অবন্তী_সমাচার
'তোর কপালে ভালো বউ নাই।' কথাটা বলেই সাধুবাবা চলে গেলেন। আমি তো পুরাই বেকুব বনে গেলাম। এ কি কান্ড! আমার কপালে ভালো বউ আছে কিনা এইটা সাধুবাবা জানলো কেম্নে? মাথায় কিছুই ঢুকলো না।
হাঁটতে হাঁটতে অবন্তীকে কল দিয়ে বললাম, 'ঘটনা তো একটা ঘটে গেছে।'
আমার কথা শুনে অবন্তী কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলো। আসলে সকালবেলা আসার সময় অবন্তী বলেছিলো তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে। তাকে নিয়ে নাকি ঘুরতে যেতে হবে। আর, আমি যে দেরি করে ফেলাতে অবন্তীর রাগ বাড়ছে তা বুঝতে পারছি।
অবন্তী বললো, 'এতো ন্যাকামি না করে কী হয়েছে বলেন। আপনার কথা শোনার অতো টাইম নাই।'
অবন্তীকে বললাম, 'রাস্তায় এক সাধুবাবার সাথে দেখা হলো। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাধুবাবা কিছুক্ষণ ফুঁ দিয়ে দিলেন। জানো! উনার মুখ দিয়ে প্রচুর দুর্গন্ধ বের হচ্ছিলো। তাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। হ্যালো, অবন্তী!'
অবন্তী রাগ করে কল কেটে দিয়েছে। আবার করতে হবে। নাহয় মজা পাবো না। তৃতীয় বারে কল রিসিভ করেই অবন্তী বললো, 'এতো বকবক শোনার টাইম নাই। ঘটনা কী বললে বলেন নাহলে রাখেন। কাজ আছে।'
এইবার খুব তাড়াতাড়ি বলতে শুরু করলাম। 'তো যেটা বলছিলাম। উনার শরীর থেকে যে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে মনে হয় মাস দুয়েক গোসল করেনি। অথচ মাত্রা পাঁচদিন গোসল না করাই তুমি কম্বলের ভিতরে পানি মেরে দিসিলা। আচ্ছা যাইহোক, ওসব দুঃখের কথা বলে লাভ নাই।
তারপর হলো কী কিছুক্ষণ মুখের ভিতর কী যেন পড়ে জিজ্ঞেস করছে, "তুই কী বিয়ে করছিস?" আমি এক নিঃশ্বাসেই বলে দিলাম যে বিয়ে করিনি। কারণ তো তুমি জানোই, এক বড় ভাইয়ের উপদেশের কথা তো তোমায় বলেছিলাম যে, ভাইয়া বলছিলেন, "বিয়ের পরে কখনো নিজেকে বিবাহিত মনে করবি না। নাহয় আনন্দ মাটি হয়ে যাবে।"'
আর কিছু বলতে যাবো অম্নিই অবন্তী বললো, 'আজকে আসেন। আপনার বাটপারি কথাবার্তা আমি বের করবো।' বলেই অবন্তী পুনরায় কল কেটে দিয়েছে।
এতে আমার কী দোষ বুঝলাম না। বড় ভাইয়ের কথা তো রাখতেই হবে। আবারো কল দিতে হবে। এখনো তো অনেক কিছুই বলার আছে।
ফের কল দিলাম। ষষ্ঠবারে কল রিসিভ হলো। এবার অবন্তী চুপচাপ। আমি আবার শুরু করলাম।
"তো সাধুবাবা দোয়া করে দিলেন আমি যেন মাশাআল্লাহ টাইপের বউ পাই। এখানেই শেষ না। আমি যখন হাঁটা দিবো তখন হয়েছে ঝামেলা। সাধুবাবা হাত এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'তোরে অনেক দোয়া করে ফুঁ দিলাম। আর কেউ তোর ক্ষতি করতে পারবে না।' অবন্তী শুনছো! এই পর্যন্ত ঠিক ছিলো। আরেকটু যখন এগোবো তখন বললেন, "হাদিয়া দে বাবা।"
তুমি সকালবেলা পানি মেরে দেয়ায় যতোটা খারাপ লাগেনি তার চেয়ে বেশি খারাপ লাগছে সাধুবাবার টাকার কথা শুনে। প্রথমে ভাবছি মানবসেবা করছেন। পরে দেখি না, তিনি নিজের পেট সেবা করতেই এতোকিছু করছে।
বিশ্বাস করো, যাওয়ার সময় মানিব্যাগ রেখে গেছিলাম। পকেটে টাকা ছিলো না। এইবার তুমিই বলো আমি কী করবো!'
অবন্তী প্রতুত্তরে কিছু না বলে বেশ কিছুক্ষণ হেঁসে তারপর বলল, 'তারপর কী হলো। আপনারে কী পিটিয়েছে?'
বিশ্বাস করেন রাসেল ভাই! অবন্তীর এই কথা শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তাও নিজেকে স্বান্তনা দিয়ে আবার বলতে শুরু করলাম।
'কোনো টাকা দিতে না পারাই সাধুবাবা আমায় অভিশাপ দিয়ে দিছে। আমি নাকি কখনো ভালো বউ পাবো না। বিশ্বাস করো, এই কথা শোনার পরে থেকে প্রচুর কষ্ট হচ্ছে। নিজেকে একা একা মনে হচ্ছে। আমায় একটু স্বান্তনা দাও প্লিজ।'
অবন্তী কটমট করে বলল, 'বউ রাইখা আরেকটা বিয়ে করার ধান্দা তাই না! আসেন, আজকে সিঙ্গেল বানাই ছাড়বো।'
অবন্তী রেগে গিয়ে কল কেটে দিয়েছে। আমি কিন্তু এখনো বুঝতে পারছি না, কীভাবে আমায় সিঙ্গেল করবে।
সমাপ্ত।
#অবন্তী_সমাচার
~ সাধুবাবা।
লেখা - মোহাম্মদ নুরুল আজিম চয়ন।
|| ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ ||

Thirty first night
========
মাথা নীচু হতে হতে তনুর থুতনি প্রায় বুকের সাথে লেগে গিয়েছিল। ওর চোখ থেকে সমানে পানি গড়াচ্ছিল। এলোমেলো চুল, চোখের নীচের অনিদ্রাজনিত কালো দাগে ওকে খুব বিপর্যস্ত মনে হচ্ছিল। মেয়েটা যে খুব সুন্দরী সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমি একবার গলা পরিষ্কার করে ব্যক্তিত্বের গলায় বললাম, "মিস তনু আমি মো. শরীফ হাসান। একজন জুনিয়র লইয়ার। আপনার পক্ষ হয়ে আমি মামলাটা লড়তে চাই। আশা করি প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন।"
তনু আমার কথা শুনতে পেল কীনা বুঝলাম না।ওর মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল না। মাথাও তুলল না।
ফের শান্ত গলায় বললাম, " ইচ্ছে হোক, অনিচ্ছায় হোক লাইফে যা কিছু ঘটে সবই লাইফের একটা পার্ট। জীবনে এমন অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে যা আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। হয়তো যে লোকটাকে আমি সবচে বেশি বিশ্বাস করি কিংবা যাকে আমি সবচেয়ে কাছের মনে করি তার দ্বারাই সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হই। সময়ই আমাদের চিনতে শিখায় কে আপন ও কে পর।"
একটু থেমে বললাম, " এত সহজে ভেঙ্গে পড়লে চলেনা মিস তনু। শেষ নিশ্বাস ফেলার আগ পর্যন্ত মানুষ বেচে থাকার লড়াই করে। শেক্সপিয়ার বলেছেন 'ভীরুরা মরার আগে বার বার মরে, আর সাহসীরা মরে একবার। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে অনুশোচনা করে লাভ নেই। বরং সামনে কী করা যায় সেটাই ভাবা উচিত।"
এত কিছুর পরও ওর কোন সাড়া পাচ্ছিলাম না। ইতোমধ্যে আমার দু'জন মক্কেল জরুরী ফোন দিয়েছে। তাদের আমি চেম্বারে অপেক্ষা করতে বলেছি।
নিরাশ হয়ে আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। "আমার একটু তাড়া আছে। আমি তাহলে উঠি।" বিরুক্তি নিয়ে যখন উঠে দাঁড়ালাম তখন তনু বলল, " দাঁড়ান ।"
এই প্রথম মেয়েটা কথা বলল।
"থ্যাংকস।" বলে ফের চেয়ারটা টেনে বসলাম।
" কী জানতে চান?"তনু নির্লিপ্ত গলায় বলল।
"পুলিসের কাছে আপনি স্টেটমেন্ট দিয়েছেন আপনি ঠাণ্ডা মাথায় খুনটা করেছেন। আমার ধারনা মেয়েরা খুব কমই ঠান্ডা মাথায় এমন খুন করতে পারে। তারপর আবার কোন পুরুষকে।"
"হ্যা আমি ঠান্ডা মাথায়ই খুনটা করেছি।"তনু শান্ত গলায় বলল।
আমি আড়চোখে কিছুক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। বললাম, "আপনি এর জন্য অনুতপ্ত কীনা?"
"মোটেই না।" ক্রুদ্ধ গলায় ও বলল।
"দেখেন একজন অপরাধীর শাস্তি হয় অপরাধের তারতম্য, মাত্রা বা পরিস্থিতি বিচার করে। আপনি যদি আমাকে সবকিছু খুলে বলতেন তাহলে আইনি লড়াইটা আমার জন্য খুব সুবিধা হত।"
তনু হটাত মাথা তুলল। সামনের দেয়ালে একটা টিকটিকি একটা পোকা খাওয়ার জন্য ওৎ পেতে ছিল। তনু একদৃষ্টে সেদিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। তারপর বলতে শুরু করল--
"ওর নাম রবিন। দীর্ঘ চার বছরের সম্পর্ক আমাদের। আমি ওকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসতাম। তিনদিন এক নাগাড়ে ওকে না দেখলে পৃথিবীটা অর্থহীন মনে হতো। সারাক্ষন ওকে নিয়ে সুন্দর একটা পরিবার গড়ার স্বপ্নে বিভোর থাকতাম ।
ঘটনাটা ঘটে থার্টি ফাস্ট নাইটে। সন্ধ্যা থেকেই ও আমাকে অনবরত ফোন দিতে থাকে--কাল নতুন বছর। আজ থার্টি ফাস্ট নাইটে বন্ধু জনির ফ্লাটে খুব মৌজ-মাস্তি করব। জনি,লিটনকে তো তুমি চিন। ওদের গার্লফ্রেন্ডও আসবে। তুমিও চলে আসো। তুমি ছাড়া আমি বড় একা বেবি।
হলে সিট পাইনি বলে এক বড় আপুর সাথে মহিলা কর্মজীবী হোস্টেলে শেয়ার করে থাকি। আমি বললাম এত রাতে আমার পক্ষে আসা সম্ভব না। ও বলল, ভয় নেই, আমি রাতে তোমাকে পৌঁছে দেব। প্লিজ লক্ষিটি চলে এসো। প্লিজ প্লিজ..
আমি ওর কোন অনুরোধ ফেলতে পারিনা। 'এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছি' বলে হোস্টেল থেকে রাত সাড়ে নয়টায় ওর বন্ধু জনির ফ্লাটে গেলাম। যদিও জনির ফ্লাটে আগেও একবার গিয়েছিলাম। চিনতে অসুবিধা হয়নি ।
এগারটার দিকে জনি আর লিটন কাচ্চি আর কি কি খাবার নিয়ে আসলো। কিন্তু বাসা থেকে অনুমতি না পাওয়ায় ওদের গার্লফ্রেন্ডরা নাকি আসতে পারেনি।
বারোটা এক মিনিটে আমরা সবাই হ্যাপ নিউ ইয়ারের উইশ করলাম। কাচ্চি খেলাম। ওরা ড্রিংকস টাইপের হাল্কা পানীয়ও এনেছিল। আমি এসব পানীয় পছন্দ করিনা। তারপরও ওরা বার বার বলছিল নতুন বছর সেলিব্রেট করতে জাস্ট একটু খাও। অনেক পীড়াপীড়িতে কয়েক চুমুক খেতে হল। খাওয়ার আধ ঘন্টা বাদে আমি সব ঝাপসা দেখতে লাগলাম। কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। সমস্ত শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছিল। আমি অচেতন হয়ে গেলাম। ওরা তিনজন পুরো রাত আমার শরীরটা খুবলে খুবলে খেল। অচেতন, নিস্তেজ শরীরে বাধা দেয়ার মত বিন্দুমাত্র শক্তি ছিলনা আমার। বাকি রাত আমার আর হুশ ছিলনা। সকালে জ্ঞান ফিরতেই দেখি আমার সালোয়ার, বিছানা রক্তে লাল হয়ে আছে। বিছানা থেকে উঠার কোন শক্তিই পাচ্ছিলাম না আমি। আমার পাশে রবিন তখনো চিত হয়ে গভীর ভাবে ঘুমুচ্ছিল। ওর দুই বন্ধু রাতেই সরে পড়েছিল। অনেক কষ্টে নিজের শরীরটাকে বিছানা থেকে টেনে তুললাম। হটাত ডাইনিং টেবিলের উপর ফল কাটা চকচকে ছুড়িটার দিকে নজর গেল। মুহুর্তে সব হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। ছুড়িটা ওর কণ্ঠনালি বরাবর এক মুহুর্তে ঢুকিয়ে দিলাম। ফিনকির মত সমানে রক্ত বেরোচ্ছিল ওর গলা থেকে। কোরবানির গরুর মত গো গো শব্দে ওর শরীরটা নিস্তেজ হয়ে গেল। রক্ত দেখে উল্লাসে মেতে উঠলাম আমি। ঠিক কতক্ষন এভাবেই কেটে গেল আমি জানিনা। তারপর সেখান থেকে সরাসরি থানায় গেলাম। পুলিসের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। ফ্লাট থেকে রবিনের লাশ উদ্ধার করা হল। আমাকে পুলিস কাস্টডিতে নেয়া হলো ।
ওর কথা শুনতে শুনতে আমার মেরুদণ্ড হয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে রইলাম।
বললাম, "আপনি শুধু প্রতিশোধই নেননি রীতিমত পুলিসের কাছে আত্মসমর্পণ করে সাহসীকতার একটা কঠিন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কীভাবে এমন একটা ভয়ংকর প্রতিশোধ নিলেন কিছুতে আমার মাথায় আসছেনা।"
পাল্টা গলায় ও বলল, "যখন খুনটা করি তখন আমার হিতাহিত জ্ঞান ছিলনা। আর যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন পুলিসের কাছে আত্মসমর্পন করি।"
একটু থেমে বলল,"নিজের জীবন নিয়ে এখন আর পরোয়া করি না। ফাঁসি হলেও আমার কোন আপত্তি নাই। কিন্তু আমি শুধু সবাইকে মেসেজটা দিতে চাই থার্টি ফাস্ট কিংবা ভ্যালেন্টাইনস ডে'র নামে আর কোন মেয়ে যাতে আমার মত এমন ভয়ংকর নিষ্টুরতার শিকার না হয়। এমন গ্যাং রেপের শিকার না হয়। কাউকে বিশ্বাস করে এমন ভাবে যাতে আর ঠকতে না হয়।"
বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে যে মানুষ কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে ওকে দেখে ভাবছিলাম।
বললাম, "মিস তনু আপনার জন্য আমি কতটুকু কি করতে পারব জানিনা। কিন্তু কেসটাকে আমি সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম। "
ঠিক তখনি দু'জন মহিলা পুলিশ ঢুকলো। তনুকে দু'হাত ধরে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে উঠাল। স্টার্ট নিয়ে প্রিজন ভ্যানটি চলতে শুরু করল।
আমি ওর চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভালবাসার এপার ওপার নিয়ে ভাবছিলাম। ভালবাসা নাকি কখনো কখনো মানুষকে নতুন ভাবে বাচতে শেখায়। আবার কখনো জীবনও কেড়ে নেয়। তবু ভালবাসে মানুষ। ভালবাসা ছাড়া জীবন যে বড় অচল!
~মেহেরাব মাশুক

Unknown
বাসে উঠে দেখি আমার সিট দখল করে বসে আছে সুন্দরী একজন মহিলা, মহিলা বলা মনে হয় ঠিক হবে না। মেয়ে বলা যায় বয়স পঁচিশের বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে না।অবশ্য মেয়েদের বয়স নির্ণয় করা আমার সাধ্যের বাহিরে।ভ্রমণে জানালার পাশের সিট আমার লাগবেই। অন্য অনেক কিছু ছাড় দেয়া যায় এটা ছাড়া আমার চলে না।চারপাশের দৃশ্য দেখা সাথে প্রিয় গান।না হলে ভ্রমণের স্বাদ পাইনা!
সুন্দরী মেয়েদের জ্ঞান বুদ্ধি থাকে একটু কম ! অতি যত্নে বিধাতা এদের সুন্দর করে গড়ে বুদ্ধিটা দেয় একটু কম ।এ জন্য সুন্দরী মেয়েরা বখাটের পাল্লায় পড়ে! অধিকাংশ সুন্দরী মেয়ের জীবন কাটে দুঃখের মাঝে! কালো মেয়েগুলো প্রথম জীবনে অবহেলিত হলেও জীবনে সুখী হয়।
ময়মনসিংহ যেতে হবে কিছু ছেলে নিমন্ত্রণ করেছে ওদের একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে ।ময়মনসিংহ শহরে প্রথমবার যাচ্ছি। একটা বিভাগীয় শহরে একবারও যাওয়া হয়নি তাই ছেলেগুলোর আবদারে প্রথমবারে রাজি হয়ে যাই।অনেক দিনের ইচ্ছে ময়মনসিংহ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয় দেখার ।শুনেছি এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিশ্বাবিদ্যালয়। দেখতেও নাকি বেশ সাজনো গুছানো।এ সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়টা দেখা হয়ে যাবে।
ওদের একটা কালচারাল প্রোগ্রামে একটা বিষয়ে আলোচনা করতে আমাকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। এসব অনুষ্ঠান আমার খুব একটা পছন্দ না।এখানে ভারি ভারি আলোচনা হয় সব জ্ঞানী লোকজন আসে।আমি মুখ্য মানুষ জ্ঞানীদের সাথে মানিয়ে নেয়াটা কষ্টকর হয়ে যায়। এখানে আলোচনা শুনতে না সবাই বলতেই আসে।এসব অনুষ্ঠান আমি সাধারণত এড়িয়ে যাই এবার শহরটা দেখার লোভ।কয়েক ঘন্টা বিরক্তিকর আলোচনার মাদ্যমে একটা শহর ঘুরার সুযোগটা নেয়া যায়।
বাসের টিকিট ওরা কেটে দিয়েছে আমার চাহিদা চার নাম্বার লাইনে জানালার পাশের সিট। ডেকে বললাম আপু এটা আমার সিট।মেয়েটি আমার দিকে এমনভাবে তাকলো মনে হয় এ জীবনে এমন কথা কখনো শুনেনি! হালকা লাল চোখ! ভিজানো মুড়ির মত ফুলে আছে! চোখের নিচে নোনা জলের দাগ।বুঝা যাচ্ছে একটা লম্বা সময় ধরে কেঁদেছে!
আমি বোয়াল মাছের মত ভাবলেশহীন মানুষ। সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি।মেয়েটি উদাস চোখে আমার দিকে তাকালো আমি নির্লপ্তভাবে চোখের ইশারায় ইঙ্গিত বুঝালাম আমার সিট! একরাশ বিরক্তি নিয়ে ক্লান্তভাবে আমায় সিট ছেড়ে দিয়ে পাশের সিটে বসলো।সুন্দরী মেয়েদের আত্মবিশ্বাস থাকে তাদের কেউ না বলতে পারে না।এমন ঘটতে পারে কল্পনা করেনি! হতাশ চোখে আমায় একটু দেখলো।
সিটে বসে ব্যাগ থেকে ব্লুটুথ হেড ফোন ট্যাব বের করে আমার যাত্রার আনন্দময় সঙ্গী গান শুনা শুরু করলাম। মেয়েটা চোরা চোখে আমায় দেখলো কয়েকবার।
বাস চলতে শুরু করেছে তীব্র গতিতে পাশের ছুটন্ত দৃশ্য সাথে প্রিয় গান। আমার পাশে একজন মেয়ে আছে সেদিকে আমার কোন খেয়াল নেই।আমি আমার মত আছি হঠাৎ টের পেলাম মেয়েটি কাদঁছে!
পাশে একজন সুন্দরী মেয়ে নীল শাড়ির আচঁলে বারবার চোখ মুচ্ছে এ দৃশ্য দেখে স্বাভাবিক থাকা যায়! মনের মধ্যে কেমন কেমন করে! একটা অসস্তি আচ্ছন্ন করে রেখেছে।গানে মন শান্ত হচ্ছে না।একটা অজানা কৌতূহল হচ্ছে! বুঝে উঠতে পারছিনা কি করবো।মেয়ের ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই।তার দুঃখ আমাকে আকৃষ্ট করছে। শান্ত থাকার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না।মেয়েদের এড়িয়ে চলার ক্ষমতা আল্লাহ পুরুষদের দেয়নি!
ক্রন্দনরত নারিকে শান্তনা দেয়ার ভাষা আমার জানা নেই।মানুষ আমার আগ্রহের বিষয় নয় এদের আমি খুব কম বুঝি। মেয়ে মানুষ বুঝি আরো কম!শান্তনা দিতে মোটেই পারিনা, শান্তনা দেয়ার উপরে কোন বই আছে? জানা নেই থাকলে ভালো হতো। আমার মত মানুষের জন্য এটা খুব দরকার। শান্তনা দেয়ার একশো উপায় এনামে একটা বই। সেদিন অফিসে হঠাৎ করে কলিগের মা মরার খবর এলো কলিগ কান্নায় ভেঙে পড়লো তাকে শান্তনা দেবো কি করে জানি না।বোকার মত চেয়ে রইলাম! আগুন লাগলে কার্বনডাই-অক্সাইডে নিভে, মানুষের বুকের জ্বলা আগুন নিভিয়ে দেয়ার কিছু একটা থাকলে ভালো হতো।কিছু কথা বা কোন পদ্ধতি নিশ্চয় আছে!
ইউটিউবে কোন ভিডিও আছে কিনা একটু দেখা দরকার। কতসব আজগুবি ভিডিও থাকে এমন প্রয়োজনীয় বিষয়ে ভিডিও মনে হয় আছে। দেখতে পারছিনা মোবাইলে নেট নেই! এ এক যন্ত্রণা প্রয়োজনে এদেশে কিছুই পাওয়া যায় না।একটা হিন্দি ছবিতে দেখেছিলাম একটা মেয়ে কাঁদছে নায়ক তাকে পানি দিয়েছিলো।কাদঁলে পানি শুন্যতা বেড়ে যায় কি? এটা অবশ্য আমার জানা নেই অথবা পানি পান করলে শরীর শীতল হয়। এটাও একটা কারন হতে পারে বা পানির কথায় মনটা পানির দিকে আকৃষ্ট হলে দুঃখবোধটা কমে যায়।পানির প্রস্তাব ভালো মনে হলো ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা বের করে মেয়েটির দিকে এগিয়ে ধরলাম।মেয়েটি ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো" আমি আপনার কাছে পানি চেয়েছি? আপনি মনের সুখে গান শুনেন "
ফুটো বেলুনের মত সবটুকু হাওয়া বের হয়ে একবারে চুপসে গেলাম।আর কিছু বলার সাহস হলো না।মনে মনে ভাবছি সাধে মানুষ বলে মেয়ে মানুষের মন বিধাতা বুঝে না।আমি আমার মত আছি গান শুনছি আড় চোখে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছি।কান্নার এখন বিরতি চলছে।কান্নার বিরতির সাথে বাসের বিরতির সময় হলো।নিচে নেমে এলাম না রূপসী কে নামার কথা বলা সাহসে কুলালো না।নিচে এসে একটু অপেক্ষা করলাম নামে কিনা।কি অদ্ভুত আমি অপেক্ষা করছি! মেয়েটি নামলো না।ওয়াশরুমের কাজ সেরে একটা ফাঁকা টেবিলে বসে আছি খাওয়ার কোন ইচ্ছে নাই।শুধু একটা কফি অর্ডার করলাম। চারদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি মেয়েটি নেমেছে কিনা। একটু কেমন হতাশ হলাম! কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারছিনা!
আমি বরাবর মেয়েদের ব্যাপারে উদাসীন! এ নিয়ে মামুন ভাই আমাকে নানা কথা শুনায় আমি নাকি কোন পুরুষেই না।
রাস্তায় কখনো কোন মেয়ের দিকে আমি ফিরে তাকাই না।যত সুন্দর হোক এটা অন্যদের কাছে অস্বাভাবিক লাগে।না, কোথাও দেখা মিললো না।মনে হয় নামেনি। আচ্ছা যদি নামতো আমি কোন কিছু বলতাম? মনে হয় বলতাম না।
বাস আবার চলতে শুরু করেছে না মেয়েটির কান্না থেমে গেছে। আমি আমার মত গান শুনতে শুনতে কখনো ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারেনি।রাতের বাসে ভালো ঘুমাতে পারি ।রাতের জার্নি খুব ভালো লাগে।
ঘুম ভাঙলো সুপারভাইজারের ডাকে বাস তার শেষ গন্তব্যে এসে গেছে। রাত এখন গভীর আমার জন্য একটা ডাক বাংলোয় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এনিয়ে কোন চিন্তা নেই।ডাক বাংলো বস স্টপেজের নিকটে। বাস থেকে নেমে হাটা শুরু করলাম কয়েক মিনিটের পথ।
ডাক বাংলোয় এসে আমার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে আসলাম।বেশ বড় রুম সাথে বিশাল বারান্দা।সামনে খোলা মাঠ। চমৎকার পরিবেশ! বাহির থেকে এসে আমার প্রথম কাজ গোসল করা এটা অনেকদিনের অভ্যাস। অবশ্য গোসল করতে আমার সময় লাগে না।চড়ুই পাখির মত ফটাফট গোসল শেষ হয়ে যায়।গোসল সেরে বাহিরে এসে দেখি কলিং বেল ভাচ্ছে।দরজা খুলে ভুত দেখার মত অবস্থা দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে সেই রুপসী! আমি কিছু বলার আগে রুমে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে দিলো
আমি কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।অনেক বেশি অবাক হলে মানুষ ভাষা হারিয়ে ফেলে।অনুভূতির তীব্রতার একটা মাত্রা পর্যন্ত ভাষায় প্রকাশিত হয়। মাত্রা অতিক্রম করলে ভাষা শুন্য হয়ে যায়।
নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছি মেয়েটির দিকে।রুমে প্রবেশ করে দেয়ালঘেরা সোফায় ধপাস করে বসে পড়লো! এসময় আমার মোবাইলের রিংটোন ভেজে উঠলো। মোবাইলের পর্দায় ভেসে উঠলো অন্তুর নাম।আমার এক ছোট ভাই ওর মাধ্যমে এখানে আমন্ত্রিত হয়েছি।ওর বাড়ী এখানে। রিসিভ করলাম হ্যালো
ভাই খুব ভালো লাগছে আপনি এসেছেন, কোন সমস্যা হয়নিতো?
না অন্তু কোন সমস্যা হয়নি খুব ভালোভাবে পৌঁছেছি। তোমাদের অনুষ্ঠানের কি খবর?
খুব ভালো ভাইয়া সব ভালোভাবে হয়েছে আশা করি খুব ভালো একটা প্রোগ্রাম হবে।খুব ভালো লাগছে আপনি ভাবি কে নিয়ে আসছেন!আগে জানালে ভালো ব্যবস্থা করতে পারতাম।বাংলো থেকো জানালো ভাবি আপনার একটু পরে এসেছে! কোন সমস্যা ভাইয়া?
আমার কলিজা মরুভূমির মতো শুকিয়ে গেছে কথা শুনে।অন্তু জেনে গেছে মানি ওদের ব্যাচের সবাই জানবে।এদের থেকে কথা ছড়াতে সময় লাগবে না।অন্তু ভালো করে জানে আমি অবিবাহিত। এসব খবর বাতাসের বেগে ছড়ায়! আমি হিসাব করছি এ সংবাদ মায়ের কানে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে! কিযে কান্ডবাধে আল্লাহ জানে! "না ভাইয়া কোন সমস্যা হয়নি "এতটুকু বলতে খুব কষ্ট হলো মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না।
ঠিক আছে ভাইয়া সকালে দেখা হবে।কোন সমস্যা হলে জানাবেন।
কল কেটে দিলাম কিছুই বললাম না।আমি স্পট দেখছি অন্তুর টিপটিপ হাসি মুখখানা! রাগে শরীর জ্বলছে! অগ্নি দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম "এই আপনি বাংলোর ওদের কি বলে এসেছেন? " কথার ভীতরে জ্বলন্ত আগুনের তাপ ছিলো ভালোই।
মেয়েটি প্রথমে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়, কথা শুনে কান্না শুরু করে দিলো,কি বিপদ! "এই কাদবেন না উত্তর দিন, কী? বলেছেন।
এটা বলার পর কান্নার ভলিউম আরো বাড়ছে! মধ্যে রাতে লুকিয়ে নিঃশব্দে ভিডিও দেখার সময় আচমকা সাউন্ড ভেজে উঠলে দ্রুত কমাতে যেয়ে বেড়ে গেলে যেমন হয়! একে নিয়ে কি করবো এখন! এখন বের করে দেয়া যাবে না।অন্তু জেনে গেছে সকালে একে না দেখলে ঘটনা অন্য দিকে মোড় নিবে, যে দাগ লাগবে তা মুছাঁ যাবে না।
নিজেকে শান্ত করে মোলায়েম কন্ঠে বললাম" আপনি এখানে কেন এসেছেন এটাতো বলুন? " বিরতিহীন কান্না চলছে, কেমনডা লাগে! এমন কাঁদে কি করে এরা! কোন উত্তর দিচ্ছে না! কি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লাম।এমনিতেই মেয়ে মানুষ সম্পর্কে জ্ঞান আমার শুন্যের কাছাকাছি। কোন মেয়ে বন্ধু নাই যারে কল দিয়ে পরামর্শ চাইবো।বন্ধুদের জানাবো? এক একেটা বদের হাড্ডি! ওদের বললে ঝামেলা বিরাট আকার ধারন করবে।
কি বা বলবো গভীর রাতে একটা মেয়ে আমার রুমে প্রবেশ করে বসে আছে! একথা দুনিয়ার কোন পুরুষতো দূরের কথা কোন মেয়েও বিশ্বাস করবে না।
আচ্ছা কিছু বলতে হবে না অনেক পথ ভ্রমণ করেছেন ফ্রেশ হয়ে নেন পরে কথা হবে।একথা বলার সাথে সাথে বাথরুমে ডুকে পড়লো।রুম সার্ভিস কল দিয়েছে স্যার রাতে কি খাবেন? কিছু খাবারের অর্ডার দিলাম মেয়েটির কথা চিন্তা করে।
বাথরুমে গেছে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে।অবশ্য মেয়েদের বাথরুমে সময় খুব বেশী লাগে।পানি মেয়েদের খুব প্রিয় জিনিস।পানি পেলে সহজে বের হতে চায় না।অনেকটা সময় পর বুঝতে পারলাম মেয়ে কাপড় ছাড়া বাথরুমে গেছে!
কি অদ্ভুত! আমি ভেবেছিলাম মেয়ে বুঝি বোকা এখন দেখি কয়েকধাপ এগিয়ে সে আমার শার্ট প্যান্ট পড়ে বেরিয়েছে! এ সব নিলো কখন!
ইতোমধ্যে খাবার দিয়ে গেছে।মেয়ে বের হয়ে আমার কোন প্রশ্নের উত্তর সে দিচ্ছে না।টেবিলে রাখা খাবার দেখে সুন্দর করে খাওয়া শুরু করলো!
একি কান্ড! এতো কোন কথাই আর বলছে না।ওমা খাওয়া শেষ করে সে
খাটে শুয়ে পড়েছে! আমি বললাম "আমি শুবো কোথায়? "
বলে" আপনার ইচ্ছে মত শুয়ে পড়েন খাটতো ছোট না!"
কি মেয়েরে বাবা এমন মেয়ে জীবনে দেখাতো দূরের কথা শুনিওনি! কোন কিছু মাথায় ঠুকছে না।মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। মেয়েটি শুয়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়েছে! কেমনে সম্ভব? গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন! হাত পা গুটিয়ে বাচ্চাদের মত ঘুমিয়ে আছে। ঘুমন্ত মুখখানি কি নিস্পাপ! অসম্ভব সুন্দর লাগছে!
আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম আকাশে আজ বড় চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে সামনের খোলা মাঠে। চারিদিকে শুনসান নিরবতা।
চাঁদের ঝাপসা আলোতে দূরের গাছপালা দেখা যাচ্ছে।চাঁদের আলো গায়ে মাখলে মনটা কেমন ভালো হয়ে উঠে! মনের অবসাদ অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে।ক্লান্ত শরীর কখন সোফায় এসে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই।ঘুম ভাঙলো কলিং বেলের শব্দে। ঘুম থেকে উঠে অবাক হয়ে বসে আছি!
আমি সোফায় কেন? ধীরে ধীরে রাতের সব মনে পড়লো।বিছানা খালি মেয়েটি কোথায়? বাথরুমের দরজা খোলা। দরজায় বেল ভাচ্ছে।
দ্রুত উঠে দরজা খুললাম।ছোটভাই অন্তু এসেছে। " কি খবর ভাইয়া? "
ভীতরে এসো।তোমাদের কি খবর বলো?
অদিকে সব ঠিক আছে আপনারা দ্রুত প্রস্তুত হয়ে বের হোন আমরা নিচে আছি।
রুমে এসে বারান্দায় গেলাম দেখি শার্ট প্যান্ট পড়ে দাড়িঁয়ে আছে মেয়েটি।
খোলা চুল ছড়িয়ে পড়েছে। শার্ট প্যান্টে মেয়েটিকে দারুণ লাগছে! কিছু মেয়ে থাকে এদের সব ধরনের পোশাকে ভালো লাগে।মেয়েটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কি এখন মন ভালো হয়েছে?
আমার দিকে একটুখানি তাকালো কি ময়াবী চাহনি! এ চোখের গভীরতায় পৃথিবী হারিয়ে যাবে! "আপনাকে অনেক ঝামেলায় ফেলেছি না? "
ভালো লাগছে যাক স্বাভাবিক কথা বলছে।ভয় করে আবার না কান্না শুরু হয়ে যায়।দেখুন আমি এমন পরিস্থিতি কখনো পড়িনি।মেয়েদের সাথে মিশার অভিজ্ঞতা আমার খুব কম।একটু ঘাবড়ে গেছিলাম। আপনার নামটা জানা হয়নি এখনো।
আপনি খুব ভালো মানুষ! আমি তারিন।
আমি মোটেই ভালো মানুষ না, আপনি আমায় চিনতে ভুল করেছেন।মোবাইল রিং হচ্ছে। অন্তু কল দিচ্ছে। আচ্ছা দ্রুত তৈরি হোন এখন বের হতে হবে আমার একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হবে।
আপনি যান আমি চলে যাবো।
বলে কি মেয়ে! "আপনি বুঝতে পারছেন না, আপনি না গেলে ঝামেলা বাড়বে সে পরে খুলে বলবো।এখন সময় কম।
অনুষ্ঠান ভালোই আয়োজন করেছে এরা। অনেক গন্যমান্য লোকজন এসেছে।অল্প কিছু বলে আমার আলোচনা শেষ করেছি। সেই বাংলো থেকে ছোট ভাইরা আমাকে রেখে তারিন কে নিয়ে ব্যস্ত! ভাবি বলে ডাকছে, কেমন লাগে! কি আশ্চর্য মেয়েটি কিছু বলছে না! সুন্দর হাসি মুখে ওদের সাথে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠান শেষে এখন এসেছি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আসলে বিশাল জায়গা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি।বিভিন্ন কৃষি কাজের জন্য বিশাল খেত সেখানে নানা রকমের ফসল লাগানো।ছোট ছোট মাছ চাষের ব্যবস্থা আছে, হাস মুরগির নানা প্রজনন। অসম্ভব সুন্দর একটা বিশ্ববিদ্যালয়।তারিন ওদের সাথে একটু দূরে ঘুরে ঘুরে সব দেখছে এখন মনে প্রান খুলে হাসছে। এ সময় মোবাইল ভেজে উঠলো বের করে দেখি মা কল দিয়েছে। কল রিসিভ করলাম কোন কথা বলছে না কান্নার শব্দ। কি হয়েছে মা? কাদঁছো কেন!
মা কান্নার মাঝে একটু ঝাড়ি দিয়ে বললো কে তোর মা?
আবার কি হলো?
কি হয়নি তুই বিয়ে করেছিস সেটা আমাকে শুনতে হলো অন্য মানুষের কাছে! আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে করেছে আমি জানি না।সে বউ নিয়ে ঘুরতে যায়। আমায় বলে যায় না।আমি কি তোর বউ কে মনে নিতাম না।কতবার তোরে জিজ্ঞেস করেছি তোর পছন্দ থাকলে বল।আমি সেই মেয়েকে মেনে নিবো।ছেলে আমার বলে কিনা এখন বিয়ে করবে না।আর আমায় না জানিয়ে বউ নিয়ে ঘুরতে যায়।
কি বলছো তুমি? এসব তোমায় কে বললো।
আমি কোন কথা শুনতে চাইনা বউ নিয়ে সোজা বাড়িতে আয়।
মায়ের কথায় অবাক হলাম, মা জানবে কিছুটা আচঁ আগেই করেছিলাম তাই বলে এতো দ্রুত! এটা বড় কোন ব্যাপার না, মা কে পরে বুঝানো যাবে।এখন এসেছি জয়নাল আবেদীন নামে একটা পার্কে। পার্কের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদী।নানা রকম গাছের সারি মাঝে মাঝে বসার কিছু বেঞ্চ। খুব বড় না হলেও দেখতে বেশ ভালো লাগে পার্কটা।
ময়মনসিংহ শহরটা খুব গোছানো বলা যায় সব শহরের মতো এখানেও আছে যানযট নামক যন্ত্রণা! ঢাকা চট্টগ্রামের মত বড় না হলেও খুব একটা ছোট না এ শহর।দিনের বড় একটা সময় কেটে গেলো শহর ঘুরে দেখতে।এ লম্বা সময় ধরে তারিন আমাদের সাথেই আছে এটা কেমন অস্বাভাবিক লাগলো আমার কাছে অচেনা একটা মেয়ে হুট করে নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়াচ্ছে! ছেলেগুলোর সাথে এমনভাবে মিশে গেছে সত্যি সত্যি আমাদের মাঝে একটা বন্ধন আছে! সব কেমন রহস্যময় লাগছে! কে এই তারিন?
তারিন কে প্রশ্ন করার অবকাশ হলো না।পুরোটা সময় জুড়ে ছোট ভাই গুলো সাথে সাথে ছিলো।এখন ফিরার পালা ওরাও আমার সাথে ফিরবে।
কি আশ্চর্য তারিন আমাদের সাথে আসছে! এতে ওর মাঝো কোন ধরনের অসংকোচ নেই।মনে হচ্ছে সব স্বাভাবিক। তারিনের সাথে সত্যি একটা সম্পর্ক আছে এমন মনে হচ্ছে দেখে। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা তারিন কে। শুরু থেকে কেমন একটা রহস্যের দেয়াল ঘিরে আছে। মায়ের সামনে এ মেয়ে উপস্থিত হলে বড় হাঙ্গামা বাধঁবে।আচ্ছা তারিন কি কিছুই বুঝতে পারছেনা।না বুঝার কারন নেই। ও ইচ্ছে করেইতো সব করছে। এমন না সে আচমকা এ পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে।
বাড়িতে এসেছি সাথে তারিন অন্তুরা সবাই। বাড়িতে এসেতো আমার অবস্থা চোখ ছানাবড়া! প্রায় সব আত্মীয় স্বজন উপস্থিত।বাড়ি সাজগোছ করা ঘটনা এতো দূর গড়িয়েছে! মা দেখি হাট ঘাট বেঁধে নেমেছে।
বাড়িতে প্রবেশ করতেই খালাতো বোন দৌড়ে এসেছে ভাইয়া বউ নিয়ে এসেছো?
আমি চোখ রাঙিয়ে বললাম ভাগ এখান থেকে। তারিন মনে হয় মজা পাচ্ছে! মায়ের কাছে গেলাম মা এসব কি শুরু করেছো?
মা রাগ দেখিয়ে বলছে কোন কথা বলবি না।তোর সাথে কোন কথা নেই।তবে বউ আমার পছন্দ হয়েছে।
আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম না।মা কোন কথা শুনতেই চাচ্ছে না। আমিও দেখি কি হয়।একটু পর মামা ডাকলো যেয়ে দেখি খালা, মামা বসে আছে।আমার মামা একটু গুরুগম্ভীর প্রকৃতির লোক।খালা মনঃখারাপ করে বসে আছে! আমার দিকে শুকনো মুখে তাকিয়ে মুখ সরিয়ে নিলো অন্য দিকে।খালা আমায় বড় ভালোবাসে।খালার কোন ছেলে নেই এ জন্যে ভালোবাসার মাত্রাটা খুব বেশি। মামা কে সালাম দিলাম। কেমন আছেন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে একটু গম্ভীরমুখে বসতে বললেন।
মামা বলা শুরু করলো তোমার কাছে এমনটা প্রত্যাশা করিনি।তুমি আমাদের বলতে পারতে।তুমি ছাড়াতো বুবুর কেউ নাই।তোমার বাবা গত হওয়ার পর কত কষ্টে তোমাকে মানুষ করেছেন।তোমাকে ঘীরে আমাদের অনেক স্বপ্ন। যা হওয়ার হয়েছে এখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমাদের আবার বিয়ে দিবো।পূর্বে কি করেছো সেতো আমরা দেখিনি।
আমাকে বলার সুযোগ দেয়া হলো না।সব এরা আগে থেকেই করে রেখেছে। আসলে গত দুবছর ধরে আমাকে বিয়ে করানোর জন্য এরা উঠে পড়ে লেগে কোন কূলকিনারা করতে পারেনি।এ সুযোগে আমায় বেঁধে দেয়ার সব রকম ব্যবস্থা করে ফেলেছে। মনে হয় না এখান থেকে বের হতে পারবো।বের হওয়ার ইচ্ছে খুব একটা নেই। তারিন আমার পছন্দ।
তারিন আর আমার বিয়েটা হয়েই গেলো।তারিন খুব মজার মধ্যেই আছে।সব অবিশ্বাস্য লাগছে তাইনা? আত্মীয় স্বজনের পাল্লায় পড়লে বুঝতেন এরা কি জিনিস!
বাসর ঘরে এসে দেখি তারিন বসে আছে বড় ঘোমটা দিয়ে।আমি রুমে প্রবেশ করে তারিনের পাশে বসে বললাম এখনো কি? কাদঁবে, না জবাব দিতে পারবে নিতু।আমার কথা শুনে ঘোমটা ফেলে বড় বড় চোখে তাকালো।নিতুর চোখে বিস্ময়!
তোমরা কি ভাবছো আমি কিছুই বুঝবো না।এতোসব ঘটনা কি স্বাভাবিক হয়?
তুমি প্রথমে আমাকে চিনেছো?
না,বাসের মধ্যে চিনতে পারিনি।সেই ছোটবেলায় দেখেছি এতোবছর পরে চিনা যায়।
তাহলে কখন বুঝতে পারলে?
অজানা একজন ছেলের রুমে প্রবেশ করে একা একটা মেয়ে এতো নির্ভয়ে! আমার সন্দেহ হলো যখন তুমি হুট করে বাথরুমে চলে গেলে।
একটা মেয়ে কখনোই এটা করতে পারে না।অজানা কোন ছেলের রুমে বলার সাথে সাথে বাথরুমে চলে যাবে না।যে মেয়েটি শুধুই কাদঁছে হঠাৎ করে এমন আচরণের পরিবর্তন আমায় ভাবিয়ে তুললো।
তাতেই বুঝে গেলে আমি নিতু?
না,ভাবতে শুরু করলাম তখন তোমার ছোট হাতব্যাগটা কিছুটা সহায়তা করলো।
তাইতো বলি বলদটা এতো নিঃসংশয় থাকে কি করে।বলে আমি ঘুমাবো কোথায়! এতোটা স্বাভাবিক! আন্টি যেমন বলেছে তার সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম না।অবশ্য রুমে প্রবেশ করার পর তোমার যা অবস্থা হয়েছিল। দেখে এমন হাসি পাচ্ছিলো অনেক কষ্টে হাসি লুকিয়েছি।রুমে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিলো না।এটা অন্তুর বুদ্ধি।
অন্তু সব জানতো! তাইতো বলি বেটা এতো স্বাভাবিক কেন? কান্না বুঝি হাসি লুকানোর মাধ্যম, ওমন করে কাঁদা যায়!নিতু হলো আমার মায়ের বান্ধবীর মেয়ে ছোটবেলায় আমরা একসাথে কত খেলা করেছি।ওরা বিদেশে চলে যাওয়ার পর খুব একটা যোগাযোগ ছিল না।মার হয়তো ওদের সাথে যোগাযোগ ছিলো।তুমি যে আমার রুমে রাতে থাকলে ভয় করলো না? যদি আমি কিছু করে ফেলতাম।
তোমাকে আমি চিনি না? তুমি কোন মেয়ের ক্ষতি করতেই পারো না।এতটুকু বিশ্বাসতো আছে।না হলে বিয়েতে রাজি হতাম।আন্টি বললো তুমি মেয়েদের ব্যাপার অনাগ্রহী। বিয়ে করতে চাচ্ছো না।
সব খবর নেয়া হয়ে গেছে দেশে এসে, শুধু আমিই কিছু জানিনা।সেদিন ছেড়ে দিয়েছি আজ ছাড়বো এমন আশা করো না।
আজ তোমাকে ছাড়তে বলেছে কে? নিতু হাসছে।
কি সুন্দর হাসি মনে হয় মুক্তা ঝরে পড়ছে সারা ঘরটা হাসির আনন্দে ভরে গেছে, দেয়ালা গুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে আনন্দের আমাজে!
সমাপ্ত
@ নাবিল মাহমুদ

National self
#জাতীয় স্বার্থরক্ষায় রাষ্ট্রীয় ভূমিকার ধরন:
জাপানিরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে যে ভাত সেটার নাম 'স্টিকি'। মানে ভাতের দানা একটার সাথে আরেকটা লেগে থাকে।
আমার ধারণা ছিল, স্টিকি ভাত কাঠি দিয়ে সহজে খাওয়া যায় বলেই জাপানিরা এটা এত পছন্দ করে। আমি এই ভাত খেতে একদমই পছন্দ করতাম না।
ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো জাপানের বাজারে জাপানি কৃষকদের উৎপাদিত এই বিশেষ ভাতের চালের দামই সবচেয়ে বেশি।
বাজার থেকে কয়েকবার বিভিন্ন ধরণের চাল কেনার পর বুঝলাম এই চাল যদি জাপানিরা নিজেরা উৎপাদন না করে আশেপাশের কোনও দেশ থেকে আমদানি করতো তাহলে এর দাম বেশ কম পড়তো।
আমি কৌতুহলী হয়ে আমার সুপারভাইজার প্রফেসর কামিজিমাকে একবার জিজ্ঞেসই করে ফেললাম..
"আচ্ছা প্রফেসর, তোমরা এই চাল বিদেশ থেকে আমদানি করো না কেন? আমদানি করলে তো দাম অনেক কম পড়তো!"
কামিজিমা: "তা হয়তো পড়তো.."
আমি: "তাহলে?"
কামিজিমা: "সরকার ইচ্ছে করেই কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদন খরচের অনেক বেশি দামে এই চাল কেনে।"
"কেন?"
"কৃষকদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।"
"মানে?"
"কৃষক যদি ভালো দাম না পায় তাহলে কি ওরা আর কৃষিকাজ করবে?
পেশা বদলে ফেলবে না!"
"তাই বলে সরকার এত বেশি দামে চাল কিনবে কৃষকদের কাছ থেকে?"
"শোনো, আমরা আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা ভুলিনি। জাপান একটা দ্বীপরাষ্ট্র। ঐরকম একটা যুদ্ধ যদি আবার কখনো লাগে আর শত্রুরা যদি আমাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে! তখন কী হবে ভেবেছ?"
"বুঝলাম না!"
"বাইরে থেকে কোনও খাবার জাপানে আসতে পারবে?
আমরা কি তখন এই টয়োটা গাড়ি খাব?
কৃষক যদি না বেঁচে থাকে তাহলে ঐসময় আমরা বাঁচব?!"
আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম কামিজিমার কথা শুনে। ভাবলাম,আমরা কী অবলীলায়ই না আমাদের কৃষকদেরকে মেরে ফেলার যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করছি।
"The Mind Game" বই থেকে উদ্ধৃত।
#collected
#moral_of_the_story:
দেশি পেয়াজ কিনুন। দেশি কৃষকদের বাচান।
বিদেশি পেয়াজ বর্জন করুন।
এখন বিদেশি পেয়াজ কমদামে কিনে দেশীয় পেয়াজ চাষীদের ক্ষতি করলে তারা পরবর্তি বছর পেয়াজ চাষ বন্ধ করে দিবে।
ঝোপ বুঝে কোপ মারা দেশ গুলো আবার বাংলাদেশে পেয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিবে।
তখন কি আর করা?
না আছে দেশি,না আছে বিদেশি ।
১৫/২০ টাকার পেয়াজ কিনবেন ১৫০/২০০++টাকায়।
সংগৃহীত

Good night
Good night everybody.....
Have a nice dream
মুক্তির ওপারে
মুক্তির ওপারে
পর্ব-৩
ইশিতা আদনিন
ইরা সকাল সকাল উঠে নাস্তা বানাতে চলে গেল। রাতে ঔষধ খাবার পর জ্বর কিছুটা কমে এসেছে। তাই ওভাবে শুয়ে থাকার মানে হয়না। এরা তার মা বাবা নয় যে আহ্লাদ করবে। তখনই ড্রয়িংরুম থেকে রিতার মায়ের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। উনারা ইরাদের পাশের ফ্লাটের। খালার সাথে যোগ হয়ে উনিও ইরাকে দু চারটে কথা শোনাতে ছাড়ে না। মহিলার নিজের মেয়েটা বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। ছেলে আছে একটা ছোট। কাজ কর্ম সেরেই নামে খবর জোগাড় করতে।
-শুনছেন ভাবি, কাল নাকি বাড়িওয়ালার ছেলে এসেছে বাসায় লন্ডন থেকে।
-ও তাই নাকি! কখন এলো?
-কাল সকালেই নাকি এসেছে। এই নাকি পাঁচ বছর পর দেশে ফিরলো।
- ওহ ভালো। শুনেছি, ছেলে নাকি দেখতে ভালোই।
হঠাৎ মিসেস চৌধূরীর গতকাল সকালের কথা মনে হলো। " তাহলে ওটা বাড়িওয়ালার ছেলে! " বিড় বিড় করে বললো। হিংসায় গা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে তার। রিতার মা যাওয়ার পরই আবার ইরাকে বকাবকি শুরু করলো।
- "তোরে যা বদ মনে করেছিলাম, তুই তো তার থেকেও বেশি বদ মেয়ে। যেই দেখলি বাড়িওয়ালার ছেলে আসছে, তখনই তুই পড়ে যাওয়ার অভিনয় করলি? আসার সাথে সাথেই কোলে উঠে নিলি? হায় রে কপাল আমার!!!"
কথা গুলো শুনে ইরার বুক কেঁপে উঠলো। কান্নায় দু চোখ ভেঙ্গে পানি চলে আসছে ওর। ও তো ইচ্ছা করে কিছু করে নি। এমনকি দেখেও নি, আশে পাশে দেখার মতো অবস্থাতেই ছিলো না। ইরা ভাবতে লাগলো,
"তাহলে কাল আমাকে যে ছেলেটা কোলে করে নিয়ে এসেছে, সেই ই নিশাতের ভাই! ছি! কি লজ্জা!! এত কিছু থাকতে ঐ লোকের সামনেই কেনো পরতে হলো আমাকে! ওহ খোদা! সব বাজে ঘটনা আমার জীবনেই কেনো ঘটে!"-
...........
দু দিন পর মাশফিক বিকাল বেলা ছাদে গেলো ঘুরতে। আসার পর থেকে বের হওয়া হয় নি। মনের ভিতর অদ্ভুত এক যন্ত্রনা বিরাজ করছে তার। দু চোখ শুধু ইরাবতীকে খুঁজছে। ছাদে গিয়ে দেখলো একটা মেয়ে ফুল গাছে পানি দিচ্ছে, তার ঘন কালো চুলগুলো পিঠজুড়ে মেলে আছে। বাতাসে হালকা উড়ছে।
মাশফিক এগিয়ে গেলো সেদিকে। ভালো করে দেখতেই বুঝে গেলো ওটা ইরা। হঠাৎ মনে হলো, কোথা থেকে এক দমকা শীতল বাতাস এসে তাকে ছুঁইয়ে দিয়ে চলে গেছে। অশান্ত মন শান্ত হয়ে গেছে মুহুর্তেই। মুচকি হাসি দিয়ে অন্যদিকে ফিরে বলতে লাগল,
- আগে শুধু রূপকথার গল্পেই শুনেছি, পরীরা নাকি ফুল বাগানে থেকে ফুলের পরিচর্যা করে। তা যে সত্যি চোখের সামনে দেখবো, তাতো ভাবি নি।
কথাটা শুনেই ইরা সেদিকে তাকালো, দেখলো সেই লোক দাড়িয়ে, মানে নিশাতের ভাই। ইরা ওর খালার কথা মনে হতেই ভয়ে কেঁপে উঠলো।বললো,
- কিছু বলেছেন আমাকে?
- নাহ। কিছু বলিনি তো। ইরাবতী!!!
ইরা অবাক চোখে তাকালো, এই নামে নাকি ওর বাবা ডাকতো।এরপর আর কেউ ডাকেনি এত মিষ্টি করে। কেমন যেনো কান্নায় চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে এলো ইরার।
- আপনার শরীর কেমন এখন? সেদিন তো খুব জ্বর ছিলো দেখলাম।
- জী। ভালো
- কাল ডাক্তার দেখিয়েছেন?
- জী। টাইফয়েড হয়েছে বললো।
- কি বলেন! তাহলে এই শরীর নিয়ে ছাদে এসেছেন কেনো?( মনে মনে বললো, ভালোই হয়েছে এসেছো। তোমাকে দেখার জন্য বুক ফাটা তেষ্টা পেয়েছিলো ইরাবতী)
- গাছগুলো পানি দেয়া হয়নি তিন দিন ধরে। ওদের ও তো জীবন আছে। আচ্ছা আমি যাই।
- হুম তা ঠিক। আমারো বেশ তৃষ্ণা পাচ্ছিলো । সেটাও মিটছে।
- কিছু বললেন?
- নাতো। কিছু বলিনি। পরীদের তো বলতে হয়না। তারা এমনিই বুঝে।
- আসছি।
বলেই ইরা দ্রুত সিড়ি বেয়ে নামতে লাগলো। লোকটার কথা শুনে ওর কান গরম হয়ে গেছে, আর কিছুক্ষন থাকলে জ্বলেই যাবে, তাছাড়া কখন কে দেখে ফেলে, আবার ওকে বাজে কথা শুনতে হবে।
মাশফিক ইরাকে যত দেখছে ততই মুগ্ধ হচ্ছে। সেদিন শুধু ইরাকে দেখতে পেয়েছে কিন্তু কথা শুনতে পায়নি। আজ ইরার কথা শুনে মাশফিকের হৃদয় বরফ শীতল হয়ে গেলো। এই মেয়েটা যেমনি দেখতে অপূর্ব, তেমনি তার কন্ঠস্বর হৃদয় জুড়ানো। এত সুন্দর সৃষ্টিকে সব দিয়ে ও আল্লাহ তাকে এতিম কেন করে রাখলো।
মাশফিকের খুব কষ্ট হচ্ছে। ইরাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। শুধু ভাবছে ইরাকে কবে সে নিজের করে পাবে। তার মনে যে এত প্রেম জমেছিলো, সে নিজেই কোনদিন টের পায়নি! এই মায়াবতীকে দেখে সব যেনো উপচে পড়ছে মাশফিকের। মনে মনে ভাবলো, " এর জন্য যে বহুদিন তাকে অপেক্ষা করতেই হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। এই মেয়ে যা লাজুক, তার উপর কত যে ঝামেলা ওর ফ্যামিলিতে। ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে।"
হুমায়ুন আহমেদ স্যার বলেছিলেন, "অপেক্ষা হচ্ছে শুদ্ধতম ভালোবাসার চিহ্ন। " মাশফিক বিড় বিড় করে বললো,
" আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো ইরাবতী, আমি তোমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভালোবাসাই দিবো, তুমি আমারই হবে, আমার ইরাবতী হবে তুমি"।
..................
পরেরদিন দুপুরের পর নিশাত ইরাদের বাসায় যায়। ঐ সময়ে ইরার খালা নীরাকে নিয়ে কোচিং এ চলে যায়।নিশাত এ সময়টাই বেছে নেয়। কারন ওর ও নাফিসা চৌধুরীকে পছন্দ নয়। নিশাত ইরার ভালো সম্পর্ক। ইরা একটু চাপা স্বভাবের হলেও নিশাত সব খু্ঁচিয়ে কথা আদায় করে নেয়। বয়সে ছোট হলেও মনের খুব মিল দুজনের। ইরা নিশাতকে পড়ার ব্যাপারে ও সাহায্য করে। কিছু না বুঝলে বুঝাই দেয়। ইরা মাঝে মাঝে ওদের বাসায় যায়, নিশাতের মা এর সাথে ও সম্পর্ক ভালো। সে ইরাকে খুব স্নেহ করে। এভাবেই চলছিলো ওদের সম্পর্ক। এসে দেখে রান্না ঘরে সব গুছাচ্ছে।
- এই ইরাপি কি করছো?
- এই তো একটু কাজ করছি। শরীর ভালো নেই। টাইফয়েড হয়েছে।
- বলো কি! তা নিয়ে কাজ করছো কেন!
- তেমন কিছু করছি না। গুছাইতেছি সব কিছু।
- ইরাপি জানো! গত পরশু আমার ভাইয়া এসেছে। তোমাকে বলছিলাম না ভাইয়ার কথা?
নিশাতে ভাইয়ের কথা শুনেই ইরার বুকের মধ্যে তবলা বাজানো শুরু হয়ে গেলো। মনে পড়ে গেলো সেদিন সকালের কথা, লজ্জায় ভিতরে ভিতরে মরে যাচ্ছিলো সে। ভাগ্যিস নিশু কিছু জানে না। ইরাও নিশাতকে সে ব্যাপারে আর বলে নি। ও স্বাভাবিক ভাবেই বললো,
- হুম।
- হুম কি? জানো আমার ভাইয়া দেখতে কত হ্যান্ডসাম? তুমি দেখলে টাস্কি খাবে বুঝলে!!! (চোখ মেরে বললো)
- কি আবোলতাবোল বকছিস নিশু?
- হুম ঠিক ই বলেছি। এই তুমি যাবে আমাদের বাসায়? ভাইয়ার সাথে ও দেখা হবে।
দেখা করার কথা শুনে ইরা কিছুটা ভড়কে গেলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো,
"ঐ লোকের কথা মনে হলেই কেমন বুক ধড়পড় করে, আর সামনে গিয়ে! এই তো সেদিন ছাদের উপরে যখন আস্তে আস্তে ঐ কথা গুলো বলছিলো, তারপর উনার দিকে তাকাতেই তো বুক কেঁপে উঠে, তবে সেটা যে ভয়ে নয়, তা বেশ বুঝতে পারছি। সেটা অন্য কোন অনুভূতি। এরপর আর মানুষটার সামনে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব, অসম্ভব, অসম্ভব!!!"
- এই ইরাপি, কি ভাবছো? চলো না আমাদের বাসায়, এখন তো তোমার মামনিও নেই।
- নারে নিশু। আমাকে ক্ষমা কর। আজ নয়, অন্যদিন। আজ শরীর ভালো নেই। দেখছিস ই তো।
- ওকে তোমাকে আজ ক্ষমা করলাম। কিন্তু অন্যদিন যেতেই হবে। _ এরপর নিশাত বাসায় চলে গেলো।
ইরা যেনো হাঁফ ছেড়ে বাচলো । মনে মনে বললো,
" আল্লাহ তুমি এইটুকু সহায় হও। ঐ লোকের সামনে যেনো আর না পড়ি আমি"
............
ইরার বাবা মা মারা যাওয়ার পর মাঝেমাঝে দাদা দাদীর কাছে থাকতো এক দু দিনের জন্য। কিন্তু ইরা বড় হওয়ার সাথে সাথে ইরার খালা তাদের সাথে দেখা করা সীমিত করে দিলো। যতটুকু সময়ই থাকতো, সে ইরাকে চোখে চোখে রাখতো, না জানি ইরাকে আদর করে তাদের কাছে রেখে দেয়। আবার এদিকে ছোট থেকে নাফিসা চৌধুরী ইরাকে ভুল বুঝাতে শুরু করে। বলতো,
" ইরা, তোর দাদা দাদীর সাথে বেশি মিশবি না, ওরা তোর মাকে কখনো ভালোবাসে নি। তোর মায়ের সাথে খারাপ আচারন করেছে। তুই ওদের সাথে মিশলে তোর মায়ের আত্মা কষ্ট পাবে।" -ইরাও সারাজীবন সেই ভুল ধারনা নিয়েই আছে সে কারনে ইরাও তার সাথে মিশে না, কাছে ঘেষে না। শত কষ্ট হলেও খালার কাছেই পড়ে রয়েছে। আর মিসেস চৌধুরী এটাই চেয়েছিলেন। ইরার বাবার অনেক সম্পত্তি ছিলো, দাদার অনেক সম্পত্তি। যেহেতু ওনাদের আর কেউ নেই, সব কিছুর উত্তরাধীকারি ইরা। এই সম্পত্তি দখল করার জন্যই তার এত কিছু করা।
তার হিংসার পিছনে আর একটা বড় কারন ও আছে। মিসেস চৌধুরী আর ইরার মা আসলে সৎ বোন ছিলো যা ইরার নানা নানু আর মা ছাড়া কেউ জানে না। কোনদিন জানতে পারে নি। নাফিসা চৌধুরীর মা মারা যাওয়ার পর ই ইরার নানীকে বিয়ে করে ইরার নানা। সেই থেকেই সে ইরার মা নাজিফা আহসানকে ভালো চোখে দেখতো না। ইরার মায়ের সাথে সবকিছু নিয়েই হিংসা করতো সে। কিন্তু ইরার মা তাকে আপন বোনের মতোই ভালোবাসতো।
ইরার দাদা মারা গেছে এক বছর হলো, দাদী একজন নার্স নিয়ে একা ফ্লাটে থাকে। ইরা মাসে একবার গিয়ে দেখে আসে, ওর যেতে মন চাইলেও খালার কারনে পারে না। ওদিকে ইরার দাদী সব কিছুই বুঝতে পারে, ইরাকে দূরে সরিয়ে রাখার কারন, সব কিছু । কিন্তু তার ও কিছু করার নেই, ইরাকে এসব বললে উল্টো ভুল বুঝতে পারে। শেষে যদি বাসায় যাওয়াই বন্ধ করে দেয়। সে তার নাতনিকে অসম্ভব ভালোবাসে। এই ভয়ে আজ ও ইরাকে কিছু জানাতে পারে নি।
এসব বসে বসে ভাবছে নাফিসা চৌধুরী, আর মনে মনে শয়তানি হাসি দিয়ে বলছে
- " একবার শুধু তোর সম্পত্তিগুলো পাই, তারপর তোর যা হওয়ার হবে, তাতে আমার কিছুই এসে যায় না। তোর মা সারাজীবন ই সবকিছু বেশী পেয়েছে অথচ আমি কি পেলাম! এখন যে সুযোগ পেয়েছি, সেটা কিছুতেই হাতছাড়া করবো না"
...............
মাশফিক বাড়িতে এসে এক সপ্তাহ অলসভাবে কাটিয়ে দিলো। মাঝে মাঝে নিশাতের থেকে ইরার খোঁজ নেয়। এতেই যেনো তার শান্তি। দেখতে মন চাইলেও উপায় নেই। সেদিনের পর ইরা বিকালে যায় না ছাদে। দু তিন দিন পর রাতে গিয়ে পানি দিয়ে আসে যেটা মাশফিক বুঝতে পেরেছে গাছ গুলো দেখেই। তার এখন চাকরিতে যোগদান করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করার জন্য সকাল সকাল বেড়িয়েছে সে। নিজের গাড়ি নিয়েই বের হয়েছে, কিন্তু ড্রাইভারকে সাথে নেয় নি। সেখানে গিয়ে স্যারদের সাথে দেখা করে, কিছু কাজ সেড়ে বাসার দিকে রওয়ানা হলো। গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ চোখ গেলো রাস্তার সাইডে। ইরা হেটে যাচ্ছে। কলেজ ড্রেস পরা, মাথায় হিজাব, পিছনে স্কুল ব্যাগ, ঘর্মাক্ত ক্লান্ত মুখ। ওকে দেখলেই মাশফিকের মন অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে যায়। ইরাকে দেখেই ওর থেকে কিছুটা সামনে গিয়ে একটা চা এর দোকানের পাশে গাড়ি পার্ক করলো। তারপর হাতে এক কাপ চা নিয়ে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে রইলো, যেনো ইরাকে আগে দেখেই নি। যখনই ইরা সামনে দিয়ে যেতে শুরু করেছে, মাশফিক কথা বলে উঠলো,
- আরে, ইরাবতী! কোথায় যাচ্ছেন?
ইরা হালকা কেঁপে উঠলো। পাশে তাকিয়ে দেখলো মাশফিক গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে দাড়িয়ে হাসছে।।। মাশফিকের পড়নে কালো শার্ট, ব্লু জিন্স, হাতা কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করা, চুল গুলো ব্যাক ব্রাশ করা, এ যেন যেকোন রমনীর কাঙ্খিত পুরুষ । মিনিট দুয়েক দেখেই ইরার হার্টবিট মিস হওয়ার জোগাড়।
ইরা চোখ বন্ধ করে দৌড়ে চলে গেল, পিছনে ফিরেও তাকালো না। পিছনে ফিরলে দেখতে পেত, একটা মানুষ তার ভীতু, লাল, ঘর্মাক্ত মুখটা দেখে ভিতরে ভিতরে আরেকবার খুন হয়ে আছে। মাশফিক গাড়িটা নিয়ে দ্রুত চলে এসে বাসার ভিতরে পার্ক করে রাস্তার সাইডে গিয়ে দাড়িয়ে আছে, আরেকবার যদি প্রিন্সেস এর দেখা পাওয়া যায়।
ইরা বাসার সামনে এসে দেখলো গাড়িটা ভিতরেই আছে। আশে পাশে চেয়ে বুকে থুথু ছিটেয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল, মনে মনে আওড়াতে লাগলো,
"হে, আল্লাহ! ঐ লোকটাকে দেখে আমার এ অবস্থা হয় কেনো? আর কেন এই লোকটাকেই আমার সামনে নিয়ে আসো? এবার অন্তত রেহাই দাও মাবুদ! "
কিন্তু ইরা জানলোই না ওপাশে কেউ একজন ওর কর্মকান্ড দেখে হাসতে হাসতে ওকে অনুসরন করছে।
ইরার খালা ব্যপারটা লক্ষ করলো। বললো,
- কিরে ইরা! আজ ওভাবে দৌড়ে তাড়াহুড়া করে আসলি কেনো?
- না, মামনি, তেমন কিছু নয়। রাস্তার মাঝেই হঠাৎ করে পেটে মোচড় দিয়ে উঠলো। তাই দৌড়ে চলে এলাম।
- ওহ। আচ্ছা যা। (মনে সন্দেহ নিয়ে)
......
চলবে........
পূর্ববর্তী পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/864709721001192/?app=fbl

