স্বপ্ন+বউ= দুঃস্বপ্ন
স্বপ্ন+বউ= দুঃস্বপ্ন
ফরহাদ ইবনে মালেক
রাত আনুমানিক ঠিক ৩.৪৫ বা তার দুই-এক মিনিট এদিক সেদিকে হঠাৎ করেই ঘুম ভাঙলো রাতুলের। আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙেছে? ধারণা ভুল। দুঃস্বপ্ন বা সু-স্বপ্ন কোনটাই নয়। ভাবতে পারেন গরম পড়েছে বেশি, হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ মামা জ্ঞান হারায় গরমে। তাই বুঝি গরমেই ঘুমটা ভাঙলো? এই উত্তরটাও ভুল। যে উত্তরটা এরপর আসতে পারে কিংবা আপনার মাথায় আসছেই না, সেই উত্তরটাই কারেক্ট। হিসু চাপার ইস্যুতে ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুম ঘুম চোখে রুমের লাইট জ্বেলে দিল রাতুল। লাইট জ্বেলে বাথরুম থেকে এসে ঘুম ঘুম চোখেই টলতে টলতে লাইটটা অফ করে আন্দাজ মতো বিছানা বরাবর এসে ধপাস করে পড়ে গেল বিছানার ওপর। ল্যান্ডিং টা নরম হবার কথা থাকলেও কেমন যেন বন্ধুর(কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু'র এক কথায় প্রকাশ) মনে হলো। সাথে সাথে মাগো বলে একটা আওয়াজ!
"ওয়েট, হোয়াট? মেয়ে? তাও আবার আমার রুমে? আমার বেডে! কী করে সম্ভব?"
ভাবছে রাতুল।
"ওই গাধা। চামচিকার শরীরে এতো ওজন! পিঠের হাড্ডিটা ভাইঙ্গা ফালাইছে। কাইল বুঝামুনে, শয়তান। ঘুমে ধরলে আর খবর থাকে না। আব্বা আর কোন পোলা পায় নাই। একটা গাধা, গন্ডারের চামড়া ওয়ালা পোলার কাছে আমারে তুইল্লা দিছে আর জীবনডা শ্যাষ কইরা দিছে।"
চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে শুনলো সব রাতুল।
এপাশ ফিরে শুয়ে শুয়ে ভাবছে, এ কেমন কথা? আমি বিবাহিত? আর তা আমি নিজেই জানি না! মেয়েটা দেখতে কেমন তাও তো জানি না! মনে যদিও চাইছে এখনই একবার দেখি লাইট জ্বেলে। কেমন মেয়ে বিয়ে করলাম, যার চেহারাও মনে নাই আমার। ফর্সা নাকি কালো তাও জানি না। পূর্ণিমা নাকি রিনা খান এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গেছে সে নিজেই টের পায়নি। এবার ঘুমে স্বপ্ন এসেছে বোধহয়। স্বপ্নে দেখে, পরীমনির মতো চোখ, নাক আর লম্বা চুলওয়ালী এক মেয়ে বিয়ে করেছে রাতুল। সে কী ভুবন ভোলানো হাসি রে বাবা! বিছানার এক পাশে হাতে ভর দিয়ে শুয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সিলিং ফ্যানের অত্যাচারে ভালোমতো দেখতেও পারছেনা চেহারাটা। চুল তার কবেকার এমন সিল্কি ছিলো কে জানে! সব এসে নাকেমুখের সামনে পর্দা তৈরি করে দিচ্ছিলো। রাতুল তার হাতে ভর দেয়া মাথার নিচে নিজের মাথা ঢুকিয়ে দিলো, এবার বউ তার ওপর মুখ রেখে হাসছে। তার মাথা বউয়ের হাতের সাথে ঘষা খাচ্ছে। বউ এবার হাত বাড়িয়ে দিলো রাতুলের মাথার নিচে। রাতুল মাথা এলিয়ে দিলো তার হাতের ওপর। বউ ননস্টপ হেসেই যাচ্ছে। আহা হাসি!
হঠাৎ খেয়াল করলো বউ পান চিবোচ্ছে। পান! ওহ নো। তবে খারাপও না। পানের রসে তার লাল ঠোঁট আরও লাল হয়ে যাচ্ছে। ঠোঁটের দু পাশ দিয়ে পিচকির আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। এবার বউকে 'মোল্লা বাড়ির বউ' সিনেমার শাবনূরের মতো লাগছে। তাও ভালো, নায়িকা তো। রাতুল আবারও দেখেই যাচ্ছি তাকে৷ সে পান খাচ্ছে আর হাসছে, খাচ্ছে আর হাসছে। এবারও তার চুল মুখের সামনে এসে আড়াল করে দিচ্ছে তার হাসি। রাতুল এবার চোখ বন্ধ করে বউয়ের পান চিবানোর আওয়াজ ফিল করলো। শুনতে পেল বউ "পুচ" করে পানের পিচকি ফেললো এক পাশে। আহা! কী মধুর সুর সে পিচকি ফেলার। কেমন যেন টলছি রাতুল এই শব্দ আর হাসির নেশায়। টলছে তো টলছে, টলছে তো টলছেই। রাতুল হাত বাড়ালো তার গালের দিকে, ঠোঁটের দিকে। হাতে চুল লাগছে। কিন্তু এই চুল সিল্কি নয়, কোঁকড়ানো! মুখও খসখসে লাগছে রাতুলের কাছে। যুবতী চেহারায় ভাঁজ পড়ে গেছে হঠাৎ করেই বউয়ের! বন্ধ চোখে রাতুলেরও কপালে ভাঁজ।
এমন সময় সজোরে হাত ঝাড়ি দিয়ে এক ধাক্কা দিলো রাতুলকে ধমকের সাথে কে যেন!
ঘুম ভাঙলো রাতুলের ট্রেনের মাঝে। পাশে তাকিয়ে দেখে, কোথায় শাবনূর কোথায় পরীমনি; এ তো সাক্ষাৎ ভিলেন ইলিয়াস কোবরার উত্তরসূরী! মাঝবয়সী লোকটা পান চিবোতে চিবোতে বলছে,
"ওই ছেরা, হিজলা নি তুই? অত ঘষাঘষি করস ক্যারে? বেশভুষা দেইক্কা ত বালা গরের ফুলাওই মনে অইতাছে। ইত্তা ঘষাঘষি শিখছত কইত্তে, হ্যাঁ?"
রাতুল এখনও ঘোরের মাঝে আছে। কী ঘটলো এতক্ষণ? মানে সে স্বপ্ন দেখছিলো? যাক, তারমানে সে অবিবাহিত। কিন্তু স্বপ্নটা ভালো ছিলো।
রাতুল একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল পাশের সিটে বসা মুরুব্বীর সাথে এমন ঘটে যাওয়ায়। তাই কিছুক্ষণ ট্রেনের দরজার সামনে থেকে বাতাস খেয়ে আসলে মন্দ হয় না। অস্বস্তিবোধটাও কেটে যাবে।
কিন্তু........
কিন্তু খেয়াল করলো রাতুল, উঠতে গিয়েই তো সব বিপত্তি। স্বপ্নে যে বাথরুম থেকে ঘুরে এসেছিলো রাতুল!

▪#দামোদর_মাস_বা_কার্তিক_মাসের_মাহাত্ম্য
(
123).▪#দামোদর_মাস_বা_কার্তিক_মাসের_মাহাত্ম্য▪
◆ দামোদর মাস বা কার্তিক মাস সনাতন ধর্মালম্বীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস। এই মাস ভগবান বিষ্ণুর মাস বলে খ্যাত। এই মাস ত্যাগের মাস হিসেবে ও পরিচিত।এই মাসে ভগবান বিষ্ণুর সেবা একগুণ করলে সহস্রগুণ ফল লাভ করা যায় । এই মাসে প্রত্যেক মন্দিরে বা তুলসী গাছের নীচে বিষ্ণুর প্রীতি লাভের জন্য দীপ দান করা হয়। এই পূণ্য মাস সম্পর্কে পদ্মপুরাণ,ভাগবতপুরাণ,স্কন্ধপুরাণ ও শ্রীহরিভক্তিবিলাস শাস্ত্রে অসংখ্য তথ্য বলা আছে। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে,এই পূণ্য মাসে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে কেউ যদি একটি প্রদীপ দান করে তবে, তার সমস্ত পাপ নাশ হবে এবং তার পুনর্জন্ম আর হবে না।
◆ তিনি সংসারে অজেয় ও অক্ষয়কীর্তি স্থাপন করবেন। নিরন্তন প্রদীপ জ্বালানো উচিত। প্রদীপটি মাটির হলে উওম হয়। প্রদীপটি জ্বালাতে সলিতা ও ঘি, তিলের তেল বা কর্পূর ব্যবহার করা হয়।কৃত্রিম ঘি ব্যবহার করবেন না।প্রদীপের আলোতে যেমন, চারদিক আলোকিত হয়ে সমস্ত অন্ধকার দূর করে;তেমনি ভক্তি ও জ্ঞান দ্বারা সকলের পাপ দূরীভূত হয়। অর্থাৎ প্রদীপের আলোর শিখা যত উজ্জ্বল হতে থাকবে,ততই তার পাপ ক্ষয় হতে থাকবে। স্কন্ধ পুরাণে বলা হয়েছে,এই মাসে যে প্রদীপ দান না করে তারা ব্রহ্মঘাতী,গোঘাতী,স্বর্ণ অপহারী ও সদা মিথ্যাবাদী। দামোদর মাসে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তার মাতৃ স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ হন। পৌরাণিক কাহিনী মতে, কলিপ্রিয়া তার স্বামীকে বধ করেছিল এবং তার ভুল বুঝতে পেরে সে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য এই দীপ দান করেন। এই পবিত্র মাসে দীপ দানের জন্য তিনি দেহান্তে বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হন। আবার,এক স্ত্রী ইঁদুর প্রদীপের তেল খেতে এসে নিজের অজান্তেই প্রদীপের সলিতাকে উস্কে দেয় বা জ্বলতে সাহায্য করে;আর যার ফলশ্রুতিতে দেহান্তের পর সে ও বৈকুন্ঠলোক প্রাপ্ত হোন।পূজা দেয়ার সময় ভগবান বিষ্ণুর চিত্রপট বা বিগ্রহের চরণে চার বার,নাভি কমলে দুই বার,মুখমন্ডলে তিনবার ও সর্বাঙ্গে সাত বার (ডানদিক থেকে আরম্ভ করে) প্রদীপ প্রদক্ষিণ করাতে হয়। দামোদর মাসে সম্পূর্ণ ভক্তি ,বিশ্বাস ও প্রেম দ্বারা ভগবান বিষ্ণুর পূজা করলে দেহান্তে বৈকুন্ঠ লাভ বা মুক্তি লাভ হয়। তাই, আপনারা অন্তত পক্ষে একটি প্রদীপ ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে অর্পণ করুন।
◆ (দামোদর মাস) মাশকলাই,বেগুন, বরবটি,শিম বর্জন। দমোদর মাসের ব্রতপালন করুন ভগবান দামোদরের বিশেষ কৃপা লাভ করে আপনার জীবনকে ধন্য করুন।
◆ স্কন্দপুরাণে ব্রহ্মা-নারদ সংবাদে বলা হয়েছে :-
হে মুনিবর! যে মানব কার্তিক ব্রত না করে, সে ব্রহ্মঘাতী,গোঘাতী,স্বর্ণচোর,ও সর্বদা মিথ্যাবাদী।
হে বিপেন্দ্র! বহু পূজা করে এবং শতবার শ্রাদ্ধ করেও কার্তিকে ব্রত না করার ফলে স্বর্গ প্রাপ্ত হয় না।
কার্তিকে ব্রত না করলে যে উৎকৃষ্ট দান,সুমহান তপস্যা ও জপ সকলই বিফল হয়।
হে নারদ! কার্তিক মাসে উত্তম বৈষ্ণব ব্রত না করলে সপ্ত জন্মার্জিত পুণ্য বৃথা হয়।
◆ দামোদর_ব্রতের_মাহাত্ম্য স্কন্দ ও পদ্মপুরাণে দামোদর ব্রতের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে বলা হয়েছে :-
সর্বতীর্থে যে স্নান,সর্বদানের যে ফল,কার্তিক মাসের কোটি অংশের একাংশেরও সমান হয় না।
কার্তিকের সমান মাস নাই, সত্যযুগের সমান যুগ না,বেদের সমান শাস্ত্র নাই,গঙ্গার সমান তীর্থ নাই।
যে মানব কার্তিকে শ্রীবিষ্ণু মন্দির প্রদক্ষিণ করে সে পদে পদে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল ভাগী হয়।
যে মানব কার্তিকে শ্রীহরির সম্মুখে নৃত্য,গীত,বাদ্য,ভক্তিসহ করে,সে অক্ষয়পদ বিষ্ণুধাম প্রাপ্ত হয়।
হে মুনিবর! কার্তিকে যিনি হরিকথা শ্রবণ করেন,তিনি শতকোটি জন্মের আপদসমূহ থেকে নিস্তার পান।
কার্তিকে নিমেষার্দ্ধকাল দীপদান ফলে সহস্রকোটিকল্প অর্জিত বহু পাপ বিলুপ্ত হয়।
মেরু ও মন্দর পর্বত সদৃশ অশেষ পাপ করলেও কার্তিকে দীপদান প্রভাবে সর্বপাপ দগ্ধ হয় –এতে সন্দেহ নাই।
◆ এছাড়া আরো অনেক মাহাত্ম্য পুরাণে বর্নিত আছে:-
বন্ধুদের অনুরোধ করব,আপনারা দামোদর ব্রত পালন করুন এবং মানব জীবন ধন্য করুন। এই মাসে বেশি করে হরিনাম জপ করুন এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় ভগবান দামোদরকে দীপদান করুন।
▪দামোদর মাস মানেই ১০০০ গুণ বোনাসের মাস। পড়ুন কিভাবে?
◆ ৩০০০ বার বিষ্ণু নামে ১ বার কৃষ্ণ নামের সমান হয়। আর এই দামোদর মাসে মাত্র ১ বার কৃষ্ণ নাম নিলে ১০০০ বার কৃষ্ণ নামের সমান হয়।
◆ আমরা জানি, প্রতিদিন ১৬ মালা করে ১ কোটি মহামন্ত্র জপ করতে প্রায় ১৬ বছর সময় লাগে। কিন্তু এই দামোদর মাসে ভগবান আমাদেরকে একটি বিশেষ বোনাস উপহার দিচ্ছেন। মাত্র ১ বার কৃষ্ণ নাম নিলে ১০০০ বার কৃষ্ণ নামের সমান হবে। অর্থাৎ ১০০০ গুণ বেশি ফল পাওয়া যাবে।
◆ যদি কেউ প্রতিদিন ১৬ মালা জপ করেন তাহলে অনায়াসে সে এই ৩০ দিনেই প্রায় ৫ কোটি মহামন্ত্র জপের সমান ফল পাবেন। অর্থাৎ প্রায় ৮০ বছরের ফল পাচ্ছেন মাত্র এই ১ মাসে।
◆ তাই এই দামোদর মাসকে ভগবানের বিশেষ বোনাসের মাসও বলা হয়।
জয় শ্রীকৃষ্ণ।।
#ভালো_লাগলে_লাইক_কমেন্ট_ও_শেয়ার_করবেন

এলিটিও_প্রডাক্ট
লেবুর হালি হঠাৎ হয়ে গেল তিন হাজার টাকা।
কেন হইলো, কবে হইলো কেউ জানে না।
শুধু হঠাৎ একদিন মানুষ বাজারে গিয়ে দেখলো খুচরা সবজির দোকানগুলোতে আর লেবু পাওয়া যাচ্ছে না। লেবু যা পাওয়া যাচ্ছে সব হচ্ছে সুপার মার্কেটগুলোতে।দামী পলিথিনে মোড়ানো, প্যাকেটের গায়ে দাম লেখা, চারটে লেবু দুই হাজার টাকা, ভ্যাট প্রযোজ্য।
.
মানুষ লেবুর জন্য আন্দোলনও করতে পারতেছে না।এইটা খাইলেও চলে না খাইলেও চলে। এখন সবাই অপেক্ষায় আছে দুইটা জিনিসের,
কবে লেবুর দাম কমবে আর লেবুর দাম কেন বাড়ছে এইটার কারণ জানার জন্য।
.
যাইহোক এক দেড়মাস চইলা গেল এভাবেই।
লেবু এখন এলিট সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে।
আমাদের মত গরীব, ছোটলোকদের জন্য এখন (সকাল) আর লেবু নয়।
.
সেদিন ক্লাসে হঠাৎ একটা অদ্ভুত স্যার ক্লাস নিতে আসলো। গেস্ট টিচার উনি।তো পরিচয় পর্বে সবাইকে বললো নাম আর প্রিয় ফল বলতে।
সবাই একে একে বলতে লাগলো। বেশিরভাগই ফলের উত্তরে হয় আম অথবা লিচু বললো।
আমি অদ্ভুত একটা ছেলে। আমি উত্তরে বললাম আমার প্রিয় ফল, সবেদা।সবাই হাসলো তবে ততক্ষণ হাসলো যতক্ষণ না স্যার বললো, আমারও প্রিয় ফল সবেদা।
সবার হাসি এখন বন্ধ।এখন তো চাটতে হবে। তাই সবাই হাসি থামায় নিজেদের সাথে সবেদা কেন সবচেয়ে উন্নত ফল এটা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো।
এখনও সবার বলা শেষ হয় নাই।তাই স্যার সবাইকে চুপ করতে বললো।আমি ভাবছিলাম আমিই অদ্ভুত কিন্তু আরেকজন যে অদ্ভুত ছিল আমি জানতামই না।
তো সেই ছেলেটা দাঁড়ায় বললো,
"আমার নাম মৃদুল। আমার প্রিয় ফল লেবু।",
ক্লাসের সবার মধ্যে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
স্যার বললো, "বাহ, ভাল তো।তবে লেবু তো এখন অনেক দামী জিনিস।",
ছেলেটা বললো,"কোথায় স্যার, মাত্র তো তিনহাজার টাকা হালি।"
সবাই চুপ হয়ে গেল।আমার অবাক লাগলো এই ভেবে যে ছেলেটা বাম রাজনীতি করে।আমিও মনে মনে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। তবে এদের সাথে আমার কেন যায় না আজকে বুঝলাম।
.
এভাবেই দিন চলতে লাগলো। তবে যারা একটু বড়লোক কিসিমের তাদের আচরণ দেখে খালি অবাকই হয়ে যাচ্ছি।
দুইদিন পর পর ফেসবুকে পোস্ট।
"লেবুর শরবত, আহ!"
"লেবু, আই লাভ ইউ।"
"লেবু ছাড়া জীবন অচল।"
ভাই এদের ব্যাবহার দেখে আমার মনে হইতে লাগলো, আমি জীবনে লেবুই খাই নাই।
লেবুর স্বাদও ভুইলা গেসি।না জানি কত মজা এই জিনিস। আহ!!!
লেবুর শরবত এখন হাইফাই রেস্টুরেন্ট ছাড়া বিক্রি হয় না।
এভাবে দিনে দিনে লেবু গরীব ছোটলোকদের হাতছাড়া হয়ে গেল। আর রক্ত চুষে খাওয়া, ঘুষ খাওয়া, সুদ খাওয়া
অবৈধ উপায়ে ফুইলা যাওয়া মানুষের কাছে লেবু হইয়া গেল "যা ছাড়া আমাদের চলেই না"
প্রোডাক্ট।
#এলিটিও_প্রডাক্ট
Hemanta Hassan
[পোস্টে কোন ডাবল মিনিং নাই
তবে লেবুর জায়গায় অন্য যেকোন কিছু বসায় কল্পনা করা যাইতে পারে।]

#তাহারেই_পড়ে_মনে
#তাহারেই_পড়ে_মনে
পর্ব আট
সাবিহা ছেলের বিয়ের দিন এগিয়ে এনেছেন। আত্মীয় স্বজন আর হবু বেয়াইবাড়ির সবাইকে সত্যিটা জানতে দেওয়া হলো না। সবাই জানলো ছেলের মা হঠাৎ ভিষণ রকম অসুস্থ হওয়াতে, মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে অস্থির হয়ে পড়েছেন। পুত্রবধুর মুখ দেখার জন্যই জান আটকে আছে। তাই আড়ম্বর হলো না, ছেলেপক্ষ বউ আনতে মেয়ের বাড়ি গেলো না বরং মেয়েপক্ষ বিয়ের কণেকে নিয়ে ছেলের বাড়ি এলো!
সাবিহা সবসময়ই অন্যকে গালি দিয়ে, হেয় করে নিজেকে বড় করার আস্ফালন করে এসেছে - সামনাসামনি সবাই চাটুকারিতাই করেছে। ভেতরে ভেতরে সাবিহা আর ওর পরিবার যে কতটা জঘন্য, কী ভাবে সবাই তাদের নিয়ে , জাফরিন তা নগ্ন করে জানান দিলে সহ্য করাটা সাবিহার জন্য কষ্টকরই বটে। তাই ছেলে নিয়ে ও ছেলেখেলাতেই ব্যস্ত হলো! প্রিন্সের শরীরেও খাঁগোষ্ঠিরই রক্ত - সেযে খুব সহজে পোষ মানবে না, কথা শোনানোর রাস্তা আসান হবে না তা সাবিহার চাইতে কে আর ভালো জানে!
নেই নেই করেও লোক কম না বাড়িতে। অবাক ব্যাপার সাবিহার বাপের বাড়ির কাউকে ডাকা হয়নি। পরে ধুমধামে অনুষ্ঠান করার সময় সবাই জানবে এভাবেই এই তর্ক ধামাচাপা দিয়েছে সাবিহা। সবার ভেতরেই চাপা উত্তেজনা কিন্তু সাবিহা কাউকে কিছু বলছে না। প্রিন্সের চাচা, ফুফুরা এসেছে। ডিঘটি থেকেও জনাপঞ্চাশের মতো লোক এসেছে। তারাও ইতস্তত বোধ করছে। তুলিকে খুব সাধারণ জামা-ওড়নাতে আনা হয়েছে। সাবিহা তিন লাগেজ ভরে উপঢৌকন পাঠিয়েছিলো কিন্তু কাবিন না হওয়া পর্যন্ত ছেলের বাড়ির কোনো উপহার তাকে ছোঁয়ানো হবে না। তুলির সাথে ওর খালা, ফুফু, চাচি, দাদি, বোনেরা এসেছে। সবাই ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখে এসেছে কিন্তু তুলি সেইযে বাড়িতে ঢুকে বিছানায় উঠে বসেছে, ঘন্টাতিনেক ধরে গুটিসুটি মেরে সেখানেই বসে আছে। আদর আপ্যায়নের কম হচ্ছে না এখানে কিন্তু সবারই মন ভার আর মুখে মেকি হাসি। কিছু একটা হচ্ছে ভেতরে কিন্তু সেই কিছুটা যে কী কেউই তা বুঝে উঠতে পারছে না। ভালোয় ভালোয় বিয়েটা হয়ে গেলে হয়। তুলির বড়চাচা রানিং চেয়ারম্যান। তুলি বংশের বড়মেয়ে। এমনিতেই যেচে ছেলের বাড়িতে এসেছেন তার উপর যদি বিয়েটা না হয়, কুমারি মেয়েকে এইভাবে আবার বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হয় তো অপমান, অপদস্ত হওয়ার সীমা থাকবে না। তিনি অযু করে এসে তওবার নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। 'হে রহিম রহমান, হে পরওয়ারদিগার, ক্ষমা করো। বান্দার মানসম্মান তোমার হাতে।'
বাইরবাড়িতে মওলানা সাহেব আর রেজিস্ট্রারকে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। নাস্তার পাশাপাশি বারচারেক চাও পরিবেশন করা হয়ে গেছে। মওলানা সাহেবই আজকের বিয়ের কাজি। তারাও বিব্রত হচ্ছেন - যে কাজে আসা হয়েছে তার কোনো খবরই নেই। কারও কাছে কিছু জানার উপায় নেই কারণ কেউই কিছু জানে না।
সবার ভেতরের গোপন শংকা ক্রমশ ফিসফাস এবং এখন ফিসফাস শোরগোলে পরিণত হয়েছে। বাড়ির ভেতর পাশে বড় বড় পুকুর - মাছের ঘের কাটা আছে। তার পাড়ে বসার জন্য ইট-সিমেন্টে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবার প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচতে প্রিন্সের বাবা সেখানে এসে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। প্রিন্সের চাচাদের অবস্থা শোচনীয়, একে তারা বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারছে না তার উপর মেহমানদের প্রশ্নাতুর চোখরাঙানি তাদেরকেই সহ্য করতে হচ্ছে!
বড় বড় হাড়ি চুলায় চড়ছে আর নামছে, ঘ্রাণে সারাবাড়ি ভরে আছে। অকারণ বারবার পরিবেশন ও করা হচ্ছে। কারো খাবারে রুচি না থাকায় সেগুলোর জায়গা হচ্ছে ডাস্টবিনে। কিন্তু বাড়ির কর্ত্রির খবর নেই। তিনি ছেলে নিয়ে সেইযে নিজের শোবার ঘুরে ঢুকে দোর দিয়েছেন বেরুবার নাম নেই। সেখানে কী হচ্ছে জানার উপায় নেই কারণ আশেপাশে ঘেঁষার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে।
কয়েকবার প্রিন্সের জোর কন্ঠস্বরে শোনা গেছে কিন্তু এর বেশি জানার উপায় নেই।
প্রিন্স মায়ের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মায়ের জন্য এটা বড় কষ্টের কিন্তু জাফরিনের বলা কথাগুলো সাবিহার দম্ভচুর্ণ করে সেখানে এক দাউদাউ করা আগুন জ্বেলে দিয়েছে, নাড়িছেঁড়া কলিজার টুকরো ছেলের চোখের পানি সেই আগুনকে শান্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়। বড় কষ্টে, অনেক ব্যথা হজম করে সাবিহা নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন, তা ধুলোয় মিলিয়ে যাবে তা কোনোদিন মানা যায় না। সাবিহার মা মারা গেছে ওকে পাঁচ বছরের রেখে, বাবা আবার বিয়ে করলে তার জায়গা হয় নানার বাড়িতে। সেখানে নানারকম অবহেলায়, অনাদরে বড় হয়েছে ও। খালাদের বিয়ে আশেপাশেই হয়েছে, নানার বাড়ি কাজ শেষ হলে নানা খালাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতো তাদের সংসারের কাজ করে দেওয়ার জন্য। নানা বঞ্চনা সয়ে সয়ে মন কৃচ্ছ, ছোট হয়ে গেছে। রূপের জোরে খাঁবাড়ির বউ হয়ে আসলেও চরিত্রহীন স্বামির মনে জায়গা হয়নি। বরং নানারকম কূটবুদ্ধি আশ্রয় করে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করতে হয়েছে। গয়না-বাড়ি আর মিথ্যে অহংকারই ওর বেঁচে থাকার শক্তি - সেটাকে নতুন করে জানান দিয়েছে জাফরিন আজকে। চাপা ব্যথাকে খোঁচা দিয়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছে। প্রতিশোধের স্পৃহায় আত্মজের কষ্ট তাই ধরা পড়ছে না ওর চোখে।
'মাগো, তুমি যা বলবে আমি তাই করবো। শুধু এইসব তুমি বন্ধ করো। আমার মিষ্টিকে চাই মা।'
'কিন্তু ওই মেয়ে তো আসবে না তোর সাথে। তোর তো রাস্তায় জন্ম হইছে, তুই কুত্তার জন্ম - তুই বাপ মা ছাড়তে পারবি, ওই মেয়ে কি নিজের বাপ মার অমতে তোর সাথে আসবে? তুই পারবি এখন ওকে আনতে?'
প্রিন্স ভালো করেই জানে এখন মিষ্টি আসবে না কোনোভাবেই। 'ও পড়াশুনা শেষ করবে মা।'
'তারপরে ওর যদি আর তোকে পছন্দ না লাগে। তখন যদি বড় চাকুরে, বড় পাশ দেওয়া ছেলে চায়?'
'মিষ্টি এমন করবে না, মা।'
'তোর বিয়ে আজকেই হবে, সে এই মেয়ের সাথে হোক বা মিষ্টির সাথে হোক। আজকেই হতে হবে।'
'অসম্ভব মা, আমাকে মেরে ফেললেও না। এতক্ষণ তোমার পায়ে ধরে সেধেছি, আর না। তোমরা যা পার কর। এভাবে আমাকে আটকে রাখা যায়, তুমি ভাবলে কী করে? একমিনিটও লাগবে না আমার তোমার বাড়ির সীমানা পার হতে। তুমিও তা খুব ভালো করে জানো। এইসব বন্ধ কর এখন নইলে আমাকে যে হারাবা তাও শুনে রাখো।'
সাবিহা প্রমাদ গুণলো। কিন্তু তার প্রস্তুতি নেওয়াই ছিলো, সে খুব ভালো করেই জানে বুনোবেড়াল আঁচড় কাটবেই। ওকে গায়ের জোরে না কৌশলে আটকাতে হবে। বাড়িতে মাছের চাষ হয়, ক্ষেতের কাজ হয় - কীটনাশকের মজুত থাকেই। এরকম একটা বোতল বের করে সামনে রেখে প্রিন্সকে একটা গল্প বলা শুরু করলো সে 'জানো বাপধন, আমি যখন বিয়ে করে এইবাড়িতে আসি তখন পনেরো - ষোল বয়স। নানারবাড়ি আধাপেট খেয়ে বড় হইছি, হঠাৎ করে সোনা-জহরৎ পেয়ে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেলো। আমি উড়তে লাগলাম। তোমার বাপে রাইতে আসতো, কাছে থাকতো, দামি শাড়ি-গয়না দিত। রাগ হইলে ভাতের থালা ছুঁড়ে মারতো, পাড়ায়া বেহুঁশ করে রাখতো - আমার কাছে ওইটাই ভালো থাকা মনে হতো। আমি তখনও ভালো থাকতাম এখনও ভালো থাকি। সংসারে থাকতে বহু কিছু সহ্য করা লাগে। কিন্তু আমার ভালো ভাগ্য অনেকের জন্য খুব খারাপও হয়। লোকে কিন্তু সব জানে, ঘেন্নাও করে আড়ালে কিন্তু টাকার গরমরে মান্যও করে। এই মিথ্যা দেমাগের লোভ সবাই ছাড়তে পারে না, আমিও পারিনা - তোমার বাপ-চাচারাও পারে না। তোমার বাপে আমারে মারত কিন্তু জানত যে আমি তার ঘরের বউ, তার বাড়ির মান। সে বাজারের মেয়েগো কাছে যাইতো, এখনো হয়তো যায়। এইরকম এক মাইয়ার একবার পেটে বাচ্চা আসলে সে দাবি করলো ওইটা তোমার বাপের বাচ্চা। তুলকালাম লেগে গেল। মাইয়ারে অনেক বোঝানো হইলো, টাকার লোভ দেখান হইলো কিন্তু মাইয়া অনড়। সে বাচ্চাও ফেলবে না, দাবিও ছাড়বে না! তারে নাকি তোমার বাপের বিয়া করতেই হবে। মেয়ে হয়ে আমি আরেক মেয়ের কষ্ট দেখলাম না, আমার ভয় হতে লাগলো সত্যিই তোমার বাপে আরেকটা বিয়ে করে বসবেনাতো? আমার ভয়ের চাইতেও তোমাগো গুষ্ঠির ভুয়া মানের ভয় ছিল বেশি। একদিন ওই মাইয়া যখন সাতমাসের সন্তানসম্ভবা তখন তার পেটে লাথি মেরে বাচ্চাটারে মেরে ফেলে তোমার বাপে। মেয়ে বড় জেদি ছিলো, ওই অবস্থায় তোমাগো এই বিরাট বাড়ির গেইটের সামনে এসে বসে থাকে। ভাগাড়ে দিয়া তারে তুইলা কই ফেলে আসছে তোমার বাপ-চাচারা তা আর খবর পাইনাই। থানা পুলিশ - বিচার যে এই বাড়ির সীমানায় ঢোকার ক্ষমতা রাখে না তা তুমিও খুব ভালো করেই জানো!'
একটু থামে সাবিহা। ছেলের বিস্ফোরিত চোখের দিকে তাকিয়ে শুকনো হাসি হাসে। তারপর বলে 'এইরকম অনেক ঘটনার স্বাক্ষী আমি। একটা গল্প শুনাইলাম, হাজার হাজার বলতে পারব। তোমাগো বড়ির জমিনে, ইটে যে কতমানুষের পঁচা রক্ত লেগে আছে তার হিসাব আমার কাছে আছে। এখন এই গল্প আমি কেন শুনাইলাম তোমারে? কারণ দেখো, কতকিছুর পরেও এই বাড়িটা কেমন মাথা উঁচা কইরে আছে, দেখছ? তোমার বাপে এখনও ওইরকম দুইএকটা পাপকাজ করতে দুইবার ভাববে না, তার মান বাঁচাইতে। আজকে ডিঘটিরা যদি ফেরত যায়, মিষ্টির কী হবে তা তুমি বুঝতে পারতেছ নিশ্চয়!'
প্রচ্ছন্ন কিন্তু সহজ হুমকি দিলো সাবিহা। প্রিন্সের আপাদমস্তক কেঁপে উঠলো!
'এখন তুমি কি করবা দেখো। এই অপমান আমিও নিতে পারব না। এইযে বিষের শিশি- এখনই গিলে ফেলব তোমার সামনে। হয় তুমি কবুল বলবা নইলে আমারে তো হারাইবাই, জাফরিনের মাইয়ার কী হবে তাও তুমি বুঝতে পারতেছ।'
আগেররাতে তুমুল তুফান গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে আছে সব। মেঘ কেটে ভোর থেকেই রোদের ঝলক। গাছের পাতার ময়লা ধুয়ে চকচক করছে। তাতে রোদ পড়ে ঝলমলে অবস্থা। জাফরিন মিঠিকে নিয়ে বারবার এঘর-ওঘর করছে। মিষ্টির সাথে সীমাতীত দুর্ব্যবহার করা হয়েছে সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। তার মেয়ে যে অবুঝ না তা খুব ভাল করেই জানে জাফরিন। হয়তো একটা ভুল হয়ে গেছে, একটু পা এলোমেলো চলে ফেলেছে - তার জন্য শাস্তিটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। দুদিন ধরে মিষ্টির সাথে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে গেছে কিন্তু মিষ্টির নিজেরও জেদের ভার অনেক, ও কিছুতেই সহজ হয়নি। ওর মনের আলোড়নও তিনি মা হয়ে টের পান, এঘরে থেকেও ওইঘরে মিষ্টি যে নির্ঘুম রাত ছটফট করছে বেশ বুঝতে পারে জাফরিন। আজকে জাফরিন নিজেই ছটফট করছে। অন্যরকম ভয় আর শংকায় মন দুলছে। সারারাত মিষ্টি ঘুমায়নি। সকালে অনেকক্ষণ ছাদে চুপ করে বসেছিলো। একটু আগে সামান্য খাবার মুখে দিয়ে বই নিয়ে বসেছে বারান্দায়। তারপর সেখানেই ঘুমিয়ে গেছে। মেয়ের কাছে এসে বসলো জাফরিন। খোলা বই বুকের উপর রেখে হাতের উপর মাথা দিয়ে গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে মিষ্টি। রোদ এসে মুখে পড়ছে। চশমা খোলা হয়নি। চশমার ভেতর দিয়ে কুঞ্চিত চোখ দেখা যাচ্ছে। চাপা কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। হাহাকার করে উঠলো মায়ের মন। কীভাবে মিষ্টির সাথে কথা বলবে বুঝে উঠতে পারল না জাফরিন। ঘরে এসে বাটিতে নারকেলের তেল নিয়ে গিয়ে মেয়ের পাশে বসে মিষ্টির মাথাটা কোলে টেনে নিয়ে রুক্ষ চুলে বিলি কেটে কেটে তেল লাগাতে থাকলে মিষ্টি জেগে গেল। আরাম পেয়ে ও চুপ করে থাকল। আস্তে আস্তে কথা বলতে শুরু করলো জাফরিন 'এরকম হয় মিষ্টি। এই বয়সে ভুল হয়ে যায়। আমরা সবাই ভুল করি। আমার মাথা ঠিক ছিল না মা। তুমি আমার বড় গর্বের ধন। মিঠি আসছে সেইদিন, তুমিইতো আমার দুনিয়া মা। তুমি কত ভালো মেয়ে তা আমার চাইতে ভালো তো কেউ জানে না। তোমার নামে খারাপ বললে আমার সহ্য হয় না। আমি অনেক খারাপ কথা বলেছি তোমাকে, তুমি আর মন খারাপ করে থেকো না।'
কিভাবে কী বলবে আসলেই বুঝতে পারছে না জাফরিন। এলোমেলো নানা কথা বলে গেলেন। 'এইরকম হয় মা। সবার হয়৷ তারপর যখন তুমি বড় হয়ে যাবে, অনেক বছর পরে এইসব ছেলেমানুষি কথা মনে পড়ে তুমি নিজেই হাসবা, মা। প্রিন্স তোমার সাথে যায় মা? তুমি এতো বুদ্ধিমান মেয়ে, তুমি এইটুকু বুঝনাই? যাকগে ওইসব ভুলে যাও মা। পড়াশুনা করো, হাসি আনন্দ করো। ওইসব আর মাথাতেও আইনো না। মনে রাখবা সবসময়, জীবন তোমার। কারও জন্য সেই জীবনের চলা থামে থাকে না। জীবন অমূল্য, কারো জন্য সেই জীবনের ক্ষতি করা ঠিক না। কোনো উল্টাপাল্টা চিন্তা কখনো মাথায় জায়গা দিবা না। মনে রাখবা তোমার মা আছে, তোমার বাবা আছে তোমার জন্য। আর মিঠির জন্য তুমি আছ।'
আবোলতাবোল বলতে বলতে জাফরিন চোখ বন্ধ করে বলে ফেললো
'আর এখন তার বিয়ে হয়ে গেছে, সে অন্য মেয়ের স্বামী। তার কথা এখন ভাবাটাও অন্যায় তাতো তুমি বোঝো, না?'
মিষ্টি একটু নড়ে উঠলো 'কী হয়েছে আম্মু, কার বিয়ে হয়েছে?'
জাফরিন ভয়ে ভয়ে বললেন 'কালকে রাতে সাবিহা বুর ছেলে প্রিন্সের কাবিন হয়ে গেছে, মিষ্টি। আর কাবিন মানেই তো বিয়ে। শুধু লোকদেখানো অনুষ্ঠানটাই হয়তো বাকি আছে।'
মিষ্টি চুপ করে থাকলো। কিছুই বললো না। জাফরিন আতঙ্কিত হয়ে ধাক্কা দিলো ওকে, মরিয়া হয়ে বললো 'ঘুরতে যাবা মিষ্টি, তোমার আব্বু অনেকদিন ধরে বলছে - কক্সবাজার বেড়াতে যাবে। যাবা মা?'
'যাব মা।' আস্তে আস্তে জবাব দিলো মিষ্টি।
চলবে...
Afsana Asha
আগের পর্ব
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/852119442260220/

