তাহারেই_পড়ে_মনে
#তাহারেই_পড়ে_মনে
শেষ পর্ব
ছন্নছাড়া মানুষগুলোকে কেমন করে যেন কাছে দূরের সবগুলো মানুষ ভালোবাসে - ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতেই এরা অভ্যস্ত কীনা! তার উপরে প্রিন্সের বাপের টাকা ছিল - কাছের দূরের এই ভাইবোনদের বিপদেআপদে সবার আগেই প্রিন্সকেই পাওয়া যেতো, সে কাজ উঠিয়ে দিতে হোক বা পণ্ড করে দিতেই হোক না কেন! কোথাও ঝামেলা করতে হবে, মারামারি করা লাগবে, কাউকে পরীক্ষার সেন্টারে পৌঁছে দিতে হবে, মুমূর্ষু রোগিকে হাসপাতালে নিতে হবে, কারও বিয়ের কনে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হবে, কাউকে প্রেমিকার জন্য গিফট কিনে দিতে হবে, বিয়ের গেইটে তুলকালাম লাগাতে হবে, কারও বিরহের সময় বুক পেতে দিতে হবে চোখের পানি মুছতে, সবখানে প্রিন্স- সব অকাজের পান্ডা প্রিন্স! অকাজের এই বান্দাকে সবাই যেমন ভয় পেতো তেমনি বুক দিয়ে ভালোবাসত! সবার বুকেই তাই এই মৃত্যুসংবাদ বড় কঠিন করে বেজেছিলো! এই বাইক নিয়ে বহু কথা শুনেছে প্রিন্স - বহু সতর্কবার্তা। এতো রাশ ড্রাইভ করতো যে আঁতকে উঠতো সবাই দেখেই, যেই দেখতো সাবধান করতো - 'ওই বাইকেই তুই মরবি।' খুব বাচ্চাবেলা থেকে বাইক চালাতে চালাতে আশ্চর্য এক কন্ট্রোল ছিলো ওর বাইকের উপর। ওই দ্বিচক্রযানটি যেন ওর মনের কথাই শুনতো - প্রিন্স যা বলতো তাই! আজ যে ওর মনও বিক্ষিপ্ত ছিলো, অশান্ত হৃদয়ের টানাপোড়েন অসহ্য ছিলো তা বুঝি ওই মেশিনও জানতে পেরেছিলো। যন্ত্রনার আতিশয্যে তাই সেও বেসামাল হয়েছিলো, নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলো।
প্রিন্স চলে গেছে - কারো কিছুই আর করার নেই, কাউকে একটু কিছু করার সুযোগও দিলো না। আর এই সংবাদ যে কারও বুকে আরও কঠিন করে বাজবে লোপা, পাপ্পু, জহিররা ভাবেইনি! প্রিন্সের জন্য শোকাতুর মনগুলো মিষ্টির অস্বাভাবিক ব্যবহার দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। কারও কিছু বলার দরকার হয়না- সবাই সব বুঝে যায় সেইমূহুর্তে! নিজেদের শোক ভুলে বিপর্যস্ত মিষ্টির জন্য ব্যস্ত হয় সবাই।
তীব্র আঘাতে লীন হওয়া মিষ্টিকে সাজিদ বুকে জড়িয়ে নিলো।
তিনদিন ছাড়াছাড়াভাবে জ্ঞান ফেরে মিষ্টির। সেন্স ফিরলেই বাস্তবে ফিরতে মিনিট দুয়েক সময় লাগে। বাস্তবতা বুঝে নিতেও ওই মিনিটখানেকই লাগে। তারপরই শোকের তীব্রতায়, যন্ত্রণাকাতর হয়ে আবার জ্ঞান হারায়।
পানির অভাবে নেতিয়ে পড়া কচি লাউডগার মতো প্রায় মৃত মিষ্টি পুরোপুরি সজ্ঞানে আসে তিনদিনের মাথায়। ওর বিয়ের তিনদিন, নতুন জীবনে গাঁটছড়া বাঁধার তিনদিন, অতীত ভুলে যাওয়ার শপথের তিনদিন আর প্রিন্সের চলে যাওয়ার তিনদিন!
সবাই আরও বেশি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলো মিষ্টি অস্বাভাবিক রকম স্বাভাবিক! না খাওয়াতে শরীর দুর্বল ছিলো - কন্ঠটাই শুধু নরম শোনা গেলো। কান্তা সাগুসেদ্ধ করে এনেছিলো - পুরো বাটি বিনা প্রতিবাদে শেষ করে নিলো। একটু সতেজতা ফিরলে লম্বা শাওয়ার নিলো। পলা কান পেতে রেখেছিলো ওয়াশরুমের দরজায় - মিষ্টি গোপনেই হয়তো কাঁদবে ভেবে। কিন্তু গোসল করতে করতে বরং মিষ্টির গুণগুণ করা গানের সুরই ভেসে আসতে লাগলো!
গোসল করে মিষ্টি সুন্দর করে শাড়ি পরলো, চোখে কাজল ছোঁয়ালো - ঠোঁট রাঙালো। পলার অবাক চোখে তাকিয়ে ভেজা চুলে চিরুনি দিতে দিতে বললো 'পলা আপা, দেখোতো আমার চুলে শুধু শ্যাম্পুর ঘ্রাণ নাকি অন্য কোনো ঘ্রাণ পাওয়া যায়? নাকি মানুষ মিথ্যে করেই বলে খোলা চুলে নাকি নেশা হয়?'
ওইটুকুই শুধু, আর কোনো অস্বাভাবিকতা ওর ভিতর দেখা গেলো না। জাফরিন শান্ত হলো - সাজিদেরও অস্থিরতা কমে গেলো। নিজেকে আর বেঁধে রাখলো না মিষ্টি - সাজিদের সাথে একেবারে খোলা পাখির মতো উড়ে বেড়ালো, মেলে দিলো নিজেকে পুরোপুরি! সাজিদের সাথে সম্পর্কটাকে পুরো সুযোগ দিলো ও - সুন্দর একটা সময় কাটাতে লাগলো নবদম্পতি। সাজিদেরও জীবনটাকে মধুর লাগতে লাগলো, যেনো অন্য কেউ কোনোদিন মিষ্টির জীবনে ছিলো না, কোনো তৃতীয় ব্যক্তির ছায়া, স্মৃতি কিছুই নেই মিষ্টির মনে।
কিন্তু এই তৃতীয় ব্যক্তি যে সাজিদ স্বয়ং তা ও টের পেলো বিয়ের দুমাসের মাথায়। দুটোবছর হেসেখেলে তারপরেই পরিবার পরিকল্পনার ইচ্ছে ছিলো ওর। কিন্তু মিষ্টি নিজেই সন্তান নেওয়ার জন্য আগ্রহী খুব বেশি রকমের। প্রেগন্যান্সির স্ট্রিপ হাতে ও যখন সাজিদকে সুখবর দিলো তখন ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সাজিদের সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো। এ কোনো সুস্থ মানুষের দৃষ্টি না - অপ্রকৃতস্থ এক মানবীর চোখ যার মনের ভেতর সুতীব্র যন্ত্রণা গত হওয়া প্রেমিকের জন্য। ঘোর লাগা অদ্ভুত দৃষ্টিতে, ফিসফিস করে ও বলেছিলো 'শাহেনশাহ আসছে।'
মিষ্টির মানসিক বৈকল্যের লক্ষণ একটু একটু করে প্রকাশ হতে লাগলো। প্রিন্স যে পৃথিবীতে নেই এইকথাটা ওর মন থেকে পুরোপুরি মুছে গেলো। কখনো ও সাজিদকেই প্রিন্স ভেবে নিলো আবার কখনো সাজিদের ঘরনী হয়ে প্রিন্সের সাথে বিবাহ-বহির্ভুত অন্যায় সম্পর্কের দায়ে পুড়তে লাগলো। এক সময় পুরোপুরিই ভারসাম্য হারালো! কাউকেই চিনতে পারে না - প্রিন্সের কথাও ভুলে যায় কখনো কখনো। মানসিক ভারসাম্যহীন স্ত্রীকে নিয়ে সাজিদ পুরো ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। কত কত ডাক্তার দেখানো হয়, একবার বাচ্চা এবর্ট করার চিন্তাও মাথায় আসে, কিন্তু তাতে যদি চিরদিনের জন্য মাথার রোগটা চেপে বসে সেই শংকায় সেই ভাবনাও দূর করে দেয়। সারাদিন অফিস করে এসে পাগল স্ত্রীকে সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয় ওকে। সাজিদ আর মিঠিকে ছাড়া অন্য কাউকে সহ্য করতে পারে না মিষ্টি। জাফরিনকে দেখিলেই হাইপার হয়ে যায় - একদিম দেওয়ান মঞ্জিলের পাগল মেয়ে লিপির মতো কামড় দিয়ে ধরে বা বটি হাতে উন্মত্ত হয়। আবার কখনো নদীর মতো শান্ত হয়ে যায়। শুধু রাতের আঁধার ভেদ করে সাজিদের বুক ভেঙেচুরে উন্মাদ মিষ্টির সুললিত কন্ঠের আবৃত্তি শোনা যায়
কহিলাম “ওগো কবি, রচিয়া লহ না আজও গীতি,
বসন্ত-বন্দনা তব কণ্ঠে শুনি-এ মোর মিনতি।”
কহিল সে মৃদু মধুস্বরে-
“নাই হ’ল, না হোক এবারে-
আমার গাহিতে গান! বসন্তরে আনিতে ধরিয়া-
রহেনি,সে ভুলেনি তো, এসেছে তো ফাল্গুন স্মরিয়া।”
কহিলাম “ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই?
যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।”
কহিল সে পরম হেলায়-
“বৃথা কেন? ফাগুন বেলায়
ফুল কি ফোটে নি শাখে? পুষ্পারতি লভে নি কি ঋতুর রাজন?
মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নি সে অর্ঘ্য বিরচন?”
“হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?”
কহিলাম “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?”
কহিল সে কাছে সরি আসি-
“কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে। তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোন মতে।”
পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধের অনুভূতি না নিয়েই, যাবতীয় আনন্দ উপভোগ না করেই - বঞ্চনা, একবুক কষ্ট নিয়ে প্রিন্স চলে গেছে এইটেই মনে হয় বড় ব্যথা দিয়েছে মিষ্টিকে। যদি এক আকাশের নীচে বেঁচে থাকতো প্রিন্স, তুলির সাথে সুখি হতো তবে একটা চিনচিনে ব্যথার মতো মিষ্টির হৃদয়ের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকতো ও। কিন্তু ওই কঠিন মৃত্যু ওকেও আজকে কঠিন সব প্রশ্নের মুখোমুখি করে রেখেছে - মিষ্টির বিয়ের খবর কেমন করে বেজেছিলো ওর মনে? কতটা অসহায় কষ্ট নিয়ে ও মরে গেছে? কী ভাবছিলো মরে যাওয়ার আগেও? একবার কি দেখতে চেয়েছিলো মিষ্টির মুখ নাকি ওর চুলের গোছায় মুখ ডুবিয়ে প্রলম্বিত শ্বাস নিতে চেয়েছিলো? সব প্রশ্নগুলো উৎকট বিভৎস হয়ে ওর চোখের সামনে ঘুরতে থাকে। সেই সব প্রশ্নের না জানা উত্তরগুলো ওকে টালমাটাল করে দেয়, অশান্ত হাহাকারে পরিপূর্ণ করে রাখে। ও খেতে পারে না, ঘুমাতে পারে না, শান্ত হয়ে চোখ বুজতে পারে না। ভুতের মত এলোমেলো হেঁটে বেড়ায় ঘরময়!
