিন।’
১৪.
একবার এক ছাত্র আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করল, ‘গত বছর পরীক্ষায় যেসব প্রশ্ন পড়েছিল, এবারের পরীক্ষায়ও ঠিকঠিক ওই সব প্রশ্নই পড়েছে।’ ‘ঠিক বলেছ।’ আইনস্টাইন বললেন, ‘কিন্তু এ বছরের উত্তরগুলো আগেরবারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা!'
১৫.
একবার এক অনুষ্ঠানে আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনি একটু সহজ করে আপনার তত্ত্বটা আমাদের বোঝাবেন?’ আইনস্টাইন তখন এই গল্পটা শোনালেন। আমি একবার বন্ধুর সঙ্গে হাঁটছিলাম। বন্ধুটি ছিল অন্ধ। আমি বললাম, 'দুধ পান করতে ইচ্ছা করছে।' ‘দুধ?’ বন্ধুটি বলল, ‘পান করা বুঝি, কিন্তু দুধ কী জিনিস?’ ‘একটা সাদা তরল পদার্থ।’ বললাম আমি। ‘তরল আমি বুঝি, কিন্তু সাদা জিনিসটা কী?’ ‘বকের পালকের রং।’ ‘পালক আমি বুঝি, কিন্তু বক কী?’ ‘ঘাড় কুঁজো বা বাঁকানো ঘাড়ের এক পাখি।’ ‘ঘাড় সে তো বুঝি। কিন্তু এই কুঁজো কথাটার মানে কী?’ এরপর আর ধৈর্য থাকে, বলুন! আমি তার হাতটা ধরে এক ঝটকায় টানটান করলাম। বললাম, ‘এটা এখন একদম সোজা, তাই না। তারপর ধরো, কনুই বরাবর এটা ভেঙে দিলাম। এবার তোমার হাতটা যেমন আছে সেটাকেই কুঁজো বা বাঁকানো বলে, বুঝলে?’ ‘আহ্!’ অন্ধ বন্ধু বলল, ‘এবার বুঝেছি, দুধ বলতে তুমি কী বুঝিয়েছ।’
১৬.
স্বামী সম্পর্কে কেমন ধারণা ছিল আইনস্টাইনের স্ত্রীর? তাঁর স্ত্রীকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব কি আপনি বুঝতে পারেন?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘না, কিন্তু আমার স্বামীকে বুঝি। আমি জানি, তাঁকে বিশ্বাস করা যায়!
১৭.
বিখ্যাত ভাস্কর জ্যাকব অ্যাপস্টিন একবার আইনস্টাইনের একটি আবক্ষ মূর্তি খোদাই করছিলেন। আইনস্টাইন নিজেই মডেল হয়ে ধৈর্য ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে শিল্পীকে সাহায্য করতেন। সে সময় একদিন তিনি জ্যাকবকে বলেন, 'প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানী বই লিখে আমার আপেক্ষিকতা তত্ত্বটি ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। আমার থিওরি যদি ভুল হয়, তবে এতজনের দরকারটা কী? একজন বললেই যথেষ্ট।'
১৮.
একবার বেলজিয়ামের রাণী আইনস্টাইনকে আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর দেশ সফরের জন্য। নির্দিষ্ট দিনে আইনস্টাইনকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাবার জন্য রেলস্টেশনে হাজির হল গাড়ির বহর। কিন্তু কোথায় কী? রেল স্টেশনে আইনস্টাইনকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। ফিরে চলল গাড়ির বহর রাজপ্রাসাদের দিকে। কিছুক্ষণ পর সাদাসিধে পোশাকে বেহালা বাজাতে বাজাতে রাজপ্রাসাদে হাজির হলেন বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। রাণী ব্যাপারটাতে লজ্জিত হলেন। সাথে সাথে ক্ষমা প্রার্থণা করে জানালেন যে, বিজ্ঞানীকে নিয়ে আসার জন্য গাড়ি বহর রেলস্টেশনে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁকে না পেয়ে ফিরে এসেছে। আইনস্টাইন বললেন,'আমি ইচ্ছে করেই গাড়ি বহরকে এড়িয়ে গেছি। আর পায়ে হেঁটে বেহালা বাজাতে বাজাতে এসেছি। যদি আপনার ঐ রাজকীয় গাড়িতে আসতাম, তবে কি এভাবে বেহালা বাজাতে পারতাম? সাধারণ মানুষের মত শহরটাকে দেখে নিতে পারতাম?'
১৯.
আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আবিষ্কার করে তিনি তখন বিখ্যাত ও বিতর্কিত। সত্যি কথা বলতে কি, বিজ্ঞানী-অবিজ্ঞানী কারোর মগজের অ্যান্টেনাই ব্যাপারটা 'ক্যাচ' করতে পারছিল না। তিনি বিভিন্ন সভা সেমিনারে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর উদ্ভাবিত তত্ত্বটি বোঝাতে লেকচার দিতে যেতেন। প্রায় সব সেমিনারে তিনি একই ধরনের আলোচনা করতেন। একবার এমনই এক সেমিনারে তিনি আমন্ত্রিত হয়েছেন, লেকচার দেবার জন্য। পথিমধ্যে তাঁর ড্রাইভার করে বসল এক আজব আবদার। বলল, ‘স্যার, আপনার লেকচারগুলো শুনতে শুনতে আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। আজ একদিনের জন্য আমি আইনস্টাইন সেজে সেমিনারে বক্তব্য চাই।’ মজার মানুষ আইনস্টাইনেরও কথাটা খুব মনে ধরল। তিনি এক কথায় রাজি। দেখাই যাক না, ব্যাপারটা কী হয়!
ড্রাইভার আইনস্টাইন সেজে অনুষ্ঠানে গেল বক্তব্য দিতে আর স্বয়ং আইনস্টাইন দর্শক সারিতে বসে রইলেন আইনস্টাইনেরই ড্রাইভার হয়ে। তখন তো আর মিডিয়ার এত দৌরাত্ম ছিল না। তাই ব্যপারটা কেউ বুঝতে পারল না। আইনস্টাইনরুপী ড্রাইভার মঞ্চে বক্তব্য রাখল এবং চমৎকার বক্তব্য রাখল। দর্শক সারিতে বসে মুগ্ধ আইনস্টাইন বার বার হাত তালি দিতে লাগলেন। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত একজন আইনস্টাইনের ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আপনার বক্তব্যটি আমার খুব ভাল লেগেছে। কিন্তু কি জানেন, আমি এই অমুক অমুক বিষয়গুলো একদম বুঝতে পারিনি। আপনি কি অনুগ্রহ করে আমাকে বিষয়গুলো বুঝিয়ে দেবেন?’ আইনস্টাইনের ড্রাইভার বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে উত্তর দিল, 'ওহ! এই ব্যাপার? এই ব্যাপারটা তো আমার ড্রাইভারই বুঝিয়ে দিতে পারবে। চলুন তার কাছেই যাই।'
২০.
একবার আইনস্টাইনকে সফলতা লাভের একটি গাণিতিক ফর্মুলা দিতে বলা হল। তিনি বলেছিলেন, 'X+Y+Z=A, যেখানে X=কাজ, Y=খেলাধুলা আর A=সফলতা।' ‘আর Z মানে কী?’ আবারও জিজ্ঞেস করা হল তাঁকে।
‘তোমার মুখ বন্ধ রাখা’, আইনস্টাইনের উত্তর।
২১.
রেডিও জিনিসটার ব্যাখ্যায় আইনস্টাইন : ‘তুমি টেলিগ্রাফের তার তো দেখেছ। মনে করো, এটা লম্বা, অনেক লম্বা একটা বিড়াল। তুমি নিউইয়র্কে বসে এর লেজে টান দেবে, ওদিকে লস এঞ্জেলেসে এর মাথা মিউ মিউ করে উঠবে। ব্যাপারটা বুঝতে পারছ? বেতার ঠিক এভাবেই কাজ করে। তুমি এদিকে ইশারা দাও, ওদিকে সাড়া পড়ে। পার্থক্য হল বেতারের ক্ষেত্রে বিড়াল বলে কিছু উপস্থিত নেই।
২২.
এত সুন্দর ব্যাখ্যা যিনি দিতে পারেন, তিনি কিন্তু অনেক সময় জীবনের সহজ ব্যাপারগুলো বুঝতে পারতেন না। একবার আইনস্টাইন বাড়ি বানালেন। বাড়িটা কেমন হল একদিন তিনি তা দেখতেও গেলেন। ঘুরে ঘুরে সব দেখে তিনি জানতে চাইলেন, তাঁর ছোট্ট বিড়ালছানাটি ঘরে ঢুকবে কী করে? তার জন্য তো কোন আলাদা ছোট দরজা বানানো হয় নি?
আইনস্টাইনকে কোনোভাবেই বোঝানো গেল না যে বিড়াল মূল দরজা দিয়েও ঢুকতে পারে! অবশেষে তাঁকে খুশি করার জন্য বড় দরজার পাশে আরেকটি ছোট দরজা তৈরি করে দেওয়া হল, যেন তাঁর আদরের বেড়ালছানাটি নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত বেড়ালছানাটি কোন দরজা ব্যবহার করত তা আইনস্টাইনই ভাল বলতে পারবেন।
২৩.
গুজব আছে, সুন্দরী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো আইনস্টাইনের প্রতি দুর্বল ছিলেন। তাই একদিন মনরো আইনস্টাইনকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন এইভাবে, ‘চলুন না, আমরা বিয়ে করে ফেলি? তাহলে আমাদের সন্তানেরা হবে সৌন্দর্য ও জ্ঞানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান। ওরা দেখতে হবে আমার মত আর বুদ্ধিতে আপনার মত।’
আইনস্টাইন তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘আর যদি উল্টোটা হয়? দেখতে যদি হয় আমার মত আর বুদ্ধিতে আপনার মত?’
২৪.
তিন হাজার শব্দের মধ্যে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব যে সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করতে পারবে, তার জন্য মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করে সায়েন্টিফিক আমেরিকান। এ ব্যাপারে আইনস্টাইন মন্তব্য করেন, ‘বন্ধুদের মধ্যে কেবল আমিই অংশ নিইনি। আমার বিশ্বাস হয়নি যে তিন হাজার শব্দে আমি এটা ভালো বোঝাতে পারতাম!’
২৫.
অন্য সব স্ত্রীদের মত কাজে যাওয়ার আগে আইনস্টাইনকে প্রায়ই ভালো পোশাক পরে যাওয়ার অনুরোধ করতেন তাঁর স্ত্রী। বেশির ভাগ সময়ই তিনি জবাব দিতেন, ‘আমি কেন এটা করব? সেখানে সবাই আমাকে চেনে।’ তারপর আইনস্টাইনের প্রথম বড় ধরনের আলোচনা সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় যখন ঘনিয়ে এল, তখন আবার তাঁকে একটু ভালো কাপড়চোপড় পরে সেখানে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন তাঁর স্ত্রী। এবার তিনি জবাব দিলেন, ‘কেন আমি এটা করব? সেখানে কেউই তো আমাকে চেনে না!’
২৬.
মাউন্ট উইলসন মানমন্দির পরিদর্শনে গেছেন আইনস্টাইনের স্ত্রী। সেখানকার বিশাল অপটিক্যাল টেলিস্কোপটি ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম। এক জ্যোতির্বিদ তাঁকে জানালেন, এসব স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতির প্রধান কাজ মহাবিশ্বের বিস্তার, আকৃতি নির্ণয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, ‘ও। আমার স্বামী তো পুরোনো একটা খামের পেছনেই এটা করে ফেলে!'
২৭.
১৯৩০ সালে আমেরিকার উদ্দেশে বার্লিন ত্যাগ করেন আইনস্টাইন। বার্লিন রেলস্টেশনে পৌঁছেই স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলেন তিনি। যা হোক, একসময় খুঁজে পেলেন তাঁকে। তারপরই টিকিট জোড়া হারিয়ে বসলেন। শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেল তাও, আর এভাবেই শুরু হলো তাঁর দ্বিতীয় আমেরিকা যাত্রা।
২৮.
ভবিষ্যতে কী আছে? আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে একবার জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি কখনোই চিন্তা করি না। কারণ, এটা এমনিতেও তাড়াতাড়িই আসে।
২৯.
এক পার্টিতে আইনস্টাইনকে চিনতে না পেরে এক তরুণী প্রশ্ন করলেন, আপনি কী করেন? আইনস্টাইন উত্তর দিলেন, আমি পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র।
তরুণী অবাক হয়ে বললেন, আপনি এখনও ছাত্র! আর আমি গত বছর পাশ করেছি!
৩০.
আইনস্টাইনের মেয়ের বিয়ে। সবাই চার্চে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে উনি উনার মেয়েকে বললেন, তুমি চার্চের দিকে যাও আমি ল্যাবে আমার কলমটা রেখে আসছি। মেয়ে অনেক বারন করা সত্ত্বেও উনি গেলেন। ৩০ মিনিটের কথা বলে যাওয়ার পর উনি যখন সেই সময়ের মধ্যে ফিরলেন না, তখন বিলম্ব না করে সবাই মিলে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন। ৭ দিন পর উনার মেয়ে যখন বাসায় এসে মাকে জিজ্ঞাস করলো বাবা কোথায় তখন তার মা বলল ওই যে গেল, এরপর আর আসে নি।
আইনস্টাইনের মেয়ে বাবাকে খুঁজতে ঢুকলো তার ল্যাবে। গিয়ে দেখলো, তার বাবা একটা কলম নিয়ে বোর্ডের সামনে গিয়ে কী জানি চিন্তা করছিলেন। মেয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলো সে কী করছে।
আইনস্টাইন অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, 'মা তুমি চার্চে যাও, আমি এই কাজটা ১০ মিনিটের মধ্যে শেষ করে আসছি।'
প্রথম বানিজ্যিক গাড়ি
ফ্রান্সের প্যানহার্ড অ্যান্ড লেভাসর বিশ্বে প্রথম বারের মতো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গাড়ি নির্মাণ করে। ফরাসি ব্যবসায়ী রেনি প্যানহার্ড ও এমিলি লেভাসরের যৌথ উদ্যোগে ১৮৮৭ সালে এ কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ডেইমলাম ইঞ্জিন ব্যবহার করে এ কোম্পানিটি ১৮৯১ সালে তাদের প্রথম বাণিজ্যিক গাড়ি নির্মাণকাজ শেষ করে।
প্যানহার্ড লেভাসর কোম্পানিটিই প্রথমবারের মতো মোটর গাড়িতে ক্লাচ প্যাডেল ও গিয়ারবক্স যুক্ত করে। এরপর আস্তে আস্তে সেই গাড়িতে আরও অনেক পার্টস যুক্ত করা হয়।
বিভিন্নফোবিয়া
লজ্জা ও সামাজিক (সোশ্যাল)ফোবিয়া
সোশ্যালফোবিয়া কাকে বলে?
লজ্জা একধরনের অস্বস্তি যা আমাদের অনেকের হয়ে থাকে।অল্পস্বল্প হলে এতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। আমাদের অনেকের অপরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে লজ্জা করে, কিন্তু প্রাথমিক আড়ষ্টতা কেটে গেলে আমরা স্বচ্ছন্দ বোধ করি, এমনকি উপভোগও করতে পারি তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা।
আপনার সোশ্যাল ফোবিয়া থাকলে আপনি অচেনা লোকের সামনে খুব অস্বস্তিবোধ করবেন। আপনার মনে হবেঃ
1.সবাই আপনাকে অপছন্দ করছে
2.আপনি এখনি কী করতে কী করে বসবেন
এই অনুভূতি এতই কষ্টকর হতে পারে যে আপনি হয়ত লোকের সঙ্গে মেলামেশাই করতে পারবেন না। সব সামাজিক অনুষ্ঠান আপনি এড়িয়ে যাবেন।
প্রধানতঃ দুধরনের সোশ্যাল ফোবিয়া দেখা যায়ঃ
সাধারণ (বা জেনেরালাইজেড) এবং স্পেসিফিক
জেনেরাল সোশ্যাল ফোবিয়াঃ
এতে আপনিঃ
1.মনে করেন যে লোকে আপনার দিকে তাকিয়ে দেখছে
2.মনে করেন যে তাঁরা আপনি কী করছেন না করছেন তার উপর নজর রাখছে
3.অপরিচিত লোকের সঙ্গে আলাপ করতে চাইছেন না
4.দোকানে বা রেস্তোরাঁতে যেতে চাইছেন না
5.লোকের সামনে খেতে অসুবিধা হচ্ছে
6.স্বল্প পোশাকে বাইরে বেরোতে চাইছেন না (যথা সমুদ্রের ধারে)
7.প্রয়োজন সত্ত্বেও স্পষ্ট করে নিজের মনোভাব জানাতে দ্বিধাবোধ করছেন
পার্টিতে যাওয়া বিশেষ করে অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। মনে মনে চাইলেও আমরা অনেকেই ঘরভর্তি লোকের সামনে যেতে দ্বিধাবোধ করি। সোশ্যাল ফোবিয়া থাকলে আপনি ঘরেও দোরগোড়াতেই দাঁড়িয়ে থাকবেন, ভিতরে ঢুকতে কুন্ঠাবোধ করবেন। এতে সকলে ভাবতে পারে যে আপনার ক্লস্ট্রোফোবিয়া(বদ্ধ ঘরে ফোবিয়া)আছে। শেষমেষ আপনি যখন ঘরে ঢুকলেন, তখন আপনার মনে হবে যে সবাই আপনাকে দেখছে। অনেকে পাব বা পার্টিতে যেতে গেলে তার আগে মদ্যপান করে নেন যাতে একটু রিল্যাক্সড বোধ করেন এবং পার্টিটা উপভোগ করেন।
স্পেসিফিক সোশ্যাল ফোবিয়াঃ
এটি দেখা যায় কিছু লোকের মধ্যে যাঁদের কাজের ধরনই এমন যে তাঁদের মধ্যমণি হতে হয়। নায়ক, গায়ক, শিক্ষক বা ইউনিয়নের নেতা প্রমুখরা এই দলের অন্তর্ভুক্ত। স্পেসিফিক সোশ্যাল ফোবিয়া থাকলে লোকের সঙ্গে মেলামেশা করতে কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু সবার সামনে যখন দাঁড়িয়ে কথা বলতে বা গান গাইতে গেলে টেনসন হয় এবং কেউ কেউ তোতলাতে থাকেন। এমনকী যাঁরা অভিজ্ঞ, এবং এই কাজ প্রায়ই করে থাকেন তাঁদের হঠাৎ এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমনও হতে পারে যে লোকের সামনে একটাও কথা বলা যায় না, একটা প্রশ্ন অবধি করা যায় না।
কী রকম অনুভূতি হয়?
দুধরনের ফোবিয়াতেই স্ট্রেসের উপসর্গ দেখা দেয়। আপনি দেখবেন যে আপনিঃ
1.খুব চিন্তা করছেন যে লোকের সামনে অস্বাভাবিক কোনো আচরণ না করে ফেলি
2.যেখানে যেতে আপনার মন চাইছে না, সে বিষয়ে সবসময় ভেবে যাচ্ছেন
3.মনে মনে ভাবছেন কবে কখন কোন পরিস্থিতিতে আপনি লজ্জায় পড়েছিলেন
4.আপনি যা করতে চান বা বলতে চান তা পারছেন না
একটা ঘটনার পর বার বার ভাবছেন ‘কী করলাম, কী করলাম’
5.আপনি হয়ত বার বার পুংখানুপুংক্ষ ভাবে নিজের মনে ভাববেন কী করা উচিৎ ছিল বা বলা উচিৎ ছিল।
এই দুধরনের সোশ্যাল ফোবিয়াতেই কিছু শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন ধরুনঃ
1.মুখ শুকিয়ে যাওয়া
2.অতিরিক্ত ঘামা
3.বুক ধড়ফড় করা
4.বারবার পেচ্ছাপ বা পায়খানা পাওয়া
5.হাত বা পা ঝিমঝিম করা বা অসাড় হয়ে যাওয়া (এটি হয় কারণ আপনি খুব দ্রুত নিশ্বাস নিচ্ছেন)
অন্যেরা হয়ত আপনাকে দেখে বুঝতে পারবেন যে আপনি অস্বস্তিতে পড়েছেন। আপনি হয়ত লাল হয়ে যাচ্ছেন, তোতলাচ্ছেন বা আপনার হাত পা কাঁপছে। এই উপসর্গগুলি আপনার ভীষণ ভয়ানক মনে হতে পারে এবং আপনার টেনসন আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
এরপর এটি বাড়তে থাকে চক্রাকারে। আপনি টেনসন নিয়ে টেনসন করেন এবং তাতেই আরো বেড়ে চলে আপনার টেনসন। আপনার চোখেমুখে ফুটে ওঠে এর অভিব্যাক্তি। আপনার টেনসনই আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু।
প্যানিক
দুধরনের সোশ্যাল ফোবিয়াতেই প্যানিক হতে পারে। প্যানিক বেশিক্ষণ থাকে না, মিনিট কয়েক মাত্র থাকে। সাংঘাতিক দুশ্চিন্তা হয়, মনে হয় আপনি পরিস্থিতির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। আপনার মনে হয় আপনি এবার হয় মারা যাবেন নয়ত পাগল হয়ে যাবেন। সচরাচর যে পরিস্থিতিতে এটি হয়েছে সেখান থেকে আপনি বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করবেন। প্যানিকের অনুভূতি অত্যন্ত তীব্র কিন্তু ক্ষণস্থায়ী, এটি কেটে গেলে আপনি ক্লান্ত বোধ করবেন। প্যানিক যতই ভয়প্রদ হোক না কেন, এতে আপনার শারীরিক কোনো ক্ষতি হবে না এবং নিজের থেকেই এটি কমে যাবে।
কিভাবে এতে জীবন প্রভাবিত হয়?
অনেকে নিজেদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে এই সমস্যার মোকাবিলা করেন। এর অর্থ তাঁরা এবং তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যেরা যা করতে ভালবাসতেন তা অনেক সময় না করা। তাঁরা বাচ্ছার স্কুলে যেতে পারেন না, ডেন্টিস্টের কাছে যেতে পারেন না বা বাজার করতে যেতে পারেন না। এমনকী তাঁরা অনেক সময় নিজেদের পদোন্নতিতেও বাধা দেন যদিও তাঁদের পক্ষে চাকরির উন্নতির পথে আর কোনো বাধা নেই। যাঁদের সোশ্যাল ফোবিয়া থাকে তাঁদের অর্ধেকের বেশি (বিশেষত; পুরুষরা) দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন না।
এতে কজন আক্রান্ত হয়?
একশো জনের মধ্যে পাঁচ জনের সোশ্যাল ফোবিয়া থাকে। পুরুষের তুলনায় মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি দুতিনগুণ বেশি দেখা যায়।
এর থেকে আর কী হতে পারে?
বিষাদরোগ
সোশ্যাল ফোবিয়া থেকে বিষন্নতার জন্ম হতে পারে। শেই বিষাদরোগ এত বেশি তীব্র হতে পারে যে তার জন্য আলাদা চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
আগারোফোবিয়া
আপনি যদি সবসময় যেখানে মানুষ আছে সেই জায়গায় না যান তবে এই জায়গাগুলির প্রতি আপনার ভীতি জন্মাতে পারে। এমনকী আপনি নিজের বাড়ী ছেড়ে বেরোতেও ভয় পেতে পারেন—তাকে বলে আগারোফোবিয়া।
মদ ও অন্য নেশা
আপনি হয়ত আপনার মনের কষ্ট লাঘব করতে মদ, ড্রাগ বা ঘুমের ঔষধ ব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে আপনি মাদকাসক্ত হয়ে যেতে পারেন।
শারীরিক স্বাস্থ্য
প্যানিক এবং চিন্তা সত্ত্বেও হার্টের অসুখের সম্ভাবনা কিন্তু অন্যদের সঙ্গে সমান, বেশি না।
কেন সোশ্যাল ফোবিয়া হয় ?
আমরা সঠিক জানিনা। এতে বেশি আক্রান্ত হয় তাঁরা যাঁরা
1.লোকসমক্ষে নিজেদের ব্যবহার সম্পর্কে অতি মাত্রায় সচেতন
2.অল্পবয়সে তোতলামিতে ভুগতেন
তিন থেকে সাত বছর বয়সে এই ধরনের লজ্জা স্বাভাবিকভাবেই সকলের মনে জাগে। কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে জীবনের এই অধ্যায় থেকে এগোতে না পারলে সোশ্যাল ফোবিয়া জন্ম নেয়।
এই অসুবিধা না কাটবার কারণ কী ?
চিন্তা
সামাজিক পরিস্থিতিতে কিছু চিন্তা মনে আসে। যেমন ধরুনঃ
1.‘আমায় সবসময়ে সবাই বুদ্ধিমান ভাববে পরিস্থিতি যেন আমার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে’
2.‘আমি খুব বোরিং’
3.ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা—কেউ আমায় চিনলে সে বুঝতে পারবে আমি কেমন অপদার্থ
আপনি সব সময় নিজের ব্যবহার পুংখানুপুঙ্খভাবে বিচার করছেন এবং নিজের অক্ষমতা বা দোষগুণগুলো দেখছেন।
এই চিন্তা এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত যে আপনি এগুলি সত্য মনে করেন, যদিও এর সপক্ষে কোনো যুক্তি নেই। আপনার নিশ্চিত ধারনা হয় যে সবার চোখে আপনাকে খারাপ লাগছে। অন্যলোকেরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই আপনার সম্পর্কে অন্যরকম ধারনা মনে পোষণ করেন।
সাবধানতা অবলম্বন
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আপনি কিছু কিছু সাবধানতা অবলম্বন করে থাকেন। যথাঃ
1.মদ্যপান
2.কারো চোখে চোখ না মেলানো
3.নিজের সম্পর্কে কোনো কথা না বলা
4.অন্যকে বেশি প্রশ্ন করা
এর ফলে আপনি কোনোদিন জানতেই পারেন না যে এই সাবধানতা অবলম্বন না করলেও আপনার কল্পিত ভয়ানক পরিণতি হয় না।
ঘটনার আগে এবং পরে যে চিন্তা হয়
একই ঘটনার আগে এবং পরে বারংবার চিন্তা করলে আপনার আরো বেশি নিজের দোষ চোখে পড়ে। আপনার ভ্রান্ত বিশ্বাস আরো বদ্ধমূল হয়।
সাহায্যের পথ
কারো সোশ্যাল ফোবিয়া হলে নানাভাবে তাঁকে সাহায্য করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী নীচের টিপসগুলি ব্যবহার করে দেখতে পারেন।
আপনি নিজে কী করতে পারেন
1.আপনি স্বভাবতই লাজুক হলে লোকাল কোনো আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কোর্স করতে পারেন।
2.রিল্যাক্স করতে শিখুন। বই, টেপ, সিডি, ডিভিডি সব পাওয়া যায় রিল্যাক্সসেসান পদ্ধতি শেখানোর। আপনি দুশিন্তা শুরু হলেই রিল্যাক্স করলে বাড়াবাড়ি আটকে দিতে পারবেন।
3.আপনার দুশ্চিন্তাগুলি লিখে রাখুন। আপনার সম্পর্কে যে ছবি ফুটে উঠছে, লিখে রাখলে তার পরিবর্তন করা অপেক্ষাকৃত সহজ।
4.আপনি নিজে মনে মনে কী ভাবছেন সেকথা চিন্তা না করে লোকে কী বলছে তা শোনার চেষ্টা করুন।
5.যে সাবধানতা আপনি অবলম্বন করেন, সেটা বন্ধ করুন। যেটি সহজতম সেটি দিয়েই শুরু করুন।
6.কোনো ভয়জনক পরিস্থিতি হলে তাকে ছোটো ছোটো ধাপে ভেঙ্গে দেখুন। প্রথম ধাপটি অভ্যাস করুন। অভ্যস্ত হতে সময় লাগতে পারে। অভ্যস্ত হয়ে গেলে পরের ধাপে এগোন। তারপর তার পরের ধাপে। এমনি করে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলুন।
ভিনাস্ট্রাফোবিয়ার উৎপত্তি ও সংজ্ঞা
ভিনাস্ট্রাফোবিয়া মানে হলো সুন্দরী মেয়েদের ভয় পাওয়া। এই ফোবিয়ার নামকরণ করা হয়েছে রোমান দেবী ভেনাস থেকে। ভেনাসকে প্রেমের দেবী বলা হয়। এছাড়াও তাকে যৌনতা ও সৌন্দর্যের দেবী হিসেবেও দাবি করা হয়। ফোবিয়ার তিনটি প্রকারভেদ সম্পর্কে আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। ভিনাস্ট্রাফোবিয়া এগুলোর মধ্যে স্পেসিফিক ফোবিয়ার কাতারে পড়ে। একে ক্যালিগাইনিফোবিয়াও বলা হয়ে থাকে।
রোমান প্রেমের দেবী ভিনাসের নাম থেকে এসেছে ভিনাস্ট্রাফোবিয়া;
মানুষ স্বভাবগত দিক থেকেই সুন্দরের পূজারী। আর সুন্দরী মেয়েদের প্রতি সকলের এক আলাদা আকর্ষণ কাজ করে। তবে ভিনাস্ট্রাফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। এরা আকর্ষণীয় নারীদের আশেপাশে থাকতে একধরনের ভয় ও অস্বস্তি বোধ করে। এই অমূলক ভয়ের কারণে তারা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নারীদের সঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
ভিনাস্ট্রাফোবিয়াকে গাইনোফোবিয়ার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। গাইনোফোবিয়া বলতে সকল মেয়েদের ভয় পাওয়াকে বোঝায়। তবে খুবই অল্প সংখ্যক মানুষ এই দুই ফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়। এরকম ফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষ অনেক হীনম্মন্যতায় ভোগে। সুন্দরী মেয়েদের সামনে দাঁড়ালে তারা নিজেদের শরীর ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। তারা সত্যিকার অর্থেই অসুস্থ বোধ করে। নিজেদের অনুভূতির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারায় তাদের চোখে-মুখে অস্বস্তির চিহ্ন ফুটে ওঠে। দ্রুত নিঃশ্বাস নেওয়া, অনবরত ঘামতে থাকা ইত্যাদি তাদের মাঝে দেখা দেয়।
কারণ
কারো মাঝে একটি ফোবিয়া সৃষ্টি হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করে। পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা এই অমূলক ভয়কে ট্রিগার করতে পারে। আবার এর পেছনে জেনেটিক বা বংশগত কারণও দায়ী। পূর্বপুরুষদের কারো কোনো মানসিক রোগ বা অন্য কোনো ফোবিয়া থাকলে তা থেকে এই রোগের উৎপত্তি ঘটতে পারে। তবে বেশিরভাগ স্পেসিফিক ফোবিয়ার কিছু নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্রীভূত করে আবির্ভাব ঘটে।
একজন ব্যক্তির অতীত জীবনে সুন্দরী মেয়েদের সাথে কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা, যেমন– হৃদয়ভঙ্গ হওয়া, জনসম্মুখে কোনো আকর্ষণীয় মেয়ের দ্বারা অপমানিত হওয়া ইত্যাদি মনে স্থায়ী আঘাত হানতে পারে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এক্ষেত্রে অনেক প্রভাব ফেলতে পারে। একজন ব্যক্তি কেমন পরিবেশে বড় হয়েছে তার সাথে এই ফোবিয়ার যোগসূত্র তৈরি করা যায়।
আগে থেকে থাকা কোনো মানসিক রোগ, যেমন- অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার, জেনারালাইজড এংজাইটি ডিজঅর্ডার কিংবা অন্য কোনো এংজাইটি ডিজঅর্ডার থেকে এই ফোবিয়া আসতে পারে। এরকম কিছু মানসিক ডিজঅর্ডার ও অতীত খারাপ অভিজ্ঞতা একসাথে হানা দিলে এই অদ্ভুত ফোবিয়ার শিকার হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
একজন ভিনাস্ট্রাফোবিককে যেভাবে চিনবেন
যে ব্যক্তির ভিনাস্ট্রাফোবিয়া রয়েছে তাকে ভিনাস্ট্রাফোবিক বলে। সাধারণ মানুষজনের সাথে তাদের আচরণ ও সুন্দরী মেয়েদের সামনে তাদের আচরণের মাঝে বিস্তর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এর পেছনে কী কী কারণ কাজ করে তা আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এগুলোর দরুণ একজন ভিনাস্ট্রাফোবিকের মস্তিষ্কে নানা রাসায়নিক ক্রিয়া ঘটতে থাকে। এগুলো তার ভাবভঙ্গি থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যে লক্ষণগুলো সচরাচর একজন ভিনাস্ট্রোফোবিকের মাঝে দেখা যায় তা নিচে উল্লেখ করা হলো:
১) মেয়েদের সামনে প্রচন্ড অস্বস্তি বোধ করা।
২) সুন্দরী মেয়েদের চিন্তা মাথায় আসলে ইতঃস্তত বোধ করা।
৩) তাদের সাথে বাধ্য হয়ে কথা বলতে হলে ঘামতে থাকা, চোখে-মুখে এক ধরনের অনীহা ফুটে ওঠা।
৪) আকর্ষণীয় মেয়েরা থাকতে পারে এমন জায়গা পরিত্যাগ করা।
৫) অকারণে হীনম্মন্যতা ও লজ্জা অনুভব করা।
৬) নিজেকে একঘরে করে রাখা।
মূলত আগে থেকে ওসিডি বা জিএডি নামক মানসিক রোগ থাকা মানুষের মাঝে এই ফোবিয়া থাকার সম্ভাবনা বেশি। আসলে ফোবিয়া নিয়ে আমরা খুব একটা মাথা ঘামাই না। তবে এই ফোবিয়া কারো সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বাধাগ্রস্ত করলে অবশ্যই ভালো কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হতে হবে।
ভিনাস্ট্রাফোবিয়ার চিকিৎসা
সাধারণত ফোবিয়াগুলোর সরাসরি কোনো চিকিৎসা নেই। তবে এগুলো মানসিক রোগের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় কিছু মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নিকট থেকে বিভিন্ন থেরাপি নেওয়া যেতে পারে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টক থেরাপি ও এক্সপোজার থেরাপি। টক থেরাপির মধ্যে একটি হলো কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি (সিবিটি)। এই থেরাপির মাধ্যমে রোগী কোনো থেরাপিস্টের সাথে নিয়ম মেনে কথাবার্তা বলেন। নানা বিষয়ে খোলাখুলি কথাবার্তার মাধ্যমে তিনি নিজের ব্যবহার ও চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন আনতে চেষ্ঠা করেন।
এক্সপোজার থেরাপি বলতে সরাসরি নিজের ভয়ের মুখোমুখি হওয়াকে বোঝায়। সুন্দরী মেয়েরা সচরাচর যেসব জায়গায় যায় সেখানে গিয়ে স্বেচ্ছায় নিজের ভয়ের মোকাবিলা করতে হয়। এভাবে চেষ্টা করতে থাকলে আস্তে আস্তে এই ফোবিয়া কেটে যেতে পারে।
সাইকোথেরাপি এই ফোবিয়া থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করবে;
এন্টি–ডিপ্রেসেন্ট বা অন্য কোনো ধরনের ওষুধও ফোবিয়ার চিকিৎসা হতে পারে। তবে এসব ওষুধ সেবনের পূর্বে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
পৃথিবীতে বহু বিচিত্র ও অদ্ভুত ফোবিয়া রয়েছে। এই যেমন ধরুন, হাইড্রোফোবিয়া। এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষ আক্ষরিক অর্থেই পানিকে ভয় পায়। তারা পানি সহ্য করতে পারে না। প্যাপিরোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষ কাগজ ভয় পায়। স্কোলিওনোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষ স্কুলে যেতে ভয় পায়।
এরকম অদ্ভুত ফোবিয়াগুলোর তালিকা বলে শেষ করা যাবে না। ভিনাস্ট্রাফোবিয়া এসব অদ্ভুত ফোবিয়ার কাতারেই পড়ে। তবে সব রোগের মতো এই রোগগুলোরও চিকিৎসা রয়েছে। তাই চিকিৎসার ব্যাপারে অনীহা না দেখিয়ে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।
কুকুরের ফোবিয়া:যে সব কারণে ভয় পায় কুকুর
১) অ্যাস্ট্রাফোবিয়া
বজ্রপাতে ভয় পায় কুকুর।
অ্যাস্ট্রাফোবিয়া হচ্ছে বজ্রপাতের শব্দে ভয় পাওয়া। কুকুরের সবচেয়ে সাধারণ ফোবিয়া এটি। অধিকাংশ কুকুরই অ্যাস্ট্রাফোবিয়াতে অল্পবিস্তর ভুগে থাকে। তবে ভয় পাবার মাত্রা কুকুরভেদে ভিন্ন হয়। সাধারণত বজ্রপাতের পূর্বেই কুকুর বুঝতে পারে কিছু একটা হতে চলেছে এবং যথাসম্ভব নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করে। বজ্রপাতের সময় দেখা যায় অনেক কুকুরের কানগুলো অনেকটা চ্যাপ্টানো আর লেজ একেবারে গুটি পাকিয়ে থাকে। এরকম দেখলে বুঝতে হবে কুকুরটির অ্যাস্ট্রাফোবিয়ার খুবই হালকা পর্যায়ে আছে। কিন্তু অনেক কুকুরই বজ্রপাতের সময় আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, যাকে সামনে পায় তাকে কামড় দেয়ার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে বুঝতে হবে কুকুরটির অ্যাস্ট্রাফোবিয়া গুরুতর পর্যায়ের। কখনোবা ভয়ের মাত্রা বেশি হলে কুকুরের পাকস্থলীতে গণ্ডগোল বাঁধে এবং বমি হয়। এই ফোবিয়া কাটানোর সবচেয়ে ভালো উপায় গান। বজ্রপাত শুরুর পূর্বে কিংবা শুরু হলে কুকুরকে গান শোনালে অ্যাস্ট্রাফোবিয়ার ভয় অনেকটাই প্রশমিত হয়ে আসে।
২) আতশবাজি ফোবিয়া
উচ্চশব্দের আতশবাজি ভয় পাইয়ে দেয় কুকুরকে
বজ্রপাতের মতো আতশবাজি ভয় পাওয়াটাও কুকুরের একটি স্বাভাবিক ফোবিয়া। তবে ভয়ের মাত্রাটা বেশি হলেই সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উজ্জ্বল আলো দেখে নয়, বরং আতশবাজির প্রচণ্ড শব্দই কুকুরকে বেশি বিব্রত করে। তবে অনেক কুকুরই ধীরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। আবার অনেকে নিজের কুকুরকে অভ্যাস করিয়ে নেন। সেক্ষেত্রে প্রথমে কম আওয়াজের ছোট আতশবাজি দেখিয়ে শুরু করা যেতে পারে। তবে যেসব কুকুরের ক্ষেত্রে সমস্যাটা প্রকট সেগুলোর জন্য ‘অ্যান্টি অ্যাংজাইটি’ ওষুধ বা সিডেটিভ প্রয়োগ করা বাঞ্ছনীয়।
৩) সেপারেশন ফোবিয়া
প্রভুর বাড়ি ত্যাগের সময় একাকীত্বে ভোগে কুকুর;
উন্নত দেশের পোষা কুকুরের মধ্যে এই ফোবিয়া বেশি দেখা যায়। সেপারেশন ফোবিয়া বলতে কুকুরের একাকীত্বে ভোগার ভয়কে বোঝায়। সহজ ভাষায়, একটি কুকুর যখন মনে করে যে তার প্রভু তাকে পরিত্যাগ করবে, তখন সে এরূপ ফোবিয়ায় ভোগে। অফিসগামী মানুষের পোষা কুকুরগুলো এরূপ পরিত্যাজ্য হবার ফোবিয়ায় ভোগে। সাধারণত কুকুর যখন এর মালিককে বাড়ি থেকে বের হতে দেখে, তখন একে সেপারেশন ফোবিয়া পেয়ে বসে। আর তখন শত বারণ সত্ত্বেও সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় এবং মালিকের পিছু নিতে চায়। এরূপ ফোবিয়ায় ভুগতে থাকা কুকুরকে বাড়িতে একা রেখে গেলে দিনকে দিন এর ফোবিয়া প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে। এরা একাকী বাড়িতে সারাক্ষণ ঘেউ ঘেউ করে এবং বিভিন্ন আসবাবপত্রের ক্ষতিসাধন করে। সেপারেশন ফোবিয়া থেকে খুব সহজেই কুকুরকে মুক্ত করা যেতে পারে। বাড়ি থেকে বের হওয়া এবং বাড়িতে ফেরার সময় যথাসম্ভব নিঃশব্দে কাজ সারতে হবে, যেন কুকুরটির কাছে কোনোভাবেই এমন মনে না হয় যে তার মালিক অনেক সময়ের জন্য চলে যাচ্ছে তাকে ছেড়ে।
৪) হাসপাতালের ভয়
প্রথমবার টিকাদানের সময় ভয় পায় কুকুর;
কুকুরকে সুস্থ রাখতে নিয়ম মাফিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান অনেকেই। আর এখানেও জন্ম হয় আরেক প্রকার ফোবিয়ার। এই ফোবিয়ায় ভোগা কুকুর বাড়ি থেকে বেরুতেই চাইবে না। আপনার উদ্দেশ্য বেড়াতে যাওয়া হলেও সে ভাববে আপনি তাকে কোনো পশু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন নিশ্চয়ই! এই ফোবিয়া সহজেই এড়ানো যেতে পারে খানিকটা সাবধানতা অবলম্বন করে। যখন কোনো কুকুরকে প্রথমবারের মতো পশু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন এমনিতে হাসপাতালের অপরিচিত গন্ধ এবং নতুন যন্ত্রপাতি দেখে সে ভীত হয়ে পড়ে। সবশেষ ইনজেকশন দেয়ার সময় ভয়ের মাত্রা চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়। ফলে পরবর্তীতে বাড়ির বাইরে নিয়ে যেতে চাইলেই সে ভীতিকর সেই স্মৃতি স্মরণ করে। তাই মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ এই যে, কুকুরটিকে প্রথমে কয়েকবার এমনিতেই পশু হাসপাতালে ঘুরিয়ে আনতে হবে যেন সেটি সেই পরিবেশকে সহজ করে নিতে পারে। পরে একদিন ইনজেকশন প্রয়োগ করলেও আর সমস্যা নেই।
৫) গাড়িতে চড়ার ভীতি
ধীরে ধীরে অভ্যাস করালে গাড়ি চড়ার ভয় কেটে যায় কুকুরের;
এক মাসের জন্য চলে যাচ্ছেন কোথাও বেড়াতে। এমন অবস্থায় আপনার প্রিয় পোষা কুকুরটিকে সাথে নিয়ে যাবেন সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি কোনো কারণে কুকুরটি আপনার সাথে গাড়িতে উঠতে আপত্তি জানায় তখন? শুধু আপত্তি নয়, আপনি জোর করে গাড়িতে তুললে সে আপনাকে কামড়ও বসিয়ে দিতে পারে! এর কারণ গাড়িতে চড়ার ফোবিয়া। আর সে ফোবিয়া সৃষ্টির পেছনে কোনো না কোনোভাবে আপনিই দায়ী। কীভাবে? কুকুরের প্রথম গাড়ি চড়ার অভিজ্ঞতা যদি ভালো না হয়, সেটি এর মনে দাগ কেটে যায় এবং ফোবিয়ার সৃষ্টি করে। যেমন ধরুন, কুকুরের প্রথম গাড়ি চড়ার অভিজ্ঞতা যদি হয় কোনো দুর্গম উঁচু নিচু রাস্তায় ভ্রমণ, ছোটোখাট দুর্ঘটনা কিংবা পশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, তাহলে সে আর দ্বিতীয়বার গাড়িতে উঠতে চাইবে না। এক্ষেত্রে কুকুরের গাড়ি চড়ার ভীতি সহজেই দূর করা যায় কয়েকটি আনন্দভ্রমণের মাধ্যমে।
৬) স্টেয়ার ফোবিয়া
সিঁড়ি দিয়ে নামতে ভয় পায় কুকুর;
স্টেয়ার ফোবিয়া বা সিঁড়িতে ওঠানামা করার ভয় সাধারণত যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে হয়ে থাকে। কুকুর শিশু অবস্থায় সিঁড়িতে চলাফেরার সাথে পরিচিত না হলে বড় হয়ে সে ফোবিয়াতে ভোগে। একটি কুকুর হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ির কাছে গিয়ে থেমে গেলে এবং ইতস্তত করতে থাকলে ধরে নিতে হবে সে সিঁড়িতে উঠতে বা নামতে ভয় পাচ্ছে। এক্ষেত্রে অজ্ঞাতসারে জোর করে একে সিঁড়িতে উঠিয়ে দিলে অনেক সময় ভয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে ব্যথা পায়। আমেরিকায় পশু হাসপাতালে পায়ের ব্যথায় ভর্তি হওয়া অধিকাংশ কুকুরই সিঁড়ি থেকে পড়ে জখম হয়। প্রথমেই বড় সিঁড়িতে না নিয়ে ছোট ছোট সিঁড়িতে ওঠানামার অভ্যাস করিয়ে এই ভয় কাটানো যেতে পারে।
৭) মেনজ ফোবিয়া
পুরুষদের ভয় পায় কুকুর;
একটি কুকুর যখন সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, তখন সে সবচেয়ে বেশি আগ্রাসী থাকে। তাই মেনজ ফোবিয়া সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অনেক পুরুষই প্রতি বছর ভীত কুকুরকে আদর করতে গিয়ে কামড় খান! হ্যাঁ, কুকুর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের চেয়ে পুরুষদের বেশি ভয় পায়। তবে কিছু কুকুর পরিস্থিতির শিকার হয়ে যেকোনো পুরুষকেই বিপদ মনে করে। আর এরূপ ফোবিয়া যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। কুকুরকে নানাভাবে বিরক্ত না করে বন্ধুসুলভ আচরণ করলেই এই ফোবিয়া ধীরে ধীরে কেটে যায়।
৮) অপরিচিতি ভীতি
অপরিচিত মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে ফোবিয়ায় ভোগা কুকুর;
অপরিচিত মানুষ দেখলে কুকুর খানিকটা গর্জে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। কুকুরের এই আচরণ বরং বাড়িঘরে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে। কিন্তু আচরণ যখন উল্টো হবে, তখন বুঝতে হবে সেটি ফোবিয়াতে ভুগছে। অপরিচিত মানুষকে ভয় পাওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায় অনেক কুকুরের মাঝেই। আর কুকুরের এ সমস্যাটি একটি জটিল সমস্যা। কারণ, বাড়িতে আগত প্রতিটি নতুন মানুষের সাথে একে পরিচয় করিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি কুকুর যেখানে অপরিচিত লোকজন দেখে ঘেউ ঘেউ করলেও সহজে আক্রমণ করে না, বরং প্রভুর আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করে। কিন্তু ফোবিয়াতে ভোগা একটি কুকুর অপরিচিত মানুষ দেখলেই বিপদের গন্ধ পায় এবং ভয় পেয়ে আক্রমণ করে বসে। এরূপ ফোবিয়ায় ভোগা কুকুরকে কিছুদিন বেঁধে রাখলে এর ফোবিয়া কেটে যায়।
৯) শিশু ভীতি
শিশুদের ভয় পায় কুকুর;
শিশুদের ভয় পাওয়া কুকুরের জন্য একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ, একটি গৃহপালিত কুকুরকে যা শেখানো হয় সে তা-ই শেখে এবং যে পরিবেশে বড় হয়, তার সাথেই বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। এভাবে একটি নির্দিষ্ট সময় পর সে নতুন কিছু সহজেই গ্রহণ করে নিতে পারে না। শিশুদের ব্যাপারটিও তেমন। হঠাৎ করে প্রভুর সংসারে নতুন সদস্যের আগমন সে সহজভাবে নিতে পারে না। তাছাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে বড় হওয়া একটি কুকুর আকার আকৃতিতে বেশ ছোট এবং অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গিমা করা একটি শিশুকে এমনিতেই ভয় পায়। অনেকসময় শিশুর আদরকেও সে নিজের জন্য হুমকি মনে করে। তাই, বাড়িতে পোষা কুকুর থাকলে কোনো শিশুকে প্রথমেই এর সাহচার্যে ছেড়ে দেয়া উচিৎ নয়। কেননা তাতে কুকুরটির আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। ধীরে ধীরে অভ্যাস করিয়ে নিলে কুকুরের এই ভয় কেটে যায়।
১০) যন্ত্রপাতির ভয়
ভ্যাকুয়াম ক্লিনারে ভয় পেয়ে পালাচ্ছে কুকুরটি;
যন্ত্রপাতির উপর কুকুরের ভয় জন্মানোটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ওয়াশিং মেশিন, ব্লেন্ডার কিংবা ট্রেডমিলের মতো যন্ত্রপাতির উপর নানা কারণেই কুকুরের ফোবিয়া সৃষ্টি হয়। এর কারণ এসব যন্ত্রের অদ্ভুত শব্দ এবং কার্যকরণ। কুকুরের এরকম ফোবিয়া স্বাভাবিক হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিপদজনক হতে পারে। কোনোরূপ দুর্ঘটনা ঘটবার আগেই এই ফোবিয়া কাটানো উচিৎ। সেটা হতে পারে পরিচর্যার মাধ্যমে কিংবা ডগ ট্রেনার এর সাহায্যে। তবে বাসায় যেকোনো নতুন যন্ত্র আনলে প্রথমেই তা চালু না করে কুকুরকে মানিয়ে নেয়ার সময় দিলে এই ফোবিয়া সহজেই কেটে যায়।
টেক ফোবিয়া: মানব মনে প্রযুক্তি বিষয়ক যত ভীতি
অনেকেই হয়তো জেনে অবাক হবেন যে, মানুষের ফোবিয়ার বিষয়বস্তু থেকে বাদ পড়েনি প্রযুক্তিও। যে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের জীবন সহজ থেকে সহজতর হচ্ছে, অসংখ্য অসম্ভবকে সম্ভব করা যাচ্ছে, এমনকি অদূর ভবিষ্যতে গোটা বিশ্বকেই নিজের আঙ্গুলের ডগায় নিয়ে আসতে পারার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সেই প্রযুক্তির ব্যাপারেও কিছু মানুষের ভয় ও আতঙ্কের শেষ নেই। মানুষের প্রযুক্তি বিষয়ক এসকল ভীতির নামই হলো 'টেক ফোবিয়া'।
হয়তো ভাবছেন, টেক ফোবিয়া হয়তো মনোবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে একদমই নতুন কোনো সংযোজন। কিন্তু না, সেটি সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। বিগত কয়েক শতক ধরেই রয়েছে এর অস্তিত্ব। এমনকি সেই অষ্টাদশ শতকেও অস্তিত্ব ছিল 'টেকনোফোবিয়া' নামক একটি বিশেষ ফোবিয়ার, যার অর্থ হলো 'প্রযুক্তিগত প্রভাবের ব্যাপারে অস্বাভাবিক ভীতি কিংবা উদ্বিগ্নতা'।
টেকনোফোবিয়া শব্দটির প্রথম আগমন ঘটে শিল্প বিপ্লবের (১৭৬০-১৮৪০) সময়। তখন থেকেই ইউরোপীয় শিল্প-কারখানায় মানুষের বিকল্প হিসেবে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে যায়। আধুনিক যন্ত্রপাতির কারণে কাজ হারিয়েছিল একদল তাঁতিও। তারা নিজেদেরকে পরিচয় দিত 'লডাইট' (The Luddites) হিসেবে। তারা এতটাই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে যে, বিভিন্ন কলকারখানায় গিয়ে তারা তাঁতযন্ত্র ভেঙে ফেলতে শুরু করে। অবস্থা নাগালের বাইরে চলে গেলে, ইংরেজ আইনসভা বাধ্য হয় যন্ত্র-ধ্বংসকে সর্বোচ্চ সাজার আওতাভুক্ত অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিতে।
ওই সময়টাতেই টেকনোফোবিয়া শব্দটি জনপ্রিয়তা লাভ করে, আর যারা নতুন প্রযুক্তি বা কাজের ধরনকে ভয় পায় বা বিরোধিতা করে, তাদেরকে ডাকা হতে থাকে লডাইট নামে। তবে তখনকার দিনে যে ভীতিকে টেকনোফোবিয়া নাম দেয়া হয়েছিল, তার সাথে বর্তমানের টেক ফোবিয়াকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উন্মেষ ঘটেছে, এবং সেগুলোর একেকটি একেকভাবে মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করে। সেই সকল ভীতির একটি সামষ্টিক রূপকে অভিহিত করা হয় টেক ফোবিয়া হিসেবে।
অবশ্য এখন আমরা সামগ্রিক টেক ফোবিয়া নিয়ে নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের টেক ফোবিয়া নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করব। তাহলে পাঠক, চলুন আর দেরি না করে জেনে নিই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত টেক ফোবিয়াগুলোর সম্পর্কে।
নোমোফোবিয়া
এটি হলো নিজের মোবাইল ফোন ছেড়ে থাকার ভয়। 'নোমো' শব্দটি মূলত 'নো মোবাইল' শব্দদ্বয়ের সংক্ষিপ্ত রূপ। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের পোস্ট অফিস এই বিশেষ ফোবিয়াটির নামকরণ করে। সেখানে কর্মরতদের মধ্যে যারা মোবাইল ব্যবহার করতো, তাদের মধ্যে বিভিন্ন উদ্বেগে ভোগার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছিল। এবং শেষমেষ পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার পর দেখা যায়, তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগটি আসলে মোবাইল ফোন হারানো নিয়েই। সাইকোলজি টুডে'র এক প্রতিবেদন মতে, আজকাল কলেজ শিক্ষার্থীদের মাঝে গোসল করতেও মোবাইল নিয়ে ঢোকার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর বয়ঃসন্ধিকালীন অনেক মোবাইল ব্যবহারকারীর দাবি, তারা নাকি প্রয়োজনে নিজেদের কনিষ্ঠ আঙুল বিসর্জন দিতেও রাজি, তবু তারা মোবাইল কাছছাড়া করবে না!