বিবশ_রজনী
#বিবশ_রজনী
#পর্ব_সাত
.....
রাত এগারোটার দিকে জেরিন নিজাম সাহেবকে ফোন করে বলল, "আমি পারবো স্যার।"
নিজাম সাহেব বললেন, "মিস জেরিন আপনি চিন্তা-ভাবনা করে বলছেন তো?"
--"স্যার চিন্তা-ভাবনা করেই বলছি।"
--দেখুন, আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে ঈশান যে সুস্থ হয়ে যাবে আমি কিন্তু সেই নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। আর ঈশান আপনাকে সঙ্গী হিসেবে পছন্দ করবে কি না সেটাও কিন্তু জানি না।"
--"ও আমাকে পছন্দ করুক অথবা অপছন্দ করুক তা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই, আমি চাই ও সুস্থ হয়ে উঠুক।"
--"আপনাকে সবকিছু বলেছি, ঈশান রাত দুটোয় ঘর থেকে বের হয়ে যায়, ফিরে আসে রাত তিনটায়। আপনার পক্ষে কি এত রাতে সময় দেওয়া সম্ভব হবে? আপনার মা-বাবা এত রাতে আপনাকে ঈশানদের বাসায় আসতে দেবে?"
--"আমার মনে হয় না বাবা-মা আমাকে নিষেধ করবে। যদি নিষেধ করে তাহলে সেটা আমি দেখবো। আপনি আমাকে বলুন কি করতে হবে।"
--"সবকিছু আমি আপনাকে বুঝিয়ে দেবো। আপনি আগামীকাল একবার ওয়ারীতে আসতে পারবেন?"
--"জ্বী স্যার পারবো।"
--"ঠিক আছে, আপনার সুবিধা অনুযায়ী আপনি চলে আসবেন। আর আরেকটা ব্যাপার, স্যার শব্দটা আমার ঠিক ভাল লাগে না, আপনি আমাকে অন্য যে কোন সম্মোধন করতে পারেন।"
--"আচ্ছা।"
নিজাম সাহেব ফোন রেখে ল্যাব ঘরে বসে পুনরায় ঈশানের ভিডিওর সাথে তাঁর লেখা মিলিয়ে দেখলেন। ঈশান যেসব কথা বিড়বিড় করে বলে তিনি চেষ্টা করেছেন যথাসম্ভব নিখুঁতভাবে সেসব লিপিবদ্ধ করার। কিছু শব্দের হের-ফের হয়তো তারপরেও রয়ে গেছে, তবে বাক্যের মাঝে কোনো বড় ধরনের অমিল থাকার কথা নয়। তিনি পর পর তিনবার ঈশানের ভিডিও দেখলেন। ভিডিও দেখা শেষ করে তিনি সংলাপ আকারে ঈশানের কথোপকথনের সাথে সম্ভাব্য প্রতিত্তোর লিখলেন।
রাত প্রায় সাড়ে তিনটার কাছাকাছি হঠাৎ দুবার বাড়ির দেয়ালে শব্দ হলো। নিজাম সাহেবের মনে হলো বাড়ির পূর্ব পাশ থেকে কেউ তাদের জানালা লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তে শুরু করেছে। তিনি দ্রুত ঘরে গিয়ে হামিদুলকে ডেকে তুলে বললেন, "চল ওঠ ওঠ, আজকে বেটাকে ধরেই ছাড়বো।"
হামিদুল বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো, এমন সময় জানালার একটা কাঁচ ভেঙে গেল। নিজাম সাহেব দ্রুত হামিদুলকে নিয়ে বাড়ির নিচে গেলেন। তিনি তাঁর পোষা কুকুর রিকের রশি খুলে দিয়ে বাড়ির গেট থেকে পূর্ব পাশে গিয়ে দেখলেন, আবছা মতন কাউকে দেখা যাচ্ছে। তিনি রিককে ইশারায় বললেন তাকে ধরতে। এ্যালাস্কান মালামিউট প্রজাতির কুকুরগুলো এই কাজটা খুব ভাল পারে। নিজাম সাহেবের নির্দেশ পেতেই রিক সেই মূর্তির পেছনে ছুটতে শুরু করলো। রিককে কিছু সময় পরপর থেমে গন্ধ শুকে ছুটতে দেখে নিজাম সাহেবের মনে হলো, এই গন্ধের সাথে সে আগে থেকেই পরিচিত।
রিককে অনুসরণ করে নিজাম সাহেব এবং হামিদুল দুজনেই ছুটতে শুরু করলেন। কিছুসময় পর রিকের আক্রমনাত্মক গর্জন শুনে নিজাম সাহেব নিশ্চিত হলেন রিক তাকে ধরে ফেলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে রিকের সামনে গিয়ে নিজাম সাহেব প্রত্যক্ষ করলেন কেউ একজন মাটিতে পড়ে আছে। তিনি মুঠোফোন বের করে বাতি জ্বালতেই হামিদুল বলল, "রফিক্কা!"
নিজাম সাহেব বললেন, "তুই ওকে চিনিস নাকি?"
হামিদুল রাগ রাগ গলায় বলল, "ওতো বিউটি খালার জামাই, বিউটি কাজে আসলে বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করে।"
রফিক ভয়ার্ত কন্ঠে বলল, "স্যার আপনার কুত্তাটারে দয়া কইরা সড়ান স্যার, কামড়ায়া শেষ করে দিল।"
নিজাম সাহেব রিকের রশি ধরে হামিদুলকে দিয়ে বললেন, "ওকে দূরে সরা।"
হামিদুল রিককে কিছুটা দূরে নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজাম সাহেব রফিকের পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি প্রতিরাতে আমাদের বাসার জানালা লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ে মারো কেন? সমস্যা কি তোমার?"
--"স্যার আর মারবো না স্যার, ভুল হয়ে গেছে।"
--"ভুল হয়েছে বুঝলাম, কিন্তু ঢিল মারার কারণটা কী? মানুষ তো অবশ্যই কারণ ছাড়া একজনের বাসার জানালা লক্ষ্য করে প্রতি রাতে ঢিল ছুড়ে মারবে না।"
--"রফিক কোকাতে কোকাতে বলল, "স্যার এই আপনার কুত্তাটার জন্যে, এই কুত্তায় আমারে ঐদিন কামড় দিছে।"
--"ও আচ্ছা, এবার বুঝলাম, তুমিই তাহলে সেই লোক। তুমি আমার বাসায় চুরি করার উদ্দেশ্যে এসেছিলে, তাই না?"
--"স্যার মিথ্যা বলবো না, চুরি করার উদ্দেশ্যেই গেছিলাম।"
--"তোমাকে এখন পুলিশে দেবো।"
--"স্যার মাফ কইরা দেন স্যার, আর হইবো না।"
--"তোমাকে এত সহজে আমি ছাড়ছি না বুঝেছো, তুমি বিউটিকেও নেশার টাকা জোগাড় করতে খুব জ্বালাতন করো।"
--"স্যার আপনে আমারে যা খুশি করেন, আপনার পায়ে পড়ি স্যার আমারে পুলিশে দিয়েন না, জেলখানা খুব কষ্টের জায়গা স্যার।"
--"উঠো, উঠে আমার সাথে চলো।"
--"কই স্যার।"
--"বেশি কথা বলো না, বেশি কথা বললে কিন্তু পুলিশে দিয়ে দেবো।"
রফিক উঠে দাঁড়িয়ে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে নিজাম সাহেবের পেছনে হাঁটতে শুরু করলো।
নিজাম সাহেব বাসায় ফিরে রফিককে একটা ঘরে ঢুকিয়ে হাত-পা বেঁধে রিককে জানালার সাথে শক্ত করে বাঁধলেন এরপর ঘর থেকে বের হয়ে ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলেন। দরজা বন্ধ করার সাথেই রফিক চিৎকার দিয়ে বলল, "ও স্যার আপনার কুত্তা আমারে মাইরা ফালাইবো। দরজা খুইলা দেন স্যার।"
নিজাম সাহেব হামিদুলকে বললেন, "শাস্তিটা কেমন হলোরে?"
হামিদুল হাসতে হাসতে বলল, "একদম উচিৎ শিক্ষা।"
নিজাম সাহেব বললেন, "কিছুক্ষণ পর পর দরজা খুলে একটু দেখিস, রিক যেন ছুটে না যায়, ছুটে গেলে কিন্তু ওকে খুব কামড়াবে, আমি কিছুক্ষণ ঘুমাবো, আজ আমার অনেক কাজ। তোর যদি ইচ্ছা হয় তো রফিকের বাঁধন খুলে দিস, তবে বিউটি বাসায় আসার আগে যেতে বারণ করবি। যদি যাবার জন্যে বেশি ঝামেলা করে তাহলে ছেড়ে দিস।"
হামিদুল বিজয়ের হাসি দিয়ে বলল, "আচ্ছা।"
--"তোর কি ঘুম এসেছে?"
--"না।"
--"ঠিক আছে, খেয়াল রাখিস আমি গেলাম।"
ভোর পাঁচটা বেজে গেছে, নিজাম সাহেব শোবার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। হামিদুল দুষ্টর শিরোমনি, নিজাম সাহেব চলে যেতেই দরজা খুলে রিকের সামনে গিয়ে রশিতে হাত দিয়ে রফিককে বলল, "ছেড়ে দেই?"
বিউটি সকাল দশটায় বাসায় এসে হামিদুলের কাছে রফিকের কথা শুনে রাগে-ক্ষোভে, লজ্জায়-দুঃখে কাঁদতে শুরু করলো। বিউটির কান্নার শব্দে নিজাম সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি বিছানা থেকে উঠে ডাইনিংয়ে এসে বিউটিকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কাঁদছো কেন?"
বিউটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ভাইজান, আমি এই বাড়িতে কাজ করি, আপনে আমার কত উপকার করেন! আর আমার স্বামী এই বাড়িতেই চুরি করতে আসে। লজ্জায় ভাইজান মনডা চাইতেছে গলায় দড়ি দিয়া ঝুলে থাকি।"
নিজাম সাহেব হামিদুলকে ইশারায় রফিকের বাঁধন খুলে দিতে বলে বিউটিকে বললেন, "কেঁদো না, যা হবার হয়েছে। তোমার স্বামীকে আমি একটা সুযোগ দিতে চাই, দেখি সে কি করে।"
হামিদুল রশি খুলে দেবার পর রফিক ডাইনিংয়ে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। নিজাম সাহেব বললেন, "তুমি যে চুরি করো, এই তো ধরা পড়লে তাই না। চুরি করলে এইভাবেই একদিন না একদিন ধরা পড়তে হয়। আর তোমার সংসারে তো খুব বেশি অভাব নাই, তুমি অভাবের জন্যে চুরি করো না, চুরি করো হচ্ছে নেশার টাকার জন্যে। তুমি কি নেশা ছাড়বে না?"
রফিক মাথা নত রেখেই বলল, "স্যার ছেড়ে দেবো।"
--"তোমার মুখের কথা আমি বিশ্বাস করি না। তোমাকে আমি একটা কাজ দিচ্ছি, এর জন্যে প্রতিমাসে তোমাকে আমি টাকাও দেবো।"
--"কি কাজ স্যার?"
--"তুমি এখন থেকে আমাদের বাসা দেখাশোনা করবে, বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডের ঘরটা খালি পড়ে আছে, তুমি বিউটিকে নিয়ে ঐ ঘরেই থাকবে। রাজী আছো?"
--"জ্বী স্যার।"
--"জ্বী স্যার বললে হবে না, আমি কিন্তু নিয়মিত তোমার ব্ল্যাড টেস্ট করে দেখবো তুমি নেশা করছো কি না।"
--"জ্বী স্যার।"
--"এই তুমি আমাকে স্যার স্যার বলবে না তো। স্যার ব্যতীত অন্যকিছু বলবে, বিউটির মতো ভাইজান বলতে পারো।"
--"তাহলে বিউটিকে নিয়ে গিয়ে বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে আসো।"
নিজাম সাহেব ঘর থেকে তিনহাজার টাকা এনে বিউটিকে দিয়ে বললেন, "রফিককে যাবার সময় ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে যেয়ো, যদিও আমি নিয়মিত রিককে ভ্যাকসিন দেই, তারপরও সাবধানতার মার নেই।"
দুপুরবেলা জেরিন নিজাম সাহেবকে ফোন করে বলল, "ভাইয়া আমি ওয়ারীতে চলে এসেছি।"
নিজাম সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, "এখন আপনি ওয়ারীর কোথায় আছেন?"
--"আমি আড়ংয়ের সামনে আছি ভাইয়া।"
--"কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমি আসছি।"
নিজাম সাহেব বাসা থেকে বের হয়ে জেরিনকে সাথে নিয়ে পুনরায় বাসায় ফিরে এসে ল্যাবে গিয়ে ঢুকলেন।
ঈশানের রাতে হাঁটার ভিডিও ছেড়ে নিজাম সাহেব জেরিনের দিকে সংলাপের কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন, "ঈশানের ভিডিওটা ভাল ভাবে দেখুন। কিছুক্ষণ পর পর ঈশান বিড়বিড় করে কথা বলে, আমি চেষ্টা করেছি সেসব কথা নির্ভুলভাবে লেখার। কিছুক্ষণ ভিডিও চলার পর নিজাম সাহেব পুনরায় বললেন, "ভাল ভাবে লক্ষ্য করে দেখুন, ঈশান প্রতিবার কথা বলে কিছু সময়ের জন্যে থামছে। ওর মুখের ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, সে কারও কথা শুনতে পাচ্ছে। হতে পারে তার অবচেতন মন অংশী হয়ে ওর কথার প্রতিত্তোর দিচ্ছে। আপনার ভূমিকা হবে, অংশীর ভূমিকা পালন করা। কখন কি বলতে হবে আমি সবকিছু কাগজে লিখে রেখেছি।"
নিজাম সাহেব ল্যাব থেকে বের হয়ে সিঁড়িতে বসে একটা সিগারেট ধরালেন। কিছুক্ষণের মধ্যে হামিদুল এসে তাকে একটা খাম দিয়ে বলল, "কে যেন দরজার নিচে রেখে গেছে।"
নিজাম সাহেব খাম খুলে চিঠি বের করে পড়তে শুরু করলেন, চিঠিতে লেখা,
১৩. ১০. ২০
"এমন উত্তরই আপনার কাছ থেকে আশা করেছিলাম। অতীত এবং ভবিষ্যৎ মানুষকে অবশ্যই প্রভাবিত করবে তবে মানুষ বেঁচে থাকবে বর্তমানে। আপনার একটা দুঃখজনক অতীত রয়েছে। বলাটা হয়তো ঠিক হলো না, স্ত্রী-সন্তানের কথা নিশ্চয়ই আপনার খুব মনে পড়ে, মনে পড়াটাই স্বাভাবিক। আপনি কি কখনো সঙ্গী হীনতায় ভোগেন না? সঙ্গী হিসেবে কাউকে পেতে ইচ্ছা করে না? যদি সত্যি আপনি মনে করেন আপনার একজন সঙ্গীর খুব প্রয়োজন তাহলে আমাকে খুঁজে বের করবেন, অন্যথায় খুঁজবার প্রয়োজন নেই।"
নিজাম সাহেব চিঠি পড়া শেষ করে ভাবতে শুরু করলেন তারিখ নিয়ে। চিঠিগুলো যে পাঠাচ্ছে সে অবশ্যই তার পূর্ব পরিচিত, খুব সম্ভবত চিঠিগুলো তার নিজের হাতে লেখা না। সে এইপর্যন্ত যে কয়টা চিঠি পাঠিয়েছে, এরমধ্যে একটাতেও তারিখ উল্লেখ ছিল না, এই চিঠিটাতে তারিখ উল্লেখ করবার কারণ কী? তিনি চিঠি পকেটে রেখে ল্যাবে ঢুকলেন। ঈশানের ভিডিও ক্লিপ জেরিনকে দিয়ে তিনি বললেন, "বাসায় গিয়ে ভিডিওটা বার বার দেখবেন, ঈশান কথা বলা থামালেই, আপনি অংশীর ভূমিকায় কাগজে যা লেখা আছে অনুশীলন করবেন। দুই-তিনদিনের মধ্যে আমরা কাজ শুরু করবো।"
রাতে নিজাম সাহেব ঈশানের বাবা আব্দুল মালেক সাহেবকে ফোন করলেন। তিনি ফোন কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ পর নিজাম সাহেবকে ফোন করে বললেন, "দুঃখিত একটু ব্যস্ত ছিলাম, সেজন্যে ফোনটা তখন ধরতে পারিনি। কি ব্যাপার বলুন, কেমন আছেন?"
নিজাম সাহেব বললেন, "বেশ ভালো আছি, আপনারা কেমন আছেন?"
--"শারীরিক ভাবে ভালো আছি, মানসিক ব্যাপারটা তো আপনি জানেন।"
--"আপনাকে একটা জরুরী বিষয়ে ফোন দিয়েছিলাম।"
--"বলুন।"
--"আমি হয়তো আগামীকাল রাত থেকে একজনকে নিয়ে আপনাদের বাসায় আসবো। অনেক কিছু আপনাদেরকে বলা হয়নি, ঈশান অংশী নামের একজনকে খুব পছন্দ করতো, মেয়েটা মারা গেছে। আমার ধারণা একাকীত্বতা থেকেই ঈশানের এরকম সমস্যা হয়েছে। আমি যাকে আমার সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছি সে ঈশানকে খুব পছন্দ করে, এতে কি আপনাদের কোনো সমস্যা আছে?"
--"না, কোনো সমস্যা নেই, আমরা শুধু চাই আমাদের ছেলেটা সুস্থ হয়ে উঠুক।"
--"আমিও তাই চাই, একটা কাজ আপনাকে করতে হবে।"
--"কি কাজ?"
--"আমি যেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ইশানকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি, তাতে বেশ ঝুঁকি আছে, ছাদের রেলিংয়ের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ যে কোনো সময় ঈশানের জ্ঞান ফিরে আসতে পারে, অথবা তার ঘোর কেটে যেতে পারে, এমনটা হলে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাবার সম্ভাবনা খুব বেশি। আপনি আগামীকালের মধ্যে চাদের চতুর্দিকে নেট জাতীয় কিছু লাগানোর ব্যবস্থা করবেন, যাতে পড়ে গেলে নেটে গিয়ে পড়ে, নিচে না পড়ে যায়। আরও আগেই লাগানো উচিৎ ছিল।"
--"আমি কালকেই ব্যবস্থা করবো।
নিজাম সাহেব ফোন রাখলেন। তার চোখের সামনে ভেসে আসছে চিঠির তারিখ, ১৩. ১০. ২০।
.....
#চলবে
লেখা,
নাহিদ হাসান নিবিড়
পর্ব-০৬
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/852420418896789/
এসিড
পর্ব ৫
নির্ভীক হোসাইনুল আলমকে কড়া কিছু কথা শোনানোর জন্য প্রস্তুত হয়। দাঁতে দাঁত চেপে, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে শান্তস্বরে বলে,
'আমার লাইফের ডিসিশন নিজে নেয়ার মতো যথেষ্ট বয়স হয়েছে আমার। এখনও কেন আপনাকে আমার সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে?'
হোসাইনুল আলম হতভম্ব হয়ে পড়েন নির্ভীকের কথায়। ওর এত সাহস হলো কবে? তিনি রক্তবর্ণ চোখে বলেন,
'কি বললে তুমি? তোমার...'
হোসাইনুল আলমকে হাতের ইশারায় থামিয়ে নির্ভীক বলে,
'আপনি নিজের পছন্দমতো নিজের ক্যারিয়ার গড়েছেন। আপনার ইচ্ছে ছিলো রাজনীতি করার, কিন্তু দাদু ভাইয়ের ইচ্ছে ছিলো আপনাকে ডাক্তারি পড়ানোর। আপনি পড়েছেন? সেই তো নিজের ইচ্ছেয় রাজনীতি করলেন।'
হোসাইনুল আলম তুমুল রেগে বললেন,
'কি বললে তুমি? ডাক্তারি পড়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিলো না। ওটা বাবার পেশা বলে বাবা আমাকেও পড়তে বলেছিলেন।'
নির্ভীক হোসাইনুল আলমের কথাটা ধরলো। ও যেন এই কথাটা শোনার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। সুযোগ বুঝে কোপ দিলো নির্ভীক।
'এক্সেক্টলি! এটাই আপনাকে বোঝাতে পারছিলাম না। আপনার বাবা ডাক্তার বলে তিনি আপনাকে ডাক্তার বানাতে চাইলেন। কিন্তু আপনার পছন্দ রাজনীতি। তাই আপনি বাবার কথা না মেনে রাজনীতি করে গেছেন আজীবন। আর আজকে আপনার পছন্দের পেশা চাপাতে চাইছেন আমার ওপর। আমাকে রাজনীতিতে নিতে চাইছেন। আপনিও ঠিক দাদুর মতো কাজই করছেন এবং আমিও ঠিক আপনার মতো বাবার কথা না শুনে ফটোগ্রাফিই করবো। কেউ আমাকে সরাতে পারবে না।'
এটুকু বলে নির্ভীক হোসাইনুল আলমের হাত থেকে শান্ত ভঙ্গিতে ক্যামেরাটা নিয়ে নিলো। হোসাইনুল আলম বিস্ফোরিত চোখে নির্ভীকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নির্ভীক চলে যাওয়ার জন্য সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। আবার ফিরে তাকিয়ে বলে,
'মি. হোসাইনুল আলম, হয়তো এই ফর্মূলা একদিন আমিও আমার ছেলের ওপর প্রয়োগ করবো। তাকে জোর করে ফটোগ্রাফার বানানোর চেষ্টা করবো। আর সে আমার বিরোধিতা করবে। হয়তো বংশপরম্পরায় এই নিয়ম চলমান থাকবে।'
হোসাইনুল আলম পাশে থাকা বড় ফুলদানিটাতে জোরে লাথি মারলেন। ভয়ানক জোরালো শব্দে সেটা ভেঙ্গে খানখান হয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। সিঁড়ির রেলিংয়ের রিংয়ে হাত রেখে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস নেন হোসাইনুল আলম। কিছু ভাঙ্গার শব্দ পেয়ে পড়িমরি করে সবাই ড্রইংরুমে ছুটে আসে।
নির্ভীক বাবার দিকে একটু এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলে,
'এটাই আপনার আর আমার মধ্যে তফাৎ। আপনি সামান্য কারণেই তুমুল রেগে যান। অথচ আমি সকল পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারি। আমি আপনার মতো নিজের ছেলের ওপর নিজের পছন্দের পেশা চাপিয়ে দিবো না। ছেলের সাথে বন্ধুর মতো মিশে আগে তার মনের কথা জানার চেষ্টা করবো।'
হোসাইনুল আলমের চোখ ভয়াবহ লাল হয়ে গেছে। তাঁর ইচ্ছে করছে নির্ভীককে কষে একটা চড় লাগাতে। কিন্তু সেটা তিনি করতে পারছেন না। কারণ নির্ভীকের প্রত্যেকটা কথায় যুক্তি আছে। তিনি হুংকার ছেড়ে বললেন,
'তোমার সাহস খুব বেড়ে গেছে। নিজের বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ফিউচার ছেলের কথা বলছো। লজ্জা করে না তোমার?'
নির্ভীক কিছু বলার আগেই মিসেস শায়লা এসে ওর হাত চেপে ধরে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বলেন,
'তুমি আর একটা কথা বলবে না নির্ভীক। এক্ষুনি নিজের রুমে যাও।'
নির্ভীক কথা না বাড়িয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে চলে গেল। যেতে যেতে একবার বাবার দিকে ফিরে তাকালো। এরপর নিজের মতো উঠে চলে গেল।
.
সন্ধ্যার পর আরিশা পড়তে বসে। সামনে বই খোলা অথচ মন পড়ে আছে নির্ভীকের কাছে। আরিশা ভেবে পায় না, ক্ষনিকের দেখা পাওয়া সেই ছেলেটার কথা ওর কেন বারবার মনে পড়ছে।
রাফসান এসে বসে আরিশার পাশে। ভালোভাবে খেয়াল করে আরিশাকে। অন্যমনস্ক হয়ে থাকতে দেখে চোখের সামনে তুড়ি বাজায়। আরিশা চমকে উঠে বলে,
'ওহ চাচ্চু তুমি?'
'কি ব্যাপার? অন্যমনস্ক লাগছে?'
'কিছু না।'
'কিছু তো একটা আছেই। আচ্ছা, আজকে নাকি তুই ভাত রাঁধতে ভুলে গিয়েছিস?'
আরিশা কেমন যেন লজ্জা পেয়ে যায়। লজ্জামাখা হাসি দিয়ে বলে,
'কেন এরকমটা হলে বুঝলাম না। ভাত রাঁধতে কেউ ভুলে যায়? আব্বু আর সেঝ চাচ্চুর সামনে কেমন লজ্জায় পড়ে গেলাম।'
'হয় হয় এরকম হয়।' সবজান্তার মতো বলে রাফসান।
'মানে?'
'শোন তোকে একটা গল্প বলি।'
'কিসের গল্প?' উৎসুক হয়ে জানতে চায় আরিশা।
'তোর মায়ের।'
আরিশা খানিক দমে যায়। এবাড়িতে কেউ ওকে মায়ের গল্প শোনায় না। মাঝেমধ্যে রাফসান শোনায়। কিন্তু সেটা যদি আশফাক আহমেদ জানতে পারে তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যায়। আশফাক আহমেদ এমনিতেই খুব শান্ত প্রকৃতির। কারো সাতেপাঁচে থাকেন না তিনি। তার জীবনের সবটা জুড়ে আছে আরিশা। আরিশার কষ্ট তিনি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেন না। মায়ের গল্প শুনলেই আরিশার মন খারাপ হয়। সারাক্ষণ কেমন মুখ গোমড়া করে, উদাস হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তখন আশফাক আহমেদের খুব রাগ হয়। তিনি আরিশার বিষাদময় চেহারাটা দেখতে পারেন না, সইতে পারেন না। তিনি রেগে খানিক কথা শুনিয়ে দেন রাফসানকে। এরপর আরিশাকে আদর করে ওর মন খারাপটা দূর করেন। কিন্তু আরিশার মন খারাপ দূর হতেই সেটা ওনার ওপর এসে ভর করে। সারাদিন তাঁর স্ত্রী হুরায়রাকে মনে পড়ে। যন্ত্রণায় সারারাত ছটফট করেন, ঘুমাতে পারেন না বেশ কয়েক রাত। চোখ বুজলেই চোখের সামনে হুরায়রার বিভৎস চেহারাটা ভেসে উঠে। তখন তিনি হাউমাউ করে ছোট বাচ্চার মতো কাঁদেন। আরিশার পাশে বসে সারারাত চোখের জল ফেলেন। অন্যপাশে ফিরে আরিশাও তখন চোখের নোনা পানিতে বালিশ ভেজায়।
'আরিশা? কি হলো? শুনবি না?' আরিশাকে চুপ থাকতে দেখে ডাকে রাফসান।
'হ্যাঁ বলো শুনবো তো।'
'তোর মা-ও না বিয়ে করে এখানে আসার পর প্রায়সময় ভাত রাঁধতে ভুলে যেত। সে তখন ভালো রাঁধতে পারতো না। অনেক বড়লোকের মেয়ে ছিলো ভাবী। মস্ত বড় ডাক্তারের মেয়ে। শহরের মস্ত বড় ভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছে। সে কি আর রাঁধতে জানে?' আরিশার ভাজ করা বইয়ের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে রাফসান।
'তারপর?' টেবিলে রাখা রাফসানের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে আরিশা।
'প্রথম প্রথম এই বাড়িতে তার খুব অসুবিধে হতো। ছোটবেলা থেকে যে মেয়ে সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড় হয়েছে সে আমাদের মতো ভাঙ্গাচোরা বাড়িতে কিভাবে থাকবে? তবে ধীরে ধীরে সব মানিয়ে নেয় ভাবী। বড়ভাইকে অনেক বেশি ভালোবাসতো ভাবী। শুধুমাত্র বড়ভাইয়ের জন্য এরকম বাড়িতে থাকতেও আপত্তি করেনি কোনদিন।'
'আব্বু-আম্মু কি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো চাচ্চু?'
'না। ওরা বিয়ের আগে কেউ কাউকে কোনদিন দেখেনি। বড়ভাই তো ভাবীকে দেখেছে বিয়ের পর। না দেখেই শুধুমাত্র তোর দাদার কথায় বিয়ে করে নিয়েছিলো।'
'দাদা কিভাবে আম্মুর খোঁজ পেয়েছিলো?'
'আব্বা তো প্রায়ই শহরে যেত। একবার আব্বার হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। তাই সেঝভাইকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে শহরে যায় আব্বা। ওখানে আলাপ হয় ভাবীর আব্বার সাথে। ভাবীর আব্বা মানে তোর নানাভাই আমার আব্বার চিকিৎসা করে। তোর নানাভাই ছিলো খুবই সুন্দর মনের মানুষ। তিনি খুব সুন্দর ভাষায় কথা বলতেন। আব্বা তার কথায় মুগ্ধ হয়ে বলে বসেন, ওনার মেয়েকে তিনি ঘরের বউ করতে চান।' এটুকু বলে থামে রাফসান।
'নানাভাই কি মরে গেছে?' আকষ্মিক প্রশ্ন করে আরিশা।
'আমি জানি না। ভাবী মারা যাওয়ার পর ওনাদের সাথে আর কোনো সম্পর্ক নেই আমাদের। ভাবীর আব্বা যোগাযোগ রাখতে চাইলেও ভাবীর ভাই সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে চলে যায়। তার ধারণা, ভাবীর মৃত্যুর জন্য আমরা দায়ী।' বিমর্ষ কন্ঠে জবাব দেয় রাফসান।
আরিশা আকষ্মিক বোবা বনে যায়। শূন্য দৃষ্টিতে ছাদের কালো ঝুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাফসান বহুবার ডেকেও সাড়া পেলো না আরিশার। রাফসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
'আরিশা, মুখ গোমড়া করে থাকিস না। বড়ভাই জানলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। ও আরিশা! সোনা মেয়ে আমার! একটু হাস। মুখ গোমড়া করে থাকিস না। আরিশা!'
আরিশার চোখ বেয়ে নোনাজলের ধারা নামে। ও শান্তভঙ্গিতে চোখ মুছে রান্নাঘরে যায়। রাতের খাবার তৈরী করতে হবে।
.
ডিনারের জন্য ডাইনিংয়ে এসে নির্ভীক হোসাইনুল আলমকে দেখতে পেলো না। বাকিরা খেতে বসেছে ঠিকই কিন্তু সবার মুখ গোমড়া। নির্ভীক দ্বিধান্বিত কন্ঠে জানতে চাইলো,
'কিছু হয়েছে? এনিথিং রং?'
'বাবার সাথে এত বাজে ব্যবহার করা তোমার উচিত হয়নি নির্ভীক!' গম্ভীর মুখে বলেন মিসেস শায়লা।
'বাবা খেতে আসেনি? ওয়েট আমি ডেকে নিয়ে আসছি।' বলে নির্ভীক হোসাইনুল আলমের রুমে গেলো।
হোসাইনুল আলম আধশোয়া হয়ে বসে আছেন। নির্ভীক গিয়ে ওনার পাশে বসে মৃদুস্বরে ডাকে,
'ড্যাড!'
হোসাইনুল আলম চোখ খুলে তাকান। নির্ভীকের দিকে একঝলক তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন।
নির্ভীক শান্তস্বরে বলে,
'তোমাকে অনেক রেসপেক্ট করি ড্যাড। তুমি কষ্ট পাবে বলে কখনো তোমার মুখের উপর কথা বলিনি। আজও বলতাম না, যদি না তুমি ক্যামেরাটা ছিনিয়ে নিতে। ওটা আমার ড্রিম ড্যাড, আমার সবকিছু।'
'তোমার কথা বলা শেষ হলে আসতে পারো।' আবার চোখ বুজে ফেলেন হোসাইনুল আলম।
'ডিনার করবে না?'
'না, তোমাকে যেতে বললাম তো।'
'তুমি ডিনারে যাওনি বলে কেউ খাচ্ছে না। সবাই তোমার অপেক্ষায় বসে আছে।'
হোসাইনুল আলম আকস্মিক রেগে গেলেন। বললেন,
'ওহ এটাই তাহলে কারণ। সবাইকে খাওয়ানোর জন্য তুমি আমাকে ডাকতে এসেছো। নিজের ইচ্ছেয় আসোনি৷ আমি কিনা এতক্ষণ কতকিছু ভাবছিলাম।'
'বাবা, অন্যদেরকে খাওয়ানোর জন্য তোমাকে ডাকতে আসিনি। তুমি খেতে যাওনি বলে ডাকতে এসেছি। এনিওয়ে, তোমার ইচ্ছে না হলে যেতে হবে না। আমিও খাবো না, বাকীরাও খাবে বলে মনে হয় না। তোমার একজনের জন্য পুরো বাড়ির সবাই উপোস থাক। এতে কোনো সমস্যা নেই। শুধু তোমার জেদ বজায় থাকলেই হলো।' বলে নির্ভীক উঠে চলে গেলো।
ডাইনিংয়ে গিয়ে বললো,
'বাবা না আসলে তো তোমরা কেউ খাবে না। তাহলে খাবারগুলো টেবিলে রাখার কি প্রয়োজন আছে? নিয়ে যাও সব।'
নির্ভীক নিজেই টেবিল থেকে রান্নাাঘরে নিতে থাকে খাবারগুলো। কেউ ওকে কিছুই বলে না। যে যার মতো উঠে চলে যায়। নির্ভীক দাঁড়িয়ে সবার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। ও কি অনেক বেশি ভুল করে ফেলেছে? যার জন্য সবাই ওর ওপর রেগে গেলো? একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের রুমে চলে যায় নির্ভীক।
.
রাতে খেতে বসার পর আরিশার থমথমে চেহারা দেখে থমকে যান আশফাক আহমেদ। বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। তিনি কটমট করে রাফসানের দিকে তাকান। রাফসান প্লেটে ভাত নাড়াচাড়া করছে। কারো দিকে তাকাচ্ছে না। আশফাক আহমেদ কোমল গলায় আরিশাকে ডাকেন।
'আরিশা, খাচ্ছিস না যে?'
আরিশা মুচকি হেসে বলে,
'এই তো খাচ্ছি।'
আরিশার হাসি দেখে আশফাক আহমেদ বড়সড় একটা ধাক্কা খান। আরিশার চোখেমুখে বিষন্নতার ছাপ। চোখে পানি টলমল করছে। চোখের পানি লুকোতে আরিশা দ্রুত রান্নাঘরে চলে গেলো।
আরিশা যেতেই আশফাক আহমেদ রাফসানের উদ্দেশ্যে কড়া গলায় বললেন,
'তুই আবার ওকে ওর মায়ের কথা বলেছিস?'
রাফসান মাথা নিচু করে রাখে। আশফাক আহমেদ হুংকার ছাড়েন,
'কেন বলেছিস? কতবার বলেছি, ওকে এসব কথা বলবি না। তাও তুই বললি?'
'হঠাৎ মনে পড়ে গেলো। ভাবীও নতুন বিয়ে করে আসার পর ভাত রাঁধতে ভুলে যেত। তাই...'
'তাই বলে ওকে বলতে হবে সেসব? জানিস না ওর কষ্ট হয়?' আরমান বলে।
'ও-ই তো শুনতে চাইলো।' কাঁচুমাচু করে জবাব দেয় রাফসান।
'শুনতে চাইলেই বলতে হবে?' আশফাক আহমেদ বলেন।
'ও যা চায় তাই করতে মন চায় আমার। তাই না বলে থাকতে পারিনি।' সোজাসাপটা জবাব রাফসানের।
আশফাক আহমেদ আর কথা না বাড়িয়ে চলে যান। আরমান টেবিল থেকে খাবার-দাবারগুলো রান্নাঘরে নিয়ে যায়।
.
নির্ভীক রুমে এসে শুয়ে পড়ে। শুয়ে শুয়ে নিউজফিড স্ক্রল করতে থাকে। হঠাৎ কি মনে করে ফেসবুকে "আরিশা" লিখে সার্চ দেয়। গাদা গাদা আইডি চলে আসে। প্রিন্সেস আরিশা, অ্যান্জেল আরিশা, বাটারফ্লাই আরিশাসহ আর অনেকগুলো আইডি। নির্ভীকের মুড অফ হয়ে যায়। ও ফেসবুক থেকে বেরিয়ে মোবাইল রেখে দেয়। সিলিংয়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে আরিশার কথা ভাবে আনমনে। অংক মেলানোর চেষ্টা করে ও।
আরিশার তো ফোন নেই বললো, ওর ফেসবুক আইডি কোথা থেকে আসবে? তাছাড়া জঙ্গলে তো নেটওয়ার্কই নেই। তাহলে কি আরিশার সাথে যোগাযোগ করা কোনোভাবেই সম্ভব না? কিন্তু নির্ভীকের মন যে আরিশাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে।
নির্ভীক ড্রেসিং টেবিল থেকে ক্যামেরা নিয়ে, ক্যামেরায় চোখ রাখে। একটার পর একটা ছবি দেখে যায়। অনেকক্ষণ দেখার পর সাদা বাড়িটা দেখতে পায় ও। এরপরই আরিশার ছবিটা চোখের সামনে আসে। কাঁধে বানর নিয়ে অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটা। একবার চোখে পড়লে চোখ ধাঁধিয়ে যায় এমন সুন্দর।
নির্ভীক ক্যামেরা থেকে ছবিগুলো ল্যাপটপে ট্রান্সফার করে। ক্যামেরা পাশে রেখে পেটের ওপর ল্যাপটপটা নিয়ে শুয়ে পড়ে ও। জুম করে খতিয়ে খতিয়ে দেখে আরিশাকে। কিছুক্ষণ চুল দেখে তো কিছুক্ষণ পা। আবার কিছুক্ষণ চোখজোড়া দেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। পিসির স্ক্রিনে আরিশার চোখে চোখ রাখতেই নির্ভীক কেমন দিশেহারা হয়ে পড়ে। অস্থির হয়ে ওঠে ও। অবাধ্য মন বারবার চায় আরিশাকে সামনে থেকে দেখতে। নির্ভীক তৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্ত নেয় ও আবার আরিশার কাছে যাবে। তার আগে আরেকটা কাজ বাকি। নির্ভীক তাড়াহুড়ো করে আরিশার ছবিটা নিয়ে বসে যায় এডিট করবে বলে। যদিও আরিশার ছবিটা তেমন এডিট করার প্রয়োজন পড়লো না। ও তো এমনিতেই অপূর্ব সুন্দরী।
ছবি এডিট করতে করতে নির্ভীকের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফোটে। তখনো নির্ভীক জানে না ও আরিশার জীবনে কি ভয়াবহ বিপদ টেনে আনছে।
[ নেক্সট নেক্সট বলে না চিল্লালেও চলবে। অর্ধেক গল্প দিয়ে থেমে যাবো না। নেক্সট এমনিতেই দিবো। পারলে গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। ]
#Be__Continued ✌
আগের পর্বের লিংক...
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/850408479097983/

গল্পঃ সম্পর্ক, বিয়ে; অতঃপর... (৩য় ও শেষ পর্ব)
#গল্পঃ সম্পর্ক, বিয়ে; অতঃপর... (৩য় ও শেষ পর্ব)
ঐটা কিসের কাগজ পড়ে আছে?
দেখি দাও তো।
চিঠি! ফারহানার লেখা চিঠি।
কবে লিখেছে? কি লেখা আছে পড়তো।
দাঁড়াও এটা শুধু আমার জন্য লিখা। মনে হচ্ছে যাওয়ার আগে লিখে গেছে। মা আমি রুমে যাচ্ছি।
রায়হান রুমে গিয়ে চিঠিটা পড়ার ঘন্টা দুয়েক পর।
আরিয়ান, আরিশা চলো আমরা বাহিরে বেড়াতে যাব।
ওয়াও কি মজা! কি মজা! আমরা বেড়াতে যাব।
মা তুমি যাবে আমাদের সাথে?
না তোরাই যা, আমার পায়ে ব্যাথা।
তাহলে চলো তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।
না আজকে তোরা ঘুরতে যেতে চাচ্ছিস সেটাই কর। বাচ্চা দুটোরও ভালো লাগবে।
তাহলে কাল তোমাকে নিয়ে যাব।
ঠিক আছে।
আব্বু আমরা কোথায় যাব?
আমরা আগে হাতিরঝিলে ঘুরবো তারপর রেস্টুরেন্টে খেতে যাবো।
তারপর?
তারপর কী করবো সেটা তো এখন বলা যাবেনা!
বলো না আব্বু, বলো না। দাদু আব্বুকে বলতে বলো না।
না বলব না।
বলো না আব্বু।
তোদের এমন হাসিখুশি দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল। অনেকদিন পর আবার তোদের সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
মা এখন থেকে আমরা সবসময় হাসি আনন্দে থাকবো।
তাই যেনো হয়।
মা আমরা বের হলাম।
সাবধানে যাস বাবা। কি হলো হঠাৎ করে ছেলেটার মনে?
আব্বু আমি খেতে পারছি না।
দাও আমি তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছি।
আরিশা তুমি কি খাবে মামনি?
চিপস খাবো।
না মামনি এখানে তো চিপস নেই। আসো আমার কোলে আমি তোমাকে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছি।
আমি স্যুপ খাবো না। আমি চিপস খাবো, আমি চিপস খাবো।
না মামনি এমন করে না। আচ্ছা আমরা এখান থেকে বের হয়ে তোমাকে এত্তো এত্তো চিপস কিনে দিবো।
আব্বু আমাকেও আইসক্রিম কিনে দিতে হবে কিন্তু।
ঠিক আছে বাবা তোমাকেও কিনে দিবো। এবার তাড়াতাড়ি খাও তো।
বলতো এবার আমরা কোথায় যাবো?
জানি না।
এবার আমরা তোমার নানুদের বাসায় বেড়াতে যাবো।
কি মজা! কি মজা! আব্বু কত ভালো। আব্বু আমি আম্মুর সাথে কথা বলবো ভিডিও কল দাও।
বাবা তোমার নানুর বাসায় গিয়ে তারপর দিবো, ঠিক আছে?
আচ্ছা।
ওয়েইটার আমাকে এই খাবারগুলো পার্সেল করে দিন তো।
ঠিক আছে স্যার।
আরে বাবা রায়হান তুমি! সাথে আমার নানু ভাইরাও আছে দেখছি।
জ্বী মা ভালো আছেন?
হ্যা বাবা, আমরা ভালো আছি। তোমরা সবাই ভালো আছো?
মা এগুলো নিন।
এগুলো কি?
আপনার আর বাবার জন্য কিছু খাবার নিয়ে এলাম।
এসব আবার আনতে গেলে কেন?
মা আজকে রাতে আমরা আপনাদের বাসায় থাকবো।
আমাদের বাসায়!
কোনো আপত্তি নেই তো মা?
কি বলছো বাবা? আপত্তি থাকবে কেন? এটা তো তোমার বাসাও । যখন ইচ্ছা আসবে, যখন ইচ্ছা থাকবে, যখন ইচ্ছা যাবে।
মা বাবাকে ডাক দিন ফারহানাকে ভিডিও কল দিবো।
ঠিক আছে বাবা আমি এখনি ডাকছি।
এ কই গেলে? জামাই বাবা আসছে, এদিকে আসো না।
আরে জামাই বাবা দেখছি। কেমন আছো?
ভালো বাবা, আপনি ভালো আছেন?
এই বয়সে আর ভালো থাকা! দেখো না কোমড়ের ব্যাথার জন্য সেজদা দিতে পারি না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হয়।
মায়েরও পা ব্যাথা কাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। আপনিও চলুন না আমাদের সাথে।
আমি যাবো?
হ্যা।
কি গো তুমি কি বলো?
এখানে আবার আমার বলার কি আছে? জামাই যখন বলছে তুমি যাও না। ভালোই তো হবে, তুমি না যাওয়ার জন্য মানুষ পাচ্ছিলে না।
ঠিক আছে বাবা।
বাবা আরিয়ান, নাও তোমার মায়ের সাথে কথা বলো।
আম্মু...
আব্বু তুমি কেমন আছো?
আমি ভালো আছি। আম্মু তুমি কোথায়?
আমি বাবা অনেক দূরে!
আমিও যাবো তোমার কাছে।
এখানে বাবা আমি একা তুমি ঐখানেই থাকো, ঐখানে কত মানুষ।
তুমি কবে আসবে?
খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো বাবা।
আমার তোমার জন্য খুব খারাপ লাগে।
আমারো খুব খারাপ লাগে তোমাদের জন্য।
আমি একা হাত দিয়ে খেতে পারি না।
বাবা তুমি তো বড় হয়ে গেছ, তোমাকে একা নিজ হাতে খাওয়া শিখতে হবে। তোমাকে যে আরিশাকে দেখে রাখতে হবে। তুমি তো ছেলে মানুষ তোমার তো অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আচ্ছা আম্মু আমি সব করব। নাও আরিশার সাথে কথা বলো।
আ.. আম্মু... তুমি কোথায়? আমি তোমার কাছে যাবো। আমি তোমার সাথে ঘুমাবো।
এইতো মা আমি। আমি বাসায় ফিরে তোমাকে বুকে নিয়ে ঘুমাবো। এখন কয়েকটা দিন তোমার দাদুর সাথে ঘুমাও।
মা ফারহানা কেমন আছিস?
ভালো আছি মা।
তুমি বুঝি রায়হানদের বাসায় গিয়েছ?
না রে মা। রায়হান বাবাজি ওদের নিয়ে আমাদের বাসায় এসেছে। আজকে আমাদের বাসায় থাকবে।
ওহ্ তাই বুঝি।
হ্যা তুই কথা বল না রায়হানের সাথে।
না মা আমি ফারহানার সাথে কথা বলবো না। আপনারা কথা বলুন আমি একটু ছাদে যাচ্ছি।
রায়হান তোর সাথে কথা বলতে চাচ্ছে না।
ঠিক আছে মা, আমিও ওর সাথে কথা বলবো না। রাখছি মা আমার ক্লাশ আছে।
আমি কলটা কেটে দিলাম। রায়হান হঠাৎ করে সবাইকে নিয়ে আমাদের বাসায়! তাহলে কি রায়হান চিঠিটা পড়েছে? আর এইজন্য পরিবর্তন। তারমানে রায়হান ওর ভুল বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তাহলে আমার সাথে কথা বলল না কেন?
অভিমান নাকি ইগো? ঠিক আছে যতদিন ও নিজ থেকে কথা বলতে চাইবে না আমিও ততদিন কথা বলব না।
অনেকদিন পর।
মায়ের সাথে আমার প্রতিদিনই কথা হয়। আজকেও কথা হলো। রায়হান নাকি এখন চেম্বারে কম সময় দেয়। আগে তিনটা হাসপাতালে ডিউটি করতো এখন একটা ছেড়ে দিয়েছে। আরেকটায় অন কলে যায়। বিকেলবেলা চেম্বার করে না। বিকেলটা আরিয়ান আর আরিশাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বের হয়। আরিয়ানের জন্য একটা টিচার রেখে দিয়েছে, নিজেও আরিয়ানের পড়াশোনার প্রতি নজর রাখছে। আরিয়ান ও আরিশা আমাদের এবং রায়হানদের বাসায় দুই জায়গাতেই থাকে। আর রাত বারোটার আগেই চেম্বার বন্ধ করে বাসায় চলে আসে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক রোগী দেখে। আরিয়ান ও আরিশা যেই বাসায় থাকুক না কেন রায়হান সেখানেই রাতে ফিরে ওদের বুকে নিয়ে ঘুমায়। কখনো কখনো সময় পেলে নিজ হাতে খাইয়ে দেয়। আমার মা বাবার দিকেও খোঁজ খবর রাখে। বাবাকে নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায়। বাবার কোমর ব্যাথা এখন নেই বললেই চলে। বাবা এখন নামাজে সিজদা দিতে পারে। নামাজ পড়ে দুহাত তুলে আমাদের জন্য বাবা দোয়া করেন। শশুর-শাশুড়ি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। বাড়ির লোকজনের আমার উপর আর কোনো রাগ নেই। রায়হান ওদের নাকি সবকিছু বুঝিয়ে বলেছে। সবার সাথে আমার নিয়মিত ভিডিও কলে কথা হয়। তবে রায়হান আমার সাথে কথা বলে না। আমি খুব ভালোভাবে পড়াশোনা করতে লাগলাম। রায়হান তার সবগুলো দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে। সবদিকে তার সমান নজর থাকে। সবাইকে ভালো রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। রায়হানের এমন পরিবর্তনে সবাই অবাক। আমি অনেক খুশি ওর পরিবর্তনে। সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলে যাচ্ছে। আমাদের জীবনে আর কোনো সমস্যাই নেই। আমিও পড়াশোনা ছাড়া অন্য কোনো কিছু নিয়ে ভাবি না।
তিন বছর পর।
আমার MD কোর্স সম্পন্ন হলো। আমি অনেক ভালো রেজাল্ট করলাম। আমেরিকায় অনেক হসপিটাল থেকে আমাকে অফার করা হলো। কিন্তু আমি আমেরিকায় থাকতে রাজি হলাম না। আমি আমার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আমার নিজ দেশের মানুষের সেবা করবো। তাছাড়া আমি ওদের ছেড়ে আর একমুহুর্ত আমেরিকায় থাকতে চাইনা।
আজকে আমার ফ্লাইট। বাসায় কল দিয়ে বলেছি আমি বাংলাদেশে ফিরছি। মা বলল শরীরটা ভালো না। আর রায়হান তো তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আমার সাথে একবার কথা বলেনি। ও এত পাষাণ কিভাবে হয়ে গেল ভাবতেও আমার অবাক লাগছে। এয়ারপোর্টে হয়তোবা আমার জন্য কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে না।
নির্দিষ্ট সময়ে বাংলাদেশের মাটিতে প্লেন ল্যান্ড করল। আমার মনটা কেমন শীতল হয়ে উঠলো যেন মায়ের বুকে জড়িয়ে আছি। এ এক অন্যরকম অনুভুতি আমি বলে বুঝাতে পারব না। আমি প্লেন থেকে নেমে সবকিছু সম্পন্ন করে এয়ারপোর্টের বাইরে বেরিয়ে আসলাম। আমার দু'চোখ আপন মানুষদের খুঁজে ফিরছে। কিন্তু কাউকেই খুঁজে পাচ্ছি না। এক বুক কষ্ট নিয়ে আমি লাগেজ নিয়ে বের হচ্ছি।
হঠাৎ আরিয়ান আর আরিশা আম্মু বলে চিৎকার করে উঠল। আমি লাগেজ ফেলে দিয়ে ছুটে গিয়ে ওদের জড়িয়ে ধরে সমানে চুমু খাচ্ছি। আমার চোখ জুড়ে অশ্রুর বন্যা। তাকিয়ে দেখি সবাই এসেছে আমাকে রিসিভ করতে। রায়হানের হাতে ফুলের তোড়া। আমার পাগুলো যেন অসার হয়ে গেছে। আমি এগুতে পারছি না। রায়হান নিজেই আমার দিকে এগিয়ে এলো আমার সামনে এসে দাড়ালো। দুজন দুজনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। অনেক কথা জমে আছে। রায়হানও কিছু বলছে না। পুরুষ মানুষ শব্দ করে কাঁদতে পারেনা। রায়হানের চোখে অশ্রু টলমল করছে। রায়হান আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি হাওমাও করে কেঁদে ফেলি। আমি গত তিন বছর একদিনও কাঁদিনি। আজকে আমার তিন বছরের জমানো চোখের পানি সব যেনো বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমি কিছুতেই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছি না। মনে মনে খুব সংকল্প করেছিলাম রায়হানের সামনে অনেক শক্ত আচরণ করব।
কিন্তু পারছি না।
তুমি কাঁদো ফারহানা। চোখের নোনা জলে তোমার সকল কষ্ট ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাক।
তুমি অনেক নিষ্ঠুর, অনেক পাষাণ! তুমি এই তিন বছর আমার সাথে কেন কথা বলনি, আমাকে শাস্তি দেয়ার জন্য?
না আমি নিজেকে শাস্তি দেয়ার জন্য তোমার সাথে এতদিন কথা বলি নি। তুমি স্ত্রী হয়ে আমার ক্যারিয়ার গুছানোর জন্য সর্বোচ্চ স্যাক্রিফাইস করেছ। আর আমি স্বামী হয়ে তোমার স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাই আমি নিজেকে শাস্তি দিয়েছি।
তোমার কথা মনে করে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু কথা বলিনি।আমি যে তোমার কাছে অপরাধী। কিন্তু এতদিন ধরে আমি তোমার জন্য আমার সকল ভালোবাসা হৃদয়ে জমিয়ে রেখেছি।
আমি তোমাকে আর কখনো কোনো কষ্ট পেতে দিবো না। তোমার চোখে আর এক ফোঁটা অশ্রুর কারন হব না।
তুমি আমার চিঠি পেয়েছিলে?
হ্যাঁ আমি তোমার চিঠি পেয়েছিলাম। তুমি আমাকে কথাগুলো সামনাসামনি আরো আগে কেন বললে না?
আমি সামনাসামনি বললে তুমি কথাগুলো কিছুতেই শুনতে চাইতে না।
খুব অভিমান হয়েছিল আমার উপর তাই না? চিঠিটা পড়ে খুব অভিমান হয়েছিল?
হ্যাঁ হবেই তো। আমি নাহয় ভুলে গিয়েছিলাম, ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিলাম তোমার প্রতি, সন্তানের প্রতি, মা বাবার প্রতি দায়িত্বের কথা কিন্তু তুমি তো আমার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে বুঝিয়ে দিতে পারতে।
আমারও তোমার প্রতি ক্ষোভ, অভিমান হয়েছিল এইজন্য যে, কেন তুমি আমাকে বুঝতে পারো না।
আমি আর কোনোদিন আমার উপর তোমাকে অভিযোগ আনতে দিবো না। আমি একজন আদর্শ স্বামী হয়ে উঠব। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।
তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ, অণুযোগ নেই। আমি শুধু চেয়েছি একজন স্বামী হিসেবে তুমি আমাকে বুঝতে পারো। আমাকে আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য সাপোর্ট করো। সব সময় আমার পাশে ছায়া হয়ে থাকো।
আজ থেকে আমি সবসময় তোমার ছায়া সঙ্গী হিসেবে থাকবো। আমরা দুজন মিলে সবকিছু ম্যানেজ করে চলব।
তোমার মতো স্বামী পেয়ে আজকে আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে করছি।
তুমি একজন আদর্শ স্ত্রী বাংলার ঘরে ঘরে যেন তোমার মতো স্ত্রী থাকে।
আর তুমি একজন আদর্শ স্বামী তোমার মত স্বামী যেন প্রতিটা মেয়ের ভাগ্যে জুটে। তুমি একজন দায়িত্ববান ও আদর্শ পুরুষ হয়ে দেখিয়ে দিয়েছ পুরুষ মানুষ সব সময় নিষ্ঠুর, পাষাণ হয় না।
এই তোদের মান অভিমানের পালা শেষ হলো? আর কতক্ষণ চলবে এভাবে, আমরা কি দাঁড়িয়েই থাকব নাকি এখানে?
চলো রায়হান, সবাই কি ভাবছে।
মা-বাবা আপনারা সবাই বাসায় চলে যান।
আমরা সবাই বাসায় চলে যাব মানে কি?
আমরা এখন বাসায় যাব না।
বাসায় যাব না মানে, আমরা কোথায় যাব তাহলে?
আমরা এখন রেডিও স্টুডিওতে যাব।
রেডিও স্টুডিওতে! কিন্তু কেন?
আমি চাই আমাদের জীবনের গল্পটা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ শুনুক।
রায়হান, আমি চাইনা আমাদের পার্সোনাল বিষয়গুলো মানুষ জানুক।
দেখো ফারহানা, আমাদের কথাগুলো যখন মানুষ জানতে পারবে তখন তারা তাদের ভুলগুলো বুঝতে পারবে, নিজেদের সংশোধন করতে পারবে।
কিন্তু এতে তোমাকে হয়তো মানুষ খারাপ ভাববে।
সে ভাবলে ভাবুক আমাদের কথা জানার মাধ্যমে মানুষ যদি তাদের ভুলটা বুঝতে পারে তাতেই আমি খুশি।
আমি চাই তোমার চিঠিটা তুমি নিজেই পড়ে শোনাও।
আমি পড়ব?
হ্যা, তাহলে মানুষ বুঝতে পারবে একজন নারীর কষ্টটুকু কি পরিমাণ। তার লুকিয়ে থাকা আর্তনাদ জানতে পারবে। আর পুরুষ মানুষ বুঝতে পারবে নিজের অজান্তে সে কিভাবে একজন স্ত্রীর স্বপ্ন ভেঙ্গে দেয়। কিভাবে একজন নারীর নিজস্ব সত্তাকে বিলীন করে দেয়। আর তোমার বিজয়ের গল্প শুনে নারীরা নিজেদের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্ব ফিরে পেতে লড়াইয়ের জন্য অণুপ্রাণিত হবে। একটা সংসার, একটা পরিবার তখনই সুন্দর হয়ে উঠে যখন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠে।
তুমি কত সুন্দর করে কথাগুলো বলছ রায়হান। তুমি সত্যিই অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছ। মনে হচ্ছে আজকে আমার জীবন পূর্ণতা পেল।
আর তুমি ছাড়া আমি তো অপূর্ণ, তুমি যে আমার অর্ধাঙ্গী। আচ্ছা এবার তাড়াতাড়ি চলো শো শুরু হতে আর মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট বাকি।
চলো তাহলে যাওয়া যাক।
আমি রায়হানের কাঁদে মাথা রেখে গাড়িতে বসেছি। আমি কখনো রায়হানকে বলবো না যে ওকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য অ্যাডভোকেট আজমিরি সুলতানার কাছে গিয়েছিলাম। আজমিরি সুলতানা আমার বড় বোন হিসেবেই থেকে যাবেন। আমি যদি রাগের মাথায় এই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতাম তাহলে আজকে আমার জীবনে এই সুখের দিন আসতো না। আমাদের সকলের উচিত যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য্য ধারণ করা এবং রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা। পরিস্থিতি যতোই খারাপ হোক একটু ধৈর্য ধরে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। ভুলত্রুটিগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে হবে। যদি সমস্যার সমাধান হয়ে যায় তাহলে তো ভালোই নাহলে পড়ে না হয় ডিভোর্সের মতো সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। একটা সম্পর্ক গড়ে তোলা অনেক কঠিন আর ভেঙে ফেলা অনেক সহজ কিন্তু একবার ভেঙে গেলে সেই সম্পর্ক আবার নতুন করে গড়ে তোলা অসম্ভব। আর এই ভাঙ্গা গড়ার মাঝে নিষ্পেষিত হয় ছোট অবুঝ বাচ্চারা।
আমি আমার আরিয়ান ও আরিশাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম।
গাড়ি চলছে রেডিও স্টেশনের দিকে।
সমাপ্ত।।
#একান্ত_কথাঃ গল্পটির সাথে থাকার জন্য সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। গল্পের চিঠিটা আর পড়ে শোনান হলো না এইজন্য দয়া করে কেউ রাগ করবেন না। তবে চিঠিটায় কি লেখা থাকতে পারে তা আপনারা রায়হানের শেষ কথাগুলো পড়লে একটা ধারণা পেয়ে যাবেন। গল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করার অনুরোধ করছি।
(ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)
লেখক: সাইফুল ইসলাম
https://m.facebook.com/groups/526513374820830?view=permalink&id=851982468940584

