মেকআপ_সুন্দরী - (পর্ব-৬-৭)
মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে আপনি যে জাদুর চর্চা করেন তা অনেকটা ভালো আর খারাপের মাঝামাঝি? তাইতো?
মামা বললেন, হ্যাঁ, তবে যেহেতু ভালো কাজ করার নিয়তে জাদু চর্চা করে থাকি, নিজের স্বার্থ মেটানোর উদ্দেশ্যে না, তাই আমার বিশ্বাস সৃষ্টিকর্তা আমার ওপর নাখোশ হবেন না। যদিও সেটা একান্তই তার মর্জি!
– মামা, আপনি কি করে ও কেন এই জগতে পা রেখেছিলেন?
– তোর মামীকে এক দরবেশ জাদু করে পাগল বানিয়ে দেয়, সে এক লম্বা কাহিনী, তারপর থেকেই আমার এই জাদু শেখা ও কবিরাজি জীবন। থাক সেসব, আমরা আসল কথায় আসি।
তিনি এরপরে মিশকাতকে জিজ্ঞেস করলেন, তুই কি বুঝতে পারবি যে কখন শয়তান জাদুকরটা ঘুমোতে যাবে?
মিশকাত বললো,
হ্যাঁ, ঠিক সূর্য উঠে যাবার পরপরই।
মামার বউ মানে মামীর কথা চিন্তা করে খুব খারাপ লাগছিল। তবে ঠিকই সময় করে মামার কাছ থেকে মামীর ঘটনা জেনে নেবো ভেবে আর কথা আগালাম না।
(তোমরা যদি গল্পে কবিরাজ রহিম মন্ডলের স্ত্রীর ঘটনাটুকু জানতে আগ্রহী থাকো, কিভাবে দরবেশ জাদু করে ও পাগল বানিয়ে দেয় – তবে কমেন্টে আগ্রহের কথা জানাও, জানানোর চেষ্টা থাকবে আমার পক্ষ থেকে)
–
সূর্য উঠতে শুরু করেছে কেবল, এমন সময় মিশকাত তার পাশে বসা সেহেলকে বললো, সেহেল তুই জাদুকরকে স্বপ্ন দেখাতে পারিস এখন। সেহেল উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, মামা, ও চলে গেল কেন? ও কি তবে জাদুকরের কাছে গিয়ে স্বপ্ন দেখাবে?
মামা বললেন, না রে পাগলী, তা নয়। স্বপ্ন দেখানোর ব্যাপারটা অনেকটা ধ্যানের মতন। এর সাথে জাদুও জড়িত, এর জন্য সে নির্জন স্থানে গিয়েছে যেখানে গেলে সে দূর থেকে ধ্যানের মাধ্যমেই স্বপ্ন দেখাতে পারবে।
প্রায় মিনিট বিশেক পরে সেহেল ফিরে এসে জানায়, যা করবার তা করা হয়ে গিয়েছে, এখন শুধু প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায়। এই কষ্টিপাথরই ওকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসতে বাধ্য করবে।
রহিম মামা সেহেল ও মিশকাত দুজনকেই চলে যেতে বললেন। ওরা মানুষ রূপে যেভাবে এসেছিল, অমনি আবার চলে গেল। আমি ওদের চলে যাবার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম, আমার মনে হচ্ছিলো আমি যেন কোনো রূপকথার রাজ্যে এসে পড়েছি, সারাজীবন যে জ্বীনের গল্প শুনে এলাম, সেই জ্বীন আজ আমার সামনে কথা বললো, আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে গেল!
– এই সুমা, কিরে কি ভাবছিস? চল ঘুমোতে যাই এখন। মামা আর সাইফুল মিলে ব্যাপারটাকে দেখবে।
রত্নার কথায় ঘোর ভাঙলে বললাম, তুই আমাকে বাড়িতে দিয়ে আই, যদি জাদুকরের সন্ধান মেলে তবে আমাকে আবার নিয়ে আসিস দয়া করে।
ও বললো, আরে থেকে যা, গিয়ে কি হবে। মেয়েদেরকে নিয়ে ভয় নেই, একটা ফোন দিয়ে দেখ সব ঠিক আছে কিনা।
রত্নার কথায় আমি বাড়িতে ফোন দিলাম। সব ঠিকঠাক আছে জেনে রত্নার সাথে ঘুমোতে গেলাম, রত্নাই মূলত আমাকে ওর সাথে ঘুমোতে বললো, কারণ, এই সময় যখন তখন আমার ওপর শয়তানি আক্রমণ আসতে পারে নাকি, যদিও বাড়ি বন্ধ করা আছে, তারপরেও একা থাকাটা উচিত নয়।
–
এক ঘুমে দুপুর দুইটা, রত্না আমাকে ডাকছে। দুপুরের খাবার খেতে। ওর ডাকে আমি হুড়মুড় করে জেগে উঠি।
– কিরে খারাপ স্বপ্ন দেখছিলি নাকি?
– মনে হয়, সেরকম কিছুই, তুই এখুনি আমার বাড়িতে একটা ফোন লাগা না?
– আরে ভয় পাস নে, রহিম মামা তোদের বাড়িতেই গিয়েছেন একবার দেখে আসতে।
– তাহলে কি আমরা দুজন বাড়িতে একা?
– আরে না পাগলী, সাইফুল আছে না?
হুইলচেয়ারে উঠে বসলাম, রত্না আমাকে সাহায্য করলো। হাত মুখ ধুঁতেও সাহায্য করলো।
ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখি সাইফুল ভাই এরই মধ্যে খাবার সামনে নিয়ে বসে আছেন। রত্না বললো, তোরা দুজন খেয়ে নে, আমি রহিম মামা এলেই খাবো।
গতকাল থেকে একবারের জন্যও সাইফুল ভাইয়ের সাথে কথা বলা হয়ে ওঠেনি। খাবার খেতে খেতে উনাকে জিজ্ঞেস করলাম,
– কি সাইফুল ভাই, জাদুবিদ্যায় হাত পাকাচ্ছেন মনে হচ্ছে?
– হ্যাঁ, সেরকমই, আসলে জাদুবিদ্যার প্রতি আমার সেই ছেলেবেলা থেকেই বেশ আগ্রহ। আর মামা যেহেতু কবিরাজি করেন, মনে হলো কিছু জিনিস শিখে রাখা মন্দ না, যদিও জাদুবিদ্যার যত গভীরে যাওয়া হয়, শয়তানী শক্তির লোভ যেন মনের কোণে উঁকি মারতে থাকে। অনেক সতর্ক থাকতে হয়।
– তো এখন পর্যন্ত কি কি শিখলেন?
– অনেক কিছুই; বলে শেষ হবেনা – বলে হাসলেন।
পাশে বসা রত্নাকে জিজ্ঞেস করলাম, কি রে তুইও নাকি শিখবি? তো কি শেখার ইচ্ছা তোর?
রত্না হাসতে হাসতে বললো, যদি কোনোদিন সম্ভব হয় অবশ্যই শিখবো, আমার ইচ্ছের কথা শুনলে তুই হাসবি রে সুমা।
– আরে নাহ বলতো আগে।
– আমি চাইবো আমার এই সৌন্দর্য যেন চির-অটুট থাকে। জীবনে যেন কোনোদিন বুড়ি না হই।
রত্নার কথা শুনে আমি আর সাইফুল ভাই দুজনই হেসে উঠলাম, এরই মধ্যে রহিম মামা হাজির, আমি উনার দিকে তাকাতেই বললেন, তোমাদের বাড়িতে সকলেই ভালো আছেন, তোমার দুই মেয়ে আসতে চাচ্ছিলো কিন্তু আমি নিয়ে আসিনি।
বললাম, ভালোই করেছেন মামা! ওরা সবাই বাড়িতে নিরাপদ থাকলেই হলো।
মামা খাবার টেবিলে বসতে বসতে বললেন, খবর তো একটা পেলাম একটু আগে। সেহেল বললো, শয়তান জাদুকরটা এরই মধ্যে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। খুব বেশি দেরী নেই যে ও আমার সামনে বসে আমার পা ধরে ক্ষমা চাইবে, তারপর সবকটা কে দেখে ছাড়বো!
আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহ! তাই যেন হয়। তুমি রক্ষা করো আমাকে।
– আচ্ছা মামা, জাদুকর এলে কি করা হবে? মানে আপনি কি করবেন? ওর কাছে থাকা আমার শাশুড়ির কংকাল দিয়ে ওকে উলটা বান মারার কথা বলেছিলেন?
– হ্যাঁ, কিন্তু যেহেতু ও নিজের থেকেই আমাদের কাছে আসছে বা আসবে, সেহেতু এখানে ভিন্ন পথ অবলম্বন করা হতে পারে কিংবা করা হবে।
পাশ থেকে সাইফুল ভাই জিজ্ঞেস করলেন, সেটা আবার কেমন মামা?
মামা বাটি থেকে মাছ ভর্তা তুলে নিতে নিতে সাইফুল ভাইকে বললেন,
– জাদুকর এলে ওকে বলবো জাদু তুলে নিতে। ও যদি জাদু তুলে নেয়, তবে আর ওকে উলটা বান মারা লাগবেনা।
– কিন্তু এই জাদু তো আরো চৌদ্দ বছরের পুরোনো জাদু। সৌর চক্র অনুযায়ী তা পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে, এখন কি আর এই জাদু তুলে নেওয়া সম্ভব হবে?
– তাও ঠিক, কিন্তু এখানে এটা দেখতে হবে যে সে কোন সৌর চক্র ব্যবহার করেছে। এটাও তো হতে পারে সে চন্দ্র-চক্র ব্যবহার করেছে?
– তবে কি আমাদের গণণা ভুল হতে পারে?
– না, আমাদের গণণা ভুল হতে পারেনা, যেটা হতে পারে সেটা হলো, জাদুকর তার মায়াজাল দিয়ে জাদুর মূল উৎসকে প্রতিরক্ষা করে রেখেছে যাতে করে আমরা জাদুটাকে না ধরতে পারি। যাইহোক, তোমার তো কদিনেই বেশ উন্নতি হয়েছে – রহিম মামা সাইফুল ভাইকে বললেন।
সাইফুল ভাই মামার কথায় বেশ খুশি হলেন সেটা বোঝা গেল। কিন্তু এসব চক্র-ফক্র মাথায় ঢুকলো না বিধায় মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, মামা এসব চক্র দ্বারা কি হয়?
– জাদুকর আসুক, তখন নিজের চোখেই সব দেখতে পারবি মা, আরেকটু অপেক্ষা কর।
–
সন্ধ্যে ৭টা বাজে।
মামা ধ্যানে বসে মিশকাত ও সেহেলের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন।
আমরা মামার সামনে বসে আছি। খুব নাটকীয় একটা দৃশ্য তৈরী হয় তখন। মামা হুট করে চোখ খুলে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ও এসেছে, ও এসে পড়েছে, এক সিঁড়ি, দুই সিঁড়ি, দরজার সামনে…
অমনি দরজায় দুম দুম করে আওয়াজ। আমার ভেতরটা যেন কেঁপে উঠলো, শরীর কাপঁছে, অজানা ভয়ে। মামা নিজের থেকে উঠে গেলেন, সাইফুল ভাইও যেতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু বললেন, না, তুমি এসোনা, তুমি ওদেরকে দেখে রাখো, ও এসেই যে হামলা চালাবেনা তার কি নিশ্চয়তা?
মামা, তার হাতের মুঠোয় চাল আর দূর্বা ঘাস নিয়ে দরজা বরাবর এগোতে লাগলেন। দরজা খুলেই মামা মুঠোয় থাকা চাল আর দূর্বা ঘাস জাদুকরের শরীর বরাবর ছিটিয়ে দিলে জাদুকর হো হো করে হেসে উঠে।
জাদুকর মামার শরীর বরাবর থকথকে রক্ত জাতীয় কিছু ছুড়ে মারলে মামা মেঝেতে পড়ে যান। সাইফুল ভাই মামা বলে চিৎকার দিয়ে ওঠেন।
বুঝতে পারছিলাম খুব ভালো কিছু হচ্ছেনা, জাদুকর হয়তো মামাকে আঘাত করেছে কোনভাবে। আরো শক্তিশালী কোনো কিছুর আঘাত যা মামা সইতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গিয়েছেন।
জাদুকর আমাদের দিকে অগ্রসর হতে লাগলে সাইফুল ভাই জোরে শ্বাস নিয়ে পকেট থেকে একটা ছোট বোতল বের করেন। জাদুকর খুব কাছেই চলে এসেছে, সে আমাদের দিকেও সেই রক্ত জাতীয় পদার্থ ছুড়ে মারবে ঠিক এমন সময় সাইফুল ভাই বোতল থেকে কিছু একটা জাদুকরের মুখ বরাবর ছুড়ে মারলে সে প্রচন্ড যন্ত্রণায় মেঝেতে পড়ে যায় ও কাতরাতে থাকে।
রত্না তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, কি করলে তুমি? কোনো জবাব না দিয়ে সে রত্নাকে ফ্রীজ থেকে ঠান্ডা পানি বের করতে বলে। আমি পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখলাম, জাদুকরের মুখ ঝলসে যাচ্ছে। সাইফুল ভাই আমাকে বললেন, আমি ওর মুখে এসিড ছুঁড়েছি, এছাড়া আর কোনো উপায় ছিলনা আমার কাছে। তুমি মামাকে গিয়ে সাহায্য করো, আমি জাদুকর ব্যাটাকে সামলাচ্ছি!
মামার কাছে যেতেই দেখি মামা চোখ উলটে মেঝেতে পড়ে আছেন, আমি প্রচন্ড জোরে একটা চিৎকার দিয়ে উঠি!!
--
আমার কাছে কেন জানি মনে হতে লাগলো যে রহিম মামা মরে গিয়েছেন। চোখ উলটে এভাবে পড়ে থাকাটা ভালো কিছুর সংকেত দেয়না। মূলত মানুষ মরে গেলেই এভাবে চোখ উলটে পড়ে থাকে। যদিও মনে হচ্ছিলো যে মামার শ্বাস প্রশ্বাস তখনো চলছিল।
আমার চিৎকারে রত্না আর সাইফুল ভাই দুজনই আমার দিকে ছুটে আসছিল কিন্তু সাইফুল ভাই রত্নাকে বললো, তুমি শয়তানটার যেখানে যেখানে এসিড লেগেছে সেসব স্থানে ভালো করে ঠান্ডা পানি ঢালো। সাইফুল ভাইয়ের হাতে শয়তানের হাতে থাকা বোতলটাকে দেখলাম, উনি আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন, বসেই মামার চোখ টেনে ভালো করে দেখলেন, মামার চোখের নিচের পাশটা কালো হয়ে যাওয়া দেখে বেশ অবাক হলাম। সাইফুল ভাই বললেন,
– ঠিক যেটা ভেবেছিলাম, সেটাই হয়েছে!
– কি হয়েছে সাইফুল ভাই? শুধু বলেন যে মামা মরেননি!
– না, মামা মরেননি। তুমি এক কাজ করো মামার মাথাটা সোজা করে ধরে রাখো। আমি এক দৌঁড়ে ঘর থেকে আসছি।
সাইফুল ভাইয়ের কথা শুনে আমি যেন আমার অন্তরে প্রাণ ফিরে পেলাম! উনার কথা মতন আমি মামার মাথাটাকে যতসম্ভব সোজা করে রাখলাম। মনে
সাইফুল দ্রুত ঘর থেকে ফিরে এলেন। একটা মোটা দড়ি দিয়ে যন্ত্রণায় কাতরানো শয়তানের হাত দুটো বেঁধে টয়লেট পর্যন্ত দিয়ে এলেন আর রত্নাকে বললেন শাওয়ারের ঠান্ডা পানি গাল আর ঘাড় বরারবর ছেড়ে রাখতে।
সাইফুল ভাই আবার আমার পাশে এসে বসলেন, আমি বললাম,
– সাইফুল ভাই, শয়তানটাকে কি জ্বীনেরা সুস্থ করতে পারবেনা?
– মানে তুমি কি সেহেল আর মিশকাতের কথা বলছো?
– হুম!
– জানিনা ওরা শয়তানকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারবে কিনা, যদিও মনে হয়না সেটার দরকার আছে, ওর গালে আর ঘাড়ে এসিড লেগেছে! পানি ঢাললে ঠিক হয়ে যাবে, ব্যাটা মরবেনা – বলে তিনি একটা ছোট্ট শিশি দেখালেন আমাকে। দেখিয়ে বললেন, এটা দিয়ে যদি মামাকে কোনোভাবে সুস্থ করা যায়! দেখা যাক! এটা উনার নাকে দেয়ার কিছু সময়ের মধ্যে যদি উনার নাক দিয়ে পানি না বের হয় তবে বুঝতে হবে তিনি হয়তো মৃত্যুর দিকে ঢেলে পড়ছেন!
সাইফুল ভাইয়ের কথা শুনে আমার হার্টবিট যেন আবার বেড়ে গেল, ঘটনার আকস্মিকতায় আমি এমনিতেই যেন নিজের মধ্যে নেই। সাইফুল ভাই দ্রুততার সাথে একটা ছোট পিরিচে সেই শিশি থেকে তরল আঠালো জাতীয় পদার্থের এক ফোঁটা ঢাললেন, এরপরে শয়তানের হাতে থাকা বোতল থেকে এক ফোঁটা লাল (রক্ত জাতীয় কিছু একটা) তরল ঐ শিশির আঠালো পদার্থের সাথে মিশিয়ে মামার নাকের মধ্যে ঢালতেই মামা প্রচন্ড জোরে একটা হাচ্চি দিয়ে চোখ খুলে তাকালেন। তারপর তুমুল গতিতে শ্বাস নিতে লাগলেন। যেন তিনি বহুকাল পরে নতুন করে শ্বাস নিচ্ছেন – ব্যাপারটা এমন ছিল! মামাকে চোখ খুলে তাকাতে দেখে সাইফুল ভাই আর আমি দুজনই কেঁদে ফেললাম আনন্দে! মামা সাইফুল ভাইকে আনন্দে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, তুমি একদিন আমার চাইতেও বড় জাদুকর হবে সাইফুল। আমি বলে দিচ্ছি, জাদুকর কখনো তার শেখা জাদু দিয়ে বড় জাদুকর হতে পারেনা, জাদুকরের স্বার্থকতা নিহিত তার কৌশলে। উপস্থিত বুদ্ধিই জাদুকরের মূল শক্তি!
মামা উঠে বসলেন, উঠেই বললেন, শয়তানটা কোথায়?
আমি বললাম, শয়তানটাকে সাইফুল ভাই এসিড মেরে আহত করে ফেলেছে, ও এখন বাথরুমে, রত্না ওর শরীরে ঠান্ডা পানি ঢালছে।
আমার কথা শোনার সাথে সাথে মামা উঠে সোজা বাথরুম বরাবর হাঁটলেন। আমি আর সাইফুল ভাই উনার পেছন পেছন। গিয়ে দেখি জাদুকর শয়তানটার গাল, থুতনির নিচের অংশ আর গলা-ঘাড়ের কিছু অংশ ঝলসে গিয়েছে। সাইফুল ভাই মামাকে বললেন, মামা, এসিডে বেশ পরিমাণেই পানি মেশানো ছিল, সুতরাং ওর খুব বেশি ক্ষতি হয়নি।
মামা বললেন, ওকে সুস্থ রাখতে হবে, নাহলে সমস্যা, একটু অপেক্ষা করো, আমি আমার ব্যাগ থেকে কচু পাতার ঐ মলম টা নিয়ে আসি। ওর ক্ষত স্থানে দিলে ও দ্রুত সেরে উঠবে।
এরপরের সময়টা পার হয় শুধু জাদুকরকে সুস্থ করানো নিয়ে। ঘন্টা দুয়েক পার হয়ে যায় এরই মধ্যে, কচু পাতার মলমে জাদুকর সত্যিই যন্ত্রণামূক্ত হলেও ওর ঝলসে যাওয়া অংশ গুলো পুড়ে যায়। ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
জাদুকর কথা বলার চেষ্টা করলেও কথা বলতে পারছিল না, থুতনির নিচের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবার কারণে, তবে মামা বললেন,
– চিন্তা নেই, আগামীকালের মধ্যেই সে কথা বলতে পারবে, আপাতত ওকে বেঁধে রাখা হোক, যত্ন-আত্নি করা হোক। ওকেই এখন আমাদের সবচাইতে বেশি প্রয়োজন! আমার নিজেরও বেশ বিশ্রামের প্রয়োজন। আমার ওপর যা প্রয়োগ করা হয়েছিল, তা আমাকে বেশ দূর্বল বানিয়ে দিয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।
শয়তানটাকে একটা ম্যাট্রেসের ওপর শুইয়ে দেয়া হলো, যদিও হাত দুটো আর পা দুটো বেঁধে। ওকে বসার ঘরে আমাদের চোখের সামনেই রাখা হয়। এমন ধূর্ত ব্যক্তিকে এক পলকের জন্যও নজরছাড়া করা যাবেনা। মামাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম,
– মামা, জাদুকরটা আপনার ওপর কিইবা ছুঁড়ে মারলো আর আপনাকে সুস্থ করা হলোই বা কিভাবে? ঐ তরলগুলো কি জাদুকরী কিছু?
– না সুমা, ওগুলো এক ধরণের পদার্থ। পুরোটা জাদুকরী নয়, তবে কিছুটা। ওগুলো মূলত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরী, প্রাচীনকাল থেকেই জাদুকরেরা যা ব্যবহার করে আসছে। এমনকি কচু-পাতার মলমটাও!
মামার কথায় আমি নিদারুণ রহস্যের মধ্যে পতিত হলাম, আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম মামা এর ব্যাখ্যা দেন কিনা কিন্তু নিজের থেকে খুব বেশি প্রশ্ন করলাম না কারণ মামাকে তখন বেশ দূর্বল লাগছিল। উনি যোগ করলেন,
ওগুলো কি এবং কিভাবে তা কাজ করে, সেটা পরে বলছি। কারণ এর সাথে জড়িয়ে আছে তোর মামীর পাগল হবার রহস্য। তোকে তো বলেছিলামই যে তোর মামীকে এক দরবেশ জাদু করে পাগল বানিয়ে দিয়েছিল। সেই ঘটনা শুনলেই সব বুঝতে পারবি।
মামা শুরু করলেন,
তোর মামীর সাথে যখন আমার বিয়ে হয়, তখন আমার বয়স ছিল তেইশ আর তোর মামীর পনেরো।
আমার বাবার বেশ সহায় সম্পত্তি ছিল। আমি সেগুলোরই দেখাশুনা করতাম। সাথে ছিল পারিবারিক ব্যবসা। একবার আরেক গ্রামের এক জমিদারের সাথে সওদা করতে যাই নদী পথ পাড়ি দিয়ে। এটা আমরা প্রায়ই যেতাম!
অন্যান্য সময় আমাদের নিজেদের গ্রামের এক মাঝিই আমাদেরকে বাণিজ্যে নিয়ে যেতেন, কিন্তু তিনি সেবার অসুস্থ থাকার দরুন গ্রামে আসা নতুন এক মাঝির শরাপন্ন হই, কারণ গ্রামের অন্য মাঝিরা আমার চাচাদের সাথে বাণিজ্যে চলে গিয়েছিল।
যখন সেই মাঝিকে প্রথম দেখি, শুকনো এক বৃদ্ধকেই আমরা আবিষ্কার করি। আমি আর আমার চাচাতো ভাইয়েরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করি যে এই বৃদ্ধ আমাদেরকে কি করে অতদূর নিয়ে যাবেন, উনার বয়স ছিল ষাটের বেশি। আমরা উনাকে জিজ্ঞেস করি, কাকা, আপনি কি আমাদেরকে হরিপুর অব্দি নিয়ে যেতে পারবেন? তাছাড়া আপনি কি পথ চিনবেন? যেতে কিন্তু দুই দিন সময় লাগবে।
মাঝি ছিলেন খুব অল্পভাষী একজন মানুষ।
তিনি বললেন, আপনারা শুধু বসুন। বাকিটা আমি দেখছি। এরপর আমি আর আমার চাচাতো ভাইয়েরা আসলেই যেন শুধু দেখে গেলাম, যে পথ দুইদিনের বেশি সময়ে কখনো আমাদের তাগড়া যুবক মাঝি পার হতে পারেনি, একজন ষাটোর্ধ বৃদ্ধ আমাদেরকে সেই পথ একদিনের একটু বেশি সময়ে পার করে দিলেন।
যখন ভোর নাগাদ পৌছাই, বিস্ময়ে হতবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই যেন করার ছিলনা! উনাকে জিজ্ঞেস করি, কাকা আপনি কি করে পারলেন?
স্বল্পভাষী মানুষটা শুধু একটা জবাবই দিলেন, বললেন, সর্দাররা সবই পারে!
উনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝলাম না। উনি একটা মুচকি হাসি দিয়ে আবার ফেরত চলে গেলেন।
চলবে…
-
লেখকঃ Ferdous Sagar Zfs
-
“#মেকআপ_সুন্দরী”- এর সকল স্বত্ত্ব লেখক ফেরদৌস সাগরের। লেখকের অনুমতি ব্যতীত এর যে কোনো অংশ কপি করা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। সকলকে শুভকামনা ও ভালোবাসা।
-
আগের পর্বের লিংকঃ https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/841817113290453/

গল্পের নামঃ খাদক।
রাতের খাবার খাওয়ার জন্য আসাদ একটা ভালো ভিআইপি মানের হোটেলে এলো। বেশ তৃপ্তি সহকারেই খেলো। এখানের গরুর মাংস থেকে শুরু করে ভাজি-ডাল সবই সুস্বাদু। গতকাল এলাকার এক হোটেলে দুই লোকমা ভাত খেয়েছিল। তারপর আর খেতে পারেনি। রান্নার স্বাদ ভালো না হলে আসাদ তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারে না। খাওয়া শেষে বিল শুনে আসাদ মনে মনে একটা ধাক্কা খেলো। আড়াইশো টাকা বিল এসেছে। আসাদ ভাবতে লাগল এমন হলে তো বেতনের পুরোটাই খাবারের পেছনে চলে যাবে। অনেক ভেবেচিন্তে আসাদ সিদ্ধান্ত নিলো বাবা-মাকে শহরে নিয়ে আসবে। এই নিয়ে সে তার বাবার সাথে আলোচনা করলো। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। এর আগেও তারা বেশ কয়েকবার শহরে এসেছিলেন। শহরের চার দেয়ালের বন্দী পরিবেশে তাদের মন বসে না। অতঃপর আসাদ একটি সিদ্ধান্ত নিলো। তা নিয়ে সে তার মায়ের সাথে আলাপ করলো।
- মা, আমার জন্য ভালো থেকে একটা মেয়ে দেখো। সামনের মাসে ছুটি নিয়ে এসে বিয়ে করব।
ছেলের এমন কথা শুনে মোবাইলের ওপর পাশে থাকা রুকমনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মাত্রই ছেলেটা গ্রাম ছেড়ে শহরে উঠেছে। এরইমধ্যে বিয়ে করতে চাচ্ছে? রুকমনি ছেলেকে বুঝানোর চেষ্টা করলেন যে, আর কিছুদিন যাক। আগে ঘর দুয়ার পাকাপোক্ত করা হোক তারপর বিয়েশাদী। এতে আসাদ রেগে বলল, “ঠিক আছে। তাহলে আমি ট্রান্সফার নিয়ে গ্রামে চলে আসি।”
- না বাবা, তোর গ্রামে আসতে হবে না। আমরা মেয়ে দেখতেছি।
রুকমনি ব্যাপারটা তার স্বামী জয়নালকে জানালেন। এতে জয়নালও অস্থির হয়ে উঠলেন। বিয়েশাদীর ব্যাপার, হুট করে তো মেয়ে পাওয়া যায় না। তারওপর আসাদ তাদের একমাত্র ছেলে। তাই বিয়ে নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্ন আছে। আত্মীয়স্বজন ডেকে বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছেলের বিয়ে দিবেন। কিন্তু তাড়াহুড়োয় এসব সম্ভব না। রুকমনি ভালোভাবেই জানেন আসাদের কেমন মেয়ে চাই। সপ্তাহখানেক খোঁজাখুঁজির পরেও মনের মতো মেয়ে পেলেন না।
পাশের গ্রামে মারুফ তালুকদার টিনের ঘরের স্থানে ইট পাথরের বাড়ি তুলেছেন। তাই পাড়া-পড়শি ও আত্মীয়স্বজনকে ডেকে মিলাদ দিলেন। জয়নাল হলেন তালুকদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুজনে একই সাথে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সকল পরামর্শে দুজন একে অপরের পাশে ছিলেন। তাদের সেই বন্ধুত্ব আজও টিকে আছে। মিলাদে পোলাও-ভাতের আয়োজন করা হয়েছে। সাথে আছে পায়েস ও মিষ্টি। খাবারের প্রসংশায় সবাই পঞ্চমুখ হলেন। মারুফ গর্বের সাথে বলতে লাগলেন, রান্না তার মেয়ে নূরী করেছেন। এমনকি মিষ্টিও ঘরের বানানো।
রুকমনি তার স্বামীকে নূরীর ব্যাপারে বললেন। এই মেয়েই আসাদের সাথে সংসার করতে পারবে। জয়নাল প্রস্তাবটা তালুকদারকে জানালো। আসাদের ব্যাপারে গ্রামের সবাই জানে। সহকারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদে আছে। প্রায় এক বছর ধরে গ্রামেই ছিল। সেই সুবাদে সবাই তাকে চিনে। কিছু মাস হয়েছে প্রমোশন পেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট পদে উপনীত হয়ে শহরে গেছে। এমন ছেলে যেকেউই হাত ছাড়া করতে চাইবে না। তালুকদারও চান না। তিনি বিষয়টা মেয়েকে জানালেন। নূরী কোনো আপত্তি করলো না।
নূরী বিয়ের জন্য রাজি হয়েছে জেনে তার মা বেশ অবাক হয়েছেন। এমনকি তার বন্ধুবান্ধবও অবাক হয়েছে। সবাই ভেবেছিল নূরী শহরে কোনো বড় রেষ্টুরেন্ট দিবে। কেননা সে বিদেশ গিয়ে রান্নার ওপর দুই বছরের একটা কোর্স করেছে। সেখানের এক নামীদামী রেষ্টুরেন্টে তিন মাস কাজও করেছে। নানান দেশের নানারকম খাবার সে রাঁধতে পারে। সবার ধারণা ছিল নূরী নিজ পায়ে প্রতিষ্ঠিত হবে তারপর বিয়ে করবে। কিন্তু সবার চিন্তাভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে নূরী বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেল। হঠাৎই তার মধ্যে সংসার প্রবণতা জেগে উঠেছে। একটা সময় তার দুচোখে স্বপ্ন ছিল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। এখন তার দুচোখে স্বপ্ন শুধু স্বামী-সন্তানের।
পরবর্তী মাসে আসাদ গ্রামে এসে মেয়ে দেখতে এলো। সাথে তার বাবা-মা, চাচা-চাচী এসেছেন। দেখা সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে দুজনকে আলাদা কথা বলতে দেওয়া হলো। পরিচয় পর্ব শেষে আসাদ বলল, “কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করতে পারি?” নূরী সম্মতি জানালো।
- খাবারে তো অনেক আইটেম দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে আপনি কোনটা বানিয়েছেন?
নুরী হাসি দিয়ে বলল, “সবই আমি বানিয়েছি। আপনি বোধহয় আমার বায়োডাটা দেখেননি।” আসাদ আর কিছু বলল না। বায়োডাটায় সে বিদেশের কোর্সের ব্যাপারটা দেখেছে। তবে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু এখন বিশ্বাস করেছে। কেননা খাবারের প্রতিটি আইটেমের গুনগত মান ফাইভ স্টার হোটেলকেও হার মানিয়েছে।
বেশ ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো। বিয়ের চতুর্থ দিনের মাথায় নূরীকে নিয়ে শহরে পাড়ি জমালো আসাদ। শহরের হাবভাবের সাথে নূরী বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। তাই মানিয়ে নিতে সময় লাগল না। নতুন ঘরে আজ তাদের প্রথম দিন। নূরী পুরো ঘর নিজের মতো করে সাজালো। ভালো কিছু রান্নাও করলো। সন্ধ্যার পর আসাদ চলে এলো। নূরী তাকে এক গ্লাস শরবত বানিয়ে দিলো। শরবত-টুকু শেষ করে আসাদ তৃপ্তির ঢেকুর ফেলে বলল, “আহ! সারাদিনের ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল।” এইটুকুতেই নূরীর খুশির সীমা রইলো না। খানিকক্ষণ বাদেই আসাদের ব্যস্ততা আবার শুরু হলো। কিছুক্ষণ পরপরই তার ফোন আসতে লাগল। আর সে কথা বলতে লাগল। এভাবেই পুরো সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। নূরী সময় নিয়ে নিজেকে সাজালো।
যথাসময়ে আসাদ ডিনার খেতে বসলো। সবকিছু পরিবেশন করে নূরীও সাথে বসলো। নূরীর দিকে তাকিয়ে আসাদ বলল, “চমৎকার! কি সুন্দর! আহা! পরাণ জুড়িয়ে গেল।” নূরী লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসি দিলো। আসাদ আরও বলল, “অনেকদিন পর এমন সুস্বাদু খাবার খাচ্ছি।” এবার নূরী বিস্মিত হয়ে আসাদের দিকে তাকালো। তারমানে এতক্ষণ আসাদ যা বলেছে তা রান্নার প্রশংসা হিসেবে বলেছে। অথচ নূরী ভেবেছিল তার প্রশংসা করেছে। সে মনে মনে কিছুটা রাগ করলো। আসাদ তৃপ্তি সহকারে খেয়ে যাচ্ছে আর প্রশংসা করে যাচ্ছে। খাওয়া শেষেও প্রসংশা করে বলল, “তোমার হাতের রান্না সত্যিই অসাধারণ। সকালে সবজি জাতীয় কিছু রান্না করিও।” নূরী মাথা দুলালো।
দুজন দুপাশে শুয়ে আছে। আসাদ ইতোমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। নাক না ডাকলেও লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছে। নূরী ভীষণ রেগে আছে। আসাদের কাছ থেকে সে কিছু প্রসংশা আশা করেছিল। কিন্তু আসাদ তো তাকে ভালোমতো দেখলোই না। পরেরদিন সকালেও একই ঘটনা ঘটলো। নূরী সকালেও খুব সুন্দর করে সেজেছে। লাল-সবুজের সংমিশ্রিত শাড়ি পরেছে, চোখে কাজল দিয়েছে, মাথায় বেলী ফুল গুজেছে। তবুও আসাদের নজরে পড়লো না। সে শুধুমাত্র খাবারের প্রশংসা করে চলে গেল। যাওয়ার আগে রাতে চিকেন বিরিয়ানি রাঁধতে বলে গেল। দিন যতো যেতে লাগল নূরী ততই বুঝতে পারলো যে, আসাদের সমস্ত ধ্যান খাবার ঘিরেই সীমাবদ্ধ। নূরীর প্রসংশা তো দূর তার দিকে আসাদ ভালোমতো তাকায়-ই না। অথচ নূরী ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে নিজেকে সাজায় যাতে আসাদের নজর কাড়তে পারে। তার মুখে দুটো প্রশংসা শুনতে পারে। নূরীর অনেক স্বপ্ন ছিল স্বামীর মুখে নিজের প্রশংসা শুনবে, দুজনে মিলে চায়ের কাপে ধোয়া উড়িয়ে গল্প করবে, বৃষ্টি বিলাস করবে। কিন্তু আসাদের সাথে এসবের কিছুই হচ্ছে না। একরাশ আক্ষেপ নিয়ে নূরী তার জীবনের চাকা চালিয়ে যাচ্ছে। অপেক্ষায় আছে কোনো একদিন আসাদ তার অনুভূতি গুলো বুঝবে।
সরকারি ছুটিতে আসাদরা গ্রামের বাড়ি এলো। নূরী তার শ্বশুরবাড়িতে দুদিন থেকে তারপর বাপের বাড়িতে বেড়াতে এলো। বিয়ের পর এই প্রথম মেয়ে জামাই বাড়িতে এসেছে। তাই আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না। বড় দেখে বোয়াল মাছ আনা হলো। ছাগল জবাই করা হলো। ঘরে রান্নার ধুম পড়ে গেল। দুপুরে সবাই খেতে বসলো। আসাদের পাতে মাছের মাথা দেওয়া হলো। আসাদ দু লোকমা খেয়েই আটকে গেল। রান্না তার পছন্দ হয়নি। ব্যাপারটা নূরী আঁচ করতে পেরেছে। সে আসার আগেই রান্নাবান্না সব হয়ে গিয়েছিল। তবুও সে সময় করে সবজি ভাজি করেছিল। নূরী এগিয়ে এসে তা দিয়ে দিলো বলল, “তোমাদেরকে বলতে ভুলে গেছিলাম। ও বোয়াল মাছ খায় না। এলার্জি আছে।” নূরীর মা ছাগলের মাথাটা দিতে গেলেন। কিন্তু নূরী বাধা দিয়ে বলল, “ছাগলও খায় না।”
- সেকি! এই প্রথম জামাই এলো। আর নিরামিষ খাবে শুধু?
- আমারই দোষ। আমার বলে দেওয়া উচিত ছিল।
ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হলো।
পুকুর পাড়ে বসে আছে নূরী। আসাদ এসে বলল, “সবজি তুমি রেঁধেছ, তাই না?” নূরী মাথা ঝুলালো।
- যাক বাঁচলাম আজ। নয়তো আজ এসব খেতে খুব কষ্ট হতো।
- কেন? আমার মা কি খারাপ রান্না করে?
- তা নয়। তবে তোমার হাতের রান্না খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
- সকালে তো নিজের মায়ের হাতের রান্না ঠিকই চেটেপুটে খেয়েছ।
- আমার কাছে প্রথম সেরা রাঁধুনি আমার মা। তারপরেই তুমি।
নূরী ভেংচি কাটলো।
পরেরদিন সকালে আসাদরা যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল। নূরীর মা বললেন, “বাবা, তুমি তো গ্রামে আরও কিছুদিন আছ। তাই বলছি কি, নূরী এখানে কিছুদিন থেকে যাক। কতদিন পর মেয়েটাকে কাছে পেয়েছি!”
- হ্যাঁ, হ্যাঁ থাকুক কিছুদিন। আমি সময়মতো এসে নিয়ে যাব।
নূরীর মা খুশি হলেন। তবে নূরী বলল, “না, আমিও যাবো।” এতে নূরীর মা ব্যথিত হলেন। তবে নূরীর বাবা সাই দিলেন। নূরীরা চলে গেল। নূরীর মা অভিমানী সুরে বললেন, “মেয়েটা কি এখন তোমার কাছে বোঝা মনে হচ্ছে যে চলে যেতে দিলে?” জবাবে তার স্বামী বললেন, “আহা! ভুল বুঝো কেন? শহরে তো ব্যস্ততার কারণে ওরা দুজনে কথা বলারও সময় খুব বেশি পায় না। তাই আর আটকালাম না। নয়তো কি আমার ইচ্ছে করে না মেয়েটাকে কাছে রাখতে!” শেষ বাক্যটা তিনি বেদনায় ভরাক্রান্ত হয়ে বললেন।
এক সপ্তাহ পর আসাদরা রওনা দিলো। কিন্তু নূরী আরও কিছুদিন থাকার জন্য জিদ শুরু করলো।
- তুমি যাও। আমি আর কিছুদিন বাবা-মায়ের কাছে থাকি।
আসাদ আঁতকে উঠে বলল, “না, না। তা কিভাবে হয়? তোমাকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো?” এই কথা শুনে আসাদের বাবা-মা হাসলেও নূরীর মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি হলো না। কারণ সে জানে, সে না গেলে আসাদের খাওয়াদাওয়ায় সমস্যা হবে। আসাদ বুঝাতে লাগল যে, সামনে অনেক কাজ। নূরী না গেলে ঘর-দুয়ার নিয়ে সে বিপাকে পড়বে। অবশেষে রুকমনির কথায় নূরী যেতে রাজি হলো। বাসায় আসার পর নূরী চুপচাপ রুমে এসে শুয়ে রইলো। বেশ কিছুক্ষণ পর আসাদ এসে বলল, “কি হলো? এভাবে শুয়ে আছ কেন? রাতের খাবার রাঁধবে না?”
- ভালো লাগছে না।
- কি বল! তাহলে?
- হোটেল থেকে আনো।
আচ্ছা বলে আসাদ চলে গেল। ঘর থেকে বের হবে এমন সময় নূরী এসে বলল, “যেতে হবে না। আমি রান্না বাসাচ্ছি।” আসাদ যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
রান্না শেষে নূরী খাবার পরিবেশন করে আসাদকে ডাকলো। আসাদ এসে খেতে বসলো। মনের সাধ মিটিয়ে খাচ্ছে আর প্রসংশা করছে। আহা! কি সুস্বাদু! কি চমৎকার টেস্ট! তোমার হাতের সবকিছুই দারুণ। হঠাৎ আসাদ লক্ষ্য করলো আজকের মাছ ভাজাটা অন্যরকম হয়েছে। আগের তুলনায় যেন আরও সুস্বাদু। আসাদ বলল, “বাহ! মাছ ভাজা তো আজ খুবই সুস্বাদু হয়েছে।” নূরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই।”
- উম্মম্ম দারুণ। কালকেও নতুন কিছু করিও।
- এই! তুমি কি খাওয়া ছাড়া কিছু বুঝ না?
- খাওয়াই তো সব। পেট শান্তি তো দুনিয়া শান্তি।
- আর মনের শান্তির ব্যাপারে কিছু ভাবো না?
- মনের আবার কি লাগে?
- ভালোবাসা লাগে, সঙ্গ লাগে, সময় লাগে।
- কি যে বল না।
- তুমি আমার দিকে কখনো ভালো করে তাকিয়েছ? আমি যে তোমার জন্য কত সময় করে সাজগোজ করি, তুমি কি কোনোদিন সেটার মূল্যায়ন করেছ? ভালোবেসে আমাকে সময় দিয়েছ? সুখ-দুখের আলাপ করেছ? আমার মনের অনুভূতি গুলো জানার চেষ্টা করেছ? আমাকে বুঝার চেষ্টা করেছ? বলো, জবাব দাও।
নূরী একনাগাড়ে কথাগুলো বলল। তার চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট প্রকাশিত হয়ে আছে। আসাদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তারপর আঙ্গুল চুষে বলল, “আরেক টুকরো মাছ দাও তো।” নূরীর রাগ এবার আকাশ ছুঁয়ে গেল। রাগের মাথায় বাটির পুরো মাছ আসাদের প্লেটে ঢেলে দিয়ে বলল, “পেটুক একটা। খাও। খাও।” নূরী উঠে চলে গেল। আসাদ চুপচাপ খেতে লাগল। আর বিড়বিড় করে নিজেকে বলল, “খাবারের সাথে রাগ করতে নেই।”
নূরী অন্ধকার বারান্দায় বসে আছে। খাওয়া শেষে আসাদ সেখানে এলো। পাশে বসলো। তারপর বলল, “তুমি কোন কোন দেশি আচার বানাতে পারো?” নূরী অবাক হয়ে গেল। সে ভেবেছিল হয়তো এখন আসাদ তার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করবে। নূরী বলল, “সত্যিই আমার না বিশ্বাসই হচ্ছে না। এই! তোমার মধ্যে কি হৃদয়-মন বলতে কিছু নেই? আমি এখানে রাগ করে বসে আছি। কোথায় তুমি আমার রাগ ভাঙাবে, কিন্তু তা না করে তুমি আমাকে আচারের কথা জিজ্ঞেস করছো? কি অদ্ভুত!”
- আচারের কথা জিজ্ঞেস করার পরেই আমি রাগ ভাঙাতাম।
নূরী বারান্দা থেকে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। রাগে তার মাথা ব্যাথা উঠেছে।
পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আসাদ রান্নাঘরে উঁকি দিলো। সাথেসাথেই নূরীর সাথে দেখা হয়ে গেল। নূরী কোমড়ে শাড়ি গুজে বলল, “রান্না করছি কিনা সেটাই দেখতে এসেছ‚ তাই না? এমন পেটুক আমি জীবনেও দেখিনি।” আসাদ না শুনার ভান করে চলে গেল। নূরী মনে মনে হাসতে লাগল। আসাদ যে মস্তবড় পেটুক তা নূরী বিয়ের আগেই জেনেছিল। রুকমনিই বলেছিল। সেদিনই নূরী বুঝেছিল নিয়তি তাকে আসাদের স্ত্রী হওয়ার জন্যই তৈরি করেছে। নয়তো বিদেশ গিয়ে কুকিং কোর্স করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরিবর্তে হঠাৎ কেন স্বামী-সন্তানের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল?
আসাদ অপলক দৃষ্টিতে নূরীর দিকে তাকিয়ে আছে। নূরী গোগ্রাসে একের পর এক লোকমা মুখে পুড়ে দিচ্ছে আর গিলছে। আসাদের দিকে চোখ পড়তেই নূরী বলল, “কি ব্যাপার, এভাবে তাকিয়ে কি দেখছো?”
- তোমার খাওয়া দেখছি।
- আমিও সেটাই ভাবছি। কারণ তুমি তো আমাকে দেখার মতো মানুষ না।
- তুমি তো ডায়েট করছ। তবে আজ এভাবে বেপরোয়ার মতো খাচ্ছ কেন?
- আমি ডায়েট করছি। কিন্তু ভেতরে যে এসেছে সে তো ডায়েট করছে না।
“ও আচ্ছা” বলে আসাদ নিজের খাওয়াতে মনোযোগ দিলো। খেয়েদেয়ে উঠে চলে গেল। নূরী বোকার মতো বসে রইলো। এই মানুষটা কি কিছুই বুঝে না? কি অদ্ভুত!
আসাদ অফিসের জন্য প্রস্তুত হয়ে বের হতে লাগল। নূরী লান্স বক্সটা এগিয়ে দিলো। আসাদ বাইরে যাওয়ার জন্য পা দিলো। হুট করেই সে আবার নূরীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। আর তাত্ক্ষণিক নূরীর কপালে একে একে দুটো চুমো দিয়ে বলল, “একটা তোমার জন্য আরেকটা নতুন অতিথির জন্য।” আসাদের এমন আচরণে প্রথমে নূরী বিস্মিত হয়ে গেল। পরক্ষণেই লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিলো। আসাদ আরও বলল, “রান্নাবান্না সাবধানে করিও। আমি যত দ্রুত সম্ভব আম্মুকে নিয়ে আসবো।” লাজুক স্বরে নূরী বলল, “কিছুদিন না খেলে কি হবে?”
- না মানে আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে……
- হয়েছে আর বলতে হবে না। আমি সব করতে পারব। যাত্রা তো মাত্রই শুরু।
একচিলতে হাসি দিয়ে আসাদ চলে গেল। নূরী বারান্দায় এসে এক কাপ কফি নিয়ে বসলো। আসাদকে যতটুকু বোকা মনে করেছিল ততটুকু বোকা সে নয়। তবে ভীষণ রকমের খাদক। খাওয়া ছাড়া কিছুই বুঝে না। নূরী পেটে হাত রেখে বলল, “তুইও তো মনে হয় তোর বাবার মতোই খাদক হবি। ইতোমধ্যেই আমার ক্ষুধার মাত্রা বেড়ে গেছে। হায় কপাল! জীবনটা কি দুই খাদকের জন্য রাঁধতে রাঁধতেই চলে যাবে? কেন যে বিদেশ গিয়ে কুকিং কোর্স করলাম! তবে ভালোই লাগে যখন সে রান্নার প্রসংশা করে।” নূরী লাজুক হাসি দিলো। তার মনের মধ্যে অদ্ভুত ভালোবাসা কাজ করছে। নিজেকে নিজেরই খুব ভালো লাগছে। নূরী কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর ভাবছে আজ রাতে দুই পেটুকের জন্য স্পেশাল কিছু রাঁধতে হবে। একজন বাহিরের অন্যজন ভেতরের।
সমাপ্ত।

কৃষ্ণপূজা এবং দুর্গাপূজা কি এক?
অল্প-বুদ্ধিসম্পন্ন কিছু লোক অল্পমেধাসাম্ (গী. ৭/২৩) যারা নিজেদের মহাপণ্ডিত বলে লোক ঠকায়, তারা সমস্ত দেব-দেবীকে ভগবানের বিভিন্ন রূপ বলে মনে করে এবং তাদের ভ্রান্ত প্রচারের ফলে জনসাধারণও সেই কথা সত্য বলে মনে করে। প্রকৃতপক্ষে, এই সমস্ত দেব-দেবী ভগবানের বিভিন্ন রূপ নন, তাঁরা হচ্ছেন ভগবানের বিভিন্ন অংশ বিশেষ। ভগবান হচ্ছেন এক, আর অবিচ্ছেদ্য অংশেরা হচ্ছেন বহু। বেদে বলা হয়েছে, নিত্যনিত্যানাম্ ভগবান হচ্ছেন এক ও অদ্বিতীয়। ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ "ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর।" বিভিন্ন দেব-দেবীও হচ্ছেন শক্তিপ্রাপ্ত যাতে তাঁরা এই জড় জগৎকে পরিচালনা করতে পারেন। এই সমস্ত দেবদেবী হচ্ছেন জড় জগতের বিভিন্ন শক্তিসম্পন্ন জীব (নিত্যানাম্), তাই কোনো অবস্থাতেই তাঁরা ভগবানের সমকক্ষ হতে পারেন না। শুক্লযজুর্বেদ (৩২/৩) ও শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে (৪/১৯) তাই বলা হয়েছে, ন তস্য প্রতিমা অন্তি অর্থাৎ তাঁর (পরমেশ্বর ভগবানের) সমান বা তুল্য কেউ নেই। যে মনে করে যে, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবিষ্ণু বা শ্রীনারায়ণ ও বিভিন্ন দেবদেবী একই পর্যায় ভুক্ত, তার কোনো রকম শাস্ত্রজ্ঞান নেই। এমনকি দেবাদিদেব মহাদেব এবং আদি পিতামহ ব্রহ্মাকেও ভগবানের সঙ্গে তুলনা করা চলে না। প্রকৃতপক্ষে শিব, ব্রহ্মা, আদি দেবতারা ভগবানের সেবা করেন (শিববিরিঞ্চিনুতম্); কিন্তু তা সত্ত্বেও মানব সমাজে অনেক নেতা আছে, যাদেরকে মূর্খ লোকেরা 'ভগবানে নরত্ব আরোপ'- এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অবতার জ্ঞানে পূজা করে। কিন্তু ভগবান শ্রীনারায়ণ বা শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পরমেশ্বর, তিনি এ জড় জগতের নাম, বিগ্রহ বা স্বয়ংরূপে আবির্ভূত হলেও জড় জগতের তত্ত্ব নন। তিনি জড় জগতের অতীত চিন্ময় জগতে নিত্য অবস্থান করেন।
এমনকি মায়াবাদ দর্শনের প্রণেতা শ্রীপাদ শঙ্করাচার্য বলে গেছেন, নারায়ণ অথবা শ্রীকৃষ্ণ এই জড় জগতের অতীত। কিন্তু সাধারণ লোকেরা (হৃতজ্ঞান) তা সত্ত্বেও
তাৎক্ষণিক ফল লাভ করার আশায় বিভিন্ন জড় দেবদেবীর পূজা করে চলে। এ সমস্ত অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা বুঝতে পারে না, বিভিন্ন দেবদেবীকে পূজা করার ফলে যে ফল লাভ হয়, তা অনিত্য। যিনি প্রকৃত
বুদ্ধিমান, তিনি ভগবানেরই সেবা করেন। তুচ্ছ
ও অনিত্য লাভের জন্য বিভিন্ন দেবদেবীকে
পূজা করা নিষ্প্রয়োজন। জড়া প্রকৃতির বিনাশের সঙ্গে-সঙ্গে এই সমস্ত দেবদেবী এবং তাঁদের উপাসকেরা ধ্বংশপ্রাপ্ত হবে। দেবদেবীদের দেওয়া বরও হচ্ছে জড় এবং অনিত্য। জড় জগৎ, জড় জগতের বাসিন্দা,
এমনকি বিভন্ন দেবদেবী এবং তাঁদের উপাসকেরা সকলেই হচ্ছে মহাজাগতিক সমুদ্রের বুদবুদের ন্যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই জগতের মানবসমাজ ভূসম্পত্তি, পরিবার, পরিজন, ভোগের সামগ্রী আদি অনিত্য জড় ঐশ্বর্য লাভের আশায় উন্মাদ। এই প্রকার অনিত্য বস্তু লাভের জন্য মানব সমাজে কেউ কেউ বিভিন্ন দেবদেবীর অথবা শক্তিশালী কোন ব্যক্তির পূজা করে। কোনো রাজনৈতিক নেতাকে পূজা করে যদি ক্ষমতা লাভ করা যায়, সেটিকে তারা পরম প্রাপ্তি বলে মনে করে। তাই তারা সকলেই তথাকথিত নেতাদের দণ্ডবৎ প্রণাম করেছে এবং তার ফলে তাদের কাছ থেকে
ছোটখাটো কিছু আশীর্বাদও লাভ করেছে। এসমস্ত অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা জড় জগতের দুঃখ কষ্ট থেকে চিরকালের জন্য মুক্ত হবার জন্য ভগবানের শরণাগত
হতে আগ্রহী নয়। পক্ষান্তরে, সকলেই তাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধন করার জন্য ব্যস্ত এবং তুচ্ছ একটু ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করার জন্য তারা দেব-দেবীর আরাধনার প্রতি আকর্ষিত হয়। খুব কম মানুষই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীচরণের শরণাগত হয়। অধিকাংশ মানুষই সর্বক্ষণ চিন্তা করছে- কিভাবে আরও বেশি ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ
করা যায়। আর এই সমস্ত ভোগবাসনা চরিতার্থ করার
জন্য তারা বিভন্ন দেবদেবীর কাছে গিয়ে 'এটা দাও', 'ওটা দাও' বলে কাঙ্গালপনা করে তাদের
সময় নষ্ট করছে।
এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত শ্লোকটি প্রণিধানযোগ্য-
যথা তরোর্মূলনিষেচনেন
তৃপ্যন্তি তৎস্কন্ধভুজোপশাখাঃ।
প্রাণোপহারচ্চ যথেন্দ্রিয়াণাং
তথৈব সর্বার্হণমচ্যুতেজ্যা॥ (ভাগবত ৪/৩১/১৪)
বৃক্ষমূলে জলসেচন করলে যেমন সেই গাছের কাণ্ড, ডাল, উপশাখা প্রভৃতি সকলেই তৃপ্তিলাভ করে এবং উদরে আহার্যদ্রব্য প্রদানের দ্বারা যেমন সমস্ত ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি হয়, তেমনই শ্রীকৃষ্ণের পূজা করলে সমস্ত দেবতার পূজা হয়ে যায়। তখন ভগবানের বিভিন্ন অংশ দেবতারাও আপনা থেকেই তৃপ্ত হন। তাই কখনো দেবদেবী-পূজাকে ভগবদ্ভক্তির সমকক্ষ মনে করা উচিত নয়।
পরমেশ্বর ভগবানকে বাদদিয়ে দুর্গাপূজার ফলে খুব বেশি হলে কৈলাশধাম প্রাপ্ত হওয়া যেতে পারে, কিন্তু বৈকুণ্ঠ বা গােলােকধামে গমন সম্ভব নয়।
মাহেশ্বরা রাজসী চ বলিদানসমন্বিতা।
শাক্তাদয়াে রাজসাশ্চ কৈলাসং যান্তি তে তয়া॥ (ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, প্রকৃতিখণ্ড ৬৪.৪৮॥
তাই দেবী দুর্গারই নির্দেশে সুরথ রাজা অন্তিমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই আরাধনা করেছিলেন এবং ভগবদ্ধাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন।
শাক্তগণ বলেন, “যিনি কালী বা দুর্গা, তিনিই কৃষ্ণ”। শাস্ত্রানুসারে, দেবী কালী ভগবানের শক্তি, আর শ্রীকৃষ্ণ হলেন সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর ভগবান। আগুন তাপ ও আলাে উভয় শক্তির উৎস। অর্থাৎ, তাপ ও আলাে শক্তি দুটো আগুনের প্রকাশ- আগুন শক্তিমান, তাপ ও আলাে শক্তি। তেমনি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনন্তশক্তির মধ্যে তিনটি প্রধান শক্তি হলাে অন্তরঙ্গা, বহিরঙ্গা ও তটস্থা শক্তি। দেবী কালী হলেন শ্রীকৃষ্ণের বহিরঙ্গা মায়াশক্তি দুর্গার উগ্ররূপা প্রকাশ, যার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ সংহারকার্য সম্পাদন করেন। ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছে---
সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়সাধনশক্তিরেকা
ছায়েব যস্য ভুবনানি বিভর্তি দুর্গা।
ইচ্ছানুরূপমপি যস্য চ চেষ্টতে সা
গােবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি॥
“স্বরূপশক্তি বা চিৎশক্তির ছায়া-স্বরূপা প্রাপঞ্চিক জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়-সাধিনী মায়াশক্তিই ভুবনপূজিতা 'দুর্গা', তিনি যাঁর ইচ্ছানুরূপ চেষ্টা করেন, সেই আদিপুরুষ গােবিন্দকে আমি ভজনা করি।”
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের প্রকৃতিখণ্ডে (১.৯০) কালী সম্পর্কে বলা হয়েছে---
‘কৃষ্ণভক্তা, কৃষ্ণতুল্যা তেজসা বিক্রমৈর্গুণৈঃ।
কৃষ্ণভাব নয়া শশ্বৎ কৃষ্ণবর্ণা সনাতনী'।
অর্থাৎ, “দেবীকালী তেজ ও গুণ বিক্রমে কৃষ্ণতুল্যা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি কৃষ্ণ ভক্তিপরায়ণা তথা শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত (বৈষ্ণবী)। এই সনাতনী নিরন্তর কৃষ্ণের ভাবনাবশত কৃষ্ণবর্ণ হয়েছেন।”
ভক্তের মধ্যে ভগবানের সমস্ত দিব্যগুণ বিকশিত হয়, তথাপি ভক্ত ও ভগবান দুই ভিন্ন সত্ত্বা। ভগবান সেব্য, আর ভক্ত হলেন তাঁর সেবক। তেমনি দেবীকালী হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবিকা।
একেলা ঈশ্বর কৃষ্ণ আর সব ভৃত্য।
যারে যৈছে নাচায়, সে তৈছে করে নৃত্য॥
সুতরাং, কালী তথা দুর্গা ও কৃষ্ণ এক নয়।