আজকাল আবার নোমোফোবিয়ারও বিভিন্ন নতুন শ্রেণিবিভাগ তৈরি হয়েছে। যেমন- কিছুক্ষণ পরপর মোবাইল ফোন চেক করে দেখা যে নতুন কারো মেসেজ বা কল এলো কি না, এ প্রবণতাটি কমবেশি সবার মধ্যেই বিদ্যমান। আবার অনেকে অবসেসড থাকে তার মোবাইলের ব্যাটারি নিয়ে। হয়তো ১০০ শতাংশ চার্জ আছে মোবাইলে, তবু তাদের মনের মধ্যে সর্বক্ষণ ঘুরঘুর করতে থাকে ভয়, "মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে যাবে না তো!" আর নোমোফোবিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো মোবাইল হারিয়ে ফেলা বা চুরি যাওয়ার ভয়। অর্থাৎ, মোবাইলের থেকে কিছুক্ষণ দূরে থাকার ভয়টাই এক পর্যায়ে এতটা তীব্র হয়ে ওঠে যে, ব্যবহারকারীর মনে প্রতি মুহূর্তে বিরাজ করে মোবাইল হারিয়ে ফেলা বা চুরি যাওয়ার আতঙ্ক।
সাইবারফোবিয়া
কম্পিউটার ব্যবহারের ব্যাপারেও অনেকের মনে অহেতুক ভয় কাজ করে, যার নাম হলো সাইবারফোবিয়া। এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষের মনে করে, যেহেতু তারা ইতোপূর্বে কখনো কম্পিউটার ব্যবহার করেনি, তাই এখনো তারা এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারবে না। এজন্য তারা সবসময় চেষ্টা করে কম্পিউটার থেকে দূরে থাকতে, এবং কর্মস্থল বা শিক্ষাক্ষেত্রে কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ দেয়া হলে সেটি এড়িয়ে যেতে। আর কেউ যদি নিতান্ত বাধ্য হয়ে কম্পিউটারে কাজ করতে শুরু করেও, তার মধ্য মাথাব্যথা, দুর্বল অনুভব করা, মানসিক উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া, মৃত্যুভীতি সৃষ্টি হওয়া, প্রচুর ঘাম হওয়া, মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দিতে থাকে। অর্থাৎ, যতক্ষণ তারা কম্পিউটারে কাজ করে, ক্রমাগত তাদের দেহ ও মনে অস্বস্তি খেলা করতে থাকে, এবং কারো কারো ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ফেলে যায়।
টেলিফোনোফোবিয়া
এটি সরাসরি টেলিফোন যন্ত্রটির প্রতি ভীতি নয়, বরং টেলিফোনে কথা বলার প্রতি ভীতি। আজকাল অনেকের মধ্যেই এই ফোবিয়াটি দেখা যায়। তারা হয়তো সামনাসামনি খুব বন্ধুত্বপরায়ণ। এমনকি মেসেজেও লিখিতভাবে খুব ভালো করেই নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে একধরনের ভীতি কাজ করতে শুরু করে। তারা ভাবে, তারা হয়তো গুছিয়ে কথা বলতে পারবে না, যা বলতে চায় তা ঠিকভাবে বলতে পারবে না, কিংবা তাদের কথা শুনে অপর প্রান্তের মানুষটি তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে না, হাসবে, অথবা তার সমালোচনা করবে। এ কারণে অনেকে এমনকি রাইড বুকিং করা কিংবা খাবার অর্ডার দেয়ার মতো অতি সংক্ষিপ্ত ফোনকলও দিতে পারে না।
সেলফিফোবিয়া
বর্তমান সময়ে যার হাতেই একটি স্মার্টফোন আছে, তাকেই দেখা যায় সেলফি তথা নিজের ছবি নিজে তোলার চেষ্টা করতে। সেলফি তোলার এমন প্রবণতা রীতিমতো মহামারী আকার ধারণ করেছে। তবে মুদ্রার অপর পিঠে ভিন্ন চিত্রও কিন্তু রয়েছে। অনেকেই চায় সেলফির মাধ্যমে নিজের খুব সুন্দর কোনো ছবি তুলতে। কিন্তু যখন তাদের ছবি ভালো আসে না, কিংবা তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে যায়, তখন সেলফির প্রতি তাদের মনে একধরনের বিতৃষ্ণা জন্মে যায়। তাই পরবর্তীতে আর কখনো তারা সেলফি তুলতে চায় না।
এক্সপেন্সিভটেকফোবিয়া
এর অর্থ হলো, কোনো প্রযুক্তির পেছনে অতিরিক্ত অর্থ খরচের ভীতি। বিশেষ করে সেই প্রযুক্তিটি যদি কেউ ভালোভাবে ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে সেটির মাধ্যমে পয়সা উসুল হবে না বরং টাকাগুলো জলে যাবে, এমন রক্ষণশীল চিন্তা করতে দেখা যায় অনেককেই। যেমন- শুরুতে অনেকেই কম্পিউটার বা মোবাইল ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে না। মানুষ ব্যবহার করতে করতে এগুলোর ব্যাপারে পারদর্শী হয়ে উঠবে, এমনটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু যারা একটু বেশিই মিতব্যয়ী, তাদের কাছে মনে হতেই পারে, "আমি তো কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারি না। কেনার পর এটা এমনিই পড়ে থাকবে। তাহলে আমি কেন খামোকা এটার পেছনে এত টাকা খরচ করবো!" এমন ফোবিয়ার কারণে অনেকের পক্ষেই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও খুব দামি কোনো প্রযুক্তির মালিকানা লাভ করা সম্ভব হয় না।
নোইন্টারনেটফোবিয়া
ইন্টারনেট কানেকশন হারিয়ে ফেলা বিষয়ক এই ফোবিয়াটি বোধহয় সকলেরই আছে। ধরুন, মেসেঞ্জারে প্রিয়জনের সাথে চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন, কিংবা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দাপ্তরিক কাজ করছেন। এমতাবস্থায় যদি হুট করে ইন্টারনেট কানেকশন হারিয়ে ফেলেন, তাহলে কেমন হবে? অবশ্যই খুব খারাপ হবে। আর তাই কেউই চায় না এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে। শহরের বাইরে যাওয়ার সময় অনেকের মনেই আশঙ্কা জাগে, যদি নেটওয়ার্ক ভালো না থাকে? আবার এখন যেহেতু গরমকাল চলছে, আর গরমকালে বারবার লোডশেডিং হয়, তাই ওয়াইফাই ব্যবহারকারীদের এক সার্বক্ষণিক উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়, "হুট করে লোডশেডিং হয়ে ইন্টারনেট কানেকশনটাও চলে যাবে না তো!"
লোরিমোফোবিয়া
সোফা কিংবা কাউচে বসে টিভি দেখতে দেখতে রিমোট কন্ট্রোলটি হারিয়ে ফেলেছেন কখনো? বাজি ধরে বলতে পারি, প্রত্যেকের জীবনেই এমন দুঃস্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা অবশ্যই এসেছে, যখন সে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে চ্যানেল পাল্টাতে চেয়েছে কিন্তু রিমোট কন্ট্রোলটি বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছে। আর যারা একটু বেশি অবসেসিভ, একবার এমন অভিজ্ঞতার শিকার হওয়ার পর পরবর্তীতে প্রতিবার টিভি দেখার সময় তাদের মনে আবারো রিমোট কন্ট্রোলটি হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা জাগা খুবই সম্ভব। তাছাড়া আজকাল যেহেতু টিভি ছাড়াও এসি, সাউন্ড সিস্টেম, স্ট্রিমিং সার্ভিসসহ আরো অনেক কিছু দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেই রিমোট কন্ট্রোলের প্রয়োজন হয়, তাই লোরিমোফোবিয়াও ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
ড্রোস্মার্টয়ফোবিয়া
এটি একটু অদ্ভুত ধরনের ফোবিয়া বটে, তবে অমূলক নয় মোটেই। বিশেষত যাদের অভ্যাস (কিংবা বদভ্যাস) রয়েছে টয়লেটে যাওয়ার সময়ও হাতে করে স্মার্টফোনটি নিয়ে যাওয়ার, তারা হয়তো সহজেই এই ফোবিয়াটির সাথে একাত্মতা অনুভব করতে পারবেন। টয়লেটে স্মার্টফোন নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার সময়টুকুতেও ফোনের পর্দায় কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকা। এদিকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়া শেষে কিছু বিশেষ কাজও করা আবশ্যক। তো, একসাথে দু'টি কাজ করতে গিয়ে যদি কোনোভাবে মনোযোগ সরে যায়, আর তখন ফোনটি হাত থেকে পিছলে কমোডের ভেতর পড়ে যায়? অনেককেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে, যে কারণে অন্যরাও এখন টয়লেটে গিয়ে ভয় পেতে থাকে, "এই বুঝি আমার ফোনটিও পড়ে গেল!" চাইলে এই ফোবিয়াটি থেকে কিন্তু খুব সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। স্রেফ আপনাকে যে কাজটি করতে হবে তা হলো- টয়লেটে ফোন নিয়ে না ঢোকা, কিংবা ঢুকলেও সেটি হাতে নিয়ে টিপতে থাকার বদলে নিরাপদ কোনো স্থানে রেখে দেয়া।
ফরমাসপাসফোবিয়া
পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়াটা নতুন কিছু নয়। প্রায়ই আমরা নিজেদের বিভিন্ন আইডির পাসওয়ার্ড ভুলে ফেলি, এবং তারপর ফরগেট পাসওয়ার্ড দিয়ে, নতুন করে একটি পাসওয়ার্ড সেট করে দিই। কিন্তু যদি এমন হয় যে আমরা আমাদের মাস্টার পাসওয়ার্ডটিই হারিয়ে ফেলি? হতে পারে সেটি মোবাইলের লক পাসওয়ার্ড, মূল মেইল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড, কিংবা ঘরের দরজা খোলার পাসওয়ার্ড। এসব পাসওয়ার্ড একবার হারিয়ে ফেললে নিশ্চিতভাবেই আমাদেরকে প্রচুর বিড়ম্বনায় পড়তে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে, প্রচুর সময় ব্যয় করে অ্যাকাউন্ট বা ডিভাইসটি পুনরুদ্ধার করা যাবে বটে, কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে সেটি চিরতরে ডিজেবল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থেকেই যায়। তাই তো, প্রযুক্তির সাথে যাদের নিত্য বসবাস, তাদেরকে সবসময় মাস্টার পাসওয়ার্ড স্মরণে রাখার চ্যালেঞ্জও জয় করতে হয়। আর যারা সহজেই ভয় পায় বা উদ্বিগ্ন হয়, তারা ফরমাসপাসফোবিয়ার শিকার হয়।
ফরআন্সাকুয়েফোবিয়া
পাসওয়ার্ড ছাড়াও আজকাল আমাদেরকে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশের জন্য কিছু গোপন প্রশ্নের উত্তর স্মরণে রাখতে হয়। কিন্তু কখনো কখনো পাসওয়ার্ড মনে রাখার চেয়েও এই উত্তরগুলো মনে রাখা ঢের বেশি কঠিন। মনে করুন, আপনি কোথাও নতুন একটি অ্যাকাউন্ট খুলবেন, যেটির নিরাপত্তা প্রশ্ন হিসেবে আপনার কাছে জানতে চাওয়া হলো, আপনার প্রিয় বই কোনটি। আপনার হয়তো একাধিক প্রিয় বই আছে। তাড়াহুড়ায় প্রথম যেটির নাম মাথায় এসেছে, সেটিই আপনি উত্তর হিসেবে দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কিছুদিন পর সেই উত্তরটি ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর অনেকদিন পর যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয় আপনার প্রিয় বই কোনটি, তাহলে আপনি যে পূর্বোল্লিখিত বইয়ের নামটিই এবারও উত্তর হিসেবে দেবেন, তেমনটি তো না-ও হতে পারে। তাই আজকাল অনেককেই তাড়া করে বেড়ায় ফরআন্সাকুয়েফোবিয়া।
ফোমো (FOMO) অথবা 'ফিয়ার অব মিসিং আউট'
বর্তমান সময়ে এটিও খুব বড় একটি ফোবিয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আমাদের অনেকের জীবনটাই যেন একটি খোলা বইয়ের মতো হয়ে উঠেছে। আমরা প্রতিনিয়ত কী করছি, কী খাচ্ছি, কী পরছি, কোথায় যাচ্ছি, কার সাথে আড্ডা দিচ্ছি- সবকিছুর আপডেট দিতে থাকি ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামে। এর মাধ্যমে আমরা একধরনের মানসিক শান্তি পাই বটে। কিন্তু কখনো এটিই হতে পারে চরম মানসিক অশান্তির কারণ। হয়তো আমার বন্ধুরা সবাই মিলে কক্সবাজার ঘুরতে গেছে। আমি যেকোনো কারণেই হোক যেতে পারিনি। এখন আমি ফেসবুকে ঢুকতেও ভয় পাচ্ছি। কারণ ফেসবুকে ঢুকলেই তাদের আনন্দ করার ছবি, পোস্ট ইত্যাদি আমার চোখে পড়বে, এবং তখন আমার কাছে মনে হবে আমি হয়তো খুব বড় কিছু মিস করছি। আবার আমার মনে আফসোসও হবে, কেন আমি গেলাম না। অর্থাৎ আমি একপ্রকার নিশ্চিত যে ফেসবুকে ঢুকলেই আমার মন খারাপ হয়ে যাবে, আর তাই আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করব ফেসবুক থেকে দূরে থাকার। এই 'আমি' কিন্তু কেবল আমিই নই, আপনারাও বিভিন্ন সময় এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, তা-ই নয় কি?
ফেসমোফোবিয়া: ভূতের ভয় থেকে জন্ম নেয়া এক ফোবিয়া
ভয়’ শব্দটির সাথে আমরা সকলেই কমবেশি জড়িয়ে আছি। বিভিন্ন অলৌকিক বা অশরীরী ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের ‘ভূতের ভয়’ নামক অনুভূতি আবর্তিত হয়। আত্মানির্ভর বা পারলৌকিক বিষয়ের উপর কোনো চলচ্চিত্র বা গল্প বইয়ের রেশ যখন মনের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দিয়ে যায়, তখন এক গা ছমছমের অনুভূতির জন্ম নেয়। কারো কাছে ব্যাপারখানা নিতান্তই রোমাঞ্চের, আবার কারো কাছে জীবন কেড়ে নেয়ার মতো হুমকিস্বরূপ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অলৌকিক বা ভূতের অতিরিক্ত ভয়কে এক ধরনের ফোবিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার নাম ‘ফেসমোফোবিয়া‘।
ফেসমোফোবিয়া কী?
আপনি হয়তো খুব ভয়ের একটি চলচ্চিত্র দেখলেন বা একটা ভূতের বই পড়লেন। কিন্তু গল্প শেষ হয়ে গেলেও গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে অনেক বেশি একাত্ম হয়ে আছেন। গল্পের চরিত্রগুলো এতটাই জীবন্ত ছিল যে চরিত্রগুলো যেন কল্পনা থেকে বাস্তবে উঠে এসেছে। আর মনের অজান্তেই নিজের চারপাশে এক ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি করে নিয়েছেন।
রাতে যখন ঘুমোতে গেলেন, তখন গল্পের সবগুলো ভৌতিক দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। বিছানায় একা শুয়ে আছেন, কিন্তু মনে হলো কীসের যেন একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। দরজায় কেমন যেন একটা আওয়াজ হচ্ছে। ঘরের কাঠের আসবাব থেকে ঘুনে ধরার আওয়াজ আসছে। মাথার কাছে রাখা ঘড়িটার টিক টিক আওয়াজ শোনা যাচ্ছে যেন। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ।
জানলার পর্দাটা খোলা ছিল বলে বাইরের ল্যাম্পপোস্টের কিছুটা আলো ঘরে ঢুকে পড়েছে। আধো আলো ছায়াতে বিছানার পাশেই যেন কারো অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে রাখতে চাইছেন, তবু কেন জানি চোখ খুলে ফেলছেন বারবার। শরীরের উপর চাদরটা দিয়ে মুখটা ভালোভাবে ঢেকে দিলেন, কিন্তু মনে হতে লাগলো কেউ একজন যেকোনো সময় চাদরটি মুখ থেকে সরিয়ে নিবে। আবার বিছানার পাশেই হয়তো গল্পের সেই সাদা মুখের বাচ্চাটি গুটি দিয়ে বসে আছে।
চোখে ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই, তবুও চোখ খুলতে সাহস হচ্ছে না। চোখ খুললেই হয়তো লাল শাড়ি পরা মেয়েটিকে দেখা যাবে, যে কিনা রাতের আঁধারে এসেই গলা টিপে দিয়ে যেত। চাইলেই বৈদ্যুতিক বাতিটি জ্বালিয়ে কিছুটা হলেও ছাড় পাওয়া যায় কিন্তু সকালেই নিন্দুকের টিপ্পনি সইতে হবে। ভীতু নামটা যেন কিছুতেই গায়ে মাখা যায় না।
হঠাৎ করেই কীসের যেন একটা আওয়াজ হলো বা ঘরের জানালাটা নড়ে উঠল। আপনিও হুড়মুড় করে উঠে পড়লেন। যে যা-ই বলুক, এভাবে তো আর থাকা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে ভয়েই দম বন্ধ হয়ে আসবে। উঠে গিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন বাতি, আর বাকিটা রাত কিছুটা ঘুম আর কিছুটা আতঙ্ক নিয়ে কাটিয়ে দিলেন। কারো কারো ক্ষেত্রে ভূতের ভয় এমনই তীব্র আকার ধারণ করে যে নিদ্রাহীনতা, হৃদরোগ, স্কিজোফ্রেনিয়া, ইনসোমনিয়ার মতো রোগেও আক্রান্ত হতে পারেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে ভূতের এই ভয়কেই ফেসমোফোবিয়া বলে আখ্যা দেয়া হয়।
ভূতের ভয় অনেক মানসিক ব্যাধির কারণ হয়ে উঠতে পা
লক্ষণসমূহ
ভূতের ভয় কমবেশি আমাদের সকলের মনের মধ্যে রয়েছে। এর একটি বড় কারণ হলো ছোটবেলা থেকেই আমরা বড়দের কাছ থেকে ভূত-প্রেত, রূপকথা শুনে বড় হই। তাই ভূত সম্পর্কিত একধরনের অদৃশ্য ভয় আমাদের বড় হয়ে ওঠার মধ্যেই যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। অনেকের মনের মধ্যে ভূতের ভয় থাকলেও তা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন।
তবে ফেসমোফোবিয়ায় আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রে ভয়ের মাত্রাটি অনেক বেশি। তারা একা ঘরে থাকতে ভয় পায়, অন্ধকারকে অসম্ভব ভয় পায়, নিস্তব্ধতা সহ্য করতে পারে না, শহরে বাস করলে গ্রামে কোনভাবেই রাত কাটাতে চায় না, ভৌতিক গল্প, সিনেমা বা ছবি থেকে অনেক দূরে থাকেন। তবে এই ধরনের ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ প্রদর্শন করে থাকেন।
১। একা ঘুমুতে ভয় পান
২। পুরোপুরি অন্ধকার ঘরে ঘুমুতে চান না
৩। মনের মধ্যে সবসময় অলীক ভূতের ছবি ভাসতে থাকে
৪। যেকোনো পরিস্থিতিতে ভূতের অস্তিত্বের আভাস পান
৫। মাঝে মাঝে ভয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় এবং খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন
৬। সবসময় মুখে চিন্তার ছাপ দেখা যায়
৭। নিদ্রাহীনতায় ভুগতে থাকেন কারণ ভূতের ভয়ে ঘুমুতে পারেন না
৮। বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্রের প্রতি অনেক বেশি আসক্তি হয়ে পড়েন
করণীয়
ভূতের ভয়কে সাধারণত খুব বেশি উদ্বেগজনক বলে মনে করা হয় না। তবে ভয়ের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অথবা এই ভয় যদি দৈনন্দিন জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলে, তবে এই বিষয়ে সতর্কতা গ্রহণ করা উচিত। তবে প্রথমেই উদ্বিগ্ন না হয়ে নিজে থেকেই চেষ্টা করতে হবে এই ফোবিয়া থেকে বের হয়ে আসার।
ভয়কে জয় করার চেষ্টা
ফেসমোফোবিয়া থেকে মুক্তির সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হলো ভূতের ভয় মন থেকে পুরোপুরি বের করে ফেলার চেষ্টা করা। ভূতের ভয়কে যত বেশি প্রশ্রয় দেয়া হবে, ভয় ততই মনের মধ্যে স্থায়ী হয়ে যাবে। তাই সর্বপ্রথম নিজের মনকে বোঝাতে হবে, ভূত বলে কিছু নেই। এটি সম্পূর্ণ নিজের মনের ভুল ধারণা। আর যদি আপনি ভূতে বিশ্বাস করে থাকেন, তবে চেষ্টা করতে হবে ভূতের দেখা পাওয়ার চেষ্টা করা। কারণ আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে ভূত যদি থেকেও থাকে, তা কখনো সরাসরি আপনাকে আঘাত করতে পারবে না, বরং একমাত্র ভয়ই হয়ে উঠতে পারে আপনার মৃত্যুর কারণ। তাই মনকে শক্ত করে ভূতের মুখোমুখি হওয়ার জন্যে মনকে গড়ে তুলুন।
মনকে অনেক বেশি যৌক্তিক করে তোলা
বিজ্ঞানের এই যুগে ভূতে বিশ্বাস রাখা খুব কষ্টসাধ্য। তবুও যদি মনের মধ্যে ভূতের ভয় বাসা বাঁধে, তবে মনের বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাকে জাগ্রত করে তুলুন। কোনো কিছুর প্রমাণ ছাড়া সহজেই মেনে নেয়ার অভ্যাস দূর করতে হবে। কোনোকিছু দেখে বা অনুভব করে অথবা শব্দ শুনে ভয় পেলে তার উৎসের সন্ধান করতে হবে। কী কারণে এমন ঘটল, তা বের করলে সব কৌতূহলের সমাধান হয়ে যাবে।
ভয় থেকে মুক্তির জন্যে কৌতুকের আশ্রয় নিন
ভূতের ভয় পাচ্ছেন দেখে নিজেকে নিয়ে কৌতুক করুন। অথবা আপনার খুব পছন্দের কোনো কৌতুক চরিত্রের কথা চিন্তা করুন। নিজের জীবনের মজার কিছু স্মৃতি নিয়ে ভাবুন। ভূত সবসময় খারাপ হয় না, ভালোও হতে পারে এমন চিন্তা মাথায় আনুন। এর একটি ভালো উদাহরণ ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ এর ভূতের অবয়ব।
নিজেকে নিরাপদ রাখা
অনেক কিছু করেও যদি ভূতের ভয় জয় করতে না পারেন, তবে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সাধারণত কোনো ভূতের চলচ্চিত্র দেখলে বা বই পড়লে এমনটা মাথার মধ্যে বেশি কাজ করে, যা কয়েকদিনের মধ্যে এমনিতেই মিলিয়ে যায়। তাই যদি খুব বেশি ভয় মনের মধ্যে গেঁথে যায় তবে রাতে কারো সাথে ঘুমান, অথবা বাতিটা জ্বালিয়ে রাখুন কিংবা হালকা কোনো গান চালিয়ে রাখুন।
ভূতের চলচ্চিত্র দেখা বা বই পড়া থেকে বিরত থাকা
যাদের ভূতের ভয় খুব বেশি, তারা চাইলে ভূতের চলচ্চিত্র দেখা অথবা ভূতের বই পড়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। তবে অনেকেই ভয় পেলেও ভূতের চলচ্চিত্র দেখা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেন না। তাদের ক্ষেত্রে সাধারণত একা থাকার প্রবণতা কম দেখা যায়। অন্যথায় রাতের বেলা ভূতের চলচ্চিত্র না দেখে দিনের বেলা দেখে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভূতের ভয় পাওয়ার আনন্দটাও ষোলোআনায় যে হারাতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।
মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া
অনেকেই ভূতের ভয়ে এত বেশি আক্রান্ত হয়ে পড়েন, যার কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবন অনেক বেশি ব্যাহত হয়ে থাকে। এই ধরনের ফোবিয়া থেকে মানসিক আরো জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ভূতের ভয়ের ফোবিয়া অল্পতেই বিনষ্ট করে নেয়া উচিত। কোনোভাবেই যদি ভূতের ভয় কমানো না যায় এবং এর ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে থাকে, তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
বিজ্ঞানের এই যুগে ভূতের ভয় একধরনের বিলাসিতা বা বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সত্যটি যাদের মনে গেঁথে রয়েছে, তাদের ভূতের বিষয়টি আনন্দ ও নিছক বিনোদনের একটি বিষয়। অনেকের মতে, ভয় না পেলে ভূতের চলচ্চিত্র বা বই পড়ে লাভটাই বা কী? তবে মানুষের মন বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন হয়ে উঠতে পারে। তাই এই ফোবিয়াকে সবসময় ছোট করে দেখা উচিত নয়। ফোবিয়া খুব তীব্র হয়ে উঠলে এর উপযুক্ত চিকিৎসা নেয়া মোটেও লজ্জার চোখে দেখা উচিত নয়।
আরাকনোফোবিয়া: মানুষ কেন মাকড়শাকে ভয় পায়
অনেকেই হয়তো “ব্যাপারটি নারীদের সাথে বেশি ঘটে থাকে”- এমনটা বলবেন। তবে গবেষণানুসারে, নারীদের প্রতি তিনজনে একজন এবং পুরুষদের গড়ে প্রতি চারজনে একজন এই সমস্যায় ভুগে থাকেন। বলছিলাম আরাকনোফোবিয়ায় কথা। বাংলায় যার সহজ নাম মাকড়শা থেকে ভয়। আরাকনোফোবিয়ায় আক্রান্তরা মাকড়শা নামক ছোট্ট এবং অতি সাধারণ প্রাণীকে নিয়ে প্রচণ্ড আতঙ্কে ভুগে থাকেন। যার উদাহরণ হয়তো আপনি নিজেই! কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতকিছু থাকতে আমরা মাকড়শাকে কেন ভয় পাই? এমনকি, মাকড়শা আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না জেনেও এটি দেখলেই ভয়ে সিঁটিয়ে যাই। কিন্তু কেন? আরাকনোফোবিয়া কেন হয়?
ফোবিয়া মূলত তিন ধরনের হয়ে থাকে। সেগুলো হল- অ্যাগ্রোফোবিয়া বা ঘরের বাইরে যাওয়ার ভয়, সোশ্যাল ফোবিয়া বা সামাজিকতায় ভয় এবং নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে ভয়। মাকড়শা নিয়ে আপনার ভয়টি শেষ রকমের ফোবিয়া বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যাপারে ফোবিয়ার মধ্যে পড়ে। তাহলে কি আপনার সাথে মাকড়শা নিয়ে এর আগে কোনো বাজে ঘটনা ঘটেছিল? সবার সাথেই কি তা-ই হয়েছে? প্রশ্ন জাগতেই পারে আপনার মনে। তবে ব্যাপারটি এত সহজ নয়। আরাকনোফোবিয়া বা মাকড়শাকে ভয় পাওয়ার এই ব্যাপারটি মানুষের মধ্যে এখন জন্ম নেয়নি। আপনি এবং বাকি সব মানুষ যে মাকড়শাকে ভয় পায়, সেটি মোটেও নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে নয়। এর পেছনে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের হাত। একটা সময় আমাদের প্রাচীন মানবদের কাছে না ছিল বড় হাতিয়ার, আর না ছিল কোনো উন্নত ওষুধ। আরাকনোফোবিয়ার উৎপত্তি তখন থেকে। নির্দিষ্ট এই গোত্রের প্রাণীদের কাছ থেকে আক্রমণের সম্ভাবনা থাকতো তখন মানুষের। তাদেরকে প্রতিহত করার কোনো উপায় জানা ছিল না কারো। সেইসাথে আক্রমণের পর ব্যবহার করার মতো ঔষধ ছিল না তাদের কাছে। ফলে এই আক্রমণে মারা যেত অনেক মানুষ।
সেখান থেকেই মাকড়শা গোত্রের যেকোনো প্রাণীর প্রতি আমাদের স্বভাবজাত ভয়ের জন্ম। বর্তমানে আমার কিংবা আপনার সাথে মাকড়শা সংক্রান্ত কোনো ঘটনা ঘটুক কিংবা না ঘটুক, ভয় পাওয়াটা তাই হয়ে পড়ে স্বাভাবক একটি ব্যাপার। মাকড়শা সম্পর্কে তো জানা হল। কিন্তু মাকড়শা কেবল তার গোত্রের একমাত্র প্রাণী নয়। আরো অনেকে আছে তার সাথে। প্রাচীনকালে কেবল মাকড়শা নয়, বরং এই গোত্রের সব প্রাণীকেই ভয় পেত মানুষ। আরাকনিড একটি প্রাণীগোষ্ঠী। এই গোত্রের মধ্যে আছে মাকড়শা, বিছেসহ আরো অনেক প্রাণী, যাদের শরীর দেখতে অনেকটা একইরকম। আর এদের মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে আরাকনোফোবিয়া হয়ে থাকে। ১৯৯১ সালে লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির গ্রাহাম ডেভি এই সংক্রান্ত একটি পরীক্ষা চালান। এতে তার সাথে অংশ নেয় ১১৮ জন শিক্ষার্থী। আর সেখান থেকে পরীক্ষায় জানা যায় যে, প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ মাকড়শা এবং আরাকনিড গোত্রের প্রাণীদেরকে ভয় পায়। আর এদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী।
তবে প্রশ্ন থাকে যে, মানুষ কি কেবল এই একটি কারণেই মাকড়শাকে ভয় পায়? একদম নয়। মানুষের মাকড়শার প্রতি এই ভয় জন্ম নেওয়ার পেছনে আছে তার পরিবারের প্রভাব। পরীক্ষায় জানা যায় যে, যেসব ব্যক্তি মাকড়শাকে প্রচন্ড পরিমাণে ভয় পান তাদের পরিবারেও কারো না কারো ঠিক একই সমস্যা ছিল। তবে কারো উপরে এই সংক্রান্ত ব্যাপারে জিনগত কোনো ব্যাপার বেশি প্রভাব রাখে নাকি পরিবেশগত, সেটি খুব একটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না। আশ্চর্যজনকভাবে, মাকড়শাকে ভয় পাওয়ার দিকে সবচাইতে এগিয়ে থাকে শিশুরা। বিভিন্ন শিশুকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তাদের ভয়ের কারণ হিসেবে গাড়ি, নিঃশ্বাস না নিতে পারা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো উল্লেখ করেছে তারা। কিন্তু সবার ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ এবং সবচাইতে এগিয়ে থাকা ভয় প্রাধান্য পেয়েছে। আর সেটি হলো মাকড়শাকে ভয়। মাকড়শাকে ভয় পাওয়া বা আরাকনোফোবিয়ার সাথে যে আমাদের প্রাচীন মানবদের সম্পর্ক আছে, তা তো আগেই উল্লেখ করেছি। তবে এই ব্যাপারে আরো বেশি পরিষ্কার ধারণা পেতে ডেভির গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি গবেষণা চালানো হয় জানার চেষ্টা করা হয় যে পরিবেশ নাকি জিন- কোনটা প্রভাব রাখে এই ক্ষেত্রে?
স্বাস্থ্য
আরাকনোফোবিয়া: মানুষ কেন মাকড়শাকে ভয় পায়?
অনেকেই হয়তো “ব্যাপারটি নারীদের সাথে বেশি ঘটে থাকে”- এমনটা বলবেন। তবে গবেষণানুসারে, নারীদের প্রতি তিনজনে একজন এবং পুরুষদের গড়ে প্রতি চারজনে একজন এই সমস্যায় ভুগে থাকেন। বলছিলাম আরাকনোফোবিয়ায় কথা। বাংলায় যার সহজ নাম মাকড়শা থেকে ভয়। আরাকনোফোবিয়ায় আক্রান্তরা মাকড়শা নামক ছোট্ট এবং অতি সাধারণ প্রাণীকে নিয়ে প্রচণ্ড আতঙ্কে ভুগে থাকেন। যার উদাহরণ হয়তো আপনি নিজেই! কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতকিছু থাকতে আমরা মাকড়শাকে কেন ভয় পাই? এমনকি, মাকড়শা আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না জেনেও এটি দেখলেই ভয়ে সিঁটিয়ে যাই। কিন্তু কেন? আরাকনোফোবিয়া কেন হয়?
মাকড়শার ভয় বা আরাকনোফোবিয়া;
এই ‘কেন’র উত্তর জানতে হলে আমাদের জানতে হবে ফোবিয়া কী। ফোবিয়া মূলত ভয়। না, সাধারণ কোনো ভয় নয়। বেশ জাঁকিয়ে বসা ভয়। পরীক্ষায় ভালো না লিখে আসলে ফলাফল দেওয়ার সময় আপনার দুশ্চিন্তা এবং ভয় হতেই পারে। তবে ফোবিয়া ঠিক সেরকম ভয় নয়। এটি একজন মানুষের মধ্যে অনেকটা পাকাপাকিভাবে এবং অতিরিক্ত মাত্রায় বাস করে। মাকড়শার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি অনেকটা একই রকম। আশেপাশে কোনো মাকড়শা নেই, থাকলেও সেটি আপানাকে কোনোভাবেই আঘাত করতে পারবে না। সুতরাং এই ছোট্ট প্রাণীকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণই নেই। এতকিছু জানার পরেও যদি আপনাকে কেউ বলে বসে- ঐ যে মাকড়শা! আর আপনি অসম্ভব ভয় পান, তাহলে সেটা সাধারণ ভয়ের পর্যায়ে থাকে না। এই ভয়কে আমরা এত বেশি নিজেদের মধ্যে পুষে রেখেছি যে, এটি খুব সাধারণ ঘটনা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু যতজন মানুষই কোনো ফোবিয়া বা ভীতির ভুক্তভোগী হয়ে থাকুন না কেন, সেটি শেষ পর্যন্ত ফোবিয়াই থাকে। আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, ফোবিয়া কেন হয়? প্রশ্নের উত্তর খুব একটা সহজ নয়। ঠিক কী কারণে ফোবিয়া হয়ে থাকে সেটা এখনো পর্যন্ত জানতে পারা যায়নি। তবে অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা হতে পারে আপনার কোনো ব্যাপারে ভয় পাওয়ার কারণ। তবে কিছু ফোবিয়া বা ভীতি আছে যেগুলো মানুষ জন্ম থেকেই সাথে নিয়ে আসে। আর সেগুলো হচ্ছে- উচ্চতা থেকে ভয়, অন্ধকারে ভয়, চলন্ত বস্তুতে ভয় ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি মানুষের মধ্যে এই ভয়গুলো কাজ করে। আর বাকি ফোবিয়া বা ভীতিগুলোকে অর্জিত ফোবিয়া বলে। যেগুলো মানুষ আগে থেকে নয়, বরং জন্ম নেওয়ার পর শেখে।
মাকড়শার প্রতি মানুষের এই ভয় আজকের নয়; Source: San Diego Zoo Animals
ফোবিয়া মূলত তিন ধরনের হয়ে থাকে। সেগুলো হল- অ্যাগ্রোফোবিয়া বা ঘরের বাইরে যাওয়ার ভয়, সোশ্যাল ফোবিয়া বা সামাজিকতায় ভয় এবং নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে ভয়। মাকড়শা নিয়ে আপনার ভয়টি শেষ রকমের ফোবিয়া বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যাপারে ফোবিয়ার মধ্যে পড়ে। তাহলে কি আপনার সাথে মাকড়শা নিয়ে এর আগে কোনো বাজে ঘটনা ঘটেছিল? সবার সাথেই কি তা-ই হয়েছে? প্রশ্ন জাগতেই পারে আপনার মনে। তবে ব্যাপারটি এত সহজ নয়। আরাকনোফোবিয়া বা মাকড়শাকে ভয় পাওয়ার এই ব্যাপারটি মানুষের মধ্যে এখন জন্ম নেয়নি। আপনি এবং বাকি সব মানুষ যে মাকড়শাকে ভয় পায়, সেটি মোটেও নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে নয়। এর পেছনে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের হাত। একটা সময় আমাদের প্রাচীন মানবদের কাছে না ছিল বড় হাতিয়ার, আর না ছিল কোনো উন্নত ওষুধ। আরাকনোফোবিয়ার উৎপত্তি তখন থেকে। নির্দিষ্ট এই গোত্রের প্রাণীদের কাছ থেকে আক্রমণের সম্ভাবনা থাকতো তখন মানুষের। তাদেরকে প্রতিহত করার কোনো উপায় জানা ছিল না কারো। সেইসাথে আক্রমণের পর ব্যবহার করার মতো ঔষধ ছিল না তাদের কাছে। ফলে এই আক্রমণে মারা যেত অনেক মানুষ।
সেখান থেকেই মাকড়শা গোত্রের যেকোনো প্রাণীর প্রতি আমাদের স্বভাবজাত ভয়ের জন্ম। বর্তমানে আমার কিংবা আপনার সাথে মাকড়শা সংক্রান্ত কোনো ঘটনা ঘটুক কিংবা না ঘটুক, ভয় পাওয়াটা তাই হয়ে পড়ে স্বাভাবক একটি ব্যাপার। মাকড়শা সম্পর্কে তো জানা হল। কিন্তু মাকড়শা কেবল তার গোত্রের একমাত্র প্রাণী নয়। আরো অনেকে আছে তার সাথে। প্রাচীনকালে কেবল মাকড়শা নয়, বরং এই গোত্রের সব প্রাণীকেই ভয় পেত মানুষ। আরাকনিড একটি প্রাণীগোষ্ঠী। এই গোত্রের মধ্যে আছে মাকড়শা, বিছেসহ আরো অনেক প্রাণী, যাদের শরীর দেখতে অনেকটা একইরকম। আর এদের মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে আরাকনোফোবিয়া হয়ে থাকে। ১৯৯১ সালে লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির গ্রাহাম ডেভি এই সংক্রান্ত একটি পরীক্ষা চালান। এতে তার সাথে অংশ নেয় ১১৮ জন শিক্ষার্থী। আর সেখান থেকে পরীক্ষায় জানা যায় যে, প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ মাকড়শা এবং আরাকনিড গোত্রের প্রাণীদেরকে ভয় পায়। আর এদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী।
পুরুষদের চাইতে নারীরা মাকড়শাকে বেশি ভয় পায়; Source: Medical News Today
তবে প্রশ্ন থাকে যে, মানুষ কি কেবল এই একটি কারণেই মাকড়শাকে ভয় পায়? একদম নয়। মানুষের মাকড়শার প্রতি এই ভয় জন্ম নেওয়ার পেছনে আছে তার পরিবারের প্রভাব। পরীক্ষায় জানা যায় যে, যেসব ব্যক্তি মাকড়শাকে প্রচন্ড পরিমাণে ভয় পান তাদের পরিবারেও কারো না কারো ঠিক একই সমস্যা ছিল। তবে কারো উপরে এই সংক্রান্ত ব্যাপারে জিনগত কোনো ব্যাপার বেশি প্রভাব রাখে নাকি পরিবেশগত, সেটি খুব একটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না। আশ্চর্যজনকভাবে, মাকড়শাকে ভয় পাওয়ার দিকে সবচাইতে এগিয়ে থাকে শিশুরা। বিভিন্ন শিশুকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তাদের ভয়ের কারণ হিসেবে গাড়ি, নিঃশ্বাস না নিতে পারা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো উল্লেখ করেছে তারা। কিন্তু সবার ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ এবং সবচাইতে এগিয়ে থাকা ভয় প্রাধান্য পেয়েছে। আর সেটি হলো মাকড়শাকে ভয়। মাকড়শাকে ভয় পাওয়া বা আরাকনোফোবিয়ার সাথে যে আমাদের প্রাচীন মানবদের সম্পর্ক আছে, তা তো আগেই উল্লেখ করেছি। তবে এই ব্যাপারে আরো বেশি পরিষ্কার ধারণা পেতে ডেভির গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি গবেষণা চালানো হয় জানার চেষ্টা করা হয় যে পরিবেশ নাকি জিন- কোনটা প্রভাব রাখে এই ক্ষেত্রে?