মুক্তির_ওপারে
#মুক্তির_ওপারে
#পর্ব-২
#ইশিতা আদনিন
ইরার আসতে লেট দেখে নাফিসা চৌধুরী বকাবকি শুরু করে দিলো।
"একটা পাউডার আনতে পাঠালাম, তাতেই উনার এত দেরী হচ্ছে, সুযোগ পেয়ে না জানি কোন নাগরের সাথে গিয়ে গল্পে মেতে আছে। "- মিসেস চৌধুরী কথাটা বলেই শুনে কলিংবেল বাজছে। নীরাকে গিয়ে দরজা খুলতে বললো
।
নীরা এসে দরজা খুলে বিশাল বড় ধাক্কা খেলো। দেখে ইরাকে কোলে নিয়ে দাড়িয়ে আছে একটা হ্যান্ডসাম ছেলে, ছেলেটি গায়ে কালো ব্লেজার, ভিতরে সাদা টি শার্ট, জিন্স , হাতে দামী ঘরি, পারফিউমের ঘ্রান। তার কোলে ইরা শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ। নীরা অবাক হয়ে গেলো আর কিছুটা ভয় ও পেলো।
- "আজ কপালে শনি আছে রে বোন। না জানি কি করে মা তোমাকে আল্লাহ জানে! "
"দাড়িয়ে না থেকে দরজা থেকে সরুন প্লিজ। উনাকে শুইয়ে দিতে হবে। উনি খুব অসুস্থ।" - কথাটি বলে মাশফিক নীরাকে উপেক্ষা করে ভিতরে ঢুকে গিয়ে ইরাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো।
পুরুষ কন্ঠ পেয়ে নাফিসা চৌধুরী নীরাকে ডাক দিলো।
- কে এসেছে নীরা! পুরুষ মানুষের গলা শুনলাম।
"মা, ইরা আপু অজ্ঞান হয়ে গেছে । তাড়াতাড়ি এদিকে এসো? কেনো তুমি মেয়েটার সাথে এমন করো বুঝিনা আমি! " - মায়ের কাছে গিয়ে বললো নীরা।
নীরার কথা শুনে ওর মা ড্রয়িংরুমে এসে চমকে গেলো।
মাশফিক নীরার দিকে তাকিয়ে বললো, " আপনি প্লিজ এক গ্লাস পানি নিয়ে আসুন। উনি অনেকক্ষন হলো জ্ঞান হারিয়েছে।"
নীরা গিয়ে পানি নিয়ে আসলো কিন্তু নাফিসা চৌধুরীর চোখে মুখে বিরক্তির ভাব স্পষ্ট। উনি ইরার কাছে না গিয়ে মাশফিক কে প্রশ্ন করলো,
- আপনি ওকে কোথায় পেয়েছেন? আর আপনি ই বা কে?"
মাশফিক মনে মনে ভাবলো, "মেয়েটার সাথে উনি এমন আচারন করছে কেনো? অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, আর মহিলার কথার কি ধরন! কাজের মেয়ে বলেতো মনে হয় না। অনেক মানুষ আছে যারা কাজের লোকদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। কিন্তু তাতো মনে হয়না। তাহলে উনি এত নির্দয় আচারন করছে কেনো!"
তাই সে কোন কথার উত্তর না দিয়ে ইরার মুখে পানি ছিটিয়ে দিতে লাগলো । অনেকক্ষন পানি ছিটানোর পরে ইরার জ্ঞান ফিরে এলো। ইরা চোখ মেলো দেখলো ও ঘরে শুয়ে আছে। একটু সামনেই চক্ষু লাল করে তাকিয়ে আছে ইরার খালা। উনাকে দেখেই ইরার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। উঠেই প্যাকেট খুঁজতে লাগলো।
"এই আপনি উঠছেন কেনো? আর কি খুঁজছেন? আমাকে বলুন!"- মাশফিক বলে উঠলো।
এতক্ষণে ইরার খেয়াল হলো, ওর পাশেই একটা ছেলে বসে আছে, ছেলেটির গায়ে আভিজাত্যের ছোঁয়া। তাড়াতাড়ি গায়ের কাপড় চোপড় ঠিক করায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
মাশফিক ইরার খালাকে যা যা হয়েছে বললো। নাফিসা চৌধুরী খুব কষ্ট করে মুখে হাসি এনে বললো,
- ধন্যবাদ। কষ্ট করে নিয়ে আসার জন্য। বসুন আপনাকে চা দেই।
- না, না । আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আমি চলে যাচ্ছি। আপনি প্লিজ উনাকে দেখেন। ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যান। এটা বলে মাশফিক বেড়িয়ে গেলো। নাফিসা চৌধুরী তার সাথে আলাপ করার সময়টুকু পেলেন না। কে এই ছেলে তাও জানা হলো না।
........
মাশফিক বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর নাফিসা চৌধুরী ইরার কাছে এসে দাড়ালেন।
" এই মাইয়া নাটক তো ভালোই জানোস তুই। যেই দেখলি সুন্দর পুরুষ মানুষ সামনে আইছে, তখনই পড়ে যাওয়ার নাটক করলি? ভাব ধরস যে কিছুই বুঝোস না, পেটে পেটে এত শয়তানি তোর? একেবারে কোলে চড়ে বসলি! এতটুকু পথ গিয়েই তুই পড়ে যাওয়ার নাটক করলি? মানুষ দেখাতে এসব করেছিস! আমি তোকে ভালো পাই না, সেটা বুঝাতে গেছস! নির্লজ্জ, বেহায়া মেয়ে। পরের উপর বসে বসে খায়,আবার তাদেরই অপমান করে! বাপ মা তো মরে গিয়ে বাঁচছে। এখন আমাদের মান সম্মান খাওয়ার ধান্দা। যত্তসব।"- চিৎকার দিয়ে বললো ইরার খালা।
- মামনি, তুমি ভুল বুঝতেছো। আম্মু আব্বুকে নিয়ে কথা বলিও না প্লিজ! আমার শরীর সত্যিই খুব খারাপ ছিলো.....
" মা, প্লিজ! তুমি একটু চুপ করো। ইরাপু সত্যিই শরীর খারাপ ছিলো। তুমি আমাকে বলতে পারতে! আর ঐ লোক তো বলেছে যে ইরাপু উনাকে দেখতে ও পায় নি।" - মায়ের অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুনে সহ্য করতে না পেরে উত্তর দিলো নীরা। এতে বিপত্তি আরো বাড়লো।
-" এই মেয়ে, তুই তো আমার মেয়েটাকে বশ করেছিস? আমারই মেয়ে আজ আমার মুখের উপর কথা বলে! তোর কারনে আমার সংসারে যত অশান্তি। এসেছিসই তো সংসারের শান্তি নষ্ট করতে। কেনো যে তোকে আনতে গেলাম!"-
নাফিসা চৌধূরী এসব কথা শুনে নীরা চলে গেলো। পরে ওর মা চলে যাওয়ার পর লুকিয়ে লুকিয়ে ঔষধ এনে দিলো ইরাকে।
........
মাশফিক ইরাদের বাসা থেকে বের হয়ে জুতা ঠিক করতে নিল। তখনই শুনলো বাসার ভিতর থেকে চিৎকার চেচামেচি। তখন সে দাড়িয়ে ওদের সব কথা শুনলো কিন্তু ভিতরে গিয়ে কিছু বলার সুযোগ নেই। রাগে নাক মুখ লাল হয়ে গেলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো,
-"উনি কি মানুষ নাকি পশু? পশু ও তো অসুস্থ প্রাণীর প্রতি দয়া দেখায়। আর কি! ছি! কত কষ্টে মেয়েটা আছে কে জানে!"
মেয়েটা যে ওদের আপন কিছু হয়না সেটা সে স্পষ্ট বুঝে গেলো।
এর মধ্যে ড্রাইভার চলে এলো ব্যাগ নিয়ে। বললো,
- স্যার কোন সমস্যা? দাড়িয়ে আছেন যে?
- না কাকা, চলুন, উপরে যাই।
মাশফিক বাসার কলিং বেল চেপে দাড়িয়ে রইলো। নিশাত এসে দরজা খুলে ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরলো আনন্দে।
-ভাইয়া, তুমি কেমন আছো ভাইয়া। সেই কখন থেকে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি বলতো, এত দেরী কেনো করলে?
- সোনা বোনটা আমার। একটু কাজ পড়ে গেছিলো রে। রাগ করিস না বোনটি। এখন থেকে ভাইয়া তোকে অনেক সময় দিবে।
- আসতে না আসতেই তুমি কাজ শুরু করে দিলা ভাইয়া!
ওদিকে মাশফিকের মা এসে দুই ভাই বোনের খুনসুটি দেখছে। কতদিন পরে ভাইকে কাছে পেয়ে মেয়েটা যেনো আনন্দে আত্মহারা।
-হয়েছে, হয়েছে। আর আল্লাদ করতে হবেনা নিশু। ভাইকে এখন ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিতে দাও। কত দূর থেকে এসেছে ছেলেটা।
- আসসালামুআলাইকুম আম্মু। কেমন আছো তুমি?
- ভালো আছি বাবা। তুই ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি খাবার দিচ্ছি।
-ওকে, আম্মু।
.................
ইরা ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। সারাদিনে ওকে কেউ আর ডাকে নি। সন্ধ্যায় মঈন চৌধুরী বাসায় এসে ইরার খোঁজ নিলো কিন্তু কোথাও দেখতে পেলো না। বাধ্য হয়ে ইরার রুমে গিয়ে দেখলো, ও গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে।
-ইরা মা! এই সন্ধ্যায় শুয়ে আছিস কেনো মা? শরীর খারাপ নাকি?
ডাকশুনে ইরা চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো, বাবাই দাড়িয়ে আছে। বাড়িতে এই মানুষটাই ওকে ভালোবেসে আগলে রেখেছে, ঠিক যেনো বাবার মতো। তাকে দেখলেই সব দুঃখ কষ্ট পানি হয়ে বের হয়ে যেতে চায় চোখ দিয়ে। পরের ছেলে হয়েও ওকে কত ভালোবাসে, অথচ নিজের খালাই ওকে সহ্য করতে পারে না। এ কেমন দুনিয়া! ইরা বহু কষ্টে নিজেকে সামলালো। বললো,
- না বাবাই। তেমন কিছু না। একটু খারাপ লাগছে। তুমি
বসো বাবাই।
ইরা শোয়া থেকে বসতেই, মঈন চৌধুরী খেয়াল করলো,ইরার মুখ শুকিয়ে গেছে, সুন্দর মুখখানা লাল হয়ে আছে। সে ইরার কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠলো।
- একি মা! তোর শরীর তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। আমাকে বলিস নি কেনো?
- বাবাই তেমন কিছু না। তুমি মিছামিছি চিন্তা করছো।
- আবার কথা বলিস তুই? এত জ্বর নিয়ে পড়ে আছিস আর বলছিস কিছু না! তোর মামনিকে বলিসনি?
ইরা জানে, ওর খালার আচারনের কথা বললে আবার অশান্তুি হবে। তাই ও মিথ্যা বলতে বাধ্য হলো।
- না বাবাই। তেমন জ্বর তো আসে নি। তাই বলিনি।
মঈন চৌধূরী জানে, তার স্ত্রী ইরার সাথে ভালো আচারন করে না। নিজের আপন বোনের মেয়ে হয়েও যে কেনো নাফিসা চোধুরী ওর সাথে খারাপ আচারন করে, সেটাই বুঝে আসে না। কিন্তু সংসারে অশান্তি হবে চিন্তা করে চুপচাপ থাকে।
- চল মা, তোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।
ইরা যেতে না চাইলেও বাধ্য হয়ে যেতে হলো। হাসপাতালে টেস্ট করে ধরা পড়লো ইরার টাইফয়েড হয়েছে। ঔষধ কিনে বাসায় নিয়ে এলো।
.......
মাশফিক ফ্রেশ হয়ে খেয়ে বোনের সাথে গল্প করতে বসলো। কিন্তু মন পড়ে আছে সেই অনিন্দ্য সুন্দর মানবীর কাছে। অস্থির হয়ে আছে সে, যেনো একবার না দেখলে শান্তি মিলবে না কোথাও। নিশাত তার কলেজের কথা, বন্ধু বান্ধবী সবার কথা বলছে। মাশফিকের সেদিকে মনযোগ নেই। সবশেষে ইরার কথাও বললো। ইরার কথা শুনে চমকে উঠলো মাশফিক।
- জানো ভাইয়া, আমাদের বাসার তিনতলায় একটা আপি আছে, ওর নাম ইরা। আপিটা উচ্চ মাধ্যমিকে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। খুব ভালো মেয়ে। মেয়েটা খুবই মেধাবী, আর দেখতেও সুন্দর অনেক।
মাশফিক ভাবতে লাগলো, যার জন্য সে এতদিন অপেক্ষা করেছিলো, শুধু অপেক্ষা নয়, কল্পনায় আঁকতো, সেই প্রতীক্ষিত মানবীর নাম ইরাবতী! মাশফিক ভেবেই নিয়েছিলো, এমন কোন মেয়ের দেখা, সেই আকাঙ্ক্ষিত মুখশ্রীর দেখা সে এই ইহলোকে পাবে না কিন্তু ইরাকে দেখার পর তার সমস্ত ধ্যান জ্ঞান পাল্টে গেলো। মনে হলো এই রহস্যময়ী, ঝড়নার মতো প্রাণোচ্ছল, শুভ্র, নিষ্কলুষ মানবীকে সে যুগ যুগ ধরে চিনে। যেনো তার হৃদয়ের গহীনে লুকানো ভালোবাসা গুলো তার জন্যই জমানো ছিলো এতকাল।আজ এই বালিকাকে দেখার পর সব সুপ্ত আবেগ ভালোবাসাগুলোর ঘুম ভেঙ্গে গেছে, বাঁধনহারা হয়ে গেছে তার অনুভূতিগুলো। ইতিহাসে যেসব নারীদের নাম আছে, যাদের সৌন্দর্যের কারনে রাজাদের মধ্যে যুদ্ধ লেগেছিলো, তারা কেউ এই ইরাবতীকে দেখেনি । দেখলে এই ইরাবতীকে নিয়ে আর একটা যুদ্ধ নিশ্চই রচনা হতো। মাশফিক কল্পনায় হারিয়ে যাচ্ছে বার বার।
নিশাত মাশফিকের কাছে ইরার জীবনের করুন কাহিনী বললো। ইরার কষ্টের কথা শুনে ওর বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে মনে হয়। সব শুনে মাশফিক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো,
- "ইরাবতী, তোমাকে ওই নরক যন্ত্রনা থেকে আমি উদ্ধার করবো। তোমাকে এত বেশি ভালোবাসবো যেনো তুমি অতীতের সব দুঃখ কষ্ট ভুলে যাও। সব ব্যথা ভুলে যাও। তুমি এতদিন যে কষ্ট পেয়েছো, তার শতগুন সুখ আমি তোমায় এনে দেবো। তোমার ওই মায়া জড়ানো মুখে এক পৃথিবী হাসি এনো দেবো। তোমাকে আমি মুক্তি দেবোই ইরাবতী"
চলবে.........
পূর্ববর্তী পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/863804067758424/?app=fbl

অভিমান বেঁচে থাক
অফিস থেকে আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। নিউমার্কেটের দিকে যেতে হবে। কেনাকাটা আছে ছোটখাটো। আগামীকাল একটা বিশেষ দিন। আমাদের দ্বিতীয় বিবাহ বার্ষিকী। তাই ভাবলাম নীলার জন্য একটা শাড়ি কিনে নিয়ে যাই। এমন একটা দিনে উপহার ছাড়া কি চলে? কিছু না নিয়ে গেলে নীলা সারাদিন গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে। তখন অভিমান ভাঙাতেই বেলা ফুরাবে আমার। তার ছেলেমানুষি আর গেল না।
নিউমার্কেটে ঢুকে একটা শাড়ির দোকানে গেলাম। বেশ সুসজ্জিত দোকান। নাম "দ্যা নিউ শাড়ি ঘর"। বাংলা এবং ইংরেজি শব্দের চমৎকার মিশ্রণ।দোকানে খুব একটা ভীড় নেই। কর্মচারীরা অলস সময় কাটাচ্ছে। আমি দোকানে ঢোকা মাত্রই একজন কর্মচারী আমার দিকে এগিয়ে এলো। বললো,
“স্যার ভালো শাড়ি আছে। বসেন।”
আমি বসলাম। কর্মচারী প্রশ্ন করলেন,
“কতো দামের ভেতর শাড়ি দেখাব স্যার?”
“পাঁচ ছয় হাজারের ভেতর দেখান।”
যদিও মাসের শেষ। তবুও একটু বেশি দামের শাড়ি নেওয়া যাক। বউয়ের জন্য উপহার বলে কথা। কর্মচারী যখন শাড়ি দেখানো শুরু করছে সেই সময় আরেকজন মেয়ে দোকানে প্রবেশ করলো। বসলো আমার পাশে,একই সারিতে। প্রথমে তার চেহারা আমি লক্ষ্য করিনি। নিজ মনে শাড়ি দেখছিলাম। শাড়ি দেখার এক পর্যায়ে একবার মেয়েটার দিকে চোখ পড়লো। তাকিয়ে কিছুটা অবাক হলাম মেয়েটাকে আমি চিনি। তার নাম তনু। আমার পূর্ব পরিচিত। শুধু পূর্বপরিচিত বললে ভুল হবে। তার সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বছর একসাথে কেটেছে আমাদের। খুবই ভালো বন্ধুত্ব ছিল দুজনের মাঝে। সেই বন্ধুত্বে ছিল অধিকার, রাগ, অভিমান, হাসি,ভালোবাসা। আমাদের পরিচয় পর্বটাও বেশ মজার ছিল। প্রথমদিন ক্লাসে এসেই তনু আমাকে ডেকে বললো,
“এই মোটা ছেলে, এদিকে শুনে যাও তো।”
কথাটা শুনে খুব আত্মসম্মানবোধে লাগলো। আরেহ, চেনা নেই জানা নেই মোটা বলে ডাকলো? আমি তার দিকে তেড়ে এসে বেশ কর্কশ কণ্ঠে বললাম,
“এই মেয়ে, নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছো কখনো? তুমি কি জিরো ফিগার?”
“বড় আপুর সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না?”
একথা শুনে আমি কিন্তু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কয়েকবার ঢোঁক গিলে বললাম,
“ইয়ে মানে স্যরি আপু। আসলে.... ”
কথা শেষ করতে পারিনি। চেয়ে দেখলাম তনু হিহি করে হাসছে। অর্থাৎ সে আমার ব্যাচমেট। কী মিচকে শয়তান যে ও ছিল। বন্ধুত্বের শুরুটা এভাবেই হলো। আমরা দুজনই ছিলাম ক্যাম্পাসে প্রমাণ সাইজের মোটা মানুষ। তাই আমাদের বন্ধুত্ব আলাদা করে সবার নজর কাড়তো। আহা কী দিন ছিলো!
এখন তনুকে দেখলে চেনা যায় না। আগের থেকে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে সে। এখন আর প্রমাণ সাইজে স্বাস্থ্য তার নেই। হাহা। অনেক সুন্দর হয়েছে দেখতে। পরিবর্তন আমার মাঝেও এসেছে। এখন তনু চাইলেও আমাকে এই মোটা ছেলে বলে ডাকতে পারবে না। আচ্ছা তনুর সাথে কি কথা বলা উচিৎ হবে আমার? ও কি আমাকে চিনতে পেরেছে? এতদিন পর দেখা, খুব অস্বস্তি হচ্ছে কথা বলতে। ও কি সহজভাবে নিবে?
“স্যার, ও স্যার। কই হারায় গেলেন?”
দোকানের কর্মচারী ডাকে ঘোর কাটে আমার। সে বেশ কয়েকটা শাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন রঙের শাড়ি। হলুদ, নীল, লাল, খয়েরী। আমার পছন্দ আগে থেকেই খুব একটা জুতসই নয়। তবুও অনেক ভেবেচিন্তে হলুদ রঙের একটা শাড়ি পছন্দ করলাম। কর্মচারীকে বললাম,
“এই শাড়িটা প্যাকেট করে দিন।”
“জি স্যার। ক্যাশ কাউন্টারে টাকা জমা দিন। আমি প্যাকেট করে দিচ্ছি। আপনার হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা।”
আমি চুপচাপ উঠে গিয়ে ক্যাশ কাউন্টারের সামনে দাঁড়ালাম। তনু তখনো শাড়ি দেখছে। ভাবখানা এমন যেন আমাকে সে চেনেই না। এতো নির্লিপ্ততা আসে কই থেকে? আমি দাঁড়ানোর মিনিট দুয়েক পরে তনুও এলো। তারও হয়তো শাড়ি পছন্দ করে কেনা শেষ। এখন ক্যাশ কাউন্টারে থেকে শাড়ি নেওয়া বাকি। দুজন দাঁড়িয়ে রইলাম আরও মিনিট পাঁচেক। এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছি যেন দুজনই একে অপরের অপরিচিত। এদিকে প্যাকেট আসছে না। ব্যাপার কী? দেরি হচ্ছে কেন? এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিরক্তিকর। অস্বস্তিও লাগছে। কিছুক্ষণের মাঝেই শাড়ির প্যাকেট ক্যাশ কাউন্টারে এলো। আমি আমার কেনা শাড়িটা নিয়ে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম। কথা বলার ইচ্ছা থাকলেও কথা বলা হলো না। না হোক। আফসোস করে লাভ নেই।
পরেরদিন বিকাল বেলা। আমি বারান্দায় বসে সিগারেটে ধরিয়েছি। প্ল্যান হলো নীলাকে নিয়ে বাইরে খেতে যাবো। নীলা সাজগোজ করছে। মেয়েদের এই এক সমস্যা। সাজতেই ঘন্টা দুয়েক লাগিয়ে দেয়। সিগারেট শেষ না হতেই নীলা বারান্দায় চা নিয়ে এলো। বললো,
“তুমি একা বসে বোর হচ্ছো তাই চা দিয়ে গেলাম। আমার আর বেশি সময় লাগবে না।”
আমি নীলার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবো, কিন্তু পারলাম না। তাকে দেখে বড়সড় একটা ধাক্কা খেলাম। নীলা একটা নীল রঙের শাড়ি পড়ে আছে। এই রঙের শাড়ি তো তার পড়ার কথা না। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি হলুদ রঙের একটা শাড়ি কিনেছিলাম। ব্যাপারটা কী? তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আমি এক দৃষ্টিতে নীলার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে নীলা প্রশ্ন করলো,
“কী ব্যাপার? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
প্রশ্ন শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম আমি। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিলাম,
“তোমাকে নীল শাড়িতে অসাধারণ লাগছে।”
“হয়েছে, আর বলতে হবে না! হিহি। ”
সে মুচকি হেসে কথাটা বলে চলে যায় রুমে। তার সাজগোজ এখনো কিছুটা বাকি। আমি বারান্দায় বসে চায়ে চুমুক দেই। হঠাৎ করে বুঝতে পারি ঠিক কিভাবে শাড়ি হলুদ থেকে নীল রঙের হয়ে গেল। ক্যাশ কাউন্টার থেকে যে ব্যাগটা আমি নিয়ে এসেছি তা ছিল তনুর কেনা শাড়ি। আমাদের দুজনের ব্যাগ পরিবর্তন হয়ে গেছে। তনু গিয়েও হয়তো অবাক হয়েছে। হলুদ রঙের শাড়ি তো সে কেনেনি। তবে ব্যাপারটা নেহায়েত মন্দ হয় নি। একটু আগে নীলাকে যে বললাম, তোমাকে অসাধারণ লাগছে, কথাটা মিথ্যা নয়। আমার ধারণা হলুদ শাড়িতে নীলাকে এতটা সুন্দর মানাতো না।
এসব ভেবে এখন লাভ নেই। ভাবতে ইচ্ছা করছে তনুকে নিয়ে। তনুর সাথে কথা বলতে পারলে ভালো লাগতো। আমি আসলে প্রচণ্ড রকম ভীতু একজন মানুষ। অতীতেও এর প্রমাণ দিয়েছি। গতকাল যখন তনুর সাথে দেখা হলো তখনো দিলাম। যখন মাস্টার্সে সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি তখন তনুর বিয়ে ঠিক হয়। আমি দেখেছিলাম কী গভীর দুঃখ তাকে গ্রাস করে নিয়েছিল। বিয়ের দুইদিন আগে তনুর ফোন আসে। সে কাঁপা কণ্ঠে বলে,
“মারুফ, আমি কিছু ভাবতে পারছি না।”
“কেন কী হয়েছে?”
বোকার মতো প্রশ্নটা করেছিলাম আমি। উত্তরে তনু বলেছিল,
“তুই কি বুঝতে পারছিস না, আমি এই বিয়েটা করতে চাই না। তোর কি মনে হয় না আমরা দুজন একসাথে থাকলে খুব ভালো থাকবো সারাজীবন?”
“না মানে ইয়ে, আমি তো এভাবে ভেবে দেখি নি। এখন কী করবো তবে?”
“কিচ্ছু করতে হবে না। বাদ দে এসব কথা। রাখি রে। নিজের যত্ন নিস।”
এই ছিল আমার আর তনুর শেষ কথা। খুব অভিমান করে কথাগুলো বলেছিল তনু। আহারে অভিমান। সেই অভিমান এখনো পুষে রেখেছে সে। এজন্যই হয়তো দেখেও না দেখার ভান। অপরিচিত হওয়ার এই সূক্ষ্ম অভিনয়। এতে দোষের কিছু নেই। ভালোবাসার তো অনেক রূপ। দুঃখ, আনন্দ, সুখ, হাসি, কান্না, অভিমান সবই ভালোবাসার একেকটা রূপ। তনু এবং মারুফ নামের এই ভীতু মানুষটার মাঝে হয়তো এখনো ভালোবাসা বেঁচে আছে অভিমান রূপে। এর থেকে বেশিই বা আর কী চাওয়ার আছে? এই ভালোবাসা মনের আকাশে কালো মেঘে করে ভেসে বেড়াক আমৃত্যু। এই ভালোবাসা বেঁচে থাক আজীবন। এই অভিমান বেঁচে থাক চিরকাল।
“অভিমান বেঁচে থাক”
আদিল মাহফুজ রনি
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সংসার (ধারাবাহিক গল্প)
#সংসার (ধারাবাহিক গল্প)
লেখাঃ মোঃ তানিম-উল-ইসলাম
(পরিচ্ছেদ-১)
মিতুর সাথে রাকিবের আজই ডিভোর্স হয়ে গেল! বিয়ের আগে একটা মেয়ের সাথে রাকিবের সম্পর্ক ছিল। তা থাকতেই পারে কিন্তু বিয়ের পরেও স্বামী যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রেমিকার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে তখন আর যাই হোক- সংসার করা যায় না। ঘৃণা নিয়ে সংসার করার চেয়ে একা থাকা অনেক ভাল!
মিতুর সাথে রাকিবের বিয়ে হয় পারিবারিক ভাবেই। সবকিছু ভালভাবেই চলছিল কিন্তু হঠাৎই যখন মিতু রাকিবের শার্টের পকেটে একটা প্রেমপত্র পায় তখন তার দুনিয়া কেঁপে ওঠে।
রাকিবকে জিজ্ঞেস করায় প্রথমে সে ক্ষেপে যায়। কিন্তু মিতু ছাড়বার পাত্রী নয়। শেষমেশ সে জানতে পারে এটা মহিমার লেখা চিঠি। ইউনিভার্সিটিতে রাকিব আর মহিমা এক সাথেই পড়তো!
রাকিবের সাথে মিতুর ভালবাসার বিয়ে না হলেও, মিতু রাকিবকে পাগলের মতোই ভালবাসতো। এতোটাই ভালবাসতো যে, তার বান্ধবী লিমা যখন মিতুকে বলেছিল- রাকিবকে সে একটা মেয়ের সাথে রেস্টুরেন্টে খেতে দেখেছে; সে লিমার কথা বিশ্বাস করেনি। ভাল যখন কেউ মন থেকে বাসে তখন তার চোখ দুটো অন্ধ হয়ে যায়, কান দুটো অকেজো হয়ে যায়। ভালবাসা এমনই এক রোগঃ এ রোগে আক্রান্তরা চোখে দেখে না, কানে শোনে না!
২
খুব সহজেই তাদের ডিভোর্স হয়ে গেল!
মিতুর গায়ে যেদিন রাকিব হাত তোলে সেদিনই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে রাকিবের সাথে সে আর সংসার করবে না। যেদিন রাকিব তার মা বাপ তুলে নোংরা গালি দেয় সেদিনও সে একই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সে সংসারের এমন এক মায়ায় আটকা পড়ে যায়, চাইলেও সে এ সংসার নামক জেলখানা থেকে নিজেকে মুক্তি দিতে পারছিল না।
যেদিন রাকিব মিতুর পেটে লাথি দেয় সেদিন সে বুঝে ফেলেঃ এ সংসার আর তার নয়।
একটা মানুষ কতোখানি পশু হলে তার ছয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা বউয়ের পেটে এভাবে লাথি মারতে পারে!
৩
মাঘ মাস।
বেশ শীত পড়েছে।
গত রাত সারাটাক্ষণ মিতু তার দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। বারেবার তার মনে হচ্ছিল রাকিব হয়তো বা শেষ মুহুর্তে ডিভোর্স পেপারে সাইন করবে না। কিন্তু তার সমস্ত আকাশ মাথায় ভেঙে পড়ে তখন, যখন আজ সকালে রাকিবের সাইন করা পেপারটা মিতুর বাসায় ফেরত আসে।
মিতু সোফায় পা তুলে বসে আছে। তার সামনে কাগজ হাতে ধরে বসে আছেন মিতুর বাবা মোতালেব হোসেন। চোখ মুখ কুচকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেনঃ
মারে একটু কি সহ্য করা যেত না?
বাবা তুমি সবকিছু জানার পরেও এই কথাটা আমায় কিভাবে বলো?
কথাটা বলেই মিতু কাঁদছে।
মোতালেব হোসেন গায়ের চাদরটা আরো ভালমতো তার গায়ে জড়িয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। তারপর হাতের কাগজটা টেবিলে রেখে সে ভেতরের ঘরে চলে যায়।
মিতু এক দৃষ্টিতে ডিভোর্স পেপারটার দিকে তাকিয়ে আছে।
কী আশ্চর্য! কতো সহজেই না এতদিনের সম্পর্কটা ভেঙে গেল। মিতুর সাথে যেদিন রাকিবের বিয়ে হয় সেদিনও ঠিক আজকের মতোই শীত পড়েছিল। বিকেলের দিকে এ শীতের মাঝে শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। মোতালেব হোসেন উৎফুল্ল হয়ে বলতে থাকেন- বৃষ্টি মানেই শুভ লক্ষ্মণ।
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ বৃষ্টি কিছুটা ধরে আসে। রাকিবের পাশে বসে মিতু যখন শশুড় বাড়ি যাচ্ছিল তখন তার মনে অন্যরকম একটা ভাল লাগা কাজ করছিল।
রাকিবের সাথে মিতুর বিয়েটা পারিবারিক ভাবে হলেও রাকিবকে সে আগে থেকেই চিনতো। তাদের বাসা একই এলাকাতেই। রাকিব ছোটকাল থেকেই তুখোড় ছাত্র ছিল। এলাকার সমস্ত মায়েরা যখন ভাল ছাত্রের উদাহরণ দিত প্রায় সবাই রাকিবের প্রসঙ্গ টেনে আনতো।
রাকিবের সাথে এলাকাতে দেখা হলেও তাদের মাঝে তেমন কোন কথা হত না। কিন্তু সে যে রাকিবকে মনেমনে খুব পছন্দ করে এটা জানতে পারে সেদিন, যেদিন রাকিবের মা তাদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে!
(পরিচ্ছেদ- ২)
আজ দুদিন হলো মিতুর সাথে রাকিবের ডিভোর্স হয়েছে! সে এখন বুঝতে পারছে তার নিজের আপনজনেরাই তাকে কেমন জানি অন্য চোখে দেখা শুরু করেছে।
মিতুর ছোট বোন ইতু এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আজ সকালে সেও মিতুকে বলে গেলঃ সে ইচ্ছা করলেই তার সংসারটা টিকিয়ে রাখতে পারতো। এখন তার নিজের জীবনটাও এলোমেলো হয়ে গেল সাথে সাথে ইতুরও হয়তো ভাল কোন জায়গায় বিয়ে হতে সমস্যা হবে।
২
প্রেগন্যান্ট ওয়াইফের পেটে লাথি মেরে যে স্বামী গর্ভের সন্তানকে হত্যা করতে পারে তার সাথে আর যাইহোক সংসার করা যায় না এই সহজ সত্যি কথাটা মিতু তার পরিবারের কাউকে বোঝাতে পারেনি।
মিতুর খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় মায়ের সাথে নিজের দুঃখ কষ্টগুলো শেয়ার করতে। কিন্তু চাইলেইতো সবাই সবকিছু পারে না। মিতুর মায়ের ঠিকানা যে এখন ওই আকাশের অনন্ত নীলে!
৩
মিতুর বাবা মোতালেব হোসেন দিনের এ সময়টায় বাইরে থাকে। এলাকাতে একটা ক্লাব ঘরের মতো আছে। ওখানেই তার সমবয়সীরা মিলে সংবাদপত্র পড়ে, চা-টা খায়।
কিন্তু আজ মোতালেব সাহেব কোথাও যাননি। উনি বারান্দায় বসে নিচে উঁকি মেরে দেখছেন। গ্রাম থেকে আনসার মিয়ার আসার কথা। আনসার মিয়ার চাচাতো এক বিধবা বোন আছে। সে খুব করে চাচ্ছে মোতালেব হোসেন যেন তার বোনটাকে বিয়ে করে।
মিতুর বাবারও যে খুব একটা আপত্তি আছে তা কিন্তু নয়। কিন্তু হঠাৎ করেই মিতু যেই ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেলেছে, এখন যদি সে বিয়ে করতে চায় তাহলে মেয়ে দুটো ব্যাপারটা কিভাবে নিবে ভাবতেই তার মাথার তালু গরম হয়ে যাচ্ছে।
৪
মিতু অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছে তার বাবা বারান্দার রেলিং ধরে নিচে কী যেন দেখার চেষ্টা করছে।
মিতু বাবার কাছে এসে দাঁড়ায়। তারপর একটু কেশে বলেঃ
বাবা তোমায় চা দেই?
মোতালেব হোসেন একটু থতমত খেয়ে মিতুর দিকে তাকায়। কিন্তু পরোক্ষণেই মেয়েটার চেহারা দেখে তার সারা মনটা বিষিয়ে ওঠে। তবে, মোতালেব সাহেব রাগ দেখালেন না। অত্যন্ত কোমলভাবে বললেনঃ
"মাগো আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করছি। সে এলে একসাথে বসে চা খাবো"।
মিতু বাবার কথা শুনে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দেয়। চুলোয় সে রান্না চাপিয়েছে!
৫
ইতু রেডি হচ্ছে, ভার্সিটিতে যাবে। মিতু ইতুর চেয়ারে বসে বোনকে দেখছে। ঠিক দেখছে বললে ভুল বলা হবে, সে আনমনে কী যেন ভাবছে।
গত কয়েকদিন ধরেই তার কেবলি মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। আশেপাশের সবকিছুই তার কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছে। কিন্তু এমনতো হবার কথা ছিল না!
মিতুর মনে আছেঃ সেবার তাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী ছিল। অন্যদিন রাকিব অফিস থেকে অনেকবার ফোনে মিতুর খবরাখবর নিলেও সেদিন সে একটাবারের জন্যেও মিতুকে ফোন দেয়নি। মিতুর অভিমানে প্রচন্ড কান্না পাচ্ছিল।
মিতু কান্না করেছিল ঠিকই! যখন সে দেখে রাকিব কিছুই ভুলে নি, বিকেলে সে মিতুর জন্য বিশাল একটা ফুলের তোড়া নিয়ে আসে, তখন মিতু রাকিবকে জাপটে ধরে খুব কেঁদেছিল। মিতুর কান্না দেখে রাকিব হোহো করে হাসে আর একটু পরপর বলে- আরেহ্ আমার পাগলী বউয়ের কী হইলো? বলে আবারো হাসে।
বদলে যাওয়া মানুষের রূপ যে এতো বিচ্ছিরি, এতো কদাকার হতে পারে রাকিবকে না দেখলে মিতুর তা কখনোই মনে হতো না। দেয়া ভালোবাসা যখন কেউ ফিরিয়ে নিতে চায়, তখন সে শুধু তার ভালবাসাটাই ফিরিয়ে দেয় না, ফিরিয়ে দেয় তার গোটা জীবনটা!
মিতুর এখন কেবলি মরে যেতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় ভালবাসাহীন এ পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিতে!
৬
মোতালেব হোসেন খুবই উত্তেজিত! ঠিক বুঝতে পারছেন না তিনি কী করবেন।
আনসার মিয়া একা আসেনি, সাথে করে তার বোনকেও নিয়ে এসেছে। লম্বা ঘোমটায় সখিনা তার পুরো মাথা ঢেকে রেখেছে। মোতালেব হোসেন চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন আর আঁড় চোখে সখিনাকে দেখছেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই বোধহয় আনসার মিয়া গলা খাঁকাড়ি দেয়। তারপর নাকের একটা লোম টান দিয়ে ছিড়ে মোতালেব হোসেনকে বলেনঃ
"ভাইজান পিশাব করবো। টাট্টিখানাটা এট্টু দেখায়া দেন"
হঠাৎ পেশাবের কথা শুনে মোতালেব হোসেনের মাথা গরম হয়ে যায়। সে চোখমুখ কুচকে আনসার মিয়াকে টয়লেটটা দেখিয়ে দেয়!
(পরিচ্ছেদ-৩)
মা হবার স্বপ্ন মিতুর আর পূরণ হলো না। মিতু এখনো তার পেটে হাত দিয়ে প্রায়ই তার বাচ্চাটাকে খোঁজে! পায় না! যা যায় তা একেবারেই যায়, সবটুকুন সুখ নিয়েই যায়।
মিতুর যখন সংসার ছিল, মিতুর যখন রাকিব ছিল; মিতুর তখন সব ছিল।
দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল হতো; মিতু তার মানুষটার জন্যে অধীর আগ্রহে বসে থাকতো। সেই রাকিবই বদলে যায়, এতোটাই সে বদলে গেলো, মিতুর গায়ে হাত তুলতেও তার মনে একটুও
বাধেনি।
২
রান্নাবান্না শেষ।
মিতু চুপচাপ তার ঘরে বসে আছে।
মাথাটা এখন তার কাছে কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা মনে হয়। কোনকিছুই সে এখন সুস্থিরভাবে চিন্তাভাবনা করতে পারে না। তবে সে এটুকু বুঝেছেঃ স্বামীর সংসার ছেড়ে এভাবে চলে আসাটা তার পরিবারের কেউই সহজভাবে নেয়নি।
কী আশ্চর্য! মিতুতো আর অন্যকোথাও যায়নি, সে এসেছে তার নিজের বাসায়। তাহলে এটা কি তার ঘর না? একটা মেয়ের কি নিজের বলতে কিচ্ছু থাকতে নেই?
মাথায় ভাবনাটা আসতেই মিতুর চোখের পানি গাল বেয়ে নিচে নামতে থাকে!
৩
মোতালেব হোসেন এখনো উত্তেজিত হয়ে আছেন। সে বেসিনের সামনে রাখা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ভালমতো পরখ করে নিচ্ছেন। দুই সপ্তাহ আগেই চুলে কলপ দিয়েছেন কিন্তু এখন দেখে মনে হচ্ছে মাথা ভর্তি সাদা কাশফুল। সে নিজের পাকা চুলের দিকে তাকিয়ে যারপরনাই বিরক্ত।
বিরক্তি নিয়েই সে বাইরে বের হয়। সেলুনে গিয়ে সুন্দর করে চুল কাটিয়ে, কলপ পড়ে তারপর তিনি বাড়ি ফিরবেন।
৪
সখিনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের রাস্তায় ছুটে চলা বাস গাড়ি দেখছে। তার খুব ভাল লাগছে। ছোটবেলায় সে তার বাবার সাথে বড় মামার বাসায় একবার এসেছিল। সেই তার প্রথম ঢাকায় আসা। মামারা সবাই বিদেশ চলে গেলে তাদের আর কখনোই ঢাকা আসা হয় না।
তবে তার স্বামী তাকে অনেকবার বলেছিল- ঢাকায় তারে নিয়ে সে বেড়াতে আসবে। কিন্তু তার এমনই কপাল-জ্বরে পড়ে মানুষটা ভেদবমি করতে করতে মারা গেল। স্বামী জয়নালের কথা মনে হলে এখনো তার মনটা আকুলিবিকুলি করে ওঠে।
মিতু অনেকক্ষণ হলো সখিনার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে খুবই অবাক হয়ে খেয়াল করছে সখিনা একটু পরপর চোখ মুচছে।
৫
খুব অল্প সময়ের ভেতরেই সখিনার সাথে মিতুর ভাব হয়ে যায়। মিতু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সখিনার দিকে। আর মনেমনে ভাবে কতো সুন্দর করেই না সে কথা বলে।
সখিনা তাকে তার গ্রামের গল্প শোনায়। অন্ধকারে জ্বীনের বাদশা তাদের ঘরের ভেতরে ঢুকে সবাইকে কিভাবে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল সেই গল্পও সখিনা তাকে শোনায়।
সখিনার খুব সুন্দর একটা পিতলের পানের বাটা আছে। সে পানের বাটা থেকে পান বের করে; মুখে পুরে মিতুকে জিজ্ঞেস করেঃ
"জামাইরে ছাইড়া আসাটা তোমার কিন্তু ঠিক হয় নাই। মাইয়াগো......."
সে আরো কী যেন বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু মিতু তাকে হাত তুলে থামিয়ে দেয়।
সম্ভবত মিতুর চোখ তখন আগুনের মতো জ্বলছিল। সেই আগুন দেখে সখিনা বোধহয় আরো দ্বিগুণ উৎসাহে বলে ওঠেঃ
"বাব্বাহ মাইয়ারতো তেজ আছে! আরে মাইয়া দুইদিন পর আমি তোর বাপের বউ হমু আর তুই আমার লগে তেজ দেখাস"?
বলেই সখিনা মিটিমিটি হাসতে থাকে।
মিতু অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে থাকে সখিনার দিকে। তার সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে যায়। বুঝতে পারছে না সে এখন কী বলবে!
৬
মোতালেব হোসেন গোসল করে ফ্রেশ হয়ে তার রুমে বসে আছেন। তার ঠিক সামনের চেয়ারে বসে আছে আনসার আলী।
আনসার আলী মাথা চুলকে মোতালেব সাহেবের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলেঃ
"ভাইজান ঢাকা শহরে হাগামুতা কইরা মজা পাইতাছি না। গাও গেরামের মানুষ জঙ্গল ছাড়া হাইগা মজা পাই না। আপনার অনুমতি পাইলে আমি গ্রামে চইলা যাবো"।
মোতালেব মিয়া সাদা সিল্কের একটা পাঞ্জাবি পড়েছেন। মনটাও তার বেশ ফুরফুরে ছিল কিন্তু আনসার মিয়ার কথা শুনে তার সারা মুখ থুতুতে ভরে ওঠে। সে জানালা দিয়ে থু মেরে একদলা থুতু ফেলে আবারো আনসার আলীর সামনে এসে বসে। তারপরে বলেঃ "সখিনার কি করবা"?
আনসার আলী লকলকে জিবটা বের করে তার কালো ঠোঁটদুটো ভিজিয়ে নেয়। তারপরে ফিসফিসিয়ে বলে, "রাইখা গেলাম আপনার কাছে"। বলেই চোখ টিপে একটা হাসি দেয়।
"আমার কাছে রাইখা গেলা? ঝেড়ে কাশো আনসার আলী"।
মোতালেব হোসেন ফিসফিসিয়ে জানতে চায়।
"ভাইজান, ওয় আপনাগো কাছে কয়দিন থাকুক। আপনার মাইয়া দুইডার লগে মিল মহব্বত হউক। আর আমি এর মইদ্দে গ্রাম থেইকা তার ছোট পোলাডারেও নিয়া আই"।
"কার ছোট পোলা? কি বলতেছো আমিতো কিছুই বুঝতেছি না"।
এবার মোতালেব সাহেবের চোখমুখ শক্ত হয়ে যায়!
"ভাইজান সখিনার আগের ঘরে একটা পোলা আছে"।
বলেই আনসার আলী কোমর তুলে তার পশ্চাৎদেশ চুলকাতে থাকে।
"বাবা তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে, একটু শুনে যাওতো"।
দরজায় মিতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মোতালেব হোসেন আঁতকে ওঠেন। তার ঠিক বুঝে আসে না মিতু তাকে ঠিক কী বলতে চাচ্ছে! তাহলে কী সে সব জেনে গেছে!
(চলবে)
লেখায়ঃ মোঃ তানিম-উল-ইসলাম
.............................................