শারীরিক পরিবর্তনের সাথে সাথেই ওর উন্মাদনাও বাড়তে থেকে ক্রমশ! দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে শরীর আর মন দুটোই। সাজিদের ফ্ল্যাটবাসার বারান্দাটাকে ডেইজি হাউসের ছাদ মনে হয় মিষ্টির মাঝে মাঝেই। আনমনে খোলা ছাদের পাশ দিয়ে এলোচুলে হেঁটে বেড়ায় ও। মাগরিবের আযান শেষ হলে, ঝুপ করে যখন আঁধার নেমে আসে, কাকে যেন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে ও - চিনতে পারে না। আজকাল কাউকেই চিনতে পারে না। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছেলেটা ডেইজি হাউসের সামনে এসে চলার গতি কমিয়ে দেয়, থেমে যায় গেইটের সামনে এসে। অন্ধকারের কালো চোখে দুজন তাকিয়ে থাকে দুজনের দিকে। কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলে 'খোলা চুলে নেশা হয় জানিস মেয়ে?'
'কে বললো?' চমকে পেছনে তাকায় মিষ্টি। কমজোর শরীরে টাল সামলাতে পারেনা, পা হড়কে পড়ে যায়। সেন্সলেস হওয়ার আগে ও স্পষ্ট শুনতে পায়, কে যেন বলছে 'তুই মরে যা, মিষ্টি।'
পরিশিষ্ট - সাজিদ চুপচাপ বসে আছে ডেইজি হাউসে, মিষ্টির ঘরে। এই ঘরটার কোনোকিছু জাফরিন কাউকে ছুঁতে দেয় না বা পরিবর্তন আনতে দেয় না। বইগুলোর ধুলোও নিজ হাতে মুছে চকচকে করে রাখে। সাজিদের মনে হয় সবকিছু তেমনি আছে, কিছুই পরিবর্তন হয়নি - মাঝখানে দশটা বছর চলে যায়নি। এখনই হয়তো বারান্দায় পায়চারি করে পড়তে দেখা যাবে মিষ্টিকে নইলে ওর পড়ায় বিঘ্ন ঘটানোতে একরাশ বিরক্তিমাখা চোখে তিরস্কার করবে সাজিদকে! গত দশ বছরে, দেশে বিদেশে যেখানেই থাকুক না কেন, নিয়ম করে মিষ্টির মৃত্যুর তারিখে ডেইজি হাউসে এসে এভাবে চুপচাপ বসে থাকে সাজিদ, ছেলে শাহেনশাহকে সাথে করে। ছেলেটা একদম সাজিদের কপি হয়েছে, কিন্তু মাঝেমাঝেই ওর ভিতর তীব্র কনফিউশন জাগে - মনে হয় এ মিষ্টি আর প্রিন্সেরই সন্তান। বায়োলজিকালি শাহেনশাহ'র পিতা সাজিদই কিন্তু মিষ্টির মনে কখনো তো ও ছিলো না। যতবার মিষ্টি ঘনিষ্ঠ হয়েছে ওর সাথে, ওকে প্রিন্সই ভেবেই কাছে এসেছে, তীব্র ভালোবেসেছে। মিষ্টির মন, মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু প্রিন্সেরই অস্তিত্ব ছিলো।
মিঠি অনেক বড় হয়েছে। একদম মিষ্টির মতোই দেখায়। পার্থক্য শুধু মিষ্টি শ্যামলা ছিলো আর মিঠি দুধে আলতা! সাজিদ ভুল করে ওকে মিষ্টি বলে ডেকে ফেলে সবসময়ই। মিঠি ক্ষেপে যায় 'সাজিদ ভাই, মিঠি, মিঠি, মিঠি - মুখস্থ করেন তো। আপনার ব্রেইন তো আপার মতো শার্প, আমার মতো পঁচা মাথা না। প্র্যাকটিস করলে আমাকে মিঠি বলেই ডাকতে পারবেন। এখন দশবার বলেন 'মিঠি, মিঠি, মিঠি।'
সাজিদ হেসে ফেলে। 'তুমি শুধু দেখতেই মিষ্টির মতো, কিন্তু আলাদা। মিষ্টি খুব শান্ত।'
'শান্ত ছিলো, এখন নেই। মিষ্টি এখন পাস্ট টেন্স। এটাও মুখস্থ করেন। সাথে আরও মুখস্থ করবেন মিঠি হচ্ছে প্রেজেন্ট ফর্ম। ক্লিয়ার?'
'ক্লিয়ার মিষ্টি। একদম ক্লিয়ার।' সাজিদের কথা শুনে মিঠি চোখ বড়বড় করে তাকায়। কটমট করে ওঠে। তারপর হতাশ হয়ে বলে 'আমার চোখের দিকে তাকানতো, সাজিদ ভাই। কি দেখেন, বলবেন?'
সাজিদ ভালোভাবে নিরীক্ষণ করে বলে 'তোমার চোখে কি সমস্যা হয়েছে? চোখ দেখিয়ে নাও। নইলে মিষ্টির মতো চশমার পাওয়ার বাড়তেই থাকবে।'
'প্রতি লাইনে একবার মিষ্টির রেফারেন্স না টানলে কি আপনি সেনটেন্স শেষ করতে পারেন না? আজব।' মিঠি রেগে যায়। নিজের ঘরে ঢুকে বই টেনে নিয়ে বসে। ওর সামনে এইচ এস সি পরীক্ষা। কিন্তু পড়াশুনায় ও মিষ্টির ধারেকাছেও না। একেবারেই পড়তে ইচ্ছে করে না। সাজিদ যখন আসে তখন তো আরও ইচ্ছে করে না। ওর দ্বিগুণেরও বেশি বয়সের একটা মানুষের জন্য ওর বুকের ভেতর তোলপাড় করতে থাকে, তা ও কাউকে বলতে পারে না। চল্লিশ দিনের মিঠিকে কোলে নিয়ে দুইবেণী ঝোলানো মিষ্টির একটা ছবি থাকে ওর ফাঁকা ডায়েরির ভাঁজে। সেটাকে টেনে এনে চোখের সামনে ধরে অভিমানে চোখ গলে ওর 'তোকে মা ভালোবাসে, বাবা বেশি ভালোবাসে, আমি ভালোবাসি, যাকে ভালোবাসতি তার মৃত্যু পর্যন্ত সে তোকেই ভালোবেসে গেছে আর সাজিদ ভাই এখনো তোকেই ভালোবাসে। তুই কেন এমন স্বার্থপর হলি - কেন শুধু একজনকেই ভালোবাসলি। সাজিদ ভাইকে কেন ভালোবাসলি না। একটু ভালোবেসেই না হয় অনেকদিন বেঁচে থাকতি, মিষ্টি।'
মিষ্টির ঘরে সাজিদের উপস্থিতি ও এখানে বসেও টের পায়। সাজিদের মৃদু শ্বাসপ্রশ্বাস ওর মনের ভিতর ঘূর্নিঝড় সৃষ্টি করে। সেই ঝড় কখনো কখনো বিপদসীমা পার করে দেয়। সমস্ত পৃথিবীতে প্রলয়ঙ্কারী ঝড় তুলে, সব ধ্বংস করে ওর সাজিদের মুখোমুখি বসতে ইচ্ছে করে। সাজিদের হাতদুটো ধরে ফিসফিস করে বলতে ইচ্ছে করে 'আমি মরে গেছি সাজিদ ভাই, এক্কেবারে মরে গেছি...'
সমাপ্ত।
Afsana Asha
(অনেক ধন্যবাদ সকল পাঠককে যারা এতদিন প্রিন্স আর মিষ্টির সাথে ছিলেন। কমেন্টে সবার গল্পটা পড়ার অনুভূতি জানতে চাই।)
আগের পর্ব
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/855781045227393/

আমি_রোদেলা
#আমি_রোদেলা
#পর্ব_১৭
- তা তো হবে না ।
- কেন ? আমি আপনার পাওনা বুঝিয়ে দিতে চাইছি । আপনার উচিত সেটা বুঝে নেয়া ।
- দেখুন পাওনাদার তো আমি তাইনা ।
-হুম ।
- আমার টা আমি আমার সময় মত বুঝে নিব ।
- না , তা হবে কেন ? আজই সব লেনদেন শেষ হয়ে যাক ।
- আপনার কিন্তু দেরি হয়ে যাচ্ছে । আমি সি এন জি ডেকে দিচ্ছি ।
বলেই তুহিন সাহেব দ্রুত রাস্তার কাছে চলে গেলেন আমাকে পেছনে ফেলেই ।
- এই যে শুনুন , তুহিন সাহেব আমার কথা তো শুনুন ।
- আমাকে তুহিন সাহেব তুহিন সাহেব করছেন কেন ?
- তাহলে কি ডাকবো ?
- নাম ধরেই ডাকুন না ।
- নাম ধরে ! ব্যাপারটা কেমন না ।
- তাহলে তুহিন ভাই ডাকুন । এটা তাও আপনার ওই সাহেবের তুলনায় অনেক ভালো ।
- ঠিক আছে ।
- এবার বলুন ডেকেছিলেন কেন ?
- বলছিলাম বিশ মিনিট আর কফির পার্ট টা আজ চুকে গেলে হতো না । আমার তো বাসায় যেতে এমনও দেরি হয়ে গিয়েছে ।
- আজ হচ্ছে না । সেটা অন্য দিনের জন্য তোলা থাকলো ।
তুহিন সাহেব একটা খালি সি এন জি দেখে হাত দেখিয়ে থামলেন ।
- নিন আজ আপনার গাড়ি পেয়ে গেছি । এবার উঠে পড়ুন ।
- আপনি তো আচ্ছা লোক একটু আগে আমাকে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলেন । এখন বিদায় দিতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন ।
- সেটা আপনি বুঝবেন না । আজ আপনি গেলেই আপনার সাথে আবার আমার দেখা হবার একটা সুযোগ থেকে যাবে ।
- আল্লাহ হাফেজ । ভালো থাকবেন ।
বলেই আমি সি এন জিতে উঠে বসলাম । তুহিন সাহেব ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বললেন ।
- পৌঁছে কিন্তু কল দিয়েন । আমি কিন্তু চিন্তায় থাকবো ।
আমি সি এন জি থেকে নেমে এলাম । ব্যাগ থেকে ভাড়ার টাকাটা তুহিন সাহেবের বাড়িয়ে দিয়ে
বললাম ।
- এটা যদি না ফিরিয়ে নেন , তবে এই সি এন জি তে আমি যাবো না ।
- আপনি তো আচ্ছা মানুষ । এভাবে গাড়ি থেকে কেউ নেমে যায় ।
- অন্যদের ব্যাপারে জানি না । আমি এমন ই ।
- আপনার অনেক রাগ তাই না ।
ও দিকে সি এন জি ড্রাইভার হর্ন দিচ্ছে ।
- আপা যাবেন না ?