মাকড়শা এবং শিশু; Source: founditgood.com
২০০৩ সালে জন হেত্তেমা ভার্জিনিয়া ইন্সটিটিউট ফর সাইকায়াট্রিক এন্ড বিহেভিওরাল জেনেটিক্স থেকে তার সহকর্মীদের নিয়ে শুরু করেন এই গবেষণা। এই গবেষণায় তারা ব্যবহার করেন জমজদের উপরে। এই জমজ শিশুদেরকে সম্পূর্ণ দু’ভাবে বড় করা হয়। পরিবেশ আলাদা দেওয়া হয় এবং এটা নিশ্চিত করা হয় যে তাদের মধ্যে একজন মাকড়শা দেখেনি আর মাকড়শার সাথে তার কোনোরকম বাজে কোনো অভিজ্ঞতাও হয়নি। পরীক্ষা চলতে থাকে। খানিকটা বড় হওয়ার পর তাদের দুজনকেই মাকড়শার ছবি দেখানো হয়। আর ফলাফল? মাকড়শা দেখুক কিংবা না দেখুন, মাকড়শার সাথে বাজে অভিজ্ঞতা থাকুক বা না থাকুক- এরা দুজনেই ভয় পেয়ে যায় মাকড়শার ছবি দেখে। আর সেখান থেকে সিদ্ধান্তে আসেন গবেষকেরা যে, আরাকনোফোবিয়া কোনো পরিবেশগত সমস্যা নয়। পরিবেশের উপরে কিংবা নিজের অভিজ্ঞতার উপরে ভিত্তি করে এই ভয়কে ধারণ করতে হয় না মানুষের। মাকড়শাকে ভয় পাওয়ার এই ফোবিয়া জন্ম থেকে নিজের সাথে নিয়ে আসা এবং শেখা- এই দুটোর মাঝখানে পড়ে যায়। তাহলে, কী ভাবছেন? আপনারও আছে নাকি আরাকনোফোবিয়া?
অ্যালোডক্সাফোবিয়া: মতামত শোনার ফোবিয়া
আপনাকে যদি কেউ নিজের মতামত জানায় কিংবা আপনার বিশ্বাসের বিপরীতে কিছু বলে, তাহলে আপনার কেমন লাগবে? কেউ কেউ ব্যাপারটির সত্যতা যাচাই করে বোঝার চেষ্টা করবেন যে কার কথা ঠিক। কিন্তু কিছু মানুষ এমনও আছেন, যারা নিজেদের মতামতকে কোনো বাছবিচার ছাড়াই ঠিক ধরে নেন এবং বাকিদের কথাকে পাত্তাও দেন না। বিষয়টি কে কীভাবে নেবে, সেটা তার উপরই নির্ভর করে। তবে অন্য কারো মতামত শুনে ভয় পাওয়ার বিষয়টি নিতান্তই অস্বাভাবিক। একটি কাজ করলে কে কী বলবে বা একটি বিষয়ে আপনার মত শুনে বাকিদের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা আমরা সকলেই কম-বেশি চিন্তা করি। কিন্তু এই চিন্তা এবং ভয়ের মধ্যে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। এই ভয়ের মানে হলো আপনার একধরনের ফোবিয়া রয়েছে। অন্যের মতামত শোনার ফোবিয়া, যাকে বলা হয় ‘অ্যালোডক্সাফোবিয়া’।
‘অ্যালোডক্সাফোবিয়া’-এর উৎপত্তি ‘ডক্সাফোবিয়া’ থেকে হলেও দুটি শব্দ অর্থগত দিক থেকে পরস্পরের বিপরীত। ডক্সাফোবিয়া হলো মতামত ‘প্রকাশ’ করার ভয়। অন্যদিকে ‘অ্যালোডক্সাফোবিয়া’ মানে অন্য কারো মতামত ‘শোনার’ বা ‘জানার’ ভয়। তিনটি গ্রিক শব্দ ‘অ্যালো’, ‘ডক্স’ এবং ‘ফোবোস’ থেকে এই ফোবিয়ার নামটির উদ্ভব। উল্লেখ্য, ‘অ্যালো’ অর্থ ভিন্ন, ‘ডক্স’ হলো মতামত এবং ‘ফোবোস’ বলতে ভয়ের দেবতাকে বোঝানো হয়। ফোবিয়ার বিষয়টা হলো নির্দিষ্ট কোনো একটা বিষয়ের ক্ষেত্রে কারো অবাধ ভয়। সেই ব্যাপারে ভয় পাওয়াটা ভিত্তিহীন কিংবা অযৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও তা কাটিয়ে উঠতে না পারা। ফলস্বরূপ, ফোবিয়ার শিকার ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অ্যালোডক্সাফোবিয়া যাদের মধ্যে রয়েছে, তারা বাকিদের মতামত শোনার ভয়ে নিজেদের উপর নিজেরাই অনেক বিধি-নিষেধ আরোপ করে বসে। সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে সর্বদাই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এই ফোবিয়া। মতামত শোনার বা জানার ভয়ের বিষয়টা শুধুমাত্র কোনো নির্দিষ্ট বয়সের মানুষদের জন্য নয়। বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও শিকার হতে এই ফোবিয়ার। কোমল শিশুদের মনেও ভয় জাগতে পারে, অন্যরা কী ভাববে তা ভেবে। আর এই অযৌক্তিক ভয় তাদের মনে শক্ত করে ঘর বেঁধে বসে। যেমন- পরীক্ষায় তাদের ফলাফল দেখলে বাকিরা কী বলবে কিংবা নিজেকে অন্যদের তুলনায় নিকৃষ্ট ও অদক্ষ মনে করে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ না করা।
অথবা হেরে গেলে বাকিরা সমালোচনা করবে, তা ভেবে ভিত্তিহীন ভয় পাওয়া। বড়দের ক্ষেত্রেও এরকম ভয় লক্ষ্য করা যায়। এই পোশাক পরলে বাকিরা কী বলবে, এই উত্তরটা এভাবে বললে সবাই তার সম্পর্কে কী ভাববে কিংবা এমনিতেই সারাক্ষণ অকারণে তার সম্পর্কে কে কী ভাবছে তা নিয়ে চিন্তা করা বা মতামতটা জেনে ফেলার যে ভয় সেগুলোই অ্যালোডক্সাফোবিয়ার অন্তর্ভুক্ত। ধীরে ধীরে এই ভীতি তাদের চেতনাশক্তিকে কবজ করে ফেলে। এতে করে তারা পরবর্তীতে নিজের মতো করে কোনো কিছু করার বা মত প্রকাশের সাহস পায় না। অ্যালোডক্সাফোবিয়া একধরনের বিরল এবং অস্বাভাবিক সামাজিক ফোবিয়া। এই ধরনের ফোবিয়া ভুক্তভোগীকে সমাজ থেকে আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তার জীবনের, বিশেষ করে পেশাগত জীবনের ক্ষতি করে থাকে।
অ্যালোডক্সাফোবিয়ার কারণ
ফোবিয়ার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিই সাধারণত নিজেদের ভয়-ভীতির কথা বলতে চায় না। তা-ও কিছু কিছু মানুষ নিজেদের ভয়ের পেছনের কারণ জানান। এক্ষেত্রে মূলত অতীতের কোনো খারাপ ও আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা দায়ী বলে জানা যায়। সবচাইতে দুঃখজনক বিষয় হলো মা-বাবা, শিক্ষক কিংবা পরিচিত জনের কারণেই মূলত উঠতি শিশুদের এই ফোবিয়ার সৃষ্টি হয়। সবসময় বা অতিরিক্ত খবরদারি বা সমালোচনা করলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে একজন ব্যক্তির উপর। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবহারের ফল হিসেবে মাঝে মাঝে অ্যালোডক্সাফোবিয়া লক্ষ্য করা যায়।
কৌতূহলশূন্য এবং অনুভূতিপ্রবণ ব্যক্তি, যারা সমালোচনা এবং প্রতিশোধের মতো বিষয়গুলোর প্রতি ভীত থাকে, তাদেরকেই এই ফোবিয়ার ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে এসব অপ্রিয় অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের একটি অংশ এমিগডালায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে যেকোনো চাপে বা সমস্যায় পড়লে মস্তিষ্ক একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়। এজন্য একজন ব্যক্তি নিজেকে নিরাপদ রাখতে নিজের অজান্তেই অন্যদের কাছ থেকে দূরে থাকা শুরু করে, যাতে করে অন্য কারো মতামত শোনা না লাগে।
যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা সামাজিক মাধ্যমও মতামত জানার এই ফোবিয়াকে বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন- খবরের কাগজ, টেলিভিশন এবং যেকোনো সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হওয়া যেকোনো মন্দ খবর অ্যালোডক্সাফোবিয়ার রোগীর জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আবার অনেক সময় এই ফোবিয়ার পেছনে দায়ী থাকে কোনো বংশগত ফ্যাক্টর বা জেনেটিক সমস্যা।
অ্যালোডক্সাফোবিয়ার লক্ষণসমূহ
এই ফোবিয়া হলে একজন ব্যক্তির মধ্যে শারীরিক এবং মানসিক লক্ষণ দেখা যায়। অ্যালোডক্সাফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবস্থা কারো মতামত শুনলে এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে এর ফলে সেই ব্যক্তি প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হতে পারে। আর মতটা যে সবসময় নেতিবাচক হয় তা-ও না। ইতিবাচক কোনো কথা শুনেও চটে যেতে পারে এই ফোবিয়ার শিকার কোনো ব্যক্তি। এর কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো ঘন ঘন হাত ঘামানো, অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বমি বমি ভাব এবং অকারণেই অসুস্থতা অনুভব করা।
এই ধরনের ফোবিয়া হলে রোগী ভালো বা খারাপ নির্বিশেষে সব রকমের মতামত শুনলেই রেগে যায়। অথবা এর উল্টোটাও হতে পারে। কারো কথা শুনতে হবে বা কেউ কি ভাবছে তা জানা লাগবে বলে কিছু অ্যালোডক্সাফোবিক ব্যক্তি সেসব স্থানে যাবেই না, যেখানে মত প্রকাশের কোনো সুযোগ থাকতে পারে। অর্থাৎ সামাজিক জীবনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে এই ফোবিয়া। আর এতে করে অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে এবং জীবনের ভালো সুযোগগুলো হাতছাড়া হয়ে যায়। তাছাড়া তাদের মধ্যে অনিরাপত্তা এবং আত্মসম্মানবোধের অভাবও লক্ষ্য করা যায়। একটি জরিপে দেখা যায়, ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে অ্যালোডক্সাফোবিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ১৮-৩৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রেও রোগীদের সংখ্যা অনেক। সাধারণত নারীরা এই ফোবিয়ার শিকার বেশি হয়।
প্রতিকার
অ্যালোডক্সাফোবিয়ার কারণ জানা গেলে একজন ডাক্তার রোগীকে তার সমস্যা বা রোগ সেরে উঠতে সহায়তা করতে পারে। এর জন্য ব্যবহৃত থেরাপিগুলোর মধ্যে রয়েছে টক থেরাপি, সাইকোথেরাপিউটিক কাউন্সেলিং, গ্রুপ থেরাপি, সিস্টেমিক ডিসেন্টিসাইজেশন, হিপনোথেরাপি ইত্যাদি। এছাড়া অ্যালোডক্সাফোবিয়া কাটিয়ে তোলার সবচাইতে বড় অন্তরায় হলো রোগী নিজে থেকে প্রথমেই চিকিৎসা নিতে রাজি হন না। তবে এই সমস্যা সমাধানের তাগিদে রোগীর যথাযথ সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন যার জন্য পরিবারের সদস্যরা মূলত কাজ করতে পারে। একজন ফোবিককে নিজের সমস্যা বলার জন্যে উৎসাহিত করা উচিত। কেননা, অসুবিধা না বললে কখনো কারো সাহায্য করা সম্ভব নয়। অ্যালোডক্সাফোবিক ব্যক্তি প্রতিদিন তার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, চিন্তা ও মতামত পরিবার কিংবা আপনজনদের কাছে প্রকাশ করলে তার মধ্যে যে জড়তা কাজ করে তা কাটিয়ে তোলা সম্ভব হবে। এসব ছোট ছোট কাজই একজন ব্যক্তিকে প্যানিক না করে বড় কিছু মেনে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে। একইসাথে একজন ব্যক্তিকে আত্মবিশ্বাসী হিসেবেও গড়ে তোলে।
এই ফোবিয়ার আসলে নির্দিষ্ট বা সুষ্ঠু কোনো চিকিৎসা কিংবা ঔষধ আবিষ্কার হয়নি। এটা অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার, যা সারানোর জন্য ধৈর্য এবং আশাবাদী থাকতে হবে। রোগী এবং রোগীর পরিবার উভয়ের জন্য এই কথা প্রযোজ্য। থেরাপিগুলোর মধ্যে ধ্যান করা, যোগ ব্যায়াম করা বা অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করার বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া বিশেষজ্ঞদের সাথে এই বিষয়ে অবশ্যই কথা বলে পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডিডাসক্যালেইনোফোবিয়া: স্কুলে যাওয়ার ভয়
অনেক শিশুই স্কুলে যেতে কিছুটা ভয় পায় কিংবা স্কুলে যাওয়ার প্রতি থাকে অনীহা। স্কুলের নাম বললেই হাজারো অজুহাতের বুলি শুনতে মা-বাবাকে। তবে ব্যাপারটির মধ্যে সাধারণত অস্বাভাবিকতার কোনো ছাপ দেখা যায় না। হঠাৎ করে মা-বাবা এবং পরিবার থেকে আলাদা হয়ে কয়েক ঘণ্টা অপরিচিতদের ভিড়ে খাপ খাইয়ে নিতে সময় লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। সেজন্য মা-বাবাও এই বিষয়কে বিশেষ কোনো গুরুত্ব দেন না। সময়ের সাথে প্রাকৃতিকভাবেই এই সমস্যার সমাধান ঘটে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা তাদের। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরকমই হয়।
তবে কিছু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এই ক্ষণস্থায়ী ব্যাপারটা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। যে ভয়টা সময়ের সাথে আপনাআপনি কমে যাওয়ার কথা, তা দিন দিন বাড়তেই থাকে। দিন দিন এর প্রভাব একটি শিশুর শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও পরিলক্ষিত হয়। সাধারণ ভাষায় একে ‘স্কুল অ্যাভয়ডেন্স’, ‘স্কুল রিফিউজাল’ বা ‘স্কুল ফোবিয়া' বলে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ডিডাসক্যালেইনোফোবিয়া নামে পরিচিত। দুর্লভ এই ফেবিয়ায় আক্রান্ত বিশ্বের ২ থেকে ৫ শতাংশ শিশু। শব্দটি গ্রিক ‘ডিডাস্কো’ এবং ‘ফোবোস’ থেকে এসেছে। ‘ডিডাস্কো’ অর্থ শেখানো এবং ‘ফোবোস’ বলতে ভয় বা ঘৃণাকে বোঝানো হয়। এই ফোবিয়াকে বোঝানোর জন্য ‘স্কোলিওনোফোবিয়া’ শব্দটিও ব্যবহার করা হয়, যার উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ ‘স্কিয়াস’ থেকে। এর অর্থ ‘জানা’। যেসকল বাচ্চা এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত, তাদের মধ্যে স্কুল পলায়নের প্রবণতা বা এ নিয়ে টালবাহানার অভ্যাস দেখা যায়। সাধারণত অনেক শিশুই স্কুলের নাম শুনলে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। তবে ডিডাসক্যালেইনফোবিয়ায় আক্রান্ত কোনো শিশুর ক্ষেত্রে অবস্থাটি হয় বেশ বেগতিক। স্কুলের নাম শুনলেই তাদের প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে। মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ফোবিয়া চার থেকে ছয় বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে মূলত দেখা যায়, যারা সাধারণত প্রি-স্কুলের শিক্ষার্থী। এই ফোবিয়া শনাক্ত করা কিছুটা কষ্টসাধ্য। কারণ এত ছোট বাচ্চারা নিজেদের অনুভূতি ভালোমতো প্রকাশ করতে পারে না। আর প্রকাশ করলেও ভয়টি স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক, তা বোঝাও কষ্টকর।
কারণগুলো কী?
এর চিকিৎসা করার পূর্বে অবশ্যই একটি শিশুর জীবন, বিশেষ করে তার স্কুল জীবন সম্পর্কে ভালো করে জানতে হবে, একদম ছোটখাট বিষয়গুলোও। যেমন- বাচ্চাটি স্কুলে বা স্কুল বাসে কোনো হেনস্তার শিকার হচ্ছে কি না, স্কুলে যাওয়ার পথে সে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা সমস্যার সম্মুখীন হয় কি না, তার শিক্ষক এবং সহপাঠীদের ব্যবহার সম্পর্কেও জানতে হবে। সব বিষয় জানার পরই কেবলমাত্র একটি শিশুর ক্ষেত্রে তার এই ফোবিয়ার আসল কারণ জানা সম্ভব। অবশ্যই সবার ক্ষেত্রে এর কারণ এক হয় না।
৪-৬ বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয় অনেকসময় কাজ করে। তাদের মনে হয় স্কুলে চলে গেলে পরে হয়তো আর মা-বাবার সাথে দেখাই হবে না। কোনো নেতিবাচক বা কষ্টদায়ক ঘটনা, যেমন- মা-বাবার মধ্যে মনোমালিন্য বা বিবাহবিচ্ছেদ, কোনো আপনজনের মৃত্যু ইত্যাদি এই ফোবিয়ার প্রভাব আরও বাড়িয়ে দেয়। এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে তা মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যা পরবর্তীতে ফোবিয়ার আকার ধারণ করে।
মাঝে মাঝে ১৩-১৫ বছর বয়সী মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ডিডাসক্যালেইনোফোবিয়া দেখা যায়। হঠাৎ করে স্কুলে পড়ার চাপ বাড়লে বা কঠিন কোনো বিষয়, যেমন- গণিত, বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে বুঝতে সমস্যা হলে তা মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।
এই বয়সী কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটে। হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই তাদের বেশ ভুগতে হয়। এর মাঝে বাড়তি মানসিক চাপ আরো বেশি ক্ষতি করে।
তাছাড়া আরো কিছু ব্যাপার আছে। স্কুলের পরিবেশ নিরাপদ বা শিশুবান্ধব না হলে, যেমন- বুলিং, পড়া না পারলে কঠোর শাস্তি, স্কুলের সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তির বিপজ্জনক আচরণ বা এরকম কোনো ঘটনা শিশুর মধ্যে ডিডাসক্যালেইনোফোবিয়ার জন্ম দিতে পারে। আবার ঘন ঘন স্কুল পরিবর্তন করলে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ভালো না মন্দ তা, নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে তাদের মনে। যে সন্দেহ কখন যে ভয়, আর ভয় থেকে পরবর্তীতে এই ফোবিয়ার জন্ম দেয়, তা সেই শিশু নিজেও বুঝে উঠতে পারে না। কোনো ভীতিই আসলে একদিনে ফোবিয়ার আকার ধারণ করে না। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর এই সময়ের মধ্যে ভয়ের মূল বিষয়ের সাথে জড়িত ঘটনা ঘটলে তা দিন দিন আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
লক্ষণসমূহ
ডিডাসক্যালেইনোফোবিয়ায় আক্রান্ত একটি শিশুর ক্ষেত্রে কিছু শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন-
১. স্কুলে যাওয়ার কথা বললেই অস্বাভাবিকভাবে কান্নাকাটি করা, কারো কারো ক্ষেত্রে প্যানিক অ্যাটাকও দেখা যেতে পারে। অনেক সময় একজন ফোবিক কিশোর-কিশোরী বা শিশু স্কুলে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য সবসময় অসুস্থতার ভান করে কিংবা নিজেকে নিজেই ছোটখাট আঘাত করে, যার জের ধরে সে স্কুলে যাওয়া থেকে বাঁচতে পারবে বলে মনে করে। আবার অনেকে রাতভর ইচ্ছা করে কান্নাকাটি করে, যাতে করে তাদের মা-বাবা বিরক্ত কিংবা ক্লান্ত হয়ে যায় এবং স্কুলে যাওয়া না লাগে। শুধু তা-ই নয়, এসব ফোবিক শিশু সবসময়ই নিজেদের মা-বাবাকে অনেক বেশি জ্বালায়। এর পেছনে তাদের সরল যুক্তি হলো, এতে করে তাদের অভিভাবকেরা স্কুলে যেতে জোর করবেন না। তবে ফলাফল যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর উল্টো হয়, তা-ও আর নতুন করে কিছু বলার নেই!
২. ফোবিক শিশুরা বেশিরভাগ সময়েই নেতিবাচক চিন্তা করে, বিশেষ করে মৃত্যু সম্পর্কিত। আপনজন এবং মা-বাবার খারাপ কিছু হতে পারে, এরকম চিন্তা মন ও মস্তিষ্ককে অবশ করে দেয়। ফলে তারা এক লহমার জন্যও তাদের ছেড়ে যেতে চায় না। আর এই কম বয়সে মা-বাবা তাদের বাচ্চাদের স্কুল ছাড়া অন্য কোথাও এত বেশি সময়ের জন্য একা রাখে না। ফলস্বরূপ, ফোবিক শিশুর মনে স্কুলের প্রতি বিতৃষ্ণা এবং ক্ষোভ জন্মানোর বিষয়টা খুব অস্বাভাবিক নয়। অবশ্য এই অবস্থায় শুধু স্কুলের প্রতি ভয় নয়, বরং বাসায় একা থাকার বা অন্ধকারে থাকার মতো ভয়, কিংবা ভূতের ভয়ও তার মধ্যে কাজ করে।
৩. কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে অবশ্য সবসময় একরকম ব্যবহার দেখা যায় না। তারাও শিশুদের মতো নিজেদের ফোবিয়ার কথা কাউকে বলে না। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো তাদের কাছে বুঝিয়ে বলার ভাষা নেই আর কিশোর-কিশোরীদের সমস্যা হলো, তাদের বলার কোনো ইচ্ছা নেই। সেজন্য তারা সবকিছু এড়িয়ে চলা শুরু করে। স্কুলে যাওয়া নিয়ে টালবাহানা এক্ষেত্রে আরো তীব্র হয়। চেহারায় বিষণ্নতার ছাপও স্কুল ফোবিয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে।
৪. মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা, শুকনো মুখ, ঘন ঘন ঘামা, ঊর্ধ্বশ্বাস, বমি বমি ভাব এবং প্যানিক অ্যাটাকের মতো লক্ষণগুলো ডিডাসক্যালেইনোফোবিয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ কিছু শারীরিক পরিবর্তন।
প্রতিকার
কোনো ফোবিয়ারই আসলে স্থায়ী কোনো চিকিৎসা বা ঔষধ নেই। তবে যতটা সম্ভব একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
যদি আপনি কোনো ফোবিক শিশুর অভিভাবক হন, তাহলে অবশ্যই আপনাকে আপনার বাচ্চার প্রতি নমনীয় হতে হবে এবং খুব সতর্কতার সাথে ব্যাপারটা বুঝতে হবে।
একটি ইতিবাচক দিক হলো, বড়দের তুলনায় শিশু বা কমবয়সীদের মধ্যে নতুন কোনো চিন্তাধারা বা অভ্যাস গড়ে তোলা সহজতর। প্রাপ্তবয়স্ক হতে হতে তারা তাদের ফোবিয়া ভুলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সুযোগও পেতে পারে। সেজন্য মা-বাবা এবং আপনজনদের অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। শিশুরা যেন মন খুলে তাদের সমস্যা বলতে পারে সেরকম বন্ধুসুলভ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঔষধ গ্রহণেরও প্রয়োজন হয়। তবে অবশ্যই তা ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞদের কথা মতো সেবন করতে হবে। অবশ্য বিশেষজ্ঞের মতে, ঔষধ সেবনের বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন এরকম ঔষধ খাওয়া ইতিবাচক নয়। মা-বাবা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং আশেপাশের লোকজন সচেতন হলে একটি শিশুকে এই ফোবিয়ার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব।
ঘুমাতে ভয়! আপনি কি হিপনোফোবিয়ায় আক্রান্ত?
ঘুমাতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ বা প্রাণীকূল খুঁজে পাওয়া দুর্লভ বটে, কিন্তু এমন অনেক দুর্ভাগ্যবান ব্যক্তি আছেন যারা কিনা ঘুমাতেই অত্যাধিক মাত্রায় ভয় পান। হ্যাঁ, এটা একধরনের রোগ। ঘুমের অনেক অসুখের মাঝে এই রোগটির নাম অন্তর্ভূক্ত। মেডিকেল টার্মে এই অসুখটি ‘হিপনোফোবিয়া’ নামেই পরিচিত। এছাড়াও এই রোগটিকে কোথাও কোথাও ক্লিনোফোবিয়া বা ওম্নিফোবিয়া নামেও নামকরণ করা হয়েছে।
নামকরণ বা উৎপত্তি
হিপনোফোবিয়া (Hypnophobia) নামটি এসেছে গ্রিক শব্দ হাপনোস (Hupnos) এবং ফোবোস (Phobos) থেকে। গ্রিক ভাষায় হিপনোস শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘ঘুম’ এবং ফোবোস বা ফোবিয়া (Phobia) শব্দের অর্থ ‘ভয়’। গ্রিকদের ঘুমের দেবতাকে ডাকা হয় হিপনোস (Hypnos) নামে।
হিপনোফোবিয়া কেন হয়ে থাকে?
ঠিক কী কারণে অযাচিতভাবে মানুষ ঘুমাতে আতঙ্কগ্রস্ত হয় তা বলা কঠিন। তবে ধারণা করা হয়, আত্মরক্ষার প্রস্তুতি থেকেই মনের অগোচরে বাসা বাঁধে এই রোগ। অনেকের ক্ষেত্রে আবার সিনেমায় ভয়ঙ্কর কোনো দৃশ্য (বিশেষত ভুতুড়ে সিনেমার দৃশ্য) মনে গেঁথে গেলে অথবা ঘনিষ্ঠজনের সাথে ঘটে যাওয়া কোনো দুঃখজনক স্মৃতির সাক্ষী হয়ে থাকলে বা শৈশব (বিশেষত শৈশবের কোনো শারীরিক নিপীড়নের ঘটনা) অথবা জীবনের যেকোনো মুহূর্তে কোনো কারণে ভয় পাওয়ার নিদারূণ ঘটনা মনে গেঁথে থাকলে এসব ঘটনা আড়ালে-আবডালে ঘুমের সংশ্লিষ্টতায় ব্যাঘাত ঘটার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অবচেতন মন তখন সব কিছুতেই তৈরি করে নেয় একধরনের আতংক বা ফোবিয়া, যা থেকে হিপনোফোবিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। অনেকক্ষেত্রে আবার এই রোগের উৎপত্তিগত কারণ হিসেবে বংশানুক্রমিক বা জেনেটিক কারণকেও নির্দেশ করা হয়ে থাকে।
হিপনোফোবিয়া আক্রান্তের লক্ষণ
হিপনোফোবিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের লক্ষণসমূহ চলুন জেনে নেয়া যাক-
১) অত্যাধিক মাত্রায় দুশ্চিন্তা এবং ভয়
২) শ্বাসের স্বল্পতা বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
৩) দ্রুত শ্বাস টানা
৪) হৃদযন্ত্রের অতিরিক্ত স্পন্দন
৫) মাত্রাতিরিক্ত ঘাম
৬) বিতৃষ্ণাবোধ
৭) মুখ শুকিয়ে যাওয়া
৮) মনোযোগের অভাব
৯) বাকযন্ত্রের আড়ষ্টতা
১০) মানসিক অস্থিরতা
১১) খিঁচুনি
১২) শরীর শক্তিশূন্য মনে হওয়া
১৩) সর্বদা আতঙ্কগ্রস্ততা
১৪) অনুভূতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা
১৫) মাথাব্যথা
১৬) সবকিছুতে বিরক্তি ভাব
১৭) ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রা
১৮) ঘুমের মাঝে হাঁটা
১৯) অবচেতন মনে বিছানা ভিজিয়ে ফেলা
তবে ব্যক্তিবিশেষে রোগের লক্ষণ পাল্টে যেতে পারে। যেহেতু এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি, সে কারণে এই রোগের সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে কিছুটা দ্বন্দ্ব থেকেই যায়। চলুন জেনে আসি কী কী উপায়ে এই রোগ থেকে মুক্তি ঘটতে পারে।
হিপনোফোবিয়া আক্রান্ত হওয়ার ক্ষতিকর দিকসমূহ
যেহেতু হিপনোফোবিয়া একটি মানসিক সমস্যা, তাই এক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, সময়মতো এই রোগ না সারালে সারাজীবন ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করাই ভবিতব্য বলে ধরে নেওয়া যায়। এই রোগের ক্ষতিকারক দিক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় যে, এতে পারিবারিক অশান্তি ও সম্পর্কহানি পর্যন্ত ঘটতে পারে। সর্বোপরি, এক অসুখী জীবন, স্বাস্থ্যহানী, মনোসংযোগের অভাবও দেখা দেয়।
তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, হিপনোফোবিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সঠিক সময়ে চিকিৎসা করালে ৭০-৯০ ভাগ রোগী পুরোপুরিভাবেই সুস্থ হয়ে যায়। তাই এক্ষেত্রে খুব দ্রুত চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। চিকিৎসার বিলম্ব যতই ঘটবে, ততই নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হওয়ার আশংকা বেড়ে যেতে থাকে। সাধারণত নবযৌবন বা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। নানা সমীক্ষায় প্রমাণ মেলে, মহিলাদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার পুরুষদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
সমাজের যেকোনো স্তরের মানুষই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে রোগের উপসর্গের মাঝে পার্থক্য থাকতেই পারে। ভয় রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সব সময় সিটিয়ে থাকে। বিশেষ করে কোনো কারণ ছাড়াই উদ্ভ্রান্তের মতো একের পর এক ভয় তাকে আক্রমণ করতে পারে এই ভেবেই মানুষ চিন্তামগ্ন দিনযাপন করে। এই ভয় পাওয়ার অনুভূতি মানুষের মধ্যে অধিকাংশ সময়ই অবস্থান করে ও তার জীবনকে নষ্ট করে দেয়। অতীতে কোনো এক পরিস্থিতিতে ভয় পেয়ে থাকলে সেই পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে স্বাভাবিকভাবেই কমবেশি সকলের গায়েই কাঁটা দিতেই পারে। কিন্তু এ ধরনের ভয় থেকে মনের অগোচরে তৈরি হয় একধরনের আতংক।
মহিলাদের হিপনোফোবিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি; Source: curemysleepapnea.com
যাদের মধ্যে আতঙ্ক বা ভয়-রোগ রয়েছে তারা যে ধরনের পরিস্থিতিতে ভয় পায় সেসব পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি প্রায়ই এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। ফলে তাদের জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় এ থেকে নানা সামাজিক বিপত্তিও ঘটে যেতে পারে। শুধুমাত্র ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ততার কারণে অনেকে কর্মস্থলেও পিছিয়ে থাকে, ফলে ভালো কর্মীও হতে পারে না। মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও অবচেতন মনে অস্বাভাবিক ধরনের হয়ে থাকে। ভয়ের কারণে মানুষের ঘুমের সমস্যা তো এক প্রধান সমস্যা হয় বটেই, তাই রাতে জেগে থাকতে বাধ্য হতে হতে একসময় তৈরি হয় নানা মানসিক সমস্যা।
ভয়সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত অনেকেই তাদের রোগের উপসর্গ নিয়ে খুব চিন্তায় থাকেন। এমনকি ডাক্তার যদি আশ্বস্ত করে যে, এসব উপসর্গ মারাত্মক কিছু নয় তবুও তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ততায় দিন কাটান। অনেক ক্ষেত্রে অকারণে নিজেদের হার্টের রোগী, নিউরোলজিক্যাল রোগী বা কোনো মারাত্মক খারাপ অসুখের রোগী মনে করে ভয় পায় এবং প্রায়ই ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য ছুটে যান। অনেকে আবার বারবার ডাক্তার পাল্টিয়ে যাচাই করার মানসিকতা দেখিয়ে থাকেন এবং রোগ নির্ণয়ের জন্য কতগুলো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বারবার করাতেই থাকেন। আসলে এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই, তবে এতে করে রোগী সাময়িকভাবে মানসিক সান্ত্বনা খুঁজে পেতেও পারেন।
ভয় বা আতংক থেকে মানুষ তার বাস্তব জ্ঞান হারিয়ে ফেলে বা নিজের প্রতি আস্থা এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ভয়ের উপসর্গগুলো সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। উপসর্গগুলো আস্তে আস্তে বিলীন হওয়ার জন্য ঘণ্টাখানেক বা বছরের পর বছর সময়ও লাগতে পারে। যারা ভয়ের কারণে ঘুমাতে পারেন না তারা সবসময় তাদের ভেতরের অসহ্য অস্থিরতার কথা প্রকাশ করে থাকে। অনেক সময় তারা পাগলাটে ধরনের আচরণ করে থাকে।
প্রচন্ড মানসিক চাপের দরূণ ভয় সৃষ্টি হওয়া বা কোনো মারাত্মক দুর্ঘটনা, অসুস্থতা প্রভৃতি কারণেও অনেকে এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তাছাড়া অতিরিক্ত চা-কফি খাওয়া, কোকেন বা অন্য কোনো উত্তেজক ওষুধ অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলেও ভয়ের সৃষ্টি হতে পারে। ভয় মানুষকে হতভম্ব করে দেয়।
এর ক্ষতিকর প্রভাব কী বা কতটুকু তা আগে থেকে বলা কঠিন। যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়নি তারা অনেক সময় মনে করে যে, ভয় হচ্ছে কোনো বিষয়ে নার্ভাস বা উদ্বিগ্ন হওয়া, যা কম-বেশি সবার ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। অনেক সময় কেউ ভয় পেলে তার মনের ভেতরে যেসব অস্থিরতা দেখা দেয় বাইরে থেকে তা বোঝা কঠিন।
সাধারণত যারা খুব অল্প সময় ভয়ে আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত তাদের জীবনে এর মারাত্মক কোনো প্রভাব পড়ে না। কিন্তু যারা বারবার ভয়ে আক্রান্ত হয় এবং এ থেকে ঘুমাতে পর্যন্ত পারে না তাদের জীবনে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। পরিবারের কোনো এক সদস্যও যদি হিপনোফোবিয়া আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে পরিবারের অন্যদের জন্যও এটি দুঃখের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। রোগীর চিকিৎসার জন্য পরিবারের অন্য সদস্যদের সদয় দৃষ্টি দেওয়া খুব প্রয়োজন এবং সময়মতো রোগীকে একবার অন্তত মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।
তাছাড়া অনেক সময় সাময়িক চিকিৎসা এবং থেরাপিস্টের পরামর্শেও উপকার পাওয়া যায় বৈকি, তবে এক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক রোগীকে তার নিকটজনের সময় দেয়াটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভয়রোগের উত্তম চিকিৎসা হলো রোগী যেসব অবস্থা বা পরিস্থিতিকে ভয় পায় তার সঠিক অনুসন্ধান করে সেসব পরিস্থিতিতে তাকে নিয়ে যাওয়া এবং তার ভুল ভাঙ্গানোর চেষ্টা করা। পরিবারের কাছের মানুষেরাই এ কাজটি করতে পারে। একমাত্র রোগীর কাছের মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টাই পারে এমন ভয়রোগে আক্রান্ত রোগীকে পুরোপুরিভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।
চিকিৎসা পদ্ধতি
হিপনোফোবিয়া থেকে মুক্তি পেতে কাউন্সেলিং খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সমাধান। তবে সমস্যা হলো এই পদ্ধতি সময় সাপেক্ষ হওয়াতে রোগীকে দীর্ঘদিন যাবত আতঙ্কে সময় কাটাতে হওয়ার ভোগান্তিতে ভুগতে হয়। বেশিরভাগ থেরাপি বলতে গেলে সময়সাপেক্ষ। তাই বলে চিকিৎসা পদ্ধতির অবদান কিন্তু থেমে নেই। পদ্ধতিগুলোর মাঝে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-
১) কগনিটিভ থেরাপি (Cognitive Therapy or CT)
২) কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (Cognitive Behavior Therapy)
৩) হ্যাবিট স্ট্রাটিজিস টু রিল্যাক্স (Habit Strategies to Relax)
৪) ইন ভিভো এক্সপোজার (In Vivo Exposure)
৫) রেস্পন্স প্রিভেনশান (Response Prevention)
৬) হিপনোথেরাপি
৭) গ্রুপ থেরাপি
৮) সাইকো থেরাপি
৯) এনার্জি সাইকোলজি
১০) পথ্য (Medication) এবং
১১) মেডিটেশান বা ধ্যান
ক্যাটসারিডাফোবিয়া: তেলাপোকা ভীতির খুঁটিনাটি
তেলাপোকা ভয় পাওয়া খুব সাধারণ একটি বিষয়। পৃথিবীতে যত প্রজাতির তেলাপোকা রয়েছে, তার মাত্র এক শতাংশই মানুষের সঙ্গে বসবাস করে। এরা সরাসরি কোনো রোগ বিস্তার করে না বা মানুষের খুব বড় ধরনের কোনো ক্ষতিও করে না। তা সত্ত্বেও মানুষ সচরাচর যেসব ফোবিয়া বা ভীতিতে ভুগে থাকে, তেলাপোকা-ভীতি বা ক্যাটসারিডাফোবিয়া তার মধ্যে অন্যতম। পূর্বে এটিকে এনটোমোফোবিয়া বা পোকামাকড়-ভীতির মধ্যেই ধরা হতো। পরবর্তীতে এটিকে আলাদা করে ‘ক্যাটসারিডাফোবিয়া’ নাম দেওয়া হয়।
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিং এর ইকোলজি বিষয়ের অধ্যাপক জেফ্রি লকউড তেলাপোকা-ভীতি প্রসঙ্গে বলেন, “ভয় ও বিরক্তি মানুষের দুটি সার্বজনীন নেতিবাচক আবেগ। এর একটি তাৎক্ষণিক বিপদ নির্দেশ করে আর অপরটি রোগবালাই বা দূষণের সম্ভাবনার সংকেত দেয়।” তার মতে, তেলাপোকা মানুষের মনে বিরক্তি ও ভয়- দুটি অনুভূতিকেই সক্রিয় করে তোলে। এর শরীরের তৈলাক্ত, চটচটে ভাব, রাতের আঁধারে গায়ের ওপর হেঁটে বেড়ানো কিংবা ভুলবশত পায়ের নিচে চাপা পড়ার ফলে বেরিয়ে আসা ইউরিক অ্যাসিডের দুর্গন্ধ স্বাভাবিকভাবেই বিরক্তি জাগায়। অপরদিকে হরর ছবির ভূতুড়ে কোনো চরিত্রের মতো দ্রুততার সঙ্গে উড়ে বেড়ানো, মানুষেরই ঘরে গোপনে বাস করে হঠাৎ হঠাৎ দেখা দেওয়া কিংবা তার অদ্ভুতুড়ে পা ও অ্যান্টেনার গঠন মানুষের মনে রহস্য ও ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে। তেলাপোকার প্রতি মানুষের মনে ভয়মিশ্রিত ঘৃণার এটিই হয়তো মূল কারণ। তবে এটি কেবল স্বাভাবিক একটি প্রতিক্রিয়া, কোনো ফোবিয়া নয়।
তেলাপোকা-ভীতি বা ‘ক্যাটসারিডাফোবিয়া’ শব্দটি সেক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাবে, যখন একজন ব্যক্তি তেলাপোকার প্রতি দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক ধরনের ভয় পোষণ করে, এবং এই ভয়ের ফলে তার মারাত্মক শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারেন যে, তেলাপোকা মোটামুটি নিরীহ ধরণের প্রাণী এবং এটি মানুষের জন্য বড় কোনো হুমকি বয়ে নিয়ে আসে না। এমনকি তারা তাদের এই ভীতি নিয়ে বিব্রতও বোধ করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা তাদের মনে উদ্ভূত ভয় এবং উদ্বেগ এড়িয়ে যেতে পারেন না।
ক্যাটসারিডাফোবিয়ার কারণ
বিবর্তনগত কারণ: রাতে বা অন্ধকার পরিবেশে এটি বেরিয়ে এসে শরীরের ওপর হেঁটে বেড়ালে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের শিরশিরে অনুভূতি হয়, যার ফলে আমরা ভয় বা বিরক্তি অনুভব করি। এই অনুভূতিটি বিবর্তনগতভাবে আমাদের মধ্যে এসেছে। প্রাগৈতিহাসিক কালে আমাদের পূর্বপুরুষগণ যখন গুহায় বাস করতেন, তখন তাদেরকে সবসময় এ জাতীয় পোকামাকড়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হতো। সেই থেকেই মানুষের মনে কীটপতঙ্গের প্রতি একধরনের আতঙ্ক জন্ম নিয়েছে।
শৈশবের নেতিবাচক স্মৃতি: সাধারণত উষ্ণ ও
তেলাপোকা ভয় পাওয়া খুব সাধারণ একটি বিষয়। পৃথিবীতে যত প্রজাতির তেলাপোকা রয়েছে, তার মাত্র এক শতাংশই মানুষের সঙ্গে বসবাস করে। এরা সরাসরি কোনো রোগ বিস্তার করে না বা মানুষের খুব বড় ধরনের কোনো ক্ষতিও করে না। তা সত্ত্বেও মানুষ সচরাচর যেসব ফোবিয়া বা ভীতিতে ভুগে থাকে, তেলাপোকা-ভীতি বা ক্যাটসারিডাফোবিয়া তার মধ্যে অন্যতম। পূর্বে এটিকে এনটোমোফোবিয়া বা পোকামাকড়-ভীতির মধ্যেই ধরা হতো। পরবর্তীতে এটিকে আলাদা করে ‘ক্যাটসারিডাফোবিয়া’ নাম দেওয়া হয়।
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিং এর ইকোলজি বিষয়ের অধ্যাপক জেফ্রি লকউড তেলাপোকা-ভীতি প্রসঙ্গে বলেন, “ভয় ও বিরক্তি মানুষের দুটি সার্বজনীন নেতিবাচক আবেগ। এর একটি তাৎক্ষণিক বিপদ নির্দেশ করে আর অপরটি রোগবালাই বা দূষণের সম্ভাবনার সংকেত দেয়।” তার মতে, তেলাপোকা মানুষের মনে বিরক্তি ও ভয়- দুটি অনুভূতিকেই সক্রিয় করে তোলে। এর শরীরের তৈলাক্ত, চটচটে ভাব, রাতের আঁধারে গায়ের ওপর হেঁটে বেড়ানো কিংবা ভুলবশত পায়ের নিচে চাপা পড়ার ফলে বেরিয়ে আসা ইউরিক অ্যাসিডের দুর্গন্ধ স্বাভাবিকভাবেই বিরক্তি জাগায়। অপরদিকে হরর ছবির ভূতুড়ে কোনো চরিত্রের মতো দ্রুততার সঙ্গে উড়ে বেড়ানো, মানুষেরই ঘরে গোপনে বাস করে হঠাৎ হঠাৎ দেখা দেওয়া কিংবা তার অদ্ভুতুড়ে পা ও অ্যান্টেনার গঠন মানুষের মনে রহস্য ও ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে। তেলাপোকার প্রতি মানুষের মনে ভয়মিশ্রিত ঘৃণার এটিই হয়তো মূল কারণ। তবে এটি কেবল স্বাভাবিক একটি প্রতিক্রিয়া, কোনো ফোবিয়া নয়।
তেলাপোকা-ভীতি বা ‘ক্যাটসারিডাফোবিয়া’ শব্দটি সেক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাবে, যখন একজন ব্যক্তি তেলাপোকার প্রতি দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক ধরনের ভয় পোষণ করে, এবং এই ভয়ের ফলে তার মারাত্মক শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারেন যে, তেলাপোকা মোটামুটি নিরীহ ধরণের প্রাণী এবং এটি মানুষের জন্য বড় কোনো হুমকি বয়ে নিয়ে আসে না। এমনকি তারা তাদের এই ভীতি নিয়ে বিব্রতও বোধ করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা তাদের মনে উদ্ভূত ভয় এবং উদ্বেগ এড়িয়ে যেতে পারেন না।
ক্যাটসারিডাফোবিয়ার কারণ
বিবর্তনগত কারণ: রাতে বা অন্ধকার পরিবেশে এটি বেরিয়ে এসে শরীরের ওপর হেঁটে বেড়ালে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের শিরশিরে অনুভূতি হয়, যার ফলে আমরা ভয় বা বিরক্তি অনুভব করি। এই অনুভূতিটি বিবর্তনগতভাবে আমাদের মধ্যে এসেছে। প্রাগৈতিহাসিক কালে আমাদের পূর্বপুরুষগণ যখন গুহায় বাস করতেন, তখন তাদেরকে সবসময় এ জাতীয় পোকামাকড়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হতো। সেই থেকেই মানুষের মনে কীটপতঙ্গের প্রতি একধরনের আতঙ্ক জন্ম নিয়েছে।
শৈশবের নেতিবাচক স্মৃতি: সাধারণত উষ্ণ ও অন্ধকার জায়গায় তেলাপোকা লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। ছোটবেলায় যাদেরকে এমন অন্ধকার ঘর বা আলমারির ভেতর বন্দী করে রেখে শাস্তি দেওয়া হয় যেখানে তেলাপোকার বসবাস রয়েছে, তাদের মনে বড় হওয়ার পরেও সেটির বিরূপ প্রভাব থেকে যায় এবং সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ তাদের মনে তেলাপোকা-ভীতি তৈরি হতে পারে।
আশেপাশের বড়দেরকে তেলাপোকা ভয় পেতে দেখলে অনেক সময় ছোটরাও তেলাপোকাকে ভয় পেতে শুরু করে।
তেলাপোকা নিজে সরাসরি কোনো রোগের জন্যে দায়ী না হলেও এটি বিভিন্ন রোগের বিস্তারে সাহায্য করতে পারে। এই ক্ষতিকারক প্রভাবের কারণেও মানুষের মনে তেলাপোকা নিয়ে শংকা জাগতে পারে।
তেলাপোকার পচা-বাসী খাবার খাওয়ার নোংরা স্বভাব কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার অকল্পনীয় ক্ষমতাও মানুষের মনে ভয়ের উদ্রেক করতে পারে।
তেলাপোকা কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে?