রৌদ্রছায়া
৪.
বৃষ্টি থেমে গেছে।বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।ঝিঁঝিঁ পোকার ক্রমাগত ডাক শোনা যাচ্ছে।আকাশে মেঘ কেটে গিয়ে , সেখানে এখন কোটি তারার মেলা বসেছে।সাফওয়ান সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ।জানালা দিয়ে হিম শীতল বাতাস আসছে।পুরো ঘর জুড়েই কেমন যেন থমথমে ভাব।
সে ধীরে ধীরে জানালা থেকে চোখ সরিয়ে তার বা-পায়ের দিকে তাকালো।পায়ে সেই অসহনীয় যন্ত্রণাটা এখন আর নেই। তবে নাড়াচাড়া করলেই একটা তীক্ষ্ণ ব্যাথা টের পাওয়া যাচ্ছে।
সায়মা যদিও যাওয়ার আগে বলেছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আবার আসবে তবে সে আর আসে নি।আজ রাতে বোধহয় আর আসবেও না।
বাইরে খুব শোরগোল শোনা যাচ্ছে।পরশু রাফসানের বিয়ে, তার দুদিন পর বৌভাত।বৌভাতের আয়োজন চলছে।এখনই সবার ব্যাস্ততা শুরু হয়ে গেছে।বাইরের হৈচৈ সে সবেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে ।
বিকেলের পর থেকে বাড়িতে একের পর এক লোক আসছে।প্রথমে এলো ডেকোরেটর,বাড়ির আলোকসজ্জার জন্য। তারপর এলো একে একে ভ্যান ভর্তি বাজার।এবং সবশেষে দুটো গরু আর চারটে খাসি বাড়ির সামনে বাগানের একপাশে বাঁধা হল।সেখানে বাতি দেয়া হয়েছে। ছোট ছেলেমেয়েরা সেই আলোর বৃত্তের কাছাকাছি উৎসুক হয়ে ঘোরাফেরা করছে।
সাফওয়ান বিছানা থেকে নামলো। ডান পায়ে ভর ধীরে ধীরে হাটার চেষ্টা করলো। হেটে সে দরজা পর্যন্ত এগুলোও। কিন্তু দরজার কাছে এসেই সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো। কিছু একটা ভেবে খোরাতে খোরাতেই দরজা খুলে বেরিয়ে অস্থির হয়ে আশেপাশে তাকাতে লাগলো। নাহ! এখানে তো কেউ নেই। তবে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে যে সেই সন্ধ্যায় পাওয়া ফুলের সুবাসটা এখনই সে পেল?
সাফওয়ান দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। পায়ের সেই তীক্ষ্ণ ব্যাথা টা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না।
সে বুঝতে পারলো না কেন এই সামান্য কারণে সে এভাবে ছুটে এল।আশেপাশে অনেক গাছপালা আছে। তারমধ্যে কোন একটা ফুল গাছ থেকেই হয়তো সুবাসটা আসছে।এতে এতো ভাবাভাবির কি আছে!
রুবিনা ডাইনিং এ বসে গভীর মনযোগে তার হাতে থাকা ছোট নোটবুক টির দিকে তাকিয়ে আছেন। সেখানে চকলেট কেক তৈরির রেসিপি খুব সুন্দর করে বর্ণনা করা আছে। তবে রুবিনা ঠিক বুঝতে পারছেন না। কোন উপকরণ টা আগে দিতে হবে আর কোনটা পরে কিছুতেই তিনি মেলাতে পারছেন না।ফলাফল ভ্রু জোড়া কুচঁকে মুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে তিনি বসে আছেন।
পেছন থেকে কেউ একজন নরম স্বরে তাকে সালাম জানালো।রুবিনার ভ্রু জোড়া আরো কুচঁকে গেল, প্রবল বিরক্তি নিয়ে তিনি পেছন ফিরে তাকালেন।দরজায় মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। ছিপছিপে গড়নের শ্যাম বর্ণের মেয়ে।মেয়েটার পুরো মুখ জুড়ে নিরিহ একটা ভাব কিন্তু চোখ জোড়া ভীষণ ধারালো।সে পূর্ণ দৃষ্টিতে রুবিনার দিকে তাকিয়ে আছে।
রুবিনা সালামের জবাব দিলেন। তারপর কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ফের নোটবুকের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবতে চেষ্টা করলেন।
কাল রাতে ঘুমোনোর আগে তিনি একবার সাফওয়ানের ঘরে গিয়েছিলেন। এত শত ব্যাস্ততার মাঝে ঠিক মতো ছেলেটার খেয়াল রাখা হচ্ছে না।মায়ের আদরের ছেলে কিনা! সব খাবার আবার সে খেতে পারে না। তার জন্য বাড়িতে সবসময় হালকা তেলমশলা দিয়ে আলাদা খাবার রান্না করা হয়।এবাড়িতে আসার পর সেই রান্নার দায়িত্ব টা রুবিনাই নিয়েছিলেন। তবে ব্যাস্ততার জন্য এই দুদিন তিনি রাধতে পারেন নি।রেধেছে মঞ্জুরী।সে খাবার নাকি সাফওয়ান মুখেই তুলতে পারেনি। মুখে দেওয়া মাত্রই ঝালে বেচারার অবস্থা কাহিল।মুখ লাল হয়ে, চেচিঁয়ে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে ফেলেছে।বেচারা নিশ্চয়ই বাড়ি ফিরে মাকে এসব জানাবে। রুবিনার ইজ্জত আর এবাড়ির আথিতেয়তার যে সুনাম এবার ধুলোয় লুটোপুটি খাবে।
তাই অপমানের হাত থেকে বাঁচতে গল্পের ছলে নানার কথার ফাঁকে, কাল রাতে সাফওয়ানের কাছে ফন্দি করে তিনি জেনে নিয়েছেন সে কি কি খেতে ভালোবাসে।রাতে বসে সেসবের একটা লিস্টও তৈরি করেছেন।
সকালে হতেই ঘোষণা দিয়েছেন আজ বাড়িতে সাফওয়ানের সব প্রিয় খাবার রান্না হবে এবং রাধবেন তিনি একা!
সেজন্যই এই সাতসকালে চকলেট কেকের রেসিপি নিয়ে বসা।সাফওয়ান নাকি চকলেট কেক খেতে ভীষণ ভালোবাসে।
প্রথমে রুবিনা ভেবেছিলেন কেক বানানো কাগজের ফুল বানানোর মতই সহজ। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে গোরাতেই গন্ডগোল। কিভাবে কি শুরু করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না।
আবার কারো সাহায্যও চাওয়া যাচ্ছে না। কারণ প্রথমেই তিনি সবাই কে জানিয়ে দিয়েছেন আজ তিনি একা হাতে সবকিছু করবেন।
এখন দেখা যাচ্ছে মহা মুশকিল। রুবিনা চোখ বুজলেন। এই ঘোর বিপদের সময় রেগে অস্থির না হয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে। এই মেয়েটাকে কোনভাবে কাজে লাগলো যায় কিনা তাই দেখতে হবে।
রুবিনা খানিক পর পেছন ফিরে তাকালেন।মেয়েটা এখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।তিনি ইশারায় তাকে ডেকে পাশে বসতে বললেন।মেয়েটি দ্বিরুক্তি করল না নিশব্দে পাশে এসে বসল। রুবিনা নিজের মনের সাথে মত কষাকষি করছেন।মনকে জিজ্ঞেস করলেন ,'একে দিয়ে কাজটা করানো কি ভালো হবে?
মন বলল,'অবশ্যই ভালো হবে। এ হল আমাদের কেয়ার টেকার রহমানের মেয়ে।বাড়ির চাকর শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। কাজ করাতে অসুবিধা কোথায়? '
রুবিনা মনে মনে মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন,'তাও ঠিক। কথা অতি সত্য। কাজের মেয়ে কাজ করবে সেখানে আবার ভালো মন্দ কি?'
রুবিনা পানসে মুখে বললেন, 'সরোজু, তুমি কেক বানাতে জানো তো?'
সরোজু চোখমুখ উজ্জ্বল করে মাথা নাড়লো, 'জ্বি চাচি।'
-'ওহ, জানো তাহলে। আচ্ছা শোন,আমি এখন কেক বানাচ্ছি।তুমি আমাকে হাতে-হাতে সবকিছু এগিয়ে দিয়ে একটু সাহায্য করোতো।'
সরোজু মৃদু কণ্ঠে বলল,'জ্বি চাচি।'
রুবিনা বিরক্ত হয়ে বললেন,'উফফ কথায় কথায় এমন জ্বি চাচি,জ্বি চাচি করবে না তো। কানে অসহ্য ঠেকছে। '
কেক বানানোর প্রক্রিয়া চলছে।রুবিনাকে খুবই উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। তিনি ব্যাটারে পানি ঢালছেন তো ঢালছেনই।সরোজু এতক্ষণ আড়চোখে ব্যাপারটা দেখছিল।এবার আর চুপ থাকতে না পেরে বলল,'চাচি,পানি দিলে ব্যাটার পাতলা হয়ে যাবে। তখন কেক........'
রুবিনা কঠিন চোখে তাকালেন। বললেন, 'এই মেয়ে, কেক কিভাবে বানাতে হয় সেটা আমি তোমার কাছ থেকে শিখব?
তুমি কি ভেবেছ তুমি একাই সব জানো?
আমি কিছু জানি না? তুমি আসলে ছাই জানো।কেকের 'কে' টাও তুমি জানো না। হুহ্। '
সরোজু মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে রইলো । মনে মনে বলল,'কেক বানান 'কে' দিয়ে নয় চাচি।কেক বানান 'সি' দিয়ে।'সি' 'এ' 'কে' 'ই' কেক।বুঝেছেন? '
সরোজু ঈষৎ হেসে ফেললো।
ব্যাটারে পানি মেশাতে মেশাতে রুবিনা সরোজুর দিকে তাকালেন।তাকিয়ে বললেন।,'এই, এই মেয়ে তুমি হাসছ কেন?'
মূহুর্তেই সরোজুর মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেল।
-'এই মেয়ে, তুমি আমার সাথে ফাতড়ামি কর।হু? আমার সাথে ফাতড়ামি?
এখান থেকে যাও এক্ষুণি।এক্ষুনি যাও।'
সরোজু মাথা নিচু করে বেরিয়ে যেতে নিলেই রুবিনা ফের বললেন,'এই মেয়ে কোথায় যাচ্ছো? যেতে বলেছি বলেই কি সাথে সাথে চলে যেতে হবে ?
আগে কেকটা ঠিক কর তারপর যেখানে খুশি যাও।'
সরোজু ফিরে এল।সবকিছু আবার ঠিকঠাক করে কেক ওভেনে দিল।
রুবিনা সেদিকে তাকিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলেন।রাগটা একেবারে মাথায় চড়ে গিয়েছে।
সরোজু চৌধুরী বাড়ির সদরদরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে অপেক্ষা করছে তার বাবা আবদুর রহমানের জন্য। মেয়ের হাতে বাড়ির চাবি দিয়ে তিনি গিয়ে গাড়িতে উঠবেন।তবেই গাড়ি ছাড়বে।কিন্তু তিনি এখনো আসছেন না।
সরোজু চঞ্চল দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে আছে।তার মাথায় কালোরঙা বড় একটা ওড়না জোড়ানো। ওড়নার রঙ আর তার গায়ের রঙের মাঝে তফাৎ টা খুব বেশি নয়।আবার খুব কমও নয়।মনে হচ্ছে তার গায়ের রঙটা আরেকটু ফর্সা হলে কিংবা আরেকটু কালো হলে তাকে আর মানাতো না বরং খুবই বাজে দেখাতো। এই গৌরবর্ণটাই যেন তার সাথে একেবারে মানানসই।
ওড়নার ফাঁক দিয়ে লালচে বর্ণের কিছু চুল বেরিয়ে তার ঘামার্থ মুখে লেগে আছে।নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম । সে শঙ্কিত হয়ে বাবার আসার অপেক্ষা করছে।এই ক্লান্ত দুপুরে, শঙ্কা ভরা প্রতীক্ষায় রত মেয়েটাকে যে কি ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে মেয়েটি যদি একবার জানতে পারত!এতো ভালো লাগার কারণ হল'মেয়েরা তাদের অর্ধচেতন রূপেই বেশি সুন্দর, কারণ সে সৌন্দর্য তাদের অজানা থাকে।কোনোরকম অহং সেখানে মিশতে পারে না, তাই সেই সৌন্দর্য হয় পুরোপুরি বিশুদ্ধ। '
সরোজু কপালে দুশ্চিন্তার ভাজ নিয়ে এদিকওদিক চাইতে লাগলো।মধ্যদুপুর তো হয়ে এল বলে। এরা বিয়ে বাড়ি যাবে কখন?
-'আম্মাজান।' মুখে সরল হাসি ফুটিয়ে ধীর পায়ে আবদুর রহমান মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
বাবার এই নির্মল হাসিকে সরোজু কখনোই উপেক্ষা করতে পারে না। আজও পারল না। সে বাবার দিকে একপলক তাকালো।কি নিরীহ আর শান্ত একটা মুখ।এই মুখ দেখলে বাবাকে সরোজুর খুব অসহায় মনে হয়। তখন ইচ্ছে হয় বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে পাশে বসে থাকতে।আর বলতে,'বাবা,তুমি একদম ভেবো না। আমি তো আছি।আমি তোমার সব কষ্ট দূর করে দেব।তোমার জীবনের সব দুঃখগুলো ইরেজার দিয়ে মুছে খুব সুন্দর স্বপ্নের মতো দিন নিয়ে আসব।তোমার অত ভাবনা কিসের ? আমি আছি না!'
চলবে...........।
অদ্রিজা আহসান
আগের পর্বের লিংক:
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/850255292446635/?app=fbl

রম্যগল্প
#রম্য
#রম্যগল্প
শেষমেশ বউয়ের যন্ত্রণায় তিনতলা থেকে লাফ দিলাম।এ জীবন আর রাখব না।পাশের বাসার ভাবীর একটু সুনাম করাই আমার জীবনের কাল হয়ে দাড়িয়েছে।দুপুরে যখন শুটকি দিয়ে ভাত মাখছিলাম ঠিক তখনই হুড়মুড় করে ঘরে বিরিয়ানির ঘ্রাণ ঢুকে পড়ল।বিরিয়ানির গ্রাণে পাগল হয়ে ভুলে বলে ফেললাম,
"আহা!কি ঘ্রাণ!ভাবীর রান্না অসাধারণ।"
শুধু এটুকু বলতে দেড়ি হয়েছে কিন্তু আমার বউয়ের তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতে দেড়ি হয়নি।
" আমার রান্না ভালো হয় না?
- হয় তো!
-তাহলে তুমি আমার রান্নার তারিফ কোনদিন তো করলে না।আর শুধু ঘ্রাণেই বলে দিলে ভাবীর রান্না অসাধারণ।আমি আজ থেকে রাধব না।তুমি ভাবীর বাসায় গিয়ে খেয়ে আসো।
এই বলে সামনে থেকে খাবার কেড়ে নিলো।সাথে ঘর থেকেও বের করে দিয়েছে।সারারাত ক্ষিধেয় পেট চো চো করেছে।শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম বউকে উচিত শিক্ষা দিব।সাতপাঁচ না ভেবে দিলাম ছাদ থেকে লাফ।লাফ দেবার পরেই মনে হল ভুল করে ফেলেছি।বউকে উচিত শিক্ষা দিতে গিয়ে নিজেকেই শিক্ষা দিয়ে ফেলেছি।এখন নিচে পড়ার পর ব্যাথাটা আমিই পাব।বউয়ের উপর রাগ করে বাপের দেয়া জীবনটা হারালাম।নাহ!এ জীবন রেখে আসলেই লাভ নেই।আল্লাহর নাম নিতে নিতে ধপাস করে মাটিতে পড়লাম।ধূপ করে আওয়াজ হলো।হাত,পা কোমর সব ভেংগে আলুর বোস্তার মত গড়াগড়ি করতে লাগলাম।লোকজন আমায় হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিলো।
হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে শুয়ে নিজেকে বেশ ফুরফুরে লাগছে।কোথাও ব্যাথা হচ্ছে না।এত অল্পসময়ে হাড় জোড়া লেগে গিয়েছে ভেবে পুলকিত বোধ করলাম।শরীরটাকে আচমকা ধাক্কা দিয়ে তুলতে চেষ্টা করলাম।তখনি হুড়মুড় করে মেঝেতে পড়ে গেলাম।নিজের উপর নিজের বেশ রাগ লাগল। উঠে দাড়িয়ে নিজের পাছায় কিক করলাম।তখনই মনে হলো আহা!ভুল করে ফেলেছি।অতি উত্তেজনায় বডি থেকে বেড়িয়ে গেছি।সাথে সাথে ভিতরে ঢুকতে চেষ্টা করলাম।পারলাম না।তখন বাপ্পারাজের মত আবারও বলতে ইচ্ছে হল "এ জীবন রেখে কি লাভ?"
শব্দ শুনে নার্স আর ডাক্তারদের হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।আমি অনেকক্ষণ ধরে নার্সের বুকের উপর লেখা নাম পড়লাম।নামটা পড়ে বেশ শান্তি পেলাম।
বারান্দায় হাটছি।কেউ আমায় দেখতে পাচ্ছে না।ইচ্ছে করে একটি মেয়ের সাথে ধাক্কা খেলাম।মেয়েটি চিৎকার দিয়ে দৌড় দিল।হাহা।দেখে আমি মজা পেলাম।এক বুইড়াকে ল্যাং মেরে ফেলে দিলাম।বুইড়া নার্সদের নামের দিকে তাকিয়ে লুচ্চা হাসি দিচ্ছিল।হাটতে হাটতে বারান্দার শেষপ্রান্তে চলে এলাম।নিচে তাকিয়ে দেখলাম মাটি দেখা যাচ্ছে।মাটি দেখে আবার লাফ দিতে ইচ্ছে হলো।হাসপাতালের বিল্ডিং থেকে আবার লাফ দিলাম।মাটিতে পড়ে দেখলাম আমি ঠিকই আছি তবে যেই কুত্তাটার উপর ল্যান্ড করলাম তার পা ভেংগে গেল।কুত্তাটা আমার দিকে তাকিয়ে কুত্তার মত চিল্লাতে লাগল।আমি তাকে ফ্রি কিক দিয়ে ড্রেনে ফেলে দিলাম।বেচে থাকতে অনেক জ্বালিয়েছো এখন লাত্থি খাও।
হাটতে হাটতে আবিষ্কার করলাম আমি আমার বাসার কাছাকাছি চলে এসেছি।ভাবলাম বাসায় গিয়ে বউয়ের সাথে একটু মজা করা যাক এমন ভয় দেখাব।হাগু মুতু করতে ভুলে যাবা চান্দু।
সিড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে নিচের ফ্লাটের সুন্দরী মেয়েটার রুমে উকি দিলাম।মরে গিয়ে একদিকে ভালোই হয়েছে।কারো বাসায় হুটহাট ঢুকে পড়া যায়।মিনা নামের মেয়েটা বিছানায় চ্যাগায়া শুয়ে আছে।কানে হেডফোন গুজে বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছে।আর অনবরত পা এপাশ ওপাশ করছে।যে হারে পা নাড়াচ্ছে তাতে যেকোন দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।আমি সেখানে বেশিক্ষণ থাকব না ভাবলাম।তখনি তাদের মাঝে কিছু কথোপকথন শুনলাম।তার বয়ফ্রেন্ড দুষ্ট প্রকৃতির।মেয়েটার কাছে নগ্নচিত্র চাচ্ছে।মেয়েটিও দুষ্টু প্রকৃতির।সে এদিক ওদিক তাকিয়ে বিভিন্ন অঙ্গভংগী করে নগ্ন চিত্র তুলতে উদ্যত হলো।এসব দেখে আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল।রাগে মোবাইল ভেংগে ফেললাম।মেয়েটা ঘটনার আকস্মিকতায় বলদ হয়ে গেল।আমি তার বলদমার্কা মুখে থাপ্পড় মারলাম।থাপ্পড়ের চোটে মেয়েটার মুখ বাকা হয়ে গেল।আমি এত জোড়ে মারতে চাইনি,লেগে গেছে।তবুও আমার রাগ কমল না।তাকে আর একটা চটকানা মারব কিনা ভাবতে লাগলাম।এর মাঝেই মেয়েটি পালিয়ে গেল।আর আন্টির পিছনে লুকিয়ে রইল।আন্টির কাছে যেতে ভয় পাচ্ছি।যদি মারে!তাই নিচে দাড়োয়ান কুদ্দুসকে মেরে এলাম।শ্লায় লুঙ্গির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে যন্ত্রপাতি হাতাচ্ছিল।লাত্থি খাইয়া লুংগি রাইখা পলাইছে।হারামজাদা!ফেরত এলে এবার তোমার বিচিতে মারব।
.......
© Parves Mossarrov
#রম্য_গল্প_সমগ্র
একটি অপ্রত্যাশিত মধ্যরাত, অতঃপর...
#ছোটগল্প
একটি অপ্রত্যাশিত মধ্যরাত, অতঃপর...
নুসরাত জাহান লিজা
আচমকা বাস থেমে যাওয়ায় সামনের দিকে হেলে পড়তেই হালকা তন্দ্রা ভাবটা কেটে গেল মিলির। ব্যাগ হাতড়ে মুঠোফোন বের করে দেখল চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল ওর, জানালার পাশে বসা লোকটির অবশ্য কোন হেলদোল দেখল না ও। একবার আশেপাশে তাকিয়ে আবারও গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল লোকটা। কিছুক্ষণ পরে বাসের কন্ডাক্টর ক্যাটক্যাটে গলায় জানাল, বাস আপাতত আর যাবে না, কী একটা সমস্যার কথাও বলল, ঠিকমতো খেয়াল করতে পারেনি মিলি!তখন অস্বস্তি বেড়ে কয়েকগুণ সাথে আশঙ্কা! বাসের লাইট জ্বালিয়ে দিতেই হাতের ঘড়িতে দেখল রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। এই সময় ওর বাড়িতে পৌঁছে নিজের বিছানায় ঘুমোবার কথা, আর এখন কিনা মাঝ রাস্তায় এক অনিশ্চিত যাত্রী!
এসেছিল চাকরির ভাইভা দিতে, এসব দৌড়াদৌড়ি ও একাই করে, বাবাকে এসবে টানাটানি করা ওর পছন্দ নয়। আর তাছাড়াও বিকেল পাঁচটার বাসটা দশটা সাড়ে দশটার মধ্যেই পৌঁছে যায়, বাসস্ট্যান্ডে বাবা এসে দাঁড়িয়ে থাকেন ওকে নিতে। দিব্যি চলে যায় এই করেই, প্রায় এক দু'সপ্তাহ পরপরই কোনো না কোনো পরীক্ষার ডেইট পরছে, শুধু শুধু বাবাকে এর মধ্যে টেনে আনার কোন মানে হয় না। প্রথমবার শুধু বাবার সাথে এসেছিল, খুব একটা সমস্যা হয় না বলেই একা একাই চলাফেরা করে ও।
যখন জানানো হলো বাস আর এগুবে না, তখন মিলির মাথায় শুধু আকাশ না, পুরো সৌরজগত ভেঙে পড়েছে যেন! একে তো প্রায় মধ্যরাত, তার উপর একেবারেই একা ও, অস্বস্তি সরে গিয়ে ভয় জায়গা করে নিল দ্রুতই। পাশের লোকটার খুব একটা হেলদোল দেখা গেল না তবুও, নির্বিকার মুখে হাত পা নাড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল, হাই তুলল বার দুয়েক। এরপর আশেপাশে তাকিয়ে রাস্তার দু'পাশের গাছের সাড়ি আর সরিষা ক্ষেত দেখল যেন আলো আঁধারিতে।
এরপর আচমকা মিলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কী করবেন এখন, বাসেই অপেক্ষা করবেন নাকি নেমে অন্য কোনো বন্দোবস্ত করার চেষ্টা করবেন?"
সহসা কোনো উত্তর দিতে পারল না মিলি, নিজের উপরে প্রচন্ড রাগ হলো। কেন যে আরেকটু দ্রুত আসতে পারল না বাসস্ট্যান্ডে! ইন্টারভিউ শেষ করে বিশাল জ্যাম পেরিয়ে যখন বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছল, জানতে পারল মিনিট কয়েক হলো ওর কাঙ্ক্ষিত বাসটা ছেড়ে গেছে। পরের একটা লোকাল বাস আছে, যেটা সাতটায় ছাড়বে। ঢাকায় ওর তেমন কোনো কাছের আত্মীয় পরিজন নেই। অগত্যা ওই লোকাল বাসকেই ভরসা করতে হলো। কিন্তু সাতটা বললেই কী আর সাতটায় ছাড়ে? লোক ঠাসাঠাসি করে বাস ভর্তি করিয়ে ছাড়তে ছাড়তে সেই আটটার পরে। এরপর তো ঢিমেতালে চলা আর কিছুক্ষণ পরপর সেই বাসে গাদাগাদি করে আরও লোক ভর্তি করা। এসব বাসকে কেন মুড়ির টিন বলা হয় সেটা হাড়েহাড়ে টের পেল মিলি। আর এখন তো অর্ধেক রাস্তা আসতেই এই মুড়ির টিনের দম শেষ! কী করবে কিছুই মাথায় আসছে না।
পাশের লোক আবারও জিজ্ঞেস করতেই সম্বিতে ফিরল ও,
"আসলে বুঝতে পারছি না কী করব! আমি তো এখানকার কিছু চিনি না।"
"আরেকটু সামনে গেলেই একটা বাজার আছে, খুব একটা দূরে না, হাঁটা পথ। ওখানে গেলে হয়তো কোনো একটা ব্যবস্থা হবে।"
দ্বিধা কাটিয়ে মিলি বলল, "আপনি কোথায় যাবেন? "
"দেখি, আমার এক বন্ধুর বাড়ি আছে বাজারের কিছু পরেই। কোনোকিছুর ব্যবস্থা না হলে ওইখানেই হয়তো যাব!"
আশেপাশে তাকিয়ে দেখল সবাই প্রায় নেমে যাচ্ছে। জনা কয়েক যারা বাসে থাকছে এদের চেহারা দেখে বাসে বসে থাকার ভরসা পেল না। কেন যে সেলফ ডিফেন্স শেখেনি! তাহলে কারও উপর ভরসা করতে হতো না।
"যাবেন নাকি বলুন, আর নয়তো জায়গা দিন, আমি নেমে যাই।" তাড়া লাগায় লোকটা।
"আচ্ছা চলুন তবে, বাজারের দিকে যাই।" কিছুক্ষণ ভেবে নেমে যাওয়াই মনস্থির করল। লোকটার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হবে হয়তো, ভালো ফ্যামিলির ভদ্রগোছের ছেলে বলেই মনে হলো। এসব ভেবেই উঠে দাঁড়াল মিলি।
এছাড়া আর কিছু মাথায় আসছে না ওর, এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে এরকম সংকটে কখনো পড়েনি। অচেনা, অপরিচিত এক লোকের সাথে নেমে এলেও ভরসা করতে পারছে না এতটুকু। কী এক ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভেতরটা কাঁপছে দুরুদুরু! ভয়, শঙ্কা সর্বোপরি প্রবল অনিশ্চয়তা নিয়ে পিছু নিল অচেনা আগন্তুকের!
আকাশে মস্ত এক চাঁদ, সেখান থেকে উছলে পড়ছে আলোকের ঝর্ণাধারা! ওরাও সেই আলোতে ভিজে একাকার!
"আপনার কাছে মোবাইল আছে?"
পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করে বাড়িয়ে দিল মিলির দিকে। মিলি সেটা হাতে নিয়ে দেখল বন্ধ হয়ে আছে।
"আপনার ফোনটা তো বন্ধ!"
"হ্যাঁ, চার্জ শেষ হয়ে গেছে।" আবারও নির্বিকার মুখে উত্তর দিল লোকটা।
কিন্তু এবার মিলির মেজাজ খারাপ হয়ে গেল,
"চার্জ নেই যখন তখন ফোনটা আমাকে দিলেন কেন? আপনার ফোনের চেহারা দেখে আমি কী করব?"
"আরে, আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? আপনি ফোন চেয়েছেন আমি দিয়েছি, চার্জ নেই সেটা তো আর আমার দোষ নয়, নাকি?"
এরকম উত্তরে নিজের মেজাজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে প্রচণ্ড রকম বেগ পেতে হলো মিলিকে। দাঁতে দাঁত চেপে দৃষ্টিতে কাঠিন্য এনে একবার লোকটির দিকে তাকিয়ে ফোনটা ফেরত দিল।
বাড়িতে সবাই নিশ্চয়ই ভীষণ চিন্তায় আছে, বাবা হয়তো বসে আছে বাসস্ট্যান্ডেই! ফোনটা থাকলে তাও বাসায় জানাতে পারত। এই যে অদ্ভুত সুন্দর চাঁদের আলো, তাও ওর কাছে কেমন যেন পানসে লাগছে! ক্ষুধার্ত ব্যক্তির কাছে পূর্নিমার চাঁদ যেমন ঝলসানো রুটির মতো, সেরকমই এই পৃথিবী ভাসানো জোছনাকেই ওর একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী মনে হচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে পাশাপাশি চলা লোকটাকে ঠিক কতটা বিশ্বাস করা যায়? খচখচে একটা অনুভূতি থেকেই যায় মনে!
হাঁটাপথ বললেও অনেকটা হাঁটার পরেও যখন বাজারের দেখা পাওয়া গেল না, বুকের ধুকপুকানি ক্রমশ বাড়তে থাকল। তারমধ্যে তাড়াহুড়োয় দুপুরে ঠিকমতো খেতেই পারেনি ভাইভার টেনশনে, এখন ক্ষুধা জেঁকে বসেছে একেবারে। আর বাস ধরার তাড়া থাকায় কোনো খাবারও নিতে পারেনি। আর কতদূর যেতে হবে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে কী করবে না ভাবতে ভাবতেই অদূরেই বাজারের আভাস পেল।
বাজারেও একেবারে নিথর নীরবতা, একটা দোকানে শুধু টিমটিমে আলো জ্বলছে, অনেকটা টঙ দোকানের মতোই। দোকানের লোকটা ভেতর থেকেই দোকান বন্ধ করে দিচ্ছিল, হয়তো ঘুমাবার বন্দোবস্ত করছে। দ্রুত পা চালিয়ে লোকটাকে নিরস্ত করতে পারল। ঘড়িতে একটা ছুঁই ছুঁই, দুজনে বসে চা আর টোস্ট নিল। এছাড়া এই দোকানে আর কিছু খাবার উপযুক্ত মনে হলো না। পেটকে কিছুটা শান্ত করতে চা-টোস্টই বেছে নেয়। এরকম পাড়াগাঁয়ে মধ্যরাতেও যে দোকান খোলা ছিল এই পরম ভাগ্য।
আবারও পা বাড়ায় অনিশ্চিত গন্তব্যে! আশ্চর্য, এখনো কেউ কারোর নামই জানে না। মিলিই প্রথম জিজ্ঞেস করল,
"আপনার নামটা?"
"শফিক। আমি মাত্রই আপনার নামটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম।" গলায় উচ্ছ্বাস, যেন এই কাকতাল খুব মজার কিছু! এখানে এত মজার কী ছিল মিলির ঠিক বোধগম্য হলো না। নির্বিকার গলায় বলল,
"আমি মিলি।"
"একা একা রাতের বাসে যাচ্ছিলেন কেন?"
"ইন্টারভিউ ছিল।" সংক্ষিপ্ত উত্তর ওর। কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছে না।
"আমার জয়েনিং দুদিন পরে, আপনাদের এলাকায়। অবশ্য এর আগেও সেখানে গিয়েছি কয়েকবার। সেও অনেক আগে।" শফিক বলে উঠে।
"হুম" দুঃশ্চিন্তা নামছেই না মাথা থেকে।
"আপনি মনে হয় আমাকে এখনো ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি। কী আর করা।"
সহসা থেমে গিয়ে কিছুটা অভিমানী সুরেই বলল শফিক।
মিলি কিছুটা যেন থমকাল এরকম কথায়! এই প্রথমবার খুব ভালো করে তাকাল শফিকের দিকে, পূর্ণ দৃষ্টিতে। সরল একটা অভিব্যক্তি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না, নাকি চোখ এড়িয়ে গেল এই অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ আলো আঁধারিতে? সহসা মনে হলো বিশ্বাস করাই যায় লোকটাকে!
দু'একটা গাড়ি পাওয়া গেলেও কেউই এত রাতে দূরে কোথাও যেতে সম্মত হলো না। অগত্যা শফিকের সাথে ওর বন্ধুর বাড়ি যেতে রাজি হলো নিতান্ত অপারগ হয়ে।
"স্যরি, আমার জন্য আপনি ঝামেলায় পড়ে গেলেন!" গলায় কিছুটা অপরাধবোধ।
"স্যরি কেন বলছেন? রাত বিরেতে একটা মেয়েকে একা ফেলে চলে যাব, এটা হয় নাকি?"
কৃতজ্ঞচিত্তে মাথা নাড়ে মিলি। যে ছেলের এতটা দ্বায়িত্ব বোধ তাকে আর অবিশ্বাস করে কী করে! কিন্তু মিলি তখনও জানে না যে, কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের সারাজীবনেও চেনা যায় না, সেখানে কয়েক মুহূর্তের পরিচয়ে কাউকে বিশ্বাস করা শুধু বোকামিই নয়, মূর্খতা। কারণ এই সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিতে অনেকেই ওঁত পেতে বসে থাকে, বিশ্বস্ততার টোপ ফেলে। সরল বিশ্বাসে পিছু নিল শফিকের, এতক্ষণ যেই সতর্কতা ছিল তাও ঢিলে হয়ে গেল। এরকম সুযোগের অপেক্ষায়ই হয়তো ছিল প্রতিপক্ষ! সরল বিশ্বাসের মাশুল দিতে হলো সব হারিয়ে, নিজের জীবনটা খুইয়ে।
মিলির বাড়ি থেকে অনেক খোঁজখবর নিয়েও যখন কিছু জানতে পারল না, তখনই দুদিনের মাথায় নদীতে এক মেয়ের লাশ ভেসে উঠে। মিলির পরিবারও সেই খবর পেয়ে ছুটে যায়, আর লাশটাকে মিলি বলে শনাক্ত করতে পারে। মিলির বাবার করা মামলায় কোনো অগ্রগতি হয় না, সময়ের সাথে সাথে ধামাচাপা পড়ে যায় সবটা। আসল অপরাধী থেকে যায় আড়ালেই, প্রমাণের অভাবে, নাকি ক্ষমতার প্রভাবে জানা নেই!
মাঝে পেরিয়ে গেছে অনেকবছর, এক বারো বছরের কিশোরী মেয়ের লাশ সামনে নিয়ে গগনবিদারী আর্তচিৎকারে ফেটে পড়ছে শফিক। সেই মেয়েটির বাবা সে। এত ছোট নিষ্পাপ ফুটফুটে মেয়েটার সাথে কে এমন করল, এতটা নিষ্ঠুর কেউ কীভাবে হতে পারে? এসব আহাজারি ঝরছিল গলায়, সহসাই বিস্মৃতির অতল থেকে নিজের বিশ্বাসঘাতকতার কথা ভেসে উঠল চোখের সামনে। সেই জোৎস্নালোকিত মধ্যরাতে একজনের বিশ্বাসকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিল। সে রাতে ও শুধু একটা মেয়ের সম্ভ্রম আর জীবনটাই নেয়নি, গলা টিপে মেরেছে বিশ্বাস নামক বস্তুটাকে। প্রথমে নির্ভরতা অর্জন করে, বিশ্বাসের গলায় কাঁচি চালিয়েছিল। সেসময় গাঁ ঢাকা দিয়ে পার পেয়েও গিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির বিচার বড্ড কঠিন, বড্ড নির্মম! জাগতিক বিচারব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারলেও প্রকৃতি কখনোই ভুলে যায় না, কখনোই ছাড় দেয় না। মানুষের প্রতিটি কৃতকর্মের ফল ফিরিয়ে দেয় কয়েকগুণ করে। উপরে আল্লাহ আছেন, তাঁর বিচার কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। আল্লাহ সকলকেই উত্তম প্রতিদান দেন।
"ভুলটা তো আমি করেছিলাম, আমার অপরাধের শাস্তি আমার মেয়েটা কেন পেল, আল্লাহ.."
শফিকের এমন আহাজারিতে প্রায় পুরো হাসপাতাল কেঁপে কেঁপে উঠছিল। শফিক আর ওর মেয়ের জন্য এতক্ষণ সবার প্রগাঢ় সহানুভূতি কাজ করছিল, কিন্তু যখনই নিজের পাপের ফিরিস্তি দিতে শুরু করল, তখনই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। যেটুকু সহানুভূতির প্রগাঢ়তা সবটাই শুধু ভিক্টিম মেয়েটার জন্যই থাকল, আর শফিকের জন্য শুধুই প্রগাঢ় ঘৃণা।
শফিক হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সব বলে ফেলল। পাশে বসা মেয়ের শোকে মূর্ছা যাওয়া অজ্ঞান স্ত্রী জ্ঞান ফিরে সবটা শুনে পাথরপ্রায়। এরকম এক মুখোশধারী ঘৃণ্য মানুষের সাথেই সে সংসার করেছে এতগুলো বছর! ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি কিছুই, এতটা কাছাকাছি থেকেও!
শফিকের কৃতকর্মের বলি ওর নিষ্পাপ মেয়েকে হতে হয়েছে, একজন বাবার জন্য এর থেকে ভয়ংকর শাস্তি আর কী হতে পারে! মেয়েটার তো কোনো দোষ ছিল না! নিষ্পাপ মেয়ের এমন পরিনতি কেউই চায় না, কারোই কাম্য নয়, কেউ সমর্থনও করে না। কিন্তু উপরওয়ালা হয়তো অন্যকিছু ভেবে রাখেন। এমন কঠিন শাস্তি দিয়ে হয়তো আরও অনেক শফিককে সতর্ক করে দেন। যেন এমন ঘৃণ্যতম কাজ করতে গেলে ওদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে তীব্র ভয়ে, নিজের প্রিয়জনের কথা যেন চোখে ভেসে উঠে।
সবার ঘরেই মা আছে, বোন আছে, একসময় সংসার পাতবে প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে, মেয়ের বাবাও হবে। তবুও কেন এই অধঃপতন, অবনমন চারিত্রিক, মানসিক, নৈতিক? বাইরের যে মেয়ের সাথে নিজের বিকৃত মস্তিষ্কের প্রকাশ ঘটায় সেও অন্য কারো মেয়ে, বোন, মা, স্ত্রী।
সবাই যদি অন্যের মা, বোনের দিকে বাজে দৃষ্টিতে তাকানোর আগে চিন্তা করত নিজের মা, বোনের দিকে কেউ একই দৃষ্টিতে তাকালে কেমন লাগবে, একই আচরণ করলে কেমন লাগবে? তবে কেউ এভাবে তাকানোর সাহস করত না। মিলির মতো কিংবা এই মেয়ের মতো হাজারো মেয়েরা বেঁচে যেত শফিকের মতো ঘৃণ্য পশুদের লালসা থেকে! এরা যখন নিজের ভুলটা বুঝতে পারে তখন আর কিছুই করার থাকে না, পাপের মাশুল দিতে হয় নিঃস্ব হয়ে, সবটা হারিয়ে। তাই সময় থাকতে এরকম হাজারও শফিকের বোধশক্তি জাগ্রত হওয়া অতি জরুরি।
............

ভেজা চিরকুট -- ৬২তম পর্ব
ভেজা চিরকুট -- ৬২তম পর্ব
রিফাত হোসেন।
১১৫.
মুক্তমঞ্চে বসে ক্লাসের এসাইনমেন্টগুলো করছে ইতু। বাড়িতে এগুলো করার সময় হয় না। পরিবারের অতগুলো মানুষ; একতলা বাড়ি, ড্রয়িংরুমে সবাই একসাথে বসলে দারুণ একটা আসর উপস্থিত হয়। ওইসময় সবাইকে সঙ্গ না দিয়ে থাকতে পারে না ইতু। দিনেও সময় হয় না। বড়-জা এর বাচ্চাগুলোর সাথেই সময় কেটে যায়। তাই এই ক্যাম্পাসে এসে কাজগুলো করছিল। বন্ধুরা কেউ আশেপাশে নেই। সে একা, নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। কাজটা এগোচ্ছিল ঠিকমতই, কিন্তু আচমকাই পাশে এসে একজন বসল। গুরুত্বহীন ভাবে আড়চোখে পাশে তাকালো ইতু। শুভ্রকে দেখেই চমকে উঠল; যেন শুভ্র কোনো মানুষ না, একজন ভূত, যাকে দেখতে চমকাতে হয়! এক হাত বুকের উপর রেখে চমকিত স্বরে ইতু বলল, "তুমি!"
শুভ্র প্রাণবন্ত ভাবে বলল, "হ্যাঁ, আমি।"
"আমি সেতু না, ইতু।" আগেই সতর্ক করল ইতু। আগের কোনোকিছুই সে ভোলেনি। এইসব ভাবলে এখনো সচকিত হয় সে।
ইতুর কথা শুনে হাস্যরত গলায় শুভ্র বলল, "আমি জানি তুমি সেতু না, ইতু। সেতু তো ক্লাস করছে। আমি দেরি করে গেলাম বলে ঢুকতেই দিলো না স্যার।"
ইতু আড়ষ্টভাবে জবাব দিলো, "ওহ্!" শব্দটা বলেই শুভ্রকে এড়ানোর জন্য আবার এসাইনমেন্টের মনোযোগ দিলো ইতু। কিন্তু পারল না। চোখ জোড়া যেন বাঁকা হয়ে বারবার শুভ্র'র দিকে চলে যাচ্ছে। ভীষণ অস্থিরতা অনুভব করছে ইতু।
শুভ্র পা দু'টো সামনে ছড়িয়ে দিয়ে স্বাভাবিক গলায় আবার বলল, "তাছাড়া একই ভুল দু'বার করব না আমি। বিয়ের পর তোমার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এগুলো আমি লক্ষ্য করতে পারছি। সেতু কিন্তু আগের মতো আছে। তাই তোমাদের চেনা এখন খুব একটা কঠিন ব্যাপার নয়।"
ভিতরে ভিতরে শিউরে উঠতে লাগল ইতু। শুভ্র তাকে এত তীক্ষ্ণ ভাবে লক্ষ করছে, অথচ সে জানতোই না। তাঁর অগোচরে শুভ্র পার্থক্য খুঁজে বের করেছে। এই পার্থক্য নিশ্চয়ই শারীরিক দিক থেকে। এগুলো ভাবতেই ইতুর সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
ইতুর কোনো জবাব না পেয়ে শুভ্র ওর মুখের দিকে তাকালো। সামান্য ঝুঁকে দেখল, চোখ দু'টো পিটপিট করে আছে ইতু। কাচুমাচু হয়ে বসে আছে এক জায়গায়। হাতের কলমটা শক্ত করে ধরেছে। আগ্রহী চোখে তাকিয়ে থেকে শুভ্র জানতে চাইল, "তোমার কি হয়েছে বলো তো? আগে তো আশেপাশে এলেই বকাবকি করতে, ধমকাতে। এখন এত চুপচাপ। রাগ জমাচ্ছ নাকি? একসাথে ছুড়ে মারবে সব।"
ঈষৎ শক্ত গলায় ইতু বলল, "তুমি যাও তো। দেখছ না আমি কাজ করছি। পরের ক্লাসে এটা জমা দিতে হবে।"
শুভ্র রসিক গলায় বলল, "মনে হয় তোমার তিন-চারটে বাচ্চাকাচ্চা আছে; তাই বাড়িতে পড়াশোনার সময় পাও না।"
"তুমি চুপ করবে?" চোখ কটমট করে শুভ্র'র দিকে তাকালো ইতু।
শুভ্র সচকিত হয়ে বলল, "ওরে বাবা, আমি তো জ্বলেপুড়ে ছাঁই হয়ে গেলাম। এভাবে কেউ তাকায়?"
"প্লিজ, যাও এখন।" হাল ছেড়ে দিলো ইতু। তাঁর সত্যিই এখন শুভ্র'র সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। শুভ্র'র কাছাকাছি থাকলেই তাঁর অস্বস্তি হয়, বুকের ভিতর দ্রিমদ্রিম করে।
ইতুকে হঠাৎ নিভে যেতে দেখে শুভ্র'র মুখটা গম্ভীর হলো। তবে চলে গেল না। পা দু'টো গুটিয়ে নিয়ে ইতুর মুখোমুখি বসে ভাবান্তর স্বরে বলল, "জানো, একটা ব্যাপার অনেকদিন ধরে আমার মাথায় খচখচ করছে। ব্যাপারটা কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছি না।"
"কোন ব্যাপার?" ইতুও এবার ভুরু কোঁচকালো। আগ্রহী ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।
শুভ্র এক মুহূর্ত নীরব থেকে ক্ষীণ গলায় বলল, "তোমার মনে আছে, সেদিন তুমি হঠাৎ করে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে। তোমার বিয়ের দিন। বিদায় নেওয়ার সময় সিড়িতে আমাকে জড়িয়ে ধরলে হঠাৎ। এরপর হঠাৎই চলে গেলে।"
শুভ্র'র কথাগুলো শুনে ইতুর হৃদপিণ্ডে কম্পন শুরু হলো। নিঃশ্বাস যেন কেউ আটকে দিলো সহসা। চোখ ফিরিয়ে নিলো অন্যদিকে।
শুভ্র ভুরু জোড়া এবার উপরে তুলে চিন্তামগ্ন হয়ে বলল, "সেদিন রাতে অনু আপু একবার বলেছিল, 'মূল্যবান কিছু হারালে, শুভ্র।' কথাটার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারিনি আমি। বুঝার কথাও না। আমি আবার কী হারালাম? তবে পরপর এই দু'টো ব্যাপার আমাকে খুব ভাবিয়েছে। তোমাকে বলব বলব করেও বলতে পারছিলাম না কিছুতেই। সুযোগই পাচ্ছিলাম না। আজ স্যারের জন্যই সুযোগটা পেলাম।"
ইতুর কপালে সামান্য ঘাম জমেছে ইতোমধ্যেই। শুভ্র'র কোনো প্রশ্নের জবাবই সে দিতে পারবে না। সেদিন ধরিয়ে ধরার আগে এতকিছু ভাবেনি সে। সম্মুখে এসে গিয়েছিল শুভ্র, চোখের পানিটুকু লুকানোর জন্যই আচমকা জড়িয়ে ধরেছিল। তৎক্ষনাৎ বুঝতে পেরে নিজেই কেঁপে উঠেছিল।
জবাবা না পেয়ে বেশ অবাকই হলো শুভ্র। ইতুর মতো স্পষ্টভাষী মেয়ে সে দু'টো দেখেনি৷ সেই ইতুই সামান্য প্রশ্নের জবাব দিতে পারছে না এই মুহূর্তে। ইতু যেন কাঁপছে কিছুটা। অস্বাভাবিক আচরণ করছে। ঘনঘন চোখের পলক ফেলছে। বিস্মিত হয়ে শুভ্র আবার বলল, "তোমার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে?"
বড় করে শ্বাস নিলো ইতু, আবার শ্বাস ছেড়ে বলল, "তুমি এখন নিজের চিন্তা না করে আমাকে নিয়ে পড়ে আছ।"
"কেন, আমার কী হইছে?" শুভ্র আরও অবাক!
ইতু বলল, "সেতুর জন্য যে পাত্র দেখা হচ্ছে, সেটা কি জানো না তুমি? বাবা তো কালকেও ফোন করে এই বিষয়ে আলোচনা করছিল।"
শুভ্র ক্রুদ্ধ হলো। মুখ শক্ত করে বলল, "তোমার বাবা অসহ্যকর একটা মানুষ। সাধারণ জ্ঞান নেই। আরে ভাই, কী দরকার এত তাড়াতাড়ি মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার? একজনের দিয়েছ ঠিক আছে, তাই বলে দ্বিতীয়টাকেও দিতে হবে?"
ইতু মিটমিট করে হেসে বলল, "এই কথাগুলো আমার বাবাকে গিয়ে বলো।"
শুভ্র সংকোচিত হয়ে বলল, "কী বলব?"
ইতু বলল, "গিয়ে বলো, কী দরকার এত তাড়াতাড়ি মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার? অন্তত অনার্স পর্যন্ত মেয়েকে পড়তে দেওয়া উচিত। বিয়ের পর যে ও পড়াশোনার সুযোগ পাবে, তাঁর গ্যারান্টি কি?"
শুভ্র অনিহার স্বরে বলল, "ধুর! তোমার বাবাকে এগুলো কীভাবে বলব আমি?"
"পারবে না?" ইতু ভুরু নাচালো। আবার বলল, "খুব সহজ কাজ। গিয়ে বলবা, আঙ্কেল, আমি আপনার মেয়েকে ভালোবাসি। আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আপনার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য উপযুক্ত পাত্র হয়ে উঠবো। আর এর মধ্যে ওকে বিয়ের জন্য জোরাজোরি করতে পারবেন না।"
আগের মতোই অনাগ্রহ প্রকাশ করল শুভ্র। বলল, "তোমার বাবার সামনে গিয়ে এইসব বলার অধিকার কি আমার আছে?"
গম্ভীর স্বরে ইতু বলল, "অধিকার কি কেউ দান করবে তোমায়? এটা তোমাকে আদায় করতে হবে।"
"না, আমার দ্বারা এটা সম্ভব না।" শুভ্র ঢোক গিলল।
ইতু শক্ত গলায় বলল, "তাহলে অপেক্ষা করো। সেতু বিয়ে করে বিদায়ের আগে তোমাকে একবার জড়িয়ে ধরবে। তুমি না হয় সেটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থেকো।"
"এভাবে বলো না। আমি সেতুকে খুব ভালোবাসি।" শুভ্র কণ্ঠ শীতল, কাতর ভাব। মুখ গোমড়া করে মাথা নুইয়ে বসে রইল।
ইতু আগের মতোই শক্ত গলায় বলল, "তাহলে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াও। প্রেমিক হয়েছ, প্রেমিকার জন্য এইটুকু সাহস দেখাতে পারবে না? কেমন প্রেমিক তুমি? প্রেমিকদের যে সাহসী হতে হয়, সেটা জানো না?"
শুভ্র অসহায় ভাবে তাকালো ইতুর দিকে।
ইতু বসা থেকে উঠতে উঠতে বলল, "দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই। এটাই একমাত্র অপশন।" কথাটা বলে আর দাঁড়ালো না ইতু, পালিয়ে যাওয়ার মতো করেই দ্রুত পায়ে হেঁটে স্থান ত্যাগ করল।
শুভ্র দাঁড়িয়ে বিস্ময় গলায় বলল, "পুরো প্রসঙ্গটাই পাল্টে দিলো। খুব চালাক এই মেয়ে।"
১১৬.
"হ্যাঁ-রে, তূবা এখনো আসছে না কেন?" মোনার থাই-এ হালকা থাপ্পড় মেরে জানতে চাইল অনু।
মোনা বলল, "আসছে, একটু দেরি তো হবেই।"
মোনা আর অনু, দু'জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে এই মুহূর্তে। মোনার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল ৩মাস আগে। এরপর অনু চিকিৎসার জন্য বাহিরে যাওয়ার আগে একবার ফোন করে জানিয়েছিল, তখন সময় ছিল না আর, তাই মোনা আসতে পারেনি। এরপরও অনুর সাথে ফোনে কথা হয়েছিল। আজ অনু শ্রেয়সীদের নাটকের অনুষ্ঠান দেখতে আসছে শুনে মোনা সব কাজ ফেলে সঙ্গে সঙ্গে বলেছে, আমিও আসব। কথাটা তূবাকেও বলা হয়েছে। ইউনিভার্সিটির এই তিনজনই এখন কাছাকাছি আছে, তাই তিনজনই আজ ক্যাম্পাসে দেখা করার মত দিয়েছে। এছাড়া অনুর চাকরির সুখবর তো আছেই। মঞ্চটা এখনো রেডি হয়নি পুরোপুরি। সেটাই করা হচ্ছে এই মুহূর্তে। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। নাটকও শুরু হবে। মঞ্চের সামনের আসনে পাশাপাশি অনু আর মোনা বসে আছে। মোনা সঠিক সময়ে চলে এলেও তূবা এখনো এসে পৌঁছায়নি। ওর জন্যই অপেক্ষা করছে দু'জনে।
মোবাইলে সময়টা দেখে চিন্তান্বিত গলায় অনু আবার বলল, "ও সত্যিই আসছে তো? মানে ওর মা আসতে দিবে তো? জানিসই তো বিয়ে হচ্ছে না বলে ওর মা ওর সাথে কেমন করে সবসময়।"
মোনা মাথা দুলিয়ে বলল, "আরে ও আসবে। অফিস থেকে সরাসরি এখানে আসছে ও। ওর মা আটকাবে কোত্থেকে?"
"তাও ঠিক।" মৃদুস্বরে বলল অনু।
মোনা আবার বলল, "তাছাড়া আমি যখন খাটাশ বরকে ফাঁকি দিয়ে আসতে পেরেছি, ও পারবে না?"
শ্রেয়সীর গলার আওয়াজ শুনে অনু আর জবাব দিতে পারল না। সে ওঠে দাঁড়িয়ে, শ্রেয়সীর দিকে তাকালো। শাড়ি পরিহিত শ্রেয়সী এগিয়ে আসছে। সব সময়ের মতোই উজ্জ্বল চেহারা। এই মুহুর্তে ওকে আরও সুন্দর দেখতে লাগছে। শাড়ি তো প্রানবন্ত মেয়েদের শরীরেই মানায়!
শ্রেয়সী এগিয়ে এসে অনুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো হ্যান্ডশেক করার জন্য। মুখে বলল, "অনেকক্ষণ ধরে এসেছ নিশ্চয়ই। আসলে আমি সাজছিলাম, তাই আসতে পারিনি।"
মুখশ্রী উজ্জীবিত করে অনু বলল, "কোনো অসুবিধা নেই।" পাশের মোনাকে দেখিয়ে অনু বলল, "ও আমার বান্ধবী, মোহনা। আমরা মোনা বলেই ডাকি। আমরা একসাথেই অনার্স শেষ করেছি এই ইউনিভার্সিটি থেকে।"
"বাহ্!" ভুরু নাচিয়ে মোনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো শ্রেয়সী। এরপর আবার অনুর দিকে তাকিয়ে বলল, "নাটক এক্ষুণি শুরু হবে। পুরোটা দেখতে হবে কিন্তু। এখানেই বসে থাকবে। নাটক শেষে আমি আবার আসবো। আর জয়েনিং লেটারটা তখনই দিবো, যখন ট্রিট দিবা।"
অনু হেসে উঠল, "ঠিক আছে।"
শ্রেয়সী চলে গেল আবার।
কিছুক্ষণ পরই তূবা এলো। অনু জড়িয়ে ধরল তূবাকে। পাশে বসিয়ে বলল, "এখানে বোস, নাটক পুরোটা দেখে যাব।"
তূবা চোখ বড় বড় করে বলল, "দেরি হবে না? সন্ধ্যে হয়ে গেলে?"
মোনা পাশ থেকে বলল, "হলে হবে।"
"সর্বনাশ! মা তো আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে।" তূবা চেঁচিয়ে উঠল।
অনু বলল, "আরে বেশি দেরি হবে না। চিন্তা করিস না।"
অনুর কথায় যেন ভরসা পেলো তূবা। বড় করে শ্বাস নিয়ে কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রাখল পাশে। কিছুটা সময় নিয়ে বলল, "তাহলেও অনু চাকরি পেয়ে গেল।"
পাশ থেকে মোনা বিষণ্ণ গলায় বলে উঠল, "খালি আমিই চাকরি করতে পারব না।"
তূবা হাস্যরত ভাবে বলল, "করছিস তো, পতিসেবা! এটাও তো চাকরি।"
"তা-যা বলেছিস।" মোনা হেসে উঠল উচ্চস্বরে।
অনুষ্ঠান শেষ হলো সন্ধ্যার পর। অনু এতটা সময় থাকতে চাচ্ছিল না, কিন্তু আর কোনো উপায়ও পেলো না। শ্রেয়সীকে না বলে যাওয়া ঠিক হবে না। আর নাটকের মাঝে ওর সাথে কথা বলা মুশকিল। তূবা, মোনা, অনু তিনজনেই যেন উৎকণ্ঠিত কিছুটা। ইতোমধ্যেই মোনার স্বামী তাকে বেশ ক'বার তো দিয়েছে। তূবাকেও বাড়ি থেকে ফোন দিয়েছে কয়েকবার। অনুকে অবশ্য এখনো ফোন দেয়নি কেউ। কারণ সন্ধ্যার পর বাড়ি যাওয়াটা তাঁর জন্য স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বিকেলের পর মামুনও আর ফোন দেয়নি।
শ্রেয়সী এলো ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চেহারা করে। এসেই ব্যস্ত গলায় বলতে লাগল, "সরি সরি, তোমাদের অনেক দেরি করিয়ে দিলাম। আসলে নাটকটাই দেরি করে শুরু হয়েছে। না হলে দেরি হতো না। নাটকের মাঝে আসতেও পারিনি। সরি গো!"।শ্রেয়সী অনুর হাত ধরে চোখ পিটপিট করল।
অনু বলল, "আরে তুমি সরি বলছ কেন? তোমার তো হাত নেই এখানে।"
"তবুও!" শ্রেয়সী মুখ কালো দাঁড়িয়ে থাকল।
অনু বলল, "আহা! মন খারাপ করো না। তুমি তোমার ওই বান্ধবীকে ডাকো। খাওয়াদাওয়া করে আমরা দু'জন চলে যেতে পারব।"
শ্রেয়সী মুখ ভার করে বলল, "ও আজ আসেনি। আমি ফোন করলাম একটু আগেনি, বলল ও আসেনিই ও। এটা আমি জানতাম না আগে। বিশ্বাস করো।"
শ্রেয়সীর চোখ-মুখের অবস্থা দেখে অনুর খারাপ লাগল ভীষণ। নির্লিপ্ত চোখে তূবা আর মোনার দিকে তাকালো।
তূবা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, "অনু না হয় আমাদের বাড়িতে থাকলো আজ।"
সবাই তাকালো তূবার দিকে। শ্রেয়সীও কিছুটা উজ্জ্বল চাহনিতে তাকালো। তূবা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসতে হাসতে বলেল, "আমাদের অবস্থাটা এমন যে, যাই হয়ে যাক না কেন, দিনরাত নিয়ম করে ঝাড়ি খেতেই হবে। আমি এখন একা বাড়িতে গেলেও মায়ের কথা শুনবো, অনুকে সাথে নিয়ে গেলেও কথা শুনবো। মোনার স্বামীও হয়তো বকাঝকা করবে। প্রতিদিন যখন বকাঝকা খেতেই হয়, আজও না হয় খেলাম। অনুও এতবড় একটা অসুখ পার করল। চাকরি পেলো আবার। বিয়েও সামনে। তাই আজকের একটু আনন্দ করি।"
মোনা পাশ থেকে বলে উঠল, "সেই পরিচিতি চায়ের দোকানে চা খেতে ইচ্ছে করছে। আগে হল থেকে বেরিয়ে রোজ চা খেতাম, মনে আছে?"
অনু মাথা ঝাঁকালো। তবে সংকোচিত গলায় বলল, "আমি না হয় বাবাকে বলে ম্যানেজ করতে পারব। কিন্তু মোনা তুই, রাত করে বাড়ি ফিরলে তোর স্বামী রাগারাগি করবে না?"
মোনা বলল, "ওকেও ডেকে নেই। অনবরত ফোন দিয়েই যাচ্ছে। ফোন করে যদি খাওয়াদাওয়ার কথা বলে, তাহলে হয়তো রাগটা কম করবে। সবসময় তো এভাবে ঘোরার সুযোগ আমাদেরও হয় না।"
মোনার কথা শেষ হতেই তূবা বলল, "আমি মা কে বলছি, আসতে একটু দেরি হবে। আর সাথে অনুকে নিয়ে আসব। প্রতিদিন তো দেরি করি না। কতক্ষণ আর বকবে বল। অন্তত আজকের এই সময়টা সবকিছু ভুলে আনন্দ করি, প্লিজ।"
সবাই সম্মতি দিলো। অনু বাবাকে ফোন করে বলল ব্যাপারটা। তূবার সাথে কথা বলিয়ে দিলো। সাথে যে মোনা আছে, সেটাও বলল। নুরুল ইসলাম মোনাকে আগে থেকে চিনলেও তূবাকে তেমন চিনতো না। তবে তিনি জানেন, অনু ডিভোর্সের পর তূবার বাড়িতে ক'দিন থেকেছিল। তাই এবারও না করলেন না তিনি। মোনা নিজের স্বামীকে বলল, ইউনিভার্সিটিতে আসতে। আর তূবা নিজের মাকে সবটা খুলে বলল। মায়ের জবাবে অপেক্ষা করল না সে। জানে মা কী বলবে। শুধু ২ ঘন্টা সময় চেয়ে ফোন কেটে দিয়ে, মোবাইল সাইলেন্ট করে রাখল।
চা খেলো সবাই, এরপর ফাস্টফুড খাবার খেলো রাস্তার পাড়ে দাঁড়িয়ে। যদিও ট্রিট অনুর দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শ্রেয়সীর জোরাজোরি করে সব বিল সে দিলো। কারণ হিসেবে বলল, সে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসেছে।
মোনা তাঁর স্বামীর সাথে বাড়িতে চলে গেল। শ্রেয়সীর বাসা কাছেই, তাই সহজেই চলে গেল সে। তূবা আর অনু বাসে ওঠে বাড়িতে রওয়ানা দিলো। মনেমনে তূবা বেশ ভয় পাচ্ছিল। তখন মায়ের কথা না শুনেই ফোন কেটে দিয়েছিল। মা মত দিবে না সেটা জানতো, মূলত এই কারণেই প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করেছিল। তবে সে জানে, বাড়িতে গিয়ে শুরুতেই একটা ঝড়ের মুখোমুখি হতে হবে।
৬২ পর্ব এখানেই সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসছে।
গত পর্বের লিংক - https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/852371108901720/