আমি_রোদেলা#পর্ব_১২
পর দিন দুপুরে আমি আর মিনু খালা খেতে বসেছি ।
- খালামনি তোমার ফোনটা আমাকে ঘন্টা দুয়েকের জন্য দেয়া যাবে ?
- আমার ফোন দিয়ে তুই কি করবি ?
- আমার ফোনটা যার কাছে তার সাথে দেখা করতে যাবো ।
- কি বলিস ? তুই একা যাবি ?
- হুম , তাতে সমস্যা কি ? আমি তো আর ছোট নই ।
- তোর মা জানে ?
- আমার ফোন যে হারিয়ে গেছে আম্মু তো সেটাই জানে না । আর ফোন আনতে আমি একা যাব সেটা জানবে কি ভাবে ?
- আচ্ছা তুই আমাকে একটা কথা বলতো , তুই যে আমার সাথে এত খোলামেলা ভাবে কথা বলিস , তোর মার সাথে কেন এমন দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলিস বলতো ?
- তুমি কি মনে করো আমি আম্মুর সাথে এভাবে মিশতে চাই না । আমার খুব ইচ্ছে করে জানো , আমার সব কথা আম্মুর সাথে শেয়ার করতে , কিন্তু আব্বুর ঘটনার পর থেকে আম্মু কেমন জেনো হয়ে গেছে । সব কিছুতেই একটু দূরত্ব বজায় রাখতে চায় । তুমি চলে যাবার পর তো সেটা আরো বেড়েছে ।
- তোর মা না হয় দূরত্ব বজায় রাখে তুই তো সেটা ভেঙ্গে কাছে যেতে পারতি কিন্তু তুই তো তা করিস নি ।
- তুমি বুঝি আম্মুকে চেনো না , আম্মু যা বলে বা করে সেটার কেউ ব্যাতিক্রম করুক আম্মুর সেটা একে বারেই পছন্দ করেন না ।
- হুম বুঝলাম ।
- বললে না তো আমি তোমার ফোনটা নিতে পারবো কি না ।
- আমি তোর সঙ্গে যাই , কি বলিস ?
- তোমাকে নিলে তো ভালোই হতো , কিন্তু বাসায় এসে আম্মু যখন দেখবেন । আমরা দুজনেই বাসায় নেই তখন । আচ্ছা আম্মু গিয়েছে কই ? কিছু বলেছে ? আজ তো আম্মুর অফিস নেই ।
- কিছু তো বলেনি , বলেছে আসতে দেরি হবে । আমরা জেনো দুপুরে খেয়ে নেই ।
- আচ্ছা তুমি বরং বাসায় ই থাকো , আমি যাব ফোনটা নিয়েই চলে আসবো ।
- তুই একা যাবি ? যদি লোকটার মতলব খারাপ হয় । যদি কোন বিপদে ফেলে দেয় তোকে ।
- ফেলতে পারবে না , সি আর বি তে দেখা করবে । বিকাল বেলা ওখানে হাজার লোকের আনাগোনা হয় । এত মানুষের ভিড়ে কিছু করার সাহস ই হবে না ।
- তারপরও তুই একা একটা মেয়ে ।
- চিন্তা করো নাতো , ফোনে কথা বলে তো ভদ্রলোক ই মনে হলো ।
- তুই বরং অন্তূ কে নিয়ে যা ।
- কাল আম্মু কি বলেছে ভুলে গেলে । কথা বলতে বারণ করেছে আর তুমি বলছো ওকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে যেতে , তাহলে তো ঘরে কেয়ামত চলে আসবে । এমনি আম্মু রেগে আছেন আমার দুইদিন বাহিরে থাকা নিয়ে ।
- ওই দুদিনের ব্যাপারটা আলাদা , আমি তোর আম্মুকে সব বলেছি । তোর আম্মু বলছিলো উনাদের ফোন করবে , তোর কাছ থেকে নম্বরটি নিতে বলেছে আমাকে ।
- আম্মু ফোন করে কি বলবে বলো তো ?
- কি আর বলবে , কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে । সেটাই স্বাভাবিক তাই না ।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমি রুমে এলাম , যাওয়ার আগে কি একবার ফোন করে দেখব । আজ ভদ্রলোক আসবেন কি না । মিনু খালার কাছে ফোন আনতে রুম থেকে বের হতে যাবো তখনই দেখি মিনু খালা আমার রুমে ঢুকলেন ।
- আমি তো তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম ।
- কেন ?
- তোমার ফোনটা দাও তো , ওই লোক কে একটা ফোন করে দেখি । আজ আসবে কি না ।
মিনু খালা কিছু না বলে ফোনটা আমার হাতে দিলেন । আমি আমার নম্বরে ফোন দিলাম , রিং হচ্ছে কেউ ফোন ধরছে না । বেশ কয়েক বার চেষ্টা করার পর , ফোনটা মিনু খালাকে দিলাম ।
- কি রে কি হলো ? ফোন বন্ধ করে রেখেছে ?
- না , রিং হচ্ছে কিন্ত কেউ ধরছে না ।
- মনে হয় কাজে ব্যস্ত ।
- হবে হয়তো ।
- ওই লোক ফোন না করলে শুধু শুধু যাওয়ার দরকার নাই । মোবাইল গেলে যাক আর একটা কিনে নেয় যাবে ।
- দেখিনা , পাঁচটা বাজতে এখনো অনেক দেরি ।
রোদেলা আজ একবার ও ফোন করেনি , এই মেয়েটার তো আর একবার ফোন করে নিশ্চিত হওয়া উচিত ছিল যে আমি আজ আসবো কি না । নাকি ধরেই নিয়েছে যে আজ আমি যাচ্ছি ।
- তুহিন খেতে আয় ।
মায়ের ডাকে তুহিনের চিন্তায় ছেদ পরলো ।
- মা আসছি ।
বলেই তুহিন নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলো । তুহিন কে দেখে মিসেস রামিসা জানতে চাইলেন ।
- কিরে আজ কোথাও বের হোস নি যে ? শরীর খারাপ লাগছে ।
- কই না তো । বিকেলে বাহিরে যাব তাই আর সকালের দিকে বের হলাম না । তা তোমার ঐ রোদেলা ফোন করে ছিলো ?
- আমাকে করে নি , আমার নম্বর তো ওর কাছে নেই । তবে গতকাল তোর বাবাকে ফোন করেছিলো । ঠিক মত বাসায় গিয়েছে , আর আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে ।
- যাক মেয়েটি তাহলে অকৃতজ্ঞ নয় ।
-অকৃতজ্ঞ হতে যাবে কেন ? যাওয়ার সময় ই তো কতবার করে ধন্যবাদ জানিয়ে গেছে । বলেছে এই ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারবে না ।
- ভদ্রতা জানে তাহলে ।
- তুই মেয়েটিকে এত খারাপ ভাবছিস কেন বলতো ?
- মা তুমি আজকাল কার মেয়েদের চেনো না । সবাই স্বার্থপর । শুধুমাত্র নিজের টাই বুঝে ।
- তুই মনে হয় অনেক মেয়ে কেই চিনিস ।
- চিনবো না কেনো ? স্কুল, কলেজ ভার্সিটিতে এখন অফিসে কম মেয়ের সাথে তো আর মেশা হলো না ।
- আমার ছেলে তো তাহলে ভালোই মেয়ে চেনে । বাদ দে এসব , তোর কি কোন পছন্দ আছে ? মা কে বলতে পারিস ।
- আছে না ছিলো ।
- ছিলো মানে কি ?
- ছিলো মানে হলো একজন কে পছন্দ করতাম , এখন আর করি না ।
- কই কখনো বলিস নি তো মাকে ?
- ভেবেছিলাম চাকরিটা পার্মানেন্ট হলে তোমাকে জানাবো । কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে গিয়েছে ।
- কি নাম ছিলো রে মেয়েটার ?
- নীলা আমার সাথে ভার্সিটিতে পরিচয় ।
- কিন্তু সম্পর্কটা কে ভেঙেছে তুই না নীলা । তোর যা খুঁতখুঁতে স্বভাব আমার তো মনে হয় তুই কিছু করেছিস ।
- মা তুমি শুধু আমার দোষ টাই দেখো । ওই যে বললাম না , মেয়েরা শুধুমাত্র নিজের টা
বুঝে । আমার চাকরী কবে পার্মানেন্ট হবে সে অপেক্ষায় সে বসে থাকবে কেন । অস্ট্রেলিয়ার ছেলে পেয়েছে , ছেলে অনেক টাকা ইনকাম করে । এমন ছেলে পেলে আমার জন্য কেন সে অপেক্ষা করবে বলো ।
- ওদের কি বিয়ে হয়ে গেছে ?
- কেন বলতো ?
- না এমনি জানতে চাইলাম ।
- হ্যা , গত মাসে নীলার বিয়ে হয়ে গিয়েছে ।
তুহিন খাওয়া দাওয়ার পর মায়ের সাথে অনেক্ষন গল্প করে নিজের রুমে গেলো । গিয়ে দেখে রোদেলার ফোনে ছয়টা মিসড কল উঠে আছে । ছয়টা মিসড কল ই এসেছে মিনু খালার নম্বর থেকে ।
তুহিন ফোন ব্যাক করলো ।
- হ্যালো , আসসালামুয়ালাইকুম ।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম ।
- ফোনটা রোদেলাকে দেয়া যাবে ।
- একটু লাইনে থাকুন ।
তুষার ফোন কানে দিয়ে বসে রইলো , যিনি ফোন ধরেছেন উনি হয়তো মিনু খালা হবেন ।
- হ্যালো
- আপনি কি আজ আসবেন ?
- হ্যা । আপনি ?
- আমি তো আসবই , আপনার ফোনটা তো আর আমার কাছে রেখে দিতে পারি না ।
-তাহলে পাঁচটায় দেখা হচ্ছে । কিন্তু আমি আপনাকে চিনবো কি ভাবে ?
- আপনাকে চিনে নিতে হবে না , আমি ই আপনাকে চিনে নেব । যেখানে দাঁড়াতে বলেছি ওখানেই
থাকবেন ।
- জী আচ্ছা । আল্লাহ হাফেজ ।
- আল্লাহ হাফেজ ।
তুহিন ফোন রেখে ঘড়ি দেখলো , সাড়ে তিনটা বাজে । হাতে এখন ও সময় আছে । মোবাইলটা এভাবেই দিব, একটা প্যাকেট হলে ভালো হতো ।
- কিরে রোদেলা তুই কটায় বের হবি ?
- খালামনি আসরের নামাজটা পড়ে বেরহই । নয়তো দেখা যাবে বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় গিয়েছি তখন আযান পড়ছে ।
- ঠিক আছে ।
- আচ্ছা তোমার ফোনে , তোমার কল আসলে কি বলবো ।
- আমাকে ফোন দেবার তো কেউ নেই । দিলে হয়তো তোর আম্মু দিতে পারে ।
- আম্মু ফোন দিলে কি বলবো , ধরেই তো জানতে চাইবে তোমার ফোন আমার কাছে কেন ? তখন ।
- তুই ফোন রিসিভ করিস না । ফোন না ধরলে ঘরের নম্বরে ফোন দেবে । তখন কিছু একটা বলে দেয়া
যাবে । তুমি কিন্তু দেরি করবে না ।
- ঠিক আছে খালামনি ।
আমি নামাজ পড়ে কাপড় পাল্টে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম । নিচে নেমে ঘড়ি দেখলাম চারটা বিশ বাজে , সময় মত পৌঁছাতে পারবো কিনা সন্দেহ হলো । রাস্তায় কোন খালি সি এন জি নেই । আমি যখন সি এন জি পেলাম তখন চারটা পঞ্চাশ বেজে গেছে । আমার টেনশন হতে লাগলো । লোকটি যদি অপেক্ষা না করে চলে যায় । আমার যাওয়া টাই বৃথা হয়ে
যাবে । আমি খালামনির নাম্বার থেকে ফোন দিলাম ফোনে ব্যালেন্স নেই । মেজাজ টা খারাপ হয়ে গেলো । আমার উচিত ছিলো বের হবার আগে ব্যালেন্স চেক করা । গাড়ি থামিয়ে টাকা ঢুকাতে গেলে সময় নষ্ট হবে তাই ঠিক করলাম । ওখানে যাওয়ার পর দেখা যাবে । আমি যখন সি আর বি তে পৌছালাম ঘড়িতে তখন পাঁচটা বিশ । গাড়ি থেকে নেমেই আমি আসে পাশে তাকাতে থাকলাম । এখানে তো অনেক মানুষ , ওই লোক কে কিভাবে খুঁজে পাবো ।
- আপনি অনেক লেট করে এসেছেন ।
আমার সামনে অনেক হ্যান্ডসাম একটা ছেলে হাসতে হাসতে বললো । আমি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম এই ছেলের সাথে তো আমার জীবনে ও দেখা হয়নি । তাহলে আমার ফোন এর কাছে গেলো কি ভাবে । দেখে তো চোর ও মনে হচ্ছে না । আর সবচেয়ে বড় কথা এই লোক আমাকে এত সহজে চিনলো কি ভাবে ?
- মিস রোদেলা কি ভাবছেন ?
- সরি , বাসা থেকে বেরিয়ে গাড়ি পাচ্ছিলাম না । আমার ফোন এনেছেন ?
- আপনি আমাকে এতক্ষন দাঁড় করিয়ে রেখেছেন আগে চলুন কোথাও বসি । তারপর না হয় ...
- দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য সত্যি আমি দুঃখিত । ফোনটা দিয়ে দিলে আপনাকে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না ।
- আপনি তো অদ্ভুত মানুষ , আমি আপনার ফোন ফেরত দিতে আসলাম । এক কাপ কফি তো অফার করতে পারেন ।
- সরি , আপনি কি খাবেন বলুন । আমি বিল পরিশোধ করে দিচ্ছি ।
- আমি তো একা খাবো না । আপনি আমার সাথে ভেতরে গিয়ে বসবেন , আমাদের পরিচয়টা ই তো হয় নি । পরিচয় পর্ব শেষ করবো তারপর কফি এবং যাবার আগে আমি আপনার ফোন আপনাকে বুঝিয়ে দেবো ।
- এতো ঝামেলা কি দরকার বলুন । ফোনটি দিয়ে দিন , আমি আপনার খাবারের বিলটা দিয়ে দিচ্ছি ।
- আচ্ছা আপনার একবার ও এটা জানার কৌতূহল হচ্ছে না যে । আমি কে ? আপনার ফোনটা আমার কাছে এলো কি ভাবে ?
চলবে .......
✍️রেহানা হক রেনু
গত পর্বের লিংক -১১
https://m.facebook.com/groups/526513374820830?view=permalink&id=849406749198156

আমি_রোদেলা
- হচ্ছে না , তা বলবো না । তবে জেনে কি করবো বলুন ? ফোনটা পেলে তো আপনার সাথে যোগাযোগ করার আর কোন কারণ থাকবে না । শুধু শুধু কেন সময় নষ্ট করবো বলুন । ফোনটা দিয়ে দিন আমি চলে যাই ।
- আপনি তো সত্যি খুব আজব মানুষ ।
- আপনি যা ইচ্ছা ভাবতে পারেন , আমার কোন সমস্যা নাই । শুধু আমার ফোনটি দিয়ে দিন তাহলেই হবে ।
- আপনি আমার সাথে আগে কফি খাবেন কথা বলবেন তারপর আমি আপনাকে ফোনটা ফিরত দিব ।
খেয়াল করলাম আসে পাশের মানুষ জন আমাদের খেয়াল করছে । আবার কোন ঝামেলা পরতে হয় , তাই বললাম ।
- চলুন ।
রেস্টুরেন্টে ঢুকে বাহিরে খলামেলা জায়গায় একটা টেবিল দেখে বসে পরলাম , ভদ্রলোক ও এসে আমার সামনের চেয়ারে বসলেন ।
- শেষ পর্যন্ত আমার কথা শুনলেন তাহলে ।
- এবার বলুন আপনি কে ? কিভাবে আমার ফোন আপনার কাছে গেলো ?
- ধীরে , একটু অপেক্ষা করুন খাবারের অর্ডার টা আগে দিয়ে নেই । আপনার সাথে তর্ক করতে গিয়ে আমার গলা শুকিয়ে গেছে ।
টেবিলে রাখা পানির বোতল খুলে গ্লাসে ঢেলে খেলে পানি নিলেন । তারপর ভদ্রলোক হাতের ইশারায় ওয়েটার কে ডাকলেন ।
-দুই কাপ কফি , সাথে আপনি কি নিবেন বলুন ?
- আমি কিছু নিব না । আপনি আপনার জন্য অর্ডার করুন ।
- তাহলে দুটো কফি আর দুটো স্যান্ডউইচ দিয়ে যান ।
ওয়েটার ছেলেটা চলে যেতেই বললেন ।
- আমি রায়হান আহমেদ তুহিন । একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আছি ।
- পরিচিত হয়ে খুশি হলাম । তুহিন সাহেব এবার মনে হয় আপনি আমার মোবাইলটা দিয়ে দিতে পারেন।
- আপনার আর একটি প্রশ্নের উত্তর এখনো দেয়া বাকি আছে কিন্তু ।
- ঠিক আছে বলুন ।
- আমার আর একটি পরিচয় আছে যেটা বললে হয়তো আপনি বুঝতে পারবেন কি করে ফোনটি আমার কাছে এলো ।
- চাকরির পাশাপাশি আপনি কোন চোরাই দলের গ্যাং লীডার নন তো ?
- আমাকে দেখে কি আপনার তাই মনে হচ্ছে ?
- মানুষের বাহিরের টা দেখেতো আর বলা যায় না সে কি বা কেমন । তা ছাড়া আপনি যে ব্যাংকে চাকরি করেন সেটা যে সত্য তা কি করে ভেবে নেই বলুন তো ?
- আপনি আমাকে বিশ্বাস করছেন নাতো ?
তুহিন সাহেব পকেট থেকে আইডি কার্ড বের করে আমার সামনে দিয়ে বললেন ।
- এবার বলুন আমি সত্যি বলেছি কি না ?
আমি কার্ড টা হাতে নিয়ে দেখলাম । ফিরিয়ে দিতে দিতে বললাম
-দেখে তো আসল ই মনে হচ্ছে ।
আমার কথা শুনে তুহিন সাহেব কিছুটা রেগে গেলেন , রাগের কারণে উনার কপাল ঘামছে , মুখ ও লাল হয়ে যাচ্ছে । বোতল থেকে আরও এক গ্লাস পানি খেলেন । ভদ্রলোক কে রাগিয়ে দিয়ে আমার কেন জেনো খুব মজা লাগছে ।
- আপনার ধারণা এই আইডি কার্ড টি নকল ?
- নকল বলি নি , বলেছি হতেও তো পারে ।
- আপনি কি আমাকে রাগাতে চাচ্ছেন ?
- না , আপনাকে রাগাতে যাব কেন বলুন তো । আর দেখুন ফোনটি তখন দিয়ে দিলে কি ঝামেলা টা মিটে যেতো না । এতো কথার তো কোন প্রয়োজনে ছিলো না । কি বলেন ?
তুহিন সাহেব কিছুটা রেগেই বললেন ,
- আমি কবির আহমেদ ও মিসেস রামিসা আহমেদ এর ছেলে । যাদের বাসায় আপনি গতকাল সকাল পর্যন্ত ছিলেন । এবার নিশ্চয় বলবেন না যে এটাও আমি মিথ্যা বলছি ।
আমি অবাক হয়ে তুহিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলাম । কি বলবো খুঁজে পেলাম না । আমার তো আগেই বুঝা উচিত ছিলো । তুহিন সাহেবের চেহারা রামিসা আন্টির সাথে মিল আছে । আগে কেন ভালো করে খেয়াল করলাম না । আমি চুপ করে আছি দেখে , তুহিন সাহেব জানতে চাইলেন ।
- চুপ হয়ে গিয়েছেন যে ?
- সরি , আপনার প্রথমেই বলে উচিত ছিলো আপনি রামিসা আন্টির ছেলে । তাহলে এত ঝামেলা করার প্রয়োজন ছিলো না ।
- বলতে তো চেয়ে ছিলাম , তার আগেই তো আপনি আমাকে চোরদের লীডার বানিয়ে দিয়েছেন ।
-সেটা আপনার শুরুতেই বলা উচিত ছিলো ।
- বললেই কি আপনি আমাকে চিনতেন ?
- হ্যা , রামিসা আন্টি আপনার কথা বলেছে । আর আপনার চেহারা আপনার মায়ের সাথে মিল
আছে ।
- তাহলে প্রথমে দেখে কেন চিনতে পারেন নি ?
- আমার মাথায়ই আসেনি রামিসা আন্টির ছেলে আমার মোবাইল ফিরত দিতে আসতে পারে । আচ্ছা আপনি আমার মোবাইল পেলেন কি করে ?
আমার যত দূর মনে পরে আপনাদের বাসায় যাওয়ার পর আমি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করিনি । তাহলে ?
- আপনি ঠিকই ব্যাগ থেকে বের করেন নি । আগেই সরি বলে নিচ্ছি । আপনার সম্পর্কে জানার জন্য আপনার ব্যাগ খুলেছিলাম ।
মোবাইল যেহেতু ব্যাবহার কারি সম্পর্কে অনেক তথ্য বহন করে তাই আপনার মোবাইলটা চেক করেছিলাম । কিন্ত মোবাইলে চার্জ না থাকায় অন্য জিনিস পত্রের সাথে মোবাইল ফোনটি রেখে দেয়া হয়নি । আর আপনি তো সকালবেলা চলে গিয়েছিলেন তাই ফিরত দেবার ও কোন সুযোগ পাই নি । সরি ।
- সরি হবার কিছু নেই , আমি যেই ভাবে আপনাদের বাসায় গিয়ে ছিলাম । যে কেউ ই জানতে চাই তো আমি কে ? কোথা থেকে এসেছি ? আমার উদ্দেশ্য কি ? আপনার আব্বু আম্মু অনেক ভালো মানুষ । কিছুই জানতে চান
নি । আমি সত্যিই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ ।
- তারমানে আমি জানতে চেয়েছি বলে কি আপনি আমাকে খারাপ ভাবছেন ?
- না না তা কেনো হবে । আপনার জায়গায় আমি হলে হয়তো তাই করতাম । আপনার কফি মনে হয় ঠান্ডা হয়ে গেছে । আর এক কাপ দিতে বলি ?
দুজনে কথায় এতো ব্যস্ত ছিলাম যে টেবিলে খাবার দিয়ে গেছে ভুলেই গেছি । ওয়াটার কে ডেকে নতুন করে কফি দিতে বললাম ।
- আপনি কিন্তু আপনার সম্পর্কে কিছুই বলেন নি ?
আর কি কারণে সেদিন আমাদের বাসায় গিয়েছিলেন তা কিন্তু জানা হলো না ।
- আমি রাফিকা সুলতানা রোদেলা , সমাজতত্ত্ব নিয়ে অনার্স করেছি । আপাতত বেকার , কিছুই করছি না ।
- বুঝলাম , আমাদের বাসায় ওভাবে কেন গিয়েছিলেন ? মানে আপনার সাথে সেদিন কি ঘটেছিলো তা কিন্তু বললেন না ।
- রামিসা আন্টি আপনাকে কিছু বলে নি ?
- না , আম্মু কিছু বলে নি , এড়িয়ে গেছেন । আপনার কাছ থেকেই না হয় শুনি ।
- থাক না , নাইবা জানলেন ।
- কেন খুব কি ব্যক্তিগত কিছু ? তাহলে থাক ।
- ধন্যবাদ ।
- ধন্যবাদ কেন ?
- এইযে জানতে চাইলেন না , তার জন্য । সন্ধ্যা হয়ে এলো আমাকে বাসায় ফিরতে হবে ।
- একটা কথা বলবো ।
- জী , বলুন ।
- আপনাকে কি মাঝে মাঝে ফোন করতে পারি যদি আপনি বিরক্ত না হন ।
- ফোন করার কি কোন দরকার আছে ?
- না , তবে মাঝে মাঝে মনে হয় না , কাউকে ফোন করে জানতে চাই সে কেমন আছে ?
- হুম করতে পারেন । রামিসা আন্টির নাম্বারটা দিবেন ? সেদিন নেয়া হয় নি ।
- হ্যা , অবশ্যই । আপনি ফোন করলে আম্মু খুশি হবেন ।
বলেই তুহিন সাহেব আমার ফোনটি আমাকে ফিরত দিলেন ।
- ধন্যবাদ ।
আমি রামিসা আন্টির ফোনে নাম্বারটা সেইভ করে রাখলাম । ওয়েটার এসে বিল দিলো , আমি ব্যাগ থেকে টাকা বের করতেই , তুহিন সাহেব টাকা দিয়ে দিলেন ।
- বিল আমার দেবার কথা ছিলো ।
- আমি যেহেতু আপনাকে জোর করে কফি খাওয়াতে এনেছি । আজ আমি বিল দেবো । আর আপনার টা জমা রাখলাম অন্য কোন দিনের
জন্য ।
- কাজটা কিন্তু আপনি ভালো করেন নি আমি কোন কিছু বাকি রাখাটা পছন্দ করি না । আমাদের তো আর দেখা হবার কোন সম্ভাবনা
নেই । আপনি বরং এই টাকাটা রাখুন ।
- সরি , টাকাটা রাখতে পারছি না । বললাম তো অন্য কোন সময় আপনার কাছ থেকে চেয়ে নিবো ।
- অন্য সময়টা যদি কখনো না আসে ।
- তাহলে কি আর করার ।
- আমি এখন যাবো , সন্ধ্যা হলে এখানে গাড়ি পাওয়া মুশকিল হয়ে যায় । তাহলে আল্লাহ
হাফেজ । ভালো থাকবেন ।
বলেই আমি উঠে পড়লাম । তুহিন সাহেব ও আমার সাথে উঠতে উঠতে বললেন ।
- একটু দাঁড়ান , আপনাকে গাড়ি তো ঠিক করে দেই ।
- না ,লাগবে না । আমি ঠিক করে নিতে পারবো ।
- বুঝলাম আপনি পারবেন । যতক্ষন না পাচ্ছেন ততক্ষণ নিশ্চই আপনার সাথে থাকতে পারি ।
আমি কিছু বললাম না । হাঁটতে শুরু করলাম , রেস্টুরেন্টে থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়ালাম । যে কটা সি এন জি আসছে সব গুলোই যাত্রী নিয়ে আসছে আগে থেকেই ।
-এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে চলুন সামনের দিকে
যাই । আপনি কোথায় যাবেন ?
- আগ্রাবাদ ।
- তাহলে এদিকে চলুন ।
আমি আর কিছু না বলে হাঁটতে থাকলাম । তুহিন সাহেব আমার পাশে পাশেই হাঁটছেন । আমি মনে মনে বললাম , নামাজের সময়টা এখানেই পার করতে হবে । আমার আরো আগেই উঠে পরা উচিত ছিলো ।
- কি ভাবছেন ?
- কই কিছু না তো ।
- এই সময়টায় সি এন জি কম পাওয়া যায় । আপনি এর আগে এখানে এসেছেন ?
- হুম ..
- জানেন রাতের সি আর বি দেখতে কিন্তু অনেক সুন্দর লাগে ।
- আমার কাছে রাতের তুলনায় ভোর বেলার সি আর বি বেশি ভালো লাগে । তখন এখানে তেমন মানুষ জন থাকে না । অনেক শান্ত লাগে পরিবেশ টা ।
- আপনি তাহলে ভোর বেলায় এসেছেন এখানে ।
- হুম , কখনো কখনো সকালে ক্লাস থাকলে কলেজে একটু আগেই চলে আসতাম শুধু মাত্র কিছুটা সময় এখানে কাটানোর জন্য ।
- আপনার তাহলে হৈচৈ পরিবেশ ভালো লাগে না ।
-হুম , আমার নিরিবিলি থাকতেই ভালো লাগে ।
- আপনার বন্ধু বান্ধব নেই যাদের সাথে হৈচৈ করে আড্ডা দেয়া যায় ।
- আমি মানুষের সাথে একটু কম মিশতে পছন্দ করি ।
বলেই আমি হাত দিয়ে একটা খালি সি এন জি থামালাম । ভাড়া ঠিক করে উঠতে যাব তখন তুহিন সাহেব বললেন ।
- রোদেলা একটু দাঁড়াবেন । আপনার সাথে কথা বলে খুব ভাল লাগলো ।
- আপনার সাথে ও , আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মোবাইল ফোনটি কষ্ট করে নিয়ে এসেছেন বলে । আর কফির জন্য ও ধন্যবাদ ।
- আপনাকেও ধন্যবাদ এতো সুন্দর একটা বিকেল উপহার দেয়ার জন্য ।
- আল্লাহ হাফেজ ।
- আমি কিন্তু আপনাকে ফোন করবো ।
আমি সি এন জি তে উঠে বসলাম । মনে মনে বললাম সময়টা মন্দ কাটে নি ।
তুহিন রোদেলা চলে যাবার পর , সি আর বি র নিচের গ্যালারিতে নেমে এসে ফাঁকা জায়গা দেখে বসলো । মেয়েটার মধ্যে কি জানো একটা কিছু আছে , অল্প সময়েই কেমন জেনো আপন আপন মনে হচ্ছে । অনেক দিন পর সুন্দর একটা বিকেল কাটলো । নীলার সাথে কাটানো বিকেল গুলো ও মনে হতো চোখের পলকেই শেষ হয়ে যেতো । নীলা চলে যাবার অনেক দিন পর আজ সেই অনুভুতিটা আবার হলো । বিকেলটা আর একটু বড় হলে কি এমন ক্ষতি হতো কার । তুহিন আসে পাশে তাকালো , অনেকেই জোড়ায় জোড়ায় বসে
আছে । অনেকে বন্ধুদের সাথে হৈ হুলর করে আড্ডা দিচ্ছে । কিছু বাবামা এসেছে বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে , তারা বাচ্চাদের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের সময় দিতেই ভুলে গেছে ।
- স্যার , বাদাম দিমু ?
তুহিন তাকালো বাদমওয়ালার দিকে ,ছোট একটা ছেলে বয়স দশ বারো হবে ।
- স্যার , বাদাম দিমু ? ছেলেটি আবার জানতে চাইলো ।
- দাও ।
- কয় টাকার নিবেন ? আপনি কি একা আইছেন ?
- কেন ? ১০ টাকার দাও ।
- না মানে সন্ধ্যার পর তো কেউ এই খানে একা থাকে না । আফনারে একা দেইখা তাই
জিগাইলাম ।
তুহিন কিছু বললো না । বাদাম নিয়ে ভেঙে মুখে দিতে দিতে ভাবলো । আচ্ছা রোদেলা মেয়েটিকে আর একটু সময় আমার সাথে থাকতে বললে কি খুব খারাপ হতো ?
চলবে .......
✍️রেহানা হক রেনু
গত পর্বের লিংক -১২
https://m.facebook.com/groups/526513374820830?view=permalink&id=850519045753593

মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধির তাগিদ: বড় শক্তিগুলোর টনক নড়বে কি?
মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধির তাগিদ: বড় শক্তিগুলোর টনক নড়বে কি?
বাংলাদেশে বসবাসকারী রাখাইন সম্প্রদায়ের সংগঠন ‘রাখাইন কমিউনিটি অব বাংলাদেশ’ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে রোববার রাজধানীতে এক মানববন্ধনের আয়োজন করেছিল।
বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর মতো রাখাইন জাতিগোষ্ঠীও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়ন ও গণহত্যার শিকার হয়েছে। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, লেখক ও প্রকাশক মফিদুল হক রাখাইন প্রদেশে গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
সেটি হল, রাখাইন প্রদেশে গণহত্যার ঘটনায় গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে অভিযোগ করার পর দেশটির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও রাখাইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দাবি করছে। ইনডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। এ সময় আন্তর্জাতিক চাপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিষয়টি রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ এবং তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা নিধন যে মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর জাতিগত নির্মূল পরিকল্পনারই অংশ, ইতোপূর্বে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে তার সত্যতা মিলেছে।
তাছাড়া সম্প্রতি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চারজন সাবেক সদস্য রাখাইনে গণহত্যার কথা স্বীকারও করেছে। কাজেই মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির এটাই মোক্ষম সময়। এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণও বটে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতি বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি আশ্রয় ক্যাম্পে দু’দল রোহিঙ্গার মধ্যে সংঘর্ষে তাদের আটজন নিহত হয়েছে।
কিছু রোহিঙ্গা মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে তারা এ অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের এ উদ্বেগের কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুধাবন করতে হবে।
ইতোপূর্বে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার বারবার আশ্বাস দিলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ন্যূনতম পদক্ষেপও নেয়নি। বৃহৎ শক্তিগুলোও মিয়ানমারের ওপর মৌখিক চাপ প্রয়োগের বেশি কিছু করেনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের নির্লিপ্ততার এটাই কারণ। তারপরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের ওপরই আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য অব্যাহত রাখতে হবে কূটনৈতিক তৎপরতা।
বিশেষ করে এ ইস্যুতে চীন, রাশিয়া ও ভারতের সমর্থন আমাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশগুলো যাতে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থের চেয়ে এক্ষেত্রে নৈতিক, মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনগত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়, সে লক্ষ্যে জোর প্রয়াস চালাতে হবে আমাদের। আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং তাদের নিরাপত্তা দিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করাতে হবে।
রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনও শুরু না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমরা আশা করব, তার এ উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটবে চীনা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূমিকা যেন শুধু মৌখিক চাপ প্রয়োগে সীমাবদ্ধ না থাকে। তারা এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই কাম্য।
নারীবাদী
আজকাল দেখি নারীবাদী শব্দটা নিয়ে প্রচুর ট্রল হয়। আর এসব ট্রল এর মূল বক্তব্যটা অনেকটা এই রকম
" আগেরকার যুগের নারীবাদীরা নারী শিক্ষা নিয়ে কথা বলত। আর এখন তারা ছোট পোশাক পড়া আর চুল কাটায় ব্যস্ত। তাদের আন্দলনের মূল বিষয় এখন পোশাক ছোট পরা।"
আচ্ছা, ব্যপারটা কি হাস্যকর না, যে আমার শরীরে আমি কতটুকু কাপড় জড়াব, আমার নিজের চুল আমি কতটুকু কাটব সেটা নিয়েও আমাকে রাস্তায় নামতে হয়?!
এখন বিতর্কের একটা বড় বিষয় হচ্ছে যৌন হয়রানির জন্য মেয়েদের পোশাক দায়ী কিনা। যেসব পুরুষ এটা দাবি করছেন যে মেয়েদের পোশাক এর জন্য দায়ী, তাদের মূল বক্তব্য কি এটাই বোঝায় না যে, "মেয়ে, তোমার শরীরের অনাবৃত অংশে আমি হাত দেব এবং এটা আমার ভুল না! বরং দোষ তোমার যে তুমি নিজেকে আমার আমার কামদৃষ্টি থেকে সরিয়ে রাখতে পারনি।" আচ্ছা, এটা কি একধরনের খোলা হুমকি নয়?! আর সেই সকল নারীর কথা বলছি যারা মনে করেন ধর্ষণের জন্য পোশাক দায়ী, তারা কি মুক্ত আহ্বান জানাচ্ছেন না সকল লম্পটদেরকে যে, "তোমাদের কামদৃষ্টি যদি না ঠ্যাকাতে পারি তবে এসো ধর্ষণ করো আমাকে, আমার মেয়েকে, আমার বোনকে এবং আমার মাকে।"
মেয়েদের কথা আলাদা করে বলার কারণ হল, যৌন হয়রানির এই বৈরী আবহাওয়ার আমরা যখন কেবল ছেলেদের দোষ দিতে ব্যস্ত, তখন যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মেয়েরাও নানা নেতিবাচক কথা ছড়াচ্ছে। আমার মনে হয়, একজন ধর্ষিতাকে মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে আত্মহত্যা পর্যন্ত এগিয়ে নেয়ার পবিত্র দায়িত্বটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েরাই করে।
'অনন্ত জলিল' বা অপু ভাইয়ের মতো মানুষদের বলা কথা নিয়ে এত হৈচৈ হওয়ায় প্রথম দিকে খুবই বিরক্ত হতাম। এখন মনে হয় যে প্রতিবাদ এর প্রয়োজন আছে। একজন মুক্তমনা কখনই এ ধরনের কথা বলবে না। ছোট ছোট প্রতিবাদের মাধ্যমেই এগিয়ে যেতে হবে। অবশ্য তাতে কয় শতাব্দী লাগবে তা ঠিক ধারনা করতে পারছি না।
ক্যামেলিয়া হোসেন মীম