খাদ্যদ্রব্য ঢেকে না রাখলে তেলাপোকা তাতে আক্রমণ করে। খাওয়ার সময় এরা মুখ থেকে লালা এবং হজমে সহায়ক তরল পদার্থ উদগিরণ করে। ফলে তেলাপোকার অন্ত্রে বসবাসকারী জীবাণুসমূহ খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। Pseudomonas aeruginosa নামক ব্যাকটেরিয়া তেলাপোকার অন্ত্রে ব্যাপকভাবে বংশবিস্তার করতে সক্ষম। এই ব্যাকটেরিয়া মানবদেহে মূত্রনালীর সংক্রমণ, হজমে গোলযোগ এবং রক্তদূষণ ঘটাতে পারে। এছাড়া খাদ্যে বিষক্রিয়া ও টাইফয়েড রোগের জন্যে দায়ী Salmonella ব্যাকটেরিয়াও তেলাপোকার মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
তেলাপোকা সর্বভুক প্রাণী। গাছ ও প্রাণীর মৃতদেহ, বিষ্ঠা, সাবান, আঠা, কাগজ, চামড়া, চুল ইত্যাদি এমন কিছু হয়তো নেই, যা তারা খায় না। ফলে এরা শুধু খাবারে মুখ দিলেই নয়, খাবারের ওপর মল ত্যাগ করলেও খাবার দূষিত হতে পারে। সাধারণভাবে তেলাপোকার কামড়ানোর প্রবণতা কম, তবে হাত-পায়ের আঙুল বা নরম চামড়ায় এটি কামড় দিতে পারে। এছাড়া গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ব্যক্তির নাক বা কানের ফুটো দিয়ে ছোট আকৃতির তেলাপোকা ঢুকে যেতে পারে। তেলাপোকার লালা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জেন রয়েছে, যা মানুষের শরীরে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং যার ফলে হাঁপানি রোগীদের হাঁপানির আক্রমণের প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।
কখন বুঝবেন, ক্যাটসারিডাফোবিয়ায় ভুগছেন?
এই ফোবিয়ার লক্ষণগুলো একেকজনের ব্যক্তিত্ব ও মানসিক অবস্থা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা দিতে পারে। কারো হয়তো সামনাসামনি তেলাপোকা দেখলে ভয় হয়, আবার কেউ হয়তো তেলাপোকার ছবিও দেখলে ভয় পান। খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে ক্যাটসারিডাফোবিয়ার লক্ষণ হচ্ছে, তেলাপোকাকে প্রচণ্ড ভয় পাওয়া এবং তেলাপোকা আছে, এমন কোনো পরিবেশে থাকতে উদ্বেগ বা অস্বস্তি বোধ করা।
এছাড়া যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে, তা হলো-
তেলাপোকা দেখলে ভয়ে স্থির হয়ে যাওয়া, নড়াচড়া করতে না পারা।
চিৎকার-চেঁচামেচি বা কান্না করা।
অনেক সময় ‘অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারে’র অংশ হিসেবে ক্যাটসারিডাফোবিয়া দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ব্যক্তির মধ্যে তেলাপোকা দূর করার জন্যে ঘরের ভেতর বারবার কীটনাশক স্প্রে করা, কার্পেট ঝাড়া ও মোছা, রান্নাঘর ও স্নানঘর পরিস্কার করার অস্বাভাবিক প্রবণতা দেখা দেয়।
অতিরিক্ত ভয় বা উদ্বেগের কারণে প্যানিক অ্যাটাক হওয়া, যার লক্ষণসমূহ হচ্ছে- মাথা ঝিমঝিম করা, হাঁটু অবশ বোধ হওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাসে কষ্ট হওয়া, দুর্বল বোধ করা, বুকে ব্যথা হওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
কীভাবে তেলাপোকা-ভীতি কাটিয়ে ওঠা যায়?
যেকোনো ভীতি দূর করতে হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রথমেই সেই ভয়ের মুখোমুখি হওয়ার মতো সাহস অর্জন করতে হবে। তিনি নিজে ভয় কাটিয়ে উঠতে ইচ্ছুক হলে একজন থেরাপিস্ট বা বিশ্বস্ত কোনো বন্ধু তাকে এ ব্যাপারে সহায়তা করতে পারেন। তেলাপোকা ভীতি সারাতে মনোচিকিৎসা অনেকাংশেই সফল হয়। চিকিৎসার অংশ হিসেবে বিভিন্ন থেরাপির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তবে সকল রকমের চিকিৎসা কেবলমাত্র চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই করতে হবে।
সিস্টেমিক ডিসেনসিটাইজেশন: এই থেরাপির ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তার ভয়ের সম্মুখীন করা হয়। তেলাপোকার ছবি দেখানো থেকে শুরু করে দূর থেকে জীবন্ত তেলাপোকা দেখা, মৃত তেলাপোকা স্পর্শ করা, তেলাপোকার সাথে একা একটি ঘরে থাকা, জীবন্ত তেলাপোকা স্পর্শ করা- এসবের মাধ্যমে ধীরে ধীরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তেলাপোকার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলা হয়।
কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি: এই থেরাপি ভয়ের সেই নির্দিষ্ট বস্তুটির (অর্থাৎ তেলাপোকা) ব্যাপারে আক্রান্ত ব্যক্তির নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণার পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে ভয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
নিউরো-লিংগুইস্টিক প্রোগ্রামিং: এ পদ্ধতিতে প্রথমে ভয়ের প্রকৃত কারণ সনাক্ত করা হয় এবং পরে সাইকোথেরাপি, আত্মউন্নয়ন, শিথিলায়ন প্রভৃতি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির আচরণে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়।
ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি থেরাপি: এই পদ্ধতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ভার্চুয়াল পর্দায় তার ভয়ের সম্মুখীন করে ভয় কাটানোর চেষ্টা করা হয়।
তেলাপোকার উপস্থিতিতে যাদের তীব্র ভয় এবং প্যানিক অ্যাটাক দেখা দেয়, তাদের চিকিৎসায় ঔষধও প্রয়োগ করতে হতে পারে।
কারো তেলাপোকা-ভীতি থাকুক বা না থাকুক, বাড়িতে তেলাপোকা থাকা মোটেও ভাল কোনো ব্যাপার নয়। তাই ঘরে তেলাপোকার আনাগোনা বন্ধ করতে নিচের উপায়গুলো অবলম্বন করা যেতে পারে–
ঘর সবসময় পরিস্কার রাখুন। তেলাপোকারা দল বেঁধে ঘরের অন্ধকার, স্যাঁতসেতে ও উষ্ণ কোণে লুকিয়ে থাকে। রান্নাঘর, শৌচাগার এবং খাওয়ার ঘরেই এদের বেশি দেখা যায়। এরা বিশেষত উচ্ছিষ্ট, তৈলাক্ত খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাই চুলার আশপাশের অংশ, খাওয়ার টেবিল ও ঘরের মেঝে সবসময় মুছে পরিস্কার রাখুন। রাতে ঘুমানোর আগে সিংকে জমা হওয়া নোংরা তৈজসপত্র ধুয়ে ফেলুন। ময়লার ঝুড়ি সবসময় ঢেকে রাখুন এবং প্রতি রাতে তা খালি করে ফেলুন। সপ্তাহে অন্তত একবার রেফ্রিজারেটর পরিষ্কার করুন।
খাবারের দূষণ এড়াতে হলে খোলা অবস্থায় খাবার ফেলে রাখবেন না।
দেয়ালে তৈরি হওয়া ছিদ্র বা ফাটলের মধ্য দিয়ে সহজেই ঘরে তেলাপোকা প্রবেশ করতে পারে। তাই যেকোনো ছিদ্র বা চিড় চোখে পড়ামাত্রই তা বন্ধ করে দিন।
পুরনো খবরের কাগজ, বই ও ম্যাগাজিনের স্তূপ খোলামেলা জায়গায় সংরক্ষণ করুন।
ভেজা, স্যাঁতসেতে পরিবেশ তেলাপোকার বেশ পছন্দ। সুতরাং তেলাপোকা থেকে রেহাই পেতে বাড়ির পানি প্রবাহের পথে কোনো ত্রুটি থাকলে তা সারিয়ে নিন। সিংকে পানি জমিয়ে রাখবেন না এবং ঘরের ভেতর টবে গাছ থাকলে তাতে অতিরিক্ত পানি দেবেন না।
গরম পরিবেশে তেলাপোকারা বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাই ঘরবাড়ি যথাসম্ভব ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করুন।
বাজারে তেলাপোকা নিধনের জন্যে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক পাওয়া যায়, সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন। ঘরের ভেতর বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করতে না চাইলে সরাসরি তেলাপোকার গায়ে সাবান-পানির মিশ্রণ তৈরি করে তা স্প্রে করলেও পোকা মারা যাবে। এছাড়া তিন ভাগ বোরিক অ্যাসিড ও এক ভাগ গুঁড়ো চিনির মিশ্রণ তৈরি করে তেলাপোকার চলাচলের জায়গায় টোপ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন।
মোবাইলে আসক্তির নতুন নাম নোমোফোবিয়া
আর দশটা মানুষের মত বর্তমান সময়ে আপনার হাতেও একটি মোবাইল ফোন থাকাটা স্বাভাবিক। তবে আপনার মোবাইল ফোনের সাথে যদি নিজেকে মানসিকভাবে জড়িয়ে ফেলেন তাহলে ব্যাপারটা আর স্বাভাবিক থাকে না। মোবাইল ফোনের সাথে এর ব্যবহারকারীর এই যে অতিমাত্রায় মানসিক সংযোগ, মানসিক চিকিৎসকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘নোমোফোবিয়া’।
নোমোফোবিয়া শব্দটি এসেছে নো (NO), মো (MOBILE) এবং ফোবিয়া (PHOBIA) থেকে। যেটাকে একসাথে করলে হয় মোবাইল ফোন নেই- এমন ফোবিয়া। বর্তমানে পৃথিবীতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সাধারণ মোবাইল ফোনের পাশাপাশি বেড়ে চলেছে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণানুসারে, বর্তমানে শুধু আমেরিকার মোট জনসংখ্যারই ৯০ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, যাদের ৫০ শতাংশ হল স্মার্টফোন ব্যবহারকারী। এছাড়া পৃথিবীতে প্রায় ৬.৮ বিলিয়ন মোবাইল ফোন গ্রাহক রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক তো খুব সাধারণ একটি অ্যাপ। আর দশটা অ্যাপের মত। কিন্তু বর্তমানে ফেসবুক ছাড়া আমাদের একটা মিনিটও চলে না। কোনো অ্যাপ নয়, এটি যেন আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। ঠিক একইভাবে, মোবাইল ছাড়াও বর্তমানে মানুষ নিজের জীবনকে ভাবতে পারে না। মোবাইল কাছে নেই বা মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছে- এটাও অনেকের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
মোবাইল ফোন অত্যন্ত দরকারি একটি জিনিস। সেটি নষ্ট হলে বা না থাকলে মানসিকভাবে একটু চিন্তায় পড়তেই পারেন আপনি। কিন্তু তাই বলে সেটা মাত্রা ছাড়াবে এমন তো নয়। তবে কারো ক্ষেত্রে যদি ব্যাপারটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে, সেটাকে আর স্বাভাবিক বলা যায় না। তখন এই মানসিক সমস্যাকে নোমোফোবিয়া বলে। বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ফোবিয়া বা ভীতি বেশি দেখতে পাওয়া যায়। ফোন না থাকার ভীতি বা নোমোফোবিয়ায় এমন অনেক কিছু ঘটে যা খুব বেশি বড় আর চোখে পড়ার মত না হলেও, একটু একটু করে মানসিক নানাবিধ সমস্যা তৈরি করে।
নোমোফোবিয়ার উপসর্গ
নোমোফোবিয়ার উপসর্গগুলো খুব সাধারণ। বিশেষ করে, বর্তমানে আমাদের মধ্যে ব্যাপারগুলো এত সহজভাবে মিশে গিয়েছে যে, এগুলোকে আর আলাদা করে কিছু মনে হয় না। বরং অনেক বেশি স্বাভাবিক মনে হয়। এই যেমন ধরুন, আপনি খাচ্ছেন বা রাস্তায় হাঁটছেন। হঠাৎ আপনার মনে হল পকেটের ফোনটা হয়তো বেজে উঠেছে। কিন্তু ফোন হাতে নিয়ে দেখলেন, না! কেউই ফোন করেনি আপনাকে। এই যে ছোট্ট আর অতি সামান্য ঘটনাটি ঘটে গেল আপনার সাথে এটিও কিন্তু নোমোফোবিয়ারই অংশ!
এছাড়াও নোমোফোবিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে বেশ কিছু উপসর্গ দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলো হলো-
১। মোবাইলের কাছ থেকে দূরে থাকলে চিন্তিত হয়ে পড়া, অস্থিরতায় ভোগা।
২। কোনো কাজে বা কারো কথায় মন না দিতে পারা। একটু পরপর ফোন হাতে নিয়ে দেখা কেউ কল দিল কিনা বা বার্তা পাঠালো কিনা।
৩। সেলফোন ভাইব্রেশন সিনড্রোম বা মোবাইলের কম্পন বারবার অনুভব করা।
৪। ফোন না থাকলে নিজেকে একা মনে হওয়া, হতাশ হয়ে পড়া।
ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাট স্কুল অব মেডিসিনের মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক ডক্টর ডেভিড গ্রিনফিল্ডের মতে, মোবাইল ব্যবহারকারীদের মস্তিষ্কে ডোপামিনের স্বাভাবিক পরিমাণ কমে যায়। ডোপামিন মানুষকে নতুন কোনো কাজ করতে উৎসাহ প্রদান করে। মোবাইল যেহেতু সেটাকে কমিয়ে দেয়, ফলে অন্য কোনো কাজে তারা আর উৎসাহ খুঁজে পায় না। মোবাইলের প্রতিই আসক্ত হয়ে পড়ে। প্রত্যেকবার একেকটি নোটিফিকেশন বা বার্তা পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের মস্তিষ্কে একটু করে ডোপামিনের সরবরাহ ব্যাহত হয়। মস্তিষ্ক দ্বিধায় পড়ে যায় এটা ভাবতে গিয়ে যে, কখন নতুন কোনো বার্তা বা নোটিফিকেশন আসবে ফোনে। আমাদের পুরো চিন্তাভাবনা আর মস্তিষ্কের সমস্ত কাজেই প্রভাব পড়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, আমরা একটা সময় এই মানসিক অবস্থাটির সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাই। এই যে অস্বস্তিতে থাকা, মোবাইলের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়া, ডোপামিনের একটু কম সরবরাহ- এতে এত বেশি অভ্যস্ত হয়ে যাই যে, এই ব্যাপারগুলো না থাকলে নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে পারে না আমাদের মস্তিষ্ক; নানা রকম সমস্যা সৃষ্টি হয়, নোমোফোবিয়া জন্ম নেয়।
২০১৩ সালে করা একটি পরীক্ষায় দেখা যায় যে, মোবাইল ব্যবহারকারীদের মধ্যে অন্তত ৯ শতাংশ মানুষ প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর নিজেদের মোবাইল দেখেন। বাকিরাও যে খুব একটা পিছিয়ে আছেন এদিক দিয়ে তা কিন্তু নয়। এছাড়াও এই পরীক্ষাটিতে আরো জানা যায় যে, বাড়িতে ফোন ফেলে আসা মোবাইল ব্যবহারকারীদের মধ্যে শতকরা ৬৩ শতাংশ মানুষ ঐ দিনের পুরোটা সময় হতাশাগ্রস্থ অবস্থায় থাকেন। ইউগভ এবং হাফিংটন পোস্টের একটি পরিসংখ্যান অনুসারে, অধিকাংশ মানুষই রাতে ঘুমানোর সময় সাথে মোবাইল ফোন না থাকলে অস্বস্তি বোধ করেন এবং ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে শতকরা ৬৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ব্যবহার করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েন।
নোমোফোবিয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নারী নয়, পুরুষরাই নোমোফোবিয়ার বেশি ভুক্তভোগী হয়ে থাকে। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার করার ফলে নোমোফোবিয়া সৃষ্টি হয় এবং সেটি কেবল মানসিক নয়, আমাদেরকে শারীরিকভাবেও প্রভাবিত করে। তাই আপনিও যদি নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত হন, কিংবা আসক্ত যদি হয় আপনার সন্তান বা আশেপাশের মানুষ, তাহলে নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করুন।
১। দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় মোবাইলকে নিজের কাছ থেকে দূরে রাখুন। তার মানে এই নয় যে, সেই সময় আপনাকে ফোন করলে কেউ পাবে না। তবে মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ রেখে, সেটাকে একটু দূরে রেখে দিন যাতে করে কেউ আপনাকে ফোন করলে খুঁজে পায়। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। অন্যথায়, চোখের সামনে ফোন থাকলে বা ফেসবুক এবং অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বারবার নোটিফিকেশন আসলে আপনি মোবাইল ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন।
২। ঘুমানোর সময় মোবাইল দূরে রাখুন। সম্ভব হলে বন্ধ কিংবা সাইলেন্ট করে রাখুন। কিছুদিন এই পদ্ধতি মেনে চললে আপনার চারপাশের মানুষ ব্যাপারটি বুঝতে পারবে এবং রাতের নির্দিষ্ট একটি সময়ের পর আপনাকে আর কল করবে না। ঘুমের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট সময় মেনে চলুন। অনেকেই রাতে ঘুম না আসার কারণে মোবাইল ব্যবহার করেন এবং খানিক পর ঘুম আসলেও আর মোবাইলের কারণে ঘুমাতে পারেন না। তাই ঠিক সময়ে প্রতিদিন ঘুমিয়ে পড়ুন। অনেকগুলো সমস্যার সমাধান হবে।
৩। কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে? কোনো কাজ করতে গেলে সময় কেটে যায়? এই মানুষ এবং কাজগুলোকে চিহ্নিত করুন এবং এই ব্যাপারগুলো নিয়েই নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। বিনা কারণে ফোনের দিকে মনোযোগ চলে যাওয়ার সমস্যা একটু হলেও কমে যাবে।
৪। মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করুন। চেষ্টা করুন ল্যাপটপ কিংবা ডেস্কটপে এই মাধ্যমগুলো ব্যবহারের। বর্তমানে আমাদের মোবাইলের আসক্তি এবং নোমোফোবিয়া নামক মানসিক সমস্যা তৈরি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তাই এর ব্যবহার কমিয়ে ফেলুন। এতে করে সমস্যা একটু হলেও দূর হবে।
মনোফোবিয়া: একা হয়ে যাবার ভয়
কেস স্টাডি ১
দিনা (ছদ্মনাম) তার বিবাহিত জীবনে অসুখী একজন মহিলা। তিনি বিয়ের প্রায় দশ বছরের মাথায় বুঝতে পারেন তার স্বামী আরেকজনের সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছেন। দিনার দুটি ফুটফুটে সন্তান আছে। তিনি যথেষ্ট সুন্দরী একজন মহিলা এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। তিনি চাইলেই আলাদা হয়ে যেতে পারেন, কিন্তু তবুও নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংসার করে যাচ্ছেন। কারণ তিনি একা থাকতে ভয় পান। এই সংসারে অন্তত রাতে শোবার ঘরে কেউ থাকে। কিন্তু সংসার ছেড়ে চলে গেলে তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়বেন। তার ধারণা, তিনি একা থাকলে মারা যাবেন অথবা কেউ তাকে মেরে ফেলবে। তার স্বামী মানুষটা যেমনই হোক, তিনি আশেপাশে থাকলেই দিনা নিরাপদ!
কেস স্টাডি ২
রুপক (ছদ্মনাম) বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বয়স বিশের কাছাকাছি। পড়াশোনায় খুব ভালো। কিন্তু ছেলেটি এখনও তার মাকে ছাড়া কোথাও চলাফেরা করতে পারে না। রাতে মাকে পাশে নিয়ে ঘুমায়, সকালে মা তাকে ভার্সিটিতে রেখে আসে, ফেরার পথে মা তাকে নিয়ে আসে, খাবার সময় মায়ের সাথেই খায়, এমনকি গোসলের সময়ও মাকে দরজার বাইরে থাকতে হয়। রুপকের বাবা খুব বিরক্ত হচ্ছেন। মা নীরবে চোখ মোছেন।
উপরে যে দুটি ঘটনা বলা হলো এখানে দিনা এবং রুপক একটি ফোবিয়ায় আক্রান্ত। এই ফোবিয়ার নাম মনোফোবিয়া।
মনোফোবিয়া হলো একধরনের মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত মানুষ সবসময় একা হয়ে যাবার ভয়ে আতংকিত থাকে। শুধু মানুষই না, পশুরাও এই রোগে ভোগে। মনোফোবিয়া কাটিয়ে ওঠা খুব সহজ কোনো ব্যাপার নয়। সত্যিকার অর্থে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রকাশভঙ্গী এমন হয় যে তার কাছের মানুষকে খুব বেশি ভালবাসছে বলেই তাকে চোখের আড়াল করতে চাইছে না। এমন ইতিবাচক একটি লক্ষণ থাকায় কেউই এটাকে রোগ মনে করেন না। কিন্তু ভুক্তভোগী বিভিন্ন সময় দুশ্চিন্তায় বিভোর থাকেন।
এই রোগকে অটোফোবিয়া বা ইসোলাফোবিয়াও বলা হয়। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সবসময় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। সবসময় তার মধ্যে উদ্বিগ্নতা, বিষণ্ণতা এবং একা হয়ে যাবার ভয় পেতে দেখা যায়। ফলে তার ঘুম, খাওয়া, এমনকি একা বাথরুমে যেতেও সমস্যা হয়। মনোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষ স্বাভাবিক কোনো কাজ করতে পারে না। মাঝে মাঝে তার এই অতিরিক্ত সাথে সাথে থাকার প্রবণতা থেকে কাছের মানুষের সাথে সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে, যা তার জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর।
মনোফোবিয়ার লক্ষণসমূহ
অস্থির লাগা, মাথা ঘোরা, হাত পা অবশ হয়ে আসা
কেউ গলা চেপে ধরছে এমন বোধ হওয়া
ঘন ঘন হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
প্রচুর ঘাম হওয়া
বুকে ব্যথা
বমি বমি ভাব হওয়া
হঠাৎ করে অসাড় হয়ে যাওয়া
আরও কিছু লক্ষণ
বাস্তবতা এবং কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করতে না পারা
মারা যাবার দুশ্চিন্তা হওয়া
কাছের মানুষকে হারিয়ে ফেলার ভয়
হঠাৎ করে ঠাণ্ডা লাগা, আবার গরম লাগা
জ্ঞান হারিয়ে ফেলা
মনোফোবিয়ার কারণ
এই রোগের উৎপত্তি বা কারণ নির্দিষ্ট করে বলা একটু কঠিন। কারো হয়তবা ছোটবেলায় কোনো বড় দুর্ঘটনা থেকে হতে পারে, কারো চোখের সামনে ঘটে যাওয়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে, কারো বা খুব কাছের মানুষের মৃত্যু থেকেও এমনটা হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে পুষে রাখা দুশ্চিন্তা, সম্পর্কে অবনতি, বাসায় অসঙ্গতিমূলক পরিবেশ ইত্যাদিও মনোফোবিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
এটাও বলা যায় যে, যারা খুব বেশি উদ্বিগ্নতার মাঝে থাকেন, একটা সময় তাদের ভিতর মনোফোবিয়া তৈরি হয়। যে সকল বাচ্চা নিজেদের বাবা-মায়ের কাছে কম সময় পায় বা বাড়িতে গৃহকর্মীদের নিকট বড় হয়, তাদের মাঝেও বিভিন্ন রকম ফোবিয়া দেখা দেয়। যারা মনোফোবিয়ায় ভোগেন তাদের মাঝে আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে। এরা সাধারণত নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটার উপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে থাকে।
মনোফোবিয়ার চিকিৎসা
মনোফোবিয়ার চিকিৎসা আসলে মানসিকভাবে হয়ে থাকে। বিভিন্ন ধ্যান, কোনো সেমিনারে অংশগ্রহণ করা বা ব্যক্তিগতভাবে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে এই রোগের প্রভাব অনেকটা কমিয়ে আনা এবং ক্ষেত্রবিশেষে সম্পূর্ণ ভালো করা সম্ভব। হিপনোথেরাপির মাধ্যমেও এর চিকিৎসা সম্ভব। শুধুমাত্র ওষুধ দ্বারা এই রোগের চিকিৎসা করা হয় না। তবে স্নায়ু ঠাণ্ডা করার মতো ওষুধ, হালকা মাত্রার ঘুমের ওষুধ, এন্টি এংজাইটি বা দুশ্চিন্তারোধক ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ডাক্তারগণ চিকিৎসা করতে পারেন। কারণ, এই সমস্ত রোগের ক্ষেত্রে রোগীর পর্যাপ্ত মানসিক বিশ্রাম প্রয়োজন।
কাছের কেউ এই রোগে আক্রান্ত হলে আপনার যা করণীয়
আপনি এতদূর পড়ে হয়ত বুঝতে পারলেন আপনার কাছের কেউ ইতোমধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রে আপনার ভেঙ্গে পড়া চলবে না। আপনি যা যা করতে পারেন তা হলো-
1.তিনি যে কোনো একটা রোগে ভুগছেন এই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসুন। ফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষেরা সাধারণত ‘রোগী’ নয়, এমনকি তারা মানসিক রোগীও নয়। এরা সাময়িকভাবে একটা মানসিক অস্থিরতায় ভোগে যা তারা নিজেরাও জানে না। অতএব তাদের সাথে সেভাবেই কথা বলুন।
2.স্বাভাবিক থাকুন। তাকে কখনই বুঝতে দেয়া যাবে না আপনি তার সাথে কোনোরকম পরামর্শে যাচ্ছেন যেটা তার কোনো সমস্যার সমাধান দিবে।
সঙ্গ দিন। এই সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তির ভরসা করার মতো একজন মানুষের প্রয়োজন।
3.তার আস্থার ব্যক্তি হন, কিন্তু নির্ভরশীলতার নয়। ব্যাপারটা একটু জটিল হতে পারে। কিন্তু এই রোগ থেকে পরিত্রাণের এটাই উপায়।
4.আক্রান্ত ব্যক্তিকে একা একা চলাফেরা করার সুযোগ করে দিন। সেটা হতে পারে কোনো পার্ক, শপিং মল কিংবা রেস্টুরেন্ট। আপনি সাময়িকভাবে একটু দূরে সরে যেতে পারেন অথবা তাকে একাই কেনাকাটা করতে বলতে পারেন। এই সময় আপনি একটু দূর থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কোনো সমস্যা হলেই যেন আপনি সামনে থাকতে পারেন এমন দূরত্ব বজায় রাখুন।
5.তাকে আত্মনির্ভরশীল হলে সাহায্য করুন। ‘তুমি একাই পারবে’ এই ধরনের মনোভাব গড়ে উঠতে সাহায্য করুন। বিভিন্ন কাজ তাকে একাই করতে দিন। মাঝেমাঝে হালকা ধাঁচের ধাঁধা সমাধান করতে দিন। পড়তে দিতে পারেন কিছু গোয়েন্দা ভিত্তিক বই। পরবর্তীতে হয়ত শুনে নিলেন সে কেমন বোধ করছে অথবা কাউকে তার দোষী মনে হচ্ছে কিনা।
6.এই ধরনের মানুষেরা নিজের উপর আস্থা রাখতে পারে না, ফলে যেকোনো বিপদজনক পরিস্থিতিতে কেউ পাশে না থাকলে তার আতংকের সৃষ্টি হয় এবং সে ধরেই নেয় কাজটি তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাই তাকে ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরশীল করে তুলুন।
আমাদের অজান্তেই হয়ত আশেপাশের অনেকেই এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। অতিরিক্ত স্নেহপ্রবণতাও এই ধরনের ফোবিয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পরনির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে প্রতিটি মানুষেরই নিজের উপরে নির্ভরশীল হতে শেখা উচিত। ব্যস্ত জীবনে হয়ত সবচেয়ে কাছের বন্ধু অথবা পরিবারের মানুষগুলোই একে অপরকে ঠিকমত সময় দিতে পারে না। এমন অবস্থায় যেন যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবেলা একাই করা যায় এমন মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। আপনি, আমি আমাদের আশেপাশের সবাই যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো ফোবিয়ায় নিজেদের অজান্তেই আক্রান্ত হয়ে যেতে পারি। তাই নিজেকে মানসিকভাবে শক্ত রাখুন। এটাই মনোফোবিয়া থেকে নিরাপদ থাকার প্রধান উপায়। আত্মনির্ভরশীল হোন, সুস্থ থাকুন।
হিমোফোবিয়া: রক্ত যখন ভয়ের কারণ
নিজের স্ত্রীকে জন্মবার্ষিকীর সারপ্রাইজ দিয়ে গিয়ে নিজেই যে চমকে যাবে, সেটা ভুলেও ভাবেনি সৈকত (ছদ্মনাম)। কে চিন্তা করতে পেরেছিলো, বেলুনের মধ্যে ঢোকানো লাল রংয়ের তরল দেখে শ্বেতা জ্ঞান হারিয়ে ফেলবার মতো কান্ড ঘটাবে?
মাত্র কিছু দিন হলো বিয়ে হয়েছে তাদের দুজনের। বিয়ের পরে শ্বেতার এটাই প্রথম জন্মবার্ষিকী। তাই সৈকত ভেবেছিলো শ্বেতাকে না জানিয়েই একটা জমকালো আয়োজন করে চমকে দেবে। সেই মোতাবেক ব্যবস্থাও নিয়েছিলো সে। পুরো ঘর সাজিয়েছিলো বিচিত্র সব বেলুন, কাগজ আর ফিতায়। বেলুনগুলো ভর্তি করা হয়েছিলো নানা রঙের তরল দিয়ে। দিনশেষে ওগুলোই হয়ে দাঁড়ালো বিপত্তির কারণ।
জন্মদিনের কেক কাটা শেষ হওয়া মাত্রই দেয়ালে টাঙানো বেলুনগুলো ফাটাতে শুরু করে ক্ষুদে অতিথিরা। সেগুলোরই একটার ভেতরে ছিলো লাল রং গোলানো পানি। বেলুনটা ফাটতেই ভেতরের তরলগুলো ছিটিয়ে পড়ে চারদিকে। এ দৃশ্য থেকেই চিৎকার করে জ্ঞান হারায় অনুষ্ঠানের মধ্যমণি শ্বেতা।
সাথে সাথে এগিয়ে আসেন অনুষ্ঠানের অতিথি শ্বেতার মামা। জ্ঞান ফেরাতে মাথায় পানি ঢালতে ঢালতে তিনি সৈকতকে জানান, লাল রঙকে রক্ত ভেবে ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে মেয়েটি। সেদিনই সৈকত জানতে পারে, শ্বেতার রয়েছে এক বিচিত্র অসুখ, যার নাম হিমোফোবিয়া বা রক্তভীতি।
হিমোফোবিয়া কী?
হিমোফোবিয়া শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দাংশ 'haima' এবং 'phobos' থেকে, যাদের অর্থ যথাক্রমে রক্ত এবং ভয়। অর্থাৎ হিমোফোবিয়ার সহজ সরল অর্থ হলো রক্তকে ভয় পাওয়া। সেই রক্ত হতে পারে নিজের, কিংবা অন্য কোনো মানুষ অথবা পশুপাখির।
যারা এ ফোবিয়ায় আক্রান্ত তারা যে শুধু রক্তকেই ভয় পান তা নয়, রক্ত সম্পর্কিত যেকোনোকিছু দেখলেই তারা আঁতকে ওঠেন। এটি হতে পারে দুর্ঘটনার ফলে সৃষ্ট ক্ষতচিহ্ন, ঘাঁ, কাটাছেঁড়া; কিংবা বিভিন্ন বস্তু যেগুলোর সাথে রক্তের সম্পর্ক রয়েছে, যেমন- সিরিঞ্জ, ইনজেকশন, এবং ছুরিকাঁচি।
এই অমূলক ভীতির কারণে এসব মানুষের জীবনযাপন দূর্বিষহ হয়ে ওঠে। হাত কেটে যাবে এই ভয়ে গৃহিণীরা ঘরের কাটাকুটিতে ছুরি-বটিতে হাত লাগাতে চান না। ছোট বাচ্চাকাচ্চা, এমনকি অনেক প্রাপ্তবয়স্কের কাছে ইনজেকশন হয়ে দাঁড়ায় এক ভীতির বিষয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের চিকিৎসায়। এই ফোবিয়া প্রভাব ফেলে পেশা নির্বাচনেও। অনেকে তো শুধু রক্ত দেখতে হবে বলে চিকিৎসক হওয়ার আশা ছেড়ে দেন।
হিমোফোবিয়া ও ইতিহাস
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, রক্তের প্রতি মানুষের ভীতি চিরায়ত। বিভিন্ন সাহিত্যিক কর্মের মধ্যে রক্তকে চিহ্নিত করা হয়েছে ভয়াবহতা, অপরাধ আর ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে।
তাই তো গ্রিক কবি হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যে আমরা দেখতে পাই মহাবীর অ্যাকিলিস বিপক্ষ ট্রোজান সৈন্যদের কচুকাটা করতে করতে এমন অবস্থা করেন যে জলধারা পর্যন্ত লাল হয়ে যায়। আর রক্ত যে অপরাধের চিহ্ন, তা শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ নাটকের লেডি ম্যাকবেথের রক্তাক্ত হাত পরিষ্কার করার প্রাণান্তকর চেষ্টা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
এ কারণে রক্তকে ভয় পাওয়ার বিষয়টি আমাদের মজ্জাগত হয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে সমস্যাটা তখনই দেখা দেয়, যখন ক্ষেত্রবিশেষে এই ভয়টা মাত্রাতিরিক্ত ও অমূলক হয়ে দাঁড়ায়। যেমন কেউ কেউ টমেটো সস দেখেই রক্ত ভেবে আতঁকে ওঠেন।
কারণ ও রিস্ক ফ্যাক্টর
গবেষকদের মতে, তিন থেকে চার শতাংশ মানুষের রক্ত দেখলে ভয় পেয়ে ওঠার বাতিক রয়েছে। সাধারণত ছেলেরা গড়ে ৯ বছর এবং মেয়েরা সাড়ে ৭ বছর বয়স থেকে রক্তভীতিতে ভুগতে শুরু করে। বেশ কিছু নিয়ামক রয়েছে, যেগুলো হিমোফোবিয়ার জন্য দায়ী। এগুলো হলো:
বংশগতির প্রভাব: অনেকে বাবা-মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে রক্তভীতি পেয়ে আসেন।
অনুকরণ: আমরা জানি, সকল ফোবিয়াই কারো না কারো কাছ থেকে শিখন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়। তাই নিজের আশেপাশের মানুষদের রক্তের প্রতি ভয় পেতে দেখলে, নিজের মধ্যেও হিমোফোবিয়া গড়ে ওঠে।
ট্রমাটিক ঘটনা: রক্ত নিয়ে পূর্বে কোনো ট্রমাটিক ঘটনা ঘটে গেলে তা মানুষকে হিমোফোবিয়ার দিকে ধাবিত করে।
উপসর্গ
একজন হিমোফোবিয়াক রক্তের সংস্পর্শে আসলে নিম্নরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকেন।
শারীরিক উপসর্গ
1.শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হওয়া।
2.হৃদকম্পন বেড়ে যাওয়া।
3.মাথা ঘোরানো ও বুকে ব্যথা হওয়া।
4.ঠকঠক করে কাঁপতে থাকা।
5.বমি বমি ভাবের উদ্রেক ঘটা।
6.শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বেয়ে পড়তে থাকা।
মানসিক উপসর্গ
1.প্রচন্ড ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়া।
2.চারপাশ থেকে বিস্মৃত হয়ে পড়া।
3.দেহের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে, এমন অনুভূত হওয়া।
4.এখনই মারা যাবো এমন অনুভূত হওয়া।
যেভাবে দেখা দেয় উপসর্গগুলো
হিমোফোবিকরা রক্ত দেখলে কী প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে সেটি নিয়ে হয়েছে বিস্তর গবেষণা। গবেষকদের মতে, রক্তের প্রতি হিমোফবিকরা মূলত দুই পর্যায়ে সাড়া প্রদান করে থাকে।
একজন হিমোফোবিক যখনই রক্তের সংস্পর্শে আসেন, তখনই রক্তভীতির কারণে তার মধ্যে উচ্চ শারীরিক ও স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে হৃদকম্পন, শ্বাসপ্রশ্বাসের হার ও রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, চোখের মণি বড় হয়ে যাওয়া ও ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলা। মূলত বিভিন্ন উদ্দীপক হরমোনের নিঃসরণ এর জন্য দায়ী।
দ্বিতীয় ধাপে ঘটে উল্টো ঘটনা। যে হরমোনগুলোর কারণে শরীর উদ্দীপ্ত ও উত্তেজিত হয়েছিলো, সেগুলোর নিঃসরণ কমে যেতে শুরু করে। ফলে শরীর ভারী হয়ে আসে, হাতের পেশিগুলোতে বল পাওয়া যায় না, দেহের শারীরবৃত্তীয় ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ার গতি কমে যেতে থাকে। রক্ত সরবরাহ কমে যাবার জন্য ব্যক্তি জ্ঞানও হারিয়ে ফেলতে পারেন। দেখা গেছে, হিমোফোবিকদের মধ্যে ৮০ শতাংশই রক্ত দেখলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
নিরাময় ও প্রতিরোধ
সত্যি বলতে, হিমোফোবিয়া প্রতিরোধে প্রথাগত ওষুধের চাইতে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি আর মনোবলই বেশি কাজে দেয়। মনে রাখতে হবে, রক্ত কেবল মানবদেহের অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। একে ভয় পাবার কিছুই নেই।
হিমোফোবিয়া নিরাময়ে এক্সপোজার থেরাপি বেশ ফলাফল দিয়ে থাকে। এই থেরাপিতে রোগীকে বারবার রক্তের সংস্পর্শে এনে সেটির সাথে অভ্যস্ত করানো হয়। এতে করে রোগী বুঝতে পারে, রক্ত নিয়ে যে ভয় সে এতদিন পেয়ে আসছিলো, তা নিতান্তই অমূলক। এভাবে তার ভয় ও আতঙ্ক কেটে যায়।
কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি এবং রিলাক্সেশন থেরাপি ব্যবহার করে উপকার পাওয়া যায়। এছাড়াও রক্তভীতি কমিয়ে আনতে অ্যাপ্লাইড টেনশন নামের একটি কসরত কৌশল রয়েছে যেখানে ধাপে ধাপে শরীরের কিছু পেশির সংকোচন ও প্রসারণ করার মাধ্যমে উদ্বেগ কমিয়ে আনা সম্ভব। অ্যাপ্লাইড টেনশন কৌশলটি নিম্নরূপ:
১. বসে পড়ুন। মাথা বনবন করার পরিণতি হতে পারে জ্ঞান হারানো। তাই মাথা বনবন করতে শুরু করলে তাড়াতাড়ি বসে যাওয়া উচিত। না হলে পড়ে গিয়ে আঘাত পেতে পারেন।
২. নিজের হাত দুটোকে পায়ের কাছে নিয়ে আসুন। নিজের মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলুন, যেন কিছু একটা আঁকড়ে ধরে আছেন। এভাবে কমপক্ষে ১০-১৫ সেকেন্ড থাকুন।
৩. দম ফেলুন ধীরে ধীরে। শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানসিক চাপকে সামলে নিন। হাতের পেশিগুলোকে শিথিল করে ফেলুন।
৪. এরপর পায়ের পাতা দিয়ে ভূমির ওপর চাপ প্রয়োগ করুন। একইসাথে নিজের হাটুকে হাত দিয়ে চেপে ধরুন। একই কথা কনুইজোড়ার জন্যও প্রযোজ্য।
৫. এবার পায়ের পেশিকে শিথিল করে ফেলুন। যেভাবে আছেন, সেভাবেই ১৫-২০ সেকেন্ড যেতে দিন।
৬. নিজের শরীরকে নাড়িয়ে এমন একটি ভঙ্গিমা করুন, যেন আপনি উঠে দাঁড়াতে চলেছেন। এটা অনেকটা দরজায় কলিংবেল বাজলে হাত-পা ঝাড়া দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর মতো।
৭. পুনরায় শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি কমিয়ে আনুন।
৮. এভাবে শরীরের সবগুলো পেশির কসরত সমাপ্ত হলে বুঝে নিন, আপনার সমস্ত শরীর এখন আশঙ্কামুক্ত।
অ্যাক্রোফোবিয়া বা উচ্চতাভীতির আদ্যোপান্ত
উচ্চতাভীতিকে ইংরেজিতে বলা হয় অ্যাক্রোফোবিয়া। গ্রিক শব্দ ‘acron’ অর্থ উচ্চতা এবং ‘phobos’ অর্থ ভয়। এই শব্দ দু’টো নিয়েই ‘Acrophobia’ নামের উৎপত্তি।
উচ্চতাভীতি কী?
প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন জানান যে, তারা উঁচু কোনো জায়গায় গেলে এক ধরনের অস্বস্তি বা চাপ অনুভব করেন। উঁচু জায়গায় গেলে এমন অনুভূতি হওয়া স্বাভাবিক এবং তারা কিন্তু অ্যাক্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত নন।
অ্যাক্রোফোবিয়া শব্দটি সেক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, যেখানে ব্যক্তির মনে উচ্চতা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কে দীর্ঘ সময় ধরে অযৌক্তিক, তীব্র ভয় কাজ করবে। অতিরিক্ত ভয় ও উদ্বেগের কারণে উঁচু কোনো জায়গা থেকে নেমে আসাটাও তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
অ্যাক্রোফোবিয়াক ব্যক্তিরা উঁচু জায়গা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। উঁচু স্থানে গেলে বা যাওয়ার আশঙ্কা করলে তাদের সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার কাজ শরীরকে জরুরী অবস্থার জন্যে প্রস্তুত করে তোলা। এর ফলে শরীর আসন্ন বিপদের মোকাবেলা করা অথবা তা থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়, সাধারণভাবে যা ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট রেসপন্স’ নামে পরিচিত।
এ সময়ে ব্যক্তিটি মাথা ঘোরানো, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, ঘাম হওয়া, কাঁপুনি এবং বমি বমি ভাব অনুভব করতে পারেন। সাধারণভাবে বিপজ্জনক কোনো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট রেসপন্স’ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অ্যাক্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ‘বিপজ্জনক নয়’, এমন পরিস্থিতিতেও ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট রেসপন্স’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি অনেক সময় ব্যক্তিটি শ্বাসকষ্ট, নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারা বা মৃত্যুভয়েও আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
মানব মনে কীভাবে অ্যাক্রোফোবিয়া তৈরি হয়?
কেন মানুষের মধ্যে অ্যাক্রোফোবিয়া বা উচ্চতাভীতি গড়ে ওঠে, তার কারণ দু’ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, বিবর্তনমূলক এবং আচরণমূলক।
বিবর্তনমূলক মনোবিজ্ঞান অনুসারে, ভয় হচ্ছে মানুষের জন্মগত বা সহজাত প্রবৃত্তি। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উচ্চতার সংস্পর্শে না আসলেও একজন মানুষ উচ্চতা সম্পর্কে ভয় পোষণ করতে পারেন।
বিবর্তনমূলক মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অ্যাক্রোফোবিয়াক ব্যক্তিরা যে কোনো উপায়ে বিপজ্জনক উঁচু এলাকা এড়িয়ে চলেন। ফলে তারা বিপদ আপদ থেকে মুক্ত থাকেন, টিকে থাকেন এবং পরবর্তীতে বংশ বিস্তার করেন। আর এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাদের জিন বাহিত হয়ে চলে।
মানব মনে সহজাত বা Innate Phobia মূলত এমন কোনো বস্তু বা পরিস্থিতির জন্য তৈরি হয়, যার সাথে মানুষকে দীর্ঘকাল মোকাবেলা করে পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়েছে। যেমন- অধিক উচ্চতা বা সাপের প্রতি ভীতি। কিন্তু কেউ কেউ ডাক্তারের কাছে যেতে বা বক্তৃতা দিতে যে ভয় পান, তার উৎপত্তির ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে বিহেভিয়ারিস্টরা মনে করেন, ভয় সহজাত বা জন্মগত প্রবৃত্তি নয়, বরং আমরা ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডিশনিংয়ের মাধ্যমে ভয় পেতে ‘শিখি’। একটি উদাহরণ থেকে ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডিশনিং কীভাবে কাজ করে, সেটির পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি প্রথমবারের মত গাছে চড়েছেন। গাছে চড়ার পর স্বাভাবিকভাবে ঐ উচ্চতায় তিনি হয়তো ভয় অনুভব করবেন না। কিন্তু দুর্ঘটনাক্রমে তিনি যদি গাছ থেকে পড়ে যান, তাহলে গাছে চড়ার ব্যাপারে তার মনে এক ধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি হবে। উঁচুতে ওঠার পর পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার এই অভিজ্ঞতা তাকে উচ্চতার প্রতি নেতিবাচক ভাবাপন্ন করে তুলবে। ফলে পরবর্তীতে তিনি উঁচু জায়গা এড়িয়ে চলতে চাইবেন।
যদিও অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি বাস্তবে কখনো একটি বিশেষ বস্তু বা অবস্থার সম্মুখীন না হওয়া সত্ত্বেও সেই বিশেষ বস্তু বা অবস্থার প্রতি ভয় অনুভব করেন। ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডিশনিং তত্ত্ব থেকে এ ধরনের ভয়ের কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না।
সুতরাং অ্যাক্রোফোবিয়া কীভাবে মানুষের মনে স্থান করে নেয়, তা বুঝতে হলে বিবর্তনমূলক এবং আচরণমূলক- উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এর উৎপত্তি বিবেচনা করতে হবে।
চিকিৎসার মাধ্যমে কি এটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব?