নাম বিভ্রাট
সেদিন হুট করেই রাস্তার মাঝে মেঘলার বাবার সাথে দেখা। মেঘলার বাবা আমার কাছাকাছি এসে বলল।
-তুমি আজাহার ভাইয়ের ছেলে আকাশ না।
আমি বললাম।
-জী আংকেল আপনি ঠিকই বলেছেন।
আংকেল হুট করেই বললেন।
-আংকেল বলছো কেন? বাবা বলো বাবা আমি তোমার শশুর।
-কি বলছেন আবোল তাবোল। আপনার মাথা ঠিক আছে তো।
-আমার মাথা ঠিক আছে, আবোল তাবোল কথা আমি বলছি না। আবোল তাবোল কাজ তুমি করছো। আমার মেয়েকে ভুলিয়ে ভালিয়ে পটিয়েছ। আর এখন তাকে পালিয়ে নিতে চাও। এটা কিন্তু তুমি ঠিক করো নি। আমাকে বলতে পারতে আমি তোমাদের মেনে নিতাম। আরে তোমার মতো ছেলেকে কেউ হাত ছাড়া করে।
আংকেলের কথা শুনে আমি হতবম্ব। বললাম।
-আংকেল আমি কেন আপনার মেয়েকে পালিয়ে নিয়ে যাবো। আপনি হয়তো ভুল করছেন।
আংকেল রাগি চোখে বললেন।
-ভুল আমি করছি না ভুল তুমি করছো। এই নাও এটা পড়।
আংকেল আমার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলো। আমি চিঠির ভাজ খুলে পড়তে লাগলাম।
প্রিয় বাবা,
আমি তোমাকে কখনো কোনোদিন কষ্ট দিতে চাই নি। কিন্তু আমি নিরুপায়। আকাশকে অনেক ভালো বাসি আমি। জানি তুমি আমাদের সম্পর্কটা মেনে নেবে না। আকাশের পরিবারও মেনে নেবে না আমাদের সম্পর্ক। তাই আমরা বাধ্য হয়ে পালিয়ে যাচ্ছি। আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা। আর আমাদের জন্য পাড়লে দোয়া করো।
ইতি,
তোমার আদরের কন্যা মেঘলা।
চিঠিটা পড়া শেষ করতেই আংকেল বললেন।
-তোমরা যেটা করতে যাচ্ছো সেটা মস্ত বড় ভুল। আমি তোমার বাবা সাথে কথা বলে তোমাদের বিয়ের ব্যাবস্থা করবো। তোমার বাবা অবশ্যই আমার কথা রাখবেন।
কথাটা বলেই আংকেল উল্টো পথে হাটা ধরলো। আমি পিছন থেকে আংকেলকে ডাক দিয়ে বললাম।
-আংকেল মেঘলাকে এই বিষয়ে কিছুই জানাবেন না। ওকে একটা ঘরে আটকে রাখবেন। আর পাড়লে আজকেই আমাদের বিয়ের ব্যাবস্থা করেন। আমি মেঘলাকে সারপ্রাইজ দিতে চাই।
আংকেল বললেন।
-ঠিক আছে।
আংকেল চলে গেল। আর আমি পিছন থেকে লুঙি ড্যান্স দিলাম। মেঘলাকে আমি ভালোবাসতাম ঠিকই কিন্তু মেঘলা আমাকে পাত্তা দিতো না। আমাকে দেখলেই জুতা দিয়ে তারা করতো। আমাদের মাঝে কোন প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক নেই। মেঘলা আকাশ নামে একটা ছেলেকে ভালো বাসতো। আর তার সাথে সে পালিয়ে যাওয়ার প্লান করছে। কিন্তু আংকেল ভেবেছে আমি। মেঘলাকে বিয়ে করার এই মুখ্যম সুযোগ কখনোই হাত ছাড়া করা যাবে না। বিয়ের পর যা হয় দেখা যাবে। আপাতত আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। যেন বাসর রাতে বিড়ালটা মারতে পারি
নাম বিভ্রাট
Akash Mahmud

দিনলিপি হাতে চল্লিশতম দিনে -
যার নামের আগে বা পরে ,অপরাধীর যেকোনো তকমা-
অনায়েসে জুড়ে দেওয়া যায় ৷
অন্ধ বললেও মন্দ হয় না ,যে প্রাক্তনের প্রেমে মজে ছিল
পবিত্র প্রেম যার চোখে পড়ে নি ৷
খুনি তকমা জুড়লেও অতি নগণ্য মনে হবে-
যে ভালোবাসা খুন করেছে ,কত কল্পণা খুন করেছে ,
জন্ম হওয়ার আগেই খুন করেছে কত ইচ্ছেদের !
তবুও কিছু ইচ্ছে দিনলিপির বুক ছুঁয়েছে
আজ যা আমার হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে ,
দুচোখের অশ্রুতে ভিজে যাচ্ছে বুক পকেটের দিকটাও!
এই যেমন ইচ্ছে ছিল-
আমার বুকে মাথা রেখে আর্তনাদ শোনা ,
দুষ্টুমি করে, বুকের হৃদস্পন্দন গুনা !
অথচ বুক কেন! ভালোবেসে কখনও-
পায়ের কাছেও বসতে দেয় নি ৷
কত বার যে আমাকে নিয়ে ফুচকা খেতে চেয়েছিল ;
বলতে গেলে হয়তো আরো বছর চারেক লেগে যাবে ৷
আমি খুব আইসক্রিম পছন্দ করতাম
কখনও জানা হয় নি ,
সেও খুব আইসক্রিম প্রিয়সী ছিল ৷
আমাকে সাথে নিয়ে আইসক্রিম খাবে বলে-
আর আইসক্রিম খাওয়াই হলো না !
"একটা আইসক্রিম দু'জনে মিলে খাবো ,
ইচ্ছে করেই তোমার গালে লেপ্টে দেবো৷"
এই লাইন দু'টো যে কত বার লেখা-
নতুন করে লিখতে গেলে কলম ক্লান্ত হবে ৷
চোখের জলে লেপ্টে যাওয়া কালিই বলে
সেদিন সে কতটা কেঁদেছিল ,
যেদিন সামান্য আমার বালিশে মাথা রাখার জন্য ,
কত কিছুই না বলেছিলাম ৷
দিনলিপির সাতশতম পৃষ্ঠা স্পষ্ট বলে ,
কতটা অপমান বোধ করতো সে ,
চায়ের কাপের হাতলের দিকটায় পান করাকে-
যখন খুব বিশ্রীভাবে অপমান করতাম ৷
কিন্তু আজ-
আমার তৃষ্ণার্ত বুকে ,
মাথা না রাখতে পারার চাপা কষ্ট বোধ করি ৷
ফুচকার নাম শুনলে
আর সবার মতো জিভে নয়,চোখে জল আসে ৷
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ,
আইসক্রিম না খাওয়ার ব্রত পালন করছি ৷
আজ আমার বালিশ সরিয়ে ,
তার বালিশে মাথা রাখি,চুলের সুবাস খুঁজি ৷
বিছানার যে পাশটায় সে শুয়ে থাকতো ,
সেখানেই সারাদিন ঘুমাতে ইচ্ছে করে
খুঁজতে থাকি তার গাঁয়ের সুঘ্রাঁণ !
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ,
এই বালিশে,এই চাদরে তার আদর খুঁজে যাবো ৷
চিহ্ন দেওয়া চায়ের কাপটা ভেঙে ,
তার ঠোঁট লাগানো কাপটায় ,ঠিক হাতলের দিকটায় ;
ঠোঁট লাগিয়ে থাকি চা শূন্য কাপে ৷
শেষ ইচ্ছেটাও আমি রাখতে পারলাম না ,
"আমায় তুমি ক্ষমা করো" ৷
যতটুকু ভালোবাসা পেলে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত-
ভালোবাসার অভাববোধ হবে না ,
ঠিক ততটুকু ভালোবাসা তুমি দিয়েই গিয়েছ ৷
তাই ইহলোক ও পরলোকে ,
আর ভালোবাসার প্রয়োজন নেই ৷
শুধু তোমাকে প্রয়োজন ,শুধু তোমাকে ৷
কবিতা:এপিটাফের ঠিকানায়
রচয়িতা:শাহিদুল ইসলাম

তিনটি ভৌতিক গল্প
১.
'বাহ, নেকলেসটাতো বেশ সুন্দর। কোথা থেকে কিনলে?'
'কিনি নি। আমার মায়ের নেকলেস এটা।'
'ওহ আচ্ছা। খুব সুন্দর, অসাধারণ।'
প্রশংসা করতে করতে অর্পার গলার নেকলেসটার দিকে তাকিয়ে থাকে রুনা। এরকম একটা নেকলেস কেনার খুব শখ ছিলো তার। বোঝাই যাচ্ছে অর্পা নেকলেসটা বিক্রি করবে না, মৃত মায়ের শেষ স্মৃতিচিহ্ন কেই বা বিক্রি করতে চায়? তবুও এই নেকলেসটা তার চাই, যে কোনো ভাবেই হোক।
পার্টি থেকে ফেরার সময় রুনা অর্পাকে জড়িয়ে ধরে বললো, 'যাই এখন। অনেক সুন্দর একটা পার্টি দিলে। অনেক এনজয় করলাম।' অর্পা টেরও পেল না, এই ফাঁকেই রুনা তার গলা থেকে নেকলেসটা খুলে লুকিয়ে ফেলেছে।
নিজের ঘরে এসে নেকলেসটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো রুনা। কি অদ্ভুত সুন্দর নেকলেসটা, এমন সুন্দর এক নেকলেস যে এখন কেবল তার সেটা ভাবতেই বুকটা আনন্দে ভরে গেলো। এই নেকলেসটা এখন আর সে কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। নেকলেসটা বিছানার পাশে রেখে রুনা শুয়ে পড়লো, সকালে উঠে সূর্যের চকচকে আলোয় আবার সে নেকলেসটাকে দেখতে চায়।
মাঝরাতে রুনার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে উঠেই বিছানার পাশে তাকালো নেকলেসটা দেখার জন্য, দেখলো ওটা জায়গামতোই আছে। কিন্তু ঘরে কেমন একটা পঁচা, বাজে গন্ধ। গা গুলিয়ে উঠলো রুনার, ভাবলো ঘরের কোন কোণে মনে হয় ইঁদুর মরে পড়ে আছে। সকালে উঠে সাফ করতে হবে, এখন খুব ঘুম পাচ্ছে ওর। ঘুমানোর চেষ্টাতেই বাম পাশ থেকে ডানপাশে ফিরলো সে, কিন্তু যা দেখলো তাতে ভয়ে জমে গেল।
ও দেখতে পেল এক বুড়ি মহিলা মশারিতে ভর দিয়ে ঝুঁকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখের মাংস যেন পঁচে গলে পড়ছে, চোখ দুটো টকটকে লাল। সে রাগী গলায় রুনাকে বললো, 'তোর এতো লোভ? আমার মেয়ের কাছ থেকে আমার দেয়া জিনিস চুরি করেছিস। তোকে আমি ছাড়বো না।' রুনা কিছুই বলতে পারলো না, ভয়ে তার সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগলো।
পরেরদিন অর্পা তার স্বামী সাহেদের কাছে গিয়ে হাসিমুখে বলতে লাগলো,'জানো, কাল রাতে মা এসেছিলেন। পার্টিতে যে নেকলেসটা হারিয়ে ফেলেছিলাম, সেটা ফেরতে দিতে।' সাহেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অর্পার পাগলামিটা আবার বেড়েছে। ওকে আবার সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
ওদিকে রুনা আহমেদের বাসায় ততক্ষণে কান্নার রোল পড়ে গেছে। কাল রাতে মারা গেছে রুনা। ডাক্তার সন্দেহ করছেন স্ট্রোক, নয়তো হার্ট অ্যাটাক। তবে সবাই বলাবলি করতে লাগলো, সকালে যখন রুনাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, তখন নাকি তার চোখদুটো সম্পূর্ণ খোলা ছিলো, আর মুখে ছিলো ভয়ানক আতংকের ছাপ। যেন কাল রাতে ভয়ঙকর কিছু একটা দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলো সে।
২.
কয়েকদিন ধরেই আনিস সাহেব বাসার ছাদে মার্বেল খেলার আওয়াজ পান। আজও পাচ্ছেন। আজ আর তিনি কৌতূহল সামলাতে পারলেন না, সিঁড়ি বেয়ে চুপিচুপি ছাদে উঠে গেলেন কে ছাদে আছে দেখার জন্য।
দেখলেন দুটো বাচ্চা ছেলে মার্বেল খেলছে, এদের তিনি আগে কখনো দেখেননি। এরাই তবে প্রতিদিন বিরক্ত করে? আজ তবে এদের একটা শিক্ষা দিতে হবে।
আনিস সাহেব আড়াল থেকে বেরিয়ে ধমক দিয়ে বললেন, 'এই, কি হচ্ছে? এটা মার্বেল খেলার সময়?'
ছেলে দুটো তাকে দেখে ভয়েই আধমরা। একজন কোনোরকমে আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে কাঁপতে বললো, 'ভাইয়া, তুই না বলেছিলি এ বাসায় কেউ থাকে না? তাহলে এ লোকটা এলো কোথা থেকে?'
আনিস সাহেব রাগী গলায় বললেন, 'ভূত হয়ে এসেছি। আরেকদিন যদি তোদের এখানে দেখেছি তো ঘাড় মটকে রক্ত চুষে খাব। যা, পালা এখন।' বলতে না বলতেই ছেলে দুটো দৌড়ে এ বাড়ির লাগোয়া পাশের বাড়ির ছাদে লাফিয়ে চলে গেল। সেখান থেকে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে।
আনিস সাহেব সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ভাবতে লাগলেন, তিনি যখন জীবিত ছিলেন তখনও বাচ্চারা তাকে ভীষণ জ্বালাতো। মরার পরও এদের জ্বালাতন থেকে রেহাই পাওয়া গেল না।
৩.
'এটা কি রেনুদের বাসা?'
কলিংবেল বাজানোর পর যে মহিলা দরজাটি খুললেন তাকেই মিলি প্রশ্নটা করলো। মহিলাকে সে আগে কখনো দেখেনি। মহিলার চেহারাটি কেমন যেন, দেখেই কেমন একটা ভয় লাগা অনুভূতি তৈরি হয়।
মহিলাটি একটু হাসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু উনার কঠিন মুখে হাসি ফুটলো না। তিনি বললেন, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, ও তো ভেতরেই আছে। তুমি ভেতরে এসো।'
একটু ইতস্তত করেই ঘরে ঢুকলো মিলি ।
ঘরের ভেতরে কেমন যেন একটু অন্ধকার অন্ধকার ভাব, কম পাওয়ারের বাতির জন্যই হয়তো। মিলি সোফায় বসে বললো, 'রেনুকে একটু ডেকে দিন না। আমার একটু তাড়া আছে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে।'
মহিলাটি বললেন, 'আরে ওতো তাড়া কিসের? বাসায় যখন এসেছো, একটু জিরিয়ে নাও। আমি রেনুকে ডেকে দিচ্ছি।'
'মাফ করবেন, আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না। আগে হয়তো দেখি নি...'
'হ্যাঁ আমাকে দেখোনি আগে। আমি রেনুর খালা হই।'
মহিলাটি চলে গেলেন। মিলি বসে রেনুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। রেনুর কাছে কিছু নোটস নিতে এসেছে, আজকেই ফটোকপি করে আবার ফেরত দিয়ে যেতে হবে। কাল এক্সাম আছে এগুলোর ওপর।
এটা রেনুদের নতুন বাসা, আগে এখানে আসেনি মিলি । বাসার লোকেশনটা রেনু বলে দিয়েছিলো ফোনে, বলেছিলো বাসার নিচে এসে কল দিতে, রেনু এসে ওকে নিয়ে যাবে। কিন্তু ঠিকানায় পৌঁছে রেনুকে ফোন দিয়ে রেনুর নম্বর বন্ধ পায় মিলি। শেষে বাধ্য হয়েই তিনতলাতে উঠে পড়ে ও, রেনুর কাছে কবে যেন শুনেছিলো তিনতলায় ফ্ল্যাট নিচ্ছে ওরা। আর তিনতলায় উঠেই এই মহিলার সাথে দেখা।
কিন্তু রেনু এখনো আসছে না কেন? মহিলাটিরও তো কোনো দেখা নেই। মহিলাটি যে ঘরে ঢুকেছিলেন তার সামনে গিয়ে মিলি বললো, 'খালা, রেনুকে একটু তাড়াতাড়ি ডেকে দিন না প্লিজ। আমার এখনই যাওয়া লাগবে।'
'হ্যাঁ মা, একটু বসো, ও এখনি আসছে।'
মিলি আবার গিয়ে সোফায় বসলো। কি করবে বুঝতে পারছে না। এরমধ্যেই ওর মোবাইলে কল আসলো। ও অবাক হয়ে দেখলো রেনু ফোন দিয়েছে।
ফোন ধরতেই রেনু বললো, 'স্যরি রে, ফোনে চার্জ ছিলো না। তুই কি নিচে দাঁড়িয়ে আছিস?'
'না তো। আমি তো তোদের বাসায়।'
'আমাদের বাসায়? কি বলিস!'
' হ্যাঁ। তোদের বাসার ড্রয়িংরুমে বসে আছি। তোদের বাসা তিনতলায় না?'
'না তো। আমাদের বাসা তো চারতলায়। তিনতলাতো পুরো খালি, ওখানে তো কেউ থাকে না। তুই কোথায় আছিস বলতো..'
কথাটা শুনেই মিলির মেরুদন্ড বেয়ে ভয়ের এক শীতল স্রোত নেমে গেল। ও তাহলে কোথায় আছে? ওকে এক্ষুণি এখান থেকে পালাতে হবে, যতো দ্রুত সম্ভব।
দরজার দিকে দৌড়ে গেল মিলি। দরজা খোলার চেষ্টা করলো, কিন্তু খুললো না দরজা। এসময়ই ওর পিছে কেমন একটা অদ্ভুত ভয়ঙকর গর্জন শুনতে পেলো। ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকালো ও।
দেখলো মহিলাটি বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। তার চেহারা বদলে গেছে। চুলগুলো খোলা, চোখদুটো রক্তের মতো টকটকে লাল। মহিলাটি এগোতে লাগলেন মিলির দিকে।
মিলির চিৎকার সেদিন তিনতলার বন্ধ দরজার বাইরে কেউ শুনতে পায়নি।
লেখা- সোয়েব বাশার
Update
#পোস্ট___০৩
০১| যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ী প্রেসিডেন্টে যেখানে শপথ পড়ানো হয়___ ক্যাপিটাল ভবনে,ওয়াশিংটন ডিসি
০২| National Security Agency(NSA) যে দেশের সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা___যুক্তরাষ্ট্রের
০৩| "The Truth We Hold" নামে আত্মজীবনী লিখেছেন___কমলা হ্যারিস,যুক্তরাষ্ট্র
০৪| ক্লু ক্লাক্স-ক্ল্যান( কে কে কে)কী?
®____যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত উগ্র বর্ণবাদী সংগঠন
০৫| "গুপকর ঘোষণা"ভারতের যে অঞ্চলের রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত___জম্মু-কাশ্মীর
০৬| জম্মু-কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় উদ্যোগে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল___জম্মু-কাশ্মীর আপনি পার্টি
০৭| ইরানের উপর অারোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হবে___চলতি অক্টোবর,২০২০ এ
০৮| "পোস্টাল ভোটিং" কী?
®____গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ডাকযোগে ভোট
০৯| মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর-অাফ্রিকার দেশগুলোকে একত্রে বলে___মেনা
১০| "GRU" যে দেশের সামরিক সংস্থা___রাশিয়া
নোট____রমজান
১১| "অ্যালেক্সি নাভালনি" যে দেশের অালোচিত বিরোধী নেতা___রাশিয়ার
১২| GDP'র হিসেবে বর্তমান বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশ____চীর(আকার ২২.৫৩ ট্রিলিয়ন ডলার)
১৩| GDP আবিষ্কার করেন___সাইমন কুজনেতস,যুক্তরাষ্ট্র(এ কারণে ১৯৭১ সালে সে অর্থনীতিতে নোবেল পায়)
১৪| "মহাখালী নদী" যে দুটি দেশের সীমানা নির্দেশ করে____ভারত-নেপাল
১৫| বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা হয়েছিল___১৯২৯-১৯৩৯ সাল পর্যন্ত
১৬| ১৯২৯ সালের ২৯ আগস্টকে বলা হয়___কালো মঙ্গলবার
১৭| কিশোরী পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ যে দেশের নাগরিক___সুইডেনের
১৮| "ইউনিয়ন-পে" যে দেশের অান্তর্জাতিক অার্থিক প্রতিষ্ঠান___চীনের
১৯| "গ্র্যান্ড প্যালেস" কী?
®___থাইল্যান্ডের রাজপ্রাসাদ
২০| কুখ্যাত "হোয়া লো কারাগার"অবস্থিত___হ্যানয়, ভিয়েতনাম
নোট MD. Ramjan

দূরত্ব
আমি সোহেল, আমার বয়স এখন ১১বছর। আমরা ৫ভাই বোন, দুই বোন তিন ভাই। আমি মেজো। কয়েকদিন আগে আমার সেজো ভাই আমার কাছ থেকে ৪টাকা নিয়েছিলো। এখনো ফেরত দেয়নি। খুব মেরেছি আজকে ওকে। আমার টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে হুহ! ঠিকই নিয়ে নিয়েছি।
০৭/১০/১৯৮৭ই তাং
আমার নাম সোহেল মাহমুদ। বয়স ২৩শের কাছাকাছি। আর কিছুদিন বাদেই পাঁ দিবো ২৩এর ঘরে। আজ একটা বিশেষ দিন। আজ বড় আপার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। আমার চেয়ে মাত্র ২বছরের বড় হলেও গ্রামের মানুষের কাছে সে অনেক বেশি বুড়া হয়ে গিয়েছে। এখানের রীতি রেওয়াজই হচ্ছে কুড়িতে বুড়ি। কোনো মেয়ের কুড়ি বছরেও যদি বিয়ে না হয় তাহলে তাকে অলক্ষুণে হিসেবে ধরা হয়। ছোটবেলায় বড় আপাই বেশি আদর দিয়েছে। যৌথ পরিবার ছিল আমাদের। মা শুধু রাতেই রান্নাঘর ছেড়ে একটু দম ফেলার সময় পেতো। আর আমরা ভাই-বোন রা মিলেই নিজেদের খেয়াল রাখতাম। বড় আপাই ছিলো আমাদের মা। আমাদের অভিভাবক। তার আজ বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বুঁক ফেঁটে কান্না আসছে। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কাঁদতে পারছিনা। কি জানি সুখী হবে কিনা?
২৪/০৩/১৯৯০ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ, বয়স ২৬। আজ আমার বিয়ে। মিনা রহমান নামের একটি মেয়ের সঙ্গে। আমার চেয়ে প্রায় ৯বছরের ছোট। যেদিন দেখতে গিয়েছিলাম সেদিন ভেবেছিলাম হয়ত কনের বোন হবে তবে সেই যে কনে তা পড়ে জানতে পেরেছি। একদম বাচ্চা মেয়ে। ভাইদের মধ্যে আমি বড়। সেইদিক থেকে ধরতে গেলে মিনু এ বাড়ির বড় বউ। কম বয়সে অনেক কিছুই শিখে নিতে হবে যে ওকে। আমার মা আগেরকালের মানুষ। খুব কঠোর আবার মিছরিও বটে। খুব বোকা-সোকা কিন্তু বেশ পাঁকা-পক্তো। নাহলে এ বাড়িতে ৫জা এর মধ্যে মাথা উঁচু করে টিকতে পারতো না যে। মিনুকেও শিখতে হবে মাথা উঁচু করে বাঁচা আবার ঠিক জায়গায় মাথা নত করে চলা, সব কিছুর সাথে মানিয়ে নেওয়া। আশা করি সুখে রাখবো তাকে।
১৩/০১/১৯৯২ই তাং
আমার নাম সোহেল মাহমুদ, বয়স ২৮। আজ আমার ঘর আলো করে আমার রাজকন্যা মিতা আহমেদ (মিতু) এসেছে। বংশের সবার বড়। সেও সবার বড় আপা হবে ঠিক যেমন আমার বড় আপা আমাদের জন্য ছিল। একটু কঠিন, একটু মিষ্টি। আজ আমি ২টন কাঠ আর ২বিঘা জমি কিনেছি। ৪টা পানের বরাজ আর ১টা ঘের আছে আমার।
২৯/০৬/১৯৯৫ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ, বয়স ৩১। আজ শোকের ছায়া নেমেছে আমাদের বাড়ি জুড়ে। আব্বা মারা গিয়েছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহির রাজিউন। আমার গলা ধরে আসছে, কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই। আম্মা বারং বার জ্ঞান হারাচ্ছেন। একটু পরই আব্বার জানাজা হবে।
১৭/০৯/১৯৯৮ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ, বয়স ৩৪ হবে হয়তো। আজ আদরের ছোট বোনটার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বড় আপার কপালে তো সতীনের সংসার লেখা ছিল, না জানি সাবিহার ভাগ্যে কি আছে। তবে দোয়া করবো সুখে থাকুক। আদরের বোনটার সাথে আর খুনশুটি হবে না যদিও সেই বয়স অনেক আগেই পার হয়েছে। মিনু আর সাবিহার ঝগড়াও বাঁধবে না যে আমি থামাতে হাতে দুটো বেলি ফুলের মালা নিয়ে ছুটে আসবো।
৩০/০৫/২০০১ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ, বয়স ৩৭বছর। আজকে বাড়িতে অনেক গ্যাঞ্জাম হচ্ছে। জমির দলিল করার সময় দুই বোনের কাউকেই কেনো জানানো হয়নি এসব নিয়ে। বড় আপা কয়েকটা কথা বলে দাবী ছেড়ে দিয়েছে তবে সাবিহা ছাড়ছে না। দেখি কি হয়।
০৪/০৯/২০০৩ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ, বয়স ৩৯। আজ সবচেয়ে ছোট ভাই শহীদের সাথে আমার ঝামেলা হলো। গাঁয়ে হাত ও তুললাম বউ বাচ্চার সামনে। সম্পর্ক খুব ই খারাপ হয়ে গিয়েছে। আমার জমির পাশেই ওর জমি। ও নিজের জমির বালি বিক্রি করেছে ঠিকই তবে এমনভাবে করেছে যে আমার জমির নিচে ফাঁপা হয়ে গাছপালা সব ভেঙ্গে পড়েছে। সম্পর্ক খারাপ হলে হউক, অন্যায় করেছে যখন তখন টাকা না দিলে আর কোনো সম্পর্ক আমার নাই ওর সাথে।
২৭/০৩/২০১১ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ, বয়স ৪৭। আমার চোখের মণি আজ আমায় ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যের ঘরে। আমার চোখের পানির বাঁধ ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। আমি কাকে আদর করবো এখন "মা" ডেকে?
১৪/০৮/২০১২ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ বয়স ৪৮। আজ আমার জন্মদাত্রী মাও ছেড়ে চলে গেল। আগের মতো আর সেই চাঞ্চলতা নেই আমার মাঝে। কান্নাও আর আসে না তবে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মনে হয় মরেই যাবো আজ। ভাই বোন সবাই এক হয়েছিলাম আজ সব ঝামেলা ভুলে। কিন্তু জানি আম্মার বিদায়ের পর আবারো ঝগড়া লাগবে আমার নানাবাড়ির সম্পত্তির ভাগ নিয়ে।
২১/১১/২০১৬ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ, বয়স কত হিসেব নেই তবে ৫০এর ঘর পেরিয়েছে তা বুঝতে পারছি। শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। আজ বড় আপা এসেছিল তার অধিকার নিতে। শুনেছি শশুর বাড়ি থেকে নাকি চাপ দিচ্ছে খুব। তাতে আমার গাঁয়ে লাগছে না। নিজের স্বার্থ আমি ছাড়তে পারবো না।
১৩/০৪/২০১৮ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ, বয়স বোধহয় ৫৫পেরিয়েছে নাকি পেরোইনি জানিনা। স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেয়েছে। মেয়েটা বেশ সুখেই আছে। দু'টো নাতি আছে আমার। তবে মেয়েটা বছরে ৩ কি ৪বার ই এ বাড়িতে আসার সময় পায়। মিনুর ক্যান্সার ধরা পড়েছে। ডাক্তার দেখিয়েছি। বলেছে ঠিক হঅয়ে যাবে।
১২/১০/২০২০ই তাং
আমি সোহেল মাহমুদ। বয়স হিসেব করে বের করলাম ৫৬হয়েছে। মিনু ছেড়ে গেছে ৩মাস হয়েছে। আমার বাড়িটা এখন পুরোই নির্জন, পরিত্যক্ত। ভাইদের সাথেও কোনো সম্পর্ক নেই। মেয়েটা আজ এসেছিল আমাকে দেখতে। জানালা থেকে দেখে চলে গেছে। ভেতরে আসেনি। মেয়েটার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। বোধহয় অনেক কাজ করায়। আজ কেনো যেনো শৈশবের কথা গুলো খুব মনে পড়ছে। কতো বেশি তফাৎ হয়ে গেছে এই কয়েকটি যুগে। করোনায় আক্রান্ত তবু কেউ আসলো না দেখতে।
দু'ফোটা পানি পড়লো ডায়েরির পাতাটায়। নিঃশ্বাস নিতে একটু কষ্ট হচ্ছে সোহেল সাহেবের। জানেনা কতদিন বাঁচবে। তবে বাঁচলে সব সম্পর্ক, সবার হক সে ফিরিয়ে দিবেই। ডায়েরিটা বন্ধ করেও আবার খুললো। নতুন একটা পেজ বের করলো, কলমটা হাতড়িয়ে খোঁজার চেষ্টা করলো কিন্তু পেলো না। বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে রাখা টেবিলটার কাছে গেল। কাজের ছেলেটা খাবার রেখে গেছে তিনদিনের। সে শশুর বাড়িতে বেরাতে গিয়েছে বলে গেছে। আজকের খাবার টা প্লেটে বেড়ে রেখেছে আর অন্যদিনেরগুলো বাটিতে। এখন সোহেল সাহেবের দায়িত্ব হলো খাবারগুলো ফ্রিজে রাখা। তবে এখন আর ইচ্ছে করছে না। টেবিলের উপরই একটা কলম পড়ে আছে। নিয়ে ফিরে চলে গেল বিছানায়।
১৩/১০/২০২০ই তাং
বয়স বাড়ার সাথে সাথে টাকার মূল্যও বাড়ে,
কিছুটা কথা কাটাকাটি, কিছুটা দূরত্ব
শৈশবের সেই মিলেমিশে থাকা ভাই-বোন
বেড়েছে ঝগড়া, পাশাপাশি বয়সও বাড়ন্ত।
সবাই সবার নিজের মতো সুখে
অন্যের হক কেড়ে নিয়ে, সে যে বড্ড দুখে
আজ বুঝছি কেউ দীর্ঘমেয়াদী সুখী নয়
অন্যের সুখ কেড়ে
বেড়েছে বয়স, মনমালিন্য
বেড়েছে দূরত্ব বড়।
ছন্দ গুলো মিলাতে পারছিনা আর। বয়স বেড়েছে বুঝতে পারছি। অন্যায় গুলো আজ খুব বেশিই কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। যে ভাই-বোনদের সাথে বড় হয়েছি তাদের সাথেই অন্যায় করেছি। ছোট থাকতে অনেক মারামারি করেছি আবার ভালোও বেসেছি। কান্না করলে বুকে জরিয়ে নিয়েছি। তবে বড় হওয়ার সাথে সাথে যে স্বার্থ, টাকার পরিমাণ আর দূরত্বও বেড়ে যায় তা এখন উপলব্ধি করছি। যদি জানতাম তাহলে হয়তো তোদের, নিজে বড়ই হতাম না। অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি, পারলে মাফ করে দিস।
আজ ১৬/১০/২০২০ই তাং। কাজের ছেলে মিরাজ ফিরে এসেছে। বাগানের কাজ কর্ম শেষ করে রান্না করে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে জানালার সামনে। ইশশ, বাঁটির ভাত, তরকারিগুলো পঁচে গিয়েছে। কি বিশ্রী গন্ধ আসছে! প্লেটের ভাতটুকুও রয়েছে, একেবারে পঁচে গেছে। ভাত-তরকারি পঁচা গন্ধের পাশাপাশি আরো একটা ঝাঁপসা পঁচা গন্ধ নাকে লাগছে, মৃতদেহের।
#দূরত্ব
#আরিয়া_সুলতানা

গল্পের নাম: নিজের কাছে চিঠি
প্রিয় আবেগী কিশোরী
যখন তুমি এই চিঠিটা পড়ছো তখন তোমার বয়স কত বলতে পারো? মাত্র ১৭ বছর। পৃথিবীর পাথুরে বুকে তুমি তোমার কচি পায়ে টলমল করে দাড়িয়ে আছো। তোমার কোমল গায়ে এখনো বাস্তবতার আচড় পরেনি। শুধু আবেগের হাল্কা হাওয়া তোমায় ছুঁয়ে গেছে। আর তাতেই তুমি নিজেকে অজানার পথে ভাসিয়ে দিলে? ভাবলেও না একটি বার কোথায় গিয়ে থামবে?
এখন তুমি নিজের রুমে বসে ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছো আর ভাবছো তোমার মায়ের বলা কথা গুলো নিয়ে। হয়তো পাশের রুমে বসে থাকা মহিলাটি তোমার মা না হলে এতকিছু মুখ বুজে সহ্য না করে প্রতিবাদ করতে। তবে তা সম্ভব হবে না। তাই শাসনের শিকল হতে বেড়িয়ে এবার মুক্তির জোয়ারে গা ভাসাতে যাচ্ছো তুমি।
কিন্তু দাড়াও। একটু থামো। কিছুক্ষণ পরেই হয়তো তুমি তোমার তরুন প্রেমিকের হাত ধরে অজানার পথে পারি জমাবে। তবে তার পর কি হবে তা কী জানো? না তো। তবে শোনো-
তুমি যেই প্রেমিকের হাত ধরে আজ নতুন পথে হাঁটতে চাও সে ই তোমার হাত ছেড়ে যাবে। দুবছরের আবেগের সম্পর্ক রক্ষা করতে যেই মায়ের সাথে ১৭ বছরের মায়া, মমতা আর ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করলে, সেই মা ই তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমার মঙ্গল কামনা করে গেছেন।
তার বুকে পাথর চাপা দিয়ে তুমি চলে গেলে সেই মা ই তোমায় হন্নে হয়ে খুঁজেছে। অপেক্ষা করেছে তোমার ফিরে আসার। তবে সে বোঝা সইতে না পেরে চলে যায় না ফেরার দেশে। তোমায় তখনো কেউ কোথাও খুঁজে পায়নি। তবুও তোমার মায়ের মৃত্যুর খবর তোমার কাছে পৌছানোর জন্য সবাই অনেক চেষ্টা করবে কিন্তু পারবে না। কারন তুমি যোগাযোগের সকল পথই বন্ধ করে দিয়েছো। তবে তোমার ভুল ভাঙ্গতে বেশি সময় লাগেনি।
দেড় মাস পর তুমি আবার এ বাড়িতে ই ফিরে আসবে। কিন্তু ততদিনে তোমার মায়ের মাটির দেহ মিশে গেছে গোরস্থানের মাটির সাথে আর সেই সাথে এই বাড়িতে ঢোকার ফটকও তোমার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে চিরতরে। বন্ধ দরজায় কড়া নেড়ে এবার তুমি ফিরে যাবে সেই সত্যের দিকে যা কখনো তুমি দেখনি। সারাজীবন এই ভুলের মাশুল তোমায় দিয়ে যেতে হবে।
আজ তুমি তার হাত ধরে পালিয়ে যাবে ভেবেছো তুমি কী সেই ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়েছো? হ্যা! তুমি সেখানে দেখেছো শুধুই আবেগ। তবে তা যে মিথ্যা তা তুমি জানো না। আর তুমি এটাও জানো না সেই আবেগের আড়ালে কত রুক্ষ দৃষ্টি তাকিয়ে আছে তোমার দিকে।
তেই মা আজ তোমায় মারলো, তুমি কী তার চোখের দিকে তাকিয়েছো? কী দেখেছো? শুধুই শাসন? তবে তা যে ক্ষনিকের তা তুমি জানো না। আর তুমি এটাও জানো না সেই শাসনের আড়ালে কতটা স্নেহ, মমতা মাখা দৃষ্টি তাকিয়ে আছে তোমার দিকে।
একটা বার তাও নিজের মায়ের ঘরে। গিয়ে বলো " মা আমার ভুল হয়ে গেছে, আমায় ক্ষমা করে দাও" তখন দেখবে শাসনের চশমা পরা চোখ দুটো কী করে ভালোবাসার জলে ভিজে যায়। দেখবে যেই হাত আজ তোমায় আঘাত করলো, কি করে সেই হাত তোমায় আবার আদর করে বুকে টেনে নেয়।
ভুল কোরোনা কিশোরী, ভুল করোনা। সব ভুল সুধরে নেয়া যায় না।
আজ তুমি তোমার প্রেমিকের বুকে মাথা রেখে স্বর্গ সুখ খুঁজতে চাও? কিন্তু তোমার স্বর্গ মে তোমার মায়ের পায়ের নিচেই আছে তা কি দেখছো না?
ইতি
আমি কে তা নাহয় পাঁচ বছর পরই জানবে
চিঠি লেখা শেষ। কাগজটা ভাঁজ করে খামে ঢুকালাম। খামের উপর বাস্তবতার টিকেট লাগিয়ে চিঠিটা সময়ের ডাকবাক্সে ফেলে দিলাম। এবার শুধু অপেক্ষা, কখন একজন আলোর ডাকপিয়ন এসে চিঠিটা সঠিক প্রাপকের হাতে পৌঁছে দেবে। যাতে আর কেউ তার ফুলের মতো জীবনটাকে আমার মতো অকালে বোটাচ্যুত না করে।
আমার কাজ শেষ। এবার আমি আবার বাস্তবতার বেড়ি পরে ভুলের মাশুল দিতে মহাকালের অন্ধকার পথে হেঁটে চললাম।