ভেজা চিরকুট -- ৬০তম পর্ব
১১১.
মোবাইলটা সাথে আনেনি অনু। হাতে ঘড়ি নেই। তবে হাসপাতালের ঘড়িতে সময়টা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট- সকাল সাড়ে ৯টা বাজে এই মুহূর্তে।
ভোরবেলা হঠাৎ করেই নুরুল ইসলামের বুকে ব্যথা শুরু হয়। ভীষণ ঘামতে শুরু করেন তিনি। শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল। বমি হচ্ছিল। খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল বাড়ির সবাই। বেশ ক'বার তো অচেতন হয়ে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। আবার নিজেই হাত দিয়ে বুক চেপে ধরছিলেন। শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ঝাপসা চোখে তিনি দেখেছিলেন, সবার আতঙ্কিত মুখখানি। মাথা খুব ঝিমঝিম করছিল সেসময়, তাই তাকিয়েও থাকতে পারেননি। বুকে চাপা ব্যথা, আর প্রচণ্ড ভার অনুভব করছিলেন। তিনি নিজেও এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিলেন, এটাই বোধহয় শেষ সময়, শেষবারের জন্য আপনজনদের দেখা। তবে বাড়ির সবাই এটা বুঝেছিল, হার্ট অ্যাটাক হয়েছে নুরুল ইসলামের। সেজন্য দেরি না করে এম্বুল্যান্স ডাকে, এবং গৃহকর্তাকে নিয়ে হাসপাতালে আসে।
বাইরে থেকেই একনজর বাবাকে দেখল অনু। এখন কেবিনে আছেন উনি। পাশে মমতাজ বেগম বসে বসে চোখ মুছছেন। আবার নিঃশব্দে অশ্রু ঝড়াচ্ছেন। কেবিনের বাইরে অনু, বাঁধন সহ বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা আছে। মাথা নুইয়ে, গম্ভীরমুখে বেঞ্চিতে বসে আছেন সবাই। ডাক্তার নিজের রুমে আছেন। এখনো ডাকেননি। নুরুল ইসলামের শারিরীক অবস্থা এই মুহূর্তে অনেকটা ভালো। তবুও যতক্ষণ না ডাক্তারের সাথে কথা বলতে পারছে, নিশ্চিন্ত হতে পারছে না কেউই। সবার মাঝেই একটা উদ্বেগ কাজ করছে।
কাঁধে হাত পড়ায় পাশে তাঁকালো অনু। শুভ্র ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে৷ চোখ দু'টো আধভেজা। দুর্বলতার ছাপ দেখা যাচ্ছে। চোখের চারিপাশ সামান্য ফুলেছে। হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত শুভ্রকে এই অবস্থায় দেখে ভীষণ অসহায়বোধ করল অনু। মনটা কেঁদে উঠল আবার। কেউ দেখল না এই কান্না। কিন্তু এই অদৃশ্য কান্না তাঁর ভিতরটাকে তছনছ করে দিচ্ছে। শুভ্র'র গলার আওয়াজ শুনে স্বাভাবিক হলো সে।
শুভ্র কান্না জড়ানো গলায় সান্ত্বনা দিলো বোনকে। বলল, "চিন্তা করো না, ঠিক হয়ে যাবে।"
শুকনো হাসি দিলো অনু। মুখে কোনো জবাব দিলো না।
শুভ্র আবার বলল, "তুমি বরং চোখে-মুখে পানি দিয়ে এসো৷ তাহলে ফ্রেশ লাগবে।"
"তুমিও চলো।" ক্ষীণ গলায় বলল অনু।
শুভ্র জবাবে বলল, "তুমি যাও, আমি আসছি।"
ওঠে দাঁড়াল অনু। একবার বাঁধন আর বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর শুভ্র-ও ওঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বলল, "ভাইয়া, আমি বরং কিছু খাবার কিনে আনি। নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে সবার। মা-ও খায়নি।"
বাঁধন হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিয়ে বলল, "বাকিদের জন্য আন। আমি এখন খাবো না।"
"তুমি কি এখন অফিসে যাবে?" শুভ্র সরল গলায় জানতে চাইল।
বাঁধন বলল, "না। ফোন করে 'আজ আসবো না' বলেছি। খেতে ইচ্ছে করছে না এখন। আগে ডাক্তারের সাথে কথা বলি, এরপর দেখা যাবে।"
শুভ্র বৃষ্টির দিকে তাকাতেই বৃষ্টি বলে উঠল, "আমি এখন কিছু খাবো না, ভাই। এখন থাক বরং। এইরকম চিন্তার মধ্যে কেউই খাবে না।"
"ঠিক আছে, আমি তাহলে চোখে-মুখে একটু পানি দিয়ে আসছি।" হেঁটে চলে গেল শুভ্র।
অনু ফিরে এলো প্রায় ১০ মিনিট পর। এসে আগের জায়গায় বসতেই একজন নার্স এসে সহসা বলল, "ডাক্তার সাহেব ডাকছেন।"
অনু ছুটে গেল সঙ্গে সঙ্গে। বাঁধন বৃষ্টিকে বসতে বলে অনুর পিছনে পিছনে গেল। দরজার বাইরে থেকে দেখল অনু বসে কথা বলছে ডাক্তারের সাথে। ভিতরে ঢুকল বাঁধন।
ডাক্তার বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বিনয়ী গলায় বলল, "আসুন, বসুন এখানে।"
অনুর পাশের ফাঁকা চেয়ারটাতে বসল বাঁধন। উদগ্রীব চাহনিতে তাকিয়ে রইল ডাক্তারের মুখের দিকে। অভিজ্ঞ ডাক্তার। বয়স আনুমানিক ৫০ উর্ধ্ব। বাঁধনের পরিচিত। ডাক্তার গলা খাঁকারি দিতেই শক্ত হয়ে বসল বাঁধন।
ডাক্তার বলতে লাগলেন, "বাঁধন সাহেব, আপনার বাবার হার্টের অবস্থা খারাপ। আগেও অ্যাটাক হয়েছিল।"
অনু ছটফটে গলায় বলে উঠল, "হ্যাঁ। তবে বেশ কয়েক বছর আগে। এরপর সবকিছু ঠিক ছিল। ভোরবেলা হঠাৎ করেই বুকে ব্যথা শুরু হলো।"
ডাক্তার অনুর দিকে তাকিয়ে বলল, "হ্যাঁ।"
বাঁধন হালকা স্বরে ধমক দিলো অনুকে, "অনু, একটু চুপ কর।"
অনু আর কথা বলল না। মুখ কালো করে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে থাকল।
ডাক্তার আবার বলতে শুরু করলেন, "আমাদের হৃদপিণ্ডে যে রক্ত প্রবাহিত হয়, তা হৃদযন্ত্রে আসে ধমনী দিয়ে। সেটি যখন সরু হয়ে যায়, তখন নালীর ভেতরে রক্ত জমাট বেধে যেতে পারে। ফলে নালীর ভেতর দিয়ে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে হৃদযন্ত্রের পেশীগুলো দুর্বল হয়ে যায়, ফলে আর সে অক্সিজেন প্রবাহিত করতে পারে না। হৃদপিণ্ডের ভেতর দিয়ে অক্সিজেন প্রবাহিত না হতে পারলেই হার্ট অ্যাটাক হয়।" (সোর্স: গুগল)
"বাবা ঠিক হয়ে যাবে তো?" ডাক্তারকে থামিয়ে দিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল অনু।
মুখ শক্ত করে বাঁধন আবার বলল, "চুপচাপ বসে থাক, না হয় বাইরে গিয়ে বৃষ্টির পাশে বোস। আমি কথা বলে আসছি।"
অনু মনোক্ষুণ্ণ হয়ে চোখ নামিয়ে নিলো নিচের দিকে। হাত দু'টো থাই এর উপর রেখে ঘন ঘন শ্বাস ত্যাগ করতে লাগল।
ডাক্তার অনুর দিকে তাকিয়ে বলল, "চিন্তা করবেন না। এখন সব ঠিক আছে। তবে ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা অনেকটা আপনাদের উপরও নির্ভর করছে। আপনারা উনাকে যতটা ভালো রাখতে পারবেন, উনি ততটা সচ্ছল থাকবেন। সুস্থ থাকবেন। হার্ট অ্যাটাকের অনেক কারণই আছে। উনি ব্যবসায়ী মানুষ ছিলেন। চিন্তাভাবনা বেশি ছিল। ফলে প্রথম অ্যাটাক হয়। এবারও ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। কোনো বিষয় নিয়ে হয়তো খুব ভাবছিলেন উনি। রাতে ঘুমাতে পারেননি। বুকে চাপ পড়েছিল। চাপটা হার্ট নিতে পারেনি। যার ফলে এইরকমটা হয়েছে৷"
অনুর বুকের উপর যেন আস্ত একটা পাহাড় এসে পড়ল। বাবার টেনশনের কারণটা নিজের মতো করে ভাবতেই তাঁর সারা শরীর শিউরে উঠল। আনমনে বিড়বিড় করতে লাগল সে। "রাতে না ঘুমিয়ে কী ভাবছিল বাবা? মামুনের কথা? বিয়ের পর আমি কীভাবে থাকবো ওখানে, এইসব ভেবেই কি নির্ঘুমে রাত পার করেছেন তিনি? উনি কি মামুনকে মন থেকে মেনে নিতে পারেননি? বাধ্য হয়ে মামুনের সাথে দেখা করতে চেয়েছেন। আর সেই বাধ্য আমি করেছি। তাহলে কী বাবার এই করুণ অবস্থার জন্য প্রত্যক্ষ ভাবে আমিই দায়ী? আমার জন্যই বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে?" বিড়বিড় করে অনবরত কথা বলেই যাচ্ছে অনু।
অনুর শেষের কথাগুলো একটু জোরেই শোনালো বলে বাঁধন আবার উচ্চস্বরে ধমকালো অনুকে। এবার অনুর হাত ধরে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলল, "আয় আমার সাথে।"
প্রতিরোধ করার সুযোগই পেলো না অনু। চট করে বাইরে এসে বৃষ্টির পাশে তাকে বসিয়ে দিলো বাঁধন। এরপর বিকট আওয়াজ করে বলল, "এখান থেকে এক পা নড়বি তো খবর আছে। চুপচাপ বসে থাক।" বৃষ্টির দিকে তাকালো বাঁধন। বলল, "ওকে ধরে রেখো, বৃষ্টি। ওর জন্য ডাক্তারের সাথে ভালোভাবে কথাও বলতে পারছি না।"
বৃষ্টি মাথা ঝাঁকিয়ে অনুর হাত ধরল বটে, তবে বাঁধন চলে যেতেই হাত ছেড়ে দিয়ে মুখ বেঁকিয়ে অনুর উদ্দেশ্যে বলল, "সব জায়গায় গণ্ডগোল না করলে হয় না তোমার, তাই না?"
অনুর মুখ থেকে কোনো শব্দই বেরোলো না আর। নিজের মনে বিড়বিড় করে যাচ্ছে সে। নিজেকেই দোষারোপ করছে।
নুরুল ইসলামকে নিয়ে সবাই বাড়িতে ফিরল বিকেলে। বাঁধন আর বৃষ্টি নিজের ঘরে চলে গেল। মমতাজ বেগম গেলেন স্বামীর জন্য কিছু খাবার রান্না করতে। শুভ্র-ও নেই এখানে। ঘরে অনু আর নুরুল ইসলাম শুধু।
জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখছেন নুরুল ইসলাম। পড়ন্ত বিকেলে। ছন্নছাড়া কিছু মেঘ এদিক-সেদিক খেলা করছে। ক্লান্ত সূর্যটা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আকাশের রং হয়েছে তিন রকম। কোথাও ধূসর রঙের মেঘ, কোথাও নীল আবার কোথাও গাঢ় সাদা।
বাবাকে এমন নিস্তব্ধ দেখে অনু আহত গলায় বলল, "বাবা, তোমার শরীর এখন কেমন আছে?"
পাশ ফিরে মেয়ের দিকে তাকালেন নুরুল ইসলাম। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সহসা উজ্জীবিত ভাবে বললেন, "ভালো আছি, মা। বুকের ব্যথাটা এখন আর নেই।"
শ্বাস আটকিয়ে অনু জানতে চাইল, "বাবা, তোমার চিন্তার কারণ কী আমি? তুমি কি মামুনকে মন থেকে মেনে নিতে পারছ না? অর্ককে বিয়ে করব না বলে আমি কি তোমায় খুব আঘাত দিয়ে ফেলেছি?" একনাগাড়ে প্রশ্নগুলো বাবার দিকে ছুড়লো অনু। জবাবের আশায় তাকিয়ে থাকল বাবার মুখের দিকে।
নুরুল ইসলাম প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করে সামান্য আফসোস প্রকাশ করে বললেন, "ওহ্ হো! আজ তো মামুনের সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিল আমার। হঠাৎ এমন একটা ঘটনা ঘটল যে, সব এলোমেলো হয়ে গেল। ছেলেটা নিশ্চয়ই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ওকে ফোনে বলেছিস আমরা আজ আসতে পারব না?"
"তুমি আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও, বাবা।" অনু কণ্ঠে দৃঢ়তা এবং বেশ জোর প্রকাশ পেলো।
নুরুল ইসলাম বললেন, "তুই ভুল ভাবছিস। মামুনকে মেনে না নিলে আমি কখনোই ওর বাড়িতে গিয়ে দেখা করতে চাইতাম না। আর তোর কথায় আমি কষ্ট পাবো কেন? বরং তুই যদি আমার কথা ভেবে অর্ককে বিয়ে করতে বাধ্য হতি, এবং সেটা আমি পরে জানতে পারতাম, তাহলে আমার কষ্ট হতো। তুই নিজের মনের কথা, ইচ্ছের কথা আমাকে বলেছিস, এতে আমি খুব খুশি হয়েছি।"
অনু চিন্তামগ্ন হয়ে বলল, "তাহলে তোমার এত টেনশন কীসের? ডাক্তার বলল, খুব বেশি টেনশন থেকেই অ্যাটাকটা হয়েছে। তুমি কি রাতে ঘুমাওনি?"
হালকা শব্দ করে হেসে উঠলেন নুরুল ইসলাম। বললেন, "ঘুমিয়েছি, মা।"
"তাহলে হঠাৎ এইরকম হলো কেন?" অনুর কপালে ভাজ পড়ল।
নুরুল ইসলাম বললেন, "জানি না, হঠাৎ করেই বুকে ব্যথা শুরু হয়েছিল। এর আগে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্ন দেখেই ঘুমটা ভেঙে যায়।"
"কী স্বপ্ন?"
"একটা দুঃস্বপ্ন!"
"তাহলে বলতে হবে না।" অনু সচকিত হয়ে বাবার হাত চেপে ধরল। আবার বলল, "দুঃস্বপ্নের কথা না বলাই ভালো।"
মাথা ঝাঁকালেন নুরুল ইসলাম। মুখে বললেন, "ওকে।"
অনুর কৌতূহল হলো। দুঃস্বপ্নটা শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ল মনটা। আকুল চোখে বাবার দিকে তাকালো সে।
নুরুল ইসলাম জানতে চাইলেন, "কী হলো?"
মুখ ভেজার করে অনু বলল, "আমি শুনবো। বলো তুমি।"
"এক্ষুনি তো বললি দুঃস্বপ্নের কথা বলতে হয় না।"
"হয় না, তবুও বলো। না শুনলে শান্তি পাবো না আমি।"
অগত্যা দুঃস্বপ্নটা বলতে শুরু করলেন নুরুল ইসলাম। "আমি দেখি, হঠাৎ করেই মরে যাই আমি। আমি মরে যাওয়ার পর সবকিছু কেমন পাল্টে যায়। মমতাজ, বাঁধন, বৃষ্টি, সবাই কেমন যেন হিংস্র হয়ে ওঠে; এমনকি শুভ্র-ও। সবাই এক হয়ে তোকে মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তুই পুরোপুরি একা হয়ে যাস। কেউ থাকে না তোর পাশে। নিঃসঙ্গ হয়ে পড়িস। একদিকে আমার মৃত্যু, অন্যদিকে সর্বহারা, এইসব কিছু তোকে পাগল করে দেয়। আঘাতটা সহ্য করতে পারিস না তুই। আর তখনই ভুলটা করিস।" বাকিটুকু বলতে পারলেন না নুরুল ইসলাম। হাঁপিয়ে উঠলেন আচমকা। কপালে ঘাম জমতে শুরু করল।
অনু চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়াল। চেঁচাতে শুরু করল। "বাবা, কী হলো তোমার? শান্ত হও, কথা বলো না তুমি। মা, মা, বাঁধন ভাইয়া, শুভ্র। এদিকে এসো।"
অনুর গলার আওয়াজ পেয়ে একপ্রকার দৌড়ে এলো সবাই। মমতাজ বেগম এসে কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। বাঁধন দেখল, বাবা আবার ঘেমে যাচ্ছে। হাঁপানি রোগীদের শ্বাস নিচ্ছে বড় বড় করে।
এগিয়ে এসে হাতপাখাটা তুলে নিলো বাঁধন। বাতাস করতে লাগল। অনু বাবার শার্টের বোতাম খুলে দিলো। বৃষ্টি ফ্যানের পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো।
প্রায় মিনিট পাঁচেক পর শান্ত হলেন নুরুল ইসলাম। শ্বাসটাও স্বাভাবিক হলো তাঁর। ঘাম শুকিয়ে গেল; আর ঝড়ল না। সবার দেহে যেন প্রাণ ফিরে এলো। অনু বাবার হাত জড়িয়ে ধরে বলল, "সরি, বাবা। আমার জিজ্ঞেস করা উচিত হয়নি।"
মমতাজ বেগম অনুকে ধাক্কা মেরে রাগান্বিত গলায় বললেন, "অলক্ষুণে মেয়ে কোথাকার, যা এখান থেকে। কী জিজ্ঞেস করেছিস তুই, যে মানুষটা আবার অসুস্থ হয়ে পড়ল।"
অনু নির্বাক থাকল। হাত দিয়ে নিজের চোখ মুছে বাবার থেকে দূরে সরে এলো।
শ্বাশুড়িকে সঙ্গ দিয়ে বৃষ্টিও কঠিন গলায় বলে উঠল, "অনু, তুমি যাও তো এখান থেকে। তুমি বাবার আশেপাশে থাকলেই বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই পরিবারটার আর কত ক্ষতি করবে তুমি? তোমার জায়গায় আমি হলে এতদিনে গলায় দড়ি দিতাম। নির্লজ্জ, বেহায়া মেয়ে কোথাকার!"
প্রতিবাদ করতে পারল না অনু৷ গলার কাছে এসে কথাগুলো আটকে গেল। যেন গলা টিপে ধরেছে কেউ। চোখ দু'টো থেকে অঝোর ধারায় পানি পড়তে লাগল। নিঃশ্বাসটা প্রচণ্ড ভারী মনে হলো এই মুহূর্তে। বুকের ভিতর অসহ্যকর এক যন্ত্রণা। কেউ যেন ছুরিকাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করছে হৃদয়টাকে। বিছানা থেকে নেমে ধীর গতিতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে।
বুকটা হালকা ভাবে চেপে ধরে খুব কষ্ট করে নুরুল ইসলাম বললেন, "মা, মামুনকে ফোন করে বল, কাল যেন আমার সাথে দেখা করে।"
অনু ফুঁপিয়ে উঠল। বলল, "বাবা, প্লিজ।"
"এটা আমার হুকুম।" গলায় জোর দিলেন নুরুল ইসলাম। "অবশ্যই বলবি, এক্ষুণি। আর আজকে যেতে না পারার জন্য ক্ষমা চাইনি।"
অনু কান্না জড়ানো গলায় বলল, "এখন এইসব বাদ দাও, বাবা। তুমি রেস্ট করো। তোমার থেকে আর কেউ বেশি না আমার কাছে। তুমি সুস্থ থাকলেই আমি খুশি। সুখে থাকার জন্য আর কাউকে দরকার নেই আমার।"
নুরুল ইসলাম বললেন, "আমার মনে হচ্ছে, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। দেখলি না, অল্পতেই কী অবস্থা হলো? এভাবে ক'দিন আর বাঁচবো? তাই আমি চাই, চলে যাওয়ার আগে তোকে একটু সুখে দেখতে। আমি চলে যাওয়ার পর এরা তোকে কতটা দেখবে, তা আমি জানি না। কিন্তু আমি কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। তুই যখন মামুনকে বিশ্বাস করিস, তাই আমিও বিশ্বাস করছি। তোর উপর আমার আস্থা আছে। তুই কখনো ভুল করবি না। আমি চাই, যত দ্রুত সম্ভব মামুনের সাথে তোর বিয়ে দিতে। অন্তত আমি চলে যাওয়ার পর এমন একজন তোর পাশে থাকবে, যে তোর একান্ত আপনজন।"
অনু জবাব না দিয়ে ছলছল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। নুরুল ইসলাম না থেমে বলতে লাগলেন, "আমার এই শেষ ইচ্ছেটা রাখ, মা। তুই মামুনকে ফোন করে বল, কালই যেন আমার সাথে দেখা করে। দেখা করতেই হবে ওকে। আমি একটু নিশ্চিন্ত হয়ে মরতে চাই।"
বাবার কথাগুলো খুবই বিষাক্ত লাগল অনুর কাছে। মনে হলো এই বিষাক্ত কথাগুলো সে খেলো, এবং বুকে জ্বালা শুরু হলো। কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল অনু। দরজাটা আটকে দিয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো।
অনু চলে যেতেই মমতাজ বেগম গম্ভীর গলায় জানতে চাইলেন, "এই মামুনটা কে? তোমার বন্ধুর ছেলের নাম তো অর্ক। সত্যি করে বলো তো, তোমরা দু'জনে মিলে ঠিক কি করতে চাইছ।"
নিচের দিকে তাকিয়ে নুরুল ইসলাম বললেন, "কাল ও আসলেই সব জানতে পারবে।"
দীর্ঘক্ষণ কেঁটে গেল এভাবেই। কান্না থেমে গেছে আগেই। মেঘলা আকাশের মতো বিষণ্ণ মুখ করে শুয়ে ছিল অনু। সম্বিত ফিরল মোবাইলের রিংটোনের শব্দে। নিজেকে সামলে নিয়ে মোবাইল হাতে তুলে নিলো সে।
স্ক্রিনে চোখ পড়তেই মামুনের নম্বরটা ভেসে উঠলো। রিসিভ করার ইচ্ছে নেই, তবুও রিসিভ করল অনু। অন্তত একটা সরি বলা প্রয়োজন। গতকাল রাতেই মামুনকে ফোন করে নিজেদের যাওয়ার কথা বলেছিল সে। নিশ্চয়ই অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল মামুন।
ফোনটা কানে ধরে সালাম দিলো অনু। "আসসালামু আলাইকুম।"
ওপাশ থেকে মামুন উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠল, "ওয়ালাইকুমুস সালাম। অনু, কোথায় তুমি? সেই সকাল থেকে ফোন দিয়ে যাচ্ছি, রিসিভ করলে এখন।"
কান্নাটা সামলে নিয়ে অনু বলল, "আসলে, ভোরবেলা হঠাৎ বাবার বুকে ব্যথা শুরু হয়। এরপর উনাকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। মোবাইলটা বাড়িতেই ছিল।"
"ওহ্! সরি, আমি জানতাম না।" মামুনের কণ্ঠে তীব্র দুঃখের ছাপ! চিন্তান্বিত গলায় প্রশ্ন করল সে, "উনি এখন কেমন আছেন?"
অনু বলল, "এখন ভালো আছে।"
"আমি কি আসবো একবার?"
ভাবান্তর গলায় অনু বলল, "উম, এখন আসতে হবে না। কাল এসো। বাবা বলেছেন তোমায় এসে দেখা করতে। কালকে যেকোনো সময় এসে দেখা করো বাবার সাথে।"
"ঠিক আছে।"
"আর সরি।"
"কেন?"
অনু ভার গলায় বলল, "আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে তোমাদের। তবুও শেষমেশ আমরা যেতে পারলাম না।"
"এর জন্য তুমি ক্ষমা চাচ্ছ কেন? এখানে তো তোমার হাত নেই। যা হওয়ার ছিল, তাই হয়েছে। এর পরেও যা হওয়ার, তা-ই হবে। তুমি চিন্তা করো না। কাল আমি ঠিক তোমার বাবার সাথে দেখা করব।"
"থ্যাঙ্কিউ সো মাচ।"
"এই ইংরেজির বাংলা অনুবাদ আমি জানি। থ্যাঙ্কিউ সো মাচ মানে অনেক অনেক ধন্যবাদ।"
হেসে উঠল অনু। ম্লানমুখে হঠাৎ প্রসন্ন হাসিটা ভীষণ অদ্ভুত দেখালো! মামুনের এইরকম রসিকতা তাকে প্রতিবারই বিমোহিত করে আনন্দ দেয়।
মামুনও হালকা আওয়াজে হেসে বলল, "তোমার গলাটা কেমন যেন শোনাচ্ছিল এতক্ষণ। এবার ঠিক আছে। সবসময় হাসিখুশি থাকবে।"
মৃদুস্বরে অনু বলল, "হুম, থাকব। এবার রাখছি তাহলে।"
"ঠিক আছে।"
ফোন কেঁটে দিয়ে বালিশটা কাছে টেনে নিলো অনু৷ চোখ-মুখের বিষণ্ণতা কেঁটে গেছে ইতোমধ্যে। উজ্জ্বলতার দেখা মিলছে। মোবাইল হাত থেকে নামিয়ে রেখে বালিশে মাথাটা রেখে চোখ বন্ধ করে শুলো সে।
১১২.
অনু সকাল ৮টায় বাড়ি থেকে বেরোলো। অফিসে পৌঁছালো সাড়ে ৯টায়। রাস্তায় জ্যাম ছিল কিছুটা। তবুও সময়টা কমই লেগেছে।
রিসিপশনে একটা মেয়ে বসে আছে। বয়স ২২-২৫ এর মধ্যে হবে। অনুর থেকে খুব বেশি ছোট হবে না। কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সদ্য প্রেমে পড়া তরুণীর মতোই মুচকি হাসি। অনু ডাকতেই কম্পিউটারের দিক থেকে চোখ ফেরালো। হাসিটা অব্যাহত রেখে ওঠে দাঁড়াল।
অনু বলল, "আমি ইন্টারভিউ দিতে এসেছি৷ এখান থেকে ফোন করা হয়েছিল আমাকে।"
উচ্ছল কণ্ঠে মেয়েটি জানতে চাইল, "আপনার নাম?"
"অনু।"
মেয়েটি আবার কম্পিউটারে তাকালো। অনুকে খুঁজতে লাগল। কিছু সময় পর ব্যর্থ হয়ে বলল, "এখানে তো অনু নামে কেউ নেই।"
আলতো করে নিজের মাথায় থাপ্পড় মারল অনু। হালকা শব্দ করে হেসেও উঠল।
রিসিপশনের মেয়েটা আশ্চর্য হয়ে বলল, "কী হলো?"
ভুলটা শুধরে নিলো অনু। হাসি থামিয়ে বলল, "অহনা নাম।"
এবার আর কম্পিউটারের দিকে তাকালো না মেয়েটা। আগের মতোই প্রানবন্ত ভাবে বলল, "ডাক নাম বুঝি অনু? আমি আসলে সিভি দেখে অহনা নামটাই তুলেছিলাম। সেজন্য অনু নাম বলায় চিনতে পারিনি। আমি নিজেই আপনাকে ফোন করেছিলাম সেদিন।"
মেয়েটির সাথে তাল মিলিয়ে হাসল অনু। মাথাটা সামান্য দুলিয়ে বলল, "আসলে সবাই অনু নামে ডাকে। আমিও এই নামেই পরিচয় দেই। তাই এখানেও সেই অনু নাম বলে ফেলেছি।"
"কোনো অসুবিধা নেই। আমার নাম শ্রেয়সী। আমি কিন্তু আপনাকে অনু বলেই ডাকব।" শ্রেয়সী কথাটা শেষ করে আবারও হাসল। মুখটা উজ্জলতায় পরিপূর্ণ। বিষণ্ণতার ছাপ নেই কোত্থাও।
অনু প্রথমে ভেবেছিল, মেয়েটা বিশেষ কারণে মিটমিট করে হাসছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, মেয়েটার মুখশ্রীটাই হাস্যোজ্জ্বল। বিমুগ্ধ হয়ে শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে থেকে অনু জানতে চাইল, "আমি একাই কি ইন্টারভিউ দিতে এসেছি? আর কাউকে দেখছি না তো।" পিছনের ফাঁকা চেয়ারগুলোকে ইঙ্গিত করল অনু।
শ্রেয়সী বলল, "এইসময় আপনিসহ তিনজনকে আসতে বলেছিলাম। একজন এখনো পৌঁছায়নি। আর একজন ভিতরে আছে। ম্যাডাম কথা বলছেন উনার সাথে।"
"ওহ্। ইন্টারভিউ তাহলে ম্যাডাম নিচ্ছেন। উনি একাই, না আরও কেউ আছে?"
"ম্যাডাম একাই ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। এই কারণেই মূলত সবাইকে এক সময় আসতে মানা করেছেন ম্যাডাম। এখন তিনজন, আবার হয়তো লাঞ্চের পর তিনজন। কালকেও আছে। ম্যাডাম আমাকে বলেন, আমি সেই সময় অনুযায়ী ফোন করে আসতে বলি। যেমন আপনাকে বলেছি। ম্যাডাম আসলে ঝামেলা পছন্দ করেন না। তাঁর ধারণা, একসাথে অনেকজন পার্থী আসলে একটা গণ্ডগোল বাঁধবে। পার্থীরা যেমন দেরি হচ্ছে বলে বিরক্ত হবে, তেমনি ম্যাডামও একের পর এক ইন্টারভিউ নিতে বিরক্তি বোধ করবেন। সেজন্য এইরকম সিস্টেম। কাজের প্রতি খুব সিরিয়াস ম্যাডাম। যা করবেন, কোনো ফাঁকফোকড় না রেখে করবেন।"
শ্রেয়সীর কথাগুলো শুনে অনুর ভয় হলো কিছুটা। মুখটা মলিন হলো। অস্থিরতা কাজ করছে ভিতরে।
অনুকে দেখে মনে হলো, হঠাৎই জলন্ত আগুনটা নিভে গেছে। শ্রেয়সী খেয়াল করল ব্যাপারটা। ভ্রু কুঞ্চিত করে জানতে চাইল, "কী হলো?"
অনু ইতস্ততভাবে বলল, "ম্যাডাম কি খুব রাগী?"
শ্রেয়সী হেসে উঠল অনুর কথা শুনে। যেন খুব বড় হাসির কথা বলেছে অনু! হাস্যরত ভাবেই বলে উঠল সে, "মিস অনু, কাজের প্রতি সিরিয়াস মানেই রাগী হওয়া না। ম্যাডাম খুব ভালো একজন মানুষ।"
বিব্রত মুখ করে অনু বলল, "আসলে, আগে তিনটা অফিসে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম, একটাতেও চাকরি হয়নি। রেজাল্টও আহামরি কিছু নয়, যে তাঁরা খুব ভেবেচিন্তে হ্যাঁ বা না বলবেল। তার উপর এমন সব প্রশ্ন করেন যে, আমি বিভ্রান্ত হয়ে যাই। দেখা গেল, একটা হাস্যোকর প্রশ্ন করে তাঁরা খুব গম্ভীর, তেজি প্রতিক্রিয়া দেখালো। এইরকম করলে তো আমি বিভ্রান্ত হবোই। কেউ আবার ধুমসে ইংরেজি বলা শুরু করে। আরে ভাই, একটু আস্তে বল। আমাকে বুঝতে দে। গরুর মতো ইংরেজিতে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করলে হবে? আমি কি ইংরেজিতে ডক্টরেট, যে এত দ্রুত ইংরেজি বললে আমি সব বুঝতে পারব। মাত্র অনার্স পাস আমি। তোদের তো বুঝতে হবে।" কথাগুলো বলা শেষে আক্রোশে হাতের ফাইলটা মুচড়াতে লাগল অনু।
অনুর কথাগুলো মুখ 'হা' করে শুনছিল শ্রেয়সী; অনু থামতেই এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠল সে। পাশ দিয়ে হাঁটছিল যারা, তাঁরা কৌতূহলী চোখে তাকালো একবার। তবে শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়েই আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো, যেন শ্রেয়সীর এই হাসিটা অত্যন্ত স্বাভাবিক সবার কাছে।
শ্রেয়সীর সামনের টেলিফোনটা বেজে উঠায় হাসি থামিয়ে রিসিভার তুলে ওপাশের মানুষটার কথা শুনল; রিসিভারটা আবার নামিয়ে অনুর দিকে তাকিয়ে বলল, "ম্যাডাম আপনাকে ডাকছেন। দু'তলায় গিয়ে ডান দিকে। দরজায় সামিরা নাম লেখা। শুভ কামনা।"
কৃতজ্ঞতা ভঙ্গিতে হেসে ফাইলটা ঠিক করে হাঁটতে শুরু করল অনু। দু'তলা পেরিয়ে ডান দিকে যেতেই একটা রুমের সামনে থেমে গেল। নামটা দেখে নিশ্চিত হয়ে নিলো৷ দেয়াল গ্লাসের। ভিতরের একজন মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। খুব ব্যস্ত হয়ে ল্যাপটপের কিবোর্ডে লিখছেন তিনি।
দরজাটা সামান্য ধাক্কা দিতেই ফিরে তাকালো সামিরা। অনু বিনয়ী সুরে সালাম দিলো। বলল, "আসসালামু আলাইকুম, ম্যাম।"
সামিরা সোজা হয়ে ল্যাপটপটা হালকা সরিয়ে রাখল পাশে। সালামের জবাব দিয়ে বলল, "ওয়ালাইকুমুস সালাম। এসো, অহনা।"
সরাসরি তুমি শব্দটা শুনে বেশ অবাকই হলো অনু। এইরকম আগে ঘটেনি। চেয়ারে যিনি বসে আছেন, তিনি বয়সে বড় বটে, তবে উনার থেকে বেশি বয়সী মানুষের সামনে বসে ইন্টারভিউ দিয়েছিল অনু, তাঁরা সবাই আপনি বলে সম্মোধন করেছিল। অবশ্য অনুর ভালোই লাগল ব্যাপারটা। উচ্চ পর্যায়ে কেউ তুমি করে বললে বেশ ভালো লাগে। মনে হয়, অপরপ্রান্তের মানুষ বুঝি আমাকে আপন ভাবতে চাইছে। অভিভূত হয়ে অনু দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকল।
সামিরা আবার বলল, "এসো, ভিতরে এসো।"
আপাদমস্তক হেসে ভিতরে ঢুকল অনু। টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
সামিরা ল্যাপটপের দিকে একনজর তাকালো, আবার অনুর দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট এবং দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "তুমি আমার ছোট, তাই তুমি করেই বললাম। কিছু মনে করোনি তো?"
"না।" মৃদুস্বরে জবাব দিলো অনু।
সামিরা আবার বলল, "দাঁড়িয়ে রইলে কেন? বসো।"
অনু 'ধন্যবাদ' দিয়ে বসল চেয়ারে। হাতের ফাইলটা এগিয়ে দিলো।
সামিরা ফাইলটাতে চোখ বুলিয়ে বলল, "শ্রেয়সী মেয়েটাকে কেমন দেখলে?"
"হ্যাঁ!" সংকোচিত হলো অনু। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল সামনের মানুষটার দিকে। পরণে শাড়ী। সাজটা অনেকটা গৃহবধূর মতো। চুলগুলো খোলা। তবুও বেশ গোছানো, সুন্দর দেখতে। মুখশ্রী বেশ সিগ্ধ। অথচ এতবড় একটা পোস্টে চাকরি করছে। বেতন লাখ টাকা তো হবেই। বেশিও হতে পারে। নিজের দিকে একবার তাকালো অনু। পরণে থ্রিপিস। মুখটা ফেকাসে হয়ে আছে। এতটা পথ জার্নি করে আসায় চুলগুলোও একটু এলোমেলো। রাগ হলো অনুর। ভিতরে আসার আগে একবার ওয়াশরুম থেকে ঘুরে আসা উচিত ছিল। তাহলে অন্তত এখনকার মতো অস্বস্তি বোধ হতো না।
সামিরা চোখ উপরে তুলে বলল, "শ্রেয়সীর কথা বলছি। খুব ভালো মেয়ে, তাই না? অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। আপাতত চাকরিটা পার্টটাইম করছে। খুব কাজের। বিরক্ত হয় না, হাসিমুখে কাজ করে যায়। এই ধরনের মানুষকে আমি ভীষণ পছন্দ করি। অনার্সটা কমপ্লিট হলেই ওর প্রমোশন হবে। আগেই নিশ্চিত করে দিয়েছি আমি।"
অনু মৃদুস্বরে তাল মিলালো, "হুম, খুব ভালো মেয়ে। মিশুক প্রকৃতির।"
"খুব হাসছিলে দেখলাম। সেজন্যই জিজ্ঞেস করলাম তোমাকে।" ফাইলের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে গেল সামিরা।
অনু আবার ভুরু কুঁচকে তাকালো। মনেমনে ভাবল, আমরা হাসলাম, সেটা উনি কীভাবে জানলো?
অনুকে কৌতূহলী দেখে সামিরা ডান দিকে তাকানোর নির্দেশ দিলো। সে নিজে তাকালো ল্যাপটপের দিকে।
অনু ডান দিকে তাকাতেই দেখল একটা বড় মনিটর। যেখানে বিভিন্ন স্থানের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠেছে। রিসিপশনের শ্রেয়সীকেও দেখা যাচ্ছে। এখানে এসে অবাকের পর অবাক হচ্ছে অনু। রিসিপশনে যে ক্যামেরা লাগানো আছে, সেটা তাঁর নজরেই আসেনি।
সামিরা বলল, "একটা জায়গা বাদে বাকি সব জায়গাতেই ক্যামেরা আছে।"
অনু সামনের লাগিয়ে বিড়বিড় করে জানতে চাইল, "কোন জায়গায় নেই?"
সামিরা বলল, "ওয়াশরুমে।"
লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে ফেলল অনু।
সামিরা হালকা কেশে নড়েচড়ে বসল। এরপর প্রশ্ন শুরু করল।
আজকে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই জবাব দিতে পারল অনু। একেই সামনে একটা মেয়ে, তার উপর এমন ফ্রেন্ডলি। মনে হচ্ছিল পুরোনো কোনো বান্ধবীর সাথে অনেকদিন পর দেখা হয়েছে, এবং সে অনেক অনেক প্রশ্ন করছে। অজানা সবকিছু জানতে চাচ্ছে। প্রথমবারের মতো অনুর মনে হলো, যারা ইন্টারভিউ নেয়, তাতা সবাই পাগল না; কিছু সুস্থ মানুষও আছে। এই মানুষগুলোর মধ্যে সামিরা ম্যাম একজন। স্পষ্ট এবং বাংলাতে কথা বলেছে পুরো সময়টা। মাঝে মাঝে হেসেও উঠছিল। যেন সূর্যাস্তের সময় টং দোকানে দু'জনের একটা চায়ের আড্ডা বসেছে।
যদিও সামিরা এখনো নিশ্চিত করেনি চাকরির ব্যাপারে, তবে অনুর দৃঢ় বিশ্বাস, চাকরিটা তাঁর হয়ে যাবে। কেন না সবক'টা প্রশ্নের জবাব ঠিক ভাবেই দিয়েছে সে। কোনো জড়তা ছিল না। ত্রুটিও ছিল না। স্বাভাবিক, সচ্ছল ভাবে শেষ করেছে ইন্টারভিউ। গতকাল রাতেই নিজের পোস্টটা নিয়ে ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করেছিল অনু। যে যে তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল, সেগুলো মাথায় নিয়ে নিয়েছিল।
নিচে নেমে এসে শ্রেয়সীর পাশে দাঁড়ালো অনু। বাঁ দিকের উপরে তাকাতেই দেখল ক্যামেরাটা। চট করে আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে শ্রেয়সীর দিকে তাকালো সে।
শ্রেয়সী কম্পিউটার থেকে চোখ সরিয়ে অনুর দিকে তাকিয়ে বলল, "কেমন হলো ইন্টারভিউ?"
অনু উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, "বেশ ভালো। মনে হচ্ছে চাকরিটা হয়ে যাবে। কনফার্ম করেনি অবশ্য।"
শ্রেয়সী বলল, "আমিও চাই চাকরিটা হোক।"
"তুমি সত্যিই বলেছিলে, ম্যাডাম আসলেই খুব ভালো। তোমারও অনেক প্রশংসা করল। অনার্স শেষ হলেই নাকি তোমার প্রমোশন হবে।"
"ইয়েস। তখন আমরা দু'জন পাশাপাশি ডেস্কে বসে কাজ করব। পার্ট-টাইম না, একেবারে ফুল টাইম। সেজন্যই আমি আরও বেশি করে চাচ্ছি, আপনার চাকরিটা যেন হয়।"
"আপনি করে বলছ কেন? তুমি করে বলো।"
শ্রেয়সী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, "ওকে।"
আচমকাই পাশ ঘেঁষে লম্বাচওড়া একটা লোক পা দিয়ে গটগট আওয়াজ করে হেঁটে চলে গেল। সিড়ি দিয়ে উঠল প্রায় দৌড়ানোর মতো করে। মুখের একপাশটা দেখেই চিনে ফেলল অনু। সহসা মুখটা ফেকাসে গেল তাঁর। স্তম্ভিত হয়ে সেদিকেই তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
শ্রেয়সী বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইল, "কী হলো, হঠাৎ 'থ' মেরে গেল কেন?"
শঙ্কিত গলায় অনু বলল, "এক্ষুনি যে লোকটা উপরে ওঠে গেল, সে এখানে কেন?"
শ্রেয়সী জবাবে বলল, "উনি মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে হেড। ভীষণ রাগী। আমার তো মাঝে মাঝে ভয় করে উনাকে। তবে এখন পর্যন্ত আমাকে ধমকায়নি। সামিরা ম্যামের সাথে আমার মেলামেশা বেশি বলেই উনি আমাকে ধমকানোর সাহস দেখায় না।"
রাগ নিয়ে একটুও চিন্তিত না অনু। তাঁর চিন্তা অন্যখানে। তবে এই ব্যাপারে শ্রেয়সীকে কিছু বলার মানেই হয় না। নিজেকে সামলে নিয়ে হাত দিয়ে মুখের ঘাম মুছল। এরপর শ্রেয়সীর উদ্দেশ্যে ম্লানস্বরে 'আসছি' বলে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল।
৬০ পর্ব এখানেই সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসছে।

ছেলেটি নিজেকে হত্যা করেছিল
আমি নিজেকে হত্যা করেছিলাম কয়েকবার!
তবুও, তোমার মনকে পড়তে পারিনি
এত কঠিন শব্দ আর এত জটিল ভাষা!
আমি আয়ত্ত করতে পারিনি।
তোমার জন্য আমি নিজেকে হত্যা করেছিলাম!
আমি পূর্বের সকল বাজে অভ্যেসকে বদলে দিয়েছিলাম;
পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডার আসরটা
ভেঙে দিয়েছিলাম।
তুমি বলা মাত্রই, বইয়ের সাথেই বন্ধুত্ব করেছিলাম
তারপর আর শার্টের একটিও বোতাম খুলে দেইনি।
ফর্মাল পোষাকে অস্বস্তিবোধ হতো
নিজেকে মানিয়ে নিতে বলেছিলাম।
হটাৎ করেই ক্রিকেট ছেড়ে দিলাম!
তোমার জন্য বন্ধু মহল ত্যাগ করলাম!
আমার যাবতীয় সকল ইচ্ছেদের আমি নিমিষেই ভুলে গেলাম।
শুরু হলো তোমাতে ডুবে থাকার এক নতুন অধ্যায়।
তোমার জন্য আমি নিজেকে হত্যা করেছিলাম!
বন্ধুরা সিনেমা দেখতে হলে যেতো
আর আমার চোখ তোমায় দেখার জন্য ব্যাকুল হতো।
দিনকে দিন আমার জগৎ বলতে শুধু "তুমি"
নিজেকেও যেন হারিয়ে ফেললাম!
যেদিন তোমায় ভালোবাসি বলেছিলাম
সেদিনের পর__
আমি আমার আমিকে আর একদিনও ভালোবাসিনি;
রোদে পুড়ে চাকরির খোঁজ চালিয়েছি
এক বেলা রুটি চিবিয়ে পুরো শহর হেঁটেছি;
আমাকে কেউ চাকরি দেয় নি
কেউ গ্রাহ্যও করেনি।
শুধু মাত্র তোমার জন্যই আমি নিজেকে হত্যা
করেছিলাম;
আর তুমি আমায় বেকার বলে ত্যাগ করলে!
সেই যে আমি শেষ বারের মত নিজেকে হত্যা করলাম
আর জন্মানোর সাধ আমার হয় নি।
পরিণয়।
১.
আমি অনেক কষ্টে চোখের জলের বানে বাঁধ সাধলাম, আমার চোখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে তেজ নিয়ে বললাম, " আপনার সম্পদ আপনি নিয়ে যান, বাবা। আপনার মেয়েকে ছাড়াও আমার চলে এখন।"
পাশ থেকে সামিরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। আমার সব রাগ, তেজ সামিরার কান্নার কাছে হেরে গিয়ে মাথা নত করার আগেই আমি আমার মাথাটা উঁচু করে সামিরার বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও বললাম, "লাট খাওয়া মানুষ, বাবা। আমার মুখের কথায় আপনার সম্মান থাকবে না। "
বাবার বুকে সামিরা মুখ লুকিয়েছে। অথচ মেয়েকে জড়িয়ে ধরবার শক্তিটুকুও যেন এখন আর নেই। আমার চোখের দিকে আহত দৃষ্টি ফেলে অবাক হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায় ফুটিয়ে তুলেছেন। সামিরাকে উদ্দেশ্য করে আরেকবার মুখের কথায় আমি অতর্কিত আঘাত করে ফেলে বললাম, "ঐ বুকে মুখ লুকিয়ো না, তোমার লজ্জা ঢাকা পড়বে না বরং বেড়েই যাবে।"
সামিরাকে এভাবে তাচ্ছিল্য করে, সামিরার বাবার মুখের উপর কথার জবাব দিয়ে, সামিরার মনে আঘাত করে যেন আমিই নিজেই ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দে কুকিয়ে উঠলাম।
আমার চোখের সামনে সেই দিনগুলো ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় আমি মরিয়া হয়ে গেলাম; যে দিনগুলোতে আমার পাশে কেউ ছিলো না।
২.
আমার আর সামিরার তখন ছয় মাসের নতুন সংসার। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারকে সঙ্গী করে সামিরার বাবা আমার দরজায় এসে উপস্থিত। বাবাকে দেখে সামিরার চোখে মুখে জোছনা ঝরে আর আমার মনে অমাবস্যা।
ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কথা হলো। পরিস্থিতির চাপে, বাবার মুখের দিকে চেয়ে সামিরা কাঁদলো।
শেষটায় এসে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সামিরার বাবা বললো, "কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।"
নিজেকে ৭১ এর হানাদার বলে মনে হলো।
আমি বললাম, "ভালোবাসা অন্যায়?"
উনি বললেন, "হ্যাঁ।"
আমি বুকে কষ্টের পাহাড় তুলে নিয়ে ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুঁটিয়ে তুলবার বৃথা চেষ্টা করে বললাম, "তবে সামিরারও অন্যায় হয়েছে আমাকে ভালোবেসে। দিন ফাঁসি।
যুক্তিতর্কের খেলায় যোগ না দিয়ে সামিরার বাবা সামিরাকে নিয়ে গেলেন।
যাবার আগে সামিরা আমার শার্টের একপাশে ধরে রেখে কাঁদলো। কাঁদতে কাঁদতে বলে গেল, "একদিন তোমার সব হবে সেদিন ঠিকই আমি তোমার কাছে ফিরবো।"
সেরাতে আর ঘুম হয়নি আমার। অনেক অভিমান আর দুঃখ নিয়ে ডায়েরির একটা পাতায় লিখে দিলাম, "আমার দুর্দিনেই যদি তোমায় পাশে না পাই তাহলে সুদিনেও তোমাকে আমার লাগবে না, প্রিয়।"
৩.
সামিরার হঠাৎ চলে যাওয়া মেনে নিতে না পেরে আমি ভেঙে পড়েছি যেমন; তেমন খুব সহজেই গড়েও নিয়েছি নিজেকে। বুঝেছি পৃথিবীতে ভাঙা গড়ারই খেলা চলে। রঙের সঙ্গে রঙ মেশালে নতুন রঙ পাওয়া যায়। আমি ভালোবাসার সঙ্গে ঘৃণা আর ক্ষোভ মিশিয়ে আমার দিন পাল্টালাম, নতুন দিন পেলাম।
নতুন সূর্য উঠলো। সূর্যের আলোয় আমি জ্বলে পুড়ে যাই। দু'হাত ভরে টাকা কামাই, আবার দু'হাত ভরেই খরচ করি।
প্রথম প্রথম মানুষের রূপ দেখে আতকে উঠতাম। সবচেয়ে বেশি ভড়কে গিয়েছিলাম সেদিন, যেদিন আমার পাড়ার জুনিয়র ছেলেটা এসে আমার গালে একটা চড় মেরে বলেছিলো, "ঠিকঠাক মতন কাজ না করলে এরপর আর বড় ভাই মানতে পারুম না; লাত্থি মাইরা বিদায় করমু। টাকা কামানো এত সহজ না।"
এরপর থেকে পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাকে আর চমকে তোলে না। লাট লাট খেতে খেতে সয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে সামিরা খোঁজ নিতো, চিঠি লিখে কান্না কাটি করতো। আমি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছি।
কষ্ট চাপা দিয়ে বলেছি, "আমি বেশ আছি। তুমি তোমার যত্ন নিও।"
সত্যি বলতে আমার কিছুই হয়নি। টাকা-পয়সা, মান-সম্মান যা এখন আছে এগুলো আমারই। পার্থক্যটা শুধু সময়ের ; তখন ছিলো না এখন আছে। আমারই হওয়ার ছিলো। কিছু জিনিস তো প্রকৃতিও নির্ধারণ করে দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনজনেরা ধৈর্যহারা হয়ে ছেড়ে চলে যায়। আমার আর সামিরার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
৪.
আজ এই দিনটার জন্য সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা সামিরাই করেছে। যোগ্য স্বামীর কাছে একদিন নিজ মহিমা নিয়ে গর্ব করে ফিরবে বলেই হয়তো এতো অপেক্ষা।
সামিরা বাবার বুক থেকে মুখ তুলে আমার দিকে তাকালো। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম।
"আমাকে তুমি অস্বীকার করছো!" - সামিরার কণ্ঠে অসহায়ত্বের ছাপ ষোলকলা।
আমি নিরুত্তর রইলাম। সামিরা খানিকটা চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। আমার দিকে তিরস্কারের দৃষ্টি ফেলে বললো, " তুমি না আমায় ভালোবাসো? এই তোমার ভালোবাসা?"
সামিরার বাবার দিকে চেয়ে থেকে বললাম, "ভালোবাসা অন্যায়।
"তবে সেদিন ভালোবেসে বিয়ে করেছিলে কেন? স্বপ্ন দেখিয়েছিলে কেন?"
-"স্বপ্ন দেখিয়ে, ভালবেসে অন্যায় করেছিলাম। আমাকে ছেড়ে চলে গিয়ে তার শাস্তি তোমরা আমায় দিয়েছো।"
সামিরা আমার পায়ের তলায় মাটিতে গড়াগড়ি দিলো। আমি সামিরার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মেয়ের কষ্টে চোখের জল ঝরাতে দেখলাম। দু'পা পিছিয়ে গিয়ে বললাম, "আমার কিছু নেই, সামিরা। পায়ের তলা মাথা ঠুকে কী খুঁজছো?
সামিরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। জোর করে কণ্ঠে শক্তি ফেরানোর চেষ্টা করতে গিয়ে গলায় ফ্যাস ফ্যাস আওয়াজ তুললো প্রথমবার। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় বললো, " স্বামীর পায়ের তলায় যদি স্ত্রীর জান্নাত হয় তবে আমি জান্নাত খুঁজি।"
সমুদ্রের ঠেউ যেমন তীরে এসে ধাক্কা মারে সামিরার কথাতেও আমার ভেতরে যেন তেমন ধাক্কা লাগলো। কিন্তু সকল ঠেউয়ে তো আর গা ভাসানো যায় না। কিছু ঠেউয়ের ধাক্কার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থির রেখে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, নিজের শক্তির পরিচয় দিতে হয়। আমিও দিলাম। সামিরাকে মাটি থেকে টেনে তোলার বদলে শব্দ করে হেসে বললাম, "তোমাকে দেবার মতন কোনো জান্নাত আমার কাছে নেই।"
সামিরার বাবার দিকে এগিয়ে গিয়ে শান্তস্বরে বললাম, আমার যা আছে তা আমারই লাগবে। দু'মুঠো ডাল ভাত খেয়ে বাঁচতে চাই, সেগুলোর ভাগ আমি আর কাওকে দিতে পারবো না। আপনি বরং আপনার সম্পদ নিয়ে যান, বাবা। আপনার মেয়েকে ছাড়াও আমার চলে এখন। রূপে, সৌন্দর্যে কোনো অংশে কমে যায়নি। ভালো টাকা ওয়ালা কারো হাতে তুলে দিন সুখে থাকবে। শুধে- আসলে আপনার হিসেব মিলে যাবে। "
★
★পরিণয়।

একাডেমিক পড়ালেখা না বিসিএস প্রস্তুতি?
বিসিএস! বিসিএস! বিসিএস! বর্তমানে চারিদিকে শুধু BCS CRAZE। বিসিএস যেন এখন আর option নয় বরং passion বা obsession হয়ে গেছে। সরকারি চাকরি নামক সোনার হরিণটি যেন এখন হীরার বা প্লাটিনামের হরিণ হয়ে গেছে! তাই না? এই হরিণটিকে খাঁচায় বন্দী করার অদম্য ইচ্ছা আজ তরূণ প্রজন্মের মধ্যে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। নবীনদের সবার তাই অতি পরিচিত প্রশ্ন: কখন থেকে বিসিএস এর প্রস্তুতি নিব? পাস করার আগে না ছাত্রাবস্থাতেই? আমার অভিজ্ঞতার আলোকে উত্তর দেবার জন্য এই লেখা। আশা করি নবীনরা কিছুটা হলেও দিক নির্দেশনা পাবেন। আর দিকভ্রান্ত হয়ে পথ খুঁজে না পাওয়া কারও জন্য এটি হতে পারে অন্ধকারের শুকতারা। চলুন শুরু করি।
প্রথমেই আমার একটি প্রশ্নের জবাব দিন; আজ আপনি ক্যাডার হবার স্বপ্নে বিভোর, মরিয়া আপনি কি নিশ্চিত এই আকাঙ্ক্ষাটি কাল বা আগামী ৪-৫ বছর পর আপনার মাঝে এত তীব্রভাবে বিদ্যমান থাকবে? আপনি হয়ত অনার্স বা মাস্টার্স কমপ্লিট করার পর সুপার পাওয়ার আমেরিকায় স্বপ্নের ঠিকানা গড়তে চাইবেন অথবা উদ্যোক্তা হতে চাইবেন। এভাবে ভেবে দেখেছেন কি? বিষয়টা কিন্তু মোটেই হেলাফেলার নয়। তাই এমনভাবে ক্যারিয়ার প্ল্যান করতে হবে তা যেন হয় ফিউচারপ্রুফ আর আপনি হয়ে ওঠেন বিশ্বনাগরিক –বিশ্বের যেকোন প্রান্তে যেন আপনার কাজের, মেধার মূল্যায়ন হবার সুযোগের দরজা ২৪*৭*৩৬৬ খোলা থাকে। একবার ভেবে দেখুন তো ২০১৫ সালে সরকারি চাকরির বেতন স্কেল বৃদ্ধি না পেলে কি আজ তরুণ প্রজন্ম বিসিএস এর জন্য এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ত? উত্তরটা আপনিই ভাল জানেন। আপনার প্রথম বর্ষের প্ল্যান আর শেষ বর্ষের প্ল্যান কিন্তু ভিন্ন হতেই পারে বয়স আর অভিজ্ঞতার তারতম্যের কারণে। ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যে ছেলে ব্যবসা করার ব্যাপারে মনস্থির করল, ভার্সিটি শেষে সে হয়ত হয়ে গেছে একদম পাক্কা চাকরিজীবী। আপনার আশেপাশে তাকালেই এরকম উদাহরণ হয়ত দেখতে পাবেন। তাই ভাবিয়া কাজ করিতে হইবে, করিয়া ভাবিলে হইবে না। আশা করি কিছুটা বোঝাতে পেরেছি; না কি আরও কনফিউজড করে দিলাম?
আপনি যদি এখন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বা শেষ বর্ষের ছাত্র হন, আপনার জন্য অঢেল সময় পড়ে আছে জীবনে কিছু করার জন্য। আপনি বিসিএস টার্গেট করলেও অঢেল সময় বা টার্গেট না করলেও অঢেল সময় আছে আপনার হাতে। প্রথম বর্ষ থেকে পড়া শুরু করে স্বেচ্ছায় বিসিএস এর জন্য সিজিপিএ বিসর্জন কেন দিবেন? কাল যে আপনি ক্যাডার হবেন তার নিশ্চয়তা আপনাকে কে দিল? কোন গ্যারান্টি/ওয়ারেন্টি আছে? দুই লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে দুই হাজার ক্যাডার হলে আপনার সম্ভাবনা মাত্র ১%। হুম, এখন তো নন ক্যাডারেও প্রচুর নিয়োগ হয় কিন্তু সেটা পুরোটাই ভাগ্যের ব্যাপার। যদি ভাবেন আসল পরীক্ষার্থী মানে সিরিয়াস পরীক্ষার্থী এত বেশি না তাহলেও কিন্তু সম্ভাব্যতার মান খুব বেশি বৃদ্ধি পায় না। ৫০ হাজার সিরিয়াস পরীক্ষার্থী ধরলে আর ক্যাডার, নন ক্যাডার মিলিয়ে ৫ হাজার ধরলেও তবুও সেটা ১০% এর বেশি হচ্ছে না। বুঝতে পারছেন আপনি কোথায় যুদ্ধ করতে নামছেন? কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামছেন? মনোযোগ দিয়ে শুনুন, কাল হয়ত আপনি বিসিএস এর নাম শুনলেই বিরক্ত হতে পারেন বা অট্টহাসি দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারেন। যদি সরকারি চাকরির সুবিধা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আর বৃদ্ধি না পায় বা প্রাইভেট সেক্টর আরও দৃঢ় হয়? তখন কী করবেন? সব সময় মনে রাখবেন, বিসিএস এর জৌলুস কিন্তু এখনকার মত আগে ছিল না। তাই সম্ভাবনার সব কটা জানালা, দরজা খুলে দিতে হবে—বিসিএস, পিএইচ ডি, উদ্যোক্তা, প্রাইভেট চাকরি যা আছে সব।
ভালভাবে শুনুন, বিসিএস বারবার দিতে পারবেন কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের রেজাল্ট শুধরানোর সুযোগ কি সেভাবে পাবেন? তাই স্বেচ্ছায় সিজিপিএ বিসর্জন দেবার কোন যুক্তি নেই। সিজিপিএ ভাল থাকলে আপনার জন্য বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বে কিছু করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। তখন সারা বিশ্ব হবে আপনার কাছে উম্মুক্ত। আর রেজাল্ট খারাপ হলে আপনার কোন চয়েজই থাকবে না। পরিস্থিতিই আপনাকে বাধ্য করবে সিদ্ধান্ত নিতে। সুশান্ত পালের সিজিপিএ কম তার মানে এই নয় যে বেশি সিজিপিএ পেলে বিসিএস পরীক্ষায় ক্যাডার হবার চান্স কমে যাবে। চাকরির বাজারে সিজিপিএ মূল্যহীন কথাটা মোটেই ঠিক নয়। সহজভাবে চিন্তা করুন আপনি ২.৮ পেয়েছেন আর আপনার প্রতিদ্বন্দী পেয়েছেন ৩.৮। কাকে আপনাকে বেশি যোগ্য মনে হবে ভাইভা বোর্ডে? হ্যাঁ, রিটেনে আপনি তার চেয়ে বেশি নম্বর পেতে পারেন। তিনিও কিন্তু আপনার চেয়ে বেশি নম্বর পেতে পারেন। বুঝেছেন? তাই স্বেচ্ছায় সিজিপিএ বিসর্জন দেওয়া যাবে না। তবে রেজাল্ট যদি খারাপ হয়েই যায় তাহলেও সরকারি চাকরি পাওয়া যায় এরকম অজস্র উদাহরণ আছে। জেনেবুঝে কেন খারাপটা নিবেন যখন ভালটা পাবার মেধা, সময়, সুযোগ সবই আছে আপনার মুষ্টির মধ্যে।
প্রতিবছর বিসিএস এর রেজাল্ট বের হবার পর কম সিজিপিএধারীদেরও সফলতা দেখা যায়। তিনি পেরেছেন তাই বলে আপনি পারবেন এমন কোন নিশ্চয়তা আছে কি? তাহলে তো আমি এক ধাপ এগিয়ে বলব গ্রাজুয়েশনেরই দরকার নাই আর যুক্তি হিসেবে বিল গেটস, জুকারবার্গ এদের নাম বলব। তারা জীবনেও কখনো বলেন নি গ্রাজুয়েশন কর না, টাইম নষ্ট, প্রতিভা থাকলে মূল্যায়ন হবেই, তুমিই হবে নেক্সট জুকারবার্গ, তোমাকেই খুঁজছে ট্রাম্প। হার্ভার্ড ড্রপ আউট আর ছাগলচিপা কলেজ ড্রপ আউট এক নারে ভাই। তাই আবারও বলছি একাডেমিক পড়ার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিন। বিল গেটসের কোম্পানিতে যারা বড় বড় পদে আছেন তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতাটাও একবার দেখে আসুন। শুধু এক চোখ দিয়ে মালিক, চেয়ারম্যানের যোগ্যতা দেখলে হবে না। Exception কে example হিসেবে ধরে সেই আনুযায়ী জীবন বাজি ধরার রিস্ক নেওয়াটা চরম নির্বুদ্ধতা ছাড়া আর কিছু না।
আরে ভাই, “আপনি খুব বেশি বুঝেন। যত আগে শুরু করব, ক্যাডার হবার সম্ভাবনা তত বেশি। বুঝেছেন? আপনি আপনার প্যাঁচাল বন্ধ করেন।’’ আসলেই কি তাই? আপনার মনে হয় যত আগে শুরু করবেন তত এগিয়ে থাকবেন? মোটেও না। তাহলে ৫-৬ বার কেউ প্রিলি ফেল করত না আর কেউ প্রথম বিসিএস পরীক্ষাতেই টপ ক্লাস চাকরি পেত না। কিছু মনে করবেন না একটা কথা বলি। বাংলাতে একটা প্রবাদ আছে, যার হয় না নয়েতে, তার হয় না নব্বইয়ে। যিনি পারবেন, তিনি শুরুর দিকেই তার সফলতার প্রমাণ রাখতে পারবেন। আপনার কি মনে হয় সারাদিন প্র্যাকটিস করলে আমি-আপনি মেসি, রোনালদো, ম্যারাডোনা বা পেলে হয়ে যাব? তারা কি ২৪ ঘণ্টাই প্রাকটিস করেন? তাদের চেয়ে বেশি কি কেউ প্র্যাকটিস করেন না? সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত একটা জিনিস আছে সেটার জোরেই সফলরা আজ সফলতার আসনে আসীন। শুধু আগে শুরু করলে বা বেশি প্র্যাকটিস করলেই হবে না। অবশ্যই আপনাকে তাদের মত বিরল প্রতিভাবান হতে হবে না। আপনার ব্যাসিক ক্লিয়ার থাকতে হবে, স্ট্র্যাটেজি ঠিক থাকতে হবে, গাইডলাইন ঠিক হতে হবে, পরিশ্রমী হতে হবে, ধৈর্য লাগবে এবং সর্বোপরি ভাগ্যের সাহায্য তো লাগবেই। তবে শুধু ভাগ্যের উপর ভরসা করা আর ভাগ্যকে দোষারোপ করা যাবে না। আবারও বলছি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করুন পড়ালেখা, সৃজনশীলতা, খেলাধূলা ইত্যাদি ইত্যাদি কাজে।
তবে একটা কথা আমি বলতে চাই যদি আপনার পড়ালেখার চাপ খুব কম থাকে, সব কিছু করেও আপনার হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকে, তাহলে বলব আপনি শুধু ম্যাথ আর ইংলিশ পড়ুন আর দেশ বিদেশের খবর রাখুন, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করুন। শুধু এই দুই বিষয় পড়ুন আর কিচ্ছু না। প্লিজ আর কিচ্ছু না। আবারও বলছি আর কিচ্ছু না। বিসিএস হোক বা না হোক আপনার কোন লস হবে না। ইংলিশ স্পোকেন, ফ্রিহ্যান্ড রাইটিং এবং অনুবাদ প্র্যাকটিস করুন। ইংলিশ বলতে, লিখতে যত উন্নতি করতে পারবেন, ততই লাভ। ইংলিশের জন্য বিসিএস এর সিলেবাস ধরে পড়তে হবে না; যা পড়বেন তা ইতোমধ্যে বিসিএস এর সিলেবাসেই আছে। ইংলিশের ব্যাসিকে সমস্যা থাকলে তা মজবুত করার জন্য পিসি দাসের বইটা পড়তে পারেন, Anglo-Bangla ভার্সন অবশ্যই। মনে রাখবেন, বিসিএস মূলত ব্যাসিকের খেলা। যার ব্যাসিক যত মজবুত, তার কষ্ট তত কম হবে, সময়ও লাগবে কম। ব্যাসিক ক্লিয়ারের জন্য tense, voice, article ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পড়ুন। বেশি গভীরে পড়তে হবে না কারণ আপনাকে বিশেষজ্ঞ হতে হবে না সরকারি চাকরি পাবার জন্য। যেমন tense এর জন্য ১২ ধরনের টেন্স না পড়ে শুধু ৭-৮ টা ধরন ভালভাবে বুঝলেই আপনার ব্যাসিক ক্লিয়ার হয়ে যাবে। একইভাবে narration এর জন্য বেশী গভীরে যেতে হবে না। খুশির কথা বিসিএস সিলেবাসে narration নেই তবে প্রশ্ন যে এখান থেকে হবে না তার কিন্তু কোন নিশ্চয়তা নেই। আর আপনার বিসিএস হবে সেটাও কিন্তু নিশ্চিত নয়। আপনি তো এনএসআই, দুদক, ডিজিএফআই ইত্যাদি টপ ক্লাস স্থানেও চাকরিও পেতে পারেন। স্পোকেন ইংলিশের জন্য বিবিসি জানালার ভিডিও বা বই দেখতে পারেন। ব্যাসিক ক্লিয়ার হবে, ভালও লাগবে। আর ইউটিউবে ইংরেজি শেখার অজস্র চ্যানেল তো আছেই। অনুবাদের জন্য প্রথম আলোর সম্পাদকীয় প্রতিদিন অন্তত ৫টি বাক্য অনুবাদ করুন। পত্রিকাটির ইংরেজি ভার্সন (এখন সাধারণত বিকালের দিকে ইংরেজির আর্টিকেলগুলো পাওয়া যায়) দেখে আপনার অনুবাদ যাচাই করুন, শাণিত করুন এবং প্রাঞ্জল করুন।
ব্যাসিকে সমস্যা না থাকলে ম্যাথের জন্য সরাসরি আগারওয়ালের Quantitative Aptitude বইটি দেখতে পারেন। আর ব্যাসিকের জন্য খাইরুল’স ব্যাসিক ম্যাথ দেখতে পারেন। খাইরুল’স এডভান্সড ম্যাথও দেখতে পারেন যদি আগারওয়াল কঠিন মনে হয়। আর একটা কাজ করতে হবে সেটা হচ্ছে নবম-দশম শ্রেণির সাধারণ গণিত বইটা ভালভাবে শেষ করুন। আপাতত উচ্চতর গণিত দেখার দরকার নেই। সবই যদি আগে পড়ে ফেলেন তাহলে পরে পড়বেন কী? কিছু কাজ বাকি রাখুন প্লিজ। এভাবে ধীর ধীরে অবসর সময়ে নিজের ম্যাথ এবং ইংলিশের দক্ষতাকে আরও শাণিত করুন।
আর কথা বাড়াচ্ছি না। আশা করি বোঝাতে পেরেছি। না পারলে সরি; আপনার সময় নষ্ট করলাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা বৃষ্টিতে ভিজে খেলাধূলা করার জীবন, দৌড়-ঝাঁপ করার জীবন, ঘোরাঘুরি করার জীবন, সৃজনশীলতার শিখরে পৌছানোর জীবন। এক কথায়–না থেমে চলার জীবন। আপনাকে সবকিছু বিসর্জন দিয়ে বিসিএস এর পিছে দিগভ্রান্তের মত ছুটতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা শুধু পাগলের মত জব সলুশন পড়ার জন্য নয়, হে নবীন।
যেটাই করুন, আপনার জন্য নিরন্তর শুভ কামনা।
লেখকঃ শাহেদ হোসাইন
সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (কাস্টমস এন্ড ভ্যাট), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), (সুপারিশপ্রাপ্ত, ৩৭তম বিসিএস নন ক্যাডার)
৩৭, ৩৮, ৪০তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কৃতকার্য এবং আপনাদের সহযোদ্ধা (৪১তম বিসিএস)