অ্যাক্রোফোবিয়া কাটিয়ে ওঠার জন্যে প্রথমেই যা দরকার, তা হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তির আন্তরিক ইচ্ছা এবং প্রচেষ্টা। তিনি নিজে যদি ভয় থেকে মুক্তি পেতে চান, তাহলে মনোবিজ্ঞানী বা মনোচিকিৎসক প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন উপায়ে তাকে ভয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারেন।
1.ইতিবাচক চিন্তা করা, মেডিটেশন, হিপনোসিস এক্ষেত্রে কাজে দিতে পারে।
2.ভয় কাটিয়ে ওঠার চিকিৎসা হিসেবে ‘সিস্টেম্যাটিক ডিসেনসিটাইজেশন’ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিতে রোগীকে নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ পরিবেশে রেখে ধীরে ধীরে তার ভয়ের সম্মুখীন করা হয়। যেমন- অ্যাক্রোফোবিক ব্যক্তিকে মই বা উঁচু সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এবং ধীরে ধীরে ধাপ সংখ্যা বাড়িয়ে অধিকতর উচ্চতায় উঠতে অভ্যস্ত করে তোলা হয়, উঁচু দালান বা পাহাড় থেকে তোলা ছবি দেখানো হয়। এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে এরপর রোগীকে উঁচু দালানের ব্যালকনি বা ছাদ থেকে নিচে তাকানো, চলন্ত সিঁড়িতে চড়া- এসব কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে তার ভয় কাটানো যেতে পারে। তবে এ সময় বিশ্বস্ত কেউ অবশ্যই রোগীর সঙ্গে থাকা জরুরী।
3.রোগীর উদ্বেগ কাটানোর জন্যে স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদে কিছু ঔষধও সেবন করতে হতে পারে।
4.এটির চিকিৎসার আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে- ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এক্সপোজার থেরাপি (VRET)। ১৯৯৫ সাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসা এ পদ্ধতিটি অ্যাক্রোফোবিয়ার চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর বলে জানা যায়।
‘ফিয়ার অব হাইট’ নামক একটি গেইমের বর্ণনা দিলে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি’র মাধ্যমে কীভাবে উচ্চতা-ভীতি কাটানো হয়, তার সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। ২০১৬ সালে এপ্রিলের ১৫ তারিখে জাপানি ভিডিও গেইম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Bandai Namco Entertainment Inc. টোকিওর এক ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এক্সপো সেন্টারে তাদের বিভিন্ন গেইম প্রদর্শন করেছিলো, যার মধ্যে ‘ফিয়ার অব হাইট’ অন্যতম। এই গেইমটিতে VRET থেরাপির প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। এতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিকে একটি কাঠের পাটাতনের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে গিয়ে একটি ছোট পুতুল বিড়ালের ছানাকে উদ্ধার করতে হয়।
আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটি সাধারণ মনে হলেও গেমে অংশগ্রহণকারীর জন্যে এটি বেশ জটিল, কারণ গেমে অংশ নেওয়ার সময় তার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয় একটি হেডসেট, যা তাকে নিয়ে যাবে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি’র জগতে। তার মনে হবে তিনি উঁচু একটি দালানের চলন্ত এলিভেটরের ভেতরে আছেন। ষাট তলায় পৌঁছে এলিভেটর থামার পর দরজা খুলে গেলে তিনি দেখতে পাবেন, তার সামনে রয়েছে একটি কাঠের পাটাতন যার অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিড়াল ছানা। যেকোনো সময় বিড়াল ছানাটি পাটাতন থেকে পড়ে যেতে পারে। যদিও বাস্তবে পাটাতনটি ঘরের মেঝেতেই রাখা হয়েছে, কিন্তু ভার্চুয়াল রিয়্যালিটিতে এটিকে মাটি থেকে প্রায় ২০০ মিটার উচ্চতায় দেখানো হবে। অংশগ্রহণকারীর কাজ হচ্ছে বিড়াল ছানাটিকে পাটাতনের অপর প্রান্ত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা। এভাবেই ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির সাহায্যে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই একজন অ্যাক্রোফোবিয়াক তার ভয়ের সম্মুখীন হন এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি তার ফোবিয়া কাটিয়ে উঠতে বেশ সহায়ক হয়।
শুধুমাত্র উচ্চতা সম্পর্কে ভীতি ও উদ্বেগের কারণে রোলার কোস্টার রাইডে চড়া, পাহাড়ে ওঠা, বিমানে ভ্রমণ করা, বাঞ্জি জাম্পিং, প্যারাগ্লাইডিংয়ের মতো অনেক উত্তেজনাকর আর উপভোগ্য মুহূর্তগুলো জীবন থেকে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। এমনকি সমস্যা হতে পারে দৈনন্দিন জীবনে সিঁড়ি বা মই বেয়ে ওঠা, এলিভেটর ব্যবহার করা, উঁচু দালানের ছাদ বা ব্যালকনিতে দাঁড়ানো, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করার মতো সাধারণ কাজেও।
সুতরাং পাঠক, আপনার বা আপনার পরিচিত কারো মধ্যে উচ্চতা সম্পর্কে অতিরিক্ত ভীতি বা উদ্বেগ দেখা দিলে অবহেলা না করে একজন মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন, কাটিয়ে উঠুন অকারণ ভীতি।
আপনার কি টেলিফোবিয়া আছে?
ফোন বেজে উঠলেই কি আপনার ঘাম ছুটে যায়? বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে ওঠে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটা কোনও স্বাভাবিক বিষয় নয়! এটা এক ধরনের রোগ, যার নাম টেলিফোবিয়া৷
কী এই ফোবিয়া?
শুধু এই দেশে নয়, বিদেশেও এই রোগে আক্রান্ত বহু মানুষ৷ বয়স বা লিঙ্গভেদে এই রোগে আক্রান্ত মানুষ রয়েছেন প্রায় সব ক’টি মহাদেশেই৷ কী করে বুঝবেন আপনি এই রোগে আক্রান্ত? আচ্ছা, আপনি কি এসএমএস করতে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন? যাঁরা টেক্সট মেসেজ করতে পারদর্শী, কিন্তু ফোনে কথা বলতে গেলেই আমতা আমতা করেন, তাঁরাই নাকি এই রোগের শিকার৷
এই রোগ যে শুধু স্মার্টফোন ইউজারদেরই হয় এমনটা নয় কিন্তু! ১৯২৯-তে ব্রিটিশ কবি ও লেখক রবার্ট গ্রেভসও এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, শুধুমাত্র ফোনে কথা বলতে গেলেই এই রোগীরা ভয় পান এমনটা নয়৷ কথোপকথন মাত্রই তাঁরা পিছিয়ে আসেন৷ অনেকেই টেলিফোনে এই ভেবে কথা বলতে ভয় পান, যে তাঁরা যেন ভুলভাল কিছু বলে না বসেন! তবে নিয়মিত চেষ্টা করলে এই ভীতি কাটিয়ে ওঠা যায় বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ম্যাথেমাফোবিয়া: গণিতের ভীতি এবং সমস্যার সমাধান
ফরাসি স্কুলছাত্র লরেন সোয়াজ, অংক করতে বসলেই তার হাত-পা ঘেমে একাকার। নিজের উপর খুব সহজেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে, সে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। শুধু এই লরেন সোয়াজই নয়, দুনিয়া জোড়া শত সহস্র মানুষের একই সমস্যা। অংকের সমাধান করতে বসলেই হাত-পা ঘামা শুরু হয়, মস্তিষ্ক কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে, চরম পরাজয়ের মতো অস্বস্তি বোধ হয়। তবে আপনারও যদি একইরকম হয়ে থাকে, তবে আপনি মোটেও একা নন, গবেষকদের মতে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় বিশ শতাংশ এই ধরনের গণিত নিয়ে ভীতিতে ভুগে থাকে। কোনো কোনো মনস্তত্ত্ববিদের মতে, এই গণিত ভীতি একধরনের চিকিৎসাযোগ্য মানসিক সমস্যা। তবে এই সমস্যায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি যে গণিতে ভালো করতে পারে না, তা মোটেই সত্য নয়। গণিতকে ভয় পাওয়া সেই ফরাসি স্কুলছাত্র লরেন সোয়াজ পরবর্তীতে গণিতের সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস মেডেলে ভূষিত হয়েছিলেন।
গণিতভীতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন মেরি ফিডেস গফ নামের এক গবেষক। ১৯৫৪ সালে তিনি প্রথম তার লেখায় ‘Mathemaphobia’ নামে শব্দটির প্রচলন করেন। গণিতের প্রতি সাধারণ মানুষের ভীতি আর তার প্রতিকারে কী করা যেতে পারে, তা ছিলো এই গবেষকের গবেষণার বিষয়বস্তু। পরবর্তীতে স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শত-সহস্র ছাত্র ছাত্রীর উপরে গণিতের ভয় নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ের মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, বেশিরভাগ মানুষের এই গণিত কিংবা সংখ্যার প্রতি বিদ্যমান ভীতি লুকিয়ে আছে তাদের মস্তিষ্কে। যারা গণিতকে ভয় পায়, তাদের অনেকের মনেই এই ধারণা বদ্ধমূল যে তারা গণিতে খারাপ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনা কিছুটা উল্টো। তারা গণিত নিয়ে ভয়ে থাকে বলেই তাদের গাণিতিক সমস্যা সমাধান করার দক্ষতা কম। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, মানুষ যখন গণিত সমাধানের ব্যাপারটি নিয়ে শংকিত হয়ে যায়, তখন তার বুদ্ধিবৃত্তিক জ্বালানিতে টান পরে। আর সেই জ্বালানি হলো ক্ষণস্থায়ী এবং দ্রুতগতির স্মৃতিশক্তি ব্যবস্থা, যা ‘ওয়ার্কিং মেমরি’ নামেও পরিচিত। এই স্মৃতিশক্তি ক্ষণস্থায়ী হলেও কোনো কাজের তথ্যগুলো ঠিকঠাক গুছিয়ে নিতে এর বিকল্প নেই। কঠিন বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ কিংবা সমস্যা সমাধানে এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিশক্তির ভূমিকা আরো বেশি। গণিত সমাধানের ক্ষেত্রে এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির সিংহভাগই ব্যবহার করতে হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, গাণিতিক সমস্যা নিয়ে শুরুতেই যদি কেউ ভীত হয়ে যায়, তাহলে এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির অনেকটাই নেতিবাচকতা এবং এর প্রতিক্রিয়া দেওয়ার কাজেই ব্যস্ত হয়ে যায়। গাণিতিক সমস্যাকে মোকাবেলা করার জন্য খুব অল্পই অবশিষ্ট থাকে। ফলে দেখা যায় গণিতভীতিতে ভুক্তভোগীদের অনেকেই মানসিক চাপে সাধারণ যোগ-বিয়োগেও তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। প্রতিযোগিতা কিংবা পরীক্ষায় এই ধরনের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে অনেকের মাঝেই।
তবে শিশু কিংবা তরুণদের মধ্যে গণিত নিয়ে ভীতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা প্রাপ্তবয়স্কের অনেকেও এই সমস্যায় জর্জরিত। দোকানে কিংবা বাজারের ফর্দ দেখেও অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে যান। তবে ব্যাপারটি শুধুই আমাদের মনেই ভীতির সঞ্চার করে না, অনেক মানুষ গণিত সমাধান করতে রীতিমতো যন্ত্রণা অনুভব করেন।
গবেষকদের দীর্ঘদিন ধরে চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, গণিতের প্রতি ভীতি থাকা ব্যক্তিদের গাণিতিক সমস্যা দিয়ে কোনো পরীক্ষা কিংবা প্রতিযোগিতায় বসিয়ে দিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ‘কর্টিসল’ নামক হরমোন নিঃসরিত হয়। এই হরমোন আমাদেরকে অধিকমাত্রায় উত্তেজিত করে দেয়। পাশাপাশি এই ধরনের প্রতিযোগিতা কিংবা পরীক্ষা আমাদের মস্তিষ্কের এমন কিছু স্থানকে (পেইন ম্যাট্রিক্স) উত্তেজিত করে, যেগুলো আমরা সাধারণত ব্যথা পেলেই কার্যকর হয়।
তবে এমনটা হওয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকা কারণটা বের করতেও কাঠখড় কম পুড়িয়ে যাচ্ছেন না গবেষকরা। তবে তাদের ধারণা, শিশুদেরকে খুব কম বয়সে যেভাবে গণিতের হাতেখড়ি দেওয়া হয়ে থাকে, সে ব্যাপারটিও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। বেশিরভাগ শিশুর সামনেই তার পরিবার কিংবা শিক্ষক উভয়েই গণিতকে বিভীষিকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। এমনকি অনেক কম বয়স থেকেই বেঁধে দেওয়া সময়ে গণিতের সমাধান করতে দেওয়াও ভীতির সঞ্চার করে শিশুদের মধ্যে। বিশেষ করে মেয়েরা গণিত সমাধানে কম দক্ষ, এমন মানসিকতাও বিদ্যমান অনেকের মধ্যেই। তবে ব্যাপারটি মোটেই সত্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন গবেষণা বলছে, গাণিতিক সমস্যা সমাধান দক্ষতা আমাদের লিঙ্গের সাথে যতটা না জড়িত, তার চেয়ে অনেক বেশি জড়িত আমাদের সংস্কৃতির সাথে। ছোটবেলা থেকেই মেয়ে শিশুদের মধ্যে গণিত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দিয়ে দিলে পরবর্তী জীবনে তা উৎরে যাওয়া খানিকটা কঠিন। এমনকি গণিতের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস মেডেল পাওয়া প্রথম নারী গণিতবিদ মরিয়ম মির্জাখানিও স্কুলে পড়ার সময়ে গণিতের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন, কারণ তার শিক্ষকেরা মনে করতো মরিয়মের গণিত সমাধান করার মতো প্রতিভা নেই।
তবে গবেষকদের ধারণা, গণিতের প্রতি বিদ্যমান এই ভীতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। মূলত যেকোনো প্রতিযোগিতায় গণিতকে কেন্দ্র করে ভীতি এবং উত্তেজনাকে কাটিয়ে উঠতে একটি কার্যকর উপায় হলো এই ভীতিকে অন্যদিকে ধাবিত করে দেওয়া। এটি করা যেতে পারে ছোট ছোট নিঃশ্বাস নিয়ে। এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে উত্তেজিত মুহূর্তেও নিজেকে শিথিল করা যায়। কর্টিসল হরমোনের প্রভাবে সৃষ্ট উত্তেজনার ফলে অনেক সময় আমাদের হাত-পা কাঁপতে থাকে কিংবা অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার যে ব্যাপারটি দেখা যায়, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
গণিতভীতিকে যেহেতু বর্তমান সময়ে একটি মানসিক সমস্যা হিসেবেও গণ্য করা হয়, সেটিকে দূর করার আরেকটি উপায় হলো গণিতের নিজের ভয়ভীতিকে লিখে ফেলা এবং সেগুলো মূল্যায়ন করা। ‘Expressive writing’ নামক প্রক্রিয়ায় নিজের সমস্যাগুলোর বিবরণ নিজেই খাতায় লিখে ফেলা হয় এবং এর ফলে ক্ষণস্থায়ী কার্যকরী স্মৃতির উপর চাপ অনেকটাই কমে আসে।
পরবর্তীতে মানসিকভাবে চাপমুক্ত অবস্থায় সেই বিষয়গুলোকে পুনরায় মূল্যায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে কী করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। গণিত সমাধানে কাটিয়ে উঠতেও এই প্রক্রিয়া বেশ কাজে দেয়। এক জরিপে দেখা গেছে, এক দল কলেজ শিক্ষার্থীকে গণিত সমাধানের ক্ষেত্রে তাদের ভয়ভীতির ব্যাপারে লিখে সেগুলো নিজেকে মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছিলো। কয়েকমাস অন্তর অন্তর তাদের গণিতের ছোট ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের গড় নম্বর রেকর্ড করা হয়। এবং যাদের এই কাজ করতে বলা হয়নি, তাদের কয়েকজনেরও এই পরীক্ষা নেওয়া হয়। উভয়ের গড় নম্বর তুলনা করে দেখা গেছে নিজের ভয়ভীতিকে লিখে সেগুলোকে মূল্যায়ন করা দলটি তূলনামূলক এগিয়ে আছে এবং গণিতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবও অনেকাংশে দূরে সরে গেছে।
পাশাপাশি গণিতের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ভীতি কাটিয়ে উঠতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক যথেষ্ট মাত্রায় সহনক্ষম এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী। খুব ছোট বয়স থেকেই বাচ্চাদেরকে গণিত সমাধানে সময় বেঁধে দিয়ে তাদেরকে গণিতের প্রতি ভীত করে না তোলারও পরামর্শ দেন অনেক মনস্তত্ত্ববিদ। পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে গণিতের প্রতি বিদ্যমান ভয় উল্লেখযোগ্য হারে দূর করা যায়। অনেকটা নতুন ভাষা শেখার মতো করেই প্রকৃতির এই ভাষা শেখার চেষ্টা করলে গণিত মোটেই কঠিন কিছু নয়।
ভর ও ওজন
একটু নিজের মতো করে আপনাদের বোঝানোর চেষ্টা করি। ভর হলো কোনো কিছুতে অবস্থিত মোট পদার্থের পরিমাণ। এবং ওজন হলো সেই পদার্থ কে সেই স্থানের গ্রাভিটি নিজের দিকে কি পরিমাণে আকর্ষণ করছে। একটা কথা বলে রাখি, ভর পরিমাপ এর আসল যন্ত্র হলো দাড়িপাল্লা। মনে করুন আমি এখন আমার ভর মাপবো। তাহলে দাড়িপাল্লায়র দুই দিকই সমান রেখে একদিকে আমি উঠে পড়লাম এবং অপর দিকে কিছু লোহা দিলাম। তারপর যখন দুই দিকই সমান হয়ে যাবে তখন ই আমার ভর বেরিয়ে যাবে। এখন আমার ভরের সমান আমি ৫ টা রড পেলাম। এখন যদি দাড়িপাল্লায় ও সেই ৫ টি রড নিয়ে আমি চাঁদ, মঙ্গল, শনি বা যেকোনো আলাদা গ্রাভিটি ওয়ালা গ্রহে গিয়ে দাড়িপাল্লায় টা বসিয়ে একপাশে রডগুলো দিয়ে আরেকপাশে আমি বসে পড়ি তাহলে কিন্তু সমান সমান হয়ে যাবে! অর্থাৎ আমার ভর একই থাকবে। কারন ভর কখনো স্থানের জন্য পরিবর্তন হয় না। --(১)
আপনারা জানেন কি যে পৃথিবী তে যেসব আলু পটল মাপার ডিজিটাল মেশিন আছে সেটা আসলে আমাদের ভর মেপে দেয়। ওজন নয়। কিন্তু সেসব মেশিন গুলা আমাদের ভর কিভাবে মাপে জানেন? তারা পৃথিবীর গ্রাভিটির সাহায্য মাপে। মেশিনটা মাটিতে থাকলে আপনি যখন তার উপরে উঠবেন তখন কিন্তু পৃথিবী আপনাকে তার গ্রাভিটির কারনে নিচের দিকে টানবে! আর সেই টানকেই আমারা ওজন বলি। তখন মেশিনটা পৃথিবীর হিসেবে আপনার ওজন পেয়ে যাবে। এবং সেটাকে পৃথিবীর গ্রাভিটি ৯.৮ দিয়ে ভাগ করে আপনার ভর আপনাকে দেখিয়ে দেবে। মেশিন টা কিন্তু সরাসরি আপনার ভর বের করতে পারবে না। কারন ডিজিটাল মেশিন দিয়ে সরাসরি ভর বের করা সম্ভব না। কারন পৃথিবীর গ্রাভিটি! এখন এই মেশিন টা যদি আপনি চাঁদে নিয়ে যান তাহলে কিন্তু চাঁদে গিয়ে মেশিনটা আপনার ভর বের করতে পারবে না। কারন মেশিনটা পৃথিবীর গ্রাভিটি কে ক্যালকুলেট করে আপনার ভর বের করতো। কিন্তু চাঁদ আর পৃথিবীর গ্রাভিটি তো এক না। তাই ডিজিটাল মেশিনে চাঁদে আপনার ভর কম দেখাবে। কিন্তু আপনার ভর ঠিকই আছে। চাঁদের গ্রাভিটি দিয়ে যদি আপনি একটা ডিজিটাল মেশিন বানিয়ে চাঁদে গিয়ে আপনার ভর মাপেন তাহলে কিন্তু ঠিক দেখাবে! অর্থাৎ ডিজিটাল মেশিন গুলো উক্ত স্থানের গ্রাভিটিকে কাজে লাগিয়ে আপনার ওজন বের করবে এবং তারপরে সেই গ্রাভিটি কে ভাগ করে আপনার ভর বের করে। - (২)
কিছু উদাহরণ: মনে করুন আমার ভর ৫০ কেজি। ডিজিটাল মেশিন সেটাকে ৪৯০ Newton হিসেবে পাবে। তারপর সেটাকে ৯.৮ দিয়ে ভাগ করে আমার ভর ৫০ কেজি দেখিয়ে দেবে। কারন মেশিন টার ভেতরে আগে থেকেই ৯.৮ ভাগ করার কমান্ড ইনপুট করা হয়েছে। এখন এই ৯.৮ কমান্ড ইনপুট করা মেশিন চাঁদে নিয়ে গেলে আমার সঠিক ভর নির্ণয় করতে পারবে না। কারন এতে পৃথিবীর গ্রাভিটি ইনপুট করা। এখন এটাতে যদি চাঁদের গ্রাভিটি ১.৬৬ ভাগ করার কমান্ড ইনপুট করে দেওয়া হয় তাহলে এই মেশিন টা চাঁদে আপনার আসল ভর বের করতে পারবে। যেমন প্রথম সে চাঁদের গ্রাভিটি অনুযায়ী আপনার ওজন বের করবে, ৫০*১.৬৬= ৮৩ নিউটন। তারপর সেটাকে ১.৬৬ দিয়ে ভাগ করে আপনার সঠিক ভর বের করে দেবে। ৮৩÷১.৬৬= ৫০ কেজি!

অ্যাটেলোফোবিয়া
অ্যাটেলোফোবিয়া হল নিজেকে অসম্পূর্ণতা ভাবা বা কিছু ভুল হওয়ার ভয় এবং ব্যর্থতার ভয়। এটা প্রায়ই নিজেকে 'পারফেকশনিস্ট' না হওয়া বা 'যথেষ্ট ভাল' না হওয়ার একটানা অনুভূতির জন্ম দিতে পারে।অ্যাটেলোফোবিয়া গ্রীক শব্দ এটেলিস থেকে এসেছে যার অর্থ "অপূর্ণ" বা "অসম্পূর্ণ"৷
অ্যাটেলোফোবিয়া হল যখন "পারফেকশনিজম" বা নিজেকে অতিরিক্ত সম্পূর্ণ বা নিঁখুত হওয়ার ইচ্ছা আপনাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করতে শুরু করে।মূলত নিখুঁত হওয়ার এই অযৌক্তিক, আবেগপ্রবণ রূপ আপনার স্ট্রেস-সম্পর্কিত অসংখ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। এটেলোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেরাই যে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন তা কখনও পৌঁছাতে পারে না। এটা গুরুতরভাবে তাদের সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলে। যখন তারা বুঝতে পারে যে তারা তাদের লক্ষ্যগুলি অর্জন করতে পারে নি, তখন নেতিবাচক আবেগগুলো তাদেরকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়৷অএকজন এটেলোফোবি প্রায়শই মনে করে যে তারা যা কিছু করে তাই ভুল।
এটেলোফোবিয়ার অনেক মানসিক, আবেগ এবং শারীরিক লক্ষণ রয়েছে।
মানসিক লক্ষণ:
-মানসিক ভয় ছাড়া
-যেকোন কিছু নিয়ে ভাবতে অসুবিধা -অবাস্তবতা বা নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুভূতি
- ব্যর্থ হওয়ার ভয়
- পরিস্থিতি হওয়ার আগে তার ফলাফল সম্পর্কে হতাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
- স্ব-সম্মান কম
- কোনও কিছুতে ব্যর্থ হলে চরম হতাশাগ্রস্ত হওয়া
- কোনও পরিস্থিতিতে অবাস্তব প্রতিক্রিয়া জানানো -সংবেদনশীল আসন্ন ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে নিয়মিত উদ্বেগ
- ভয়ঙ্কর পরিমাণ রাগ, দুঃখ, হিংসা এবং আঘাতের মতো আচরণ
- আকস্মিকভাবে পরিস্থিতি ছাড়ার ইচ্ছা
শারিরীক লক্ষণ
-শারীরিক স্ট্রেসের কারণে ঘাম
-বমি বমি ভাব
- আতঙ্কগ্রস্থ হওয়া সাথে মাথা ঘোরা
- হার্ট রেট হঠাৎ বেড়ে যাওয়া
- বুকের ব্যাথা
- অসাড়তা
- নিঃশ্বাসের দুর্বলতা
- অনিদ্রা
- পেশী টান
- অবিরাম অস্থিরতা
ট্রিটমেন্ট:
এক্সপোজার থেরাপি এবং বিহেভিয়ার থেরাপির মাধ্যমে কিছুটা কমানো সম্ভব৷
ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের সংগ্রামমুখর জীবনী
হোমিওপ্যাথির আবিষ্কারক ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের সংগ্রামমুখর জীবনী।
1755 সালের 10 এপ্রিল মধ্যরাতে জার্মান দেশের অর্ন্তগত মিসেন শহরে এক দরিদ্র চিত্রকরের গৃহে জন্ম হয়েছিল হ্যানিমানের। অবহেলা আর দারিদ্রের মধ্যেই বড় হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে এই শিশুটি একদিন হয়ে উঠবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নতুন ধারার জন্মদাতা । হ্যানিম্যানের বাবা গটফ্রিড চিনামাটির কারখানায় বাসনের উপরে নকশা আঁকার কাজ করতেন। এই কাজে উপার্জন ছিল খুবই কম, তাই অতি কষ্টে তাদের সংসার চলতো। হ্যানিম্যান ছিলেন চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। তার পিতার আশা ছিল হ্যানিমান বড় হয়ে তার সাথেই ছবি আঁকার কাজ করবে , তাকে সাহায্য করবে, তাতে হয়ত সংসারের আর্থিক সমস্যা কিছুটা দূর হবে। কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই হ্যানিম্যান ছিল শিক্ষার প্রতি অত্যাধিক আগ্রহ । বাড়িতেই বাবা-মায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষ করে 12 বছর বয়সে হ্যানিম্যান ভর্তি হলেন স্থানীয় টাউন স্কুলে। অল্পদিনের মধ্যেই তার অসাধারণ মেধার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন তার শিক্ষকরা। গ্রীক ভাষায় তিনি এতটা দক্ষতা অর্জন করেছিলেন যে শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তিনিই প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্রদের গ্রীক ভাষা পড়াতেন। টাউন স্কুলের শিক্ষা শেষ করে হ্যানিম্যান ভর্তি হলেন প্রিন্সেস ইস্কুলে। কিন্তু সংসারে ক্রমশই অভাব বাড়ছে। গটফ্রিডের পক্ষে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে উঠছিলো। নিরুপায় হয়ে তিনি হ্যানিম্যানকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে লিপজিক শহরে এক মুদির দোকানে মাল কেনাবেচার কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন । কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ এ কথা জানতে পেরে হ্যানিম্যানের স্কুলের সব মাইনে মকুব করে হ্যানিমানকে আবার পড়াশোনা আরম্ভ করালেন। যথা সময়ে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে তিনি উত্তীর্ণ হলেন । হ্যানিমান একাধিক ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। ক্রমশঃ তার মধ্যে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্খা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছিলো। তিনি লিপজিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। হাতে সম্বল ছিলো মাত্র ২০ খেরল, মানে আমাদের দেশের ১৪ টাকার মতন। নিজের খরচ মেটাবার জন্য এক ধনী গ্রীক যুবককে জার্মান এবং ফরাসী ভাষা শেখাতেন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকাশকের তরফে অনুবাদের কাজ করতেন।
হ্যানিম্যানের ইচ্ছা ছিল চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করবেন । তখন কোন ডাক্তারের অধীনে থেকে কিছুদিন কাজ শিখলে তবেই চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করার সুযোগ হতো। কিন্তু লিপজিগে কোন ভাল ডাক্তার না থাকায় তিনি ভিয়েনাতে ডাঃ কোয়ারিনের কাছে কাজ করার সুযোগ নিয়েছিলেন। তখন তার বয়স মাত্র বাইশ বছর, আর ইতিমধ্যেই তিনি ইংরাজী, আরবি, স্পানিশ , হিব্রু, লাটিন, এবং জার্মান ভাষায় যথেষ্ট পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন। এবার ভাষাতত্ত্ব ছেড়ে শুরু হলো চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন।
দুর্ভাগ্যক্রমে এই সময় তার সামান্য গচ্ছিত অর্থ একদিন সব চুরি হয়ে গেল। নিদারুণ অর্থ সংকটে পড়লেন তিনি। এই বিপদের দিনে তাকে সাহায্য করলেন স্থানীয় গভর্নর। তাকে তার লাইব্রেরী দেখাশোনার ভার দিলেন হ্যানিম্যানকে। এই সুযোগটিকে পুরোপুরি সদব্যবহার করেছিলেন তিনি । এক বছর নয় মাস, থাকাকালীন এই লাইব্রেরির প্রায় সমস্ত বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলেন । এখান থেকে হাতে কিছু অর্থ এলে তিনি ভর্তি হলেন আরল্যানজেন
বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই তিনি ২৪ বছর বয়সে ডাক্তারী পাশ করে অর্জন করলেন M. D. বা ডক্টর অব মেডিসিন ডিগ্রী। এক বছর প্রাইভেট প্রাকটিস করলেন, তারপর জার্মানীর এক হাসপাতালে চাকরি নিলেন।
অন্য সব বিষয়ের মত রসায়নের প্রতি হানিমানের ছিল সবচেয়ে বেশী আগ্রহ। সেই সুত্রেই হেসলার নামে এক ঔষধের কারবারীর সাথে তার পরিচয় হয়। নিয়মিত তার বাড়িতে যাতায়াত করতে হত তাকে। হেসলারের সাথে থাকতেন তার পালিতা কন্যা হেনরিয়েটা। হেনরিয়েটা ছিলেন সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং আকৃষ্টমনা। অল্পদিনেই তাই দুই তরুন-তরুনী পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ১৭৮২ সালের ১৭ই নভেম্বর দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। হ্যানিম্যানের বয়স তখন ২৭, এবং হেনরিয়েটার ১৮।
এই সময় হ্যানিম্যান রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে রচনা প্রকাশ করতে আরম্ভ করলেন। এই সময়ে বেরুলো তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা--- " কিভাবে ক্ষত এবং ঘা সারানো যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনামা "। সাথে সাথে তিনি বিভিন্ন বই অনুবাদের কাজেও নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। সে যুগের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা অন্য বিষয় সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন না, কিন্তু হ্যানিমানের আগ্রহ ছিলো বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে রসায়ন শাস্ত্রের উপরে বেশী জ্ঞাণ অর্জন করা। তাই তিনি রসায়ন বিদ্যার প্রতি অত্যাধিক আকৃষ্ট হয়েছিলেন । পারদকে অন্য ফর্মে এনে সলুবেল করে আবিষ্কার করলেন Mercurius Solubilis । এই সময়ে তার লেখা আর্টিকেল--On Arsenic Poisoning গবেষণার জগতে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়েছিলো। রসায়নের জগতে তাঁর গবেষণা তখন যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছিলো। তার নাম যশ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। এই সময় ফরাসি ভাষা থেকে জার্মান ভাষায় একাধিক গ্রন্থ তিনি অনুবাদ করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বইগুলি ছিলো---দুই খন্ডে---The Art of Manufacturing Chemical products, দুই খন্ডে----The Art of distilling liquors , ইত্যাদি ।
এই সময় কিছুদিন তিনি টাউন হাসপাতালে চাকরী নেন। হঠাৎ ঐ হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার ডাঃ ওয়াগলার অসুস্থ হলে পুরো হাসপাতালের দায়িত্ব এসে পড়ল হ্যানিম্যানের উপর । যেমন প্রচুর রোগী দেখতে থাকলেন, তেমনি দিনের পর দির বীতশ্রদ্ধ হতে থাকলেন তৎকালীন বিদঘুটে আনাড়ী হ্যাপাজার্ড চিকিৎসা ব্যবস্থার উপরে।
মন থেকে সায় দিচ্ছিল না ঐ সব বিসম চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা করতে।
মনের মধ্যে তাই অনবরত চিকিৎসা সংক্রান্ত নতুন কিছু উদ্ভাবনের স্বপ্ন ধীরে ধীরে জেগে উঠছিলো। তিনি অনুভব করতে পারছিলেন সমস্ত দিন হাসপাতালে পড়ে থাকলে মনের ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হবে না। ছেড়েই দিলেন তাই হাসপাতালের চাকরীটা। কিন্তু জীবিকা নির্বাহ ত করতে হবে। কয়েকটি পুত্র কন্যারও পিতা হয়ে গেছেন। সেইজন্য তখন থেকে তিনি তার রিসার্চ ওয়ার্কের ফাঁকে ফাঁকে অনুবাদের কাজে হাত দিলেন কিছু উপার্জন করার জন্য।
অাসলো সেই দিন। ১৭৯০ সালের একদিন। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডাঃ উইলিয়াম কালেনের একটি ইংরাজী মেটিরিয়া মেডিকা ইংরাজী থেকে জার্মান ভাষায় অনুবাদের কাজে হাত দিলেন। এই বইয়ের একটি অধ্যয়ের পাদটিকায় লেখা ছিল ম্যালেরিয়া জ্বরের ঔষধ কুইনাইন যদি কোন সুস্থ ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগ করা যায় , তবে অল্প দিনের মধ্যেই তার শরীরে ম্যালেরিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পাবে ।
উইলিয়াম কালেনের এই অভিমত হ্যানিম্যানের চিন্তা জগতে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করল। তিনি এর সত্যাসত্য পরীক্ষার জন্য নিজেই প্রতিদিন চার ড্রাম করে দিনে দুইবার সিঙ্কোনার রস খেতে আরম্ভ করলেন। এর তিন চারদিন পরে সত্যি সত্যিই তিনি ম্যালেরিয়ার মতন কাঁপুনি জ্বরে আক্রান্ত হলেন। এরপর পরিবারের প্রত্যেকের উপর তিনি এই একই পরীক্ষা করলেন এবং প্রতিবারই একই ফলাফল পেলেন। এর থেকে তার মনে প্রশ্ন জেগে উঠল , কুইনাইনের মধ্যে কি তাহলে ম্যালেরিয়া রোগের লক্ষণ সৃষ্টিকারী কোন ক্ষমতা আছে? যদি থাকে, তাহলে নিশ্চয় অন্য সমস্ত ঔষধের মধ্যেও রোগ সৃষ্টিকারী ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। অর্থাৎ যে ঔষধ খেলে মানুষের কোন রোগ নিরাময় হয়, সুস্থ দেহে সেই ঔষধ খেলে ছিল নিঃসন্দেহে সেই রোগ সৃষ্টি হয় ।
এতদিন চিকিৎসকদের ধারণা ছিল বিরুদ্ধভাবাপন্নতাই বিরুদ্ধভাবাপন্নকে অারোগ্য করে। অর্থাৎ মানুষের দেহে অসুস্থ অবস্থায় যে সব লক্ষণ প্রকাশ পায় তার বিপরীত ক্রিয়াশক্তি সম্পন্ন ঔষধই সেই রোগ আরোগ্য হয়। এই প্রচলিত মত তিনি খন্ডন করতে চাইলেন। এই পুরানো মতের বিরুদ্ধে শুরু হলো তার নতুন গবেষণা।
এই সময় তিনি যাযাবরের মতন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। স্থায়ী কোন আস্তানা গড়ে তুলতে পারেননি।
এমন সময় জার্মানীর ডিউক একটি মানসিক রোগের চিকিৎসালয় খোলার জন্য তার বাগানবাড়িটি হ্যানিম্যানকে ছেড়ে দিলেন। ১৭৯৩ সালে হ্যানিম্যান সেখানে একটি মানসিক রোগীদের হাসপাতাল গড়ে তুললেন, এবং একাধিক মানসিক রোগীকে সুস্থ করে তুলতে লাগলেন। ঐ সময় মানসিক রোগীদের উপর কঠোর নির্যাতন করা হত। শারীরিক নির্যাতন কে মানসিক রোগীদের চিকিৎসার প্রধান অঙ্গ বলেই মনে করা হত। হ্যানিমান সেই সময় পৃথিবীর প্রথম ব্যক্তি, যিনি ঐ সব বর্বর প্রথার নিন্দা ও প্রতিবাদ করেন।
কিন্তু তার গবেষণার কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে, মানসিক হাসপাতালে সারাটা দিন নষ্ট হচ্ছে, তার নিজের গবেষণাগারে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সময় পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কিছুদিন মানসিক হাসপাতালে থাকার পর তিনি আবার এই চাকরীটাও ছেড়ে দিলেন।
ইতিমধ্যে আটটি সন্তান হয়েছে। সংসারে দারুন অার্থিক অনটন। কিন্তু তা সত্তেও গবেষণার কাজে তিনি সামান্যতম বিঘ্ন ঘটান নি। একদিকে যেমন চিকিৎসাশাস্ত্র ছাড়াও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করতেন, তেমনি অন্যদিকে নিরন্তর পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজনে নিজেই বিভিন্ন রকম ঔষধ খেতে থাকলেন। এ কারনে বহুবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কিন্তু তা সত্তেও গবেষণার কাজ থেকে তিনি কখনও বিরত থাকেননি ।
১৭৯০ থেকে ১৭৯৬, দীর্ঘ ৬ বছরের অক্লান্ত গবেষণার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে যথার্থই সদৃশ সদৃশকে আরোগ্য করে। বিরুদ্ধভাবাপন্ন বিরুদ্ধভাবাপন্নতাকে আরোগ্য করে না। তার এই ধারণা কোন অনুমান বা কল্পনার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, এ সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড়ানো সত্যের এক স্বচছ সরোবর।
তার এই আবিষ্কার ১৭৯৬ সালে সে যুগের জার্মানীর একটি বিখ্যাত পত্রিকা হুফল্যান্ডস জার্নালে প্রকাশিত হল । প্রবন্ধটির নাম দেওয়া হল- এ্যান এসে অন এ নিউ প্রিন্সিপ্যল ফর এ্যাসারটেনিং দ্য কিওরেটিভ পাওয়ারস অব ড্রাগস এ্যান্ড সাম এক্সামিনেশন অফ দ্য প্রিভিয়াস প্রিন্সিপলস। ( An essay on a new principle for ascertaining the curative powers of drugs, and some examination of the new principles).