সালফার_৫৯
এক রাতের মধ্যেই সিফাতের উচ্চতা প্রায় ১ ফুট কমে গেছে। হঠাৎ করে খাটো হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ঘটেছে ঘুমের মধ্যে। কাল রাতে সিফাতের বিছানায় যেতে দেরি হয়। পড়াশোনা শেষ করে সে শুতে গিয়েছে রাত একটার পর। বিছানায় শোয়া মাত্রই চোখে রাজ্যের ঘুম। গভীর ঘুম ছিলো বলে ভোর রাতেই ঘুম ভেঙে যায় তার। ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য খাট থেকে নামতে যাওয়ার সময়ই সিফাতের মনে হলো কিছু একটা ঠিক নেই। সে খাটে বসা অবস্থায় পা দিয়ে মেঝে ছুঁতে পারছে না। সিফাত ভ্রূ কুঁচকে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। পা জোড়া কেমন যেন ছোট ছোট লাগছে।
ফার্মেসীর নাম ‘দাওয়াই খানা’। নামটাতে কবিরাজি ভাব প্রকট হলেও ফার্মেসিটা বেশ আধুনিক। দোতলা একটা বিল্ডিং এর পুরোটা জুড়েই এই ফার্মেসি। যেন ছোটখাটো কোন ক্লিনিক। শহরের অপর প্রান্ত থেকেও লোকজন প্রায়শই এখানে ছুটে আসে প্রয়োজনীয় ওষুধের খোঁজে। স্থানীয় ডিসপেনসারিগুলোতে কোন ওষুধ খুঁজে পাওয়া না গেলে মানুষ তেমন একটা চিন্তিত হয় না। কারণ তারা জানে- দাওয়াই খানায় গেলেই ওষুধ পাওয়া যাবে। কেউ দাওয়াই খানায় অষুধ কিনতে এসে খালি হাতে ফিরে গেছে এমনটা কখনো শোনা যায়নি। কাজেই কেউ কেউ ধারণা করে বসে আছেন- এই ফার্মেসিতে নেই এমন কোন ওষুধ সম্ভবত তৈরিই হয়নি।
রাত এগারোটা। দাওয়াই খানার মালিক ডা. মানিক বাবু নিচতলা থেকে দোতলায় চলে এলেন। এখন তেমন একটা ভীড় নেই। তবে তিনি জানেন এমনটা থাকবে না। রাত বাড়ার সাথে সাথে ওষুধ কিনতে আসা ক্রেতার সংখ্যাও বেড়ে যাবে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন- রাতের বেলাতেই রোগীদের যন্ত্রণা বেশি হয়। সারা দিন ঘুমন্ত থেকে রাত হলেই যেন অসুখেরা যেন জেগে ওঠে। রোগীর কাছের মানুষকে ছুটে যেতে হয় ওষুধের খোঁজে।
দোতলায় মানিক বাবুর নিজের একটা রুম আছে। এই রুমে অন্য কেউ আসে না। তিনি রুমে না থাকলে সেটি তালাবদ্ধ থাকে। মানিক বাবু রুমটা তালাবদ্ধ করে চাবি নিজের কাছেই রাখেন। “দাওয়াই খানায়” অতিরিক্ত একজন ডাক্তার এবং পাঁচ জন সেলসম্যান থাকলেও তারা কখনোই এই রুমটিতে ঢুকতে পারেনি। দালানের ভেতরে হলেও মানিক বাবুর এই রুমটা যেন অগম্য কোন জায়গা। সবার ধারণা মানিক বাবু রুমটাতে গোপনীয় কিছু করেন। সেটা নিয়ে সুযোগ পেলেই সবার মধ্যে আলোচনা হয়। বরাবরই সেই আলোচনার সমাপ্তি ঘটে সমালোচনায়। কেউ কেউ অভিযোগ তোলে মানিক বাবুর হয়তো মেয়েলি কোন ব্যাপার আছে। কারণ তার রুমের পেছন থেকেই একটা লোহার সিড়ি সোজা নেমে গেছে রাস্তায়। সেই সিড়ি দিয়ে সহজেই কোন মেয়ে মানুষ উপরে নিয়ে আসা সম্ভব। যদিও কেউ কোনদিন এমনটা দেখেনি, তবু সন্দেহের তীর ছুড়তে কারোরই কোন রকম দ্বিধা সংকোচ হয় না। এই গুপ্তকক্ষ নিয়ে কোন প্রশ্ন করা হলে, মানিক বাবু হেসে জবাব দেন। স্বাভাবিক ভাবে বলেন, “পড়াশোনা করি। বিদেশি ডিগ্রি আছে বলেই আমি যে চিকিৎসা বিদ্যার সব জেনে বসে আছি এমন তো নয়। অনেক পড়াশোনা করতে হয়। নতুন বইয়ের পাশাপাশি পুরাতন বইও পড়ি।”
মধ্যবয়সী এই লোকটার কথা সবাইকে ধাঁধায় ফেলে দেয়। কেউ তার কথা বিশ্বাসও করতে পারে না। আবার অবিশ্বাসও করারও কোন কারণ নেই তাদের কাছে। নিরিবিলিতে বই পড়ার জন্য নিজের একটা রুম থাকতেই পারে। তবে তিনি কাউকে তার রিডিং রুমে ঢুকতে দিচ্ছেন না কেন- এই প্রশ্নটাই ভাবিয়ে তোলে সবাইকে।
দোতলায় এসেই মানিক বাবু নিজের রুমে ঢুকে গেলেন। ভেতরে ঢুকেই সশব্দে দরজা লাগিয়ে দিলেন তিনি। সেই উচ্চশব্দ উপরে কর্তব্যরত সেলসম্যানের ভাবনার কারণ হলো না। সে এহেন দৃশ্য দেখে মোটামুটি অভ্যস্ত।
ভেতরে খুব বেশি সময় রইলেন না ডাক্তার। একটু পরই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন তিনি। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলেন নিচ তলায়। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “আজ কোন কুষ্ঠ রোগী এসেছিলো ওষুধ কিনতে?”
সেলসম্যানরা এই প্রশ্নে অবাক হলো। দেশ থেকে অনেক আগেই কুষ্ঠরোগ বিদায় নিয়েছে। আর রোগী থাকলেও তারা চলে যাবে কুষ্ঠ হাসপাতালে। এখানে আসবে কেন? তাদের বিস্ময়ভরা দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মানিক বাবু বুঝে গেল এমন কোন রোগী আসেনি। তিনি দ্বিতীয় প্রশ্ন ছুড়লেন, “গরিলার মতো মোটা কোন রোগী কি এসছিলো আজ?”
কর্মচারীদের বিস্ময়বোধ আরও বাড়ল। এমন অযাচিত প্রশ্ন কেন করা হচ্ছে তারা বুঝতে পারছে না। অথচ মানিক বাবু এমনভাবে প্রশ্ন ছুড়ছেন যেন গরিলার মতো দেখতে কোন রোগী সত্যিই আসার কথা ছিল। এবারেও জবাব না পেয়ে মানিক বাবু বুঝে গেলেন এমন কোন রোগীও আসেনি। তিনি কিছু সময় নিচ তলাতেই পায়চারি করলেন। তারপর হন্তদন্ত হয়ে ফিরে গেলেন দোতলায়। এবারেও সশব্দে দরজা লাগানো হলো।
সিফাত নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার একবার মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। সে নিজ গায়ে চিমটি কাটল। ব্যাথা পেল সাথে সাথেই। এতেও সে নিশ্চিত হতে পারলো না যে এটা স্বপ্ন কি-না। সিফাত দ্রুত জুতা থেকে মোজা বের করে নাকে ধরলো। উৎকট গন্ধটা ভুরভুর করে চলে গেল মস্তিষ্ক পর্যন্ত। সিফাত জানে স্বপ্নে কোন কিছুর ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। এবারে সে নিশ্চিত হলো এটা স্বপ্ন নয়। সে সত্যিই সত্যিই এক ফুট খাটো হয়ে গেছে। তাও আবার এক রাতের মধ্যেই। আতঙ্কে জমে গেল সে। মানুষের জীবনে অলৌকিক ঘটনা ঘটে। তাই বলে এমনটাই হতে হলো তার সাথে!
সিফাত আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। শুধুমাত্র তার চুল দেখা যাচ্ছে। মুখের পুরো অংশটাই আয়নার নিচে পড়ে গেছে। অথচ আগে মাথা থেকে বুক পর্যন্ত দেখা যেতো। সিফাতের উচ্চতা এমনিতেই অল্প। যদিও সে কখনো মেপে দেখেনি তবে তার ধারণা সেটা পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির বেশি ছিলো না। এখন সেটা গিয়ে ঠেকেছে চারফুটে।
সিফাত ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলো। শোকেজের গ্লাসটা কালো হওয়াতে এটা আয়নার মতো কাজ করে। সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়। সিফাত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার সারা শরীর দেখতে লাগলো। বুঝতে চেষ্টা করল, শুধু কি উচ্চতাই কমেছে না-কি আরও ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে তার জন্য। বেশ কিছুক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে নিশ্চিত হলো – অন্য কোন শারীরিক পরিবর্তন হয়নি। হাত,পা, নাক-মুখ আগের মতোই আছে।
সিফাত প্রথমে ভেবেছিলো তার পা দুটোই বোধহয় ছোট হয়ে গেছে। কিন্তু সে বিস্ময় নিয়ে লক্ষ্য করলো পা আগের মতোই আছে। কোমড়ের উপরের অংশেরও মনে হচ্ছে তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। তাহলে উচ্চতা কমে গেল কিভাবে?
ফাঁকা বাড়িতে বেশ কিছুক্ষণ পায়চারি করার পর সিফাত বিষয়টা ধরতে পারলো। তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গই সমানুপাতিক ভাবে ছোট হয়ে গেছে। এজন্য সে পার্থক্যটা চট করে ধরতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে হাত,পা আগের মতোই আছে।
এই ধারণা ঠিক কি-না পরীক্ষা করার জন্য সিফাত চোখে সানগ্লাস বসালো। তারপর মাথা সামান্য নিচু করতেই সানগ্লাসটা নিচে পড়ে গেল। অর্থাৎ তার ধারণাই ঠিক। তার মুখের আকৃতিও কিছুটা ছোট হয়ে গেছে। সেটা এতটাই সূক্ষ্ম যে চট করে বোঝা যাবে না।
সিফাত দ্রুত ঘরের সমস্ত জানালায় পর্দা টেনে দিল। পাশের বাসার ছাদটা ঠিক তার জানালা বরাবর। অতি উৎসাহী কেউ জানালা দিকে উঁকি দিলেই তার চারফুট উচ্চাতার শরীরটা দেখতে পাবে। দরজা জানালা সব বন্ধ করে সিফাত বেড রুমে ফিরে গেল। ব্রেকফাস্ট করার কথা তার মনে রইলো না।
ধীরে-সুস্থে খাবার খাওয়ার মতো অবস্থায় সে নেই। সে কোন কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছে না। এক ধরনের অস্থিরতা তাকে তাড়া করতে লাগলো। ভাগ্য ভালো এই ফ্ল্যাটে সে একা থাকে। নইলে হুট করে কেউ চলে আসলে বিপদ ঘটতো।
এই মুহুর্তে কেউ এসে যদি তার এই অবস্থা দেখে ফেলে সে নিশ্চিত ভয় পাবে। আতঙ্কিত কন্ঠে বলবে, “তুমি ছোট হয়ে গেলে কিভাবে?”
তখন সিফাত কী জবাব দেবে! তার জানা নেই।
সিফাত সেলফোন তুলে নিল। শবনমকে একটা ফোন দেয়া যায়। ওর সাথে কথা বলে যদি কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়।
ফোন ধরেই শবনম বলল, “কী ব্যাপার স্যার, আজ এতো সকালেই মনে পড়লো যে?”
“এমনি, সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেল। ভাবলাম তোমাকে ফোন দেই।”
“জ্বর কমেছে তোমার?”
“হ্যাঁ জ্বর নেই।”
“সত্যি করে বলো। ওষুধ খেয়েছো তো? তুমি তো আবার অষুধ খেতে চাও না।” শবনমের কন্ঠে উৎকন্ঠা প্রকাশ পায়।
সিফাত বলল, “কাল দুপুরেই খেয়েছি ওষুধ। জ্বর নেই। ঠিক আছি আমি।”
“বাট তোমার গলা কেমন ভার শোনাচ্ছে। কী হয়েছে বলোতো?”
“কিছু হয়নি। বললাম তো ঠিক আছি আমি।”
“নাহ, কিছু একটা হয়েছেই। তোমার গলা কাঁপছে। সত্যি করো বলো তো কী হয়েছে?”
“তোমার হাইট যেন কত?”
এমন প্রশ্নে শবনম চমকে উঠলো। অবাক হয়ে বলল, “এসব কী উল্টাপাল্টা প্রশ্ন। আমাদের তিন বছরের রিলেশনশিপ। তুমি তো জানোই আমার হাইট কত।”
“ভুলে গেছি। বলো।”
শবনম বুঝে গেল সিফাত কী চাচ্ছে। সে কথাবার্তা অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাবে এখন। হাইট দিয়ে শুরু করলেই একে একে অন্যকিছু জানতে চাবে সে।
যতটা সম্ভব গলায় মধু ঢেলে শবনম বলল, “পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। এখন আর কী জানতে চাও?
সিফাত বলল, “আচ্ছা ধরো কোন কারণে আমার হাইট চার ফুট হয়ে গেল। তুমি আমাকে বিয়ে করবে না?”
“মানে কী? সকাল সকাল এসব আবোল তাবোল বকছ কেন? তোমার কী হয়েছে হঠাৎ?”
“নাহ কিছু না। আচ্ছা ফোন রাখি। পরে কথা হবে।” শবনম আর কিছু বলার সুযোগ পেল না।
ফোন রেখে সিফাত ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে, ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার আগ মুহুর্তে সে আবারও আয়নার দিকে তাকালো।
এবারে সে স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রবল বিস্ময় নিয়ে সে দেখতে পেল, এখন তার পুরো চুলও দেখা যাচ্ছে না। আঙ্গুলে ভর দিয়ে উঁকি দিলেই কেবল চুলের অংশ দেখা যাচ্ছে। এটার অর্থ এই দাঁড়ায়- এই অল্প সময়ের মধ্যেই সে আরও খানিকটা খাটো হয়ে গেছে। সিফাত দৌড়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসলো।
হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো সে। কিছুক্ষণ পর কান্নার আওয়াজ কমাতে হলো তাকে। নইলে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষ ছুটে আসবে। কেউ আসলে সে তার সমস্যার কথা বলতে পারবে না। সে এমন সমস্যায় পড়েছে সেই সমস্যার কথা কাউকে বলা যায় না।
সিফাত আবারও ফোন তুলে নিল। বাবা গ্রামে থাকে। বাবাকে সে তার সমস্যার কথা বলবে। বাবার কাছে নিশ্চয়ই এই সমস্যার কথা বলা যায়। সে নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবে।
“আব্বা, আমি অনেক বড় একটা বিপদে পড়ে গেছি।” কান্নার ফাঁকে ফাঁকেই কথাগুলো বলল সিফাত।
টেলিফোনে ছেলের কান্না মাখা কন্ঠস্বরটা তীরের মতো বিধে গেল মফিজ উদ্দিনের বুকে।
সে কাতর গলায় বলল, “তোর কী হইছে বাপজান? কান্দোস ক্যান।”
“অনেক বড় বিপদে পড়ছি আব্বা।”
“কী বিপদ। ক আমারে।”
সিফাত কিছুই বলতে পারলো না। মফিজ উদ্দিনের বুকের ব্যাথাটা বাড়তেই থাকল। সে লজ্জা ভুলে বলে ফেলল, “কী বিপদ ক আমারে। পলায়া বিয়া কইরা ফেলছোস? না-কি পুলিশ তোরে খুঁজে? যাই হোক চিন্তা করিস না। আমি ঢাকা আসতাছি। সব ঠিক হইয়া যাইবো।”
“এইসব কিছু না আব্বা।”
“তাইলে কান্দস ক্যান? হইছে টা কী?”
“আমি ছোট হইয়া যাইতাছি আব্বা।”
এবারে কান্নার স্বর আবারও বেড়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর কান্নার বেগ কমলে সিফাত সবকিছু খুলে বলল। মফিজ উদ্দিন ছেলের সাথে কথা বলে ধাঁধায় পড়ে গেলেন। যদিও ঘটনাটা অসম্ভব কিন্তু কোন ছেলে বাবার সাথে এমন বিষয় নিয়ে রসিকতা করবে না।
মফিজ উদ্দিন শহরের উদ্দেশ্য রওনা দিলেন। ( চলবে)...
- #বাস্তবতার_শিকল
পর্ব :- ০৩
লেখিকা :- #তাসনিয়া_আলী 🍁
আমার মেয়ের নামটা তার দাদীমা রেখেছিলেন( সুবাইতা বিনতে রাজীব) ডাকনাম জাইমা। আমি অনেক স্পৃহা সহকারে অত্যাধুনিক নাম রাখতে চেয়েছিলাম কিন্তু আম্মার ভালোবাসার কাছে আমি নত স্বীকার করে আমার মেয়ের নাম নিজের মতো রাখতে পারিনি।
তার লাশের পাশে সুবাইতাকে কোলে নিয়ে বসে সেইদিনের কথা আমার অনবরত মনে হচ্ছে । পুরো পাথর হয়ে গেছি আমি, এই মানুষটাকে এতটা দিন আগলে রেখেছি কিন্তু তার শেষ সময় আমি পাশে থাকতে পারলাম না। এই মানুষটাকে প্রথম থেকেই আমি বেশি ভালবাসতাম । সে নিজেও আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন, নিজেকে খুব বেশি অসহায় লাগছে। তার লাশের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো তিনি অভিমানি ভঙ্গীতে আমার দিকে তার সেই তিক্ত কথা গুলো বলছেন,
" ছোটো বৌমা গো, তুমি আজকে ছিলে না কেন? তুমি থাকলে আমার বাথরুমডা অমন পিচ্ছিল হতো না, আর আমি পরে মরতাম ও না।"
আমার স্বামীকে কেউ সান্তনা দিতে পারছেন না । রক্তিম কাঁদছে না, কিন্তু সে পাথর হয়ে গেছে। মাথায় হাত চেপে মায়ের লাশের সামনে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বাড়িতে আমার অন্য ভাসুর, জা, ননদরা কান্নায় ভেঙে লুটিয়ে পরেছেন। লাশ বাড়ি থেকে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আমার বড়ো ভাসুর চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
" মারে, তুমি এইভাবে চলে গেলে। তুমি আমার কাছে থাকলে কোনোদিনও এত নির্মম মৃত্যু পেতে হতো না তোমার। তোমার আদরের শিক্ষিত বউয়ের ঘরে দুটো ভাতের যে বড়ো দাম, সেইটাই তুমি বুঝলে না। চলে গেলে আমাদের ছেড়ে। "
•
মরা বাড়িতে শোক পালনের থেকে আমাকে নিয়ে কুরুচি পূর্ণ বক্তব্যের আসরটা বেশি ভালো জমলো। পৃথক কিছু আসরে কিছু সময় চিৎকার করে কান্নাকাটি করার পর শোকাহত মানুষটির মুখ থেকে অনর্গল আমার সংসারে আমার শাশুরির অবস্থানের গল্প রচিত হতে থাকলো, এবং সান্তনা প্রদানকারী ব্যক্তিরা তিলের তাল রূপটি অন্তরে ধারণ করে আমার বিরুদ্ধাচরণ করতে লাগলেন ।
•
আমার পাশে আমার অসহায় মা সুবাইতাকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। আমি নামায আদায় করে আমার শাশুরির আত্মার মাগফেরাত কামনা করে উঠে দেখি মা আমার দিকে অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে আছেন।
- কী হলো আম্মু? এইভাবে কী দেখছো?
- মারে, এই বাড়িতে তোর অবস্থান খুব নড়বড়ে। আমি মা, আমাকেও কোনোদিন কিছু বলিসনি। আজকে মানুষ আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে অনেক কথা বললো। আমার তো তোর মা, তোকে আমি চিনি । আমি কিভাবে সহ্য করলাম সেইটা আমি জানি। আর এতকিছু সহ্য করে তুমি কিভাবে এইখানে পরে আছিস? আমার সাথে চল। জামাই থাকেনা এইখানে, তুমি এদের সাথে একা কিভাবে জীবন কাটাবি? আমার কাছে চল, না হয় মানুষের বাড়িতে কাজ করে হলেও তোর কোন অভাব রাখবো না। কিন্তু আমি আমার মেয়েকে এইভাবে দেখতে পারবো না। হাতে ধরে তোকে আমি বলি দিয়ে দিছি, আটকাতে পারিনি কোনো কিছুর মূল্যেও ।
- মা আমি অনেক সুখী। আমার স্বামী অনেক ভালো মানুষ। তার পর্যাপ্ত যত্নে আমি এইখানে অনেক ভালো আছি। আমার শাশুড়িও অনেক ভালো মানুষ ছিলেন। আর যাদের কথা শুনে তুমি কষ্ট পাচ্ছো তারা দুদিনের অতিথি। তাদেরকে আমার পরিবারের অভ্যন্তরীণ সদস্য আমি মনে করি না যে তাদের কথা গায়ে লাগিয়ে আমি রক্তিমের হাত ছেড়ে দিবো। আর সব থেকে বড়ো কথা রক্তিম মা ছাড়া পুরো অচল। ওর এই দুনিয়াতে আমি ছাড়া আপন আর কেউ নেই, আর থাকলেও না। আমি এতবড়ো অমানবিক হতে পারবো না ওর সাথে। আমাকে ওর দরকার, আমার পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করতে হবে তাকে । তুমি আমার জন্য দোয়া করো আমি যেনো শক্ত হাতে সব কিছু আয়ত্ত করতে পারি ।
.
.
মা ওইদিন অনেক কান্নাকাটি করছিলেন, এই বাড়িতে আমার অবস্থান দেখে তিনি নিজেই হতভম্ব। কিন্তু মায়ের এত উদ্ধিগ্ন হওয়াতে আমি কিছুই মনে করিনি। আমার সংসারে ভাঙনের আভাস দেখা দিতেই পারে, সেইটা আমাকেও প্রতিহত করতে হবে। এমনটাই ভেবে প্রবল মনোবল চাঙ্গা করে নেমে পড়লাম এক নতুন ধরনের জীবন যুদ্ধে। আমি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম, এইখানে রক্তিমের উপস্থিতিও আমি পাবো না। তেমনটাই হলো, রক্তিম মনে হলো এক দমকা হাওয়াতে পুরোপুরি ভেঙে লুটিয়ে পড়লো। সে মুখে কিছু না বললেও আমি ভালোভাবেই বুঝতে পারলাম, মায়ের চলে যাওয়াতে সেও মোটামুটি ভাবে আমাকে জড়িয়ে ফেলেছে। অন্য দশজন যেমন বিষয়টা ধারণ করেছে, রক্তিমের ও মনে হচ্ছে তার মায়ের মৃত্যুর জন্য অনেকটাই আমার অন্যায় আবদার জড়িত। চোখের নিমেষেই আমার তার সম্পর্কটা বন্ধুত্বের থেকে শুধু জৈবিক চাহিদা সম্পূর্ণ স্বামী স্ত্রীতে পরিণত হলো। কিছুদিন বাদেই মা হারানো শোক বুকে চেপেই রক্তিম তার কর্মস্থলে ফিরে গেলো। আমি থেকে গেলাম শশুরবাড়ি নামক এই অন্ধকার পুরীতে একা আমার মেয়েকে নিয়ে, প্রচন্ড একা। এই সময়টাতেই আমি পুরোপুরি ভাবে আমার অস্তিত্বের অবনতির কথাটা উপলব্ধি করতে পারছিলাম। আসলে একটা মেয়ের জন্য শশুর বাড়ির ধাক্কা সামলানো যে খুব সহজ বিষয় না সেইটা উপলব্ধি করতে আমার খুব অল্প সময় লেগেছিল। জীবন যুদ্ধে নিজেকে মানিয়ে নিতে নিতে অনেক কিছু আমাকে হারাতে হলো। লেখাপড়ার বিষয়ে ওইদিন পর থেকে আমি আর কখনও ভেবেও দেখিনি।
"যেইখানে টিকে থাকাটাই অস্বাভাবিক, সেইখানে নিজের সত্তার বিকাশ ঘটানোর ইচ্ছাটা নেহাত দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছুই না। "
সময় যেতে থাকলো, বাড়িতে সবার পরিবেশ সাবলীল। যে যার মতো নিজেদেরকে গুটিয়ে নিলো। মা হারানো শোকটাও সবাই কাটিয়ে উঠলো। আমি আমার সুবাইতাকে নিয়ে রয়ে গেলাম একা এই বাড়ির প্রান্তে। আসলে মা হওয়ার একটা সুবিধা আছে, বয়সে আমি যতই ছোটো মা হইনা কেনো, আমার বাচ্চার মুখের দিকে তাকালে রাজ্যের প্রতিটা জিনিস আমার কাছে তুচ্ছ লাগতো।
কিসের দুঃখ? কিসের কষ্ট? কিসের না পাওয়া অভিযোগ? আমি একজন মা। আমার সামনে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট সুখময় নিষ্পাপ হাসির ভান্ডার আছে। আমার কোনোই দুঃখ নেই, তাকে আগলে রেখেই আমি হাজার বছর অনায়াসেই কাটিয়ে দিতে পারবো। তেমনটাই দিন চলছে, আমি পুরো একা আমার ভাগে পাওয়া দুটি ঘরের মধ্যে আমার ছোট্ট সোনাকে নিয়ে। মাসে মাসে আমার ব্যাবহৃত মোবাইল নাম্বারে টাকা চলে আসে। খাওয়া-পড়াতে কোনো সমস্যা হচ্ছিলো না। গায়ে বল ছিল, মোটা ভাত মোটা কাপড়ে দিন চলে যাচ্ছিলো। আম্মা মারা যাওয়ার পর রক্তিম টানা ৪ মাস বাড়ি ফিরলো না। ফোনে কল দিয়ে শুধু ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে, বাবুর কথা শুনে সেইটাও খুব অল্প সময়ের জন্য। এইভাবে অতিবাহিত হচ্ছিলো আমার জীবন। বাড়িতে কেউ আমার সাথে তেমন কথা বলে না, কিন্তু সুযোগ পেলে কথা শোনাতে কেউ ছাড় দেননা। পাড়া প্রতিবেশী এসেও আমাকে নিয়ে কথা তোলে, হাসাহাসি করে। আমার সেই আগের সমস্যাটা আবার আমাকে মানসিক অশান্তি দেই। দূরের কথা শোনার শক্তি একটু বেশিই আমার মধ্যে কাজ করে। নিজের উপর প্রচুর রাগ হয়, কেনো আমি এতটা স্পষ্ট মানুষের খারাপ কথা গুলো শুনতে পাই? এমন কথা জিজ্ঞেস করে সারাক্ষণ আমার মন। কিন্তু দিনে দিনে এগুলো আমার দৈনন্দিন সঙ্গীতে পরিণত হলো।
দিন কাটতে লাগলো, আমার মেয়ের বয়স ৫ মাস তখন। হঠাৎ একদিন ভোর রাতে আমার মোবাইলে একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসলো। আমি মাত্র নামায শেষ করে উঠে এসে ফোন ধরলাম। ঐপাশ থেকে অচেনা এক কণ্ঠে বলে উঠলো,
" আসসালাময়ালাইকুম, আপনি কি মিসেস রক্তিম বলছেন ? "
" ওয়ালাইকুম্যাসালাম! জি আমি বলছি। আপনি কে বলছেন? "
" আমি স্যারের সহকর্মী বলছি, মনোয়ার হোসেন । আসলে ম্যাডাম আপনাকে একটা কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছি। "
কথাটা শুনেই আমার ভেতরে একটা ভয় কাজ করতে লাগলো । আমি একটু বিব্রত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
" জি বলুন। কী বলতে চান? "
' ম্যাম, আসলে রক্তিম স্যার গতকাল রাতে মোটর সাইকেল অ্যাকসিডেন্টে করেছেন । আপনি অনুগ্রহ করে আজকের মধ্যেই এইখানে চলে আসার চেষ্টা করুন। স্যারকে আমরা হসপিটালে ভর্তি করিয়েছি। আপনি দ্রুত আসার চেষ্টা করুন, আর এই নাম্বারে যোগাযোগ করলেই সমস্যা হবে না । "
আমি তাৎক্ষণিক নিজের ভেতর থেকে হারিয়ে গেলাম । ফোনটা রেখেই দৌড়ে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম বড়ো ভাসুরের ঘরের বারান্দায়। আমার চিল্লাচিল্লিতে তাদের সকলের ঘুম ভেংগে গেল। সবকিছু শুনে তারা আমাকে সান্তনা দিতে লাগলেন। তারপর কিছু সময় পর আমাকে নিয়ে রওনা হলো আমার বড়ো ভাসুর এবং ননদের ছেলে। সাথে আমার মেয়ের খাবারের দ্রব্য এবং ওর প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী নিয়ে রওনা হলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে । সেইদিনই আমার জীবনের প্রথম ঢাকা যাত্রা ছিল। আগে হাজারো ইচ্ছা থাকলেও কখনো ঢাকা যাওয়া হইনি আমার, এই প্রথম পাড়ি জমাচ্ছি। কিন্তু ঘুরতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। আমার স্বামীর বিপদে, আমার স্বামীর রক্ষাত্রে আমি প্রথম ঢাকা শহরে পদার্পণ করলাম।
সিএনজি মেডিকেল এরিয়াতে ঢুকতেই আমার চোখে খুব স্পষ্ট ভাবে পড়লো, ( ঢাকা মেডিকেল ) । অনেক বড়ো সাইন বোর্ড এই লেখাটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছি আমি । হঠাৎ আমার ভাসুর বললেন,
" দ্রুত নামো। আমরা চলে এসেছি, এইখানেই ওরা ঠিকানা দিয়েছে। ওই লোকের নাম্বারটা দাও।"
আমি দ্রুততার সাথে নাম্বার বের করে দিলাম। আমার ভাসুর সেই লোকটিকে ফোন দিলেন এবং অবশেষে আমরা রক্তিমের সামনে উপস্থিত হলাম। আসলে জীবনটা কখনোই সিনেমাটিক হয় না। হ্যাঁ, সেইটাই ঠিক। আমার জীবন কখনোই সিনেমাটিক হবে না সেইটাও ১০০ ভাগ সত্য। আমার প্রত্যাশিত মানুষটি শুয়ে আছে মেডিকেলের তিন তলার সিড়ির নিচে। তাকে ওইখানে দেখে আমার ভাসুর বলে উঠলেন,
" একটা ওয়ার্ড এও কি জায়গা হলোনা ওর জন্য? কিসের ব্যবস্থা করেছেন আপনারা কালকে থেকে? "
" ভাই আপনি রেগে যাবেন না । এই জায়গাটায় ভালো ওনার জন্য। কেবিন পাওয়া দুষ্কর, ওয়াডের যা অবস্থা, তার থেকে এইটাই নিরাপদ। তবুও আমরা চেষ্টা করছি আজ কালকের মধ্যে কেবিনের ব্যবস্থা করার জন্য। "
তারা কথোপকথন অব্যহত রাখলো, আমি অপলকে চেয়ে আছি রক্তিমের অসাড় দেহের দিকে। পুরো শরীর সাদা গজে আবৃত থাকলেও তাকে চিনতে আমার একটুও কষ্ট হলো না। হ্যাঁ, সেই মানুষটি। এইতো সংসারের টাকা থেকে কিছু টাকা জমিয়ে তাকে একটি আংটি উপহার দিয়েছিলাম আমি, সেইটা তার হাতে আছে। তার চোখের কোণের ছোট্ট তিলটি ও আমার চোখে পড়লো। কিন্তু ঠোঁটটা খুব বেশি বিধঘুটে লাগছে। ছোপ ছোপ রক্তের চিহ্ন এঁকে আছে। তাকে দেখে আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। আমার সুবাইতাকে কোলে নিয়েই তার দিকে অগ্রসর হলাম, প্রবল কান্নায় ভেংগে গিয়ে। পাশে থাকা এক নার্স অনেক খারাপ ব্যবহার করে আমাদেরকে সেইখান থেকে সরিয়ে দিলো। তার যথাযথ বিশ্রামের প্রয়োজন। অনেক রক্ত ক্ষরণ হয়েছে। লোকজনের ভিড় কম হলেই ভালো হবে। ছন্নছাড়া ভাবে সেইখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হলো আমাকে। পাশের করিডোরে এক বেঞ্চের উপর গিয়ে বসলাম। তখনও আমি কান্না করছি, আর মধ্যে আমার মেয়ে ক্ষুধার তাড়নায় কান্না করতে লাগলো, তাকে আমার খাওয়ানোর দরকার কিন্তু আমি কখনোই তাকে মানুষের মধ্যে খাওয়াতে অভ্যস্ত নই। আমাকে এমন অবস্থায় দেখে একজন মহিলা আমার দিকে এগিয়ে এসে আমাকে নিয়ে তার স্বামীর কেবিনে জায়গা করে দিলেন। সেইখানেই কোণায় বসে আমি আমার মেয়েকে দুধ খাওয়ালাম ।
ঢাকাতে আমাদের স্থান হলো রক্তিমের এক ফুফাতো ভাইয়ের বাড়িতে। আমি সারাদিন রক্তিমের কাছেই থাকতাম, ওর দেখাশোনা করতাম। আমরা তিন দিনের মধ্যে একটি কেবিন ও পেয়ে গেলাম । বাবু অনেক বেশি ছোটো ছিল বলে রাতে ওই বাসায় গিয়ে ঘুমাইতাম আমি। তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ঢাকা শহর আসলেই নিষ্ঠুর সমাজের বোঝা। এইখানে একবেলা ভাতেরও অনেক মূল্য, মানুষের দুই কথা, মুখের মলিনতা, অপ্রস্তুত ভাবে বাইরের মানুষকে গ্রহণ করা এইটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। তারপরও যদি সেইটা অসুস্থ রুগীর সাথে সম্পৃক্ততা অর্জন করে তাহলে বিষয়টা আরো বেশি তীব্র আকার ধারণ করে। কিন্তু কী যায় আসে, এইসব সহ্য করা করা ছাড়া উপায়হীন। তারা যেটুকু করবে ততটুকুই সাদরে গ্রহনের প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে।
আস্তে আস্তে রক্তিম অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেলো। কিন্তু পায়ে দুই ভাঙ্গা দেওয়াতে সে স্বাভাবিক হাঁটা চলার ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হলো। সেইটাও কোনো বিষয় না, সে যে আমার বাবার মতো আমাদেরকে ফাঁকি দিয়ে পরকালে পাড়ি জলামো না এইটাই অনেক বড় বিষয়। হ্যাঁ, এইটাই আমার আর আমার মেয়ের জন্য অনেক কিছু। এক মাস পর তাকে নিয়ে আমরা রক্তিমের মেসে ফিরলাম।সেইখানে একটি ফ্ল্যাটে তারা চারজন থাকতো, রক্তিমের ঘরে দুইজন থাকতো। আমি যাওয়াতে ওই ঘরটি আমাদেরকে দিয়ে দেওয়া হলো। যে ক'দিন আমি থাকবো আমরা এই ঘরেই থাকবো কারণ তাকে ওই অবস্থায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না জেনে আমাকে রেখে আমার ভাসুর আর ননদের ছেলে গ্রামে ফিরে গেলো । আমি থেকে গেলাম রক্তিমের দেখাশোনা করার জন্য। অচেনা অজানা নিষ্ঠুর শহরের কোলে একা বিস্ফারিত হৃদয়ে।
রক্তিম যতটা সুস্থতার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো, তত মনে হতে লাগলো আমি সেই আগের মানুষটিকে খুঁজে পাচ্ছি। অনেক উৎফুল্ল লাগতো তাকে, তাকে যখন আমি ড্রেসিং করাতাম, খুব আগ্রহ নিয়ে সে আমার ব্যস্ত চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করতো। আমার চোখে ধরা পড়লেই সে খুব রসিকতার সাথে বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতো। আমার তখন খারাপ লাগতো না, আমি রান্না করার সময় খুব যত্নের সঙ্গে আমার মেয়েকে সে আগলে রাখতো, যতটুকু পারতো।আমার কাছে সব থেকে ভালো লাগলো সুবাইতার সাথে রক্তিম যখন খুনসুটি করতো, আমার মনে অফুরন্ত ফুল ছড়িয়ে পড়তো।
সাবাইতাকে কোলে নিয়েই সব সময় সে বলতো,
" আমার মা তুমি, আমার মা নেই তো কী হলো, মায়ের পুরো চেহারা ঢেলে দিয়েছে আল্লাহ, আমার সুবাইতার মধ্যে।"
কথাটা শুনেই আমার আত্মতৃপ্তি ঘটতো এইটা ভেবে যে কিছুটা হলেও রক্তিম মা হারানো শোক টা কাটিয়ে উঠছে। বিয়ের পর প্রথম এক মাস যেভাবে আমি রক্তিমের সাথে আমার জীবনের সব থেকে সুখময় দিন গুলো অতিবাহিত করেছিলাম, এই বিপদের সম্মুখীন হয়ে তার কাছাকাছি এসে আমি ধীরে ধীরে ঠিক সেই অনুভূতি গুলোই উন্মোচন করতে লাগলাম । হ্যাঁ, খুব খুশি লাগতো। আমি জানি এইটা আমার প্রাপ্য না, আমাকে ছেড়ে যেতে হবে এই স্বর্গ ছেড়ে, এই অগোছালো, অনিশ্চিত, আমার একার মতো গুছিয়ে নেওয়া এই ছোট্ট ঘরটি আমার জন্য না। কিন্তু তারপরও রাতের আঁধারে মনে হতো, আমি যদি এই ছোটো ঘরটি, আমার রক্তিমকে এইভাবে সবসময়ের জন্য আপন করে নিতে পারতাম তাহলে খুব ভালো হতো। কিন্তু সে তো আমার মতো অভাগার জন্য দিবাস্বপ্ন, কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন দিবা স্বপ্ন দেখেও বেঁচে নেই থাকার শক্তি ফিরে পায়। বার বার দিবা স্বপ্ন দেখতে চায়।
.
•আমাদের যাওয়ার পালা, রক্তিম মোটামুটি সুস্থতা লাভ করেছে । কিছুদিন ক্র্যাচ নিয়ে হেঁটেছে, অফিস করেছে। আমি দিয়ে এসেছি, কিন্তু এখন একাই যেতে পারছে । আমার সাহায্য লাগছে না, ভালোই লাগছে নিজের কাছে। এইটা যেনো আমার জন্য প্রাপ্তির মতো। আমাদের যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো, আমার ননদের ছেলে এসেছে আমাকে নিয়ে যেতে । গাড়ির টিকিটও বুকিং । আগামীকাল সকাল ৮:০০ টাই বাস। আমি রাতে অনেক কিছু রান্না করলাম। যেনো আগামী দুই সপ্তাহ ওর খাবারের কোনো সমস্যা না হয়। বাটি বাটি করে খাবার ফ্রিজিং করলাম। ওকে সব কিছু বুঝিয়ে দিলাম, বোঝার থেকে সে আমাকে আদর করতে বেশি ব্যস্ত। আমার খুবই ভালো লাগছে তার এই দুষ্টু মিষ্টি কার্যক্রম গুলো, এই দুইমাসে মনে হচ্ছে আমি আমার প্রত্যাশিত রক্তিম কে ফিরে পেয়েছি। কিন্তু ভোরে চলে যাবো ভেবেই বুকের মধ্যে ব্যাথা হতে লাগলো। একটাই প্রশ্ন,
- ও একবার আমাকে বলুক, "নকশী তুমি যেও না, আমি তোমাকে ছাড়া একাকিত্বে ডুবে যাবো। "
কিন্তু সেগুলো আমার কল্পনা ছাড়া কিছুই হবে না । বললে ঐকদিনে সে একবারের জন্য হলেও বলতো।
সকাল ৭:০০ বাজে। খুব দ্রুততার সাথে আমি রেডি হচ্ছিলাম। বাবু হঠাৎ ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদতে লাগলো। আমি ব্যস্ততার মাঝে দ্রুত তাকে খাওয়াতে লাগলাম । কিছুক্ষন বাদে রক্তিম আসলো,
" দেরি হয়ে যাচ্ছে, এখন একটা খাওয়ানোর সময় হলো নাকি? "
তার কথায় আমি হঠাৎ প্রচুর রেগে গেলাম,
" তাহলে কি আমাকে মরতে বলছো? আমারও তো জীবন তাইনা? তোমাদের জন্য সেইটাকে তো বিসর্জন দিয়েই দিছি, এখন এই বিসর্জনের মধ্যেও কী ডবল বিসর্জন দিতে হবে? "
" এই পাগলী? কী বলো এইসব? আমি তো এমনি জিজ্ঞেস করছি। দেরি করে লাভ আছে? নীরব কতক্ষন ওয়েইট করবে? এইজন্য বললাম। "
আমি কিছুটা অভিমানি ভঙ্গীতে অশ্রুসিক্ত নয়নে উঠে গেলাম। ওইঘরে গিয়ে দেখি নীরব বসে আছে, আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো। আমি উত্তর দিয়েই তাকে বললাম আর একটু দেরি করতে, আমি পাঁচ মিনিটেই বের হচ্ছি। আমাকে কিছুটা অবাক করে দিয়ে সে আমাকে বলল,
-"আপনি কোথায় যাবেন মামী? আমি যাবো। আমি বসে আছি আপনার কী কী লাগবে আরো একটু ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলে ভালো হতো। মামা বলছে আমার মাথার উপর দিয়ে গেছে। "
-" মানে? "
হঠাৎ রক্তিম এসে বললো, তোমার কী কী নিয়ে আসতে হবে সেইটা শুনছে ও । এখন এই মুহূর্তে ছোটো বাচ্চা নিয়ে তুমি সবটা গুছিয়ে আসতে পারবে না । তাই ওকে একাই পাঠাচ্ছি আমি একা, এক্সট্রা কিছু লাগলে ওকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দাও।
নীরবকে সব বুঝিয়ে বিদায় দিয়ে আমি নিষ্ফলকে রক্তিমের শান্ত স্বাভাবিক চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি কিছু বলার আগেই সে বলে উঠলো,
-" এত অবাক হওয়ার কী আছে নকশী? পরিবার পরিজন নিয়ে একসাথে থাকাটাই তো সার্থকতা। খুব কিছুদিনের জন্য নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তোমার সাথে অন্যায় করে ফেলেছি পাখি। সেই তোমার অপূর্ণতা বুঝতে আমার কিছুটা সময় ঠিকই লাগলো কিন্তু অনেকটা ভুক্তভুগী হতে হলো, তাতেও আমার আক্ষেপ নেই নকশী। আর কথা না বাড়িয়ে চলো নতুন করে সংসার শুরু করি, তুমি আমি আমার মা আর আমাদের ছোট্ট সংসার। "
আমি দৌড়ে গিয়ে বরাবরের মতোই তার বুকের বা পাশে গিয়ে স্থান গ্রহণ করলাম । আমি অঝোরে আঁখি বর্ষণে ব্যস্ত, আমার নিজেকে থামাতে ইচ্ছা করছে না । এইবার সে আমার মাথাটা উপরে দিকে কিছুটা উঠিয়ে বললো,
" কান্নাকাটি করার সময় নেই নকশী । সময় কিন্তু অনেক কম, এই পঙ্গু স্বামীর পিছে অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেলেছো, এইবার নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হও, এইবার পরীক্ষা দিতে পারনি তো কী হয়েছে? সামনের বারের জন্য তৈরি হতে হবে, খুব কঠোর ভাবে তৈরি করো নিজেকে নকশী, আমি তোমাকে উন্নয়নের সর্বস্তরে দেখতে চাই। অনেক বড় হতে হবে তোমাকে । অনেক কিছু অর্জন করতে হবে তোমাকে।
• রক্তিমের গলাটা ধরে আসছিল কথা গুলো বলার সময়। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে তার কথা গুলো শুনছিলাম, হয়তো হৃদয়ে ধরন করছিলাম। আমার হৃদয় থেকে অনায়াসেই দুঃখ গুলো নিংড়ে যাচ্ছিলো। অনেক বেশি ঋণী হয়ে গেলাম তার প্রতি, অনেক বেশি, সব কিছুর উর্ধে। সে আমার চোখ মুছে দিয়ে বললো,
" This is not the right time to cry . We have a lot of work to left, let's do it together, better half . "
চলবে.....???
পূর্ববর্তী অংশ :- https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/840165820122249/
বি. দ্র:- সবার নিকট আমি ক্ষমা প্রার্থী। আমি নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছি গল্প দিতে। আমার বোনের বিয়ের অনুষ্ঠান প্লাস আমি মানসিক ভাবেও কিছুটা অপ্রস্তুত ছিলাম, যার কারণে কিছুটা কষ্ট দিয়ে দিয়েছি আপনাদেরকে। পুরো বিষয়টা ক্ষমাশীল দৃষ্টিতে দেখবেন এবং আমার জন্য দোয়া করবেন । ধন্যবাদ সবাইকে 🍁

কবিতা:গৌরীপুর রেলস্টেশন
লেখক :ফাইরুজ হুমাইরা কর্ন
তার সাথে প্রথম দেখা হয় কোনো এক রেলস্টেশনে
হলুদ রৌদ্দুরে ভেসে উঠা কোনো এক হেমন্তের বিকালে,
টিনের ছাওনি ঘেরা কংক্রিটের থোওয়ায় বসে ছিল।
আমিও কিছুটা বিব্রতবোধ হয়ে
নিরুপায় হয়ে তার মধ্যে বসি।
আড়চোখে না দেখার ভান করেই তাকে আমি দেখি,
তার পরনে ছিল লাল পাড়ের সাদা শাড়ি,
খোঁপায় গোঁজা রক্তজবা,
কানে ঝুমকো জোড়া,
ঠোঁট জোড়াতে একটু গাঢ় করেই লিপস্টিক দেওয়া,
আর কপালটিতেও ছোট্ট একখান টিপ,
যেনো আকাশ-ধরনী চুমো খাচ্ছে রুপের জলপ্রপাতে!
হেমন্ত বিলাচ্ছে হিমেল হওয়ার প্রণয়শয্যা।
সোনাঝরা সময়টি যেনো তরঙ্গের পূর্ণসৌরভে কাঁপানো
হেমন্তের যায়যায় একটা হলদে বিকেল!
তার উপর দৃষ্টি পরাতে সে কিছুটা বিব্রতবোধ হয়েছিল বটে,
আর কেনই বা নয়!
অপরিচিত একটা পুরুষমানুষ কোনো মেয়ের দিকে তাকালেই
সে কিছুটা বিব্রত হবে,এটাই স্বাভাবিক।
তবে বিব্রতের মধ্যেও কেমন জানি একটা ভালোলাগা এলো
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চোখাচোখি হলো,
অতঃপর ট্রেন আসলো
তবে সে খেয়াল আর আমার নেই,
আমিতো ঢেউখেলানো রুপশ্রীতে বেপরোয়া ছিলাম!
তৃষ্ণার্ত ছিলো আঁখি আরো দেখার!
স্পর্শতা ছিলো রক্তজবা খোঁপার পরে একটু ছোঁবার!
রুপের শ্রী জৌলুসে হলদে চিঠি লিখার!
আকস্মাৎ সেই অপরিচিতা বলে উঠলো
আপনি যাবেন কোথায়?
এভাবে ফ্যালফ্যালিয়ে চেয়ে শূন্য হৃদয়ে ফাগুন কেন বাড়াচ্ছেন,শুনি?
আমি,আজ্ঞে হে গৌরীপুর রেলস্টেশন!
১৭ই সেপ্টেম্বর,২০২০
গৌরীপুর(নিজগৃহ)