থ্রেশহোল্ড
আজকের গল্পটি লিখেছি বেশ কয়েক মাস আগে। ব্যস্ত দিনে যারা গল্পটি পড়তে পারেননি, তাদের জন্য আজকে গল্পটি রিপোস্ট করা হলো। আপনাদের মতামত জানাতে ভুলবেন na
(১)
পাপ্পুর মনটা আজ খুব খারাপ। প্রতিদিনই বিকেলবেলা তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। তবে আজ একটু বেশি খারাপ। সে ল্যাবরেটরি স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। তার রোল নাম্বার ৭। যখনকার কথা বলছি তখন স্কুল টি খুবই ঐতিহ্যবাহী একটি স্কুল ছিল। বোর্ডে প্রায় ৮/১০ জন ছেলে স্ট্যান্ড করত। যারা স্ট্যান্ড ব্যাপারটা জানেন না, তাদের অবগতির জন্য বলি, এক সময় বোর্ডে র প্রথম ২০জন কৃতকার্য ছাত্র ছাত্রীর তালিকা প্রকাশ করা হতো। সেই হিসাবে রোল নাম্বার ৭ খুব একটা খারাপ নয়। কিন্তু তার মা কঠিন এক মহিলা। তার ছেলের আগে আরও ছয়টি ছেলে আছে, ব্যাপারটা তিনি ঠিক মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি তার ছেলের জন্য একটি রুটিন করে দিয়েছেন। সেই রুটিন মোতাবেক, এখন তার টিভি দেখার সময়। কিন্তু যে সময়ের কথা বলছি তখন দেশে একটি মাত্র টেলিভিশন চ্যানেল ছিল।আসর আর মাগরিবের মধ্যবর্তী এই সময়টুকুতে তারা হিজল-তমাল নামে একটি অনুষ্ঠান প্রচার করতো। ক্লাস থ্রি এর একটি বাচ্চা র জন্য যে অনুষ্ঠান কখনোই আনন্দদায়ক হতে পারে না। সুতরাং সে তার রুটিনের বাইরে গিয়ে একা একা খেলা শুরু করলো।
(২)
এমনিতেই শিশুরা অনেক কল্পনাপ্রবণ হয়। তারা একটা অন্য জগতে বাস করে। পাপ্পুও তার ব্যতিক্রম নয়। সে কল্পনা করে নিল সে একজন ডাক্তার। মায়ের খালি হয়ে যাওয়া ডিজিপ্লেক্স এর বোতলে পানি ভরে সে ডাক্তার ডাক্তার খেলা শুরু করলো। তার একটাই রোগী। তাদের কাজের মেয়ে জোসনা। মেয়েটি কোন এক বিচিত্র কারণে পাপ্পুকে অসম্ভব আদর করে। হয়তো ওকে দেখলে তার গ্রামে ফেলে আসা ছোট্ট ছেলেটির কথা মনে পড়ে যায়।
(৩)
ডিজিপ্লেক্স ওষুধটি অত্যন্ত ধন্বন্তরি। পাপ্পুর মায়ের হজমের সমস্যা রয়েছে। তাই তিনি ওষুধটি সবসময় হাতের কাছে রাখেন। আজ দুপুরের খাবার পর থেকেই তার বদহজমের মত হচ্ছে। এক ধরনের চুনা ঢেকুর উঠে আসছে যার সাথে দুপুরের খাবারের স্বাদ তার মুখটাকে বিস্বাদে ভরে দিচ্ছে। তিনি জোসনাকে ডাকলেন ওষুধটি তাকে দিয়ে যাওয়ার জন্য।
(৪)
ওষুধটি তার বিছানার পাশের টেবিল টিতে থাকবার কথা। স্বভাবতই জোসনা প্রথমে সেখানেই খোঁজ করলো। সেখানে না পেয়ে সে পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল। নেইতো নেই। কিন্তু কোথায় যাবে? তার মনটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে একটু আগে পাপ্পু কে দেখেছে ডাইনিং রুমের বেসিন থেকে পানি ভরে একটা ডিজিপ্লেক্স এর বোতল নিয়ে খেলতে। সে ভেবেছিল হয়তো খালাম্মার খালি হয়ে যাওয়া ঔষধের বোতল দিয়ে খেলছে। কিন্তু এখন ভয় হচ্ছে, এটা বলা মাত্র খালাম্মা পাপ্পুকে মারতে শুরু করবেন। ভদ্রমহিলা অসম্ভব সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত। তার ধারণা পৃথিবীর সবাই তাকে বোকা বানানোর জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে যখন ধীরে ধীরে খালাম্মকে গিয়ে বলল যে বোতলটি পাওয়া যাচ্ছে না তখন পাড়ার মসজিদগুলো থেকে মাত্র আসরের আযান ভেসে আসছে।
(৫)
পৃথিবী ধ্বংস করার জন্য সৃষ্টিকর্তা আসর ওয়াক্ত বেছে নেবেন বলে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে , সেটা সত্যি কিনা আমি ঠিক বলতে পারব না, কারণ আমাদেরকে না দেখেই এই ব্যাপারটার উপর বিশ্বাস আনতে বলা হয়েছে, এটাই ঈমান। সুতরাং ঈমানদার মানুষেরা যথা সময়ে এর সত্যতা জানতে পারবেন ইসরাফিলের বাঁশি শুনে। কিন্তু পাপ্পুর ছোট্ট জীবনে কেয়ামত যে আসর ওয়াক্তে নেমে এসেছিল সে ব্যাপারে আমার কোনোই সন্দেহ নাই। তার মা প্রথমে খুব নরম স্বরে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুই যে বারান্দায় ডিজিপ্লেক্স এর বোতলে পানি ভরে নিয়ে বসে খেলছিলি, এটা তুই কোথায় পেয়েছিস?"
"তুমি বোতল শেষ হয়ে গেলে নোংরার ঝুড়ির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলে। আমি সেখান থেকে উঠিয়ে রেখেছি খেলবো বলে।"
"সত্যি করে বল,আমি কিচ্ছু বলবো না!"
"সত্যি করে বলছি মা।"
"তুই তো জানিস আমি মিথ্যা কতটা ঘৃণা করি। তোকে আমি শেষ সুযোগ দিচ্ছি। ভেবে বল, আমার ওষুধ বেসিনে ফেলে সেই বোতলে পানি ভরে খেলছিস না তো?"
"ভেবেই বলছি মা।"
"এতোটুকু বয়স, এর মধ্যে মিথ্যা বলতে শিখেছিস। বড় হলে কি করবি, মানুষ খুন করবি?"
এই কথাটা বলে তিনি পাপ্পুর জাম্প রোপটা টেনে নিলেন। সাধারণত এই জিনিসটা নাইলনের তৈরি হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন টেকসই যেন হয় তাই পাপ্পু তার ঈদীর টাকা জমিয়ে একটি রাবারের জাম্প রোপ কিনেছিল। আজকে যদিও তার সেই সিদ্ধান্তের জন্য সে অনুতপ্ত হলো। রাবারের সেই জাম্প রোপটি চাবুকের মতো সপাং সপাং করে তার হাফপ্যান্ট পরা অর্ধনগ্ন পায়ে দাগ বসিয়ে দিতে লাগল।বাবার কথামতো কমদামি নাইলনের রশি কিনলে আজকে এত ব্যথা পেতে হতো না।
(৬)
সে খুবই চেষ্টা করছিল হাত নামিয়ে উপর থেকে নেমে আসা সেই জাম্প রোপটিকে আটকাতে। কিন্তু তখন তা সপাং সপাং করে তার হাতে কালশিটা দাগ কেটে দিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহুর্তে ব্যথার চাইতেও অন্য একটা চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। কাল স্কুলে বন্ধুদেরকে এই দাগগুলোর কথা কিভাবে ব্যাখ্যা করবে। পায়ের দাগ গুলো ডেস্কের নীচে থাকবে, হয়তো তারা লক্ষ্য করবে না, কিন্তু হাতের দাগ তো লুকানো যাবে না।
(৭)
আপনাদের আগেই বলেছি শিশুরা খুব কল্পনাপ্রবণ হয়। পাপ্পুর খুব ইচ্ছা করছিলো, তার যদি একটা টাইম মেশিন থাকতো,তবে সে সেই টাইম মেশিনে চড়ে সপ্তাহখানেক আগের জন্মদিনের দিনটিতে ফেরত চলে যেত। তার জন্মদিন গিয়েছে সপ্তাহখানেক আগে। সেদিন সকালে তার মা এক অদ্ভুত ঘোষণা দিলেন। বললেন," তোমরা সবাই শোনো, আজকে পাপ্পুর জন্মদিন, তোমরা কেউ কিন্তু আজকে পাপ্পু কে মারবেনা।"
যদিও কথাটা ঘটা করে বলবার তার প্রয়োজন ছিল না। এ বাসায় তিনিই একমাত্র পাপ্পুর গায়ে হাত তোলেন। বাকি সবাই আদরে আদরে ভরিয়ে রেখেছিল পাপ্পুর শৈশব।
(৮)
শিশুরা খুব কল্পনা প্রবণ হয় তা আপনাদের আগেই বলেছি। শিশুদের আরেকটা কি সহজাত প্রবৃত্তি থাকে জানেন? তারা কখনো মিথ্যা বলতে পারে না। তার মা তার মুখে সত্যি শুনতে চাচ্ছিলেন। পাপ্পু মিথ্যা করে বলে দিলেই পারত, সে মায়ের ওষুধ ফেলে দিয়েছে। তাহলেই সব ঝামেলা মিটে যায়। কিন্তু ছোটবেলায় আমরা খুবই শুদ্ধ থাকি। চাইলেই হুটহাট মিথ্যা বলতে পারিনা। আর তাই কখনো কখনো অনেক চড়া দাম দিতে হয় আমাদের এই সত্যবাদী হবার কারণে। যেমন দিতে হয়েছিল পাপ্পুকে পুরো দুটো দিন।
(৯)
পানির একটা থ্রেশহোল্ড পয়েন্ট আছে। যে হাঁড়িতে আপনি পানি ফুটাবেন তাকে ১০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পৌঁছাতে হবে । তেমনি প্রতিটি মানুষের একটি থ্রেশহোল্ড পয়েন্ট থাকে, যেখানে পৌঁছালে মানুষটি ভেঙ্গে যায়। দুদিন ক্রমাগত শারীরিক অত্যাচারের ফলে সন্ধ্যার মুখে মুখে পাপ্পু সেই বিশেষ জায়গাটিতে পৌঁছাল। বিগত ৪৮ ঘন্টায় যখনই তার মায়ের মনে পড়ছিল ব্যাপারটা তখনই তিনি পাপ্পুকে শাস্তি দিচ্ছিলেন। কিন্তু ছেলেকে ক্রমাগত শাস্তি দেবার কারণে ক্লান্তি এসে ভর করছিল তার শরীরে। তখন পাপ্পু কিঞ্চিৎ বিরতি পাচ্ছিল। ক্রমাগত দুইদিন অত্যাচার সহ্য করে যখন চাবুকের বাড়ি সে আর নিতে পারছিল না তখন সে তার মাকে একটি মিথ্যা কথা বলে।"মা আমি সত্যির বদলে মিথ্যা বলছি, আমি তোমার ডিজিপ্লেক্স বোতল বেসিনে ঢেলে খালি করেছিলাম খেলবো বলে।"
(১০)
কথাটা বলা মাত্র পাপ্পুর ছোট্ট জীবনে শান্তি নেমে আসলো আর তার মায়ের ঠোঁটে র কোণে আত্মতুষ্টির হাসি।একটি ছোট্ট ছেলেকে ভাঙতে পেরে তিনি অত্যন্ত তৃপ্তি বোধ করলেন। আপনারা কি কখনো আলেক্স হালির রুটস উপন্যাসটির চিত্ররূপ দেখেছেন ? আফ্রিকা থেকে ধরে নিয়ে আসার পরে ক্রীতদাস বানানোর প্রক্রিয়া হিসেবে কুনটা কিনতে নামের মূল চরিত্র টির নতুন নামকরণ করা হয়েছিল টোবে। কিন্তু গোয়ার কুনটা কিনতে কিছুতেই তার নতুন নাম মেনে নিচ্ছিল না। একপর্যায়ে তাকে ঝুলিয়ে চাবুক দিয়ে পিটিয়ে তার থ্রেশহোল্ড পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। শেষমেষ সে যখন মনিবের দেয়া নতুন নামটি মেনে নেয় তখন ঝুলন্ত অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ার সময় মনিবের মুখে যে হাসি ফুটে উঠেছিল, সে হাসি আর তার মায়ের মুখে ফুটে উঠা হাসির মাঝে কোন পার্থক্য ছিল না।
(১১)
কোন বাবা-মাই সন্তানকে শাস্তি দিতে চান না। তবুও তাদের এই অপ্রিয় কাজটি করতে হয় । যখন করেন তখন নিশ্চয়ই তাদের খুব মন খারাপ করে। আর তাই পাপ্পুর মুখে স্বীকারোক্তি আদায় করা মাত্র তার মায়ের মন সন্তানের মায়ায় আর্দ্র হয়ে উঠল। তিনি তৎক্ষণাৎ পাপ্পুর জন্য সান্ধ্যকালীন দুধ বানাতে রান্নাঘরে গেলেন। সেখানে বেশ কিছু খালি দুধের কৌটা রয়েছে। তার কাজের মেয়েটি একেবারে অজপাড়া গ্রাম থেকে এসেছে। এটি তার প্রথম শহরে চাকরি। সে কোন কাজ গুছিয়ে করতে পারে না। তিনি বহুবার বলেছেন, নতুন দুধের কৌটাটি খালি হয়ে যাওয়া কৌটা গুলি থেকে দূরে রাখতে। এখন তাকে সবগুলো কৌটা ঝাঁকিয়ে দেখতে হবে কোনটায় দুধ আছে। এই পরীক্ষার মাঝখানে একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। তিনি যখন ডানোর খালি হয়ে যাওয়া কৌটা গুলো ঝাঁকিয়ে দেখছিলেন, কোনটা ভারী ঠৈকে, তখন একটি কৌটা থেকে ঠকঠক শব্দ আসতে শুরু করলো। সেই কৌটাটি খুলে তিনি তার হারিয়ে যাওয়া সেই নতুন ডিজিপ্লেক্স এর বোতলটি আবিষ্কার করলেন। কিন্তু বাবা-মায়েরা সন্তানের স্বীকারোক্তি যতটা পছন্দ করেন, নিজেরা কখনো সন্তানের কাছে স্বীকার করেন না যে তাদের কোনো ভুল হয়েছে বা ভুল হতে পারে। এটা কে তারা দুর্বলতা মনে করেন। পাপ্পুর মাও এর ব্যতিক্রম নন।সুতরাং তিনি পাপ্পুর কাছে হারিয়ে যাওয়া বোতলটি আবিষ্কারের পুরো ঘটনাটা চেপে গেলেন। গত দুদিন ধরে অন্যায় ভাবে শাস্তি পাওয়া সন্তানের থেকেও তার কাছে যে ব্যাপারটা বেশি গুরুত্ব পেল তা হচ্ছে বোতলটা দুধের খালি হয়ে যাওয়া কৌটায় ঢুকলো কিভাবে? তিনি অনেক ভেবে চিন্তে ও এই রহস্যের সমাধান বের করতে পারলেন না।
(১২)
এদিকে শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য মাকে মিথ্যে বলার অপরাধবোধ ছোট্ট পাপ্পুর মনোজগতে এক অদ্ভুত প্রভাব ফেলল। সারাটা জীবন এই ব্যাপারটা তাকে তাড়িয়ে বেড়ালো। তার মায়ের জীবদ্দশায় সে বহুবার ভেবেছিল সত্যি ঘটনাটা সে মাকে বলবে। কিন্তু অনেক অসম্পূর্ণ কাজের মতই এই কাজটিও সে তার মায়ের জীবদ্দশায় করে উঠতে পারে নি।তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ যখন তার কাছে এসে পৌঁছল তখন সে দেশের পাট চুকিয়ে পাকাপাকিভাবে বাস করে আমেরিকায়। তাদের মাঝখানে রয়েছে বিশাল সমুদ্র।
(১৩)
সে যখন সেই বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মায়ের কাছে এসে পৌছালো ততোদিনে তার মায়ের স্থান হয়েছে মাটি থেকে বেশ অনেকটা নিচে। অন্ধকারাচ্ছন্ন সেই ছোট্ট ঘরটিতে চিরনিদ্রায় শুয়ে তিনি তখন চার দশক আগে ছেলেকে কি শাস্তি দিয়েছেন, তা নিয়ে ভাবছিলেন এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। তবুও নিজের মানসিক সান্তনার জন্য পাপ্পু যখন পুরান ঢাকায় তার মায়ের কবরের পাশে এসে দাঁড়ালো কাকতালীয়ভাবে তখনও আসরের আযান ভেসে আসছিল কবরস্থান সংলগ্ন মসজিদ থেকে। পাপ্পু যখন তার মায়ের কবরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার মাকে বলা বহু বছর আগে মিথ্যা ভাষণ এর ব্যাখ্যা দিচ্ছিল, আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ তিনি তো সত্যি ঘটনা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু তবুও পাপ্পুর মানসিক শান্তির জন্য এই স্বীকারোক্তির প্রয়োজন ছিল। ইংরেজিতে এর নাম ক্লোজার।
রচনাকাল জুন ২০২০ ডালাস টেক্সাস ইউএসএ
প্রাপ্তি
ঠিক ২০ বছর বয়সে বিয়ে হয় আমার। বাবা এক প্রকার জোর করেই বিয়েটা করান আমাকে!
যাইহোক, সে কথায় পরে আসছি...
বিয়ের প্রথম-প্রথম শেষ রাতে বউয়ের ডাকে ঘুম ভাঙত আমার । সে এক প্রকার আদেশ করেই বলত, "আযান দিচ্ছে, নামাজে পড়ে আসেন।"
আমার বাবা মাদ্রাসার একজন শিক্ষক।টানা ৩০ বছর ধরে মসজিদে ইমামতি করছেন। যেদিন ফজরের নামাজে মসজিদে আমায় দেখতে পাননা, সেদিন অর্ধেক বেলা কপালে খাবার জুটে না আমার। বাবা এমনিতেই খুব কঠোর প্রকৃতির মানুষ। দাদি ব্যতীত, তার হুকুম ছাড়া বাড়ির একটা মানুষও লড়াচড়ার সাহস রাখে না ।
ছোট বেলা ফজরের নামাজ মিস হলে কয়েকটা বের্তাঘাত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। বড় হওয়ার পর থেকে এই কড়া নিয়ম। মা অবশ্য চুপিচুপি খেতে দিতেন।
কিন্তু বাবা আমায় বিয়ে করিয়ে দেয়ায় হয়েছে আরেক ঝামেলা।
বাবা যার সাথে আমার বিয়ে দেন তার নাম আফিয়া। বাবার ছাত্রী । আমি সারাদিন কী করি না করি বাবার কাছে নালিশ দেয়াই তার প্রধান কাজ।
হঠাৎ কোন কারণে ফজরের নামাজ মিস হয়ে গেলে সে কুটকুট করে হেসে বলত, "আজ কিন্তু খাওয়া বন্ধ।"
সত্যিই তাই, বিয়ের পর থেকে নামাজ মিস হলেই দুপুর পর্যন্ত খাওয়া বন্ধ থাকে আমার।
এখন নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছেন কেমন ফ্যামিলি তে বড় হয়েছি আমি।
বাবার অবশ্য এই কড়া নিয়মের পিছনে একটা যুক্তি ছিল। তিনি বলতেন, " ক্ষণস্থায়ী আরামের ঘুমের জন্য যে অনন্তকাল চিরনিদ্রার ঘুমের বেঘাত ঘটায় সে বোকা। আর বোকাদের শাস্তি দিয়ে চোখ-কান খুলে দিতে হয়।"
আমরা চার ভাই বোন। পিঠাপিঠি বড় দুই ভাই কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে 'আল কুরআন ও ইসলামী শিক্ষা' বিভাগে
পড়া লেখা করছে। তারাও বিবাহিত। বড় বোন কুরানে হাফেজ।বছর খানেক আগে তারও বিয়ে হয়।
আমি পরিবারের সবার ছোট। বাবার ইচ্ছে ছিল,মাদ্রাসায় পড়ে বড় মাওলানা হই। ৮ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম।
একদিন বাবা সন্ধার পর বাড়ি আসলেন। দাদি আমাকে দিয়ে খবর পাঠালেন বাবাকে ডেকে নিয়ে আসতে।
বাবা সালাম দিয়ে দাদির পাশে এসে বসলেন।
দাদি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
''খলিল তোর আব্বা কী অসুখে মরছিল তোর মনে আছে?"
কথা শুনে বাবা থমথম খেয়ে গেলেন। তিনি হয়তো এমন কথা আশা করেননি। কারণ দাদি সবসময় তার নাতিনাতনি দের উপর কড়া শাসনের জন্য বাবাকে নানা রকম কথা শুনাতেন।তিনি হয়তো ভেবেছিলেন সেরকম কোন কথাই হবে।
বাবা অপ্রস্তুত কণ্ঠে বললেন, " জ্বী আম্মা মনে আছে। আব্বার কলেরা হয়েছিল, এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় মারা যান।"
দাদি চোখমুছে বললেন, "সাত গেরামের মধ্যে কোন ডাক্তার আছিলো না। যদি থাকতো তোর আব্বা হয়তো আজো বাঁইচা থাকত।"
"হ্যাঁ। আম্মা। আল্লাহ চাইলে হয়তো বেঁচে থাকতে পারত।" এই বলে বাবা পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে চোখ মুছলেন।
আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম।দাদি আমাকে পাশে এনে বসালেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বাবাকে বললেন, "আমি চাই বংশের এক পোলা ডাক্তার হোক। মানুষের সেবা করুক।" দাদি একটু থেমে, বাবার চোখের দিকে তাকালেন। "তুই আবদুল্লাহ কে মাদ্রাসায় না পড়িয়ে স্কুলে ভর্তি করে দে।"
দাদির এক কথাতেই পরদিন বাবা আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমার লাইফ স্টাইলে আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল!
সাদা পাঞ্জাবি টুপি ছেড়ে প্যান্ট-শার্ট পড়ে স্কুলে যেতে লাগলাম।
.
.
এস.এস.সি'র পর বন্ধু দের পাল্লায় পড়ে ক্লিন শেইভ করে বাড়ি এসে ছিলাম। বাবা বাড়িতে ঢুকতে দেননি। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে কড়া কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
"ইহুদী খিষ্টান চাল-চললে যে চলা ফেরা করে সে আমার ছেলে হতে পারে না। তুই বের হয়ে যা।"
মাথা নিছু করে আছি। মুখ দিয়ে আমার কোন কথা বের হচ্ছিল না। ভাবছিলাম, হোস্টেল বন্ধ, কোথায় যাব কী করব।
বাবা হঠাৎ মাটিতে পড়ে থাকা আমার ব্যাগটা তুলে আমার হাতে দিলেন। বের হওয়ার রাস্তাটা দেখিয়ে বললেন,
" যেদিন মুখে দাড়ি উঠবে,সেদিন পরিপূর্ণ সুন্নত নিয়ে বাড়ি আসবি তার আগে না।"
হৈ চৈ শুনে দাদি বের হয়ে আসলেন। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,
"খলিল কী হইছে রে, কারে বাড়িত থাইক্যা বের করস?"
"আম্মা আপনি এই শরীরে বাইরে বের হলেন কেন? ভিতরে যান।"
"তোর সাহস তো কম দেখতাছি না, আমার নাতিরে তুই বের করে দিবি। এই বয়সে তোর তো ঠিক মত দাড়িই ওঠে নাই।"
দাদি আমার দিকে তাকালেন। থুরথুর করে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে ঘরের ভিতর নিয়ে গেলেন।
এমনিতেও বাবার সাথে আমার কথা খুব কম হত। কোন প্রয়োজন পড়লে তিনিই আমাকে ডেকে পাঠাতেন। সেদিন রাতে বাবা নিজেই আমার রুমে আসলেন। আমি তখন অজানা ভয়ে কাঁপছি। মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, উনার কথা গুলো হজম করার। তিনি নরম গলায় বললেন, " ভাত খেয়েছিস বাবা?"
তাঁর কথা বলার আন্তরিকতায় আমি কিছুটা হচকিয়ে গেলাম। মাথা নেড়ে দুর্বল কণ্ঠে বললাম, "হ্যাঁ। "
"তোকে কেন এত বেশি শাসন করি তা জানিস?
আমি চুপ। জবাব দিচ্ছিনা। বাবা আবার বললেন, " বাবা'রা কোন দিন সন্তানের খারাপ চায় না। তুই যেন বাজে সঙ্গীদের পাল্লায় পড়ে নষ্ট না হয়ে যাস তাই এত শাসন করি। "
"বাবা ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দাও।"
"দেখ, মানুষের ভুল হবেই। তবে জেনেশুনে এমন কিছু ভুল করা ঠিক না; যেগুলোর নিজের সাথেই বেঈমানি করা, নিজেকে ঠকানো, এসব ভুল খুব মারাত্মক। তুই কী জানিস কোন আমলটা পুরুষরা সরাসরি কবরে সাথে করে নিয়ে যাবে?"
"না বাবা।"
বাবা মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, " দাড়ি হচ্ছে একমাত্র সুন্নাত, যেটা একজন পুরুষের সাথে কবর পর্যন্ত যাবে।"
আমি কিছু বলতে চাইছিলাম, বাবা থামিয়ে দিয়ে বললেন, "ক্লিন শেইভ মানেই স্মার্ট টা। আদর্শ মুসলিমদের স্মার্টনেস মানেই যুবক থেকেই দাড়ি রাখা।অনেকে বলে বিয়ে করি সন্তানাদি হোক, তারপর দাড়ি রাখবো। আরে বেটা,তুই যে কাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবি সে ভরসা কি আছে?"
.
.
ছাত্র হিশেবে খারাপ ছিলাম না। এইচ.এস.সি'র পর এক চান্সেই মেডিকেলে ভর্তি হলাম। প্রথম সেমিস্টারের পর ছুটিতে বাড়ি এসেই দেখি সবার মুখে এক ধরনের চাপা হাসি। ঈদ ছাড়া ভাইবোন কখনো একত্রিত হতে পারিনা। কিন্তু সবাই এখন বাড়িতে।কিছুটা অবাক হয়েছি, ভেবেছিলাম আমি মেডিকেলে চান্স পেয়েছি,এজন্য প্রথম বাড়ি আসার খবর শুনে সবাই হয়তে এসেছে।
কিন্তু সে ভুল ভাঙে আমার রাতে। দাদি সাথে কথা বলার ফাঁকে তিনি হঠাৎ বললেন,
" তোর মা গিয়ে দেখে এসেছে, মেয়ে নাকি অনেক সুন্দর। "
"কোন মেয়ে? কী বলছ এসব!"
"তোর বিয়ে ঠিক হয়েছে। তোর বাবা বাড়ি ফিরুক ওর মুখেই সব জানতে পারবি।"
দাদির কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম।বুঝতে পারছি বিয়ের জল হয়তো অনেক টুকু গড়িয়েছে। যেভাবেই হোক এবার বাবাকে থামাতেই হবে। এমনিতেই মেডিকেলের পড়া পড়তে-পড়তে পাগল হয়ে যাবার দশা, তার মাঝে ছাত্র অবস্থায় আবার বিয়ে?
ভোরবেলা ফজরের নামাজের পর বাবা সাথে দেখা। বড় দুই ভাই মুচকি একটা হাসি দিয়ে, বাবার সামনে আমাকে একা রেখে বাড়ির দিকে যেতে থাকল।
বাবা মুখে হাসি এনে বললেন,
"কী খবর তোমার সালাত ঠিক মত পড়া হয় তো?"
"জ্বী, পড়া হয়।"
"খবর তো নিশ্চয় শুনেছ, সামনে শুক্রবার তোমার বিয়ে।"
চোখমুখ শক্ত করে বললাম, " না বাবা আমি এখন বিয়ে করব না।"
বাবা শব্দ করে হাসলেন। কৈফিয়তের স্বরে বললেন, "কেন বিয়ে করবে না শুনি?"
বললাম, " ছাত্র অবস্থায় কেউ কী বিয়ে করে? আর আমি তো এখনো এক-পয়সাও কামাই করি না। তাছাড়া... "
হঠাৎ বাবা আমাকে থামিয়ে দিয়ে, খালি-পায়ে হাঁটতে লাগলেন। আমিও তার পিছুপিছু হাঁটছি। বেশ কিছুক্ষণ পর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার বয়স কত এখন? "
উত্তর দিলাম, "এই তো বাবা বিশ।"
"হুম তার মানে তুমমি যতেষ্ট বালেক। বিয়ে করার বয়স হয়েছে।"
অসহায় ভাবে বললাম, "তার মানে এই না যে এখনি বিয়ে করতে হবে।"
কথাটা শুনে বাবা নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। আমার পাঞ্জাবির পকেটে থাকা ফোনটার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, " স্মার্ট ফোন তো সাথেই আছে। নিশ্চয়'ই পেপারের আগে সব খবর আগেই পেয়ে যাও।"
আমি বাবার দিকে তাকালাম, কিছু বললাম না।
বাবা বললেন, " এই যে হারাম রিলেশনশিপ, জিনা, ধর্ষণ, আরো অজানা আরো অনেক খারাপ কাজ পত্রিকা খুললেই দেখতে পাই।
প্রতিটা যুবকের চরিত্র যদি ঠিক থাকত, নৈতিক আদর্শ ও পারিবারিক শিক্ষা যদি সঠিক ভাবে পেত এসব কী হত? আমি বলছি না তুমি এসব খারাপ কাজে লিপ্ত হবে। কিন্তু বাবা হিশেবে আমার দায়িত্ব হলো অজানা অনেক পাপ থেকে তোমাকে হেফাজত করা।
বললে যে টাকা পয়সা কামাই কর না, বিয়ে করে খাওয়াবে কী? আরে খাওয়ানোর মালিক তো উপরওয়ালা। কেউ কি কারো রিজিক খেতে পারে।যার যত টুকু সে ততটুকুই খেতে পারে। পৃথিবীতে কেউ তো না খেয়ে আছে না। প্রয়োজনে তিন বেলার খাবার তুমি এক বেলা কম খাবে।"
সেদিন বাবার মুখের উপর আর কোন কথা বলার যুক্তি আমার ছিল না।
বিয়েটা হয়েই যায় আমার। বিয়ের পর বাবা বললেন আফিয়া কে সাথে নিয়ে যেতে। বুঝিয়ে শুনিয়ে বললাম, হঠাৎ তো নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। পরের বার এসে নিয়ে যাব।
আমার বিয়ের খবর শুনে বন্ধুরা অনেকে হাসাহাসি করল। কেউ অভয় দিয়ে বলল, "হ্যাঁ যা করেছিস, একদম ঠিক করেছিস। "
ক্লাস শেষে ক্যাম্পাসে একা-একা বসে থাকি। বন্ধুরা অনেকেই গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরে বেড়ায় গল্প করে, চিল-মাস্তি করে। তখনি বাবার কথাটা মনে হয়ে যায়, 'হারাম রিলেশনশিপ'। ভাবতে থাকি, রঙিন চশমা দিয়ে দেখলে হয়তো এসব ভালোই দেখায়। কিন্তু একজন মুসলিম হিশেবে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে এই ব্যাপার গুলো আসলেই অনেক স্পর্শকাতর ...
জ্ঞানের স্বল্পত ও বুঝার অক্ষমতায় একসময় মনে হয়েছিল বাবা বুঝি আমার উপর খবরদারি বা অত্যাচার করছেন। আজকাল চিন্তা করি বাবা যা করেছেন সবি সঠিক ছিল।
.
.
পরের বার আফিয়া কে সাথে করে নিয়ে আসি। ছোট্ট একটি বাসায় আমাদের সংসারটা খুব ভালোভাবেই জমে যায়।
ক্লাস শেষে যখন বাসায় আসি, দেখি সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রতিদিন সে আমার জন্য এভাবেই অপেক্ষা করে। আজ আমাকে রিক্সা থেকে নামতে দেখেই এক ঝাটকায় সড়ে যায়।
আমি জানি সে এখন কী কী করছে। প্রথমে দৌড়ে ওয়াসরুমে গিয়ে পানির কল ছাড়বে, আমার কাপড় গুলো আনবে, তারপর চুপিচুপি দরজার ওপাশে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে, এবং কলিংবেল টিপার আগেই আমার পায়ের আওয়াজ শুনে দরজা খুলে ফেলবে।
ঠিক আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গোসল শেষ করে এসে খাওয়ার সময় বললাম, "এই যে প্রতিদিন তুমি আমার জন্য এত কিছু কর, বিনিমেয়ে আমি তো তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনা।"
সে মুচকি হেসে বলে, "কে বলে পারেন না? এই যে আপনি প্রতিদিন ক্লাস শেষে ঠিক সময়ে ফিরে আসেন। অযথা কোন বাজে আড্ডা দেন না। আমি সারাদিন খালিবাড়ি তে অপেক্ষা করে যখন আপনার মুখটা দেখতে পাই,তখনি তো সব পাওয়া হয়ে যায় আমার।"
আফিয়ার কথা শুনে চোখ ভিজে যায় আমার। ভাবি, পুরুষদের জীবনে ঠিক সময়ে বিয়ে করাটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক ততোটা গুরুত্বপূর্ণ একজন পুণ্যবতী স্ত্রী পাওয়া।
#প্রাপ্তি
#

তাহারেই_পড়ে_মনে
#তাহারেই_পড়ে_মনে
পর্ব ছয়
এবারে বোধহয় অন্য পরীক্ষা দেওয়ার সময় হলো মিষ্টির। পড়ায় মন দিতে ভুল হলো, রাতের ঘুম নামতেও চোখের আলস্য লাগলো, ক্ষিধেতেষ্টাবোধও ওকে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করলো। নোটকপিগুলোতে প্রিন্সের নাম লিখে ভরিয়ে ফেললো, এলোমেলো চিন্তায় পাগলপারা হলো! ক্লাসের শেষে, লাইব্রেরিতে ঢোকার মুখে, বেরোতে বেরোতে কিংবা হলের গেইটে প্রিন্সের অপেক্ষায় চোখ কাতর হলো। শুধু মনে হতে লাগলো এই মনে হয় প্রিন্স সামনে এসে দাঁড়াবে, হঠাৎ করে পেছন থেকে হাত ধরে বসবে কিংবা দূর থেকে ডাকবে এসে! ইদের ছুটিতে বাড়িতে গিয়েও মন আনচান করতে লাগলো - এই বোধহয় প্রিন্স এসে দাঁড়ালো রাস্তার মাঝে কোথাও। মিষ্টিকে দেখতে না পেয়ে রেগে যাবে খুব, ওতো আর বলে আসতে পারেনি!
মনের ভিতর যতটা দ্বিধা ছিলো, যা কিছু সংশয় সব ধুয়ে গেলো গোপন কান্নার জলে। অবিন্যস্ত, অবুঝ, অভদ্র, অশালীন ছেলেটাকে মনপ্রাণ দেওয়া হয়ে গেছে তা আজ মনপ্রাণ দিয়েই বুঝলো মিষ্টি।
নিজের উপরে নিজেরই খুব রাগ হতে রাগলো। সব মানুষের যে ওরই মতো নিয়মতান্ত্রিক, বুঝদার, ধৈর্যশীল হতে হবে এমন কোনো কথা আছে! আক্ষরিক অর্থেই ও কাটা মুরগির কতো তড়পাতে লাগলো।
ছোট পকেট আয়না ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো কতক্ষণ - গড়পড়তা সাধারণ চেহারা, আলাদা করে চোখে পড়ে না, চটক নেই অতিরিক্ত, সাজের বাহুল্য নেই, পোশাকেও অতি সাধারণ, শিক্ষা ছাড়া উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কোনো সম্পদ নেই - কেন ভালোবাসে ওকে প্রিন্স? ওই ছেলের রাণি হতে তো রাজ্যসহ রাজকন্যারা প্রস্তুত আছে!
আর মিষ্টিই বা কেন চায় প্রিন্সকে? না আছে মিষ্টির সাথে মানানসই শিক্ষাগত যোগ্যতা, না আছে কোনো এম্বিশন! মিষ্টির জন্য কোনো এক ভদ্র, সুশিক্ষিত, মার্জিত, ক্যারিয়ালিস্ট কাউকেই মনোনিত করবে ওর বাবা মা!
বহুদিনের অদর্শনে আজকে মিষ্টির মনের এইদিকটা পরিষ্কার হয়ে গেলো। ভালোবাসা কোনো শর্তের মুখাপেক্ষী হয় না, গজফিতায় মেপে আর ক্যালকুলেটরের বোতাম চেপে চেপে প্রেম হয় না। আজকে ও নিশ্চিত বুঝলো - জীবনে ওর ওই দুষ্ট প্রিন্সকেই চাই! কিন্তু সেই বান্দা কই? তার তো খবর নেই! সেইযে ওকে কাঁদিয়ে চলে গেলো, আর মনে করবে না বলে হুমকি দিয়ে গেলো - আর তো এলো না! মিষ্টি ভেবে রেখেছিলো রাগ পড়ে গেলেই চলে আসবে। খুব বেশি অপমান করে ফেলেছে কি মিষ্টি - ভালোবাসার চাইতে আত্মসম্মানবোধ কি বড় হয়ে গেলো প্রিন্সের কাছে? যোগ্যতার প্রশ্ন টেনে এনে অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছে ও প্রিন্সকে?
অনেক বেশি আনপ্রেডিক্টেবল ছেলেটা। কিছু উল্টোপাল্টা করে বসেনিতো? ভুলে যায়নিতো মিষ্টিকে? আসলেই যদি মিষ্টিকে ভুলে যায়, যদি অনেক দূরে সরে যায় - এসব খেয়ালেই বিপর্যস্ত হলো ও! কি হতো একটা মোবাইল থাকলে? জাফরিনও কিনে দিতে চেয়েছে - প্রায় সবার হাতে হাতেই ফোন আছে এখন। পড়াশুনোয় বিঘ্ন হবে বলেই সেই প্রস্তাব নাকচ করেছে ও নিজেই। নিজের পাকামোতে আজ নিজেরই চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হচ্ছে! হলে উঠেছে দুদিন ও। প্রথমদিন থেকেই দেখে আসছে রুমমেট বড় আপুরা কি সুন্দর ফোন কানে নিয়ে রাত পার করছে আবার পড়াশুনায়ও সমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। মিষ্টি কেন এতোটা ভাবে - এতো কঠোর আত্মসংযম কি ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়? যদি প্রিন্সই হারিয়ে যায় তবে সেই সোনালি ভবিষ্যৎ ওর কি কাজে লাগবে?
আর পারলো না মিষ্টি। এক তুমূল বর্ষার রাতে রুমমেটের মোবাইল দিয়ে ফোন করলো প্রিন্সকে। নাম্বার তো মুখস্থই ছিলো কিন্তু দুশ্চিন্তা এসে ভর করলো - নাম্বার ঠিক আছে তো, পাওয়া যাবে তো, ধরবে তো ফোনটা? কথা বলবে মিষ্টির সাথে নাকি এড়িয়ে যাবে? এতোদিন কেন আসেনি প্রিন্স, নাকি এসেছে - ও টের পায়নি! এতোদিন কিভাবে থাকছে ওকে না দেখে? ক্রিং করে ডায়ালটোন বাজে আর পাল্লা দিয়ে উত্তেজনা বাড়ে ওর - একবার রিং পড়ে, দুবার রিং পড়ে, তিন চার পাঁচ - কেউ ফোন ধরলো না।
আবার রিং দিলো মিষ্টি, ওর প্রাণটা গলাপর্যন্ত এসে ঠেকলো কিন্তু সব এক্সাইটমেন্ট নিস্তেজ করে প্রিন্স ফোন ধরলো না।
মোবাইলটা ফেরত দিয়ে বই টেনে নিয়ে বসলো মিষ্টি। মনে মনে প্রিন্সকে গালি দিতে থাকলো - কি হতো মিষ্টির নিস্তরঙ্গ জীবনে এমন উত্তাল ঝড় হয়ে না আসলে - এমন টালমাটাল হতো না ও কখনোই। বাড়ি বয়ে এসে এইভাবে মনের ভিতর পাকাপোক্ত জায়গা করে না বসলে কি ক্ষতি হতো? আর এলোই যদি এমন কেন করে - কেন মিষ্টির কথা শোনে না, না বলা কথাগুলো কেন বুঝে নেয় না?
সামনে খুলে রাখা বইয়ের কালো অক্ষরগুলো পড়েই থাকলো, ওর চোখে ভাসতে লাগলো একসাথে কাটানো সময়গুলোর প্রতিটা মূহুর্ত। মাঝেমাঝেই সেইসব স্মৃতি নাড়তেচাড়তে বড় সুখ হয়! আবার নিজের ভুলের দায়ে অনুশোচনায়ও পোড়ে মিষ্টি!
ও যখন এমন পুড়ছে ক্রমাগতই তখনই ফোনটা এলো।
প্রিন্সের অবস্থাও তথৈবচ! রাগ করে মিষ্টিকে বলে এসেছে, আর ভাববে না ওর কথা, কিন্তু মুখের কথা মন কি শোনে? দিবানিশি ওর ধ্যানেই তো মগ্ন থাকে। রাত কাটে ছাদের তারা গুণে গুণে, দিনের বেলায় ঘরে গুম হয়ে পড়ে থাকে নইলে বাইক নিয়ে আকাশ, বাতাস, দিগন্ত ছুটে চলে! ভাইবেরাদররা তাদের প্রিয় ভাইয়ের এমন কাঙালিপনা দেখে অস্থির হয়ে যায়, ওদের বুদ্ধিতে আসে না কি এমন এক মেয়ে মিষ্টি, তার জন্য প্রিন্সের এমন হাভাতেপনা! সম্ভব- অসম্ভব নানা উপায় বাতলে দেয় ওরা - কখনো রঙিন বোতলের ইঙ্গিত করে কখনোবা অন্য নারীকে ওর কল্পনায় এনে দিতে চায়। কখনোবা মিষ্টিকেই এনে দেওয়ার উপায় করে দেয় - সে ধরে আনুক বা বেঁধে! সেইসব সদোপায়গুলো মাথায় নাড়াচাড়া করে প্রিন্স, নানাভাবে ভেবে দেখে কোনটাতে কেমন ফলাফল আসবে কিন্তু বলাবাহুল্য কোনোটাই প্রিন্সের মনে ধরে না, ও সেইরকমই উদাস ঘুরে বেড়ায়!
মিষ্টিকে বড়রকম একটা শিক্ষা দিতে ওর খুব ইচ্ছে করে, মনে হয় সামনে গিয়ে ঠাঁটিয়ে একটা চড় মেরে বেহুঁশ করে দিতে, কিন্তু ওর সামনে গেলেই তো ওর অদ্ভুত ব্যক্তিত্বের সামনে কেঁচো হয়ে যায় প্রিন্স, ঠুনকো পড়ে যায় সব আত্মাভিমান। কথা ভুলে যায়, আবোলতাবোল কাজ করে বসে। ওই স্নিগ্ধ মুখের পেছনে কতখানি কাঠিন্য আশ্রয় করে ভেবেই অবাক হয় ও। 'একটুখানি মেয়ে, তার কি কঠিন মন।' একে টলাবে কিভাবে ভেবেই সারা হয় ও!
এরকম হাজার রকম উপায় মাথায় নিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে ও মায়ের কাছে যায়। সাবিহা তখন দুপুরের খাবার খেয়ে ডিভানে আধাশোয়া হয়ে টিভির রিমোট হাতে নিয়ে বসেছে। চোখ টিভির দিকে কিন্তু আসলে পরামর্শসভা বসেছে। আশেপাশের নিম্নবিত্তের মানুষগুলোর শালিসিপ্রধানের দায়িত্ব যেমন সাবিহার তেমনি তাদের সাংসারিক ঝুট-ঝামেলায় নানারকম পরামর্শ দেওয়াও ওর সারাদিনের বড় একটা কাজ বটে! এইসব সুপরামর্শ মতান্তরে কুবুদ্ধি দিতে দিতেই বউ-ঝিদের দিয়ে ফুটফরমাশ খাটিয়ে নেয় সাবিহা ওদের দিয়ে তাও বিনা মজুরিতেই। প্রিন্স গিয়েই মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো। সব সন্তানের জন্যই মায়ের কোল বড় শান্তির আশ্রয়!
'কিরে তোর পোলার বউ বলে আবার চইলে গেছে? তোর পোলা কি মাইজ্ঞা নাকি বউ রাখতে জানে না!' যার উদ্দেশ্য বললো সে নেহায়েতই গ্রাম্য দরিদ্র মহিলা। ছেলের প্রতি কটুক্তি শুনে একেবারে হাউমাউ করে উঠলো ছেলের বউয়ের নানা বদনামে। পেটের কথা টান মেরে বের করে নিতে জুড়ি নেই সাবিহার। রূপোর পানের বাটা থেকে এক খিলি পান করে মুখে নিয়ে বেশ আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে রায় দিয়ে দিলো 'পোলারে আবার বিয়ে করায় দে। মাইয়া মানুষ এক সোজা মাইরে আর এক সোজা সতিনে! বরভাগ হইলে দেখবি একদম কাঠির মতো সোজা হয়ে গেছে, যেমনে চালাবি তখন তেমনি চলবে।'
দরিদ্র পরিবারে বহুবিবাহ আরেকটি ক্ষুধার্ত মুখ বাড়াবে বৈ নয়, তাই পরামর্শ নিতে আসা মহিলার এই বুদ্ধিটা হয়তো খুব একটা মনে ধরলো না কিন্তু প্রিন্সের মাথায় বুদ্ধিটা জোরে কিক করে গেলো। এতোদিনে মিষ্টিকে টাইট দেওয়ার একটা যুৎসই বুদ্ধি পাওয়া গেছে। হুম, বিয়েই করবে ও, দেখিয়ে দেবে মিষ্টিকে। প্রিন্সের পাশে অন্য কাউকে দেখে মিষ্টি কেমন জ্বলবে আর ছটফট করবে ভেবেই রোমাঞ্চিত হলো ও। এইভাবেই দেমাগির অহংকার চুর্ণ হবে! যেমন ইচ্ছে তেমন নাচানো ওকে, এবার বন্ধ হবে! এইটেই বেশ হবে! মোটাবুদ্ধির ভারে পরিণাম না ভেবেই দুম করে মাকে বলে বসলো 'পরের ছেলের বউয়ের এতো খবর নেও, নিজের ছেলেকে বিয়ে দিবা না?'
'ও, বাপ, সত্যি কথা বললা তুমি? বিয়ে করবা তুমি? আমি তো কতদিন ধরে বলতেছি, তুমিইতো রাজি হওনা। সত্যি করে বলো বাপ, মায়ের সাথে ইয়ার্কি করে না। মানিক আমার, বিয়ে করবা তুমি? মেয়ে দেখি আমি?' আহ্লাদে গদগদ হয়ে গেলো সাবিহা!
'হুম, বললামই তো। করবো বিয়ে। বিয়ে করাই লাগবে।' মায়ের আঁচলে ভালো করে মুখ ঢেকে নিলো প্রিন্স।
'বাপ, সত্যি করে বলো, পছন্দ আছে তোমার কোনো, নাকি আমি ঘটক লাগাবো।'
'না মা, আমি কাউরে পছন্দ করি না। কাউকে ভালোবাসি না। আমাকেও কেউ চায়না।' বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা কষ্টটাকে চাপা দিয়ে বললেও মায়ের কাছে তা সম্মতিসূচক বাক্যই মনে হলো।
সাজসাজ রব পড়ে গেলো বিশাল বাড়িটাতে। ঘটক লাগিয়ে সারাদেশে নাড়াচাড়া লাগিয়ে দিলো সাবিহা - ছেলের জন্য তার মনের মতো বউ চাই! মানি ঘরের গুনি মেয়ে চাই - রূপে সেরা বউ চাই!
এহেনও কাজে প্রিন্সের সাঙ্গপাঙ্গরা তব্দা খেয়ে গেলো কিন্তু ভাইর সব কাজেই তো তাদের সায় আছে পুরোপুরি! ভাই দিন বললে আকাশের তারাগুলোকেও তারা চোখে দেখবে না, আর সূর্যের প্রখর আলোর নীচে বসেও যদি প্রিন্স বলে এখন রাত তবে ওরাও মাথা নেড়ে আস্তে আস্তে বলবে 'এখন আসলেই রাত - হ্যাজাক বাতি জ্বালানোতেই এতো আলো।' তাই নির্বিঘ্নে মেয়ে দেখার কাজ চলতে লাগলো। জিনিয়ার কাছেও খবর পৌঁছে গেলো। প্রিন্সকে প্রশ্ন করলে ও অম্লানবদনে বলে দিলো 'মিষ্টি মরে গেছে।'
হাজার হাজার মেয়ে দেখে অবশেষে বাড়ির কাছেই রূপে,গুনে, টাকার ভারে সর্বেসর্বা মেয়ে পাওয়া গেলো। ডিঘটির জমিদারের উত্তরপুরুষ, তিনপ্রজন্ম চেয়ারম্যান, বেশ ধনী আর প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ে জাহানারা, ডাকনাম তুলি। ক্লাস নাইনে পড়ে, সুন্দরী হওয়াতে বিয়ে দেওয়ার জন্যই ব্যস্ত অভিভাবকেরা। নানারকম খোঁজখবর নিয়ে, নানাভাবে যাচাই-বাছাই করে শান্তি পেলো সাবিহা। বেশ মেয়ে - কোনো রটনা নেই তেমনি শান্তস্বভাবা। বেশ বউ হবে প্রিন্সের। প্রিন্সকে ছবিও দিলেন মেয়ের - হাজার হোক যে বিয়ে করবে তারও তো একটা মতামত আছে! প্রিন্স ভালোভাবে দেখলো ও না ছবিটা, হ্যাঁবোধক জবাব দিয়ে দিলো। ওর বিয়ে করাটা জরুরি, কাকে বিয়ে করছে সেটা জরুরি না। এবারে মিষ্টি বুঝবে, কত ভুল করেছে ও। ভিষণ আনন্দ হলো ওর। মনে মনে হাজারবার 'তুলি' নামটা আওড়ালো, কিন্তু তুলি কখন মিষ্টি হয়ে গেছে টের পেতে পেতেই টনক নড়লো ওর! মিষ্টি ছাড়া অন্য কোনো ললনা ওর কল্পনাতেও আসে না। আজ কতদিন মিষ্টিকে দেখে না ও, কানের কাছে মিষ্টির হাসির শব্দ বাজতে থাকলো! মিষ্টি হাসছে, ঘুরছে, বই পড়ছে সব যেন চোখের সামনে ঘটতে থাকলো, এমনকী ওর চুলের ঘ্রাণও স্পষ্ট পেলো যেনো, প্রিন্স!
শুভবোধটির উদয় হলো, কিন্তু খাদের কিনারায় এসে। প্রিন্সের মা যখন নতুন বৌকে আংটি পরাতে যাওয়ার জন্য একেবারে হাতিঘোড়াসমারোহে প্রস্তুত সেইদিন বিকেলে আর উপায় খুঁজে না পেয়ে পালালো প্রিন্স। সাবিহা হতবুদ্ধি হলো কিন্তু সামলে নিলো - বিয়ের আগে ছেলেমেয়ের মেলামেশা তাদের পরিবারে রেওয়াজ নেই ঘোষণা করে ছেলের মাই হবুবধুকে আংটি পরিয়ে বিয়ের দিনক্ষণ পাকা করে এলো!
রাতে প্রিন্স সিদ্ধান্ত নিলো মিষ্টির সাথে এবার একটা দফারফা করতেই হবে। দফারফা আবার কি, মিষ্টিকে শুনতেই হবে প্রিন্সের কথা, আর কোনো বগিচগি চলবে না। এবারে যা বলবে প্রিন্স তাই শুনতে হবে মিষ্টিকে। সেইসময়ে অপরিচিত নাম্বার ফোন আসে ওর মোবাইলে। মিষ্টি ফোন করতে পারে মনেপ্রাণে চাইলেও ভাবেনি কখনো সত্যিই ফোনটা মিষ্টি করেছে। একটু বাদে রিংব্যাক করলো প্রিন্স নাম্বারটাতে।
এবারে মিষ্টি ধরলো। প্রিন্সের গলা শুনেই অভিমানে কন্ঠরোধ হলো ওর। গলা দিয়ে শব্দ এলো না, কেঁদে ফেললো একদম শব্দ করে। 'প্রিন্সভাই আমি মরে যাচ্ছি! একেবারে মরে যাচ্ছি! প্লিজ একবার আসো।' বহুকষ্টে হেঁচকি তুলে তুলে বললো ও।
অনির্বচনীয় আনন্দে ভাসলো প্রিন্স। ফিসফিস করেই বললো 'তুই মরে যা, মিষ্টি।'
চলবে....

পূর্ণিমাতিথী#পর্ব: ১
কলেজ হোস্টেলের আর.পি সাহা আবাসিক ভবনের দোতলার একদম উত্তর-পশ্চিম কোনার ২১৮ নাম্বার রুমের সামনে আধভাঙ্গা জীর্ণশীর্ণ বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে মাদিহা। দৃষ্টি তার দশ থেকে বারো হাত দূরে রাস্তার ওপারে সাবালিয়া রোডের কোন এক একতলা বাসার ছাদে সীমাবদ্ধ। ধবধবে সাদা পোশাক পরে ছাদের উপর অস্থির ভঙ্গিমায় পায়চারি করে চলেছে একটি মেয়ে। যার মাটি ছুয়ে যাওয়া ঘন কালো রেশমি চুলের আড়ালে থাকা মুখমন্ডল গত এক ঘন্টায় একবারের জন্যও দৃশ্যমান হয়নি। মাথা নিচু করে শুধু পায়চারিই করে চলেছে মেয়েটি। আর এই পায়চারি করার দৃশ্য ই গভীর মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে মাদিহা। যেনো এ কোন মজার খেলা।
হঠাৎ ব্লু হোয়েল গেম মিউজিকের বিকট শব্দে ভয় পেয়ে চমকে উঠে মাদিহা। শব্দের উৎস খুজতে গিয়ে বুঝতে পারে এ তার নিজেরই ফোনের রিংটোন। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে 'SHAN' লেখা নামটি। এত রাতে শানের কল দেখে অবাক হয় মাদিহা। একটু না, অনেক বেশি। রিসিভ করবে কি করবে না ভাবতে ভাবতেই কল কাট হয়ে যায়। আবারো ঐ বাসার ছাদে দৃষ্টিপাত করে। কিন্তু মেয়েটি নেই। কোথাও নেই। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাবধানে ভোজভাজির মত কোথায় চলে গেলো মেয়েটি? মাদিহা আর মাথা ঘামায় না। রুমে এসে চুপচাপ ঘুমিয়ে পরে।
ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্রী মাদিহা। গ্রামের বাড়ি থেকে প্রতিদিন ক্লাস করতে অসুবিধা হবে বলে, কলেজের আবাসিকে থেকেই পড়াশোনা করে। রোজ, বিনা, রিতু, কনিকা, শিমু! এরা সবাই মাদিহার রুমমেট। ইন্টারের ছাত্রীদের আবাসস্থল আর.পি সাহা ভবনের দোতলার দুইশ আট নাম্বার কেবিন রুমে থাকে এই ছয়জন মেয়ে।
,
,
"যে মেয়ে রাত দুইটা তিনটা পর্যন্ত রুমের বাইরে একা বসে ফোনে কথা বলে, সে বলছে কাল রাতে রুমে শুয়ে থেকে বাইরে ভূত দেখেছে! আর এইটা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে! হোয়াট আ জোক ইয়ার!"
কথাগুলো বলে অট্টহাসিতে ফেটে পরে রিতু। রিতু সাথে তাল মিলিয়ে হাসতে শুরু করে কনিকা, শিমু। রোজ দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলে,
"তোরা বিশ্বাস কর, চাই না কর। আমার কিছু যায় আসে না। আমি দেখেছি বলেই বলেছি।"
রিতু বিদ্রুপের হাসি হাসে।
"তাই না! তা কোথায় দেখেছিস তুই এই ভূত?"
"বিনার পাশের জানালায়।"
এতক্ষন চুপচাপ বসে এদের সবার কথা বার্তা শুনছিলো বিনা। এখন রোজের কথায় বিচলিত হয় উঠলো,
"আমার জানালায় মানে?"
"হ্যাঁ তোর পাশের জানালায়। কাল রাতে তুই উপরের জানালা খুলে ঘুমিয়েছিলি। আর ওটা তোর পাশের উপরের জানালা দিয়েই তাকিয়েছিলো আমার দিকে।"
শিমু বাঁকা হেসে প্রশ্ন করে,
"তোর সাথে ডেট করতে এসেছিলো বুঝি? দেখতে কেমন রে? রবিন ভাইয়ের থেকেও সুন্দর?"
শিমুর কথায় রেগে যায় রোজ।
"এখানে আমি সিরিয়াস কিছু বলছি, আর তুই মজা নিচ্ছিস? কেন? এই হোস্টেলে যে এসব আছে তা কি কারো অজানা? যত্তসব আ*ল পুলাপান। যাহ সর এখান থেকে।"
রোজ এর ধমক খেয়ে রিতু, শিমু, কনিকা তিনজনেই মুখ ভেংচিয়ে চলে যায় নিজেদের বেডে। রোজের চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় মাদিহার। ফোন হাতে নিয়ে দেখে মাত্র সকাল সাতটা বাজে। রোজ এখনো চেচামেচি করে চলেছে। কিছু একটা ভূত নিয়ে কথা বলছে। শোয়া থেকে এবার উঠে বসে মাদিহা। এলমেলো চুলগুলো হাত খোপা করতে করতে রোজের বেডের পাশে এসে দাঁড়ায়।
"কিরে গোলাপী! আজ এত এত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই চেচামেচি শুরু করেছিস। রবিনের সাথে ঝগড়া হয়েছে?"
"আরে ধুর রাখ তোর রবিন। তোকেই দরকার আমার।"
"কেন কি হয়েছে?"
"বাজে কিছু দেখে ভয় পেয়েছি। এদের বলছি কিন্তু এরা বিশ্বাসই করছে না।"
"এক্সাক্ট কি দেখেছিস? আর কিভাবে?"
"গতকাল রাতে দুইটার দিকে বিনার উপরের জানালায় ছিলো। হঠাৎ চোখ পরতেই দেখি সারা মুখ থেতলে আছে। এক চোখ উপরানো। নিচের ঠোঁট টা নেই। উপরের টা টুকরো টুকরো করে কাটা। গালের একপাশে মাংস পচে গলে পরছে। দাঁত দেখে মনে হলো শয়তান টা বেঁচে থাকতে কোনদিন ব্রাশ করেনি। ইশ! কি বিচ্ছিরি ফেস! এখনো মনে হলেই গা গুলিয়ে উঠছে আমার। আয় বোস তুই। বাকি কথা বসে বলি।"
মাদিহার হাত ধরে বেডে নিজের পাশে বসতে বলে রোজ। মাদিহার সারা শরীর ঝাকুনি দিয়ে উঠে। ধীরে সুস্থে রোজের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়।
"উহু বসবো না। ঘুম কম্পলিট হয়নি। মাথা ঘোরাচ্ছে। আবার গিয়ে ঘুমাবো। ঘুম থেকে জেগে ঠান্ডা মাথায় সব শুনবো।"
আর এক মুহুর্তও দাঁড়ায় না মাদিহা। নিজের বেডে এসে কাথা মুরি দিয়ে শুয়ে পরে। মাদিহা জানে রোজ মিথ্যে বলছে না। রোজ সত্যিই কিছু দেখেছে। বাজে কিছু। মাথা ব্যাথা করছে। প্রচন্ড মাথা ব্যাথা। অসহনীয়! মনে হচ্ছে মাথার ভেতর সব ছিড়ে যাচ্ছে। বিড়বিড়িয়ে কিছু একটা পড়ে বাম কাধে ফু দেয়। ঘুমিয়ে নেওয়া দরকার। বালিশে মাথা রাখতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় মাদিহা।
____
দেড় বছর আগে।
বর্ষাকালে বন্যার পানিতে ভরপুর চৌহালি গ্রামের মাঠঘাট। গ্রামের হাইস্কুলের সামনের আর পিছনের দুই কাঁচা রাস্তা বাদে, মানুষজন যাতায়াতের রাস্তাঘাট সব ডুবে! ভরা বন্যায় সাপের উপদ্রব বেড়ে গেছে কয়েকগুন! দুই বছরের বাচ্চা থেকে ষাটোর্ধ প্রবীন, যেখানে যেভাবে যাকে পারছে তাকেই সাপে কাটছে। প্রতিদিন মসজিদের মাইকে কারো না কারো সাপে কাটার খবর শোনাটা একপ্রকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এ গ্রামের মানুষের। সময়মত চিকিৎসা নেওয়াতে কেউ অবশ্য মারা যাচ্ছেনা সাপের কামড়ে। কিন্তু এবারের বন্যা যেনো গ্রামের মানুষের জন্য কোফা হয়ে এসেছে! দূর্বিষহ করে তুলেছে মানুষের জীবন!
-----
"তা জমিদারের বেটি কি আজকে উঠবেন, নাকি আপনার খাবার দাবার সব বিছানায় নিয়ে সাজিয়ে দিবো? সাতটা তো বাজে। এমনি তো উঠে না উঠেই না! আজকেও মরার মত পরে পরে ঘুমাচ্ছে।"
সকাল সকাল মায়ের বাজখাই গলার কর্কশ কথায় ঘুমিয়ে থাকা আর চলেনা মাদিহার। কিন্তু বিছানা ছেড়েও উঠে না। কপাল কুঁচকে, চোখমুখ খিচ্চে বন্ধ করে, বালিশ একটা জড়িয়ে ধরে বিছানায় ই কাত হয়ে পরে থাকে। আশা মেয়েকে ডাকতে ডাকতে ঘরের ভিতর প্রবেশ করে।
"বোনের মৃত্যু সংবাদ শোনার পরেও মানুষ এত্ত আয়েশ করে কিভাবে ঘুমায় আল্লাহ্! এই তুই মানুষ না শয়তান রে! উঠ তাড়াতাড়ি!"
মশারির এক কোনা খুলে পায়ের মধ্যে ধাক্কা দিতেই, হকচকিয়ে উঠে মাদিহা। হাটু ভর করে উঠে বসে চোখ পিটপিট করে তাকায় মায়ের দিকে।
"মৌসুমি আপু মারা গেছে তো তুমি কান্নাকাটি বাদ দিয়ে আমার উপর অত্যাচার শুরু করেছো কেন?"
"আমি কি বলেছি মৌসুমি মারা গেছে?'
"তুমিই না বললে বোন মারা গেছে!"
"বোন বলেছি আর মৌসুমি ভেবে নিয়েছিস!"
"তো? আর কি ভাববো? আছেই তো খালি ঐ এক বড় চাচাতো বোন মৌসুমি! তাছাড়া আমার আর বোন কোথায় পাও তুমি? নাকি লুকিয়ে রেখেছিলে মেয়ে দুই একটা!"
মেয়ের কথা শুনে আশা রেগে কটমট করে উত্তর দেয়,
"তোর আফজাল চাচার মেয়ে দিশা মারা গেছে।"
"দিশা আপু মারা গেছে মানে?"
"আজানের পরেই তো জানিয়ে দিয়েছে মাইকে। তুই শুনিস নি?"
"না তো! আমি তো আজানের সময় জেগেই ছিলাম! কিভাবে মারা গেছে?"
"গতকাল সন্ধায় নাকি সাপে কেটেছিলো। ভোরের দিকে মারা গেছে।"
"মানে কি! এখনকার দিনেও সাপের কামড়ে মারা যায় মানুষ? হস্পিটালে নিয়ে যায়নি?"
"নিয়েছিলো। তবে মধুপুর না নিয়ে ঢাকা নিয়েছিলো। বাকিটা ওবাড়িতে গেলেই বিস্তারিত জানতে পারবো। রান্না শেষ আমার। এখন দিশার মায়ের কাছে যাচ্ছি। সাড়ে সাতটা বাজে প্রায়। তুই ফ্রেশ হয়ে, খেয়ে স্কুলে চলে যাস।"
"আমিও তোমার সাথে আপুকে দেখতে যাবো আম্মু।"
"তোর না আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত প্রাইভেট? তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে স্কুলে যা। স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখতে যাস।"
"এতক্ষন কি রাখবে লাশ?"
"শিক্ষাবোর্ড থেকে লোকজন আসবে শুনেছি মৃত্যুর ব্যাপারে এনকোয়্যারি করতে। সবকাজ শেষ করে জানাজা হবে সন্ধার দিকে। দেখতে পারবি।"
কথাগুলো শেষ করে আর মাদিহার উত্তরের অপেক্ষা করেনা আশা। আশা চলে যেতেই বিছানা গুছিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায় মাদিহা। ব্রেকফাস্ট করে, রেডি হয়ে আটটা বাজে চলে যায় স্কুলে। দিশা মাদিহার দূরসম্পর্কের চাচাতো বোন। মেয়েটা অবিবাহিত। এইবার বিসিএস দিয়েছিলো। বিকেলে স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরে, সোজা আশার কাছে রান্নাঘরে চলে যায় মাদিহা। একটা মোড়া টেনে বসে জিজ্ঞেস করে,
"আপুর লাশ নিয়ে মধুপুর থেকে ফিরে এসেছে?"
"নাহ্! এখনো বাড়িতে পৌছায়নি। সন্ধা হয়ে যাবে আসতে আসতে।"
"তাহলে কি তুমি আবার যাবে ও বাড়িতে?"
"হ্যাঁ যাবোই তো। মেয়েটাকে শেষবারের মত চোখের দেখা দেখবো না?"
"আমিও যাবো তোমার সাথে"
"আচ্ছা যাস। এখন গোসল করে নামাজ পড়ে নে।"
গোসল আর নামাজের কথা শুনেই চোরের মত মাথা নিচু করে মায়ের সামনে থেকে পালিয়ে যায় মাদিহা। ঘরে ঢুকে স্কুল উনিফর্ম চেঞ্জ না করেই ঘুমিয়ে পরে। সন্ধাবেলায় আশার বকাবকিতে ঘুম থেকে উঠে গোসল সেড়ে মাগরিবের নামাজ পড়ে নেয়। তারপর মাথার উড়না গলায় পেচিয়ে, কোমড় পর্যন্ত লম্বাচুলগুলো খুলে দিয়ে, আশা, বড় চাচী, আর চাচাতো বোন মৌসুমি কে সাথে নিয়ে, বেড়িয়ে পরে আফজালের বাড়ির উদ্দেশ্যে। ঘরের বাইরের এসেই আশা মেয়েকে বলে,
"ভরসন্ধায় এভাবে খোলাচুলে ঘরের বাইরে বেরোতে নেই। চুলগুলো খোপা করে মাথায় কাপড় দে।"
কিন্তু কে শোনে কার কথা?
আফজালের বাড়িতে পৌছে, মৌসুমির বামহাত নিজের দুইহাতে ঝাপটে ধরে দিশার লাশ রাখা খাটিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায় মাদিহা। লাশের মুখে থেকে কাফনের কাপর সরাতেই চোখে পরে দিশার রক্তশুণ্য ফ্যাকাশে নীলবর্ণ ধারণ করা গায়ের চামরা। নাক-মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসা কুঁচকুঁচে কালো তরলের সাথে বিজল জাতীয় কিছু! বন্ধ চোখের কোনা বেয়ে গড়িয়ে পরা পানি। এসব দেখে গা গুলিয়ে উঠে মাদিহার। মাথা ভো চক্কর দিয়ে উঠে। মৌসুমি কোনরকমে বোনকে সামলে নেয় পরে যাওয়া থেকে। নিজ হাতে মাদিহার চুল বেঁধে দিয়ে মাথায় কাপড় তুলে দেয়। আশাকে ডেকে সাথে সাথেই মাদিহা কে নিয়ে ফিরে আসে বাড়িতে। ফেরার পথে সারা রাস্তা আর টু শব্দটিও করেনা মাদিহা।
এশার নামাজের পর দিশার জানাজা পড়ে, দাফন-কাফনের কাজ শেষ করে রাত দশটায় বাড়ি ফিরে আশার স্বামী, শাফি। আশা, ছেলে পার্থ, আশার ভাই জাহিদ, জাহিদের বউ জেরিন কে বাড়ির সামনের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে থাকতে দেখে, কারেন্ট না থাকায় এই গরমে আর ঘরে না ঢুকে সবার সাথে বসে পরে শাফি।
"হাত-পা ভর্তি কাঁদামাটি নিয়ে এভাবে বাড়ির সামনে বসে পড়লে কেন? ফ্রেশ হয়ে ঘরে আসো।"
"কারেন্ট নেই কিছু নেই। গরমে ঘরের ভেতর টেকা যাবে? তার থেকে এখানেই ঠান্ডা বাতাসে কিছুক্ষন বসি! তোমরা খেয়েছো কি রাতে?"
"আমরা সবাই তো এক ঘন্টা আগেই মোম জ্বালিয়ে খেয়ে নিয়ছি। কিন্তু মাদিহা খায়নি। বললো কারেন্ট আসলে খাবে।"
"আচ্ছা! তুমি এক কাজ করো। ফ্রিজ থেকে এক বোতল ঠান্ডা পানি নিয়ে আসো তো। গরমে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে একদম।"
"আচ্ছা বসো, আনছি।"
আশা ঠান্ডা পানি নেওয়ার জন্য ঘরে ঢুকতেই কারেন্ট চলে আসে। এক ঘন্টা হতে চললো মাদিহার কোন সারা শব্দ পায়নি আশা। মাথা ব্যাথার জন্য রাতে না খেয়েই শুয়ে পড়েছিলো। ঘুমিয়ে পরেছে কিনা কে জানে! কারেন্ট আসাতে তাই আগে মেয়ের খোজ নিতে চলে যায়। মাদিহার রুমের লাইট অফ ছিলো। লাইট অন করে দেখতে পায়, মাদিহা বামপাশ ফিরে ঘুমিয়ে আছে। আশা মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে অস্ফুটস্বরে ডেকে উঠে,
"নূর! বাবা! তুই ঘুমিয়ে গেছিস?"
"___মাদিহা প্রতিক্রিয়াহীন!"
"না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়িস না! কারেন্ট এসেছে। উঠ বাবা! খাবার খেয়ে, ব্যাথার ঔষুধ খেয়ে তারপর ঘুমা!"
মাদিহার ঘুম খুবই পাতলা। হাল্কা আওয়াজেই ভেঙ্গে যায়। সেখানে এতগুলো কথা বলার পরেও মাদিহার কোন সারা শব্দ না পেয়ে কঁপাল কুঁচকে যায় আশার।
"কি হলো! এতবার ডাকছি তাও... "
এতটুকু বলে ডানহাতের বাহুতে ধরে কয়েকবার ঝাকিয়ে নিজের দিকে ফেরাতেই, হাতটা বিছানা থেকে ফ্লোরের দিকে ঝুলে পরে মাদিহার। মেয়ের হালকা হা হয়ে থাকা মুখ আর অসার দেহ দেখে দেখে বুকটা ধক করে উঠে আশার। পাগলের মত বারান্দায় ছুটে গিয়ে হাক ছাড়ে ছোট ভাই জাহিদের নামে। বোনের ডাক শুনে বাড়ির সামনে থেকে ঘরের ভিতর চলে আসে জাহিদ। যেহেতু বন্যার জন্য গ্রামে এখন সাপের উপদ্রব খুবই বেশি, তাই ভাগ্নীর হাত-পা, ঘাড় ভালো করে চেক করে জাহিদ। আশাকে বলে সাড়া শরীর চেক করে দেখতে। আশা জাহিদকে বলে তোর দুলাভাই কে ডাক। জাহিদ গিয়ে শাফি কে বলে মাদিহার কথা। শাফি তখন গোসলখানায় ঢুকে কোনরকমে ফ্রেশ হয়ে মেয়ের পাশে এসে বসে। আর এসেই আগে মেয়ের নাকে হাত দিয়ে চেক করে শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে কিনা ঠিকমত। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে, ঠোট ফাঁক করে দেখে দাঁতগুলো শক্ত হয়ে লেগে আছে।
"নূর তো অজ্ঞান হয়ে গেছে।"
"কিহ! অজ্ঞান মানে!"
"হ্যাঁ অজ্ঞান। দাঁতে দাঁত লেগে শক্ত হয়ে আছে। শ্বাসটাও চলছে না। তাড়াতাড়ি একগ্লাস পানি আনো।"
পুরো এক গ্লাস পানি মেরেও মেয়ের জ্ঞান ফেরাতে অক্ষম হয় শাফি। কিছু একটা ভেবে মেয়ের কামিজ সরিয়ে পেটের উপরের অংশ উন্মুক্ত করে, সালোয়ার নাভি থেকে কিছুটা নিচে নামিয়ে চেক করে দেখে যা ভেবেছিলো তাই। রাগান্বিত চোখে রুনার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠে শাফি!
"সত্যি করে বলো আশা, মেয়েকে কি সন্ধার পর দিশার লাশ দেখতে নিয়ে গেছিলে তুমি?"
ভয়ার্ত চোখে শাফির দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই ধমকে উঠে শাফি!
"কোন আক্কেলে আজ সন্ধার পর মেয়েকে নিয়ে বাইরে বেড়িয়েছো তুমি? তাও এক সাপে কাটা রুগীর লাশ দেখতে? তুমি জানোন আজ পূর্ণিমাতিথীর রাত? "
শাফির প্রশ্নে টনক নড়ে আশার। ডুকরে কেঁদে উঠে। তার মাথাতেই ছিলো না আজ পূর্ণিম! মেয়ের প্রতি তার সতর্ক থাকা উচিৎ ছিলো তার। আজ রাতে কিছু হয়ে গেলে,,,
চলবে...