মন_যে_আমার_হারিয়ে_ফেলেছি
#মন_যে_আমার_হারিয়ে_ফেলেছি
লেখা- তানজীলা হাসান
পর্ব-৭
কি করবে মীরা যাবে নাকি যাবে না? ভাবতে ভাবতে আরো ১ঘন্টা পার হয়ে গেলো, এখন রাত ২টা বাজে বাড়ির সবাই গভীর ঘুমে। মীরা আস্তে করে ছাদের দিকে যাচ্ছে তবে মনে অনেক ভয় করছে এক দিকে কেউ দেখে ফেলার ভয় অন্য দিকে এত রাতে একা একা ছাদে যাবার ভয়। ছাদের দরজার একটু সামনে দাড়াতেই হুট করে মীরাকে জরিয়ে ধরলো আকাশ.....
হঠাৎ এভাবে ধরাতে অপ্রস্তুত হয়ে গেলো মীরা, কিছু বলতে গিয়েও যেন বলতে পারলো না। চুপ করে দাড়িয়ে রইলো প্রায় দুই -তিন মিনিট পার হয়ে গেলো তাও আকাশ মীরা কে ছাড়ছে না, বেশ শক্ত করে ধরে রেখেছে যেন আর কোনদিন ছাড়বে না মীরাকে।
একটু শান্তকণ্ঠে মীরা বলল-
-- আকাশ আমাকে ছাড়ো আমার কথা শোনো,
-- ছাড়বো না মীরা, এভাবেই ধরে রাখব অনন্তকাল, এর পরে যেন আর হারিয়ে যেতে না পারো,
-- আচ্ছা হারিয়ে যাব না, আগে আমার কথা শোনো?
-- হুম বলো আমি শুনছি তো
-- এভাবে বলা যায় না আকাশ, প্লিজ আমাকে ছাড়ো, ঠান্ডা মাথায় বসে কিছু কথা শোনো প্লিজ।
-- মীরা I love you and I know that you also love me ( মীরা আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং আমি জানি তুমিও আমাকে ভালোবাসো)
-- হ্যা ভালোবাসি আকাশ, অনেক ভালোবাসি সেই প্রথম থেকেই তোমাকে ভালোবাসি, তাই রিকুয়েষ্ট করছি প্লিজ আমাকে ছেড়েদাও আর আমার কথাগুলো শোনো প্লিজ।
এবার আকাশ মীরাকে ছেড়ে দিলো, দুজন ছাদের এক পাশে বসলো, এবার মীরা বলতে শুরু করলো-
-- আকাশ তুমি আমি আমরা তো কোন টিনেজ বাচ্চা না, তাহলে এমন বাচ্চামো আচরণ করার তো কোনো মানে হয় না,
-- মীরা তুমি মাত্রই বলেছ তুমি আমাকে ভালোবাসো, এবং সেই শুরু থেকেই ভালোবাসো,
-- হ্যাঁ ভালোবাসি, আমি তো অস্বীকার করছি না আকাশ, কিন্তু ভালোবাসলেই কি সব ভালবাসার মিলন হয় বলো? আমাদের ভালোবাসার মিলন লেখা ছিল না এজন্যই হয়তো ছয় বছর আগেও আমরা একত্রিত হতে পারিনি, আর এখন একসাথে হয়েও এক হতে পারব না, এটাকেই আমাদের নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে হবে।
-- কেন নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে হবে মীরা? আমরা দুজন সবার কাছে সব সত্যি বলে দিব, তোমাদের ফ্যামিলির কেউই এতটা অবুঝ না যে বিষয়টা বুঝবে না নিশ্চয়ই বুঝবে। তাছাড়া আমাদের সম্পর্ক টা শুধু ভালোবাসার না আমরা এখনো স্বামী স্ত্রী। আর এটাই ১০০% সত্য কথা।
-- আকাশ শুধু আমাদের দুজনের কথা ভাবলে হবে না, ফ্যামিলির প্রতিটা মানুষ তোমাকে কনার হাসবেন্ড হিসেবে দেখছে এমনকি কনা তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে, সবার স্বপ্ন নষ্ট করে দিয়ে আমরা সুখী হতে পারব না আকাশ। আর কনার স্বপ্ন নষ্ট করা কোনভাবে আমার পক্ষে সম্ভব না, ও আমার বোন আমি ওকে ভালোবাসি।
-- মীরা ধরলাম আমি কনাকে বিয়ে করবো, কনাকে নিয়েই সংসার করবো, কিন্তু তাহলে কি সব সমাধান হয়ে যাবে? কণা কে কি আমি কোনদিন ১০০% ভালোবাসা দিতে পারব? ১০০% সুখী করতে পারবো? সময়ের সাথে সাথে সে কি কোনদিনই কিছু বুঝতে পারবে না? আর কোনদিন যদি কনা আমাদের সত্যিটা জেনে যায় সেদিন কি তা মেনে নিতে পারবে বা সুখে থাকবে?
এখন সব সত্যি বললে হয়তো সাময়িক ভাবে একটু কষ্ট পাবে কিন্তু ভবিষ্যতে হয়তো অনেক ভালো জীবনসঙ্গী পাবে তখন অনেক সুখি হবে।
কিন্তু সত্যি না বলে ধোকার মধ্যে রেখে কতদিন আমি ওকে সুখে রাখতে পারবো বল?
এভাবে কি ওর জীবনটাকে আরো নষ্ট করা হবে না?
আমাদের এনগেজমেন্ট হয়েছে আজ কতদিন, এই কয়দিনে একবার এক সেকেন্ডের জন্যও কনা আমার মনে আসেনি, জোর করে ওকে নিয়ে ভাবার চেষ্টা করেও কোনভাবে আমার ভাবনায় তাকে আনতে পারিনি, আমার মন সারাক্ষণ শুধু তোমাকে নিয়েই ভেবেছে।
তোমার সাথে আর কোনদিন দেখা না হতো সে এক কথা ছিলো বা তোমার জীবনে এখন অন্য কেউ থাকতো তাহলে হয়তো তোমাকে ভুলে যাবার চেষ্টা করতাম,কিন্তু সব জেনেশুনেও নতুন করে কিভাবে ভুলে যাবো তোমাকে?
মীরা আমি পারবোনা, প্লিজ আমার কথা গুলো বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ। আর কনা আমার কাছে কোনোদিন সুখে থাকবে না, একটা মেয়ে তার স্বামীর মনকে ভালো করেই বুঝতে পারে, কনাও হয়তো একদিন আমার মনের অবস্থা বুঝে ফেলবে তখন কি হবে?
-- কিছুই বুঝে ফেলবে না আকাশ, সময়ের সাথে সাথে তুমিও একদিন কনাকে ভালোবেসে ফেলবে তখন আমি আবার শুধুই তোমার একটা অতীত হয়ে থাকবো। তাছাড়া আমরা দুজন দু দেশে থাকি আমাদের মধ্যে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, কণাকে নিয়ে তুমি খুব সুখে থাকবে।
-- মীরা এটা সম্ভব না,
-- সম্ভব করতে হবে আকাশ, তুমি যদি সত্যি আমাকে ভালোবেসে থাকো তাহলে কনাকে অনেক সুখে রাখবে। কখনো কষ্ট দিবে না। আর যদি এই বিয়ে নিয়ে কোনো রকম সমস্যা তৈরি করো তাহলে আমাকে তো পাবেনাই বরং আমার মনের ভালোবাসা টাও ঘৃনায় পরিনত হয়ে যাবে। তোমার প্রতি ভালোবাসা থেকেই বলছি, আমাদের সুখের পরিবারের মধ্যে কোনো রকম সমস্যা তৈরি করবে না, ভেবে নাও আমি শুধুই তোমার একটা অতীত মাত্র।
ভবিষ্যতে কোনোদিন তুমি আমার ভাবনায় এলে সদিনও যেন তোমার প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা কোনো অংশে কম না হয়।
মীরার কথা গুলো শুনে আকাশের চোখ গুলো লাল হয়ে গেলো, ছলছল চোখে মীরার হাত ধরে আকাশ বললো-
-- মীরা একবার তোমাকে হারিয়ে অনেক কষ্টে নতুন করে সামনে এগোতে চেয়েছিলাম, সেই নতুন পথে আবার তোমাকে খুঁজে পেলাম। এখন দ্বিতীয় বার ইচ্ছে করে কিভাবে হারিয়ে যেতে দিব? আমাকে এত বড় শাস্তি দিওনা মীরা প্লিজ,
-- আকাশ এ নিয়ে আর কিছু বলো না, আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না,
মীরার কথা শেষ হবার সাথে সাথে ছাদের দরজায় একটা শব্দ হলো, মীরা চমকে উঠলো, আকাশ একলাফ দিয়ে সানসেট এর উপরে নেমে গেল। আকাশ এভাবে লাফ দেয়াতে মীরা আরো ভয় পেলো। মীরা আস্তে আস্তে ছাদের দরজার দিকে গেলো কিন্তু কেউ নেই, মীরা আবার ছাদের দিকে আসতে গিয়েও কি মনে করে আবার আসলো না। নিচে নেমে এলো।
ঘরে ঢুকেই দেখে তার আম্মা দাঁড়িয়ে আছে, মীরা আবার চমকে উঠলো
-- আম্মু তুমি ঘুমাও নি?
-- হ্যা ঘুমে ছিলাম, তোর বাবা কল করে তোকে চাচ্ছিলো জরুরি কি কথা বলবে কিন্তু তুই কোথায় ছিলি?
-- আম্মু ঘুম আসছিল না তাই একটু ছাদে গিয়েছিলাম,
-- এতো রাতে একা একা ছাদে যাওয়া কি ঠিক হয়েছে? যদি কোনো সমস্যা হতো? ভয় করলো না? আমাকে ডাকতি?
-- তোমার ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করেনি, এখন বাবাকে কল দাওতো কথা বলি,
আমেরিকায় এখন দুপুর, মীরা তার বাবাকে কল দিয়ে অনেকক্ষণ কথা বললো, তবে মনে মনে আকাশকে নিয়ে অনেক চিন্তা হচ্ছে আকাশ ঠিক মতো যেতে পারবে তো? কোনো সমস্যা হবে নাতো?
মীরার মা চলে যাবার পরে আকাশের নাম্বারে কল দিলো, কল রিসিভ করে আকাশ বললো-
-- আমি ঠিক আছি মীরা, তবে কতদিন ঠিক থাকতে পারবো তা জানি না।
-- আমি চাই তুমি ভালো থাকো শুধু এ জন্যই তোমাকে ভালো থাকতে হবে আকাশ। সেদিন ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তপ্ত রোদে দাঁড়ানো অপরিচিত আকাশকে শুধু এ জন্যই সাহায্য করে ছিলাম যেন সে ভালো থাকে, কেনই যেন করেছিলাম, আর আজও তাই চাই শুধু সাথে কনা যোগ হবে। কানাকে নিয়ে সুখে থেকো আকাশ।
কথাটা শেষ করেই ফোন কেটে দিল মীরা।
সকাল ১১টা বাজে মীরা ঘুমিয়ে আছে, কনা এসে মীরাকে ডেকে তুললো,
-- গুড মর্নিং মীরা
-- গুড মর্নিং
-- মীরা জলদি উঠ জরুরি কথা আছে
-- হুম বল
-- মীরা কাউকে বলতে তো পারছি না তাই তোকে বলছি, আমি আকাশের সাথে দেখা করতে চাচ্ছি। কয়দিন পারে আমাদের বিয়ে অথচ এখনো আকাশের সাথে একা কথা বলার সুযোগ হয় নি, তাই ভাবছি আজ আকাশের সাথে দেখা করবো, আর গিফট গুলো দিব।
একটু সময় নিয়ে মীরা বললো-
-- হুম ভালো হবে,
-- কোথায় যে আসতে বলি তাই ভেবে পাচ্ছি না,
-- ফিউচার পার্কে যেতে পারিস অথবা রমনা পার্ক।
-- না রমনায় যাবো না তাহলে ফিউচার পার্কে বলি
-- হুম তাই যা।
মীরার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে কনা চলে গেলো। মীরা চুপ করে বসে আছে, আর গতকাল রাতের কথাগুলো ভাবছে। আকাশের পারফিউমের ঘ্রান এখনো যেন মীরার ড্রেসে লেগে আছে। আলমারি থেকে অন্য একটা ড্রেস বের করে চেঞ্জ করতে গেল, অনেকক্ষণ ধরে ড্রেসটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু কি মনে করে আবার চেঞ্জ করল না।
বাড়ির পিছনে গিয়ে সেদিনের ফেলে দেওয়া ফুলের তোড়াটা খুঁজলো কিন্তু পেল না।
বিকাল ৪টা বাজে কনা আকাশের সাথে দেখা করতে ফিউচার পার্কে এলো, অনেকক্ষণ ধরে দুজন অনেক ধরনের কথা বললো, কনা আকাশকে তার গিফট গুলো দিল, আকাশও চেষ্টা করলো কনার সাথে খুব স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে কিন্তু আকাশের মন যেন মীরাকে নিয়েই পরে আছে। আকাশ একবার ভাবলো কনাকে সব বলে দিবে কিন্তু মীরার কথা ভেবে তাও বলতে পারলো না, তাহলে যে মীরার সাথে দুর থেকে কথা বলার সম্ভাবনাও হারিয়ে ফেলবে। মীরা বলেছে এ বিয়েতে কোনো সমস্যা হলে তাকে শুধু ঘৃণা করবে, না মীরার মনে কোনোদিনও ঘৃণার পাত্র হতে চায়না আকাশ। তাই কনাকেই বিয়ে করবে মীরা যদি তাতে খুশি হয় তবে তাই হবে।
সন্ধ্যা সাতটা বাজে কনা এখনো বাসায় ফেরেনি, মীরা বার বার টাইম দেখছে আজ যেন কিছুতেই সময় কাটছে না।
অনেক চিন্তা ভাবনা করে মীরা সিদ্ধান্ত নিল, কনা আকাশের বিয়ে পর্যন্ত এখানে থাকা যাবে না তার আগেই যেভাবে হোক তাকে আমেরিকা ফিরে যেতে হবে। এভাবে প্রতিটা মুহূর্ত আর টেনশন করতে পারছে না মীরা, দম ঘুটে আসছে কোনো কিছুই ভালো লাগছে না।
তাই ভাবলো আগে থেকে কাউকে কিছু বলবে না, যেদিন যাবে তার কিছুক্ষণ আগে সবাই কে জানাবে বা প্লেনে ওঠার সময়।
মীরার ভাবনা শেষ হবার আগেই তার ফোন বেজে উঠলো, মোবাইলে তাকিয়ে দেখে আকাশ ফোন করেছে, দেরি না করে সাথে সাথে রিসিভ করলো হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে আকাশ বললো-
-- মীরা শুধু তোমার জন্য আজ নিজের মনকে কুরবানী দিলাম মনে হল, কনার হাত ধরে তাকে সুখে রাখার প্রতিজ্ঞা করেছি, তোমার ঋন পরিশোধ করে দিব মীরা পরিশোধ করে দিব, হয়তো আমার আমি মন থেকে মরে যাব তবুও তোমার ঋন পরিশোধ করবো।
কথা গুলো বলেই ফোন কেটে দিল আকাশ, মীরার দুচোখ দিয়ে শুধু কিছু নোনাজল গড়িয়ে পরলো.......
চলবে....
পূর্ববর্তী পর্বের লিংক দেওয়া হল-
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/862161734589324/

গল্প #পালক (১ম পর্ব)©
সম্প্রতি এক তরুণ চদ্রনাথ পাহাড় থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছে। এর আগে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সে চিৎকার করে বলেছে, আমি জারজ নই। জারজ এই সমাজ- যে আমাকে জন্ম দিছে। জারজ এই সিস্টেম- যে আমাকে জারজ বইলা গালি দেয়।
তাঁর এই চিৎকার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতে থাকে। আর সে পাহাড় বেয়ে অজানা গন্তব্যের দিকে চলে যেতে থাকে। তখন ভোরের সূর্য উঠছিল।
জানা গেছে, ওই তরুণের নাম পালক। উনিশ বছর আগে টোঙ্গির ব্যাংক কোলনির পাশে রোমেলা তাকে পায়। রোমেলা তখন তেইশ বছরের সুন্দরী যুবতী। গার্মেন্টসের কাজ হারিয়ে পেশায় ভ্রাম্যমাণ পতিতা। রাত এগারোটার দিকে ডাস্টবিনের পাশে বড় রেইন্ট্রি গাছের নিচে সে দাঁড়িয়ে ছিল। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছিল একজন 'ক্ষুধার্ত পুরুষের'। কিছুক্ষণ পর তিন তিনজন ক্ষুধার্ত পুরুষ রোমেলার সামনে হাজির হলো। তারা গাছের আড়ালে অন্ধকারে একে একে রোমেলাকে ভক্ষণ করল। কিন্তু রোমেলার পেট ভরানোর কথা ভাবলো না। বস্তুত সেই দায়ও তাদের নেই। কারণ, তারা এই এলাকার নিরাপত্তারক্ষী। তাদেরকে তৃপ্তি দেয়া রোমেলার জন্য রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দেয়ার মতোই কর্তব্য।
পুরুষ তিনটি হাতের লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে শীষ দিতে দিতে চলে গেল। আধো আলো আধো অন্ধকারে তাদেরকে আর ঠাহর করা যাচ্ছে না। এমন সময় একটা নবজাতকের ক্ষীণ কণ্ঠের কান্না ভেসে এলো। সেই সাথে কুকুরের কুঁই কুঁই আওয়াজ। রোমেলা কান খাড়া করে এগোতে থাকে। ডাস্টবিনের সামনে গিয়ে দেখতে পায়, নেড়ি কুত্তার গলায় প্লাস্টিকের ব্যাগ ঝুলছে। তার ভেতর থেকে আসছে মানুষের বাচ্চার চিৎকারের আওয়াজ। খুব তীক্ষ্ণ কিন্তু খুবই দূর্বল।
রোমেলা কী করবে ভেবে পায় না। তার পেটে ক্ষুধা। শরীর অবসন্ন। ঘরে চাউল নেই। শিশু কন্যা হয়ত ঘুম ভেঙে এতোক্ষণে কাঁদতে শুরু করেছে। এখন এই আরেকটা ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে সে কী করে? বেচে দেয়া যায়। তাতে কিছু টাকা আসবে। কিন্তু রোমেলা এখনো অতটা ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেনি। এইসব ভাবনার ভেতর শিশু আরেকবার কেঁদে ওঠে।
রোমেলা তাকিয়ে দেখে নেড়ি কুত্তাটা খুব করুণ চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। তার মনে হয় কুত্তাটা যেন বাঁকা চোখে হাসছে। রোমেলার লজ্জা লাগে। যদিও কেউ দেখছে না, যদিও খুব নির্জন রাত, তবু এই আধো আলো আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে নেড়ি কুত্তার দেয়া লজ্জা সে হজম করতে পারে না। ডাস্টবিনের গন্ধ এড়াতে হাফ পেট দম নিয়ে সে কুকুরের দিকে এগোয়। কিন্তু কুকুরটা তাকে ধরা দেয় না। রোমেলা ছলাকলা দেয়। কিন্তু কুকুর তো ক্ষুধার্ত পুরুষ না। তাই ছলাকলায় ভোলে না। রোমেলার মনে হয় নেড়ি কুত্তাটা তার মনের ভাব বুঝে ফেলেছে। বাচ্চাটাকে তাই দিতে রাজি না।
এই সময় বাচ্চাটা আবার চিৎকার দেয়। রোমেলা তাকিয়ে দেখে লাল পিপড়ে সারি বেধে ব্যাগের ভেতর ঢুকছে। কী করা যায়? কুকুর তো ছলাকলায় ভুলছে না। কিন্তু রুটিকলায় ভুলবে।
দূরে গলির মোড়ে কোহিনূরের চা-বিড়ির দোকানে পচিশ ওয়াটের লাইট জ্বলছে। রাস্তার কারেন্টের খুঁটি থেকে নেয়া চোরাই লাইন। দিনে কুড়ি টাকা চার্জ নিয়ে কানা রতইন্যা এই লাইট দেয়। সেই লাইটে কলা রুটি চকচক করে ঝুলতেছে। কোহিনূর কি বাকিতে দুইটা কলারুটি দেবে না?
রোমেলা প্রায় দৌঁড়ে দোকানের কাছে যায়। হঠাৎ মনে পড়ে কোহিনূর একহালি কন্ডমের দাম পায়। বাকি চেয়ে লাভ নাই। রোমেলা খুট করে কলারুটি ছিড়ে হুট করে দৌঁড় দেয়। এক দৌঁড়ে ডাস্টবিনের কাছে এসে নেড়ি কুত্তার সামনে বসে। তারপর হাপাতে হাপাতে কুত্তার সাথে ভাগাভাগি করে কলারুটি খায়। কুত্তার মনে একটা আস্থা জন্মায়। তার গলা থেকে ব্যাগ খুলে বাচ্চাটাকে বেড় করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না।
বাচ্চাটাকে দেখে রোমেলা মুগ্ধ হয়ে যায়। কী দারুণ টানা টানা চোখ। গোলাপী গাল। ছেলে না মেয়ে? হ্যাঁ, পুরুষই তো। নিমকহারাম পুরুষ। কার ছেলে কে জানে। একদিন হয়ত এই ছেলেও কাউকে ধোঁকা দেবে। মিঠা মিঠা কথা বলে বিছানায় নেবে কোনো মেয়েকে। তারপর সময় মতো ছুড়ে ফেলে অন্যত্র পালাবে। আর ধোকা খাওয়া মেয়ে সমাজের রক্তচক্ষু এড়াতে কুকুরের গলায় ঝুলিয়ে দেবে সদ্য নাড়ি ছেড়া সন্তান।
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে রোমেলা পথ চলছে। রাস্তা ফাঁকা। তবু খুব সাবধানে ওড়নার নিচে শিশুটাকে লুকিয়ে রেখেছে। কেঁদে উঠলে দ্রুত অন্ধকারে লুকাচ্ছে। সে জানে এই শহরে গরীবের কথার কোনো দাম নাই। যে কেউ দেখলে তাকে চোর বলে সন্দেহ করবে। কোটি টাকা চুরি করে এই শহরের বড়লোকেরা বিদেশে পাঠায়। জুম্মার নামাজ পড়ে ফ্লাইটে তারা ব্যাংকক যায়। সেখানে নাইট ক্লাবে উদ্দাম নৃত্য করে ফরেনার সুন্দরি দিয়ে শরীর টেপায়। দেশে ফিরে পরদিন এই সব চোরেরাই হাজি সেজে সালাম আর শ্রদ্ধা কুড়ায়। তাদের কথার দাম আছে। তাদের কথায় চলে সমাজ। কিন্তু রোমেলার মতো ক্ষুধার্তরা এক পিস রুটি চুরি করলে গণপিটুনিতে প্রাণ যায়। এ বড় আজব শহর। তাই পথ চলতে হয় খুব সাবধানে, খুব হিসেব করে।
রোমেলা যখন তাদের গলিতে পৌঁছায় তখন দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল জোয়ার্দার স্টোরে আলো জ্বলছে। দোকানের কর্মচারী সিদ্দিক মিয়া। বছর ত্রিশেক বয়স। চোখ দু'টো কুতকুতে। আট মাস হলো তার বউ এক ট্রাকের হেলপারের সাথে ভেগে গেছে। এখন দোকানেই ঘুমায় সিদ্দিক। ফ্লোরে বিছানা করছিল। রোমেলা গিয়ে দাঁড়াতেই কুতকুতে দুটি চোখ তুলে তাকালো। মনে হচ্ছে চোখ দিয়েই সে রোমেলাকে চেটেপুটে খেয়ে ফেলবে।
ওড়নার নিচ থেকে বাচ্চাটাকে বের করে রোমেলা। ঘুমাচ্ছে। রোমেলা বলে, এইটারে কুড়ায় পাইছি। কোন খানকির পোলায় যে ফালায়া গেল। এখন কী করি কও তো সিদ্দিক ভাই। ঘরে নাই চাইল-ডাইল৷ বিজনেসও হয় নাই আজ।
সিদ্দিক বলে, দুধ আছে। গুড়া দুধ। কিন্তু হ্যার তো ম্যালা দাম।
রোমেলা খানিকটা ঝুঁকে দাড়াল। ওড়নার ফাঁক দিয়ে বুকের খাঁজ দেখা যাচ্ছে। সিদ্দিক মিয়া ঢোক গিলল। রোমেলা ঢং করে বলে, দামটা বুঝলা সিদ্দিক মিয়া। এই মাসুম বাচ্চার লাইগা মায়া বুঝলা না।
রোমেলার বুক থেকে চোখ না সরিয়ে সিদ্দিক বলে, এই সব হাইরা-জাইরার লাইগা মায়া কইরা কী লাভ কও।
রোমেলা বলে, আমার লাইগাও তোমার মায়া জাগে না? নাকি একটা শিমার তুমি?
সিদ্দিক বলে, বুক তো কাঁপে। তয় তোমার উপর মায়া দেখাইলে জোয়ার্দার সাব আমারে কাঁচা চাবায় খাইবো না?
রোমেলা হাসে। তারপর কামিজ উঠিয়ে পুরুষ্ট স্তন শিশুটার মুখে গুজে দেয়। রোমেলা বলে, নাই, এই বুকে দুধ নাই। মায়া হয় না সিদ্দিক ভাই? নাকি ঢাইকা দিমু?
সিদ্দিক চোখ সরায় না। হাত বাড়ায় দুধের প্যাকেটের দিকে। ব্যস্ত হয়ে বলে, না না ঢাকবা ক্যান? ঢাইকো না। মায়ায় আমার বুক ফাইটা যায়।
রোমেলা হাত বাড়িয়ে দুধের প্যাকেট নেয়। সিদ্দিক বলে, তুমি যদি জোয়ার্দার সাবের মাল না হইতা, তুমারে লইয়া আমি নিরুদ্দেশে যাইতাম রোমেলা।
দুধের প্যাকেট নিয়ে রোমেলা বাসায় এসে দেখে রাহেলা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। সাত বছর বয়স তার। মেয়েটা একদম ক্ষুধা সহ্য করতে পারে না। মায়ের কোলে একটা ফুটফুটে বাচ্চা দেখে রাহেলা কান্না থামিয়ে ড্যাবডেব করে চেয়ে রইল।
রোমেলা বলল, এইটা তোমার ভাই। এরে আমি পালক নিছি। তোমার পালক ভাই। সুন্দর না?
রাহেলা বলল, প্যাট পুড়তাছে মা।
রোমেলা একবাটি দুধ গুলিয়ে পালক আর রাহেলাকে খাওয়ায়। তারপর টিনের ঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে উঁকি দেয়। জোয়ার্দারের চিলেকোঠার ঘরে বাতি নেভে নাই। রোমেলার পেটে রাক্ষসের মতো ঘাই মারছে ক্ষুধা। একবার ঢুঁ দেবে চিলেকোঠায়?
বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের চালে রিনঝিন শব্দ। পেট ভরা থাকলে এই শব্দ গানের মতো মিঠে লাগে। কিন্তু এখন বিরক্ত হচ্ছে রোমেলা। পালককে শুইয়ে দিয়ে রোমেলা রাহেলাকে বলে, ওরে একটু দেইখো। আমি আইতাছি।
তারপর বৃষ্টির ভেতর সে ঘর থেকে বের হয়। গলির মাথায় রোডলাইটটা জ্বলছে আর নিভছে। রোমেলা আবছা আলোয় মৃদু পায়ে হেটে জোয়ার্দারের চার তলার চিলেকোঠায় গিয়ে কলিংবেল টেপে।
এককালে ট্রাক ড্রাইভার ছিল জোয়ার্দার। ট্রাকের চাকা ঘোরারা সাথে সাথে জীবনের মোড় ঘুরে গেছে। তিন শতক জমির উপর চার তলা এই বাড়িটা তার নিজের। তিনটা ট্রাক আর দুইটা পিকআপেরও মালিক সে। বিয়াল্লিশ বছর বয়স। তয় শরীরের গাথুনি খুব মজবুত৷ এখনো বাইশ বছরের তাগড়া জুয়ানের মতো তাগোদ। তেইশ বছরের রাহেলাকে সে তুড়ি মেরে ঘায়েল করে দেয়।
তিন বছর হলো জোয়ার্দারের বউটা মরছে। কেউ কেউ বলে জোয়ার্দার নিজেই মারছে। মেরে ব্যালকনি থেকে নিচে ফেলে দিছে। তারপর সবাইকে বলছে, আকাশে পূর্ণিমার চান উঠলে বউটার মাথা বিগড়ায়। ক্যান যে বিগড়ায়। হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তাই বইলা ব্যালকনি থেইকা লাফায়া পড়তি হবি?
এই ঘটনার পর খুব চাপ গেছে। জোয়ার্দার বলে, এইটা এক জাইড়্যা দ্যাশ। চারদিকে সব খানকির পোলায় ভরা। ঘুষ ছাড়া এক পয়সার কাম হয় না। কোথায় একটু বউর জন্য শোক করুম তা না। ঘুষ দিতে দিতে নিজেরই জান যায়।
কিন্তু জোয়ার্দারের মেয়ে বলে, এই জাইড়্যা সিস্টেম ছিল বইলায় তুমি বাইচা গ্যালা। তয় কয়দিন। একদিন তো মরবাই। ওই পাড়ে যায়া বুঝবা।
মেয়ে আর কোনো দিন বাপের বাড়ির দিকে মুখ করে নাই। জোয়ার্দার তিন তলা ভাড়া দিয়ে চিলে কোঠায় গিয়ে উঠছে। এই বিয়ালিশ বছর বয়সে সে বাইশ বছরের মতো যৌবন নিয়ে এখানে ওখানে ঢুঁ মারে। ট্রাক আর পিকআপের তদারকির নাম করে আজ গোয়ালন্দ তো কাল টাঙ্গাইল চলে যাচ্ছে। যখন যখন বাসায় থাকছে হরহামেশা জোয়ান জোয়ান 'কাজের বেটি' ডাকছে। রোমেলা তাদেরই একজন।
দরজা খুলে জোয়ার্দার বিগলিত হাসি দেয়। তার ঠোট বেয়ে পানের কষ গড়াচ্ছে। বলে, আহো রোমেলা আহো। তোমার কথাই ভাবছিলাম। রোমেলা ভেতরে ঢুকে দেখে রোগা মতো এক যুবতী পায়জামার ফিতা বাঁধছে।
জোয়ার্দার বলে, বুঝলা রোমেলা, আইজকালকার মাইয়াগুলার তাগোদ নাই। কাজকামে কোনো গোছগাছ নাই। বেগুন দিয়া ট্যাংরা মাছ রান্ধে। মুখে দিয়া মনে হয় ঢ্যাঁড়স ভাজি।
রোগা মেয়েটাকে বলে, তুমি তাইলে আহো। ঠিক দুই দিন পর আইবা। সন্ধ্যায়। ট্যাকা দিয়া দিমু।
মেয়েটা বের হয়। জোয়ার্দার দরজা আটকে রোমেলার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, বুঝলা রোমেলা শিয়ানে শিয়ানে ডেরাইভার পাইলাম না। কম তো দেখলাম না। তয় তুমি ছাড়া আমার লগে গিয়ার মাইরা কেউ পারে না।
রোমেলা চোখ তুলে বলে, ক্ষিধা লাগছে জোয়ার্দার।
জোয়ার্দার বলে, ভাত চাপাইয়া আহো তাইলে। আমারও ক্ষিধা মেটে নাই।
রোমেলা ভাত উঠিয়ে বেডরুমে চলে যায়। এদিকে ভাতের পানি গরম হতে হতে বলক ওঠে। ওদিক থেকে নারী-পুরুষের দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে। মনে হয় মাইলের পর মাইল দৌঁড়ে তারা যেন হাপাচ্ছে। রোমেলার কণ্ঠ ভেসে আসে, সাথে খিলখিল হাসি, তোমার বয়স একটু হইছে। তয় মুরদ কমে নাই। আমারে নিকা করবা তুমি জোয়ার্দার?
জোয়ার্দার হাসতে হাসতে বলে, তোর মাথা নষ্ট রোমেলা। সমাজে আমার একটা সম্মান আছে না?
রোমেলা বলে, আমার সাথে শুইলে তোমার সম্মান যায় না। বিয়া করলেই জাত যায়?
জোয়ার্দার বলে, হেইডা তুই বুঝবি না। তাছাড়া তুই হইলি বারো জনের আইঠা মাগী। তোর লগে দুই বেলা শুয়া যায়। তয় ঘরের বউ করা যায় না।
রোমেলা একটা বিশ্রী গালি দেয়। তারপর হাসে। হাসতে হাসতে বলে, তুই একটা আসল খানকির পুত। আর তোর এই সমাজ রোমেলার চেও বড় খানকি।
এক মুহূর্ত পর আরও দ্রুত নিশ্বাসের শব্দ শুরু হয়। জোয়ার্দার যে আসল 'খানকির পুত' তা প্রমাণে সর্বশক্তি ঢেলে দিচ্ছে। ঠিক তখন বলক উঠে ভাতের পাতিলের ফ্যান উপচে পড়ছে।
পেটেভাতে দিন ভালোই চলতে পারত রোমেলার। জোয়ার্দারকে বললে ট্রাকের হেলপারের চাকরি পেয়ে যেত পালক। তারপর একদিন ড্রাইভারও হতো। আর জোয়ার্দারের ঘরে কাম করে রোমেলার পেট আর গতর চলত মন্দ না। কিন্তু কপাল মন্দ হলে যা হয় রোমেলার তাই হলো। পালককে 'মানুষের মতো মানুষ' বানানোর ইচ্ছা হলো তার।
পালককে সে স্কুলে ভর্তি করল। যাতে একদিন সসম্মানে বাঁচতে পারে। কিন্তু শর্ষের মধ্যেই যে ভূত রোমেলা তা বোঝে নাই। স্কুলের বাচ্চারা পালককে জাইড়্যা জাইড়্যা বলে ক্ষেপাতে লাগলো। সহ্য করতে না পেরে পালক একদিন এক পিচ্চির নাক ফাটিয়ে ছুটে বাসায় এসে বালিশে মুখ গুজে কাঁদতে লাগলো। পরের দিন রোমেলাকে ডাকলেন হেড স্যার। কাচুমাচু মুখ করে বললেন, স্টুডেন্টদের প্যারেন্টসরা চাচ্ছেন না পালককে আমরা এই স্কুলে রাখি। তাহলে তারা অন্য স্কুল দেখবেন। আমি খুবই স্যরি। খুব স্যরি।
রোমেলার ইচ্ছা করল গলা খুলে গালি দেয়। কিন্তু কাকে দেবে? কী গালি দেবে? বুঝতে না পেরে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বেরিয়ে আসে।
পালকের তখন বয়স কত আর? আট কী নয়। তার হাত ধরে রোমেলা এক সকালে মসজিদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মক্তব্যের হুজুর পালকের হাত ধরে তাকে মসজিদের ভেতর নিয়ে গেলেন। কিন্তু সেখানেও পালক দলছুট।
মহল্লার বাচ্চারা তাকে খেলতে নেয় না। বলে, তোর বাপ-মায়ের দিশা নাই। তোরে খেলায় নিমু না। তাইলে আমরা নষ্ট হয়া যামু। তুই না জাইড়্যা?
পালক হীনমন্যতায় ভোগে। গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকে একা। নিঃসঙ্গ। বিমর্ষ। একদিন ছোট ছোট পায়ে একটি বালিকা এসে পাশে তার দাঁড়ায়। মাথার চুলগুলো রুক্ষ। এলোমেলো। মুখখানা মলিন। বালিকা বলে, আমারে একটা ফড়িং ধইরা দিবা? আমি পালুম।
পালক বলে, দিমু। কিন্তু ফড়িং পামু কই?
বালিকা গলির ভাঙা দেয়ালের দিকে আঙুল তুলে দেখায়। দেয়ালের উপর বেওয়ারিশ জন্মানো ধুন্দল গাছ। ফুল ফুটেছে। সেখানে উড়ছে কয়েকটি ফড়িং।
পালক বালিকার সঙ্গে ফড়িং ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সহজে দেয় না ধরা ফড়িং। কিন্তু পালকের আনন্দ তাতে একটুও কমে না। যত বার ফড়িং পালককে ফাঁকি দেয়, ততোবার পালক দ্বিগুন উৎসাহে চেষ্টা শুরু করে। এমন মধুর বিকেল, খেলার এমন সুখ পালকের জীবনে তো আর আসে নাই।
এক, দুই, তিনদিন যায়। কতদিন যে যায় ঠিক হিসাব নাই। রোজ বিকেলে রুটিন করে তারা ফড়িং ধরতে বের হয়। গলি ছাড়িয়ে, দূরে, অনেকটা দূরে- কাশবনে, ঘাসবনেও পৌঁছে যায় এই দুই বালক-বালিকা। তারপর এক গোধূলিলগ্নে ঘাসবনে পালক একটি ফড়িং যখন ধরে বালিকার সে কী আনন্দ। পালক বালিকার হাতে ফড়িংটা তুলে দেয়। বালিকা আনন্দে চোখ গোলগোল করে বলে, কী সুন্দর, না?
পালক বলে, তোমার মতো।
বালিকা বলে, ছাইড়া দেই?
কেন?
সন্ধ্যা হইছে। ওরে না পাইলে ওর মায়ে কানবো না?
পালক হাসে, আইচ্ছা। ছাইড়া দাও তাইলে।
বাকিকা মুঠো থেকে ফড়িং উড়িয়ে দেয়। তার মুখে তখন গোধূলির আলো পড়েছে। ছোট ছোট রুক্ষ চুল বাতাসে উড়ছে। মুখে তার অপার্থিব আনন্দের আভা। পালক সেই মুখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, নাম কী তোমার?
বালিকা বলে, কেয়া। কেয়া বইলাই আমারে সবাই ডাকে।
পালকের বন্ধুহীন জীবনে একটুকরো সবুজ মরুদ্যান হয়ে ওঠে কেয়া। সৎ মায়ের সংসারে সে একটা বোঝার মতো। এককোণে পড়ে থাকে। কখন খায়, কখন নায় কে তার খেয়াল রাখে? কিন্তু পান থেকে চুন খসলে সৎ মায়ের হাতে তার দুর্গতির সীমা থাকে না। কেয়ার সবজি বিক্রেতা দরিদ্র পিতা মেয়ের জন্য গোপনে চোখ মোছেন। কিন্তু মুখরা স্ত্রীকে শাসন করে অন্যায়ের প্রতিকার করার মুরোদ তার নাই।
কেয়াকে কোনো কোনোদিন সে বাজারে নিয়ে যায়। পালকও যায় কেয়ার বাবার সঙ্গে। বলে, চাচা আমারে ব্যবসা বুঝাইবা?
কেয়ার বাপে হাসে, বুঝবি। ধীরে ধীরে বুঝবি।
বাজারে শেষে সবজির ঝুড়িতে বসিয়ে কেয়াকে মাথায় নেয় তার বাপ। পালক তার হাতের আঙুল ধরে রাস্তা পাড় হয়। কোনোদিন মিষ্টির দোকানে বসে রসগোল্লা খায় তারা। কেয়ার বাপে চোরের মতো মুখ করে বলে, বাসায় যাইয়া কইস না আবার। তর মা'য় ক্ষ্যাপবো।
এইভাবে একটা মিষ্টি মধুর সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় কেয়া আর পালকের। তারা বড় হতে থাকে। কেয়ার পোশাকের পরিধি বাড়তে থাকে। সেই সাথে সমাজের নগ্নতা ধরা দিতে থাকে তাদের চোখে।
চলবে....
গল্প #পালক
(১ম পর্ব)
© হাসনাত কাদীর

কোথায়_সেই_গয়নার_বাক্স
#কোথায়_সেই_গয়নার_বাক্স
#শেষ_পর্ব
আমার ছোট ফুপুরকানেও এই কথা চলে আসে,তার পরে সেই দিন রাতে আমাদের বৈঠক খানায় সবার সাথে বসে ছোট ফুপু,সেই মিটং এ অনেক অজানা বিষয় খুলাসা হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো ছোট ফুপুর তালাকের বিষয়। সেই মিটিং এ ছোট ফুপু তার দুই ভাই, দুই ভাবি, এবং আমাদের ছোট দাদু ছিলো। আমার ছোট ফুপুর মুখে আমরা সেই দিন এমন কিছু দেখেছিলাম, যা দেখে আমরা ভেবেছিলাম, ফুপু মনে হয় আজকে বৈঠক খানার সবাই কে গুলি করে দিবে। আমরা একটু পর পর বৈঠক খানার দিকে যেতে চাই, আর গামা আমাদের দেখে বলে
-ছোট আম্মাজান মানে (আমাদের ফুপু)জরুরী মিটিং ঢাকছে এখন বৈঠক খানার দিকে কেউ যেতে পারবে না।
আমরা আশেপাশে ঘুর ঘুর করছিলাম আর কান খাড়া করে রেখেছিলাম আর আশা করছিলাম ফুপু ফাঁকা গুলি হলেও যেন করেন,আসলে আমরা ছোট'রা ফুপুর সব কিছুতেই আলাদা একটা রোমাঞ্চকর কিছু ভেবে নিতাম। কারন ফুপু দুপুর বেলা বলছিলো, এখন থেকে বন্দুক নিয়ে ঘুরবো কেউ উল্টা পাল্টা কিছু বললে সোজা গুলি করে দিবো!
আমাদের নিরানন্দ জীবনে ফুপুই ছিলো একমাত্র আনন্দের এবং স্বপ্ন বুনার কারিগর।
ফুপু আমাদেরকে, আমাদের ভেতরের আমিকে দেখতে সাহায্য করেছিলো, আমাদের শক্তি কে এবং আমাদের কে মূল্যবান ভাবতে শিখিয়েছিলো। আমরা একসময় আবিষ্কার করলাম আমরা সব পারি। একসময় আমাদের অবসর কাটতো গুপ্তধন খুঁজে, আর এখন আমরা কোন অবসর পাই না, কারণ আমরা সবাই সারাক্ষণ আমাদের নিজের কাজ করি এবং সব চাইতে বড় কথা আমরা একসময় কোন কিছু কিনতে হলে মায়ের পেছনে ঘুরতাম, মা যদি বাবাকে বলে টাকাটা নিয়ে দেন, তা হলে কিনতে পারবো।আর এখন আমাদের সবার নিজেস্ব ব্যাংক আছে আমরা এখন আমাদের নিজের উপর্জনের টাকা সেই ব্যাংকে রাখি।
এক ঘটনা বলতে গিয়ে আরেক কথায় চল গিয়েছিলাম। আসলে আমাদের ছোট ফুপুর কথা বলতে গেলে দু'চারটা উপন্যাস লেখা হয়ে যাবে।
সেই দিন সেই বিচার সভায় আমার ছোট ফুপু তার বড় দুই ভাই এবং বড় দুই ভাবিকে উদ্দেশ্য করে বলেন -আমাকে তালাক দেওয়ার পেছনের কারণ কি বলে আপনারা জানেন? আমি কয়মাস সংসার করেছি? আমি কেমন তা কি,আমার পরিবারের মানুষ ভালো জানে? না হারুন লম্পট টা ভালো জানে? আমার পরিবার কি এখন থেকে আমাকে, আমার তালাক দেওয়া নিয়ে, আমার মূল্যায়ন করবে?আমার চরিত্রের সাটিফিকেট এখন হারুনের তালাকনামা?
-আমাকে কে কি বলল তাতে আমার কিছু যায় আসে না, কিন্তু আমি জানতে চাই আমার পরিবারের মানুষ গুলোর চিন্তা- ভাবনা নিয়ে? সবাই তার মনের কথা গুলো এখনই আমাকে বলবেন এবং এটাই সবার মনের কথা বলার শেষ সুযোগ।
এদিকে আমার আম্মার তো ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে।
-আমার আব্বা আর ছোট চাচা ছোট ফুপু কে শুধু আস্তে করে বলে ছোট বুবু তুমি (আমাদের ছোট ফুপুকে আমার আব্বা আর ছোট চাচা কিছু দিন দাদিজান ডাকতো পরে তারা আমাদের পর দাদির সাথে ছোট ফুপির হুবহু মিল থাকায় ছোট বুবু বলে ডাকে। আমাদের দিকে দাদি কে বুবু বলার রেওয়াজ ছিলো)ঠান্ডা হও তুমি এত রেগে গেলে অসুস্থ হয়ে যাবে,আর তুমি অসুস্থ হলে আমরা কার কাছে যাবো? আমাদের তো তুমি ছাড়া কেউ নাই।
আব্বা আর ছোট চাচা শুধু না ,আসলে এই পরিবারের সবাই, সব কিছুতে ছোট ফুপুর প্রতি অনেক নির্ভরশীল ছিল।সবাই আমাদের পর দাদির ছবি দেখতে পেতো ফুপুর ভেতরে। সেদিন বৈঠক খানায় আমাদের ছোট দাদু, যে ছিলো চিরকুমার। উনি বিয়ে করেন নাই এবং বেশির ভাগ সময় বাড়িতে থাকতেন না। তিনি কিছু দিন পর পর কিছু জমি বিক্রি করে দেশ ভ্রমনে চলে যেতেন। একবার হিমালয়ে চলে গিয়েছিলিন সাধুসন্ন্যাসী হবেন বলে, সেবার ছোট দাদু তিন বছর টানা বাড়িতে আসেন নাই,সেবার গোটা ইন্ডিয়া ঘুরে বেড়িয়েছেন দাদু। তার পর আজমীর-শরিফ এ খাজা বাবার মাজারে টানা ছয়মাস ছিলেন, তার পর ছোট দাদুর এক বন্ধু, ছোট দাদুকে আজমির শরীফে দেখে চিনতে পারে, আর তখন দাদুকে বলে তুমি বাড়ি যাবে না? তখন দাদুর বন্ধু বাবাকে আজমির থেকে কল দিয়ে ছোট দাদুর কথা জানায়, তখনও ঠিক ছোট ফুপুই ছোট দাদুকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনে। ছোট ফুপু ছোট দাদুর খোঁজ পাওয়ার পরে এমন কান্না - কাটি শুরু করে যে, বাসার সবাই অস্হীর হয়ে যায়। তার পর ছোট দাদুর কে জানানো হয় সে কথা,ছোট দাদু যদি বাড়িতে ফিরে না আসে, তা হলে ছোট ফুপুকে নিয়ে বাবা ইন্ডিয়াতে যাবে দাদুর কাছে, তা না হলে ছোট ফুপু খাওয়া বন্ধ করে দিবে। তারপর ছোট দাদু নিজেই হুলুস্থুল করে বাড়িতে ফিরে আসে।এই হলো আমাদের ছোট ফুপু।
সেই দিন ছোট দাদু জানতে চায়,ছোট ফুপু কেন রেগে গেছে?
রুবাই কেন রেগে আছে?এই বিষয়ে কে কি জানো আমাকে বলো?
দাদু আরো বলে
-আমাদের বাড়ির মেয়ের সন্মান আমরা যদি দিতে না পারি? তবে আমরা কিভাবে বাহিরের মানুষের কাছ থেকে সেই সন্মান আশা করবো?
-তার পরে ছোট দাদু সবার উদ্দেশ্য বলে, আজকে তোমরা সবাই আছো তা-ই আমি তোমাদেরকে একটা কথা পরিস্কার করে জানাতে চাই, যা তোমরা হয়তো-বা জানো না, তা-ই তোমাদের মধ্যে বিশেষ, করে বৌমাদের ধারণা আমাদের রুবাই কে হারুন তালাক দিয়েছে, আসলে হারুন কে আমি বাধ্য করেছি রুবাই কে তালাক দিতে।
-রুবাই এর কাবিন নামায়, মেয়ে কে তালাকের অধিকার দেওয়া হয় নাই এক্ষেত্রে রুবাই রশিদ কে তালাক দিতে গেলে যথেষ্ট পরিমানে ঝামেলা করতে হতো সেক্ষেত্রে আঙুল বাকা করতে হয়েছে একটু।
রুবাই কে আমরা একটা অমানুষের সাথে বিয়ে দিয়েছিলাম।
সেই অমানুষটা ভেবেছিলো রুবাই কে নানা ভাবে অত্যাচার করে আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু আদায় করে নিবে, তোমরা দেখেছো রুবাইয়ের বিয়ের পরে ওরা আমাদের বাড়ি থেকে রুপার পান দান এবং আরো কিছু পুরাতন জিনিস চেয়ে পাঠায়, আসলে রশীদ অনেক দিন থেকে দালালী করে বিভিন্ন বিষয়ে। আর ও ঢাকা শহরে কিছু দিন থাকার সময় এন্টিক জিনিসের মূল্য সম্পর্কে জানতে পারে, ওর ধারণা ছিলো আমরা আমাদের বাড়ির জিনিসপত্রের মূল্য জানি না।
আর তার চাইতে বড় কথা হলো রশিদ রুবাই কে ভয়ঙ্কর রকমের অপমান করেছে। আর সেই কথা রুবাই কেন, তোমাদের বলতে পারে নাই? তোমরাই বা, কেন, রুবাই এর চেহারায় কষ্ট দেখতে পাও নাই?
- রুবাই কে দেখে তো আমি চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম, কারণ আমি মৃত একটি মুখ দেখতে পেয়েছিলাম, আজ আমি আবার আমাদের প্রান-চঞ্চল রুবাই কে দেখতে পাচ্ছি।
-রুবাই কে আমি শুধু একটা কথা বলি ছাদে নিয়ে ? রুবাই সমস্যা ছোট থাকতেই সমাধান করে ফেলা ভালো। আর আমাকে তোমার সমস্যা না বললে আমি কি ভাবে তার সমাধান করবো? রুবাই তখন আমার কথা এড়িয়ে যেতে চায় , তখন আমি শুধু বলি আমি আমার মায়ের মৃত মুখ দেখতে পারবো না, আমি তা হলে চলে যাবো বাড়ি ছেড়ে।তখন রুবাই বলে
-ছোট কাকা রশীদ একটা লম্পট, সে আমাকে বিয়ের প্রথমদিন থেকেই বিভিন্ন ভাবে অপমান এবং অত্যাচার করছে, তবে আমি ওকে কঠিন শিক্ষা দিয়ে তবেই ছাড়বো।
-রশিদ আমাকে বলে,জমিদার বাড়ির মেয়ে কে , বিয়ে করেছি তাকে দিয়ে পা টেপানোর জন্য। অনেক মেয়েছেলে দিয়ে পা টিপিয়েছি কিন্তু জমিদার বাড়ির মেয়েছেলে পাই নাই! এখন সেই শখ মিটাবো। আমি যখন এক কথায় বলে দেই আমি কোন কেনা দাসী না। আমার পরিবারের প্রতিটা ছেলে তার বউ কে সন্মান করে। তেমন আমাদের বাড়ির মেয়েদের কেও তাদের স্বামীরা সন্মান করবে, এটাই আমাদের শেখানো হয়েছে, তখন আমি ঘরে উপস্থিত থাকা অবস্থায় তাদের বাড়িতে আশ্রিত একজন নারী কে ঘরে নিয়ে আসে।
তখন ছোট দাদা ফুপু কে বলে
- ঐ শয়তানের বাড়িতে তো আমি আর তোমাকে ফেরত যেতে দিতে পারি না, তুমি যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছো ওর সাথে সংসার করবে না, সেখানে তোমার জীবন নিয়ে আমি রিস্ক নিতে পারি না। তার পর গামা রশীদের শরীর বানিয়ে দেয়, আর সাথে গামার বউ রুপার একটা বাক্স রশীদের হাতে দেয়, রশীদ সেই বাক্স খুলে দেখে আর চিৎকার দিয়ে উঠলে, তাকে বলা হয় রুবাই আর তার বাড়িতে যাবে না। আর রশীদ কে জীবিত ফেরত যেতে দেওয়া হলো এই কারণে, সে যেন বাড়িতে গিয়ে ভালোয় ভালোয় তালাকনামা পাঠিয়ে দেয়।
আমাদের ছোট দাদা সবাই কে তখন বলে
-একদিন এই পরিবারের একজন নারী তার প্রানপ্রিয় স্বামীর অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করেছিলো এবং সে নারীর সন্মান করতে যে শিক্ষা এই পরিবারে দিয়ে গেছে তার ফল এখন সবাই ভোগ করছে আমাদের পরিবারে নীতি হলো তারা সব সময় নারীকে তাদের স্ত্রীকে সন্মান করবে, আমরা আমাদের জমিদারী বিসর্জন দিয়েছিলাম আমাদের পর দাদি তার হীরা জহরতের বাক্স ফেলে দেন যা দিয়ে তখনকার দিনে আরো দুবার জমিদারি কেনা যেতো।
আর সেই বাড়ির মেয়ে অন্য বাড়িতে গিয়ে অন্যয় আচরণ মেনে নিবে এটা কিভাবে তোমরা ভাবতে পারো?
-এখন থেকে তোমরা সবাই মনে রাখবে মেয়ে বিয়ে দেওয়া মানে তার সব ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া না, বরং মেয়ের প্রতি আরো বেশি দায়িত্ব শীল হওয়া, তাকে সব সময় এই সাহস দিবে যে আমরা তোমার পাশে সব সময় আছি আর তুমি বিয়ের আগে যেমন এই বাড়ির মেয়ে ছিলে সারাজীবন এই বাড়ির মেয়ে থাকবে তোমার বাড়িতে চলে আসতে হলে তুমি একবারও ভাববে না।
সেই দিন ছোট ফুপুর তালাকের বিষয় সবার কাছে পরিস্কার হয়ে যায়। আর যেহেতু ছোট দাদু ফুপুর বিষয়টা, সুন্দর ভাবে সবাই কে বুঝিয়ে দেন, আর সবাই ছোট দাদুর কথায় হাফ ছেড়ে বাঁচে। ছোট দাদুর কারণে কাউকে আর আলাদাভাবে ছোট ফুপুর প্রশ্নের জবাব দিতে হয় নাই। তাই আর কোন ধরনের হইচই হয় নাই সেদিন। ছোট দাদু সবাই কে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো। এবং তিনি আবারও এই পরিবারের নিয়মগুলো সবাই কে নতুন করে মনে করিয়ে দেন।
ছোট দাদু যেহেতু বিয়ে করে নাই, তাই ছোট দাদুর সম্পত্তির ওয়ারিশ, আমার বাবা'রা ভাই- বোনেরা হবে এটাই স্বাভাবিক ছিলো। তবে সেদিন ছোট দাদু সবাই কে বুঝিয়ে দেন যে, ছোট ফুপির মনে কেউ কষ্ট দিলে ছোট দাদু তাকে কখনো ক্ষমা করবে না। আসলে ছোট দাদুকে তার বোহেমিয়ান জীবন থেকে ঘর মুখি করেছে ছোট ফুপু। ছোট ফুপু দাদু কে এমন যত্ন করতো,আর বকাও দিতো অনিয়ম করলে, মনে হতো ছোট দাদু'র মা হচ্ছে ছোট ফুপু।
বড় পরিবার গুলোতে স্বার্থের সাপ গর্তের ভেতরে লুকিয়ে থাকে, একটু সুযোগ পেলেই ছোবল মারে।আমাদের পরিবারটা ধরে রাখা হয়েছে, কঠিন ভাবে। কারন আমাদের পরিবারের সাথে যুক্ত পরিবার হচ্ছে আমার মায়ের পরিবার, আমার চাচীর পরিবার, আমার বড় ফুপির শ্বশুর বাড়ির পরিবার। কোন পরিবারের মানুষই অন্য পরিবারের মতো হয় না। আমাদের পরিবারের যৌথ অবস্থা ভাঙ্গার চেষ্টা খুবই সচেতন ভাবে আমার মায়ের এবং চাচির পরিবার করতে চেয়েছে, কিন্তু পারে নাই।এর কারণ ছিলো ছোট দাদুর সম্পত্তি ভাগ না পাওয়ার ভয়। আর ছোট ফুপু যা করছিলো তাতে সবার লাভই ছিলো। সবার ধারণা ছিলো ছোট ফুপু যাই করবে তা তো বাড়ির ছেলে মেয়েদের জন্যই থাকবে, তার তো ছেলে মেয়ে সংসার কিছুই নাই।
ফুপুজানের টাকায় করা বাগান আর পুকুরের মাছ চাষ থেকে বছরে যা আসে, তা দিয়ে পারিবারিক সমস্ত ব্যয় মিটিয়েও, যথেষ্ট পরিমানে টাকা জমা হতে থাকে, যা থাকতো ফুপুর একাউন্টে।এটা নিয়ে টুকটাক অনেক কথা হতো, যা আমাদের ছোট ফুপু শুনেও শুনতো না।
আমাদের ছোট ফুপু আমাদের কে এমন ভাবে তৈরি করেছে যে, এখন আমরা সবাই বিজি থাকি আমাদের কাজ নিয়ে, ছোট ফুপু আমাদের বাড়ির ভেতরে, আমাদের বাগানের মধ্যে সবার জন্য আলাদা আলাদা সীমানা ভাগ করে দিয়েছে এবং পুরাতন আম কাঠাল গাছ কেটে নতুন বাগান করার কাজ হাতে নিয়েছে, সবাই কে একই পরিমান গাছ কিনে দেওয়া হয়েছে আমরা সবাই স্কুল, কলেজ থেকে বাড়িতে ফিরে দুই তিন ঘন্টা সময় বাগানে কাটাই, সবাই পাল্লা দিয়ে বাগানের যত্ন করি, কার বাগান কত সুন্দর করতে পারি সেটা নিয়ে।
আমাদের বাড়ি একসময় খামার বাড়ি হয়ে গেলো, আমাদের বাড়িতে গরু আছে, হাস,মুরগী আছে, সবজি বাগান আছে পুকুরে মাছ আছে আমাদের বাড়িতে শুধু কাপড় বুনা হতো না।
একসময় যে জমি বিক্রি করে আমাদের প্রয়োজন মিটানো হতো, আজ সেই জমি কাজে লাগিয়ে আমরা আবার আমাদের সচ্ছলতা ফিরে পেয়েছি।
আমাদের ফুপু এদিকে আবার আইন পড়া শুরু করে, ফুপুর কথায় বাড়ির জমি জমা ধরে রাখতে হলে আইন জানা খুবই জরুরি। আসলে ফুপু এক সেকেন্ড বসে থাকতে চাইতো না, ফুপু বলতো মানুষ যতক্ষন কাজ করে ততক্ষণ তার ভেতরে কোন টেনশন বা ডিপ্রেশন কাজ করে না। চুপচাপ বসে থাকলেই মাথায় অযথা চিন্তা আসে, কি পেলাম? কি পেলাম না, সেই হিসাব করে কি হবে? কাজ করার মধ্যে অনেক আনন্দ আছে। তোমার লাগানো একটা গাছে, যখন ফল ধরবে তখন বুঝতে পারবে তুমি সফল। প্রকৃতির সাথে মিশে যাও দেখবে শান্তি পাবে। আমাদের বাসায় আধুনিক সব উপকরণ ছিলো, আমাদের সবার মোবাইল আছে, বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহার হয়, তার পরেও আমরা কখনো প্রযুক্তি নিয়ে পড়ে থাকতাম না, আমাদের বন্ধু'রা সবাই সারাদিন মোবাইলে নিয়ে পড়ে থাকে,আমাদের বন্ধু'রা আস্তে আস্তে সবাই যখন ফেসবুক আর ইউটিউব, ভিডিও গেমস নিয়ে বিজি আমরা তখন বিজি বাড়িতে জৈব সার তৈরি করা সঠিক নিয়মে কাছের, যত্ন করা নিয়ে বিজি।
আমরা প্রতি সপ্তাহে একদিন পিকনিক করতাম আর সেই পিকনিকের সব কিছু থাকতো আমাদের বাড়ির চাল, মুরগি, ডিম, সবজি আর মাছ দিয়ে পিকনিক হতো। আর পিকনিকের রান্না কিন্তু আমাদের করতে হবে, সেদিন মা, ফুপু বা কাকি কোন কাজ করবে না। ফুপুর এক কথা এখন আধুনিক যুগ, ছেলেরা রান্না না জানলে হবে?
আমাদের অবশ্য গামা আর গামার বউ সাহায্য করতো আর একটা নিয়ম ছিলো তা হলো সেদিন আমরা আমাদের বন্ধু'দের পিকনিকে নিমন্ত্রণ করতে পারতাম।
ডিসেম্বর মাসে আমাদের বড়ফুপু, ফুপা আর আমাদের কাজিনরা বেড়াতে আসলো তারা এখন ছুটি পেলেই চলে আসে, আমাদের বড় ফুপা সব সময়ই ছোট ফুপুর জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতো, প্রতিবার যে পাত্রের খোঁজ নিয়ে আসতো, সেই পাত্রই নাকি পৃথিবীর সেরা পাত্র, তার পর সবাই মিলে একদিন -দুদিন সেই বিষয় নিয়ে তুমুল আলোচনা তার পর ছোট ফুপু কঠিন কোন শর্ত দিয়ে দিবে তখন বড় ফুপা বলবে এটা কি বলো ছেলে কেন ঘরজামাই থাকবে? তখন ফুপি বলবে মেয়েরা যদি বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি যেয়ে থাকতে পারে? তা হলে আপনার মতে যে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো পাত্র, তার শ্বশুর বাড়িতে থাকতে কি সমস্যা? তারপর আর কি! বিয়ের কথা সেখানেই শেষ।
আসলে ছোট ফুপু ছিলো অনেক সাহিত্যক মনের একজন মানুষ, আর ছোট বেলা থেকে প্রচুর গল্পের বই পড়তো, ফুপুর তার জীবন নিয়ে খুব সুন্দর পরিকল্পনা ছিলো ছোট ফুপু কে আমাদের পরিবারের সবাই সব সময় অনেক বেশি আদর করতো। ফুপুর মনটা ছিলো টলটলে পুকুরে জলের মতো স্বচ্ছ। কিন্তু ফুপুর বিয়ের পরে ফুপু এত বড় আঘাত পান, আমাদের ফুপার কাছ থেকে যা তার কল্লনার বাহিরে ছিলো, ফুপু প্রথম কোন মানুষের এমন কদাকার রুপ দেখেন, তাও তার জীবন সঙ্গীর কাছ থেকে। এমন ঘটনা ঘটলে সাধারণত মেয়েরা মানিয়ে চলার চেষ্টা করে, তা না হলে নিজেকে ঘুটিয়ে ফেলে, তা না হলে বাবার বাড়িতে এসে আশ্রিতার মতো জীবন যাপন করে। আর সেখানে আমাদের ফুপু তার সমস্ত জীবনের পড়ালেখা তার পরিবারের শিক্ষা এবং ফুপুর নিজের তৈরি ব্যক্তিত্ব কাজে লাগিয়ে সে নিজেকে, সবার সেরা প্রমানিত করে।তিনি দিখিয়ে দেয় জীবন বহমান, জীবন কে নিজের মতো তৈরি করে নিতে হয়, এবং ভালো থাকতে জানতে হয়।
আমাদের ছোট ফুপুর জীবনেও আবার, একজন রাজপুত্র আসে, সেই গল্প বলেই শেষ করবো এই কাহিনি।
আমাদের বড়ফুপার মধ্যে ইদানীং আমাদের বাড়ির প্রতি বেশ আগ্রহ দেখতে পাওয়া যায়,আসলে এখন আমাদের বাড়িটা খুবই সুন্দর হয়েছে, পুকুর ঘাটগুলো সংস্কার করা হয়েছে, বাড়ি টা এখন আবার জমিদার বাড়ি বা বাগান বাড়ি বলা যায়, তবে পরাতন বাড়ি সংস্কার করা অনেক টাকার বিষয়, আর বাড়ির কিছু কিছু জায়গা একটা নাজুক হয়ে পড়েছে।
যেহেতু আমরা আমাদের পুরাতন জমিদার বাড়িতেই এখনো বাস করছি, আর আমাদের এই বাড়ি ভাঙ্গার পক্ষে কারোই মত নাই। তাই বড়ফুপা সবার সাথে আলোচনা করে ঠিক করে, তার এক বন্ধুর ছোট ভাই লন্ডনে থাকে, সে একজন ভালো স্থপতি। তিনি দেশে এসেছে বেড়াতে, তিনমাস থাকবেন, আর ওনার পুরাতন স্হাপনার প্রতি খুবই আগ্রহ। ওনাকে আমাদের বাড়ির কথা বলা হয়েছে তিনি আগ্রহ দেখিয়েছেন বাড়িটা দেখার জন্য। সবাই যদি একমত হয় বাড়িটা না হয় ব্যাংক লোন নিয়ে হলেও সংস্কার করা যাবে। এই প্রস্তাব শুনে ছোট দাদু বলেন ওনাকে আসতে বলো, আগে বাড়ি দেখুক তার পর শুনি সেকি বলে। ছেলে -মেয়ে নাতিপুতি নিয়ে সংসার, বাড়িটা এখনো কতটুকু বসবাসের উপযোগী আছে তাও তো জানা দরকার।
তার দুই দিন পরেরেই ফুপার বন্ধু'র ছোট ভাই চলে আসে আমাদের বাড়িতে। তাকে বৈঠক খানার সাথের গেস্ট রুমটা ভালো করে পরিস্কার - পরিচ্ছন্ন করে টিপটাপ করে সাজিয়ে দেওয়া হয়। আসলে আমাদের বাড়িতে অনেক দিন পর বাহিরের মেহমান আসলো।
ওনার নাম ছিলো ইমরান আমরা ওনাকে ইমরান চাচু বলে ডাকতাম।
ইমরান চাচু বাড়ি দেখা বাদ দিয়ে হাঁসের ডিম দেখা শুরু করলেন, আসলে ইমরান চাচু আমাদের বাড়ির যা দেখেন তাতেই মুগ্ধ হন। ইমরান চাচু আসার পরের দিনের কথা তিনি আমাদের পুকুরের কাছে হাঁটতে গিয়ে হাঁসের ডিম কুড়িয়ে পান, আসলে আমরা তো হাস পালি আর হাস গুলো অনেক সময়ই পুকুর পারে ডিম পারে এমনও হয় পানিতেও ডিম পারে, এটা দেখে আমরা অভ্যস্ত, আর ইমরান চাচু তিনটা হাঁসের ডিম নিয়ে বাসায় এসে গামাকে দেয়, আর বলে এই ডিম আমি কুড়িয়ে পেয়েছি , এই ডিমের মালিক এখন আমি। আমরা তখন ইমরান চাচুর ছেলেমানুষী দেখে খুবই মজা পাচ্ছিলাম।
ইমরান চাচু সব সময় ছোট ফুপুর পিছনে পিছনে ঘুরতো, আর ছোট ফুপু কে রাজকুমারী বলে ডাকতো। আমরা সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম, শুধু মনে হতো, ফুপু ইমরান চাচুকে যেকোন দিন বলে বসবে, আপনি তো কোন কাজই করছেন না, তা হলে এখানে কেন বসে আছেন? আজই ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাবেন।
আসলে ইমরান চাচু দারুণ সব গল্প বলতো, আমরা মুগ্ধ হয়ে শোনতাম।
তার পর ইমরান চাচু একসময় আসলেই বাড়ির কাজ শুরু করেন। আমাদের বাড়ির প্রতিটা কোন পর্যবেক্ষন করেন তার পর কিছু ইটের নমুনা পরীক্ষা করেন, উনি কিছু যন্ত্রপাতি আনান ঢাকা থেকে, সাথে একজন মানুষও আসে তিনি ইমরান চাচুকে তার কাজে হেল্প করেন। তার পর উনি চলে যান। এদিকে ইমরান চাচু আমাদের বাড়িতে আছেন প্রায় একুশ দিন থেকে, উনি তিনদিন থাকবে এমন কথা ছিলো। বড় ফুপা এর মধ্যে কয়েক বার কথা বলেছে, বাড়ির সবার সাথে। ইমরান চাচু থাকাতে আমাদের কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা জানার জন্য । সবাই একবাক্যে বলেছে কোন সমস্যা নাই ইমরান চাচু অনেক ভালো।
ইমরান চাচুর খাবার সব সময় ওনার ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো, একদিন উনি খাবার প্লেট নিয়ে পুকুর পাড়ে চলে যান আর বলে, একা-একা ঘরে খাওয়ার চাইতে পুকুরের মাছদের সাথে খাবার ভাগ করে খাওয়া ভালো। তারপর থেকে ওনাকে আমাদের সাথে ভেতর বাড়িতে খেতে বলা হয়েছে। আর আমাদের বাড়ির সব মহিলারা ওনাকে পছন্দ করতো।
এর মধ্যে আমাদের সাপ্তাহিক পিকনিকে ইমরান চাচু দারুণ রান্না করে সবার মন জয় করে নেয়। আমরা ছোটরাও বুঝতে পারছিলাম ইমরান চাচু সব সময় ছোট ফুপুর ভালো লাগার মতো কাজ গুলো করতে চাইতো। ইমরান চাচু আমাদের বাড়ির সব ছবি নিয়ে পড়লেন তিনি আমাদের বাড়ির ছবি গুলোকে নতুন করে বাঁধাই করা এবং কিভাবে এগুলো আবার ঠিক করা যায় তার জন্যও অনেকের সাথে যোগাযোগ করেন।
তারপর একদিন ইমরান চাচু চলে যাবে, আমরা সবাই মন খারাপ করে আছি, তখন আমার আম্মা ইমরান চাচুকে বলে, আরো কয়েক টা দিন থেকে যেতে ভাই, তুমি থাকায় বাড়ি টা কেমন হাসিখুশি ছিলো।
ইমরান চাচু তখন যা বললেন তা শুনে সবাই অবাক উনি তখন বললেন, ভাবি আমি তো আমার কিছু দরকারী কাজ আছে ঢাকাতে তা শেষ করে, আর আমার কিছু জিনিস আছে তা আনতে যাচ্ছি এই ধরেন সাত আট দিন লাগবে, বড় জোর দশদিন তার পরে তো আবার চলে আসবো এখানে। আর আমি থাকাতে তো আপনাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না, আমি এবার দেশে থাকার সময়টা এখানেই থাকবো। আর আপনাদের বাড়ির ভেতরে অনেক কাজ আছে তা করে দেবার বদলে খাওয়া থাকা ফ্রি। ইমরান চাচু সব সময়ই মজা করে কথা বলে আমরা সবাই এই কথা কে খুব সিরিয়াস হিসাবে নেই নাই।
ইমরান চাচু চলে যাবার এক সপ্তাহের মধ্যে বড়ফুপা আর ইমরান চাচুর বড় ভাই আমাদের বাড়িতে আসে। আর ছোট দাদুর কাছে ছোট ফুপুর সাথে ইমরান চাচুর বিয়ের বিষয় নিয়ে কথা বলে, আর বড় ফুপা ছোট ফুপি কে অনেক বুঝায় ইমরান চাচু কে বিয়ে করার জন্য। ছোট ফুপির এককথা, ইমরান ভালো তবে আমি এখন আমার মতো করে জীবন গুছিয়ে নিয়েছি এবং অনেক ভালো আছি, আমি নতুন করে আবার কোন ঝামেলা নিতে পারবো না।
বাড়ীর সবাই বিয়ের পক্ষে মত দিয়েছে, শুধু ছোট ফুপুর মত হলেই বিয়ে হবে, আমরা সবাই এখন সারাক্ষণ শুধু ভাবি ছোট ফুপু কেন মত দেন না, ফুপু কেন এত পাষাণ!
শেষ পর্যন্ত সবাই হার মানে ছোট ফুপুর সিদ্ধান্তের কাছে। শুধু একজন হার মানেন নাই, সে হচ্ছে আমাদের ইমরান চাচু। ইমরান চাচু লন্ডনে ফিরে যাওয়ার আগে আমাদের বাড়িতে আবার এসেছিলো এবং সাতদিন ছিলো এই সাতদিন উনি ফুপুর সাথে অনেক কথা বলে। শেষ পর্যন্ত ইমরান চাচু ফুপির শর্তে রাজি হয়। ইমরান চাচু বলে একবছর মনোযোগ দিয়ে কাজ করবো সব কিছু গুছিয়ে চলে আসবো। তারপর তোমাদের বাড়ির গুপ্তধন খোঁজার কাজ নিবো।
ফুপুর সাথে ইমরান চাচুর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, ইমরান চাচু এক বছরের মধ্যে লন্ডনের পাট চুকিয়ে দেশে চলে আসবে, তার পর ফুপুর সাথে ইমরান চাচুর বিয়ে হবে।
আমাদের ছোট ফুপু এখনো খুবই রাগী একজন মানুষ, তবে আমরা এখন ফুপি বকা দিলেই, বা কিছু হলেই বলি, ফুপি আমরা কিন্তু ইমরান চাচুর দলে চলে যাবো!তখন ফুপি হেঁসে ফেলে বলে, তার মানে ইমরানের সাথে তোমাদের জায়গা হবে বাড়ির বাহিরের কুঁড়েঘরে।
এখন আমরা সবাই খুবই খুশি, কারণ ছোট ফুপির মন সব সময়ই খুশি থাকে। ফুপির এখন অনেক সময় কাটে ইমরান চাচুর সাথে কথা বলে।
আমি এই পরিবারের সপ্তম পুরুষ আমি এখনো আশা ছাড়ি নাই গুপ্তধনের, ইমরান চাচু আমাকে বলেছে তোমাদের বাড়ির পুরাতন একটা নক্সা আমি পেয়েছি, সেই নক্সায় একটা পাতাল ঘর আছে, সেটা খুঁজে বের করতে হবে। আবার অনেক সময় এমনও হয় নক্সায় আছে কিন্তু, পরে বাদ দেওয়া হয়েছে। তখন আমি জোর দিয়ে বলি না না আমাদের বাড়িতে সুরঙ্গ আছে। ইমরান চাচু হাসে আর বলে, মানুষের বাঁচার জন্য শুধু বাস্তববাদী হলেই চলে না, তার সাথে কল্পনাও থাকতে হয় তবেই জীবন সুন্দর হয়।
https://m.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/861772211294943/