- যাবো একটু দাঁড়ান ।
- কি হলো নিচ্ছেন না কেন ?
তুহিন সাহেব আমার হাত থেকে টাকা টা নিতে নিতে বললেন ।
- আমি সত্যি অনেক কষ্ট পেলাম ।
- দুঃখিত , আমার কিছুই করার নেই ।
বলেই আমি সি এন জিতে উঠে বসলাম । ড্রাইভার জানতে চাইলো ।
- আপা ভাইজান যাবে না ।
- না , আপনি যান ।
রোদেলা চলে যাওয়ার পর তুহিন বেশ কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে রইলো । ও ভেবে পেলোনা মেয়েটি এমন কেন ? আর ভাড়া দেয়াতে এমন রেগে যাবার কি হলো ? কই নীলা তো কখনো রাগ করত না । বরং দিতে ভুলে গেলে বলতো , আমার নাকি দায়িত্ব বোধ নেই । রোদেলা মেয়েটা খুব অদ্ভুত কখনো রোদেলাকে খুব আপন মনে হয় আবার কখনো মনে হয় ওকে ঠিক বুঝতে পারি না ।
- ভাইজান একটু সাহায্য করবেন , বাচ্চাটা না খাইয়া আছে ।
তুহিন সামনে দাঁড়ানো মহিলাটির দিকে তাকালো । মহিলাটি পরনে ময়লা শাড়ি আর কোলের বাচ্চাটি দেখেই মনে হচ্ছে ক্ষুধার্থ ,ময়লা হাত মুখে দিয়ে রেখেছে । তুহিন হাতে ধরে রাখা টাকা গুলো মহিলাটির হাতে দিয়ে , হাঁটতে শুরু করলো ।
বাসায় ডোরবেল দিতেই , আম্মু দরজা খুলে
দিলেন ।
- কোথায় ছিলে এতক্ষন ?
- একটা কাজ ছিলো , তুমি কখন এসেছো ?
- আমি তো বিকেলেই চলে এসেছি । ভাবলাম আজ দুজনে বিকেলে এক সাথে চা খাবো । এসে শুনি তুমি নেই ।
আমি অবাক হয়ে আম্মুর দিকে তাকালাম ।
- তুমি আমার সাথে চা খাবে বলে তাড়াতাড়ি চলে এসেছো !
- কেন ? আমি কি তোমার সাথে বসে চা খেতে পারি না ?
- পারো , তবে এমন কখনো আগে ঘটে নি তো তাই ....আর তুমি এসে আমাকে ফোন দিলে না কেন ?
- তুমি তো শুনি সারাদিন বাসায়ই থাকো । তাই বেরিয়েছো শুনে ফোন দেয়নি ।
- তুমি কি চা খেয়েছো ?
- না , একা খেতে ইচ্ছে করে নি ।
- আম্মু তাহলে আজ আমি তোমার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসছি ।
- বাহির থেকে এসেছো আগে ফ্রেশ হয়ে এসো ।
- যাচ্ছি তার আগে চায়ের পানি বসিয়ে দিয়ে যাই ।
চায়ের পানি বসিয়ে দিয়ে , আমি আমার রুমে এসে তাড়াহুড়ো করে কাপড় পাল্টে ফ্রেশ হলাম । রান্না ঘরে গিয়ে দেখি চায়ের পানি ফুটতে শুরু করেছে । পানিতে চা পাতা দিয়ে , কাপে দুধ চিনি দিতে গিয়ে খেয়াল হলো । আম্মু চায়ে চিনি কি পরিমান খান , না চা চিনি ছাড়া খান , তা তো আমি জানি না । আম্মুর কাছে জানতে চাইবো ? আম্মু কি ভাববেন ? আমি চিনি ছাড়াই দুকাপ চা আর ছোট একটা পটে করে চিনি নিয়ে আম্মুর রুমে গেলাম । আম্মু তখন বারান্দায় বসে আছেন ।
- আম্মু চা নিয়ে এসেছি ।
- চা নিয়ে বারান্দায় চলে এসো ।
আমি ট্রে নিয়ে বারান্দা গেলাম , অনেক বছর পর আম্মুর রুমের বারান্দায় এলাম । আম্মু আগে থেকেই আমার জন্য একটি চেয়ার আনিয়ে রেখেছেন । এই বারান্দাটা আমার রুমের বারান্দা থেকে অনেক বড় । আম্মু চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বললেন ।
- চায়ে চিনি দাও নি তো । আমি চায়ে চিনি খাই না ।
- না দেই নি ।
আম্মু চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন ,
- বাহঃ তুমি তো ভালো চা বানাতে শিখে গেছো ।
- এখন থেকে চা খেতে ইচ্ছে করলে আমাকে বলবে । আমি বানিয়ে দিবো ।
- ঠিক আছে । কি ভাবলে ?
- কোন ব্যাপারে ?
- তোমার নিজের ব্যাপারে ।
- আমি ঠিক বুঝি নি ।
- অনার্স তো শেষ , মাস্টার্স করবে না ?
- করবো , তবে কিছু একটা করতে চাচ্ছি মাস্টার্স এর পাশাপাশি ।
- কি করার ইচ্ছে ?
- শিক্ষকতা ।
- শিক্ষক হতে চাইছো কেন ?
- আমার বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে তাই ।
- বাচ্চা বলতে তুমি প্রাইমারী লেবেলে পড়াতে চাচ্ছ ?
- হুম ।
- ওই লেবেলের বাচ্চাদের হ্যান্ডেল করা তো অনেক কষ্ট কর । তুমি বরং হাই স্কুলের জন্য চিন্তা করো ।
- দেখি ।
- রোদেলা আমি তোমার বিয়ের কথা ভাবছি ।
- এত তাড়াতাড়ি ?
- বিয়ে তো করতে হবে তাই না ।
- হুম , কিন্তু আমি এখন বিয়ে নিয়ে ভাবতে চাচ্ছি না ।
- কেন ? তুমি কি কারো জন্য অপেক্ষা করতে চাইছো । এমন হলে আম্মুকে বলতে পারো । আমার মনে হয় আমরা আমাদের ব্যাপার গুলো খোলামেলা ভাবে আলোচনা করতে পারি ।
- না , তেমন কিছু নয় । আমি আমার জীবনের কিছুটা সময় আমার মত করে কাটাতে চাচ্ছি ।
- ঠিক বুঝলাম না ।
- বিয়ে মানেই তো দায়িত্ব পালন করা । একটা পিছুটানের মধ্যে থাকা । আমি ওগুলো ছাড়া স্বাধীন ভাবে থাকতে চাইছি ।
- কিন্তু আমি তো চাইছি তোমাকে বিয়ে দিয়ে । আম্মার সাথে গিয়ে থাকতে ।
- তুমি যাও না নানুমনির কাছে । তার জন্য আমাকে কেন বিয়ে দিতে চাইছো ?
- আমি চাইনা তুমি একা থাকো ।
- কেন খালামনি তো আছে ।
- বুবুর ও তো বয়স হয়েছে । উনি আর কতদিন তোমার পাশে থাকবে ?
- কেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ।
- রোদেলা আমি মনে হয় তোমাকে ঠিক মত বুঝতে পারছি না ।
- এখানে বুঝানোর কি হলো ?তুমি নানুমনির কাছে যেতে চাচ্ছ যাওয়া । কিছুদিন থেকে এসো ।
- আমি একে বারে যেতে চাইছি ।
আমি কিছু বললাম না , চুপ করে বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দূরের রাস্তার আলো দেখতে লাগলাম ।
- চুপ হয়ে আছো যে ?
- কি বলবো ভেবে পাচ্ছি না ।
- আমি আপাতত একে বারে যাচ্ছি না । তোমাকে বিয়ে দেবার পর , হয়তো একে বারে থেকে যাবার কথা ভাববো । কারণ তোমার বিয়ে হয়ে যাবার পর তো আমি একা হয়ে যাবো তাই না ।
- কবে নাগাদ যেতে চাইছো ?
- এখনো ঠিক করি নি । তবে ছয় মাসের মধ্যেই যেতে চাইছি ।
- একেবারে ?
- না , প্রথম গিয়ে কিছুদিন থাকবো । পরে ....
- খালামনি কি কাল আসছেন ?
- না , আগামী সপ্তাহে আসবেন । বিকেলে ফোন করেছিলো । তোমাকে ও তো করেছে , তুমি নাকি ফোন ধরো নি ?
- ব্যাগে ছিল টের পাইনি । আমি নামাজ পড়তে যাবো ।
- ঠিক আছে যাও , তবে আম্মুর কথা কিন্তু এখনও শেষ হয়নি ।
আমি চায়ের কাপ গুলো নিয়ে বারান্দা থেকে চলে এলাম । কাপগুলো রান্না ঘরে রেখে , ওযু করে নামাজ পড়ে নিলাম । নামাজ শেষ হতেই খেয়াল হলো । খালামনি তো ফোন দিয়েছিলো । ব্যাগ থেকে ফোন হাতে নিয়ে দেখি তুহিন সাহেব তিনটি মেসেজ পাঠিয়েছেন ।
-- আপনি কি ঠিক মত পৌঁছে গেছেন ? আপনার কিন্তু জানানোর কথা ছিল ।
-- আমার আচরণে হয়তো আপনি বিরক্ত হচ্ছেন । আজ ঠিক করেছিলাম আপনি মেসেজ না দিলে , আমি ও দিবো না । কিন্তু আপনার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে ।
-- কি হলো কথা বলবেন না ? না এখন ও রেগে আছেন ?
আমি মেসেজের উত্তর না দিয়ে খালামণিকে ফোন দিলাম ।
-আসসালা মুয়ালাইকুম ।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম , কেমন আছিস মা ?
- আমি ভালো , তুমি নাকি কাল আসবে না ?
- হ্যা , আমার পরিবর্তে এখানে যার আসার কথা ছিল । তার নাকি আসতে দুদিন দেরি হবে ।
- হুম , বুঝলাম । তুমি তাড়াতাড়ি আসবে তোমার সাথে জরুরি কথা আছে ।
- কিছু হয়েছে ? আমাকে বল ।
- তুমি আগে এসো তারপর বলবো ।
- জরুরী হলে তুই ফোনেই বল ।
- না , তুমি আসলে তারপর বলবো ।
- আমি আগামী সপ্তাহে আসছি ।
- তখন আবার কোন অজুহাত দেখাবে না তো ?
- না , সত্যি আগামী সপ্তাহে আসছি ইনশাআল্লাহ।
- ঠিক আছে , আল্লাহ হাফেজ ।
খালামনির সাথে কথা শেষ করেই ,আমি রামিসা আন্টিকে ফোন দিলাম ।
-হ্যালো ,
-আসসালা মুয়ালাইকুম ।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম , কে বলছেন ?
- আমি কি মিসেস রামিসার আহমেদ এর সাথে কথা বলছি ।
- জী , আপনি ?