বিবশ_রজনী
#পর্ব_ছয়
.....
নিজাম সাহেব জেরিনের ফোন নম্বরে ফোন করলেন, জেরিন ফোন ধরতেই তিনি বললেন,
"হ্যালো জেরিন বলছেন?"
--"জ্বী বলছি, কে বলছিলেন?"
--"আমি নিজাম আহমেদ বলছি। সৌমিত্রর কাছ থেকে আপনার ফোন নম্বর নিয়েছি।"
--"ও আচ্ছা, কি ব্যাপার বলুন।"
--"আপনার সাথে ঈশানের ব্যাপারে জরুরী কিছু কথা ছিল।"
--"জ্বী বলুন।"
--" সামনাসামনি বললে ভাল হতো।"
--"কি বিষয়ে বলুন তো।"
--"জেরিন, সৌমিত্র সম্ভবত আমার ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলেনি। আমি একজন সাইক্রিয়াটিস্ট। ঈশান দীর্ঘদিন থেকে মানসিক কিছু সমস্যায় ভুগছে, আমি চেষ্টা করছি ওকে সমস্যাগুলো থেকে মুক্ত করার। ঈশানকে সমস্যাগুলো থেকে বের করবার জন্যে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন।"
--"কেমন সমস্যা?"
--"আপনি কি আমার সাথে কাল একবার দেখা করতে পারবেন?"
--"জ্বী পারবো, কোথায় কয়টার সময় আসতে হবে?"
--"আপনি বলুন, আপনি যেখানে বলবেন আমি সেখানে চলে আসবো।"
--"আগামীকাল বিকেল চারটার দিকে সংসদ ভবনের সামনে আসতে পারবেন?"
--"অবশ্যই।"
--"আচ্ছা তাহলে আগামীকাল দেখা হচ্ছে।"
রাতের খাবার খেয়ে নিজাম সাহেব ল্যাবে বসে ঈশানের চিকিৎসার ব্যাপারে ভাবতে শুরু করলেন। জেরিন যদি সহযোগিতা করতে রাজী হয়ে যায় তাহলে ঈশানের ক্ষেত্রে তিনি কি পদ্ধতি অবলম্বন করবেন? নিজাম সাহেব পুনরায় ঈশানের ভিডিও দেখতে শুরু করলেন, ঈশান বিড়বিড় করে কথা বলার সময় কিছুক্ষণ পর পর থামে, ওর মুখের অবয়ব দেখে মনে হয় ও প্রতিত্তোরের জন্যে অপেক্ষা করছে। এর মানে কী? ওর অবচেতন মন কি ওকে কোন প্রতিত্তোর দেয়? যদি তা নাই ই হবে তবে ও ওরকম ভাবে কথা বলার মাঝে থামবে কেন? ঈশান যদি অবচেতন মনের কাছ থেকে কোন প্রতিত্তোর পেয়েই থাকে তবে প্রতিত্তোর গুলো ঠিক কেমন হতে পারে? নিজাম সাহেব ঈশানের কথোপকথন লিখে রাখা কাগজ বের করলেন, ঈশান ঘর থেকে বের হয়ে প্রথম কথাটি বলল, "ঘর থেকে বের হলাম, যাচ্ছি ছাদে।"
এর সম্ভাব্য প্রতিত্তোরে নিজাম সাহেব লিখলেন, "কেন ছাদে কেন? পাগলামি কোরো না তো, ঘরে যাও।"
ঈশান ছাদে গিয়ে বলল, "কষ্ট হয় বুঝলে, খুব কষ্ট হয়।"
নিজাম সাহেব লিখলেন, "কিসের কষ্ট! শোনো এরকম কোরো না।"
ছাদের রেলিংয়ের উপরে দাঁড়িয়ে ঈশান বলল, "আমি এখন কি করছি জানো?"
প্রতিত্তোরে নিজাম সাহেব লিখলেন, "কি করছো?"
ঈশান একমুহূর্তের জন্যে থেমে বলল, "ছাদের রেলিংয়ের উপর দিয়ে হাঁটছি, পরে গেলে মরে যাব। সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।"
নিজাম সাহেব লিখলেন, "কি যা তা পাগলামি করছো, ঘরে ফিরে যাও তো। অনেক রাত হলো, ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।"
নিজাম সাহেব এতটুকু লিখে উঠে দাঁড়ালেন, ঘুমে চোখ দুটো তাঁর বন্ধ হয়ে আসছে। তিনি এখনো জানেন না জেরিন সবকিছু শোনার পর সহযোগিতা করতে রাজী হবে কি না, যদি রাজী হয়ে যায় তবে ঈশান রাতে হাঁটার সময় তিনি জেরিনকে তার সামনে উপস্থিত করতে চান। জেরিনকে তিনি ঈশানের অবচেতন মনের ভূমিকায় রেখে দেখতে চান ঈশানের মাঝে কোনো পরিবর্তন আসে কি না।
ল্যাব থেকে উঠে নিজাম সাহেব ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
সকালবেলা হামিদুলের আগে নিজাম সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল, তিনি বিছানা ছেড়ে মুখ হাত ধুয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন দরজার নিচে একটা খাম পড়ে আছে। খাম দেখে তিনি অবাক হলেন না, খাম না এলেই বরং তিনি অবাক হতেন। আগে থেকেই নিজাম সাহেব ধারণা করে রেখেছিলেন যে নাম-ঠিকানা বিহীন অদৃশ্য একটা চিঠি তাকে পাঠিয়েছে সে আবারও চিঠি পাঠাবে। তিনি দরজার সামনে গিয়ে খাম তুলে নিলেন, খাম খুলে চিঠি বের করে তিনি খানিকটা অবাক হলেন কারণ তিনি ভেবেছিলেন, এইবার হয়তো চিঠি লেখার ক্ষেত্রে অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করা হবে কিন্তু চিঠিটা কলমের কালিতে লেখা। নিজাম সাহেব চিঠি পকেটে রেখে রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে বেলকনিতে গিয়ে বসলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তিনি পকেট থেকে চিঠি বের করে পড়তে শুরু করলেন। চিঠিতে লেখা,
"আপনার কাছে অতীত এবং ভবিষ্যতের মূল্য কেমন? অতীতের স্মৃতি, ভবিষ্যতের স্বপ্ন-পরিকল্পনা আপনাকে কেমন প্রভাবিত করে? খুব বেশি নাকি আপনি বর্তমান নিয়েই বাঁচতে চান?"
বিঃদ্রঃ আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো। উত্তর অবশ্যই হাতে লিখবেন। উত্তর পাঠাতে আপনাকে চলে আসতে হবে বাংলা বাজারে। সময় নিয়ে 'দি বুক সেন্টার' বইয়ের দোকান খুঁজে বের করতে হবে। আপনার কুকুরটা খুব লক্ষ্মী, একবার ইচ্ছা হচ্ছিলো ওকে নিয়ে আসি।
নিজাম সাহেব চিঠি রেখে একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। অসংখ্য সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষ অতীত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বারণ করে বলেছেন বর্তমানটাই সত্য, বর্তমান নিয়েই বাঁচতে হবে। কিন্তু তিনি মনে করেন, অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ভাবনার উপর মানুষের নিজস্ব কোনো কর্তৃত্ব নেই সুতরাং মানুষ অতীত-ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে না চাইলেও ভাবনাগুলো হরহামেশাই নিজে থেকে এসে মানুষের মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। যেহেতু অতীতের সকল অভিজ্ঞতাই মানুষের স্মৃতিকোষে জমা রয়েছে তাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। অতীতের সুন্দর অভিজ্ঞতাগুলো মানুষকে যেমন সুখী করে তেমনি খারাপ অভিজ্ঞতা গুলো যেন পরবর্তীতে আবারও না হয় সেজন্যে মানুষ সচেতন থাকে। মানুষ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেই বর্তমানকে কাজে লাগায়।
নিজাম সাহেবকে অতীত এবং ভবিষ্যৎ উভয় কালই প্রভাবিত করে কিন্তু তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেন বর্তমানকে জোর দেবার।
বেলকনি থেকে উঠে নিজাম সাহেব ঘরে গিয়ে দ্রুত কাগজ কলম নিয়ে লিখলেন,
"অতীত এবং ভবিষ্যৎ আপনাকে যেমন প্রভাবিত করে আমাকেও তেমনি প্রভাবিত করে৷ মানুষ অতীত এবং ভবিষ্যৎ কালকে উপেক্ষা করতে পারে না, তবে তারা সর্বদাই বেঁচে রয়েছে বর্তমানে।"
হামিদুল ঘুম থেকে উঠে হাই তুলতে তুলতে নিজাম সাহেবের ঘরে এসে বলল, "আমার আগে উঠে গেছো।"
নিজাম সাহেব হেসে বললেন, "হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি মুখ হাত ধুয়ে নে। বাইরে নাস্তা করে দুইটা জায়গায় যেতে হবে।"
হামিদুল দ্রুত মুখ-হাত ধুয়ে তার সবচেয়ে পছন্দের শার্ট-প্যান্ট, জুতো পরে নিজাম সাহেবের ঘরে ফিরে এলো। নিজাম সাহেব হামিদুলের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন। হামিদুল তার লাল শার্ট, কালো প্যান্ট পরেছে ইন করে, তার প্যান্টের চেন খোলা। ওর জুতো জোড়া নিজাম সাহেব পছন্দ করে কিনে এনেছিলেন কিন্তু বাসায় আসার পর দেখা গেল জুতো জোড়া হামিদুলের এক সাইজ বড় হয়েছে। তিনি জুতোজোড়া বদলে এনে দেবেন বলেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বদলে আনার কথা ভুলে গেছেন। নিজাম সাহেবকে শব্দ করে হাসতে দেখে হামিদুল বেশ অপমান বোধ করছে। হাসতে হাসতেই নিজাম সাহেব বললেন, "কিরে তোর প্যান্টের পোস্ট অফিস খোলা কেন?"
হামিদুল প্যান্টের চেনবক্সের দিকে তাকিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল। নিজাম সাহেব হামিদুলের পেছন পেছন ওর ঘরে গিয়ে বললেন, "শার্ট-প্যান্ট ইন করে জুতোর সাথে পরেছিস, দেখে মনে হচ্ছে ঔষধ বেচার কাজ করিস নইলে কোম্পানির অর্ডার কাটতে দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়ানোর কাজ করিস। শার্ট-প্যান্ট খুলে একটা জিন্স পরে নে সাথে টি-শার্ট। আমি রেডি হয়ে আসছি।"
হামিদুলকে নিয়ে নিজাম সাহেব বাসা থেকে বের হয়ে হোটেলে সকালের নাস্তা করে চলে গেলেন বাংলা বাজারে। দি বুক সেন্টার খুঁজে বের করতে তাকে খুব বেশি বেগ পেতে হলনা। তিনি দি বুক সেন্টারের দোকানিকে চিঠি দিয়ে শাহবাগের উদ্দেশ্যে হামিদুলকে নিয়ে রওনা করলেন।
কে চিঠি পাঠাচ্ছে নিজাম সাহেব যে তা ভাবছেন না বিষয়টা ঠিক তা নয়, তবে তিনি জানেন, যে চিঠিগুলো লিখছে সে নিজে থেকেই তার পরিচয় প্রকাশ করবে সুতরাং তাকে খুঁজে বের করবার বিশেষ প্রয়োজন নেই, খুঁজতে গেলেই দেখা যাবে সে নিজেকে লুকাবার চেষ্টা করছে।
জাদুঘরের সামনে এসে নিজাম সাহেব গাড়ি থামালেন। জেরিনের সাথে দেখা করবার কথা বিকেল চারটায়, কেবল বাজছে দুপুর একটা, হাতে যথেষ্ট সময়, তিনি হামিদুলকে নিয়ে টিকিট কেটে জাদুঘরে প্রবেশ করলেন।
ঘন্টাখানেক নিজাম সাহেবরা জাদুঘরে কাটালেন। জাদুঘরের বিশেষ কিছুই হামিদুলের পছন্দ হল না, কেবলমাত্র বিভিন্ন প্রজাতির পাখিগুলো তার ভালো লেগেছে। নিজাম সাহেব জাদুঘর থেকে হামিদুলকে নিয়ে আজিজ সুপার মার্কেটের একটা ফাস্টফুডে গিয়ে বসে জিজ্ঞাসা করলেন, "কি খাবি?"
হামিদুল খাবারের দিকে তাকিয়ে বলল, "পিজ্জা।"
নিজাম সাহেব দোকানীকে দুইটা পিজ্জা দিতে বললেন।
দোকানি মুহূর্তের মধ্যে ওভেনে পিজ্জা গরম করে টেবিলে দিয়ে গেল। হামিদুল পিজ্জাতে কামড় দিয়ে বলল, "এটা এমন কেন?"
নিজাম সাহেব বললেন, "কেমন?"
--"খেয়ে দেখো।"
নিজাম সাহেব পিজ্জাতে কামড় দিয়ে বললেন, আসলেই তো। তিনি পিজ্জা পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন, পিজ্জাতে দেওয়া হয়েছে, মিষ্টি কুমড়া সাথে সুজি, আলু, পেঁয়াজ-মরিচ, এক টুকরো মুরগির মাংসও খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি বেশ ক্ষেপে গিয়ে দোকানীকে ডেকে বললেন, "পিজ্জাতে সুজি দেওয়া কেন? আর চিকেন পিজ্জায় চিকেনটা কোথায়?"
দোকানী বিরক্তমুখে বলল, "আমাদের এখানের পিজ্জা এমনই।"
--"পিজ্জাতে মুরগির মাংসের ছিটেফোঁটাও নেই সেটা মেনে নিলাম, কিন্তু সুজির ব্যাপারটা কী? লাভের জন্যে খরচ কমাতে কমাতে এত বেশি কমিয়েছেন যে এটা আর খাবার উপযোগী নেই।"
দোকানী বলল, "আমাদের এখানে অসংখ্য মানুষ পিজ্জা খেতে আসে কেউ তো কখনো কমপ্লেইন জানালো না, আপনিই কেবল জানালেন।"
মুহুর্তের মধ্যে এক বয়স্ক লোক দোকানীকে চেঁচিয়ে ডেকে তার সামনের পিজ্জা দেখিয়ে বললেন, "এই বেটা, এটা কি তোর বাপের মাথা বানায়ছিস।"
নিজাম সাহেব দোকানের বিল পরিশোধ করে হামিদুলকে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলেন।
সংসদ ভবনের সামনে গাড়ি পার্ক করে নিজাম সাহেব গাড়ি থেকে সংসদ ভবন দেখিয়ে হামিদুলকে জিজ্ঞাসা করলেন, "বল তো ঐ ভবনটার নাম কী?"
হামিদুল সাথে সাথে বলল, "সংসদ ভবন।"
--"বাহ, তোর মনে আছে দেখছি। বল তো দেখি সংসদ ভবনের প্রধান স্থপতির নাম কী?"
হামিদুল মাথা চুলকাতে শুরু করলো অর্থাৎ তার মনে পড়ছে না। নিজাম সাহেব বললেন, "আগে তোকে দুইবার বলেছি, ভুলে গেছিস। এইবার মনে রাখবি, আবার যখন আসবো তখন জিজ্ঞাসা করবো। সংসদ ভবনের মূল স্থপতির নাম, লুই আই কান।"
জেরিন ঠিক চারটা বাজে নিজাম সাহেবকে সংসদ ভবনের সামনে এসে ফোন করলো। নিজাম সাহেব ফোন ধরে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, বাইশ থেকে তেইশ বছরের এক তরুণী এদিক সেদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে। তিনি বললেন, "আপনাকে সম্ভবত আমি দেখতে পেয়েছি, আপনি কি মেরুন রঙের জামা পরা?"
জেরিন বলল, "জ্বী, আপনি কোথায়?"
নিজাম সাহেব সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, "জেরিন!"
জেরিন ফোন রেখে হাসিমুখে বলল, "কেমন আছেন?"
নিজাম সাহেব বললেন, "আমি বেশ ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?"
--"আমিও ভালো আছি।"
সংসদ ভবনের সামনে বসে নিজাম সাহেব ঈশানের ব্যাপারে সবকিছু জেরিনকে খুলে বলে জিজ্ঞাসা করলেন, "ঈশানের সমস্যাগুলো তো আপনি শুনলেন। এখন যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনি কি ঈশানকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেবেন?"
জেরিন সাথে সাথে বলল, "ও কি কখনো এই সমস্যা থেকে বের হতে পারবে?"
--"হয়তো পারবে অথবা পারবে না। মনে করুন, ঈশান এই সমস্যা থেকে বের হতে পারল না, আপনি কি ওকে গ্রহণ করবেন? ভেবে বলুন, সময় নিন, ঝোকের বশে সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন নেই, কারণ আমরা এখনো জানি না ঈশান আদৌ কখনো সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে পারবে কি না। আমি আজ উঠছি, আমার ফোন নম্বর তো আপনার কাছে আছেই, যদি মনে করেন ঈশানের মানসিক সমস্যাকে উপেক্ষা করে ওকে আপনি গ্রহণ করতে পারবেন তাহলে আমাকে ফোন করে জানাবেন। আপনি যদি ওকে গ্রহণ করতে পারেন তাহলে আমি আপনাকে নিয়ে একটা প্রচেষ্টা চালাতে চাই ঈশানকে এই সমস্যা থেকে মুক্ত করার। আপনি যদি ওকে গ্রহণ করতে না চান, তবে অন্য কাউকে আমার খুঁজতে হবে।"
নিজাম সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। জেরিন কান্নামিশ্রিত গলায় বলল, "পারবো।"
নিজাম সাহেব বললেন, "আপনি আরও ভাবুন, আপনার পরিবার-পরিজন আছে, তাছাড়া আমি কিন্তু আপনাকে কথা দিতে পারছি না যে ঈশান আপনাকে গ্রহণ করবে। আমি তাকে সমস্যা থেকে বের করতে চাইছি, আপনাকে সে গ্রহণ করবে কি করবে না সেই সিদ্ধান্তটা ওর নিজের, তাতে আমি হস্তক্ষেপ করতে পারবো না।"
জেরিনের চোখ দুটো ছলছল করছে। নিজাম সাহেবের মনে হলো যে কোন সময় জেরিনের চোখ থেকে জল পড়তে শুরু করবে, তিনি কারো চোখের জল দেখতে চান না। জেরিনের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ার আগেই তিনি গাড়িতে গিয়ে বসলেন।
.....
#চলবে
লেখা-
নাহিদ হাসান নিবিড়
পর্ব-০৫
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/851542578984573/

তাহারেই_পড়ে_মনেপর্ব সাত
একে নাচুনি বুড়ি তার উপর ঢোলের বাড়ি! প্রিন্স মুখিয়ে ছিলো, উদগ্রীব হয়ে ছিলো মিষ্টির কাছে ফিরতে আর তখনই ডাকলো মিষ্টি ওকে। ওর কান্নাভেজা কথাগুলো যেন সুধা ঢাললো কর্নকুহরে!
প্রিন্সের জন্য মিষ্টি অন্য কিছু, সেই অন্যকিছু যে কী তা ও জানে না, নিজেও বোঝেনা- প্রকাশ করা তো আরও অসম্ভব। মিষ্টির আহবান এড়িয়ে যাওয়াও ওর পক্ষে অসম্ভব। এদিকে কী কান্ড ঘটিয়ে রেখেছে তা ওর মাথা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গেছে- ও সকালের অপেক্ষা করছে, কখন মিষ্টির কাছে যাবে। এমনিতেই এতোদিনের অদেখা, মনের ভেতর জ্বালাপোড়া করছিলো - তায় মিষ্টি কেঁদে সারা হয়েছে আজ - শুধু ওরই জন্য! নিজেকে নিজেই বললো 'আমি আসছি, বিবিজান।'
খুব সকালে রওনা করে ও যখন এসে পৌঁছেছে ঢাকায়, মিষ্টি তখন ক্লাসে। ও চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলো। কখনো কখনো অপেক্ষা বড় মধুর হয়, আনন্দের হয় - ও হাসতে থাকলো মনে মনে, পৃথিবী ওলোট-পালোট হয়ে গেলেও মনে হয় মিষ্টিকে ক্লাস, পড়াশুনা থেকে দূরে সরানো যাবে না। মাঝে মাঝেই প্রিন্সের মনে হয় ও নিজে আরেকটু পড়াশুনা করলে কী হতো? নিজেকে মিষ্টির তুলনায় খুব ছোট মনে হয় - ওর জন্য মিষ্টির মনে কোনো খেদ নেইতো, কোনো আক্ষেপ! যোগ্যতার বিচারে নিজেকে অনেক তুচ্ছ লাগে, ভালোবাসেতো মিষ্টি নাকি করুণা করে? আরেকবার যদি সুযোগ পাওয়া যেতো ও নিশ্চয়ই খুব ভালো করে পড়াশুনা করতো! স্কুলজীবনে শিক্ষকেরা তো ওর মেধার খুব প্রশংসাই করতো, ভালো রেজাল্টও হতো নিচু ক্লাসগুলোতে। কিন্তু বড় হতে হতে নিয়ম করে পড়তে বসার চাইতে আড্ডা, বেড়ানো, বন্ধুবান্ধবই ভালো লাগা শুরু হলো। দিন দিন বইয়ের সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকলো। আনন্দ মাস্টার বাঁধা ছিলো বাড়িতে - সবভাইবোনকে এক সাথে করে পড়তে বসাতো। প্রতিদিনই সেখানে একটা ঝামেলা লাগিয়ে দিতো ও। বিনিময়ে জালি বেতের বাড়ি শপাং শপাং করে পিঠে পড়তো। প্রথম দিকে সাবিহা এসে রক্ষাকর্ত্রি হয়ে দাঁড়াতো - কেঁদে চোখ ফুলে যাওয়া ছেলেকে পড়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে যেতো। দিন দিন বড় হতে থাকলো আর মার খেয়ে কাঁদতে লজ্জা হলো। তারচেয়ে পড়ার সময়টা বাড়ির বাইরে কাটানোই শ্রেয়তর ছিলো ওর জন্য। প্রায়ই ধরেবেঁধে আনতো মাস্টার কিন্তু আরও বড় হলে, যখন গোঁফ -দাঁড়ির রেখা দেখা গেলো তখন থেকে মাস্টারও সমীহ করে চলতেই শুরু করলো। কোনরকম ডানপিটে, অমনোযোগী মাথায় হাত বুলিয়ে যদি বোর্ড পরীক্ষার বৈতরণি পার করিয়ে নেওয়া যায় তাই ঢের!
পরীক্ষার আগের কয়টা রাত বইখাতার পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে হাঁসফাস লাগতো ওর, কালো কালো অক্ষরগুলোকে অত্যাচারের মতো মনে হতো! নতুন বাইক পাওয়ার লোভে উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পার হতেই তাই ওই বইখাতার জঞ্জালের সাথে সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করেছে ও।
ক্লাস শেষে দূর থেকে প্রিন্সকে দেখে চপলা কিশোরীর মতো মন নেচে উঠলো মিষ্টির। একদম অন্যরকম দেখাচ্ছে, পালিশ করা গেটআপ। হালকা গোলাপি রঙের ফুলস্লিভ ফরমাল শার্টের হাতা দুটো করে ভাঁজ দেওয়া, গাঢ় ছাই রঙের প্যান্টের ভিতর ইন করে রাখা। দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে, পেছনে লাল রঙের বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, মাথাটা একটু সামনে ঝুঁকে এসেছে। মিষ্টিকে দেখেনি, চোখ দুটো নীচের দিকে তাকানো। বাউন্ডুলে প্রিন্সের এমন শান্ত, সৌম্য অবতার দেখে মিষ্টি অবাকও হলো, ভালো লাগায় মন ভরেও উঠলো। গোলাপি রঙে প্রিন্সের দুর্বলতা আছে। বেশিরভাগ সময়েই মিষ্টি ওকে এই রঙেই দেখেছে। ও কাছে এসে নিজেও প্রিন্সের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো।
'তুমি কী ঘুমাচ্ছ?'
প্রিন্স চমকে তাকালো। মিষ্টিকে দেখেই সহজ হাসি ফুটলো মুখে। 'রাতে কি ঘুমাতে দিস তুই আমাকে? কিজন্যে ডেকেছিস, তাড়াতাড়ি বল।' চোখে আনন্দ নিয়েও এমনভাবে বললো যেন নেহায়েতই মিষ্টি আসতে বলেছে তাই ও এসেছে। ওর কোনো ইচ্ছাই ছিলো না দেখা করার!
মিষ্টি সব বুঝলো। এদিক ওদিক তাকাতে থাকলো। 'একটা কুকুর খুঁজছি, জানো? পাওয়া গেলে সেটাকে প্রিন্স নামে ডাকা যায় কীনা ভাবছি!'
'তুই সবসময়ই এইগুলো করিস। আমাকে রাগিয়ে দিস আর ঝগড়া হয়। সবাই আমার রাগটা দেখে, তুই যে উষ্কে দিস সেটা কেউ দেখে না। তারপর রাগের মাথায় আমি কিসব করে ফেলি, উল্টোপাল্টা।'
'কি করেছো এবার?'
প্রিন্স চুপ হয়ে যায়। মিষ্টিকে কিছুতেই বলা যাবে না ও কী করেছে আর কী করেনি! মিষ্টি ওকে খেয়েই ফেলবে সম্ভাবনা আছে। 'ঝগড়াই করবি, বিবিজান?' ও তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে নেয়।
'না আজকে কানে ধরলাম, এখুনি। আজকে আমি একদম ভালো মেয়ে।' দুহাতে দুইকান ধরে মাথা নাড়ে মিষ্টি।
'তো? আমার বাপের টাকায় কেনা বাইক, উঠবি?'
প্রিন্সের খোঁচা গায়ে মাখে না মিষ্টি। চিন্তিত হওয়ার ভান করে বলে 'ভাবছি, ঠিকঠাক চালাতে পারবে তো? এখুনি তো দেখলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলে। পরে দেখা যাবে এমন মরা মরলাম যে হাত একদিকে, মাথা আরেকদিকে - ঝুড়িতে করে লাশ দিতে হবে মিঠির মায়ের কাছে, আস্ত মিষ্টিকে পাওয়া যাবে না!'
'শোন, আমি প্রিন্স, আমি যদি চোখ বন্ধ করেও বাইক চালাই তো রাস্তা নিজেই পথ বানিয়ে দেবে। তুই উঠবি কীনা বল?'
'প্রিন্স ভাই, আমার না বাইকে ভয় করে, যদি ফেলে দাও বা আমি পড়ে যাই!' মিষ্টিকে বিপদগ্রস্ত দেখা গেলো।
'মুশকিলে ফেললি দেখছি, আজকে তো আমি কাউকে সাথে আনিনি, তোর ফোন পেয়ে, না পারতে তখনি ছুটে আসিনি। কাউকে আনলে তো সেই দেখতো। এখন এভাবে ফেলে যাবো?'
'আমার চাইতে বাইক বড় হলো তোমার কাছে?' মিষ্টি গাল ফুলোলো।
'নাটক করবি না। এতো ভয় পাওয়া মেয়ে তুই না। বিরক্ত করিস না। আমি আস্তে চালাবো, তোর ভয় লাগবে না।'
'তথাস্তু, বাপ অফ শাহেনশাহ!'
'ছিঃ কী বিশ্রী নাম।' প্রিন্স বিরক্ত হয়। 'তোর মনে হয়না, তুই আজকে অনেক বেশি কথা বলছিস। সমস্যা কী তোর?'
'তুমি জানো না গো, আমার খুশিতে আজকে লাফাতে ইচ্ছে করছে, সিনেমার নায়িকাদের মতো কোমর দুলিয়ে নাচতে ইচ্ছে করছে। পুরো শহরে মাইক লাগিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, আমার ভালোবাসার কথা, বলতে ইচ্ছে করছে 'যাহা চাইয়াছি, তাহাই পাইয়াছি!'
প্রিন্স মুগ্ধতায় বিভোর হয় ওর দিকে তাকিয়ে। মেয়েটাকে এতোটা স্বতঃস্ফূর্ত আগে কখনো দেখেনি ও। ওকে চমকে দিয়ে আবার বলে ওঠে মিষ্টি 'তোমাকে এমন চোরচোর লাগছে কেন আজকে প্রিন্সভাই? কিছু কি লুকোচ্ছো? অন্য কোনো মেয়েটেয়ে আসেনি তো মাঝখানে? বলো, বলো! চেহারা, লুকেও তো বিস্তর চেঞ্জ! কেমন গ্লো করছো। বলো?'
প্রিন্স অবাক হয়। ও কি মনের ভেতরটাও দেখতে পায়? 'অনেক বেশি বেশি হচ্ছে না, মিষ্টি?' ওর একগাছি চুলে টান দেয় প্রিন্স। হঠাৎই মনে পড়লো এমন ভঙ্গিতে বললো 'তুই মোবাইল নিয়েছিস?'
'না তো। কিনে দেবে তুমি?'
প্রিন্স যেন আশ্বস্ত হলো মনে মনে। ও যে ঝামেলা পাকিয়ে রেখেছে সেই খবর এখনো পায়নি মিষ্টি। ফোন থাকলে গোপন করা সম্ভব হতো না। কাজিনদের সাথে দুজনেরই খুব ভালো সম্পর্ক। প্রিন্সের বিয়ের খবর যেমন সবাই জানবে তেমনি সেই গল্প মিষ্টির কানে পৌঁছাতেও দেরি লাগবে না। আর সেই তুলি নামের মেয়েটাও বারদুয়েক ফোন করেছে। ও রাজুকে মোবাইল পাস করলে মেয়েটা প্রিন্স ভেবেই রাজুর সাথে কথা বলে গেছে। আবার যদি ফোন করে? ও নিজের ফোনটাও বন্ধ করে নিলো আর মিষ্টিকে বললো 'দরকার নেই, এমনিতেও তুই তোর ওই বিদ্যার্জনের মাঝে কতটুকুই বা কথা বলবি আমার সাথে।'
'তুমি হেলমেট পরো না কেন? আমি মোটেও তোমার সাথে উঠবো না। আইন কানুন কিছু মানোনা দেখছি! মিনিমাম প্রটেকশন তো দরকার আছে। ভাবো কি নিজেকে, সুপারম্যান?' হেলমেট ছাড়া বাইকে উঠতে আপত্তি করে মিষ্টি, এমনিতেই যাবতীয় দুইচাকার যানে ভয় আছে ওর।
প্রিন্স বিরক্ত হয় 'তুই জানিস কি, ন্যাকামি জিনিসটা তোর সাথে যায় না?'
'এটা ন্যাকামি নয়, সচেতনতা। এই প্রথম, এই শেষ - আর কখনো এইরকম হেলমেট ছাড়া তোমার বাইকের পেছনে আমাকে পাবা না।'
'চুলগুলো আটকে নে না?'
'কেন, আমার চুলে তোমার কী ক্ষতি হচ্ছে?'
'চুল খুলে রাখতে নেই, পাগল। কেমন জানি নেশা নেশা লাগে, জানিস?'
'উঁহু, জানিনা তো। নেশা করে দেখেছ কখনো?' প্রিন্সের পিঠে নাক ঘষতে থাকে মিষ্টি! 'তোমার ঘ্রাণ নিয়ে নিচ্ছি, বুঝেছ? কখন ঝগড়া করবা আর কয়েকমাস লাপাত্তা হয়ে যাবা, তার তো ঠিক নেই - তোমার গায়ের ঘ্রাণ মুখস্থ করে রাখি, ওইসময়ে কাজে দেবে।'
সারাদিন এলোমেলো ঘুরলো দুজন, সারাশহরে। বিকেলে যখন হলের সামনে মিষ্টিকে নামিয়ে দিতে এলো, তখন হারানোর ভয় জেঁকে বসলো প্রিন্সের মনে। ও আঁকড়ে ধরলো মিষ্টিকে 'চলনা, বিয়ে করে ফেলি, বিবিজান।'
মিষ্টি ওর হাতটা ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। প্রিন্স এবার কাতর হলো, নিজের কথা চেপে গিয়ে বললো 'মনে কর জাফরিন খালা এখন তোকে বিয়ে করার চাপ দিলো, কী করবি তখন তুই? তার চেয়ে আমরা বিয়ে করে ফেলি, তাহলে আর কোনো টেনশন নেই। বিশ্বাস কর আমি তোকে এক লাইনও বিরক্ত করবো না। তুই না ডাকলে আসব না, তোকে এক ইঞ্চি ছুঁয়ে দেখব না।'
মিষ্টি হাসলো। আলতো করে চেপে ধরলো ওর হাত, যেন আশ্বস্ত করলো 'আগামি আড়াই বছরের জন্য নিশ্চিত থাকো প্রিন্সভাই। আর ততদিনে আমি আব্বু আম্মুকে ঠিক রাজি করিয়ে ফেলবো। তুমি শুধু মাথা ঠান্ডা রেখো।'
প্রিন্স নিজেও জানে এইদিকে ওর আসলেই ভয় নেই। ভয় তো নিজেকে নিয়েই। মিষ্টিকে ছেড়ে আসতে আজকে অনেক কষ্ট হলো ওর। সারারাস্তা উপায় খুঁজতে লাগলো। যে পাঁক নিজে ঘুলিয়ে ঘোলা করেছে তার থেকে পরিত্রানের বুদ্ধি কী ভাবলো শুধু। কী হবে কী হবে ভাবলো কিছুক্ষণ তারপর নিজেই নিজেকে স্বান্তনা দিলো, কী আর হবে- গন্ডগোল লাগবে একটা, খুব চিল্লাপাল্লা হবে, মা কান্নাকাটি করবে, খুব বেশি হলে বাড়ি থেকে বের করে দেবে বাবা! বাড়ি থেকে বের হলে কোথায় যেতে হবে আর কী করতে হবে তার প্ল্যানও সেট করলো অনেক ভেবে ভেবে। শুধু মিষ্টিকে এর থেকে দূরে রাখতে হবে। এমনিতেই কাজ করো, কাজ করো বলে মাথা খেয়ে ফেলে মেয়েটা! তবে মাকে ঠিক করতেই পারলে সব মুশকিলই আসান! এমনিতেই প্রথম সন্তান, একমাত্র পুত্র বলে ওকে চোখে হারায় সাবিহা! মায়ের কাছে চেয়েছে কিছু অথচ পায়নি এমন কোনোদিন হয়নি। আজকে মিষ্টিকেই চাইবে, মনে মনে ঠিক করে নিলো প্রিন্স!
কিন্তু বিধাতা যে কপালে অন্য কিছু লিখছিলো তা কি কেউ জানে?
পুরো বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় বেশ জোরেশোরেই শুরু হয়েছে। সাবিহা, জিনিয়া, পরিবারের আরও মেয়েসদস্যরা মিলে শপিং করে ঘর ভরিয়ে দিয়েছে। অর্ধেকের বেশি দাওয়াত পৌঁছে গেছে। প্রিন্সের আনপ্রেডিক্টেবল ন্যাচারের সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত। ওর মতিভ্রম হওয়ার আগেই বিয়েটা সেরে ফেলতে চায় সাবিহা তাও ধুমধামের সাথে। কাজিন গ্রুপেও প্রিন্স খুবই পপুলার - তারাও নানারকম প্ল্যানিং করছে। প্রিন্সের বন্ধুরাও খুব উৎসাহী - এর ভিতর প্রিন্সই শুধু মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে! নিজের পাতা ফাঁদে পড়ে গিয়ে নিজেই কুপোকাত, বেচারা! মিষ্টির রুমমেটের ফোন দিয়ে মাঝেমাঝেই ওর সাথে কথা হয়। মিষ্টি বাড়ি যাবে শুনে ওর কলিজার ধরফড়ানি বেড়ে গেছে- বাড়ি গেলেই তো ও শুনতে পাবে প্রিন্সের বিয়ের খবর। গাঁয়ে হলুদে যে ম্যাচিং শাড়ি পরা হবে তাও হয়তো কেউ পৌঁছে দেবে মিষ্টিকে! মিষ্টি তখন কী করবে? ভেবে ভেবে কোনো তল খুঁজে পায়না ও। বাবাকেই ভয় হয় বেশি- যে বজ্রকন্ঠ, তার উপরে বদনামও আছে এলাকা জুড়ে। লোকে আড়ালে 'জালিম খাঁ' বলে ডাকে ওর বাবাকে। প্রিন্স আস্তে আস্তে মায়ের কাছে গেলো। ঝুট-ঝামেলায় মাথা গরম সাবিহার। কদুর তেলে মাথা চুপচুপা করে, ঘুমানোর জন্য বাতি বন্ধ করে একটু শুয়েছে - প্রিন্স গিয়ে মায়ের পায়ের কাছে বসলো। 'কীরে বাপ, সারাদিন কই কই টো টো করিস? তোর জন্য ঐ 'জালিম খাঁর গালাগালি খাই আমি। লায়েক ছেলে, বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, বাপের হাত বাটা উচিত না?'
'বিয়ে করবো না, মা।'
সাবিহা উঠে বসে। এই ভয়টাই তার ছিলো। 'কেন বাপ, কী হইছে? কেউ কিছু কইছে? কিছু লাগবে তোমার? নতুন গাড়ি না সেইদিন নিলা? যা চাও, একটু কথা শুনাইলেও তো তোমার বাপে সবই দেয়। তোমার মতো কপাল কয়টা ছেলের কও? সব বাপে কইরা দিয়ে যাইতেছে। যা করছে সারাজীবন পোলাপাইন নিয়ে বইসা খাইয়া যাইতে পারবা। তাইলে কী চাও আর?'
'বিয়ে করবো না মা।'
'কেন? তুমি বললা বইলাই তো আমরা আগাইলাম। এখন বিয়ে করবা না বললে চলে? তোমার কোনো পছন্দ আছে? সেওতো আমি জিগাইছি তোমারে। তুমিই তো না কইছো।'
'ভুল হয়ে গেছে মা।'
'কি ভুল হইছে? মাইয়ারে আংটি পরায়ে আইছি। বিয়ার দিন পড়ছে। কেনাকাটা হয়ে গেছে। গয়না গড়ানি শেষ। দাওয়াত দেওয়া শেষ। এখন আর এইসব বইলো না। তোমার বাপ একদম গাঁইড়া দেবে। মনে অশান্তি করে, বাপ? বিয়ের আগে ওইরকম অশান্তি সবার হয়। বৌয়ের মুখ দেখলে, দুইদিন -পাঁচদিন একসাথে কাটালে দেখবা সবঠিক হয়ে গেছে।'
এবার মরিয়া হয় প্রিন্স 'এই বিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব না, মা।'
এবারে সাবিহার অন্যরকম লাগে। 'তোমার কি কাউরে পছন্দ, বাপ?'
মায়ের কোলে মুখ ডুবিয়ে দেয় প্রিন্স। আস্তে করে বলে 'মিষ্টি, মা।'
'মিষ্টি? কোন মিষ্টি। জাফরিনের মাইয়া? ও তো কালো!' আঁতকে ওঠে সাবিহা। 'ওগো সাথে আমাগো আত্মীয়তা সম্ভব না, বাপ।'
'আমি মিষ্টি ছাড়া কাউকে বিয়ে করবো না, মা।' এবারে জেদ দেখায় প্রিন্স।
'আচ্ছা, আমি দেখতেছি কী করা যায়। তুমি ঘরে যাইয়া ঘুমাও।'
মা এতো তাড়াতাড়ি মেনে যাবে প্রিন্স ভাবেইনি। এবার মাই সামলে নেবে বাবাকে, এই বিয়েটাকেও! সাবিহা ভালোমতোই সামলে নিলো, তবে অন্যভাবে। ও জাফরিনকে ফোন দিলো। বেশ কুশলাদি বিনিময় হলো, প্রিন্সের বিয়ে কোথায়, কেমন মেয়ে এসব জানতে চেয়ে বিয়েতে আসার আগ্রহও প্রকাশ করলো জাফরিন। তখনই টেনে টেনে হেসে হেসে আর বিদ্রুপ করে সাবিহা বললো 'মেয়েরে তো পড়াশুনা করাই বিরাট চাকরি করাবা শুনছিলাম, বিরাট বিরাট নাকি পাশ দেয় মাইয়া! তো বাজারে উঠায় দিবা তাতো ভাবিনি কোনোদিন। এতো খয়রাতি আর অভাইব্যা নাকি তুমি?'
জাফরিনের জন্য এই বিশ্রী আক্রমন অপ্রত্যাশিত। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না ও। তারপর আস্তে করে বললো ' কেন, সাবিহা বু, আমার মেয়ে কী করছে?'
'কী আবার করবে, যা শিখাইছো তাই করছে। বড়লোকের পোলাগো মাথা খাওয়া শিখছে। কাইল বিয়া, পোলায় আজ কয়, মিষ্টিরে বিয়া করবে। আচ্ছা, ওইতো মাইয়ার চেহারা, আমার পোলারে ভুলাইলো কেমনে? তাবিজ - টাবিজ জানো নাকি তোমরা? নিজের মাইয়ারে সামলা, জাফরিন। আমার পোলার বিয়েতে আমি কোনো কেচরমেচর চাই না।'
'আমার মেয়ে আসলেই কিছু করেছে কীনা আমি জানিনা সাবিহা বু। তবে তুমি নিশ্চিত থাকো তোমার ওই অশিক্ষিত, গুন্ডা, লোফার ছেলেকে পাত্তা দেওয়া মেয়ে আমি পেটে ধরিনি। তোমাদের কাহিনি তো আর কম জানা নেই। বাজারের বেটির কাছে কে যায়? তোমার জামাইতো নাকী? সাত মাসের বাচ্চা পেটে মহিলারে পেটে লাথি দিয়ে মেরে ফেলা জল্লাদওতো তোমার স্বামিই নাকী? ওই নোংরা আস্তাকুঁড়ে আমার মেয়েরে আমি জান থাকতে থুথুও ফেলতে দেবো না, জেনে রাখো তুমি!'
মিষ্টি ভেবে রেখেছিলো অনার্সের রেজাল্ট এসে গেলে ও নিজেই বাবা-মাকে প্রিন্সের কথা জানাবে। এইভাবে এইদিক থেকে এতো নোংরাভাবে আঘাত আসবে ওর চিন্তারও বাইরে ছিলো। প্রিন্সও কোনো আভাস দেয়নি ওকে একবারও। জাফরিন এসে কথ্য অকথ্য ভাষায় ওকে বকলো। রাগে, দুঃখে জাফরিনের ভাষা শিষ্টাচারের বেড়া অতিক্রম করে গেলো। মিষ্টির চুলের মুঠো ধরে ফ্লোরে ফেলে লাথি মেরে মেরে গায়ের ঝাল ঝাড়লো 'পড়াশুনা বাদ দিয়ে নাঙ ধরার সখ হইছে আমাদের বলতি, খুঁজে এনে বিয়ে দিয়ে দিতাম, বাপের মানসম্মান রাস্তায় ঢাললি? ওই বদমায়েশ প্রিন্স রুচিতে এলো তোর?' মিষ্টি শুধু অঝোরে কাঁদলো - এ কী হলো!
সব ঘটনার নাটের গুরু প্রিন্স এসবের খবর পেলো না। ওকে বাড়ির ভেতর আটকে ফেলা হয়েছে টের পেলো না, পাহারাদার বসানো হয়েছে তাও বুঝলো না।
চলবে...
Afsana Asha
আগের পর্ব
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/850794105726087/

হিমেল বরকত সম্পাদিত রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর শ্রেষ্ঠ কবিতা।
নিখিল তাঁকে নরক-নগ্নতা দিয়েছিল অথচ সে চোখে রেখেছিল অমলিন দৃষ্টি।ভালোবাসার তীব্রতাকে যে কবি রূপ দিয়েছিলেন প্রতিবাদে,যিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্যের দ্রোহ আর প্রেমের কবি তিনিই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।পাঞ্জাবির সাথে জিন্সের প্যান্টকে যিনি বানিয়ে ছিলেন নিজস্ব পোশাক (যা রকস্টার গুরু জেমস পরে বিখ্যাত বানিয়েছেন) তিনিই বাংলা কবিতার বরপুত্র। রুদ্রর পিতৃ প্রদত্ত নাম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। ছোটবেলায় এই নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি। লেখালেখির জগতে এসে নামটি তিনি নিজেই বদলে দেন। নামের আগে যোগ করেন ‘রুদ্র’, ‘মোহাম্মদ’-কে করেন ‘মুহম্মদ’ আর ‘শহীদুল্লাহ’-কে ‘শহিদুল্লাহ’। নিজ প্রদত্ত এই নাম শুধু লেখক হিসেবেই নয়, পরীক্ষার সনদেও তিনি ব্যবহার করেছেন।শুধু নামের ক্ষেত্রে নয়,কবিতাতেও এই কবি এক নূতন বানানরীতির সৃষ্টি করেছিলেন।যা এখনো পাঠক মহলে বিশদভাবে গ্রহণযোগ্য।
১৯৭৩ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা "আমি ঈশ্বর আমি শয়তান"। কবি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র।বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে কিন্তু আজন্ম বাউন্ডুলে এই কবি নিজের ভাগ্যের চিত্রনাট্য লিখে ছিলেন নিজের হাতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে(ডাকসু) বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন প্যানেলের সাহিত্য সম্পাদক পদে লড়েছিলেন যদিও সেই নির্বাচনে বিজয়ী হন নি রুদ্র তবুও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থা অবিচল ছিল শেষ দিন পর্যন্ত।
ছাত্রজীবনেই ' উপদ্রুত উপকূল', 'ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম' নামে তাঁর দুইটি কাব্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কাব্যগ্রন্থগুলোর জন্য ১৯৮০-১৯৮১ সালে " মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরষ্কারও লাভ করেন তিনি।রুদ্র যখন টগবগে যুবক,কবিতাকে বেছে নিয়েছেন স্বপ্নের প্ররোচনা হিসেবে তখনি পরিচয় হয় তসলিমা নাসরিনের সাথে।পরিবারের অমতে বিয়েও করে নেন তিনি।বরাবরের মতো অনিয়ন্ত্রিত জীবন আর খামখেয়ালীপনায় এই সংসার খুব বেশি দিন টিকে নি।
বাউন্ডুলে এই কবির জীবনে নারীর আগমন ছিল অনেক,যারা তাঁর কবিতার নিয়ামক হিসেবে কাজ করতেন অনেক সময়।
রুদ্র ছিলেন সময় সচেতন মানুষ।১৯৭৫-১৯৯০ মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সংগঠিত হওয়া প্রায় সকল আন্দোলনে রুদ্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল।তিনি ছিলেন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সংগঠক।জাতীয় কবিতা পরিষদ,সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট,বাংলাদেশ সংগীত পরিষদের মত সংগঠন গুলো প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে রুদ্রর ভূমিকা ছিলো অপরিসীম।
রুদ্রের কবিতায় ছিল এক অন্যরকম জাদু।রুদ্র লিখেছেন প্রেমের কথা,দ্রোহের কথা,বিপ্লবের কথা।লিখে গিয়েছেন ধর্মের সমার্থক হবে ফসলের সুষম বন্টন। রুদ্রের কবিতা এখনো পাঠকের নিঃসঙ্গ রাতের এক অপার স্বস্তির নাম।
"হায়রে আমার বয়স হয় না,সংসারী মন পোক্ত হয় না।" বলা এই কবি আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন একজন কবি এবং কবি।পারিবারিক স্বচ্ছলতা থাকলেও নিজের চরম দারিদ্র্যতার মধ্যেও মুখাপেক্ষী হন নি কারো কাছে। লিখে গেছেন অসংখ্য গীতি কবিতা যা দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয়।
ব্যক্তিজীবনে খুবই অনিয়মিত জীবন যাপন করেছেন তিনি। উপার্জন করেছেন সামান্য আর টাকা উড়িয়েছেন দু'হাতে। রুদ্র’র সিগারেট আর মদ্যপ্রীতি ছিলো বলিহারী! হুইস্কির তিনি বাংলা নামকরণ করেছিলেন ‘সোনালী শিশির ‘।😉
অতিরিক্ত অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা,তুখোড় ধূমপান আর মদ্যপানের ফলাফলে শেষমেষ আলসারে পেয়ে বসেছিল রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে। পায়ের আঙ্গুলে রোগ বাসা বেঁধেছিল। এসবকে কখনোই গুরুত্ব দেন নি তিনি। ডাক্তার বলেছিলো পা বাঁচাতে হলে সিগারেট ছাড়তে হবে। তিনি পা ছেড়ে দিয়ে সিগারেট নিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।অসুস্থতা নিয়েও তিনি ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা পড়তে যেতেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি নিয়মিত আসতেন নীলক্ষেত-বাবুপুরায় কবি অসীম সাহার ‘ইত্যাদি’-তে। এ সময়টায় তিনি অনেক নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।
সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেছেন-
“কেউ তাকে সামান্য আশ্রয় দেয়নি। কেবল অসীম সাহা দিয়েছিল, নীলক্ষেতে তার টেবিলের বাঁ-পাশে রুদ্রকে একটা চেয়ার দিয়েছিল বসবার জন্য। রুদ্র সকাল, দুপুর, বিকেল ঐ একটি চেয়ারে নিমগ্ন বসে জীবন পার করতো।”
অসীম সাহার ওখানে যোগ দিতেন কবি মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, সাহিত্যিক আহমদ ছফা, চিত্রকর সমর মজুমদার, সঙ্গীতশিল্পী কিরণচন্দ্র রায়, কবি কাজলেন্দু দে প্রমুখ। একদিন এই আড্ডাতে রুদ্রকে আর উপস্থিত পাওয়া যায়নি। অসীম সাহার কাছ থেকেই সবাই জানতে পারেন রুদ্র পেপটিক আলসার বাঁধিয়ে হাসপাতালে। হাসপাতালের কেবিনে অসুস্থ রুদ্রকে দেখতে যান অনেকেই।
হাসপাতালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাংবাদিক আবু মাসুম মাসিক নান্দনিক পত্রিকায় লিখেন-
“আমার হাতে রজনীগন্ধার ডাঁটি দেখে রুদ্রর চোখজোড়া ভীষণ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। দেখি, পাশে বসে আছেন আহমদ ছফা। রুদ্রর এক হাত জড়িয়ে রেখেছেন তার হাতে। কথা বলছিল অল্প অল্প, মৃদুস্বরে। আহমদ ছফা বেরুনোর সময় রুদ্রর মাথায় হাত রেখে বললেন- তুমি তো ভালো হয়ে গেছো। আমি আবার আসবো। যাওয়ার সময় আহমদ ছফা একটা ইনভেলাপ রেখে গেলেন রুদ্রর বালিশের নিচে।”
হাসপাতালে সপ্তাহখানেক থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে কবি বাসায় ফেরেন। পরের দিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করতে কবি বেসিনে দাঁড়ান। হঠাৎ মুখ থুবড়ে বেসিনের উপরেই পড়ে যান। সিরামিকের বেসিন কবির ভার বইতে না পেরে গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। কবির ভাই ডক্টর মুহম্মদ সাইফুল্লাহ জানান, সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।১৯৯১ সালের ২১ জুন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ চলে যান অন্তিমশয়ানে তার চিরচেনা, শৈশবের স্মৃতিধন্য, মংলার মিঠেখালিতে।
জীবনের ভগ্নস্তূপ জুড়ে যিনি আজীবন সুন্দরের ছবি আঁকতেন সেই রুদ্র চলে গিয়েছিলেন খুব কম বয়সে। এই স্বল্প সময়েই তিনি রেখে গেছেন তার ছাপ, করে গেছেন ঋণী, বেঁধে গেছেন অমোঘ মায়ার বন্ধনে।
রুদ্রের আজ ৬৪ তম জন্মবার্ষিকী। জন্মদিনে বাংলা কবিতার বরপুত্রকে জানাই,
"তোমার কবিতা নিয়ে আমরা ভালো আছি,তুমি ভালো থেকো।"
© Raihan E Khan Shubho
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া,হিমেল বরকত সম্পাদিত রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর শ্রেষ্ঠ কবিতা।