কোথায়_সেই_গয়নার_বাক্স
#কোথায়_সেই_গয়নার_বাক্স
#২য়_পর্ব
আমাদের পর দাদি আর পর দাদার মধ্যে পান্নুবাঈকে তাড়িয়ে দেওয়া নিয়ে যে মনোমালিন্য হয়েছিলো, তা আর তাদের জীবত দশায় কখনো মিটমাট হয় নাই।
আমাদের জীবনে সব চাইতে আলোচনার এবং আলোচিত গল্পের বিষয় ছিলো, আমাদের পর দাদির গল্প। মানুষ বাঁচে আশায় ,আমাদের এত বিশাল জমিদার বাড়ি অথচ আমাদের জীবন যাপন ছিলো খুবই সাধারণ, এর একটা-ই কারণ তা হলো আমাদের বংশপরম্পরায় সব পরুষ মানুষ গুলো ছিলো অকর্মা।
তারা না, জমিজমা দেখতো! না, তারা কোন ব্যবসা
বানিজ্য করতো! তারা তাদের জীবন দশায় একটা কাজই করতো, তা হলো তাদের স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার, আর বসে বসে হিসাব করা কোথায় গেলো সেই গয়নার বাক্স। আর দাদিজানের ঘরের প্রতিটা কোন, মনে হয় শতবার নাড়াচাড়া করে নাই, এমন কোন পূর্ব পুরুষ আমাদের পরিবারে নাই।
আমাদের বাড়ির পুরুষ মানুষ গুলো যেমন নরম মনের ঠিক তার বিপরীত হলো এই পরিবারের মেয়েরা।আমাদের পরিবারের সব মেয়েদের মুটামুটি ভালো পরিবারে বিয়ে হয়, তার কারণ হলো তারা সবাই কমবেশি এই পরিবারের বিষয় সম্পত্তির উত্তধিকার। এবং তাদের কে সব সময়ই তাদের ওয়ারিশ বুঝিয়ে দেওয়া হতো।এমন অনেক হয়েছে যে আমাদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির ফুপু-দাদিরা, যে সম্পত্তি পেয়েছে তা কাজে লাগিয়ে তাদের শ্বশুর বাড়ির লোকেরা আমাদের চাইতে অনেক ভালো দিন যাপন করতো।
আমাদের সম্পত্তি বিক্রি করা হতো বিভিন্ন কারণে, এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো আমাদের পড়ালেখার খরচ, আর বাড়ির মেয়েদের জাঁকজমক পূর্ণ ভাবে বিয়ে দেওয়ার ব্যয় বহনের জন্য।
আমাদের বংশের সবার মস্তিস্কের ভেতরে চীর স্হায়ী ভাবে একটা কথা গেঁথে গিয়েছিল , তা হলো আমাদের বংশে অভিশাপ আছে, সেই অভিশাপ দিয়েছে আমাদেরই পরিবারের সব চাইতে আলোচিত শক্তিমান সেই নারী, যিনি ছিলেন আমাদের পর দাদা সাফায়ত চৌধুরীর স্ত্রী, আমাদের পর দাদি। শাপ-মোচন হবে একদিন, আর তখন আমরা আমাদের দাদিজানের গয়নার বাক্স ফিরে পাবো, তার পরেই আমরা আবার ধনী হয়ে যাবো।
আমার ছোট ফুপু প্রচনড রাগী একজন মানুষ, তার বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রামের এক ধনী পরিবারে। কিন্তু ফুপুর সাথে, তার শ্বশুর বাড়ির লোকদের সাথে বনিবনা হয় নাই, এর কারণ ছিলো ফুপার চরিত্রের দোষ, উনি তার বাড়ির আশ্রিত এক বোন কে, প্রায়ই ঘরে ডেকে নিয়ে হাত পা টেপানোর মতো কাজ করাতো।এই বিষয় টা আমাদের ফুপুজান একদম পছন্দ করতো না, তার পর একবার ফুপু জান ফুপাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসেন এবং আমাদের বাড়ির কাজের লোক গামা'কে ফুপার শরীর এমন করে বানায়ে দিতে বলেন যে, এর পরে যেন শরীরে আর ব্যথা- বেদনা না থাকে।সেই বার ফুপা ফুপুকে রেখে চলে যায়, তার পর বাড়িতে গিয়েই ফুপুকে তালাকনামা পাঠিয়ে দেন। তবে এই তালাকের পেছনে আরো বড় এবং কঠিন বিষয় লুকিয়ে আছে, যা আমরা ছোটরা জানতাম না।
আমাদের ছোট ফুপুই আমাদের সবার জীবন বদলে দিতে থাকেন। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, আমাদের ফুপুর তালাকের বিষয় নিয়ে ফুপুর কোন মাথা ব্যথা ছিলো না।তিনি সব সময়ই বলতেন মেয়ে হয়েছি বলে কি পঁচে গিয়েছি নাকি? যে , একটা ইতর - চরিত্রহীন লোকের সংসার করবো? মেয়ে মানুষের বিয়ে আর সংসার করা ছাড়াও অনেক কাজ আছে। আমাদের ফুপুজান ছিলো আমাদর সবার খুবই প্রিয়, তিনি আমাদের ভেতরে একধরনের স্পিড তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি একজন মহিলা হয়ে দেখিয়ে দিয়ে ছিলেন, মানুষের অসাধ্য কিছু নাই, মানুষের কর্মই তার ভাগ্য বদলের হাতিয়ার। সে অত্যন্ত আনন্দের সাথে বাড়ির প্রতিটি বিষয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ মতামতের দেওয়া থেকে শুরু করে আমাদের সবাই কে মানুষ করার দায়িত্ব নিয়ে নিলেন।
আমার বাবারা ছিলো দুই ভাই, দুই বোন। আমাদের বড় ফুপু থাকতো ঢাকা শহরে, তার স্বামী ছিলো সরকারি আমলা, তিনি কখনো ছুটি কাটাতে আমাদের বাড়িতে আসতো, তবে খুব বেশি দিন থাকতো না। ফুপির এক ছেলে, এক মেয়ে, তারা কিন্তু সব সময়ই আমাদের বাড়িতে আসলে, আমাদের বিশাল বাড়ি নিয়ে খুবই গর্ব করতো আর বলতো, তোমাদের বাড়ির মতো যদি আমাদের একটা জমিদার বাড়ি থাকতো, তবে আমরা সেই বাড়ি অনেক সুন্দর সাজিয়ে রাখতাম।আমরা তখন বলতাম এটা তো তোমাদেরও নানার বাড়ি।
আমাদের ছোট ফুপুজান তার সকল গয়না বিক্রি করে দেন এবং সেই গয়নার টাকা দিয়ে আমাদের বাড়ির ভেতরের দুইটা পুকুর পরিস্কার করানো, পুকুরে মাছ ছাড়া থেকে শুরু করে, পুকুরের চার পাশ পরিস্কার করে সেখানে ফলের গাছ লাগানো সব কিছু করেন। ফুপুর সব কাজের শুরুতে প্রথমেই বাবারা অমত করতো এই বলে যে,
- এগুলো কে দেখবে?সব লস হবে, মাছ চুরি হবে, মাছ মরে যাবে, কে নিয়ম করে মাছের খাবার দিবে?তুমি এই ঝামেলা কেন ঘাড়ে নিচ্ছ? তোমার যদি বাসায় বসে থাকতে বিরক্ত লাগে, তবে তোমার ভাবিদের সাথে ঘরের কাজে হাত লাগাও।
এই কথা গুলো শোনার, সাথে,সাথে ছোট ফুপু বাবা'কে শুধু ঠান্ডা গলায় বলে,
-বড় ভাইজান যদি রান্না করা আর ঘর সংসার করাই আমার জীবনের এক মাত্র লক্ষ হতো, তা হলে ঐ বদমায়েশ টা সংসার করলাম না কেন?শুধু আপনাদের অতি ভালো মানুষি আর দুর্বলতার জন্য আমার জীবনে কি নরক নেমে এসেছিলো, তাকি আপনাকে আবার মনে করিয়ে দিতে হবে? ভুলে গেছেন?
-আমি কিন্তু ভুলি নাই, আমি আমার মতো করে ভালো থাকতে চাই এবং এই পরিবারের জং ধরা মানুষ গুলোর মরিচাধরা জীবন থেকে ফেরাতে না পারলেও অন্তত এই বাড়ির সপ্তম প্রজন্ম কে আমি ধারালো বানাবো।
আসলে আমাদের বাড়ির পুরুষদের কোন কাজ না করতে করতে , সব কিছুতেই তাদের ভয় ছিলো, তারা কিছু করার আগেই নানা অজুহাত দেখাতো। ফুপুজান গ্রামের একদম দিন মজুর টাইপ দুইটা পরিবার কে আমাদের বাহির বাড়িতে থাকার জন্য নিয়ে আসে, সাথে এ-ও বলে দেয় যে, কাজ ঠিক মতো না করলে বের করে দেওয়া হবে। তখন আমাদের মা-বাবারা খুবই বিরক্তি প্রকাশ করে, এদের খাওয়াতে কত খরচ পরবে তা ভেবে, বাড়িতে এমনিনেই কাজের লোক আছে গামা আর তার বউ।
কিন্তু ছোট ফুপুর কাজ নিয়ে তাকে সামনা-সামনি কেউ কিছু বলতে পারে না। এর পেছনে একটা বড় কারণ হলো ফুপুজানের সাথে আমাদের পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত ব্যাক্তির সাথে বিরাট মিল আর সেই মিল আবিষ্কার হয় যেভাবে-
- একদিন আমাদের দাদিজান তার বড় মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে কাজের লোক নিয়ে আমাদের স্টোর রুমে যান , সেখানে রাখা হতো আমাদের পরিবারের সব বাতিল হওয়া জিনিস থেকে শুরু করে, বিশাল বিশাল কাঠের বাক্সের মধ্যে তামা- কাসার ও চিনামাটির পুরাতন আমলের সব আসবাবপত্র, আর একপাশে ছিলো শতছিন্ন পারস্যের গালিচা বা কার্পেট, কিছু পেইন্টিং যার মধ্যে ছিলো আমাদের পরিবারের পূর্ব পুরুষদের কয়েকটি ছবি।এগুলোর বেশির ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে ফ্রেম নষ্ট হয়ে গেছে এই ছবি গুলো এক সময় আমাদের বৈঠক খানার দেয়ালে ঝুলানো ছিল। এখন সব স্টোর রুমের দেয়ালের কোনে রাখা আছে এবং কাপড় দিয়ে ঢাকা দেওয়া আছে।
সব সময়ই এই বাড়িতে কারো বিয়ে হলে , তখন আমাদের বংশের খানদানি কিন্তু বিষয় সচেতন ভাবে সামনে নিয়ে আসা হতো, এর মধ্যে ছিলো একটা রুপার কারুকাজ করা পানদান ও রুপার ট্রে যা শুধু মাত্র বিয়ের সময় তেতুল দিয়ে ঘষে-মেজে চকচকে করে তোলা হতো। এবং অন্যদের দেখানো হতো আমরা এখন অতিসাধারণ হলে কি হবে, একসময় আমরা ছিলাম জমিদার, আমরা সাধারণ কেউ না!
যে কথা বলছিলাম সেই দিন দাদি রুপার দুটা গ্লাস খুঁজে পাচ্ছিলেন না ,তখন উনি আরেকটা বড় সিন্ধুক খোলার চেষ্টা করেও খুলতে পারছিলেন না আর বলতেও পারছিলেন না ঐ সিন্ধুকে কি রাখা আছে, তখন আমি ছোট ফুপু এবং আব্বা মিলে সবাই চেষ্টা করতে লাগলাম সিন্ধুক টা খোলার জন্য , আসলে এত বছরের পুরাতন তালা নিয়ম করে না খুললে তাতে জং ধরে যায় তার পর অনেক বার তেল দিয়ে চেষ্টা করে সেই তালা খোলা হয়, আসলে আমরা সবাই কেন জানি স্টোর রুম খুললেই সেখানের পুরাতন জিনিস দেখতে পছন্দ করতাম, আর সব কিছুতেই গুপ্ত ধন খুঁজতাম। সেই সিন্ধুক থেকে বের হয় কিছু দলিল আর একটা মলমল কাপড়ে মোড়ানো ছবি, ছবিটা আকারে অনেক বড় না, তবে এখনো অনেক ঝকঝকে পরিষ্কার ছিলো ছবির নীচে নাম লেখা লুৎফুন নেচ্ছা। সেই ছবির লুৎফুন নেচ্ছাই হচ্ছে আমাদের পর দাদি। আর তার কপালের বা পাশে একটা তিল, আর আমাদের ছোট ফুপুর কপালের বা পাশ-ও ঠিক সে রকম একটা তিল, ছোট ফুপু দেখতে একদম পর দাদির মতো।
সেই ছবি নিয়ে কিছু দিন খুব আলোচনা হলো তার পর থেকে ছোট ফুপুর মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, তিনি কেমন জানি হয়ে গেলেন, তাকে কোথাও খুঁজে না পেলে সবাই এক সময় বুঝতে পারতো, তিনি স্টোর রুমের চাবি লুকিয়ে নিয়ে এসে, স্টোর রুমে এসে বসে থাকতো, একা-একা এবং সারাদিন পুরাতন জিনিস নাড়াচাড়া করে পার করে দিতো। সেই থেকে সবাই ছোট ফুপু কে একটু বেশিই প্রাধান্য দিত।
ছোট ফুপুর বিয়ের দিন থেকেই আসলে ছোট খাটো সমস্যার শুরু হয়েছিলো, তার শ্বশুর বাড়ির সাথে,ছোট ফুপুর বিয়ের দিন আমাদের বাড়ি থেকে দুইটা রুপার চামচ হারায়, যা বর্তমান সময়ের রূপার জিনিসের সাথে মূল্যে-মান ধরলে হবে না, সেই চামচ আনা হয়েছিলো ইংল্যান্ড থেকে যে চামচে দু'টি পাথর বসানো ছিলো। চামচ গুলো ছিলো ১৬০ বছরের পুরাতন, এর একটা এন্টিক মূল্য আছে। আর সব চাইতে বড় কথা আমাদের পরিবারের ঐতিহ্য এগুলো।
আর আমরা কোন সমস্যায় পড়লেও পরিবারের কোন ব্যবহারের জিনিস-পত্র সেল করি না, এটা আমাদের পূর্ব পুরুষ দের নিষেধ আছে।
বিয়ের আসরে বসেই বিয়ের কনে আমাদের ছোট ফুপু এমন জেদ করে বসে যে, সবাই বিব্রত হয়ে যায়।ছোট ফুপুর এক কথা, যতক্ষন না চামচ পাওয়া যায়, ততক্ষণ উনি কবুল বলবেন না। তার একটা-ই কথা ছিলো এই চামচ বিয়ে বাড়ির কেউ নিয়েছে তা এক্ষনি বের করা যাবে, এই চামুচে করে আমার দাদিজান আর দাদাজান একসাথে বসে পায়েস খেতেন। চামুচ শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু তারা অনেক আজেবাজে কথা শোনায়। আর বারবার বলতে থাকে বিয়ে বাড়িতে এমন সব সময়ই হয়, এটা কেমন ছোটলোকি দুটো রুপার চামচ কি এমন মূল্য তা নিয়ে এত নাটক করা। আমার আম্মা ছোট ফুপু কে বার বার বলছিলো এই চামচ তো বাক্সের মধ্যে পরেই থাকে সারাবছর। এটা নিয়ে এমন কেন করছো? পরে তোমার সংসারে অশান্তি হবে এই বিষয় নিয়ে।
তার পর ফুপুর ফিরানির সময় ফুপুর শ্বশুর বাড়ি থেকে বলে পাঠায় ফুপুর সাথে যেন রুপার পান দানিটা দিয়ে দেওয়া হয়, বউ তো তার বাবা-র বাড়ি থেকে দুই একটা জিনিস নিয়েই আসতে পারে। এই কথা শুনে তো সবার মাথায় হাত, কারণ এই পান দানি আসলে আমাদের পর দাদির খুবই প্রিয় ছিলো বলে আমরা বংশপরম্পরায় এই গল্প শোনে আসছি।
আমাদের ছোট ফুপুকে যথেষ্ট পরিমানে গয়না এবং পুরো বাড়ির আসবাবপত্র বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল এটা আমাদের বাড়ির চল ছিলো। তার পরেও এটা কেমন চাওয়া!আজ আমি বলবো আমাদের জীবনটাকে কি ভাবে বদলে দিলো আমাদের ছোট ফুপু। আমাদের ছোট ফুপু দেখিয়ে দিয়েছিলো একজন নারী তার যোগ্যতা দিয়ে কি ভাবে সবার শ্রদ্বা আদায় করে নিতে পারে তা।
আমাদের পরিবারটা সব সময়ই একটু জনবিচ্ছিন্ন পরিবার ছিলো, এর কারণ হলো, আমরা যেহেতু একসময় আমাদের গ্রামে শুধু, তা না, আমরা ছিলাম ঐ অঞ্চলের সব চাইতে ধনী এবং প্রভাব শালী মানুষ। আর কোন বড় পরিবার যখন তাদের প্রভাব ধরে রাখতে পারে না, তখন তারা আর সহজে কারো সাথে মিশতে পারে না, তাদের ধারণা এখন আর মানুষ তাদেরকে তাদের স্বভাবিক সন্মান টুকুও দিবে না। তাই তারা নিজেদেরকে আড়াল করে রাখে।
আর অপর পক্ষ আরেক কাঠি উপরে, তারা ইচ্ছে করেই আমাদের হেয় করতে চায়, তাদের ভাবখানা আপনি কে, যে,আপনাকে আমার সন্মান করতে হবে? কিছু নাই,, তার পরেও ভাব নেয়! আসলে আমরা কোন ভাব'ই নিতাম না, আমরা সারাজীবন যেমন ছিলাম তেমনই আছি, আমাদের পরিবারের শিক্ষা -দিক্ষা এবং আমাদের চাল - চলনের জন্য সব সময়ই আমাদের কে আলাদা করা যেতো।
আমাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সব সময়ই প্রচন্ড রকমের ভদ্র ছিলো। তারা গ্রামের মানুষের সাথে খুব একটা মিশতেন না। আসলে আমাদের পারিবারিক জমিগুলো যাদের কাছে আধিয়া দেওয়া হতো, তাদের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ গামাই করতো। আমার বাবা এবং আমাদের ছোট চাচা দুজনেই পড়ালেখা শেষ করে, কোন চাকরি বাকরি না করে বাসায় বসে আছে, তার একটাই কারণ, তারা চাকরি করলে সংসার আর তাদের জমিজমা কে দেখবে? অথচ তারা কিন্তু কখনোই কিছু দেখা শোনা করে না।আমাদের কোথায় কতটুকু জমি আছে তার বেশির ভাগ খবরই তারা জানে না। আর অনেক দিন কোন জমি কেউ ভোগ করলে এক সময় জমিটা তারা দখল করে নেয়, বা নাম মাত্র কিছু দিয়ে ভোগ করে।
আমাদের জমি আমরা সাধারণত আমাদের আদিয়াদের কাছে বিক্রি করি, সে ক্ষেত্রে তারা আমাদের কে খুবই কম দাম দেয় এবং কখনো একসাথে মূল্য পরিশোধ করে না এই বিষয়ে গ্রামের ভেতরের সবার ভালো জোট আছে। গ্রামের লোকই গ্রামের জমি কেনে। তারা আমাদের দুর্বলতা জানে, আর জমির দালাল থেকে শুরু করে সবাই গ্রামের লোক।
আমাদের ছোট ফুপু অনেক ভালো স্টুডেন্ট ছিলো, তার পরে-ও তাকে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয় নাই, কারণ তা হলে তাকে বাড়ির বাহিরে, দূরের শহরে থাকতে হবে, এটা মানা কঠিন ছিলো। আমাদের বাড়ির সবাই একটু গা ঘেঁষে থাকতে পছন্দ করে। আর একটা জিনিস তা হলো বাহিরের জগৎ এর সাথে এডজাস্ট করতে না পারা।
আমাদের বাড়ির আশপাশে কোন বাড়ি নাই এর কারণ হলো আমাদের বাড়ির আশেপাশের সমস্ত জায়গা জমি আমাদের ছিলো। আমাদের বসত বাড়ি, পুকুর আর বাড়ির ভেতরের বাগান মিলেই পঁচিশ বিঘার বেশি জমি ছিলো। আর মেন রোড থেকে আমাদের বাড়িতে এসার জন্য একটা রাস্তা আছে, সেই রাস্তা এবং রাস্তার দুইপাশের সব জমি আমাদের আর এই জমি গুলো আমাদের বাড়ির পুরাতন কাজের লোক গামা দেখাশোনা করতো। বাড়ির কাছের কোন জমি বিক্রি করা হয় নাই। আমাদের বাড়ির ভেতরে এত নিরিবিলি প্রাকৃতিক একটা পরিবেশ ছিলো যে, আমরা আসলে খুব কোলাহল পূর্ণ জায়গায় বেশি সময় থাকতে পারতাম না।
আমাদের ছোট ফুপুর ভেতরে হঠাৎ করেই অন্য রকম পরিবর্তন হয়, আমার ফুপু কে যখন ফুপা তালাকনামা পাঠায় তখন সবাই খুবই আপসেট ছিলো ফুপুর এখন কি হবে? ফুপুর জীবনটা শেষ হয়ে গেলো!আর একটা কথাও একদিন আমার আম্মা একটু খানি বলেছিলো তা হলো, বাড়ির মেয়ে তালাক হয়ে ফিরে আসলে বাড়ির বদনাম হয়, মানুষ ভাবে মেয়ের কোন সমস্যা আছে! বাড়িতে কোন কথা একবার মুখ থেকে বের হলে সেটা পরিবারের সবার কানেই আসে।
আমার ছোট ফুপুর কানেও এই কথা চলে আসে,তার পরের ঘটনায় আমরা ছোট ফুপুর তালাকের বিষয় নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারি।
https://m.facebook.com/groups/526513374820830?view=permalink&id=857562111715953
#চলবে
#লেখাঃসুরাইয়া_শারমিন।

প্রতীক্ষা
#প্রতীক্ষা
লেখায়: #সাদিক_হাসান
পর্ব: 03
অনেকে তাসীনের সাথে সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু কোন ভাবেই সফল হয়ে ওঠেনি।
কারণ সে কাউকে কিছু বলতে চায়না। তার জবাব হলো তার বই।
এইদিকে তার মা তাকে হুকুম দিয়েছে রাতকে নিয়ে বাহিরে বের হওয়ার জন্য। বিয়ের আগে নাকি দুজন দুজন কে ভালোভাবে চেনা দরকার।
তাসীনের একটুও ইচ্ছা নেই সেখানে যাওয়ার জন্য। আর রাতের সাথে তো সে যাবেই না। কিন্তু মায়ের হুকুম কোন ভাবেই ফেলে দিতে পারেনা সে।
তাই একরকম বাধ্য হয়ে বেরিয়ে পড়লো।
বিকেলে পার্কে দেখা করার কথা রাতের। তাসীন ভেবেছিল রাত শাড়ী পরে আসবে। আর রাত যেহেতু জানে তাসীনের পছন্দ নীল শাড়ি, সেই জন্য সে নীল শাড়ি পড়ে আছে এইরকম কাউকে খুঁজছিল।
হঠাৎ করে সে পেয়ে যায় নীল শাড়ি পরা একজন কে।
তাসীন নিশ্চিত হয়ে যায় সেটা রাত। তাই সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার দিকে আর তার ঘাড়ে হাত রেখে যাওয়ার জন্য বলে।
যখনই সেই মেয়েটা পিছনের দিকে ফিরে তাকায় তখন তাসীন অবাক হয়ে যায়। এর কারণ হলো সেইটা রাত ছিল না।
সেটা ছিল তার প্রতিদ্বন্দ্বী মিস রেখা খান।
আগেরবার তাসীন ভালো করে খেয়াল করে দেখলে বুঝতে পারতো রেখা খান ঠিক কতটা সুন্দরী।
হয়তো সুন্দরী বলেই তার বই আরো বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু এইসব ভাবনা তাসীনের কাছে গুরুত্বহীন।
রেখা খান পড়ে এসেছিল নীল শাড়ি। সাথে সব কিছু ম্যাচিং করে পরিধান করা।
আসমান থেকে নেমে আসা কোন পরীর থেকে কম লাগছিল না তাকে।
কিন্তু তাসীন ইতস্তত বোধ করছে কেনো জানি তার সামনে।
কেননা যার জন্য তাকে দিন রাত খেটে মাথা ঘামিয়ে বই লিখতে হচ্ছে সে এখন তার সামনেই। কী বলবে কিছু বুঝতে পারছে না।
ঠিক তখনই মুখ খোলে রেখা খান,
-"কী ব্যাপার মিস্টার আবরার তাসীন! হঠাৎ পার্কে ।নিশ্চয় ভালোবাসার মানুষের সাথে এসেছেন। আপনার বিষয় তো সেটাই। আসলেই কী এইরকম লেখার জন্য কাউকে ভালোবাসা প্রয়োজন?"
রেখা খানের কথায় অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যায় তাসীন।
তাকে এখন কিছু জবাব দিতে হবে সেটা মনে মনে রেডি করে জবাব দেয়,
-" মিস রেখা খান। সাইকো কিলার গল্প লেখার জন্য তো আর পার্কে আসার দরকার হয়না। লাশ কাটা ঘরে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাশ কাটা দেখলেই তো হয়। নাকি সেই গল্প লেখার জন্য পার্কে এসে কাউকে খুন করতে হয়! আর হরর গল্প লেখার জন্য নিশ্চয় পার্কে আসতে হয়, বাচ্চারা বিভিন্ন মুখোশ পরে সেটাই আপনার গল্পের ভূত। আপনি নিশ্চয় খুন করার জন্য শাড়ি পরে পার্কে আসেননি! আর হ্যাঁ, যদি এইসব আপনি না করে থাকেন তাহলে আমিও পার্কে সেই কারণে আসিনি। আর শুদ্ধ ভালোবাসা সেটা এক ধরণের অনুভূতি। সেটার জন্য কোন মেয়েকে ভালোবাসতে হবে তারপর পরীক্ষা করে দেখতে হবে সেইরকম কোথাও লেখা নেই।"
তাসীনের রসিকতা ভরা জবাবে ভরকে যায় রেখা খান। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়।
হঠাৎ করে পিছন থেকে কেউ একজন তাসীনের ঘাড়ে হাত রাখে।
সে পিছনে ফিরে দেখে সেটা আর কেউ নয়! রাত ছিল সেটা ।
মার্জিত পোশাকে মাথায় একটা হিজাব পরিধান করে এসেছে।
তাসীনের সব ধারণা যে এইরকম করে উল্টে যাবে সেটা সে ভাবতেও পারেনি কখনো।
কিন্তু একদিক দিয়ে রাতকে দেখে সে মনে মনে খুশি। কারণ আর যাই হোক রাত মার্জিত পোশাক পড়েছে।
তাই তার রাগ নিমেষেই গায়েব হয়ে যায়।
সেই সময় রেখা খান তাসীনের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
-"তাহলে আমার ধারণাই ঠিক ছিল!"
তাসীন আবারো একটা ভালো জবাব খুঁজে বের করে রেখা খানের দিকে ছুড়ে দেয়। সেটা ছিল,
-"যাকে দেখে আপনি এইসব বলছেন তার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আর শুধু চোখের দেখায় এতকিছু বলা মনে হয় না ঠিক। কারণ সে আমার বোন অথবা যে কোন আত্মীয় হতে পারতো। আর তাকে দেখুন। তার পোশাক দেখুন। মুখে কোন মেকআপ নেই তার। পুরো কার্যত পোশাকে ভদ্র ঘোরের একজন মেয়ে। আপনার মত সারাদিন বিউটি পার্লারে বসে থেকে হাজার হাজার টাকা খরচ করে এত সাজগজ করে পার্কে আসার কোন মানে নেই। যাই হোক, এখানে হয়তো খুন হতে চলেছে কোন সেটা আপনি দেখতে এসেছেন আমি নয়। আশা করি দেখা হবে শীঘ্রই। আপনার সেদিনের কথা গুলো ভালো লেগেছে অনেক। এবং.."
থেমে যায় তাসীন। একটু হেসে আবার আগের কথা ধরে বলে,
-"সেটা পরে না হয় অন্য একদিন বলবো। আজ আসি!"
কথাটা বলেই রাতের হাত ধরে সোজা চলে গেলো।
এতক্ষণ রাত সেখানে শুধু ছিল নীরব একজন দর্শক।
পার্কে যেতে যেতে তার দেরি হয়ে গিয়েছিলো অনেক।
যখন পার্কে যায় তখন সেখানে গিয়ে দেখে রেখা খানের সাথে দাঁড়িয়ে আছে তাসীন। তাই সেখানে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখে।
কিন্তু তাসীন যখন তার প্রশংসা করছিলো তখন রাতের মনে কতটা খুশির জোয়ার বয়ে গেছে সেটা একমাত্র সেই জানে ।
আর হাত ধরে সেখান থেকে নিয়ে আসার ব্যাপারটা সে এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না।
শপিংমলের একটা ফুড কোর্টে বসে আছে রাত এবং তাসীন।
তাসীনের মনোযোগ তার হাতে থাকা কফি শেষ করার দিকে আর রাতের নজর তাসীনের দিকে।
-"হঠাৎ করে এইরকম পোশাক পড়ে আসার কারণ?"
তাসীনের এইরকম আচমকা প্রশ্নে চমকে ওঠে রাত।
কিন্তু তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-"আমি একজন মুসলমান ঘরের মেয়ে। আমি এইসব কিছু তেমন মানি না। কিন্তু আমার কর্তব্য হলো বাহিরে গেলে পর্দা করা তাই আমি করি। এটাতে আমার ভালো লাগা আছে। মডার্ন ড্রেস আমার পছন্দ নয় সেটা না। কিন্তু আমি কেনো জেনে শুনে আমার কর্তব্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিব। তাই বাড়ির ভিতরে নিজের ইচ্ছা মতো চলি এবং বাহিরে আসলে নিজের কর্তব্য পালন করি। এতে তো আমার কোন ক্ষতি নেই!"
সবটা শুনে তাসীন শুধু মাথা কাত করে বললো,
-"হুম বুঝলাম। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি? তোমার অনেক বন্ধুরা তো আছে যারা তোমার এইরকম পোশাকে নানা রকম কথা শোনায়। তখন তোমার কী মনে হয়?"
-"হাহা! আমার অনেক বন্ধু আছে যারা আল্ট্রা মডার্ন। তারা মনে করে তারা নিজেদের ইচ্ছা মতো চলবে সব জায়গায়। এইটা তাদের অধিকার। আসলেই সেটা তাদের অধিকার। আমি তাতে বাধা দেওয়ার কে। কিন্তু পোশাকটা যে নিজের পরিচয় বহন করে সেটা তারা বোঝে না। তাদের যতো বুঝান তারা ঠিক তার উল্টো বুঝে থাকবে। তাই আমাকে কেউ কিছু বলতে আসলে সহজ একটা জবাব দেই আমি। জবাব বললে ভুল হবে। একটা সহজ প্রশ্ন করি তাদের। সেটা হলো,
আমার কর্তব্য আমি করছি। আমার লজ্জা আছে তাই আমি বাহিরের কাউকে নিজের শরীর দেখাতে চাই না। তোমাদের কী লজ্জা আছে?" বলে উঠলো রাত।
তখন তাসীন বললো,
-"ছেলেদেরও তো নিজেদের দৃষ্টি সংযত করা উচিত তাই নয় কী!"
-"এই কথাটাই কেউ কেউ বলে। অবশ্যই ছেলেদের নিজের চোখের দৃষ্টি সংযত রাখা উচিত। সেটা তাদের কর্তব্য। তাই বলে কী আমি আমার কর্তব্য ছেড়ে দিব?" জবাব দিলো রাত।
তাসীন আর কোন প্রশ্ন করলো না। কারণ তার যা জানার সে জেনে নিয়েছে। আজ অনেক বড় একটা শিক্ষা রাত তাকে দিলো। এতদিন গল্প লিখেছে এই জিনিসটা কখনো সে ধরতে পারেনি। মানুষের নিজের প্রতি একটা বিশ্বাস আছে। কারো বিশ্বাস তার ভালো করে আবার কারো বিশ্বাস তাদের খারাপ। এই ভালো খারাপের মধ্যেই জন্ম নেয় ভালোবাসা নামক বস্তুটা। মানুষ যখন তার প্রতিদিনের কাজ কর্ম গুলো বিশ্বাসের সাথে করে তখন সেই কাজের প্রতি একটা ভালোবাসা এসে যায়। আর তখনই সেই মানুষটা একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিনত হয়।
এটার একটা খারাপ দিক আছে সেটা হলো, অনেকে খারাপ কাজ করে গভীর বিশ্বাসের সাথে। সেটা যখন সে করতেই থাকে তখন সেটাকে ভালোবাসা নয়। সেটাকে নেশা বলে। যেমন সিগারেট। সেটা মানুষের ভালোবাসা নয়। সেটা হলো এক ধরণের নেশা।
অনেকে বলে থাকে ভালোবাসাও এক ধরণের নেশা। কিন্তু ভালোবাসা মোটেও কোন নেশা নয়। সেটা হলো পবিত্র বিশ্বাস।
বিশ্বাসের কোন ভালো জিনিসের প্রতি মনোযোগ দেওয়াই হলো ভালোবাসা। এখানে শুধু একজন ছেলে মেয়ের মধ্যে ভালোবাসার কথা বলা হয়নি। পৃথিবীর প্রতিটা জিনিস একে অপরের প্রতি ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে।
হঠাৎ করে তাসীনের মনে রাতের বলা সেই কথাটা পড়ে গেলো।
তার লেখায় কিছু জিনিসের কমতি আছে। তাসীন সেই কথাটার অর্থ ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে।
মনে মনে একটা মুচকি হাসি দিয়ে রেখা খান কে কল্পনা করলো। একটা উচিত জবাব তার জন্য অপেক্ষা করছে সেটা তাসীন খুব ভালো করেই জানে।
শপিংমল থেকে কিছু কেনাকাটা করে রাতকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তাসীন সোজা চলে গেলো তার বাড়িতে এবং কী বোর্ডের খটখট আওয়াজ তুলে সৃষ্টি করতে লাগলো নতুন কিছু অধ্যায়ের।
তাসীনদের যাওয়ার পথে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রেখা খান।
তার হাতে একটা বিশাল ব্যাগ ছিল। সন্ধ্যা হতে শুরু করে দিলো। পার্ক থেকে মানুষ জন ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগলো।
ঠিক সেই সময় পার্কে প্রবেশ করতে শুরু করে দিলো বেশ কিছু বাচ্চা কাচ্চা। তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো লেখিকার দিকে।
এসেই ঘিরে ধরলো তাকে।
রেখা খান তার ব্যাগ থেকে বেশ কিছু প্যাকেট বের করে সবার হাতে একটা করে ধরিয়ে দিলো।
সেগুলো পেয়ে সেই শিশু গুলোর চোখে যে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠলো সেটা বর্ননা করার মতো নয়।
এরপর প্রত্যেকের হাতে একটা করে চকলেট ধরিয়ে দিয়ে একটা বেঞ্চে বসে তাদের খাওয়া দেখতে লাগলো যুবতী লেখিকা।
ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরি বের করে সেখানে বসেই লিখতে শুরু করে দিলো,
-"প্রত্যেকটা শিশু হলো নরম মাটি। নরম থাকতেই তাদের যে আকৃতি দেওয়া হবে সেটাই হবে তাদের ভবিষ্যতের কাজের ক্ষেত্র।। ঠিক এইরকম করেই একটা বাচ্চা বড় হয়েছে কপালে গরিবের লেখা নিয়ে। সমাজের নিষ্ঠুরতা তাকে শিখিয়ে দিয়েছে অনেক কিছু। আজ সে অনেক বড় একজন লোক। সব ধরণের মানুষের সাথে তার ওঠা বসা।
ঠিক সেই সময় হঠাৎ করে শহরে শুরু হয়ে যায় এক নির্মম খুনের খেলা। খুন হতে থাকে সমাজের মুখোশধারী কিছু মানুষ। যাদের মুখোশ খুললে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে বিষাক্ত সাপ। তাদের সেই মুখোশ খুলে সেই সাপের মাথা কেটে তারপর শান্তি পাচ্ছে খুনি।"
এইটুকু লেখার পরেই হাসি ফুটে ওঠে লেখিকার মুখে। সেও তার গল্পের জন্য পেয়ে গেছে একটা অস্ত্র। শিশুদের মুখের সেই হাসির সামনে যে কোন ভালোবাসা গলে যেতে বাধ্য সেটা সে খুব ভালো করেই জানে। আবরার তাসীনকে সে একটা ভয়ানক জবাব দিবে সেটা ভেবেই আনন্দ পায় যুবতী লেখিকা রেখা খান।
চলবে.......
আগের পর্বের লিঙ্ক
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/847424829396348/