- আন্টি আমি রোদেলা , কিছুদিন আগে আপনাদের বাসা ছিলাম ।
- রোদেলা , কেমন আছিস মা ?
- আলহামদুলিল্লাহ ভালো । আপনি , আঙ্কেল ভালো আছেন ?
- হ্যা ,আমরা ভালো আছি । তোমার শরীরের কি অবস্থা ।
- আন্টি ভালো ।
- আর বাসার সবাই ভালো আছে ? কোন ঝামেলা হয়নি তো ?
- জী না আন্টি , সবাই ভালো আছে ।
- শুনে ভালো লাগলো , চিন্তায় হচ্ছিল তোমার
জন্য ।
- সব কিছু ঠিক আছে চিন্তা করার কিছু নেই ।
- তোমার বাবার সাথে কথা হয়েছে ?
- না , আন্টি । আমি আব্বুর ফোনের অপেক্ষায় আছি ।
- তুমি ফোন দিলেই পারো ।
- হুম , দেবো ।
- ভালো থেকো , তোমার ফোন পেয়ে ভালো
লাগছে ।
- ধন্যবাদ আন্টি , আজ তাহলে রাখি । আল্লাহ হাফেজ ।
- ভালো থাকবে আর মাঝে মাঝে ফোন দিও ।
- ঠিক আছে আন্টি ।
আন্টির সাথে কথা শেষ করে ফোন রাখতেই দেখি নতুন দুটো মেসেজ এসেছে ।
-- কি হলো আমার মেসেজের উত্তর দিচ্ছেন না কেন ?
-- আমি জানি ফোন এখন ও আপনার হাতেই আছে । আম্মুর সাথে কথা বলেছেন একটু আগে ।
প্লীজ কিছু তো বলুন ।
তুহিন সাহেব তো নাছোড় বান্দা । আমি ও লিখলাম ।
-- হুম , কি বলবো ?
সাথে সাথেই উত্তর এলো ।
-- এতক্ষন অপেক্ষা করিয়ে রেখে শুধুই -হুম কি বলবো ? জানেন সেই সন্ধ্যা থেকে আপনার মেসেজের অপেক্ষায় বসে আছি ।
-- আমি কি আপনাকে অপেক্ষা করে থাকতে বলেছি নাকি ?
-- সেটা আবার বলতে হয় নাকি । আপনি তো জানতেনই আমি আপনার মেসেজে অপেক্ষায় থাকবো ।
--হুম
-- আবার হুম , আপনাকে না এই শব্দটি বলতে না করেছি ।
-- এবার বলুন কি বলবেন ?
-- সন্ধ্যায় এমন রাগ দেখিয়ে চলে গেলেন কেন ?
-- বাহ রে রাগ দেখাবো না । আপনি কেন আমার গাড়ি ভাড়া দিতে যাবেন ?
-- পুরুষ মানুষ হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব আছে না ।
-- আছে তবে সেটা আপনার আপন মানুষ গুলোর জন্য ।
-- আপনি বুঝি তাদের মধ্যে পারেন না ?
-- অবশ্যই না । আমি কেন আপনার আপন মানুষদের মধ্যে পরতে যাবো ।
-- আপনি চাইলেই কিন্তু পারেন ।
চলবে .....
✍️রেহানা হক রেনু
গত পর্বের লিংক -১৬
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/854695005335997/

#সালফার_৫৯ ( দ্বিতীয় পর্ব)
“আপনি বলতে চাচ্ছেন ক্রমশই আপনার হাইট কমে যাচ্ছে? ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছেন আপনি?” টেলিফোনের ওপাশ থেকে বলে উঠল তরুণ সাইক্রিয়াটিস্ট তুহিন আহমেদ।
সিফাত আমতা আমতা করে বলল, “জ্বি স্যার।” সিফাত ভেবেছিলো সাইক্রিয়াটিস্ট সাহেব এবারে হয়তো হেসে ফেলবেন। এমনটা হলো না। সে গুরুত্ব দিয়ে তার কথা শুনলো এবং খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে জানতে চাইলো,
“আপনি কখন থেকে ছোট হওয়া শুরু করলেন?”
“আজ ভোরে ঘুম ভেঙেই দেখি এই অবস্থা। প্রথমে এক ফুটের মতো উচ্চতা হারাই আমি। কিন্তু তার পর থেকে ক্রমাগতই হাইট কমে যাচ্ছে।”
“এখন আপনার হাইট কতটুকু আছে?”
“সাড়ে তিন ফুট সম্ভবত।”
“আগে আপনার হাইট কত ছিল?”
“পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির মতো। সামান্য কম বেশি হতে পারে।”
বেশ কিছুক্ষণ ওপাশ থেকে কোন জবাব এলো না। সিফাত বলল, “স্যার, আমি সত্যি সত্যিই ছোট হয়ে যাচ্ছি। আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না?”
তুহিন বলল, “আমি আপনার কথা বিশ্বাস করছি কি-না সেটা এখন বলবো না। তার আগে আপনি আমাকে এটা বলুন তো- আপনি ছোট হয়ে যাচ্ছেন, এটা আপনি আমাকে কেন জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন? শুধুমাত্র মানসিক সমস্যা হলেই মানুষ সাইক্রিয়াটিস্টের শরণাপন্ন হয়। কিংবা অতিপ্রাকৃতিক কোন ঘটনার রহস্য উদঘাটন করার জন্য সাইক্রিয়াটিস্টের প্রয়োজন পড়ে। আপনার হাইট কমে যাওয়ার সাথে সাইকোলজির কী সম্পর্ক?”
সিফাত বলল, “স্যার, আপনাকে ফোন করেছি কারণ আমি বাসা থেকে বের হতে পারছি না। বাসা থেকে বের হলেই সবাই আমাকে দেখে ফেলবে। তবে হ্যাঁ , আপনাকে ফোন না দিয়ে আমি আমার কাছের বন্ধু-বান্ধবকে জানাতে পারতাম। আপনাকে ফোন দেয়ার বিশেষ কারণ হচ্ছে- আমি মনে প্রাণে এটাই চাচ্ছি যে- সবকিছুই যেন আমার কল্পনা হয়। আপনি প্লিজ এটা প্রমাণ করে দিন এটা আমার হ্যালোসিনেশন। অথবা এটা কঠিন কোন স্বপ্ন। প্লিজ স্যার।” শেষের কথাগুলো বলার সময় সিফাতের গলা ধরে এলো। তুহিন বুঝতে পারল অনেক কষ্টে ছেলেটা কান্না আটকে রেখেছে।
তুহিন স্বাভাবিক গলায় বলল, “দেখুন আপনি নিজেই কিন্তু বুঝতে পারছেন এটা আপনার বিশেষ ধরনের হ্যালোসিনেশন। কাজেই এর থেকে আপনাকে বের করা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না। আমি কিছু প্রশ্ন করছি আপনি সত্য জবাব দেবেন। হয়তো কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে ইচ্ছে করবে না আপনার। সেগুলোর জবাব দেবেন না। কিন্তু মিথ্যা বলবেন না।”
“ওকে স্যার।”
তুহিন বলল, “আপনি বাসায় একা থাকেন?”
“জ্বি স্যার।”
“বাবা-মা ভাইবোন কোথায় থাকে?”
“মা নেই। বাবা আর ছোট বোন গ্রামে থাকে।”
“আপনার বোন কোন ক্লাসে পড়ে?”
“ক্লাস নাইনে পড়ে। সরি, ভুল বললাম। এবার টেনে উঠেছে ও।”
“আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে?”
“জ্বি স্যার।”
“তার হাইট কি আপনার চেয়ে বেশি?”
“জ্বি না। ও আমার চেয়ে ইঞ্চি দুয়েক খাটো হবে।”
“বিয়ে করছেন না কেন আপনারা?”
“ওর বাবা-মা আমাকে পছন্দ করে না।”
“আপনি তো ভালো জব করেন। তবু পছন্দ করে না কেন?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সিফাত বলল, “এটা বলতে চাচ্ছি না স্যার।”
“ওকে। আপনি যেহেতু একা থাকেন। আপনার বাসায় কোন কাজের লোক নিশ্চিয়ই আছে?”
“জ্বি স্যার। তোরো-চৌদ্দ বছরের একটা ছেলে আছে।”
“আপনার ফেভারিট হলিউড হিরো কে?”
“জন করবেট।”
“ফেবারিট বলিউড তারকা?”
“কুনাল কাপুর।”
সিফাত মনে মনে বিরক্ত হলো। এমন জটিল একটা সমস্যার ভেতর বলিউড, হলিউড টেনে আনার অর্থটা সে বুঝতে পারল না।
তুহিন বলল, “আমার প্রশ্ন করা শেষ। এখন আমি যেই কথাগুলো বলবো, আপনাকে মন দিয়ে শুনতে হবে। এতেই আপনার ঘোরলাগা ভাবটা কেটে যাবে।”
সিফাত কানের সাথে টেলিফোনটা আরও জোরে চেপে ধরল। সে সবটুকু মনোযোগ দিয়ে এখনকার কথাগুলো শুনতে চায়।
তুহিন বলল, “আমার ধারণা আপনার বন্ধু বান্ধবের সংখ্যা খুব একটা নেই। আপনি আত্মকেন্দ্রিক একজন মানুষ। কারো সাথে তেমন একটা মেশেন না। অফিস শেষ করে নিরবে বাসায় ফেরেন। আমার ধারণাগুলো কি ঠিক আছে?”