গল্পঃ সম্পর্ক, বিয়ে; অতঃপর... (২য় পর্ব
আজকে আমার ফ্লাইট। নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট হলো আর আমি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আমেরিকায় এসে পৌঁছলাম। আমি রায়হানকে কল দিলাম।
হ্যালো রায়হান।
হ্যা কে বলছেন আপনি?
আমার গলা চিনতে পারছো না?
খুব চেনা লাগছে! কিন্তু...
কিন্তু নাম্বারটা আমেরিকার তাই তো।
হ্যা।
আমি আমেরিকায় আছি।
মানে?
মানে আমি আজকেই আমেরিকাতে পৌঁছেছি। আমি MD করতে আমেরিকায় আসবো তোমাকে বলেছিলাম তো।
আমার ছেলেমেয়ে কোথায়?
সবকিছু বলছি একে একে।
তোমার সাথে আমার আর কোনো কথা নেই। তুমি বলো আমার ছেলে মেয়ে কোথায়।
আরিয়ান ও আরিশা আমাদের বাসায় আছে। আর তোমার ড্রয়ারে একটা চিঠি আছে।
রায়হান সাথে সাথে কলটা কেটে দিলো। রায়হান চিঠিটার কথা শুনলো কিনা কে জানে?
আমি আর রায়হানকে কল দিলাম না। খুব কান্না পাচ্ছে আমার। আমার সবচেয়ে আপনজন আমার ভালোবাসার মানুষটির সাথে আমার মনোমালিন্য হয়েছে। আমার দুটি নয়নের মণিকে ছেড়ে আসার কষ্ট। এই সুদূর আমেরিকায় আমি একা, বড্ড বেশি একা। আমি কাঁদছি হাউমাউ করে কাঁদছি! বালিশে মুখ গুজে কত সময় ধরে কেঁদেছি বলতে পারবো না। আমার চোখের নোনা জল মুছে দেওয়ার মতো কেউ নেই এই দূর প্রবাসে। একটা সময় কান্না থামিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম, চোখের অশ্রু মুছে নিজেই নিজেকে বললাম, "ফারহানা তোকে কাঁদলে তো হবে না, তুই তো সবকিছু জেনেবুঝেই এই সংগ্রামী জীবন বেছে নিয়েছিস। তুই তো হাজার হাজার নারীর প্রতিবাদী উদাহরণ। তোকে যেন আর কখনো কাঁদতে না দেখি। তোকে অনেক শক্ত হতে হবে। তোর একটাই উদ্দেশ্য স্বপ্ন পূরণ এবং স্বপ্ন পূরণ। আজকের পর থেকে তুই অন্য কোনো কিছুর দিকে মনোযোগ দিবি না।"
হ্যা আজ থেকে আমার একটাই লক্ষ্য, আমার ঝিমিয়ে পড়া অস্তিত্বকে আবার জাগ্রত করা। আমি নিভে যেতে পারি না। আমি নিজেকে অনুপ্রাণিত ও সান্তনা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
মা, আরিয়ান আরিশা কেমন আছে? আরিশা খুব কান্নাকাটি করেছে তাই না?
ওরা খুব ভালো আছে, না একদমই কান্নাকাটি করেনি।
সত্যি বলছো মা?
হ্যা রে সত্যি বলছি।
ওরা এখন কি করছে?
ওরা ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।
কি বলছ মা তুমি, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা।
রায়হান গতকাল রাতেই গাড়ি নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আসে। তারপর নিজ হাতে আরিয়ান আর আরিশাকে খাইয়েছে। ওদের নিয়ে তারপর তোর রুমে ঘুমিয়ে পড়েছে।
রায়হান কিছুই বলেনি? কোনো রাগ দেখায় নি?
নারে মা। জামাইবাবাজি তো আগের মতোই আমাদের সাথে কথা বলল। আমি আর তোর বাবাও তো অবাক।
ও মাই গড ২০ টা মিসডকল! নিশ্চয়ই মা।
হ্যালো মা।
কতগুলো কল দিলাম কোথায় ছিলি?
মা কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মোবাইল সাইলেন্ট ছিলো। আচ্ছা এতগুলো কল কেন?
কি বলব বলতো, তুই কি বিপদে ফেলে গেলি আমাদের? গতকাল রাতে জামাই আমাদেরকে কল দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে। আমার তো বিশ্বাস হচ্ছিল না এটা কি সেই রায়হান।
তার মানে আমি এতক্ষন ধরে স্বপ্ন দেখছিলাম! রায়হান কি তবে চিঠিটা পড়ে নি? না কি চিঠিটার কথা ও শুনতে পায়নি, এর আগেই লাইন কেটে দিয়েছিল? নাকি চিঠিটা পড়ে ওর কোনো পরিবর্তন হয়নি! তাহলে তো...
কি বলছিস ফিসফিস করে?
কিছুনা, মা তুমি ধৈর্য্য ধরো, দেখো কি হয়।
আজকে ওরা আসবে আরিয়ান আর আরিশাকে নিতে। আমার তো খুব ভয় করছে। ওরা বাসায় এসে যদি আরো ঝামেলা করে।
তুমি চিন্তা করো না আমি ব্যারিস্টার আজমিরি সুলতানাকে সবকিছু জানাচ্ছি।
তাই কর।
আমি রাখলাম মা।
হ্যালো সুলতানা আপা।
হ্যা কেমন আছেন ফারহানা?
আপা ভালো না। রায়হান মা কে কল দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে।
এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে। রায়হান সাহেবের রাগ করাটাই তো স্বাভাবিক তাই না।
কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন চিঠিটা পড়লে রায়হান সবকিছু ভালোভাবে নিবে।
আপনাদের মাঝে যদি সত্যিকার ভালবাসা থাকে আর ডাঃ রায়হান যদি সত্যিই একজন সুপুরুষ হয়ে থাকে তাহলে পজেটিভ কিছু হওয়ারই কথা। হয়তো ডাঃ রায়হান চিঠিটা পড়েই নি।
তাহলে?
আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আর রায়হান আজকে আরিয়ান ও আরিশাকে নিয়ে যেতে আমাদের বাসায় যাবে।
সেটা আমি দেখছি কি করা যায়। আমি আপনাদের বাসায় যাবো, আমি সরাসরি কথা বলবো ডাঃ রায়হানের সাথে। তবে আমি অ্যাডভোকেট সেই পরিচয় দিবো না।
ঠিক আছে আপা, আপনিই আমার এখন ভরসা। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
বাবা রায়হান।
হ্যা মা বলো।
গতকাল রাতে কারসাথে এমন অভদ্র ভাষায় কথা বলেছিস?
ফারহানার মায়ের সাথে। ফারহানা আমেরিকা চলে গিয়েছে।
কি! কি বলছিস তুই?
হ্যা মা আমি সত্যিই বলছি। ও গতকাল আমেরিকায় পৌঁছে আমায় কল দিয়েছিলো। তাই ওর মাকে কল দিয়ে খারাপ ব্যবহার করেছি।
তুই বেয়াইনের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে গেলি কেন?
করবো না কেন? উনারা তো সব জেনেই ফারহানাকে সাপোর্ট করেছে। নয়তো ফারহানা এভাবে চলে যাওয়ার সাহস পায়?
কিন্তু ফারহানা তোকে আগে বলেনি? হঠাৎ করে কেন চলে যাবে? ফারহানা তো এমন মেয়ে ছিলো না। নিশ্চয়ই তোর সাথে কোনো ঝামেলা হয়েছে।
আমাকে বলেছিল ও আমেরিকায় স্কলারশীপ পেয়েছে। আমি ওকে নিষেধ করি যাওয়ার জন্য। কিন্তু ও জিদ করে যে আমেরিকা যাবেই। তখন আমি ওকে বলি যদি যেতে হয় তবে যেন আমাকে ডিভোর্স দিয়ে তারপর যায়।
আমার নাতি নাতনিরা এখন কোথায়?
ওরা আছে ঐ বাসাতেই। আমি যাবো একটু পর ওদের নিয়ে আসতে।আমিও যাবো তোর সাথে। কেমন মেয়েরে বাবা কাউকে কিছু না বলে আমেরিকা চলে গেল!
মা আমি ওকে ডিভোর্স দিবো।
কি বলছিস তুই?
হ্যা আমি ঠিকই বলছি। আমি এমন অবাধ্য, বেয়াদব মেয়েমানুষের সাথে আর সংসার করবো না।
এসব নিয়ে পরে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করা যাবে। আগে চল আরিয়ান ও আরিশাকে নিয়ে আসি।
ঠিক আছে তুমি রেডি হও। আমি একটু হাসপাতাল থেকে ঘুরে আসছি। কিছু মুমূর্ষু রোগী আছে।
ঠিক আছে তাড়াতাড়ি আসিস।
দুপুরের পর।
বেয়াই কি বলবো বলুন? কেমন মেয়ে আপনাদের আর আপনারাই বা কেমন মা-বাবা? মেয়ে একা সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউকে না জানিয়ে বিদেশ চলে গেল। আমরা ওর শশুর-শাশুড়ি এখনো বেঁচে আছি, আমাদেরকে অন্তত বলতে পারতো। কোন্ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়না বলতে পারেন? তাই বলে এভাবে বিদেশ চলে যাবে!
মা এসব নিয়ে উনাদের সাথে আর কোনো কথা বলার দরকার নেই। আমরা যে জন্য এসেছি সেটা বলো।
বেয়াই সাহেব আমার নাতি নাতনিকে নিয়ে আসুন আমরা ওদের এখান থেকে নিয়ে যাবো।
অবশ্যই আপনারা আপনাদের নাতি নাতনিকে নিয়ে যাবেন। কিন্তু এইমাত্র ওরা ঘুমিয়েছে। ওরা আগে ঘুম থেকে উঠুক। আপনারা বসুন আমি চা নিয়ে আসি।
না, আমরা বসবো না। আপনি ওদের ঘুম থেকে ডেকে তুলুন।
রায়হান সাহেব শান্ত হোন, আপনি এমন করলে বাচ্চাদের মনের উপর খারাপ প্রভাব পড়বে।
আপনি কে? আপনাকে তো চিনলাম না।
আমি আজমিরি সুলতানা, ফারহানার দু্ঃসম্পর্কের বড় বোন।
আমি তো আপনার সাথে কোনো কথা বলতে চাই না।
আপনাকে আমার কথা শুনতে হবে। আপনার সন্তানদের ভালোর জন্যই আপনাকে বলছি। আমি জানি আপনারা দুজন দুজনকে অনেক ভালোবাসেন। একটা ঘটনা ঘটে গেছে আপনার রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। তব এই বিষয়গুলো নিয়ে এমন ব্যবহার করবেন না যাতে এই ছোট্ট বাচ্চাদের মনের উপর কোনো নেগেটিভ প্রভাব পড়ে। বাবা হিসেবে এই মুহূর্তে আপনাকে ধৈর্য্য ধরতে হবে।
আপনি কি বলতে চাচ্ছেন?
আমি বলতে চাচ্ছি ওদের এখন ডেকে কাঁচা ঘুম ভাঙানোর দরকার নেই। আর ওদের জোর করে নেওয়ারও দরকার নেই।
আমি তো আমার ছেলেমেয়েদের কিছুতেই এখানে রাখবো না।
আমি তো বলিনি আপনি ওদের এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবেন না। আমি শুধু বলছি ওরা ঘুম থেকে উঠলে স্বেচ্ছায় যেতে চাইলে নিয়ে যাবেন। জোরজবরদস্তি করলে ওরা ভয় পেয়ে যাবে। আজ যেতে না চাইলে দুইদিন পর নিয়ে যাবেন। কেউ আপনাকে কোনো বাঁধা দিবে না।
রায়হান উনি বোধহয় ঠিকই বলছেন। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে কিন্তু তার প্রভাব যেন আমার নাতি নাতনির মনের উপর না পড়ে।
ঠিক আছে মা তুমি যা বলবে তাই হবে।
হ্যালো মা বলো।
রায়হান আর ওর মা এসেছিলো। আরিয়ান ওদের সাথে চলে গেছে।
আর আরিশা?
ও যেতে চায়নি তাই ওরা আরিশাকে রেখে গেছে। পরে এসে নিয়ে যাবে।
ওরা কোনো খারাপ ব্যবহার করেছে তোমাদের সাথে?
না কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি। তবে তোর শাশুড়ি অনেক কথা বলেছে।
কি বলেছেন?
এই যে তুই কাউকে না জানিয়ে চলে গেলি এটা ঠিক হয়নি। এইজন্য আমাদের দায়ী করলো। আমার তো এখন মনে হচ্ছে তোর কথা শুনে হয়তো ভুলি করেছি।
তুমি একথা বলছ মা?
হ্যা বলছি। কারণ তুই একটা মেয়ে, তাছাড়া তুই এখন একা না, তোর দুটি সন্তান রয়েছে।
মা আমি তোমাকে তো বলেছি আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য আমার আর কোনো উপায় ছিল না।
তোর শশুরবাড়ির লোকজন যখন জানতে পারবে বিষয়টা উনারা কিভাবে নিবে ভেবেছিলি? বেয়াই, বেয়াইন আমাদের কাছে জানতে চাইলে আমরা তখন কি উত্তর দেব? আমাদের তো মাথা নিচু করে চুপচাপ সব অপমান সহ্য করতে হবে। এই বিষয়গুলো তোর আগে ভাবা উচিত ছিল। বেয়াইন বারবার বলছেন তোদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ যাই হয়ে থাকুক শশুর-শাশুড়িকে অন্তত একবার জানানো উচিত ছিল।
মা এটা আমার ছোট একটা ভুল হয়ে গেছে। আর জানালেও রায়হান উনাদের কথা শুনত না। রায়হান কলেজে থাকতেই আমার পড়াশোনার বিষয়ে জেলাস ফিল করতো।
যাইহোক তোর শশুরবাড়ির লোকজনদের না জানিয়ে তুই এটা মস্ত বড় ভুল করেছিস। আর আমারও কেন জানি তোর স্বপ্ন পূরণের কথা শোনার পর এইসব বিষয় মাথা থেকে চলে গিয়েছিল।
মা একজন মেয়ের বিয়ের পর তার স্বামী হলো প্রধান অভিভাবক, বিপদ-আপদের ঢাল, স্বামী যদি স্ত্রীর পাশে না থাকে তাহলে একজন স্ত্রী খুব অসহায় হয়ে পড়ে। তখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে কঠিন হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। আমার দেয়ালে পিঠ আঁটকে গিয়েছিল। আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম। আর তুমি নিজেই তো বলেছিলে যে "ফারহানা, আমাকে বিয়ের পর শশুরবাড়ি থেকে অনুমতি না দেওয়ায় পড়াশোনা করতে পারিনি, কিন্তু তুই কখনো তোর পড়াশোনা ছেড়ে দিবি না।"
হ্যা বলেছিলাম, কিন্তু...
মা তুমি আমার উপর বিশ্বাস রাখো। সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখবে আমি যেদিন বড় ডাক্তার হবো অনেক নাম করবো সেদিন তোমার গর্বে বুকটা ভরে যাবে।
মা রে সবকিছুর পরেও মেয়েদের স্বামী ছাড়া জীবন পূর্ণতা পায় না। মানুষজন অনেক কথা বলবে।
মা আমি রায়হানকে অনেক ভালোবাসি, রায়হানও আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমি জানি ও আমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারবে না।
আমার বিশ্বাস ও চিঠিটা পড়লে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। যদি ঠিক না হয়ে যায় তবে আমি বুঝবো আমি ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলাম। আর একজন ভুল মানুষের জন্য তখন আমার আর কোনো খারাপ লাগা কাজ করবে না। ও এখনো চিঠিটা পড়ে নি হয়তো।
কিসের চিঠির কথা বলছিস?
আমি ওর জন্য একটা চিঠি লিখে রেখে এসেছি। মানুষ হয়তো রাগ করে কথা শুনতে চায় না কিন্তু লুকিয়ে হলেও চিঠি পড়ে।
আমার উপর একটু বিশ্বাস রাখো মা। আর আমাকে মানসিকভাবে একটু সাপোর্ট দাও আমি নিজেকে ঠিক প্রমাণ করবো। আর রায়হানও ঠিক বুঝতে পারবে ওর ভুলটা কোথায়। আর আমি আমার শশুর-শাশুড়িকে কল দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিবো। আমি বড় ডাক্তার হলে আমার শশুরবাড়ির লোকজন দেখবে আমাকে নিয়ে কত গর্ব করবে।
উনি তো আমার বিয়ের পর সবার কাছে বলতো "কপালগুণে এমন বৌমা পেয়েছি। কলেজের সেরা স্টুডেন্ট, চাকরির পাশাপাশি আমার কত সেবাযত্ন করে। সংসারের সব কাজ একা হাতে সামলায়।"
আরো কত কি।
কি জানি আল্লাহ জানে তোর কপালে কি আছে।
মা আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। আমি সবসময় নিজেকে সঠিক রেখেছি, সব দায়িত্ব পালন করেছি। কখনো বাইরে খারাপভাবে চলাফেরাও করিনি যাতে তোমাদের বা শশুরবাড়িবাড়ীর লোকজনের বদনাম হয়। আল্লাহ আমাকে অবশ্যই এর প্রতিদান দিবেন। আমি কখনো আল্লাহর উপর থেকে ভরসা হারাই নি। মা আরিশাকে দেখে রেখো। আমি এখন রাখছি।
কয়েকদিন পর।
বাবা রায়হান তুই তাড়াতাড়ি বাসায় আয়।
কেন কি হয়েছে?
আরিয়ানের হাত কেটে গেছে।
কিভাবে?
আমি দেখিনি ও কোথায় থেকে যেন একটা ব্লেড আর কাগজ দিয়ে খেলছিল।
ও মাই গড। আমিই তো শেভ করে ব্লেডটা ফেলতে ভুলে গিয়েছিলাম।
আমি এখনি আসছি।
আরো কিছুদিন পর।
মা কিসের শব্দ হলো?
আরিয়ান বল মেরে অ্যাকুরিয়াম ভেঙে ফেলেছে।
বেয়াদব ছেলে একটা থাপ্পর মেরে দাঁত ফেলে দিবো। অনেক দুষ্টুমি করো তুমি।
আরিয়ান কাঁদছে, আম্মু কখনো আমাকে মারে নি। আমি আম্মুর কাছে যাবো। দাদু আমাকে আম্মুর কাছে নিয়ে যাও।
রাতের বেলা খাবার টেবিলে।
রায়হান আরিয়ানের স্কুল থেকে অভিযোগ এসেছে।
কিসের অভিযোগ?
আরিয়ান ঠিকমতো পড়াশোনা করছে না। ওর কোনো হোমওয়ার্ক হচ্ছে না।
আমি কালই ওর জন্য টিচারের ব্যবস্থা করবো।
আরেকটা কথা বলার ছিল।
বলো।
আরিশাকে নিয়ে আসবি না?
কিভাবে আনবো মা? সবাই মিলে তো আরিয়ানকেই সামলাতে পারছিনা। থাক ওর নানুর কাছেই।
অনেক দিন হয়ে গেল আরিয়ানকে নিয়ে গেল ওর বাবা। এর মধ্যে অনেকবার আমি রায়হানকে কল দিলাম কিন্তু ও কল তুলে নি। আরিয়ান কেমন আছে আমি জানিনা। আমি প্রতিদিন মাকে কল দেই। রায়হান আরিশাকে নিতে আর আসেনি আমাদের বাসায়। আরিশা মায়ের কাছে ভালোই আছে।
বাবা রায়হান।
এতো রাতে কল দিয়েছেন কেন?
আরিশার খুব জ্বর কয়েকবার বমি করেছে। শরীর কেমন নীল হয়ে গেছে। তুমি একটু তাড়াতাড়ি আসবে? আমার মনে হয় ওকে এখনই হসপিটালে নিয়ে যাওয়া দরকার।
আপনার মেয়েকে জানান। আমাকে বলছেন কেন?
বাবা এখন রাগ করার সময় নয়। তুমি দয়া করে তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে আসো।
আমি এখনি আসছি আপনারা রেডি হোন।
ডাঃ রায়হান আপনার মেয়ের অবস্থা বেশী ভালো না। এখনি আইসিইউ তে লিফট করতে হবে। ওর খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে লাইফ সাপোর্টে দিতে হবে।
যা করতে হবে তাড়াতাড়ি করুন। যেভাবেই হোক আমার মেয়েকে বাঁচান।
আমাদের হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক আইসিইউ নেই।
তাহলে?
আপনি যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
চার দিন পর।
আরিশা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। ওকে এখন বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন।
অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে মাসুম ভাই।
সঠিক সময়ে নিয়ে আসায় আল্লাহ রহমত করেছেন। মেয়েটাকে একটু সাবধানে রাখবেন।
ঠিক আছে মাসুম ভাই।
মা, আরিশা এখন থেকে আমাদের বাসায় থাকবে।
ঠিক আছে বাবা তোমার মেয়ে তোমার যা ভালো মনে হয়। কিন্তু একবার ফারহানাকে জানাই।
সে আপনার মেয়ে আপনি তা ইচ্ছে করুন। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে চলে যাচ্ছি। ওর জন্যই আজকে আমার মেয়েটা মরতে বসেছিলো। ওকে আমি কখনো ক্ষমা করবো না।
হ্যালো ফারহানা।
হ্যা মা। আরিশা এখন কেমন আছে?
ও এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। ডাক্তার রিলিজ করে দিয়েছে।
যাক আলহামদুলিল্লাহ।
জামাইবাবাজি আরিশাকে নিয়ে যেতে চায়।
নিয়ে যাক তুমি কিছু বলো না ওকে।
ঠিক আছে বলবো না।
বাসায় ফেরার পর।
মা আমি ফারজানাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো। আমি ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলামের সাথে কথা বলেছি।
এটা কি ঠিক হবে?
ঠিক বেঠিক বুঝি না। আমি চাইনা ওর সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আর।
তোর হাতে এটা কিসের কাগজ?
উনি বিয়ের কাবিন নামা নিয়ে যেতে বলেছেন।
আরেকটু ভেবে চিন্তে দেখ।
আর ভাবার কিছু নেই।
ঐটা কিসের কাগজ পড়ে আছে?
দেখি দাও তো।
চিঠি! ফারহানার লেখা চিঠি।
কবে লিখেছে? কি লেখা আছে পড়তো।
দাঁড়াও এটা শুধু আমার জন্য লিখা। মনে হচ্ছে যাওয়ার আগে লিখে গেছে।
চলবে...
( ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)
লেখক: সাইফুল ইসলাম
https://m.facebook.com/groups/526513374820830?view=permalink&id=850540789084752

আমার দেখা রুদ্র ও নিবেদিতা ( ছোট গল্প)
রুদ্র কে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি,খুব সহজ-সরল ভালো মনের বালক,ক্লাসের টপ 5 এরমধ্যে একজন,যে সবসময় পরিপাটি হয়ে থাকতে প্রয়োজনের বেশি কখনোই কথা বলেনা, অপ্রয়োজনে এমনকি বাসা থেকে বের হতো না আমার দেখা মতে রুদ্র এখনো খুব ভালো ছেলে,
সে যখন নবম-দশম ছিল নিবেদিতা নামে একটা মেয়েকে খুব পছন্দ করত নিবেদিত ক্লাসের টপ ফাইভ এর মধ্যে একজন, নিবেদিত ছিল উড়নচণ্ডী চালাক প্র লেভেলের,নিবেদিতা খুব সহজেই সহপাঠী সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলে,বন্ধু হওয়ার পরে ছোটখাটো চিরকুট আদান-প্রদান এবং কি নিবেদিতা একদিন রুদ্রকে পছন্দ করে শব্দটি তাকে জানিয়ে দেয়,
রুদ্র সাতপাঁচ না ভেবে অনেকটাই নীরব থেকে সম্মতি জানায়, তারা একসাথে প্রাইভেট পড়ে,কলেজের সামনে ফুচকা আড্ডায় মেতে উঠে,হয়তো নিবেদিতা রুদ্রকে অনেক বেশি ভালোবাসতো, কিন্তু একদিন রুদ্র স্বাভাবিক চিন্তা থেকে দেখল যে তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে,আর তারা দুজনেই ভালো স্টুডেন্ট বিজ্ঞান বিভাগের টপ ফাইভ এ থাকে সবসময়,
রুদ্র চিন্তা করল যে নবম-দশম পর্যায়ে যেন পড়ালেখার কোন সমস্যা না হয় সেজন্যই রিলেশন থেকে সরে আসে, রুদ্র নিবেদিতার ভালোর জন্য রিলেশন থেকে সরে আসে, রুদ্র তাকে দিক নির্দেশন না করার ব্যাপারে অসম্মতি জানায়,
ব্যাপারটা এরকম ছিল যে রুদ্র ওর সামনে এমন ভাব করত মনে হয় ওকে দেখলেই এসে পৃথিবীর সবচাইতে বাজে বস্তু বাজে মানুষ সে দেখতো,দুনিয়ার সবচাইতে নোংরা অবহেলা রুদ্র করে যেত,আসলেই রুদ্র মন থেকে তাকে অনেক ভালবাসত শুধু নিবেদিতার ভালো ফলাফলের জন্য ভালো ক্যারিয়ারের জন্য এটা কখনোই প্রকাশ করেনি,
মেট্রিক পরীক্ষা শেষে একদিন রেজাল্ট হয় দুজনেই জিপিএ ফাইভ কে পাস করে,তাদের মধ্যে স্থান কত দূরত্ব হয়ে যায়, দুজনের ভালো কলেজে পড়ে;তখন একজনের কলেজ থেকে অন্যজনের কলেজের দূরত্ব প্রায় 200 কিলোমিটার,
ছেলেটি ওকে ভালোবাসতো পছন্দ করত কারন ওর জীবনে শুধু নিবেদিতা নামে মেয়েটা ছিল.উড়নচন্ডী মাঝে মাঝে টেক্সট করা হতো ,রুদ্র চেয়েছিল যে সে মেডিকেল কলেজে পড়বে, আর নিবেদিতা হয়তো চেয়েছিল কোন ভার্সিটিতে শিক্ষকতা করবেন,
যখন ইন্টার এর ফলাফল হয় দুজনেই ভালো ফলাফল করে, কিন্তু রুদ্র অল্পকিছু নাম্বারের জন্য হয়তো মেডিকেলে পড়াশোনা করতে পারেনি,নিবেদিতা ঠিকই দেশের নামকরা ইউনিভার্সিটি তে চান্স পায়,হয়তো রুদ্র তখন মানসিকভাবে হতাশ থাকে তাকে সাপোর্ট করার মত কেউ ছিলনা ,তাকে সাপোর্ট দেওয়ার মত নিবেদিত হারিয়ে গিয়েছিল ,তার অন্যতম কারণ রুদ্র হয়তো মেডিকেল কলেজে পড়তে পারেনি,এজন্য নিবেদিতা ঠিকই তার কাছ থেকে গুটিয়ে নেয়,
প্রকৃতপক্ষে রুদ্র সবসময় নিবেদিতার ভালো চাহিত,নিবেদিতার ভালোর জন্য সে মনের বিরুদ্ধে যোগাযোগ বন্ধ করে,
রুদ্র সবসময় মনে করতো যে যখন আমি ভালো মেডিকেলে চান্স পাবো,হয়তো তখন পারিবারিকভাবেই এ নিবেদিতা কে নিয়ে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখবো,হয়তো নিবেদিতা কাছে সব সময় রুদ্রর থেকে তোদের ক্যারিয়ার এর মূল্য বেশি ছিল,
রুদ্রা একদিন আমাকে বলে ভালোবাসাটা আসলে ভিন্ন এক জিনিস,আমিতো নিবেদিতার চেহারা দেখে ওকে ভালোবাসিনি, আজ যদি ওর চেহারায় আগুনে জ্বলছে যায় তাহলে কি আমি ওকে ভালোবাসবো না,আমারটা ভালোবাসা ছিল আমি হয়তো ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলাম,
নিবেদিতা আমার ক্যারিয়ারকে ভালবেসেছিল আমাকে না আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে,
ঈদের কয়েকদিন আগে শপিং এ গিয়েছিল রুদ্র,হঠাৎ করে পিছন থেকে নিবেদিতা এসে জিজ্ঞেস করে কিরে কেমন আছিস, রুদ্র বলে জি ভালো এই শব্দ টা বলেই পিছনে না তাকিয়ে শপিং মল থেকে বাইরে চলে আসে,
হয়তো সেদিন কি আমার দেখা সবথেকে আশ্চর্যজনক একটি দিন,কারণ সেদিন আমি দেখেছি রুদ্র এর চেহারায় রাগ কি করে ফুটে উঠে, দিন শেষে রুদ্র শুধু নিবেদিতার ভালই চায় সব সময় শুভ কামনা জানা, তার কোন আক্ষেপ অভিযোগ নেই,
রুদ্ধ তাকে মনে ও রাখেনি তার কারণ সে এভাবে ব্যাখ্যা করে, ভালো মানুষদের মনে রাখা যায় ,কিন্তু দুনিয়ার সবথেকে নিকৃষ্ট মানুষ যারা যাদের সবকাজে স্বার্থ জড়িত তাদের মনে রাখাটা দায়,

Colour
আমি জন্মগত ভাবে কালার ব্লাইন্ড না। সব রঙ ই মোটামুটি সুন্দর দেখতে পারি৷ এরপরও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় "প্রশ্নবিদ্ধ কিন্তু" এই রঙ প্রসঙ্গে।
ছোট বেলা তে মা বাবা কী সুন্দর করে রঙ চিনিয়েছিলো, সবুজ, হলুদ, লাল, নীল। এরপর রঙধনু।
কিন্তু তখনো জানতাম না, ফ্যাশনের ক্ষেত্রে এই রঙ এর ব্যাবহার যে কতটা ভয়াবহ।
প্রথমেই আসি আমার জীবনের প্রথম প্রশ্নবিদ্ধ রঙ "পেস্ট কালারে।"
আমার বোন পেস্ট কালার খুব পছন্দ করতো। এই পেস্ট কালার টা যে কী কালার আমি বুঝতাম না।
ছোট বেলায় বাসায় পেপসজেল টুথপেষ্ট ইউজ করা হতো। আমার বাবা আবার ইউজ করতো সাদা পেস্ট। পেপসজেল লাল হতো, নীল হতো, সবুজ হতো, আর বাবার পেস্ট সাদা। সুতরাং আমার ভেরি ক্লিয়ার লজিক্যাল মাইন্ডে এই পেস্ট কালার টা ছিলো অদ্ভুত এক রঙ। পরে দেখলাম সবুজ আর নীলের খুব সাবধানী মিশ্রন এই পেস্ট কালার। ভাই, এই কালারের পেস্ট আমি এখন পর্যন্ত ইউজ করি নাই।
এরপর আসে ক্রীম কালার। এ এক মহা গ্যাঞ্জামের কালার। একবার বন্ধুর ক্রীম কালারের বাসা খুজতে গিয়ে স্কুল লাইফে আমার ঘাম ছুটে গিয়েছিলো। আমার মাথায় ক্রীম তো সাদাই। হয়তো সাদা কে আদর করে ক্রীম ডাকা হয়।
কারন, ছোট বেলায় বাবার শেভিং ক্রিম এর কালার ছিলো সাদা। এরপর জানলাম, এটা এডিবল ক্রীম কালার।
এ তো আরো গ্যাঞ্জাম! এডিবল ক্রীম কালার তো সাদা, হ্লুদ সহ নানান রঙ এর দেখেছি! এই ক্রীম কোন ক্রীম।
পরে দেখলাম অফ হোয়াইট কালার একটু এদিক ওদিক করলে ই ক্রীম কালার।
সবুজের যে কত প্রকার কাহিনি আছে, বিশ্বাস করা কঠিন! ফিফটি শেডস অফ গ্রীন!!
শেডের তারতম্য করে বিভিন্ন মেয়ে দের মুখে জামার রঙ সিলেকশনে দোকানীদের বলা কত গুলো সবুজ শুনেছি একটু বলি।
১) পেপে কালার
২) কচি ডাব কালার
৩) বাচ্চা টিয়া কালার
৪) পুই শাক কালার
৫) কলা পাতা কালার (এটা আবার কচি ও হয়, কলা পাতা কালার এবং কচি কলা পাতা কালার)
৬) ঘাস কালার
ভাই! পেপে কালার বললে আমি ১০০% ভাবতাম পাকা পেপের ভিতরের রঙ। আর পুই শাক কালার!! এইটা কোনো কথা!!
একবার শাড়ির দোকানে আম্মার সাথে গিয়েছি।
পাশে এক নতুন বিয়ে করা দম্পতি। বউ টা বলছে আমাকে চকলেট এর মধ্যে ক্রীম দেখান।
জামাই বলছে, কফি টা ট্রাই কর! বা ডার্ক চকলেট আর স্ট্রবেরি কম্বিনেশন?
আল্লাহর কসম ভাই! শাড়ির দোকানে না থাকলে এই ডায়লগ শুনলে আমি শিওর ভাবতাম আমি কোনো কফি শপে এসেছি!
দোকানি বলে উঠলো, ম্যাডাম, পিয়াজের মধ্যে চকলেট টা দেখেন। ভালো লাগবে।
না! কফি শপ না।
পিয়াজ বেচারার আবার দুই ঘটনা, পিয়াজ নিজে একটা রং, আবার পিয়াজ কলি একটা রং। আমি পিয়াজ কলির রঙ নিয়ে কনফিউজড। এটা তো সবুজ!
বাচ্চা টিয়া যেমন একটা রঙ সেভাবে রং এর ও বাচ্চা বুড়া আছে। যেমন বেবী পিংক। বাচ্চা গোলাপি।
বেবি গ্রীন। বাচ্চা সবুজ।
বঙ্গবাজারে এক মহিলা দোকানি কে "ক্র্যানবেরী" কালারের টপস দেখাতে বল্লো। আপা রে! ক্র্যানবেরীর রং নিয়ে আমারই আইডিয়া কম, গুলিস্তানের দোকানি হা করে তাকিয়ে থাকবে না তো করবে টা কী!!!
কিছু কিছু ফ্যাশন সচেতন মেয়ে আছে যারা কালারের নাম বলার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক
এরা লাল বলবে, কালো বলবে, নীল ও বলবে
কিন্তু গোলাপী বলবে না। বলবে পিংক। হলুদ বলার প্রশ্ন ই আসে না, ইয়েলো। আবার ম্যাজেন্টা।
কেউ কেউ দোকানী দের ভড়কে দেবার জন্য ইচ্ছে করেই জটিল সব ইংরেজি কালার বলে,
ভারমিলিয়ন, ক্রিমজন - ভাই রে! দুই টা ই গাঢ় লাল!
অনেক ইংরেজি কালারের নামে বেশ একটা স্মার্ট ব্যাপার থাকে, যেমন শকিং ব্লু, শকিং গ্রীন
এই গুলা আসলে বাংলায় কি জানেন? বীভৎস নীল, ভ্যাকাইট্টা সবুজ। আবার গাড়ির রঙের ক্ষেত্রে ব্যাপার গুলো হয়ে যায় ইলেক্ট্রিক রেড মানে ক্যাটক্যাটা লাল।
যাই হোক, মাঝে মাঝে কিছু মানুষ অতিব ফ্যাশন করতে গিয়ে পুরা ব্রেকফাস্ট টা জামার দোকানে উগড়ে দেয়।
চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, মেয়োনিজ কালার, বাটার কালার, বিন কালার, এগ ইয়োক কালার।
থামেন! কথা আছে, অনেক হইসে!! এগ ইয়োক টা মানতে পারলাম না।
ভাই! কোনো কথা!!! যে মুরগী টা ডিম পারে, সেও তো মাথা ঘুরনা দিয়ে পড়ে যাবে। ডিমের কুসুমের রঙ লাল হয়, কমলা হয়, হলুদ হয়।
আবার হাসের ডিম এর কুসুম আলাদা টাইপের লাল।
এক দোকানে খুব স্মার্ট টিন এজড মেয়ে ভাব নিয়ে বল্লো, বেবি কর্ন কালারের কিছু দেখান।
দোকানি তার এক্সপেরিয়েন্স দিয়েও মার খেয়ে গেলো। বেবি কর্ন কালার টা বুঝতে পারছে না।
আমি দ্রুত নেট সার্চ দিয়ে দেখলাম মিস্টি হলুদ কালার টা ই বেবী কর্ন। যাক, আমার জ্ঞানের ভান্ডারে একটা নতুন রঙ পেলাম।
তবে ব্যার্থতা আমারো আছে, বাংগালীর অতি পরিচিত ফিরোজা কালার আমি চিনতে পারি নাই।
আমার বউ দোকানে ফিরোজা কালারের নাম বলতেই আমি সার্চ মারলাম। গুগল সব সময় হেল্প করে না।
সে দেখালো ফিরোজা বেগম, নজরুল সঙ্গীত শিল্পীর নাম। নামকরা শিল্পী। হামিন, শাফিনের মা।
একবার এক আন্টিকে উদভট একটা কালারের নাম বলতে শুনেছি। তেতুল কালার। পরে বুঝলাম তেতুল বিচি কালার। মানে আবারো সেই ফিফটি শেডস অফ চকলেট!!! তেতুল বিচি কালার, কফি কালার এরা ভাই বোন।
একটা শেষ কাহিনি বলে শেষ করি। নিউমার্কেট এ শার্ট দেখছি। একমেয়ে দোকানির সাথে তর্ক করছে,
"আরে, আপনাকে বললাম কালো জমিনে সাদা দেখাতে, আপনি সাদা জমিনে কালো দেখাচ্ছেন কেনো! বেশী বুঝেন!"
দোকানীও ফাল পেরে উঠলো, "আপা, আমি কালো জমিনেই দেখাচ্ছি।"
আমি তাকালাম। কাপড় টা অবিকল দাবা বোর্ডের মতো।।
মেয়ে টা সাক্ষী বানাতে আমার দিকে তাকালো, আমি কেটে পড়লাম
মালয়েশিয়ায় ম্যাকের বিশাল শোরুম। নাম করা দোকান। সেফোরা।
আমার বউ কসমেটিকস কিনছে।
লিপস্টিকের সেকশনে এসে আমি বুঝলাম জীবনে আসলে অনেক রং দেখা বাকি আছে!!
এক লাল দিয়ে যে এতো কালার থাকতে পারে, আমার ধারনা ছিলো না!!
আমার বউ তিন চার টা অবিকল এক রঙ এর লিপস্টিক নিচ্ছে। আমি সরল মনে বললাম, তোমার বুঝি এই কালার টা পছন্দ খুব?
ও খুব ই অবাক হয়ে বল্লো, এক রকম কালার মানে!!! চার টা চার কালারের!!! কালারও চেনো না!!!
আমি উদাস গলায় বললাম, "আমি হালকা কালার ব্লাইন্ড। আমাকে দিয়ে কখনো কালার ট্রাই কইরো না।"
অন্য দিকে হাটা দিলাম।
-সাব্বির আহমেদ ইমন
বুয়েট

আলো_আধাঁরলেখা- তোহা কবির
১.
পুরো বাড়িতে কোলাহল আর মিউজিকের শব্দের কারণে ফোনে কথা বলতে না পেরে ছাদে চলে এল রিয়াদ। আজ ওর ভাই রাজিবের বিয়ে। ওর ইমপটেন্ট কল আসায় বিয়ে ছেড়ে ছাদে আসতে হয়েছে ওর। এখানে বেশ নিরিবিলি নিচের শব্দ কম আসছে। এক কোণায় দাড়িয়ে কথা শেষ করে নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ফিরতেই সিগারেটের বোটকা গন্ধ নাকে এসে লাগলো ওর। বিয়ে বাড়িতে সবাইকে লুকিয়ে নিশ্চয়ই কেউ সিগারেট খাচ্ছে। পাত্তা না দিয়ে চলে যেতে চাইলেও কৌতুহল দমাতে না পেরে পা টিপে ছাদের অন্য প্রান্তে গিয়ে দাড়ালো রিয়াদ। যা দেখলো তাতে অজান্তেই মুখ হা হয়ে গেল ওর। পায়ের কছে ছোটখাটো একটা সিগারেটের স্তুপ নিয়ে রেলিংয়ের উপর পা ঝুলিয়ে বসে সিগারেট খাচ্ছে একটা মেয়ে। অবশ্য মেয়ে বললে ভুল হবে একটা পরি বললে বোধহয় বেশি মানানসই হবে। এর আগে সাদা চামড়ার মহিলাদের সিগারেট কেন মদ ও খেতে দেখেছে ও। কিন্তু কোনো বাঙালি মেয়েকে প্রথমবার এ অবস্থায় দেখে অবাকই হলো সে। আরেকবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করে নিল মেয়েটাকে। অসম্ভব সুন্দরী একটা মেয়ে। লাল ফর্সা চেহারার সাথে বড় কালো একজোড়া চোখ। যদিও চোখের নিচে কালি পরেছে। সিগারেট খাওয়ার পরেও ঠোটঁ দুটি গোলাপিই আছে। মাথাভর্তি ঘন কালো চুল পিঠের উপর ছাড়ানো। যদিও বেশি লম্বা নয়। তবুও পারফেক্টলি মানিয়েছে মেয়েটির সাথে। আরেকটু খেয়াল করতেই বুঝতে পারলো মেয়েটির চোখে পানি চিকচিক করছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মেয়েটিকে যে এতক্ষন যাবত ও দেখছে সেটা মেয়েটি এখনো খেয়াল করেনি। রিয়াদ আরো কয়েক কদম এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে। ওর পাশে গিয়ে দাড়ালো। একবার ফিরে তাকিয়ে ওকে দেখে নিল মেয়েটি কিন্তু আবার মুখ ফিরিয়ে সিগারেট টানায় মনোযোগ দিল। পাশেই বড় অবহেলায় তিন প্যাকেট সিগারেট আর একটা লাইটার পরে রয়েছে। আর সিগারেটের ছোট্ট স্তুপটার পাশে আরো কয়েকটি খালি প্যাকেট দেখতে পেল ও। ও নিজেও সিগারেট খায় তবে দিনে একটার বেশি খেলেই যেখানে ওর গা গুলিয়ে ওঠে সেখানে এই মেয়েটি এতগুলো সিগারেট খেয়ে ফেলেছে দেখে ওর চোখ বের হওয়ার যোগাড় হলো। মেয়েটা সিগারেটে একটার পর একটা টান দিয়েই যাচ্ছে। হঠাৎ রিয়াদের মেয়েটার হাতের দিকে চোখ পড়লো। কয়েকটা কাটার দাগ। কেউ অনেক রাগ নিয়ে ব্লেড দিয়ে কেটেছে বলে মনে হচ্ছে। মেয়েটাই কি? মেয়েটার চেহারা যেমন ওকে মুগ্ধ করেছে তার চেয়ে বেশি মেয়েটার বিহেভিয়ার আর হাতের এই দাগ মেয়েটার সম্পর্কে জানার জন্য ওকে কৌতুহলি করে তুলেছে। এর আগে মোট চারবার এ বাড়িতে এসেছে ও। ওর ভাবীর প্রায় সব আত্মীয়র সাথেই পরিচিত হয়েছে ও কিন্তু একবারও এই মেয়েটাকে দেখেনি। কে এই মেয়েটি? এ বাড়ির কেউ নাকি......এমন সময় সিড়িতে কারো আসার শব্দ পেয়ে সরে অন্য পাশে পানির ট্যাংকের পিছনে একটু আড়াল করে দাড়ালো রিয়াদ। এখান থেকে মেয়েটাকে স্পষ্ট দেখা গেলেও ওকে কেউ দেখতে পাবেনা। ছাদের গেট দিয়ে ওর নতুন ভাবীকে আসতে দেখে ও একটু অবাকই হলো। ওর ভাবী সোজা মেয়েটার কাছে চলে গেল। হাত ধরে মেয়েটাকে রেলিং থেকে নামিয়ে পাশে থাকা দোলনায় বসালো। মেয়েটা হাত থেকে সিগারেটের টুকরোটা সাথে সাথে ফেলে দিল কিন্তু তার মুখে কোনো অপরাধবোধ নেই। মেয়েটা সরাসরি রিয়াদের ভাবীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। ওর ভাবীর গায়ে বিয়ের শাড়ি গহনা থাকাতেও যেন কারোই কোনো সমস্যা হচ্ছেনা। এমন সময় আরেকজন ছাদে আসল হাতে প্লেট আর একটা পানির বোতল। সে একটা চেয়ারের উপর প্লেট আর বোতল রেখে আবার নিচে নেমে গেল। এবার ওর ভাবী মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
দিয়া উঠে বোস তো দেখি নিশ্চয়ই কিছু খাওয়া হয়নি তোর।
তুইও আমায় ছেড়ে চলে যাবি বড়াপু।
এই প্রথম মেয়েটির কন্ঠ শুনতে পেল রিয়াদ। মেয়েটার নাম তাহলে দিয়া। আর ভাবীকে আপু বলছে তারমানে ভাবীর বোন। কিন্তু ভাবীর সব বোনের সাথেই তো কথা বলেছে ও। ফাজলামিও করেছে কিন্তু একে তো একবারও দেখেনি। সেসব চিন্তা আপাতত মাথা থেকে সরিয়ে আবারও মেয়েটার দিকে মনোযোগ দিল রিয়াদ মেয়েটা উঠে বসেছে। ওর ভাবী মেয়েটাকে খাইয়ে দিচ্ছে। মেয়েটা খাচ্ছে আর কাদঁছে। ওর ভাবীর চোখও শুকনো নেই। হঠাৎ মেয়েটি বলল,
আর তুই আমাকে খাইয়ে দিবিনা তাই না বড়াপু?
কে বলেছে দেবোনা। আমি তো একেবারে চলে যাচ্ছি না। মাঝে মাঝেই তো তোর দুলাভাই কে নিয়ে এ বাড়িতে আসবো।
কিন্তু আমি তো আর আসবো না এ বাড়িতে।
কেন?
তোমার শশুরবাড়ির কেউ এমন কি দুলাভাইকে ও আমার সম্পর্কে কেউ কিছু জানায়নি তার কারণ আমি জানি না ভেবেছ আর তাছাড়া আমিও চাইনা তারা জানুক। এ বাড়ির সম্মানের জন্য নয় কিন্তু শুধু তোমার জন্য বড়াপু। আজকের পর থেকে এ বাড়ির সাথে আর কোনো সম্পর্কই রাখবোনা আমি।
খুবই ঠান্ডা গলায় কথাগুলো বললো দিয়া। হিয়া কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
কেন এগুলো বলছিস দিয়া তুই দেরি করে আসলি আবার এসেই সারাক্ষন নিজের ঘরে ঢুকে বসে ছিলি এ কারণেই তোর সাথে কারো পরিচয় করাতে পারিনি। আর তাছাড়া আসবি না মানে কি এটা কি তোর বাড়ি না?
যে বাড়িতে আমার আপন বলে কেউ নেই সে বাড়ি আমার না।
কে বলেছে আপন কেউ নেই? সবাই তোকে খুব ভালোবাসে। আর আমিও তো চিরদিনের জন্য যাচ্ছি না। আমার তো এটা ভেবেই দম বন্ধ লাগছে তোকে ছাড়া আমি থাকবো কিভাবে?
পারবি থাকতে বড়াপু তোর এখন একটা সংসার হবে। সংসারের চাপে ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক আমাকে তোর ভুলতেই হবে দেখেনিস।
দিয়ার কথায় চুপ করে গেল হিয়া। দিয়া ভুল কিছু বলেনি। ওর শশুরবাড়ির লোকেরা কেমন ও জানেনা। তারউপর ও বাড়ির বড় বউ হবে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই মা চাচিমাদের মুখ থেকে এই নিয়ে একগাদা উপদেশ শুনে ফেলেছে ও। তাই বিয়ের পর যে ওর কি অবস্থা হবে সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তবে বাড়ির বড়মেয়ে হিসেবে সবাইকে আগলে রাখার গুনটা বেশভালো ভাবেই আছে হিয়ার। আর এখানে হিয়ার করারও কিছু ছিলনা। বাবা এসে বলল তোর বিয়ে ব্যাস কবে কার সাথে এখন কেন? প্রশ্ন গুলো মনের মধ্যে চাপা দিয়ে শুধু মাথা উপর নিচ করে চলে এসেছিল হিয়া। এবাড়িতে বাবার মুখের উপর কথা বলার মতো সাহস কারো নেই শুধুমাত্র দিয়া ব্যাতিক্রম। অবশ্য ও কথা কোথায় বলে সবসময় পালিয়ে বেড়ায়। ভয় পায় খুব। কিন্তু কেন যেন দিদার চৌধুরীও ওকে এড়িয়ে চলতে চায়। ওর কিছুতে বাধাঁও দেয় না। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে আবারও দিয়াকে খাওয়ানোতে মনোযোগ দিল হিয়া। ওর এই বোনটার মনে অনেক অভিমান জমা হয়ে আছে। যেগুলো দুর করা ওর পক্ষে সম্ভব হয়নি বা সাহস হয়নি। মাঝে মাঝে মনে হয় এমন কিছু যদি পেত যা দিয়ে ওর এই বোনটার সমস্ত দুঃখ এক নিমিষেই দূর করতে পারতো। যদি একটা রাজপুত্র....আর ভাবতে পারলোনা একবার তো পস্তাতে হয়েছে আবারও সেইম প্রসঙ্গ এনে নিজের বোনটাকে হারাতে চায়না ও তাই মনের ইচ্ছা মনেই মাটিচাপা দিয়ে বর্তমান কাজে মনোযোগ দিল ও। দিয়াও কোনো কথা বলছে না চুপচাপ বোনের হাতে খেয়ে যাচ্ছে। হয়তো এরপর ওর বড়াপুর ওকে খাওয়ানোর সময় হবেনা। এখন ওর মনে হচ্ছে চিৎকার দিয়ে কাদেঁ। কিন্তু তা ঠিক হবেনা। খাওয়া শেষে দুবোনই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নিরবতা ভেঙে হিয়া বলল,
তুই কি এমনই থাকবি?
হয়তো।
আমার জন্য কি নিজেকে একটু হলেও চেন্জ করতে পারবি না?
তুমি কিন্তু ওয়াদা ভঙ্গ করছ বড়াপু।
কিন্তু এতে তোর ভবিষ্যৎ.......
উফ্ কতবার বলব আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই এ নিয়ে আর আমাকে কিছু বলবে না তাহলে আমি আমার ওয়াদা ভেঙে ফেলবো।
ঠিকআছে। কিন্তু আমি এখানে যখন আসবো শুধু তখন এ বাড়িতে আসিস প্লিজ।
আচ্ছা আসবো।
আর আজ আমার সাথে ও বাড়িতে যাবি তুই?
না।
আর কথা বাড়ালো না হিয়া। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল শুধু।
রিয়াদ ওদের কথায় কিছুই তেমন বুঝতে পারলো না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছে মেয়েটা প্রচন্ড ডিপ্রেসড্। এই মেয়েটার কেইসটা যে করেই হোক জানতে হবে। নিজের মনেই ভাবলো রিয়াদ। তারপর আরো কিছু জানার উদ্দেশ্যে ওদের দিকে মনোযোগ দিল। কিন্তু আর কিছুই জানা গেল না। একটু আগে যিনি খাবার রেখে গিয়েছিলেন তিনি এসে তার ভাবীকে বলল,
বড়আফা এক্ষনই নিচে চলো তোমারে খুজবো সবাই।
দিয়া চল আমার সাথে।
কিন্তু বড়বাবা রাগ করবে তো।
করবে না আমি বোঝাবো তুই না গেলে আমিও যাবোনা।
তুমি এতো জেদি কেন বলোতো?
তোর বোন তো তাই। এখন চল।
বলেই দিয়ার হাত ধরে নিচে নিয়ে গেল হিয়া। রিয়াদও কিছুক্ষন পর নেমে এলো। যা জানার ভাবীর কাছ থেকেই জানবে ও। এখন বিয়েটা মিটে যাক।
চলবে.........