একটু ভয়ের রহস্য মানবি -৩
একটু ভয়ের
রহস্য মানবি -৩
কানিজ ফাতেমা
রাহাত ঘরে গিয়ে নীসাকে ঘর থেকে জোরে জোরে নীসা নীসা বলে ডাকতে লাগল। আর তার গলার আওয়াজ শুনে নীসা তাড়াতাড়ি ঘরে চলে আসলো।
ঘরে আসতেই রাহাত খুব বিরক্তি নিয়ে বলল, কি নীসা তুমি এই বুড়া মানুষটাকে নিয়ে কি শুরু করেছ? একা ছিলে তখনও তোমার ভয় করছিল এখন কত খুঁজে একটা মানুষ পাওয়া গেছে তাকে নিয়েও তোমার ভয় করছে কেন?
নীসা দরজার কাছে দাঁড়িয়েই ভয়ে কাপঁতে কাঁপতে বলল, রাহাত আমি বাড়ি যাবো- আমার এখানে ভালো লাগছে না।
এবার রাহাত একটু নরম হয়ে বলল, আচ্ছা এস তো, এখানে এসে বস- বলে উঠে এসে নীসার হাত ধরে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে নিজেও তার পাশে বসল। এমন করছ কেন নীসা এখন বাড়ি যাবে কেন?
আমার তো আর দুই সপ্তাহ পরেই দেড় মাসের ট্রেনিং পড়েছে ঢাকায়, তখন তো আমরা এক সাথেই যাবে। আর তুমি না থাকলে আমার একা বাসায় ভালো লাগবে বলো?
আচ্ছা তুমি এমন করছ কেন নীসা- তোমার কি আমার সাথে থাকতে ভালো লাগছে না?
নীসা কোন কথা না বলে কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে বলল তুমি এই মহিনী বুড়িকে বাড়ি পাঠিয়ে দাও, আমার আর ভয় করছে বলব না।
আচ্ছা ঠিক আছে পাঠিয়ে দেব, এই তো মাত্র পনের দিন তারপর আমারা ঢাকায় যাওয়ার সময় তাকে বলে কয়ে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেব। বুড়া মানুষ হুট করে চলে যেতে বললে কি মনে করবে বলো তো?
আর তুমি এত বেশি চিন্তা ভাবনা করো না তো,সে জন্য হয়তো তোমার কাছে সবকিছু ওলট পালট লাগছে।
নীসা কাঁদতে কাঁদতে রাহাতকে আবার জেদ করে বলল, না তুমি আজই তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিবে না হলে আমিই কাল ঢাকা চলে যাব।
রাহাত অনেক বুঝিয়েও তাকে শান্ত করতে পারল না। এদিকে রাতের খাবার সময় কোন ভাবেই নীসা খাবার টেবিলের কাছে গেল না তাই রাহাত ঘরেই তার জন্য প্লেটে করে খাবার নিয়ে আসলো কিন্তু তার কিছু খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কেমন যেন দুর্বল লাগছে শরীরটা, তবুও জেদ করে বলতে লাগল কাল সকালেই মহিনী বুড়িকে বাড়ি পাঠিয়ে দিবে।
রাহাত শেষমেশ তার কাছে নতী স্বীকার করতে বাধ্য হল । ঠিক আছে সকালেই পিয়ন হাবিবুল্লাহকে দিয়ে মহিনী বুড়িকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিব এবার একটু খেয়ে নেও।
না আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না- বলে শুয়ে পড়ল না খেয়েই।
রাহাত প্লেট গ্লাস ডাইনিং টেবিলে রাখতে ঘরের বাইরে এসে মহিনী বুড়িকে রান্না ঘরে সবকিছু গুছাতে দেখে ডেকে বলল, মহিনী বুড়ি তুমি না হয় কাল সকালে বাড়ি যাওয়। কিছুদিন বাড়ি থেকে ঘুরে আসো।
আর তোমার বুবুর শরীরও খারাপ তাই ভাবছি কদিন পরে ঢাকাতে নিয়ে যাব। আর তাছাড়া আমার ট্রেনিং শুরু হবে, আমাকেও যেতে হবে তাই কাল সকালে হাবিবুল্লাহর সাথে তোমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেব।
রাহাতের এক সাথে কথাগুলো বলতে দেখে মহিনী বুড়ির মুখটা কেবল ম্লান হয়ে গেল। ভাই, বুবু আমাক দেখি ভয় পাচ্ছে তাই তুমি আমাক চলি যাতে কচ্ছাও। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি কিচ্ছু করি নি।
না না তেমন কিছু না, আমার ট্রেনিং আর তুমি একা এ বাসায় কি করে থাকবে- বলে রাহাত ঘুমাতে চলে গেল।
পরদিন শনিবার তাই রাহাতের অফিস ছুটি তেমন তাড়াহুড়ো নেই বাইরে যাবার। ঘুম থেকে উঠেই নীসার দিকে তাকাল সে, মেয়েটা এত ভয় পাচ্ছে কেন?
সারা রাত ঘুম আসেনি আবার রাহাত কেও ঘুমাতে দেয়নি। ভোর বেলা একটু ঘুমিয়েছে তাই রাহাত তাকে না ডেকে ঘর থেকে বাইরে এসে মহিনী বুড়িকে নাস্তা বানাতে দেখল। মহিনী বুড়ি আসার পর থেকে বাসার সব কাজ সে ই করে, বয়স বেশী হলেও এখনও বেশ শক্ত সামর্থ্য। তার কাজ করা দেখলে বোঝার উপায় নেই সে একজন বৃদ্ধা।
তাকে দরজা খুলে বের হতে দেখে মহিনী বুড়ি বলল, ভাই উঠিচাও নাস্তা সব টেবিলে দিয়ে রাখিছি খায়ে নেও আর বুবুর কি হয়ছে- খাবি না? কাল রাতেও তো খাইলো না ওরম করছে ক্যে?
কিছু হয়নি এমনিতেই ঘুমাচ্ছে।
দেখ ভাই একটা কথা কই কিছু মনে কইরি না, তোমার বৌয়ের মাথা টাথাা খারাপ নাকি- একবার ডাক্তার দেখা নিয়ে আইসো না হলে ওরম করে ক্যা সারাদিন? আমারই তো বুবুর পাগলামি দেখি কেমমা কেমমা যেন ঠেকে।
কি সব বল, মাথা খারাপ হতে যাবে কেন?
ভাই তুমি ভালো কথায় কইচাও বুবুকও না হয় বাপের বাড়ি পাঠায় দেও, কিছুদিন থাকি চিকিৎসা হয়ে আসুক।
রাহাত যত সম্ভব চুপচাপ খাচ্ছিল আর মহিনী বুড়ির কথা শুনছিল। হঠাৎ তার মনে হল হাবিবুল্লাকে রাতে ফোন করা হয়নি, এখন ফোন করে আসতে বলি। সে এসে মহিনী বুড়িকে সাথে করে নিয়ে যশোরে তার বাড়িতে রেখে আসুক।
হুম সেই ভালো- খেতে খেতে কথাগুলো ভেবে চেয়ার থেকে উঠে বেসিনে গিয়ে হাতটা ধুতে ধুতে মহিনী বুড়িকে বলল, তোমার সব গুছানো হয়েছে? একটু পরই আমার অফিসের পিওন হাবিবুল্লাহ আসবে তোমাকে নিতে।
আমার আর গুছানোর কি আছে ভাই? দুই খান শাড়ি শুধু আর বুবু আসার পর তার কয়খান কাপড় দিছিলো আমার মিয়াডার জন্যি এই। আমি সারা দিনের রান্না সব করি রাখি দিছি তোমার আজ আর রান্না নিয়ে ভাবা লাগবিনানে।
তার সাথে কথা বলেই রাহাত হাবিবুল্লাকে ফোন করে সব কথা বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় আসতে বলল, তারপর ঘরে গিয়ে নীসার পাশে বসে তার মাথায় হাতবুলিয়ে দিয়ে নীসা বলে ডাকল।
নীসা রাহাতের কথা শুনেই ঘুম থেকে এক লাফে উঠে বসল। কি হয়েছে?
না কিছু হয়নি উঠো খাবে না?
না আমার খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
কি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না- কাল রাতেও খাওনি শরীর খারাপ করবে, উঠো তো- বলে নীসার হাতটা ধরে টেনে ধরল। নীসার মাথাটা একেবারে ধরে আছে তবুও রাহাত হাত ধরে টানছে বিধায় সে উঠে ডাইনিং টেবিলে এসে বসল।
মহিনী বুড়ি রান্না ঘরে গোছগাছ করছে দেখে নীসার মুহুর্তেই বুকের মধ্যে ধপাস্ করে উঠল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে চুপচাপ টেবিলে বসে নাস্তা করার চেষ্টা করতে লাগল কিন্তু গলাটা একেবারে শুকনা মনে হচ্ছে, তাই বারবার পানি খেতে লাগল।
রাহাত পাশের চেয়ারে বসে অসহায়ের মত বলল, এমন করছো কেন নীসা? আমাকে তো কাল থেকে অফিসে যেতে হবে তুমি এমন করলে আমার অফিসে গেলেও টেনশন হবে।
নীসা এবার চমকে উঠার মত করে বলল- তোমাকে কি আজ অফিসে যেতে হবে? আমি একা একা বাসায় থাকব?
আজ তো শনিবার ছুটি তোমার মন কোথায় থাকছে বলো তো?
না তুমি আর অফিসে যাবে না বাসায় থাকবে।
কি পাগলের মত কথা বলছ?
আচ্ছা রাহাত আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি।
না তুমি একেবারে সুস্থ, আচ্ছা এক কাজ করি বিকালে আমি তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। কি যাবে?
জানি না।
মার সাথে কথা বলবে?
না।
আচ্ছা আমার মা কে ফোন দেই- বলে রাহাত তার মাকে কল করল।
কেমন আছো মা। হ্যাঁ আমরা ভালো তারপর রাহাত তার মাকে আসতে বলে বলল, এই যে নীসার সাথে একটু কথা বলো তো- ওর কি রকম যেন লাগছে বলছে।
আস্ সালামুআলাইকুম মা। কেমন আছেন?
আমরা তো ভালো আছি মা, রাহাত বলল তোমার নাকি শরীর খারাপ লাগছে।
না মা ঠিক আছি আপনারা কবে আসবেন?
তোমরা তো শুনলাম ঢাকায় যাচ্ছ তাই এখন এসে আর কি করবো?
আর তোমরা ঢাকায় গেলে মহিনী বুড়িকে কি করবা?
আমি জানি না মা আপনার ছেলের সাথে কথা বলেন।
রাহাত ফোনটা ধরে তার মায়ের সাথে কথা বলে বলল, মা এক কাজ কর তুমি আব্বার সাথে কালই কয়েকদিনের জন্য বাগেরহাট চলে এসো। আর আজ হাবিবুল্লাহর সাথে মহিনীবুড়িও বাড়ি চলে যাবে। তাই তুমি আর আব্বা কদিন থেকে যাও। নীসার একটু কেমন ভয় ভয় করছে, আর কান্নাকাটি করছে- এদিকে আমারও অফিস, খুব ঝামেলা হচ্ছে।
বিয়াই বেয়াইনকে বলেছিস নীসার কথা।
না মা এখনও বলিনি, ভাবছি ট্রেনিংএ যখন যাবো তখন না হয় ও বাবার বাড়ি থেকে বেড়াই আসবে।
কি কাল আসতে পারবা?
আজ বললি কালই কি করে আসি দেখি। আর এক কাজ করতো বাবা- কোন এক দোয়া কালাম জানা কাউকে যদি ওখানে পাস তো নীসাকে একটু ফুঁ দেওয়াই নিস তো।
আমি ওসব পারবো না। তুমি আব্বাকে বলে আব্বার সাথে কালই বাগেরহাট চলে এসো।
সকালের নাস্তার ঘন্টা খানেক বাদে হাবিবুল্লাহ বাসায় আসলো, মহিনী বুড়িও তৈরী নীসা ঝিম ধরে বসার ঘরে সোফায় রাহাতের পাশে বসে রয়েছে। হাবিবুল্লাহ নীসাকে দেখে সালাম দিয়ে বলল, স্যার ম্যাডামের কি শরীর খারাপ?
একটু খারাপ, তুমি মহিনী বুড়িকে ঠিকমত যশোরে তার মেয়ের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ফিরতি বাসে ফিরে আসবে।
মহিনীবুড়িও তৈরী হয়ে আসলো, রাহাত আর নীসার সামনে দাঁড়িয়ে খুব অসহায়ভাবে বলল, ভাই বুবু তোমরা আমার কোন কথায় কিছু মনে কইরি না। আমি গরিব মানুষ অত বুঝি টুঝি না, কি কতি কি কইছি।
আর ভাই তুমি বুবুক ডাক্তর দেখায়ো।
আচ্ছা তুমি একটু দাঁড়াও আমি আসছি বলে রাহাত ঘর থেকে মানিব্যাগ আনতে গেল আর হাবিবুল্লাহ দরজার বাইরে বেড়িয়ে গেল।
এমন সময় মহিনী বুড়ি নীসার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন হেসে উঠল তারপর চোখ লাল করে বলে উঠল- এই বুড়িকে বিদায় করলেই কি আমি এখান থেকে যাব ভেবেছিস! এই বাড়ি এই ঘর আমার, আমি কত বছর ধরে এখানে আছি।
তোরা কেন আমার বাড়িতে এসেছিস, আমার বাড়ি থেকে তুই আমাকে তাড়াতে চাস?
আমি মায়া বুঝলি আমি মায়া আমি এখানেই থাকবো এখানেই থাকবো - বলে চোখ লাল করে নীসার দিকে তাকিয়ে হলুদ উচুনিচু দাঁতগুলো বের করে হাসতে লাগল।
মহিনী বুড়ির চোখের দিকে তাকিয়ে নীসার মনে হচ্ছে চোখদুটি বোধ হয় এক্ষুনি বেড়িয়ে আসবে।
নীসা সোফায় বসে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নির্বাক হয়ে মহিনী বুড়ির দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
এই বাড়ি মায়ার, বুঝলি মায়ার, কথাগুলো বলতে বলতেই মহিনী বুড়ি মেঝেতে ধপ্ করে বসে পড়ল।
মহিনী বুড়িকে পড়ে যেতে দেখে হাবিবুল্লাহ বাইরের সিঁড়ি থেকে দৌড়ে এসে বলল, কি কি ঠিক আছেন তো?
না ভাই কিছু হয়নি কো, ঠিক আছি। কেমমা জানি লাগলো মনে হইল হঠাৎ মাথাডা ঘুরি গেল। একটু অস্বাভাবিক ভাবেই কথাগুলো বললো সে।
এদিকে নীসাকে কাঁপতে দেখে হাবিবুল্লাহ একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করল, ম্যাডামের শরীর কি বেশী খারাপ?
এর মধ্যে রাহাত এসে টাকা বের করে হাবিবুল্লাহর হাতে ধরিয়ে দিল আর কিছু টাকা মহিনী বুড়ির হাতে দিয়ে বলল- সাবধানে যাও।
হাবিবুল্লাহ বলে উঠল, স্যার ম্যাডাম ঠিক আছে তো? আমার তো কেমন জানি একটু অন্য রকম লাগতেছে। আপনারা আবার এই বাসায় থাকেন? কেমন যেন সন্দেহ নিয়ে হাবিবুল্লাহ কথাটা বললো।
হুম ঠিক আছে চিন্তা করোনা।
আচ্ছা স্যার তাহলে এখন রওনা দেই , আসসালামুআলাই কুম বলে হাবিবুল্লাহ মহিনী বুড়িকে সাথে করে বেরিয়ে চলে গেল। রাহাত নীসাকে বলল, কি এবার ঠিক আছে তোমার ভয় কমেছে
নীসা কাঁপছে কোন উত্তর দিচ্ছে না। শুধু ভাবছে মহিনী বুড়ি এ কথা বলল কেন- সে অনেক বছর এ বাসায় আছে এ বাড়ি তার?
এটাতো সরকারি কোয়াটার আর মায়া কে? এই নামতো সে এখানে আসার পর কোনদিন শোনেনি। সে হুট করে রাহাতকে কাঁপা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞাসা করলো-মায়া কে?
চলবে------
-----কানিজ ফাতেমা-----
(কাল্পনিক ঘটনা ও চরিত্র অবলম্বনে গল্পটি লেখা।)
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/858210854984412/
পর্ব ১ ও ২ এর লিংক।
আমি_রোদেলা
#আমি_রোদেলা
#পর্ব_২৩
- আমার ভালো করতে গিয়ে নিজেদের সম্পর্কটা কে কেন নষ্ট করে ফেললে । আমাকে নিয়েই যখন সমস্যা হচ্ছিল আমাকে কেন দূরে সরিয়ে দিলে না । আমি তো তখন বেশ বড়ই ছিলাম ।
- তোমাকে ছাড়া যে তোমার মা একা হয়ে যেতো । সব দোষ আমার , আমি সবার সুখ না দেখে শুধুমাত্র নিজের সুখ বেছে নিয়েছিলাম । ভেবেছিলাম আমি বুঝি এবার সুখী হবো । কিন্তু .....
- কিন্তু কি আব্বু ?
- আমি তোমাদের হারিয়ে ফেলেছি , বলতে পারো আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি । এখন মনে হয় সেই এক রুমের বাসায় সুখ ছিল , সুখ ছিল ওই
দারিদ্রতায় । কারণ ওখানে একে অন্যের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিলো ।
- কেন ? তুমি কি এখন সুখে নেই ?
- মারে সুখ এমন একটা জিনিস যা একবার চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না ।
- কেন আন্টি আর তোমার ছেলে নিয়ে কি তুমি সুখী নও । তুমি তো তোমার নিজের সন্তান চেয়েছিলে এবং তা পেয়েছো ও । তাহলে ?
- তোমাকে আর তোমার মাকে তো হারিয়ে ফেলেছি ।
আমি কি বলবো ভেবে পেলাম না চুপ করে রইলাম । মিষ্টি এসে বললো ,
- আফা সব গুছাইয়া দিছি , আফনে আইয়া টিফিন বক্সে ঢুকাইয়া লন ।
মিষ্টির পিছুপিছু রান্না ঘরে গিয়ে খাবারগুলো বক্সে ঢুকিয়ে নিলাম ।
- মিষ্টি তুই খেয়ে নিয়ে অন্তুদের বাসায় চলে যাস । আর শোন যাবার সময় দরজা ঠিক মত লক হয়েছে কি না ভালো করে দেখি নিস ।
- ঠিক আছে আফা ।
- আমি তোকে গিয়ে ফোন দেব । আর শোন ওখান থেকে আবার কোথাও যাসনা । মনে থাকবে তো ।
- জী ,আফা ।
সব গুছিয়ে আমি আব্বুর সাথে বেরিয়ে এলাম বাসা থেকে । গাড়িতে উঠে বসতেই আব্বু জানতে চাইলেন ,
- তোমার কি জেনো প্রশ্ন ছিলো ? জিগ্যেস করলে না তো ?
- আজ না , অন্য কোন দিন জিগ্যেস করবো ।
- ঠিক আছে । তোমার মায়ের সাথে যাই হয়েছে তাতে তোমার কোন দোষ ছিলো না । ওটা আমাদের নিজেদের বোঝাপড়ার অভাবেই হয়েছে । তুমি কিন্তু তখন ও আমার মেয়ে ছিলে এখনো আমার মেয়েই আছো । এই কথাটা সব সময় মনে রাখবে ।
আমি কিছু বললাম না , গাড়ির জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে লাগলাম । হাসপাতালে পৌছেনর পর শুনি আম্মুকে কেবিনে সিফট করা হয়েছে । আমার মেঝ মামা ঢাকা থেকে এসেছেন আর বড় মামা রাতে এসে পৌঁছাবেন । কেবিনে ঢুকে জিনিস পত্র খালামনি কে বুঝিয়ে দিলাম । আব্বু কেবিনের বাহিরে দাঁড়িয়ে রইলেন । আমি আব্বুকে ভেতরে আসতে বলতেই বললেন ।
- আমি এখানেই থাকি , তোমার আম্মু হয়তো আমাকে দেখে উত্তেজিত হয়ে যেতে পারেন । ডাক্তার ওকে উত্তেজিত হতে নিষেধ করেছে ।
আমি ভেতরে ঢুকে আম্মুর পাশে বসলাম ।
- কিরে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলি ?
- হুম । এখন কেমন লাগছে ?
- ভালো , খেয়েছিস কিছু ?
- হুম , আব্বু এসেছে বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে ।
- ভেতরে আসতে বল ।
আমি উঠে গিয়ে আব্বুকে ডেকে দিলাম । আব্বু ভেতরে ঢুকতেই আমি আর খালামনি বেরিয়ে এলাম রুম থেকে । বাহিরে করিডোরে দুজন বসলাম ।
- তোর বাবা তোর সাথে বাসায় গিয়েছিলো ?
- হুম ।
- তুই কি তোর বাবার সাথেই এসেছিস ?
- হ্যা , কেন জানতে চাইছো ?
- না , এমনি । তোর বড় মামা এসে তোর মাকে নিয়ে যাবে ।
- জানি ।
- তুই কিভাবে জানিস ?
- মামা না এলেও আম্মু এমনিতে ও যেতো । আম্মুর ভিসা হয়ে গেছে ।
- কই তুই তো আমাকে আগে বলিস নি ।
- কেন তুমি জানতে না । আম্মু আমার বিয়ের জন্য কেন তাড়াহুড়ো করছিলেন তুমি জানো না ?
- রাজিয়া তো আমাকে এমন কিছুই বলে নি ।
- আম্মুর ইচ্ছে ছিলো আমার বিয়ে হয়ে গেলে উনি নিশ্চিন্তে বাকি সময়টা নানুমনির কাছে কাটিয়ে
দিবেন ।
- হটাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন নিলো রাজিয়া ।
- না নিয়ে কি করবে , একে তো নানুমনি অসুস্থ । আর আমার বিয়ে হয়ে গেলে তো আর আমি আম্মুর সাথে থাকবো না । আম্মু তখন একা হয়ে যাবেন ।
- কিন্তু .....
- কিন্তুর কিছু নেই । বিয়ে হয়নি তো কি হয়েছে । আমি তো আর ছোট নই । একটা চাকরি জুটিয়ে নিতে পারলে আমার দিব্বি চলে যাবে ।
- তুই তোর মায়ের সাথে যাবি না ।
- না ।
- তোর মা তোকে ছাড়া যাবে ।
- বিয়ে হলে তো রেখে যেতো তাই না ।
- তখন ব্যাপারটা অন্য ছিলো ।
- বাদ দাও , ডাক্তার কি বললো ?
- অনেক গুলো টেস্ট দিয়েছেন । তোর মামা ডাক্তারের সাথে কথা বলতে গেছে । এলে জানা যাবে ।
মামা এসে জানালেন আপাতত সব ঠিক আছে । বাকি টেস্ট গুলোর রিপোর্ট আসলে জানা যাবে কি হয়েছে ।
মামা আমাকে একপাশে নিয়ে গিয়ে জানতে চাইলেন ।
- কি হয়েছিলো রে বুবুর ।
- আমি ঠিক জানি না , খালামনি বলতে পারবে । আমি যখন রুমে গিয়েছি তখন আম্মুর জ্ঞান ছিলো না ।
- কোন কিছু নিয়ে কি দুশ্চিন্তা করছিলো ? দুলাভাইয়ের ব্যাপারে কিছু না তো ?
- আমার মনে হয় না । ডিভোর্সের পর তো আব্বুর সাথে আজই আম্মুর প্রথম দেখা হলো ।
- দুলাভাই এসেছিলো ?
- হ্যা , গতকাল সন্ধ্যা থেকেই তো এখানে আছেন ।
- তোর বাবা মানুষটাকে আমি এখনো বুঝতে পারলাম না । এই লোক তোর মাকে এতো ভালোবাসে তারপরও কেমনে সে এই কাজ করলো বুঝি না ।
আমি কিছু বললাম না চুপ করে রইলাম ।
- তুই কি জানিস দাদা এসে বুবুকে নিয়ে যাবে ?
- হুম ।
- আমার একটা কাজ আছে আমি একটু যাবো সন্ধ্যায় চলে আসব । আর তোর মার জন্য চিন্তা করার কিছু নাই সব ঠিক হয়ে যাবে ।
আমি আর মামা দুজন কেবিনের বাহিরে বসে কথা বলছিলাম । মামা গেলেন আম্মু কে বলে আসতে । আমি বাহিরে বসে রইলাম । ভাবতে লাগলাম আম্মু চলে যাবার পর কি হবে ? আমার চাকরিতে ইন্টারভিউর আর মাত্র তিনদিন বাকি আছে । আম্মুকে এখন ও বলা হয়নি , ইশ যদি চাকরিটা হয়ে যেতো তাহলে খুব ভালো হতো । কিন্তু আম্মু কি আমাকে এত দূরে গিয়ে পরীক্ষা দিতে দিবে ? তাও আবার গ্রামের একটি বেসরকারি স্কুলে জন্য । আমি আম্মুকে কি ভাবে বলবো ভাবতে লাগলাম ।
বিকেলে অনেক আত্মীয় স্বজন , আম্মুর অফিসের লোকজন এলেন আম্মুকে দেখতে । তাদের বেশির ভাগকেই আমি চিনি না । মজার ব্যাপার হলো তারাদের প্রায় সকলেই আমাকে চেনেন । সবার মুখে একই কথা মেয়েতো বড় হয়ে গেছে । ওর বিয়ে কবে খাওয়াবে । আমার মনে হলো ওরা আম্মুকে দেখতে না আমার বিয়ে নিয়েই আলোচনা করতে এসেছে ।
সন্ধ্যার পর আমি মাগরিবের নামাজ মাত্র শেষ করে উঠেছি ঠিক ওই সময় এলো , সাফিন ভাইয়া আর আয়াত । আয়াত কে দেখে তো আমার রাগে গা জ্বলে যেতে লাগলো । এসেই জিগ্যেস করলো ।
- আন্টি কেমন আছেন , শরীরে এখন কি অবস্থা ?
কথাটা শুনে আমার কি হলো জানি না । আমি আয়াতের হাত ধরে বললাম ,
- আমার সাথে আসুন ,আমার কথা আছে আপনার সাথে ।
খালামনি পেছন থেকে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন , তার আগেই আমি আয়াত কে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম । সন্ধ্যার সময় হাসপাতালের রোগীর আত্মীয় স্বজনের বসার জায়গাটিতে মানুষজন কম থাকে । আমি আয়াতকে ওখানে নিয়ে গেলাম । রাগের সাথেই জানতে চাইলাম ।
- আপনি এখানে কেন এসেছেন ?
- আন্টিকে দেখতে ।
- আপনার কি লজ্জা বোধ বলতে কিছু নেই ?
- কেন বলতো ?
- এতো কিছুর পর কোন মুখে এখানে এলেন ?
- যা হয়েছে তার জন্য আমি সত্যি লজ্জিত ।
- লজ্জিত খুব সহজেই বলে ফেললেন , আমার আম্মুর যদি কিছু হতো আমি কি করতাম আমি নিজে ও জানি না ।
- তুমি শুধু শুধু আমার উপর রাগ করছো ।
- শুধু শুধু ! আমি কি একবারও বলেছি আমি আপনাকে পছন্দ করি ?
- বলো নি , কিন্তু আমার সাথে বিয়েতে তো তোমার অমত ছিলো না ।
- আপনাকে সেটা কে বললো ?
- তাহলে তুমি তোমার মায়ের সাথে বিয়েতে এসেছিল কেন ?
- কেন ? আমি কি আমার কাজিনের বিয়েতে যেতে পারি না ।
- সেখানে আমাদের বিয়ের উদ্দেশ্যে ই দেখা হওয়ার কথা ছিলো ।
- সেটা পরে সিদ্ধান্ত হয়েছে আগে বিয়েতে যাওয়ার কথা ছিলো ।
- আমার অপরাধ টা কি বলতে পার ?
- আপনি আপনার আম্মুকে কি বলেছে ?
- যা সত্য তাই বলেছি , আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবো না ।
- আপনি আমার পরিচয় জানেন ?
- আমার জানার দরকার নেই ।
- কেন দরকার নেই ? সেটার জন্যই তো আপনার আম্মা আম্মুকে যা ইচ্ছে তাই বলেছে ।
- সেটা উনাদের দুই বোনের ব্যাপার ।
- আপনার কাছে ব্যাপারটা খুব সহজ মনে হচ্ছে ? আমার আম্মু মরতে বসেছিলেন বুঝতে পারছেন আপনি ?
- বললাম তো আমি সরি ।
- শুনুন আজকের পর থেকে আমাদের সাথে আর কোন যোগাযোগ করবেন না ।
- আমার দ্বারা সম্ভব নয় ।
- মানে কি ? আপনার দ্বারা সম্ভব নয় ।
- আমি সত্যি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি ।
- এত কিছুর পরও আপনি বলছেন , আপনি আমাকে ভালোবাসেন ।
- হ্যা , বলছি ।
- আমাকে ভালোবাসার অধিকার আপনার নাই । আপনার মায়ের ভাষায় আমি হলাম গিয়ে জারজ সন্তান । যাদের সমাজে কোন জায়গা নেই ।
- আমি তো তোমাকে সেটা ভাবি না , তুমি রাজিয়া আন্টির মেয়ে, তুমি রোদেলা সেটাই তোমার পরিচয় ।
- দয়া দেখাচ্ছেন ?
- না , দয়া দেখতে যাবো কেন ? আমি তোমাকে ভালোবাসি , আর ভালোবাসায় দয়া হয়না ।
- কিন্তু আমি তো আপনাকে ঘৃণা করি , আপনাকে দেখলেই মনে হচ্ছে আপনার জন্য আমি একটু হলে আম্মুকে হারাতে বসেছিলাম ।
- ব্যাপারটা এতো দূর যাবে আমি ভাবি নি । আমার আম্মুর একমাত্র সন্তান হওয়ায় আমার বিয়ে নিয়ে তার স্বপ্ন অনেক । উনি আমার জন্য সবেচেয়ে ভালো মেয়ে খুঁজতে চেয়েছেন ।
- ভালো কথা ,আমাকে তার পছন্দ হয়নি বলে দিলেই পারতেন । আমার আম্মুকে অপমান করার তো দরকার ছিলো না ।
- এক্ষেত্রে দোষ কিছুটা আমার ছিলো , আমি আম্মুর নিষেধ মানি নি । কারণ প্রথম দেখায় আমি তোমার প্রেমে পরে গিয়েছি । আমি সত্যি তোমাকে বিয়ে করতে চাই ।
- আগে হলে অন্য কথা ছিলো এখন তো অসম্ভব ।
- কেন ? আমি যদি আন্টিকে রাজি করাই ।
- আমি কখনো আমার আম্মুর অবাধ্য হয়নি । কিন্তু আপনার ব্যাপারে এবার হবো । কারণ আপনাকে দেখলেই আমার দুটো কথা মাথায় আসবে এক আপনার জন্য আমার আম্মু মরতে বসেছিলেন আর দুই আমি জারজ সন্তান ।
- রোদেলা তুমি আমার আম্মুর সাজা আমাকে দিতে পারো না ।
- আমার কিছুই করার নেই । দয়া করে আর কোন দিন আপনি আমার সামনে আসবেন না । আমি আপনাকে দেখতে চাই না ।
- রোদেলা ।
- প্লিজ ,আমি হাত জোর করছি আপনার কাছে ।
আয়াত আর কিছু না বলেই চলে গেলো , আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না । আমি কোন রকম হেঁটে গিয়ে একটি চেয়ারে বসে পরলাম । আমার অনেক ক্লান্ত লাগছে , গলা শুকিয়ে আসছে পানি খেতে পারলে ভালো হতো । আমি সামনের চেয়ারে হাত রেখে হাতের উপর মাথা রাখলাম । আমার উঠে যেতে ইচ্ছে করছে না । কেউ একজন আমার পাশে বসে পানির বোতল আগেই দিলেন । আমি বোতলটির ঢাকনা খুলে এক ঢোকে অনেক খানি পানি খেয়ে নিলাম ।
চলবে ........
✍️রেহানা হক রেনু
গত পর্বের লিংক -২২
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/861082861363878/

চারুলতা শেষ পর্ব
চারুলতা
শেষ পর্ব
তরু কিছু না বলে কেবল মুখ ঘুরিয়ে নেয় অন্যদিকে। ও কেন কাঁদছে নিজেও জানে না। চারু চিঠিটা সাবধানে ভাঁজ করে খামে ঢুকিয়ে রেখে দেয়। তারপরে চোখ মুছে বিছা্না থেকে নেমে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে। দায়িত্বের কাছে অনুভূতিরা রোজই হার মানে।
চারু ড্রয়িং রুমে রাজীবের পাশে এসে বসে। "আবার স্লিপ প্যারালাইসিস?"
"হুমম।"
"পানি খাবে?"
"না।"
চারু আর কিছু বললো না, শুধু চুপচাপ রাজীবের হাতটা ধরে বসে রইলো। রাজীব দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে উঠে বসলো বিছানায়। "অফিসের কাজ নিয়ে খুব টেনশন হচ্ছে। সন্ধ্যের দিকে রওনা দিই আমরা?"
"আচ্ছা, তাহলে ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি নাশতা দিতে বলি। আর সব গুছিয়ে নিই।"
চারু উঠে গেলো রাজীবের হাত ছেড়ে। এতোক্ষণ ও রাজীবের হাত ধরে বসে ছিলো, রাজীব খেয়ালও করে নি হয়তো। "চারু?"
"হ্যাঁ বলো?"
"তুমি কি থাকতে চাও? তাহলে তুমি আর তৃণা কদিন থেকে যাও। আমাকে ফোন দিলে আমি পরে এসে তোমাদের নিয়ে যাব।"
"না থাক, তোমার অফিস ফেলে আবার আসতে হবে আমাদের জন্য। আমরাও আজই চলে যাবো।"
"কোনো সমস্যা হবে না আমার। তুমি চাও কিনা বলো জাস্ট। আমি বাকি সব সামলে নেবো।"
চারু ভীষণ অবাক হলো। রাজীবের এই স্বভাবের সাথে পরিচিত নয়। গত সাড়ে চার বছরে রাজীব কখনো চারুর জন্য আলাদা করে ভেবেছে বলে চারুর মনে পড়ে না। হুট করে মানুষটা এমন বদলে গেলো কেন?
"তুমি ঠিক আছো রাজীব?"
"হ্যাঁ একদম। সামান্য মাথাব্যাথা করছে। সেটা বাদে সবই ঠিক আছে।"
"না মানে তুমি কখনো আমার জন্য এভাবে কেয়ার করো নি, তাই অবাক হচ্ছি।"
"কেয়ার না করাটাই মেনে নিয়েছো এখন আমার স্বভাব হিসেবে?"
চারু কিছু না বলে ড্রয়িং রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
রাজীব একা একা বসে রইলো কিছুক্ষণ। চারুর বলা শেষ কথাটা মাথায় পেন্ডুলামের মতো ঝুলে আছে। "না মানে তুমি কখনো আমার জন্য এভাবে কেয়ার করো নি, তাই অবাক হচ্ছি।" কথাটা অবাক করে দেয়ার মতো একটা সত্যি কথা। রাজীব সবসময় নিজেকে একজন দায়িত্ববান স্বামী হিসেবে বিশ্বাস করে এসেছে। কিন্তু কিছু জিনিস দায়িত্বের আওতায় পড়ে না। এই যে চারু এসে ওর হাত ধরে বসে ছিলো, এটা কি চারুর দায়িত্ব ছিলো? ও যদি দায়িত্বের বাইরে গিয়েও রাজীবের জন্য কেয়ার করতে পারে, রাজীবও কি নিজের জায়গায় সেই কাজটা করতে পারে না চারুর জন্য? রাজীব বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
চারু রুমে এসে ব্যাগ গোছানো শুরু করলো। দুইদিন থাকার জন্য কাপড়চোপড় নিয়ে এলেও কিছুই বের করতে হয়নি বলা যায়। তৃণার কাপড় বের করতে হয়েছে কিছু। সেগুলিই গুছিয়ে নিচ্ছে চারু। এর মাঝেই খালেদা এসে ঢুকলেন। "আজই চলে যাবি তাহলে?"
"হ্যাঁ মা। রাজীব অবশ্য বলেছিলো আমাকে আর তৃণাকে থেকে যেতে। ও পরে এসে নিয়ে যাবে আমাদের। আমিই না করেছি।"
"তাহলে আমি নাশতা দিই তোদের। তাও আজ থেকে যেতে পারতিস।"
বিছানা থেকে তরু বলে উঠে বললো, "থাক মা, জোর কোরো না। এখন তো ও শুধু এইবাড়ির মেয়ে না, আরেক বাড়ির বউ। ওর দায়িত্ব আছে কিছু।" খালেদা কিছু না বলে বের হয়ে গেলেন। চারু বিছানার কোনায় এসে বসলো। "কথাগুলি কি তুই অভিমান করে বলেছিস?"
"অভিমানের কি আছে চারু? এটা তো সত্যি। বিয়ের পর সব মেয়েই বদলে যায়। ওখানে তুই ভালো নেই, তবু তুই দায়িত্বের খাতিরে নিজের ভালো থাকাটা বিসর্জন দিয়ে দিবি।"
"তোর বিয়ে হলে তুই কি একই কাজ করবি না?"
"জানি না রে। আমার এখন ভীষণ ভয় হয়। যদি বিয়ের পর আমার জীবনটাও তোর মতোই হয়ে যায়?"
"হবে না, দেখে নিস। তুই আমার চেয়ে সুন্দর জীবন পাবি।"
"কিন্তু আমি যার সাথে জীবন কাটাতে চেয়েছিলাম..."
"তরু, আমরা যেমন জীবন চাই, তেমন জীবন পাই না। এটাই জীবনের অমোঘ সত্য। তুই জানতে চেয়েছিলি, আমি কিসের সাথে মানিয়ে নিয়েছি। আমি এই সত্যের সাথে মানিয়ে নিয়েছি। বিশ্বাস করে নিয়েছি, আমার ভাগ্যটা এমনই। সেটা মেনেই বেঁচে আছি, আর প্রতীক্ষা করছি, একদিন হয়তো সব বদলে যাবে। অরণ্য অসাধারণ একটা মানুষ। হয়তো তুই আমি ওর জন্য খুব সাধারণ, তাই আল্লাহ আমাদের কারো ভাগ্যেই ওর নাম লেখেন নি।"
আকাশে সাঁঝের রং ছেয়েছে। রাজীবের অফিসের গাড়িটা দাঁড় করানো আছে বিল্ডিং থেকে একটু সামনে। বিল্ডিং এর নিচে দাঁড়িয়ে আছে চারু, তরু, খালেদা আর রায়হান সাহেব।
তৃণা ঘুমিয়ে পড়েছে, রাজীব ওকে নিয়ে গাড়ির ব্যাকসিটে শুইয়ে দিলো। রায়হান সাহেব সেদিকে তাকিয়ে চারুকে বললেন, "তুই শিওর তুই রাজীবের সাথে ফিরে যাবি?"
"হ্যাঁ বাবা। ওর সাথেই তো আমার সংসার, ওর বাড়িই এখন আমার বাড়ি। এই বাড়ি এখন আর আমার নেই।"
চারু নিচু হয়ে বাবার পা স্পর্শ করলো। তারপর মায়ের পা ধরে সালাম করলো। খালেদা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। "আমাকে ক্ষমা করে দিস মা।"
"মা হয়ে মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইছো?"
"আমি যদি তোর বাবাকে জোর না করতাম, আজ হয়তো তোকে এভাবে বিদায় দিতে হতো না।"
"এর চেয়ে খারাপও হতে পারতো। যা পেয়েছি তাই নিয়ে ভালো থাকতে চেষ্টা করছি, তোমার মতো। তুমি বাবার আর নিজের যত্ন নিও মা। আর তরু, তুই দেখবি মা কোনো অনিয়ম করে কিনা। তুই ইন চার্জ।"
"আচ্ছা? আর আমার খেয়াল কে রাখবে?"
"পাত্র দেখি?"
"না না দরকার নেই। আমি খেয়াল রাখবো সবার। কোনো সমস্যা নেই।"
খালেদা আর চারু দুজনই হেসে ফেললো তরুর কথায়।
রায়হান সাহেব রাজীবের দিকে এগিয়ে গেলেন। রাজীব তৃণাকে গাড়িতে রেখে রায়হান সাহেবের পা ধরে সালাম করলো। রায়হান সাহেব তার কাঁপা কাঁপা দুই হাত দিয়ে রাজীবের হাতটা চেপে ধরলেন। "বাবা রাজীব, আমার কোনো ছেলে নেই। মেয়ে দুটোকে বড় আদরে বড় করেছি। কখনো একটুখানি বিপদ কিংবা কষ্টের আঁচ লাগতে দিই নি ওদের গায়ে। কিন্তু চারু এখন আমার মেয়ে না শুধু, ও তোমার স্ত্রী। ওকে তুমি কষ্ট দিও না। বাবা হয়ের মেয়ের কষ্টটা দেখতে পারি না। তোমারও তো মেয়ে আছে, তারও একদিন বিয়ে দেবে। নিজের মেয়েকে যেমন দেখতে চাও, আমার মেয়েটাকেও সেভাবে রাখার চেষ্টা কোরো একটু।"
"এভাবে বলবেন না আব্বা। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো চারুকে ভালো রাখার। আপনাকে কথা দিয়ে যাচ্ছি আমি। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।
চারু, এসো।"
চারু গাড়িতে উঠে বসতেই ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলো। রাজীব গাড়ির বাইরে থেকে বললো, "আরও ভেতরে গিয়ে বসো চারু। আমি বসবো এইপাশে।"
"তুমি না সামনে বসবে?"
"আমি তোমার পাশে বসবো।"
চারু কথা না বাড়িয়ে রাজীবকে বসার জায়গা করে দিলো পেছনের সিটে। গাড়ি চলতে শুরু করলো। রায়হান সাহেব , খালেদা, তরু গাড়িটার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন, গলির মুখে সেটা অদৃশ্য না হয়ে যাওয়া অবধি।
তরু বাসায় ঢুকে গোসল করলো আরেকবার। আজকের দিনটা এতো ঝামেলার যাবে ধারণায় ছিলো না। ফিজিক্যালি আর মেন্টালি পুরোপুরি বিধ্বস্ত তরু। গোসল সেরে বেরিয়ে চুল মুছছিলো, হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দটা কানে আসে। টেবিলে রাখা ফোনটার দিকে এগিয়ে যায় ও। অরণ্যর হাস্যোজ্জ্বল ছবিটা ফুটে আছে কলিং স্ক্রিনে। ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ও। রিং হতে হতে কেটে যায় কলটা। তরু ভাবতে থাকে। আবার কল আসে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কলটা রিসিভ করে ও।
"হ্যালো।"
#
সূর্য ডুবে গেছে, আকাশে একটুখানি লাল রং রয়ে গেছে এখনো। চারু সেই রঙের দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে রইলো। চোখে পানি জমে যাচ্ছে হঠাৎ, গলা ধরে আসছে।। "মন খারাপ?" চারু মুখে কোনো উত্তর দিলো না রাজীবের প্রশ্নে। শুধু উপরে নিচে মাথা নাড়লো। রাজীব খানিক দ্বিধা নিয়ে আলতো করে নিজের হাতটা রাখলো চারুর কোলে রাখা হাতের উপর। চারু একটু কেঁপে উঠলো। চোখের পানি আর চোখে জমে থাকতে চাইলো না। চারু জীবনে প্রথমবার রাজীবের কাঁধে মাথা রাখলো। এতোক্ষণ এক প্রচন্ড অনিশ্চয়তায় বসে ছিলো। ভয় হচ্ছিলো, এই বুঝি রাজীব আবার আগের মানুষ হয়ে যাবে, এমন কিছু বলে বসবে যা চারুর সহ্য হবে না। কিন্তু রাজীব কিছুই বললো না, বরং চারুর মাথা রাখার জন্য কাঁধ পেতে দিলো। চারুর মনে হলো, আজ সে সব পেয়েছে। জীবনের হারানোর তালিকাটা এই হঠাৎ বদলে যাওয়া রাজীবের ভালোবাসার কাছে হার মেনে গেছে।
কে যেন বলেছিলো,
"জীবন যেখানে থেমে যায়, স্বপ্ন সেখানে শুরু হয়।
স্বপ্ন যেখানে থেমে যায়, জীবন সেখানে শুরু হয়।"
(যবনিকা)
- সাজ্জাদুল আরেফিন
ষষ্ঠ পর্বঃ facebook.com/groups/bdofficials/permalink/862917207847110/

আমি_রোদেলা
#আমি_রোদেলা
#পর্ব_২১
পরের দিন খালামনি আমি কলেজ থেকে ফেরার সময় গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন । আমি রিকশা থেকে নামার পর ছেলেটিকে ডাকলেন , ছেলেটি প্রথমে আসতে চাইলে না , যখন খালামনি বললেন আমি তোমাকে কিছু করবো না । আমি শুধু তোমার সাথে কথা বলতে চাই । তখন ছেলেটি খালামনির সামনে এসে সালাম দিলো । আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খালামনি বাসায় চলে যেতে বললেন । খালামনি ছেলেটিকে কি বলে ছিল জানি না । সেদিনের পর আর কখনই ছেলেটিকে দেখিনি ।
ওই ঘটনার পর থেকে সব সময় ছেলেদের থেকে দ্রুত বজায় রেখেই চলেছি । কিন্তু তুহিন সাহেবের মধ্যে এমন কিছু একটা ছিলো যা আমি এড়িয়ে যেতে পারি নি । উনার সাথে কাটানো সময়গুলোকে খুব মিস করতে লাগলাম । খুব ইচ্ছে করে ফোন করে কথা বলি , কিন্তু খালামনির কথা মনে হলেই চুপ করে যাই ।
তুহিন ভেবে পেলোনা রোদেলার কি হয়েছে ? মেসেজের উত্তর ও দিচ্ছে না , বেশ কয়দিন অপেক্ষা করার পর রোদেলার মোবাইলে কল দিলো । না কল ও যাচ্ছে না । মেয়েটি কি আবার ও কোন বিপদে পরলো না তো ? তুহিন ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা বোধ করতে লাগলো । মাকে জিগ্যেস করেছিলো রোদেলার সাথে কথা হয়েছে কি না । মা জানিয়েছেন অনেক দিন কথা হয় নি । মাকে দিয়ে ফোন করিয়েছিল তুহিনের , ওর ফোন না ধরলে ও আম্মুর ফোন ঠিকই ধরেছিল । তুহিন মায়ের কাছ জানতে চাইলো রোদেলা কেমন আছে ? মা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিলেন ভাল । বেশি কিছু জানতে সাহস পায়নি তুহিন , যদি আম্মু কিছু সন্দেহ করে বসে । আর যদি জানতে চায় তুহিন কেন রোদেলার ব্যাপারে এতো আগ্রহ দেখাচ্ছে ? তখন ও মাকে কি জবাব দেবে ।
তুহিন কিছুতেই বুঝতে পারছে না রোদেলা যদি ঠিকই থাকে , তাহলে ওর সাথে কিছু না বলেই কেন যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো । মেয়েটার প্রতি একটা ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল এই অল্প সময়ে , আর কিছু বলে উঠার আগেই রোদেলা এভাবে সম্পর্কটা শেষ করে দিলো ? এই ব্যাপারটা তুহিনকে খুব কষ্ট দিচ্ছিল । এখন কি করা দরকার ভেবে পেলোনা না তুহিন । একবার ভাবলো রোদেলার মুখোমুখি হয়ে জিগ্যেস করবে ও এমন করলো কেন ? কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো ওর নিশ্চয় কোন সমস্যা হয়েছে । কিছুটা সময় দেয়া উচিত ওকে আর নিজেকে বুঝার জন্য ও কিছুটা সময় চাই । রোদেলাকে কি সত্যিই সে ভালোবাসে ? নাকি নীলার চলে যাবার পর ওর মাঝে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা পূরণ আর জন্যই কি সে রোদেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে । তুহিন দ্বিধায় পরে গেল । ঠিক করলো ব্যাপারটা সময়ের উপর ছেড়ে দেয়াই ভালো । সময় বলে দিবে সেটা মোহ ছিলো না ভালোবাসা ছিল । যদি ভালোবাসা হয় ও নিজে গিয়ে রোদেলাকে বলবে , রোদেলা আমি তোমাকে ভালোবাসি ।
আজ দুপুরে আমার ইন্টারভিউ এর জন্য মেসেজ এসেছে চাঁদপুরের একটি বেসরকারি স্কুল থেকে । মেসেজটা পেয়ে এতো খুশি হোলাম যে আম্মু আর খালামণিকে বলার জন্য অস্থির হয়ে গেলাম । ঠিক করলাম আম্মু অফিস থেকে আসলে দুজনকে একসাথে বলবো । মিষ্টিকে আমার রুমে আসতে দেখে জানতে চাইলাম ।
- মিষ্টি খালামনি কি করে ?
- খালাম্মা আইছে , বড় খালাম্মারে খালাম্মার রুমে ঢুকতে দেইখা আইলাম ।
- আম্মু এসেছে ?
- হ , খালাম্মা আইছে মনে হয় মেজাজ খারাপ ।
- তুই কি করে বুঝলি আম্মুর মেজাজ খারাপ ?
- আইয়াই বড় খালাম্মারে কইলো বুবু রুমে এসো তোমার সাথে কথা আছে । আর খালাম্মা মুখ আন্ধার কইরা রাখছে ।
- আচ্ছা হয়েছে তুই এখন তোর কাজ কর গিয়ে ।
রাজিয়াকে এই অসময়ে আসতে দেখে মিনু বেগম খুব অবাক হলেন । বোনকে জিগ্যেস করলেন,
- রাজিয়া কি হয়েছে ?
-বুবু তুমি একটু রুমে এসো আমার ভালো লাগছে না , রোদেলা কই ?
- একটু আগে খেয়ে ওর রুমে গেলো ,কেন ডাকবো ও কে ?
- না ।
রাজিয়ার রুমে ঢুকেই মিনু জানতে চাইলেন ,
-কি হয়েছে শরীর খারাপ লাগছে ?
- হুম , তুমি একটু আমার পাশে বসো ।
- তুই এমন করছিস কেন ? বাহিরের কাপড় আগে পাল্টে নিয়ে ফ্রেস হ , দেখবি ভালো লাগছে ।
- কাপড় পরে পাল্টানো যাবে , তুমি আমার কথা
শুনো ।
- আচ্ছা বল কি বলবি ?
- বুবু তোমারও কি মনে হয় আমি রোদেলার মা হয়ে উঠতে পারি নি ?
- কি হয়েছে তোর ? এতো বছর পর এই প্রশ্ন করছিস কেন ?
- যা জিগ্যেস করেছি আজ তুমি তার সত্যি উত্তর
দিবে ।
-তোকে আমি মিথ্যা বলতে যাবো কেন ?
- হ্যা আমি সব সময় ওর ব্যাপারে কঠোর ছিলাম , আমি চাইনি আমার মেয়ে , আমি জীবনে যে ভুল গুলো করেছি সে সেই গুলো করুক ।
- সেটা কোন মা ই চাইবে না তার মেয়ে ভুল করে কষ্ট করুক ।
- তুমি জানো আমি মা বাবার কথা নাশুনে রফিক কে নিজের পছন্দে বিয়ে করে ছিলাম । প্রতিটা মেয়ের ই স্বপ্ন থাকে স্বামীর সাথে সুখে , নিশ্চিনতে সংসার করার । অথচ ওকে যখন বিয়ে করি দুজনে কাছে ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা এই টাকায় মধ্যে মাথা গুজার ঠাঁই আর সংসার চালানো যে কতটা কঠিন ছিল সেটা আমি জানি । এমন ও দিন গেছে আধা কেজি চাল ছাড়া ঘরে কিছু ছিলো না নুন আর কাঁচা মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে অফিস করতে হয়েছে । আজ আমি ঐ দিনের জন্য অভিযোগ করছি না , আমার কাছে তখন রফিকের ভালোবাসাই সব কিছু ছিল । কিন্তু এমন কষ্টকর দিন জেনো আমার মেয়ের দেখতে না হয় আমি সে চেষ্টা সব সময় করেছি ।
- সেটা তো আমি জানি , আজ কেন তুই পুরনো কথা নিয়ে বসেছিস ।
- আমি যখনই মেয়েটার উপর রাগ করেছি সেদিন আমার কোন কিছুই ভালো লাগতো না । নিজে নিজে কষ্ট পেতাম কিন্তু ওকে সেটা বুঝতে দেয়নি । ওকে আঘাত করে আমি নিজে কেঁদে বুক বসিয়েছি সেটা আমি জানি । ও একটু আঘাত পেলে আমার মনে হতো সেটা আমার নিজের গায়ে লেগেছে ।
- মা তো এমনই হয় ।
- আমি আমার মেয়েটাকে সব আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছি , কেউ জেনো ওকে বলতে না পারে যে ও আমাদের পালিত মেয়ে । তুমি জানো আমি ওর মেঝ ফুপুর সাথে আজ ও কথা বলি না । কারণ রোদেলার যখন তিন বছর , ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে রফিক কে ওর বোন বলেছিলো , পালিত মেয়ের জন্য এত টাকাপয়সা খরচ করার কি দরকার ? শুধু শুধু পয়সা নষ্ট যেদিন জানতে পারবে দেখবি ঠিকই তোদের ছেড়ে চলে যাবে , পর কোন দিনই আপন হয়না । নিজের রক্ত নিজেরই থাকে । কথাটা শুনে আমার খুব রাগ হয়েছিলো সেদিনের পর থেকে আমি ওকে সবার কাছ থেকে আলাদা রেখেছি । কথাটা শুনে আমি যে কষ্টটা পেয়েছি আমার মেয়ে জেনো সে কষ্ট না পায় ।
- কিন্তু তুই আজ এগুলো বলছিস কেন ? সেগুলোতে অতীত হয়ে গিয়েছে রোদেলা বড় হয়েছে । আর ও তো জানে সব , ও তো তোকে ছেড়ে যায় নি । তাহলে ...
- আমি মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে আমার দায়িত্ব পালন করতে চাই , সেটা কি আমার অন্যায় বুবু ?
- অন্যায় হতে যাবে কেন ? সব বাবা মায়ের ই স্বপ্ন মেয়েকে ভালো পাত্রের হাতে তুলে দেয়া ।
- এলিনা আর আকরাম ভাই যখন অফিসে রিয়ার বিয়ের দাওয়াত দিতে এলো ,তখন কথায় কথায় রোদেলার কথা উঠলো । আকরাম ভাই জানতে চাইলো ওর বিয়ের কথা কি ভাবছি । বললাম মেয়ে বড় হয়েছে বিয়ে তো দিতেই হবে , তোমাদের কাছে ভালো পাত্র থাকলে বলো । এলিনা নিজ থেকেই বললো যে ওর ছেলের জন্য মেয়ে খুঁজছে । ঘরেই যখন মেয়ে রয়েছে বাহিরে কেন আর খুঁজতে যাবো । আকরাম ভাই বললো তাহলে তো ভালো কথা বিয়েতেই সবাই যখন আসবে , ছেলে মেয়ের দেখা করুক । ওদের যদি পছন্দ হয় তাহলে না হয় কথা আগানো যাবে । আমি ও ওদের কথায় রাজি হয়ে গেলাম ।
- তো এখন কি হয়েছে ? আয়াতের কি রোদেলাকে পছন্দ করে নি ?
- আজ এলিনা ফোন দিয়েছিলো , ফোনদিয়ে বলে আমি নাকি ওর সাথে প্রতারণা করেছি । আজকাল নাকি কেউই ডিভোর্সি বাপ মার মেয়েকে ঘরের বউ করতে চায় না তার পর ও সে রাজি হয়েছিল রোদেলাকে ছেলের বউ বানাতে । কিন্তু আমি কেন ওকে বললাম না , যে রোদেলা আমার মেয়ে না । যে মেয়ের বাপ মায়ের ঠিক নেই তাকে কিছুতেই সে ছেলের বউ করবে না ।
- না করলে নেই আমাদের মেয়ে তো আর ভেসে যাচ্ছে না ।
- বুবু ওখানে থেমে গেলো ও আমার কষ্ট লাগতো না । ও কি বলেছে জানো । কথাটা বলেই রাজিয়া সুলতানা কান্না করে দিলেন ।
- যা বলার তো বলেই দিয়েছে আর কি বাকি আছে বলার । তুই কান্না করছিস কেন আর ওর কথা শুনতে গেলি কেন ?
- ও বলেছে আমি নাকি আমার মেয়েকে ওর ছেলের পিছু লাগিয়েছি । ওর ছেলে নাকি বলেছে রোদেলাকে ছাড়া ও কাউকে বিয়ে করবে না । আমার মেয়ে নাকি ওর ছেলের মাথা নষ্ট করে দিয়েছে ।
- আমাদের মেয়ে ওর ছেলের কাছে বিয়েই দিবো না । ব্যাস সব চুকে গেল , তুই কেন ওদের কথা শুনে কান্না করে নিজের শরীর খারাপ করছিস । এবার তুই শান্ত হ রোদেলা তোর সন্তান ,তুই ওর মা এটাই সত্য ,আর এটাই রোদেলার একমাত্র পরিচয় ।
- তাহলে ও কেন বললো আমার মেয়ের কোন জন্ম পরিচয় নেই ? আমার মেয়ে নাকি জারজ সন্তান ।
কথা গুলো বলতে বলতেই রাজিয়া সুলতানা জ্ঞান হারালেন ।
- রোদেলা , রোদেলা এদিক আয় তোর আম্মু কেমন জেনো করছে । মিনু বেগম চিৎকার করে রোদেলাকে ডাকতে লাগলেন ।
মিষ্টি চলে যাবার পর আমি রুম থেকে বেরিয়ে এলাম আম্মুকে বলার জন্য যে আমাকে চাকরির জন্য পরীক্ষা দিতে ডেকেছে । আম্মুর রুমের দরজার সামনে আসতেই শুনতে পেলাম আম্মু খালামনির সাথে আমাকে নিয়ে কথা বলছেন । দরজায় দাঁড়িয়ে এভাবে বড়দের কথা শোনা ঠিক হচ্ছে না কিন্তু আমি কিছুতেই ওখান থেকে সরে আসতে পারছিলাম না । আম্মু আর খালামনির সব কথা আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলাম আম্মুর জন্য খুব কষ্ট হতে লাগলো । আমি কান্না আটকে রাখতে পারছি না । আমার ভেতর জমে থাকা অনেক প্রশ্নের জবাব আজ জানতে পারলাম ।এখানে না দাঁড়ালে হয়তো ওগুলো অজানাই থেকে যেতো । আমার আয়াতের উপর খুব রাগ হতে লাগলো , আমার মনে হচ্ছিলো ছুটে গিয়ে এলিনা আন্টিকে বলি । তোমাকে কে অধিকার দিয়েছে আমার মাকে এভাবে অপমান করার । রাজিয়া সুলতানা ই আমার মা , আমার আর কোন পরিচয়ের দরকার নেই ।
খালামনির চিৎকারে আমি দরজা ঠেলে রুমে
ঢুকলাম । আম্মু খাটে কাত হয়ে শুয়ে আছে । আম্মুকে ওই অবস্থায় দেখে আমি কি করবো ভেবে পেলাম না । আমি আম্মুকে জড়িয়ে ধরে খালামনির কাছে জানতে চাইলাম ।
- আম্মুর কি হয়েছে ? আম্মু কথা বলছে না কেন ?
- তুই তোর আম্মুর কাছে বোস । মুখে পানির ছিটা দে । আমি ডাক্তার কে ফোন দিচ্ছি ।
চলবে .........
✍️ রেহানা হক রেনু
গত পর্বের লিংক -২০
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/859277114877786/

চারুলতা চতুর্থ পর্ব
“তুমি বলেছিলে তুমি আমাকে ভালোবাসো। এটা শুধু একটা কথা না। একটা কমিটমেন্ট। তুমি এই কমিটমেন্টটা কিভাবে করলে আমার সাথে যেখানে তুমি আমার বড়বোনের জন্য আবেগ পুষে রেখেছো? তুমি আমাকে ভালোবাসো বলেই কি আমার সাথে আছো নাকি আমার মাঝে চারুর ছায়া দেখো বলে?”
“তোমাকে ভালো লেগেছিলো তোমার মাঝে চারুর ছায়া দেখেছিলাম বলেই কিন্তু...”
“ তাহলে এনাফ অরণ্য। আর কিছু বোলো না। আমাকে সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
তরু আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না। হন হন করে হেঁটে চললো আইসক্রিমের দোকানটার দিকে। অরণ্য পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো আগের জায়গাতেই। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ তরুর চলে যাওয়ার দিকে। কিন্তু তরু একবার ফিরেও তাকালো না অরণ্যর দিকে। অরণ্যর প্রতি ওর অভিমান হচ্ছে না। রাগ হচ্ছেনা। কষ্টও হচ্ছে না। কিন্তু একটা অপমানের ছাপ পড়ে গেছে ওর ভালোবাসায়। ধীরে ধীরে সেই ভালোবাসা বদলে যাচ্ছে বিতৃষ্ণায়। এই বিতৃষ্ণাটা কি শুধুই অরণ্যর প্রতি? নাকি খানিকটা চারুর প্রতিও আছে?\
তরু কাঁচের দরজাটা ঠেলে দোকানে ঢুকেই চমকে উঠলো ভয়ঙ্করভাবে। তৃণাকে যে চেয়ারটায় বসিয়ে রেখে গিয়েছিলো, সেটায় এখন এখন মোটা মতন এক লোক বসে আছে। তরুর হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেলো। আশেপাশে তাকাতে লাগলো ও, হয়তো অন্য টেবিলে গিয়ে বসেছে। কিন্তু তৃণা নেই কোথাও। তরুর অস্থির লাগছে খুব। ওর মনে হচ্ছে সব ঝামেলা একসাথে হাজির হয়েছে ওর জীবনে। দোকানের সেই স্টাফকে জিজ্ঞাসা করেও কিছু জানা গেলো না। তরুর চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে। দোকান থেকে বেরিয়ে এদিক সেদিক খুঁজতে থাকে। তৃণা ততক্ষণে বাসার গেটে পৌছে গেছে।
তৃণা আইসক্রিম শেষ করে চুপচাপ বসে রইলো দোকানটায়। সময় কাটছে না। খালামনি পাঁচমিনিটের কথা বলে বের হয়ে গেলো, এখনো আসে নি। তৃণার ইচ্ছা করছিলো আরেকটা আইসক্রিম খেতে। কিন্তু খালামনি বকতে পারে এই ভেবে চিন্তাটা বাদ দিল। কিন্তু একা একা বসে থাকতে খুবই বিরক্ত লাগছে। এরচেয়ে বাসায় চলে যাওয়া যায়। একা একা চলে যেতে পারলে সবাই অনেক অবাক হবে। খুশিও হবে। ভাববে মেয়ে বড় হয়ে গেছে। তৃণা চুপচাপ চেয়ার থেকে নেমে এলো। দোকানে কাস্টমার ঢোকার জন্য দরজা খুলতেই তৃণা সবার চোখের আড়ালে বেরিয়ে গেলো দোকানটা থেকে। দোকানের স্টাফরা কাস্টমার সামলাতে ব্যস্ত।
একা একা বেরিয়ে আসার পর তৃণা যে পথে এসেছিল খালামনির সাথে সেই পথ ধরে হাঁটতে শুরু করে। এই রাস্তা দিয়েই ওদের গাড়িটা ঢুকেছিলো। তৃণার অনেক কিছু মনে থাকে খুব ভালোমতো। এই রাস্তায় একটা ছোট দোকান আছে। কেমন নোংরা। সেই দোকানের সামনেই ওর নানাবাড়ি। তৃণা গুটি গুটি পায়ে নানাবাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। রাস্তায় কোনো লোকজন নেই। ওরা যেখানে থাকে সেখানে অনেক মানুষ। সবাই তৃণাকে চেনে। তৃণাকে সবাই পছন্দ করে। অনেকে কোলেও নেয়। কিন্তু নানাবাড়িতে আসার পর থেকে কেউ তৃণাকে কোলে নেয় নি। আম্মু বলে বড় হয়ে গেলে কেউ কোলে নেয় না। ও কি বড় হয়ে গেছে?
কেকের দোকানের আশেপাশের দোকানগুলিতে তরু জিজ্ঞাসা করতে থাকে ফ্রক পরা একটা তিন বছরের বাচ্চাকে কেউ হেঁটে যেতে দেখেছে কিনা। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারলো না। তরুর মাথা কাজ করছে না। বাসায় গিয়ে কি বলবে? ওরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলো ভীড়ের মধ্যে? তরু কিছুই ঠিকমত ভাবতে পারছে না। হঠাৎ ওর ফোন বাজতে শুরু করে। মা ফোন দিচ্ছে। নিশ্চয়ই দেরি হচ্ছে কেন সেটা জানতে ফোন দিচ্ছে। কিন্তু তরু ফোন ধরে কি বলবে বুঝতে পারছে না। আম্মু ফোন দিতেই থাকবে না ধরলে। দ্বিতীয় কলটা রিসিভ করলো তরু। কাঁপা গলায় বললো,"হ্যালো?"
"কিরে তরু তুই কোথায়? তৃণা বাসায় চলে এসেছে একা একা, বলছে তুই নাকি কি কিনতে গেছিস।"
"আরে মা লেবু কিনতে গিয়েছিলাম ওকে আইসক্রিম খেতে বসিয়ে দিয়ে। লেবুওয়ালাকে পাচ্ছিলাম না তাই দেরি হয়ে যাচ্ছিলো। এসে দেখি ও নেই। আমি এদিকে খোঁজাখুঁজি করে অস্থির।"
"তুই তাড়াতাড়ি বাসায় আয়।"
তৃণা আবার মন খারাপ করে বাবার পাশে এসে বসেছে। সে যা ভেবে এসেছিল তার কিছুই হয়নি। সে বাসায় এসে বলেছে খালামনির আসতে দেরি হচ্ছিলো বলে সে একা একা বাসায় চলে এসেছে। কিন্তু সবাই খুশী হওয়ার বদলে যেন বিরক্ত হলো। মা সরাসরি এসে একটা চড় বসিয়ে দিলো গালে। আচ্ছা ওর কি দোষ? ওর তো একা একা বসে থাকতে বিরক্ত লাগছিল। বকা দিতে পারত। নানা নানুর সামনে থাপ্পড় না মারলেই পারত। বাবা যে মাঝে মাঝে মাকে মারে বোধহয় এজন্যই। তৃণার এখন মনে হচ্ছে বাবা যা করে ঠিকই করে। ঠিক তখনই তরু এসে ঢোকে বাসায়।
#
- কোথায় গিয়েছিলি তুই তরু?
- মাকে তো তখন বললামই, লেবু কিনতে গিয়েছিলাম।
- তুই মিথ্যা বলছিস।
- না। আমি মিথ্যা বলতে যাবো কেন সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে? শুধু শুধু সন্দেহ করছিস আমাকে।
- তুই মিথ্যা বললে বুঝতে পারি। কোথায় গিয়েছিলি বল?
- সব বুঝিস তুই তাই না? অরণ্য তোকে ভালোবাসতো সেটাও নিশ্চয়ই বুঝেছিলি?
- অরণ্যর কথা তুই কিভাবে জানলি?
- ওর সাথে আমার তিন বছরের প্রেম। আজ তৃণাকে রেখে ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তখন বললো। কেন করলি এমনটা তুই?
- অরণ্য এখন কি করে?
- আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে একটা চাকরি করে। টিউশনি করায়, বিসিএস দেবে।
- এখন যদি তুই চাস, বাসায় সবাইকে অরণ্যর কথা জানাতে পারিস। এর কারণ ওর একটা পজিশন আছে। কিন্তু তুই কি চাইলেই তোর একটা বেকার ক্লাসমেটকে বাবার সামনে নিয়ে এসে বলতে পারবি যে তুই তাকে বিয়ে করতে চাস?
তরু চুপ করে রইলো। "আমি অরণ্যকে বলেছিলাম, ওর কি আমাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা আছে কিনা। ওর পায়ের নিচে মাটি ছিলো না। তাই আমি রাজীবের সংসারে গিয়েছিলাম।"
"সেখানে গিয়ে খারাপ কি আছিস? সবই তো দিচ্ছে। একটা মেয়েও আছে। সুন্দর সংসার।"
"বাইরে থেকে সবই সুন্দর গোছানো মনে হয়।"
"কি বলতে চাচ্ছিস তুই? কোনো সমস্যা চলছে তোর আর দুলাভাইয়ের?"
চারু কিছু বলে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তরু সেই দীর্ঘশ্বাসের অর্থ খুঁজতে থাকে। কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না।
- বিয়ের পর তোর কখনো অরণ্যর সাথে কথা হয়েছিলো কখনো?
- নাহ। তবে গতবছর ফিরে যাবার পথে গাড়ির ভেতর থেকে দেখেছিলাম ওকে। বদলায়নি একদম। আগের মতো উষ্কখুস্ক চুল, ভাঁজ পড়া টিশার্ট, রঙচটা জিনস। একটু গুছিয়ে রাখতে পারিস না ছেলেটাকে?
- আরে কত বলি! একবার বললাম, তোমার মেসে যাব আমি। এমনভাবে তাকালো আমার দিকে যেন দুটো কিডনি চেয়ে বসেছি।
- গিয়েছিলি এরপরে?
- গিয়েছিলাম, না বলে। কি এক গোয়ালঘর বানিয়ে রেখেছে। আমি গুছিয়ে রেখে এসেছি খানিকটা।
- তুইও তো দেখি সংসারী হয়ে যাচ্ছিস।
- বিয়ের বয়স হয়ে গেছে তো, অথবা তোর সুবাতাস লেগেছে গায়ে। মা শুনলে খুশি হয়ে যাবে।
- মা কি ভাবে তুই সংসারী না?
- আরে আমি ঘুম থেকেই উঠি সকাল সাড়ে আটটায়। বিছানা না গুছিয়ে চলে যাই ট্রেন ধরতে। সংসারী ভাবার কোনো কারণ আছে?
- তাও একটা কথা। আচ্ছা আমি মাকে বলে দেবো যে তার ছোট মেয়ে সংসারী হয়েছে। পাত্র দেখো। আচ্ছা পাত্র তো তুই খুঁজে ফেলেছিস।
- আমমম... আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপু।
- কি বুঝতে পারছিস না?
- আমি অরণ্যকে আদৌ বিয়ে করতে চাই কিনা।
- মানে কি বলতে চাইছিস?
- আজ ও একটা কথা বলেছে। আমি ওকে অরণ্য জেনেই ভালোবেসেছিলাম। সেও আমাকে ভালোবেসেছে, তবে তরুলতা ভেবে নয়। চারুলতা ভেবে। আমার মাঝে তোর ছায়া দেখে ও আমার প্রেমে পড়েছিলো। একটা ছায়া হয়ে ওর সাথে জীবন কাটাবো কি করে? যদি কখনো খুব বেশি আলো এসে পড়ে, আমি হারিয়ে যাবো।
- অতীত খুব গুরুত্বপূর্ন তরু। কিন্তু আমরা কখনো ভাবি না, কেন গুরুত্বপূর্ণ। অতীত কখনো সময় তৈরী করে না। সময় আমরা তৈরী করি। অতীত আমাদের তৈরী করে। আমরা আজ যা, তা অতীতের অসংখ্য ঘটনার ফলাফল।
- তুই কি বলতে চাচ্ছিস আপু?
- অতীতে অরণ্য তোকে কেন ভালোবেসেছে সেটা তুই জেনেছিস, কিন্তু জানতে চেয়েছিস ও এখন তোকে কেন ভালোবাসে? ভবিষ্যতে ও যদি তোকে ভালোবাসে, কেন ভালোবাসবে? তুই তরু, ঠিক এই কারণে যদি ও তোকে ভালো না বাসতে পারে, তাহলে এই ভালোবাসা অর্থহীন।
- হয়তো ও এখন আমাকে তরু ভেবেই ভালোবাসে। কিন্তু এই ভালোবাসার শিকড় কি? একটা অবাস্তব ভিত্তির উপর ভালোবাসাটা কতদিন টিকে থাকবে? তার চেয়ে এক কাজ কর, তুই দুলাভাইকে ডিভোর্স দিয়ে অরণ্যকে বিয়ে করে ফ্যাল।
- তৃণার কথা ভুলে যাচ্ছিস। আর আমি মানিয়ে নিয়েছি এই জীবনে।
- কিসের সাথে?
- সবকিছুর সাথে।
- তুই কিন্তু আমাকে...
- মা খেতে ডাকছে। চল চল। এমনিও অনেক দেরি হয়ে গেছে আজ।
তরু আর কিছু না বলে উঠে যায়। চারু হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। রাজীবের টপিকটা এ্যাভয়েড করা গেছে।
চারুলতা
চতুর্থ পর্ব
সাজ্জাদুল আরেফিন
তৃতীয় পর্বঃ https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/860016304803867/