“জ্বি স্যার।”
“প্রতিটি আত্মকেন্দ্রিক মানুষই কোন না কোন মেন্টাল ডিসঅর্ডারে ভোগে। তাদের নিজস্ব কিছু ধ্যান-ধারণা থাকে। তারা মনে করে তাদের ধারণাই ঠিক। যেটার শেষ পরিণতি গিয়ে ঠেকে কোন একটা মানসিক সমস্যায়। হতে পারে সেটা ছোট থেকে ছোট কোন সমস্যা। আপনার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো। আপনার মধ্যেও একটা মানসিক সমস্যা দেখা দিল। আর আপনার মানসিক সমস্যাটা হচ্ছে- আপনি সবসময় হীনমন্যতায় ভোগেন। আর সেটির কারণ হচ্ছে- আপনার হাইট তুলনামূলক কম। এই সমস্যাটা প্রথমে খুবই ছোট থাকলেও এখন তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। আপনি নিজেই তা বুঝতে পারছেন।”
“আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে স্যার। আমার হাইট অল্প বলে আমার হয়তো কিছুটা খারাপ লাগে। তাই বলে এটা মানসিক সমস্যা পর্যন্ত চলে যাবে এটা ভাবার কোন যৌক্তিকতা নেই।”
“যৌক্তিকতা আছে। আমি বুঝিয়ে বলছি। আপনি বললেন আপনার গার্লফ্রেন্ডের হাইট আপনার চেয়ে সামান্য কম। কিন্তু আমার ধারণা সেটি ঠিক না। সে হয় আপনার সমান অথবা সে আপনার চেয়ে সামান্য লম্বা। তার হাইট পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। অথচ আপনি কিন্তু আপনার এক্সজেক্ট হাইটটা জানেন না। সম্ভবত আপনি ইচ্ছা করেই আপনার হাইট কখনো মাপেন না, কারণ আপনি নিজেও জানেন মাপলে হয়তো দেখা যাবে আপনার হাইট আপনার গার্লফ্রেন্ডের সমান বা তার চেয়ে কম। আমি যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম মেয়েটার বাবা-মা আপনাকে মেনে নিচ্ছে না কেন, আপনি কিন্তু এই প্রশ্নটার জবাব দেননি। কারণ আপনার গার্লফ্রেন্ডের বাবা-মা আপনাকে মেনে নিচ্ছে না তার কারণও ঐ একটাই। আপনার হাইট অল্প। তাছাড়া আপনি ভালো জব করেন। ফ্যামিলি ছোট। আপনাকে মেনে না নেয়ার কোন কারণ ছিলো না।”
এতটুকু বলে তুহিন থামল। সিফাত কোন কথা বলল না। তার নীরবতাই প্রমাণ করলো সাইক্রিয়াটিস্টের প্রতিটি কথাই সত্যি।
তুহিন আবার বলতে শুরু করল, “দেখুন হীনমন্যতায় ভোগা ব্যাপারটা খুবই সাধারণ। আমরা সবাই কোন না কোন বিষয়ে হীনমন্যতায় ভুগি। তবে আপনার ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেল। আপনার কাছের মানুষ; যাদের হাইট আপনার চেয়ে বেশি, আপনি তাদেরকে অপছন্দ করা শুরু করলেন। যখন জিজ্ঞেস করলাম আপনার ছোট বোন কোন ক্লাসে পড়ে, আপনি প্রথমবার ভুল বললেন। অথচ নিজের আপন বোন কোন ক্লাসে পড়ে তা ভুল হওয়ার কোন কারণ নেই। আপনি ভুল করলেন কারণ আপনি তাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। আমার ধারণা আমার ছোট বোনের উচ্চতাও আপনার চেয়ে বেশি। আপনি বাসায় একা থাকেন, আপনার উচিত ছিলো ভালো কাজকর্ম জানে এমন একজন বুয়া রাখা। অথচ আপনি বাসায় রেখেছেন একটা বাচ্চা ছেলে। এমনটা করার কারণ আপনার চেয়ে লম্বা কেউ আপনার পাশে ঘুরঘুর করছে- এটা আপনি মানতে পারেন না।”
এবারেও সিফাত কিছু বলতে পারল না। তুহিন বলল, “আপনি সম্ভবত ছোট থেকেই চাইতেন বড় হয়ে আপনি দীর্ঘকায়, সুঠাম দেহের একজন মানুষ হবেন। ডিফেন্সে জব করার ইচ্ছাও ছিলো আপনার। হলিউডের ফেভারিট হিরোর কথা জানতে চাওয়া হলে সবাই নির্দ্বিধায় টম ক্রুজ, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও কিংবা জনি দীপের কথা বলে। অথচ আপনি নিলেন জন করবেটের নাম। তদ্রুপ আপনি শাহরুখ খান, আমির খানের মতো অভিনেতা বাদ দিয়ে কুনাল কাপুরের কথা বললেন। তারা কেউই কিন্তু সুপারস্টার না। জন করবেট এবং কুনাল কাপুরকে আপনার ভালো লাগে কারণ তাদের হাইট অন্য সব নায়কের চেয়ে অনেক বেশি। আপনার ভেতরে লম্বা হওয়ার গুপ্ত বাসনাই আপনাকে হীনমন্যতার চাদরে ঢেকে ফেলে। আজ আপনার যে হ্যালোসিনেশন হচ্ছে তা নিশ্চয়ই একদিনের ফল না। এটা দীর্ঘদিনের একটা… ”
এবারে মুখ খুলল সিফাত।
স্বাভাবিক স্বরে বলল, “আপনার কথা অনুযায়ী আমি আগের হাইটেই আছি? আমি ছোট হয়ে যাইনি।”
“অবশ্যই না। এক রাতের ভেতর এটা অসম্ভব।” সাইক্রিয়াটিস্টের গলায় আত্মবিশ্বাসের কোন কমতি নেই।
সিফাত বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে। আমি এড্রেস দিচ্ছি। আপনি আমার বাসায় চলে আসুন।”
তুহিন টেলিফোন নামিয়ে রাখল। সে ফোন করল থানায়। এমন অদ্ভুত রোগীর বাসায় সে একা যাবে না।
মানিক বাবু রাতে বাসায় ফেরেননি। দাওয়াই খানার নিজের রুমটাতেই রাত কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। সকাল হতেই কর্মচারীরা তাকে আঁড়চোখে দেখতে লাগলো। তারা মোটামুটি নিশ্চিত আজ রাতে অনৈতিক কিছু ঘটেছে দাওয়াই খানায়। একজন সেলসম্যান তো বলেই বসল, সে না-কি ভোর রাতের দিকে একটা মেয়েকে পেছনের সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে দেখেছে। তার কথা সবাই বিশ্বাস না করলেও কেউ কেউ বিশ্বাস করল। কারণ মানিক বাবু বিয়ে করেননি। কাজেই পঞ্চাশোর্ধ এমন একজন মানুষকে খুব সহজেই সন্দেহ করা যায়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সেই সন্দেহ বাড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে সেই ফিসফিসানি মানিক বাবুর কান পর্যন্ত চলে এলো। তিনি বিচলিত হলেন না। মানুষ বড় কোন সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে থাকলে ছোট সমস্যাগুলো তখন গায়ে লাগে না। সাপের ছোবল খাওয়ার পর, মশার কামড়ে কাউকে উদ্বীগ্ন হতে দেখা যায়নি। মানিকবাবু বড় সমস্যায় পড়েছেন।
দোতলা থেকে নিচে নেমে মানিক বাবু পুনরাই একই প্রশ্ন করলেন। সেই প্রশ্নগুলো তিনি গতকাল রাতেও করেছিলেন। উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলেন, “কোন কুষ্ঠরোগী এসেছিলো আজ? কিংবা গরিলার মতো বিশালদেহী কোন মানুষ?” কর্মচারীরা নিশ্চুপ ডানে বায়ে মাথা নাড়ল। তারা এমন কাউকে দেখেনি। মানিক বাবু আর কোন প্রশ্ন করলেন না। তিনি নাস্তা না করেই বেরিয়ে গেলেন। বেরুবার আগে কাউকে কিছুই বলে গেলেন না। সবাই বিস্ময় নিয়ে দেখতে পেল ঝাকড়া চুলের ডাক্তার হন্তদন্ত ছুটে চলেছে মেইন রাস্তার দিকে।
মানিক বাবু সোজা চলে এলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা.আফজাল হোসেন তার বাল্যবন্ধু। অনেকদিন পর কাছের বন্ধুকে দেখে আফজাল হোসেন আপ্লুত হলেন। বন্ধুর আতিথিয়েতায় ব্যস্ত হতে চাইলেন তিনি। কিন্তু মানিক বাবু তাকে সেই সুযোগ দিলেন না।
সরাসরি বললেন, “তোমাদের এখানে সালফার-৫৯ আছে?”
“সালফার-৫৯!” চোখ কপালে তুললেন আফজাল হোসেন। তিনি এমন নাম আগে শোনেননি।
“তোমার কথা বুঝতে পারছি না। আমার জানামতে সালফার-৫৯ বলতে কোন মেডিসিন নেই। এটা কি নতুন কোন ফর্মুলা?”
মানিক বাবু নিজের উপর বিরক্ত হলেন। সালফার-৫৯ এর কথা আফজাল জানবে কী করে! এই মেডিসিন চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখনো অজানা। কারণ এই ফর্মুলা তার নিজের তৈরি।
প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য মানিক বাবু বললেন, “নাহ এখনো এমন ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। কিছু গবেষক চেষ্টা করে যাচ্ছে।”
“ওহ আচ্ছা। তাই বলো।” হাসিমুখে জবাব দিলেন আফজাল হোসেন। তার মনে ক্ষীণ সন্দেহ দেখা দিল- তার এই পুরোনো বন্ধু হয়তো কিছু একটা লুকাচ্ছে।
মানিক বাবু বললেন, “তোমাদের কাছে পুরোনো সালফিউরিক এসিড হবে?”
“কত পুরোনো?”
“দুশো বছরের পুরোনো হলেই হবে। আড়াইশো বছর হলে আরও ভালো হয়।”
এবারেও অবাক হলো ডা. আফজাল।
তিনি বললেন, “এত আগে সালফিউরিক এসিড পাওয়া যেতো শুধুমাত্র জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসে। আমাদের মেডিকেল প্রতিষ্ঠিত হলো উন্নিশো ছেচল্লিশ সালে। আমরা পাবো কোথায় এত পুরোনো এসিড?”
মানিক বাবু বললেন, “আশির দশকে বেশ কিছু ফর্মুলা বিদেশ থেকে নিয়ে আসা হয়। আমার ধারণা পুরোনো সালফিউরিক এসিডও এর মধ্যে আছে। তুমি একটু খোঁজ নাও বন্ধু। আমার বিশেষ দরকার। এজন্যই তোমার কাছে আসা। আর হ্যাঁ, কিছু পুরোনো সল্টপিটারও লাগবে আমার।”
ডা. আফজাল যথেষ্ট বিরক্ত হলেন। তিনি দীর্ঘসময় মানিক বাবুর দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একজন আয়াকে ডেকে নিয়ে বললেন, “পুরাতন ল্যাবের চাবিটা কার কাছে?” মানিক বাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
দুপুরের ঠিক পর পর সাইক্রিয়াটিস্ট তুহিন এলো সিফাতের ফ্ল্যাটে। বাসার নিচে পুলিশ ভ্যান রেখে সে একাই উপরে উঠে এলো। দীর্ঘ সময় দরজা নাড়ার পরও কেউ দরজা খুলে দিল না। তুহিনও ফিরে গেল না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। পনেরো থেকে বিশ মিনিট পর দরজা খোলা হলো। তুহিন তার জীবনের সবটুকু বিস্ময় নিয়ে দেখলো, তার সামনে দুই ফুট উচ্চতার একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রবল আত্মবিশ্বাস মুহুর্তেই ভেঙে গুড়িয়ে গেল। মানুষটা তাহলে সত্যিই সত্যিই ছোট হয়ে যাচ্ছে। ( চলবে)
#সালফার_৫৯ ( দ্বিতীয় পর্ব)
~ Maruf Al-amin
আগের পর্ব
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/852476052224559/
গল্প--# কন্যাকাহন
গল্প--# কন্যাকাহন #
আমাদের বাসায় যখন কোন যুবক আত্মীয় ছেলে বেড়াতে আসে, মায়ের আত্মীয় হোক আর বাবার আত্মীয়ই হোক।তখনি মায়ের মেজাজ হিমালয়ের সমান উঁচু হয়ে যায়।মা আমার রুমে এসে রাগে গজগজ করতে করতে বলতে থাকে,তুই আমার রুমে বেশী থাকবি।রাতেও আমার সাথেই ঘুমাবি।নিজেকে সেইফ রাখতে হয় জোয়ান ছেলে বাসায় থাকলে।এমন করে মিশবিনা।অমন ভাবে চলবিনা।দুরত্ব বজায় রাখবি।খালাতো ভাই,ফুফাতো ভাই,মামাতো ভাই হইছে কি হইছে?