গল্প: সমস্যার সমাধান
চিরকুট হাতে নিয়ে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো মাহজাবীন। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। আশপাশে তাকিয়ে কোন ডাস্টবিনও খুঁজে পেল না যে চিরকুটটা ডাস্টবিনে ফেলে দিবে। অপরদিকে চিরকুট বুঝিয়ে দিয়েই হতচ্ছাড়াটা পালিয়েছে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে চিরকুট খোলে মাহজাবীন। সেটাতে লেখা-
“বন্ধু তুমি একা হলে
আমায় কইরো সরণ,
কথা বলবো দিবানিশি
যদি না হয় মরন!”
রাগে পুরো শরীর জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে মাহজাবীনের। কী রুচি, আর কী ছড়া! তার উপর দুটো বানান ভুল। সরণ আর মরণ বানান দুটি স্মরণ ও মরণ হবে। মাহজাবীন বেশ শব্দ করেই বলে উঠলো- ‘শালা অশিক্ষিত ফাজিল কোথাকার। দিবানিশি কথা বলার সখ তো, সামনে আবার পাইলে থাপ্রায়া তোর সখ মিটায় দেবো!’ যেই ছেলেটা চিরকুট দিয়েছে তার নাম জলিল। এলাকার টপ লেভেলের ভবঘুরে। বেশ কিছুদিন হলো মাহজাবীনের পিছু লেগেছে। মেয়েটা ওকে পাত্তা না দিলেও ছেলেটা একদম নাছোড়বান্দা। একেবারে হাত ধুয়ে পেছনে লেগেছে।
মাহজাবীন এইচএসসি পাশ। অথচ জলিল টেনেটুনে এইট পাশ করেছে। অবশ্য সেটা নিয়েও অনেক কানাঘুষা আছে। সবার ধারণা, জলিল পাশ করেনি। অলমোস্ট অশিক্ষিত হওয়া সত্বেও জিমটিম করে মোটামুটি বডি বানিয়েছে ছেলেটা। তার উপর আজব কিসিমের ড্রেস পরার অভ্যাস এবং ফেসবুকে উল্টাপাল্টা স্ট্যাটাস দেবার জন্য বহু মানুষের কাছে সে বেশ পরিচিত মুখ।
.
মাহজাবীনের হয়েছে এক জ্বালা। হতচ্ছাড়া জলিল তাকে এখন বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে উইশ করে। দুনিয়াতে যে এতো এতো দিবস আছে তা আগে সে জানতোই না। এইতো সেদিন, জলিল লাফাতে লাফাতে মিনি সাইজের একটা টেডি বিয়ার পুতুল নিয়ে হাজির।
‘মাজাবীন, শোনো।’
‘আমার নাম মাহজাবীন।’
‘ওইতো, শোনো। আজকে ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ। টেডি ডে।’
‘তো?’
‘এই নাও টেডি। তোমার মতোই কিউট।’
‘যা ভাগ।’
সেদিনকার মতো মুখ ফিরিয়ে চলে আসে মাহজাবীন। তার পরের দিন আবার জলিল লাফাতে লাফাতে এসে হাজির। হাতে একটা ফুল আর কার্ড।
‘মাজাবীন, শোনো।’
‘আবার কেন এসেছিস?’
‘আজকে ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ। প্রমিজ ডে।’
‘তো?’
‘প্রমিজ করো তুমি আমার হবে।’
‘যা ভাগ।’
মাহজাবীন চূড়ান্ত পর্যায়ে বিরক্ত। খুব মুশকিল হয়েছে। এই হতচ্ছাড়াকে কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না। তার একদিন পরে আবার জলিল লাফাতে লাফাতে এসে হাজির। মাল্টিকালার এক আলখেল্লা টাইপের কী যেন পড়ে এসেছে। দেখতে সঙ এর মতো লাগছে।
‘মাজাবীন, শোনো।’
‘আবার কী হলো রে ভাই?’
‘আজকে তো ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখ। হাগ ডে।’
‘তো?’
‘চলো হাগি আমরা!’
‘তবে রে হারামজাদা...!’
জলিলকে ছোটখাটো একটা দাবড়ানি দেয় মাহজাবীন। হাতের নাগালে পেলে মেরে একদম হাগিয়ে ছাড়তো। এই টর্চার আর নিতে পারছে না মাহজাবীন। সিদ্ধান্ত নেয়, এর একটা বিহিত করতেই হবে। এদিকে জলিল খুশিতে আটখানা। এতদিন ধরে সে মাহজাবীনের পিছু পিছু চলেছে। আজ প্রথমবার মাহজাবীন নিজে জলিলের পিছু নিয়েছিল। যদিও বিষয়টা ঠিক পিছু নয়, দাবড়ানি ছিল। তবুও মন্দ কী, ইমপ্রুভ তো হয়েছে। জলিল আরও কয়েকটা দিবস লিস্টে যোগ করে। মে দিবসে সে মাহজাবীনকে বলবে- ‘তুমিই আমার জীবনে একমাত্র মেয়ে।’ মা দিবসে বলবে- ‘আমার সন্তানের মা হবে?’ বাবা দিবসে বলবে- ‘আমি তোমার সন্তানের বাবা হতে চাই।’ এসব ভেবে জলিল খুশিতে বাকবাকুম। আনন্দে হাসে কাঁদে, শুয়োরের মতো নাক দিয়ে ঘোৎ ঘোৎ শব্দ করে।
.
এর মাঝেই এক কান্ড ঘটে যায়। মাহজাবীনের ফেসবুক প্রোফাইলে যত ছবি আছে, সেগুলোতে গণহারে লাইক-কমেন্ট করতে থাকে জলিল। সবগুলোতেই লাভ রিঅ্যাক্ট, কমেন্টের ধরণও এক। কমেন্টের বিষয়বস্তু- মাহজাবীনের পোশাক। এই যেমন প্রোফাইল পিকচারে দেখা যাচ্ছে মাহজাবীনের পরনে নীল শাড়ি। জলিল কমেন্ট করেছে- ‘তোমাকে নীল শাড়িতে পরীর ছাঁও লাগতেছে। কিন্তু পরী গো, তোমার ওড়না কই? হিজাব কই? এখন থেকে বোরখা পড়বে। নিজেকে ঢেকে রাখবে, ওকে।’ কমেন্ট পড়ে মাহজাবীন রাগে প্রায় স্ট্রোক করে এমন অবস্থা। আরে ব্যাটা, শাড়ির সাথে ওড়না পড়ে কে? আর আমি যাই পড়ি না কেন, তাতে তোর কী? এসব বলার তুই কে? হাজারটা প্রশ্ন মাহজাবীনের। অথচ কী অদ্ভুত! জলিলের কমেন্টে প্রায় অর্ধশত হাহা রিঅ্যাক্ট। কিন্তু কেউ এই কথার বিরোধিতা করছে না। পাল্টা জবাব দিচ্ছে না। মাহজাবীন প্রায় সবগুলো কমেন্টের উচিত জবাব দিল। তারপর ব্লক দিলো জলিলের ফেসবুক একাউন্ট।
.
জলিলের বিষয়টা দিনদিন জটিল হওয়াতে মাহজাবীন বাসায় বাবা-মাকে সব খুলে বললো। ভেবেছিল বাবা-মা বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নেবে। কোন একটা সমাধানে পৌঁছাবে। কিন্তু হলো উল্টো। বাসায় সব বলতেই হাউকাউ লেগে গেল। চিল্লিয়ে সবাই বাড়ি মাথায় তুললো। মা বললেন- ‘ওরে কী হলো রে, আমার মেয়ের তো সর্বনাশ হয়ে গেল।’ এরপর বাবা বললেন- ‘এখন আমি কী করি, ওরে এখন আমি কী করি?’ মাহজাবীন মাথা চুলকায়। এসব হচ্ছেটা কী? ওর আবার কী সর্বনাশ হলো, মা এসব কী বলছে, বাবাই বা বুক চাপড়াচ্ছেন কেন?
সমাধান দূরে থাক, উল্টো নতুন সমস্যা ঘাড়ে এসে পড়েছে। মাহজাবীনের বাবা-মা চান যত দ্রুত সম্ভব মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে। নাহলে সামনে কখন কী ঘটে যায় বলা মুশকিল। ইতোমধ্যে মাহজাবীনের বাবা-মা সকল আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশিদের বলেছে তাদের মেয়ের জন্য ছেলে দেখতে। মাহজাবীন কী বলবে ভেবে পায় না। নিজের পায়ে সে নিজেই কুড়াল মেরেছে। এদিকে এক প্রতিবেশি এসেছে বাসায়। বাবা তার সাথে তুমুল আলোচনায় লিপ্ত।
‘ভাইজান আপনেই দেখেন, কী একটা অবস্থা। মেয়েকে নিয়ে আমি যে ভীষণ অসহায়।’
‘শোনেন ভাই, মিষ্টি খোলা অবস্থায় রাখলে মাছি তো বসবেই।’
‘কী কন? তাইলে এখন কী উপায়?’
‘মিষ্টি ঢেকে রাখলেও সুবিধা হবে না। বেচে দেন।’
‘অ্যাহ! কিন্তু বাসায় তো মিষ্টি নেই।’
‘আরে ব্যাটা আপনের মেয়ের কথা কই। রূপক অর্থে বুঝাইলাম।’
‘তার মানে নিজের মেয়েকে বেচে দেবো?’
‘এ কয় কী রে! বললামই তো রূপক অর্থে বুঝাইছি। মেয়েকে বেচবেন কিভাবে! বুঝাইলাম বিয়ে দিয়ে দেন।’
‘ও আচ্ছা। তাইলে ঠিক আছে। বিয়ে দিয়ে দেবো ইনশাআল্লাহ।’
প্রতিবেশি ও বাবার আলাপ পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শোনে মাহজাবীন। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক থেকে। পরিবার থেকে কোন সাপোর্ট যে পাবে না তা নিশ্চিত হয়ে যায়।
.
পরিবারের আশা ছেড়ে মাহজাবীন নিজেই কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কোথাকার এক হতচ্ছাড়ার জন্য ওর জীবন এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে তা সে মেনে নেবে না। তাই কোন আওয়াজ না করে সোজা থানায় চলে যায় মাহজাবীন। গিয়ে নিজের সমস্যার কথা খুলে বলে। কিন্তু আফসোস! ওর সমস্যাটা এখনো সেভাবে ভাইরাল হয়নি বিধায় পুলিশরা তেমন একটা পাত্তা দিল না। বললো- ‘এসব বিষয় পারিবারিকভাবে মিটিয়ে ফেলেন। গ্যাঞ্জামে যাওয়ার দরকার নেই।’
কিছুটা হতাশ হয় মাহজাবীন। কিন্তু ভেঙে পড়ে না। বরং সাহস নিয়ে ছুটে যায় নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন কতক এনজিও আর সংগঠনে। দুঃখের বিষয়, এখানেও মাহজাবীন কোনপ্রকার পাত্তা পায় না। এখানকার লোকেরা মাহজাবীনের সমস্যাকে ঠিক সমস্যাই মনে করছে না। এসব এনজিও আর সংগঠন নাকি সমাজের বড় বড় সমস্যা নিয়ে কাজ করে। এখনও বেশ কিছু আলোচনায় থাকা কেস নিয়ে কাজ করছে। মানববন্ধন, আলোচনা সভা, প্রেস এন্ড মিডিয়া কাভারেজ নানাবিধ বিষয় নিয়ে তারা এতটাই ব্যতিব্যস্ত যে মাহজাবীনকে দেখার বা ওর কথা শোনার কেউ নেই।
মাহজাবীন এবার চূড়ান্ত পর্যায়ে হতাশ হয়। চোখ ফেটে কান্না চলে আসে। তবে নিজেকে ঠিকই সামলে নেয়। এখন কাঁদা যাবে না। কাঁদলে মাথাব্যথা করবে। আর মাথাব্যথা করলে ঘুমের দরকার পড়বে। কিন্তু এখন ঘুমানো যাবে না। জেগে থাকতে হবে। মাথা ঠান্ডা রেখে সমাধান খুঁজতে হবে। সে বাসার পথ ধরে। বাসায় ঢোকার আগে এক মুদি দোকান থেকে হাফ কেজি মুড়ি কিনে নেয়।
.
বাসায় ফিরে মাহজাবীন প্রথমেই যে কাজটি করলো তা হলো পেঁয়াজ-মরিচ কেটে লবণ সর্ষে তেল দিয়ে ভালো করে মুড়ি মাখিয়ে নিল। এরপর সেটা খেতে খেতে চললো গভীর চিন্তা-ভাবনা। মুড়িটা ভীষণ টেস্টি হয়েছে। তাই সমাধান পেতে দেরি হলো না।
মাহজাবীন হাতে মোবাইল তুলে নিল। ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখলো। নিজের সমস্যা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা তুলে ধরলো। ওর পোস্টটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে সময় নিল না। দারুণ সাড়া পেল। পোস্টটি দেবার ২৪ ঘণ্টার ভেতর ফলাফল পাওয়া গেছে। সারাদেশের বহু সংখ্যক মানুষ মাহজাবীনের হয়ে কথা বলছে। বিভিন্ন সংগঠন, এনজিও ছুটে এসেছে। পুলিশ পর্যন্ত এসেছে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশিদের অনেকেই যোগাযোগ করছে। মাহজাবীনের বাবাকে বোঝানো হলো- বিয়ে কোন সমাধান না। আপনার মেয়ের তো কোন দোষ নেই। তাকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে দিন। সবাই আপনাদের পাশে আছে। মাহজাবীনের বাবা আশ্বস্ত হন। মেয়েকে পরম মমতায় বুকে টেনে নেন। আর জলিল? লাস্ট আপডেট হলো- তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জলিল এখন পলাতক।
.
বিবশ_রজনী#পর্ব_চার
.....
রাতের খাবার খেয়ে নিজাম সাহেব ল্যাবে বসে প্রজেক্টরে ঈশানের ভিডিও দেখছেন, পাশে রয়েছে কাগজ কলম। ঈশানের ঠোঁটের ভাষা তিনি কাগজে লিপিবদ্ধ করছেন। ঈশান ঘর থেকে বের হয়ে প্রথম যেই কথাটি বলল তা হচ্ছে, "ঘর থেকে বের হলাম, যাচ্ছি ছাদে।"
ছাদে গিয়ে ঈশান বলল, "কষ্ট হয় বুঝলে, খুব কষ্ট হয়।"
নিজাম সাহেবের মনে হলো, ঈশান কথাগুলো কাউকে উদ্দেশ্য করে বলছে, অপর পাশ থেকে সে কি কোন প্রতিউত্তর পাচ্ছে? যদি পেয়ে থাকে তবে সেসব তার অবচেতন মন তাকে দিচ্ছে নাকি অন্যকেউ? তিনি পুনরায় ভিডিওতে মনযোগী হলেন।
ঈশান ছাদের রেলিংয়ের উপরে গিয়ে দাঁড়ালো। একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, "আমি এখন কি করছি জানো?"
নিজাম সাহেবের মনে হচ্ছে অপর পাশ থেকে কেউ জিজ্ঞাসা করলো, "কি করছো?" কারণ ঈশান কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে থেমে বলল, "ছাদের রেলিংয়ের উপর দিয়ে হাঁটছি, পরে গেলে মরে যাব। সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।"
ঈশান বেশকিছুক্ষণ কোন কথা বলল না। মিনিট দশেক পর ঈশান আবারও বলল, "দেখো আমাদের সম্পর্কটা দিনকে দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে। আমার দোষটা কোথায় বলো তো? আমার জীবনে তুমি নিজে থেকে এসেছিলে, যেই তোমাকে নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি, একটাদিন ডিপার্টমেন্টের সহপাঠী হিসেবেও যাকে আমি জিজ্ঞাসা করবার প্রয়োজন বোধ করিনি কেমন আছো সেই তুমি একদিন আমাকে বললে, তুমি আমার সাথে মিশতে চাও। আমি তোমায় সময় দিতে পারবো কি না। তোমার এই সরলতা আমার এতোটাই ভাল লেগেছিল যে আমি তোমার সাথে না মিশে থাকতে পারিনি। তোমাকে সময় দিতে দিতে, এখানে-সেখানে ঘুরতে ঘুরতে বন্ধুদের সাথে আমার সম্পর্কের পাঠ ঘুচিয়ে গেল। ধীরে ধীরে একদিন বুঝলাম তুমি আমারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছো। তোমাকে ছাড়া ভালো লাগে না, তুমি নিশ্চয়ই আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারতে। আমি মাঝে মাঝেই ভীষণ অবাক হই, যেই তোমাকে আমি কখনো জিজ্ঞাসা করার কথা ভাবিনি কেমন আছো, সেই তোমারই সাথে আমার ভালোবাসার সম্পর্ক হয়ে গেল।"
ঈশান আবারও থামলো, নিজাম সাহেব একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবলেন, ঈশানের কি কোন প্রেমিকা ছিল? যদি থেকে থাকে তবে সে কোথায়? তার সাথে কি ঈশানের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে? অথবা মেয়েটার কি বিয়ে হয়ে গেছে?
ঈশান আবারও বলতে শুরু করলো, "আমাদের সম্পর্কের কোন পরিনতি ছিল না আমি জানি, তুমিও জানতে, ওসব মেনেই তো ভালোবেসেছিলাম। চারটা বছর কত রাগ-অভিমানের পরেও আমরা এক থেকেছি। চিরদিন তেমনই থাকবার কথা ছিল, বিশ্বাস করো আমি তোমাকে কখনোই আপন করে পেতে চাইনি, চেয়েছিলাম কেবল একটুখানি পাশে পেতে, বন্ধুর মতো, ছায়ার মতো।"
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "অথচ একদিন তোমার পুরো আদল বদলে গেল, কেমন অচেনা হয়ে গেলে তুমি। যেই আমাকে ছাড়া তোমার একটাদিন পূর্ণতা পেত না তুমি বলতে, সেই তুমি আমার একটা খোঁজ নেবার প্রয়োজন ভুলে গেলে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে যায় একটাবার তুমি আমার খোঁজ নিতে না। জানো তো এই কষ্ট সইবার মতো সাধ্য পৃথিবীর কোনো পুরুষ মানুষের নেই। প্রতিটা মুহূর্তে তোমাকে আমার মনে পড়ে, স্মৃতিগুলো বার বার চোখের সামনে এসে জানান দেয়, তুমি আর আগের মতো নেই। আমি তোমাকে বারংবার বলেছি, তোমার কাছে তেমন কিছু তো আমি চাইনি, শুধুমাত্র একটুখানি পাশে পেতে চেয়েছি, রোজ দিন পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে যার কাছে আশ্রয় নেওয়া যায় সেই মানুষটি তুমি আমার ছিলে। আমি জানি না, তুমি হঠাৎ কেন আমায় অবহেলা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শুরু করলে। হয়তো তুমি ভেবেছিলে তোমার সুখের কথা, সংসারের কথা, তাই তো আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য অবহেলা করে বার বার দূরে সরিয়ে দিতে শুরু করেছিলে। তোমার জীবনে একজন এলো, হয়তো তারই জন্যে আমার স্থান হারালো, কিন্তু এমনটা কথা ছিল না, কথা ছিল চিরটাদিন বন্ধুর মতো পাশে থাকার। তাকে নিয়ে তুমি সুখী হবে সেটা আমি ভীষণ চাইতাম কিন্তু হঠাৎই তুমি হারালে। আমাকে উপেক্ষা করতে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে, ভীষণ কষ্ট হতো, তোমার মুখখানা, তোমার গলার স্বর শুনলেই একমুহূর্তে আমি সব ভুলে যেতাম। আজ আর তোমার গলার স্বর শোনার উপায় নেই, তোমার মুখখানা একটাবার দেখতে পারি না, কোথায় হারালে তুমি?"
ঈশান রেলিং থেকে নেমে দাঁড়ালো, কান্নারত অবস্থায় চোখের পাতা বন্ধ করলে মানুষকে যেমন দেখায় ঈশানকে ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে। নিজাম সাহেব আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আহা জীবন, মানুষ এত গভীরভাবে মানুষকে কেন ভালোবাসে? মানুষগুলো এত গভীর ভালোবাসাকে উপেক্ষা করে কি করে?"
নিজাম সাহেব ল্যাব থেকে বের হয়ে বেলকনিতে গিয়ে বসলেন। তাঁর মনটা খারাপ হয়ে গেছে। তিনি ঈশানের এই ভয়ংকর অবস্থা মেনে নিতে পারছেন না। ছেলেটা কি গভীরভাবেই না ভালোবেসেছিল, যেই ভালোবাসায় কোন চাওয়া-পাওয়া নেই সেই ভালোবাসাকে উপেক্ষা করা কি উচিৎ? অবশ্যই উচিৎ নয়। পৃথিবী থেকে ভালোবাসার সম্পর্কগুলো হারিয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। আজকাল একের পর এক ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ানো, একের পর এক বিচ্ছেদ হয়ে গেছে রীতি, অহরহ ছড়িয়ে যাচ্ছে শারীরিক সম্পর্কের চাহিদা, ওতে ভালোবাসা কোথায়? সবই যে শরীরের লোভ!
বেশকিছুক্ষণ নিজাম সাহেব চুপচাপ বসে রইলেন। এই পৃথিবীর সবকিছুই তিনি মেনে নিতে পারেন কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসাকে উপেক্ষা করার বিষয় তিনি মেনে নিতে পারেন না। একজন ভালোবাসার মানুষ জীবনে অত্যন্ত প্রয়োজন, সে হতে পারে বন্ধু অথবা অন্যকেউ, যার কাছে মানুষ নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করতে পারে, যাকে মনের সব কথাগুলো বলে ফেলা যায় কোন সংশয় ছাড়াই।
নিজাম সাহেব বেলকনি থেকে উঠে এক কাপ চা বানিয়ে পুনরায় বেলকনিতে এসে বসলেন। ঈশানের বয়ান থেকে তিনি বেশকিছু বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত, ঈশানের সাথে কারও ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল, শুধু ভালোবাসা না, অতি গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক। মেয়েটা ঈশানের খুব কাছের বন্ধু ছিল, একটা সময় তারা একে অপরকে ভালোবাসতে শুরু করে, তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, বিভিন্ন স্থানে তারা ঘুরে বেড়িয়েছে। তার সাথে মিশতে মিশতে বন্ধুদের সাথে ঈশানের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। একটা সময় মেয়েটা ঈশানকে উপেক্ষা করতে শুরু করেছে, ঈশান সর্বদা চেষ্টা করে গেছে সম্পর্ক ঠিক রাখবার কিন্তু মেয়েটার কাছ থেকে সে দিনের পর দিন অবহেলিত-উপেক্ষিত হয়েছে। একটা সময় হয়তো তার সাথে ঈশানের যোগাযোগ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ঈশান হয়ে গেছে একদম একা। কিছু ব্যাপারে নিজাম সাহেব অনিশ্চিত, ঈশানের কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটাকে ঈশান জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চায়নি। কিন্তু একজন মানুষকে এত গভীরভাবে ভালোবাসবার পরেও জীবনসঙ্গী হিসেবে পাবার কামনা-বাসনা থাকবে না কেন? ঈশানের শেষ বাক্য ছিল, "আজ আর তোমার গলার স্বর শোনার উপায় নেই, তোমার মুখখানা একটাবার দেখতে পারি না, কোথায় হারালে তুমি?" নিজাম সাহেব নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলেন, মেয়েটা এখন কোথায়?
ঘড়ির কাটা ভোর চারটা ছুঁইছুঁই করছে। নিজাম সাহেব বেলকনি থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন।
বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে নিজাম সাহেবের চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এসেছে এমন সময় বিকট শব্দে তিনি হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসলেন। হামিদুলের ঘর থেকে শব্দটা এসেছে। নিজাম সাহেব দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে হামিদুলের ঘরে গিয়ে দেখলেন, হামিদুলের ঘরের জানালার একটা কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তিনি তাকালেন হামিদুলের দিকে, হামিদুলকে অঘোরে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে তিনি স্বস্থির শ্বাস ফেলে ঘরের বাতি জ্বালালেন। কাঁচের টুকরো টুকরো অংশ ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। নিজাম সাহেব দ্রুত ঝাড়ু এনে মেঝের কাঁচ পরিস্কার করে নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। আজ আর ঘুম আসবে বলে তাঁর মনে হচ্ছে না। তিনি ঘরের একটা জানালা খুলে দিয়ে জানালার সামনে চেয়ার টেনে বসে ভাবতে শুরু করলেন, প্রতি রাতে এরকম ভাবে ঢিল ছুড়ে কে? কেনই বা ঢিল ছোড়ে? এক দুইবার ঢিল ছুড়লে সেটা মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু প্রতিরাতে ঢিল ছুড়লে ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবেই ফাজলামোর পর্যায়ে পড়ে না। কে কেন এরকম ভাবে ঢিল ছুড়ছে? গতকাল যদিও ঘরের কোনো জানালার কাঁচ ভাঙ্গেনি তবে নিজাম সাহেবের মনে হচ্ছে গত রাতেও ঢিল ঠিকই ছোড়া হয়েছিল কিন্তু জানালায় এসে লাগেনি। জানালার সামনে বসে থাকতে থাকতে সকালের আলো প্রস্ফুটিত হলো। নিজাম সাহেব মুখ-হাত ধুয়ে বাড়ির নিচে গিয়ে খুঁজতে শুরু করলেন কোন ইট অথবা পাথরের টুকরো পড়ে আছে কি না। বাড়ির চারপাশ একবার চক্কর দিতেই তাঁর চোখে পড়লো অসংখ্য ইট এবং পাথরের টুকরো। যেমনটা তিনি ভেবেছিলেন ঘটনা তেমনই, প্রতি রাতেই কেউ একজন নিজাম সাহেবদের জানালা লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ে মারে। এই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। সে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো ক্ষোভের বশে ঢিলগুলো ছুড়ছে। একটা ঢিল যদি কারও মাথায় এসে পড়ে তবে তার বেঁচে থাকবার কথা নয় কারণ ঢিলগুলো বেশ বড় বড়। যে এই কাজগুলো করছে তার সাথে মীমাংসার প্রয়োজন।
নিজাম সাহেব আরও কয়েকবার বাড়ির চারপাশে হেঁটে একটা বিষয় লক্ষ্য করলেন, এক জায়গায় রক্তের ছোপ ছোপ দাগ পড়ে আছে। গত কয়েকদিন বৃষ্টি হয়নি জন্যে দাগগুলো এখনো মুছে যায়নি, তবে রক্তের রঙ বদলে কালচে হয়ে আছে। নিজাম সাহেব দাগ অনুসরণ করতে শুরু করলেন। বাড়ির দক্ষিণ পাশ থেকে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ দক্ষিণ দিকের দেয়ালে গিয়ে মিশে গেছে। নিজাম সাহেবের মনে হলো, কেউ একজন কোনো না কোনো উদ্দেশ্যে দেয়াল টপকে বাসায় প্রবেশ করেছিল এবং তাঁর কুকুরটা তাকে কামড়ে দিয়েছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, সেই ব্যাক্তিই কি ঢিলগুলো ছুড়ছে?
সকাল দশটার দিকে নিজাম সাহেব হামিদুল সহ গাড়ি নিয়ে সোজা ঈশানদের বাসায় চলে গেলেন। ঈশানদের বাড়ির কলিংবেল বাজাতেই ঈশানের মা নাজিয়া আফরোজ এসে দরজা খুলে দিলেন। ঈশান তখনো ঘুমিয়ে আছে, আব্দুল মালেক সাহেব অফিসে চলে গেছেন। নিজাম সাহেব হামিদুলকে নিয়ে ঈশানদের বসার ঘরে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মিসেস নাজিয়া ট্রে ভর্তি নাস্তা নিয়ে বসার ঘরে এসে হাসিমুখে বললেন, "নিন নাস্তা করুন।"
নিজাম সাহেব হেসে বললেন, "আপনাদের বাসায় নাস্তা করতেই এত সকাল সকাল চলে এলাম।"
মিসেস নাজিয়া জানেন নিজাম সাহেব নাস্তা করবার উদ্দেশ্যে আসেননি, তবুও তিনি হাসিমুখেই বললেন, "খুব ভালো কাজ করেছেন, যখন-তখন নাস্তা করতে আমাদের এখানে চলে আসবেন।"
হামিদুলের দিকে তাকিয়ে মিসেস নাজিয়া জিজ্ঞাসা করলেন, "ছেলেটা কে?"
নিজাম সাহেব হামিদুলের কাঁধে একটা হাত রেখে বললেন, "বেটা। এইটা আমার একমাত্র বেটা।"
নাজিয়া আফরোজ তাড়া দিয়ে হামিদুলকে বললেন, "নাও বাবা নাস্তা করো।"
হামিদুল তাকালো নিজাম সাহেবের দিকে। তিনি নাস্তার দিকে তাকিয়েও দেখছেন না এমতাবস্থায় সে কি করে খাওয়া শুরু করবে?
নিজাম সাহেব মিসেস নাজিয়াকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আচ্ছা ঈশানের কি কারও সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল?"
মিসেস নাজিয়া বললেন, "আমি এই বিষয়টা ঠিক বলতে পারছি না। ঈশান কখনো এরকম কিছু আমাকে বলেনি, তবে ও মাঝে মাঝে ফোনে খুব কথা বলতো।"
--"ঈশানের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বন্ধুর সাথে আপনার পরিচয় আছে?"
--"আছে তো, কয়েকজনের সাথেই আছে।"
--"আমি তাদের সাথে ঈশানের ব্যাপারে কথা বলতে চাই। আমাকে তাদের ফোন নম্বরগুলো দেওয়া যাবে?"
--"হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনি নাস্তা করুন, আমি তাদের ফোন নম্বর আপনাকে লিখে দিচ্ছি।"
মিসেস নাজিয়া বসার ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। নিজাম সাহেব পাউরুটিতে বাটার লাগাতে লাগাতে হামিদুলকে জিজ্ঞাসা করলেন, "কিরে খাচ্ছিস না কেন?"
হামিদুল কিছু না বলে নিজাম সাহেবের মতো রুটিতে বাটার লাগাতে শুরু করলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে মিসেস নাজিয়া বসার ঘরে ফিরে এসে নিজাম সাহেবকে একটা কাগজ দিয়ে বললেন, "এইখানে ঈশানের দুজন বন্ধুর ফোন নম্বর লেখা আছে। আপনি ওদের সাথে কথা বলতে পারেন।"
নিজাম সাহেব কাগজ পকেটে রেখে বললেন, "ঈশানের ঘুম ভাঙ্গে কখন?"
মিসেস নাজিয়া বললেন, "ঠিক নেই, কোনোদিন সকাল আটটায় কোনোদিন দশটায় আবার কখনো কখনো দুপুর গড়িয়ে যায়।"
--"এখন থেকে ঈশানকে সকাল আটটা বাজতেই ঘুম থেকে ডেকে তুলবেন।"
--"আচ্ছা।"
নিজাম সাহেব নাস্তা শেষ করে মিসেস নাজিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঈশানদের বাসা থেকে বের হয়ে আসলেন। গাড়িতে উঠে তিনি হামিদুলের দিকে শব্দ করে হাসতে শুরু করলেন। হামিদুল নিজাম সাহেবের দিকে বিরক্তমুখে তাকিয়ে বলল, "এমন করে হাসছো কেন?"
নিজাম সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, "গাধা তোকে না বলেছিলাম খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মুখটা ভালো করে মুছবি, আয়নায় দেখতো তোকে কেমন দেখাচ্ছে।"
হামিদুল দ্রুত আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলো, তার ঠোঁটের উপরে বাম পাশে বাটার লেগে সাদা মোচ গজিয়েছে। সে দ্রুত হাত দিয়ে মুখমণ্ডল মুছে ফেলল এবং নতুন একটা সমস্যা পড়লো তার হাতের আঙ্গুলগুলো আঠালো হয়ে গেছে।
.....
Covid-19 Raises the Importance of Life Insurance।
The Growing Importance of Life Insurance
Covid-19 pandemic is far more than a health crisis. It is affecting society and economy to the large scale. It is jeopardizing lives and livelihoods for many and no one knows how long its impact will be in the world. Now even the healthy and young people are thinking about near and dear ones because some diseases like Covid-19 don't spare the fittest and healthiest among us. So the demand of life insurance is now high and in the coming days its demand will be higher.
The Importance of Life Insurance : Life insurance is very important because no one knows when death will come. It protects our family and lets us leave the family members a non-taxable amount at the time of death. The reasons why life insurance is important are given below.
Protection for Our Love Ones: Having life insurance can ensure our family's financial security. It can provide additional cash to fulfill our financial goals. Having life insurance allows us to continue our lives being worry-free as we are financially prepared. This corona crisis has taught us about the reality of lives during a crisis like this.
Care for Our Debts: In case anything happens to us, having life insurance can pay off any debt for our and our family's peace of mind. Eliminating debt can be a huge stress reliever, especially during unexpected times like financial crisis.
Support for Long-term Goals: Our children's future and retirement plans are included in these long-term goals. As a parent, it’s our responsibility to ensure that our family has enough coverage as they grow older. Life insurance also ensures that our retirement savings will last us for life. This is called as an annuity. It works like a pension plan wherein we put money into a life insurance product. In return, we get a stream of income monthly for as long as we live.
Protection for Our finances : Our income is now our greatest asset. But if you think all of a sudden we are going to deal with the loss of job or worse, a medical emergency. Then life insurance protects our savings as we work on financing these unexpected expenses. In the event of our passing however, life insurance can also provide our family financial support so they too, can enjoy the fruits of our hard work.
Security for Peaceful Mind : Having life insurance means we are at ease. It ensures that we can handle any unexpected expenses in case of any accidents or medical emergencies. We also need not worry about our family's financial security. In this way life insurance keeps us tension free and financial problem free.
The ongoing pandemic and the uncertainty over the lives have taught us about the harsh reality of life. This harsh reality of Covid-19 have proved to be 'Penny Dropping Movement' for all. People are coming with to term with this reality of life. This reality is good for them and their near and dear ones. So the importance of life insurance is on the rise .
বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন সমাধান, বিসিএস প্রি. এবং রিটেন ইংরেজি, ব্যাংক প্রি. এবং রিটেন ইংরেজি (Short note, focus writing, business letter, translation), আইইএলটিএস, স্পোকেন ইংরেজি, ইত্যাদি সম্পর্কে পরামর্শ এবং দিক নির্দেশনা পেতে সাথেই থাকুন।
পোষ্ট প্লান :
বলে রাখা প্রয়োজন যে প্রতিটি টপিক হবে সাম্প্রতিক এবং যেগুলো কোনো বইয়ে পাওয়া হবে না কিন্ত পরীক্ষায় আসার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
১. Formal বা informal letter প্রদান ।
২. Focus writing বা essay প্রদান।
৩. পত্রিকার এডিটোরিয়ালের অনুবাদ প্রদান ।
৪. গ্রামারের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে পোষ্ট প্রদান।
৫. প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ব্যাখ্যাসহ প্রশ্ন সমাধান
৬. বিসিএস রিটেন, স্পোকেন ইংরেজি বা ব্যাংক এমসিকিউ, রিটেন নিয়ে পোষ্ট।

গতি আসুক অর্থনীতিতে
বাঙালি জাতিকে তুলনা করা যায় রূপকথার ফিনিক্স পাখির সঙ্গে- ভস্মের মধ্য থেকে যে পাখি উড়াল দেয়ার সক্ষমতা দেখায়। ১৯৭১ সালের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশ। এক কোটি মানুষ দেশছাড়া হয়েছিল হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ে। লাখ লাখ বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছিল দখলদাররা।দেশের রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। চাষাবাদের জন্য লাঙল ও হালের বলদের অভাবে হাজার হাজার একর জমি অনাবাদি থেকে যায়। বাংলাদেশকে ব্যঙ্গ করে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অভিহিত করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের গডফাদারের ভূমিকা পালনকারী একটি দেশের ক্ষমতাধর মন্ত্রী। কিন্তু বাংলাদেশ গত চার যুগে নিজেদের পুনরুত্থানের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে এ জাতি হারতে জানে না।
করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক দেশ এখনও ঘুরে দাঁড়াতে না পারলেও বাংলাদেশ এ সংকট ভালোভাবেই সামাল দিতে পেরেছে বলে মনে করে এডিবি। দেশের অভ্যন্তরীণ খাতগুলোর উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থায় করোনাজনিত ক্ষয়ক্ষতি তেমন বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। রফতানি আয়েও সুবাতাস বইতে শুরু করেছে।
আমদানি ব্যয় কম হওয়ায় ও রেমিটেন্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনক। মূল্যস্ফীতির চাপও মোটামুটি নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও বন্যার প্রভাব কেটে গেলে শাকসবজি ও অন্যান্য পণ্যের দাম কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সাফল্য সম্ভব হয়েছে দেশবাসীর দৃঢ় মনোবল ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে।
বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাদশা বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলবে, এমন আশঙ্কা অনেক আগেই প্রকাশ করেছিল বিশ্বব্যাংক। তবে করোনা মহামারীর ধাক্কা সামাল দিতে সরকার এরই মধ্যে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তা সঠিক পথেই আছে বলে মনে করছে তারা। আবার নতুন আশঙ্কার কথাও বলছে সংস্থাটি।
তাদের পূর্বাভাস হচ্ছে, সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যেতে পারে, সেই সঙ্গে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের কর্মীদের আয় কমে যাওয়ায় ভোগব্যয় বাড়ার সুযোগ থাকবে না। স্বল্প মেয়াদের জন্য হলেও দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটি বলছে, কৃষির বাইরে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের যে কর্মীরা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হতে হবে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ হচ্ছে, অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো যেন টেকসই হয়, সে জন্য সরকারকে আর্থিক খাত ও ঋণ ব্যবস্থাপনার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হবে।
আর্থিক খাতকে মজবুত করার দিকে নজর দিতে হবে। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতসংশ্লিষ্ট কয়েক কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছে কিংবা পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে। আর বিশ্বের ১৬০টি দেশে থাকা এক কোটি প্রবাসীর মধ্যে করোনাকালে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন তিন লাখ কর্মী।
বেকার হয়ে পড়া বিপুল এই জনসম্পদের কর্মসংস্থানে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবাসীদের আয়ে ফিরিয়ে আনার এই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় প্রবাসীরা চাইলে দেশের চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবেন।
উদ্যোক্তা হতে চাইলে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণসহ ঋণসুবিধা দেয়া হবে। আবার বিদেশে যেতে চাইলে আরও দক্ষ হয়ে উঠতে খাতভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। নতুন করে বিদেশে যেতে ইচ্ছুকদেরও এ প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে অর্থনীতির চাকা আবার গতিশীল হবে।

রৌদ্রছায়া ২.
২.
বিভ্রান্ত সাফওয়ান আরো বিভ্রান্ত হল সায়মার শশুড় নেহাল চৌধুরী কে দেখে।
সন্ধ্যায় এসে ফ্রেশ হয়ে খানিক বিশ্রাম নিয়ে সে নিচে লিভিং রুমে এসে বসেছিল।ম্যাগাজিনের দিকে তাকিয়ে থাকা সত্ত্বেও বুঝতে পারছিল অনেক গুলো চোখ আঁড়াল থেকে তার ওপর নজর রাখছে।মাঝেমাঝে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথাও বলছে।এরা সবাই এবাড়ির কাজের লোক।তারা লুকিয়ে দেখছে কারণ বাড়ির কর্ত্রী রুবিনা অর্থাৎ সায়মার শাশুড়ীর কড়া নিষেধ আছে বিনা কারণে সাফওয়ানের সামনে এসে ঘুরঘুর করা যাবে না।
তাই বলে কি তারা থেমে থাকবে!এত সুন্দর কোন পুরুষ মানুষ কি তারা আগে দেখেছে কখনো? শুধু যে দেখতেই সুন্দর তাও তো নয়।ধবধবে ফর্সা মুখটায় মায়া মায়া ভাব। যেন অসম্ভব রূপবান একজন যুবা পুরুষ বালক বালক চেহারা নিয়ে বসে আছে।
সাফওয়ান যথাসম্ভব নিরব থাকার চেষ্টা করল।এভাবে নির্নিমেষ বসে থাকতে থাকতে একসময় তার ঝিমুনি ভাব এসে গেল।সে সোফায় হেলান দিয়েই ঝিমিয়ে পড়ল। তখনই হঠাৎ গমগমে গলায় কেউ একজন বলে উঠল,'Hey young man! কি খবর? '
সাফওয়ান প্রায় লাফিয়ে উঠে বসলো।নেহাল চৌধুরী তার বিপরীত দিকের সোফায় বসে মৃদু হেসে যাচ্ছেন।তার অভিজাত গম্ভীর চেহারার সাথে যা একেবারে বেমানান।
-'জ্বি.....জ্বি, ভালো আছি আঙ্কেল। '
নেহাল চৌধুরী হাসি থামিয়ে এবার গম্ভীর গলায় বললেন, 'শুনলাম আজকাল নাকি সব মেয়ের মাঝেই তুমি ডাইনি-পেতনি দেখতে পাচ্ছো? '
তারপর মাথা নেড়ে বললেন -'লক্ষণ তো ভালো নয়।এমন চলতে থাকলে তো একসময় দেখা যাবে তোমার জন্য মেয়েই পাওয়া যাচ্ছে না ।শেষে অন্য গ্রহ থেকে মেয়ে আনাতে হবে।'
সাফওয়ান মাথা নিচু করে হঠাৎ কাশতে শুরু করলো।
নেহাল চৌধুরী আড়চোখে সেদিকে একবার তাকিয়ে বললেন, 'তা Young man এসেছ যখন আশেপাশে একটু ঘুরাঘুরি করো।সকালে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরো।আমি সুবিমল কে বলে রাখব। কেমন?'
সাফওয়ান ইতস্তত করে হেসে বলল,'জ্বি আচ্ছা আঙ্কেল। '
নেহাল চৌধুরী চোখ বুজে আয়েস করে সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। পা নাড়াতে নাড়াতে বললেন,'বুঝলে সাফওয়ান, আমার ছিল জাহাজের নাবিকের চাকরি। কত দেশবিদেশ ঘুরে বেরিয়েছি।কোথাও স্থির থাকিনি। সেই স্বভাব এখনো রয়ে গেছে।নিজে গর্তে বসে থাকতে পারি না, কেউ গর্তে বসে আছে সেটাও সহ্য করতে পারি না।
তাছাড়া তুমি তো আর আমার ছেলেগুলোর মতো গর্তজীবি নও।Strong young man । যাও ঘুরেফিরে এসো।'
সাফওয়ান বাধ্য ছেলের মতো হেসে মাথা নাড়লো।
নেহাল চৌধুরীর পূর্বপুরুষেরা একসময় ময়মনসিংহ অঞ্চলের জমিদার ছিলেন।বাহ্যিক ভাবে যদিও সেসব কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই কিন্তু কিছুটা জমিদার জমিদার ভাব এখনো তাদের মধ্যে রয়ে গেছে।তার অন্যতম প্রমাণ হল এরা চট করে রেগে যায়। বাড়ির প্রতিটি মানুষ ভীষণ রাগী। এদের সাথে থেকে সায়মারও রাগের ক্ষেত্রে উন্নতি লক্ষনীয়!
এখানে রাত নটার মধ্যে সান্ধ্যভোজ সারতে হয়।এটা নেহাল চৌধুরীর দেয়া নিয়ম। আগেপিছে হলে সেদিন অনাহারে থাকা ছাড়া আর পথ নেই ।
রাতে খাওয়ার পর পরই সাফওয়ান ঘরে চলে এলো। তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে দোতলার উত্তর দিকের একটি ঘরে।পুরনো আমলের বড় ঘর। হাত লাগানো মাত্রই কাঠের দরজায় মর মর শব্দ হচ্ছে।ঘরটা সাফওয়ানের মোটামুটি পছন্দ হয়েছে।
বিছানার ঠিক পাশেই গরাদ দেয়া বড় কাঠের জানালা।সে জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো ।
হিম শীতল খরশাণ হাওয়া বইছে। শুল্কপক্ষের চাঁদের আলোয় দূর পাহাড়ের চূড়া গুলো পুঞ্জিভূত মেঘের মত দেখাচ্ছে।জানালার পাশে হেলান দিয়ে সে 'দ্য এ্যালকেমিস্ট' বইটি নিয়ে বসল।
এ শুধু বইয়ের ক্ষণ
এ লগন বই পড়বার!
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ দরজায় ঠকঠক কড়া পড়ল।সাফওয়ান হন্তদন্ত হয়ে দরজা খুলতে এগিয়ে গেল।দরজা খুলে দেখা গেল ওপাশে সায়মা দাঁড়িয়ে আছে।সাফওয়ান কে সম্পুর্ন অগ্রাহ্য করে সায়মা নির্বিকার ভঙ্গিতে হেটে বিছানায় গিয়ে বসে পড়ল।বিরক্তির স্বরে বলল,'তোর ড্রামা কুইন মাকে জলদি ফোন লাগা।কল করে বাবু বাবু বলে চেচিয়ে আমার কানের পোকা গুলো একেবারে নাড়িয়ে ফেলেছে।
যেন তার ছেলেকে আমরা গুম করে রেখেছি।হুহ্। '
সাফওয়ান বোনের কথা শুনে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। সিথান থেকে ফোনটা নিয়ে মাকে কল করল।রিসিভ করেই কোহিনূর আরা একের পর এক প্রশ্ন করতে শুরু করলেন।ঠিক মতন পৌঁছাতে পেরেছে কিনা,এরা ঠিক ভাবে যত্নআত্তি করছে কিনা।
তারপর হঠাৎ আতঙ্কিত গলায় বললেন, 'বাবু, একটা কথা তো তোকে বলতে একদম ভুলে গেছি।পাহাড়ে কিন্তু অনেক জিন-পরি থাকে। সুন্দর ছেলেমেয়েদের কে দেখলেই টুপ করে নিয়ে চলে যায়।কেউ টেরও পায় না।
বাবু,তুই কিন্তু ভুল করেও বাড়ি থেকে বের হবি না,এই আমি বলে রাখলাম।কথাটা মনে থাকবে তো? '
মায়ের কথা শুনে সাফওয়ান হাসতে শুরু করলো ।সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে সায়মা ভেংচি কাটল।
______________
সাফওয়ান ডাইনিং এ বসে আছে। সে ছাড়াও ডাইনিং এ আরো জন দশেক লোক আছেন। তারা সবাই বিয়ে নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে ব্যাস্ত ।সাফওয়ানের সামনে সাহেবি প্রাতরাশ সাজানো। ধোঁয়া ওঠা গরম কফি,চিকেন সসেজ,ব্রেড -বাটার,অরেঞ্জ জুস।কফির কড়া সুবাস পুরো বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে আছে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে তৈরি বাংলো বাড়িতে পৌষের একটি মিষ্টি সকাল।
নাস্তার পরই সাফওয়ান সুবিমলের সাথে বেরিয়ে পড়লো। মায়ের নিষেধ অমান্য করে সারাদিন সে বাইরে ঘুরল।সবকিছু ঠিক-ঠাকই ছিল তবে বিপত্তি বাধল সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে।সুবিমল তাকে বাড়ির কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে বাজারে চলে গেল।তাই বাকিটা পথ সাফওয়ান একাই ফিরছিল।সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে পথে চলা দুষ্কর, তার ওপর লোডশেডিং ।আঁকাবাকা রাস্তায় হাটতে গিয়ে সাফওয়ান হঠাৎ হোচট খেয়ে পড়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পায়ে হাত রেখে সে বুঝতে পারলো খারাপ কিছু একটা ঘটে গেছে। পা থেকে গড়গড়িয়ে রক্ত পড়ছে।সাফওয়ান দিশাহারা হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে যে সে মহাবিপদে পড়েছে।প্রথমত রক্তে তার ফোবিয়ার মতো আছে।রক্ত দেখলেই শরীর ঝিমঝিম করা সেই সাথে মাথা ঘোরানো শুরু হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত তার মনে হচ্ছে সে হেটে বাড়িও ফিরতে পারবে না। কারণ পায়ের চোটটা মোটেই সাধারণ নয়।এই চোট নিয়ে আর এক পা সামনে এগোনোও তার পক্ষে অসম্ভব!
সাফওয়ান কোনমতে পা টাকে টেনে হিচড়ে এনে সরু রাস্তার পাশে একটা গাছের নিচে বসে পড়ল।চারিদিকে নিকষ আঁধার। এখান থেকে নেহাল চৌধুরীর বাংলো বাড়িটা দেখা যাচ্ছে।কারণ একমাত্র ওই একটি বাড়িতেই আলো জ্বলছে।অথচ আর এক পা সামনে যাওয়ার শক্তিও তার নেই।
ক্লান্ত সাফওয়ানের ঝিমুনি ভাব এসেছিল। হঠাৎ নাকে একটা হালকা ফুলের সুবাস এসে বাড়ি খেল। সাফওয়ান ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। সামনে একটি ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। গাঢ় আঁধারের জন্য তার মুখ টা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।তবুও সে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল। তীব্র যন্ত্রণা আর আতঙ্কে তার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, সে ঘন ঘন ঢোক গিলছে।
হঠাৎ রুক্ষ অথচ স্নেহপূর্ণ কণ্ঠে সেই ছায়ামূর্তি বলে উঠল,'এইযে, কি হয়েছে আপনার?'
এই অনমনীয় কণ্ঠেও কোথায় যেন একটু প্রশ্রয় ছিল।সাফওয়ান ভরসা পেল।সে মৃদু কণ্ঠে বলল,'আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন? '
বিপরীত দিক থেকে সেই নিরস কণ্ঠ আবার বলল,' কি হয়েছে আপনার?'
-'আমি.....আমি, আসলে ঠিক বুঝতে পারছি না। পায়ে বোধহয় খারাপ ধরনের চোট লেগেছে।'
নেহাল চৌধুরীর বাড়ির দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে সে বলল,'ওই বাড়িতে একটা খবর দিয়ে আসুন। প্লিজ।'
ছায়ামূর্তি মূহুর্তের জন্য সেদিকে তাকাল।তারপর বলল,'খবর দিয়ে লাভ নেই। বাড়ি ফাঁকা।কেনাকাটা করতে সবাই শহরে গেছে। '
তারপর একটা মোটা কাপড়ের অংশ সাফওয়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,'আপনি এটা ধরে উঠে আসুন। কি,পারবেন না?'
সাফওয়ান অসহায় চোখে তাকাল।বলল,'আমি পারব না। আপনি প্লিজ কাউকে ডাকুন। '
ছায়ামূর্তি আশেপাশে একবার তাকিয়ে বলল,'এখানে তো কেউ নেই। '
খানিক নিরব থেকে ইতস্তত করে ফের বলল,'আপনি বরং আমার হাত ধরেই উঠে আসুন।'
সাফওয়ানের মাথা ততক্ষণে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এই ছায়ামানবী কিভাবে ওবাড়ির ভেতরের খবর জানতে পারল সেসব নিয়ে সে আর ভাবল না।হাত বাড়িয়ে দিল।'
কাল রাতের মতো আজও বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে গেছে।বাড়ির সদস্যরা সবাই সাংঘাতিক উত্তেজিত। কিভাবে এমন হল,বেহাইকে এবার কি জবাব দেওয়া হবে? চিৎকার, চেচামেচি, বিচার-বিশ্লেষণ........ একেবারে হুলুস্থুল কান্ড।
অন্যদিকে মার্কেট থেকে ফেরার পর থেকেই সায়মা অনবরত কেঁদে যাচ্ছে।চিৎকার, চেচামেচি বাদ দিয়ে মাঝে মাঝে কেউ কেউ আবার অবাক হয়ে সে-ই দৃশ্যও দেখছে। সায়মা সাফওয়ানের জন্য কাঁদছে এ যেন এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার! এরথেকে সায়মা তার বরের সাথে ঝগড়া করা বন্ধ করে দেবে সে কথাও যেন বেশি বিশ্বাসযোগ্য হত!
ফেরার পর থেকেই রুবিনা সুবিমল কে নিরন্তর কল করে যাচ্ছেন। বাড়ি ফিরলে আজ তার কঠিন বিচার হবে। অথচ সুবিমল এখনো গাড়ি নিয়ে লাপাত্তা! ফোন বন্ধ।
রুবিনা কঠিন কিছু গালি দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন।
তবে এখন কোন একটা অপকর্ম না করলে এই রাগ কমার নয়।সেকথা রুবিনা জানেন।
তিনি গটগট করে হেটে নিজের ঘরে চলে গেলেন।হাতদুটো নিশপিশ করছে।কিছু একটা অনর্থ করতেই হবে। হাতের একটু সুখ তো করে নেয়া যেতেই পারে।
হঠাৎ বিকট শব্দে একটা কিউরিও ভেঙে পরল।ভাঙা কাঁচের টুকরো গুলো মূহুর্তেই পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।সেদিকে তাকিয়ে রুবিনা স্বস্থির নিশ্বাস ফেললেন।তার রাগ একদম পরে গেছে।
চলবে.......