চারুলতা
তরু বেরিয়ে যায় রুম থেকে। চারু হেসে ফেলে, আজ যেন চারু ছোট আর তরু ওর বড়বোন। কি সুন্দর সব গুছিয়ে রাখছে, দায়িত্ব পালন করছে। ওরও তো বিয়ের বয়স হয়ে গেলো। একটা ভালো ছেলে দেখে তরুকে বিয়ে দিয়ে দিতে পারলে বাবা মা নিশ্চিন্ত হতে পারবেন। একটা মেয়েকে যত্ন করে বড় করতেই কত বাবা মা হিমশিম খেয়ে যান। সেখানে চারুর বাবা মা দুই মেয়েকে পরম যত্নে বড় করেছেন। অভাব ছিলো, কিন্তু তা বুঝতে দেননি কোনোদিন। তরুর নিষেধ উপেক্ষা করে চারু খাটে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসলো। স্মৃতিগুলি আবার বেরিয়ে এলো বাক্স ভেঙে, পাঁচ বছর চলে গেছে।
চারু ল্যাপটপে কাজ করছিলো। পরশু প্রেজেন্টেশন আছে একটা। গ্রুপের লিডার চারু, তাই প্রেজেন্টেশন ফাইলটা ওকেই রেডি করতে হয়। সবগুলি স্লাইড গুছিয়ে সেভ করতে যাবে, এমন সময় পাওয়ারপয়েন্টটা ক্র্যাশ করলো। চারু কয়েক সেকেন্ড থম মেরে বসে রইলো। প্রায় দুই ঘন্টার পরিশ্রম! রাগে ওর চুল চিঁড়তে ইচ্ছা হচ্ছে। নতুন একটা ল্যাপটপের জন্য আজই বলতে হবে বাবাকে। হঠাৎই দরজায় টোকা পড়লো।
- চারু?
- বাবা, এসো এসো।
- তুই কি ব্যস্ত নাকি? পরে আসব?
- আরেহ না বাবা। বসো।
- তুই তো ভালোই গুছিয়ে রাখিস রুম।
- অগোছালো রুম আমার পছন্দ না বাবা।
- তোর মায়েরও। আমি আবার উল্টো। অগোছালো থাকতে খুব পছন্দ করি।
- জানি বাবা। একবার একসপ্তাহের জন্য তোমাকে একা রেখে আমরা নানুবাড়ি গিয়েছিলাম। যা অবস্থা করে রেখেছিলে!
- ওটা কিছুটা ইচ্ছা করে করা। তোর মাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য। তাকে আবার বলিস না যেন এটা।
- আচ্ছা যাও বলবো না।
- চারু, তোর সাথে দরকারি একটা কথা ছিলো।
- কি কথা বাবা?
- তুই তো সেকেন্ড ইয়ার শেষ করে ফেললি। বিয়ের ব্যাপারে কি একটু ভেবে দেখবি?
- পড়াশোনা শেষ করতে দেবে না?
- আমি তো চেয়েছিলাম তুই গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করলে তারপর তোর বিয়ের কথা ভাববো। কিন্তু তুই তো দেখিস আশেপাশের মানুষ কি বলছে, কি করছে। দুশ্চিন্তা হয় ভীষণ। পড়াশোনাটা তো বিয়ের পরেও করতে পারবি, তাই না?
চারু বলার মতো কিছু পাচ্ছিলো না। "তুই একটু সময় নে, ভেবে দ্যাখ।" রায়হান সাহেব আস্তে আস্তে বের হয়ে গেলেন রুম থেকে। চারু চুপচাপ বসে রইলো বিছানায়। ওর মাথাটা মনেহয় হুট করে খালি হয়ে গেছে। বিয়ের ব্যাপারে চারু তেমন কিছু ভাবেইনি। কত স্বপ্ন ছিলো! কিছুই হবে না। চারুর হঠাৎ মনে পড়লো, বাবাকে ল্যাপটপের কথা বলা হয়নি। পরক্ষণেই মনে হলো, আর দরকার নেই। প্রেজেন্টেশন আর জমা দিতে হবে না।
চার দিন কেটে গেলো। এই চারদিন চারু বাসার বাইরে পা দেয়নি। শুধু ভেবেছে। বাবার অবস্থা ও জানে। এই এলাকার মানুষের মেন্টালিটি ও জানে। একা একা তো আর মানুষের মেন্টালিটি বদলানো যাবে না। কিন্তু যদি যেতো? যদি চারু একাই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতো সবার বিরুদ্ধে? এসব হাবিজাবি ভাবছিলো বারান্দায় দাঁড়িয়ে। হুট করে শিউলি গাছটার দিকে চোখ গেলো। অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে শিউলি গাছটার পাশে মাথা নিচু করে। চারু আজ প্রথমবার খুব ইচ্ছে করতে লাগলো অরণ্যর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে, কথা বলতে। আচ্ছা কি কথা বলবে চারু? "অরণ্য, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? আমার বাসায় বিয়ের কথা চলছে। তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে? আমাকে নিয়ে দুরে কোথাও চলে যাবে, প্লিজ? যেখানে কোনো মানুষ থাকবে না, আমি নিঃশ্বাস নিতে পারবো প্রাণভরে। এখানে দমবদ্ধ লাগে আমার।"
চারু নিজের ছেলেমানুষী চিন্তার ধরণ দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। অতটা সাহস থাকলে তো হয়েই যেতো। দুশ্চিন্তার কিছুই ছিলো না। কিন্তু চারু ভীতু। অরণ্যের ভালোবাসা গ্রহণ করার সাহস ওর নেই।
অরণ্য পরের দিনও এসে দাঁড়িয়ে রইলো। চারু নামলো না। এর পরের দিনও নামলো না। ছেলেটা রোজ সকাল থেকে বিকাল অবধি দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর হতাশ হয়ে ফিরে যায়। অরণ্যর মুখে হতাশা মানায় না। কিন্তু চারুর কি করার আছে? চতুর্থ দিনে চারু নেমে এলো। এভাবে চলতে দেয়া যায় না। অরণ্য আজও মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। হাতের মুঠোয় চিঠিটা দেখা যাচ্ছে।
- অরণ্য, আমার...
- বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আমি জানি।
- কিভাবে জানো? আর জানোই যখন, কেন আসো? কেন দাঁড়িয়ে থাকো? কিসের অপেক্ষায়?
- অপেক্ষায় না, প্রতীক্ষায়। তোমার প্রতীক্ষায়।
অরণ্য প্রথমবার চোখ তুলে তাকালো চারুর দিকে। চারু অবাক হলো, অরণ্যর চোখগুলি কি প্রচন্ড সুন্দর! একবার দেখেই প্রেমে পড়তে বাধ্য এমন সুন্দর চোখ। কোনো ছেলের চোখ এতো সুন্দর হতে পারে চারুর ধারণাই ছিলো না।
- অরণ্য, তোমাকে আমি যতটা চিনি, তুমি ছেলেমানুষ না। তুমি তো এখনো পড়াই শেষ করতে পারো নি। তুমি কি পারবে এই সবকিছু থামিয়ে দিতে? পারবে সবাইকে অস্বীকার করে আমাকে বিয়ে করতে? বলো পারবে?
- না। পারবো না। সে ইচ্ছা নিয়ে আমি আসিও নি। আমি শুধু চিঠিটা দিতে এসেছি। তোমাকে লেখা আমার শেষ চিঠি। আমি জানি আমি চাইলেও আর তোমাকে চিঠি লিখতে পারবো না। অধিকারের কাঠগড়া আমি ভয় পাই।
অরণ্য চিঠিটা বাড়িয়ে দিলো চারুর দিকে। চারু চিঠিটা নিতে গিয়ে খেয়াল করলো ওর হাত কাঁপছে। কেন? ও কি অরণ্যকে ভালোবাসে? না। এমন তো না। অরণ্যর সাথে ওর ফোনে কথা হয়না। রোজ রোজ অভিসার হয়না, আড্ডা হয় না। পার্কের বেঞ্চে কিংবা গাছের নিচের নির্জনতায় স্মৃতি জমে না। তাহলে কেন চারুর এতো যন্ত্রণা হচ্ছে? চারু চিঠিটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে উপরে উঠে এলো। বারান্দায় এসে দেখলো অরণ্য হেঁটে চলে যাচ্ছে৷ এলাকার মোড় অবধি ওর নীল টিশার্টটা দেখা গেলো। চারু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। চোখের নদীর পাড় ছাপিয়ে ফোঁটায় ফোটায় পানি নামতে থাকলো। চারুর বোধহয় সেদিকে হুঁশ নেই, কারণ ওর মাঝে চোখ মোছার কোনো তাগিদ স্পষ্ট হলো না।
"এ্যাই চারু, তুই কাঁদছিস নাকি?" চারু স্মৃতি ছেড়ে বাস্তবে ফিরে এলো। তরু দাঁড়িয়ে আছে ঝাড়ু আর বেলচা নিয়ে। চারু তাড়াতাড়ি চোখ মুছতে গেলো শাড়ির আঁচলে। তরু বেলচা ঝাড়ু রেখে চারুর পাশে এসে বসলো, তারপর জড়িয়ে ধরলো বড়বোনকে। চারুর চোখ আবার ভিজে গেলো। কিন্তু কিছু বললো না ও। শুধু তরুকে জড়িয়ে ধরলো চুপচাপ।
ফুলদানির ভাঙা টুকরোগুলি দুই বোনের এই নীরব কষ্ট বিনিময়ের দৃশ্য দেখলো।
#
আকাশে মেঘ জমে যাচ্ছে। তৃণার মন খারাপ। বাসার বাইরে কি সুন্দর খেলার জায়গা! ও বাসায় এমন খোলামেলা পরিবেশ পায়না। সারাদিন বাসার ভেতরে থাকতে হয়। আকাশে মেঘ আসার আর সময় পেলো না! তৃণার একটু একটু রাগও হচ্ছে। ও রাজীবের পাশে এসে চুপ করে বসলো। রাজীব ফোন নিয়ে ব্যস্ত। তৃণা ওর পাশে এসে বসেছে সেদিকে ওর খেয়ালই নেই। তৃণা মাঝে মাঝে মনে হয়, বাবার চোখে অসুখ। বাবা কিছু নির্দিষ্ট জিনিস ছাড়া কিছু দেখে না। এই যে ফোন দেখছে, কিন্তু তৃণার মন খারাপটা দেখছে না। বাসায় থাকলে শুধু মায়ের দোষ দেখে, মাকে মারে। তখন দরজার পাশে দাঁড়ানো তৃণার ভয়ার্ত মুখ বাবা দেখে না। মায়ের গায়ের কাটাগুলি বাবা দেখে না। বাবা শুধু নিজের অফিসের কাজ দেখে আর মায়ের ভুল দেখে। তৃণা ভয় পায় বাবাকে। কোনো ভুল করলে ও মায়ের জামার ভেতরে গিয়ে লুকায় আর বলে,"আম্মু আমি খারাপ কসসি। বাপিকে বলিও না। আমাকে লাঠি দিবে তোমার মতো।" মা একদম চুপ হয়ে যায়। তারপর ওকে জড়িয়ে ধরে। কেন, সেটা অবশ্য তৃণা বোঝে না।
রায়হান সাহেব ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন তৃণাকে খুঁজতে খুঁজতে। মেয়েটা বাইরে খেলছিলো, শুধু শুধু জোর করে নিয়ে এলেন। এখন মেয়েটার মুখ দেখে মায়া লাগছে। মেয়েটা একদম চারুর মতো হয়েছে। চারুও চুপচাপ মন খারাপ করে বসে থাকে, কাওকে কিচ্ছু বলে না। রায়হান সাহেব ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে চারুর ঘরে ঢুকলেন। তরু বেলচা দিয়ে মেঝে থেকে ভাঙা কাঁচ তুলছিলো তখন। চারু বাবাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলো, "ওখানেই দাঁড়াও বাবা। কাঁচের টুকরোগুলি তুলে নিক। এরপরে আসো।" রায়হান সাহেব চারুর কথা শুনেও ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। "এই তরু শোন, কাঁচগুলি ফেলে দিয়ে তৃণাকে নিয়ে ছাদে ঘুরে আয় তো একটু। মেয়েটা মন খারাপ করে বসে আছে।" তরু চুপচাপ বেরিয়ে গেলো। রায়হান সাহেব এসে মেয়ের বেডে বসলেন।
- কিরে, এতদিন পর এলি। কেমন লাগছে?
- গেস্ট গেস্ট ফিল হচ্ছে বাবা।
- তোরা তো এখন গেস্টই।
- বিয়ের পর তো সব মেয়েই বাপের বাড়িতে গেস্ট হয়ে যায়।
- তুই নিজেকে পর ভাবলে কি করে হবে?
- আমি তো পরই বাবা। কেউই তো আপন করে নিলো না। দেখো মেয়েটাও মন খারাপ করে তার বাবার পাশে গিয়ে বসে। জানে তার বাবা কাজে ডুবলে কারো দিকে ফিরেও তাকায় না। তাও বাবার কাছেই যায় ও।
- তুই কি তোর মায়ের কাছে যেতি?
- না। কিন্তু এখন মা হওয়ার পর বুঝি, মায়েরা সন্তানের জন্য কি অনুভূতি পুষে রাখে।
- তোর মা কিন্তু আসলেই তোদের ভালোবাসে...আমার চেয়েও বেশি।
- আমরা যাদের কাছে ভালোবাসা আশা করি, তারা আমাদের মূল্যায়নই করে না।
- এটা... সত্যি কথা বলেছিস। তুই হুট করে অনেক বড় হয়ে গেছিস।
- পরিস্থিতি আর দায়িত্ব মানুষের বয়স বদলে দেয়, বাবা।
- তুই ভালো আছিস তো মা?
- ভালো থাকতে যা যা লাগে সবই তো আছে আমার, খারাপ থাকার কোনো কারণ তো নেই। তাই না বাবা?
চারুলতা
দ্বিতীয় পর্ব
সাজ্জাদুল আরেফিন
প্রথম পর্ব- www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/857467278392103/
চারুলতা
চারুর কথার মধ্যে কিছু একটা ছিলো। রায়হান সাহেব কিছু বললেন না। রাজীবের সাথে কথা বলা দরকার একটু। চারু প্রচন্ড সংসারী মেয়ে, এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। তাও কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা জানা দরকার। রায়হান সাহেব চুপচাপ উঠে দাঁড়ালেন। দরজার দিকে যাওয়ার জন্য পা ফেলতেই পায়ের তালুতে একটা চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করলেন। "উহহ!"
চারু খাট থেকে নেমে এলো তাড়াতাড়ি। বাবাকে ধরে বসিয়ে দিলো খাটে। তারপর উবু হয়ে পায়ের কাছে বসলো। "কাঁচ ঢুকেছে বাবা। ছোট, ব্লিডিং হবে না খুব একটা।" বলতে বলতে চারু সাবধানে কাঁচের টুকরোটা বাইরে বের করে আনলো। ভোঁতা এক টুকরো কাঁচ, ভেতরে ঢুকতে পারেনি। চারু উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো, "তরু ভুল করে ফেলে গেছে টুকরোটা। খেয়াল করেনি। এখন উঠে দাঁড়াতে পারবে?" রায়হান সাহেব খাট ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। চারু এসে বাবার ডানহাতটা ধরলো শক্ত করে। "ছেড়ে দে। আমি পারবো।" রায়হান সাহেব নিজে নিজেই দাঁড়িয়ে গেলেন। পায়ে সামান্য ব্যাথা করছে। সেটা সয়ে যাবে। চারু হাত ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালো একপাশে। রায়হান সাহেব বেশ তাড়াহুড়োতেই বেরিয়ে গেলেন চারুর রুম থেকে। তাঁর কপালের সুক্ষ্ণ ভাঁজের মতো এই ব্যাপারটাও চারুর চোখ এড়ালো না।
“রানু, মাংসটা নামিয়ে রাখ।” খালেদা শসা কাটতে বসলেন। পোলাও মাংসের সাথে সালাদ না হলে তো চলে না। তখনই তরু বেলচা হাতে ঢুকলো। “বেলচায় কি রে?”
“ভাঙ্গা কাঁচ। ফুলসানিটা ভেঙ্গে গেছে।”
“নতুন ফুলদানিটা? চারুর রুমে যেটা দিয়েছিলি?”
“হ্যাঁ।”
“ফ্রিজ থেকে লেবু নিয়ে আয় তো দুটো।”
“লেবু নেই। ফ্রিজের দরজার সাথে অর্ধেকটা আছে, ওটা কবেকার তাও মনে নেই।”
“এখন কি করব বল তো? লেবু দেবো না? রানু তুই এক দৌড়ে নিয়ে আয় তো দুটো লেবু।”
“থাক ওকে পাঠিও না মা। আমি তৃণাকে নিয়ে যাই। বাবাও বললো ওকে নিয়ে একটু ঘুরে আসতে।”
“যা তাহলে। তাড়াতাড়ি আসিস।”
তরু নিজের রুমে ঢুকলো। চুলটা একটু গুছিয়ে নিলো, পার্সটা নিয়ে কি যেন ভাবলো। তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজ লিখলো, “আমি বের হচ্ছি অরণ্য। তুমি জিইসি মোড়ে দাঁড়াও।” তারপর আয়নায় শেষবারের মতো একবার মুখটা দেখে নিলো। তারপর তৃণাকে ডেকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
রায়হান সাহেব এসে ড্রয়িং রুমে সোফায় বসলেন। রাজীব এখনো ফোনেই ব্যস্ত আছে। রায়হান সাহেব কোথেকে কথা শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না।তার দৃঢ় বিশ্বাস চারুর সাথে রাজীবের কোনো ঝামেলা চলছে। কিন্তু রাজীব ঝামেলা করার মানুষ না। চারুও খুব সংসারী মেয়ে। কিন্তু তবুও কিছু একটা খটকা আছে। সেটা কি রায়হান সাহেব বুঝতে পারছেন না।
"রাজীব, ব্যস্ত নাকি তুমি?"
"আরে না আব্বা।"
রাজীব ফোন নামিয়ে রাখলো। রায়হান সাহেব বেশ খুশি হলেন জামাইয়ের এই ব্যবহার দেখে।
- আসার পর থেকে তোমার সাথে ভালো করে কথাই হলো না।
- জ্বি আব্বা। আসলে আমি অফিস থেকে ছুটি নেই না তো, তাই সবাই একরকম নির্ভরশীল হয়ে গেছে। আপনি তো বুঝবেন, অনিয়মিত মানুষের উপর কেউ সচরাচর ভরসা করতে চায় না। যা দায়দায়িত্ব সব আমাদের মতো মানুষদের ঘাড়ে এসে পড়ে।
- তা যা বলেছো জামাই। আমিও তো ছুটি নিই না। আজ তোমরা আসবে বলে অফিস যাই নি, তাতেই তুলকালাম অবস্থা বলা যায়।
- আব্বার চাকরি আর কত বছর আছে?
- ৭ বছরের একটু বেশি আছে। কিন্তু বুড়িয়ে গেছি এখনই।
- কে বলেছে? আপনি তো এখনো জোয়ান, আমাদের মতো। যদি বলেন পাত্রী দেখি, আবার বিয়ে করিয়ে দিই।
- তোমার শাশুড়ি আম্মাকে সামলেই পারি না, আবার আরেকটা?
- আম্মাকে আমি সামলাবো। মিয়া বিবি রাজি হলেই হয়।
- না না থাক। আচ্ছা তোমার সাথে একটা কথা ছিলো।
- হ্যাঁ আব্বা বলেন না।
- তোমার আর চারুর মাঝে কি সব ঠিক আছে? কোনো ঝামেলা হচ্ছে কি?
- না কোনো ঝামেলা তো নেই। ও কি কিছু বলেছে?
- না ও কিছু বলে নি। কিন্তু বাবা তো আমি, চিন্তা হয় আরকি ওর জন্য অনেক।
- আমাদের তো সবই ঠিক আছে। আপনি শুধু শুধু চিন্তা করছেন।
- সেটাই হবে। তা তোমরা তো থাকছো দুদিন, তাই না?
- না আব্বা, আমরা আজই ফিরে যাব। আমাকে কাল অফিসে যেতেই হবে। বারবার ফোন দিচ্ছে।
- এতোদিন পর এলে, ভাবলাম দুদিন থেকে যাবে। তৃণাকেও তো আমরা পাই না খুব একটা।
- আমি বুঝতে পারছি আব্বা। কিন্তু অফিস থেকে প্রচুর ঝামেলা করছে। থাকা যাবে না কিছুতেই।
- তাহলে তো আর কিছু করার নেই। আমি রান্নাঘরে গিয়ে দেখি খাবারের আয়োজন কতদুর হলো।
রায়হান সাহেব সোফা থেকে উঠে এলেন। তার মনটা হুট করে খারাপ হয়ে গেছে। রান্নাঘর থেকে পোলাওর গন্ধ ছড়াচ্ছে। কতদিন পর বাসায় একটা উৎসব উৎসব ভাব এসেছে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য।
- খালেদা, রান্না কতদুর হলো?
- মাংস, মাছ আর পোলাও হয়ে গেছে। চিংড়িগুলোও ভাজা হয়ে এসেছে। তরু লেবু আনতে গেছে। ও আসতে আসতে হয়ে যাবে।
- তরু কেন গেল?
- তুমি নাকি ওকে বলেছো তৃণাকে নিয়ে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে?
- হ্যাঁ বলেছিলাম। কিন্তু তুমি আগে কেন বলো নি যে লেবু নেই বাসায়?
- আমরা কেউ লেবু খাই বাসায় যে বলবো?
- তাও আগে থেকে সব ভেবে রাখবে না? সকালটাও তো বসে ছিলাম বারান্দায়। বললেই নিয়ে আসতাম।
- এখন তরু গেছে তো। তুমি এতো কথা বোলো না তো। যাও ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসো। জামাইয়ের সাথে গল্প করো। রানু চিংড়িটা নেড়ে দে তো একটু খুন্তি দিয়ে।
রায়হান সাহেব রান্নাঘরের দরজা থেকে সরে এলেন। কিন্তু ড্রয়িং রুমে গেলেন না। বেডরুমের সাথে লাগোয়া বারন্দাটায় এসে বসলেন। তাকিয়ে রইলেন বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটার দিকে। চারুর সাথে কি আরেকবার কথা বলবেন তিনি?
#
"তৃণা আইসক্রিম খাবি?"
"আম্মু বকবে না খালামনি?"
"আম্মু জানলে তবেই না বকবে!"
"তাহলে খাবো।"
তরু তৃণাকে নিয়ে একটা আইসক্রিমের দোকানে ঢুকলো। পে ফার্স্ট সিস্টেমে চলে এসেছে এই দোকানটা। তরুর মনে আছে আপু কলেজে ওঠার পরও ওরা দুজন এই দোকানে আসতো। এখনকার মতো কাঁচঢাকা ছিলো না দোকানটা। দুই বোন বাসায় ফেরার সময় এই দোকানে ঢুকে আইসক্রিম নিতো। তারপর টাকা না দিয়ে দৌড় দিতো। দোকানের লোকটা দৌড়ে আসতে আসতে ওরা অনেকদুর চলে যেতো। তরু হঠাৎ স্মৃতিগুলি নিয়ে থমকে গেলো।
"খালামনি, খালামনি..." তৃণা হাত ধরে টান দিলে তরুর সম্বিৎ ফেরে। আইসক্রিম নিয়ে তৃণাকে একটা টেবিলে বসিয়ে দিয়ে তরু বললো,"তুই এখানে বসে আইসক্রিম খেতে থাক। আমি কিছু জিনিস কিনে নিয়ে আসি বাসার জন্য। কোথাও যাবি না কিন্তু! আমার পাঁচমিনিট লাগবে। আঙ্কেল বাচ্চাটাকে একটু দেখবেন।" বলে তরু বেরিয়ে আসে।
তরু ব্যাগ থেকে ফোন বের করে অরণ্যর নাম্বার খুঁজতে শুরু করে।
- বয়ফ্রেন্ডকে ফোন দিচ্ছো?
- হ্যাঁ দিতেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি আর দিতে দিলা কই?
- আমি কি করলাম? দাও তোমার বয়ফ্রেন্ডকে কল!
- হইসে আর ঢং কইরো না তো। এতোদিন পরে দেখা হইসে কই আমার খোঁজ খবর নিবে তা না, উনি আছেন উনার উল্টাপাল্টা কথা নিয়ে।
- আচ্ছা কেমন আছো?
- রাজরাণীর মতো। দেখে বুঝতে পারছো না কেমন আছি?
- আরে তুমিই তো বললে তোমার খোঁজখবর নিতে!
- খোঁজখবর নেয়া লাগবে না। আপুর মেয়েকে বসিয়ে রেখে এসেছি।
- কোন আপুর মেয়ে?
- আমার একটা বড় বোন আছে বলেছিলাম না?
- বলেছিলে বোধহয়। কিন্তু ডিটেইলস বলো নি কখনো।
- বলি নি? ইচ্ছে করেই বলি নি তাহলে। তোমার প্রেম তো আমার সাথে। আমার বড়বোনের পরিচয় জেনে কি কাজ তোমার?
- আরে বাসায় জানাজানি হলে বড়বোনই তো সাপোর্ট করবে!
- হয়েছে অত ভাবতে হবে না।
- তোমার আপুর নাম কি তোমার সাথে মিলিয়ে রাখা?
- হ্যাঁ। তবে আপুর নামটা সুন্দর। চারু। চারুলতা। আমার নামটা কেমন যেন! শুনলেই লতাপাতা জংলার কথা মাথায় আসে।
- তোমার আপু কোথায় পড়তো?
- চট্টগ্রাম ভেটেরিনারিতে। ও যখন থার্ড ইয়ারে তখন ওর বিয়ে হয়ে যায়। সাড়ে চার বছর হয়ে গেছে বোধহয়।
- আচ্ছাআআআ…
- এভাবে আচ্ছা বলার কি আছে? তুমি চেনো নাকি?
- হ্যাঁ।
- কিভাবে?
তরু অরণ্যর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো অরণ্যকে। অরণ্য বুঝতে পারলো ওকে সত্যিটা বলতে হবে।
“আমি চারুকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না। রাস্তায় দেখেছিলাম, ভালো লেগে গিয়েছিলো। চেয়েছিলাম কিছু হোক। ওকে আমি চিঠি দিতাম মাঝে মাঝে। কখনো উত্তর দিতো না। আমি উত্তর চাইতামও না। ও কখনো কথা বলতো না আমার সাথে। চিঠিগুলি পড়তো কিনা তাও জানি না। শেষ যেদিন আমাদের দেখা হয়, ও বলেছিলো ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আমি যেন আর না যাই। আমিও তখন থার্ড ইয়ারে। কিছুই করার ছিলো না আমার।”
“এখন যাও? এখন তো চাকরি আছে, এখন গিয়ে চারুকে বলো, তুমি তাকে বিয়ে করতে চাও।”
“তরু! তুমি কি বলছো এসব?”
চারুলতা
তৃতীয় পর্ব
সাজ্জাদুল আরেফিন
দ্বিতীয় পর্বঃ facebook.com/groups/526513374820830?view=permalink&id=859105034894994

ভেজা চিরকুট -- ৭৩তম পর্ব/শেষ পর্ব।
ভেজা চিরকুট -- ৭৩তম পর্ব/শেষ পর্ব।
রিফাত হোসেন।
১৪১.
কলিংবেলে চাপ দিয়ে দাঁড়াল শান্তনু আর দীবা। ফ্ল্যাটটা অনুর। অনু দরজা খুলে দিতেই দুজনে ভিতরে ঢুকল।
অনু ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এসে সোফায় দেখিয়ে বলল, "বসো।"
দীবা আর শান্তনু বসল সোফায়। বসার পর শান্তনু চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল, "শ্রেয়সী কোথায়?"
"বাইরেই কোথাও আছে হয়তো।" জবাব দিলো অনু।
"আমরা তো ভেবেছিলাম তোমাকেও পাবো না ঘরে। তাই আগে নিচে গেলাম। আঙ্কেলই বলল উপরে আছো। তাই একটু কথা বলে এখানে চলে এলাম।"
অনু হেসে বলল, "আমি আসলে একজনের জন্য অপেক্ষা করছি। ওখানে গেলে কে কোন কাজ ধরিয়ে দিবে; তখন হবে আরেক ঝামেলা।"
শান্তনু কৌতুকের সাথে বলল, "ফাঁকিবাজ কোথাকার!"
পাশ থেকে দীবা ধাক্কা দিয়ে বলল, "আহা! তুমি শুধু ফাঁকিবাজিটাই দেখলে। একজনের জন্য অপেক্ষা করছে, সেটা দেখলে না। তা মিস অনু, সেই একজনটা কী মিস্টার মামুন?"
দীবার কথা শুনে নিচের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে শুরু করল অনু। ওর অবস্থা দেখে শান্তনু আর দীবা, একসাথে উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর অনু বলল, "আমার কথা বাদ দাও। তোমরা বলো, এভাবে আর কত দিন?"
"কোনভাবে?" শান্তনু জানতে চেয়ে দীবার দিকে তাকালো একপলক।
অনু চোখ পাকিয়ে বলল, "এই যে সবার বাচ্চাকাচ্চা এত্তো বড় বড় হয়ে গেল, আর তোমরা এখনো সুসংবাদটাই দিলে না৷ এভাবে আর কতদিন শুনি? তোমাদের বিয়ের প্রায় সাড়ে ৪ বছর হয়ে গেল। এখন বাচ্চা না নিয়ে কি ৫০ বছর পর নিবে?"
অনুর কথা শুনে দীবা সশব্দে হেসে বলল, "ও, এই কথা। আগে তোমার বিয়ে হোক, এরপর না আমাদের বাচ্চার কথা।"
"এবার বোলো না, তোমরা পণ করেছ আমার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বাচ্চা নিবে না।"
"ধরে নাও তাই। আগে তোমার বিয়ে, এরপর আমাদের সন্তান। যদি তোমাদের মেয়ে হয়, আর আমাদের ছেলে হয়, তাহলে আমরা ওদের বিয়ে দিবো।"
অনু ভুরু জোড়া উপরে তুলে অবাক হওয়ার মতো করে বলল, "ওরে বাপ্রে! কতদূর চলে গেছ তুমি। আমার এখনো বিয়েই হলো না, আর তুমি বলছ মেয়ের কথা। আবার ওর বিয়েও ঠিক করে ফেললে।"
দীবা হাসতে হাসতে বলল, "পরিকল্পনা করে রাখছি। সব ঠিকঠাক থাকলে ভবিষ্যতে চিন্তামুক্ত থাকতে পারব।"
"কিন্তু, তখন তো ওরা সমবয়সী হয়ে যাবে।"
"তোমার মেয়ে দুই বছর বড় হলেও সমস্যা নেই। তোমার আর শান্তনুর সাথে যা হয়েছিল, আমরা অন্তত সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করব না।"
"আর যদি দুজনেরই ছেলে বা মেয়ে হয়?"
"তাহলে আবার বাচ্চা নিবো। তবুও না হলে বুঝবো আল্লাহ চায় না এমনটা হোক।"
দীবার কথা শুনে অনু হেসে উঠল জোরে জোরে। শান্তনুও হাসল। তবে কিছুক্ষণ পর আবার হাসি থামিয়ে শান্তনু বলল, "আসলে, বাবার দায়িত্ব অনেক বড়। আমার মনে হয়, আমি এখনো উপযুক্ত হইনি এই দায়িত্বটা সামলানোর। আমার যা বেতন, তা দিয়ে বাড়ি ভাড়া, খাওয়াদাওয়া সহ আনুষঙ্গিক খচরেই চলে যায়। আগে কিছু জমাই, এরপর বাচ্চা নেওয়ার কথা ভাববো। এমন না হোক, ভবিষ্যতে উন্নত চিকিৎসার অভাবে দীবা বা বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়। আমি এইরকম অনেক দেখেছি। যারা শুধুমাত্র চিকিৎসার অভাবে নিজের স্ত্রী-সন্তানকে হারিয়ে ফেলছে। আমি এই ঝুঁকি এড়াতে চাইছি।"
"আরে, আগাম এত কিছু ভাবলে চলবে? বেঁচে থাকা না থাকা, পুরোটাই তো আল্লাহর হাতে। তাছাড়া এমনও অনেক আছে, যাদের সন্তান নিজ ঘরেই পৃথিবীর আলো দেখছে। ওদের তো সেভাবে কোনো চিকিৎসাই হচ্ছে না, তবুও সুস্থ বাচ্চা জন্ম দিচ্ছে; মা-ও সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকছে। সুতরাং, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।"
অনুর সাথে তাল মিলিয়ে দীবা বলল, "এই কথাটা অনেকবার বুঝানোর চেষ্টা করেছি। ও বুঝতেই চাইল না।"
অনু চোখ কটমট করে শান্তনুর দিকে তাকিয়ে বলল, "এইরকম ঘাড়ত্যাড়া বরদের আদর দিয়ে বুঝালে কাজ হবে না। পিটিয়ে বোঝাতে হবে। তবেই বুঝবে।"
অনুর কথা শুনে দীবা আর শান্তনু, দুজনেই হেসে উঠল একসাথে। অনুও তাল মিলিয়ে হাসল।
৩টা বাজতেই অনুর মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। শান্তনু আর দীবার সাথে বসেছিল অনু। মোবাইল স্ক্রিনে মামুনের নম্বর দেখে সে দাঁড়িয়ে বলল, "মামুন এসেছে বোধহয়। তোমরা বসো।।আমি ওদের নিয়ে আসছি।"
দীবা ওঠে দাঁড়াল, অনুকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বলল, "বেশ সুন্দর দেখতে লাগছে। মামুন সাহেব দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়বে নিশ্চিত। বিয়ের প্রস্তাবও দিতে পারে।"
অনু লাজুক হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মামুন। অনু সিঁড়ি দিয়ে নিচে আসতেই ওকে দেখল সে৷ শাড়ি পরে, অনেকটা বধূবেশে মতো সাজে সজ্জিত হয়ে এগিয়ে আসছে মেয়েটা। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির ঝলকানিতে বিমোহিত হয়ে গেল মামুন। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। অনু এগিয়ে আসতে আসতে সম্মুখে এসে দাঁড়াল।
মাহিমা পাশেই ছিল। অনুকে জড়িয়ে ধরল এবার। শক্ত করে আলিঙ্গন করে বলল, "কেমন আছো, অনু আপু?"
অনু আন্তরিক গলায় বলল, "আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?"
"ভালো আছি।" উজ্জ্বল হাসি দিয়ে জবাব দিলো মাহিমা।
"চলো, ভিতরে চলো।"
মামুন পাশ থেকে বলল, "আমাকে কেউ জিজ্ঞেসই করল না, কেমন আছি।"
"আহারে!" আহ্লাদী চেহারা করে মামুনের দিকে তাকালো অনু।
মাহিমা ঠোঁট টিপে হাসল। অনু আবার বলল, "ঠিক আছে। জিজ্ঞেস করছি। বলো, কেমন আছো তুমি?"
মামুন হাস্যোজ্জ্বল ভাবে বলল, "আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?"
"অনেক বেশি ভালো আছি।"
মামুন খোঁচানোর জন্য বলল, "সে তো দেখেই বুঝতে পারছি। যেভাবে সেজেছে, মনে হচ্ছে বিয়েটা তোমারই। তা কার জন্য এত সেজেছ শুনি?"
"পাশের বাড়ির মিন্টু কাকুর ১৫ বছর বয়সী একমাত্র ছেলের জন্য। ও বলেছিল, অনু আপু, তোমাকে শাড়ি পরলে অনেক সুন্দর দেখতে লাগে। ওর জন্য পরলাম।"
"তাই নাকি? হঠাৎ এই সতীন উদিত হলো কোত্থেকে?"
"সতীন!" শব্দটা উচ্চারণ শরীর ঝাঁকিয়ে হাসতে শুরু করল অনু।
মাহিমাও হেসে গড়িয়ে পড়ল অনুর উপর। মামুনও থেমে থাকল না, মিটমিট করে হাসতে লাগল।
অনু নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, "এসো, ভিতরে এসো।"
"হুম।" মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল মামুন।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল সবাই। দুতোলা পেরোতেই মামুন বলল, "তুমি তো বলেছিলে পাঁচ তলায় থাকো।"
অনু জবাবে বলল, "হ্যাঁ। আমার ঘরে শান্তনু আর দীবা বসে আছে এখন। আগে চলো, শুভ্র'র সাথে দেখা করে আসি। তোমাদের দেখলে ও অনেক খুশি হবে। যখন আমি বললাম, তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি খুশি শুভ্র-ই হয়েছিল। পাগল ভাই আমার। আমাকে অনেক ভালোবাসে ও। গত ৪বছর যারা আমাকে মানসিক ভাবে সাপোর্ট দিয়েছে, আমাকে ধৈর্য ধরতে সহায়তা করেছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলো শুভ্র। প্রতি মুহূর্তে আমাকে সাহস দিয়েছে ও।"
"বেশ, তাহলে আগে ওর সাথে দেখা করি৷"
"ওকে। ঘরেই আছে ও। রেডি হচ্ছে বোধহয়।"
মামুন আর মাহিনাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমের মাঝে এলো অনু৷ প্রতিবেশীদের ভীড় এখানে। কিছু আত্মীয়স্বজনও আছে। ব্যক্তিগত ভাবে অনু যাদের অপছন্দ করে, তাঁরাও আছে। বেশ আয়োজন করেই হচ্ছে শুভ্র আর সেতুর বিয়েটা।
মমতাজ বেগম অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মামুন আর মাহিমাকে দেখে এগিয়ে এলেন তিনি।
মামুন অনুর মায়ের দিকে তাকিয়ে সসম্মানের সাথে বলল, "আসসালামু আলাইকুম, আন্টি। কেমন আছেন?"
মমতাজ বেগম সস্নেহে জবাব দিলেন, "ওয়ালাইকুমুস সালাম। আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?"
"আমিও ভালো আছি।"
"আরে, মাহিমা যে; কতবড় হয়ে গেছ!" মাহিমার থুতনিতে হাত রাখলেন মমতাজ বেগম। সামান্য ডান-বামে নাড়িয়ে আন্তরিক ভাবে বললেন, "কেমন আছো, মা?"
মাহিমা সুপ্রসন্ন হাসি দিয়ে বলল, "আমি ভালো আছি, আন্টি।"
পাশ থেকে অনু বলল, "শুভ্র কি রেডি হয়েছে, মা?"
মমতাজ বেগম বললেন, "হ্যাঁ। ঘরেই বসে আছে এখন। যা, ওদের নিয়ে যা ওখানে।"
"ঠিক আছে।"
অনু মামুনকে ইশারা করে শুভ্র'র ঘরের দিকে গেল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলল, "শুভ্র, দেখ কে এসেছে।"
শুভ্র বিছানায় বসে ছিল। অনুর গলার আওয়াজ পেয়ে নেমে এলো। মামুনকে দেখেই চমকিত হয়ে বলল, "আরে, ভাইয়া আপনি। আসুন, ভিতরে আসুন।"
মামুন, অনু আর মাহিমা, তিনজনেই ভিতরে ঢুকল। শুভ্র'র ফ্রেন্ডরা বসে ছিল ঘরে। নেহাল, মিষ্টি সহ আরও কয়েকজন। সবাই ওঠে দাঁড়াল।
মামুন শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি তো অনেক বড় হয়ে গেছ। মনে হচ্ছে অনেক বছর পর তোমাকে দেখছি। তা কেমন আছো?"
শুভ্র উজ্জ্বল হাসি দিয়ে বলল, "আমি খুব ভালো আছি, ভাইয়া।"
"ভালো তো থাকবেই। যাকে ভালোবেসেছ, তাকেই স্ত্রী হিসেবে পাচ্ছ। এর থেকে সৌভাগ্যের আর কী হতে পারে?" আড়চোখে অনুর দিকে তাকিয়ে চোখ মারল মামুন।
শুভ্র হেসে বলল, "এইরকম সৌভাগ্য আপনারও হবে, ভাইয়া। শুধু আমার বিয়েটা হয় যাক, এরপর দেখবেন, আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অনু আপুর সাথে আপনার বিয়ে দিবো। কোনোভাবেই দেরি করব না।"
অনু হাত উঁচিয়ে শুভ্র'র দিকে মারের ইশারা করে বলল, "বাচ্চা ছেলে, এত কথা বলিস কেন, হু? চুপ করে বসে থাক।"
মামুন বলল, "বেঠিক কিছু বলেনি কিন্তু।"
অনু লাজুক হেসে, নাক একটু ফুলিয়ে মামুনকে শাসালো, "তুমি চুপ করবে?"
মামুন হেসে বলল, "ওকে। আপাতত চুপ করলাম।"
"ভেরি গুড। এবার এসো।"
"কোথায়?"
"বাবার সাথে দেখা করবে।"
মামুন সহসা গম্ভীর হলো কিছুটা। মাহিমার দিকে তাকিয়ে দেখল, সে-ও গম্ভীর হয়ে গেছে।
অনু দু'জনের দিকে ক্রমান্বয়ে তাকিয়ে বলল, "প্লিজ, আমার জন্য অন্তত চলো। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
মামুন তবুও ইতস্তত বোধ করল। ওই মানুষটার কথা মনে পড়লেই নিজের অপমানের কথা মনে পড়ে যায়। মূল দোষী যতই অন্যজন হোক, ওই মানুষটাও অন্যায় করেছে।
মামুনকে এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে দেখে মাহিমা পাশ থেকে বলল, "চলো, ভাইয়া। একবার কথা বলো, এরপর সব ঠিক হয়ে যাবে।"
মাহিমার কথা শুনে আশ্বস্ত হলো মামুন। মাহিনার জন্যই সংকোচ বোধ করছিল সে। এখন মাহিমা যেহেতু যেতে বলছে, তখন আর আপত্তি করল না। অনুর দিকে তাকিয়ে সে বলল, "চলো।"
মামুন, অনু আর মাহিমা বেরিয়ে যেতেই শুভ্রর কাঁধে হাত রেখে নেহাল বলল, "মেয়েটা কে রে দোস্তো?"
শুভ্র নেহালের দিকে তাকাল। ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল, "কোন মেয়েটা?"
"আরে, অনু আপুর সাথে যে এলো। সুন্দর দেখতে মেয়েটা। পরীর মতো।"
শুভ্র, নেহালের থেকে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে, সন্দিহান ভঙ্গিতে বলল, "ও মামুন ভাইয়ার ছোট বোন। কেন?"
নেহাল চোখের চশমাটা সঠিক জায়গায় বসিয়ে আবার শুভ্র'র কাছে এসে ভনিতা করে বলল, "না মানে, তোর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। মিষ্টির বিয়ে সামনে। মনে হচ্ছে মাস্টার্স শেষ করার আগেই সবাই বিয়ে করে ফেলবে। সবাই যখন ডাবল হয়ে যাচ্ছে, তাহলে আমি একা সিঙ্গেল থাকব কেন বল?"
"তুই পরিষ্কার করে বলতো, কী বলতে চাচ্ছিস?"
পাশ থেকে মিষ্টি শুভ্রর পেটে চিমটি কেটে বলল, "আরে গাধা, বুঝতে পারছিস না; বেচারা মেয়েটার প্রেমে পড়েছে।"
"সর্বনাশ! ওকে তো সেভাবে দেখলিই না।"
নেহাল বলল, "আমি দেখেছি। ও যখন ভিতরে এলো, তখন থেকে দেখতে শুরু করেছি।"
"আর তাতেই প্রেমে পড়ে গেলি?"
"হ্যাঁ। এক দেখাতেই প্রেম। ওকে দেখার পরই আমার হার্টবিট বেড়ে গেছে। হাতুড়ি পেটার মতো দ্রিমদ্রিম শব্দ হচ্ছে বুকের ভিতর।"
"কই, আমরা তো শব্দ শুনতে পাচ্ছি না?" পাশ থেকে মিষ্টি বলল কথাটা।
নেহাল বলল, "এভাবে শোনা যাবে না।"
শুভ্র রসিকতা করে বলল, "হেডফোন ব্যবহার করতে হবে নাকি?"
"ধুর বাল! তোরা বিষয়টি ফানি ভাবে নিচ্ছিস। আমার সত্যিই মেয়েটাকে ভালো লেগেছে। ভালোবেসে বিয়ে করার মতো ভালোলাগা। ভীষণ সিরিয়াস ইস্যু।"
"মহা ঝামেলায় ফেলে দিলি তো। আমি তো কখনো ওর সাথে কথা বলিনি।"
"সে আমি জানি না। সেতুর সাথে তোর প্রেমে অনেক সাহায্য করেছি আমি। এখন তোদের বিয়ে হচ্ছে। এবার আমার প্রেমে তোকে সাহায্য করতেই হবে।"
শুভ্র চিন্তান্বিত ভাবে বলল, "ওকে। তবে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আগে আমাকে জানতে হবে মেয়েটার কারোর সাথে সম্পর্ক আছে কী না। এরপর অনু আপুর বিয়ে হয়ে গেলে আমি কিছু একটা করব।"
"ঠিক তো?"
শুভ্র হেসে বলল, "পাক্কা।"
নুরুল ইসলাম বসে আছেন বিছানায়। তাঁর পাশে অনু। মামুন বসেছে একটা চেয়ারে। আর মাহিমা অনুর পাশে।
নুরুল ইসলামকে দেখে অবাক হয়ে গেছে মামুন। এত রোগা হয়েছে মানুষটা। আগে দেখলে মনে হতো শক্তপোক্ত এক যুবক। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বৃদ্ধ একজন মানুষ। কপালের চামড়ায় ভাজ পড়েছে। চোখ দু'টোও কোটরের ভিতরে চলে গেছে। মামুন কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর স্বাভাবিক ভাবে বলল, "আঙ্কেল, আপনি কিন্তু অনেক শুকিয়ে গেছেন।"
মামুনের কথা শুনে মৃদু আওয়াজ করে হেসে নুরুল ইসলাম বললেন, "বয়স হচ্ছে, একটু-আধটু তো হবেই।"
অনু বলল, "শুধু বয়সের জন্য না। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করলে স্বাস্থ্য ঠিক থাকতো। তুমি তো ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াই করো না। সারাক্ষণ এখানে বসে থাকো, শুয়ে থাকো। আজ ছেলের বিয়ে, তবুও তুমি এখানে।"
"তোরা তো আছিসই। ছেলের বিয়েতে আমি কী করতে পারছি বল? ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব থাকে বাবা-মায়ের। তোর মা যা করার করছে, আমি তো কিছুই করতে পারছি না। উল্টো সর্বনাশ করেছি তোর।"
মামুন বলল, "আঙ্কেল, আপনি এভাবে বলবেন না।"
"কী আর বলব, বলো? মেয়েটা আমার সারাজীবন তো দুঃখই পেয়ে গেল। আমি ওকে একটু শান্তি দিতে পারিনি। যখন তোমাকে ভালোবেসে সুখী হতে চাইল, সেখানেও আমি বাধা দিলাম।"
"ওটা একটা ভুল বুঝাবুঝি ছিল, আঙ্কেল।"
উপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়লেন নুরুল ইসলাম। মুখে বললেন, "হুম, ভুল বুঝাবুঝি। এই ভুল বুঝাবুঝির জন্যই তোমাদের ৪টা বছর নষ্ট হলো।"
মামুন বলল, "নষ্ট হয়নি তো। বরং আমাদের জীবনে উন্নতি হয়েছে। আমি লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। দেশে আমার জন্য একটা আলাদা সম্মানের জায়গা তৈরি হয়েছে এখন। অনু চাকরি করছে। এই ৪টা বছরকে আমি কখনোই তাচ্ছিল্য করতে পারি না। এই ৪টা বছর আমাদের জীবনে না এলে আমরা জীবনের অর্থই বুঝতে পারতাম না। আপনি এর জন্য নিজেকে শুধু দায়ী করবেন না।"
"অর্ক'র একার দোষও তো না। ওর কথা বিশ্বাস করে তোমার আর তোমার বোনের নামে অতগুলো খারাপ কথা বলাটা আমার গুরুতর অপরাধ ছিল। তবে এটা বিশ্বাস করো, মাহিমা যে ঘরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল, এটা আমি জানতাম না। জানলে আমি কখনোই ওইরকম কথা বলতাম না। অর্ককে আমি অনেক ভরসা করতাম। তাই ও যা বলেছিল, এক কথাতেই সব বিশ্বাস করেছিলাম। ওর কথাগুলোই আমি কপি-পেস্ট এর মতো তোমাকে বলেছিলাম। অনুকেও কিছু জানায়নি। মাহিমা যে কখন চলে এসেছিল, সেটা আমি বুঝতেই পারিনি।"
"আমি বুঝতে পারছি, আঙ্কেল।"
"তবে অর্ককে আমি উচিত শিক্ষা দিয়েছি। ওর অফিসে গিয়ে ওকে থাপ্পড় মেরে এসেছি সবার সামনে। শুনেছিলাম ওর বাবাও ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। ও এরপর মাফ চেয়েছিল আমাদের কাছে। তবুও আমি ওকে ক্ষমা করিনি এখন পর্যন্ত। এরপর আর ওর সাথে কখনো কথা হয়নি। ওর বাবা-মা কাল আসবে বলেছে।"
অনু বলল, "অর্কও কী আসবে, বাবা?"
"আমার মনে হয় না আসবে।" নুরুল ইসলাম বললেন।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলল সবার মাঝে। এরপর বাইরের লোকদের তাগাদায় ঘর থেকে বেরোলো সবাই।
অনুর বান্ধবী, মোনা আর তূবা তাঁদের স্বামীকে সাথে নিয়ে এলো কিছুক্ষণ পর। খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই সেতুদের বাড়ির ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল সবাই। কাজি এলো সন্ধ্যার বেশ কিছু সময় আগেই। সেতু আর শুভ্র যেসময় কবুল বলছিল, সেসময় নেহাল মাহিমাকে দেখছিল। ব্যাপারটা মাহিমাও লক্ষ্য করেছে ক'বার। সে চোখ পাকিয়ে নেহালকে শাসিয়েছে প্রতিবারই।
বিয়ে সম্পন্ন হলো সন্ধ্যার আগেই। দরজা পর্যন্ত সেতুকে এগিয়ে দিলো সেতুর মা-বাবা। তারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বললেন। এরপর সেতুর বাবা শুভ্রর হাতে মেয়ের হাত ধরিয়ে দিলেন। পাশের ফ্ল্যাটের দরজাটা খোলাই ছিল। গাড়ি লাগল না, কোথাও যেতে হলো না, চট করে শুভ্র আর সেতু ঢুকে গেল পাশের ফ্ল্যাটে। অনেকেই মজা পেলো বিষয়টিতে। দুই বাড়ির মাঝের দূরত্ব মাত্র দুই কদম। লাফ দিলেও পার হওয়া যায় জায়গাটুকু।
১৪২.
"শুভ্রর আর সেতুর বিয়ে দেখে আমারও বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে।" সহসা কথাটা বলে উঠল মামুন।
সন্ধ্যা ৭টা বাজে। মাহিমা, শ্রেয়সী, শান্তনু আর দীবা ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডা মারছে৷ অনুর ঘরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে মামুন আর অনু। মামুনের কথা শুনে খানিক চমকালো অনু। ভুরু উপরে তুলে বলল, "তুমি ঠিক আছো তো?"
মামুন বলল, "সত্যিই বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে।"
অনু লজ্জাপূর্ণ ভাবে বলল, "তো আমাকে বলছ কেন? আন্টিকে বলো মেয়ে দেখতে।"
"আন্টি বলেছে নিজের বিয়ের পাত্রী নিজেই ঠিক করতে।"
"তাহলে সেই পাত্রীকেই গিয়ে বলো।"
"কীভাবে বলব, বুঝতে পারছি না। লজ্জা পাচ্ছি।"
"এই বয়সে এসে এত লজ্জা!" হেসে উঠল অনু।
মামুন বলল, "তুমিও তো লজ্জা পাচ্ছো।"
"আমি মেয়ে মানুষ। একটু-আধটু তো লজ্জা পাবোই। তুমি পুরুষ মানুষ।"
"তাহলে বলছ, পুরুষ মানুষের লজ্জা নেই?"
"নেই।"
"একটুও নেই?"
"আছে। তবে সেটা প্রকাশ না করলেও চলে।"
অনুর কথাটার প্রতিউত্তরে কিছুই বলল না মামুন। অকস্মাৎ পকেটে হাত দিয়ে একটা আংটির বক্স বের করল। এই ব্যবস্থা আগে থেকে করা ছিল। সে অনুর আরও কাছে গেল। দূরত্ব বেশ কমিয়ে দিলো। এরপর বক্স থেকে আংটিটা বের করে অনুর হাত ধরে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছু সময়। মৃদু হাসি ঠোঁটের কোণে।
অনু সহসা চোখ নামিয়ে বলল, "এভাবে তাকিও না। আমার লজ্জা লাগছে।"
মামুন অন্য হাত অনুর থুতনিটা উঁচু করল। দেখল, লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলেছে মেয়েটা। অনুর হাতে আংটিটা পরিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে মামুন বলল, "মিস অনু, আমার জীবনে তুমি সত্যিই আল্লাহর দেওয়া একটা উপহার। তুমি আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছ। তুমি আমাকে প্রেম শিখিয়েছ। আমাকে অনেককিছু দিয়েছ তুমি। এর বিনিময়ে আমি তোমাকে শুধু কষ্ট দিয়েছি। ৪টা বছর আমার জন্য কষ্ট পেয়েছ তুমি। এই ৪টা বছর তো আর ফিরে আসবে না। তাই আমি চাই, আগামী ১০০ বছর তোমাকে সুখে রাখতে। সর্বোচ্চ সুখ তোমাকে এনে দিতে চাই আমি। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, অনু।"
আস্তে আস্তে চোখ মেলে মামুনকে দেখল অনু৷ চোখাচোখি হতেই মামুনের বুকে মুখ লুকালো। মামুনও বুকে আঁকড়ে ধরল অনুকে। ভালোবাসার উষ্ণতায় একে অপরকে আবদ্ধ করে ফেলল।
১৪৩.
বইমেলা শেষ হলো। প্রকাশক আফজাল আঙ্কেল এবং তাঁর স্ত্রী, মামুন আর মাহিমাকে সাথে নিয়ে একদিন অনুদের বাড়িতে এলো। সেদিনই বিয়ের তারিখটা পাকা করে ফেলল সবাই মিলে।
বেশি সময় দেরি করেনি কেউই। মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই বিয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন হলো। আয়োজন জাঁকজমকপূর্ণ। খবরের কাগজেও মামুনের বিয়ের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। দেশের অনেক গুণী মানুষগুলো উপস্থিত হলো প্রকাশক আফজাল আঙ্কেলের দাওয়াত পেয়ে। কবি, লেখক, শিল্পী, অনেকেই এলো। মামুনের সাথে পরিচিত হলো সবাই। অনুর সাথে পরিচিত হলো।
দিনটি শুক্রবার ছিল। মার্চের মাঝে গরম গাঢ়তর হতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। দুপুর হলেই রোদের তীব্রতা সবাইকে ক্লান্ত করে দেয়। বিকেলের দিকটায় আচমকা মেঘলা হয়ে এলো বিয়ের দিন। সাভারের ৫তলা বিল্ডিং বেশ সুন্দর করে সাজানো হলো। শুভ্র, বাঁধন আর মমতাজ বেগম, সবাই মিলে বেশ দারুণ আয়োজন করেছেন। অনুর বিয়েতে গ্রাম থেকে লিপি আর মাহবুবও এলো ওদের সন্তান নিয়ে। বেশ খুশি ওরা। বিয়ে সম্পন্ন হলো সন্ধ্যার আগেই। এরপর বিদায়ের পালা।
বিদায়ের সময় বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে অশ্রু ঝড়াল অনু। একে একে সবাইকে জড়িয়ে ধরে আবেগ প্রকাশ করল। এরপর মামুনের সাথে গাড়িতে ওঠে বসল। ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো গাড়িটা এক নবদম্পতিকে নিয়ে ছুটে চলল শহরের পথে।
১৪৪.
বুকের উপর ভারী কিছু অনুভূব হতেই চোখ মেলে তাকালো মামুন। অনু শুয়ে আছে তাঁর বুকের উপর। ঘুমে আচ্ছন্ন মেয়েটা। বিয়ের পর আজ তাঁদের প্রথম সকাল, প্রথম দিন। পর্দার ফাকা দিয়ে যতটুকু আলো আসছে, ততটুকুতে অনুকে বেশ ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। একটা সুন্দর, সচ্ছল মুখ। মেকাপ কাল রাতেই পরিষ্কার করে ফেলেছিল অনু। ফলে এই সকালে অনুর প্রকৃত রূপটা স্পষ্ট ভাবে, এত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হলো মামুনের।
ঘুমের ঘোরেই অনুর মনে হলো, কেউ তাকে খুব তীক্ষ্ণ নজরে দেখছে। সেজন্যই চোখ মেলে তাকালো সে। মামুনের সাথে চোখাচোখি হলো। দুই সেকেন্ড সময় লাগল পুরো ব্যাপারটা বুঝতে। সে কোথায়, কীভাবে এলো, সবটাই মনে পড়ল। গতকাল তাঁর বিয়ে হয়েছে। এরপর এই বাড়িতে এসেছে। এরপর বাসর হয়েছে। এবং শেষ রাতে স্বামীর বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে৷
মামুন মাথাটা সামান্য তুলে অনুর কপালে একটু চুমু দিয়ে বলল, "ঘুম ভাঙল তাহলে।"
মুচকি হেসে ঘুমন্ত কণ্ঠে অনু বলল, "হ্যাঁ।"
"কেমন হলো ঘুম?"
"বেশ ভালো।"
"এখন উঠবে?"
আরও একটু সামনে এসে মামুনের গলা জড়িয়ে ধরল অনু। মাথাটা আবার বুকের উপর নামিয়ে বলল, "আর একটু পর। মনে হচ্ছে এই প্রথম এত আরামের ঘুম দিলাম। উঠতে ইচ্ছে করছে না।"
মামুন মৃদু শব্দ করে হাসল। এক হাত দিয়ে অনুকে জড়িয়ে ধরে বলল, "তুমি কি এখানেই থাকতে চাও, অনু? না নিজেদের একটা আলাদা বাসা চাও? আফজাল আঙ্কেলের বাড়িতে থাকতে যদি তোমার আপত্তি থাকে, তাহলে আমি আমাদের থাকার জন্য একটা ফ্ল্যাট দেখব।"
অনু মাথা না তুলে ঘুম ঘুম গলাতেই বলল, "তোমার মন কি চায়?"
মামুন বলল, "এখানেই থাকতে চাই আমি। আমার আজ যা আছে, তাতে আঙ্কেলের অনেকটা অবদান আছে। বরং অনেক বেশিই৷ উনাদেরও কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। আমি আর মাহিমা উনাদের সন্তানের মতো। আমরা চলে গেলে উনারা কষ্ট পাবেন।"
"তাহলে এখানেই থাকবো। আমারও তো শ্বশুর-শাশুড়ি দরকার; যারা আমাকে সাংসারিক কাজ শেখাবেন, দায়িত্ববোধ শেখাবেন।"
মামুন মুগ্ধ হয়ে গেল অনুর কথা শুনে। আলতো করে অনুর গালে চুমু দিয়ে বলল, "আমি সত্যিই সৌভাগ্যবান।"
অনু মাথা তুলে মামুনের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, "আর আমি সৌভাগ্যবতী।"
১৪৫.
মামুন আর অনুর সংসার বেশ সুখে, স্বাচ্ছন্দ্যে কাটতে লাগল। ভালোবাসা, রাগ, অভিমান, আহ্লাদ, সবকিছুর সংমিশ্রণে তাঁদের সাংসারিক জীবন অতিবাহিত হতে লাগল। অনু আর মামুনের বিয়ের প্রায় মাস তিনেক পর শ্রেয়সীর বিয়ে হলো অফিসের এক কলিগের সাথে। অনু আর শ্রেয়সী, দু'জনেই মানুষটাকে কাছ থেকে দেখেছে। শ্রেয়সীর অসাধারণ পার্সোনালিটিই মানুষটা পছন্দ করতো। অনুকেই প্রথম বিষয়টি জানায় ছেলেটা। এরপর অনু শ্রেয়সীর অনুমতি নিয়েই ছেলেটার পরিবারকে আসতে বলে। সব ঠিকঠাক হওয়ায় দুই পক্ষের অনুমতিতেই বিয়েটা সম্পন্ন হয়। এরপর মধ্যে অনুর কাছে আরও একটা খবর আসে। সেটা হলো নেহাল মাহিমাকে পছন্দ করে। এই ব্যাপারে মাহিমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, পড়াশোনা শেষ করার আগে বিয়ে নিয়ে ভাবছে না সে। নেহাল বিষয়টি পজিটিভ ভাবেই নিয়েছে। সেও মাস্টার্স শেষ করে ভালো একটা পজিশনে যেতে চায়। মাঝে মাঝে মাহিমার সাথে ফোনে কথা বলে সে। মাহিমাও এড়িয়ে যায় না। স্বাভাবিক ভাবে কথাবার্তা বলে। হয়তো একদিন বিয়ে হবে ওদের দু'জনের। সেভাবে আপত্তি করেনি কেউই। মাহিমা শুধু সময় চেয়েছে, আর নেহাল সমর্থন করেছে।
ওদিকে শুভ্র আর সেতুর সাংসারিক জীবনটাও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যময়। মা-বাবার খোঁজখবর নিয়মিত নিতে পারছে সে। যখন ইচ্ছে তাঁদের সাথে গল্প করতে যেতে পারছে।
দীবার কোল আলো করে এক ছেলে সন্তান আসে। এরপর প্রায় দেড় বছর পর অনু আর মামুনের জীবনেও এক নতুন সদস্যার আগমন হয়। এক মেয়ে সন্তান হয় তাঁদের। দীবা আর অনু, দু'জনেই ব্যাপারটা নিয়ে বেশ উত্তেজিত। ছেলে-মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলেই তাঁদের বন্ধুত্বের সম্পর্কের সাথে আরও একটা সম্পর্ক যুক্ত হবে।
৭৩ পর্ব/ শেষ পর্ব সমাপ্ত।
গত পর্বের লিংক - https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/862494771222687/