মা আজ তোমাকে নিয়ে এক সেমিনারে যাবো। বিকেলে রেডি হয়ে থেকো।
কিসের সেমিনার রে?
গেলেই বুঝবে মা।
তুই বলতে পারিসনা?
নাহ।পারিনা।
একটা আজব মেয়ে জন্ম দিয়েছি। যন্ত্রণা!
তোমরা মায়ের জাতটাও আর ও বেশী আজব!হুহ!
বিকেলে আমার মাকে নিয়ে যথাসময়ে উপস্থিত হলাম।স্থান শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরীর সুফিয়া মিলনায়তন। সেমিনারের আয়োজন করেছে আমার পরিচিত এক বড় আপু। সব কন্যা সন্তানদের উদ্দেশ্যে করেই গঠিত তার সংগঠনের নাম কন্যাকাহন।বিশাল হলরুমে একজন পুরুষ ও নেই।
শতশত নারী ও তাদের কন্যারা উপস্থিত।স্টেজ সবার জন্যই উম্মুক্ত। সব মায়েরা ছোটবেলায় কোন সম্পর্কের কার দ্বারা কিভাবে, কেমন করে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে,তা অবলীলায় বলছে। আমার মা একটু উসখুস করছে।আমি মাকে সহজ করে দিয়ে বললাম, মা যাও।যা লজ্জায় কোনদিন কাউকে বলতে পারনি।তা এখানে বলে, সেই শিশুমনের গোপন চাপাক্ষোভ আর ঘৃণার সমাধি দাও।
মা বলল,নাহ থাক!বলে কি হবে সবার সামনে। আর এখন যা বোঝার বুঝেছি।মাকে জোর করলাম না আর।বুঝলাম মা নিজের মেয়ের সামনে বলতে পারবেনা।
বাসায় এসে মাকে বললাম, এই আপুটা এখন যেমন সুন্দর, ছোটবেলায় নাকি আরও বেশী সুন্দর ছিল।তাই নিকট আত্মীয়, দূরাত্মীয় কারো নখের আর ঠোঁটের ছোবল থেকে রেহাই পায়নি তার নরম শরীরখানি।কাউকে বলতেও পারেনি লজ্জা আর আড়ষ্টতার জন্য।উনার ও দুই মেয়ে আছে এখন। তাই নিজের জীবনাভিজ্ঞতা থেকেই সিদ্ধান্ত নিল কন্যাশিশু ও নারীদের সুরক্ষা নিয়ে সচেতনতামূলক একটি সংগঠন গড়ে তুলবে।আমিও এর মেম্বার।চাইলে তুমিও হতে পার।
হুম,আমাকে এড করে দিস।নারী জীবনের নানাকিছু সম্পর্কে জানতে পারবো।
মা, তুমি সেমিনারে গিয়ে কি বুঝলে এবার বলতো?
শুন,আসলে আমরা মায়েরা কিংবা বড়রা, কন্যা সন্তান ছোট থাকতে,কখনো চিন্তাই করতে পারিনা যে, ওই কচি বয়সেই কোলে নেয়া,বাজারে নেয়া,আদর করা,ড্রেস চেঞ্জ করা,গোসল করানো,একটু খেয়াল রাখার অজুহাতে নিজের চেনা পুরুষ লোকেরাই যৌন নিপীড়ন করে মেয়ে শিশুদের।এটা অনেক বড় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যা আজ এই সেমিনারে না গেলে উপলব্ধিই করতে পারতাম না।
এতদিন মনে মনে ভাবতাম, হয়তো আমার মত বাল্যবেলায় অল্পসংখক মেয়েরাই এমন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।কিন্তু আমি বিস্মিত হয়ে গিয়েছি, যখন দেখলাম, তোর ওই আপুটা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
আজ এই মঞ্চে বসা একজন বিবাহিত নারীও ও কি আছেন,যিনি ছোটবেলায় এমন বিশ্রী পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি?
ঘাড় ঘুরিয়ে সবার দিকে লক্ষ্য করে দেখলাম, একজন নারীর হাত ও উপরে উঠেনি।
হায় খোদা!তখন আমার কলিজা সেই ছোটবেলার মত আবার ও কেঁপে উঠলো।
রাইট মা। প্রতিটি মা,বাবারা নিজে সতর্ক হয় আর মেয়েকে ও সতর্ক থাকতে বলে ঠিক সেই বয়সে,যেই বয়সে বলার প্রয়োজন পড়েনা।তখনতো নিজেই নিজের প্রতি খেয়াল রাখতে পারে একজন মেয়ে।এই যে তুমি সবসময় বাসায় কোন ছেলে আসলেই অস্থির হয়ে যাও আমার নিরাপত্তা নিয়ে।তখন বেশ রাগ হয় আমার মা।আরেহ।এখন ত আমিই আমার ভালোমন্দ রিয়েলাইজ করার মত যথেষ্ট বয়স হয়েছে।এমনকি কার সাথে কি রকম দুরত্ব রেখে চলতে হবে তাও বুঝি। যখন বেশ ছোট ছিলাম,তখন ত এমন করে খেয়াল রাখনি,আর সেই সুযোগেই কম হলেও এবিউজের শিকার কি হইনি?হয়েছি মা।
মা ক্ষেপে গেল শুনে।
কিহ?তুই আমাকে বলিসনি কেন?কোন জানোয়ার আমার মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে নাম বল?
দূর মা।বাংলা সিনেমার মত ডায়ালগ দিওনাত।তুমি পেরেছ তোমার সময়ে বলতে?
৫ - ৭ বছর বয়সে কেউ বলতে পারে?৮-১৩ বয়সেরটাও লজ্জায়,ভয়ে,সংকোচে বলতে পারেনা কোন মেয়ে।
আমাদের দেশে প্রায় ৭০ শতাংশ কন্যাশিশু নিজের পরিবারের মধ্যেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়।এটা জান?
না জানতামনারে মা।
শুননি,আপুটা কি বলছে?কন্যাশিশুদের জন্য নিজের বাসাটাই সবচেয়ে বেশী অনিরাপদ।
মারে এটাত বুঝিনি তখন।এখন থেকে চেনা অচেনা সবাইকে অনুরোধ করবো যেন কন্যাশিশুকে একা কারো কাছে না দেয়।সে চাচা,মামা হোক আর খালাত, মামাতো ভাই যেই হোক না কেন।
ধন্যবাদ মা।আজকের সেমিনারের মূল মেসেজ এটাই ছিল যে,কন্যাশিশুদের দিকে যেন মায়েরা বিশেষভাবে খেয়াল রাখে।যেকোন পুরুষের বা ছেলের কাছে একা কিছুতেই যেন না রাখে।সেই ব্যক্তি, হোক ভাই,হোক চাচা।এই পৃথিবীতে একমাত্র মা ছাড়া কন্যাসন্তানের জন্য কেউই নিরাপদ নয়।সে যত কাছের কেউই হোকনা কেন।শিশুবয়স ও বাল্যবয়স, এই দুই বয়সেই খেয়াল রাখতে হবে,নিজের কন্যাকে সুরক্ষিত রাখতে চাইলে।
তুই নারীদের নিয়ে এমন কোন সেমিনার হলেই আমাকে নিয়ে যাস কিন্তু।
অবশ্যই মা।আমার বিয়ের পর মেয়ে হলে আমি সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখবো।
তাই করিস মা।আল্লাগো! আমার ছোটবেলার কিছু মুহূর্তের কথা মনে পড়লে এখনো গা গুলিয়ে আসে,বিরক্ত ও লাগে বেশ।
থাক মা বাদ দাও।বরং প্রার্থনা করো, মরচে ধরা বিবেকগুলোর দেয়াল থেকে যেন খসে পড়ে সেই পশুদের ইতর আর অসভ্য দৃষ্টিভঙ্গির পলেস্তারা। আর আমি থেকে তুমি,তুমি থেকে তারা,তারা থেকে অনেক,সেই অনেক থেকে সব মায়েরাই শুনবে, জানবে সচেতন হবে ধীরে ধীরে।এভাবেই একদিন পৃথিবীর সব কন্যাশিশুরা সুরক্ষিত থাকবে।নির্ভয়ে ঘরের আঙিনায় রঙিন প্রজাপতির মতো ছুটে বেড়াবে।কন্যাশিশুদের খলবল করা নিষ্পাপ হাসিতে মুখরিত হবে চারপাশ।সুস্থ ও প্রাণময় হয়ে বেড়ে উঠবে জগতের সকল মায়ের কন্যাসন্তানেরা।

গল্পঃ #অভিমানী_ভালবাসা
১.
দেশের নামকরা ব্যবসায়ী আরমান চৌধুরী গতকাল রাতে ইন্তেকাল করেছেন।আরমান চৌধুরীর ইন্তেকালের যতটা না দেরি হয়েছে, সংবাদ টা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় পৌছে যেতে তার থেকে অনেক বেশী কম সময় লেগেছে।আরমান চৌধুরীর চেনা, অচেনা, শত্রু, মিত্র সবাই যে যেখান থেকে পেরেছে সবাই এসে “চৌধুরী প্যালেসে” এসে শোক প্রকাশ করেছে।চৌধুরী প্যালেসে এখন মানুষ গিজগিজ করছে চৌধুরীর ইন্তেকালের জন্য শোক প্রকাশ করতে ,,,
চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি থেকে কিছু মেয়ে অফিসার কর্মী ও এসেছে।কিন্তু তাদের সাজগোজ আর পোশাকের বাহার দেখে আরমান চৌধুরী বোনের (লায়লা চৌধুরীর )রাগে সারা শরীর রি রি করে জ্বলতে শুরু করেছে।লায়লা চৌধুরীর পাশে কিছু মেয়ে অফিসার কর্মী এসে দাড়াতেই লায়লা চৌধুরী আস্তে করে গর্জে উঠে বললেন তোমারা শোক করতে এসেছো নাকি পার্টি করতে ?