#বিবশ_রজনী#পর্ব_তিন.....
.....
নিজাম সাহেব রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে বেলকনিতে গিয়ে বসলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ঈশানকে নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করলেন। ঈশান ঘুমের মধ্যে এত নিখুঁত ভাবে হাঁটে কি করে? কেউ কি আড়াল থেকে তাকে দিয়ে এরকমটা করাতে পারে? কেউ যদি ঈশানকে দিয়ে এইসব করিয়ে থাকে তবে তাকে সম্মোহন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, যা বেশ জটিল একটা ব্যাপার। সম্মোহন পদ্ধতি অবলম্বন করে হয়তো কিছুদিন পর্যন্ত একজন মানুষকে প্রভাবিত করা সম্ভব কিন্তু এক বছরের অধিক সময় ধরে প্রভাবিত করা একপ্রকার অসম্ভব ব্যাপার। তাছাড়া কাউকে সম্মোহিত করার ক্ষেত্রে ব্যক্তির আশে-পাশে থাকবার আবশ্যকতা রয়েছে। সুতরাং ঈশান সম্মোহিত হয়ে এসব করছে এরকমটা ভিত্তিহীন। তাহলে ঈশান রাত দুইটা বাজতেই ঘর থেকে বের হয়ে ছাদে গিয়ে রেলিংয়ের উপর দিয়ে হাঁটছে কেন? এত সরু একটা রেলিংয়ের উপর দিয়ে চোখ বন্ধ অবস্থায় এত নিখুঁতভাবে হাঁটাহাঁটি করা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব না। দুই একবার হলে ভিন্ন ব্যাপার, ঈশান প্রতি রাতে অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সাথে রেলিংয়ের উপর দিয়ে চোখ বন্ধ অবস্থায় হাঁটে। ঈশানের সাথে সার্কাসের লোকেদের কিছুটা মিল রয়েছে। সার্কাসে কিছু কিছু খেলা রয়েছে যা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সার্কাসকর্মীরা দেখিয়ে থাকে। যেমন রশির উপরে হাঁটা। তবে তারা শুরুতেই রশির উপর দিয়ে হাঁটতে সক্ষম হয় না, দীর্ঘদিন এর উপর তাদেরকে দীক্ষা হয়। ঈশানকি ছাদের রেলিংয়ের উপর দিয়ে হাঁটার চর্চা করতো? কিন্তু এরকম উদ্ভট একটা চেষ্টা সে কেন করবে?
নিজাম সাহেব চা শেষ করে ভিডিও ক্যামেরা, মাইক্রোফোন নিয়ে ল্যাবে গিয়ে ঢুকলেন। ভিডিও ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোনের মেমরিকার্ড খুলে তিনি ল্যাপটপে লাগিয়ে ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রাখলেন। ল্যাপটপের মনিটরে ভেসে উঠলো ঘরের দরজা খুলে ঈশানের বের হয়ে আসার দৃশ্য। নিজাম সাহেব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন ঈশানের চোখের দিকে। ঈশান যদি চোখের পাতা মেলে তাকায় তবে একটা বিষয় পরিস্কার হওয়া যাবে, সে কি ঘুমের মধ্যেই আছে নাকি জেগে আছে। ঘুমন্ত মানুষের চোখের মনি ডান থেকে বামে এবং বাম থেকে ডান দিকে ঘুরতে থাকে।
ঈশান সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে গেল, একবারের জন্যেও চোখের পাতা মেলে তাকালো না, সোজা গিয়ে রেলিংয়ের উপরে উঠে একমুহূর্তের জন্যে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলো। রাত তিনটা পর্যন্ত ঈশান রেলিংয়ের উপরে হাঁটাহাঁটি করে ঘরে চলে গেল। একবারের জন্যেও তাকালো না। নিজাম সাহেব পরপর দুইবার ভিডিও দেখে চোখ বন্ধ করলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলেন।
হামিদুল ঘুম থেকে উঠে দরজার নিচে একটা খাম পেয়েছে। ঘুম থেকে উঠার পর কয়েকবার সে খাম হাতে ল্যাবে গিয়ে দেখে এসেছে নিজাম সাহেবের ঘুম ভেঙেছে কি না। খাম নিয়ে সে ভীষণই চিন্তিত। এরকম এর আগে কখনো আসেনি, সে কি খাম খুলে দেখবে ভেতরে কি আছে, নাকি রেখে দিবে মনস্থির করতে পারছে না। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো, হামিদুল গিয়ে দরজা খুলে দেখলো বিউটি এসেছে। বিউটি ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলো, "আজকে কি রান্না করবো? ভাইজান কি বাজার করেছে?"
হামিদুল বলল, "বাবা এখনো ঘুমায়, তুমি মুরগি রান্না করো।"
বিউটি বলল, "ভাইজান কয়দিন থেকে এই অবেলায় ঘুমায় থাকে কেন?"
এমন সময় নিজাম সাহেব ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, "ভাইজান এখন ঘুমায় সকালে উঠে দুপুরে, পাঁচ-ছয় ঘন্টা না ঘুমালে কি মানুষ সুস্থ থাকে?"
বিউটি লজ্জা পেয়ে বলল, "ভাইজান আপনি উঠলেন কখন?"
--"এই তো মাত্রই, তুমি আছো কেমন?"
--"ভাইজান আল্লাহ রাখছে ভালো, তবে জামাইটা খুব ঝামেলা করে।"
--"কি ঝামেলা করে?"
--"ভাইজান আপনাকে তো আগেই বলছিলাম ও নেশা করে, একদিন বলল, ও ভালো হয়ে গেছে, আর নেশা করবে না, ওরে একটা রিকশা কিনে দিতে। আমি রিকশা কিনে দিলাম, কয়দিন ভালো ছিল মাসখানেক আগে সে রিকশা বেচে দিয়ে আবারও নেশা শুরু করেছে। রিকশা বেচে যা টাকা পেয়েছিল সব শেষ, এখন টাকার জন্যে আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে।"
--"তুমি ওকে টাকা-পয়সা দিয়ো না।"
--"ভাইজান, টাকা না দিলে জোর করে নিয়ে যায়। রাত-বিরাতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়, কোনোদিন ফেরে কোনোদিন ফেরে না।"
--"কিন্তু বিউটি তুমি তো ওকে টাকা-পয়সা দিয়ে কুলাতে পারবে না, নেশাগ্রস্থদের অঢেল টাকা-পয়সা লাগে।"
--"জ্বী ভাইজান, আমার মনে হয় সে এখন চুরিও করে।"
--"নেশার টাকা যোগাড় না হলে চুরি করবে এমনটাই তো স্বাভাবিক। তুমি ওকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে দিয়ে দাও।"
--"আমিও সেইটা ভাবছি ভাইজান, কিন্তু আমি একলা মানুষ, ওরে ওখানে দিয়ে দিলে আমি বাসায় একা একা থাকবো কিভাবে?"
--"তুমি আমাদের এখানেই থাকতে পারো, কোন ভাড়া দেওয়া লাগবে না।"
--"ভাইজান আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আপনি আমার অনেক উপকার করেন। রফিককে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির ব্যাপারে আমাকে যদি একটু সাহায্য করতেন তাহলে খুব উপকার হতো।"
--"অবশ্যই করবো বিউটি।"
--"ভাইজান, ছোটসাব বলল, মুরগি রান্না করতে। মুরগিই রাঁধবো নাকি অন্যকিছু।"
নিজাম সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, "ছোটসাহেবের জয় হোক, আজকে মুরগিই রাঁধো।"
বিউটি রান্নাঘরে চলে গেল। হামিদুল টেবিলের উপর থেকে খাম নিয়ে এসে নিজাম সাহেবকে দিয়ে বলল, "ঘুম থেকে উঠে দেখি দরজার নিচে এইটা পড়ে আছে।"
নিজাম সাহেব বেশ অবাক হলেন, খামের উপরে নিচে কিছুই লেখা নেই। খামের ভেতরে একটা কাগজের উপস্থিতি তিনি বুঝতে পারছেন, মনে হচ্ছে ভেতরে একটা চিঠি আছে। সচরাচর কেউ তাকে চিঠি জাতীয় কিছু লেখে না। তিনি খাম খুলে কাগজ বের করে পুনরায় অবাক হলেন, কাগজে কিছুই লেখা নেই।
মুখ-হাত ধুয়ে নিজাম সাহেব কাগজের ঘ্রাণ শুকে হামিদুলকে বললেন এক কাপ চা ল্যাবে নিয়ে আসতে। হামিদুল চিন্তিতমুখে নিজাম সাহেবের হাতে থাকা সাদা কাগজ ইঙ্গিত করে বলল, "ওইটা কী?"
নিজাম সাহেব হামিদুলকে সাদা কাগজ দেখিয়ে বললেন, "সাদা কাগজ।"
হামিদুল বিরক্ত হয়ে বলল, "কিছুই তো লেখা নাই।"
নিজাম সাহেব হেসে বললেন, "মনে হচ্ছে গোপন কিছু লেখা আছে। তুই আমাকে এক কাপ চা দিয়ে যা।"
হামিদুল চিন্তিত মুখে রান্নাঘরে চলে গেল। তার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না সাদা কাগজে গোপন কি লেখা থাকতে পারে।
নিজাম সাহেব ল্যাব ঘরে গিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরিয়ে লাইটার দিয়ে কাগজে হালকা করে তাপ দিতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ তাপ দেবার পর বাদামী রঙের একটা লাইন ভেসে উঠলো, তাতে লেখা,
"আপনার কি কখনো নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয় না?"
নিজাম সাহেব ভেবে পেলেন না এরকম চিঠি কে লিখলো। চিঠিটা যে লিখেছে সে নিশ্চয়ই তাঁর পরিচিত কিন্তু এরকম নাম-ঠিকানা গোপন করে চিঠি পাঠানোর কি কারণ? নিজাম সাহেবের মনে হলো এরকম চিঠি সে আরও পেতে যাচ্ছে।
হামিদুল চা নিয়ে ল্যাবে ঢুকলো। নিজাম সাহেব চিঠিটা হামিদুলকে দিয়ে বললেন, "তোকে বলেছিলাম না গোপন কিছু লেখা আছে?"
হামিদুল কাগজের দিকে তাকিয়ে বলল, "এইটা কি তুমি লিখলে?"
--"ধুর গাধা আমি লিখবো কেন? যে চিঠিটা পাঠিয়েছে সে লিখেছে।"
--"একটু আগে না দেখলাম সাদা কাগজ, সেটাতে লেখা আসলো কোথা থেকে?"
--"এই লাইনটা লেখার জন্যে সে একটা গোপন পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। তুই শিখবি?"
হামিদুল উৎসুকমুখে নিজাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, "সত্যি শেখাবে?"
--"হ্যাঁ, এখনই শেখাবো, তুই ঘরে গিয়ে একটা পাকা লেবু আর বাটিতে একটু পানি নিয়ে আয়।"
হামিদুল দ্রুত ল্যাব থেকে বের হয়ে ঘরে চলে গেল। নিজাম সাহেব চিঠির কথা বাদ দিয়ে ঈশানের কথা ভাবতে শুরু করলেন। ঈশান হাঁটার সময় বিড়বিড় করে কি বলে শোনার জন্যে তিনি বেশকিছু উন্নত প্রক্সুক্তির মাইক্রোফোন ব্যবহার করেছিলেন কিন্তু মাইক্রোনে ঈশানের কোন কথাই ধরা পড়েনি। হাঁটার সময় ঈশানের পায়ের শব্দ মাইক্রোফোন নিখুঁতভাবে ধরতে পারলেও কন্ঠস্বর ধরতে পারেনি অর্থ্যাৎ ঈশান বিড়বিড় করে যা বলে তাতে কোন শব্দ নেই। নিজাম সাহেবকে ঈশানের ঠোঁটের ভাষা পড়তে হবে যা বেশ সময় সাপেক্ষ এবং ধৈর্যের ব্যাপার। একই ভিডিও তাকে বার বার দেখতে হবে।
হামিদুল পাকা লেবু এবং বাটি ভর্তি পানি নিয়ে ল্যাবে ঢুকে নিজাম সাহেবের পাশে বসলো। নিজাম সাহেব বললেন, "এত পানি এনেছিস কেন? অর্ধেকটা পানি ফেলে দিয়ে আয়।"
হামিদুল দ্রুত পানি কমিয়ে নিয়ে আসলো। নিজাম সাহেব বললেন, "এবার বাটিতে লেবুর রস চেপে দে।"
হামিদুল বেশ বিরক্ত হলো, সে আস্তো একটা লেবু নিয়ে এসেছে, সাথে কোন ছুরি আনেনি, এখন তাকে আবারও ঘরে গিয়ে লেবু কেটে আনতে হবে। বিরক্ত গলায় হামিদুল বলল, "আমি তো লেবু কেটে আনিনি, কেটে নিয়ে আসি।"
নিজাম সাহেব ডেস্ক থেকে একটা ছুরি বের করে হামিদুলকে দিয়ে বললেন, "এটা দিয়ে কাট।"
হামিদুল লেবু কেটে বাটিতে রস চেপে দিল। নিজাম সাহেব একটা কাগজ, একটা সরু তুলি হামিদুলকে দিয়ে বললেন, "এইবার তুলি বাটিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে কাগজে যা ইচ্ছা লেখ।"
হামিদুল নিজাম সাহেবের কথা মতো তুলি ডুবিয়ে ডুবিয়ে কাগজে লিখতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ লেখার পর নিজাম সাহেবের দিকে এগিয়ে কাগজ দিয়ে বলল, "লেখা শেষ।"
নিজাম সাহেব কাগজের লেখা শুকিয়ে যাবার পর হামিদুলকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুই কাগজে যা লিখেছিস তা কি দেখা যাচ্ছে?"
হামিদুল কাগজ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলল, "না।"
নিজাম সাহেব কাগজ হাতে নিয়ে লাইটার জ্বেলে কাগজে তাপ দিতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে কাগজে ভেসে উঠলো নিজাম সাহেবের কুকুরের নাম, "এ্যালাস্কান মালামিউট।"
হামিদুল আনন্দে আত্মহারা হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, "এইটা কিভাবে হলো?"
নিজাম সাহেব হামিদুলকে বললেন, "কিভাবে কি হলো এটা আমি তোকে বলবো না। তোকে আমি একটা বই দেবো সেটা পড়ে পড়ে খুঁজে বের করবি কি কারণে লেবুর রস দিয়ে কাগজে লিখলে লেখা অদৃশ্য হয়ে যায় আবার কেন কাগজে তাপ দিলে লেখা দৃশ্যমান হয়ে যায়, ওকে?"
হামিদুল বেশ বিরক্ত হলো, তিনি যা জানেন তা তাকে বলে দিলে কি হয়? এখন তাকে পুরো একটা বই পড়তে হবে।
.....

গল্পঃ ভাঙ্গা নৌকা
বড় রাস্তা থেকে একটি মেয়ে আমাকে ডাকছে। সাথে ছোটো একটি ছেলে। হয়তো তার ছোটো ভাই হতে পারে। দুই তিনবার ডাকার পরেও আমি যাচ্ছি না দেখে চলে যাচ্ছে। মেয়েটিকে আমি চিনি তবে নাম জানি না।
আমাকে ডেকেছিল নৌকা নিয়ে যাওয়ার জন্য। বড় লোকের মেয়ে, তাই হয়তো শখ জেগেছে নৌকায় করে ঘুরে বেড়াবার।
আমার কি ঠ্যাকা পড়ছে নাকি যে নৌকা দিয়ে আমি ঘুরাবো? আর আমি কি মাঝি নাকি?
২০০৪ সাল, আমি দশম শ্রেনীতে পড়ি। তখন ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। আমার দেখা সবচেয়ে বড় বন্যা।
বন্যায় পানিবন্দী মানুষ কতটা অসহায় হতে পারে তা নিজে উপলব্ধি করেছি। যা জীবন থেকে কখনো মুছে যাবার মতো নয়।
আমাদের নৌকা কেনার মত সামর্থ্য ছিল না। তাতে কী? আব্বু আর আমি মিলে কলা গাছ দিয়ে ভেলা তৈরী করেছি। শাকিলদের বাঁশ ঝাড় থেকে বারো টাকা দিয়ে একটি বাঁশ কিনে এনেছি সেই ভেলা বেয়ে চলার জন্য।
তবে এখন যে নৌকায় বসে আছি, সে নৌকাটি সরকার বাড়ির। আশরাফউদ্দিন সরকারের পারিবারিক নৌকা। আমার নৌকা চালাতে অনেক ভালো লাগে। বন্যায় স্কুলও বন্ধ, তাই সারাদিনই নৌকা নিয়ে ছুটে চলি। হঠাৎ সরকার বাড়ির কেউ এলে পার করে দেই, নয়তো সারাদিনই নৌকা আমার দখলে।
আমি মেয়েটির চলে যাওয়া দেখছি আর মুচকি মুচকি হাসছি। ছোটো ছেলেটি মনে হয় যেতে চাচ্ছে না, মেয়েটি জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
শাপলা তুলে নৌকায় রাখছি। নীল শাপলাকে আমরা মিনি শাপলা বলি। আকারে ছোটো, হয়তো তাই। এই শাপলাগুলো দেখতেও অনেক সুন্দর লাগে। বাচ্চারা শাপলা দিয়ে মালা গেঁথে গলায় দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমি শাপলা তুলছি রান্না করে খাওয়ার জন্য। সকালে নৌকা দিয়েই কচুরিপানার ভিতরে বড়শি পেতে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। একটা মাছ ঠোকরও দেয়নি। দুপুরে খেয়েছি ঘরে অল্প চিনি ছিল, আর ভাতের মার দিয়ে।
বাবা টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক। ট্রেক্সটাইল মিলের ভিতরে কোমড় অবধি পানি। মিল বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন হলো। মজার মজার খাবার বন্যা না গেলে যে আর জোটবে না, সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছি।
উপর থেকে এক লোক চেচাচ্ছে, এই ছেলে এই, এদিকে এসো।
এই সেরেছে, মেয়েটি তার বাবাকে নিয়ে এসেছে। এখন তো আর না গিয়ে উপায় নেই। নৌকা নিয়ে বড় রাস্তার কাছে গেলাম।
--- নাম কি তোমার? (লোকটি)
--- জ্বি, শ্রাবণ।
--- আমার মেয়ে ঘুরতে চেয়েছিল নৌকা দিয়ে, তুমি আসোনি কেন?
--- আসলে নৌকা তো সরকার বাড়ির আমি ঘুরাব কী করে?
--- আশরাফকে আমি বুঝিয়ে বলব। বিকেলে আমার মেয়ে আর ছেলেটা আসলে ওদের একটু ঘুরাইবা। এই নাও এই টাকাটা রাখো।
--- না, না টাকা লাগবে না।
--- ধরো বলছি, এই শাহিদা সৈকতকে নিয়ে নৌকায় ওঠ। সন্ধ্যার আগে বাড়ি আসবি।
শাহিদা নামের মেয়েটি আর তার ছোট ভাই সৈকত নৌকায় বসা, আমি বেয়ে যাচ্ছি। শাহিদার বাবা আমাকে দশ টাকার একটি নোট দিয়েছিল। মনে মনে ভাবছি কাল সকালে দশ টাকার বাজার করব। দেড় টাকা কেজি টমেটো, ৬টাকা কেজি আলু থেকে আধা কেজি নিলেই হবে। আর ঘরে মাছ আছে, রাতেরবেলা লাইট আর কুচ দিয়ে মাছ ধরেছিলাম।
শাহিদা হঠাৎ বলে ওঠল, তুমি জোরে চালাতে পারো না?
কথাটি শুনে একটু জোরে চালাচ্ছি, তবে বেশি না। কারণ সৈকত ভয় পেতে পারে। শাহিদার প্রশ্ন..
--- তুমি কিসে পড়ো?.
--- টেনএ, তুমি?
--- আমি ও টেনএ পড়ি।
---ও
আবার চুপ। টেনও পড়ে। আমার সমবয়সী হবে তাহলে। আমি ভয়ে ভয়ে একটু পর পর তাকাইতাম শাহিদার দিকে, বড়লোকের মেয়ে কী যেন ভেবে বসে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছি। শাহিদা আর সৈকতকে নামিয়ে দিয়ে আসলাম।
শাহিদা দেখতে কালো। এটাকে কালো বলে নাকি শ্যামবর্ণ বলে আমার ধারনা নেই। তবে ওর দিকে একটু পর পরই তাকিয়েছি আমি। কালো হলেও মেয়েটির মধ্যে একটি আকর্ষন দিক ছিল, তার চোখ। আমাদের এলাকায় কেউ বিলাই চোখ বা নারকেলি চোখ বলে। অসম্ভব সুন্দর লাগে এই চোখগুলো। সাধারন মানুষের সাধারন চোখগুলোর সাথে এই চোখগুলোর মিল নেই।
এই চোখ আমি আর কোথায় যেন দেখেছি। হ্যাঁ মনে পড়েছে, শুক্রবারে ছবি দেখতাম টেলিভিশনে। ছবির ফাঁকে যখন বিজ্ঞাপন আসত তখন একটি বিজ্ঞাপনে প্রায়ই দেখি। রোমানা পেইন্ট, একটি রংয়ের বিজ্ঞাপনে রোমানা নামের মেয়েটির চোখগুলো হুবহু এমনই।
নৌকায় যতক্ষণ ছিল, ততক্ষণই একটু পর পর চোখগুলোকে দেখেছি। যখন ওরা নেমে পড়ে তখন মনটা খারাপ হয়েছিল। পরক্ষণেই দশ টাকা পেয়েছি মনে পড়তেই আনন্দে বাড়ি ফিরেছি।
পরেরদিন বিকেলে চারটার দিকে শাহিদা ডাকছে। সৈকতও সাথে আছে। বড় রাস্তার কাছ থেকে দুজনকেই তুলে নিলাম নৌকায়। শাহিদা আমার দিকে একটি দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিল,
--- কিসের টাকা?
--- বাবা বলেছে তোমার নৌকায় ওঠলে দশ টাকা দিকে।
হাত বাড়িয়ে টাকা নেয়ার সময় চোখগুলোকে আবার দেখে নিলাম। বিধাতা কত নিপুণ করে কত সুন্দর করে চোখগুলো তৈরী করেছে ।
এবার আর চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছি না। তাকিয়ে আছি চোখের দিকে। ছল ছল চোখে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। শাহিদার তাকানো দেখে আমি চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি। হঠাৎ শাহিদা বলে ওঠল,
--- শ্র্রাবণ, আমাকে শালুক তুলে দিবা?
--- আচ্ছা, বসো আমি তুলে দিচ্ছি।
স্কুল ড্রেসের নীল পেন্ট পরনে, নেমে পড়লাম পানিতে। বুক সমান পানি, তাই শালুকের জন্য ডুব দিতে হলো।
অনেকগুলো শালুক তুলে দিয়েছি তাদের।
প্রচন্ড জ্বর এসেছে আমার। গতকালকে রাত থেকেই জ্বর। সম্ভবত অবেলা ডুবিয়ে শালুক তোলার কারণেই জ্বর এসেছে। শুয়ে আছি চৌকিতে। ঘরে হাঁটু পরিমাণ পানি। পানি থেকে চৌকি বাঁচাতে চৌকির চার কোণার খুঁটির নিচে ইট দিয়ে উঁচু করা হয়েছে। আম্মু একটু পর পর মাথায় পানি ঢেলে জ্বর কমানোর চেষ্টা করছে। জ্বরের সময় সব খাবার কেমন যেন পাংসে আর তিতা মনে হয়। একদম খাওয়া যায় না।
দুদিন পর আবার নৌকা নিয়ে বের হয়েই দেখি শাহিদা একা গালে হাত দিয়ে বসে আছে। কত দুঃখে না জানি আছে এমন একটা ভাব। দূর থেকে আমাকে দেখেই হাত বাড়িয়ে ডাকছে। আমারও ভালো লাগছে। দুইদিন পর আবার সুন্দর চোখগুলো দেখব। তবে আজ সৈকত নেই কেন বুঝতে পারলাম না।
--- তুমি এই দুদিন আসোনি কেন?
--- আমার জ্বর ছিল
--- ও, ঐদিন পানিতে নামার জন্যই মনে হয় হইছে।
--- না, এমনি আসছে।
--- এই নাও তোমার টাকা
--- এত টাকা কেন?
--- তিনদিনে ত্রিশ টাকা
--- আমিতো দুদিন আসিনি।
--- আমিতো এসেছি, আর আসার সময় বাড়ি থেকে টাকাও নিয়ে এসেছি।
আর কথা বাড়ালাম না। আজকে একটু সাহস পেলাম, তাই ইচ্ছে করে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। শাহিদা তাকালেই চোখ ফিরিয়ে নিতাম।
প্রায় বিশ দিন পর, রাতে কিছুতেই ঘুম আসছে না। বারবার শুধু শাহিদাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। আমি জানি এই দেখতে চাওয়াটা অন্যায়, শাহিদাকে ভালোবাসা অন্যায়। বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর মতো কথা। তবুও একটি বাউল গানে শুনেছিলাম,
গায়ের জোরে প্রেম চলে না,
প্রেম করতে হয় মন দিয়া,
হাত বান্দিবি, পা বান্দিবি
মন বাঁধবি কি দিয়া?
এই মনটাকে তো আর বুঝাতে পারি না যে এই ভালোবাসা অন্যায়। মন তো ঠিক শাহিদাকে ভালোবেসে ফেলেছে। জানি, কখনো এই কথাটি কেউ জানবে না, যে আমি শাহিদাকে ভালোবাসতাম।
জুতো ছিঁড়ে গেলে তারকাটা দিয়ে লাগিয়ে নেই। শার্ট ছিঁড়ে গেলে সুই সুতা দিয়ে সেলাই করে পরি। সেই আমি কী করে বলব যে, শাহিদাকে আমি ভালোবাসি? ২০০৪ সাল, দশ টাকার বাজারে আমাদের একদিন চলে যেত। ভাবতেই মনের অজান্তেই বলে ওঠলাম, না, না আমি শাহিদাকে ভালোবাসি না। এটা আমার কিশোর মনের ভালোলাগা। শাহিদাকে ভালোবাসা আমার অপরাধ।
বন্যা শেষ হয়ে গেছে। তবুও হাঁটু পানিতেই নৌকা করে ঘুরে বেড়ানোর জন্য শাহিদা আমার কাছ থেকে প্রতি বিকেলে দশ টাকার টিকেট কিনত। কোন টিকিট দিতাম না। শুধু নৌকা বেয়ে চালাতাম আর সেই মন ভোলানো চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
তবে কখনো কোনোদিন তাকে ভালোবাসার কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব না।
আস্তে আস্তে লোকচক্ষুর কাছে ধরা পড়া শুরু হয়ে গেল। তাই আমি আর নৌকা নিয়ে যাই না। শুকনো রাস্তা ধরে বিকেলে হয়তো বড় রাস্তায় ওঠতাম। তবে নৌকায় ওঠতাম না। একদিন রাস্তায় দাঁড় করিয়ে শাহিদা প্রশ্ন করেছিল,কি ব্যাপার তুমি আসো না কেন?
আমি বলেছিলাম, সামনে এস এস সি পরীক্ষা, পড়ার চাপ বেশি, তাই আসি না।
আর সেদিন বুঝেছিলাম হয়তো শাহিদাও আমাকে পছন্দ করত। সে নাকি এতদিন বিকেলে প্রতিদিনই এসে বসে থাকত, নৌকায় করে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। কী জানি, হয়তো আমার ধারনা ভুলও হতে পারে।
সৈকত এসে আমাকে খুঁজে বের করল। আমার হাতে একটি চিঠি দিয়ে চলে গেল। আমার বুঝতে বাকি নেই যে এটা শাহিদার চিঠি। কারণ গত পরশুদিন শুনেছি শাহিদা ঢাকায় চলে যাচ্ছে। ওর খালার বাসায় থেকে লেখাপড়া করবে। দুদিন আমার সাথে দেখা করার চেষ্টাও করেছে, আমি সুযোগ দেইনি। তাই শেষ চিঠিযে দিবে সেটা ভেবেছিলাম।
চিঠি খুলে পড়তে যাব, অমনি দেখি চিঠির ভাজে একটি দশ টাকার নোট। টাকার মধ্যে একটা লাভ আঁকা। এর ভিতরে লিখা (শ্রাবণ+শাহিদা)
বুকের ভিতরে একটা মোচড় দিয়ে ওঠল। চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম..
★ শ্রাবন,,
আমি চলে যাচ্ছি তোমাকে ছেড়ে। আর হয়তো কখনো তোমার জন্য বড় রাস্তায় পথ চেয়ে বসে থাকব না। কখনো আর বায়না ধরব না নৌকায় করে ঘুরে বেড়াবার। শালুক তুলে দেয়ার কথাও বলব না। তবে খুব বেশি ইচ্ছে ছিল তোমাকে যাওয়ার আগে একটিবার দেখব, দেখতে পারিনি। আমি জানি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তুমি চাওনি আমি আর দেখা করি তোমার সাথে।
আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা তাও জানি না। যদি কখনো পড়ার ফাঁকে বাড়িতে আসি, আমি বড় রাস্তার সেই নৌকার কাছে অপেক্ষা করব। যদি আসো আবার হবে দেখা।
আরেকটা কথা, তুমি যে নৌকায় বসে অনবরত তাকিয়ে থাকতে, সে তাকানোর ভাষা আমি ভুল বুঝেছিলাম। তাই মনের ভিতর হঠাৎ গজিয়ে উঠা সুপ্ত ভালোলাগার ছোয়াটুকু বালিচাপা দিয়েছি। তবুও কেন যেন সেই বালি ছেদ করে কিছু একটা প্রাণরস খুঁজে পেয়ে গজাতে চায়। যদি এটা ভালোবাসার কোনো অধ্যায়ে পড়ে তাহলে ধরে নিও হয়তো তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
না বলা কথাটুকু খুব যন্ত্রনা দিচ্ছিল, তাই আজ প্রকাশ করে দিলাম।
ভাল থেকো তুমি, অনেক বেশি ভাল থেকো।
বছরের পর বছর কেটে গেল। এখন ভার্চুয়ালের যুগ। মানুষ তার আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করে ফেসবুক নামক প্লাটফর্মে। শাহিদার ভাই সৈকত অনেক আগে থেকেই আমার ফেইসবুকের ফ্রেন্ড লিস্টে ছিল। সৈকতের সূত্র ধরেই আজ এতোগুলো বছর পরে শাহিদাকে দেখেছি।
শাহিদার বাবাও বাড়িটা বিক্রি করে ঢাকায় চলে গিয়েছিল। তাই শাহিদা আর কখনো এই অজো পাড়াগায়ে আসার সুযোগ পায়নি।
আজ ষোল বছর পর মোবাইলের স্ক্রীনে দেখলাম শাহিদাকে। একটু মোটা হয়ে গেছে, তবে চোখদুটো একটুও বদলায়নি। তার এক মেয়ে এক ছেলে। ছেলে মেয়েকে সাথে নিয়েই ফেইসবুকে ছবি দিয়েছে।
আমি এখনো বিয়ে শাদি করিনি , গ্রামেরই প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করছি। কেন বিয়ে করিনি, সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই আমার কাছে। উত্তর খুঁজতেও চাইনি কখনো।
চৈত্রমাসে খরাতাপে মাঠ ঘাট ফেটে চৌচির। বিকেলে সেই বড় রাস্তায় হাঁটতেছি। একটি ভাঙ্গা নৌকা শুকনায় পড়ে আছে। পুরোনো কথাগুলো মনে পড়তেই ভাঙ্গা নৌকার কোণায় বসে ভাবছি, আমার মন কি কারো জন্য ভেঙ্গেছিল? এমন নৌকার মতো করে।
আমি যেন নৌকার ঐ মাথায় শাহিদাকে দেখছি। সেই অবাক করা চোখদুটো, সারাজীবন তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।
মানিব্যাগ থেকে পুরোনো চিঠিটা বের করলাম। এতো বছর আগের চিঠি। হাত বুলিয়ে দেখে দেখে এখনো পড়ি মাঝে মাঝে। চিঠিটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। তবুও পলিথিনের ভিতর ভরে রাখাতে এতোদিন টিকেছে
চিঠির ভাঁজে সেই দশ টাকার নোটটি। যে নোটে লাভ চিহ্নের ভিতর লেখা ছিল.....
★শ্রাবন+শাহিদা

Admission
সিলেটের ভেতরে সালমা যে কলেজে ভর্তির ফরম কিনতে যাচ্ছে, সে কলেজেই তার সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে। আমার সঙ্গে তার দেখা অনিচ্ছাকৃত হলেও, তার সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে। সে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে, আমি যে তার পিছু নিয়েছি। আর পিছু নিয়েছি সেই ইন্টার লেভেল থেকে। এখন তার অনার্সে ভর্তির পালা। পাত্তা সে কোনোদিন দেয়নি, ভবিষ্যতেও দেবে না; আমি জানি। কিন্তু আমি যে নাছোড়বান্দা, সহজে পিছু ছাড়ার পাত্র আমি নই।
আজ এসেছি নতুন আরেকটি কলেজে। সালমার পিছু পিছু এসে কখন যে কলেজের ভেতরে ঢুকে পড়েছি; খেয়াল করিনি। নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে এ যেন কলেজ নয়, যেন একটা ফুল বাগান। যেদিকে তাকাই; লাল, কালো, সাদা, গোলাপি ফুল আর ফুল। কলেজে এতো এতো ফুল দেখে মনে হচ্ছে, এ কলেজে ছাত্রীর সংখ্যাই বেশি। ছাত্ররা বোধহয় খুব একটা কলেজে আসে না, তাই ভ্রমরের অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
ভর্তির ফরম কেনার জন্য সালমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছি। সে ফরম কিনে চুপচাপ চলে যাচ্ছে। এবার আমার পালা। ফরম বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত একটা লোক বললো__
'ছাত্রীর নাম?'
এমন প্রশ্ন শুনে দিনের শুরুতেই গেলো মেজাজটা বিগড়ে। দিলাম আচ্ছা মতো ঝাড়ি__
'ওই মিয়া, আমারে দেখে কি মেয়েমানুষ মনে হয়?'
লোকটা চেয়ার থেকে দাপাদাপ দাঁড়িয়ে গেলো। মারমার কাটকাট ভঙ্গিতে বললো__
'এই যে মিস্টার, চোখ কি হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘুরে বেড়ান? কলেজে ঢোকার আগে কলেজের নাম দেখেননি? যান, এক্ষুণি কলেজের নামটা দেখে আসুন।'
লোকটার এমন অপ্রাসঙ্গিক কথা আর অসদাচরণ দেখে লজ্জায়, অপমানে ভর্তির ফরম না কিনে সোজা কলেজের বাইরে চলে এলাম। লোকটার কথামতো কলেজের সাইনবোর্ডটার দিকে তাকালাম। তাকানো মাত্রই আমার চোখ দুটো এক্কেবারে ছানাবড়া হয়ে গেলো! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে পথচারী একজনকে জিজ্ঞেস করলাম__
'ভাই, এই কলেজটার নাম কী?
- সিলেট সরকারী মহিলা কলেজ।
আমি ভুল শুনেছি নাকি ভুল দেখেছি তা জানি না। তবে কী এক অজানা ভয়ে বুকটা ধকধক করে কেঁপে উঠলো। এখন কী হবে, যদি সালমা এখানে ভর্তি হয়। তাকে যদি প্রতিদিন দু বেলা না দেখি আমার ঘুম হয় না, আর সে যদি এখানে ভর্তি হয়; তাহলে আমার সব শেষ। আমার ভালোবাসার কী হবে?
একটা টেলিফোন সার্ভিসের দোকান থেকে সঞ্চিতাকে ফোন দিলাম। সঞ্চিতা সালমার খুব কাছের বান্ধবী। সে জানালো, সে আর সালমা দুজনেই সরকারী মহিলা কলেজে ভর্তি হবে। সে ভর্তি হবে তার বান্ধবীর কারণে, আর সালমা ভর্তি হবে আমার কারণে। যাতে খুব সহজে আমি তার নাগাল না পাই। আমার হাত থেকে বাঁচতে নিরুপায় হয়ে সে এখানে ভর্তি হচ্ছে, নইলে সিলেট সরকারী এমসি কলেজে ভর্তি হবার খুব ইচ্ছে ছিল তার।
কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। কী করবো না করবো কিছু ভেবে পাচ্ছি না। কলেজ গেইটে কর্মরত দারোয়ান চাচার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিলাম। দারোয়ান চাচা নিতে চাচ্ছেন না। অবশেষে নিলেন। দুজনের ঠোঁটে জ্বলছে দুইটা জ্বলন্ত সিগারেট, এক সঙ্গে দুজনে সিগারেটে সুখটান দিচ্ছি। আমি নাকের দু ফুটো দিয়ে কয়লার ট্রেনের ধোঁয়ার মতো ধোঁয়া বের করছি। একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দারোয়ান চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম__
'চাচা, দেশের বাড়ি কই?'
- নেত্রকোনা।
'বউ ছেলেমেয়ে কই থাকে, এখানে?'
- না বাবাজি, ওরা দেশের বাড়ি থাকে।
'ও আচ্ছা, কিছু মনে না করলে বলবেন কি এখানে বেতন কত পান?'
- পাঁচ হাজার টাকা বাবাজি।
'সংসার চলে এই টাকায়?'
- হ্যাঁ বাবাজি, আল্লাহ্র রহমতে কোনোরকম চলে যায়।
'আমি যদি আপনাকে আগামীকাল নগদ এক লাখ টাকা দিয়ে দেই আর প্রতিমাসে দশহাজার টাকা করে বেতন দেই, তাহলে কি এই চাকরিটা আমাকে দিয়ে দেবেন?'
আমার মুখে এ কথা শুনে দারোয়ান চাচা তুমুল আনন্দে হাসতে শুরু করলেন। দেখে মনে হচ্ছে উনার কাছে এটা ছিল এযাবতকালের সেরা জোকস। আমি উনার হাসিরে উপেক্ষা করে বারবার বলতে লাগলাম__
'সিরিয়াস চাচা, মজা না।'
দারোয়ান চাচা ভ্রুকুঁচকে বললেন__
'আপনি দারোয়ানির চাকরি দিয়ে কী করবেন; বাবাজি? বড়োলোক মানুষ, শিক্ষিত মানুষ।'
- দরকার আছে চাচা, কাল থেকেই চাকরিটা আমার খুব প্রয়োজন। প্রিন্সিপাল হোক আর কলেজ কর্তৃপক্ষ হোক, আগামীকাল যে কেউর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবেন। আর বলবেন, আমি আপনার ভাতিজা। আপনি আর এই চাকরি করবেন না, এখন থেকে আমিই করবো।
দারোয়ান চাচা মাথা নেড়ে সমর্থন দিলেন। বাসায় এসে আম্মুকে বললাম, আমি আর কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো না, প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়বো এবং কালই ভর্তি হবো। ভর্তি হতে প্রথমেই লাগবে এক লাখ টাকা, এরপর থেকে প্রতিমাসে দশ হাজার টাকা। এতো বড়ো এমাউন্ট শুনে আম্মুর মাথা পুরাই আউলাইয়া গেছে। আম্মুকে হুমকি দিয়ে বললাম__
'টাকা না দিলে আর পড়বো না, এখন ইচ্ছে তোমার।'
পরদিন সকালে দারোয়ান চাচার হাতে এক লাখ টাকা তুলে দিলাম। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না আমি যে সত্যি সত্যি চাকরিটা চাই। দারোয়ান চাচা প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করাতে আমাকে অফিস রুমে নিয়ে যাচ্ছেন। অফিসের দরজায় ওই লোকটার সঙ্গে দেখা, যে কি না গতকাল ফরম বিতরণের দায়িত্বে ছিল। আমি লোকটাকে দেখে না দেখার ভান করে এদিকসেদিক তাকাচ্ছিলাম। লোকটা তখন আমাকে দেখে বলল__
'এই ছেলে, তুমি ওই বদ ছেলেটা না? যে কি না গতকাল নিজের জন্য ফরম কিনতে এসেছিল!'
দারোয়ান চাচা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন__
'কী কন স্যার! সে এখানে ফরম কিনতে কেন আসবে? সে তো আমার ভাতিজা। এখন থেকে সে-ই এই কলেজের দারোয়ানগিরি করবে।'
প্রিন্সিপাল স্যারের অফিসে ঢুকলাম। সব শুনে তিনি বললেন__
'সাদেক মিয়া, ছেলেটার তো বয়স অনেক কম! তোমার ভাতিজা তাই চাকরিটা দিয়ে দিলাম। অন্য কেউ হলে দিতাম না।'
প্রিন্সিপাল স্যার আমার সামনে একটি হলুদ কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন__
'সাদেক মিয়া, তাকে বলো পাঁচ বছরের এ চুক্তিপত্রে সাক্ষর করতে। আর বলো এই পাঁচ বছরের ভেতরে কোথাও সে নড়চড় হতে পারবে না। পরে তাকে বুঝিয়ে দিও; কলেজ ছুটির পর প্রতিদিন তাকে মেয়েদের টয়লেটরুম, ওয়াসরুম, ক্লাসরুম, কলেজের আঙিনা পরিষ্কার করতে নীলা বেগমকে হেল্প করতে হবে।'
- অবশ্যই বলবো স্যার, ভাতিজা আমার কাজেরকাজি। দশজনের কাজ একাই করতে পারে, ভরসা রাখুন।
রেডি হচ্ছি, এখন প্রাইভেট ভার্সিটিতে যাবো। আম্মুর কাছে আজ আমার প্রাইভেট ভার্সিটি লাইফের প্রথম দিন আর আমার কাছে আজ হলো দারোয়ানি চাকরির প্রথম দিন। আমার ক্লাস হবে টয়লেটে, কলেজ গেইটে, ওয়াসরুমে, আঙিনায়। হাতে কলমের বদলে যোগ হবে বেতের লাঠি আর ঝাড়ু। ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।
সকালে দারোয়ান চাচার ছোট্ট বাসায় হাজির হলাম। এখন থেকে এই বাসা আমার। রুমের দেয়ালে শ্যাওলা জমে আছে। ঘরের ভেতর আলোবাতাসহীন একটা ভ্যাপসা গন্ধ বিরাজ করছে। একজন সুস্থ মানুষ একমাস এখানে থাকলে নির্ঘাত অসুস্থ হয়ে যাবে। চাচা কীভাবে এতো দিন এমন একটা রুমে থাকলেন, সে ভাবনা আর নাই ভাবী। চাচা আমাকে উনার দারোয়ানি পোশাক পরিয়ে দিচ্ছেন। পোশাক বেশ ঢিলেঢালা হয়ে যাওয়াতে নিজেকে অনেকটা মদন মদন লাগছে। লাগুক, দারোয়ানের আবার স্মার্টনেস কী?
পোশাকের রঙ অনেকটা দেখতে গু কালারের মতো। আগে কড়া হলুদ ছিল। ময়লা হতে হতে পোশাকের এই অবস্থা হয়েছে। গায় জড়াতে ঘিনঘিন করলেও ভেতরে ভেতরে এক অন্যরকম আনন্দ অনুভূত হচ্ছে। আজ থেকে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা সালমাকে যখন তখন দেখতে পাবো। চোখাচোখির বৈধতা পেয়ে গেছি। এ আনন্দ এখন কই রাখি?
হাতে বেতের লম্বা একটা লাঠি নিয়ে গেইটে দাঁড়িয়ে আছি। এই লাঠিটার আপাতত কাজ হলো কুত্তা তাড়ানো। ফুল গুলো একটা একটা করে বাগানে ঢুকছে। সবাই ঢুকছে আর ঘুরে ঘুরে আমায় দেখছে। এমন করে দেখার প্রথম কারণ; আমি নতুন দারোয়ান। আর দ্বিতীয় কারণ; আমি একটা নাদুসনুদুস টাইপের স্মার্ট ছেলে। অনেকে ক্রাশ খেতে গিয়েও খাচ্ছে না, আমি দারোয়ান বলে হোঁচট খাচ্ছে। কিন্তু হাসাহাসি ঠিকঠাক হচ্ছে। তাদের এমন আনন্দ দেখে আমার মস্তিষ্কে রবিঠাকুরের সেই অমর গানটি বাজতে লাগল__
"ফুলে ফুলে দুলে দুলে বহে কী বা মৃদু বায়।"
আমি গানের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে না রেখে ডিউটিতে মনোযোগী হয়ে উঠলাম। হঠাৎ দেখলাম সালমা আর সঞ্চিতা আমার পাশ দিয়ে গেইটের ভেতরে প্রবেশ করছে। মনে হচ্ছে কেউই খেয়াল করেনি। কয়েক পা এগিয়ে যাবার পর সঞ্চিতা সালমাকে বলল__
'দারোয়ানের দিকে খেয়াল করেছিস, অয়ন নাতো?'
সঞ্চিতার সন্দেহজনক কথা শুনে সালমা দুই কদম পিছ পা হয়ে আমার সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো। আমাকে দেখে রেগেমেগে পুরাই আগুন। শিমুল বনের মতো তার মুখটা রেগে আগুন লাল হয়ে গেছে। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে আছি। তার কাজল কালো চোখের দিকে তাকানোর ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা এখনো আমাকে দেননি। সালমা আমার গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলল__
'ছেঁচড়া, মানুষ হবি কোনদিন?'
সঞ্চিতা আমার কাঁটা গায়ে নুনেরছিটা দিয়ে বলল__
'অয়ন ভাই, আপনাকে এই পোশাকে দারুণ মানিয়েছে। চালিয়ে যান।'
এই দিনের পর থেকে তারা আর কোনোদিন সিলেট সরকারী মহিলা কলেজে আসেনি। কিছুদিন পর খবর পেলাম, তারা এখন সিলেট সরকারী এমসি কলেজে ভর্তি হয়েছে। অনেকটা দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দারোয়ানি ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। দারোয়ান চাচা উল্টো হুমকি দিলেন, যদি ছেড়ে দেই উনি ব্লাকমেইলের মামলা দেবেন। জানাজানি হলে আমার নিজেরই ইজ্জত যাবে। তাই চুপচাপ চুক্তি অনুযায়ী ততদিন দারোয়ানি করে যেতে হবে। আর আম্মু যদি জানেন কু পথে টাকা নষ্ট করেছি লেখা পড়ার নামে, তাহলে আমাকে উনি কেটে টুকরো টুকরো করে সুরমা নদীতে ভাসিয়ে দেবেন।
আজ দারোয়ানি চাকরির বয়স হলো তিনবছর। আজ আমি ভয়ে পুরাই অস্থির। মাইনকার চিপায় পড়েও এতটা ভয় আগে কোনোদিন পাইনি, এখন যতটা পাচ্ছি। ছোটবোন ইমা এবার এইচ.এস.সি পাশ করেছে। তার ফাইনাল সিদ্ধান্ত, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি চান্স না পায়, সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হবে। আর কোথাও ভুলে ভর্তি হবে না। পড়ছি এখন বিপাকে, তাকে দিনরাত বোঝাচ্ছি এই কলেজের লেখাপড়ার মান খুবই খারাপ। স্যারেরা আরো খারাপ। তারচেয়ে এমসি বা সিলেট সরকারী কলেজই বেস্ট। সেও আমার মতো নাছোড়বান্দী, মহিলাতেই ভর্তি হবে। আম্মুও তাল দিলেন, মহিলা কলেজই ভালো। বিশেষ করে ছেংড়া ইভটিজার পোলাপানের নাগাল থেকে মেয়েরা অনেকটা নিরাপদে থাকে, থাকে ঝামেলা মুক্ত।
আমি এখন প্রতিদিন নফল নামাজ পড়ে দোয়া করছি, বোনটা যেন শাহজালালে চান্স পায় আর আমি যেন ইজ্জৎ নিয়ে দারোয়ানি চাকরিটা ভালোয় ভালোয় শেষ করতে পারি।
কিছুদিন পর খবর পেলাম সে চান্স পায়নি। অতি সম্মানের সহিত অকৃতকার্য হয়েছে। আমার এখন ঘুম হারাম। যেকোনো দিন সে মহিলা কলেজে ভর্তি হতে আসবে। ভর্তি ফরম ইতিমধ্যে কাকে দিয়ে যেন সংগ্রহ করে ফেলছে। ইজ্জতের ভয়ে আমি এখন প্রতিদিন মাস্ক পরে দারোয়ানগিরি করি। হঠাৎ একদিন প্রিন্সিপাল স্যারের নজরে আসি। উনি জিজ্ঞেস করলেন__
'মাস্ক পরছ কেন?'
- স্যার, ধুলাবালি আর এলার্জির সমস্যা।
'মনে এনার্জি রাখবা, জগতে এলার্জি বলতে কিছু নেই! আর থাকলেও করতে হবে দারোয়ানি। এটা চীন নয় যে মাস্ক পরতেই হবে, এটা বাংলাদেশ। কথা বোঝা গেছে?'
মাস্ক পরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। তাই আজ আমি মাস্কহীন। সাধারণ দিনের মতো আজও আমি গেইট পাহারায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছি। ফুল গুলো ফুলের মালার মতো সারিবদ্ধভাবে বাগানে ঢুকছে। আমার ভেতর অন্যরকম এক লজ্জামাখা অস্থিরতা কাজ করছে। কখন জানি ছোটবোনের হাতে ধরা পড়ি। আমি এখন দেখতে পাচ্ছি ইমা গেইট দিয়ে প্রবেশ করছে। আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে গেইটের ভেতরে ঢুকেই হঠাৎ থমকে গেছে। চোখ দুটি আকাশে তুলে ফেলছে। সে এগিয়ে আসছে___
'ভাইয়া তুই! তুই এখানে দারোয়ানি করছিস! ছি ছি ভাইয়া ছি, তোর এতোই অধঃপতন। মেয়েদেরকে দেখার জন্য তুই মহিলা কলেজের দারোয়ান হয়েছিস! ছি।'
ইজ্জৎ বাঁচাতে গিয়ে এদিকওদিক না তাকিয়ে ইমার মুখটি চেপে ধরলাম। বেমালুম ভুলে গেলাম কোথায় কী করছি। ফুল বাগানের ফুল গুলো আর ফুল নেই, যেন একেকটা অগ্নিমূর্তি। সবার হাতে বিভিন্ন ব্রাণ্ডের জুতা। এখনি জুতার বৃষ্টি নামবে। এইতো নামছে, তুমুল বেগে নামছে। জুতার বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছি আমি....।
রৌদ্রছায়া
৩.
সুবিমল ফিরল পরদিন সকালে।সবাই তখন নাস্তার টেবিলে প্রাতরাশ সারছিল।
দারোয়ানের কাঁধে ভর দিয়ে খোরাতে খোরাতে সুবিমল এসে হাজির হল।তার হাতে, মাথায় বিশাল ব্যান্ডেজ।সে দাঁড়িয়ে রইল মাথা নিচু করে।
নেহাল চৌধুরী সবে রুটিতে একটা কামড় বসিয়েছেন।সুবিমল কে দেখে তিনি পানি দিয়ে রুটি টুকু গিলে ফেললেন।কঠিন চোখে সুবিমলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সুবিমল কে দেখে রুবিনার কফির মগ ছলকে কিছুটা কফি টেবিলে পরে গেল। তিনিও স্বামীর মতোই কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলেন।
কাল রাত থেকে সুবিমল ও গাড়ি উভয়ই উধাও ছিল।থানায় জিডিও করা হয়েছে। এখন এই হাঁদারাম সাতসকালে হাতে মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে এসে হাজির ।
চর চর করে রুবিনার রাগটা বাড়তে লাগলো। তিনি নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। নিজেকে বোঝাতে চাইলেন এখন কোনভাবেই রাগটা প্রকাশ করা যাবে না।সামনেই নেহাল চৌধুরী বসে আছেন।
রুবিনার কাছে নেহাল চৌধুরী একটা ছোট খাট আতঙ্কের নাম। স্বামী কে তিনি বাঘের মতো ভয় পান।এই পুরো বাড়ি জুড়ে তার একছত্র অধিপত্য, তবে সেটা নেহাল চৌধুরীর আড়ালে ।নেহাল চৌধুরী যতক্ষণ বাড়িতে থাকেন রুবিনা ততক্ষন ভেজা বেড়াল হয়ে থাকেন।তার খবরদারি শুরু হয় স্বামী বাড়ির বাইরে পা রাখার পর।
নেহাল চৌধুরী গম্ভীর হয়ে হাতের ইশারায় সুবিমল কে কাছে ডাকলেন।খুব স্বাভাবিক গলায় তাকে পাশের চেয়ারে বসতে বললেন।সুবিমল কোনো কথা বলল না। চুপচাপ চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
নেহাল চৌধুরী গমগমে গলায় ডাকলেন, 'মঞ্জুরী...।'
মঞ্জুরী প্রায় উড়ে এসে হাজির হল।
-'সুবিমল কে নাস্তা দাও।' গম্ভীর গলায় বলে নেহাল চৌধুরী আবার খাওয়ায় মনযোগ দিলেন।তার দুটো চেয়ার পরে বসে রুবিনা রাগে দাত কিড়মিড় করতে লাগলেন।
নেহাল চৌধুরী বেড়িয়ে যাওয়া মাত্রই সবাই সুবিমল কে ঘিরে ধরল কাল রাতে কি ঘটেছিল বলার জন্য। সুবিমল অপ্রতিভ হয়ে গেল।কিছুক্ষণ মাথানিচু করে বসে থেকে অবশেষে অসহায় মুখ করে বলল কাল রাতে সাফওয়ান কে পৌঁছে দিয়ে সে যখন বাজারে যাচ্ছিল পথে হঠাৎ দেখল একটা অসুস্থ ছেলে রাস্তার পাশে বসে আছে, হালকা গোঙাচ্ছে। হয়তো সাহায্য দরকার এই ভেবে সে গাড়ি থামাল। নেমে ছেলেটার কাছে এগিয়ে গেল।তাকে কাছে আসতে দেখে ছেলেটা হঠাৎ গোঙ্গানো থামিয়ে মিষ্টি করে হাসল।সুবিমল হকচকিয়ে গেল।
তারপর হুট করেই ছেলেটা গায়ে জড়ানো আলোয়ান টা এক টানে খুলে ফেলল।তার ভেতর থেকে বেড়োল একটা ছুরি।
এই পর্যন্ত বলে সুবিমল থামল।বাকিটা বলার ইচ্ছে তার নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে পুরোটা না শুনে এরা কিছুতেই তাকে ছাড়বে না।
সবাই উত্তেজিত হয়ে ভুতের মতো চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
অগত্যা সে আবার বিরস মুখে বলতে শুরু করলো নিজের মূঢ়তার কাহিনী।
ছেলেটার হাতে যখন ছুরি দেখল সুবিমল ভীষণ ঘাবড়ে গেল ।তাই আগে পিছে কিছু না ভেবে গাড়ি ফেলে গাঢ় আঁধারের মধ্যেই দিল এক দৌড়। কোন পথে যাচ্ছে, কোন দিকে যাচ্ছে কিছুই খেয়াল করল না।ফলাফল যা হবার তাই হল।পাহাড়ি রাস্তায় উল্টে পড়ে গিয়ে হাত ভাঙল,পাথরে মাথা ঠুকে গেল।
সুবিমলের কেচ্ছার সমাপ্তি এখানেই। কথা শেষ করে সে মাথা নিচু করে বসে বেরোনোর অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলো।
নেহাল চৌধুরীর তৃ-তনয়া অর্থাৎ ইলু,নীলু,বিনু আর পুত্রবধু সায়মা এতক্ষণ রুদ্ধশ্বাসে কাহিনী শুনছিল।এবার সুবিমল থামতেই তারা মুখ টিপে হাসতে শুরু করলো।অট্টহাসি দেওয়া যাচ্ছে না কারণ সুবিমল ঠিক পাশেই মুখ গোমড়া করে বসে আছে। বেচারার জন্য তাদের কিছুটা মায়াও হচ্ছে।
কিছু কিছু মানুষ থাকে, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়েও হৈচৈ না করে যারা থাকতে পারেন না। সেই কিছু মানুষের একটা বৃহৎ অংশের বাস এই বাড়িতে। সামান্য বিষয় নিয়ে হৈচৈ বাঁধিয়ে দিতে এদের জুড়ি নেই। সেখানে গতকাল সাফওয়ান ও আজকে সুবিমলের এক্সিডেন্ট ঠিক কি ধরনের উত্তেজনা নিয়ে আসতে পারে তা বলাই বাহুল্য।
চৌধুরী বাড়িতে এখন আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু হল কিভাবে সাফওয়ান কে সহিসালামতে তার মায়ের কাছে পাঠানো যায়? বোনের কাছে বেড়াতে এসে ছেলের এই আকস্মিক দুর্দশা কে কোহিনূর আরা কিভাবে নেবেন কে যানে!
তবে তিনি যে একেবারে নির্লিপ্ত থাকবেন না সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
_______________
সাফওয়ান বিরস মুখে বিছানায় শুয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবছে এই জানালা দিয়ে কোনো ভাবে পালানো যায় কিনা!
তার মন এখন একই সাথে ভীষণ খারাপ এবং প্রফুল্ল।
মন খারাপ কারণ কালকে রাতের পর থেকে এই ঘরে সে বন্দী। কেউ তাকে বেরোতে দিচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর পর কেউ না কেউ আসছে এবং কিছু লাগবে কিনা জানতে চেয়ে ফের চলে যাচ্ছে।তাদের এই অতিরিক্ত সৌজন্য এখন তার অসস্থির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এভাবে একঘেয়ে সময় কাটানোর কাজ টা খুবই কঠিন।
আবার মন প্রফুল্ল হবার কারণ হল বৃষ্টি নামতে আর বেশিক্ষণ বাকি নেই।
সন্ধ্যা মিলিয়ে যেতে এখনো হয়তো কিছু সময় আছে। তবে ঘর এখনই তমসাচ্ছন্ন। আবহাওয়া খারাপ ।আকাশ মেঘৈ...মৈ।সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে 'মেঘেতে মেদুর আকাশ'।যেকোনো সময় বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে।এই পাহাড়ি এলাকায় আবছায়া সন্ধ্যায় যখন আকাশ ফুঁড়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে সে দৃশ্য দেখতে নিশ্চয়ই খুব সুন্দর হবে?
সাফওয়ান কি সেই শুভক্ষণের অপেক্ষা করছে?
কে জানে!
দরজা ঠেলে কেউ একজন ভেতরে এল।আবছা আলোয় সাফওয়ান তাকে চিনতে পারল না। বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে সায়মা বিছানায় তার পাশে এসে বসল।সেদিকে তাকিয়ে সাফওয়ান মিষ্টি করে হাসল।সায়মার দিকে মুখ ফিরিয়ে মৃদু স্বরে বলল-'বুবু.....সরি।আমি এসেই তোকে ঝামেলায় ফেলে দিলাম। '
অন্য সময় হলে সায়মা মুখে ভেঙচি কেটে দু'একটা কথা শুনিয়ে দিত।তবে এখন কিছু বলল না। শান্ত দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।তাকে খুব বিষন্ন মনে হল। হঠাৎ ভেজা গলায় সে বলল, 'তোর কি খুব কষ্ট হচ্ছে বাবু?'
সাফওয়ান ফের হেসে ফেলল।সায়মা ওপর ওপর তার সাথে যতই রাগ দেখাক না কেন সে আসলে জানে বুবু তাকে কতটা ভালোবাসে।
কাল সন্ধ্যায় হোচট খেয়ে পড়ে তার পায়ে একটা মরচে ধরা ছোরা ঢুকে যাওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু হয়নি। অথচ এতটুকুতেই সায়মার রকমসকম পাল্টে গেছে। সে আবেগে দুর্বল হয়ে গেছে।
-'বাবু, মঞ্জুরী বলছিল কাল রাতে সে যখন বাড়ি এল তখন নাকি তুই একাই সদরদরজার সামনে বসে ছিলি।নড়তে চড়তে পারছিলি না।
তাহলে তুই কাটা পা নিয়ে একা এতটা পথ হেটে এলি কিভাবে? '
সায়মার কথা শুনে সাফওয়ান চমকে উঠল।হঠাৎ তার মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেল। পুরো একদিন কেটে গেছে এরমধ্যে একবারও সেই ছায়ামানবীর কথা তার মনে আসে নি। আচমকা সাফওয়ানের চোখের সামনে সেই ধোঁয়াশায় ঘেরা সন্ধ্যেটা ভেসে উঠলো।
তার মতো অক্ষম আর দুনিয়াতে একটাও নেই। মেয়েটা না থাকলে তার দ্বারা কখনোই একাপথে হেটে বাড়ি ফেরা সম্ভব হত না।
-'কিরে সাফওয়ান, কথা বলছিস না কেন?'
সাফওয়ান কিছুটা ভাবুক হয়ে বলল,'একটা মেয়ে সাহায্য করেছিল।'
সায়মা সোজা হয়ে বসলো। ভুরু জোড়া কুচঁকে বলল,'মেয়ে!একটা মেয়ে তোকে এতটা পথ নিয়ে এসেছে? ওই ভর সন্ধ্যায় তুই মেয়ে পেলি কোথায়?'
হ্যাঁ রে, মেয়েটি দেখতে কেমন?'
সাফওয়ান বোনের দিকে তাকালো। তার সেই নির্মল আর অর্থহীন হাসি হাসল।শান্ত স্বরে বলল,'কিভাবে বলব বুবু,আমি তো মুখ দেখি নি।'
-'দেখিস নি মানে? তোকে কে সাহায্য করছে তাকে চিনে রাখবি না? বুদ্ধু কোথাকার !'
সাফওয়ান চিন্তিত হয়ে বলল,'ওটা মেয়ে না ছেলে আমি ঠিক শিওর না।শরীরে বড় চাদর জড়ানো ছিল।মেয়েও হতে পারে আবার অল্পবয়সী ছেলেছোকরাও হতে পারে।
তবে ছেলে বা মেয়ে যাই হোক। চোখ দুটো ভীষণ সুন্দর আর ধারালো। '
সায়মা অবাক হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালো।তাকিয়ে তার ভীষণ মায়া হল।ভাইটা কেন যে এত সোজা আর কৌতুহল হীন!
যে তাকে এতটা পথ ধরে নিয়ে এসেছে সে ছেলে কি মেয়ে সেটুকু জানার আগ্রহও এই ছেলেটার নেই।
সে বলল, 'সে যাই হোক, পরশুই তো রাফসানের বিয়ে।তুই যেতে পারবি তো?'
-'পারব বুবু।'
সায়মা চিন্তায় পরে গেল। বলল,' পারলে তো ভালোই। কিন্তু পরে যদি বিয়ে বাড়িতে গিয়ে কিছু একটা ঘটে যায়?'
সায়মা চুপ থেকে কিছুক্ষণ ভাবল।তারপর বলল,'যদি যেতে নাই পারিস তবে সরোজ কে আমি এখানে রেখে যাব। মঞ্জুরীর কোন ভরসা নেই।সে থাকবে তার নিজের তালে।'
সাফওয়ান ধীরে ধীরে উঠে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল।ভুরু কুচকে বলল,'সরোজ টা কে বুবু? এখানে আসার পর থেকেই শুনছি সবার মুখে এই নাম।'
-'আরে সরোজ কে চিনলি না? ওহ! তুই চিনবি কিভাবে সরোজ তো ছেলেদের সামনে যায় না।'
-'কে এই সরোজ বুবু? আর ছেলেদের সামনে যায় না কেন ?'
সায়মা হঠাৎ অপ্রতিভ হয়ে গেল।গম্ভীর গলায় বলল, 'সরোজ তো সবসময় কঠিন পর্দায় থাকে । পর্দা করলে কি ছেলেদের সামনে যাওয়া যায়?
যায় না তো।তাই ও কারো সামনে যায় না।
আমি এখন যাই বাবু। একটুপর আবার আসব।'
চলবে.......।