একজন_কোভিড_আক্রান্ত_ব্যাক্তির_ডাইরি
লেখাটা খারাপ লাগতে পারে, দয়া করে নিজের দায়িত্বে পড়ুন
#একজন_কোভিড_আক্রান্ত_ব্যাক্তির_ডাইরি
রাজকুমার মাহাতো
________________
২০ অক্টোবর,২০২০
আজ আমার ছোট্ট সোনাটাকে বাড়িতে রেখে একটু ঠাকুর দেখতে বেড়িয়েছিলাম। মা তো বছরে একবার আসে। তাও যদি এই রোগের ভয়ে তাকে না দেখি একটু আনন্দ না করি। তাহলে কি ভালো লাগে। বাচ্ছাটা নতুন জামা পড়ার জন্য বায়না ধরেছিল। কিন্তু ওকে নিয়ে বেড়োনোটা এখন একটু রিস্ক তাই ওকে রেখেই গেলাম ।আর বউ কাল থেকে মুখ ফুলিয়ে বসেছিল তাকে একদিন অন্তত প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে নিয়ে যেতেই হবে। অগত্যা কি আর করা। আজ চতুর্থির দিনেই বেড়িয়ে পড়লাম শহরের অলি-গলি ঘুরে ঠাকুর দেখতে। ঘরে বুড়ো মা বাবাকে বলেছিলাম বেড়োতে কিন্তু ওনারা বেরোয় নি। আজই আবার হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছে প্যান্ডেলের দশ মিটার গণ্ডির মধ্যে সাধারন মানুষ প্রবেশ করতে পারবে না। তবে দশ মিটার ছেড়ে যা ভিড় দেখলাম তাতে আদালতের রায়ে হাসি পেল।মহামান্য আদালত হয়ত চায়না সাধারণ মানুষের থেকে মা দূর্গার রোগ ছড়িয়ে পড়ুক। তাই মা দূর্গাকে বাঁচাতে তার এই পদক্ষেপ।যাই হোক দশ মিটার দূর থেকেই দেখে বেশি রাত না করে বাড়ি ফিরে আসলাম।এসে বাইরের বাথরুমে স্নান করে জামা-কাপড় ধুয়ে তবে ঘরে ঢুকে দেখলাম ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। দারুন কাটল আজকের দিনটা।
____________
২১ অক্টোবর,২০২০
সকালে উঠে দেখলাম মাথাটা একেবারে ধরে আছে। একেই ওয়েদার চেঞ্জ হচ্ছে কখনো ঠান্ডা কখনো গরম আর তার ওপর রাতে আবার বেশ করে সাবান মেখে স্নান করার ফলাফল এটা। গিন্নিকেও দেখলাম বেশ ভালোই ফোঁসফোঁস করছে। সকালে ব্রেকফাস্ট করে ছেলেকে একটু আদর করে মা বাবাকে পায়ে নমস্কার করে অফিসে বেড়িয়ে গেলাম। আজকেই লাস্ট অফিস তাই যেতেই হল।অফিসে গিয়ে কাজ করে সবার সাথে ভালোই কথাবার্তা বলছিলাম কিন্তু দুপুরের পর থেকে সর্দি আর কাশি শুরু হল। বস বলল “বাড়িতে গিয়ে রেস্ট নিতে।“ সবাইকে পুজোর শুভেচ্ছা জানিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। গা-হাত-পা ম্যাচ ম্যাচ শুরু হয়ে গেছে ততক্ষনে। মনে একটু ভয় ভয় ও লাগছিল।ভাবলাম নিজেকে আইসোলেট করে রাখব। কিন্তু আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে আর আইসোলেট কি হবে। একবার মা এসে দরজা খুলছে তো একবার বাবা এসে দরজা খুলছে।আর ছেলেতো বাবা বাবা করে পাগল। আসলে এগুলো ওয়েদার ফিভার। এত মাথাব্যাথার কিছু নেই এগুলো নিয়ে। সব ঠিক আছে। করোনাকে ভয় পেলে হবেনা। করোনা যেন আমাকে ভয় পায়। একটা অদেখা ভাইরাস কি আর করবে।
______________
২২ অক্টোবর,২০২০
রাতে ভীষন জ্বর এসেছিল। মেপে দেখেছিল গিন্নি ১০২…তারপর কাশিটাও বেশ ভালই পরিমানে শুরু হয়েছে। নিজেকে ঘরে বন্দি রেখেছি। একেবারে লক করেছি। দুপুরের খাবারটা গিন্নি জানালা দিয়ে দিয়েছে । শরীরে একটা অজানা যন্ত্রনা ঘিরে ধরেছে আর তার সাথে খামোকা একটা ভয়। মায়েরও দেখালাম সকাল থেকে কাশি শুরু হয়েছে। ছেলেটা এখনও ঠিক আছে। ভগবান, মা দূর্গা ওর যেন না কিছু হয়।
এখন রাত ১ টা………সন্ধ্যের দিকে একটু শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল। একটা বন্ধুকে ডাকলাম সে সব শুনে ফোনটা কেটে দিল। তারপর থেকেই সুইচ অফ তার ফোন। আমার এতে এক্টুকুও রাগ হয়নি। কারণ সে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে সুস্থ রাখতেই এই পদক্ষেপ নিল। বাহবা দেওয়া উচিৎ তাকে।আমি নিজেই এম্বুলেন্সে ফোন করেছিলাম। তারা পি.পি.ই কিট পড়ে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে আমাকে নিয়ে যেতে রাজি হল। শহরের পাচটা বড় হাসপাতাল ও সরকারি হাসপাতাল গুলো ঘুরেও বেড পেলাম না। সবাই ফিরিয়ে দিল। বেসরকারি হাসপাতাল গুলো যদিও বলল “বেড নেই স্যার।বাড়িতে চিকিৎসা করান।“ সরকারী হাসপাতাল গুলো গেট না খুলেই ফিরিয়ে দিল। ল্যাবে টেস্টের জন্য স্যাম্পেল দিয়ে আর প্রাথমিক একটা চিকিতসকের পরামর্শে অক্সিজেন নেওয়ার যন্ত্র কিনে বাড়ি ফিরলাম। এসে শুনলাম ছেলের কাশি শুরু হয়েছে। এখন কোরোনা কে একটু একটু ভয় লাগতে শুরু করেছে। জয় মা দুর্গা সব ঠিক করে দিও মা।
___________
২৪ অক্টোবর,২০২০
গতকাল লেখার সময় পাইনি একদম। রিপোর্টে করোনা পজিটিভ এসেছে আমার এবং আমার পরিবারের। তাই স্থানীয় বিধায়য়েক হাতে পায়ে ধরে আমি একটা সরকারী হাসপাতালে বেড পেয়েছি।ছেলেকে আর গিন্নিকে দিয়েছি একটা বেসরকারি হাসপাতালে আর মা বাবা আছেন অন্য একটা সরকারি হাসপাতালে। সকালে বাবাকে ফোন করেছিলাম। কথা বলতে পারল না। খুব হাঁপাচ্ছে শুনলাম। গিন্নিকে ফোন করতে বলল “ছেলে আর ও প্রায় ঠিক আছে।“ ডাক্তারদের অনুরোধ করে ডাইরিটা সঙ্গে রেখেছি। আজ অষ্টমী, মায়ের পায়ে পুস্পাঞ্জলি দেওয়া তো দূর একবার মায়ের মুখটাও দেখা হলনা। মাগো মা দুর্গা আমার পরিবারটাকে বাঁচিও মা। এ বিপদের হাত থেকে রক্ষা করো মা আমায়। বলতে ভুলে গেছি, আমার অফিসের দুটো কলিগ ও তার পরিবারও করোনা পজিটিভ। বুঝতে পারছি না আমার থেকে ওদের হল না ওদের থেকে আমার। সে যাই হোক, সবাই যেন ঠিক থাকে মাগো।
_____________
২৫ অক্টোবর,২০২০
বুকে একরাশ কষ্ট নিয়ে আজ ডাইরিটা লিখতে বসলাম। না, লেখা ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমার কাছে আজ। দুপুরের দিকে ফোন এসেছিল মা আর নেই। সকাল ১১ টা নাগাদ করোনা তাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে।আমি একবারও দেখতে পেলাম না।আমার মা’টা চলে গেল আমার জন্য। যদি সেদিন না বেরোতাম হয়ত এই দিনটা আজ আমায় দেখতে হতনা। ছেলে আর গিন্নিকে ফোন করতেও ভয় লাগছে। কি যে করব। মা দুর্গা তুমি ওদের বাঁচাও মা।আমাকে নিয়ে নাও কিন্তু ওদের ঠিক রেখো মাগো।
ভোর তিনটে বাজে ঘড়িতে……
গিন্নি ফোন করেছিল। প্রথমে ক্ষমা চাইল। বলল যদি সে মুখ ভার করে না থাকত আমি হয়ত বেরোতাম না । আর এই দিনটা আজ দেখতে হতনা। তারপর বলল “বাবা আর নেই, একটা পাঁচ নাগাদ করোনা তাকে হারিয়ে দিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।“ আমি কেবল শুয়ে শুয়ে ডাইরি লিখছি। আর কোন উপায় নেই আমার। নিজেকে পাথর করে ফেলেছি। চেঁচিয়ে বলছি করোনাকে “করোনা আমি তোমাকে খুব ভয় পেয়েছি,আমার পরিবারকে রেহাই দাও।ক্ষমা করো আমায় করোনা আমায় ক্ষমা করো।“ ভগবানের কাছে আর চাওয়ার কিছু নেই। তিনি যেভাবে কাড়তে শুরু করেছেন আমাকে নিঃস্ব না করে শুনবেন বলে মনে হয়না।
______________
২৬ অক্টোবর,২০২০
আজ আমার আর লেখার কিছু নেই। বিজয়া দশমীর সাথে সাথে আজ আমার পুরো পরিবারটার দশমী হল। হ্যাঁ একদম ঠিক লিখছি। করোনা আমাকে হারাতে পারেনি। কিন্তু আমার গোটা পরিবারটাকে হারিয়ে দিল। কাল ভোররাতে আমার ছেলেটাও চলে গেল। বউটা শুনলাম ধুক-ধুক করছে। জানি, ছেলে চলে যাওয়াতে ওর অর্ধেকের বেশি অংশ মারা গেছে। এখন খালি ওর যাওয়ার অপেক্ষা। চেঁচিয়ে বলছি আমি ডাইরির পাতায় অনবরত লিখছি “করোনা তোমাকে আমি ভয় পাইনা, একেবারে ভয় পাইনা। কি করবে তুমি আমার। হেরে গেছ তুমি,হেরে গেছ। এস আমাকে নিয়ে যাও। আমি তৈরি তোমাকে আর ভয় পাইনা আমি। এসো নিয়ে যাও।“ এবার শুধু অপেক্ষা কখন করোনা আমাকে এসে নিয়ে যায়। মৃত্যুর অপেক্ষা ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমার কাছে। আমার সব শেষ হয়ে গেল। নিজের হাতেই সব শেষ করলাম আমি। হয়ত কাল থেকে আর ডাইরি লিখব না। আমাকে কেঊ মনে রেখোনা। খালি হাত জোড় করে অনুরোধ। নিজেকে নিজের পরিবারকে বাঁচাতে “করোনাকে ভয় পাও।“আসি তাহলে। সবাই ভালো থাকবে।
_____________
__________________
_________________________
২৯ অক্টোবর,২০২০
হ্যাঁ, ডাইরি লিখব না বলেছিলাম। কিন্তু করোনা সত্যি আমাকে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে। আমি বেঁচে আছি। করোনার সাথে চ্যালেঞ্জটায় বাইরে থেকে দেখলে আমি জীতে গেছি, কিন্তু আমার মন জানে করোনা আমাকে হারিয়ে দিয়েছে। আমার সর্বস্য কেড়ে আমাকে একা করে চলে গেছে। বাড়ি ফিরে এলাম আজ। আমার বাবার বসার টেবিলে ধূলোর একটা আস্তরন জমে গেছে। মায়ের সদ্য পড়া শাড়ীটা আজ ঘরের ভিতরের একতা দড়িতে ঝুলছে। গিন্নির রান্নার তেলের কৌটোটা উলটে বেশ অনেকখানি তেল মেঝেতে পড়ে তাতে লাল পিঁপড়ে ধরেছে। ছেলের ছোটা ভীম পুতুলটাকে ঘুম পাড়ানো বিছানার এক কোনে। আর আমি একা পড়ে আছি এদের এই সব স্মৃতি দেখব বলে।
বেশ কিছুক্ষন পড় আবার লিখছি। সিলিং ফ্যানের সাথে গিন্নির চুড়িদারের একটা ওড়না আটকে রেখে ফাঁস দিয়ে রেখেছি। ডাইরির এই পাতাটা শেষ করে ঝুলে পড়ব বলে। করোনাকে বলতে চাই “করোনা তুমি জীততে পারনি আমার থেকে। আমি আমার পরিবারের কাছে যাচ্ছি। ওরা সবাই আমার অপেক্ষা করছে। “ আর আপনাদের বলতে চাই “ আপনি বীর পুরুষ আমি জানি। করোনার সাথে চ্যালেঞ্জে কেবল একরাশ না পাওয়া জুটবে কপালে। তাই বীরত্বটা নিজের পরিবারকে সুস্থ রেখে দেখান। “আসি তাহলে। বিদায় বন্ধু। আবার আসব ফিরে।

বুক_রিভিউ
#বুক_রিভিউ
বইয়ের নাম :- রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেন নি।
লেখক :- মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন।
প্রকাশনী:- বাতিঘর ।
ক্যাটাগরি :- থ্রিলার বই, রোমাঞ্চকর উপন্যাস।
প্রথম প্রকাশ :- ২০১৫ ।
রেটিং :- ৫/৫ ।
একজন মনোযোগী পাঠিকা হওয়ার সুবাদে আমার মন ভিন্ন ভিন্ন বইয়ের স্বাদ নেওয়ার জন্য সর্বদায় সচল থাকে। লকডাউনে থেকে সেই অভ্যাসটা আরো বেশি তীব্র হয়েছে।মোটামুটি ধরনের একজন থ্রিলার গল্প প্রেমী হিসাবে গতদিন আমি #রবীন্দ্রনাথ_এখানে_কখনো_খেতে_আসেননি বইটি একদিন পড়ে শেষ করেছি। এই উপন্যাসের একটি সিকুয়াল আছে, কিন্তু আজকে আমি প্রথম প্রকাশ নিয়েই পর্যালোচনা করবো। অনেকদিন ধরেই উপন্যাসটি আমার লিস্টে ছিল কিন্তু পর্যাপ্ত সময়ের স্বল্পতায় পড়ে উঠতে পারছিলাম না। আজকে আমি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে এই বইয়ের রিভিউ দিতে হাজির হয়েছি। আগেই বলে রাখি পুরো স্পইলার এইখানে আমি দিবো না। তাহলে পাঠকেরা পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
°
গল্পের শুরুতেই ছোট্ট একটা মফস্বল শহরের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, "সুন্দরপুর"। এই ছোট্ট শহর বললে ভুল হবে, নিতান্তই গ্রাম। যেখানে উন্নয়নের সুগন্ধ খুবই কম, একটা বইয়ের লাইব্রেরি অব্দি নেই। সেইখানে হাইওয়ের পাশে আশ্চর্য রকমের একটি রেস্টুরেন্ট অবস্থিত,
"রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেন নি"।রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই কখনো এখানে খেতে আসেননি, নাকি এসেছিলেন? আর কেনই বা রেস্টুরেন্টের নাম রাখা হলো রবীন্দ্রনাথের নামে? এইখানেও লুকিয়ে আছে এক বিশাল রহস্য।
• রেস্টুরেন্টের এবং সেখানকার খাবারের বর্ণনা যে এত সুন্দর ভাবে বইয়ের পাতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তার স্বাদ অন্তত রিভিউ পড়ে বোঝার ক্ষমতা রাখবে না সাধারণ পাঠক।
এই অদ্ভুত নামের রেস্টুরেন্টের মালিক মুশকান জুবেরি। যিনি ডাক্তারি পেশা ছেড়ে সুন্দরপুর এসে রেস্টুরেন্ট খুলে বসেছেন, যেখানে তিনি নিজেই রাধুনী। যদিও অদ্ভুত এই রেস্টুরেন্টকে তিনি রেস্টুরেন্ট হিসাবে দেখেন না। তার ভাষ্য মতে এটি অতিথিশালা। যার ফলস্বরূপ এইখানকার অত্যাধুনিক খাবারের মূল্য খুবই কম। এই রেস্টুরেন্টের বৈশিষ্ট্য হলো এইখানকার খাবারের স্বাদ একবার যে গ্রহণ করবে সে নিশ্চিত ভাবে আবার এই সুস্বাদু খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে ফিরে আসবে। তার হাতের রান্না খেতে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিদিন মানুষ এসে ভিড় করত। খাবারগুলোর স্বাদ অসাধারণ। যে খায়, সে-ই মুগ্ধ হয়ে যায়, কারণ এত মজাদার খাবার এর আগে তারা কেউই কখনো খায়নি। মুশকান জুবেরি রান্নার সময় এক বিশেষ উপাদান মিশিয়ে দিত সব খাবারে। এই কারণেই খাবারগুলো খেতে এত ভালো হতো। কিন্তু সেই উপাদান সম্পর্কে সে ছাড়া রবীন্দ্রনাথের অন্য কেউই জানত না।
খাবার গুলো পুরোপুরি নেশার মতো কাজ করে। মুশকান জুবেরি তার রেসিপি গুলো সবসময় গোপন রাখেন, তিনি বিভিন্ন খাবারের উপর এক্সপেরিমেন্ট করে খাবারের স্বাদ অসম্ভব মাত্রায় বাড়িয়ে দেয়।
রেস্টুরেন্টের মালিক এবং রাধুনী মুশকান জুবেরি সম্পর্কে স্থানীয় কেউ তেমন কিছুই জানে না, কেউ জানার আগ্রহও প্রকাশ করে না, কারণ তার উঠাবসা এলাকার সব সুনামধন্য ব্যক্তি বর্গের সাথে। লোকাল থানার ওসি, এস.পি, এম.পির সাথে মহিলার অনেক ঘনিষ্ঠতার কারণে এলাকার কেউ তার বিষয়ে খতিয়ে দেখার সাহস পায় না। কারণ এইসব ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গকে উপেক্ষা করে তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্র করা মানুষের অভাব। সবাই এইটুকুই জানে তিনি জোড়পুকুরের জমিদার বাড়ির নাতবউ এবং সে এইখানকার জমিদার বাড়িতেই থাকে, সেই বাড়িতেও তিনি একা, একজন কাজের বুয়া আর এক বাকশক্তি হীন ও বধির দারোয়ান ব্যাতিত আর কেউ থাকেন না। পুরোটা জুড়ে এক রহস্যময় নারী চরিত্র এই মুসকান জুবেরি। তার রহস্যে ঘেরা চরিত্র প্রতিটা মুহূর্তে পাঠক হৃদয়ে নতুন ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে তোলে।
°
এইদিকে তার রহস্য উদ্ঘাটনে ডিবি পুলিশের নামকরা একজন অফিসার নুরে সফা সাংবাদিক পরিচয়ে এই সুন্দরপুর এসেছেন । কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার ভাগ্নে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তিনি এইখানে এসেছেন। কারণ সে নিখোঁজ হওয়ার দিন ট্যাক্সিক্যাবে যেতে ঠিক এই রবীন্দ্রনাথেই এসেছিল খেতে। তদন্তে নেমে নুরে সফা আরো কিছু যুবকের নিখোঁজ হওয়ার খবর জানতে পারেন, যাদের গন্তব্যও এই রবীন্দ্রনাথেই ছিল। তাই লোকাল থানার ইনফর্মর আতরকে সাথে নিয়ে তদন্ত কাজে নেমে পড়েন সফা। তদন্ত কাজের মধ্যে যেইসব ঘটনা গুলো এইখানে তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো পড়তে বসলে যে কোনো মানুষই সেই ঘটনা স্থলে নিজেকে কল্পনা করতে বাধ্য এবং আসল থ্রিলড এক্সপেরিন্স করতে গেলে অবশ্যই এই বইটি পড়া উচিত। বাংলা সাহিত্যে অভিনব কৌশল অবলম্বন করে পুরোটা উপন্যাস জুড়ে পাঠককে এক নতুন রাজ্যে নিক্ষেপ করবে এবং গা শিউরে উঠবেই চাঞ্চল্যকর পেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে।
ডিবির প্রাক্তন কর্মকর্তা কে. এস খানের সহায়তায় নুরে সফা কেসটা আরো দ্রুত সলভ করতে সক্ষমতা অর্জন করে। যার রেকর্ডে অমীমাংসিত কোনো কেস নেই। রহস্যময়ী সেই নারীর কেস সলভ করতে এসে নূরে সফা এমন কিছু সত্যতার সম্মুখীন হয়, যেই সত্যের বর্ণনায় পাঠকের মন নির্ঘাত এক ভয়ের রাজ্যে পদার্পণ করবে। যে ভয় গুলো হাজারটা ভূতের সম্মুখীন হওয়ার সমান। সবশেষে সকলের চোখে ধুলা দিয়ে রহস্যের নতুন জগৎ তৈরির জন্য পালিয়ে বাঁচে মুশকান জুবেরি।
কী সেই রহস্য? কীভাবেই বা মুশকান পালিয়ে যায় সুন্দরপুর থেকে? আর রান্নায় কী বিশেষ উপাদান মেশাত সে? কেনোই বা মুশকান ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছিল? সবকিছু জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে 'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি' উপন্যাসটি।
এই গল্পে আপনি পাবেন অভিনব সব যৌক্তিকতা, আত্মা কেঁপে উঠা ভয়ার্তক দৃশ্য, ক্যানিবালিসম, সাইন্সটিফিক ধারণা এমনকি মানুষ মানুষের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে সেই চিত্র। স্পয়লার আমি এইখানেই শেষ করবো কারণ আমি চাইনা আপনারা এই রোমাঞ্চকর অনুভূতি থেকে বঞ্চিত হন।
•
লেখক অসম্ভব সুন্দর একটি প্লট তৈরি করে অসম্ভব সুন্দর ভাবে গল্পটি সাজিয়েছেন।
উপন্যাসের শেষের কথাটি আমার মন ছুয়ে গিয়েছে। সেইটা হলো,
"বইয়ের চেয়ে শক্তিশালী খাবার এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয় নি।"
এইখানে একজন পাঠিকা হিসাবে না বলে পারছি না অবশ্যই উপন্যাসটি একটি মাস্টারপিস । এই বিবেচনায় কোনো সন্দেহ নেই। আমি পার্সোনালি খুবই পছন্দ করেছি, পুরোপুরি মনের মতো একটি বই। আশা করি আপনারাও উপন্যাসটি পড়বেন।

গল্পঃ_চোখের_আলো (২য় ও শেষ পর্ব)
#গল্পঃ_চোখের_আলো (২য় ও শেষ পর্ব)
আমি বাসায় চলে আসি। আমি সারারাত আর ঘুমাতে পারলাম না।
আমার বিবেক আমার অপরাধের জন্য আমাকে একমুহুর্তের জন্য স্বস্তিতে থাকতে দিলোনা। এভাবে কয়েকটা দিন কেটে যায়। অবশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আমার ভুলের জন্য তৌফিক সাহেবের কাছে ক্ষমা চাইবো। আমি বলব যে, "যেই মেয়েটির সাথে আপনার ধাক্কা লেগেছিল সেই মেয়েটি আমি ছিলাম। আপনি আমাকে যা শাস্তি দিবেন আমি মাথা পেতে নেব।"
আজকে সাতদিন পর আমি তৌফিক সাহেবের বাসায় যাচ্ছি কি কি বলবো সবকিছু আগেই ভেবে ঠিক করে রেখেছি। কলিং বেল চাপ দিতেই তৌফিক সাহেব দরজা খুলে দিলেন।
-- কেমন আছেন তৌফিক সাহেব?
-- ও মিলি এসেছেন? কেমন আছেন আপনি?
-- জ্বী আমি ভালো আছি। আপনারা কেমন আছেন?
-- আমি ভালো আছি। আম্মু একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
-- কি হয়েছে আন্টির?
-- রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গে গেছে।
-- কি বলছেন! কোথায় আন্টি? আপনি চলুন তো।
আমি আন্টির রুমে যাই।
-- আন্টি কিভাবে হলো,কবে ঘটলো এই ঘটনা?
-- গতকালকে অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে রিকশা থেকে পড়ে যাই।
-- কিছু খেয়েছেন? রান্না তো নিশ্চয়ই করতে পারছেন না।
-- হোটেল থেকে আনিয়ে খাচ্ছি মা।
-- আজকে থেকে আর হোটেল থেকে আনতে হবে না। যতদিন আপনি সুস্থ না হোন ততদিন আমি এসে রান্না করে দিয়ে যাবো।
-- না মা তুমি কেন শুধু শুধু কষ্ট করতে যাবে?
-- আন্টি আমাকে নিষেধ করবেন না। এতে যদি আমার পাপের বোঝা একটু কমে।
-- কিসের পাপের বোঝা মা?
-- না আন্টা ও কিছু না। আমার মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই তো, তাই আপনার সেবা করতে পারলে আমার ভালো লাগবে। আপনি আমাকে আর নিষেধ করবেন না মা। আপনি শুধু আমাকে বলে দিন কোথায় কি কি আছে। ও দুঃখিত আমি আপনাকে মা বলে ফেললাম।
-- ঠিক আছে এখন থেকে তুমি আমাকে মা বলেই ডেকো কেমন।
-- ঠিক আছে মা। এবার আপনারা বসুন আমি ঝটপট রান্না করে নিয়ে আসছি।
তারপর আমি রাতের খাবার রান্না করে টেবিলে পরিবেশন করলাম। মা আর তৌফিক সাহেবের অনুরোধে আমাকেও উনাদের সাথে ডিনার করতে হলো। তারপর আমি আমার মোবাইল নাম্বার দিয়ে বাসায় ফিরে আসি। আমি আজকে আমার অপরাধের কথা আর তৌফিক সাহেবকে বলতে পারলাম না। যদি আজকে বলে দিতাম তখন তারা হয়তো পুলিশ ডেকে আমাকে থানায় দিয়ে দিতো তাহলে উনাদের খাওয়া দাওয়ার খুব বেশি কষ্ট হয়ে যেতো। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম মা যতদিন সুস্থ না হবে ততদিন পর্যন্ত আমি উনাদের কিছু বলবো না।
এরপর থেকে সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে আর স্কুল থেকে ফেরার সময় আমি উনাদের বাসায় গিয়ে রান্না করে দিয়ে আসি। এভাবে কয়েকদিন পার হয়ে যায়। আজকে মা আমাকে বললেন,
-- মা তৌফিকের কিছু শপিং করা দরকার আমি তো যেতে পারছিনা, তুমি কি ওকে নিয়ে কাল পড়শু একটু বসুন্ধরায় যেতে পারবে?
-- জ্বী মা অবশ্যই। আমি আগামী শুক্রবার যাবো।
আজকে শুক্রবার আমার সাপ্তাহিক ছুটির দিন তাই আমি তৌফিক সাহেবকে নিয়ে বসুন্ধরায় আসি এবং আমি নিজে পছন্দ করে উনার এবং মায়ের জন্য কেনাকাটা করি। শপিং শেষে আমরা ফাস্টফুড কর্নারে দু'জনে বসে হালকা খেতে খেতে অনেক গল্প করি।
এভাবে আরো কয়েকটা দিন কেটে গেল।
আজকে আমি বাসায় থেকে বের হবো এমন সময় মা আমাকে কল দিলো। মা আমাকে এমন একটা কথা বললো যা শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। মা আমাকে বললো,
-- মা মিলি তুমি আর আমাদের বাসায় এসো না! কেন আসতে নিষেধ করছি সেটা জানতে চেয়োনা। তুমি যদি না আসো তবে তা তোমার এবং আমাদের সবার জন্য ভালো হবে।
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মা কলটা কেটে দিলো। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে কি মা কোনোভাবে জেনে গেছে উনার ছেলের চোখের আলো নিভে যাওয়ার পিছনে আমি দায়ী? কিন্তু তা কি করে সম্ভব। না এটা কারো পক্ষে জানা অসম্ভব। তাহলে আর কি কারণ থাকতে পারে?
মা যতোই নিষেধ করুক আমি বিকেলে শেষবারের মতো একটিবার যাবো। আমার অপরাধের জন্য আমি ক্ষমা চাইবো। এরপর উনি যা শাস্তি দিবেন মাথা পেতে নিবো।
বিকেলে আমি অফিস শেষে তৌফিক সাহেবের বাসায় ঢুকতে যাবো এমন সময় দাঁড়োয়ান আমাকে গেটে জিজ্ঞাসা করল,
-- ভাবী সাহেবা তৌফিক ভাই কেমন আছেন?
-- আপনাকে কে বলল আমি আপনার ভাবী হই? এসব ফালতু কথা বলেন কেন?
-- আপনি আমার উপর শুধু শুধু রেগে যাচ্ছেন, এই বিল্ডিং এর সবাই তো এই কথাই বলছে। গতকাল মিটিং এ এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
আমি আর একমুহুর্ত দাঁড়ালাম না তাড়াতাড়ি ভিতরের দিকে পা বাড়ালাম। ওহ এই ঘটনার জন্য তাহলে মা আমাকে আসতে নিষেধ করেছেন। আর আমি ভেবেছিলাম তারা হয়তো সেই ঘটনা জেনে গেছে। আমি বাসায় গিয়ে কলিং বেল চাপ দিলাম। আজকে মা দরজা খুলে দিয়েই বললেন,
-- কেন এসেছ মা? তোমাকে তো আসতে নিষেধ করেছিলাম।
-- মা আপনাদের অনেক বেশি আপন ভেবে ফেলেছি অনেক ভালবেসে ফেলেছি তাই আপনাদের না দেখে থাকতে পারছিলাম না।
আমার আসার কারণ আমার অপরাধের জন্য ক্ষমা চাওয়া সেই কথা আমি আজকেও আর মাকে বলতে পারলাম না কারণ এই কথা বললে তারা আমাকে আর কোনোদিনই আসতে দিবে না।
-- দেখো মা মিলি তুমি অনেক ভালো একটা মেয়ে আমরাও তোমাকে অনেক ভালবেসে ফেলেছি, আপন করে ফেলেছি কিন্তু আশেপাশের লোকজন তোমার এখানে আসাটা ভালোভাবে নিচ্ছে না। ওরা নানা ধরনের আজেবাজে কথা বলছে। যেটা তোমার জন্য কোনোভাবেই ভালো হবে না তুমি এখনো অবিবাহিতা মেয়ে, তোমার তো একটা ভবিষ্যৎ আছে।
-- মা আপনি এই বিষয় নিয়ে ভয় পাচ্ছেন আমার সামনে এসে বলতে দেন। আর যদি আপনি লোকজনের কথায় এতই ভয় পান তাহলে আপনি যদি চান আর তৌফিকক সাহেব যদি রাজি থাকে আমি আপনাদের বাড়ির বউ হয়ে আসতে চাই।
-- এ তুমি কি বলছো মা! এটা কখনো সম্ভব না।
-- মা কেন সম্ভব না?
-- তুমি বুঝতে পারছ না মা তৌফিক একটা অন্ধ ছেলে ওকে কোনো মেয়ে বিয়ে করতে রাজি হবে না।
-- দেখুন মা আমি এই কয়েকদিনে যা বুঝেছি তৌফিক সাহেবের মতো ভালো মানুষ আর একটাও হয়না। উনার চোখের আলো নেই এটা কোনো সমস্যাই না। সত্যি কথা হলো আমার এই শহরে আপন বলতে কেউ নেই আমি আপনাদেরকে হারাতে চাইনা।
এতক্ষণ তৌফিক সাহেব আড়ালে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের সব কথা শুনছিলেন এবার আড়াল থেকে বের হয়ে আসলেন।
-- দেখুন মিস মিলি আমরা আপনাকে সম্মান করেছি, ভালোবেসেছি। তার মানে এই নয় যে আপনি আমাদের করুণা করবেন। আমি একজন অন্ধ মানুষ বলে আপনি আমাকে আজকে করুণা করে বিয়ে করতে চাচ্ছেন।
-- না! আপনি যা ভাবছেন তা ঠিক নয়, আমি আপনাদেরকে ভালোবাসি, তাছাড়া আমি সত্যিই আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
-- দেখুন এসব আপনার আবেগের কথা। আপনি আপনার বাসায় চলে যান। আপনি আর কখনো আমাদের এখানে আসবেন না।
-- ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি আমি আর কখনো আসবো না। তবে হ্যাঁ আমি সত্যিই আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি আমি আপনার কলের অপেক্ষায় থাকবো।
আমি উনাদের বাসা থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে চলে আসলাম। আমি আর তৌফিক সাহেবের বাসায় যাইনি এভাবে প্রায় ১০-১৫ দিন কেটে যায়। আজকে আমি অফিসে বসে কাজ করছিলাম এমন সময় তৌফিক সাহেবের কল আসে।
-- কেমন আছেন আপনি?
-- আমি ভালো আছি। আপনারা ভালো আছেন?
-- আমরা আছি মোটামুটি। মা আপনাকে খুব মিস করছিলো তাই মা বলল আপনার সাথে একটু কথা বলতে।
-- শুধু কি মা মিস করছেন, আপনি মিস করছেন না আমাকে?
তৌফিক সাহেব কোনো কিছু না বলে চুপ করে রইলো।
-- আপনার এই নীরবতাই বলছে আপনি আমাকে মিস করছেন তারমানে আপনিও আমাকে ভালোবাসেন।
তৌফিক সাহেব আমি আপনাকে ভালোবাসি, আপনি আমাকে ভালোবাসেন এখানে আপনার চোখের আলোকে আমাদের মাঝখানে দেয়াল করে রাখবেন না।
-- আপনি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন?
-- একজন মেয়ে মানুষ হয়ে আমি আপনাকে বারবার বলছি যে আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। কারণ এই কথাগুলো বলার জন্য আমার আর কেউ।
আর হ্যা যদি আপনি আমাকে নাও ভালোবাসেন, বিয়ে না করেন তাহলে আমি আমার বাকি জীবন একাই পার করে দিবো।
-- এ আপনি কি বলছেন?
-- হ্যা আমি সত্যি কথাই বলছি। সিরিয়াসলি বলছি।
-- মিলি আপনি আমাকে এতটাই ভালোবাসেন! আমি আপনার ভালোবাসার জন্য আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছি। আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজি আছি।
-- আপনি সত্যি বলছেন তৌফিক সাহেব?
-- হ্যাঁ সত্যি বলছি। তবে...
-- তবে কি?
-- যদি আপনি রাজি থাকেন।
হা হা হা হা...
ঠিক আছে আমি কালকেই আমার খালা-খালুকে নিয়ে আপনাদের বাসায় আসব। বিয়ে নিয়ে যা কথা বলা দরকার মুরুব্বিরা বলে নেবেন।
আজকে আমার অনেক আনন্দ লাগছে। আমার অনেক ভালো লাগছে এবার আমার উদ্দেশ্য সফল হবে। এবার আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা হবে।
দুপুর ১২ টা।
আমি খালা খালু কে নিয়ে তৌফিক সাহেবের বাসায় আসি। মা আমাদের জন্য আজকে অনেক কিছু রান্না করেছেন। দুই পরিবার কথাবার্তা বলে সিদ্ধান্ত নিল যেহেতু ছেলে মেয়ে দুজনেই আছে এবং জানাশোনা আছে সেহেতু বিয়ের জন্য আর দেরি করা ঠিক হবে না। ঘরোয়া পরিবেশে আমাদের বিয়ে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। সন্ধ্যার দিকে কাজী আসলেন তারপর আমাদের বিয়ে পড়ানো হয়।
রাতে আমি মায়ের দেওয়া মায়ের বিয়ের শাড়িটা পড়লাম আর তৌফিক সাহেব পড়েছে উনার বাবার বিয়ের পাঞ্জাবী। বাসর ঘরে আমি খাটে বসে আছি কিছুক্ষণ তৌফিক সাহেব রুমে ঢুকলেন, আমি ওনার হাত ধরে এনে খাটে বসালাম।
-- কি থেকে কি হয়ে গেল! মিলি কখনো ভাবি নি আপনি আমার স্ত্রী হবেন। অথচ আমার দুর্ভাগ্য আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না। আম্মু বলেছেন আপনি নাকি অনেক সুন্দর।
-- তৌফিক সাহেব আপনি কিন্তু অনেক হ্যান্ডসাম। বড় কথা হলো আপনি অনেক ভালো মনের মানুষ। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি আপনি একদিন আমাকে দেখতে পাবেন।
-- এ আর সম্ভব না। আমি আর কখনো দেখতে পাবো না।
-- আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি তো আপনি আমাকে দেখতে পাবেন। আচ্ছা আপনি কি আমাকে আপনি করেই বলবেন?
-- আপনিও তো আমাকে আপনি করে বলছেন।
-- ঠিক আছে আপনি এখন থেকে তুমি বলে ডাকবেন আর আমিও।
-- ওকে ঠিক আছে।
এরপর তৌফিক আমাকে তার বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। আমার কপালে তার উষ্ণ ছোঁয়া আমাকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমরা দুজন-দুজনার ভালোবাসায় পুরোপুরি ডুবে গেলাম।
এভাবে আমাদের দুজনের সংসার ভালই কাটছিল। আজ আমি স্কুল থেকে তৌফিককে ফোন দিলাম,
-- তুমি তৈরি হয়ে থাকবে আমি স্কুল থেকে ফিরে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
-- আমিতো অসুস্থ না তাহলে কেন আমাকে শুধু শুধু ডাক্তার কাছে নিয়ে যাবে?
-- আমি তোমাকে বাংলাদেশের একজন সেরা চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
-- দেখো ডাক্তারের কাছে গিয়ে আর কোনো লাভ হবে না।
-- তুমি এত কথা বলো না। লাভ হবে কি, হবে না সেটা সময় বলে দিবে।
-- আচ্ছা ঠিক আছে আমি তৈরি হয়ে থাকবো।
সন্ধ্যায় আমি তৌফিককে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে আসি। ডাক্তার সব কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চোখ প্রতিস্থাপন করতে হবে আর নয়তো তৌফিক কোনোদিন চোখে দেখতে পারবে না। আমরা তারপরে বাসায় চলে আসি।
দুদিন পর ডাক্তার তৌফিকের নাম্বারে কল দেন। কল দিয়ে বললেন যে একটা চোখ পাওয়া গেছে একজন স্বইচ্ছায় আপনাকে তার একটি চোখ দান করতে রাজি হয়েছেন সুতরাং আপনি চাইলেই আগামী পরশুদিন আপনার চোখ অপারেশন করা যাবে।
আমরা সবাই তখন অনেক খুশি হই। তৌফিক তো আমাকে এসে জড়িয়ে ধরে বলল,
-- মিলি আমি আবার চোখে দেখতে পারব, আমি আবার কবিতা লিখতে পারব, আমি কবিতা আবৃতি করতে পারব। আমি আবার মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে পারব। সবচেয়ে আনন্দের কথা আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে দেখতে পারবো। আমি প্রথম তোমাকে দেখতে চাই তুমি আমাকে কথা দাও যেন আমি চোখ খুলে প্রথমে তোমাকে দেখতে পারি।
-- না!
-- কেন?
--তুমি প্রথমে মাকে দেখবে তারপর আমাকে দেখবে।
-- ঠিক আছে আমি প্রথমে মাকে দেখব তারপর তোমাকে দেখব।
দুইদিন পর।
সবকিছু তৈরি হয়ে গেল আজকে তৌফিকের চোখের অপারেশন। তৌফিককে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে মা অপারেশন থিয়েটারের সামনে অপেক্ষা করতে লাগলো। আমি মাকে বললাম মা আমার একটা জরুরী ট্রেনিং আছে আমাকে কক্সবাজার যেতে হবে।
তৌফিকের অপারেশন আর তুমি এখন কক্সবাজারে যাবে!
মা যেতেই হবে নয়তো চাকরিটা চলে যাবে। মা অপারেশনের জন্য তো অনেকগুলো টাকা লেগেছে, সবতো ধারদেনা করে দিয়েছি এগুলো তো পরিশোধ করতে হবে। তবে মা আমি কথা দিচ্ছি যেদিন তৌফিকের চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হবে সেদিন আমি চলে আসব। মা আমাকে আর মানা করলেন না যেহেতু চাকরির বিষয়।
তৌফিকের অপারেশন সাকসেসফুল হওয়ার কয়েকদিন পর।
আজকে তৌফিকের চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হবে।
আমি ও মা তৌফিকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি ডাক্তার রফিকুল ইসলাম তোফিকের চোখের ব্যান্ডেজ খুলে দিলেন। তৌফিক মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো। তারপর আমাকে খুঁজতে লাগলো তৌফিক আমাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-- অপারেশন হয়েছে আমার, কিন্তু তোমার চোখে কিসের ব্যান্ডেজ?
আম্মু মিলির চোখে ব্যান্ডেজ কেন? বলো মিলির কি হয়েছে?
-- বাবা বিশ্বাস কর আমি কিছুই জানতাম না মিলি তোকে ওর একটি চোখ দিয়েছে। আর এইজন্য তুই চোখের আলো ফিরে পেয়েছিস।
-- এ কী বলছ আম্মু তুমি?
-- হ্যা বাবা, মিলি আমাকে আগে কিছু বলেনি যদি আমি ওকে বাঁধা দেই এইজন্য।
-- মিলি তুমি এটা কেন করলে?
-- তৌফিক সাহেব আপনি খুবই ভাগ্যবান আপনার স্ত্রী আপনাকে খুব ভালোবাসে উনিতো আপনাকে দুটি চোখ দান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা একটা সুস্থ মানুষের কাছ থেকে দুটি চোখ নিয়ে তার চোখের আলো নিভিয়ে দেওয়ার পক্ষে নই। তাই আমরা উনার একটা চোখ নিয়েছি।
-- মিলি তুমি এটা কেন করতে গেলে?
-- তৌফিক আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম তুমি আবার সবকিছু দেখতে পারবে। তুমি আমাকে দেখতে পারবে। তুমি আবার শিক্ষকতা করতে পারবে।
-- তুমি আমাকে এত ভালোবাসো! আমি তোমার এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।
-- এ কি বলছ তুমি? তুমি আমার স্বামী তোমার চোখেই তো আমার পৃথিবী।
-- আর আমার চোখে তোমার পৃথিবী।
এরপর আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেই। আমার মনে হচ্ছিল যেন চোখের জলের সাথে আমার মন থেকে সকল অপরাধবোধ দূর হয়ে গেল। আর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম কোনোদিনও তৌফিককে বলব না যে ওর চোখের আলো চলে যাওয়ার পেছনে আমিই দায়ী ছিলাম। যদি এই কথা তৌফিক জানে তাহলে তৌফিক ভাবতে পারে আমি ওকে ভালোবেসে নয় বরং করুণা করে আমার চোখ দিয়েছি। তৌফিক ভাববে আমি হয়তো আমার অপরাধের পায়শ্চিত্র করতে ওকে ভালোবেসেছি। তখন আমাদের মাঝে হয়তোবা দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে। আমি এটা কখনো সহ্য করতে পারব না। আমি যে তৌফিককে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।
সবাই শুভকামনা করবেন আমাদের ভালোবাসা যেন অমর হয়।
সমাপ্ত।
(ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গল্পের ভালোলাগা ও মন্দ লাগা অবশ্যই জানাবেন। সবসময়ই আপনাদের পাশে চাই।)
লেখক: সাইফুল ইসলাম
https://m.facebook.com/groups/526513374820830?view=permalink&id=861089664696531