লায়লা চৌধুরীর মুখের কথা শেষ না হতেই পিংকি (মেয়ে অফিসার)বলে শোক করতে এসেছি ম্যাডাম কিন্তু সৈকত স্যার যে হ্যান্ডসাম আর ড্যাসিং তাতে স্যারের পাশে এমন পোশাক ছাড়া কেমন দেখায় বলেন? ও তো কিছুক্ষনের মধ্যে এখানে এসে যাবে তাই এই গেট আপে চলে এসেছি বলে মিচকি হাসে পিংকি।
লায়লা চৌধুরী চাপা বর্জকন্ঠে বলে খবর দার আমার ভাইপোর দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছো তো ওই চোখ আমি তুলে নেবো।শোক করতে এসেছো ভালো কথা অন্যমতলব মন থেকে ছুড়ে ফেলে দাও,,নইলে আমি তোমাকে চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি থেকে ছুড়ে ফেলে দেবো।কথাটা বলেই এমন ভাবে পিংকির দিকে তাকালেন মনে হচ্ছে পারলে আস্তো চিবিয়ে খাবেন।
কিছুক্ষনের মধ্যে আরমান চৌধুরীর একমাত্র সুযোগ্য পুত্র সৈকত চৌধুরী তার ৪/৫ জন বডি গার্ড সহ চৌধুরী প্যালেসে প্রবেশ করে।সৈকত কে দেখেই অনেকে ছুটে এসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে,,সৈকত তাদের কারো দিকে না তাকিয়ে,, কোন পাত্তা না দিয়ে সোজা গিয়ে তার বাবার মৃত দেহের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। আরমান চৌধুরীর পিএ(রফিক আহমেদ) এসে সৈকতের সাথে কিছু কথা বলে।সৈকত তার সাথে কথা শেষ করে বলে যে আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত জানাজা শেষ করে দাফনের ব্যবস্থা করার জন্য।সৈকতের কথা মতো সব কাজ শেষ করে যে যার মতো করে চলে যেতে শুরু করে।কিছু সময়ের মধ্যে চৌধুরী প্যালেস আগের মতো লোকশুন্য হয়ে যায়। শুধু মাত্র রফিক আহমেদ আর তার ছেলে রিহান থেকে যেয় চৌধুরী প্যালেসে।
লায়লা চৌধুরী সৈকতের পাশে এসে বসে বলেন সৈকত যাও নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও, অনেক পথ জার্নি করে এসেছো।এখন তোমার বিশ্রাম দরকার।সৈকত বলে না ফুফি আমি থাকার জন্য আসিনি,আমার ফ্লাইট রাত দশ টায়।আমি আজই লন্ডন ফিরে যাবো।
লায়লা চৌধুরী সৈকতের কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন, কি বলছো তুমি সৈকত তুমি আজই ফিরে যাবে মানে!!?
সৈকত বলে কেন ফুফি কি হয়েছে??
পাশ থেকে রফিক আহমেদ বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন তোমার বাবার দাফন শেষ হতে না হতেই তুমি আবার লন্ডন ফিরে যেতে চাইছো!!?এদিকের কি হবে?
সৈকত মিচকি হেসে বলে আহ আঙ্কেল আপনি আর রিহান তো আছেন।রিহান হচ্ছে রফিক আহমেদ এর ছেলে। রিহান আর সৈকত সমবয়সি। ছোট বেলা থেকেই দুজনের মধ্য একটা বন্ধুত্ব সুলভ সম্পর্ক। তবে রিহান খুব সহজ সরল আর নরম প্রকৃতির।আর সৈকত তার উল্টো। রিহান তার বাবার পেশাকে ছোট বেলা থেকেই নিজের লক্ষ্যে হিসাবে নিয়ে নেয়।তাইতো রিহান আজ রফিক আহমেদ এর মতোই একজন আদর্শবান আইনজীবী হয়েছে।আর তাই জুনিয়র আইনজীবী হিসাবে সৈকতের বাবা আরমান চৌধুরী রিহানকে সৈকতের জন্য প্রাইভেট আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত করে দেন।সৈকত রিহানের কাধে হাতে দিয়ে একটু ঝাকি দিয়ে বলে কি রেএ পারবি না??রিহান একটু মুচকি হাসে।তারপর সৈকত রফিক সাহেব কে বলে এইদিক টা আপনি আর রিহান দুজন মিলে সামলে নিয়েন,,আমি বরং লন্ডনের বিজনেস গুলি সামলাবো।
রফিক আহমেদ বলেন তা কি করে হয়??
সৈকত বলে কেন হবে না আঙ্কেল?? বাবা বেচে থাকতে যেমন সামলেছেন এখনো তেমনি সামলে নিবেন।আর আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না।আমি আপনাকে সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি বাবার সাথে সব করতে তাই আমিও আপনাকে বাবার মতো অনেক বিশ্বাস করি। আপনি আমার বাবার খুব কাছের একজন মানুষ,,এবং খুবই বিশ্বস্ত। তাই আপনাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়।
রফিক আহমেদ বলেন সৈকত তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে বিজনেস এর ব্যাপারে তুমি যদি আমাকে একটু সময় দাও তাহলে খুবই ভালো হয়।
সৈকত বললো বলুন আঙ্কেল কি বলবেন।রফিক আহমেদ বললেন এখানে না আমি তোমাকে প্রাইভেট ভাবে কিছু বলতে চাই।
রফিকের কথাটা লায়লা চৌধুরীর কাছে কেমন যেন লাগলো, তাই তিনি সৈকতকে বললেন ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি তাহলে আর মনে হয় কথা বলতে অসুবিধা হবে না রফিকের!
রিহান বলে ফুফি আপনি কিছু মনে করবেন না,, আসলে স্যারের(আরমান চৌধুরী) হঠাৎ মৃত্যুতে সব কিছু এলো মেলো হয়ে গেছে,,।যেহেতু স্যার নেই তাই এখন স্যারের বদলে সৈকতকে সব বিজনেস এর দায়িত্ব নিতে হবে। এখানে কিছু নতুন ক্লাইন্ট এর কন্টাক্ট পেপার রয়েছে যেগুলি সৈকতকে দেখতে হবে,সৈকত যদি কন্টাক্ট গুলি দেখে মনে করে যে আমাদের তাদের সাথে কাজ করা উচিৎ তাহলে এখানে কিছু সিগনেচার করতে হবে বলে রিহান কিছু ফাইল বের করে ব্যাগ থেকে।
লায়লা বলে ওহ আচ্ছা,ঠিক আছে তোমরা কথা বলো,, আমি ভিতরে গিয়ে একটু রেস্ট করবো।
লায়লা ঠিকই চলে যায়, কিন্তু তার মনে বিজনেস এর বিষয় জানার জন্য খুব কৌতুহল হয়,,…
সৈকত রফিকের দিকে তাকিয়ে বলে আঙ্কেল আপনি তো আমার থেকে বেশি ভালো বুঝবেন আপনি না হয় সব টা ম্যানেজ করে নিন।
রফিক বলে ঠিক আছে, তবে উইল নিয়ে তোমার সাথে আমার জরুরী কথা ছিলো,, আর তুমি তো জানই আমি তোমার বাবার পিএ ছাড়াও তার ব্যক্তিগত আইনজীবী হিসাবে নিযুক্ত ছিলাম এবং আছি,তাই তোমার বাবা মৃত্যুর আগে আমাকে যে ভাবে বলেছিলেন আমি সেই ভাবে উইল তৈরি করেছি।
সৈকত উইল কথা শুনেই বলে কই দেখিতো কি আছে উইলে!?
রফিক আহমেদ তার ছেলে রিহানের দিকে তাকিয়ে বলে ,রিহান কাগজ গুলি ফাইল থেকে বের করো।
রিহান ফাইল থেকে কাগজ গুলি বের করতে গিয়ে হঠাৎ লায়লা চৌধুরী কে সিড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আস্তে করে বলে এখানে এগুলা নিয়ে কথা না বলে, আমাদের মনে হয় সৈকতের অফিস রুমে গিয়ে এই বিষয়ে কথা বলা উচিত।
রফিক আহমেদ ছেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে লায়লা কে দেখে বলে তুমি ঠিকই বলেছো।
সৈকত তার ফুফিকে দেখে বলে ফুফি তুমি কি কিছু বলবে?
লায়লা চৌধুরী হঠাৎ থতমত খেয়ে বলে তুমিতো সারাদিন কিছুই খাওনি,, আমি কি তোমার জন্য কিছু খাবার দেওয়ার কথা বলে দিবো?
সৈকত বলে ঠিক আছে তুমি খাবার রেডি করতে বলো, আমি আংকেল এর সাথে মিটিং টা সেরে তারপর খাবো।
সৈকত রফিক আর রিহান কে বলে চলুন উপরে আমার অফিস রুমে গিয়ে কথা বলি,বলে সৈকত সিড়ি দিয়ে উপরে যায়,রফিক আর রিহান সৈকতকে অনুসরণ করে চলে যায়।
সৈকতের ফুফি এভাবে সবাইকে একসাথে চলে যেতে দেখে মনে মনে অনেক কিছুই সন্দেহ করে, কিন্তু তিনি চুপ করে থাকেন, কারণ হুট করে এখন কিছু জিজ্ঞাসা করলে সমস্যা হয়ে যাবে।
সৈকত বাসায় নিজের অফিস রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিয়ে বলে,আংকেল কি আছে এই উইলে যার জন্য ফুফির সামনে কিছু বলতে চাইলেন না!?
রফিক, আর রিহান কিছুক্ষন নিজেদের দিকে মুখ চাওয়া চায়ি করে ফাইল থেকে কাগজ টা বের করে সৈকতের সামনে দেন। সৈকত কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করে। তারপর একটা জায়গায় এসে পড়া থামিয়ে বলে আংকেল হোয়াট ইজ দিস!!??
আমার বাবার ১০০০ কোটি টাকা অথচ এখানে লেখা আমি আমি পাচ্ছি মাত্র ৫০০কোটি বাকী ৫০০ কোটি কই গেল??
সৈকতের কথা শুনে রিহান তার হাতে থাকা আরেকটা উইলের কাগজ সৈকতের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
সৈকত কিছুটা বিরক্ত আর কৌতুহল হয়ে কাগজটা রিহানের হাত থেকে নিয়ে দ্রুত কাগজে চোখ বুলায়। হঠাৎ একটা জায়গায় এসে সৈকতের চোখ আটকে যায় পড়ার সময় “স্নিগ্ধা রহমান” সৈকত নামটা পড়েই কাগজটা রফিক সাহেবের সামনে বাড়িয়ে একটু রেগে বলে ওঠে কে এই স্নিগ্ধা রহমান যার জন্য বাবা বাকী ৫০০ কোটি টাকা তার নামে উইল করে দিয়ে গেছেন।
রফিক সাহেব সৈকতের রাগের কারণ টা বুঝতে পেরেও কিছুক্ষন চুপ করে থাকেন। কারণ সৈকতকে কি তিনি কি বলবেন হঠাৎ বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
রফিক আর রিহানের নিরবতা সৈকতের যেন ধৈর্য্যর বাধ ভেঙ্গে ফেলে। সৈকত এক প্রকার চিৎকার করে বলে ওঠে তাহলে কি বাবার অন্য কোন সন্তান ছিলো যা আমি জানতাম না!??