এই প্রবন্ধের মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন হ্যানিম্যান। সেই কারনে 1796 সালকে বলা হয় হোমিওপ্যাথির জন্ম বর্ষ। হোমিওপ্যাথি শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে গ্রীক শব্দ হোমোস (Homoeos), এবং প্যাথোস ( Pathos), --- অর্থাৎ রোগ লক্ষনের সম লক্ষন বিশিষ্ট ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা ।
হ্যানিম্যানের এই যুগান্তকারী প্রবন্ধ প্রকাশের সাথে সাথে চিকিৎসা জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হল । চিকিৎসা জগতের প্রায় সকলেই এই মতের ঘোরতর বিরোধী হয়ে উঠলেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তীব্র সমালোচনা মূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে আরম্ভ হলো। তাকে বলা হল অশিক্ষিত হাতুড়ে চিকিৎসক।
কিন্তু নিজের আবিষ্কৃত সত্যের প্রতি তার এতটা অবিচল আস্থা ছিল যে কোন সমালোচনাতে তিনি সামান্যতম বিচলিত হলেন না। নিজের এবং অাত্মীয়স্বজনের উপরে চালাতে থাকলেন বিভিন্ন ঔষধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তার মনে হয়েছিল সুস্থ মানব দেহের উপর ঔষধ পরীক্ষা করেই তার ফল উপলব্ধি করা সম্ভব। ঔষধের মধ্যে যে আরোগ্যকারী শক্তি আছে তা জানতে হলে সেই সব ঔষধ সুস্থ মানবদেহে পরীক্ষা করতে হবে, এছাড়া অন্য কোন উপায় নেই । সাধারণ পরীক্ষায় বা গবেষণাগারে পরীক্ষা করে কোন ঔষধের সাধারন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বোঝা যেতে পারে , কিন্তু মানুষের উপরে কিভাবে তা প্রতিক্রিয়া করবে তা জানবার জন্য মানুষের উপরে পরীক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন।
এইভাবে একের পর এক ঔষধ পরীক্ষা করে তিনি যে জ্ঞান অর্জন করলেন, যা সিমপটমস সংগ্রহ করলেন, তার ভিত্তিতে বিভিন্ন বাধা বিপত্তির মধ্য দিয়েও এযাবত যে ২৭ টি ঔষধ পরীক্ষা করতে পেরেছেন , ১৮০৫ সালে ল্যাটিন ভাষায় তা প্রকাশ করলেন একটি বই আকারে, যার নাম দিলেন --- Fragmenta de viribus medicamentorum positivis, sive in sano corporae humano observatis। এই বইটিকে তাই প্রথম হোমিওপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকা, বা ভেষজ লক্ষণ সংগ্রহ বলা যেতে পারে । এরপর থেকে তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা আরম্ভ করলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন তার পরীক্ষিত সত্যকে যতক্ষণ না রোগীর রোগ চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তা জনগণের মনে বিশ্বাস উৎপাদন করতে সক্ষম হবে না। এই সময় তাকে রোগী দেখা, চিঠিপত্র লেখা, গবেষণার কাজ, এবং এছাড়া বই লেখার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হত।
প্রতিদিন ভোর ছয়টায় তিনি ঘুম থেকে উঠতেন। সকালের জলখাবার ছিল দুই কাপ দুধ । তারপর কিছুক্ষণ বাগানে পায়চারি করে চেম্বারে চলে যেতেন। দুপুরবেলা বাড়ী ফিরে দুপুরের খাওয়া সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন। তার এই বিশ্রামের সময় টুকু কড়া পাহারায় রাখতেন তার মেয়েরা। কারণ, সামান্য সময় পেলেই আবার চিঠিপত্র লেখার কাজ শুরু করে দিতেন। অল্প কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই আবার রোগী দেখতে চলে যেতেন। সন্ধ্যা অবধি চলত তার রোগী দেখা। তারপর বাড়ী ফিরে এক কাপ গরম দুধ আর রাতের খাওয়া সেরে চলে যেতেন পড়ার ঘরে। মধ্য রাত, কোন কোন সময় শেষ রাত অবধি চলত চিঠিপত্র লেখা, বই লেখা এবং ঔষধ বানানো।
১৮১০ সালে প্রকাশিত হলো তার বিখ্যাত বই অর্গানন অব মেডিসিন। এই বইকে বলা হয় হোমিওপ্যাথির বাইবেল। এই বইতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতির নীতি ও বিধান সমূহের বিস্তৃত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অার অকাট্য যুক্তির উপর দাঁড় করিয়েছেন তার প্রতিটি অভিমত। এই বইয়ে হোমিওপ্যাথিক মূলনীতির আলোচনা ছাড়াও অন্যান্য চিকিৎসা প্রণালী আলোচনা করে তিনি হোমিওপ্যাথির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এছাড়াও সেযুগে চিকিৎসার নামে যে ধরনের অমানুষিক কার্যকলাপ প্রচলিত ছিল তার বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করলেন।
১৮১০ সালের এপ্রিল মাসে অর্গানন অব মেডিসিন বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে তুমুল সমালোচনা আর বিতর্কের ঝড় বইতে আরম্ভ হলো। তার উপর শুরু হল নানা রকম মানসিক নির্যাতন ।
তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হতে থাকলো বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালের মাধ্যমে, বই লিখে, প্যামফ্লেট বা ছোট ছোট পুস্তিকা পাবলিশ করে, গ্রামে গঞ্জে টিন বাজিয়ে ঢেঁড়ি পিটিয়ে। ১৮১০ সালের জুন মাস থেকে ডাঃ হেনরো নামে একজন মাসিক জার্নাল বের করা শুরু করে দিল --" এ্যান্টি অর্গানন ", নাম দিয়ে। ডাঃ সিমসন নামে একজন ডাক্তার আরও একটি জার্নাল বের করা শুরু করে দিল, " এ্যান্টি হোমিওপ্যাথিক আর্কিভ ", নাম দিয়ে। হুফল্যান্ড, যে একদা তার প্রিয় বন্ধু ছিলেন, যার ম্যাগাজিনেই তিনি ১৭৯৬ সালে An essay ------ পাবলিশ করেছিলেন, সে এখন তার জার্নালের প্রতিটি সংখ্যায় হ্যানিম্যানকে তীব্রভাবে আক্রমন করতে লাগলেন। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেকার সাহেব১৮১৯ সালের জুলাই মাসে, ১০০ পৃষ্ঠার উপরে একটি বই বের করলেন-- হ্যানিমান ও হোমিওপ্যাথির বিরুদ্ধে। দেমাকি নামে একজন বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ রসায়নবিদ, যার রসায়ন শাস্ত্রের বই হ্যানিমান মাত্র ২১ বছর বয়সে জার্মান ভাষায় অনুবাদ এবং পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত করে দেমাকের কাছ থেকে ভীষণভাবে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন, সে লিখলো,---" এই লোকটার রসায়ন শাস্ত্রে যা দক্ষতা ও পান্ডিত্য ছিলো তাতে হতে পারতো একটা বড় রসায়নবিদ, কিন্তু কি দূর্ভাগ্য, সে একটা হাতুড়ে ডাক্তারের ভূমিকায় নিজেকে নামিয়ে নিয়ে গেল।
এ্যাপোথিকারী গিল্ড নামে জার্মানীর কেমিস্ট এ্যান্ড ড্রাগিষ্ট এ্যাসোসিয়েশন গভঃ র কাছে আবেদন জানালো -- ঐ ছিটিয়াল, মূর্খ, অসভ্য লোকটার অবৈজ্ঞানিক কথাবার্তা ও কাজকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। গভঃ তাদের কথা শুনলেন, এবং হ্যানিম্যান ও তার ৬ জন ছাত্রকে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ তৈরী, ও বিতরন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিলেন। সব ছাত্রদের ঔষধ এবং ঔষধ বানানোর সরঞ্জাম সরকারী তত্ত্বাবধানে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হল। একজন ছাত্রের জেল হলো।
১৮২০ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারী হ্যানিমানকে সশরীরে লিপজিক কোর্টে হাজিরা দিয়ে তার চার্জের বিরুদ্ধে কিছু বলার থাকলে বলতে বলা হল।
হ্যানিমান জানতেন যারা নতুন কিছুর আবিষ্কারক তাদের সকলকেই এই ধরনের অত্যাচার সইতে হয়। এই ব্যাপারে তিনি প্রথম ব্যক্তি নন, শেষ ব্যক্তিও নন। নিজের উপর তার এতখানি আত্মবিশ্বাস ছিল যে ১৮১৯ সালে যখন তিনি অর্গাননের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত করেন বইয়ের প্রথমে লিখলেন Aude Sapare, যার অর্থ--- আমি নিজেকে সাহসী বলে ঘোষণা করছি, সত্যের জন্য আমি নির্ভীক। এই ভাবে তিনি তৎকালীন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তীব্র ভাবে অথচ শালীনতা বজায় রেখে প্রতিবাদ জানালেন।
হ্যানিম্যানের জীবদ্দশায় অর্গাননের আরও চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিটি সংস্করণে তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত থেকে উন্নততর রুপে নিয়ে যাওয়ার থিওরি দিয়েছেন।
ইতিমধ্যে লিপজিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অধ্যাপক হ্যানিম্যানকে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নতুন আবিষ্কার সম্মন্ধে বলার বা পড়ানোর জন্য নিয়োগে সচেষ্ট হলেন, কিন্তু অধ্যাপকদের একাংশ এই কাজে বাধা সৃষ্টি করতে থাকলেন। প্রবল বাধাদান সত্বেও হ্যানিম্যানকে শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা দেওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়া হল। তার বক্তৃতা শোনার জন্য দলে দলে ছাত্ররা এসে ভিড় করলো । সকলেই হানিমানের নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্বন্ধে জানতে উৎসাহী আর কৌতুহলী হয়ে উঠলো। তখন হ্যানিমান যদিও প্রৌড়ত্বের সীমানায় পৌঁছে গিয়েছেন, তবুও তরুণদের মত তেজোদ্দীপ্ত বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে হোমিওপ্যাথিক তত্ত্বের নানান বর্ণনা দিতে থাকলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় ছাত্রদের মধ্যে অধিকাংশই তার মতবাদকে গ্রহণ করতে চাইল না। কারণ তাদের মধ্যে প্রচলিতকে ছেড়ে নতুন কিছু গ্রহণ করার মতন মানসিকতা সৃষ্টি হল না। সামান্য কয়েকজন ছাত্র হিসেবে হ্যানিমান যাদের পেলেন তারা উত্তরকালে তার চিকিৎসা ব্যবস্থার ধারক-বাহক হয়ে উঠেছিলেন।
এই সময় ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তাদের মধ্যে বহু সংখ্যক সৈন্য টাইফাস নামক একটি রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। প্রচলিত কোন চিকিৎসাতেই তাদের রোগের প্রকোপ কমছিল না শেষে হ্যানিম্যানকে চিকিৎসার জন্য ডাকা হয়। তিনি বিরাট সংখ্যক সৈন্যকে অল্প দিনের মধ্যেই হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগ করে সুস্থ করে তোলেন । এতে তার খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
অস্ট্রিয়ার যুবরাজ সোয়াজেনবার্গ এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় কোন উপকার না পেয়ে শেষে হ্যানিম্যানের কথা শুনে তাকে চিকিৎসক হিসাবে নিয়োগ করেন। হ্যানিম্যানের চিকিৎসায় অল্প দিনের মধ্যেই তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন, কিন্তু সামান্য সুস্থ হতেই হ্যানিম্যানের নির্দেশ অমান্য করে আবার মদ্যপান করতে আরম্ভ করলেন। হ্যানিমান ক্ষুব্ধ হয়ে তার চিকিৎসা বন্ধ করে দিলেন এবং যুবরাজের চিকিৎসার জন্য আর তার প্রাসাদে গেলেন না। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই যুবরাজ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। এই ঘটনায় অস্ট্রিয়ানদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভের সঞ্চার হল। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকরা এই সুযোগে হ্যানিম্যানের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শুরু করলো এবং যুবরাজের মৃত্যুর জন্য সরাসরি হ্যানিমানকে দায়ী করলো।
আবার পিছনে লাগা, আবার কোর্ট। হ্যানিমানের উপর আবার নিষেধাজ্ঞা জারী করল জার্মান সরকার। হ্যানিম্যানের ঔষধ তৈরীর উপর আবার নিষেধাজ্ঞা জারী হলো। বলা হলো মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর এইসব ঔষধ। হ্যানিম্যান জবাবে শুধু বললেন--- ভবিষ্যতই সঠিক বিচার করবে । সম্মিলিত ভাবে চিকিৎসকরা সবাই তাকে বিরোধিতা করতে আরম্ভ করলেন । তাকে লিপজিক থেকে বহিষ্কারের জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠলেন সবাই। হ্যানিম্যান বুঝতে পারলেন তার পক্ষে আর লিপজিগে থাকা সম্ভব হবে না। তার জীবন সংশয়ও হতে পারে। নিরুপায় হ্যানিম্যান ১৮২১ সালের জুন মাসে লিপজিক পরিত্যাগ করে জার্মানীর কোথেন শহরে এসে বাসা ভাড়া নিলেন।
হ্যানিমানের জীবনের প্রতিটি পর্যায় যেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মহাসমুদ্রে পাল ভাঙ্গা একটা নৌকা। চারিদিকে শুধু মানুষের বিদ্বেষ আর ঘৃণা। প্রতি পদক্ষেপে মানুষের অসহযোগিতা আর বিরুদ্ধাচারণ। সংসারে নিদারুন অভাব। কিন্তু এই প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ছিলেন অটল, নির্বিকার। সংকল্পে ছিলেন পর্বতের মত দৃড়। অসাধারণ ছিল তার মহত্ত্বতা। কারন যে সব চিকিৎসকরা তার বিরুদ্ধাচারণ করতেন, তাদের বিরুদ্ধে কখনও তিনি কোন কটু কথা বলেন নি, ঘৃণা প্রকাশও করেন নি, কোনরকম বিদ্বেষ পোষনও করেন নি।
বরং তিনি লিখলেন-- সকল চিকিৎসকরা আমার ভাই, আমার বন্ধু। তাদের কারুর বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই।
তিনি লিখলেন--- সত্যের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ প্রচার মানুষের অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু মানুষের এই অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশের জন্য হোমিওপ্যাথির অগ্রগতি রোধ করা যাবে না।
অবশেষে সুখবর। দূর্যোগের কালো রাতও একসময় শেষ হয়ে ভোরের আকাশের রঙীন বর্ণচছটা দেখে। হোমিওপ্যাথির এই দুর্দিনে হ্যানিম্যানের পাশে এসে দাঁড়ালেন কোথেন শহরের মেয়র ডিউক ফার্দিনান্দ। তিনি কোথেন শহরে হ্যানিমানকে শুধু বাস করার অনুমতি নয়, তার ঔষধ তৈরী করার এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করার অনুমতিও দিলেন। তার ঔষধ প্রস্তুত ও চিকিৎসা করার অনুমতির জন্য যখন ডিউক এর কাছে আবেদন করলেন সেই আবেদন পরীক্ষার দায়িত্ব ছিল তখনকার দিনের একজন নাম করা চিকিৎসক আদম মূলারের উপর। হ্যানিম্যানের সাথে সাক্ষাতের অসাধারণ বিবরণ দিয়েছেন ডাঃ মুলার। তিনি লিখেছেন -- " লাঞ্ছিত, অপমানিত মানুষটিকে দেখে আমার দুই চোখ জলে ভরে গিয়েছিল। এই মানুষটির দুঃখে আমার হৃদয় বেদনার্ত হয়ে উঠেছিল। আমি উপলব্ধি করতে পারছিলাম আমার সামনে বসে আছে এই শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক, ভবিষ্যৎই যার আবিষ্কারের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারবে "।
ডিউক ফার্দিনান্দও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন হ্যানিমানের প্রতিভা। তিনি তাকে শুধু ঔষধ প্রস্তুত করার অনুমতি দিলেন তাই নয়, তাকে রাজসভার চিকিৎসক হিসাবেও মনোনীত করলেন ।
১৮২২ সালে হ্যানিম্যান প্রকাশ করলেন প্রথম হোমিওপ্যাথিক পত্রিকা। এর কয়েক বছর পর প্রকাশ করলেন তার শ্রেষ্ঠ রচনা- ক্রনিক ডিজিজ, দেয়ার নেচার এ্যান্ড হোমিওপ্যাথিক ট্রিটমেন্ট, ------পুরাতন রোগ চিকিৎসা সম্বন্ধীয় চিকিৎসা জগতে এক যুগান্তকারী পুস্তকের সংযোজন। পুরাতন রোগের চিকিৎসা সম্বন্ধে এমন বই ইতিপূর্বে কেউ রচনা করেন নি ।
হ্যানিমান বললেন, সোরা সিফিলিস, এবং সাইকোসিস হল মানবদেহের যাবতীয় রোগের কারণ, এবং এদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকারক হলো সোরা। তার এই অভিমতের বিরুদ্ধে আবার তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হল । তার কিছু প্রিয় ছাত্র ও অনুগামীরা তার এই সব থিওরি বা মতের বিরুদ্ধাচারণ করে তার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলেন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও বহু চিকিৎসক অনুভব করতে পারলেন হ্যানিমানের কথার ও রচনার গুরুত্ব । কয়েকজন বিখ্যাত এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক হোমিওপ্যাথিক শিক্ষার জন্য হ্যানিম্যানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন । আমেরিকা থেকে ডাঃ কন্সট্যান্টাইন হেরিং, ইংল্যান্ড থেকে ডাঃ কুইন এলেন-- হোমিওপ্যাথি শেখার জন্য। পরবর্তীতে এরা সকলেই নিজের দেশে হোমিওপ্যাথির প্রচার প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন ।
১৮৩০ সালে হ্যানিম্যানের স্ত্রী হেনরিয়েটা ৬৭ বছর বয়সে মারা গেলেন। তিনি ১১ টি সন্তানের জননী ছিলেন। সমস্ত জীবন হ্যানিমানের পাশে ছিলেন তার যোগ্য সহধর্মিনী হিসাবে। বাইরের প্রতিকূলতার মাঝে হ্যানিমান যখন ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন, সংসার জীবনে তখন অফুরন্ত শক্তি সাহস আর ভালোবাসায় পূর্ণ করে দিয়েছিলেন হেনরিয়েটা। হ্যানিমানের জীবনের অন্ধকারময় দিনগুলিতে হেনরিয়েটা ছিলেন তার চলার সঙ্গী, আর হ্যানিমানের জীবনে যখন অন্ধকার দূর হয়ে আলোর আভা ফুটে উঠলো , হেনরিয়েটা তখন হারিয়ে গেলেন চির অন্ধকারের জগতে ।
অবশেষে হ্যানিম্যানের জীবনে এল নতুন বসন্ত। তখন তার বয়স ৮০ বছর। ১৮৩৪ সালের ৮ই অক্টোবর এক সুন্দরী ফ্রেন্স যুবতী, নাম মাদাম মেলানি দূরারোগ্য চর্ম রোগের চিকিৎসার জন্য হ্যানিম্যানর কাছে এলেন। তিনি ছিলেন ফ্রান্সের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন আইনমন্ত্রীর পালিতা কন্যা। হানিমানের সাথে সাক্ষাতের সময় তার বয়স ছিলো ৩৫ বছর। মিলানি ছিলেন কবি, এবং শিল্পী । বয়সের বিরাট ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দুজনে দুজনের ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভায় মুগ্ধ হলেন, এবং ১৮৩৫ সালের ১লা জানুয়ারি দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। মিলানি হ্যানিমানকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারীতে নিয়ে গেলেন। সেখানে সরকারীভাবে তাকে ডাক্তারি করার অনুমতি দেওয়া হল।
জীবনের এই অন্তিম পর্বে এসে হ্যানিমান পেলেন-- জীবনব্যাপী সংগ্রামের পুরস্কার ---- খ্যাতি, সম্মান, অর্থ, আরাম, সুনাম, যশ, এবং সাংসারিক সুখ।
ক্রমশঃ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগল চারিদিকে। হ্যানিম্যানের জীবদ্দশায় চারটি হোমিওপ্যাথিক কলেজ গড়ে উঠেছিল। তার কয়েকজন ছাত্র প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক হিসেবে সুনাম অর্জন করলেন।
৮৮ বছরে পা দিলেন হ্যানিমান। দেহের শক্তি কমে এসেছিলো কিন্তু মনের শক্তি একটুও হ্রাস পায়নি। সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে শেষ রক্ষা হল না ।
১৮৪৩ সালের ২রা জুলাই শেষ রাতে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন হোমিওপ্যাথির জনক, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক, শ্রেষ্ঠ এক বিজ্ঞানী ।
প্রকৃত মানবপ্রেমী কখনো নিজেকে প্রচার করে না। যদি অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয় তোমার পথ শ্রেষ্ঠ, তবে তা মানব কল্যাণে অবশ্যই নিয়োজিত করবে।
হ্যানিম্যান অত্যন্ত ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বারবার বলেছেন, সব কিছু অর্পণ কর ঈশ্বরকে। সব খ্যাতি অর্পন কর ঈশ্বরকে। তিনি বিশ্বাস করতেন জগতের সব কল্যানকর কাজকর্মের মধ্যে ঈশ্বরের স্পর্শ আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, তার দ্বারা মানব কল্যাণে এই হোমিওপ্যাথির অাবিষ্কারও ঈশ্বরের দান। তাই তিনি বলেছেন, " Homoeopathy is a divine art of healing gifted by the gracious God, for the sufferings humanity ".
জীবনের বৃহত্তর অংশ তিনি অতিবাহিত করেছেন অন্যের নিন্দা, সমালোচনা, আর অপমানজনক কথাবার্তা শুনে। প্রতি পদক্ষেপে তাকে সইতে হয়েছে নির্যাতন, অপবাদ, আর গ্লানি। স্বার্থান্বেষী মানুষরা তাকে বারবার গৃহহারা করেছে, ঘরছাড়া করেছে। সারা জীবনে তিনি ৩৬ বার বাসা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। এমন বহু দিন গিয়েছে তিনি ও তার পরিবারের সবার কপালে জল ছাড়া কোন খাবার জোটে নি। সাবানের অভাবে আলু দিয়ে জামা কাপড় পরিষ্কার করেছেন। কনকনে শীতের রাতে ঘরে আগুন জ্বালাবার মত এক টুকরো কাঠ জোটেনি। একটা পাউরুটি ১০ টুকরো করে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়েছে। কিন্তু কখনই, কোন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তিনি ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হারান নি, এবং সত্য থেকে অবিচল হন নি। ঈশ্বরের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলো তার গভীর আত্মবিশ্বাস।
মৃত্যুশয্যায় স্ত্রীকে বলেছেন, আমি মানুষের জন্য যা কিছু করেছি সবই ঈশ্বরের অসীম করুণা আর তার শক্তিতে। ঈশ্বরের শক্তিতেই আমি সব করতে পেরেছি। সব কিছুর জন্যেই আমি ঈশ্বরের কাছে চির ঋণী । ঈশ্বর বিশ্বাসের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল তার গভীর আত্মবিশ্বাস।
তাই বোধ হয় মৃত্যুর পূর্বে তিনি নিজের সম্বন্ধে শেষ বাণী উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন--- " আমার জীবন বৃথা যায়নি"।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা হয়।
ভারতে বর্তমানে প্রায় ৭৮৫৬ টি সরকারি হোমিওপ্যাথিক চেম্বার ও ২০৭ টি সরকারি হোমিওপ্যাথিক হসপিটাল আছে, তাছাড়াও অনেক বেসরকারি হোমিওপ্যাথিক হসপিটাল আছে ।
সাইকোলজি টেস্ট!!
আপনার রাগের মাত্রা কতটুকু ?
আজকে আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চলেছি একটি নতুন সাইকোলজি টেস্ট।এই টেস্ট টি থেকে বের হয়ে আসবে আপনার রাগের মাত্রা কতটা।এবং এই রাগ আপনার জীবনে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করে।
এখানে আপনাকে কিছু প্রশ্ন করা হবে এবং প্রতিটি প্রশ্নে কিছু অপশন দেয়া থাকবে।অপশন গুলোর মধ্যে থেকে যে কোন একটি উত্তর সিলেক্ট করবেন এবং তার জন্য দেয়া নাম্বার গুলো একটি একটি করে যোগ করতে থাকবেন। সবশেষে আপনার পয়েন্ট কত হবে সেটার উপর ভিত্তি করে জেনে নিতে পারবেন আপনার রাগের মাত্রা কতটা।
চলুন টেস্ট টি শুরু করা যাক-----
১)ধরুন আপনি আপনার বাগানে একটি ফুল গাছ লাগিয়েছেন এবং আপনি গাছটির বেশ যত্ন করেন।হটাৎ একদিন দেখলেন আপনার প্রতিবেশীর একটি কুকুর আপনার গাছটি নষ্ট করে ফেলেছে,এবং কুকুরটা আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে,এখন আপনি কি করবেন ?
ক)কুকুরটাকে বাড়ি দিয়ে মেরে ফেলবেন(১০)
খ)কুকুরটাকে ধরে আটকে রাখবেন এবং ইচ্ছে মত পিটিয়ে ছেড়ে দেবেন(৭)
গ)কিছুই করবেন না(০)
ঘ)কুকুরের মালিককে বিষয়টি সম্পর্কে জানাবেন(৪)
২)আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন ,হটাৎ কেউ একজন আপনার পিঠে থাপ্পড় মারল,আপনি তাকে চেনেন না। তৎক্ষণাৎ সে আপনার কাছে দূঃখ প্রকাশ করল এবং বলল পেছন থেকে আপনাকে তার বন্ধুর মত লাগছিল বলে সে ভুলে কাজটি করে ফেলেছে।এবার আপনি কি করবেন ?
ক)কিছু বলার আগেই বকা দিয়ে উঠবেন(১০)
খ)কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দেবেন(৬)
গ)এটা স্বাভাবিক তাই কিছু বলবেন না(০)
ঘ)আশ্চর্য জনক একটা ভাব করে তাকে লজ্জা দিবেন(৭)
৩)আপনি সুন্দর করে আপনার জামা কাপড় হ্যঙ্গারে ঝুলিয়ে রেখেছেন৷বাইরে থেকে এসে দেখলেন,কেও একজন তা এলােমেলো করে রেখেছে এবং তা আগের মত গোছানো নেই।কেমন রাগ হবে আপনার?
ক)একদমই না(০)
খ)কিছুটা(২)
গ)মোটামুটি(৪)
ঘ)অনেক(৬)
ঙ)খুব বেশি(৯)
৪)কেও কোন ভুল করে তার দোষ আপনার উপর চাপিয়ে দিলে আপনার কেমন রাগ হবে?
ক)একদমই না(০)
খ)কিছুটা(২)
গ)মােটামুটি(৪)
ঘ)অনেক(৭)
ঙ)খুব বেশি(৯)
৫)আপনি ব্যাংকে টাকা জমা দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন।এই সময় একটি ছোট বাচ্চা হাতে আইসক্রিম নিয়ে আপনার কাপড়ের হাত দিয়ে কাপড় টা নোংরা করে দিল।এ অবস্থায় আপনি কেমন বোধ করবেন??
ক)একেবারেই রাগ করবেন না(০)
খ)কিছুটা রাগান্বিত হবেন(৪)
গ)প্রচন্ড রেগে যাবেন(১০)
ঘ)বাচ্চাটাকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবেন(৮)
৬)মনে করুন আপনার বন্ধুরা আপনার পার্টনারকে নিয়ে মজা নিচ্ছে এবং আপনার কাছে তা অতিরিক্ত বলে মনে হচ্ছে এই সময় আপনি কি করবেন?
ক)সেখান থেকে রাগ করে চলে যাবেন(১০)
খ)কথা ঘুরানোর চেষ্টা করবেন(৫)
গ)তাদের সাথে ঝগড়া করবেন(৮)
ঘ)বন্ধুদের বলবেন আপনার পার্টনার এরকমই কিন্তু এতে আপনার কোন সমস্যা নেই।(৪)
ঙ)কিছুই করবেন না(০)
৭)আপনি আপনার বন্ধুকে নিয়ে মুভি দেখতে গেছেন, আপনি মুভিটা বেশ উপভোগ করছেন কিন্তু আপনার পাশের ছিটে বসা লোকটা বারবার নারাচরা করছে ও ফোনে কথা বলছে,এ অবস্থায় আপনি কেমন বোধ করবেন?
ক)একেবারেই রাগান্বিত হবেন না(০)
খ)কিছুটা রাগান্বিত হবেন।(৫)
গ)প্রচন্ড রেগে যাবেন(৮)
৮)আপনি রেস্টুরেন্টে চার কাপ কফি একসাথে একটি ট্রে তে করে নেয়ার চেষ্টা করছেন Iএমন সময় কেউ একজন হঠাৎ করে আপনার অতিক্রম করার সময় আপনার সাথে ধাক্কা খেল এবং কফি সব পড়ে গেল কেমন রাগ লাগবে আপনার?
ক)একদমই না(০)
খ)কিছুটা(২)
গ)মোটামুটি(৪)
ঘ)অনেক(৭)
ঙ)খুব বেশি(১০)
৯)আপনি একটি যন্ত্র কিনে আনলেন এবং তা প্লাগ করলেন কিন্তু দেখলেন যন্ত্রটি কাজ করছে না এখন আপনার রাগ কেমন হবে?
ক)একদমই না(০)
খ)কিছুটা(২)
গ)মোটামুটি(৫)
ঘ)অনেক(৭)
ঙ)খুব বেশি(১০)
১০)রাস্তায় আপনার গাড়ি ট্রাফিক লাইটের সিগন্যাল এর কারণে থেমে আছে।তারপরেও পেছনের গাড়ী হর্ণ বাজাতেই আছে কেমন রাগ লাগবে সেই মুহূর্তে?
ক)একদমই না(০)
খ)কিছুটা(২)
গ)মোটামুটি(৪)
ঘ)অনেক(৬)
ঙ)খুব বেশি(৮)
১১)আপনার সামনে কেউ না জেনে কোন বিষয় নিয়ে তর্ক করলে কেমন রাগ হবে ?
ক)প্রচন্ড রাগ হবে(৮)
খ)একেবারেই রাগ করবেন না(০)
গ)কিছুটা রাগ লাগবে(৪)
ঘ)অনেক রাগ হবে(৬)
১২)আপনি ও আরেক জন ব্যক্তি প্রয়োজনীয় কোন বিষয়ে কথা বলছেন এই সময়ে কেউ নাক গলাতে আসলে কি করবেন?
ক)তাকে পাত্তা দেবেন না(৩)
খ)কথা বন্ধ করে তাকে লজ্জা দিবেন(৬)
গ)টিটকারি করে তাকে অপমান করবেন(৯)
১৩)আপনি আপনার মোবাইলের শেষ ব্যালেন্স দিয়ে কাউকে কল করেছেন।কিন্তু কথা শেষ হবার আগেই কলটি নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে কেটে গেল কেমন রাগ হবে আপনার?
ক)প্রচন্ড রেগে যাবেন(১০)
খ)খুব রাগ লাগবে(৭)
গ)কিছুটা রাগান্বিত হবেন(৪)
ঘ)একেবারেই রাগ করবেন না(০)
১৪)আপনি তারাহুরো করে কোথাও যাচ্ছেন এমন সময় আপনার সার্টের বোতাম ছিঁড়ে গেল,কেমন রাগ হবে আপনার?
ক)প্রচন্ড রেগে যাবেন(৯)
খ)খুব রাগ লাগবে(৬)
গ)কিছুটা রাগান্বিত হবেন(৪)
ঘ)একেবারেই রাগ করবেন না(০)
১৫)কেউ আপনাকে নিয়ে মজা করলে আপনি কি করেন?
ক)তার দূর্বলপয়েন্টে আঘাত করেন(৬)
খ)সরাসরি রিয়াক্ট করে প্রতিবাদ করেন(৮)
গ)কথা ঘুরানোর চেষ্টা করেন(৪)
ঘ)উল্টো নিজেকে নিয়ে নিজেই মজা করেন(০)
১৬)কেউ আপনার থেকে একটি বই পড়ার জন্য নিল পরে আর ফেরত দিলো না,পরবর্তীতে সে আবার বই চাইলে কি করবেন?
ক)বইটি দিয়ে দেবেন(০)
খ)১ম বইটি না দেবার জন্য লজ্জা দিবেন(৫)
গ)সরাসরি অপমান করবেন(১০)
১৭)আপনি কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন কিন্তু সে কোন উত্তর দিল না,কেমন রাগ হবে আপনার?
ক)প্রচন্ড রাগ হবে(১০)
খ)একেবারেই রাগ করবেন না(০)
গ)কিছুটা রাগ লাগবে(৩)
ঘ)অনেক রাগ হবে(৬)
১৮)দোকানে শপিং করতে গেলেন এবং একজন সেলস ম্যন আপনাকে তার প্রডাক্টের ব্যপারে একটি রিভিউ বললো আপনি তাড়ার মধ্যে আছেন,এখন কেমন রিভিউ দেবেন?
ক)সময় নেই বলে চলে আসবেন(৪)
খ)বাজে রিভিউ দেবেন(৮)
গ)ভালো রিভিউ দেবেন(০)
১৯)আপনার গাড়ি বালি বা কাঁদায় আটকে গেলে কেমন রাগ হবে আপনার?
ক)প্রচন্ড রাগ হবে(১০)
খ)একেবারেই রাগ করবেন না(০)
গ)কিছুটা রাগ লাগবে(৩)
ঘ)অনেক রাগ হবে(৬)
২০)আপনার কোন বন্ধুর সাথে ঘুরতে যাবার প্ল্যান করছেন,ঠিক যাবার আগ মুহূর্তে সে প্ল্যানটি বাতিল করল,কেমন রাগ হবে আপনার?
ক)প্রচন্ড রাগ হবে(১০)
খ)একেবারেই রাগ করবেন না(০)
গ)কিছুটা রাগ লাগবে(৩)
ঘ)অনেক রাগ হবে(৬)
০ থেকে ৭০
👉👉আপনি সহজে রেগে যান না এটা আপনার অনেক বড় গুণ।এই কারণে লোকজন আপনার কাছ থেকে ফায়দা নিতে চেষ্টা করে।অনেকে আবার আপনার উপর চাপ প্রয়োগ করে থাকে।আপনার রাগের মাত্রা কম হবার কারণে অনেকেই আপনার কাছে তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য আসে।এটা আপনি বেশির ভাগ সময়ই উপভোগ করেন।আবার কখনো কখনো এটা আপনার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।তবে আপনি যদি রেগে যান তবে সেটা মারাত্বক পর্যায়ে চলে যায়। তবে যাই হোক না কেন সবচেয়ে বড় কথা হল আপনার রাগের উপর আপনার নিজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।আপনি সহজেই আপনার এই ক্ষমতাকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন।আপনার আচরণ আসলে দুইটি বিপরীত ধর্মী পারসোনালিটির সাথে মেলে,হয় আপনি কেউ অপরাধ করলেও তার সাথে রাগ করার সাহস রাখেন না অথবা আপনার কাছে সম্পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা ছোট খাট বিষয়ে ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে চান না।তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো আপনি একজন ঠান্ডা মাথার লোক। অস্বাভাবিককে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষমতা আপনার মধ্যে আছে।
৭১ থেকে ১৪০
👉👉আপনি যদি এই ক্যাটাগরিতে পরে থাকেন তবে আপনার রাগের মাত্রা এভারেজ সাধারণ মানুষের মতোই ।আপনার জন্য সত্য এটাই যে যার উপর আপনি রাগ করতে সক্ষম শুধু মাত্র তার উপরই আপনি রাগ দেখিয়ে থাকেন।আর যার উপর রাগান্বিত হলে আপনার ক্ষতি তার উপর ভুলেও রাগ করেন না।নিজের রাগকে কন্ট্রোল করার ক্ষমতা আপনার মধ্যে আছে।আবার কারো উপরে উপর রাগ করে আপনি সেটা খুব বেশি সময় মনেও রাখেন না।এটা আপনার একটি ভালো গুণ।কাছের মানুষ গুলোর জন্য আপনার মানসিকতা অনেকটা এরকম যে, আজ কেউ ভালো কিছু করলে আপনি তাকে বাহবা দেন ঠিকই।কিন্তু সেই লোকটিই কাল যদি খারাপ কিছু করে তবে তাকে গালমন্দ করতেও আপনি দৃধা বোধ করেন না।
১৪১থেকে ২০০
👉👉আপনি যদি এই ক্যাটাগরিতে পরে থাকেন তবে আপনার রাগের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি । আপনি অল্পতেই রেগে যান।লোকজন আপনার কাছ থেকে একটু দূরে থাকতেই পছন্দ করে। কখনো কখনো আপনি নিজেই সেটা চান।তবে আপনার কাছের কিছু মানুষ আপনাকে খুব ভালোবাসে।আপনি রাগান্বিত হয়ে গেলে আপনি কাকে কি বলছেন তার উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না।এই সব আচরণ অনেক সময় আপনার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।আপনি রাগের মাথায় কখনো কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন।
সবশেষে বাস্তবতা হলো এটাই যে মানুষের রাগ অন্য আর সব আবেগের মতোই একটি আবেগের বহিঃপ্রকাশ।যেটা সম্পুর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখাটাই গুরুত্বপূর্ণ।তাছাড়া এটা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তাহলে এটা শুধু ক্ষতিই বয়ে আনবে।
হানি_নাট
সুস্বাদু, স্বাস্থ্যকর ফুড মানেই♥ড্রাই ফ্রুটস ও হানি নাট♥। যার গুনাবলী অল্পকথায় বলে শেষ করা যাবেনা।
#উপকারিতাঃ
♦ প্রেগন্যান্ট মা এবং যারা ডায়েট করছেন তাদের
জন্য এটি একটি সুপারফুড।
♦ পুরুষ-মহিলা ও শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
বৃদ্ধি করে।
♦ প্রচুর পরিমানে এতে ক্যালসিয়াম, মিনারেল,
আয়রন ও ভিটামিন থাকে।
♦ পুষ্টিতে ভরপুর বিভিন্ন উপাদান থাকায় দেহে
বহুগুনে শক্তি সঞ্চারিত হয়।
♦ শিশুদের ব্রেন-শক্তিকে তীক্ষ্ম ও সতেজ করে।
🌿 মিক্সড ড্রাই ফ্রুটস ও হানি নাটের উপাদানগুলো:
১। কিসমিস
২। কাঠ বাদাম
৩। কাজু বাদাম
৪। আখরোট
৫। পেস্তা বাদাম
৬। খুরমা খেজুর
৭। শুকনো নারকেল
৮। চেরি
৯। চিনা বাদাম ও
১০। আলু বোখারা
১১। সাদা কিসমিস
১২।এপ্রিকোট
বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় কই মাছ কেন মাটিতে উঠে আসে?
ঋতুচক্রে এখন বাংলাদেশে বর্ষাকাল চলছে। আমাদের দেশেও বর্ষাকালে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়। আষাঢ়-শ্রাবণে দিকে যখন প্রচন্ড বৃষ্টি হয়, আশেপাশের পুকুর, খাল-বিল থেকে কই মাছ মাটিতে উঠে আসে। জীবন্ত কই মাছ মাটির ওপর লাফালাফি করে। এই ঘটনাকে গ্রামের মানুষ বলে ‘মাছ উজানো’।
উজান হলো স্রোতের বিপরীত দিকে যাওয়া। কেন এমন হয়? নিশ্চয়ই প্রশ্নটা আপনার মনেও এসেছে। ইন্টারনেট কিংবা খুব বেশি বইতে এই বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই। এই বিষয়ে জানতে হলে প্রথমে ট্যাক্সিস সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।
ট্যাক্সিস একটা টার্ম; যার অর্থ প্রাণীর দিকমুখিতা। সহজভাবে বললে, বিভিন্ন পরিবেশে (যেমন- তাপ, চাপ, আলো, শব্দ) প্রাণীর ছুটে চলা। যখন বিভিন্ন পরিবেশের দিকে প্রাণী ছুটে চলে, তখন তাকে পজেটিভ ট্যাক্সিস বলা হয়। কই মাছের ট্যাক্সিস হলো পজিটিভ ট্যাক্সিস।
কোনো প্রাণী স্রোতের দিকে চললে তাকে রিওট্যাক্সিস বলে। যা এক প্রকার পজিটিভ ট্যাক্সিস। বৃষ্টি হলে পুকুর বা নদীতে পানি বেড়ে যায়। তখন স্রোতের দিকে কই মাছ চলতে শুরু করে; বিষয়টিকে অনেকেই নতুন পানিতে যাওয়া বলে থাকেন। আর কই মাছের পাখনা বেশ শক্ত. তাই তারা মাটির উপরেও নড়াচড়া করতে পারে।
আরেকটি কারণও আছে অবশ্য। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে পুকুর বা জলাশয়ের পানিতে অক্সিজেন এবং খাবারের ঘাটতি তৈরি হয়। কই মাছ বৃষ্টির পানি পাওয়ায় সে অক্সিজেন ও খাবারের জন্য স্রোতের সঙ্গে রিওট্যাক্সিসে সাড়া দেয়। শুধু কই-ই নয়; শিং, মাগুর, গুতুম মাছও বৃষ্টির সময় স্রোতের দিকে এবং পুকুর পাড়ে উঠে আসে।
অনেক দেশেই মাছ বৃষ্টি হয়। বিশেষ করে হন্ডুরাসে। গত বছর মাছ বৃষ্টির অভিজ্ঞতা লাভ করেছে শ্রীলঙ্কাও।
ঘি
আমরা কি জানি প্রতিদিন শুধুমাত্র এক চামচ ঘি এর উপকারিতা??
প্রতিদিন কেন এক চামচ ঘি খাবেন:
১. ত্বকের শুষ্কতা দূর করে তা আর্দ্র রাখে।
২. ভিটামিন এ থাকায় এটি চোখের জন্য ভালো। গ্লুকোমা রোগীদের জন্য উপকারী। এটি চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
৩. ঘি খেলে যে হরমোন নিঃসরণ হয়, এতে শরীরের সন্ধিগুলো ঠিক থাকে।
৪. এটি অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ বলে অন্য খাবার থেকে ভিটামিন ও খনিজ শোষণ করে শরীরকে রোগ প্রতিরোধে সক্ষম করে তোলে।
৫. পোড়া ক্ষত সারাতে কাজ করে ঘি। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আছে ঘি খেলে মস্তিষ্কের ধার বাড়ে ও স্মৃতিশক্তি বাড়ে।
সরিষার তেলের উপকারিতার
সরিষার তেলের উপকারিতার কথা অনেকেই জানেন। এ তেল দিয়ে শুধু ত্বকই নয়- হৃৎপিন্ড, পেশি, গাঁটের সমস্যা পর্যন্ত দূর করা যায়। সরিষার তেল ভেষজ প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক। এটি ব্যবহারে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এবং সহজেই হজমকারক। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শ্বাসনালি এবং মূত্রনালি ও ব্রঙ্কাইটিস ইনফেকশন সারাতে সরিষার তেল বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ তেলে রোগের জীবাণু ধ্বংসের ক্ষমতা রয়েছে। এর উপাদান শরীর ক্ষুদ্রান্ত্রের মাধ্যমে গ্রহণ করে এবং ফুসফুস ও বৃহদান্ত্রের প্রয়োজনীয় জীবাণুকে কোনোরকম ক্ষতি না করেই কিডনির মাধ্যমে তা নিষ্কাশিত করে দেয়। এই তেল বৃহদান্ত্রের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও হজমে সহায়তা করে। তবে এ ক্ষেত্রে কি রকম তেল ব্যবহার করতে হবে- সেটা না জানলে ফলাফল খারাপ হতে পারে। লক্ষ্য রাখার বিষয় হলো, শরীরের জন্য নামি-দামি ব্যান্ডের সরিষার তেল কিন্তু মোটেও উপকারী নয়। আসলে প্রয়োজন খাঁটি সরিষার তেল।
ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, "ব্যান্ডেড তেল নয়, খাঁটি সরিষা থেকে ঘানিতে তৈরি করা তেল ব্যবহার করতে হবে।"
জাম
⚛️পাকা জামের মধুর রসে
রঙিন করে মুখ।⚛️
⚛️ঠিকই ধরেছেন,আজ কথা হবে,জাম নিয়ে।
⚛️প্রথমেই জেনে নিন জামের পুষ্টি-
প্রতি ১০০ গ্রাম পুষ্টিগত মান
➡️শক্তি ৬০ কিলোক্যালরী,
➡️ শর্করা ১৫.৫৬ গ্রাম,
➡️স্নেহ পদার্থ ০.২৩ গ্রাম,
➡️প্রোটিন ০.৭২ গ্রাম,
➡️ভিটামিন এ ৩.০ আন্তর্জাতিক একক,
➡️থায়ামিন বি১ ০.০০৬ মিলিগ্রাম, ➡️রিবোফ্লাভিন বি২ ০.০১২ মিলিগ্রাম,
➡️ন্যায়েসেন বি৪ ০.২৬০ মিলিগ্রাম, ➡️প্যানটোথেনিক অ্যাসিড বি৫ ০.১৬০ মিলিগ্রাম,
➡️ভিটামিন বি৬ ০.০৩৮ মিলিগ্রাম, ➡️ভিটামিন সি ১৪.৩ মিলিগ্রাম, ➡️ক্যালসিয়াম ১৯ মিলিগ্রাম,
➡️লোহা ০.১৯ মিলিগ্রাম,
➡️ম্যাগনেসিয়াম ১৫ মিলিগ্রাম, ➡️ফসফরাস ১৭ মিলিগ্রাম,
➡️পটাশিয়াম ৭৯ মিলিগ্রাম,
➡️সোডিয়াম ১৪ মিলিগ্রাম,
➡️পানি ৮৩.১৩ গ্রাম।
⚛️এবার জাম কেনো খাবেন তা নিয়ে জেনে নেয়া যাক-
➡️ভিটামিন সি
জামে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি। এই ফল ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ যেমন-মুখের দুর্গন্ধ রোধ, দাঁত মজবুত, মাঢ়ি শক্ত এবং মাঢ়ির ক্ষয়রোধেও জামের জুড়ি নেই ।ভিটামিন সি প্রোটিন সংশ্লেষণের সাথে জড়িত এবং শরীরের কোলাজেন এবং নির্দিষ্ট নিউরোট্রান্সমিটার উৎপাদন করার জন্য এটি প্রয়োজনীয়,কারণ ক্ষত সারাতে এদের ভূমিকা রয়েছে।
ভিটামিন সি এন্টিঅক্সিডেন্ট সম্পন্ন এবং ইমিউন সিস্টেমের কার্যক্রমে জড়িত।
➡️ফাইবার
ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা এবং চিনির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
খাবারে দু' রকমের আঁশ থাকে, দ্রবণীয় এবং দ্রবণীয়।
দ্রবণীয় ফাইবার পানিতে দ্রবীভূত হয় এবং এটি রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস করে এবং ভালো কোলেস্টেরল তৈরী করে।
অদ্রবণীয় ফাইবার পানিতে দ্রবীভূত হয় না তবে তা হজমে সাহায্য করে।
জামে দ্রবণীয় এবং দ্রবীভূত উভয় প্রকারের ফাইবার থাকে।
➡️রক্ত জমাট বাঁধতে
জাম ভিটামিন কে এর একটি দুর্দান্ত উৎস।তাই রক্ত জমাট বাঁধার জন্য এটি প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ।
➡️ওজন নিয়ন্ত্রণ করে
জামে কম পরিমাণে ক্যালোরি থাকে, যা ক্ষতিকর তো নয়ই বরং স্বাস্থ্যসম্মত। তাই যারা ওজন নিয়ে চিন্তায় আছেন এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, তাদের খাদ্য তালিকায় আসতে পারে জাম।
➡️হার্ট ভালো রাখে
আগেই বলেছি জাম ভালো কোলেস্টেরল তৈরী করতে সাহায্য করে।আর ভালো কোলেস্টেরলের কাজ হৃদপিন্ডকে ভালো রাখে। এছাড়া শরীরের দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমিয়ে দেহের প্রতিটি প্রান্তে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।
➡️ক্যান্সার প্রতিরোধেও সাহায্য করে-
বিভিন্ন গবেষণায় জামের কেমোপ্রোটেক্টিভ বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হয়েছে। জাগেতিয়া জিসি এন্ড কলিগস এর করা এক গবেষণা মতে জানা যায় যে, জাম ফলের নির্যাসে রেডিওপ্রোটেক্টিভ উপাদান আছে। এতে আরো বলা হয় জামের নির্যাস ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ফ্রি র্যাডিকেলের কাজে এবং বিকিরণে বাধা দেয়।
➡️আয়নরের ঘাটতি পূরণ করে-
জামের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানগুলোর মধ্যে আয়রন একটি। এই আয়রন দেহের বিভিন্ন উপকার করে থাকে। জাম ফলে থাকা আয়রন অ্যানিমিয়া নিরাময় করে এবং বিভিন্ন ধরনের আয়রনঘটিত সমস্যার সমাধান করে।
➡️ত্বক ও চুলের যত্নে
জামে পাওয়া গেছে অ্যালার্জিক নামে এক ধরনের এসিডের উপস্থিতি, যা ত্বককে করে শক্তিশালী। ক্ষতিকর আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক ও চুলকে রক্ষা করে। এ অ্যালার্জিক এসিড ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাশের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করে।
➡️ডায়াবেটিস নিরাময়ে সাহায্য করে
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জাম ভীষণ উপকারী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত জাম খাওয়ার ফলে ৬.৫ শতাংশ মানুষের ডায়াবেটিক কমে গেছে। এটি রক্তে চিনির মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। জাম ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে শরীর সুস্থ রাখে।
➡️মস্তিষ্কের শক্তি বাড়িয়ে তুলে-
নিউট্রিশনাল নিউরোসায়েন্স জার্নালের একটি প্রাণী গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত জাম খেলে মোটর এবং মস্তিষ্কের কার্যকরিতার উন্নতি ঘটে এবং ইউরোপীয় জার্নাল অফ নিউট্রিশনের একটি সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে যে জামে বিদ্যমান পলিফেনল সামগ্রীর জন্য মস্তিষ্কে প্রতিরক্ষামূলক প্রভাব প্রদান করতে পারে।এছাড়াও রয়েছে মিনারেল ম্যাঙ্গানিজ যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
⚛️কিছু টিপস না দিলে অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে-
#খালি পেটে জাম খাবেন না।
#জাম খাওয়ার পর দুধ খাবেন না।
#অতিরিক্ত জাম খেলে অ্যাসিডিটি ও গ্যাস্ট্রিকভাব হতে পারে।
#অন্ত্রের সার্জারি হয়ে থাকলে জাম খাবেন না।
⚛️সবশেষে জামের ক্ষতি নেই বললেই চলে।তাই নিয়ম করে জাম খান,নিজে সুস্থ থাকুন সাথে পরিবারকেও সুস্থ রাখুন।
বিস্ময়কর উপকারিতার ভান্ডার এলাচ
তীব্র সুগন্ধযুক্ত এলাচ বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান মসলা। রান্নার যাদু এবং রোগ নিরাময়ের ক্ষমতাগুলো কারণে এলাচকে 'মসলার রানী' বলা হয়। সুগন্ধিযুক্ত এই মসলা খাবারে অতিরিক্ত স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয় এই। ভারতীয় বা এশিয়ার রান্নায় যে গরম মসলা ব্যবহার করা হয়, তার একটা প্রধান ও অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো এলাচ। এটি দৈনন্দিন রান্না খাবার এবং মিষ্টান্ন তৈরিতে সেরা স্বাদ আনতে ব্যবহৃত হয়। এমনকি চা বানাতেও এলাচের ব্যবহার শুরু হয়েছে।
এলাচের প্রকারভেদ: এলাচ দুই প্রকার। একটি ফ্যাকাশে সবুজ এবং অন্যটি কালো (গাঢ়ো বাদামী)। ফ্যাকাশে সবুজ এলাচ, কালো এলাচের চেয়ে সুগন্ধযুক্ত। এ এলাচের দামও বেশি। মিষ্টি এবং মজাদার খাবারগুলোতে সমানভাবে ব্যবহৃত হয় সবুজ এলাচ। অন্যদিকে কালো এলাচ শাক ও সবজি তৈরি করতে বেশি কার্যকর।কালো এলাচ সবুজ এলাচের চেয়ে তিনগুণ বড়। যদিও কালো এলাচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্যালোরি ডিশ (ঝাল/ফ্রাই/লবোনাক্ত) তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
এলাচের রয়েছে ম্যাজিক গুণাবলী। নিচে সেগুলো তুলে ধরা হলো।
হজমে সহায়তা: এলাচ একটি শক্তিশালী হজম সহায়ক হিসাবে সুপরিচিত। এটি অন্ত্রের গ্যাস কমাতে বিশেষ উপকারী বলে বিবেচিত হয়। মসলাটি অ্যাসিডিটি, অম্বল এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের বিরুদ্ধেও চমৎকার কাজ করে। এলাচ ক্ষুধাও বাড়ায়।
শরীরকে ডি-টক্সিফাই করতে সহায়তা: এলাচে থাকা ভিটামিন এ, বি, সি, নিয়াসিন, রাইবোফ্ল্যাভিন রক্তকে পরিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। শরীরের যাবতীয় বর্জ্য পদার্থ যেমন বাড়তি ক্যালশিয়াম, ইউরিয়া ও অন্যান্য টক্সিনকে কিডনির মাধ্যমে বের করে দিয়ে শরীরকে পরিষ্কার করে ডি-টক্সিফাই করতেও এলাচ সাহায্য করে। যার ফলে চোখে মুখে বয়সের ছাপ পড়ে না। সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে এলাচ। এটি মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে অনেক সাহায্য করে।
মুখের দুর্গন্ধ দূর করে: এলাচ মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে দ্রুত কাজ করে। পাশাপাশি, এলাচের মধ্যে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণাবলী থাকায় তা মুখের মধ্যেকার ব্যাকটেরিয়াকেও দূর করে।
হার্টবিট নিয়ন্ত্রণ করে: আমাদের রক্তের, কোষের ও শরীরের ফ্লুইডে উপস্থিত একটি অন্যতম জরুরি উপাদান হল পটাশিয়াম। এলাচে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে যা আমাদের হার্টবিটকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং রক্তচাপকেও স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
এছাড়াও এলাচ ঠান্ডা এবং ফ্লুর লক্ষণগুলো থেকে মুক্তি দেয়। এটি ব্রঙ্কাইটিস এবং কাশির জন্যও খুব ভালো ফল দেয়। এলাচ সাইনাস রোগীদের ভালো রাখে। জাদুকরী এই মসলাটি বুকে জমে থাকা কফ পরিষ্কার করতে সহায়তা করে, এমনকি সর্দি, কাশি এবং হাঁপানি সংক্রমণের বিরুদ্ধেও লড়াই করার জন্য যথেষ্ঠ। প্রয়োজনীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি-এর উপস্থিতি রয়েছে বলে সারা শরীর জুড়ে রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে সহায়তা করে মসলার রানী এলাচ।
খাদ্যই ওজনের প্রধান নির্ধারক
ওজন বৃদ্ধি বা কমানোর জন্য প্রধান নির্ধারক হলো ক্যালরি, যা খাদ্যের মাধমে আমরা গ্রহণ করি।শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামকে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে গণ্য করা হয়।এছাড়াও বংশগতি, থাইরয়েড রোগ, মানবদেহের বিপাক হারের উপরও ওজন বাড়া বা কমা নির্ভরশীল। কিন্তু, বর্তমানে জীবনাযাত্রার ধরন খুবই যান্ত্রিক হয়ে গেছে। মানুষ এতোটাই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে যে, সারাদিনে হয়তো সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যয়ামের জন্য বের করতে পারে। কিন্তু, এতে মাত্র ২০০ ক্যালরি খরচ হয়, যা কিনা ৩ টি ছোট রুটি বা ১ পিস মিষ্টির ক্যালরির সমান। এমনকি, ২০ গ্রাম বাটার এবং সবুজ চাটনির সাথে ১ পিস স্যান্ডউইচ গ্রহণেও এই ২০০ ক্যালরি পূরণ করে ফেলা সম্ভব।অবশ্যই সাওল আপনাকে হাঁটতে এবং শারীরিক পরিশ্রম করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু, শুধুমাত্র শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যায়াম আপনার ওজন কমাতে সাহায্য করবে না, যেমনটা বিনা তেলে খাবার গ্রহণে করা সম্ভব। ভারতে একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী সপ্তাহে ১০০ কিলোমিটার দৌড়িয়ে ৩৫ কেজি ওজন কমাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু, সত্যিকারভাবে কতোজন এভাবে পরিশ্রম করতে সক্ষম হবেন?