Romance
রোমান্স যায় না মরে
স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই বয়স হয়েছে ।
বৃদ্ধা বললেন :
-জানো, পঞ্চাশ বছর আগে তুমি আমাকে যেমন করে জড়িয়ে ধরতে , এখন আর তেমন করে জড়িয়ে ধরো না ।
স্বামী স্ত্রীকে আবেগে জড়িয়ে ধরলেন ।
স্ত্রী বললেন:
- জানো আগে তুমি আমার হাতে হাত রাখতে , এখন আর রাখো না । স্বামী স্ত্রীর হাতটি নিজের হাতে নিলেন ।
এবার স্ত্রী গদ গদ স্বরে আপন পতিকে বললেন সেই কিশোরী মেয়েটির মতো :
-জানো, তুমি আর আগের মতো আমার কানে আলতো করে একটু কামড়ও দাও না?
স্বামী এবার উঠে দাঁড়ালেন ।
স্ত্রী শঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন :
-কোথায় যাচ্ছ ?
স্বামী বললেন :
- এক সেকেন্ড , আমি বাথরুম থেকে আমার নকল দাঁত গুলি নিয়ে আসছি ।
মায়া_জাল
আমার ছমাস ধরে জমানো পাক্কা আট হাজার টাকায় কেনা স্টিলের আলমারীটা এই মাত্র পিক আপে পুরানো মালামালের সাথে তুলে দেওয়া হল। বিয়েতে আমার বর শশুর বাড়ী থেকে কিছু নেবেনা বলে যখন বাঁকিয়ে রইল তখন গা ভর্তি শাড়ী গহনা পরে শূন্য হাতে শশুর বাড়ীতে এলাম। গ্রামের চাচী,ফুফু খালারা যখন বৌ দেখতে এসে জানতে চাইতেন বৌ বাবার বাড়ী থেকে কি আনল তখন আমার শাশুড়ী মা সহাস্য মুখে বলতেন তার বাবার সবচাইতে মূল্যবান সম্পদটাইতো নিয়ে আসলাম আর কি আনার কথা বলছ বলতো?
যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে শহরে আমাদের দু রুমের বাসায় প্রথম যেদিন আমি সায়ানের সাথে এলাম সে রাতে মাদুর পেতে শুয়েছিলাম। মনে পড়ে লাইট, ফ্যান লাগিয়ে শুতে শুতে রাত আড়াইটা বেজেছিল। সারাদিনের জার্নি তারওপর এত ধকল শেষে কি নির্বিঘ্নে সেই খাট হীন তোশকহীন বিছানায় গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম আমরা। পরদিন শনিবার থাকায় সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিলাম। সকালে একটা হোটেলে চা পরাটা,সাথে সব্জি দিয়ে নাস্তা সেরে ছুটলাম চুলা,থালা বাসন,নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে। ফেরার পথে তোশক আর পর্দা কিনতে গেলাম। আমার পছন্দ নীল রং সায়ানের সবুজ। বিছানার চাদরটাও আমার ম্যাচিং হওয়া চাই। বেশ কিছুক্ষন দোমনা শেষে সায়ান হাল ছেড়ে দিল। স্কাই ব্লু পর্দা আর চাদর কিনে শেষ বেলায় আমার মনটা যে প্রশান্তিতে ছেয়ে গিয়েছিল আজ ঘর ভর্তি লাখ টাকার পর্দা আর শরীর ডেবে যাওয়া নরম বিছানাও আমাকে সে প্রশান্তি দিতে পারেনি।
বড় বড় চারটা বেড,বিশাল ড্রইং ডাইনিং তিনটা বেলকুনির এ ঝকঝকে বাসাটা জুড়ে যেন শুধুই শূন্যতা। এঘর থেকে ডাকলে ছেলে মেয়েদের কান অব্দি আমার গলাটা ঠিক সহজে পৌঁছয়না। অথচ আমার সেই ছোট দুরুমের বাসাটায় হোক ঝগড়া অথবা লুকোনো আলাপ সবটাই যেন বেশ সাবধানে উচ্চারণ করতে হত পাছে ছেলে মেয়েদের কানে চলে যায়। তখন বার বার মনে হত কবে যে নিজের একটা খোলামেলা খানিকটা বিস্তৃত বাসা হবে আমার। কিন্তু আজ যেন এই ১৬০০ স্কয়ার ফিটের বাসায় আমরা একেকজন দূর দেশের বাসিন্দা। তখন বাড়ীতে কেউ এলে গাদাগাদি করে থাকতে হত অথচ আজ যেন থাকার মতই তেমন কেউ নেই। শুধু মনে হয় এ শেষ বেলা বড্ড একলার, পুরোনো কেউ যদি একটু বেড়াতে আসত!
কাজের চাপে সময় দিতে না পারায় সায়ানের সাথে সপ্তাহে সপ্তাহে কথা বন্ধ করে রাখা সেই আমিই যেন আজ সায়ানের অফুরন্ত অবসরে বিরক্ত। বুড়ো বয়সে রাত দিন গল্প করার মত সেই গল্পেরা যেন বাজারের তালিকা আর ডাক্তারের পথ্যির হিসেবে আটকে আছে। ব্যাংক ভর্তি টাকা আর নির্ঝঞ্ঝাট জীবনে যেন চাইলেও কোথায় বেরিয়ে পড়তে মন চায়না। অথচ কত দিন আবদার করে দু ঈদের বোনাসের টাকা বাঁচিয়ে আমি আর সায়ান তিনদিনের ছুটিতে আমাদের চার বছরের ছেলেকে নিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। সে কি আনন্দ, কি উচ্ছাস। স্বপ্নের মত ছিল সেই তিনটা দিন যেন। আজও ভাবলে মনের কোণে আনন্দেরা ঢেউ খেলে যায়। এর পর আরো দু একবার বেড়িয়েছি বটে তবে সময়ের সাথে সেই সুখের অনুভূতিরা ফিকে হয়ে এসেছে যেন। একটা সময় শখ ছিল সাধ্য ছিলনা আজ সয়ংসম্পূর্ণ সায়ান - অদিতির শখটাই যেন মরে গিয়েছে অথবা বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছে।
একটু একটু করে দু জনে মিলে সংসারটা গুছিয়েছিলাম, আজ ডাইনিং তো কাল টিভি। আমার আবার খুব ঘর সাজানের সখ ছিল বের হলেই কিছুনা কিছু কিনতাম,শাড়ী গহনার চাইতেও ঘরটাকে অলংকৃত করতেই যেন শান্তি খুঁজে পেতাম। সায়ান যখনই বলত কি চাই? কিছু না ভেবেই সংসারের জন্য কিছু একটা চেয়ে বসতাম। একবার ব্লিন্ডার তো আরেকবার ওভেন। আহা! সেই এক একটা জিনিস কেনায় যে তৃপ্তি ছিল তা যেন আজ আমার সাজানো সংসারের নতুন অগনিত আসবাবেও নেই। এখন আমার ইজি চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে সৌখিন চায়ের কাপ হাতে আকাশ পানে চেয়ে থাকার চাইতেও যেন ঘাম মুছতে মুছতে সায়ান অফিসে যাওয়ার আগে হাজারটা কাজের ফাঁকে একসাথে দু চুমুক চা পান করাটায় কি এক অজানা সুখ লুকিয়ে ছিল।
সায়ান আমাদের পুরোনো সব মালামাল একটা পিকআপে তুলে দিচ্ছে। ওসব এবাড়িতে মানানসই না। আমার ছেলে সৈকত তার বাবাকে সাহায্য করছে, মেয়েটা মনের সুখে গুনগুনিয়ে তার ঘর গোছাচ্ছে। নতুন ফ্লাট নতুন আসবাব নতুন এলাকা কিন্তু কেন যেন আমার ভেতরে ভেতরে কান্নারা দলা পাঁকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমি জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে দেখছি আমার মেয়ের পড়ার টেবিলটা ওটা বানিয়েছিলাম অরিন যখন ক্লাস থ্রিতে,সেই থেকে ইন্টার পর্যন্ত ঐ টেবিলটায় ও পড়ত,কি যে এলোমেলো করে রাখত আমি রোজ বকতে বকতে টেবিল গোছাতাম। তার পাশেই রাখা মিটসেল্ফটা, মিস্ত্রীকে নিজে বলে বুঝিয়ে বানিয়েছিলাম খাবার গুলা রাখতে বেশ সুবিধা হত তাতে। আর তার পাশেই আমার ছমাসের জমানো আট হাজার টাকায় কেনা স্টিলের আলমারীটা। কেনার পর আমার সে কি আনন্দ, বেশ করে শাড়ীগুলা এক তাকে,সায়ানের স্যুট গুলা আরেক তাকে হ্যাংগারে,ছেলে মেয়েদের বাহিরে পরা কাপড় গুলা ভিন্ন ভিন্ন তাকে গুছিয়ে রেখে ছিলাম। ওটাই ছিল আমার সকল সম্পদের রক্ষক। অলংকার গুলা, জমানো টাকা যা কিছু মূল্যবান কি যত্ন করে আগলে রেখেছিল এ কুড়িটা বছর। মনে হয় এই তো সেদিন ঠিক আমার সন্তানের মত ঘর আলো করে ওরা এল, কত আনন্দ। অথচ আজ কত অবহেলায় ওরা বেরিয়ে যাচ্ছে আমাদের কত সুখী সংগ্রামী জীবনের সাক্ষী হয়ে।
প্রথম জীবনের সব কিছুই বুঝি সুন্দর হয়। সংসার জীবনের প্রথম দিকে দোকান ঘুরে ঘুরে আমাদের ছোট ছোট নিত্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, পছন্দ না হলে ফিরে আসা,অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে বড় শখ করে কেনা অতি সাধারণ প্রাপ্তীগুলাতে সুখ গুলা ছিল বাঁধন হারা। এখন আর শখ বলে কিছু নেই সবই যেন বিলাসীতা। যা কিছু চাওয়া মাত্রই আমার, তাকে পাওয়াতে যেন আমার ব্যাকুলতা নেই,নেই সীমাহীন সুখ। তাই বুঝি আমাদের কোয়াটারের সেই ছোট্ট বাসাটায় আমাদের ফেলে আসা টুকরো টুকরো স্মৃতিরা অশরীরির মত ঘুরে বেড়ায়। আমার এই ঝকমকে জীবন থেকে আমাকে হঠাৎ হঠাৎ স্মৃতিরা টেনে নিয়ে যায় সায়ানের সাথে ভালবাসা মান অভিমানের অলিতে গলিতে,সন্তানদের ছেলেবেলার বেসামাল দুষ্টুমিতে আর আমার পরিপাটি করে সাজানো অতি সাধারন সেই সংসারে।
সংসার আসলে একটা মায়ার ভান্ডার,এর সবটুকুই যেন মায়া। দেওয়ালে ঝুলানো ওয়াল ম্যাটটায়, চায়ের ছোট্ট পাতিলটায়, ড্রয়িং রুমের ফুলদানিটায়, জানালায় রাখা লতানো পাতাবাহারটায় যেন ভালবাসা আর মায়ার প্রতিচ্ছবি। নিজ হাতে পালা সন্তান, অথবা নিজ হাতে কেনা শো পিস হয়তবা নিজ হাতে পাক করা খাবার এর কোনটাই ভালবাসার উর্ধ্বেনা। সবটা মিলেমিশে এক অদ্ভূুত মায়াজাল তৈরী করে আমাদেরকে আঁকড়ে ধরে রাখে একে ওপরের সাথে তাই বুঝি যতই এগোতে চাইনা কেন কোথায় যেন পুরোনো একটা সুতার টান রয়েই যায় তা চাইলেও উপেক্ষা করা যায়না।

কলিযুগের দোষ নয় গুন বিচার করুন ||
''মহারাজ পরীক্ষিৎ ছিলেন মধুকরের মতো সারগ্রাহী । তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন যে , এইকলিযুগে শুভ কৰ্ম সম্পাদন করার ইচ্ছামাত্ৰই তার ফল পাওয়া যায় , কিন্তু অশুভ কৰ্মসমূহেরক্ষেত্ৰে সেরুপ হয় না , সেগুলি অনুষ্ঠিত হলেই ফল দান করে । তাই তিনি কলিযুগের প্রতিবিদ্বেষী ছিলেন না''।
কলিযুগকে বলা হয় অধঃপতিত যুগ ।
১। কলিযুগে সমস্ত মানুষের আয়ু খুব অল্প।
২। তারা কলহপ্রিয়, একে অন্যের সাথে সর্বদা ঝগড়া করে।
৩। তারা খুব অলস, তারা কর্মবিমুখ ও ঘুমিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় নষ্ট করে। বিশেষ করেপারমার্থিক বিষয়ে অত্যন্ত অলস।
৪। মন্দগতি, তারা মায়া দ্বারা চালিত, শ্রাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাহীন। তাই তাদের অন্তিমে বা মৃত্যুর পরসদগতি হয় না।
৫। ভাগ্যহীন, তারা চেষ্টা করেও সত্যের সন্ধান পায় না তাই তারা চিন্ময় আনন্দ থেকে বঞ্চিতহয়।
৬। তারা অনিয়ম ও অনাচার জীবন-যাপন করে সারাজীবন বিভিন্ন রোগাদি দ্বারা আক্রান্তথাকে।
কলিযুগের মানুষ আরও অন্যান্য দোষে জর্জরিত যেমন,
১) ভুমি দোষ, আমরা গৃহকে আনন্দ ফুর্তির জায়গা মনে করি। কখনও গৃহকে ছেড়ে যেতে চাইনা। পবিত্র জায়গা ভগবানের ধাম, তীর্থস্থানে বা মন্দিরে যেতে চাই না। বরং খেলার মাঠ, সিনেমা হল বা সুন্দর কোন পার্কে ঘুরতে যাই ছুটিতে। কিন্তু আমরা ইচ্ছা করলেই গৃহকে কৃষ্ণেরমন্দির করে গৃহেই ভগবানের সেবা করতে পারি।
২) সঙ্গ দোষ, আমরা সারাদিন অসৎসঙ্গে মেতে থাকি। কখনও সাধুসঙ্গ করতে ভালবাসি না।বরং সাধুদের দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেই।
বিবাহিত স্ত্রী ও স্বামীকে ধর্মাঙ্গীনি না ভেবে ভোগের সামগ্রী মনে করি।
৩) অন্ন দোষ, আমরা সারাদিন অখাদ্য , কুখাদ্য খেতে ভালবাসি। ভগবানের প্রসাদের প্রতিআসক্তি করতে পারি না বরং জন্মদিনে, বিয়ের অনুষ্ঠানে বা বিভিন্ন পার্টিতে কাচ্চিবিরানি খেতেজিভে জল আসে।
আবার মানুষ রাজনৈতিক দলের শিকার, বিভিন্ন ইন্দ্রিয়তৃপ্তির প্রলোভন যেমন, সিনেমা-টিভি, অনর্থক খেলাধুলা, জুয়া, ক্লাব, জড়-জাগতিক গ্রন্থাগার, ধুমপান, আসব পান, প্রতারণা, চুরি ওবাটপাড়ি ইত্যাদি।
জয়পতাকা স্বামী গুরুমহারাজ বলেছেন, ''ভাগবতে উল্লেখ আছে গৃহস্থ সংসারে গৃহমেধীরাকিভাবে জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। গৃহস্থ জীবনের প্রথম আকর্ষন হচ্ছে সুন্দরী এবং স্নেহশীলাপত্নী, যার আকর্ষনে গৃহের বন্ধন দৃঢ থেকে দৃঢতর হয়।
মানুষ তার পত্নীর সঙ্গ দুইটি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা উপভোগ করে -- জিহ্বা ও উপস্থ।
স্ত্রী অত্যন্ত মধুরস্বরে আলাপ করে। তারপর সে জিহবার তৃপ্তির সাধনের জন্য সুস্বাধু আহারতৈরী করে এবং জিহবা যখন তৃপ্তিসাধন হয় তখন অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলি বলবান হয়ে উঠে, তখনপত্নী মৈথুনের মাধ্যমে তাকে আনন্দ দান করে''।
▪️অধঃপতিত কলিযুগের সমস্ত জীবেরা অত্যন্ত দুৰ্দশাগ্ৰস্ত বলে পরমেশ্বর ভগবান তাদের কিছুবিশেষ সুবিধা প্ৰদান করেছেন ।
তাই ভগবানের কৃপায় , পাপ কর্মের অনুষ্ঠান না করা পৰ্যন্ত জীবকে পাপের ফল ভোগ করতে হয়না । অন্যান্য যুগে পাপ কথা চিন্তা করা মাত্র কর্মের ফলেই কেবল জীবকে সেই কর্মের ফল ভোগকরতে হত।
পক্ষান্তরে , এই কলিযুগে পুণ্য কর্মের কথা চিন্তা করলেই কেবল তার ফল লাভ করা যায়।
ভগবানের কৃপায় মহারাজ পরীক্ষিৎ ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ রাজা , তাই তিনিকলির প্রতি অনৰ্থক বিদ্বেষপরায়ণ ছিলেন না , কেননা তিনি তাকে কোন পাপ কৰ্ম করারসুযোগ দিতে চাননি। তিনি তার প্রজাদের কলিযুগের পাপময় প্রভাব থেকে রক্ষা করেছিলেন , আবার সেই সঙ্গে তিনি কলিকে সমস্ত সুযোগ দিয়েছিলেন কতকগুলি পাপময় স্থানে থাকবারঅনুমতি দিয়ে ।
▪️শ্ৰীমদ্ভাগবতের শেষে বলা হয়েছে যে , কলিযুগ যদিও একটি পাপের সমুদ্ৰ কিন্তু এই যুগে একটিমহান গুণ রয়েছে । তা হচ্ছে কেবলমাত্ৰ ভগবানের দিব্য নাম জপ ও কীৰ্তন করার ফলে মানুষঅনায়াসে এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে।
''হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে''।।
▪️এইভাবে মহারাজ পরীক্ষিৎ ভগবানের দিব্য নাম প্রচারের এক সুসংবদ্ধ প্ৰচেষ্টা করেছিলেনএবং কলির কবল থেকে তার প্রজাদের রক্ষা করেছিলেন । এই বিশেষ সুবিধাটির জন্যইদেবতারা ও মহৰ্ষিরা কখনো কখনো কলিযুগের শুভ কামনা করেন । বেদেও বলা হয়েছে যে , শ্ৰীকৃষ্ণের কার্যকলাপের কথা আলোচনার ফলে কলিযুগের সমস্ত দোষ থেকে মুক্ত হওয়া যায় ।
▪️শ্ৰীমদ্ভাগবতের শুরুতেও বলা হয়েছে, ভাগবত পাঠ করার ফলে ভক্ত পরমেশ্বর ভগবানেরহৃদয়ে বন্দী হয়ে যান । এইগুলি কলিযুগের কয়েকটি বিশেষ গুণ এবং মহারাজ পরীক্ষিংসেগুলির পূৰ্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন। একজন প্ৰকৃত বৈষ্ণব হওয়ার ফলে তিনি কলির কোনঅমঙ্গল কামনা করেননি ।
আসুন, এই কলিযুগের বিশেষ গুণ পেতে প্রতিদিন গীতা, ভাগবত শ্রবন ও কীর্তন এবংভগবানের দিব্যনাম হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন করে ভগবদ্বামে ফিরে যাই।
(সবাই like, share ও comment করুন)
।।সদগুরুর আশ্রয় নিন।।জয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।।

অহনার সুখ দুঃখ
▪
— আম্মা পা টিপে দেই?
— থাক আর ঢং করন লাগবে না
— আম্মা ঢং করতেছি না তো
— বৌমা আমার সাথে বেয়াদবি না করলে, তোমার ভালো লাগে না!
— আম্মা কী বেয়াদবি করলাম!
— এই যে অহনো তো মুখে মুখে তক্কো করতেছো।
অহনার খুব কষ্ট হয়। ওড়নার এককোণায় মুখ চেপে শাশুরির রুম থেকে বের হয়ে আসে। শুনতে পায়, শ্বশুরকে অভিযোগের সুরে তিনি বলছেন,
— দেখছ দেখছ, কতবড় বেয়াদব মাইয়াটা। মুখের উপর মুখ ঝামটা দিয়া চইলা গেল।
শ্বশুরের কণ্ঠও শুনতে পায়,
— আরে বাদ দাও তো জেবুন্নেছা। পর কি কখনো আপন হয়!
এবারে অহনার কষ্ট তীব্র হয়। উনিও আজ এই কথা বললেন! এই বাড়ীতে একমাত্র শ্বশুর সাহেবকেই যৌক্তিক মানুষ বলে মনে করত সে। আজকাল তিনিও শাশুড়ির সব কথাতেই তাল মেলাচ্ছেন কোনোকিছু না জানতে চেয়ে, না শুনতে চেয়েই!
গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। দেয়াল ধরে ধরে কোনোমতে বিছানায় গিয়ে শুয়েছে। তারপর কোন ফাঁকে ঘুমিয়ে পড়েছে, সকালও হয়ে গেছে একবিন্দুও টের পায়নি। সাধারণত এমন কখনোই হয় না তার। চার বছরের সংসার জীবনে এমন হয়নি যে শ্বশুর শাশুড়ির জন্য রান্না করে, তাদেরকে রাতে না খাইয়ে, নিজে খেয়েছে। বিয়ের দুবছর পরই রোমেল ডিভি লটারি পেয়ে আমেরিকা চলে গেল। বলতে গেলে তারপর থেকেই এই দুইটা মানুষের সব দায়-দায়িত্ব একহাতে সামলাচ্ছে সে। ননদ ইমা যদিও ঢাকাতেই থাকে, কিন্তু একটা কলেজে চাকরি করায় একদমই সময় পায় না। আর ওর বাচ্চাদুটোও ছোট। রাস্তার এপার ওপার বাসা যদিও, সেভাবে আসার সুযোগ সময় পায় না। তবে যেদিন আসে, অহনা একটু তটস্থই থাকে। কোথায় কি দোষ ধরবে, খুব টেনশন হয়। দেখা গেল সমস্যা তেমন কিছুই না, কিন্তু ইমা বিষয়টাকে টেনেটুনে এত বড় করবে, সেটা হেঁটে হেঁটেই আমেরিকাতেও চলে যায়। একবার সে এসে আম্মার পরনের শাড়িটা খানিক অংশ ছেঁড়া দেখল। অহনার চোখে আগে পড়েনি সেটা। সেটা নিয়েই তুমুল হয়ে গেল। নিজের মেয়ে বলেই চোখে পড়েছে, পরের মেয়েরা কি আর তাকায়েও দেখে... পর পরই... পর কি কখনো আপন হয়! ছেলে বিদেশ বিভূঁইয়ে থেকে কষ্ট করে কাজকম্মো করে টাকা পাঠায়, সেই টাকা দিয়ে কী বাপ মার কপালে ভালো কাপড়ও জুটবে না! ইত্যাদি ইত্যাদি।
অহনা সেদিন কোনো কথা বলেনি। কথা বলেনি কেন, সেটাও হয়েছে বিশাল এক অপরাধ। সে দেমাগী, অহংকারের চোটে মুখ দিয়ে কথাই বেরোয় না, নানান কথাবার্তা। তাকে এখন এমন একটা অবস্থার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে, প্রতি মুহূর্তেই ভীষণ আতংক লাগে! পা বাড়ানোর আগে একবার ভাবে, ফেলার পর আরেকবার ভাবে, একটা কথা বলার আগে একবার ভাবে, বলার পরে একবার ভাবে— কোনো ভুলই হয়ে গেল নাকি! সে মন থেকেই চায় বয়স্ক এই মানুষ দুটোকে শান্তিতে রাখতে, একটু ভালো রাখতে। নিজের বাবা মাকে হারিয়েছে আরো কয়েক বছর আগেই। উনাদেরকে মন থেকেই বাবা মা জ্ঞান করে অহনা। এ নিয়েও কথা শুনতে হয়েছে,
'বৌয়ের নিজের বাপমা নাই, অন্যের বাপ মারে আর কেমনে নিজের মনে করব!পর কি কখনো আপন হয়!'
সবচেয়ে কষ্ট হয় রোমেলও যখন ভুল বুঝে। টানা সাতবছর প্রেম করে তবেই বিয়ে করেছে। অহনাকে সে তো রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনে। সে কেন আম্মার কথাতে তাকে ভুল বুঝবে, তাকে পড়শ্ন করবে কিছুতেই মানতে পারে না। একদিন যে কোনো কারনেই হোক বাড়িতে কোনো বাজার ছিল না। হাতের কাছে যা পেয়েছে রান্না করে দিয়েছে, পটলের ভর্তা আর ডাল। সে নিয়ে পারলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধই যেন বেঁধে যায়। রোমেল ফোনের মধ্যেই অহনাকে রিমান্ডে নিল,
প্রতিমাসে আমি যে টাকা পাঠাই সেগুলো কই যায়! বাপ মাকে পটল দিয়ে ভাত খাওয়ানোর জন্য আমি কষ্ট করি! টাকাগুলো যায় কোথায়!
রাতের বেলায় ইমা এলো। টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে মুরগির মাংস, ইলিশ মাছ, তিনরকম ভর্তা সাথে। শাশুড়ি সে দেখেই বলে উঠল,
'পর কি কখনো আপন হয়!'
কয়েকদিন আগে শাশুড়িসহ নিউ মার্কেটে গিয়েছিল অহনা। ফেরার পথে তিনিই বললেন,
— বৌমা চলো ইমার বাড়ীত যাই। হের কলেজ ছুটি, বাড়ীতই আছে, দুপুরে ওইখানেই খাব। তোমার আব্বারে ফোন কইরা বইলা দাও। মোমেনায় ফ্রিজ থিকা খাবার বাইর কইরা গরম কইরা দিব।
ইমা জানত না, তারা যাবে। দুপুরে তেমনকিছু রান্নাও করেনি। বাবুদের জন্য আগের দিনের রান্না করা চিকেন ছিল, সেটা দিয়েই খাইয়ে দিবে, আর নিজের একবেলা খাওয়ার জন্য একটা কাঁকরোল ভেজে রেখেছে। অহনারা যখন সেখানে গেছে, আম্মার প্রচন্ড খিদে লেগেছে। ডায়াবেটিকের রোগী, খিদে সহ্য করতে পারেন না তিনি। ইমা অন্যকিছু রান্না করতে চাইলেও, আম্মা কাঁকরোল ভাজি দিয়েই ভাত খেল। অহনার খুব টেনশন হচ্ছিল, যেহেতু সে জানে পৃথিবীতে এই একটা পদের তরকারীই শাশুড়ির খুব অপছন্দ। শেষমেশ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। আম্মা সেটা দিয়ে ভাত খাওয়া শেষে বলল,
— আলহামদুলিল্লাহ্ শান্তি কইরা খাইলাম। বৌমা বুঝছ তরকারি-মরকারি কিছুই না, নিয়তটাই হইল আসল।
অহনা শুধু মিটিমিটি করে হেসেছিল, কোনো কথা বলেনি। সেদিনের কথা কেন জানি মনে পড়ছে তার আজ। মনে মনে ভাবছে, তার নিয়ত তো শতভাগ শুদ্ধ। গতরাতে কিছু রান্না না করে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে সত্যিই সত্যিই সে অপরাধবোধে ভুগছিল। সেটা থেকেই শাশুড়ির কাছে গিয়ে বলেছিল, আম্মা পা টিপে দেই। নিশ্চিত সে, তার নিয়ত একশভাগ খাঁটি। খুব চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না! তার জীবনের ধ্যান জ্ঞান, চাওয়া পাওয়া, সুখ সাধনা, আহ্লাদ বাসনা সবকিছু এখন ওই একটা লাইনের মধ্যে এসেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যেভাবেই হোক, যা করেই হোক, সে আর বয়স্ক ওই মানুষদুটোর মুখে সেই লাইনটা একটিবারের জন্যেও শুনতে চায় না,
'পর কি কখনো আপন হয়!'
▪▪
অহনার হঠাৎ করেই আচার খেতে ইচ্ছে করছে খুব। এই জিনিসটা ছোটবেলা থেকেই ভীষণ প্রিয় তার। মনে পড়ে, ছোটবেলায় কেবল তারজন্য বাবা বাজার থেকে বস্তা বোঝাই বড়ই নিয়ে আসত। মা সেগুলো অনেক যত্ন করে, সময় নিয়ে রোদে শুকাতে দিত। বড় ভাইয়ার দায়িত্ব ছিল সকালবেলা চটের বস্তাটা নিয়ে ছাদে উঠা, বস্তা খুলে বড়িগুলো একটা বেতের পাটিতে মেলে দেয়া। আবার সন্ধ্যার আগ দিয়ে সেগুলো গুছিয়ে ছাদ থেকে নামানো। মাঝখানে বৃষ্টি হলে পড়িমরি করে ছুট। বড় ভাইয়া মুখে খুবই বিরক্তি দেখাত। অহনাকে বলতও মাঝে মাঝে,
— তোর জন্যই প্রতিবছর আমাকে এই এক্সট্রা পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
যদিও মুখে বহু হিল্লিদিল্লি কথাবার্তা বলত, কিন্তু ভাইয়ার জান অহনা। সেও সেটা জানে। মেঘ কালো হলে মার বলতে হতো না। নিজেই ছুটে ভাঙা প্রাচীর বেয়ে নিমেষেই ছাদে উঠে যেত বড়ইগুলো গুছিয়ে ফেলতে। বড় ভাইয়া জীবনেও একটি দানা আচার খায়নি। ছোটবেলা থেকেই টক জাতীয় কিছু সে আসলে সহ্য করতে পারে না। মা যখন সন্ধ্যায় সব এন্তেজাম করে আচার বানাতে বসত, হঠাৎ মনে হতো কানিকটা তেঁতুল দিলে ভালো হয়। সাথে সাথে ভাইয়ার ডাক পড়ত,
— শফিক, কয়ডা তেঁতুল আইনা দিবি বাবা!
ভাইয়ার তখন এসএসসি পরীক্ষার টেস্ট চলে। সবকিছু ফেলে ভাঙ্গা সাইকেল নিয়ে আধাঘন্টা পথ দূরত্বের বাজার আয়না বিবির হাটে চলে যেত। তেঁতুল আনতে আনতে ততক্ষণে বাবাও অফিস থেকে চলে আসে। তারপর বাবা, মা, বড় ভাইয়া, অহনা সবাই একসাথে চুলোর উপরে বসানো বড় পাতিলটার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকত, যেন গরুর মগজ রান্না হচ্ছে।
গরুর মগজের কথা মনে হতেই অহনা ফিচ করে হেসে ফেলে। এই একটা জিনিস, বছরে হয়তো দুই চারবারই রান্না হতো। কিন্তু যেদিন রান্না হতো সেদিন ভাইয়া আর বাবা যেন আবাহনী মোহামেডান। এমন ঝগড়া বেধে যেত অহনা নিজের পাতের থেকে একটু বাবাকে একটু৷ ভাইয়ার পাতে তুলে দিত। মাও তাই করত। সেই থেকেই মা আর তার বলাও শুরু,
— মগজ খাইতে পারি না। কেমব একটা কাঁচা কাঁচা গন্ধ। এএ্
অহনার এখন বেশিরভাগ সময়েই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। আর সেসব মনে পড়লেই চোখ থেকে রাজ্যের জল নামে। তার চোখে এত জল কবে জমল টেরই পায়নি অহনা।
এমন সময়ই জেবুন্নেসা কোমড়ে হাত দিয়ে হুট কটে ঘরে ঢুকে।তড়িঘড়ি করে চোখ মুছার চেষ্টা করে। কোমড়ের ব্যথা আর বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়লে কি হবে, মাশাল্লাহ আম্মার চোখের পাওয়ার এখনো টনটনা। দেখে ফেলে বৌয়ের চোখে জল। এই শুরু হলো আরেক মুছিবত।
জেবুন্নেসা শুনবেই কী কারণে সে কান্না করছিল। এই কথা না শুনা পর্যন্ত কেউ তাকে শান্ত করতে পারবে না।
— বৌ কি হইছে গো। কানতাছো কেন। কও আমারে
— আম্মা না, এমনিতেই।
জেবুন্নেসা খেঁকিয়ে উঠে,
— ওই মিয়ে বেয়াদবে মতো মিছা কথা কও কেন! আমারারেও কিছু কওন যায় না। আমরা তোমার কিছুই না।
অহনার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিম্তু সে কাঁদেও না, কিছু বলেও না। শাশুড়ির কণ্ঠ এবারে কিছুটা নরম হয়,
— কে গো মিয়ে, রুমেলের জন্য মন পুড়ে? কালকাই ত কথা কইলা, নাকি কও নাই। কাইলকা ফোন করছোল না গো।
— না আম্মা কালকে ফোন করছে তো। অনেকক্ষণ কথাও হইছে।
শাশুড়ি গজগজ করে,
— পুলাডাও একটা আস্তা বডমাইস। ক্যারে তুই যদি অমন ফুটফুটে একখান বউরে ঘরে রাইখা বিদেশই যাইবি। বিয়া বইলি ক্যা। দুইটা বছর গেল। মিয়েডা এক্কেরে একলা। কাহাতক তার আর ভাল্লাগবো।
এবারে অহনা ভয় পায়। আল্লাহই জানে আম্মা ভুল বুঝতেছে কিনা! শেষমেষ দেখা যাবে, বিষয়টা এমনই জলঘোলা হয়েছে, রোমেলের কানে যাবে আর সে ভীষণ মন খারাপ করবে! রোমেলের মন কোনোভাবেই খারাপ করিয়ে দিতে চায় না। সে জানে ওখানে সেও খুব ভালো নেই। সারাক্ষণই তার কথা ভাবে। তাছাড়া রোমেল খুব চেষ্টা করছে এ বছরের শেষে এসে তাদেরকে নিয়ে যাবেও হয়ত। অবশ্য অহনা যদি একা যেতে চাইত, গতবছরেই আমেরিকায় চলে যেতে পারত। কাগজ পত্র ভিসা সবই রেডি ছিল। শ্বশুর শাশুড়িও পইপই করে বলেছে,
— যাও বৌমা যাও। আমরা দুইটা বুড়া মানুষের দেখতে দেখতে ঠিকই দিন চইলা যাইব।
অহনা মন থেকে সাড়া পায়নি। মানুষদুটোর উপর কেমন একটা মায়া জন্মেছে। যতদিন যায় উনারা যেন ছোট বাচ্চাদের মতো আচরণ করে। একটুতেই গাল ফুলায়, একটুতেই রাগ করে, একটুতেই মুক হাউপ, কথা বন্ধ। অহনা পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে, পা টিপে দিলে সাথে সাথে সব শেষ। যদিও শাশুড়ির রাগ ভাঙানো অতটা সহজ না, তবু হাল ছাড়ে না অহনা। সে আমেরিকায় চলে গেলে এই দুটো বু্ড়োবুড়ি সত্যিসত্যিই ভীষণ একা হয়ে যাবে। নিঃসঙ্গতার কষ্ট সহ্য করার মতো মানুষ এরা নয়। অহনা মাঝে মাঝে কষ্ট পায়, ভাবে সিদ্ধান্তটা ভুল হয়েছে। চলে গেলেই, তাকে উনাদের কাছে আর এত কষ্ট পেতে হতো না।
অহনা রিস্ক নিতে চায় না। শাশুড়ির কাছে সত্য ঘটনা খুলেই বলে।
— আম্মা, ওগুলো কিছু না। রোমেল ভালো আছে। ইনশাআল্লাহ আমাদের এই বছরের শেষে নিয়েও যাবে, ও নিয়া এেমনশন কইরেন না তো আম্মা। হঠাৎ করে ছোটবেলায় মায়ের আচার বানানো দিনগুলার কথা মনে হইল। এইজন্য খারাপ লাগতেছিল আম্মা।
জেবুন্নেসা আর কিছু বলে না। বৌ কে যা বলতে এসেছিল ভুলে গেছে। অহনার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল কেবল। আবার কোমড়ে হাত দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে তার ঘরে চলে গেল।
ঘরে গিয়েই জেবুন্নেসা দারোয়ান আতিককে ফোন দিয়ে উপরে আসতে বলে। আতিকের হাতে একটা লিস্ট আর ৩হাজার টাকা ধরিয়ে দেয়। তাকে শক্ত করে বলে দিল,
— লিস্টে যা যা লিইখা দিছি একটাও যান বাদ না পড়ে। আন্ধার মতো আবার যাই ধরায় দিব নিয়া চইলা আইবি না। একটু চোখ দুইটা খুইলা, হাত দুইটা দি দেইখা দেইখা সদাই আনবি। খারাপ কিছু আনলে তোর মাথায় ভাঙ্গব।
আতিক বলে,
— জে আচ্ছা আম্মা।
এই বুড়ি কাজ দিলে খুশিই হয় সে। সারাক্ষণই গজগজ করবে, খটমট বাঁধাবে কিন্তু বকসিস দেয়ার বেলায় অত্র বিল্ডিংয়ে এই আম্মাই সবচেয়ে বেশি দেয়। তাছাড়া ভালো কিছু রান্না হলেও ডাকে। প্লেট ভর্তি তরকারি খাবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে,
— দুধ কলা দিয়া একটা কালসাপ পুষতাছি। ল, ধর। আরো লাগলে আইসা নিয়া যাইস। খাওনের সময় নয়া বৌয়ের মতোন লইজ্জা কইরা কোনো লাভ নাই।
আতিক একমাত্র চারতলার এই আম্মার বাজার করার সময়েই খুব ভালো মতো দেখেশুনে সদাই করে। এবং আরো আশ্চর্যের বিষয় যেটা আতিক নিজেও ভাবে, সবার বাজার করতে গেলে যেখানে দশ বিশ ত্রিশ যত পারা যায়, হাপিস করে দেয়, সেখানে এই চারতলার আম্মার একটা পয়সা এদিক সেদিক করতে পারে না। মনে আসলেও, নিজে নিজের গালে চড় মেরে মনকে ঠান্ডা করে।
অহনার শ্বশুর রহমান সাহেবের শরীরটাও আজকে অতটা ভালো না। সকালে নাস্তা করা থেকেই বিছানায়। এর মধ্যে একবার জেবুন্নেসাকে ঘরে ঢুকে আলমারির উপর থেকে কাগজ কলম নিয়ে কিজানি লেখতে দেখল। দেখে মনে হলো কোনো ফর্দই তৈরী করছে। রহমান সাহেব ঠিক মনে করতে পারে না, শেষবার কবে জেবুন্নেসাকে নিজ হাতে বাজারের ফর্দ লিখতে দেখেছে। একটা শব্দ লেখতে হলেও যে মহিলা বৌরে ডাকে, সে কী এমন বিষয় এত মনোযোগ দিয়ে নিজ হাতে লিখছে! রহমানের খুব আগ্রহ হয়। গলা খাকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি গো, কি লিখতাছো! দলিল দস্তাবেজ নাকি!
জেবুন্নেসা কাগজে লিখতে লিখতেই বলে,
— তোমার সব বিষয়ে এত আগ্রহ কেন বুঝিনা। একটা মানুষ হারাটা দিন কেমনে এইভাবে বিছানায় শুয়া বইসা কাটায় বুঝি না বাবা। আইলসার আইলসা মানুষ আমার দুচক্ষের বিষ।
রহমান সাহেব যতটা আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করেছিল, ততটাই চুপসে যায়। ইদানিং বলে না, সবসময়ই জেবুন্নেসার মাথায় রাগ যেন বসে থেকে অপেক্ষাই করে। কোনোকিছু মনমতো না হলে সাথে সাথে সেটা ঝাঁপিয়ে বের হয়। রহমান আগেও তার রাগকে যমের মতো ভয় পেত, এখন ভয় পায় যমের থেকে বেশি।
দুঘন্টা পরেই আতিক এসে হাজির। দরজা খুলেছে অহনাই। হাতে বাজারের ব্যাগ দেখে কিছুটা বিষ্মিত। হঠাৎ আম্মা আবার কী আনাল! দুদিন আগেই আম্মাসহ গিয়ে সুপার শপ থেকে বাজার করে এনেছে। ফ্রিজে একফোঁটা জায়গা বাকি নেই। এখন কিছু ভরাতে হলে পাশের বাড়ির ভাবির ফ্রীজেই রাখতে হবে। অহনা বাজারের ব্যাগদুটো নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে। শাশুড়িও সেই সময়ে রানাঘরে ঢুকল।
— বৌমা তুমি ঘরে যাও। হালিমার মা আইসা এগলা গোছ করবে।
— এগলা কি আম্মা?
— মরো জ্বালা। তোমাগো সব বিষয়ে এত প্রশ্ন ক্যা গো। আমার কিছু মনে চাইতে পারে না।
বলতে বলতেই ব্যাগের ভেতর থেকে সদাইগুলো নামাতে শুরু করেছে অহনা। একটা করে জিনিস নের করে, আর তার চোখ বিস্ফারিত হয়,
শুকনা বড়ই, গুড়, আচারের মসলা, কালো জিরা, সরিষার তেল, বিট লবন, দুই দলা তেঁতুল...
— আম্মা এগলা কি?
— বউ, চউক্ষে দেখো না তুমি? এগলা আচার বানানির সারঞ্জাম। আমার জিব্বা আচার খাওনের লাইগা টগবগ করতাছে। তাই এইগুলান আনাইছি। এখন আমি নিজ হাতে এগলা দিয়া আচার বানাব। ক্যা তোমার কোনো সমস্যা আছে, ও ওই!
আকাশ ভেঙে অহনার চোখে পানি আসছে। সে জানে তার বড় ভাই আর শাশুড়ি একই গোত্রের। টক জাতীয় জিনিস তাদের শত্রু। আম্মার আচার খাওয়ার সাধ জেগেছে, মরে গেলেও বিশ্বাস করে না সে। মুখে ওড়না চাপা দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সোজা নিজের বিছানায় গিয়ে মুখ চাপে অহনা। চোখের পানি আটকে রাখার বিন্দুমাত্র শক্তি তার আর নেই। এমনকি সেটাকে আটকে রাখতে ইচ্ছেও করছে না অহনার...
▪▪▪
— আম্মা আমি কিন্তু এবার আর কোনো কথা শুনব না
— ঢং কইরো না তো বউ।
— ঢং হইলে হোক। একশ বার ঢং করব।
— দেখছ, তোমার ছেলের বউ কত বড় বেদ্দপ। আমার মুখের উপর কথা বলে।
— শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে অহনা এবার বলে,
জ্বি আব্বা আমি একটা বেশাল বেদ্দপ। এখন আপনাদের কিছু করার নাই। ছেলের বউ করে যখন আনছেন। নো ওয়ে।
রহমান সাহেব মিটিমিটি হাসে। শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে এবার আলটিমেটাম দেয়ার মতো করে বলে অহনা,
— আম্মা, আধা ঘন্টার মধ্যে রেডি হয়ে নিবেন। কোনো কথা হবে না। আর যদি নিজ থেকে না যান, টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাব। কোনো কথা হবে না।
বলেই গটগট করে রূম থেকে বেরিয়ে নিজের রূমে যায়। পেছন থেকে শুনতে পায়, জেবুন্নেসা গজগজ করছে,
— কপাল আমার কপাল। আমার কপালেই এমন দজ্জাল একটা বৌ জুটল।
অহনা হাসে। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, শ্বশুর শাশুড়ির প্রতি এখন থেকে পুরোপুরি রুদ্রমূর্তি ধারণ করবে। আপন মেয়ে না পরের মেয়ে এইসব কথা তারা বললে মুখের উপরে ধমক দিবে। বহু সহ্য করেছে, আর না। মুখে মুখে কথা তো বলবেই, গালিগালাজ করলে কেঁদে ভাসাবে না বরং গালি খেয়ে সবকটা দাঁত একযোগে বের করে কেলিয়ে হাসবে। চারবছরে মুখ বুঁজে অনেক সহ্য করেছে। সম্মান দিয়েছে। কোনো একটা কথার প্রতিবাদ করেনি, যা বলেছে বাধ্য বাচ্চার মতো মেনে নিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে সেটা খুব বড় ভুল হয়ে গেছে, বিশাল ভুল।
রোমেল সবসময়ই বলে তার বাবা-মা মন্দ মানুষ না। আসলে মা একটু বদমেজাজি। উনার প্রথম সন্তান রোড এক্সিডেন্টে মারা যাবার পর থেকে, আরো বেশি মেজাজ হয়েছে উনার। আর বাবা কখনোই মায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে না৷ মা যা বলে যেভাবে বলে সবই সুড়সুড় করে মেনে দেবে। তবে উনার জিদ উঠলে আবার খবর আছে৷ পৃথিবী উল্টে গেলেও তিনি তার জিদে অটল থাকবে।
মানুষ দুটো জীবনে বহু কষ্ট করে, খেয়ে না খেয়ে দুই ছেলে আর এক মেয়ে পড়াশোনা করিয়েছে, মানুষ করেছে। রোমেলের বড় ভাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। রামপুরা থেকে একটা পাবলিক বাসে উঠতে গেলে, বাসের হেল্পার তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। অমনি পেছনের বাস তার মাথার উপর। কী যে এক বিভৎস দৃশ্য, মনে হলে রোমেল এখন কুঁকড়ে যায়। সেই ভাইয়ের মৃত দেহের আঁকড়ে মা সেদিন একটি কথাও বলেনি। একফোঁটা চোখের পানি ফেলেনি। শুধু ছেলের রক্তাক্ত মাথাটা কোলে নিয়ে বসে ছিল। আর বলছিল ছেলেকে কোনোভাবে কোথাও নিতে দিবে না। সে ওভাবেই মায়ের কোলে শুয়ে থাকবে। সেদিন মায়ের হাতে যেন অসুরের শক্তি। দুচারজন মিলেও তাকে সরানো যাচ্ছিল না। তারপর থেকেই মা স্বাভাবিকভাবে কারো সাথেই কথা বলতে পারে না। অহনা সব ঘটনাই শুনেছে রোমেলের কাছে। সে নিজে প্রথমবার শোনার পর খুব কেঁদেছিল। খুব মন খারাপ হয়েছিল। সবই ঠিক আছে কিন্তু শাশুড়ি মাঝেমাঝে এমন চ্যাটাং করে কিছু কথা বলে, গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। তারপর সে মন খারাপ করে বসে থাকে৷ খালি নেগেটিভ কথা মনে হতে থাকে।
অহনা দেখেছে একটুকু মন খারাপ হলে, শ্বশুর শাশুড়ির উপর একটু বিরক্ত হলে, তখন আরো আরো বেশি করে মন খারাপ আর বিরক্তিরা এসে তাকে চেপে ধরে। অহনার মনে হচ্ছে, সেগুলো খুব বলদের মতো কাজ হয়েছে। প্রথম থেকেই যদি সে শক্ত হতো, তাহলে জেবুন্নেসা বেগম এতরকম কথা বলার সুযোগ পেত না। নিজেকেই দোষারোপ করে অহনা। ঘরের একটা পাপোষ কিনবে অথবা ডাইনিং টেবিলের জন্য লবণদানি কিনবে সেখানেও যখন শাশুড়ির বাগড়া পেয়েছে, মেজাজ খুব খারাপ হতো। একসময় মনখারাপ করে নিজের মতো করে কিছু কেনা এই বিষয়গুলোই বাদ দিল। তাছাড়াও একটা কিছু কিনতে যাবে জেবুন্নেসা বলে উঠত,
— আমার পোলায় বিদেশ গিয়া দিনরাত্র পরিশ্রম কইরা টাকা কামাইতেছে, আর তুমি সেগুলান খালি নষ্ট করো। স্বামীর টাকারে পরের টাকা মনে কইরা যা ইচ্ছা তাই করো তোমরা।
অথচ অহনা কখনোই ভাবেনি রোমেলের পাঠানো টাকা তার নিজের টাকা না। সে যা কিছু করেছে, করতে চেয়েছে সেটা তো এই সংসারের জন্যই করতে চেয়েছে। সেটা কী করে নষ্ট হয়, এমন কথা শুনলে খুব বেশি মন খারাপ লাগত।একটা ভালো চাকরি পাবার শিক্ষা যোগ্যতা দুটোই আছে অহনার। শ্বশুর শাশুড়ি মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের সে ইচ্ছেটাকে মাটিচাপা দিয়েছে৷ উনারা অপছন্দ করে, ঘরের বউ বাহিরে গিয়ে কাজ করবে।মনে মনে খুব কষ্ট হলেও সংসারের শান্তির জন্য সেটা মেনে নিয়েছে। ভেবেছে স্যাক্রিফাইজটা নাহয় সে-ই করল। কিন্তু এখন তার মনে হয়, শাশুড়ি বা রোমেল কেউই এটাকে কখনো স্যাক্রিফাইজ হিসেবে একবারই ভেবেছে। এ জায়গায় অহনার দুঃখটা সবচে বেশি।
সব নিয়ন্ত্রণ, নাটাই সূতো সবই তার হাতেই ছিল। অথচ সে ঘুড়ি হয়ে গিয়েছিল। তারা যেভাবে যখন আকাশে তুলেছে, সে শুধু উড়েছে। রোমেল অবশ্য বলত,
— তোমার শ্বশুর শাশুড়ি হলো পুরনো দিনের মানুষ৷ আর তুমি শিক্ষিত, আধুনিকা। দুজন বৃদ্ধ মানুষকেও তুমি যদি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারো, তাহলে কিসের তুমি আধুনিক, কিসের শিক্ষা। তুমি একটু চেষ্টা করো, দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, অহনা যখনই রোমেলকে সংসারের যেকোনো বিষয় বলতে গিয়েছে, ওসব মেয়েলি ব্যাপার, আমাকে টাইনো না বলে পাশ কাটিয়ে গেছে। অথচ সে ইচ্ছে করলে, একটু দায়িত্ব নিয়ে শাশুড়ি আর তার মধ্যে সংযোগ সেতু তৈরি করে দিতে পারত। এটা তারই কাজ ছিল। সারা দুনিয়ার কাজকর্ম করতে পারে আর ঘরে এসে বৌ-শাশুড়ির কোনো বিষয় শুনলেই সেটাকে মেয়েলি ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেয়। এই বিষয়টা মানতে পারে না অহনা, রোমেলের উপর ভীষণ রাগ হয়।
অহনা যে চেষ্টা করেনি তা নয়। কিন্তু যখনই সে মানুষ দুজনের সাথে শক্ত হয়েছে, তারা এমনভাবে নিত বিষয়গুলো, নিজেরই মন খারাপ হয়ে যেত। বাবামার কথা মনে পড়ে। শক্ত ভাবটা ধরে রাখতে পারে না। রাজ্যের যত মন খারাপের সাথেই এতদিন যেন তার সখ্যতা ছিল। বিরক্তিরা ছিল তার প্রিয়তম সখী। ছোট খাটো মাঝারি সবরকম ব্যাপারেই অহনা তাদেরকে নেমন্তন্ন করে ঘরে ডেকে আনে, তারপর তাদের উপর চড়ে বসে বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করে। অহনা প্রতিজ্ঞা করেছে, পাল্টে ফেলবে তার পুরাতন মুখশ্রী।
আধাঘন্টা পর শাশুড়ি ঘরে গিয়ে দেখে, যেভাবে বলে গিয়েছিল সেভাবেই গা এলিয়ে বিছানায় শোয়া৷ কোনো কথা না বলে, সোজা গিয়ে শাশুড়িকে জাপটে ধরে বিছানা থেকে দাঁড় করাল অহনা। দাঁড় হয়ে গেছে যখন, আর বাধা দিতে পারে না জেবুন্নেসা। কোনো রকম জবরদস্তি ছাড়া অনুগত বাচ্চার মতো অহনার হাত ধরে ওদের ঘরের বড় বাথরুমটায় ঢুকল। আগে থেকেই পানি কুসুম গরম করে বালতিতে রেডি করে রেখেছিল। শাশুড়িকে সাবধানে একটা পিড়ির উপর বসাল। আজ আটদিন হলো জেবুন্নেসা গোসল করেনি। আগেও ঠান্ডা পানির প্রতি একটা ভীতি ছিল, ইদানিং সেটা যেন বহু মাত্রায় বেড়েছে। আছরের ওয়াক্তে একবার ওজু করে, পারলে সেটা দিয়ে তাহাজ্জুদ নামাজ পর্যন্ত চালিয়ে দিতে চায়। পনেরদিনে এক-আধবার কোনোমতে গায়ে পানি ঢেলে গোসল সারে। অথচ ডাক্তার পইপই করে বলে দিয়েছে, এই বয়সে প্রতিদিন গোসল করতে হয়। তাহলে শরীর ঝরঝরে থাকে, অন্য রোগবালাই সহজে কাছে আসে না।
গডকাল রাতে এই গোসল করা নিয়েই একদফা কথা চালাচালি হয়েছে। জেবুন্নেসা তাকে ধমক দিয়ে বলেছে,
— এটা আমার বাড়ী, এখন আমার নিয়ম অনুযায়ী সবকিছু হবে। তুমি পরের মেয়ে পরের মেয়ের মতো থাকো।
ব্যাস যাবে কই! অহনা এবার আর ছাড়েনি। সেও প্রায় খেঁকিয়েই উঠেছে,
— এ্যাহ্, আপনি বললেই হবে, আপনার নিয়ম অনুযায়ী সব চলবে। আম্মা এইসব মাতবরি জীবনে বহু করছেন। এখন আপনার দিন শেষ৷ একদম শ্যাষ। এটা আপনার বাড়ী হোক অথবা দারোয়ান আতিকেরই বাড়ী হোক, এখন থেকে এই বাড়িতে সকল কিছু চলবে আমার কথা মতো।
জেবুন্নেসা অহনার কথা শুনে রহমান সাহেবের দিকে তাকায়। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,
- শুনছ, শুনছনি। বেদ্দপ মাইয়াটার কথা বলার ধরণ দেখছ। আল্লাহগো এইও আমার দেখতে হইলো।
রহমান সাহেব খুব নিরীহ ভঙ্গিতে বলে,
- কই, কি দেখলা গো
- ও, কিছুই চোখে পড়ে নাই তোমার। চোখের ছানি কাটাও। এই মাইয়ার কথা শুনে আমি পুরা আকাশ থেকে পড়ছি, আর উনি কিছুই দেখলেন না।
রহমান সাহেব এবার ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়ে জেবুন্নেসার দিকে এগিয়ে যায়,
— কই কই, আকাশ থেকে পড়ছ, আল্লাহ গো এই বুড়া বয়সে কই না কই ব্যথা পাইলা, দেহি দেহি।
শ্বশুরের কথা বলার ধরণ দেখে অহনা খিলখিল করে হেসে উঠে৷ হাসিটা জেবুন্নেসার গায়ে শুকনো মরিচের ডলা লাগা জ্বালা ধরিয়ে দেয়। হুৎকার দেয় সে,
— আমি থাকব না। শত্রু নিয়া একঘরে থাকা করা আমার পক্ষে সম্ভব না।
অহনা ফোঁড়ন কেটে বলে,
— আচ্ছা আম্মা যায়েন। কবে যাবেন ঠিক করেন। আমি ব্যবস্থা করে রাখব। সে যেদিন যাবেন দেখা যাবে, কিন্তু কালকে সকালে আপনার গোসল করা কেউই ঠেকাইতে পারবে না।
রাতে খাবার পর শাশুড়ি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। রহমান সাহেব ডাইনিং টেবিল থেকে না উঠে বসেই রইল। অহনার মনে হলো উনি বুঝি কিছু বলতে চায়। নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করে,
— আব্বা কিছু বলবেন?
— বৌমা বুঝছ, এই দুনিয়াতে যা কিছু সবই আরসি'র খেলা।
অহনা বুঝতে পারে না আরসি কি,
— আব্বা আরসি কি? RC cola?
শ্বশুর হো হো করে হেসে উঠে,
— আরে না। আর সি হইলো, রেগুলেটরি ক্যাপচার। এই পৃথিবীতে যত ব্যবসা বাণিজ্য যুদ্ধ বিগ্রহ রাজনীতি প্রেম ভালোবাসা সম্পর্ক যা কিছুই বলো সবই চলে এই আরসি'র উপর। দুপক্ষের মধ্যে একজন আরেকজনের মনোজগতকে প্রভাবান্বিত করা, অপর পক্ষের উপর আধিপত্য বিস্তার করা, সেটাই ক্যাপচার। আর রেগুলেটরি হইলো, রেগুলেট করা, কে আগে রেগুলেট করতে পারল, অন্যের মনে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারল। বুঝছ!
— অল্পবিস্তর মনে হয় বুঝছি আব্বা। একটু উদাহরণ দিয়ে বলেন।
— আচ্ছা বলি শোনো। পৃথিবীতে যা কিছুই ঘটনা ঘটে ঘটবে সবকিছুর জন্যই দুটা পক্ষ থাকা লাগে। একপক্ষ থাকলে সেখানে কোনো ঘটনা ঘটবে না। ধরো আমেরিকা যদি একাই এই বিশ্বের রাজা হইত তাহলে তাদের ইরাকের সাথে, ইরানের সাথে যুদ্ধ করা লাগত না। ধরো তোমার শাশুড়ি আর তুমি, দুইজনে যদি সবকিছু একভাবে দেখতা, ভাবতে পারতা তাহলে সেটা হইত একপক্ষ। কিন্তু দুজন মানুষ দুইরকম ভাবনা হলেই দুইটা পক্ষ হয়ে যাবে। এখন এই দুইপক্ষের মধ্যে যে আরেকজনের মনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, সে-ই বিজয়ী হবে। বৌমা সর্বক্ষেত্রে এই বিষয়টা মাথায় রাখবা। জেবুন্নেসা বেগম, তার পুত্র দুজনরেই আরসি থেরাপি দিবা। এই থেরাপি একেকরকম ক্ষেত্রে হবে একে আমি যে ভুল করছি তুমি সেইটা কইরো না মা।
অহনা শ্বশুরে কথার মানে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। পরের ঘরের মেয়েকে আপন হতে হলে রেগুলেটরি ক্যাপচার চালাতে হবে। শাশুড়িকে ওন করতে হবে। এই পৃথিবীতে আপনাতে কেউ কাউকে আপন করে নিতে পারে না। বিষয়টা সব জায়গাতেই একই, দেবে আর নেবে, মিলাবে মিলিবে।
অহনা খুব বুঝতে পারছে, এই দুইটা মানুষের জন্য এই বয়সে আসলে সোহাগ মাখা শাসন দরকার। এমন মানুষগুলো মন থেকেই চায়, ঘরের বৌ নিজের মেয়ে হোক৷ কিন্তু শুধু মনে মনে চাইলেই তো হয় না। ইচ্ছে থাকলেও চিরাচরিত কিছু সামাজিক ইগোর কারণে বাঙালি বউ বা শাশুড়ি কেউই নিজের জায়গা ছেড়ে একটু এগিয়ে আসে না। অথচ বিষয়টায় ছোটখাটো খানিক বনিবনা না থাকলে, সেটা দুপক্ষরই মনঃপীড়া কারণ হয়। জীবনকে অশান্তিময় করে তুলতে, এই সম্পর্কগুলোতে একটুখানি ভুল বুঝাবুঝিই যথেষ্ট। এমন সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব কে একবার যদি সৃষ্টি হবার সামান্যতমই সুযোগ দেয়া হয়, সেটা কেবল বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে। কিন্তু অহনা বিশ্বাস করে, ভালো কিছু শুরু করতে চাইলে সেটা যেকোনো মুহূর্ত থেকেই করা যায়। এতদিন করেনি বলে এখন করা যাবে না, সে তো নয়। শ্বশুর শাশুড়ি বয়স বেড়েছে, আর তারা বেশি বেশি নাবালকের মতো আচরণ করে। অহনা মনে মনে নিজেকে দূরছাই করে, আসলে তারা তো বয়স বাড়ার সাথে নাবালকই হয়ে উঠে। জীবনের কত বোঝা, কত অশান্তি, কত টানাপোড়েন পার করে তারপরই তো মানুষ বয়সের কাছে পৌঁছায়। এই পর্যায়ে গেলে প্রতিটি মানুষই চায় তার জীবন অতীতের থেকে ভালো হবে। সারাজীবন জীবনের সাথে যুদ্ধ আর যুদ্ধ করে, সেই বয়সে পৌঁছেছে তারা। খুব স্বাভাবিকভাবেই, যুদ্ধের প্রতি তাদের একটা অনীহা তৈরি হয়, জীবনের প্রতি হয়ত কিছুটা বিরক্তিও। খুব ছোট ছোট বিষয়গুলো মানতেও কষ্ট হয় তাদের। অহনা বুঝতে চেষ্টা করে, তার যখন বয়স হবে, যখন কারো শাশুড়ি হবে, তার পুত্রবধূকে সে কিভাবে চাইবে! হিসেব করে দেখে সে, সেই চাওয়াটা খুব বেশি কিছু না, খুব বড় কিছু না। পুত্রবধূ তার খোঁজখবর নিবে, খানিকটা আদর করবে, সেবাযত্নের ক্ষেত্রে আন্তরিক হবে, তার কাছে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। খুব ছোট ছোট চাওয়া, কিন্তু মুখ ফুটে এসব বলা যায় না, নিজেও হয়ত তার পুত্রবধূকে বলতে পারবে না, আমি তোমার কাছে এগুলো চাই। এটা বলার কোনো বিষয়ও না। অনুভব করতে হয়।
বিষয়টা গতকাল রাতে খুব হঠাৎ করেই অহনার অনুভবে এলো। ভেবে দেখল, আসলেই তো সে পরের মেয়ের মতোই থেকেছে, বকা শুনে দূরে চলে গেছে, মন খারাপ করেছে। অথচ যেভাবে নিজের মায়ের ক্ষেত্রে করেছে, শাশুড়ির ক্ষেত্রেও তা এককানে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিতে পারত! মা যখন তাকে বকত, মন খারাপ হতো ঠিকই কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সব ভুলে গিয়ে আবার মায়ের গলায় ধরে আদিখ্যেতা করেছে, আব্দার করেছে। মা অন্যায় কিছু করলে কী শাসনই না করেছে। এই বাড়ীতে এসেছিল যখন অহনা তেমনই ভেবেছিল, শ্বশুর শাশুড়িকে নিজের বাবামার মতো করেই দেখবে। কিন্তু কোথাও যেন, কী একটা আড়ষ্টতা! ইচ্ছে হতো সবকিছু সামলে নিবে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, তার কী ঠেকা পড়েছে। মানুষ এমন এক জীব, নেগেটিভ বিষয়কেই সবসময় সর্বক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। নেগেটিভ চিন্তার দৌড়ের গতিবেগ ভালোকিছু চিন্তা করার গতি থেকে কয়েকশো গুণ বেশি। অহনাও তাই বারবার নেগেটিভ ভাবনার কাছেই ধরা পড়েছে। নিজেকে শক্ত করেছে এবার, যত নেগেটিভ মনের মধ্যে আসুক, ঝেঁটিয়ে বিদায় করবে। পজিটিভলি জীবনটাকে দেখবে। এখন থেকে শাশুড়িকে সে শাসন করবে, আদর করবে। সে নিজের সাথে চ্যালেঞ্জ করেছে, শাশুড়ি জীবনে আর কখনো একটিবারের জন্যেও যেন বলার সুযোগ না পায়, সে পরের ঘরের মেয়ে, এভাবেই সে সম্পর্কটাকে গড়বে।
পিড়িতে বসিয়ে সাবান দিয়ে ডলে শাশুড়িকে গোসল করিয়ে দিচ্ছে অহনা। জেবুন্নেসার মনে পড়ে, ছেলের বউ হয়ে ঘরে আসার আগে থেকেই মেয়েটাকে নিয়ে মনের মধ্যে একটা অজানা দ্বন্দ্ব বিরাজ করছিল। বিষয়টা এমন না, অহনা বলেই তার এমন মনে হতো। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মেয়েটাকেও রোমেল যদি বউ করে আনত, জেবুন্নেসার মনে সেই একই অজানা আশংকাই বিরাজ করত।
জেবুন্নেসা সংসার জীবনের হিসেব মেলায়, দেখতে পায় দোষ আসলে অহনার না, দোষটা হয়ত তারো না। মূল দোষ এই সম্পর্কটার প্রকৃতিতে, এর নামেই- সেটা হলো মনোজগতে ধারণ করা বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক। এটা যে জেবুন্নেসার মনে আপনা থেকে এসেছে তাও না। পুরো সমাজটাই যেন একসাথে বলেছে, বলছে, পুত্রবধূ মানেই পরের ঘরের মেয়ে। টেলিভিশন পেপার পত্রিকা নাটক সবাই মিলে জেবুন্নেসাকে ধরে বেঁধে যেন শাশুড়ি বানিয়ে দিয়েছে। নিজের আত্মীয় স্বজন, এমনকি ছেলেমেয়েদের ভাষাও ছিল একই, তুমি শাশুড়ি। কেউ বলেনি, কেউ দেখিয়ে দেয়নি একটিবারের জন্যও জেবুন্নেসা তুমি কিন্তু মেয়েটির শাশুড়ি না, তুমি অহনার মা। নিজের দোষের কথা মনে পড়ে জেবুন্নেসার। যতকিছুই করেছে অহনা, সবকিছুতেই আশংকা করেছে সেটা মন থেকে করছে না, ছেলেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করছে, তাদেরকে পছন্দ করে না— এই ভাবনাগুলোই ঘুরেফিরে মাথায় এসেছে। জেবুন্নেসার খুব কষ্ট হচ্ছে ভেবে, সে জানে, খুব ভালো করেই জানে, মেয়েটা এই ঘরে আসার পর কোনো একটি মুহূর্তের জন্যেও তার সাথে মা হয়ে কথা বলেনি, কাছে ডাকেনি; যেই জেবুন্নেসা অহনার সাথে যা কিছুই করেছে, আসলে সে ছিল একজন শাশুড়ি, কেবল শাশুড়িই।
অহনা খুব যত্নে তার গায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে। কুসুম কুসুম সেই গরম পানির সাথে জেবুন্নেসার চোখ বেয়ে টপটপ করে পড়তে থাকা চোখের পানিও মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
(সমাপ্ত)