#গল্পঃ সম্পর্ক, বিয়ে; অতঃপর... (১ম পর্ব
আমি ডাঃ ফারহানা, পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক, তারপর বিয়ে এবং এগারো বছর একসাথে চলা অতঃপর আমার হাজব্যান্ড ডাঃ রায়হানকে ডিভোর্স দিতে আজকে আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমিরি সুলতানার চেম্বারে এসেছি।
ভিতরে আসতে পারি?
হ্যা অবশ্যই, ভিতরে আসুন।
ধন্যবাদ।
আপনি?
জ্বী আমি ডাঃ ফারহানা।
ওহ্ গতকাল রাতে তাহলে আপনিই কল দিয়েছিলেন?
জ্বী।
আচ্ছা বসুন আগে। এবার বলুন কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?
আমি আমার হাজব্যান্ড ডাঃ রায়হানকে ডিভোর্স দিতে চাই।
উনার বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগ কি?
কোনো অভিযোগ ছাড়া কি আমি ডিভোর্স দিতে পারিনা?
হ্যা পারেন, আপনি আপনার হাজব্যান্ডকে ডিভোর্স দিতে চাচ্ছেন ভালো কথা কিন্তু একজন আইনজীবী হিসেবে আমাকে জানতে হবে কেন আপনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
রায়হানের সাথে আমার পক্ষে সংসার করা আর সম্ভব নয়।
ঠিক আছে, আপনি আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দিন।
বলুন কি জানতে চান?
আপনার স্বামী কি আপনার সাথে কোনো দূর্ব্যবহার কিংবা আপনাকে মারধোর করে?
না আমার স্বামী কখনোই আমার গায়ে হাত তুলে নি।
তাহলে কি আপনার শশুর বাড়ীর লোকজন আপনাকে কোনো শারীরিক নির্যাতন বা যৌতুকের কোনো বিষয় আছে?
না এমন কোনো সমস্যা নেই।
আপনাদের বিয়ে কি পারিবারের পছন্দে হয়েছিল?
আমরা দুজন দুজনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি।
উনার কি এখন অন্য কোনো মেয়ের সাথে পরকীয়া আছে?
না, ও এমন পুরুষ না।
তারপরও পুরুষ মানুষের মনের কথা বলা যায় না। কত বছরের সংসার আপনাদের?
এইতো আগামী মাসে ছয় বছর পূর্ণ হবে।
আপনাদের ছেলে মেয়ে কয়জন?
ছেলেটার বয়স পাঁচ বছর আর মেয়েটার বয়স দুই বছর এখনো হয়নি।
আশ্চর্য! আপনারা দুজন দুজনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন, ছয় বছর সংসারও করেছেন আবার দুটি সন্তানও আছে তাহলে এত বছর পর কি এমন ঘটলো যে, আপনি আপনার হাজব্যান্ডকে ডিভোর্স দিতে চাচ্ছেন?
শুনুন তাহলে।
এইচএসসি পাশের পর আমি একটা সরকারি মেডিকেল কলেজে চান্স পাই। সেখানেই রায়হানের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আমরা দুজনেই ব্যাচম্যাট ছিলাম। দুজনেই খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। আমাদের মাঝে পড়াশুনা নিয়ে সবসময়ই প্রতিযোগিতা চলত কে কার চেয়ে ভালো করব। তবে বেশিরভাগ সময়ই আমি রায়হানের চেয়ে এগিয়ে থাকতাম। এই নিয়ে ও খুব মন খারাপ করতো। প্রতিযোগিতা করতে করতেই একসময় দুজন দুজনকে ভালোবেসে ফেলি। আমরা দুজনেই তখন পড়াশুনার বিভিন্ন বিষয়ে একে অপরকে সাহায্য করতাম। কলেজ লাইফটা আমাদের হাসি আনন্দে ভালোই কেটে যায়। এমবিবিএস কোর্স শেষে আমরা দুজন দুটি প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি নেই। বেশ কিছু দিন পর আমাদের দুই পরিবারের সম্মতিতে আমরা বিয়েও করি। বেশ ভালোভাবেই আমাদের সংসার জীবন কাটছিলো। পরিবারে আমার শশুরবাড়ির লোকজনদের সাথে আমার নিজের পরিবারের মতোই আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার শশুর-শাশুড়ি আমাকে অনেক স্নেহ করতো। আমার কখনো মনেই হতো না যে আমি শশুর বাড়িতে আছি। ছয় মাস ভালোভাবে পার হলো। আমাকে ও রায়হানকে প্রায়সময় রাতেও ডিউটি করতে হত। আমাদের আলাদা আলাদা সময়ে ডিউটি পড়তো। যার জন্য আমাদের দুজনের একসাথে থাকা খুব কম হতো। আর এই বিষয় নিয়ে প্রথম কথা বলা শুরু করল আমার শাশুড়ি। বাড়ীর বউ রাতে বাড়ীর বাইরে থাকে আর স্বামী একা একা থাকে, এসব কেমন জীবন! আরো অনেককিছুই বলতো তখন। এরপর আস্তে আস্তে রায়হান নিজেও বলতো যে আমাকে ঠিকমত কাছে পায় না। ওর খুব কষ্ট হয়। তারপরে আমি যতটুকু সম্ভব রায়হানের সাথে ব্যালান্স করে ডিউটিগুলো করতাম। আরো কিছু দিন পর আমরা বেবী নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি যখন কনসিভ করি তখনও চাকরি করেছি। আর রায়হান তখন চাকরির পাশাপাশি পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্স FCPS এ ভর্তি হয়ে যায়। আর আমি মা হবার কোর্সে ভর্তি হলাম। তখন রায়হান এত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লো যে আমার সাথে তেমন একটা দেখাই হতো না। আমার প্রেগন্যান্সির পুরো সময়টা আমি একাই লড়াই চালিয়ে গেছি। রায়হান পড়াশোনা এবং হাসপাতালের কাজে ব্যস্ত থাকতো বলে আমি ওর কাছে কোনো অভিযোগ করিনি। আমি ব্যালান্স করে নিয়েছিলাম। আমার ছেলে হওয়ার পর শশুর-শাশুড়ি আমাকে যথেষ্ট পরিমাণে যত্নআত্নি করেছেন। প্রেগন্যান্সি এবং প্রেগন্যান্সির পর কয়েকমাস আমি চাকরি করিনি। ছেলেটা একটু বড় হলে শশুর শাশুড়ির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আমি আবার চাকরিতে যোগ দেই। আমার ছেলের বয়স যখন এক বছর হলো তখন আমি রায়হানকে বলি যে, আমিও FCPS করবো। রায়হান তখন আমাকে সাপোর্ট করলো না। বলল একসাথে বাচ্চা, চাকরি আবার FCPS করতে পারবো না। ও বললো, "মায়ের শরীর বেশি ভালো যাচ্ছেনা সংসারের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। তাছাড়া ছেলেটা ঠিকমতো তোমাকেও পাচ্ছে না আমিও সময় দিতে পারি না। মা এসব নিয়ে আমাকে অনেক কিছু বলে।"
আমি ওকে বলি আমিও উচ্চতর ডিগ্রি নিতে চাই।
রায়হান তখন আমার উপর রেগে যায় "তাহলে চাকরি ছেড়ে দাও, নয়তো তোমার মায়ের কাছে আরিয়ানকে রেখে যেও।"
আমার ছেলের নাম আরিয়ান।
আমি তাই করলাম আমার ছেলেকে আমার মায়ের বাসায় রেখে রেখে চাকরি, FCPS করতে লাগলাম। এই নিয়ে রায়হানের সাথে এবং শাশুড়ির সাথে বেশ কয়েকবার আমার কথা কাটাকাটিও হয়েছে। কিন্তু আমি আমার পড়াশোনা ও চাকরি কোনোটাই বন্ধ করিনি।
এভাবেই চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ করে একদিন শাশুড়ির হার্ট অ্যাটাক হলো। আমার উপর সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ল। আমি সকালে রান্না করে বাসায় সবাইকে খাইয়ে দিয়ে হাসপাতালে শাশুড়ির সেবা করতাম। আবার আমার ডিউটিও থাকতো। ছেলেটাকে মায়ের বাসায় রেখে যেতাম। তখন রায়হান বলেছিল ওর কোর্সটা বন্ধ করে দিতে। কিন্তু আমি বললাম "তুমি মাঝপথে চলে এসেছ, এখন পিছিয়ে আসা ঠিক হবে না। আমি সবদিক সামলে নিতে পারব। আমিই বরং কোর্সটা বন্ধ করে দেই। পরে আবার সুযোগমতো করব। তুমি তোমার লক্ষ্য পূরণে মনোযোগ দাও।" এইভাবে সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার FCPS কোর্সটা আর করা হলো না। রায়হানের চেয়েও বেশি মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলাম আমি। রায়হান FCPS কোর্স শেষ করে রেজাল্ট পেয়ে যেদিন মিষ্টি নিয়ে আসলো সেদিন অনেক খুশি হয়েছিলাম। সেইসাথে নিজের জন্য আমার খারাপও লাগছিল। আমার অনেক ইচ্ছা ছিল আমি উচ্চতর ডিগ্রি নিবো। যাইহোক আমি সব কষ্ট ভুলে গিয়ে শুধু চাকরি, ছেলে আর সংসার নিয়েই জীবনে সুখী হবার চেষ্টা করলাম।
কিছু দিন পর আমি আবার কনসিভ করি। আর এবার রায়হান FRCP করতে আয়ারল্যান্ডে সুযোগ পেল। কিন্তু আমি প্রেগন্যান্ট, শাশুড়ি মা অসুস্থ এই অবস্থায় ও যেতে চাইলো না। ও কিছুতেই দেশের বাইরে যাবে না সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। শেষে আমি অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে ওকে আয়ারল্যান্ড যেতে রাজি করাই। ও চলে যাওয়ার পর আমার একটা মেয়ে হয়। আমার মেয়ের নাম আরিশা। ছেলে-মেয়ে লালন পালন, শশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা, চাকরি করে সংসার চালানো সবকিছু একসাথে সামলেছি। যতোই সমস্যা হোক, যতোই কষ্ট হোক আমি কখনো রায়হানকে কিছু জানাইনি। আমি চাইনি ওকে কোনো চিন্তা দিতে। আমি শুধু চেয়েছি ও কোর্সটা ভালোভাবে সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসুক। ও ভালোয় ভালোয় FRCP কোর্স শেষ করে দেশে ফিরেও আসে। দেশে এসে একটা বড় হাসপাতালে প্র্যাকটিস করা শুরু করে দিল। আমি তখনও MBBS সার্টিফিকেট নিয়ে ডিউটি ডাক্তার হিসেবে চাকরি করছি।
এবার রায়হান আমাকে বললো, "এই কয়েকটা বছর তোমার উপর অনেক ধকল গেছে এবার চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে শুধু ছেলেমেয়েদের মানুষ করার জন্য চেষ্টা করো।"
আমি রায়হানকে বলি "আমি আমার ডাক্তারি পেশা ছাড়তে পারবো না। আমি আরো উচ্চতর ডিগ্রি নিতে চাই। স্কুল জীবন থেকেই আমার স্বপ্ন আমি অনেক বড় একজন ডাক্তার হবো।"
রায়হান তখন আমাকে ভালোমন্দ কিছুই বললো না।
ও ওর মত চেম্বার করছে আর আমি আমার মতো করে চাকরি করছি। সেইসাথে দেশের বাইরে MD করার জন্য এপ্লিকেশন করতে লাগলাম।
অনেক চেষ্টা করার পর আমেরিকায় MD করার জন্য স্কলারশিপ পেয়েও যাই। আমি আমার এত বড় সু-সংবাদটা প্রথমে রায়হানকে জানাই। ভেবেছিলাম রায়হান জেনে খুব খুশি হবে। কিন্তু না রায়হানের মুখ কালো হয়ে গেল। রায়হান বলল,
ছেলেমেয়েদের কে মানুষ করবে? সংসার, মা-বাবা উনাদের কে দেখাশোনা করবে? তুমি কোথাও যেতে পারবে না। আর তোমার চাকরি করারও দরকার নেই।
আমি প্রতিবাদ করি,
এ তুমি কি বলছো রায়হান? আমি সবকিছু ছেড়ে দিবো!
হ্যা, তুমি সংসার আর ছেলে মেয়েদের দেখাশোনা করো। তোমার আর চাকরি বা পড়াশোনা করার প্রয়োজন নেই।
রায়হান আমি ছোটবেলা থেকে একজন বড় ডাক্তার হবার স্বপ্ন দেখেছি। এইজন্য আমি অনেক পড়াশোনা করতে চাই।
তুমি পারবেনা।
আমি পারবোনা? তুমি ভুলে গেছো যে, আমি তোমার চেয়েও ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। আমি MD করবোই।
তুমি যেযেতু আমার কোনো কথাই শুনবে না তাহলে তুমি দেশেই করো।
আমার ইচ্ছে আমি দেশের বাইরে করবো।
না তুমি করতে পারবে না।
একশো বার করবো।
তুমি কিন্তু জেদ করছো ফারহানা।
হ্যা আমি আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য জেদই করছি।
রায়হানের সাথে আমার অনেক ঝগড়া হয়। ও আমাকে থাপ্পর মারতেও চেয়েছিলো। কিন্তু পরে আর মারে নি। সেদিনের পর আমার আর রায়হানের মাঝে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। আমি কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। একদিকে ছেলে-মেয়ে, সংসার আরেক দিকে আমার ছোটবেলা থেকে লালন করা স্বপ্ন।
আমি কিভাবে দুই কুল বাঁচাবো বুঝতে পারছিলাম না।
আরো কিছুদিন পার হয়ে যায়। আমি রায়হানকে বললাম,
আমি কি করবো?
আমি তো যা বলার বলে দিয়েছি।
কিন্তু আমি তো বিদেশ যেতে চাই।
তাহলে একেবারে আমাকে ছেড়ে চলে যাও।
কি বলতে চাচ্ছ তুমি?
যদি তোমার বিদেশ যেতেই হয় তবে আমি তোমাকে ডিভোর্স দিবো। তোমার সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আমার সন্তানদেরও তোমার সাথে কোনো সম্পর্ক থাকবে না।
তোমার সন্তান মানে? ওরা আমার সন্তান। আমি যখন এই ছয়টা বছর একা একা ওদের বড় করেছি কোথায় ছিলে তুমি? তুমি বাবা হয়ে কোনো দায়িত্ব পালন করেছ?
আমি কেন দায়িত্ব পালন করতে পারিনি তা তুমি ভালো করেই জানো।
তুমিই আমাকে FCPS বন্ধ করতে দাওনি। তুমিই আমাকে বিদেশ যেতে বাধ্য করেছ।
হ্যা আমি করেছি, আমি তোমার স্বপ্ন পূরণের জন্য সাহায্য করেছি। আমি নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছি তোমার জন্য। আমি তোমার পাশে না দাঁড়ালে তুমি আজকে দেশ সেরা একজন ডাক্তার হতে পারতে না। তোমার অবর্তমানে তোমার সন্তানদের, তোমার মা-বাবার সবার দায়িত্ব আমি একা পালন করেছি।
একজন স্ত্রী হিসেবে একজন মা হিসেবে এসব দায়িত্ব পালন করা তোমার কর্তব্য।
আচ্ছা ঠিক আছে তোমার কথা মেনে নিলাম এসব আমার কর্তব্য। কিন্তু তোমার কি কোনো কর্তব্য নেই?
আমি তো তোমাকে বলেছি এখন পরিবারের সব দায়িত্ব আমার, আমি সব টাকা পয়সা দিবো। তুমি শুধু তাদের দেখাশোনা করো।
টাকা দিলেই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? আর আমার স্বপ্ন? আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য তুমি সাহায্য না করে উল্টো বাঁধা দিচ্ছ?
দেখো ফারহানা আমি এসব নিয়ে তোমার সাথে আর কথা বলতে চাই না। তোমার যদি বিদেশ যেতেই হয় তবে সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে তবেই যাবে।
সব তো শুনলেন। আর এইজন্য আমি রায়হানকে ডিভোর্স দিতে চাই। আপনি সব কাগজপত্র তৈরি করুন।
হুম বুঝলাম সবকিছু। আপনি এবার শান্ত হোন আর আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
হ্যা বলুন।
আপনি তো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যেভাবেই হোক বিদেশ যাবেন।
হ্যা।
আপনি এক কাজ করুন, আপনি আপনার মেয়েকে আপনার মায়ের কাছে রেখে বিদেশ চলে যান।
আর আমার ছেলে? আমি কিছুতেই আরিয়ানকে ওর হাতে তুলে দিতে চাই না।
আপনাদের তো ডিভোর্স হবে না।
মানে?
মানে আমি আপনাদের ডিভোর্স করাবো না।
কি বলতে চাচ্ছেন আপনি, আর কি করতে চাচ্ছেন?
আমি বলতে চাচ্ছি আপনি আপনার হাজব্যান্ডকে ডিভোর্স না দিয়ে, উনাকে না জানিয়ে বিদেশ চলে যাবেন।
এতে করে তো পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
দেখুন আপনাদের প্রায় এগারো বছরের সম্পর্ক।
তাতে কি?
সম্পর্ক এত ঠুনকো নয় যে এত সহজে ভেঙে যাবে। আপনার কথা শুনে আমার মনে হয় আপনারা দুজন দুজনকে অনেক ভালোবাসেন। যা বলছেন আর যা করতে চাচ্ছেন সবকিছু রাগ থেকেই। দেখুন চাইলেই একটা সম্পর্ক ভেঙে ফেলা যায়। কিন্তু একবার ভেঙে গেলে সে সম্পর্ক কিন্তু আর জোড়া লাগানো যায় না। তাই আমি যা বলি তাই করুন।
ঠিক আছে বলুন, আপনি আমার আইনজীবী আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে।
আপনি আপনার ছেলেকে আপনার শশুরবাড়ীতে আর মেয়েকে আপনার মায়ের কাছে রেখে আমেরিকা চলে যাবেন। আর যাওয়ার আগে আপনার হাজব্যান্ডকে শুধু একটা চিঠি লিখে যাবেন।
শুধু একটা চিঠি!
হ্যা শুধু একটা চিঠি। আর চিঠিতে কি লিখবেন, কিভাবে লিখবেন সেটার বিষয়ে আমি আপনাকে সাহায্য করবো। তারপর কি করতে হবে সবকিছু আমি বুঝিয়ে বলছি।
ব্যারিস্টার আজমিরি সুলতানা আমাকে কিভাবে চিঠি লিখতে হবে তা বুঝিয়ে বললেন। আজমিরি সুলতানার পরামর্শ আমার পছন্দ হলো।
এখন আপনি আপনার ফ্লাইট কনফার্ম করতে পারেন। আপনি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিন। আমাদের প্ল্যানিং যদি সফল না হয় অথবা পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যায় তাহলে আপনারা পরবর্তীতে নাহয় আলাদা হয়ে গেলেন।
ঠিক আছে। আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে। আমি তাহলে আসি আজকে।
আমি ব্যারিস্টার আজমিরি সুলতানার চেম্বার থেকে বের হয়ে জরুরী কিছু কেনাকাটা সেরে নিলাম। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিলাম। আর সবকিছু করেছি রায়হানকে না জানিয়ে। এখনও রায়হান আর আমার মাঝে কথাবার্তা হয়না। আগামী ২৭ তারিখে আমার ফ্লাইট। আমি মাকে সবকিছু খুলে বললাম। মা প্রথমে আমার সিদ্ধান্ত সাপোর্ট করলো না। কিন্তু ভালোভাবে বুঝিয়ে বলার পর আমার পাশে থাকবে বলে আস্বস্ত করলো।
আমি চিঠিটা লিখে ড্রয়ারে রেখে দিলাম। আরিয়ান রাতে ওর চাচ্চুর সাথেই থাকে। ওকে নিয়ে আমার তেমন কোনো চিন্তা নেই। একটু কষ্ট হবে প্রথম প্রথম কিন্তু ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে। এখনও আরিয়ান কিছুই জানে না।
আগামীকাল আমার ফ্লাইট তাই আমি আরিয়ান ও আরিশাকে নিয়ে মায়ের বাসায় চলে এলাম।
আমি আরিয়ানকে বুঝিয়ে বললাম যেন বাবার কথা শুনে চলে। আর ঐ বাড়ীতে ওর দাদা, দাদু, চাচ্চু সবাই আছে। সবাই ওকে চোখে চোখে রাখবে। আর মা আরিশাকে দেখে রাখবেন।
আজকে আমার ফ্লাইট। নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট হলো আর আমি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আমেরিকায় এসে পৌঁছলাম।
আমি রায়হানকে কল দিলাম।
চলবে....
(ভুলত্রুটি মার্জনীয়)
লেখক: সাইফুল ইসলাম

ঘাসফুল
পর্বঃ ৯
দুইদিন মুখ গোমড়া করে থাকার পর আকাশের আজ মন ভালো। মিষ্টির মতো। পূর্বের ঘরটা মিষ্টির, নতুন ভোরের প্রথম ঝকঝকে রোদটা তাই সবার আগে এসে ওকেই একঝলক দেখা দিয়ে তারপর অন্য কাজে যায়। শুক্রবার সকালে মিষ্টির কোচিং থাকতো। ফজরের নামাজের পড়ার জন্য ঘুম ভাঙলেও আজকের মতো এই ঝকঝকে রোদ টা সময় নিয়ে উপভোগ করা হয়নি।
শুক্রবার সকালের নাস্তাটা এ বাড়িতে দুপুরের আগ পর্যন্ত চলে। রান্নাবান্না কিচেনে চলতে থাকে, এদিকে ডাইনিং টেবিলে গল্পগুজবও চলতে থাকে। জুম্মার নামাজের পর খাওয়া দাওয়া শেষ হতে হতে দুপুর তিনটে পেরিয়ে যায়। খাওয়া দাওয়া শেষ করেই তাওহীদ ভাইয়া তাগাদা দিলো মিষ্টিকে রেডি হয়ে নিতে।
কিন্তু রুমে শান্তি মতো তৈরি হওয়া এক প্রকার দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘যাস না মিষ্টি যাস না। একটাবার আমার কথা শোন। রাজশাহীতে আমি ভালো ভালো ছেলে দেখে এসেছি, একবার আমাকে নিউমার্কেট নিয়ে চল শুধু!’ তখন থেকে চেচিয়ে যাচ্ছে মিষ্টি আলু।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিজাব পিন লাগাতে লাগাতে মিষ্টি আলুর প্রতিবিম্বের দিকে মুখ বাকালো মিষ্টি।
‘তোমার কথা তো শুনছিই।’ শ্রাগ করে বললো।
‘ও ছেলে তোকে কাঁদিয়ে ছাড়বে বলছি তো। ওকে মনে জায়গা দিস না, তোর মনটাই পুড়িয়ে দেবে। যাস না।’ বললো মিষ্টি আলু।
একথা শুনে হা হয়ে গেল মিষ্টি।
‘আমার খেয়ে, আমার পড়ে আমাকেই এতবড় অভিশাপ! দুধকলা দিয়ে এতোদিন ধরে সাপ পুষেছি আমি।’ কপাল ঠুকতে ঠুকতে বললো মিষ্টি।
‘তুমি আমাকে কি খেতে দাও আর কি পড়াও গো শুনি? আমি তোমার কিছুই নেইনা। ভালোয় ভালোয় দুটো কথা বললাম তাতে আমাকে সাপ বলে দিতে বাধলো না তোমার?’ আহত স্বরে বললো মিষ্টি আলু।
এবার মিষ্টি একটু শান্ত হলো। মিষ্টি আলুর পাতাগুলোয় হাত বুলালো।
‘তুমি যে আমার..কাজিনের নামে কূটনামি করলে এতক্ষণ সেটার বিচার কে করবে?’ প্রশ্ন করলো মিষ্টি। মিষ্টি আলু মিষ্টির সামনে আর তেমন কিছু বললো না। মিষ্টি বেরিয়ে যেতে কাঁদোকাঁদো গলা করে বললো,
‘কাজিন না আমার নকল মাটি!’
বিকেলের দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিলো তাওহীদ। প্রথমে সদরঘাট পর্যন্ত গেলো ওরা, সেখান থেকে ঘন্টায় দু’শ টাকা ভাড়ায় কাঠের নৌকা ঠিক করলো। মিষ্টি নৌকায় উঠতে অভ্যস্ত। ওকে উঠতে সাহায্য করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আগেই তাওহীদ অবাক হয়ে দেখলো মিষ্টি নৌকায় উঠে পড়েছে।
“তুমি তো দেখছি নৌকায় উঠতে অভ্যস্ত।”
মিষ্টি নৌকার শেষ মাথায় পাটাতন এর উপর বসলো।
“রাজশাহীতে থাকতে শীতকাল ছাড়া পদ্মার পারে যতবার গেছি ততবারই নৌকায় চড়ে ওপারে চর থেকে ঘুরে এসেছি। নদী আমার খুব পছন্দ।” হেসে সাড়ম্বরে বললো মিষ্টি।
সাদা একটা আনারকলি পড়ে এসেছে সে, সাথে সাদা চুড়িদার, ওড়না। মাথায় ধূসর রঙের একটা হিজাব খুব সুন্দর করে বাধা। হাতে একগাছি রং-বেরঙের চুড়িও পড়েছে। ওর মুখোমুখি বসলো তাওহীদ। এসব নৌকায় ছাউনি থাকেনা, পুরোটা খোলা পাটাতন। মাথায় পড়ন্ত সূর্যটাকে নিয়ে শান্ত ধীরস্থির কালচে পানিতে নৌকা চলা শুরু করলো। জায়গাটা চিরায়ত ঢাকার কোলাহল, হই-হট্টগোল থেকে অনেক দূরে।
এখানকার স্থানীয়রা কাঠের নৌকায় যাতায়াত করছে, তবে তারাও যেন নদীর নীরবতাটা নিজেদের মধ্যে গেথে নিয়েছে। এখানকার মানুষগুলোর জীবনযাত্রা অন্যরকম। নদীই এদের জীবন। তাওহীদ আঙুল তাক করে দেখালো দূরে আহসান মঞ্জিল দেখা যাচ্ছে, একসময়ের ঢাকার নবাবেরা যেখানে থাকতো।
“জানেন, ছোটো থাকতে প্রতি শুক্রবার বিকালে বাবা পদ্মা গার্ডেনে নিয়ে যেত । একটু বড় হওয়ার পর ভাইয়া সাথে নিয়ে যেতো। তারপর কলেজে ওঠার পর বাজার এলাকাতেই সবকয়টা প্রাইভেট শুরু করলাম। তাই প্রায়ই প্রাইভেট শেষে বিকালে নদীর পাড়ে হাঁটতে যেতাম। পদ্মা নিশ্চয়ই আমাকে খুব মিস করে এখন।” নদীর শীতল জলধারায় আঙুল ডুবিয়ে দিয়ে বললো মিষ্টি। পানিটা ভীষণ ঠান্ডা, হাতটা শিউরে উঠলো ওর।
হাসলো তাওহীদ। “নিশ্চয়ই করে।”
“হাসলেন কেন? কোনো সন্দেহ আছে? আমি চলে গেলে আপনি আমাকে মিস করবেন না?” পানি নিয়ে খেলতে খেলতে জিজ্ঞেস করলো মিষ্টি।
“তুমি কোথায় যাবে?এখন তো তুমিও আমাদের জাহাঙ্গীরনগরেরই একজন ।”
মিষ্টি খেয়াল করলো তাওহীদ সরাসরি ওর কথার উত্তর দিলো না।
“বারে! আমার বাসায় যেতে হবেনা! আমিতো শুধু তিনমাসের প্রিপারেশন নিয়ে এসেছিলাম। অ্যাডমিশনের জন্য ডকুমেন্টস গুলোও আনতে হবে।”
“ঠিক আছে।” বললো তাওহীদ। নৌকা ততক্ষণে মাঝ নদীতে চলে এসেছে। মাঝে মাঝেই দুলে উঠছে। নদীর একূল ওকূল সমান দেখা যাচ্ছে। খোলা বাতাস ফুসফুস ভেদ করে ভেতরে গিয়ে হৃদযন্ত্রটাকে শীতল করে দিচ্ছে। মাঝি আপনমনে উদাস ভঙ্গিতে দাঁড় বেয়ে যাচ্ছে।
“এবার বলো পদ্মা বেশি সুন্দর না বুড়িগঙ্গা?” খানিকক্ষণ পর জিজ্ঞেস করলো তাওহীদ।
যেন এতে কোনো সন্দেহই নেই এমন একটা ভাব করে মিষ্টি বললো,
“অবশ্যই পদ্মা।”
তাওহীদ ভাইয়া আহত ভাবে তাকাতে তারপর বর্ণনার সুরে বললো, “সৌন্দর্যের দিক দিয়ে পদ্মা বেশি সুন্দর। তবে এই নদীটার আলাদা একটা জীবন আছে, নদীটাকে ঘিরে ব্যস্ত একটা জীবনযাত্রা আছে। একঘণ্টা এখানে থাকলে মনে হবে অন্য একটা দুনিয়ায় এসে পড়েছি। এই নদীটাও আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। এখানে যদি রোজ আসা যেত।” শেষের কথাটা মন খারাপ করে বললো মিষ্টি।
“রোজ মিস রাজশাহী?” একটা ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো তাওহীদ।
ওর মুখে মিস রাজশাহী কথাটা দারুণ লাগলো মিষ্টির। তারপর দিগন্তের পানে চেয়ে বললো,
“রোজ না হোক, বছরে হয়তো একদিন।”
“তোমার যখন আসতে ইচ্ছে হবে আমাকে বলবে। আমি নিয়ে আসবো।” বললো তাওহীদ।
“ইশ! আপনি কত ব্যস্ত! আমি বললেই নিয়ে আসবেন কেন!” হেসে উঠলো মিষ্টি।
“দুটো কারণ আছে।” চিবুকে হাত রেখে চিন্তা করে বললো তাওহীদ। “প্রথমত, তোমার জন্য আমি ফ্রি।” দৃঢ়ভাবে বললো তাওহীদ।
মিষ্টি কয়েক পলক তাকিয়ে থাকলো।
তাওহীদ ভাইয়াকে আজকাল ঠিক চোরাবালির মতো লাগে ওর। বালির ভাজে ভাজে সম্পৃক্ত হয়ে থাকা পানি, যা একবার টেনে নিলে বেরিয়ে আসার আর কোনো উপায় থাকে না। অন্তত মুভি গুলোতে তো তাই দেখায়। চোরাবালি কোথাও আছে জানলে কাছে না যাওয়াই নিরাপদ। যদিও বিজ্ঞান বলে চোরাবালি মোটেও অতটা ভয়ংকর না যতটা টিভি-সিনেমায় দেখানো হয়। চোরাবালির ঘনত্ব মানুষের শরীরের থেকে বেশি, কাজেই সেখানে ডুবে মরা সম্ভব না। আর অদ্ভুতভাবে মিষ্টির মনটা ফিকশন থেকে ফ্যাক্টেই বেশি বিশ্বাসী এক্ষেত্রে, তাই সেও দূরে সরে থাকতে চায়না।
কিন্তু মাথাটা বলে দূরে থাকতে। যতটা দূরে গেলে চোরাবালি একদম টানতে পারবে না ততটা দূরে। ডুববে কি ডুববে না সেতো আপেক্ষিক ব্যাপার। ভয়ের কথা হলো ডুববে জেনেও মিষ্টির অবচেতন মন সেই টানের দিকে পা বাড়াতে থাকে। বাড়াতেই থাকে। একসময় যখন সচেতন মনটা জেগে ওঠে ততক্ষণে মিষ্টি কোমর অবধি চোরাবালিতে ডুবে গেছে। সেখান থেকে টেনে তোলার জন্য তাওহীদ ভাইয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। মিষ্টি ভালোবাসা হয়তো বোঝে না, কিন্তু সেই টানটা বোঝে। সেই একই বিপজ্জনক টান যার কারণে তাওহীদ ভাইয়ার মতো মানুষও ঠিক-বেঠিকের শীর্ণ রেখাটা গুলিয়ে ফেলেছিল৷
এভাবে বলতে নেই। মনে মনে বললো মিষ্টি।
“কেন বলতে নেই?” জিজ্ঞেস করলো তাওহীদ।
অমনি স্তম্ভিত ফিরলো মিষ্টির। সে কি জোরে বলে ফেলেছে কথাটা?
তাওহীদ মুখের সামনে তুড়ি বাজালো।
“কি হলো?”
“বলতে নেই কারণ.. কারণ বললেই কি আর আসা যায়। কত দূর মিরপুর থেকে সদরঘাট।” বললো মিষ্টি।
“আমি কিন্তু আসবো বলেই বলেছি। তোমার সাথে শুধু নদী না, আরও অনেক কিছু দেখতে ইচ্ছে করছে আমার। কেন বলতো?” বললো তাওহীদ।
“কেন?” রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো মিষ্টি। হার্ট টা মনে হয় একটা বীট মিস করে তাল হারিয়ে ফেলেছে। তাওহীদ ভাইয়ার সাথে ঘুরতে আসায় ওর হৃদযন্ত্রটা বড় বিপদে পড়েছে, যখন তখন বীট মিস করছে।
“মেয়েদের সাথে কোথাও বেড়ানো মানে জায়গাটা উপভোগ করা কম,ছবি তোলা বেশি। তুমি প্রথম মেয়ে দেখছি যে আসার পর থেকে শুধু নদী দেখতে আর নদীর বাতাস খেতেই ব্যস্ত আছো। তুমি ছবি তোলো না কেন বলো তো?”
“আমার ছবি ভালো আসে না।” লাজুক হেসে বললো মিষ্টি। তারপর প্রসঙ্গ পালটে জিজ্ঞেস করলো, “দ্বিতীয় কারণ টা কি?”
“কি?” সানগ্লাসটা চোখে গলিয়ে ভ্রুকুটি করে ওর দিকে ফিরলো তাওহীদ। রোদটা একেবারে পাকা কমলালেবুর রঙ ধারণ করেছে, সেই পাকা কমলালেবু রঙের আভা চোখে মুখে এসে পড়েছে তার।
“বললেন যে দুটো কারণ আছে নিয়ে আসার।” মনে করিয়ে দিলো মিষ্টি।
“ওহ! দ্বিতীয়টা হলো এখানে আসতে আমারও ভালো লাগে খুব, আলাদা একটা টান কাজ করে এখানে আসার। আর জানোই তো সবচেয়ে বড় শক্তি টানের শক্তি।”
“না, জানতাম না তো।” বললো মিষ্টি।
“ঠিক আছে,তোমাকে একটা গল্প বলি। মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী সম্রাট কে ছিল বলো তো?”
কোথা থেকে কি! মাথা চুলকালো মিষ্টি। এরমধ্যে ইতিহাসের ক্লাস কোথা থেকে এলো!
“সম্রাট আকবর।” বললো মিষ্টি।
“রাইট। শুধু প্রভাবশালী না, মুঘলদের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর রাজ্য বিস্তারেও আকবরের ধারেকাছে কেউ ছিল না। পুরো ভারত তখন ছিল আকবরের। একমাত্র বাংলা ছাড়া। এত প্ল্যানিং, রণশক্তি, ক্ষমতা কোনো কিছু দিয়েই বাংলা জয় করতে পারছিলেন না তিনি। আকবর হাল ছেড়ে দিলেন। তার পরে সিংহাসনে বসলেন তার ছেলে সেলিম এবং বসার পরই তার সেনাপতি ইসলাম খানকে পাঠালেন বাংলা জয় করতে। ইসলাম খান পুরো বাংলার ক্ষমতা সেলিমের হাতে এনে দিলেন। সেলিমের এমন কি ছিল যার কারণে আকবর যা সারাজীবনে পারলো না তা তিনি সিংহাসনে বসামাত্র করে ফেললেন?”
“কি?” মিষ্টি জিজ্ঞেস করলো।
“টান। বাংলার জন্য টান ছিল।” বললো তাওহীদ।
এবার মিষ্টি হেসে ফেললো। “সেলিমের কেন বাংলার প্রতি টান থাকবে? সে তো বাংলায় কখনো আসেইনি!”
“ঠিক বলেছো। সেলিম আসেনি। কিন্তু সেলিমের ভালোবাসার মানুষ মেহেরুন্নেসা কানিজ, যাকে আমরা আনারকলি নামে চিনি। তিনি ছিলেন বাংলার বারো ভূইয়া দের একজনের স্ত্রী। মেহেরুন্নেসা আকবরের রাজসভায় এক কর্মচারীর মেয়ে ছিলো, রাজসভায় সে নাচতো, গাইতো। সম্রাট আকবর সেলিম আর আনারকলির ভালোবাসা কখনো মেনে নেননি। তবে আনারকলির বাবার আনুগত্যের কথা মনে রেখে তার ছেলেকে ভালবাসার অপরাধে তিনি আনারকলিকে কঠিন কোনো শাস্তিও দেননি। বাংলার বারো ভূইয়াদের একজনের সাথে কানিজের বিয়ে দিয়ে তাকে সুদূর কোলকাতা পাঠিয়ে দেন। একবার ভাবো, দিল্লি টু কোলকাতা। আজকের দিনেও দিল্লি থেকে কোলকাতা বাই রোড যেতে ৪-৫ দিন সময় লেগে যায়।”
মিষ্টি গল্পের মধ্যে ডুবে গেছে। সেলিমের জন্য তার মায়া লাগতে শুরু করেছে। কেমন লেগেছিল সেলিমের তখন?
“হাও ট্রাজেডিক!” মন্ত্রমুগ্ধের মতো বললো মিষ্টি,
“তারপর কি হলো?”
“ইসলাম খান বাংলায় আক্রমণের সময় কানিজের হাসবেন্ড মারা যান। সেলিম যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্র কানিজ ও তার পুত্রকে দিল্লিতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন এবং কানিজকে বিয়ে করেন।”
“আহা! হ্যাপি এন্ডিং!” তালি দিলো মিষ্টি।
“শুধু তাই নয়, সেলিমই উপমহাদেশের প্রথম মুঘল ছিলেন যিনি রাজার সিংহাসনের পাশে তার রানীর জন্যও সিংহাসন তৈরি করে দেন।”
“আমি আজ থেকে সেলিমের ফ্যান হয়ে গেলাম।।” বুকে হাত রেখে বললো মিষ্টি।
“তো মিস রাজশাহী, কি শিখলে সেলিম আর আনারকলির গল্প শুনে?” তাওহীদ জিজ্ঞেস করলো।
“এটাই, যে যদি কোনো মেয়ের মন জয় করতে চাও তো তাকে একট সিংহাসন বানিয়ে দাও।” তর্জনী নাচিয়ে জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব নিয়ে বললো মিষ্টি।
তাওহীদ হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইলো, “এতক্ষণে এই বুঝলে তুমি!” চেহারা দেখে মনে হলো যেন মিষ্টিকে এই গল্প কেন বললো তার আফসোস হচ্ছে।
মিষ্টির মাথায় হঠাৎ কোনো বুদ্ধি এসেছে এমন ভাবে লাফিয়ে উঠলো,
“পিস অফ অ্যাডভাইস! কাউকে প্রোপোজ করতে হলে তাকে একটা সিংহাসন অফার করবেন শুধু, যত কঠিন মেয়েই হোক গলে একেবারে নিউটেলা হয়ে যাবে। ইওর ওয়েলকাম।” বলে বো করলো মিষ্টি।
তাওহীদ ঠোঁট বাকালো। “আমি তাওহীদ কান ধরেছি, এই জীবনে আমি কাউকে, আই রিপিট, কাউকে প্রোপোজ করবো না।”
মিষ্টির মাথার উপর যে খুশির বেলুন গুলো ভাসছিল সেগুলো মুহূর্তেই টুপ করে ফেটে গেলো। ঠোঁটের উর্ধমুখী কোনদ্বয় নেমে এলো।
“কেন!”
“তুমি জানো কেন। একবার একজনকে ভালবাসি বলার পর যে ভোগান্তি শুরু হয়েছিল, আজও তা শেষ হয়নি।” চোখ বুজে মাথা নাড়লো তাওহীদ।
“কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন অভি ভাইয়ারা ওটা ভুলে গেছে।” মিষ্টি মনে করিয়ে দিলো।
তাওহীদকে হঠাৎ অপ্রসন্ন দেখালো, কেন মিষ্টি বুঝলো না।
“আমার কথা বাদ দাও। কিন্তু আমি যে তোমার হবু জামাইয়ের জন্য বিশাল একটা সমস্যা করে ফেললাম। তাকে তো আমার ওয়ার্ন করা উচিত এখনি। এতদিন যা করছিলে সব ভুলে যাও,টাকার পাহাড় বানাতে লেগে পড়ো। মিষ্টির মন জয় করতে হলে সিংহাসন বানাতেই হবে।”
মিষ্টি দ্রুত মাথা নাড়লো। “আমি কি সেই সিংহাসন চেয়েছি নাকি! আমাকে তার মনের মধ্যে একটা সিংহাসন বানিয়ে দিলেও হবে।” লাজুকলতার মতো বললো।
তাওহীদের চোখজোড়া যেন এবার নরম হলো। গভীর দৃষ্টিতে মিষ্টির মুখ পানে চেয়ে, স্মিত হেসে বললো,
“দেবে। তুমি যার জীবনেই যাবে তার মনে, তার জীবনে, তার ঘরে সব জায়গায় রানী হয়ে থাকবে।”
মিষ্টি ভাষা হারিয়ে ফেললো। এখান থেকে অনেক অনেক দূরে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হলো। এই মুহূর্তে এখানে বসে থাকলে নির্ঘাত জ্ঞান হারিয়ে পানিতে পড়ে যাবে।
“ঐ দেখো সূর্যাস্ত!” সহসা তাওহীদ বলে উঠলো। মিষ্টি চমকে দেখলো দিগন্তে আঙুল তাক করে কিছু দেখাচ্ছে তাওহীদ। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মিষ্টি তাকিয়ে দেখলো সূর্যটা সব আয়োজন সাঙ্গ করে মাঝনদীতে নেমে পড়েছে, একটু পর টুপ করে হারিয়ে যাবে। এ এক অন্যরকম সূর্যাস্ত দেখা। সূর্য পুরো পশ্চিম আকাশ টাকে রাঙিয়ে দিয়ে বিদায় নিলো। এজন্যই হয়তো রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
যে নদীর তীরে সূর্যাস্ত দেখেনি সে কিছুই দেখেনি।
চলবে
আগামী পর্ব আসছে রবিবার।
ঘাসফুল লেখা যখন শুরুও করিনি, তখন থেকেই কয়েকটা পর্ব নিয়ে খুবই এক্সাইটেড ছিলাম, হাত নিশপিশ করতো লেখার জন্য। সেরকম একটা পর্ব ছিল আজকেরটা। কিন্তু যেভাবে ভেবেছিলাম তার অর্ধেকও লেখায় দিতে পারিনি। গতকাল রাত থেকেই লেখায় একদমই মন দিতে পারিনি। মন বসানোর জন্য কবিতা পড়েছি, পিয়ানো মিউজিক শুনেছি, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লেখকদের ঠাণ্ডা, স্লো-মোশন লেখা পড়েছি। তবে কোনোটাতেই কাজ হয়নি। সেজন্য আমি দুঃখিত।
আগের পর্ব
https://m.facebook.com/groups/526513374820830?view=permalink&id=849773989161432&ref=m_notif¬if_t=feedback_reaction_generic

ঘাসফুল
পর্ব ৮
রাত সাড়ে এগারোটা।
সামনে ফাইনার, আগারওয়াল, কালসি, পেলশিয়ারের অরগ্যানিক কেমিস্ট্রি বই, একটা স্যাম্পল পেপার আর কুইনাইন এর ডিগ্রেডেশন এর স্টেপ বাই স্টেপ প্রসেসগুলোর ডেটা রেকর্ড নিয়ে ডেস্কে বসে আছে তাওহীদ। থিসিসেে কাজ প্রায় শেষের দিকে, কাজ শেষ করলেই থিসিস পেপার লেখায় হাত দেবে। কিন্তু আজকে কাজে মনোযোগ বসাতে পারছে না। কিছু একটা ঠিক মিলছে না,কিন্তু সমস্যাটা ঠিক তার ডেটা বা থিওরি তে না। কি যেন ভুলে গেছে সে, কোনোভাবে এখন মনে করতে পারছে না। উঠে গিয়ে এককাপ কফি বানিয়ে কিচেন থেকে ফেরার পথে দেখলো মিষ্টির রুমটা অন্ধকার। এত তাড়াতাড়ি তো মিষ্টি ঘুমায় না। তারপর মনে পড়লো রাতে খাবার টেবিলেও আসেনি মিষ্টি। হলো টা কি মেয়েটার?
কফির কাপ হাতে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো তাওহীদ। ওদের বাড়িটা বানিয়েছিলেন তাওহীদের দাদা। তাওহীদের দাদা ছিল মুন্সিগঞ্জের এক বনেদি পরিবারের ছেলে। গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু। কিন্তু গ্রামে তার মন বসেনি কোনোকালেই। প্রথমে পড়াশোনা করতে তারপর চাকরিসূত্রে ঢাকায় এসে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন, স্ত্রীকেও সাথে নিয়ে আসেন। কিন্তু তাওহীদের দাদির মন পড়ে থাকতো গ্রামেই। গ্রামের খোলামেলা রান্নাঘর, ডানে গোয়াল, বায়ে পুকুরপাড়... এসব ছেড়ে শহরের ছোট, বদ্ধ বাড়িতে থাকতে পারতেন না তিনি। তাওহীদের দাদা এই শহরটাকে যতটা ভালবাসতেন ততটাই ভালবাসতেন স্ত্রীকে। স্ত্রীর কথা চিন্তা করে ভেবেছিলেন এই শহরেই তাকে একটা গ্রাম বানিয়ে দেবেন। কিন্তু চাকরির গোনা বেতনে তো এত কিছু সম্ভব না। কারণ আর যাই হোক অসৎ রাস্তায় জীবনে চলেননি তিনি। গ্রামের একমাত্র ওষুধের দোকানটা ছিল তাওহীদের দাদাদেরই। হোমিওপ্যাথি ওষুধ। তাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে হোমিওপ্যাথির দোকান খুলে বসেন এখানে, ডাক্তারি নিজেই করতেন। এলাকার তাবত গরীব অভাবিদের বিনা পয়সায়ই চিকিৎসা করতেন। সেজন্যই হয়তো আল্লাহও তাকে দিয়েছিলেন। যতই তিনি দান করতেন ততই সমৃদ্ধি বাড়তে থাকে। কয়েক বছরের মাথায় পুরো এলাকায় জমিজমা করে ফেলেন, অদূরে একটা মাদ্রাসার জন্য জায়গা দেন, এলাকার জামে মসজিদের মাসিক তহবিলে টাকা দিতে থাকেন। আর স্ত্রীর জন্য বিশাল খোলামেলা এই বাড়িটা বানিয়ে দেন,বাড়ির সামনে বাগান করে দেন, বড় বারান্দা দেওয়া রান্নাঘর করে দেন। তিন ছেলেমেয়েদের সবাইকেই এই এলাকাতেই বিয়ে দেন। এতসব করেও দাদির এখানে মন বসেনি, তাওহীদের দাদা মারা যাওয়ার বছরখানেক পর গ্রামে ফিরে যান দাদি। তিনতলার এই ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই তাওহীদের ফুপুর বাসা দেখা যায়।
সময় নিয়ে কফিটা শেষ করে রুমে ফিরে কাজে মনোযোগ দিতে গিয়েও পারলো না তাওহীদ। শেষমেশ ফাইলপত্র গুছিয়ে শুয়ে পড়লো সে। এভাবে বিক্ষিপ্ত মনে কাজ করা সম্ভব নয়। সকাল আটটায় ল্যাবে যেতে হবে,ঘুমানো দরকার। খচখচ মনে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো তাওহীদ, কি যেন তার মনে পড়ছে না… চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে উঠলো মিষ্টির মুখটা, ওড়নার আচলে আঙুল পেচিয়ে গোল গোল চোখজোড়া ওর দিকে তাকিয়ে আবদার করছে, ‘আমাকে নদী দেখতে নিয়ে যাবেন?’
“শিট!!” ঝট করে বিছানায় উঠে বসলো তাওহীদ। মামার কাছে বকা খেয়ে মন খারাপ ছিল মেয়েটার। আজ অফিস ছিল না, তাই মিষ্টির মনটা ভালো করে দিতেই কথা দিয়েছিল ঘুরতে নিয়ে যাবে। তাওহীদের ক্লাস যখন শেষ হয় তখনও তার সেকথা মনে ছিলো। তারপর সে বেমালুম ভুলে গেলো কিভাবে?? সে নাহয় কোনো এক কারণে ভুলে গেছে। মিষ্টি একবার তাকে ফোন করেও বললো না! কেন??
বিছানা থেকে উঠে চার্জে দেওয়া ফোনটা হাতে নিলো। বাসায় ফিরে এসে গোসল সেড়ে ফোনটা চার্জে দিয়েছিল। ফোনটা আনলক করেই তব্দা খেতে হলো তাওহীদকে। এতো ওর ফোন নয়! ঐশির ফোন। রেডমি নোট এইট প্রো। গতবছর শুভ্রের সাথে একসাথে কিনেছিল তাওহীদ। তাওহীদের নিজের স্যালারিতে কেনা প্রথম ফোন, আর শুভ্রের জমানো টাকায় কেনা ঐশির সাথে রিলেশনশিপের পর প্রথম বার্থডে গিফট। সেইম ফোন, দেখে বোঝার উপায় নেই কোনটা কার ফোন। ক্লাস থেকে বেরিয়ে ঐশির সাথে যখন ধাক্কা খেয়েছিল, তখনই নিশ্চয়ই ফোনগুলো অদলবদল হয়ে গেছে। মিষ্টি যদি কল দিয়েও থাকে সেটা তাওহীদ অবধি পৌঁছাতে পারেনি। তাওহীদের মনে হলো একবার সরি বলা উচিত ওর।
ফোনটা আনলক করে ডজনখানেক মিসড কল আর মেসেজ চোখে পড়লো। সেগুলো পেরিয়ে মিষ্টির নাম্বারে ডায়াল করলো। একবার। দুইবার। তিনবার ডায়াল করেও ফোন ধরলো না মিষ্টি। সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। ভাবলেও শেষ আরেকবার ডায়েল করতে প্রথম রিঙএই ফোনটা রিসিভ হলো।
তাওহীদ কিছু বলে ওঠার আগেই ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো চিকন গলার তীক্ষ্ণ শব্দবান ভেসে এলো,
“আরেবাবা কে আপনি! রাত দুইটার সময় আননোন একটা মানুষকে কন্টিনিউয়াসলি ফোন করে যাচ্ছেন! এত ইল ম্যানারড কেন আপনি? ফান করেও তো মানুষ এত রাতে ফোন করে না কাউকে। আপনি জানেন এত রাতে কত খারাপ খবর দেওয়ার জন্য মানুষ ফোন করে? মাঝ রাতে ফোন বেজে ওঠা কতটা ভয়ংকর একটা ব্যাপার আপনি জানেন? আমার মতো দূর্বল হার্টের মানুষ যদি আজ এই ফোনের শব্দে ঘুমের ঘোরে মরে যেতাম তাহলে তার দায়ভার কার হতো? আপনার! ”
তাওহীদ ঘড়িতে দেখলো দুইটা না, বারোটা বাজে সবে। সেটা বলতেও চাইলো। তার আগে মিষ্টি ওপাশ থেকে আবার ভাঙা ভাঙা গলায় চেচিয়ে উঠলো, “কথা বলছেন না কেন? হ্যালো? ফাইন, আমি রাখছি।” লাইনটা কেটে গেলো। ফোনটা রেখেই তাওহীদ বুকে ফুঁ দিলো।
মিষ্টি কি জেগে ছিল না সত্যিই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এসব বললো? এতো মানুষ না, সাক্ষাৎ সিংহের বাচ্চা।
পরদিন ক্লাসের পর অফিস শেষে বাসায় ফিরতে রাত হল। রুমে ঢোকার আগে করিডোরেই মিষ্টির সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। সারাদিনে আর মিষ্টির সাথে কথা হয়নি একদমই। তাওহীদকে দেখে কোনো ভাবোদয় হলো না মিষ্টির। এত রাগ এই মেয়েটার! তাওহীদ মাথা চুলকে একটা অপরাধী হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“রেগে আছো আমার ওপর?”
উত্তরে মিষ্টি স্মিত হাসলো। একটু বেশিই স্মিত।
“রাগ করবো কেন?” সিল্কি গলায় বললো।
মিষ্টিকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা যে সে ভুলে গিয়েছিল এটা শুনলে মিষ্টি আর কথাই বলবে না।
তাই বললো,
“কালকে অন্য একটা জায়গায় আটকে গিয়েছিলাম মিষ্টি। যখন ফ্রি হলাম ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। তুমি খুব রেগে আছো তাই না?”
মিষ্টি হাত দু'খানা বুকের ওপর ভাজ করে কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর উদাসীন গলায় হাতের নখগুলো পরখ করতে করতে বললো,
“রাগ করলেও বলবো না। আমি কাল সন্ধ্যার পর পর্যন্ত রেডি হয়ে বসেছিলাম কিন্তু সেটা আপনাকে বলবো না। আপনাকে বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ত্রিশ বার কল দিয়েছিলাম, আপনি ধরেননি কেন সেটাও জিজ্ঞেস করবো না।”
তাওহীদ সশব্দে হেসে ফেললো।
“হ্যালো! আমি ফোন চেক করেছি আজকে। মাত্র তিনবার কল দিয়েছিলে তুমি! আর কখনো এমন হবে না।”
ঐশির সাথে সকালে কথা বলে আজ একঘন্টা আগে বেরিয়ে ক্যাম্পাসে যাওয়ার আগে ওর কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে এসেছে।
তারপর মিষ্টির অনুকরণ করে যোগ করলো, “আমি কি সরি বলবো?”
“আমি রাগ টাগ করিনি।” একই উদাসীন ভঙ্গিতে বললো মিষ্টি। “আর রাগ করলেও ঘুমালে আমার রাগ চলে যায়। তবু আপনার সরি বলতে ইচ্ছে হলে আমি তো আর আটকাতে পারি না।”
তাওহীদের মনে পড়লো কাল ঘুমের মধ্যে কি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল মিষ্টি। ওর কি মনে আছে? জিজ্ঞেস করতে চেয়েও চিন্তাটা বাদ দিলো।
“জাস্ট..” শান্ত গলায় বললো মিষ্টি, “আপনি ব্যস্ত থাকতেই পারেন, আই আন্ডারস্ট্যান্ড। জাস্ট আমাকে বলে দিলে পারতেন।”
“আমি কাল ঐশির সাথে ছিলাম।” জানালো তাওহীদ।
ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়েই ঐশির সাথে দেখা হয়েছিল কাল, প্রায় তিনমাস পর। প্রথমে দেখে তাওহীদ প্রায় না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিলো। কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অন্যদিকে তাকিয়ে যেতে গিয়ে ঠিক ঐশির মুখোমুখিই হয়। ওকে অবাক করে দিয়ে ঐশিই প্রথম এগিয়ে এসে কথা বলে। এক কথা থেকে দুকথা, ডিপার্টমেন্ট থেকে পুকুরপাড় , চোখের পলকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে।
“তুমি যখন ফোন করো তার আগেই কোনো এক ফাঁকে সম্ভবত ওর সাথে আমার ফোন এক্সচেঞ্জ হয়ে গিয়েছিল।”
ওর কথা শুনে মিষ্টি মুখ কালো করে মাথা ঝাকালো, হাসলো।
“এবার বুঝেছি।”
তাওহীদ বুঝলো মিষ্টি আর তেমন রেগে নেই। রেগে থাকলে নিশ্চয়ই এতো কথা বলতো না। তবু মিষ্টি পুরোপুরি স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছে না। মিষ্টি যখন কারো সাথে কথা বলে তখন তার চোখে চোখ রেখে, সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনে ও বলে। কথোপকথনরত মানুষটার কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হতে বাধ্য যে সেই যেন মিষ্টির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। অন্তত তাওহীদের এমনটাই মনে হয়। সেখানে আজ মিষ্টির এমন অনুৎসাহী কথাবার্তায় যেন শান্তি পাচ্ছিল না সে।
মিষ্টির নরমাল টোন ফেরত আনার জন্যই যেন বলে উঠলো,
“আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে কাল নিয়ে যাবো নদী দেখতে। প্রমিস।”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য মিষ্টির চোখজোড়া জ্বলে উঠলো। তারপর কেন যেন আবার ক্ষরিত হয়ে বললো,
“নাড়া একবারই বেলতলায় যায়। আপনি আবার বাইরে গিয়ে কাল আমার কথা ভুলে যাবেন।”
“কালকে আমি চাইলেও তোমার কথা ভুলতে পারবো না। কাল শুক্রবার।” বলে থামলো তাওহীদ।
শুক্রবার? শুক্রবার কেন সে বাইরে যাওয়ার জন্য জোরাজোরি করছে? শুক্রবার বাইরে যাওয়া তাওহীদের জন্য কুফা। যত যাই হোক শুক্রবার বের না হওয়ার নিয়ম তাওহীদ নিজেই বানিয়েছিল, আর নিয়ম তো নিয়মই। এবার মিষ্টির দিকে তাকিয়ে দেখলো মিষ্টি আগ্রহী হয়ে কিছু ভাবছে।
না বলে দে, ভেতরে ভেতরে ঝাকিয়ে তাওহীদের মনোযোগ কাড়ার সিগনাল পাঠালো মস্তিষ্কটা।
না, মনে মনে বললো তাওহীদ।
আমাকে না ইডিয়ট, মিষ্টিকে না বল!! আবার ভেতর থেকে বললো কেউ। তাওহীদ তাকে পাত্তা না দিয়ে মিষ্টির দিকে ফিরলো, বললো,
“সিরিয়াসলি, যাবে?”
মুখে বলার আগেই ওর নিরঁজন, নিখাদ, কপোলে ঢেউ খেলানো হাসিটা দেখে তাওহীদ বুঝে নিলো মিষ্টি যাবে।
“যাবো।”
চলবে
আগের পর্বের লিংক https://m.facebook.com/groups/526513374820830?view=permalink&id=848171649321666&ref=m_notif¬if_t=feedback_reaction_generic