আবার, আপনি যদি একেবারেই না খেয়ে থাকেন, তবেও হয়তো আপনার ওজন কমতে পারে। উপবাস বেশ অনেকের ক্ষেত্রেই ওজন কমাতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু, তা খুব স্বল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয়। যখনই তারা আবার খাওয়া শুরু করে, অতিরিক্ত এবং ভুল খাদ্য গ্রহনের কারণে আরও বেশি ওজন ধারণ করে। ডাঃ বিমল ছাজেড় ভারতে একটি সম্প্রদায়ের কিছু ব্যাক্তিকে একটানা উওপবাসে থেকে ৩০ দিনে প্রায় ২৫ কেজি ওজন কমাতে দেখেছিলেন । কিন্তু, ৬ মাস পর যখন আবার তাদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন, তখন তাদের ওজন পূর্বের চেয়েও আরও বেড়ে গিয়েছিলো। কিছু সম্প্রদায়ের মানুষ একদিন পরপর রোজা রাখেন বা উপবাসে থাকেন। কিন্তু মাঝের দিনগুলোতে তারা প্রায় দৈনিক চাহিদার দ্বিগুণ ক্যালরি গ্রহণ করে ফেলেন।
খাদ্যই একমাত্র মাধ্যম, যার মাধ্যমে বেশি বা কম ক্যালরি গ্রহন করে ওজন বৃদ্ধি করা বা কমানো যায়। সাওল ডায়েটের মাধ্যমে খাদ্য তালিকা থেকে অতিরিক্ত তেল বাদ দিয়ে এটি খুব সহজেই করা সম্ভব। সেইসাথে শরীরের জন্য সঠিক ক্যালরি বন্টনও নিশ্চিত করতে হবে। যদিও বংশগতিকে ওজন বৃদ্ধির খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু সঠিক খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে এটিও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এছাড়া, যদি বাবা-মা খুব বেশি তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, উচ্চ ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ায় অভ্যস্ত থাকেন, তবে তাদের সন্তানদেরও একই অভ্যাস গড়ে উঠে। প্রত্যেকেরই অতিওজনের পেছনে তাদের পরিবারগত অস্বাস্থ্যকর খাদ্যভাস গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে পাওয়া যায়। বংশগতির উপর যে কারো উচ্চতা, গায়ের রং, চেহারা ইত্যাদি নির্ভর করতে পারে, কিন্তু ওজন নয়। এটি সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে খাদ্যের মাধ্যমে ক্যালরি গ্রহণের উপরই।
থাইরয়েড রোগের কারণে অতিওজন হতে পারে। শরীরে থাইরয়েড হরমোন কমে গেলে বিপাক হারও কমে যায়। ফলে শরীরে ক্যালরি শোষণও কমে যায়। তাই, হাইপোথাইরয়েড রোগীদের ওজন বেড়ে যায়। কিন্তু, যখন তাদের থাইরয়েড হরমোন দিয়ে চিকিৎসা করানো হয়, তখন তাদের থাইরয়েডের অভাব পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু, সাওল এমন অনেক রোগী পেয়েছে, যাদের ভুল উচ্চ ক্যলরিযুক্ত খাদ্যাভাসের কারণে ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে। তবুও তারা থাইরয়েড রোগকেই শুধুমাত্র এর জন্য দায়ী করছে, যা সঠিক নয়।
সুতরাং, শুধুমাত্র সঠিক খাদ্যাভাসের মাধ্যমেই ওজন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।এর জন্য সাওল পদ্ধতিই সর্বোত্তম।
মশলার গুণাগুণ
রান্নায় স্বাদের মূল রহস্য লুকিয়ে থাকে মশলায়। তেলে মশলা পুড়িয়ে রান্নায় তেল এবং মশলা উভয়ের পুষ্টিগুণাগুণ নষ্ট করে ফেলা হয়। তাই বিনাতেলে রান্নায় মশলা শুধুমাত্র স্বাদবর্ধনই করবে না, মশলার পুষ্টিগুণও বজায় রাখে। আজ জেনে নেই প্রয়োজনীয় কিছু মশলার পুষ্টিগুণ সম্পর্কে।
=>আদাঃ আদায় আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-ব্যাকটিরিয়াল প্রপার্টিজ, উপকারি ফ্যাটি এসিড, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস সহ নানারকম উপকারি উপাদান, যা মানবদেহের জন্য বিশেষ উপকারি। আদা রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন কমাতেও অনেক সাহায্য করে।
=>রসুনঃ প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়েটিক সমৃদ্ধ রসুনে রয়েছে প্রোটিন, ফ্যাট, মিনারেল, ফাইবার, আয়োডিন, সালফার, ক্লোরিনের মতো উপাদান যা উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং শরীরকে ডিটক্সিফাইড করতে সাহায্য করে। এছাড়াও মানবদেহের শিরা-উপশিরায় প্লাক জমতে বাঁধা প্রদান করে।
=>হলুদঃ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হলুদ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলে। হলুদ দেহকে অ্যালঝাইমার এবং ক্যান্সার থেকে দূরে রাখে। হলুদের কারকিউমিন নামক উপাদান দেহে অতিরিক্ত মেদ জমতে দেয় না। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
=> মরিচঃ লাল মরিচে ক্যাপসেচিন, ভিটামিন সি, এ, বি-৬ ও ই, পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, কপার, আয়রন, ফ্লাভোনেয়ড ও শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রভৃতি নানা উপাদান রয়েছে, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। মরিচ রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
=> লবঙ্গঃ ঝাঁঝালো স্বাদের লবঙ্গ অ্যান্টি-ব্যাকটিরিয়াল প্রপার্টিজ এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদানে সমৃদ্ধ, যা দাঁতের ব্যাথা সহ শরীরের যে কোনো ব্যাথা উপশমে দারুণ কার্যকরী। যাদের ধূমপান বা পান খাওয়ার অভ্যাস আছে, তারা মুখে লবঙ্গ দিয়ে অভ্যাস দূর করতে পারেন।
=> দারুচিনিঃ দারুচিনিতে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টি-ব্যাকটিরিয়াল উপাদানসহ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, অতিরিক্ত ওজন কমাতে, স্মরণশক্তি বাড়াতে, অ্যাসিডিটি কমাতে এবং পাকস্থলীর ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস দূর করতে দারুচিনি দারুণ কার্যকরী। এছাড়াও ঠান্ডায় গলা ব্যাথা বা খুসখুসে কাশি দূর করতেও দারুচিনি দারুণ উপকারি।
=> এলাচিঃ এলাচি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হওয়ায় ডিটক্সিফিকেশনের মাধ্যমে শরীরকে বিষমুক্ত রাখে। এলাচি পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামে পরিপূর্ণ।
=> জিরাঃ জিরাতে প্রচুর আয়রন আছে, যা এনার্জি বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, কপার ইত্যাদির মতো খনিজও রয়েছে।
সবাই রান্নায় প্রাকৃতিক মশলা ব্যবহার করুন। গুড়া মশলা এয়ারটাইট বক্সে রাখুন। সম্ভব হলে গুড়া মশলাও ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষন করুন। এতে করে মশলার গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকবে। বাটা মশলা, যেমন আদা-রসুন ফ্রেশই রান্না করুন।
ইলিশ মাছ🐟🐟
🐟🐟মাছের রাজা ইলিশ,আসুন জেনে নিই আমাদের জাতীয় এই মাছ ইলিশ সম্পর্কে 🐟 🐟
১০০ গ্রাম ইলিশে প্রায় ২১ দশমিক ৮ গ্রাম প্রোটিন।১৮০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম,২৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৩.৩৯ গ্রাম শর্করা, ২.২ গ্রাম খনিজ ও ১৯.৪ গ্রাম চর্বি। তাছাড়া আরোও রয়েছে উচ্চ পরিমাণ ওমেগা তিন ফ্যাটি এসিড, নায়সিন, ট্রিপ্টোফ্যান, ভিটামিন, বি ১২, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সহ অন্যান্য ভিটামিন ও মিনারেলস।আরও আছে জিঙ্ক, ক্রোমিয়াম,আয়রন, সেলেনিয়ামের মতো খনিজও রয়েছে ইলিশ মাছে৷ জিঙ্ক ডায়াবেটিস রোগীদের পক্ষে খুব ভালো৷ সেলেনিয়াম আবার অ্যান্টি অক্সিডেন্টের কাজ করে৷।ইলিশ মাছে রয়েছে ভিটামিন এ, ডি এবং ই৷ বিশেষ করে ভিটামিন ডি কিন্ত্ত খুব কম খাবারেই পাওয়া যায়৷তাই ইলিশ মাছ সপ্তাহে বা মাসে ১ বার রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
বর্তমানে ইলিশ মাছ বিভিন্ন খাওয়া যায় । যেমন ভুনা ইলিশ, ভাপা ইলিশ পাতুরি, সর্ষে ইলিশ,দই ইলিশ, ইলিশের টক, ভাজা ইলিশ ইত্যাদি । তবে ইলিশ মাছের পাশাপাশি ইলিশ মাছের ডিম ও খুব সুস্বাদু।
🔵আসুন জেনে নেয়া যাক ইলিশের উপকারিতা:
⭕ ইলিশ মাছে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ একেবারেই কম। অন্য দিকে প্রচুর পরিমাণ ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কম থাকে। ফলে হার্ট থাকে সুস্থ।
⭕ সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির হাত থেকে ত্বককে রক্ষা করে ওমেগা ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। নিয়মিত মাছ খেলে একজিমা, সোরেসিসের হাত থেকে রক্ষা পায় ত্বক। ইলিশ মাছে থাকা প্রোটিন কোলাজেনের অন্যতম উপাদান। এই কোলাজেন ত্বক টাইট ও নমনীয় রাকতে সাহায্য করে।
⭕ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের সঙ্গে অস্টিওআর্থারাইটিসের প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে। প্রতি দিনের ডায়েটে সামুদ্রিক মাছ থাকলে বাতের ব্যথা, গাঁট ফুলে গিয়ে যন্ত্রণার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
⭕ তেলযুক্ত মাছ খেলে চোখের স্বাস্থ্য ভাল থাকে, চোখ উজ্জ্বল হয়। বয়সকালে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসার মোকাবিলা করতে পারে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। ইলিশ মাছের মধ্যে থাকা ভিটামিন এ রাতকানার মোকাবিলা করতেও সাহায্য করে।
⭕ ইলিশ মাছে রয়েছে আয়ডিন, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক, পটাশিয়াম। থায়রয়েড গ্ল্যান্ড সুস্থ রাখে আয়ডিন, সেলেনিয়াম উত্সেচক ক্ষরণে সাহায্য করে যা ক্যানসারের মোকাবিলা করতে পারে। এ ছাড়াও ভিটামিন এ ও ডি-র চমৎকার উৎস হল ইলিশ মাছ।
⭕বহু গবেষণায় দেখা গিয়েছে সামুদ্রিক মাছ ফুসফুসের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে কার্যকরী। শিশুদের ক্ষেত্রে হাঁপানি রোধ করতে পারে ইলিশ মাছ। যাঁরা নিয়মিত মাছ খান তাঁদের ফুসফুস অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।
⭕ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড অবসাদের মোকাবিলা করতে পারে। সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার (SAD), পোস্ট ন্যাটাল ডিপ্রেশন কাটাতে পারে ইলিশ মাছ।
⭕সামুদ্রিক মাছে থাকা ইপিএ ও ডিএইচএ ওমেগা-থ্রি-অয়েল শরীরে ইকসিনয়েড হরমোন তৈরি রুখতে পারে। এই হরমোনের প্রভাবে রক্ত জমাট বেঁধে শিরা ফুলে যায়। ইলিশ মাছ খেলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন ভাল হয়। থ্রম্বসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে।
⭕ ডায়েটে তেলযুক্ত মাছ থাকলে পেটের সমস্যা অনেক কম হয়। আলসার, কোলাইটিসের হাত থেকে রক্ষা করে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যসিড।
⭕ভাঁপা ইলিশ, মিষ্টিকুমড়া, টমেটো বা যেকোন সবজি দিয়ে রান্না ইলিশ, কম তেলে রান্না ইলিশ ইত্যাদি অনেক উপকারী মেন্যু। তাই ইলিশের স্বাদ ও পুষ্টি পেতে হলে সঠিক উপায়ে রান্না করা অনেক জরুরি।
⭕মস্তিষ্কের ৬০ শতাংশই তৈরি ফ্যাট দিয়ে। যার অধিকাংশই ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। যাঁরা নিয়মিত মাছ খান তাঁদের মধ্যে বয়স কালে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক কম দেখা যায়। শিশুদের মস্তিষ্কের গঠনেও সাহায্য করে ডিএইচএ। অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার(ADHD) রোধ করতে পারে ইলিশ মাছ। স্মৃতিশক্তি, পড়াশোনায় মনযোগ বাড়ায়।
⛔সতর্কতা :
🚩ইলিশ মাছ তেলে ভেজে খেলে এর মধ্যে ফ্যাট ও ক্যালরির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। তখন উপকার কম হয়।কড়া তেলে ভাজা ইলিশ, ঝলসানো ইলিশ তেমন একটা স্বাস্থ্যকর হয় না।এতে অনেক পুষ্টিগুন নষ্ট হয়ে যায়।
🚩ইলিশ মাছ খেলে কারো শরীরে অ্যালার্জি বা গ্যাসের উদ্রেক হতে পারে। সেক্ষেত্রে আগে বুঝতে হবে আপনার শরীরে ইলিশ মাছের বিরূপ প্রভাব আছে কিনা। থাকলে এড়িয়ে চলাই ভাল।
মধু
মধু হচ্ছে একটি তরল আঠালো মিষ্টি জাতীয় পদার্থ, যা মৌমাছিরা ফুল থেকে নেকটার বা পুষ্পরস হিসেবে সংগ্রহ করে মৌচাকে জমা রাখে। পরবর্তীতে জমাকৃত পুষ্পরস প্রাকৃতিক নিয়মেই মৌমাছি বিশেষ প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ মধুতে রূপান্তর এবং কোষ বদ্ধ অবস্থায় মৌচাকে সংরক্ষণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে মধু হচ্ছে এমন একটি অগাজানোশীল মিষ্টি জাতীয় পদার্থ যা মৌমাছিরা ফুলের নেকটার অথবা জীবন্ত গাছপালার নির্গত রস থেকে সংগ্রহ করে মধুতে রূপান্তর করে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু উপাদান যোগ করে মৌচাকে সংরক্ষণ করে।
💠মধুর ভৌত বৈশিষ্ট্য
মধু হল একটি বিশুদ্ধ পদার্থ যাতে পানি বা অন্য কোন মিষ্টকারক পদার্থ মিশ্রিত করা হয় নাই।” মধু চিনির চাইতে অনেক গুণ মিষ্টি। তরল মধু নষ্ট হয় না, কারন এতে চিনির উচ্চ ঘনত্বের কারণে প্লাজমোলাইসিস প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। প্রাকৃতিক বায়ুবাহিত ইস্ট মধুতে সক্রিয় হতে পারে না, কারন মধুতে পানির পরিমাণ খুব অল্প। প্রাকৃতিক, অপ্রক্রিয়াজাত মধুতে মাত্র ১৪% হতে ১৮% আর্দ্রতা থাকে। আর্দ্রর্তার মাত্রা ১৮% এর নিচে যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ মধুতে কোন জীবাণু বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। পাস্তুরাইয্ড মধুতে মধুর প্রাকৃতিক ঔষধি গুণাবলী হ্রাস পায়। আসুন জেনে নিই মধুর উপকারিতা।
মধুতে প্রায় ৪৫টি খাদ্য উপাদান থাকে। ফুলের পরাগের মধুতে থাকে ২৫ থেকে ৩৭ শতাংশ গ্লুকোজ, ৩৪ থেকে ৪৩ শতাংশ ফ্রুক্টোজ, ০.৫ থেকে ৩.০ শতাংশ সুক্রোজ এবং ৫ থেকে ১২ শতাংশমন্টোজ। আরও থাকে ২২ শতাংশ অ্যামাইনো অ্যাসিড, ২৮ শতাংশ খনিজ লবণ এবং ১১ শতাংশএনকাইম। এতে চর্বি ও প্রোটিন নেই। ১০০ গ্রাম মধুতে থাকে ২৮৮ ক্যালরি।
২০১২ সালে এ নিয়ে একটি বৃহৎ গবেষণার পর সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমেরিকান পেডিয়াট্রিক সোসাইটি শিশুদের কাশি প্রশমনে মধু ব্যবহার করার পক্ষে মত দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মধুতে অন্তত ১৮১ রকমের উপকারী ভেষজ উপাদান রয়েছে। এর অনেকগুলোই অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও জীবাণুরোধী বলে সংক্রমণ ঠেকাতে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
মধু খাওয়ার পর পরই গলা ও শ্বাসতন্ত্রের ঝিল্লির ওপর একটি জীবাণুরোধী আবরণ তৈরি করে। এতে জীবাণুর আক্রমণ থেকে ঝিল্লি বাঁচে। তাছাড়া গলার অনুভূতিবাহক স্নায়ুর কাজকর্মের ওপরও প্রভাব বিস্তার করে, ফলে খুসখুসে কাশি ও অস্বস্তিভাব থেকে রেহাই দেয়। জীবাণুরোধক উপাদান থাকার জন্য অনেক আগে থেকেই শল্য চিকিৎসকেরা ঘা বা ক্ষতস্থানের ড্রেসিংয়ে মধু ব্যবহার করে আসছেন। তবে কাশি প্রশমনে মধু ব্যবহার করার সময় দুটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখা উচিত। এক. এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এই পরামর্শ প্রণিধানযোগ্য নয়; দুই. মধু ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা হলে এ থেকে বটুলিনাম বিষক্রিয়া হতে পারে।
🔴মধু শরীরের রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়ায় এবং শরীরের ভেতরে এবং বাইরে যে কোনো ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতাও যোগান দেয়। মধুতে আছে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধকারী উপাদান, যা অনাকাঙ্ক্ষিত সংক্রমণ থেকে দেহকে রক্ষা করে। ২০০৭ সালে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যায়, সুপারবাগ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধে মধু অত্যন্ত কার্যকর। বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণে বিভিন্ন রোগ প্রায়ই দেহকে দুর্বল করে দেয়। এসব ভাইরাস প্রতিরোধে মধু খুবই কার্যকর।
🔵মধুতে যে পরিমাণ শর্করা থাকে তা সহজেই হজম করতে সাহায্য করে থাকে। কারণ এতে যে ডেক্সট্রিন থাকে তা সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে এবং তাৎক্ষণিক ভাবে ক্রিয়া করে। পেটরোগা মানুষদের জন্য মধু বিশেষ উপকারি।
🔴মধুতে রয়েছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ১ চা চামচ খাঁটি মধু ভোরবেলা পান করলে কোষ্ঠবদ্ধতা এবং এসিডিটি দূর হয়।
🔵মধু রক্তের হিমোগ্লোবিন গঠনে সহায়তা করে বলে এটি রক্তশূন্যতায় বেশ ফলদায়ক।কারণ এতে থাকে খুব বেশি পরিমাণে কপার, লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজ।
🔴হজম সমস্যার সমাধানেও কাজ করে মধু। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্যাস্ট্রিক আলসার থেকে মুক্তি পেতে একজন ব্যক্তি দিনে তিন বেলা দুই চামচ করে মধু খেতে পারেন। এতে যে শর্করা থাকে, তা সহজেই হজম হয়। কারণ, এতে যে ডেক্সট্রিন থাকে, তা সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ক্রিয়া করে। রোগা মানুষের জন্য মধু বিশেষ উপকারী।
🔵মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য রক্ষায় মধু ব্যবহৃত হয়। এটা দাঁতের ওপর ব্যবহার করলে দাঁতের ক্ষয়রোধ করে। দাঁতে পাথর জমাট বাঁধা রোধ করে এবং দাঁত পড়ে যাওয়াকে বিলম্বিত করে। মধু রক্তনালিকে সম্প্রসারিত করে দাঁতের মাড়ির স্বাস্থ্য রক্ষা করে। যদি মুখের ঘায়ের জন্য গর্ত হয়। এটি সেই গর্ত ভরাট করতে সাহায্য করে এবং সেখানে পুঁজ জমতে দেয় না। মধু মিশ্রিত পানি দিয়ে গড়গড়া করলে মাড়ির প্রদাহ দূর হয়।
🔵শীতের ঠান্ডায় এটি দেহকে গরম রাখে। এক অথবা দুই চা চামচ মধু এক কাপ ফুটানো পানির সঙ্গে খেলে শরীর ঝরঝরে ও তাজা থাকে।
🔴ডায়রিয়া হলে এক লিটার পানিতে ৫০ মিলিলিটার মধু মিশিয়ে খেলে দেহে পানিশূন্যতা রোধ করা যায়।
🔵মধু চোখের জন্য খুবই ভালো।গাজরের রসের সাথে মধু মিশিয়ে খেলে দৃষ্টিশক্তি বাড়ে।
🔴মধু প্রাকৃতিক ভাবেই মিষ্টি। তাই মধু সহজে হজম হয় এবং হজমে সহায়তা করে।
🔵তারুণ্য বজায় রাখতে মধুর ভূমিকা অপরিহার্য। মধু এন্টি অক্সিডেন্ট, যা ত্বকের রং ও ত্বক সুন্দর করে। ত্বকের ভাঁজ পড়া ও বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে।শরীরের সামগ্রিক শক্তি বাড়ায় ও তারুণ্য বাড়ায়।
🔴মধুর গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ক্যালসিয়াম। ক্যালসিয়াম দাঁত, হাড়, চুলের গোড়া শক্ত রাখে, নখের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করে, ভঙ্গুরতা রোধ করে। হঠাৎ যদি দাঁতে ব্যথা অনুভূত হয় তাহলে মধুতে তুলা ভিজিয়ে ব্যথার স্থানে রাখলে ব্যথা কমে যাবে।
🔵মধু ভালো শক্তি প্রদানকারী খাদ্য। তাপ ও শক্তির ভালো উৎস। মধু দেহে তাপ ও শক্তি জুগিয়ে শরীরকে সুস্থ রাখে।
🔴মধু অনিদ্রার ভালো ওষুধ। রাতে শোয়ার আগে এক গ্লাস পানির সঙ্গে দুই চা–চামচ মধু মিশিয়ে খেলে এটি গভীর ঘুম ও সম্মোহনের কাজ করে।
🔵মধু পাকস্থলীর কাজকে জোরালো করে এবং হজমের গোলমাল দূর করে। এর ব্যবহার হাইড্রোক্রলিক অ্যাসিড ক্ষরণ কমিয়ে দেয় বলে অরুচি, বমিভাব, বুকজ্বালা এগুলো দূর করা সম্ভব হয়।
🔴পুরোনো আমাশয় এবং পেটের পীড়া নিরাময়সহ নানাবিধ জটিল রোগের উপকার করে থাকে।
🔵 আধা গ্রাম গুঁড়ো করা গোলমরিচের সঙ্গে সমপরিমাণ মধু এবং আদা মেশান। দিনে অন্তত তিনবার এই মিশ্রণ খান। এটা হাঁপানি রোধে সহায়তা করে।
🔴 দুই চামচ মধুর সঙ্গে এক চামচ রসুনের রস মেশান। সকাল-সন্ধ্যা দুইবার এই মিশ্রণ খান। প্রতিনিয়ত এটার ব্যবহার উচ্চ রক্তচাপ কমায়। প্রতিদিন সকালে খাওয়ার এক ঘণ্টা আগে খাওয়া উচিত।
🔵এক গ্লাস গরম পানির সঙ্গে এক বা দুই চামচ মধু ও এক চামচ লেবুর রস মেশান। পেট খালি করার আগে প্রতিদিন এই মিশ্রণ খান। এটা রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। তা ছাড়া রক্তনালিগুলোও পরিষ্কার করে।
🔴 রক্ত উৎপাদনকারী উপকরণ আয়রন রয়েছে মধুতে। আয়রন রক্তের উপাদানকে (আরবিসি, ডব্লিউবিসি, প্লাটিলেট) অধিক কার্যকর ও শক্তিশালী করে।
🔵 এক চামচ মৌরি গুঁড়োর সঙ্গে এক বা দুই চামচ মধুর মিশ্রণ হৃদ্রোগের টনিক হিসেবে কাজ করে। এটা হৃৎপেশিকে সবল করে এবং এর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
🔴পুরুষদের মধ্যে যাঁদের যৌন দুর্বলতা রয়েছে, তাঁরা যদি প্রতিদিন মধু ও ছোলা মিশিয়ে খান, তাহলে বেশ উপকার পাবেন।
⛔সতর্কতা
মধু হলো একটি শর্করা জাতীয় খাদ্য। শর্করা দুই ধরনের হয়, সহজ শর্করা যা দ্রুত রক্তে মিশে গিয়ে চিনির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় এবং তা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য খারাপ। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ চিনি, গ্লুকোজ, সুক্রোজ ইত্যাদি। আরেকটি হলো জটিল শর্করা, যা ভাঙতে ও রক্তে মিশতে সময় নেয়। অতি দ্রুত রক্তে চিনির পরিমাণ বাড়ায় না। যেমন আঁশ ও স্টার্চ। মধু হলো প্রায় পুরোটাই সহজ শর্করা। এর প্রধান তিনটি উপাদান হলো গ্লুকোজ, সুক্রোজ ও ফ্রুক্টোজ। এক টেবিল চামচ মধুতে আছে ১৭.৩ গ্রাম শর্করা যার পুরোটাই সহজ শর্করা। এমনকি সাধারণ চিনির চাইতেও এতে চিনির পরিমাণ বেশি।
১ চা-চামচ মধু=৫.৮ গ্রাম সহজ শর্করা=২১ ক্যালরি
১ চা-চামচ সাধারণ চিনি=৪.২ গ্রাম সহজ শর্করা=১৬ ক্যালরি
সুতরাং ডায়াবেটিস রোগীদের মধু বেশি খাওয়া উচিত নয়।
এন্টি-অক্সিডেন্ট
💝এন্টি-অক্সিডেন্ট এক ধরনের এনজাইম বা জৈব অনু, যা অত্যন্ত নিরাপদ কোষকে ফ্রি রেডিক্যাল কর্তৃক ধ্বংসের হাত থেকে সুরক্ষা করে এবং ফ্রি রেডিক্যালকে ধ্বংস করে।
💝মানব জীবনে এন্টি-অক্সিডেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । কারন এগুলো অক্সিজেন বিক্রিয়া দমন করে ফ্রি রেডিক্যাল সমূহকে নির্মূল করে এবং যে কোনো প্রকার ক্ষতি থেকে ফ্রি রেডিক্যালকে বিরত রাখে।
💝ফ্রি রেডিক্যাল হামলা থেকে রক্ষার জন্য দিন দিন এন্টি-অক্সিডেন্টের কদর বেড়েই চলছে। তবে খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে নিত্যদিনের ফ্রেশ, টনশন, ধূমপান সবকিছুই শরীরের নিজস্ব এন্টি-অক্সিডেন্টদের নষ্ট করে দেয়।
তাই আমরা প্রতিদিন যা খাবার খাই, তাতে যদি প্রয়োজনীয় এন্টি-অক্সিডেন্ট থাকে তাহলে আর সমস্যা হয় না। তবে দুষন ও ভেজালের যুগে এটা নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল যে আমরা যথেষ্ট পরিমান এন্টি-অক্সিডেন্ট খাচ্ছি।
+গবেষনায় দেখা যায়, প্রানিজ খাবারের চেয়ে উদ্ভিদজ খাবারে এন্টি-অক্সিডেন্ট এর পরিমান বেশী থাকে। এন্টি-অক্সিডেন্টের মধ্যে পলিফেনোলিক গ্রুপ অধিক কার্যকারী। এন্টি-অক্সিডেন্টের সঙ্গে খাদ্য শরীরকে নানা রকম রোগ এবং বার্ধক্যের বিবাদ প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলার জন্য শক্তিযোগায়।
# বিভিন্ন প্রকার এন্টি-অক্সিডেন্ট যুক্ত খাদ্য ও উপাদানঃ
👉এন্টি-অক্সিডেন্ট পলফেনোলিক এসিডযুক্ত খাদ্য-
#ব্লুবেরী,
আঙ্গুর বীজ,
দেবদারু,
গাছের,
গ্রীন টী ইত্যাদি।
👉এন্টি-অক্সিডেন্ট ভিটামিন সি বিটা-ক্যারোটিন যুক্ত খাদ্য-
#পালংশাক,
পুঁইশাক,
লাউ,
কুমড়া শাক,
লাল শাক,
ধনিয়া পাতা,
পুদিনা পাতা,
সজনা,
ডাটা শাক,
ঢেড়শ,
গাঁজর,
মটরশুঁটি ইত্যাদি।
👉এন্টি-অক্সিডেন্ট ভিটামিন সি যুক্ত খাদ্য-
#আমলকী,
পেয়ারা,
আনারস,
লেবু,
কমলালেবু,
কাঁচা আম,
টমেটো,
ডালিম,
আমড়া ইত্যাদি টক জাতীয় ফল।
👉এন্টি-অক্সিডেন্ট ক্রিপটোজেনথিন যুক্ত খাদ্য-
#পাকা পেঁপে,
পাকা আম,
পাকা কুমড়ো,
কালো জাম ইত্যাদি।
👉এন্টি-অক্সিডেন্ট লিউটিন যুক্ত খাদ্য-
#কালোজাম।
👉এন্টি-অক্সিডেন্ট ফাইটোইষ্টোজেন যুক্ত খাদ্য-
#সয়াবিন,
বরবটি,
সিম,
মটরশুঁটি,
গাঁজর,
বিট,
লেটুস,
হলুদ,
সরিষা,
আম,
কালো আঙ্গুর ইত্যাদি।
👉এন্টি-অক্সিডেন্ট ভিটামিন ই যুক্ত খাদ্য-
#সয়াবিন,
ছোলা বাদাম,
আটা,
বিভিন্ন প্রকার ডাল ইত্যাদি।
👉এন্টি-অক্সিডেন্ট কপার যুক্ত খাদ্য-
#চাল,
ডাল,
গম,
শুকনো কিসমিস,
শুকনো খেজুর,
বাদাম ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার খাদ্যশস্য।
👉এন্টি-অক্সিডেন্ট সিলোনিয়াম যুক্ত খাদ্য-
#দুধ,
মাংস,
সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদি
উচ্চ রক্তচাপ
উচ্চ রক্তচাপ হল উচ্চ রক্ত চাপের জন্যে ব্যাবহিত ক্লিনিকাল টার্ম, এবং এটি সবচেয়ে সাধারণ দৈনন্দিন জীবনধারণ জনিত রোগগুলির মধ্যে একটি।
এটির এমন একটি অবস্থা বোঝায় যাতে আপনার ধমনী দিয়ে বয়ে যাওয়া রক্ত চাপ সাধারণের থেকে বেশি। সাধারণত, আপনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগবেন যদি আপনার রক্তচাপ ক্রমাগত 180/90 ছাড়ায়। যদি আপনার রক্তচাপ 140/120 এর ওপরে চলে যায় তাহলে আপনার অবস্থার কঠোরতার ওপর নির্ভর করে হাঁসপাতালেও ভর্তি করতে হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপের কিছু কিছু ঝুঁকি নিম্নে দেওয়াঃ
🚩বয়সঃ আপনার বয়স বারার সাথে সাথে রক্তবাহকের স্থিতিস্থাপকতা কমার এবং হরমোনাল পরিবর্তনের জন্য উচ্চ রক্তচাপের সম্ভবনা বারে।
🚩লিঙ্গঃ ৪৫ বছর বয়স ওব্দি মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের উচ্চ রক্তচাপ হবার সম্ভাবনা বেশি। এস্ট্রোজেনের প্রতিরক্ষামূলক প্রভাব কমার জন্য ঋতুজরা বন্ধ হওয়া মহিলাদেরও ঝুঁকি আছে।
🚩জাতিঃ আফ্রিকান এবং ল্যাটিনোদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ সাধারণ।
🚩জেনেটিক্সঃ উচ্চ রক্তচাপের পিছনে আপনার পরিবারের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।
💢উচ্চ রক্তচাপের প্রধান কারণগুলিঃ
🚩স্থুলতাঃ
যত বেশি ওজন বারাবেন, আপনার হৃদয়কে তত বেশি রক্ত পাম্প করতে হবে অক্সিজেন এবং পরিপোষক পদার্থ সরবরাহ করতে। এই বেশি পরিমানের রক্ত আপনার ধমনীর দেওয়ালে অধিক চাপ দেয়।
🚩শারীরিক ক্রিয়াকলাপের অভাবঃ
যখন আপনি একটি স্বল্পসক্রিয় জীবনযাপন করেন, তখন আপনার উচ্চ হ্রদ এবং নাড়ীর স্পন্দনের হার বেশি থাকতে পারে। ফলস্বরূপ, আপনার হৃদয়কে আরো কঠর পরিশ্রম করতে হয় সংকুচিত করতে, এইভাবে আপনার ধমনীর ওপর বেশি চাপ পরবে। আবার শারীরিক কার্যকলাপ কম হলে অতিরিক্ত ভার বাড়ার আশংকা আছে।
🚩তামাক এবং ধূমপানঃ
তামাক সেবন এবং ধূমপান অল্প সময়ের জন্য আপনার রক্তচাপ বাড়ায়। যাইহোক, দীর্ঘ সময়ে, তামাকে থাকা রাসায়নিকগুলি আপনার ধমনী মোটা এবং শক্ত করে যা রক্ত চলাচল করা আরো কঠিন করে তোলে।
🚩মাদক দ্রব্যঃ
উচ্চ-ক্যালরির মাদক দ্রব্য আপনার রক্তশ্রোতের মধ্যেকার সঞ্চালিত হওয়া লিপিড বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, আপনার হৃদয়কে রক্ত পাম্প করতে আরো বেশি প্রেশার ব্যাবহার করতে হয়। তাছাড়াও, মাদক দ্রব্য আপনার ভাজাভুজি খাওয়ার ইচ্ছে বারিয়ে দেয় এবং কায়িকপরিশ্রমের দকে ঝোঁক কমায় যা পরে গিয়ে পরিস্থিতি আরো খারাপ করে।
🚩ত্রুটিপূর্ণ ডায়েটঃ
প্যাকেজকরা এবং জাঙ্ক খাবারগুলির অতিরিক্ত খেলে সাথে সবজি এবং ফলগুলি খেলে আপনার সোডিয়াম মাত্রা বাড়ায় এবং আপনার পটাসিয়ামের মাত্রা কমায়। ইলেক্ট্রোলাইটের এই ভারসামযহীনিতা জল ধরায় এবং রক্তের আয়তন বৃদ্ধি করায়।
🚩এই কারন গুল ছাড়াও অন্যান্য অবদানকারী উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে:
স্ট্রেস
গর্ভাবস্থা
ডায়াবেটিস
কিডনির রোগ
নিদ্রাহীনতা
কোরটিকোস্টেরয়েডস, ওরাল কন্ট্রাসেপ্টিভস, এবং ডিকঞ্জেসটান্টসের মত ঔষুধ
💢উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ কি কি?
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলির মধ্যে একটি হল যে আপনি কোন লক্ষণ ছাড়াই বছর ধরে ব্যাধি পেতে পারেন। রোগ নির্ণয় করার একমাত্র উপায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে।
🚩কিছু লক্ষণ থেকে সাবধানে থাকবেন:
মাথাব্যাথা
ক্লান্তি
আপনার দৃষ্টির সমস্যা
হাঁপানি
অনিয়মিত হ্রিদস্পন্দন
বুক, ঘার বা কানে ধরপর ধরপর করা
বুকে ব্যাথা
নাক দিয়ে রক্ত ক্ষরণ
উচ্চ রক্তচাপের দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব কি কি?
উচ্চ রক্তচাপের কারণে আপনার ধমনীর দেওয়ালে অতিরিক্ত চাপ আপনার রক্ত বাহকগুলিকে এবং আপনার অঙ্গগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
🚩উচ্চ রক্তচাপের দীর্ঘ মেয়াদী কিছু পরিণতি অন্তর্ভুক্ত:
হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক
এথেরোস্লেরোসিস
অ্যানিউরিজম
হার্ট ফেলিওর
কিডনি
দৃষ্টিশক্তির ক্ষয়
ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া
💢কিভাবে উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসা করবেন?