#গল্পঃ_চোখের_আলো (১ম পর্ব)
ডক্টরের চেম্বারের সামনে বসে আছি হঠাৎ মনে হলো ঘাড়ে কেউ হাত দিচ্ছে। পিছনে ফিরে দেখি একজন পুরুষ লোক! আর কোনো কথা নাই ঠাস্ করে এক চর মেরে বসলাম!
-- বদমাইশ, লুচ্চা কোথাকার মেয়ে মানুষ দেখলে মাথা ঠিক থাকেনা! এইসব মানুষ এখানে কিভাবে যে ঢুকে?
এতোই রেগে গেলাম যে মুখে যা আসলো তাই ফেললাম। লোকটি একবার কিছু বলতে চাচ্ছিলো কিন্তু এক ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলাম। এরপর লোকটি একটা টুঁ শব্দ পর্যন্ত করলো না। আশেপাশের লোকজন আমার অবস্থা দেখে এমন অবাক হলো যে তারাও আর কোনো কথা বলল না। শেষে আমিই ক্লান্ত হয়ে যাই আর শান্ত হয়ে বসে থাকি। কিছুক্ষণ পর আমার সিরিয়াল আসে আর আমি ডাক্তারের চেম্বারের ভিতরে ঢুকে যাই। এরপর সেদিন আমি ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় চলে আসি।
ঘটনার ১৫ দিন পর আজকে আবার আমি ডাক্তারের কাছে আসি। তিন তলায় উঠেই দেখি আজকেও সেদিনের লোকটা চেম্বারের সামনে বসে আছে। আমি লোকটাকে দেখতে পেয়ে একটু দূরে গিয়ে বসি। আর লোকটার উপর নজর রাখছি যে আজকে আবার পিছন থেকে কোনো মেয়ের শরীরে হাত দেয় কি না। আজকে যদি কারো শরীরে হাত দিতে দেখি তাহলে আজকে লোকটাকে ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করব।
যেই ভাবা সেই কাজ আমি খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর ডাক্তারের এ্যাসিস্ট্যান্ট "তৌফিক সাহেব আছেন এবার আপনার সিরিয়াল" বলে ডাকলো। আমি দেখলাম একজন ভদ্র মহিলা লোকটির হাত ধরে ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে গেল, লোকটির হাতে সাদা ছড়ি। আমি বুঝতে পারি লোকটি অন্ধ, চোখে কিছু দেখতে পায় না।
আর এই অন্ধ লোকটাকে আমি সেদিন এত অপমান করলাম! এখন আমার নিজেকেই খুব ছোট মনে হচ্ছে।
ইশ্ আমি না জেনেই সেদিন এই অন্ধ লোকটাকে চড় মেরেছি! কত বড় ভুল হয়ে গেছে।
আমি বারবার অনুতপ্ত হতে লাগলাম।
১০ মিনিট পর ভদ্রমহিলা লোকটিকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হতেই আমি তাড়াতাড়ি তাদের কাছে যাই।
-- এক্স কিউজ মি আন্টি। একটু কথা বলতে পারি?
-- হ্যা অবশ্যই বলো মা কি বলবে?
-- উনি কি আপনার ছেলে?
-- হ্যা, ও আমার একমাত্র সন্তান তৌফিক।
-- উনার চোখে কি হয়েছে?
-- সে অনেক কথা মা একটি দূর্ঘটনা আমার ছেলেটার চোখের আলো কেড়ে নেয়। ও এখন আর কিছুই দেখতে পায় না। কিন্তু তুমি কে মা? তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না।
-- আমার নাম মিলি। আমিও ডাঃ আরিফুল ইসলাম স্যারের পেশেন্ট।
-- ও আচ্ছা। তা মা তোমার কি ডাক্তার দেখানো হয়ে গেছে?
-- না আন্টি আজকে আমার সিরিয়াল অনেক পরে।
-- তাহলে মা আমার একটু উপকার করবে?
-- জ্বি অবশ্যই বলুন আন্টি কি করতে হবে।
এতক্ষণ লোকটি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো, এবার একটু এগিয়ে আসলো।
-- আম্মু কার সাথে কথা বলছো?
-- এইতো বাবা একটি মেয়ের সাথে।
-- ও আচ্ছা ঠিক আছে তুমি কথা শেষ করো আমি এখানেই বসছি।
-- আন্টি কি করতে হবে বলেন।
-- হ্যা মা আমাকে এই ঔষধগুলো এনে দিতে পারবে? আমিই যেতাম কিন্তু ওকে একা রেখে যেতে পারছি না। সেদিন ওকে রেখে ৫ মিনিটের জন্য বাথরুমে গিয়েছিলাম। আমি ওর ছড়িটা সামনের চেয়ারে দাঁড় করিয়ে রেখে গিয়েছিলাম। এসে শুনি ওর ছড়িটা নাকি নিচে পরে যায় তারপর সেটা খুঁজতে গিয়ে সামনের চেয়ারে বসে থাকা কোনো একজন মেয়ের গায়ে হাত লেগে যায়। মেয়েটি সবার সামনে ওকে আজেবাজে নানারকম কথা তো বললোই এমনকি ওকে চড় মেরে বসে। তৌফিকের কথাটা পর্যন্ত মেয়েটা শুনলো না। সেদিন ও একটু প্রতিবাদও করেনি। কারণ না জেনে হলেও ও অন্যায়টা করেছে।
সেদিন বাসায় গিয়ে নামাজ পড়ে নিজের অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটি করে। জানো মা আমার ছেলেটা অনেক মেধাবী ও ভদ্র-নম্র একটা ছেলে। ও মেকানিক্যাল ইন্ঞ্জিনিয়ার আবার কোরআন এ হাফেজ। খুব ভালো কবিতা লিখত ও আবৃত্তি করত। দূর্ঘটনার পর এখন আর কিছুই করতে পারে না। নামাজটা পর্যন্ত মসজিদে গিয়ে পড়তে পারে না। আর আগে সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়ার চেষ্টা করত। এখন আর সেটাও পারে না। আর এমন একটা সোনার টুকরো ছেলেকে কোন মেয়ে কত কি বাজে বাজে কথা বললো।
ভদ্রমহিলা কাঁদতে লাগলো। আর এসব কথা শুনে আমার আরো বেশি নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগলো। আমার চোখেও জল গড়িয়ে পড়লো।
-- একি মা তুমি কাঁদছো কেন?
-- আপনার কান্না দেখে আমি আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলাম না। আমি কারো চোখের পানি সহ্য করতে পারিনা।
-- ঠিক আছে মা এইতো আমি চোখের জল মুছে ফেললাম।
-- আন্টি প্রেসক্রিপশনটা আমাকে দিন, আর আপনি উনার সাথে বসুন আমি এখনি গিয়ে ঔষধগুলো নিয়ে আসছি।
আমি প্রেসক্রিপশন নিয়ে নীচতলা থেকে গিয়ে ঔষধগুলো নিয়ে এসে ভদ্রমহিলার হাতে দিলাম।
-- অনেক ধন্যবাদ মা তোমাকে। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক।
-- ঠিক আছে আন্টি এ আর এমন কি।
-- তা মা তোমার বাসা কোথায়?
-- কলাবাগান ২ নাম্বার লেন।
-- ওহ তাই নাকি! আমার বাসাও তো কলাবাগানের ডলফিন গলিতে ৬৯ নাম্বার বাসা। তাহলে মা একদিন বিকেলে বাসায় চলে এসো, চা খেতে খেতে গল্প করা যাবে।
-- ঠিক আছে আন্টি অবশ্যই যাবো।
মিস মিলি আছেন? মিস মিলি আপনার সিরিয়াল এখন।
-- আন্টি স্যারের এ্যাসিস্ট্যান্ট আমাকে ডাকছে।
-- ঠিক আছে মা তুমি তাহলে ডাক্তারের চেম্বারে যাও। আমরাও বাসায় চলে যাচ্ছি। আর হ্যা একদিন কিন্তু অবশ্যই আসবে কথা দিয়েছ কিন্তু।
-- ঠিক আছে আন্টি আসবো। আপনারা সাবধানে যাবেন। আল্লাহ হাফেজ।
-- আল্লাহ হাফেজ।
আমি ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় আসতে আসতে রাত ১ টা বেজে যায়। আমার পরে আরও ১০ জন পেশেন্ট! মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই ডাক্তাররা একদিনে এত রোগীর প্রেশার কিভাবে নিতে পারে! আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সেদিনের ঘটনাগুলো ভাবতে লাগলাম।
-- আমার আসলে সেদিন ঐভাবে রিয়্যাক্ট করাটা একদমই ঠিক হয়নি। আমার উচিৎ লোকটির কাছে ক্ষমা চাওয়া। আমি কাল-পরশুর মধ্যেই উনাদের বাসায় যাবো ক্ষমা চাইতে।
এরপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
কিন্তু এরপর আমি নানারকম কাজের ঝামেলায় তৌফিক সাহেবের কথা একদম ভুলেই যাই।
তিনদিন পর। সকাল ৭.৩০।
আমি স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। আমি একটা প্রাইভেট স্কুলের টিচার। মা-বাবা দুজনেই মারা গেছেন একমাত্র ছোট ভাই আমেরিকা প্রবাসী। তাই স্কুলই আমার আপন ঠিকানা। আজকে স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থাকায় স্কুল নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ছুটি হয়ে গেছে। আমি একটা রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরে আসছি।
-- মামা মামা একটু রিকশাটা দাঁড় করান তো।
আমি রিকশা থেকে নেমে তাড়াতাড়ি রিকশা ভাড়া দিয়ে একটু পিছনে গেলাম।
-- আরে তৌফিক সাহেব আপনি এখানে কি করছেন?
-- আপনি নিশ্চয়ই মিলি?
-- ও মাই গড! আপনি আমাকে চিনতে পারলেন কেমন করে?
-- আপনার কণ্ঠস্বর আমার মনে আছে।
-- শুধুমাত্র আমার কন্ঠস্বর শুনে আপনি আমাকে চিনে ফেলতে পারলেন সত্যিই অবিশ্বাস্য! তো আপনার সাথে কাউকে দেখছি না যে?
-- আমার তো কেউ বলতে শুধু আম্মু। আর আম্মু তো এখন অফিসে।
-- একা একা বের হলেন কেন? যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়?
-- আসলে আমার ওষুধ শেষ হয়ে গিয়েছিল তো আম্মুকে বলতে মনে ছিল না।
-- তা ঔষধ কিনেছেন?
-- না যাচ্ছিলাম আরকি।
-- ঠিক আছে চলুন আমি আপনার সাথে যাচ্ছি। যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে।
-- ঠিক আছে চলুন আপনি যেহেতু চাচ্ছেন।
আমরা হেঁটে যাচ্ছি। কিন্তু আমার অপরাধবোধের জন্য আর কোনো কথা বলতে পারছি না। তৌফিক সাহেব নিজেই কথা বলতে শুরু করলেন।
-- তো আপনি কোথাও যাচ্ছিলেন নাকি ফিরছেন?
-- আমি স্কুল থেকে ফিরছিলাম।
-- ওয়াও! আপনি তাহলে একজন টিচার!
-- আপনি এত অবাক হলেন কেন?
-- আসলে আমার খুব ইচ্ছে ছিল শিক্ষকতা করার। আমার বাবাও একজন টিচার ছিলেন তো।
-- আপনি চাইলে এখনো শিক্ষকতা করতে পারেন।
-- না তা আর সম্ভব না। আচ্ছা বাদ দেন এই প্রসঙ্গ। আপনার তো বাসায় ফিরতে দেরি হয়ে যাবে। আপনার ছেলে মেয়েরা নিশ্চয়ই বাসায় আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
-- হা হা হা হা।
-- কি ব্যাপার আপনি হাসছেন কেন?
-- আপনার কথা শুনে। আমার তো বিয়েই হয়নি!
-- ও আচ্ছা আমি দুঃখিত।
-- আসলে আমার মা-বাবাও বেঁচে নেই। একটা ছোট ভাই আছে ও আমেরিকা থাকে। তাই আমার জন্য অপেক্ষা করার কেউ নেই। আমরা ফার্মেসিতে চলে এসেছি। আপনার প্রেসক্রিপশনটা দিন।
আমরা ঔষধ কিনলাম। তারপর তৌফিক সাহেবকে নিয়ে উনার বাসায়
আসি।
-- আপনি এখানে বসুন আমি আপনার জন্য একটু চা নিয়ে আসছি। আর এরমধ্যে আম্মু চলে আসবে।
-- না না আপনি এত ব্যস্ত হবেন না। তাছাড়া আমি চা খাই না। আমি শুধু ব্ল্যাক কফি খাই।
-- আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমিতো চা কফি কিছুই বানাতে পারিনা, তাই আম্মু শুধু চা বানিয়ে ফ্লাস্কে রেখে যায়।
-- আপনি কফি খান তো?
-- তা খাই।
-- বাসায় কফি আছে?
-- হ্যা আছে। কিন্তু বানানোর মত কেউ নেই।
-- আপনি এখানে বসুন। আর রান্নাঘরটা কোথায় আমাকে বলুন আমি এক্ষুনি দুই কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে আসছি। আমার হাতের বানানো কফি কিন্তু অনেক ভালো হয়।
-- আপনি অতিথি আপনি কেন শুধু শুধু কষ্ট করবেন?
-- আপনি বসুনতো তৌফিক সাহেব।
আমি ঝট করে দুই কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে আসি এবং তৌফিক সাহেবকে এক কাপ কফি দেই।
-- বাহ্! অসম্ভব রকমের ভালো কফি হয়েছে।
-- ধন্যবাদ। ধন্যবাদ। আসলে এতটাও ভালো না, মোটামুটি।
-- তৌফিক সাহেব আপনাকে কিছু কথা বলার ছিলো।
-- ওসব কথা ভুলে যান। আমি কিছু মনে করিনি আমিও সব ভুলে গেছি।
তৌফিক সাহেবের কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
-- আপনি কি জানেন আমি কোন কথা বলতে চাচ্ছিলাম?
-- দেখুন মিস মিলি, সেদিন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য আপনি খুব অনুতপ্ত হয়েছেন, আপনি বুঝতে পেরেছেন প্রকৃত ঘটনা না জেনে কাওকে অপরাধী মনে করে শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়। আপনি যেহেতু আপনার ভুল বুঝতে পেরেছেন তাই আপনাকে আর ক্ষমা চাইতে হবে না।
-- আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন যে, আমিই সেদিনের সেই মেয়ে?
-- আপনার কণ্ঠস্বর আমি কখনো ভুলতে পারবনা। কাউকে চিনতে পারার এটাইতো আমার একমাত্র মাধ্যম।
-- সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমি সত্যিই ভীষণ অনুতপ্ত। প্লীজ আমাকে দয়া করে ক্ষমা করে দিন।
-- ছিঃ আপনি ক্ষমা চেয়ে আমাকে আর লজ্জা দিবেন না তো। আমি আপনাকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি।
-- যাক বাবা এখন মনে একটু শান্তি পাচ্ছি।
এমন সময় হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠলো।
-- নিশ্চয়ই আম্মু চলে এসেছে! আপনি বসুন আমি দরজা খুলে দিচ্ছি।
-- আরে আপনি বসুন তো তৌফিক সাহেব, আমি দরজা খুলছি।
-- আরে এত দেখছি মিলি মা। তা কখন এসেছ মা?
-- আসলে আন্টি আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলাম, হঠাৎ তৌফিক সাহেবকে দেখি রাস্তায় আর তারপর আসি।
-- তৌফিক তুই আবারো একা একা বাসা থেকে বের হয়েছিস? তোকে কতবার করে মানা করেছি।
-- মা আসলে চোখের ড্রপটা শেষ হয়ে গেছে।
-- ইশ্ আমারই মনে ছিলোনা কিনে দিয়ে যেতে।
-- তুমি একা মানুষ আর কত কি মনে রাখবে মা। আমি তো তোমার অভাগা ছেলে। আমার জন্যই তোমার এত কষ্ট। সব দোষ আমার।
-- তোর কোন দোষ নেই বাবা। সব দোষ ঐ মেয়েটার।
-- মা শুধু শুধু না জেনে একটা মেয়েকে দোষ দিওনা তো। মেয়েটি তো ইচ্ছে করে কিছু করেনি। মেয়েটি নিশ্চয়ই জানেও না তার জন্য আমার চোখের আলো নিভে গেছে।
-- তুই যতোই বলিস সব দোষ ঐ মেয়েটার।
-- আচ্ছা মা তুমি এসব কথা কেন তুললে? বাসায় একজন গেস্ট এসেছে, উনাকে কিছু খেতে দাও।
-- ওহো সরি মা, তুমি বসো আমি তোমার জন্য কফি নিয়ে আসছি।
-- আন্টি আপনি এত ব্যস্ত হবেন না। আপনি অফিস থেকে ফিরেছেন আপনি আগে ফ্রেশ হোন। তাছাড়া আমি আর তৌফিক সাহেব দুজনেই কফি খেয়েছি।
-- হ্যা আম্মু, আমি উনাকে মানা করেছিলাম কফি বানাতে, কিন্তু উনি আমার কোনো কথাই শুনলেন না। তবে আম্মু উনি অসম্ভব রকমের ভালো কফি বানিয়েছেন। তোমার ভাগ্য খারাপ তাই মিস করলে।
-- মোটেও ভাগ্য খারাপ না। আন্টি আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন তো আমি আপনার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে আসছি।
-- না মা আজ আর তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। অন্য কোনো দিন বানিয়ে খাওয়াবে।
-- ঠিক আছে আন্টি। আন্টি আজকে আমি তাহলে আসি।
-- ও মা আসবে কি! বসো আমি তোমার জন্য পায়েস রেঁধে নিয়ে আসছি।
-- ওয়াও পায়েস! পায়েস আমার খুব প্রিয়। দিলেন তো লোভ দেখিয়ে আটকে।
-- হা হা হা হা। তাই নাকি! তৌফিকও পায়েস খেতে খুব পছন্দ করে। শেষে পাতিলে একটু লেগে থাকলে সেটা পর্যন্ত আঙ্গুল দিয়ে চেটে চেটে খায়!
হা হা হা হা।
-- আম্মু তুমি কিন্তু আমাকে লজ্জা দিচ্ছ! তুমি যাওতো তাড়াতাড়ি পায়েস বানিয়ে নিয়ে আসো। পায়েসের নাম শুনলে যতক্ষন না খাবো ততক্ষণ আমার জিহ্বা শান্তি পাবেনা!
হা হা হা হা।
এবার তিনজনেই হা হা হা হা করে হাসতে লাগলাম।
-- অনেকদিন পর এভাবে প্রাণ খুলে হাসলাম।
-- আন্টি আমিও অনেকদিন পর হাসলাম।
-- ঠিক আছে মা তুমি বস আমি এখনি আসছি।
আন্টি ভিতরে চলে গেলেন।
-- আচ্ছা তৌফিক সাহেব কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
-- আপনি বলুন কি জানতে চান?
-- আচ্ছা আপনার দুর্ঘটনা কিভাবে ঘটেছিল? কোনো একটা মেয়ের কথা যেন আন্টি বলছিলেন।
-- সে অনেক কথা আপনি বিরক্ত হয়ে যাবেন।
-- না না আমি বিরক্ত হব না। আপনার যদি কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে আপনি বলেন, আমি শুনবো।
-- একবছর আগের ঘটনা। সময়টা ছিলো বর্ষাকাল, বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি আমরা অনেকেই একটা শপিং মলের সামনে অপেক্ষা করছিলাম। তখন একটা গাড়ি আসে আর একটা মেয়ে গাড়িতে উঠার জন্য দৌড় দেয় আর আমার সাথে ধাক্কা লাগে। আমি নিজেকে ব্যালেন্স রাখতে পারিনি আমি পিছলে পড়ে যাই এবং মাথায় প্রচণ্ড রকমের আঘাত পাই। মেয়েটির খুব তাড়া ছিল তাই আমার পড়ে যাওয়া হয়তোবা লক্ষ্য করেনি। মেয়েটি গাড়িতে উঠে চলে যায়। আর লোকজন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় কিন্তু বৃষ্টির জন্য হাসপাতালে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যায়। যখন আমার জ্ঞান ফিরে আসলো আমি আর চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। তখন ডাক্তাররা সব পরীক্ষা করে জানাল আমার দুটি চোখই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। একমাত্র নতুন চোখ প্রতিস্থাপন করতে পারলে আমি দেখতে পারব। এই ছিলো সেদিনের ঘটনা।
-- তৌফিক সাহেব সেদিন আপনি কোন শপিং মলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন?
-- স্টার ওয়ার্ল্ড শপিং মল।
-- কি!
-- সেদিন কত তারিখ ছিল?
-- ২২ শেষ আষাঢ়।
-- কি বললেন!
তৌফিক সাহেবের কথা শুনে আমি বসা উঠে পড়লাম।
-- তৌফিক সাহেব আপনার কি ঠিক মনে আছে সেদিন ২২ তারিখ ছিলো?
-- আমি কি করে ভুলতে পারি সেদিনের ঘটনা? কিন্তু আপনি এত অবাক হয়ে গেলেন কেন?
-- কই নাতো। তৌফিক সাহেব আমি আজকে উঠি।
-- একি আম্মু আপনার জন্য পায়েস রেঁধে আনতে গেলো, একটু বসুন।
-- না তৌফিক সাহেব আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। আমাকে এখুনি বাসায় যেতে হবে।
আমি আর একমুহুর্ত দেরি না করে তৌফিক সাহেবের বাসা থেকে বের হয়ে যাই।
চলবে...
(ভুলত্রুটি মার্জনীয়)
লেখক: সাইফুল ইসলাম

অবহেলিত ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ভালোবাসা।
জীবনে প্রথমবার হয়তো গল্প লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করছি, ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।
অবহেলার একটা লিমিট থাকা দরকার। কেউ
একজন তোমাকে দিনের পর দিন কেয়ার করে
যাচ্ছে, আর তুমি সেগুলো মুচকি হেসে এড়িয়ে গিয়ে ভাবছো এসব তোমারই প্রাপ্য। এরকম তো কতো জনই আছে কেয়ার করার।এমনটি যদি ভেবে থাকো তাহলে তুমি ভুল ভাবছো। হাজার মানুষের কেয়ারের ভিরে তুমি আসল মানুষের আলাদা কেয়ারটুকু টের পাচ্ছোনা। একদম না। কেউ একজন তোমার ছোট্র একটি "টেক্সের"
আশায় ঘন্টার পর ঘন্টা ডাটা অন রেখে কি
পরিমান ছটফট করতে পারে তুমি সেটা দেখনা বলে এমনটা ভাবছো।
মেসেজবক্সে হাজার হাজার শব্দ মিলিয়ে দু-ঘন্টা ধরে সাজানো কষ্টের ভাষা গুলো লিখে সেন্ড
করার ঠিক আগ মূহুর্তে ডিলিট বাটনে চাপ দিয়ে রাখাটা যেকতটা যন্ত্রনার তুমি সেটা বুঝোনা বলে এমনটি করো।
তোমার একটি মাত্র ফোন কলের আশায় বিছানার এপাশ-ওপাশ করে। কতো যে নির্ঘুম কেটে গেছে মানুষটির তুমি সেটা কখনই জানতে পারোনা বলে
মানুষটিকে সস্তাভাবো। বিশ্বাস করো তোমার থেকে
অবহেলা পাওয়া এই মানুষটা মোটেই সস্তা কোনো মানুষ নয়।অদ্ভুদ রকমের একটা ধর্য্য-শক্তি আছে তার মাঝে। তুমি ধারনাও করতে পারবেনা তার সিম্পল একটি মেসেজের জন্য কতো মানুষ যে পাগল হয়ে আছে। অথচ সে
তোমার জন্য পাগল। স্রেভ তোমার জন্য তার হৃদয়ের
জায়গাটুকু বরাদ্দ।মনে রাখবে "ধাক্কা দিয়ে ফেলে
দেওয়া মানুষের অভাব নেই পৃথিবীতে। কিন্তু
পড়ে যাওয়া মানুষটিকে হাত ধরে টেনে তোলার
মানুষের বড়ই অভাব।
তোমার এত অবহেলা পাওয়ার পরও কিন্তু সেই ছেলেটি তোমাকে কোনো ভাবেই ছাড়লো না।
তোমাকে ভালোবাসার কারণে সেই ছেলেটি তোমার সকল অন্যায় পাপ কাজ মুখ বুঝে ক্ষমা করে নিলো,শুধুমাত্র তোমার প্রতিশ্রুতি দেয়ার কারণে, যে তাকে ছাড়া কোন কিছুই ভাবতে পারবে না। যা করবে তার পরামর্শ অনুযায়ী। এখন থেকে ছেলেটি তার জীবনের সব। সে ছাড়া অন্য কোন ছেলের সাথে কোন ভাবে জড়িত থাকবে না।
বরং এখান থেকে শুরু হল তোমার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া। এভাবে মেয়েটি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর ছেলেটি ভুলের ক্ষমা করতে করে কাটিয়ে দিলেো কয়েকটা মাস।
কখনো কি ভেবে দেখেছো, যে তাকে আমি এত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি পরবর্তীতে সে যখন আমার সম্পর্কের সকল কিছু জানতে পারবে তার অবস্থাটা কতটুকু ভয়াবহ খারাব হবে।
শেষ মুহূর্তে যখন ছেলেটি ভাবলো মেয়েটির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিন দিন বেড়েই চলেছে, তার সাথে এভাবে থাকা সম্ভব না। এভাবে যদি আর কিছুদিন ছেলেটি পার করে তাহলে তার জীবনের শেষ মুহূর্ত চলে আসবে। তাই সে এই অনিশ্চিত জীবন থেকে বেরিয়ে আসার সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইল। মেয়েটির বিভিন্ন ভুলের কারণে প্রায় একমাস তারা সম্পর্ক বিচ্ছেদ ছিল।
কিন্তু ছেলেটি সেটা আর পারল না। মিয়েটা খুব আকুতি-মিনতি শুরু করল তার জীবনে থাকার জন্য। শেষবারের মতো মেয়েটি তার কাছে প্রতিশ্রুতির আবদ্ধ হল। সব পরিস্থিতিতে সে ছেলেটির পাশে থাকবে হাত ধরে।অন্য কোন ছেলের সাথে কোন ভাবে জড়িত থাকবে না। পরিবারকে ছেড়ে হলেও সে ছেলেটির কাছে চলে আসবে, সারা জীবন একসাথে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য।
ছেলেটি তাকে শেষবারের মত বিশ্বাস করে তার প্রতিশ্রুতিতে রাজি হয়ে গেল।
কিন্তু মেয়েটি কি সত্যিই তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়াটা রাখতে পারবে। ছেলেটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নিলো যে মেয়েটি আর হয়তো কোন ভুল করবেনা।
কিন্তু কি হলো শেষ পরিণতিটা,
মেয়েটি আবারও অন্য ছেলের সাথে বিভিন্ন ভাবে জড়িত হয়ে গেল প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কিছুদিনের মাঝেই। তখন আর ছেলেটির এই সম্পর্কটা ঠিক রাখা সম্ভব হলো না। ছেলেটি তাকে সকল স্মৃতিময় জিনিসগুলো ফেরত দিয়ে দিলো এবং সাথে ভালোবাসার হিসেবে নতুন কিছু দিয়ে আসলো।
এভাবেই শেষ হয়ে গেল একটা ছেলের সারা জীবন মেয়েটির হাত ধরে বেঁচে থাকার বাস্তব গল্প।
গল্পে বাস্তব জীবনের এক-তৃতীয়াংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল ভালোবাসা।
লেখক,
তূর্য রহমান শুভ।

Day
'রুশা, কাল থেকে আমি তোর সঙ্গে এ রুমে ঘুমাবো। আর রাতুল তোর বাবার সঙ্গে ওর রুমে থাকবে।'
খানিকটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম , 'আর তোমাদের রুম?'
মা নরম গলায় বললো, 'ওই রুমটা সাবলেট হিসেবে ভাড়া দিয়ে দিব। এটাচড বাথরুম আছে, বের হওয়ার জন্য সিঁড়ির দিকে আলাদা দরজাও আছে। শুধু রান্না করার জন্য আমাদের রান্নাঘরটাতে একটু ছাড় দিতে হবে। ওটাতে সমস্যা নেই, ও ঠিক মানিয়ে নিবো।'
মন খারাপ নিয়ে বললাম, 'মা, আমাদের বাসার ব্যালকনিটাও তো ওই রুমেরই সঙ্গে!'
'তাতে কী হয়েছে! রুমের মধ্যে যখন একঘেয়ে লাগবে, তখন ছাদে যাবি।'
'বাবা কী এই সিদ্ধান্তে একমত?'
'হ্যাঁ, বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে নিয়েছে তোর বাবা। বিকেলেই টু-লেট লাগিয়ে দিবে। রুমটা তো খুবই সুন্দর। দেখবি তাড়াতাড়িই ভাড়া হয়ে গিয়েছে।'
আমি চুপ করে ভাবতে লাগলাম, সময় মানুষকে কীভাবে বদলে দেয়!
মা পাশে বসে সান্ত্বনার স্বরে বললো, 'আমরাও-বা এত বড় বাসা দিয়ে কী করবো বল! তাছাড়া নতুন ভাড়াটিয়া এলে কিছু টাকাও বাঁচলো আর গল্প করার মত মানুষও পাওয়া গেলো।'
আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট দু'টো প্রসারিত করে মাথা ঝুঁকলাম।
আমি জানি, সমস্যাটা আসলে বড় বাসা কিংবা গল্প করার মানুষের অভাবের নয়। সমস্যা হলো, টাকার। এই মুহুর্তে ব্যয়ের তালিকায় টাকার পরিমাণ যত কম রাখা যায় আর আয়ের তালিকায় যত টাকা যোগ করা যায়, ততই মঙ্গল।
রাতের মধ্যে বড় রুমটা খালি করে জিনিসপত্র সব আমার আর রাতুলের রুমে আনা হলো৷ সপ্তাহ খানেক হলো রাতুলের টিউটর বিদায় হয়েছেন৷ ওকে পড়ানোর দায়িত্ব এখন আমার। টিউটরের সঙ্গে কাজের বুয়াকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। আমি মাকে কাজে সাহায্য করার যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও মায়ের উপর বেশ চাপ পড়ে যায়, বুঝতে পারি।
সংসারে অভাব ঢুকে পড়ার পর থেকে হিসেব জিনিসটার সঙ্গে দিনদিন বেশ পরিচিত হয়ে উঠছি। যখন তখন চা খাওয়ার অভ্যেসটাকে বিদেয় দিয়েছি৷ সকাল আর সন্ধ্যা ছাড়া বাসায় এখন আর চা করা হয় না। খাবারের তালিকায় কম দামের শাক সবজির স্থান বেশি। মাছের ক্ষেত্রে সস্তা দামের মাছটাই স্থান পায়। রাতুল এখন তার প্রিয় মাছ ইলিশের বদলে তেলাপিয়াকেই প্রিয় করে ফেলেছে। বাবা এখন বয়লার মুরগি খাওয়া শিখলেও গোশতটা খুব কমই খাওয়া হয় বাসায়। রাতে খাওয়া শেষে অবশিষ্ট থাকা ভাতগুলো মা এখন আর ফেলে দেয় না৷ ওগুলো কিছু চালের সঙ্গে দিয়ে রান্না করে সকালে খাওয়া হয়।
'মা, একটা কথা বলার ছিলো।'
ভাতের হাঁড়িটা উপুড় করে মা বললো, 'হ্যাঁ। বলে ফেল।'
'বলছিলাম, পাশের বাসার রুম্পা আর টুম্পার জন্য আন্টি টিউটর খুঁজছেন। তো ওদেরকে যদি আমি পড়াই তাতে কী অসুবিধা হবে?'
মা চুপ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে বললো, 'তোর বাবা কখনো চাইতেন না, তার সন্তানেরা এতটুকু কষ্ট করুক কোথাও। আর এখন!'
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মা। আমি সরল গলায় বললাম, 'কাউকে পড়ালে জ্ঞান বাড়ে মা, কমে না। আমি মনে করি, প্রত্যেকের ছাত্রজীবনে শিক্ষক হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকা উচিত৷ সে হোক যত ধনবান। এই অভিজ্ঞতা অবশ্যই অনেক আনন্দের।'
মা সায় দিলে আমি রুম্পা আর টুম্পাকে পড়ানো শুরু করি। বাবার চাকুরিটা চলে যাওয়ার পর থেকে সংসারে বিপর্যয় নেমে আসে। আপনজনেরাও আস্তে আস্তে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে শুরু করে। আমাদের বাসায় একসময় যাদের খুব বেশি যাতায়াত ছিলো তাদের এখন ডেকেও পাওয়া যায় না। মা বলে, টাকা ফুরালে আত্মীয় স্বজনদের টানও ফুরায়। বাবা বলে, ওরা সব দুধের মাছি ছিলো।
বাসায় নতুন ভাড়াটিয়া উঠেছে। রান্নাঘরের অর্ধেকটা মা এখন তাকে ছেড়ে দিয়েছে। অল্প স্থানে মায়ের কাজকর্ম সারতে বেশ কষ্ট হয়ে পড়লেও মা হাসিমুখে সব সামলে নেয়। বিদ্যুৎ খরচের বেলায়ও এখন মা হিসেব করা শুরু করেছে। খুব বেশি দরকার না পড়লে ফ্যান চালায় না, লাইট জ্বালায় না, সিরিয়াল দেখে অবসর যাপন করা মা এখন খুব বেশি একঘেয়ে হয়ে না পড়লে টিভি দেখে না।
রাতুল সেদিন হেসে বলে, 'আপা, ভাগ্যিস ফ্যানের গতি কম আর বেশি হোক একই বিদ্যুৎ খরচ হয়। না হলে মা ফ্যানের গতি সবসময় কমের দিকেই রাখতো।'
কথার মাঝে মা চলে এলে আমি রাতুলকে ধমকের সুরে বললাম, 'শুধু ফাজলামি। যা পড়তে বস গিয়ে।'
রাতুল আবার হেসে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, 'মা, বিটিভিতে যদি মনোযোগ আকর্ষণের মত অনুষ্ঠান দেখাতো, তবে নিশ্চয়ই তুমি এতদিনে ডিশের লাইনটা কেটে দিতে বলতে। তাই না?'
মা কথার উত্তর না দিয়ে রাগত্ব ভঙ্গিতে চলে গেলো।
আমি রাতুলের দিকে তাকিয়ে বললাম, 'খুব বেশি ইয়ার্কি হয়ে যাচ্ছে রাতুল।'
মায়ের জমানো কিছু টাকা ছিলো। বাবার চাকুরি হারানোর পর থেকে মা'ই সংসারটাকে সামলাচ্ছে। বাবা সারাদিন এখানে ওখানে ছোটাছুটি করলেও একটা চাকুরির দেখা নেই।
চোখের সামনে সব পরিবর্তন যেন স্বপ্নের মত লাগে। বাজার থেকে বেছে বড় মাছটা কেনা, দামী জামা কাপড়টা পরিধানের জন্য পছন্দ করা, উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে পছন্দের সব খাবার মুখের সামনে হাজির হওয়া, ক'দিন পর পরই পরিবারের সবাই মিলে ঘুরতে বের হওয়া, এ সবকিছু এখন অতীত। আর বর্তামানটা অতীতের ঠিক বিপরীত।
যেসব আত্মীয়-স্বজনেরা আমাকে আর রাতুলকে মাথায় তুলে রাখতো, এখন তাদের সঙ্গে পথের মাঝে ভুল করে দেখা হয়ে গেলে দৃশ্যটা এমন হয়, যেন তারা আমাদের চিনতেই পারেনি।
রাতুল সেদিন মুখ কালো করে বললো, 'আপা। বাবার সম্পদ ছিলো যতদিন, আত্মীয়দের কাছে আমাদের আদরযত্নও ছিলো ততদিন।'
দামী খাবার, দামী পোশাক, নিশ্চিন্তের জীবনযাপন ছেড়ে এখন সস্তা খাবার, কম দামী পরিধানযোগ্য পোশাক, অভাবের জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। যেখানে সেখানে গাড়িতে চলাচল করা আমরা এখন দু'পা হেঁটে দু'পয়সা জমিয়ে রাখতে চেষ্টারত।
খুব ভালো প্রস্তাব পাওয়া সত্বেও আমার পড়ার ক্ষতি হবে ভেবে বাবা কখনো ছাত্র-ছাত্রী পড়ানোর অনুমতি দেয়নি৷ অথচ আজ আমার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক। যে রাতুলটা মাছ গোশত ছাড়া ভাত খেতেই বসতো না, সেই রাতুল আজ দিনের পর দিন শুধু সবজি দিয়ে খেয়ে চলছে তবুও অভিযোগ করছে না। শৌখিন মা এখন দিনরাত খেটে চলছে সংসারে৷ শীততাপ নিয়ন্ত্রিত রুমে অফিস করা বাবা এখন রোদে পুড়ে একটার পর একটা চাকুরির ইন্টারভিউ দিয়ে চলছে।
সবকিছুর বদল ঘটেছে। সংগ্রামের এই জীবনটাই এখন অভ্যাসে পরিণত হয়ে চলছে।
মা প্রায়ই সান্ত্বনা দিয়ে বলে, 'দেখিস একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। শীঘ্রই এই দুর্দিন কেটে যাবে। আবার সুদিন ফিরে আসবে৷ সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই ধৈর্যশীল ব্যক্তিদেরকে সুখবর দিয়ে থাকেন।'
আমিও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি এই কথা, নিশ্চয়ই দুঃখের পরে সুখের আগমন ঘটান উপরওয়ালা। সব দিন একরকম যায় না। খারাপ সময় জীবনে আসে, আসবেই। আশেপাশের মানুষদের ভেতর থেকে আপন পরের তফাৎ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য হলেও সবার জীবনে খারাপ সময় আসে। আর খারাপ সময় যতটা বাড়তে থাকে, ভালো সময়ের দূরত্ব ততটাই কমতে থাকে।
সুদিনে সুজন চেনা যায় না,
দুধের মাছি চিনতে হলে দুঃখের দিন দরকার।
গল্প: দিন।'রুশা, কাল থেকে আমি তোর সঙ্গে এ রুমে ঘুমাবো। আর রাতুল তোর বাবার সঙ্গে ওর রুমে থাকবে।'
খানিকটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, 'আর তোমাদের রুম?'
মা নরম গলায় বললো, 'ওই রুমটা সাবলেট হিসেবে ভাড়া দিয়ে দিব। এটাচড বাথরুম আছে, বের হওয়ার জন্য সিঁড়ির দিকে আলাদা দরজাও আছে। শুধু রান্না করার জন্য আমাদের রান্নাঘরটাতে একটু ছাড় দিতে হবে। ওটাতে সমস্যা নেই, ও ঠিক মানিয়ে নিবো।'
মন খারাপ নিয়ে বললাম, 'মা, আমাদের বাসার ব্যালকনিটাও তো ওই রুমেরই সঙ্গে!'
'তাতে কী হয়েছে! রুমের মধ্যে যখন একঘেয়ে লাগবে, তখন ছাদে যাবি।'
'বাবা কী এই সিদ্ধান্তে একমত?'
'হ্যাঁ, বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে নিয়েছে তোর বাবা। বিকেলেই টু-লেট লাগিয়ে দিবে। রুমটা তো খুবই সুন্দর। দেখবি তাড়াতাড়িই ভাড়া হয়ে গিয়েছে।'
আমি চুপ করে ভাবতে লাগলাম, সময় মানুষকে কীভাবে বদলে দেয়!
মা পাশে বসে সান্ত্বনার স্বরে বললো, 'আমরাও-বা এত বড় বাসা দিয়ে কী করবো বল! তাছাড়া নতুন ভাড়াটিয়া এলে কিছু টাকাও বাঁচলো আর গল্প করার মত মানুষও পাওয়া গেলো।'
আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট দু'টো প্রসারিত করে মাথা ঝুঁকলাম।
আমি জানি, সমস্যাটা আসলে বড় বাসা কিংবা গল্প করার মানুষের অভাবের নয়। সমস্যা হলো, টাকার। এই মুহুর্তে ব্যয়ের তালিকায় টাকার পরিমাণ যত কম রাখা যায় আর আয়ের তালিকায় যত টাকা যোগ করা যায়, ততই মঙ্গল।
রাতের মধ্যে বড় রুমটা খালি করে জিনিসপত্র সব আমার আর রাতুলের রুমে আনা হলো৷ সপ্তাহ খানেক হলো রাতুলের টিউটর বিদায় হয়েছেন৷ ওকে পড়ানোর দায়িত্ব এখন আমার। টিউটরের সঙ্গে কাজের বুয়াকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। আমি মাকে কাজে সাহায্য করার যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও মায়ের উপর বেশ চাপ পড়ে যায়, বুঝতে পারি।
সংসারে অভাব ঢুকে পড়ার পর থেকে হিসেব জিনিসটার সঙ্গে দিনদিন বেশ পরিচিত হয়ে উঠছি। যখন তখন চা খাওয়ার অভ্যেসটাকে বিদেয় দিয়েছি৷ সকাল আর সন্ধ্যা ছাড়া বাসায় এখন আর চা করা হয় না। খাবারের তালিকায় কম দামের শাক সবজির স্থান বেশি। মাছের ক্ষেত্রে সস্তা দামের মাছটাই স্থান পায়। রাতুল এখন তার প্রিয় মাছ ইলিশের বদলে তেলাপিয়াকেই প্রিয় করে ফেলেছে। বাবা এখন বয়লার মুরগি খাওয়া শিখলেও গোশতটা খুব কমই খাওয়া হয় বাসায়। রাতে খাওয়া শেষে অবশিষ্ট থাকা ভাতগুলো মা এখন আর ফেলে দেয় না৷ ওগুলো কিছু চালের সঙ্গে দিয়ে রান্না করে সকালে খাওয়া হয়।
'মা, একটা কথা বলার ছিলো।'
ভাতের হাঁড়িটা উপুড় করে মা বললো, 'হ্যাঁ। বলে ফেল।'
'বলছিলাম, পাশের বাসার রুম্পা আর টুম্পার জন্য আন্টি টিউটর খুঁজছেন। তো ওদেরকে যদি আমি পড়াই তাতে কী অসুবিধা হবে?'
মা চুপ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে বললো, 'তোর বাবা কখনো চাইতেন না, তার সন্তানেরা এতটুকু কষ্ট করুক কোথাও। আর এখন!'
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মা। আমি সরল গলায় বললাম, 'কাউকে পড়ালে জ্ঞান বাড়ে মা, কমে না। আমি মনে করি, প্রত্যেকের ছাত্রজীবনে শিক্ষক হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকা উচিত৷ সে হোক যত ধনবান। এই অভিজ্ঞতা অবশ্যই অনেক আনন্দের।'
মা সায় দিলে আমি রুম্পা আর টুম্পাকে পড়ানো শুরু করি। বাবার চাকুরিটা চলে যাওয়ার পর থেকে সংসারে বিপর্যয় নেমে আসে। আপনজনেরাও আস্তে আস্তে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে শুরু করে। আমাদের বাসায় একসময় যাদের খুব বেশি যাতায়াত ছিলো তাদের এখন ডেকেও পাওয়া যায় না। মা বলে, টাকা ফুরালে আত্মীয় স্বজনদের টানও ফুরায়। বাবা বলে, ওরা সব দুধের মাছি ছিলো।
বাসায় নতুন ভাড়াটিয়া উঠেছে। রান্নাঘরের অর্ধেকটা মা এখন তাকে ছেড়ে দিয়েছে। অল্প স্থানে মায়ের কাজকর্ম সারতে বেশ কষ্ট হয়ে পড়লেও মা হাসিমুখে সব সামলে নেয়। বিদ্যুৎ খরচের বেলায়ও এখন মা হিসেব করা শুরু করেছে। খুব বেশি দরকার না পড়লে ফ্যান চালায় না, লাইট জ্বালায় না, সিরিয়াল দেখে অবসর যাপন করা মা এখন খুব বেশি একঘেয়ে হয়ে না পড়লে টিভি দেখে না।
রাতুল সেদিন হেসে বলে, 'আপা, ভাগ্যিস ফ্যানের গতি কম আর বেশি হোক একই বিদ্যুৎ খরচ হয়। না হলে মা ফ্যানের গতি সবসময় কমের দিকেই রাখতো।'
কথার মাঝে মা চলে এলে আমি রাতুলকে ধমকের সুরে বললাম, 'শুধু ফাজলামি। যা পড়তে বস গিয়ে।'
রাতুল আবার হেসে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, 'মা, বিটিভিতে যদি মনোযোগ আকর্ষণের মত অনুষ্ঠান দেখাতো, তবে নিশ্চয়ই তুমি এতদিনে ডিশের লাইনটা কেটে দিতে বলতে। তাই না?'
মা কথার উত্তর না দিয়ে রাগত্ব ভঙ্গিতে চলে গেলো।
আমি রাতুলের দিকে তাকিয়ে বললাম, 'খুব বেশি ইয়ার্কি হয়ে যাচ্ছে রাতুল।'
মায়ের জমানো কিছু টাকা ছিলো। বাবার চাকুরি হারানোর পর থেকে মা'ই সংসারটাকে সামলাচ্ছে। বাবা সারাদিন এখানে ওখানে ছোটাছুটি করলেও একটা চাকুরির দেখা নেই।
চোখের সামনে সব পরিবর্তন যেন স্বপ্নের মত লাগে। বাজার থেকে বেছে বড় মাছটা কেনা, দামী জামা কাপড়টা পরিধানের জন্য পছন্দ করা, উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে পছন্দের সব খাবার মুখের সামনে হাজির হওয়া, ক'দিন পর পরই পরিবারের সবাই মিলে ঘুরতে বের হওয়া, এ সবকিছু এখন অতীত। আর বর্তামানটা অতীতের ঠিক বিপরীত।
যেসব আত্মীয়-স্বজনেরা আমাকে আর রাতুলকে মাথায় তুলে রাখতো, এখন তাদের সঙ্গে পথের মাঝে ভুল করে দেখা হয়ে গেলে দৃশ্যটা এমন হয়, যেন তারা আমাদের চিনতেই পারেনি।
রাতুল সেদিন মুখ কালো করে বললো, 'আপা। বাবার সম্পদ ছিলো যতদিন, আত্মীয়দের কাছে আমাদের আদরযত্নও ছিলো ততদিন।'
দামী খাবার, দামী পোশাক, নিশ্চিন্তের জীবনযাপন ছেড়ে এখন সস্তা খাবার, কম দামী পরিধানযোগ্য পোশাক, অভাবের জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। যেখানে সেখানে গাড়িতে চলাচল করা আমরা এখন দু'পা হেঁটে দু'পয়সা জমিয়ে রাখতে চেষ্টারত।
খুব ভালো প্রস্তাব পাওয়া সত্বেও আমার পড়ার ক্ষতি হবে ভেবে বাবা কখনো ছাত্র-ছাত্রী পড়ানোর অনুমতি দেয়নি৷ অথচ আজ আমার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক। যে রাতুলটা মাছ গোশত ছাড়া ভাত খেতেই বসতো না, সেই রাতুল আজ দিনের পর দিন শুধু সবজি দিয়ে খেয়ে চলছে তবুও অভিযোগ করছে না। শৌখিন মা এখন দিনরাত খেটে চলছে সংসারে৷ শীততাপ নিয়ন্ত্রিত রুমে অফিস করা বাবা এখন রোদে পুড়ে একটার পর একটা চাকুরির ইন্টারভিউ দিয়ে চলছে।
সবকিছুর বদল ঘটেছে। সংগ্রামের এই জীবনটাই এখন অভ্যাসে পরিণত হয়ে চলছে।
মা প্রায়ই সান্ত্বনা দিয়ে বলে, 'দেখিস একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। শীঘ্রই এই দুর্দিন কেটে যাবে। আবার সুদিন ফিরে আসবে৷ সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই ধৈর্যশীল ব্যক্তিদেরকে সুখবর দিয়ে থাকেন।'
আমিও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি এই কথা, নিশ্চয়ই দুঃখের পরে সুখের আগমন ঘটান উপরওয়ালা। সব দিন একরকম যায় না। খারাপ সময় জীবনে আসে, আসবেই। আশেপাশের মানুষদের ভেতর থেকে আপন পরের তফাৎ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য হলেও সবার জীবনে খারাপ সময় আসে। আর খারাপ সময় যতটা বাড়তে থাকে, ভালো সময়ের দূরত্ব ততটাই কমতে থাকে।
সুদিনে সুজন চেনা যায় না,
দুধের মাছি চিনতে হলে দুঃখের দিন দরকার।
গল্প: দিন।
লেখা: মাহফুজা রহমান অমি।
লেখা: মাহফুজা রহমান অমি।

আব্বার সাথে একদিন"
তখন সবে হাইস্কুলে উঠেছি। আব্বা চাকরীর সুবাদে ঢাকায় থাকেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘর সবসময়ই সরগরম থাকে। সপ্তাহে ছয় দিন রিক্সা করে অতদূর স্কুলে যাওয়া আসা করে করে শুক্রবারে আলস্য পেয়ে বসতো। বিছানাটাকেই মনে হতো প্রিয়তম বন্ধু। আর জ্যামিতি, গ্রামার, সমাস নির্নয় এরা সব যেনো একেকটা জাত শত্রু।
তবে যে সপ্তাহন্তে আব্বা বাড়ি থাকতেন। সে শুক্রবারে যেনো ঈদের চাঁদ দেখতাম। তেমনি এক শুক্রবার এসেছিলো আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে।
আব্বা বৃ্হস্পতিবার রাতে বাড়ি আসতেন। এবারেও তার ব্যাতিক্রম হলোনা। রাত প্রায় একটা দুটোয় ফটকে এসে ঠক ঠক করে ধাক্কানো শুরু করেছেন। এসেই আমাদের জাগিয়ে ঘুমচোখে বিছানায় বসিয়ে, কাগজের ঠোঙা থেকে আনার, কমলা কিংবা আঙুর দিয়ে বললেন, "যত খাবি ফল, তত পাবি বল, বুঝলি আলো?"
আমরা চার ভাই বোন মিলে শরীরের বল বাড়ানোর চেয়েও চোখের বল দিগুণ বাড়িয়ে আব্বার কান্ড কারখানা দেখছি। এরপর আব্বা জাদুর ব্যাগ থেকে একের পর এক বের করলেন, ছোট বোনের জন্যে আনা রঙিন ফ্রক, ভাইদের জন্য খেলনা গাড়ি, উড়োজাহাজ আর আমার জন্য সুন্দর মলাটের লেখার ডায়েরী এবং সুগন্ধি কালির দামী কলম।
মাঝ রাতে আমাদের হইচইয়ে আম্মা বিরক্ত হয়ে আব্বাকে বললেন, " কেন এত টাকা খরচ করো বলোতো? দু'দিন পরই সব নষ্ট করে ফেলবে"।
আব্বা হেসে বললেন, " ওরা তো আমাদের মতো ছেলেবেলা পায়নি। বৌছি ডাংগুলি খেলার সুযোগ পায়নি। যতটুকুন পেয়েছে তাও কিভাবে কেড়ে নেই বলো?"
আমি এক ফাঁকে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম। নতুন ডায়েরীর প্রথম পাতায় কালো অক্ষরে লিখলাম, " আজ বৃ্হস্পতিবার, রাত একটা বেজে তেইশ মিনিট। আব্বা বাড়ি এসেছেন"।
পরের দিন অনেক বেলা করে ঘুম ভেঙেছে । স্কুল ছুটি বলে আম্মাও আজ আর ঘুম ভাঙাতে আসেনি। গড়িমসি করে উঠে দেখি ঘড়িতে আটটা বাজে। সকাল আটটা মানে তো অনেক বেলা। মুখ ধুঁয়ে রান্নাঘরে আম্মার পাশে গিয়ে বসলাম, আম্মা খুন্তি দিয়ে প্লেটে গরম ফুলকো রুটি দিয়ে বললেন, " বাটিতে আলু ভাজি আছে, নিয়ে নে।"
বুঝে নিলাম আম্মার ব্যাস্ততা আজ বহুগুণে বেশি। তার ওপর ভোর থেকেই কার্তিকের শীত নামানো বৃষ্টি। তাই দেখে আব্বা বললেন ঝরঝরে সাদা পোলাও খাবেন। সাথে নারকেল দিয়ে ডিমের কোর্মা।
রুটি বেলে শেষ করে ততক্ষনে রেশমা আপা পেঁয়াজ আলু কাঁটতে বসে গিয়েছেন। আমি নিজে ফটাফট খেয়ে ছোট ভাইয়ের মুখে রুটি ছিড়ে দিতে দিতেই শুনলাম। আব্বা ভাইয়াকে নারকেল ছিলতে বলছেন।
এই অনাত্মীয় ভাইয়ার বাড়ি বরিশাল। জন্ম থেকেই উনাকে আমাদের বাড়িতে দেখেছি। গরুর গোয়ালের কাজ করেন, খড় কাটেন, পানিতে গরুর খৈল ভুষি ভেজান আর বিড়িতে টান দিতে দিতে বলেন,
" কেমুন আছো মনু? ভালা?"
অথচ ভিন্ন জেলায় স্বজনবিহীন উনি সত্যিই ভালো আছেন কিনা। কখনো জানতে চাইনি।
ভাইয়া নারকেল ছিলে কুরিয়ে দিলে, রেশমা আপা বসে গেলেন শীল নোড়া নিয়ে। মসৃন করে নারকেল বেটে নিয়ে যখন উনি বাটিতে রাখলেন। মনে হলো আম্মার মুখে দেয়ার লাল কৌটোর ভ্যানিশিং ক্রীম। সাদা থকথকে কিন্তু কী মোলায়েম।
নাস্তা শেষে আমরা ভাই বোনেরা ছুটলাম মোরগ ধরতে। আব্বা ঝাল ঝাল করে আলু দিয়ে মোরগের গোস্ত বড় ভালোবাসেন। কিন্তু রেশমা আপা তো খোপ থেকে সকাল সকাল সব মুরগী উঠোনে ছেড়ে দিয়েছেন। এখন এই বৃষ্টির মাঝে সে দুরন্ত মোরগ খুঁজে আনা কি চাট্টিখানি কথা।
বৃষ্টিটা ধরে এলে রেশমা আপা উঠোনে নামলেন। আর আমরা ভাই বোনেরা সব উনার পিছু পিছু। বৃষ্টিতে ভিজে ঘরের পেছন দিকে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো মোরগ বেচারা। রেশমা আপা বাঁশের ঝাফোইন ফেলে সহজেই সেটাকে পাঁকড়াও করে ফেললেন । এ যাত্রায় আব্বার ভাগ্য সু প্রসন্ন।
ছোট মামা এগিয়ে এসে পশ্চিমমুখি হয়ে মোরগ জবেহ দিতে দিতে বললেন "আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর" আমরা কৌতুহলী হয়ে চোখ বড় বড় করে সব সার বেঁধে দাঁড়িয়ে দেখছি।
মামা চোখ কটমট করে ধমকে বললেন, " আজকে কি ঈদ? নাকি এখানে সিনেমা হয়, যা সব কয়টা পড়তে বোস।"
গাল ফুলিয়ে টেবিলে এসে বই খুলে, শব্দ করে পড়তে আরম্ভ করেছি,
" বাংলাদেশের প্রধানত তিন প্রকারের ধান পাওয়া যায়। আউশ, আমন এবং বোরো"
আমার ঘরের পাশেই রান্নাঘর হওয়াতে, ভুর ভুর করে পোলাও চালের ঘ্রান নাকে এসে ধাক্কা দিলো। কেরোসিনের স্টোভ কিংবা ইলেক্ট্রিক হীটার ছেড়ে এখন কাস্ট আয়রনের দুই মুখের গ্যাসের চুলা বসেছে রান্নাঘরে। সেই নীল উজ্বল রঙের আগুনে ভরপুর তাপ। সেই তাপে বাতাসে সুবাস যেনো দ্রুতগামী হয়েছে আরো।
আমি ছোট মামাকে জিজ্ঞেস করলাম। মামা, " পোলাওয়ের চাল কোন জাতের ধান?"
মামা অনেক্ষন সময় নিয়ে ভেবে বললেন, "সম্ভবত আতপ চাল"
কিন্তু সেকথা তো বইতে লেখা নেই। তাহলে কি মামা সঠিক উত্তর জানে না? নাকি বইয়ের লেখায় ভুল?
একমনে উত্তর হাতড়ে ফিরছি। এর মাঝেই আজান হলো পাড়ার মসজিদে। রেশমা আপা এসে হাঁক দিয়ে গেলেন। "আলো, গোসলে যাও,দেরি হইলে আম্মা রাগাইবো কিন্তু"
গোসলে গিয়ে দেখি ছোটভাই সারা গায়ে সাবান মেখে ফেনা দিয়ে দাঁড়ি গোঁফ বানিয়েছে। আম্মা তাই কয়েক ঘা মেরেছে ওকে। চিৎকার করে কেঁদেকেটে সারা বাড়ি মাথায় তুলেছে। আর বড়জন আব্বার পেছন পেছন পাঞ্জাবী টুপি পরে মসজিদের দিকে হাঁটা দিয়েছে। আজ তো জুম্মাবার।
গোসল সেরে আমি ছোটবোনের চুল আঁচড়ে দিলাম। রেশমা আপার ততক্ষনে ঘর ঝাড়পোছ করা শেষ। আম্মা গোসল সেরে টেবিলে খাবার সাজানোয় ব্যাস্ত। আব্বাও ফিরেছেন জুম্মার নামাজ পড়ে। আব্বার পাঞ্জাবীর আতরের ঘ্রান পোলায়ের সাথে যেনো মিশে একাকার।
আম্মা সবার পাত বাড়েন। আঁচলের নিচে ঢাকা আম্মার ভেজা চুল কপালে এসে ছুঁয়ে দিয়ে যায় বার বার। আমি অদ্ভুত মুগ্ধতায় বুঁদ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎ দরজায় অচেনা গলা পেয়ে রেশমা আপা ছুটে যান, কে যেন বলে উঠেন, " আম্মাগো কয়ডা চাইল দিবেন"।
বয়োবৃদ্ধ একজন জীর্ন শরীরে দুটো চাল ভিক্ষে চাইতে এসেছেন। আম্মা চোখ ইশারায় রেশমা আপাকে রান্নাঘরে পাঠান। সবাই তখন টকটকে লাল মরিচ বাটায় রান্না করা মোরগের ঝোল দিয়ে পোলাও মেখে গোগ্রাসে গিলছি। ছোট দুইভাই প্রতিবারের মতই ঝগড়া বাঁধিয়ে, দিয়েছে কার প্লেটের ডিম আকারে বেশি বড় সেই নিয়ে।
আম্মা বড় একটা থালা এনে তাতে সব কিছু সুন্দর করে বেড়ে দিলেন। আব্বা বাটি থেকে চামচে করে উঠিয়ে দিলেন মোরগের আস্ত একটা রান। আম্মা বলে উঠলেন, "তুমি খাও, আরেকটা দিতেছি"
আব্বা বলতেন, "ওইটা তুমি খাবে"। আম্মা কিছু বলতেন না। মৃদু হাসতেন।
আমি খাওয়া শেষ করে হাত ধুঁয়ে এসে দেখতাম, সে অচেনা লোক খাবার শেষ করে এঁটো প্লেট ধুঁয়ে সে পানি সুড়ুৎ করে টেনে টেনে খাচ্ছেন। আমার কৌতুহল উনি বুঝে গিয়ে বললেন, "এটুক হইলো গিয়া বরকত "।
তারপর উনি দুহাত জড়ো করে মোনাজাতে ধরে বলেন,
" শোকর আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ মেহেরবান "
দেখলাম রেশমা আপার দুচোখ ভর্তি জল। আমি আপার আঁচল টেনে বললাম, "এ্যাই আপা, কাঁদো কেনো?"
আপা বললেন, " উনারে দেখে আমার আব্বার কথা মনে পড়ছে, আব্বাও এইভাবে খাওয়া শেষে বলতো, শোকর আলহামদুলিল্লাহ "।
আমি জানি রেশমা আপার আব্বা বেঁচে নেই। গতবছর মারা গিয়েছেন।
আচমকা কি মনে করে, ডাইনিং টেবিলের কাছে গিয়ে আব্বার পাশে দাড়ালাম। আব্বা শেষ পাতে পায়েশ আঙুলের ডগায় নিয়ে আয়েশ করে খাচ্ছেন।
আমার খুব বলতে ইচ্ছে করে, "আব্বা আর দু'টো দিন থাকুন। আমাদের ছুটির দিনের আনন্দটুকু থাকুক"।
কিন্তু কিছুই বলে উঠতে পারিনা। আব্বা আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করেন, " কি হইছে রে আলো"।
আমি উত্তরে শুধু দুদিকে মাথা নেড়ে বলি, "কিছুনা আব্বা"।
রেশমা আপা বলতো, " বড় মানুষের কষ্টও বড় হয়। মন পুড়ে ছাই হলেও চোখে জল গড়ায় না।"
তবে কি আমিও আর সবার মতো বড় হয়ে যাচ্ছি?
বড় হওয়া মানে কি,
চোখে জল নেই অথচ বুক জুড়ে পুরো হিমালয় দাঁড়িয়ে।
"আব্বার সাথে একদিন"
লেখা : Noor Helen
২৩/১০/২০২০

প্রোজাপতি
প্রোজাপতি
দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব..
জ্যোতির কথা শোনার পর আমার মাথা থেকে আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।আমি তাড়াহুড়ো করতে শুরু করলাম।উল্লেখ্য,যখন মানুষের ব্রেন খুব দ্রুত কাজ করে তখন বাকি সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আবোলতাবোল কাজ করে।আমি কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।তখন আম্মু আমার রুমে এসে,"কিরে কি হয়েছে?"
"মিরা তো জ্যোতির বাসায় যায়নি!"
"বলিস কি?তাহলে কই যাবে?"
"আমি জানি না।"
বলে আমি সোফায় বসে মোজা পড়তে শুরু করলাম।তখন আমার টেবিলের সামনের পত্রিকা নজরে এলো।বড় হেডিংয়ে লিখা,"গর্ভবতী মহিলাকে বেধে ধর্ষণের পর হত্যা"।এখনি কেন এই জিনিসটা আমার চোখের সামনে এলো।আমি রাগে কাপতে কাপতে পত্রিকাটা ছুড়ে ফেলে দিলাম।সেই শব্দে আম্মু দৌড়ে এলেন।কিছু বললেন না,তিনিও বুঝতে পেরেছেন। কারণ আজকের পত্রিকাটা তিনি পড়েছেন।
তাড়াতাড়ি সোফা থেকে উঠে আমি জুতোজোড়া পড়ে বের হয়ে এলাম।মিরা কোথায় যেতে পারে?শপিংমলে আগে যাই। সেখানের আশেপাশে সে থাকবে?আবার নাও থাকতে পারে। এত সময়!প্রায় তিন ঘন্টা হয়ে গেছে।মিরাকে মেসেজ পাঠিয়েছিলাম কিন্তু পরে দেখি সে বাসায় ফোন রেখে গেছে।বিপদ যখন আসে সব কিছু ফেলেই আসে!
রিক্সায় উঠলাম আমি।গাড়ি চালিয়ে যাবার মতোন অবস্থায় আমি নেই।আমার কল্পনায় শুধু মিরার ছবি আসছে।এই মুহুর্তে মিরার একটা সুন্দর হাসিমাখা মুখের ছবি আসলো।তারপর মিরা আমাকে দৌড়ে এসে ধরল।কিন্তু মুহুর্তেই মিরাকে কে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে।কি বিশ্রীভাবে টানলো!এভাবে তো কেউ টানে না।মিরাকে একেবারে রাস্তায় ফেলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।লোকটার মুখে সিগারেট,আর মুখে শত্রুর হাসি।আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি;নিজেকে একটুও নাড়াতে পারলাম না।মন থেকে চিৎকার করে উঠলাম,"মিরা মিরা মিরা।"
আমার মুখ থেকে ফুপিয়ে শব্দ বের হয়ে গেলো।রিক্সাওয়ালা মামা আমাকে জিজ্ঞেস করছেন,"কি হয়েছে ভাই?খুব চিন্তিত লাগছে?"
"না কিছু না।"
ততক্ষণে আমার মাথার সিলেটে ঘটে যাওয়া সেই মুমূর্ষু ঘটনা ভেসে উঠছিল।আমার ভাবতেই এত কষ্ট লাগছে,আর যার সামনে হয়েছে এসব সে কিভাবে এখনো বেচে আছে?
শপিংমলের সামনে এসে দাড়লাম।চারপাশে সব পুরুষ মানুষকে দেখে কেমন যেনো লাগছে।আমি নিজেও পুরুষ;তারপরও মেয়েদের কথা ভেবে নিজেকে নিয়ে নিজেই লজ্জিত হচ্ছি।
চোখের সামনে দেখলাম হকার ব্যবসায়ীরা বসে বসে হাসছে আর এক একটা মেয়ের দেহের গড়ন নিয়ে আলোচনা করছে।খুব ভিড়ের কারণে তাদের নাকের কাছে মহিলাদের ওড়না এসে লাগছে তারা ভাল্লুকের মতো গন্ধ নিয়ে শুকে শুকে হাসছে। একটা বাঘ হরিণের মাংস যেভাবে খুবলে খুবলে খায় সেরকম।
পাশে তাকালাম দেখলাম সবার নজর ঠিক সেরকম!স্কুলের,কলেজের এমনকি বিবাহিত চাকরিজীবী পর্যন্ত। সবারই ভেতর সেই হিংস্র চাহনী।
ততক্ষণে আমার চোখ দিয়ে দুই এক ফোটা পানি পড়া দেখে রিক্সাওয়ালা আমাকে ডেকে বললেন,"মামা পঞ্চাশ টাকা দিবেন না?"
অহ আমি টাকা দিতে ভুলে গেছি।টাকা দিয়ে আমি সামনে এগোলাম।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তিনটা পনেরো বাজে।সামনে গেলাম,পেছনে গেলাম,পুরো শপিংমলটা একবার চক্কর দিয়ে খুজতে খুজতে ঘড়ির কাটা পয়তাল্লিশ মিনিটে চলে গেল।
আমি হতাশ হয়ে একদম সিড়িতে বসে গেছি।মোবাইলটা বের করে মিরার ছবি দেখছি একটার পর একটা।আমার চোখের পানি যেন কিছুতেই থামছে না।
মোবাইলের হোমস্ক্রিনে এসে আমি একটা জিনিস দেখে বুঝে গেলাম আমার এখন কোথায় যেতে হবে।রিক্সা নিয়ে খুব দ্রুত সেই জায়গার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।মনে মনে আল্লাহর কাছে একটাই আকুতি আল্লাহ মিরা যেন সেখানেই থাকে।
সকাল থেকে খুব জ্বরে ভুগছিলাম।এখন এসে সবকিছু কিছুটা ঠিক হয়েছে।
আমি আমার আসল গন্তব্যে এসে অনেক খুজলাম। কিন্তু মিরাকে খুজে পেলাম না।আমি একদম ব্যর্থ হয়ে মাথা নিচু করে সেখান থেকে বের হচ্ছি এখন।আমার গন্তব্য হয়তো সেইখানে হওয়ার উচিত ছিলো যেখানে হাজারো মানুষের অভিযোগ প্রতিদিন এসে জমা হয়।হ্যা,আমি এখন পুলিশ স্টেশনে যাব।
পিছন থেকে একজন আমার কাধে হাত দিল।
"কি ভাই?ভাবিরে না নিয়ে কই যাচ্ছেন গা?ভাবির সাথে ঝগড়া নাকি?"
এতিমখানার কর্মচারী মকবুল আমাকে এই কথাটা বললো।
"মিরা এখানে এসেছিল?"
"জ্বি!এখনো এখানেই আছেন।"
"কই!আমি তো খুজলাম।পাইলাম না।"
"আপনি মনে হয় ওই রুমের কথা ভুইল্লা গেছেন যেখানে নতুন এতিম বাচ্চাদের আনা হয় প্রথম।"
"অহ!অহ!"
আমি দৌড়াতে শুরু করলাম।আমার সব প্রাণ যেন ফিরে আসছে।হাপাতে হাপাতে রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি মিরা বাচ্চাদের সাথে কথা বলছে।সব মেয়ে বাচ্চারা সেখানে।
তার মধ্যে একটা মেয়ে স্টেথোস্কোপ মিরার পেটে লাগিয়ে হাসছে আর বলছে,"বাবু ফুটবল খেলছে।"
পেছনে ফিরে মিরা আমাকে দেখলো।দূর থেকে ইশারা দিয়ে ক্ষমা চাইলো।তার মনের কথা আমি বুঝতে পারছি।ফোন ভুলে রেখে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চাচ্ছে।আমি মোবাইলের হোমস্ক্রিনের যেই জিনিসটা দেখে আন্দাজ করেছিলাম মিরা এতিমখানায় সেটা হচ্ছে আজকের তারিখ।
হ্যা,আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী।
সমাপ্ত।
-নাজমুস আলভী।
Nazmus Alvee