মন_যে_আমার_হারিয়ে_ফেলেছি
পর্ব-৩
-- মীরা কাল সকাল ৭টায় রমনাপার্কের ২নাম্বার গেটে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো, আমি জানি তুমি আসবে, আর ডিভোর্স পেপারে সিগনেচার টা কিন্তু আজও করা হয়নি.....
মেসেজ টা দেখেই মীরার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো, আকাশ কেন এমন মেসেজ দিল তাকে? কি বলতে চায় সে? এর মানে কি?
না আর ভাবতে পারছে না মীরা, আকাশের নাম্বারে কল দিলো কিন্তু নাম্বার বন্ধ, আবার চেষ্টা করলো, না এবারও হলো না নাম্বার বন্ধ করে রেখেছে আকাশ।
অন্ধকার রুমে শুয়ে আছে মীরা, এই মুহূর্তে তার জীবনে কি চলছে সে নিজেই যেন কিছু বুঝতে পারছেনা। কি করবে সে?
৬ বছর পরে আকাশকে দেখে তারই বা কেন এমন লাগছে? হ্যাঁ একটা সময় আকাশকে সে খুঁজেছিল সত্যি কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা তো একদম ভুলেই গিয়েছিল সে, অবশ্য পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিল বললে ভুল হবে আকাশ নামটা কোথাও শুনলেই মীরা যেন একটু চমকে যেতো সব সময়।
শুয়ে শুয়ে অতীতের ভাবনায় ডুব দিল মীরা,
#৬বছর_আগেঃ
ক্যালিফোর্নিয়ায় বিচ পারে একটা রেস্টুরেন্ট এর মধ্যে বসে মীরা তার কিছু বান্ধবীদের সাথে গল্প করছিল, বান্ধবীরা সবাই ছিল ফরেনার, তাদের মধ্যে মীরা একাই বাঙালি ছিল।
তাদের পিছনের টেবিলে বসা ছিল আকাশ ও তার বন্ধু, আকাশ ও তার বন্ধুর আলোচনা শুনে মীরা বুঝতে পেরেছিল, আকাশ অনেক চেষ্টা করে, কয়েকটা দেশ ঘুরে বন্ধুর সাহায্যে অবশেষে টুরিস্ট ভিসায় আমেরিকা এসেছে কিন্তু এখন কোনো ভাবে থাকতে পারছে না, একদিকে ভিসার মেয়াদও প্রায় শেষ অন্য দিকে এই ভিসা নিয়ে সে কোনো জবও পাচ্ছে না। কিন্তু আকাশ কোনো ভাবেই দেশে ফিরে যেতে চাচ্ছে না, এ নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে অনেক প্ল্যান চলছিল কি করা যায়। সাথে আকাশের ফিনান্সিয়াল সমস্যা নিয়েও আলোচনা করছিল।
মীরা তাদের সব কথা শুনছিল, তার কিছুক্ষণ পরেই আকাশ ও তার বন্ধু রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল, প্রায় ৩০মিনিট পরে মীরাও রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়ির দিকে যাচ্ছিল, এমন সময় খেয়াল করলো ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তপ্ত রোদে একটা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ, অবশ্য প্রচন্ড শীতের মধ্যে এমন রোদ খারাপ লাগে না। ক্যালিফোর্নিয়ায় রোদকে সবাই অনেক উপভোগই করে।
সে যাই হোক, আকাশ দাড়িয়ে আছে রোদে তার ফর্সা মুখটা একদম লাল হয়ে আছে, তার চেহেরায় চিন্তার রেখা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মীরা হাটতে হাটতে আকাশের বেশ কাছে চলে এল, আকাশ গভীর চিন্তায় মগ্ন কোনো দিকে খেয়াল করছে না। মিরা আকাশকে ক্রস করে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসলো, গাড়ি স্টার্ট দিতে গিয়েও কি মনে করে স্টার্ট দিল না গাড়ি থেকে নেমে আবার আকাশের সামনে এলো।
আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে বললো-
-- হ্যালো, আমি মীরা,
মীরার দিকে তাকিয়ে আকাশ একটু অবাক হলো,
-- আমি আকাশ, আপনি বাঙালি?
-- জন্মসূত্রে আমেরিকান হলেও আমার আর একটা পরিচয় আমি বাঙালি।
-- nice to meet you
-- আমি কি আপনার সাথে কিছু কথা বলতে পারি?
-- জি অবশ্যই,
-- আপনার বন্ধুর সাথে আপনার আলোচনা গুলো সব শুনেছি, আপনি দেশে ফিরে যেতে চাচ্ছেন না,
-- হুম, আসলে অনেক কষ্ট করে আমেরিকা এসেছি, অনেকগুলো পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল এখানে আসার জন্য, অনেকগুলো রাষ্ট্র ঘুরতে হয়েছিল, ভেবেছিলাম একবার এখানে আসতে পারলে কোনো না কোনো ব্যবস্থা করে নেব। এভাবে ফিরে যেতে হবে ভাবতে পারিনি, আর ফিরে যেতেও চাচ্ছি না।
আকাশের কথা গুলো শুনছিলো মীরা, আর কেন জানি অলৌকিক ভাবে এক অন্যরকম মায়া কাজ করছিল আকাশের উপরে। মীরা বলল-
-- চলুন সামনে বিচ পারে গিয়ে বসে কথা বলি?
-- ওকে চলুন।
সী-বীচে বসে আকাশ আর মীরা প্রায় এক ঘন্টা কথা বলল, মীরার সমস্ত পরিচয় জানার পরে একসময় আকাশ মীরা কে বলল-
-- আচ্ছা আপনি তো আমেরিকার নাগরিক আপনি কি কোন ভাবে পারেন আমাকে সাহায্য করতে? যাতে দেশে ফিরে যেতে না হয়, আমি এখানেই থাকতে পারি!
আকাশের কথা শুনে তার দিকে তাকিয়ে মীরা কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইল, প্রায় ৫ মিনিট চুপ করে বসে থাকার পরে, শান্তভাবে মীরা বলল-
-- হ্যাঁ পারব, আপনাকে দেশে ফিরে যেতে হবে না। আর একটা কথা, আমি কাউকে আপনি করে বলতে কমফোর্টেবল ফিল করি না তুমি বললে আপনার সমস্যা হবে?
-- না না কোনো সমস্যা নেই আপনি আমাকে তুমি বলতে পারেন,
-- ok Thank you, যেহেতু আমি তোমার থেকে ছোট হব, আর ছোট বা বড় সেটা বড় কথা নয়, তুমিও আমাকে তুমি বললে আমার ভালো লাগবে,
-- ওকে, কিন্তু তুমি আমাকে কিভাবে সাহায্য করবে? আমার কি করতে হবে? তাছাড়া আমার কাছে বেশি টাকা বা ডলার নেই।
-- হুম, সেটার প্রয়োজন হবে না,
-- তাহলে কি করতে হবে?
-- আমাকে বিয়ে করতে হবে,
একটু চমকে গিয়ে আকাশ বললো-
-- মানে? সরি আমি বুঝলাম না?
-- আমরা দুজন কন্টাক্ট ম্যারেজ করব আমার হাজব্যান্ড হওয়ার সূত্রে তুমি সিটিজেনশিপ পেয়ে যাবে, সিটিজেনশিপ কাগজ পাওয়ার পরে কনট্রাক শেষ হয়ে যাবে। আপাতত তোমাকে সাহায্য করার জন্য এই একটাই সহজ রাস্তা আমার জানা আছে। এখন তোমার ইচ্ছে?
-- আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, তুমি আমার সাথে ফান করছো না তো?
-- তুমি আমার পরিচিত কেউ নও তোমার সাথে ফান করবো কেন? আগামীকাল সকাল দশটায় তোমার সকল পাসপোর্ট ভিসার কাগজপত্র নিয়ে এই রেস্টুরেন্টে চলে আসবে আমি এখানেই থাকব।
কথা শেষ করেই মীরা চলে গেলো।
পরদিন সকাল ১০টায় মীরা ঐ রেস্টুরেন্টে এসে দেখে আকাশ দাঁড়িয়ে আছে। হুট করে একজন এঞ্জেলের মত করে এসেই আকাশের সকল সমস্যার সমাধান করে দিল মীরা। কিছু কাগজপত্র প্রসেসিং করতে চার দিন সময় লেগেছিল, ঐ চারদিন সময় মীরা আর আকাশ সারাদিন একসাথে কাটিয়েছে অনেক ছোট ছোট গল্প করেছে, আর মীরা শুধু পিজা খেয়েছে। চারদিন পরে আকাশ কে বিয়ে করে নিল মীরা। কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী সিটিজেনশিপ পাওয়ার সাথে সাথে আকাশ আর মীরা ডিভোর্স নিয়ে নিবে, এটা ছিল শুধুমাত্র একটা কন্ট্রাক বিয়ে শুধু সিটিজেনশিপ পাওয়ার জন্য।
এর পরে আকাশ নিউইয়র্কে চলে যায় সেখানে জব করা শুরু করে, আকাশের সাথে মাঝে মাঝে খুব সামান্য কথা হতো মীরার, তবে তাদের আর দেখা হয় নি। দুজন দুজনের কাজে বিজি হয়ে যায়, আকাশ দিনরাত পরিশ্রম করে কাজ করছে জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। মীরাও নিজের পড়াশোনা বন্ধু বান্ধবী পার্টি ক্লাব ডিস্কো এসব নিয়ে ব্যস্ত। প্রায় ৩বছর পরে আকাশ সকল লিগেল কাগজ পত্র পেয়ে যায়, এর পরে মীরা আকাশকে কলকরে তাদের ডিভোর্সের জন্য একটা নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করে। আকাশও রাজি হয়ে যায়।
কিন্তু নির্ধারিত তারিখে মীরা আকাশের সাথে দেখা করতে পারে না, কারন তার ১সপ্তাহ আগেই তার মায়ের সাথে হঠাৎ করে বাংলাদেশে চলে আসতে হয় তাকে, তার নানু ভাই হসপিটালে আইসিইউ তে ভর্তি ছিল এবং তারা আসার তিন দিন পরেই তার নানু ভাই মারা যায়। এর মধ্যে মীরা আর আকাশ কে ফোন দেয় না।
দেড় মাস পরে যখন মীরা আমেরিকার ফিরল, তখন তার মোবাইল টা অন করার সাথে সাথে আকাশের অনেক গুলো মেসেজ পায়, শেষ মেসেজ টা ছিলো এমন-
-- মীরা তোমার কথা অনুযায়ী নির্ধারিত তারিখে আমি এসেছিলাম, কিন্তু তুমি আসোনি। তোমার মোবাইলে অনেকবার কল দিয়েছি তোমাকে পাইনি, এরপরে প্রায় একমাস তোমাকে প্রতিদিন কল দিয়েছি কিন্তু তাও তোমার কোন সন্ধান পাইনি, তোমার মোবাইল বন্ধ। তোমার কোন ঠিকানা আমার কাছে ছিল না তাই কোন ভাবে যোগাযোগ করতে পারলাম না,অফিস থেকে আমাকে তাদের প্যারিসের ব্রাঞ্চে ট্রানস্ফার করে দিচ্ছে তাই আগামীকাল প্যারিস চলে যাবো।
তোমার ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারব না যেখানেই থাকো অনেক ভালো থাকো অনেক সুখে থাকো, প্যারিস থেকে আমি তোমাকে কল দিতে থাকব, কখনো যদি তোমার মোবাইল অন করো অবশ্যই তোমাকে পেয়ে যাব। আর তুমি যেদিন বলবে সময় করে এসে একদিন ডিভোর্স পেপারে সিগনেচার করে দিয়ে যাব। আকাশ।।
আকাশের চিঠিটা পড়ে মানসিকভাবে অনেক কষ্ট পায় মীরা, সে নিজেও বুঝতে পারে না সে কেন এত কষ্ট পাচ্ছে। শুধু এইটুকু বুঝতে পেরেছিল আকাশ এত সহজে ডিভোর্স পেপারে সিগনেচার করতে চাচ্ছে বিষয়টা কেন জানি মীরার ভালো লাগছিলো না।
সে জন্য মীরা তার মোবাইলের সিমটা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে রাখে আর কোনদিন এই সিম চালাবে না। আকাশের সাথে আর কোনরকম যোগাযোগ করতে চায়না মীরা।
এরপরে আর কোন দিন আকাশের সাথে কোনরকম যোগাযোগ হয়নি মীরার। দীর্ঘ ৬ বছর পরে সেই আকাশ আবার তার সামনে এভাবে দাঁড়াবে সে কল্পনাতে ভাবতে পারেনি।
#বর্তমান
রাত ১২টা বাজে, মীরার পাশে কনা শুয়ে আছে, কনার মুখে শুধু বিয়ের আলাপ। আকাশকে নিয়ে নানান রকমের জল্পনা কল্পনা করেই যাচ্ছে কনা।
এদিকে মীরার চোখে কোনো ঘুম নেই, আকাশ তাকে কি বলবে? কাল সকালে আকাশের কাছে যাওয়া ঠিক হবে? কনা কতো স্বপ্ন দেখছে আকাশ কে নিয়ে আর আকাশ?
নানান ধরনের চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পারল মীরা। এদিকে আকাশের চোখে কিছুতেই ঘুম আসছে না, তার মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা মীরা আজ তার সামনে, তাও জীবনের এমন কঠিন মোড়ে এসে, এখন সে কি করবে? আর মীরা কি তার মনের কথা বুঝবে? তবে মীরার চোখ দেখে তার ভিতরেও যেন কিছু একটা অনুভূতি লক্ষ্য করেছে আকাশ।
সকাল ৭টা বাজে রমনার গেটে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ, মীরার জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু মীরা আসছে না। প্রায় ১ঘন্টা হয়ে গেলো, তবে মীরা না আসা পর্যন্ত এখানে তার জন্য অপেক্ষা করবে ভেবে রেখেছে আকাশ।
এর মধ্যেই একটা সিএনজি এসে থামলো, সিএনজি থেকে নেমে একটু সামনে তাকাতেই আকাশ কে দেখতে পেল মীরা, কাচা হলুদ রঙের একটা টপস্ পরে এসেছে সে সাথে সাদা ওরনা। মীরাকে দেখেই যেন গভীর শান্তি অনুভব করতে লাগলো আকাশের হৃদয়, যেন কত জনম ধরে এই মীরার জন্য সে অপেক্ষা করছিল।
কোন কথা না বলেই দুজন হেঁটে রমনা পার্কের ভিতরে চলে গেলো, ঘাসের উপরে আস্তে আস্তে হাঁটতে দুজন, কথা যেন সব হারিয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ হেঁটে বটগাছের নিচে একটা বেঞ্চের উপরে বসলো দুজন, এবার আকাশ বললো-
-- thank you, তবে আমি জানতাম তুমি আসবে,
-- কেনো আসতে বলেছ?
-- তোমাকে দেখবো বলে
-- মানে?
-- কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে মীরা?
প্যারিস থেকে কতবার তোমাকে কল দিয়েছি তোমার মোবাইল বন্ধ, কোন ঠিকানা ছিল না তার পরেও কতবার গিয়ে খুঁজেছি তোমাকে কিন্তু তুমি যেন চিরদিনের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলে।
-- খুঁজে পেলে কি হতো?
-- জানিনা, শুধু জানি তোমাকে পাবার প্রয়োজন ছিল আমার।
-- আমাকে পেয়ে আর কি করতে বল? সিটিজেনশিপ তো পেয়েই গিয়েছিলে,
-- মীরা এভাবে বলো না,
-- দেখ আকাশ ৬বছর আগের কোনো কথাই আর নতুন করে তুলতে চাচ্ছি না, কিছু দিন পরে তুমি আমার বোনের হাজব্যান্ড হবে, এখন আমার কাছে এটাই তোমার পরিচয়, অতীতের কোনো কিছু এখন আর ভাবতে চাইনা।
-- তাহলে আমার ডাকে আজ এখানে এলে কেনো?
-- কারন তুমি বাধ্য করেছ, কাল তুমি মেসেজ করে এসব কি লিখেছ?
-- কেন কোন ভুল লিখেছি?
-- তোমার সাথে আমার একটা কন্ট্রাক হয়েছিল, হয়ত সময়ের কারণে শেষ সিগনেচার টা করা হয়নি, তাই বলে তো এভাবে মেসেজ দিতে পারো না তুমি।
-- কনট্রাক বলো আর যাই বলো, কিন্তু আমাদের ডিভোর্সটা তো আজও হয়নি মীরা সেটা কি মিথ্যে?
-- এসব কথা এখন বলার মানে কি আকাশ? এসব বলে কি বোঝাতে চাচ্ছো?
-- মীরা বিয়ের কাগজ পত্র দিয়ে আমি হয়তো তোমাকে খুঁজে বের করতে পারতাম, সময় একটু বেশি লাগলেও হয়তো পেতাম, কিন্তু তাতে করে তোমার ফ্যামিলিও বিয়ের বিষয় টা যেনে যেত যা তুমি চাও নি। আবার ভেবেছি হয়তো তুমি কারো সাথে নতুন জীবন শুরু করেছ, আমার মতো তুচ্ছ একজন আকাশের কথা একদম ভুলেই গিয়েছো, আর সেটাই স্বভাবিক তাই আর তোমাকে বিপদে ফেলতে চাইনি।
কিন্তু তুমি সবসময়ই ছিল আমার মনের মাঝে সব থেকে সুরক্ষিত স্থানে।
-- আকাশ তোমার সেদিনের মেসেজে এসব কিছুই লেখোনি তুমি, তুমি শুধু লিখেছিলে ডিভোর্সের কথা। যেন ডিভোর্স পেপারে সিগনেচার করাটাই ছিল তোমার সব থেকে জরুরি,
-- আমার জন্য কখনোই সেটা জরুরি ছিল না মীরা, আমি ভেবেছিলাম তোমার জন্য জরুরী তুমি আমার এত বড় উপকার করেছ, তাই তোমার মতামতকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছি, তখন কল্পনায়ও নিজেকে তোমার যোগ্য মনে করিনি। ভেবেছিলাম মনে মনেই সারা জীবন তোমাকে ভালোবেসে যাবো, কিন্তু যখন তোমাকে হারিয়ে ফেললাম তখন যেন তোমাকে পাওয়াটা সব থেকে জরুরি হয়ে গেল, কিন্তু আবারও সেই একই নিজেকে তোমার অযোগ্য ভেবে মনকে শান্তনা দিয়েছি।
-- আকাশ সেদিন মেসেজে যদি একবার শুধু মনের কথাটা কিখে রাখতে তাহলে হয়তো আজ আমাদের এখানে এভাবে দেখা করা লাগতো না।
-- সরি মীরা সেদিন আমি তোমার মনকে বুঝতে পারিনি, কিন্তু এংগেজমেন্টের দিন তোমার চোখ দেখেই যেন সব বুঝে গিয়েছিলাম,
-- অনেক দেরি হয়ে গেছে আকাশ, অনেক দেরি,
-- মীরা আমরা চাইলে এখনো সব ঠিক করতে পারি,
-- কি ঠিক করবে আকাশ? আমার বোন কণা কাল সারারাত তোমাকে নিয়ে মনে ননান রকমের স্বপ্ন একেছে, বাড়ির সবাই বিয়ে নিয়ে উৎসব মুখর পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে, সবার মনে অনেক আনন্দ। আমাদের একান্নবর্তী পরিবার, সবাই যেন প্রতিটা মুহূর্তে বিয়েকে ঘিরে নতুন নতুন আয়োজন করছে। কনা বিয়ের ওরনা মাথায় দিয়ে বার বার আয়না দেখছে, তার মা মেয়েকে বিদায় দেবার সকল প্রস্তুতি করে ফেলেছে। তাদের সবাই কে কষ্ট দিয়ে কি ঠিক করবে তুমি?
আজকের পর আমার সাথে আর কোনো কথা বলার চেষ্টা করবে না আকাশ, ক্যালিফোর্নিয়ার মীরা তোমার জীবন থেকে সারা জীবনের জন্য হারিয়ে গিয়েছে, এটাই তোমার জীবনের চরম সত্য। এটাকে মেনে নিয়েই সামনে এগিয়ে যাও শুভকামনা তোমার জন্য।
-- কিন্তু মীরা...
-- আর কোনো কিন্তু শুনতে চাইনা আকাশ, তোমার আকাশে আমার আশার তারা আর কোনদিন জ্বলানো সম্ভব নয়। আমি এখন উঠছি, তবে একটা কথা বলে যাই সেদিন তুমি লিখেছিলে আমার ঋন পরিশোধ করতে পারবে না কোনোদিন, কিন্তু আজ ঋন পরিশোধ করার সময় এসেছে তোমার, আমার বোনকে বিয়ে করে সারাজীবন সুখে রাখবে, ও যেন কোনদিন কষ্ট না পায় তাহলেই তোমার ঋন পরিশোধ হয়ে যাবে।
কথাগুলো একটানা বলেই মীরা উঠতে গেলো অমনি মীরার হাত ধরে ফেললো আকাশ........
চলবে.....

নরকের_কীট পর্বঃ১
-মিলিটারি ক্যাম্পে আছিন(ছিলো) এমুন কুনো মাইয়্যা মাইনসের এই গেরামে জাগা(জায়গা) অইবো না। আইজ সুরুজ ডুবুনের আগে তুই তর পেটের পাপ লইয়্যা গেরাম থেইক্যা বাইর যাইবি।
জমির আলী ভুবনপুরের গ্রাম-প্রধানদের পক্ষ থেকে গ্রামের ছোট-বড় সকলের সামনে আয়েশা আক্তারকে কথাগুলো বলে। আয়োশা দৃষ্টিটা দৃঢ় করে গ্রাম প্রধানদের মুখগুলোর দিকে তাকায়। মিলিটারি ক্যাম্পে থাকার সময় এদের মধ্যে কয়েকজকে দেখেছিলো তাই চেহারা চিনতে পারে। এরা প্রায়ই ক্যাম্পে যেতো মুক্তিবাহিনীর খবর নিয়ে।
আয়েশার খুব ইচ্ছে করচ্ছিলো চিৎকার করে বলতে,
-আমি ইচ্ছা করে পাকিস্তানি মিলিটারির কাছে যাই নাই। জমির আলী তুই আমার বাড়ি দেহাইয়্যা দিছিলি। জোর কইরা মিলিটারির গাড়িতে তুইল্যা দিছিলি। যে গেরাম আমার ইজ্জতের বদলে স্বাধীন অইছে আইজ হেই গেরাম থেইক্যা তুই আমারে কেমনে বাইর করস? রাজাকারের বাইচ্যা।
কিন্তু হায়! সে কিছু বলতে পারলো না। বলার মতো মুখ তার নেই। ছয় মাস মিলিটারি ক্যাম্পে ছিলো আয়েশা। এই সময় প্রতিদিন ঐ হায়েনাগুলো তার শরীর খুবলে খেয়েছে। তার পরিণতি হিসেবে আজ একটা অনাগত জীবন তার পেটে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। একথা আশ্রয় কেন্দ্র চিকিৎসাধীন থাকাকালীন সময়ে জানতে পেরেছে।এক দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে যখন নিজের ঘরে ফিরে আসে তখন পরিবার তাকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
আয়েশার পায়ের নিচের মাটিতো তখনই সরে যায় যখন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসা করে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে দেখে তার সেখানে কোন স্থান নেই। তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ কলঙ্কিনী বউ নিয়ে তো ঘর করা যায় না। যতই হোক-না সে বীরাঙ্গনা।
তাই আয়েশা বিচার নিয়ে এলাকার প্রধানদের কাছে এলো। কিন্তু সেখানেও দেখা মিললো হতাশার। উল্টো তাকে গ্রাম ছাড়া হওয়ার রায় শোনানো হয়।
রায় শুনে মাথা ঘুরে পড়ে যায় আয়েশা।
একটা মেয়ে দৌড়ে আয়েশাকে ধরতে কয়েক পা বাড়াতেই হুংকার দিয়ে উঠে জমির আলী,
-দূরে থাক বেউকুফ মাইয়্যা মানু! এইটা একটা নষ্টা নরকের কীড়া! এই নষ্টারে ছুঁইলে তোরে আর তোর বাড়ির হগলতেরে(সবাইকে) এক ঘইরা করমু।
হুংকার শুনে মেয়েটা ভয়ে দশ পা পিছিয়ে যায়।
যেখানে আয়েশার কোন স্থান নেই সখানে তার অনাগত সন্তান কি করে স্থান পাবে? তাও আবার এমন বাচ্চা যার নির্দিষ্ট কোন পিতৃপরিচয় নেই।
-ঘটনাটা ১৯৭২ সালের।
ষোল-সতের বছরের এক নিরপরাধ নারী তার নিজের ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অথৈই অন্ধকার ডুবে যাচ্ছিলো। বলতে পারেন অফিসার আয়েশা আক্তার নামে ঐ বীরাঙ্গনার সাথে এরপর কি হয়েছিলো?
জোড়া খুনের আসামী হিসেবে যাকে ধরে এনেছে তার মুখে স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনী শুনতে বেশ অবাক লাগছে অঙ্কুর মাহমুদের । অপরাধী বা নিরপরাধ সবাই এ সময় একটাই কথা বলে,
-বিশ্বাস করুন আমি কিছু করি নি আপনাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।
কিন্তু এই ভদ্রমহিলার কথা শুনে অবাক আর সাথে সাথে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে অঙ্কুর। আর এই মহিলা এতো সুন্দর করে কাহিনী বলছে যে অঙ্কুরের মনে হচ্ছ সম্পূর্ণ ঘটনা তার চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে। এই প্রথম খুনের তদন্ত আগে আয়েশার কি হলো সেটা শোনার ইচ্ছে হচ্ছে । তাই আবেগ প্রবণ হয়ে অঙ্কুর বলেই ফেলে,
-কি হয়েছিলো?
একটা ধূর্ত নেকড়ের মতো হেসে মহিলাটি বলে,
-সে তো আপনার মতো আইনের রক্ষকরা ভালো বলতে পারবেন। দেশের ইতিবৃত্ত আর মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাস মুখস্থ না পারলে সরকারি চাকুরি হয় না। তো আপনিই বলুন দেখি কি হয়েছিলো আয়েশার মতো বীরাঙ্গনা সাথে? আর এখন কী হচ্ছে আপনার সোনার বাংলায়?
মহিলাটির হেয়ালি কথা আর হাসির মানে ইন্টারোগেশন রুমে থাকা কেউই বুঝতে পারলো না। অঙ্কুর নেহাতই কৌতুহলে জিজ্ঞেস করে,
-আপনি কি বলতে চাইছেন স্পষ্ট করে বলুন।
ঝিলের মতো গভীর কালো চোখে ভদ্রমহিলা একটা স্থির বিষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অঙ্কুরের দিকে। সাহসী পুলিশ হওয়া সত্ত্বেও সামনে বসা আসামীর অদ্ভুত দৃষ্টিতে গা হিম হয়ে যায় অঙ্কুরের।
মহিলাটি কর্কশ গলায় বলে,
-আমি তো স্পষ্ট করেই বলছি স্বাধীনতার উনপঞ্চাশ বছর পরেও যে দেশে সাত মাস থেকে সত্তর বছরের নারী ধর্ষিতা হয়। শাস্তির বদলে শুধু ফেসবুকে প্রতিবাদ হয় সেই দেশে আপনি আমার মতো নিরপরাধ একজনকে খুনের আসামী বানাচ্ছেন এ আর নতুন কি? তা সত্যি করে বলুনতো কার কাছ থেকে টাকা খেয়ে আমাকে ফাঁসাতে চাইছেন?
এক মহিলা অফিসার রেগে ঠাস করে গাল বরাবর থাপ্পড় দিয়ে বলে,
-Bitch.
-নাফিসা! নিজেকে সামলাও। তোমাকে কে বলেছে গায়ে হাত দিতে?
অঙ্কুর ধমক উঠে নাফিসার উপর।
নাফিসার শুরু থেকেই এই মহিলাকে অসহ্য লাগছে। তার প্রথম কারণ হলো মহিলার অসহ্য রূপ আর দ্বিতীয়ত ব্যক্তিত্ব। মানে খুনের আসামী দেখতে হবে বিদঘুটে আর এই মহিলা!
অত্যাধিক সুন্দরী, হলিউড সিনেমার ডাইনির মতো। শুধু মাথায় টুপিটা নেই।
উহ অসহ্য!
মানে এতো নিঁখুত সুন্দরী হওয়াটা কও খুব প্রয়োজন ছিলো? সোজা কোমড় অব্দি লম্বা কালো চুল, ফর্সা গাল কালোহরিণীর মতো চোখ। নাফিসার অবাক লাগছে এই ভেবে যে এতো গরমে এই কালো কাপড় পড়ে সে বসে আছে কিভাবে? তার উপর সে এতোটাই পরিপাটি মনেই হচ্ছেনা রিমান্ডে আছে বরং মনে হচ্ছে সে কোন রূপকথার রাজ্যের রাজকন্যা আর এখন নিজের রাজসভায় বসে আছে । নাফিসা তো ধরেই নিয়েছে ডাইনীটা কালোযাদু জানে। আর সে নিজের রূপ দেখিয়ে অঙ্কুরকে ফাঁসাতে এসেছে। যদিওবা রূপে পাগল হওয়ার মতো পুরুষ অঙ্কুর না কিন্তু নাফিসা মেয়ে হয়ে এর আত্মবিশ্বাস আর ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানে কতটা মনোমুগ্ধকর অভিব্যক্তি থাকলে খুনের দায়ে গ্রেফতার হওয়ার পর রিমান্ডে বসে অফিসারকে কাহিনী শুনানো যায়? আর সেখানে উপস্থিত থাকা প্রত্যেকে আগ্রহী হয়ে তার কথা শুনতে থাকে। নাহ নাফিসা আর ভাবতে পারছিলো না তাই থাপ্পড়টা লাগিয়ে দেয়। কিন্তু অঙ্কুরের ধমক খেয়ে আমতা আমতা করে বলতে থাকে,
-I am sorry sir. Actually she is insulting you.
তাকে ইশারায় থামিয়ে অঙ্কুর বলে,
-আমি খুবই দুঃখিত । আসলে নাফিসা মাথা গরম করে..
থাপ্পড়ের চোটে এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো ঠিক করে, নিজের গালে হাত বুলাতে বুলাতে ভদ্রমহিলা শান্ত গলায় বলে,
-আআ! আপনার দুঃখ পাওয়া উচিত। তবে বিনা ওয়ারেন্টে আমাকে রিমান্ডে নেওয়া কিংবা আমার গায়ে হাত তোলার জন্য না বরং এইজন্য যে আপনার থানার মহিলা পুলিশ এখনো বাংলা বলতে পারে না। সত্যিই ব্যাপারটা দুঃখজনক উনি দেশে থেকে বাংলা বলতে পারেন না অথচ আমি দশ বছর আমেরিকার মতো দেশে কাটিয়ে আসার পরও বাংলা ছাড়া ঠিকমতো কথা বলতে পারি না।
অঙ্কুর কিছু বলার আগেই অন্য একজন অফিসার এসে বলে আসামীর উকিল জামিন নিয়ে এসেছে।
মহিলাটি শয়তানের মতো হেসে অঙ্কুরকে বলে,
-তখনই বলেছিলাম আমাকে এক ঘন্টার বেশি থানায় আটকে রাখা আপনার ক্ষমতার বাইরে। মাঝখান থেকে আমার সময় নষ্ট। একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাওয়ার ছিলো। একটা পরামর্শ দেই ভবিষ্যতে এমনটা করবেন না আমার বিরুদ্ধে সত্য প্রমাণ বের করার চেষ্টা করুন ; কে জানে হয়তো আমি নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়ে দিলাম।
সে চলে যাওয়ার আগে নাফিসাকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলে,
-তুমি আমাকে আমার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ার দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলে। আমার ভাল ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে স্কুলের সবাই আমাকে Bitch বলেই ডাকতো।
নাফিসা বোকা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সে চলে গেলে নাফিসা পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করে আর জোরে জোরে বলে,
- দেমাগি! Crazy! Bitch!
অঙ্কুর নাফিসার রাগ দেখে হেসে বলে,
-I agree she is। তবে ত্রিশ হাজার কোটি টাকার একমাত্র উত্তরাধিকারীণির দেমাগ থাকা স্বাভাবিক।
রুমে থাকা সবাই চরম বিস্ময়ে বলে উঠে,
-ত্রিশ হাজার কোটি!
অঙ্কুর মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
-হুম। ভদ্র মহিলার নাম জান্নাতুল বিনতে আজিজ মুক্তি। আজিজ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের সম্ভাব্য মালিক।
একজন অফিসার বলে,
-এই তাহলে সে যে নিজের বাবার উপর কেস করেছে সমস্ত সম্পত্তির জন্য? কয়দিন আগে খবরটা ফেসবুকে বেশ ভাইরাল ছিলো।
অঙ্কুর মাথা নাড়িয়ে বলে
-হুম এই হলো সেই। গত দশ বছর বিদেশে ছিলো মায়ের এক্সিডেন্টের খবর শুনে দেশে ফিরে। সবাই ভেবেছিলো মায়ের মৃত্যু শোকে ভেঙে যাবে কিন্তু না মাকে কবর দেওয়ার আগেই মামলা মোকদ্দমা শুরু করে।
নাফিসা রাগে ফোঁস ফোঁস করে বলে,
-I am absolutely right. She is a bitch. মানে কোন মেয়ে মায়ের মরার পর দোয়া-দরুদ বাদ দিয়ে মামলা করে তাও সম্পত্তির জন্য।
অঙ্কুর খানিকটা হেসে বলে,
-কে জানে সে আসলে কি? তবে আপাদত সে জোড়া খুনের প্রধান আসামী। তার সম্পত্তির প্রধান দুই অংশীদার এক চাচা আর ফুফাতো ভাই গতকাল খুন হয়। কিন্তু অদ্ভুদ ব্যাপার হলো প্রধান আসামি হিসেবে তাকে গ্রেফতার করার জন্য আমি ওয়ারেন্ট পাই নি। তাই আইজি সাহেবের সাথে আলোচনা করে এমনি তুলে এনেছিলাম। কিন্তু লাভ হলো না টাকার জোর। এক ঘন্টাও থানায় রাখতে পারলাম না। আর ইনি এতো ধূর্ত যে খুনের ব্যাপারে টুঁশব্দটিও করলো না।
নাফিসা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে,
-স্যার ভাববেন না। পাপ বাপকেও ছাড়ে না। আপনি চেষ্টা চালিয়ে যান আমি নিশ্চিত এই শয়তান মহিলা বাঁচতে পারবে না।
অঙ্কুর দৃঢ়তার সাথে বলে,
-ঠিক বলেছো। আমি এতো সহজে দমে যাবো না। অপরাধীকে খুনের সাজা দেবোই। সবচেয়ে বড় কথা অপরাধের কারণটাও বের করতে হবে। এত নৃশংসভাবে কেউ কেন খুন করলো?
-তা যা বলেছেন। লাশ দুটো দেখে আমার বমি পাচ্ছিলো। পুরো শরীরের চামড়া ছাড়ানো। কতটা ঘৃণা মনে পোষণ করলে কেউ কাউকে এভাবে খুন করতে পারে ভাবা যায়?
-হুম এই ঘৃণার কারণটাইতো বের করতে হবে। চলুন কাজে নামা যাক। আপনি আর নাফিসা মুক্তি আর তার ফ্যামিলি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত খোঁজ নিন। প্রতিটা তথ্য আমাকে জানাবে। ফোনে না পেলে মেসেজ অথবা ওয়াটাসঅ্যাপ করবেন। আমি মুক্তির উপর নজর রাখবো। একে গ্রেফতারের পর পরই আইজি স্যার ফোন করেছিলো অনেক বেশি হাই প্রোফাইল কেস তাই খুব তাড়াতাড়ি আর গোপনীয়ভাবে তদন্ত করতে হবে। নাফিসা আমার হয়ে আর একটা কাজ করো। খোঁজ নিয়ে দেখো আয়েশা নামে কোন বীরাঙ্গনা নারীর খোঁজ পাও কি না।
নাফিসা কিছুটা বিরক্ত আর অবাক হয়ে বলে৷
-স্যার আপনি ঐ মেয়েটার কথা এতো সিরিয়াসলি কেন নিচ্ছেন?
-কারণ আমার মন বলছে ওর বলা কাহিনীর সাথে এই কেসটার মিল রয়েছে।
তখন অঙ্কুটের ফোনটা বেজে উঠে। রিসিভ করতেই মুখ অন্ধকার হয়ে যায়।
আনমনেই বলে উঠে,
-নিজের বাড়ি না গিয়ে কোথায় ঐদিকে কোথায় যাচ্ছে?
এরপর সে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলে নাফিসা জিজ্ঞেস করে,
-কি হলো?
চিন্তিত হয়ে অঙ্কুর বলে,
-যতটা সহজ ভেবেছিলাম কেসটা ততটা সহজ নয়। তোমাদের যা বললাম তা করো।
এরপর সে বের হয়ে যায়।
।
।
-কি নিষ্ঠুর নিয়তি! দেখো না আমার নাম মুক্তি কিন্তু তারপরও দশ বছরের জন্য একরকম জেলখানায় বন্দী ছিলাম। জানো, দেশের মাটিতে পা রাখতেই প্রথম মাথায় যে নামটি এসেছিলো তা হলো নীলয়। চেয়েছিলাম ছুটে তোমার কাছে চলে আসতে কিন্তু পারে নি কারণ তুমিতো নিজেকে দশ বছর আগেই গুটিয়ে নিয়েছিলে। এই ইন্টারনেটের যুগেও যে কাউকে খুঁজে পাওয়া এতো দুষ্কর হবে তা আমার কল্পনাতীত।
সামনে দঁড়ানো যুবকটির দুহাত শক্ত করে ধরে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে কাঁদতে থাকে মুক্তি। কিন্তু যুবকের কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে নিজেকে খানিকটা সামলে জিজ্ঞাসু নয়নে মুক্তি নীলয়ের দিকে তাকায়।
দশ বছরের অনেকটা বদলে গেছে নীলয়। এখন সে আর হালকা পাতলা ছিপছিপে গড়নের স্কুলের সেই অবুঝ বালক নেই । আজ সে সুঠামদেহী আকর্ষণীয় সুপুরুষ। যেমন উচ্চতা তেমন গড়ন। চেহারাতেও কঠোর ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পাচ্ছে। কিশোর বয়সের ভাললাগার ব্যাপার না থাকলেও মুক্তি নিশ্চিত আজ নীলয়ের সুদর্শন চেহারায় ঘায়েল হতো।
মুক্তি ভেবেছিলো নীলয় তার কান্না সহ্য করতে পারবে না, হয়তো আবেগী হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরবে কিংবা তার চিবুক ধরে অশ্রু মুছে দেবে। তার কপালে ঠোঁট দিয়ে স্পর্শ করে নিজের প্রশস্ত বুকে মুক্তিকে টেনে নিবে। দশ বছরের জমানো দুঃখের জোয়ালাকে শান্ত করে দিবে। কিন্তু সে এসব কিছুই করলো না। নীল চোখের যুবকটি যেন সময়ের সাথে সাথে নিজের সব কোমলতা বিসর্জন দিয়ে ফেলেছে।
নীলয় হাত সরিয়ে নেয়।
কঠিন আর দৃঢ় গলায় বলে,
-বের হয়ে যাও। না হলে বাধ্য হবো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে।
নিজের প্রতীক্ষার তেতো ফল কেউ মেনে নিতে পারে না। মুক্তির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। নীলয়ের কঠোরতা সহসা তার চোখে পড়লো না। সে ভাবলো হয়তো নীলয় তাকে চিনতে পারে নি। তাই এমন বলছে।
তাই সে দু'হাতে নীলয়ের বাহু ঝাঁকিয়ে বলে,
- আমি.. আমি মুক্তি, আমাকে তুমি চিনতে পারছো না?
নিজেকে ছাড়িয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে নীলয় বলে,
-মানুষ যতই চেষ্টা করুক নিজের জঘন্য অতীতের ছায়া থেকে কখনোই মুক্ত হতে পারে না। তুমি আমার সেই অতীত, তাইতো দেখা মাত্রই তোমাকে চিনতে পেরেছি। তবে এখন অতীতের মতো ভুলটা আর করবো না। কারণ তুমি দশ বছর আগে যা ছিলে এখনো তাই আছো। বাইরে থেকে রূপবতী আর ভেতরে কুৎসিত-কদাকার জঘন্য। একটা নরকের কীট!
নরকের_কীট পর্বঃ১