আপনি ওষুধ এবং জীবন ধারা পরিবর্তন সমন্বয় মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসা করতে পারেন। আপনি যদি ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের মতো অন্য কোনও রোগের কারণে হাইপারটেনশন উন্নত করেন তবে ডাক্তার প্রথমে তাদের সাথে আচরণ করার জন্য ওষুধগুলি লিপিবদ্ধ করবেন।
🚩রোগের জন্য নির্ধারিত সবচেয়ে সাধারণ ওষুধ:
ডায়রেক্টিক্স
ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার
এঙ্গিওটেন্সিন II রিসেপ্টর ব্লকার (এআরবি)
এঙ্গিওটিসিন-রূপান্তর এনজাইম (এসিই) ইনহিবিটারস
বিটাব্লকার
💢ঔষধ বরাবর, আপনি নিম্নলিখিত লাইফস্টাইল পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন:
👉ওজন কমানো;
30 মিনিটের জন্য সপ্তাহে পাঁচ বার ব্যায়াম করুন;👉সংযম থেকে অ্যালকোহল পান: সপ্তাহে চারটির বেশি পানীয় নয়;
👉ধূমপান ছাড়ুন;
👉প্রতিদিন পাঁচবারে ফল এবং সবজি খাওয়া;
👉কম লবণযুক্ত খাওয়া এবং সোডিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার যেমন পনির, আচমকা, কেচাপ এবং প্যাপ্যাড খাওয়া কমানো;
👉আপনার ভাজা খাবার, জাঙ্ক খাবার, এবং মিষ্টি খাবার খাওয়া কমানো।
👉ড্যাস ডায়েট হল হাইপারটেনসানে ভুক্ত লোকেদের জন্য বিশেষ খাদ্য প্ল্যান।
💢উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন যাদের রয়েছে তাদের খাদ্য গ্রহণে সতর্ক হওয়া উচিত। কোন জিনিস খাওয়া যাবে, কোনটা যাবে না, কোনটা কী পরিমাণে খেতে হবে সেই বিষয়েও সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
💢খাদ্য নির্দেশনা
🚩 বাদ দিতে হবে-
কোলেস্টেরলযুক্ত এবং সমৃদ্ধ চর্বি (saturated fat) যুক্ত খাবার যেমন - ডিমের কুসুম, কলিজা, মাছের ডিম, খাসি বা গরুর চর্বিযুক্ত মাংস, হাস-মুরগীর চামড়া, হাড়ের মজ্জা, ঘি, মাখন, ডালডা,মার্জারিন, গলদা চিংড়ি, নারিকেল এবং উল্লেখিত এসব দ্বারা তৈরী খাবার।
🚩 বেশি করে খেতে হবে-
আঁশ যুক্ত খাবার - যেমন সবধরনের শাক, সবজি-বিশেষত খোসা সহ সবজি যেমন ঢেড়স, বরবটি, সিম ইত্যাদি, সব ধরনের ডাল, টক জাতীয় ফল বা খোসা সহ ফল ইত্যাদি। উপকারী চর্বি ও অসম্পৃক্ত চর্বি (unsaturated fat) জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে হবে- যেমন সব ধরনের সামুদ্রিক মাছ, ছোটো মাছ, উদ্ভিজ তেল (কর্ণ অয়েল, সানফ্লাওয়ার অয়েল,সয়াবিন অয়েল, সরিষার তেল ইত্যাদি)।
🚩 হিসাব করে খেতে হবে-
শর্করা জাতীয় খাবার যেমন ভাত, আলু, রুটি ইত্যাদি।
মিষ্টি জাতীয় ফল যেমন পাকা আম, পাকা পেপে, পাকা কলা ইত্যাদি।
🚩দুধ ও দুধের তৈরী খাবার।
অতিরিক্ত লবন খাওয়া যাবে না, পাতে লবন ও নোনতা খাবার পরিহার করতে হবে।
🚩খাওয়া যাবে না-🚫
বিভিন্ন ধরনের ফাস্ট ফুড (fast food), কেক, পুডিং, আইসক্রিম,বোতল জাত কোমল পানীয় ইত্যাদি।
এছাড়া কোনো রোগীর যদি ডায়াবেটিস থেকে থাকে তাহলে তাকে ডায়াবেটিসের খাদ্য তালিকাও এর সাথে মেনে চলতে হবে।
কিছু সাধারণ পরামর্শ
১. উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রনে রাখুন।
২. পরামর্শ পত্রে প্রদত্ত ওষুধ নিয়মিত সেবন করুন।
৩. প্রতিদিন হাটুন অথবা ব্যায়াম করুন, ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখুন।
৪. ধূমপান, জর্দা, তামাক পাতা, গুল পরিহার করুন।
৫. দুঃশ্চিন্তা মুক্ত থাকুন।
৬. ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগ থাকলে তার চিকিৎসা করুন ও নিয়ন্ত্রনে রাখুন।
প্রতিদিন ইফতারে খেজুরের স্বাস্থ্য উপকারিতা ও পুষ্টিগুন
প্রতিদিন ইফতারে খেজুরের স্বাস্থ্য উপকারিতা ও পুষ্টিগুন
#খেজুর মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে উৎপাদিত একটি ফল হলেও মুসলমানদের কাছে খেজুর একটি তাৎপর্যপূর্ণ একটি ফল। ইসলামের ইতিহাসে অনেক নবী-রাসূলগণ খেজুর দিয়ে সেহেরি ও ইফতার করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় মরুর এই ফলটি ইফতারিতে থাকাটা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু নিয়মের জন্যই নয়, রোজায় প্রতিদিন খেজুর খেলে পাওয়া যাবে প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদান এবং স্বাস্থ্য উপকারিতা। চারটি বা ৩০ গ্রাম পরিমাণ খেজুরে আছে ৯০ ক্যালোরি খাদ্যশক্তি, এক গ্রাম প্রোটিন, ১৩ মি.লি. গ্রাম ক্যালসিয়াম, ২.৮ গ্রাম ফাইবার, পানি, আয়রণ, ভিটামিন ‘বি-১’, ভিটামিন ‘বি-২’ ও সামান্য পরিমাণ ভিটামিন ‘সি, ফলিক অ্যাসিড, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, সালফার।
#রোজায় দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকার কারণে দেহে গ্লুকোজের ঘাটতি দেখা দেয়। শরীরের এই প্রয়োজনীয় গ্লুকোজের ঘাটতি পূরণ করে ইনস্ট্যান্ট শক্তি যোগায় খেজুর। তাই প্রতিদিন ইফতার শুরু করা উচিত খেজুর দিয়ে।
@এছাড়া খেজুরের রয়েছে আরও অনেক উপকারী গুণ। সেগুলো হলো-
# যকৃৎ ও পাকস্থলীর শক্তিবর্ধক,যকৃতের সংক্রমণ প্রতিরোধে খেজুর উপকারী।
#খেজুরে থাকা গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ স্নায়ুবিক শক্তি বৃদ্ধি করে, দুর্বলতা দূর করে, ইন্সট্যান্ট কর্মশক্তি প্রদান করে
#খেজুর শরীরে রক্ত উৎপাদন করে, যা নিয়মিত খেলে আয়রনের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি রক্তাল্পতা দূর করে।
#প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকার কারণে নিয়মিত খেজুর হজমে সহায়তা করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমানোর পাশাপাশি এতে বদ-হজম, কোলাইটিস এবং হেমোরয়েডের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।
# খেজুরে প্রচুর পরিমানে এন্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, ক্যানসার প্রতিরোধ করে।
# রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, এছাড়া গলাব্যথা এবং বিভিন্ন ধরনের জ্বর, সর্দি ও ঠাণ্ডায় বেশ কাজ দেয়।
#খেজুর বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের জন্য সমৃদ্ধ এক খাবার। যা মায়ের দুধের পুষ্টিগুণ আরও বাড়িয়ে দেয় এবং শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
#খেজুর দৃষ্টিশক্তি বাড়িয়ে রাতকানা প্রতিরোধেও সহায়ক।খেজুরের মধ্যে রয়েছে জিক্সাথিন ও লিউটেইন। এই উপাদানগুলো চোখের ম্যাকুলার ও রেটিনার ভালো রাখে।
#ফুসফুসের সুরক্ষার পাশাপাশি মুখগহ্বরের ক্যান্সার রোধ করে
#খেজুরে থাকা ভিটামিন সি ও ডি ত্বক ভালো রাখে।
#খেজুরে থাকা সালফার অ্যালার্জির মতো রোগ থেকে দূরে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
#অন্ত্রের কৃমি ও ক্ষতিকারক পরজীবী প্রতিরোধে খেজুর বেশ সহায়ক। অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে।
প্রতিদিন ইফতারে ও সেহেরিতে খেজুর হতে পারে একটি আদর্শ ফল।
লেবু
ভারতে দক্ষিন পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশে লেবুর উৎপস্থিল, লেবুর রস আচার ও শরবৎ তৈরী করা হয়। লেবুর তেল খাদ্য এবং প্রসাধনীতে ব্যপক ব্যাবহৃত হয়।
এটি ভিটামিনে ভরপুর যেমন ভিটামিন B₁,B₂,B₃,B₅,Fe, K, Zn, কার্বহাইড্রেট ভ্যাট, প্রোটিন, ভিটামিন সি, রিবোফ্লোবিন, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, মিনারেল, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফসফরাস সমৃদ্ধ এতে কোন সম্পৃক্ত চর্বি ও কোলেস্টেরল নেই, খুব কম মাত্রার ক্যালোরী আছে, লেবুর প্রধান আকর্ষন ভিটামিন সি।
এই ভিটামিন সি একটি গুরুত্ব পূর্ন উপাদান যা আপনার শরীরকে সক্ষম রাখতে সাহায্য করে। লেবু খেলেই প্রায় ৮৮% ভিটামিন সি চাহিদা পুরন করা সম্ভব। প্রাকৃতিক প্রিজারভেটিভস সাইট্রিক এসিড শরীরকে বিভিন্ন রোগজীবানুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে গড়ে তোলে।
আপনি যদি শ্লিম হতে চান তাহলে নিয়মিত লেবু খেতে হবে। সকালে খালিপেটে লেবু পানি সঙ্গে সামান্য লবন আপনার চর্বি কমিয়ে দেবে শরীরের ক্ষতিকর বিষাক্ত দ্রব্য বের করে আপনাকে আকর্ষনীয় করে তুলবে, লেবুর রসে উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি মানুষের রোগপ্রতিরোধী সিষ্টেমকে শক্তিশালী করে তোলে।
১০০ গ্রাম লেবুর রসের পুষ্টি উপাদান
পুষ্টি পুষ্টিমুল্য
শক্তি ৪৮ কিলো ক্যালরি
কার্বোহাইড্রেট ৯.৩২ গ্রাম
প্রোটিন ১.১০ গ্রাম
কোলেষ্টেরল ০০ গ্রাম
মোট আশ ২.৮০ গ্রাম
ফোলিয়েট ১১ মাইক্রো গ্রাম
নিয়ামিন ১৫ মাইক্রো গ্রাম রেটিনল সমতুল্য
প্যানথোটিক এসিড .১৯০ মাইক্রো গ্রাম
পাইরিডক্সিন .০৪০ মাইক্রো গ্রাম
ক্যালসিয়াম ০৫ মিঃগ্রাঃ
লৌহ ০.৭ মিঃগ্রাঃ
১। ক্যান্সার প্রতিরোধ করেঃ
লেবুতে রয়েছে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের সমারোহ যা শরীরকে বিভিন্ন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। নিয়মিত লেবু খাদ্যতালিকায় রেখে আমারা ক্যান্সারের হাত থেতে রক্ষা পেতে পারি।
২। পাকস্থলিকে সুস্থ্য রাখেঃ
যারা পেটের গোলযোগে ভুগছেন তাদের জন্য লেবু আদর্শ টনিক। পেটের গোলযোগের মধ্যে ডায়রিয়া, বদহজম, কোষ্টকাঠিন্য, আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়, শুরুতে এক গ্লাস লেবু+লবন পানি আপনাকে এই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দেবে। লেবুর সঙ্গে এক চা চামচ মধু হলে আরো ভাল।
৩। ফুসফুসের জন্য ভালঃ
লেবু ফুসফুসের যতœ নেয় এবং শরীর থেকে বিষাক্ত দ্রব্য বের করে দেয়, লেবু শরীরের চর্বি এবং লিপিডের মাত্রা কম রাখে ।
৪। ক্ষত সারায়ঃ
লেবুর উচ্চ ভিটামিন যা শরীরের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধি করে যে কোন ভাইরাস জনিত ইনফেকশন যেমন ঠান্ডা, সর্দি, জ্বর দমনে লেবু খুব কার্যকারী, মুত্রনালীর ক্ষত সারাতেও লেবুর গুরুত্ব রয়েছে।
৫। হাইপার টেনশন কমায়ঃ
যারা খাবারে যথেষ্ট পটাশিয়াম গ্রহণ করে না, তারা সহজেই নান রকম হৃদরোগে আক্রন্ত হয়ে পড়ে। লেবুর রসে যথেষ্ট পরিমান পটাশিয়াম রয়েছে যা হাইপার টেনশন কমাতে সাহয্য করে।
৬। ত্বকের যত্নে লেবুঃ
প্রাকৃতিক পরিস্কার হিসাবে লেবুর জুড়ী নেই, এটি ত্বকের লাবন্য ধরে রাখতে সাহায্য করে, মধুর সাথে লেবুর রস মিশিয়ে ব্যবহার করলে ত্বকের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পায়। এটি ত্বকের সংকোচন সৃষ্টিকারী পদার্থকে নিয়ন্ত্রন রাখে। চামড়ার অতিরিক্ত তেল অপসারণ করে। লেবুর রস প্রাকৃতিক অ্যানটি সেপটিক। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমন দূর করে। ব্রণ সারিয়ে তোলে, ত্বকের রং উজ্জল করে। বয়সের বলিরেখা দূর করে।
৭। লেবু মুখের দুর্গন্ধ দুর করেঃ
মাড়ীর ব্যাথা, দাতের সমস্যা মুখের দুর্গন্ধ দুর করে, লেবুর পানি খাবার পর দাত ব্রাশ করার প্রয়োজন নেই।
৮। নখকে সুন্দর করেঃ
একটুকরা লেবু দিয়ে নখ পলিশ করলে নখ তার বিবর্নতা থেকে উজ্জল রং ফিরে পায়। লেবুর পানিতে পা, হাত, ডুবিয়ে রাখলেও একটি উপকার হয়।
৯। লেবুর রস ওজন কমাতে সাহায্য করেঃ
নিয়মিত ফ্রেস লেবুর জুস+পানি খেলে ধীরে ধীরে ওজন কমাতে সাহয্য করবে।
১০। পিএইচ মাত্রা নিয়ন্ত্রন করেঃ
শুনলে অবাক হতে হয়, লেবু অম্লীয় হওয়া সত্বেও শরীরে প্রয়োজনে ক্ষারধর্মী আচরন করে। এটি শরীরে এসিডিটি তৈরী করে না। এটি শরীরের পিএইচ মাত্রাকে সঠিক অবস্থায় রাখে। লেবুর রস+লবন পানি পান করলে পিএইচ মাত্রা ঠিক থাকে।
১১। পৃথিবীর সেরা দশটি পানীর মধ্যে লেবুর জুস একটি।
গুড়+লেবু, চিনি+লেবুর সরবত শ্রেষ্ট পানীয়। যে কোন প্রক্রিয়াজাত বোতলজাত জুসের চেয়ে এটি উত্তম।ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যাভ্যাসে লাগাম টানা হলে কার্বোহাইড্রেট এবং অন্যান্য পুষ্টিগুণের অভাব দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে লেবু পানি পানের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে শরীরে ক্লান্তি ভর করতে পারে।৷ ৷
অপকারিতাঃ
- অতিরিক্ত লেবু সেবনে গ্যাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে পেট ফাঁপাসহ নানান ধরনের সমস্যা ও অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।
- অতিরিক্ত লেবু ও লেবুর শরবত পানের ফলে পেটে ব্যথা এবং তল পেটে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
- লেবুর শরবত বেশি পান করলে শরীর থেকে অনবরত বিষাক্ত পদার্থ বের করতে থাকে। এতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশিবার বাথরুমে যেতে হতে পারে যা কিছু ক্ষেত্রে বেশ অস্বস্তিকর।
- লেবুর শরবত বেশি পান করলে কিছুটা দুর্বলতা অনুভূত হতে পারে।
টক দই
দধি বা দই হল এক ধরনের দুগ্ধজাত খাদ্য যা দুধের ব্যাক্টেরিয়া গাঁজন হতে প্রস্তুত করা হয়। ল্যাক্টোজের গাঁজনের মাধ্যমে ল্যাক্টিক এসিড তৈরি করা হয়, যা দুধের প্রোটিনের ওপর কাজ করে দইয়ের স্বাদ ও এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গন্ধ প্রদান করে। মানুষ ৪৫০০ বছর ধরে দই প্রস্তুত করছে এবং তা খেয়ে আসছে।
সারা পৃথিবীতেই এটি পরিচিত। পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে এর সুনাম আছে।
+দই প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, রাইবোফ্ল্যাভিন, ভিটামিন B6 এবং ভিটামিনB12 এ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এক গবেষণা প্রতিবেদনে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অনটারিও-এর মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও লৌসন হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর হিউম্যান মাইক্রোবায়োলজি এন্ড প্রোবায়োটিকসের সভাপতি গ্রেগর রেইড দাবী করেছেন গাঁজন প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত খাদ্য যেমন দই খেলে মানব দেহে পাকস্থলীর উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বা প্রোবায়োটিক্স-এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে বিষাক্ত রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শরীর সুরক্ষিত থাকবে।
দই, পূর্ণ ননী
প্রতি ১০০ g(৩.৫ আউন্স) পুষ্টিগত মান
শক্তি -২৫৭ kg (৬১ kcal)
শর্করা--4.7 g
চিনি--4.7 g (*)
স্নেহ পদার্থ--3.3 g
সুসিক্ত স্নেহ পদার্থ--2.1 g
এককঅসুসিক্ত--0.9 g
প্রোটিন--3.5 g
ভিটামিনসমূহ
রিবোফ্লাভিন (বি২)--(12%)0.14 mg
চিহ্ন ধাতুসমুহ
ক্যালসিয়াম--(12%)121 mg
(*) Lactose content diminishes during storage.
একক
μg = মাইক্রোগ্রামসমূহ
• mg = মিলিগ্রামসমূহ
IU = আন্তর্জাতিক এককসমূহ
(Percentages are roughly approximated using US recommendations for adults.
Source: USDA Nutrient database)
#টক দইয়ের উপকারিতা:
এতে আছে প্রচুর পরিমান ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, যা হাড় ও দাঁতের গঠনে সহায়ক। মহিলাদের টক দই বেশী প্রয়োজন,কেননা তারাই ক্যালসিয়ামের অভাবে বেশী ভোগেন।
টক দইয়ের ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত উপকারী,এটা শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।
√√টক না মিষ্টি- কোনটা বেশি উপকারী?
ডাক্তার বা পুষ্টিবিদেরা সবসময়ই টক দই খেতে পরামর্শ দেন| বাইরের দেশগুলোতে যেমন ভারতে খাবার পরে সব সময় টক দই খায়| টক দই একটি lactic fermented খাবার|
টক দই একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও হেলদি খাবার, কারণ এতে আছে দরকারী ভিটামিন, মিনারেল, আমিষ ইত্যাদি| এটি দুগ্ধ যাত খাবার ও দুধের সমান পুষ্টিকর খাবার| এমনকি এটি দুধের চেয়েও বেশি পুষ্টিকর খাবার হিসাবে গণ্য করা হয়| কারণ দুধের চেয়েও বেশি পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
টক দই খাওয়ার উপকারিতাগুলো হচ্ছে:
১. এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়| ঠাণ্ডা লাগা, সর্দি ও জ্বর না হওয়ার জন্য এটি ভালো কাজ করে।
২. টক দইয়ের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে এবং শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে বাড়িয়ে হজম শক্তি বাড়ায় বা ঠিক রাখে।
৩. lactic acid থাকার কারণে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া ও কোলন cancer এর রোগীদের জন্য উপকারী।
৪. দইয়ের ব্যাকটেরিয়া হজমে সহায়ক| তাই এটি পাকস্থলী/ bowel র ও জ্বালাপোড়া কমাতে বা হজমের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে|
৫. এতে প্রচুর calcium, riboflavin, vitamin B6, B5 ও vitamin B12 থাকার কারণে এটি খুব দরকারী একটি খাবার|
৬. এতে প্রচুর calcium ও vitamin D থাকার কারণে হাড় ও দাঁতের গঠনে ও মজবুত করতে সাহায্য করে।
৭. তাই Osteoporosis, Arthritis এর রোগী রা নিয়মিত টক দই খেলে উপকার পান।
৮. কম ফ্যাটযুক্ত টক দই রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এলডিএল কমায়| যাদের দুধ সহ্য হয় না বা lactose intolerance আছে, তারা টক দই দুধের বিকল্প হিসেবে খেতে পারেন| কারণ দইয়ের ব্যাকটেরিয়া lactose কে ভেঙ্গে lactic acid তৈরি করে|
৯.যারা দুধ খেতে পারেন না বা দুধ যাদের হজম হয় না, তারা অনায়াসেই টক দই খেতে পারেন। কারন টক দইয়ের আমিষ দুধের চেয়ে সহজে ও কম সময়ে হজম হয়।
১০. টক দই রক্ত শোধন করে।
১১. উচ্চ রক্ত চাপের রোগীরা নিয়মিত টক দই খেলে রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।
১২. ডায়বেটিস, হার্টের অসুখ এর রোগীরা নিয়মিত টক দই খেলে এসব অসুখ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।
১৩. নিয়মিত টক দই খেলে তা অন্য খাবার থেকে পুষ্টি নিয়ে শরীরকে সরবরাহ করে|
১৪. কম ফ্যাটযুক্ত টক দই একটি ভালো স্ন্যাকস। কারণ এটি খেলে পেট ভরা বোধ হয়| তাই পুষ্টিহীন খাবার বা বেশি ক্যালরিযুক্ত junk food না খেয়ে পুষ্টিকর টক দই খেলে ওজন কমাতে সাহায্য করে| কারণ এতে আমিষ থাকে, যেহেতু আমিষ হজম হতে সময় লাগে, তাই পেট ভরা বোধ হয় ও শক্তি পাওয়া যায়| অতিরিক্ত খাবারও খেতে ইচ্ছা করে না|
১৫. এর পুষ্টি উপাদানগুলো হজমের সময় তাড়াতাড়ি শরীরে শোষিত হয়ে দ্রুত শরীরকে শক্তি দেয়।
১৬. এটা ব্রেইনকে tyrosine সরবরাহ করে, যা মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং ক্লান্তি কমায়|
১৭. প্রচুর calcium থাকার কারণে এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে| সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, শরীর যখন প্রচুর calcium পায়, তখন তা ওজন কমাতে সাহায্য করে| আর যখন calcium পায় না, তখন শরীরে ফ্যাট জমতে থাকে|
১৮. টক দই শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে| তাই গ্রীষ্মকালে টক দই খেলে ভালো|
১৯. টক দই শরীরে টক্সিন জমতে বাধা দেয়| তাই অন্ত্রনালী পরিষ্কার রেখে শরীরকে সুস্থ রাখে ও বুড়িয়ে যাওয়া রোধ বা অকালবার্ধক্য করে| শরীরে টক্সিন কমার কারণে ত্বকের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পায়।
২০. স্ট্রেস থেকে মুক্ত থাকে আপনার পেট। স্ট্রেস কি শুধুই মনের ব্যাপার? তা কিন্তু নয়। শরীরেও পড়ে স্ট্রেসের নেতিবাচক প্রভাব আর যাদের পেট একটু স্পর্শকাতর, স্ট্রেসে থাকলে তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। মাঝারি মাত্রার স্ট্রেসেই তাদের হয় বারবার বাথরুমে ছুটতে হয় অথবা বেশ কিছুদিন ধরে স্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের ফলে দেখা দেয়া উপসর্গের উপশম করতে পারে প্রোবায়োটিকস।
২১. পেট খারাপের উপশম। পেট খারাপ মানে সেটা হতে পারে ডায়রিয়া, আমাশয়, কোষ্ঠকাঠিন্য, ফুড পয়জনিং, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি।
২২.টক দই ওজন কমাতেও সাহায্য করে। এর আমিষের জন্য পেট ভরা বোধ হয় ও শরীরে শক্তি পাওয়া যায়। ফলে অতিরিক্ত খাবার গ্রহন করতে ইচ্ছে করে না। আর অতিরিক্ত খাবার না খেলে সহজেই ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখা যায়।
++
শত শত উপকারি উপাদানে ঠাসা দই। খাবারটির দাম মাত্র গুটি কয়েক টাকা। তবে চাইলে একটা পয়সা খরচ না করে বাড়িতেই তৈরি করে ফেলা যায়। তবু যুব সমাজের সিংহভাগই দই খেতে প্রস্তুত নন। বরং পকেট হালকা করে ফাস্ট ফুড সেন্টারের ব্যবসা বাড়াতে এরা এক পায়ে খাড়া। কিন্তু এই সব ভাজাভুজি খেতে খেতে যখন শরীরটা ঝাঁজরা হয়ে যবে, তখন দেহটাকে সুস্থ রাখতে কিন্তু সেই দইয়েরই প্রয়োজন পরবে। কেন জানেন? বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গত দশ বছরে যে যে মারণ রোগ বেশি মাত্রায় থাবা বসিয়েছে যুব সমাজের উপরে, এই যেমন ধরুন-ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ প্রভৃতি রোগের প্রকোপ কমাতে দইয়ের কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। শুধু তাই নয়, রোজের ডায়েটে একবাটি দইকে জায়গা করে দিলে আরও নানাবিধ উপকার পাওয়া যায়। যেমন ধরুন-
#ভেজাইনাল ইনফেকশের মতো রোগ দূরে থাকে
বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দইয়ে উপস্থিত ল্যাকটোব্যাসিলাস অ্যাসিডোফিলাস নামক একটি ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে এমন খেল দেখায় যে ক্ষতিকর জীবাণুরা সব মারা পরে। ফলে ভেজাইনাল ইনফেকশনের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা যায় কমে। এই কারণেই তো নারীদের নিয়মিত দই খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা।
#মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসের ঘাটতি দূর হয়
দইয়ে প্রচুর মাত্রায় মজুত রয়েছে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং জিঙ্কের মতো উপকারি উপাদান। তাই তো নিয়মিত একবাটি করে দই খাওয়া শুরু করলে শরীরে নানাবিধ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসের ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা যায় কমে। ফলে শরীর এতটাই চাঙ্গা হয়ে ওঠে যে ছোট-বড় কোনও রোগই ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না।
#স্ট্রেস এবং অ্যাংজাইটির প্রকোপ কমে
বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দই খাওয়ার পর আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন হয় যে মানসিক চাপ এবং অ্যাংজাইটি কমতে শুরু করে। প্রসঙ্গত, বর্তমান সময়ে যে সব মারণ রোগগুলোর কারণে সব থেকে বেশি সংখ্যক মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, তার প্রায় সবকটির সঙ্গেই স্ট্রেসের যোগ রয়েছে। তাই তো নিয়মিত দই খাওয়ার প্রয়োজনয়ীতা যে বেড়েছে, সে বিষযে কোনও সন্দেহ নেই।
#পুষ্টিকর উপাদানের চাহিদা মেটে
নিয়মিত দই খাওয়া শুরু করলে শরীরে পটাশিয়াম, ফসফরাস এবং আয়োডিনের ঘাটতি দূর হতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ভিটামিন বি৫ এবং বি১২-এর মাত্রাও বাড়তে থাকে। আর এই সবকটি উপাদানই যে নানাভাবে শরীরের উপকারে লেগে থাকে, তা কি আর বলে দিতে হবে! এই যেমন ধরুন ভিটামিন বি১২ লোহিত রক্ত কণিকার উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নার্ভাস সিস্টেমের কর্মক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
#হার্টের ক্ষমতা বাড়ে
রক্তে খারাপ কোলেস্টরল বা এল ডি এল-এর মাত্রা কমানোর পাশাপাশি রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ ভূমিকা নেয় দই। তাই তো নিয়মিত এই দুগ্ধজাত খাবারটি খেলে হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় থাকে না বললেই চলে। তাই তো পরিবারে যদি কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের ইতিহাস থাকলে দইকে সঙ্গ ছাড়ার ভুল কাজটি করবেন না যেন!
#ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়
দইয়ে পরিমাণ মতো বেসন এবং অল্প করে লেবুর রস মিশিয়ে যদি মুখে লাগাতে পারেন তাহলে ত্বক নিয়ে আর কোনও চিন্তাই থাকে না। আসলে দইয়ে থাকা জিঙ্ক, ভিটামিন ই এবং ফসফরাস এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পলন করে থাকে। প্রসঙ্গত, এই ফেস প্যাকটি সপ্তাহে কম করে ২-৩ বার লাগালে দারুন উপকার মেলে।
#ক্যান্সারের মতো রোগকে দূরে রাখে
বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দইয়ে উপস্থিত ল্যাকটোব্যাসিলাস এবং স্ট্রেপটোকক্কাস থ্রেমোফিলাস নামক দুটি ব্যাকটেরিয়া শরীরের ভেতরে ক্যান্সার সেলের জন্ম আটকে দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্যান্সারের মতো মারণ রোগ ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না।
#হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটে
বেশি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দইয়ে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা পাকস্থলিতে হজমে সহায়ক ভাল ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা নেয়। সেই কারণেই তো বদ-হজম এবং গ্যাস-অম্বলের সমস্যা কমাতে দই খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা। প্রসঙ্গত, পৃথক একটি গবেষণায় দেখা গেছে পেপটিক আলসার হওয়ার পিছনে দায়ি এইচ পাইলোরি নামক ব্য়াকটেরিয়াকে মেরে ফলতেও দইয়ের কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। সেই কারণেই তো পেপটিক আলসারের চিকিৎসায় দইয়ের অন্তর্ভুক্তির পিছনে সাওয়াল করে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।
#দুধের বিকল্প হিসেবে চলতেই পারে
এমন অনেকই আছেন যারা একেবারে দুধ খেতে পারেন না। কারও গন্ধ লাগে, তো কারও বমি পাই। এই ধরনের সমস্যাকে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বলা হয়। প্রসঙ্গত, দুধ থেকে দই হওয়ার সময় ল্যাকটোজ, ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ফলে দই খেলে না গা গোলায়, না বমি পায়।
#ওজন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে
অতিরিক্তি ওজনের কারণে কি চিন্তায় রয়েছেন? তাহলে নিয়মিত এক বাটি করে দই খাওয়া শুরু করুন। দেখবেন দারুন উপকার মিলবে। বিশেষত ভুঁড়ি কমাতে দইয়ের কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। প্রসঙ্গত, ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির গবেষকদের করা একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, নিয়মিত দই খাওয়া শুরু করলে হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটে। সেই সঙ্গে কর্টিজল হরমোনের ক্ষরণও কমে যায়। ফলে ওজন হ্রাসের সম্ভাবনা প্রায় ২২ শতাংশ বেড়ে যায়।
#হাড় এবং দাঁতের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে
দুধের মতো দইয়েও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস এবং ক্যালসিয়াম। এই দুটি উপাদান দাঁত এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই বুড়ো বয়সে গিয়ে যদি অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো রোগ আক্রান্ত হতে না চান, তাহলে এখন থেকেই নিয়মিত দই খাওয়া শুরু করুন। এমনটা করলে দেখবেন উপকার মিলবেই মিলবে।
#রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতি ঘটে
দইয়ে উপস্থিত উপকারি ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করার পর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এতটাই শক্তিশালী করে দেয় যে সংক্রমণ থেকে ভাইরাল ফিবার, কোনও কিছুই ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না। ফলে সুস্থ জীবনের পথ প্রশস্ত হয়।
এ্যাজমা
গ্রীক শব্দ Az-MA থেকে Asthma শব্দের উৎপত্তি যার অর্থ ‘দ্রুত নিঃশ্বাস নেয়া'। এ্যাজমা এমন একটি অবস্থা যাতে ফুসফুসের বায়ুনালীসমূহ আক্রান্ত হয়।
এ্যাজমায় আক্রান্ত হলে ফুসফুসের বায়ুবাহী নালীসমূহ অত্যাধিক সংবেদনশীল (Hyper active) হয়ে যায় এবং সহজে ফুটে ওঠে ও প্রদাহিত হয়। ফলশ্রুতিতে বায়ু চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়।
শ্বাস-প্রশ্বাস বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি যা দেহের কোষ ও কলায় পরিমিত অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেয়।
বায়ুমন্ডলীয় অক্সিজেন নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শ্বসনতন্ত্রের শ্বাসনালী (Trachea), ব্রঙ্কাই (Bronchi) ও ব্রঙ্কিওল (Bronchiole) পেরিয়ে সব শেষ এলভিওলাই (Alveoli) বা বায়ু কুঠুরীতে পৌঁছে। সেখানেই গ্যাসের আদান প্রদান সম্পন্ন হয়।
💢প্রকারভেদ:
#তীব্রতা অনুসারে এ্যাজমা
১.তীব্র হাঁপানি (Acute asthma)- এতে ফুসফুসের বায়ুবাহী নালীসমূহ আকস্মিকভাবে সংকুচিত হয় ও শ্বাস প্রশ্বাসে কষ্টের সৃষ্টি করে।
২. দীর্ঘমেয়াদী হাঁপানি (Chronic Asthma)- এতে ঘন ঘন এ্যাজমায় আক্রান্ত হয় এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে ও প্রতিরোধে চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে।
#কারণ অনুসারে এ্যাজমা:
১.এলার্জিক এ্যাজমা (Extrinsic asthma)- সাধারণত কোন এলার্জেন বা এন্টিজেন নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে ঢুকলে আমাদের ইমিউন সিস্টেম-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। যেমন- ফুলের রেণু, বিভিন্ন প্রাণীর লোম, মাইট ও ধুলাবালি ইত্যাদি। ফলশ্রুতিতে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হয় ও হাপানী দেখা দেয়। একে এটোপিক এ্যাজমা বা এলার্জিক এ্যাজমাও বলা হয়।
২. নন এলার্জিক এ্যাজমা (Intrinsic asthma)- এ ধরনের এ্যাজমা এলার্জি ঘটিত নয় বরং ধূমপান, রাসায়নিক দ্রব্য, জীবাণুর সংক্রমণ, মানসিক চাপ, অট্টহাসি, অধিক ব্যায়াম, এস্পিরিন জাতীয় ঔষধ সেবন, খাদ্য সংরক্ষণকারী উপাদান, পারফিউম, অত্যাধিক ঠান্ডা, গরম, আর্দ্র ও শুষ্ক বাতাসের কারণে দেখা দেয়।
#অন্যান্য এ্যাজমা
👉মিশ্র এ্যাজমা (Mixed asthma)- এক্ষেত্রে রোগী পূর্বোক্ত এলার্জিক ও নন-এলার্জিক দু'ধরনের এ্যাজমাতেই ভোগেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকোপ বেড়ে যায়।
👉রাত্রিকালীন এ্যাজমা (Nocturnal asthma)- এ ধরনের হাঁপানি রাতের বেলা, বিশেষতঃ রাত ২ টা থেকে ৪ টার মধ্যে আক্রমণ করে। রোগীর শারীরিক দুর্বলতার জন্য রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। এমনকি দিনের বেলায় স্বল্পকালীন নিদ্রা যায়। রাত্রিকালীন এ্যাজমা গুরুত্বের সহিত নেয়া উচিত কারণ এ ক্ষেত্রে রেসপিরেটরী এরেস্ট হয়ে রোগীর মৃত্যু ঘটে।
👉 ব্রঙ্কিয়াল এ্যাজমা (Bronchial asthma)- এটি মূলত: এক ধরনের এলার্জিক রিএ্যাকশন যাতে শ্বাসকষ্ট ও বুকে সাঁই সাঁই শব্দ হয়। শ্বাসনালীর চারপাশের পেশী ও মিউকাস মেমব্রেনসমূহের সংকোচন দেখা দেয়। শ্বাসনালীর সংক্রমণ, বায়ুবাহিত এলার্জেন, খাদ্যের এলার্জেন ও অত্যধিক মানসিক চাপ এর প্রধান কারণ।
👉কার্ডিয়াক এ্যাজমা (Cardiac asthma)- হৃদপিন্ড যখন তার স্বাভাবিক রক্ত সংবহন হারিয়ে ফেলে তখন পালমোনারি ইডিমা বা ফুসফুসে পানি জমে বায়ুনালীকে সংকুচিত করে ফেলে এবং হাঁপানি সৃষ্টি হয়। এটি অত্যন্ত মারাত্মক। ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা পর এটি আক্রমণ করে কারণ শুয়ে থাকলেই ফুসফুসে পানি জমে। শ্বাসকষ্টে রোগীর ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং কিছুক্ষণ বসে থাকার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
👉ব্যায়ামজনিত এ্যাজমা (Exereise indrced asthma)- এ ধরনের এ্যাজমা ব্যায়ামকালীন সময়ে অথবা ব্যায়ামের কিছুক্ষণ পর থেকে শুরু হয়। বিশেষতঃ শীতকালে এ ধরণের সমস্যা বেশি হয়।
👉পেশাগত এ্যাজমা (Occupational asthma)- অকুপেশনাল বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ্যাজমা সাধারণত: চাকরি নেবার কয়েক মাস থেকে শুরু করে কয়েক বছরের মধ্যে দেখা দেয়। সাধারণত কর্মস্থল ত্যাগ করার সাথে সাথে বা ছুটিতে থাকাকালীন সময়ে লক্ষণসমূহ কমে যায়।
‘স' মিলের গুড়া, রাসায়নিক ধোঁয়া, সর্বদা ধুলাবালিযুক্ত পরিবেশ, সিমেন্ট কারখানা, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী, আটা ও মসলার মিল, রাইস মিল, জুট মিল, স্পিনিং মিল, রংয়ের কারখানা, রাসায়নিক সার কারখানা, ফটোকপি মেশিন, ড্রাইভিং, পোল্ট্রি ফার্ম, বেডিং স্টোর ইত্যাদিতে কর্মরত শ্রমিকরা এ ধরনের হাপানিতে বেশি আক্রান্ত হন।
👉মওসুমি এ্যাজমা (Seasonal asthma)- মওসুমি এ্যাজমা সাধারণত: বিশেষ ঋতুতে দেখা দেয়। যেমন- কারো কারো গরমে এ্যাজমা বাড়ে, কারো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ফুল বাগানে এ্যাজমা বাড়ে। গাছ, ঘাস, ফুলের রেণু ইত্যাদিতেও এ্যাজমা বাড়ে।
👉নীরব এ্যাজমা (Silent asthma)- এ ধরনের হাঁপানির আক্রমণ অত্যন্ত ভয়াবহ ও জীবনের জন্য হুমকি স্বরূপ। কোনরূপ পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই বা বুকে হালকা শব্দ করেই আক্রমণ করে।
👉কফ ভেরিয়েন্ট এ্যাজমা- এ ধরনের এ্যাজমা দীর্ঘমেয়াদী ও বিরক্তিকর কাশিযুক্ত হয়ে থাকে।
💢#কারণ:
অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট এমন একটা রোগ যার নির্দিষ্ট কোন কারণ জানা না গেলেও চিহ্নিত করা হয়েছে প্রধানত ২ টি কারণকে বলে জানালেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা.শাহরিয়ার জামান দীপ ।
১) ‘এটোপি’ বা বংশগত (Genetic) ও ‘এলার্জি’ পরিবেশগত উপাদান এবং
২) শ্বাসনালীর অতি-সক্রিয়তা (Bronchial hyper-responsiveness)
পৃথিবীজুড়ে ৩০ কোটি লোক অ্যাজমায় আক্রান্ত, যা ২০২৫ সাল নাগাদ ৪০ কোটিতে পৌছবে । বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ । যার মধ্যে ৪০লাখই শিশু ।
৬৫% মানুষের আক্রান্ত হবার কারণ এলার্জি । যুবক বয়সে অ্যাজমা আক্রান্তের হার ১৫% । পেশাগত ভাবে ‘potent sensitizer’ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫-২০% এজমায় আক্রান্ত হয় ।হাঁপানির প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয় তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী বংশগত ভাবে এ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে জীবনের প্রথম দিকে যারা তামাক আসক্ত হয়ে থাকে, ফুসফুসের ইনফেকশনে (যেমন-নিউমোনিয়া) ভোগেন ও বিভিন্ন এলার্জেন এর সংস্পর্শে থাকেন তাদের এ্যাজমায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
#ট্রিগারিং ফ্যাক্টর
যে সকল ফ্যাক্টরগুলো শ্বাসকষ্ট বাড়ায় অথবা হাঁপানীকে মারাত্মক রূপ দেয় সেগুলোকে ট্রিগারিং ফ্যাক্টর বলে।
এরা মূলত: এ্যাজমা সৃষ্টি করে না তবে এ্যাজমার আক্রমণকে ত্বরান্বিত করে।
❤দু'ধরনের ট্রিগারিং ফ্যাক্টর রয়েছে-
💜#এলার্জিক ট্রিগারসঃ
+মাইট ( যা পুরনো ময়লা কাপড় চোপড়ে জন্মায়)
+বিড়ালের পশম, প্রস্রাব ও লালা
+কুকুরের পশম, প্রস্রাব ও লালা
+মেটাবাইসালফাইড (যা পানীয় ও খাদ্যে প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়)
+ফুলের রেণু বা Pollen
+ তুলার আঁশ, পাটের অাঁশ
+ঘরের ধুলাবালি
+স্যাঁতস্যাতে কার্পেট
+ পুরনো অপরিষ্কার উলের জামা কাপড়
💜#নন-এলার্জিক ট্রিগারস-
+ধোঁয়া
+ শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম
+গ্যাস, কাঠের গুঁড়া, কয়লা, কেরোসিন, পেট্রোল, ডিজেল
+প্রাকৃতিক গ্যাস, প্রোপেন, রান্নায় জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত কেরোসিন
+কুয়াশা ও ধোঁয়া
+শ্বাসনালীর ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন
+কাঠ পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া
+আবহাওয়া পরিবর্তন
+দীর্ঘক্ষণ ভ্রমণ
🤦♀কাদের হতে পারে এ্যাজমা বা হাঁপানি :
যে কোন বয়সের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর যে কারো হতে পারে। যাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের হাঁপানি আছে তাদের এ রোগ হবার আশঙ্কা প্রবল। আবার দাদা-দাদীর থাকলে (বাবা-মা’র না থাকলেও) নাতি-নাতনী বা তাদের ছেলেমেয়েরা এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। পিতৃকুলের চেয়ে মাতৃকুল থেকে হাঁপানিতে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা বেশি থাকে। তবে এ্যাজমা বা হাঁপানীর মূল কারণ কিন্তু এলার্জি ।
🗣হাঁপানি রোগের লক্ষণসমূহ
💢#প্রধান লক্ষণসমূহ-
+ বুকে সাঁই সাঁই বা বাঁশির মত শব্দ হওয়া
+শ্বাস কষ্ট হওয়া
+বুকে চাপ অনুভব করা
+ দীর্ঘ মেয়াদী কাশিতে ভুগতে থাকা
+ব্যায়াম করলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া
💢#অন্যান্য লক্ষণসমূহ-
+শীতকালে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া
+ ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া
+কাশির সাথে কফ নির্গত হওয়া
+গলায় খুসখুস করা ও শুষ্কতা অনুভব করা
+রাতে কাশি বেড়ে যাওয়া
+নাড়ীর গতি দ্রুত হওয়া
+কথা বলতে সমস্যা হওয়া
+সর্বদা দুর্বলতা অনুভব করা
+দেহ নীল বর্ণ ধারণ করা
🌡#প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা:
রক্তের বিশেষ বিশেষ পরীক্ষাঃ বিশেষত রক্তে ইয়োসিনোফিল ও সিরাম আইজিই।
👉স্কিন প্রিক টেস্টঃ এই পরীক্ষায় রোগীর চামড়ার উপর বিভিন্ন এলার্জেন দিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং এই পরীক্ষাতে কোন কোন জিনিসে রোগীর এলার্জি আছে (এ্যাজমার জন্য দায়ী) ধরা পড়ে।
👉বুকের এক্স-রেঃ হাঁপানি রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করার আগে অবশ্যই বুকের এক্স-রে করে নেয়া দরকার যে অন্য কোন কারনে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কিনা ।
👉স্পাইরোমেট্রি বা ফুসফুসের ক্ষমতা দেখাঃ এই পরীক্ষা করে রোগীর ফুসফুসের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা যায় ।
🌬🌬#হাঁপানি থেকে রক্ষা পাবার উপায়🤔🤔
👉বিছানা ও বালিশ প্লাস্টিকের সিট দিয়ে ঢেকে নিতে হবে বা বালিশে বিশেষ ধরনের কভার লাগিয়ে নিতে হবে।
👉ধুলো ঝাড়াঝাড়ি করা চলবে না।
👉ধোঁয়াযুক্ত বা খুব কড়া গন্ধওয়ালা পরিবেশে থাকা চলবে না।
👉গরম চা হাঁপানির টানে উপশমের কাজ করে। তবে দুধ চা একেবারেই খাবেন না। অ্যাসিড রিফ্লাক্স বাড়িয়ে দেয় হাঁপানির টান। চলতে পারে গ্রিন টি বা লিকার চা।
👉পশু-পাখির রোমে অ্যালার্জি থাকলে ঋতুবদলের সময় পোষ্যদের সঙ্গও এড়িয়ে চলতে হতে পারে।
👉আলো-হাওয়া যুক্ত, দূষণমুক্ত খোলামেলা পরিবেশ থাকা দরকার। কারণ স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় ফাঙ্গাল স্পোর অনেক সময় হাঁপানির কারণ হয়।
👉 হাঁপানি রোগীর আশেপাশে ধূমপান বর্জনীয় ও মশার কয়েল জ্বালানো যাবে না।
👉হাঁপানির টান উঠলে পিঠে বালিশ রেখে আধশোয়া হয়ে থাকলে খানিকটা আরাম পাবেন।
👉অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্যও হাঁপানি রোগীরা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তাই নিজের শরীরের অবস্থা বুঝে পরিশ্রমের ঝুঁকি নেয়া উচিত।
👉হালকা খাওয়া-দাওয়া করা উচিত যাতে হজমের কোনও অসুবিধে না হয়। কারণ, বদহজম এবং অম্বল থেকেও হাঁপানি হতে পারে। যে খাবারে এ্যালার্জি আছে তা বর্জন করে চলতে হবে।
👉অফিস শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত হলে অবশ্যই কান-মাথা ঢেকে বসুন। গায়ে রাখুন পাতলা চাদর। শীতে শোওয়ার সময়ও কান-মাথা ঢেকে ঘুমান। ঘাম হচ্ছে কি না খেয়াল রাখুন। ঘাম হলে গরম পোশাক খুলুন। ঘাম বসে ঠাণ্ডা লাগলেও বিপদ বাড়বে।
👉প্রয়োজনে স্থান ও পেশা পরিবর্তন করতে হবে। শুধু নিয়ম মেনে চললেই এই ধরনের রোগীর শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ভাল থাকেন।
👉ঠাণ্ডা লেগেছে বুঝলেই চিকিৎসকের কাছে যান। অল্প সর্ষের তেল হাতের তালুতে নিয়ে বুকে মাসাজ করলেও কিছুটা আরাম পাবেন।
👉 ইউক্যালিপটাস তেল হাঁপানিতে খুব কার্যকর। গরম পানিতে দু'ফোটা এই তেল ফেলে ভেপার নিলে উপশম পাওয়া যায়
👉প্রয়োজন মতো ওষুধ ব্যবহার করে রোগী সুস্থ থাকতে পারেন। সতর্ক জীবনযাপন ও চিকিৎসার মাধ্যমে শতকরা ৮০ ভাগ হাঁপানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
👉তীব্র হাঁপানিতে খাবার ওষুধের চেয়ে ইনহেলার(Inhaler) বা রোটাহেলার (Rotahaler) ব্যবহার করাই বেশি ভাল।
👉খুব বেশি শ্বাসকষ্ট থাকলে জেবুলাইজার নামের যন্ত্রের সাহায্যে রোগীকে হাঁপানির ওষুধ দেয়া হয়ে থাকে।
💢#হাঁপানি রোগীর খাদ্য ও পথ
☕যা যা খেতে হবে:
+ কুসুম গরম খাবার।
+ মওসুমি ফলমূল।
+ছাগলের দুধ (তেজপাতা, পুদিনা ও কালোজিরা সহ)।
+আয়োডিন যুক্ত লবণ ও সৈন্ধব লবণ।
+মধু, স্যুপ, জুস।
+কালোজিরার তেল।
+আদা ও পুদিনার চা।
🍜যা যা খাবেন না:
+মিষ্টি দধি ও মিষ্টান্ন।
+ফ্রিজের কোমল পানীয়।
+আইসক্রীম, ফ্রিজে রাখা খাবার।
+ইসুবগুল ও গ্রেবী জাতীয় খাবার।
+কচুর লতি, তিতা জাতীয় খাবার।
+ পালং শাক ও পুই শাক,
+মাসকলাই
+মাটির নীচের সবজি যেমন-গোল আলু, মিষ্টি আলু, শালগম, মুলা, গাজর ইত্যাদি।
+ইলিশ মাছ
+ গরুর গোশত
+ চিংড়ী মাছ।
+পাম অয়েল, ডালডা ও ঘি।
+অধিক আয়রনযুক্ত টিউবঅয়েলের পানি।
🌴🌾কিছু ঘরোয়া উপায়ের মাধ্যমেও হাঁপানির আক্রমনে উপশম করা সম্ভব।
#পেঁয়াজ: পেঁয়াজ যে কোনও প্রদাহজনিত রোগ উপশমে খুবই উপকারি। তা ছাড়া নাসাপথকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। শ্বাসকষ্ট দূর করতে কাঁটা পেঁয়াজ খেয়ে দেখতে পারেন।
#লেবু: লেবুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এক গ্লাস জলের মধ্যে লেবুর রস এবং সামান্য চিনি দিয়ে রোজ খেয়ে দেখতে পারেন। হাপানির কষ্ট অনেক কম হবে।
#ল্যাভেন্ডার তেল: গরম পানির মধ্যে ৫-৬ ফোঁটা ল্যাভেন্ডার তেল ফেলে দিন। এ বার ধীরে ধীরে ভেপার নিন। ম্যাজিকের মতো কাজ হবে।
#মধু: হাঁপানি নিরাময়ের অন্যতম প্রাচীন উপায় হল মধু। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোজ রাতে ঘুমোবার আগে এক চামচ মধুর সঙ্গে দারচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে শ্বাসকষ্ট কমে যায়। সর্দি-কাশিতেও অনেক আরাম পাওয়া যায়।
#আদা: পানির মধ্যে এক টুকরো আদা ফেলে ফোটান। এ বার পাঁচ মিনিট রেখে সেই মিশ্রণ খেয়ে নিন। শুধু হাঁপানি নয়, জ্বর, সর্দি-কাশি নয়, যে কোনও রোগেই সমান উপকারি আদার রস।
#রসুন: এক কাপ দুধের মধ্যে ৩-৪ কোয়া রসুন ফেলে ফুটিয়ে সেই মিশ্রণ পান করুন। ফুসফুসের যে কোনও রোগ নিরাময়ে রসুনের রস খুবই উপকারি।
#কফি: হাঁপানির কষ্ট নিরাময়ে খুবই নির্ভরযোগ্য পানীয় কফি। এক কাপ গরম কফি শ্বাসনালীর প্রদাহ কম করে। শরীরে এনার্জি যোগায়।
💢#হাঁপানি রোগীর পোশাক-পরিচ্ছদ💢
👉 কটন জাতীয় নরম ঢিলে-ঢালা পোশাক পরিধান করতে হবে।
👉 সিল্ক, সিনথেটিক, পশমি কাপড় পরিধান না করাই উত্তম।
👉পাতলা বালিশ ও নরম বিছানায় শোয়া উচিত।
👉বাসস্থান শুষ্ক ও পর্যাপ্ত সূর্যের আলো-বাতাস সম্পন্ন হওয়া উচিত।