রফিক সাহেব বিচলিত হয়ে বলে, তুমি ভুল ভাবছো তেমন কিছু না।আসলে স্নিগ্ধা হচ্ছে তোমার আব্বুর একজন বন্ধুর মেয়ে । তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না,, তোমার বাবা অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে তাদের সাথে হঠাৎ দেখা হয়, তোমার বাবা যখন জানতে পারে যে তার বন্ধু অনেক আগে মারা গেছে এবং তার স্ত্রী এবং মেয়ে খুবই সাধারণ জীবন যাপন করছে তাই তিনি স্নিগ্ধার নামে এই উইল করে দিয়েছিলেন।
সৈকত খুব বুদ্ধিমান বিজনেস ম্যাগনেট।মাত্র ২৬ বছর বয়সেই সে বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক পুরুষ্কার ও অর্জন করে ফেলেছে বিজনেস এর সূত্র ধরে।কারণ তার শরীরে যে আরেক বিখ্যাত বিজনেস ম্যানের রক্ত।তাই রফিক সাহেব কে কিছু না বলে প্রথমে সৈকত চোখ বন্ধ করে কিছুর হিসাব মেলাতে চেষ্টা করে । তারপর আস্তে করে বলে শুধু বন্ধুত্বের দাবীতে বাবা নিশ্চয় তার এতগুলি টাকা তার বন্ধুর মেয়ের নামে ইউল করেনি।নিশ্চয় এর পেছনে কোন কারণ আছে।কারণ আরমান চৌধুরীর মতো বিজনেস এর পাকা প্লেয়ার গুলি কখনো নিজের স্বার্থ ছাড়া এক পা ও আগে দেয় না। কিন্তু আরেকটা কথা মনে আসতেই সৈকত বলে আংকেল স্নিগ্ধার পরিবারে কে কে আছে?
রফিক সাহেব বলেন, স্নিগ্ধা আর তার মা।তাদের একটা পার্লার আছে সেখানে দুজনে কাজ করে।তাতে তাদের সংসার চলে।
সৈকত তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠে একটু গম্ভীর হয়ে টেবিল থেকে পেপার ওয়েট টা হাতে নিয়ে আবার টেবিলের উপর ঘুরিয়ে রেখে দেয়।তারপর রফিক আর রিহানের দিকে তাকিয়ে বলে স্নিগ্ধার পরিবার কি বাবার এই উইলের ব্যাপারে কিছু জানে??
রিহান বলে না স্নিগ্ধারা এ-সম্পর্কে কিছুই জানেনা।তুই বললে আমি আগামীকাল তাদেরকে সব জানাতে পারি।আর যদি তুই আমার সাথে ওদের বাসায় যাস তবে আরোও ভালো হবে।
সৈকত রিহানকে বলে চিল ব্রো এতো তাড়াহুড়ার কি আছে!!?
আপাতত উইল টা আমার কাছেই থাক যখন সময় হবে আমিই না হয় তোকে বলবো।
রফিক সাহেব বলে সৈকত হাতে বেশি সময় নেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের উচিৎ এ বিষয়ে তাদের জানানো।
কথাটা শুনতেই তেতে ওঠে সৈকত হাতে বেশি সময় নেই মানে!!?
রিহান বলে দেখ উইলে লেখায় আছে যে আরমান চৌধুরীর অবর্তমানে ১মাস পরেই যার যার ভাগের অংশ সে পেয়ে যাবে। এখন তুই বল স্নিগ্ধা যদি না জানে বিষয় টা তাহলে কিভাবে প্রাপ্য অংশটুকু নিবে।
সৈকত ডান হাতের আঙুল গুলি মুষ্টিবদ্ধ করে মনে মনে বলে তার মানে যা করার আমার এই এক মাসের ভিতরেই করতে হবে।এই ৫০০ কোটি টাকার সম্পত্তি আমি অন্য কাউকে দিতে পারিনা,এটা আমার প্রাপ্য অন্যের নই।বি রেডি স্নিগ্ধা রহমান আমি আসছি………… .
গল্পঃ #অভিমানী_ভালবাসা
লেখাঃ সাবেরা সুলতানা রশিদ
#সূচনা_পর্ব

গল্প: সম্পূর্ণা।
'বাবা, নাবিল ভালো ছেলে। আর ও খুব মেধাবী। তুমি একবার ওর সঙ্গে কথা বলো, তুমি বুঝতে পারবে।'
বাবা হুংকার দিয়ে বললেন, 'শুধু ভালো দিয়ে আজকাল জগৎ চলে না। সঙ্গে আকার থাকা চাই। আর তোমার কী ধারণা যারা বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে এরা সবাই মেধাহীন? ভালো রেজাল্ট দিয়ে যদি ভালো চাকুরি পাওয়া যেত তবে বেকারের সংখ্যা এতবেশি হতো না।'
মাথা নিচু করে বাবাকে বললাম, 'আমি নাবিলের সঙ্গেই অনেক ভালো থাকবো বাবা৷'
ধমক দিয়ে বাবা বললেন, 'কিশোরীর মতো কথা বলো না তৃণা। এসব আবেগের ঠাই নাই বাস্তবতায়। সোহান অনেক ভালো ছেলে। সেও খুব মেধাবী। ভালো চাকুরি করে, মাস গেলে মোটা অংকের টাকা বেতন পায়। সোহানই তোমাকে ভালো রাখতে পারবে।'
বাবাকে নাবিলের কথা বললে বাবা চেঁচিয়ে উঠলেও আমার বিশ্বাস বাবা যদি একবার নাবিলের সঙ্গে কথা বলেন, নাবিল সম্পর্কে বাবার অবশ্যই ভালো ধারণা জন্মাবে। আমার মতো বাবাও নাবিলের উপরে আস্থা রাখতে পারবেন। কিন্তু বাবা নাবিলের ছায়াটাও দেখতে চান না। বাবার কথার উপরে কারো কথাও এ বাড়িতে গ্রহণযোগ্য নয়।
আমার হয়ে মা যতবারই বাবাকে বোঝাতে গিয়েছেন বাবা ততবারই মাকে কড়া স্বরে প্রসঙ্গ বদলাতে বলেছেন। এখন তাই মা আমাকেই বোঝান বাবার কথা মেনে নিতে। এ সংসারে বাবার কথাই যে শেষ কথা।
সদ্য পড়াশোনা শেষ করা নাবিলের পক্ষে দুম করে চাকুরি জোগাড় করা সম্ভব নয়। তবে প্রচেষ্টার কমতি রাখছে না সে। দুম করেই যে কোনো একদিন চাকুরি পেয়ে যাবে হয়তো। কিন্তু ততদিন অপেক্ষা করার সময়টা এখন আর আমার কাছে নেই। বাবা সময় বেধে দিয়েছেন। আগামী মাসে বিয়ে ঠিক করেছেন।
'নাবিল?'
মুঠোফোনের ওপাশ থেকে নাবিল শান্ত স্বরে জবাব দেয়, 'বলো তৃণা।'
'একবার আসবে বাড়িতে বাবার সঙ্গে দেখা করতে?'
'তিনি তাহলে অনুমতি দিলেন অবশেষে।' বেশ খুশি মনেই নাবিল বলে উঠলো।
খানিক চুপ থেকে বললাম, 'বাবা বলেননি। তুমি যদি আসতে। আমার বিশ্বাস, তুমি এসে কথা বললে তোমার সম্পর্কে বাবার যত ভুল ধারণা রয়েছে সব দূর হয়ে যাবে।'
'এভাবে যাওয়াটা কী ঠিক হবে বলো?'
'বাবা যেহেতু স্বেচ্ছায় দেখা করতে চাচ্ছেন না। তাহলে জোর করেই দেখা করার ব্যবস্থা করতে হবে।'
'যদিও আমার মন সায় দিচ্ছে না। তিনি এতে আরও চটে না যান। তবুও তুমি যখন বলছো, আমি আসবো।'
বাবা কলেজের অধ্যাপক। বাড়িতে এবং কলেজে দু'জায়গাতেই বাবা বেশ কঠোর ব্যক্তি। দু'দিন বাদেই নাবিল এলো বাবার সঙ্গে দেখা করতে। বাড়ির সকলে আতিথেয়তা করলেও বাবা ভীষণ রেগে গেলেন৷ বেশ অপমানবোধ নিয়ে নাবিল চলে গেলো। নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগলো। অযথা ডেকে এনে নাবিলকে অপমান করার অপরাধবোধ আমাকে কুঁড়ে খাচ্ছিলো।
ফোনে নাবিলের সঙ্গে ভীষণ কাঁদতে লাগলাম। নাবিল আমাকে নানা কথা শুনিয়ে শান্ত করার প্রচেষ্টা চালাতে লাগলো। কিন্তু মন কিছুতেই শান্ত হলো না। এই মুহুর্তে বাড়ি থেকে পালিয়ে নাবিলের কাছে আশ্রয় নিতে মন একদম সায় দেয় না। ভালোবাসার মানুষ হয়ে আমি বেকার মানুষটার উপর সংসারের এত বড় দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেই কী করে!
নাবিল আসায় বাবা বেজায় ক্ষেপে গিয়ে পাত্রপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিয়ের সময় আরও এগিয়ে আনেন৷ কঠোর আদেশ জারি করেন, আমি যেন বাড়ি থেকে এইকয়দিনে আর বের না হই। নাবিলের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও বারণ করেন৷
অস্থির লাগতে শুরু করলো, ভেতর জুড়ে ছটফট করে চলছি। এবার বাবা আমাকে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই বাধ্য করছেন৷ নাবিলকে ছেড়ে দিলে তাকে পাওয়া অসম্ভব কিন্তু বাবার অমতে গেলে পরিবারের সঙ্গে ভাঙ্গা সম্পর্কটা পরেও জোড়া লাগানো সম্ভব।
নাবিলের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলার জন্য মুঠোফোনটা হাতে নিতেই দেখি নাবিলের ফোনকল৷ ইদানীং নাবিল যতবারই কল করে, আমার মন আনন্দে নেচে ওঠে৷ মনে হয়, নিশ্চয়ই কোনো খুশির খবর জানানোর জন্যই কলটা করা হয়েছে।
খুশি মনে ফোনটা কানের কাছে নিয়ে হাসিমুখে 'হ্যালো' উচ্চারণ করতেই মনের মধ্যে কেমন যেন একটা করে উঠলো। নাবিল কাঁদছে।
আতঙ্কিত স্বরে প্রশ্ন করলাম, 'কী হয়েছে নাবিল?'
'মা আর নেই তৃণা।' বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো নাবিল।
কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম৷ নাবিলকে এই মুহুর্তে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো শব্দ আমার কাছে নেই। নাবিলের জন্য ভীষণ কষ্ট হতে লাগলো। চোখ ভিজে জল গড়াচ্ছে।
নাবিল গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে৷ কবে ফিরবে এই প্রশ্নটা করিনি৷ এই প্রশ্নটা এখন স্বার্থপরতার প্রকাশ করবে। আমি কখনোই স্বার্থপর হতে চাই না৷ কথা শেষ করে ফোনটা রেখে দিলাম৷
বিষাদে ভরে উঠেছে আশপাশ। ক্রমশ ভয় জন্মাতে থাকলো নাবিলকে হারানোর। বাবা দৃঢ় স্বরে জানিয়ে দিয়েছেন, তার সিদ্ধান্তে কোনোমতেই বদল ঘটাবেন না। অটল হয়ে রইলেন বাবা তার নিজ চিন্তায়।
কেটে গেলো আরও কয়েকটা দিন। নাবিলকে বলি বলি করে আর বলা হয়ে উঠলো না কথাগুলো। শোকের মধ্যে চিন্তার পাহাড় চেপে দিতে খুব সংকোচবোধ হচ্ছিলো। সুযোগ খুঁজতে গিয়ে সময় চলে গেলো আর কথাগুলো অব্যক্তই রয়ে গেলো।
নাবিলকে যতবারই বলতাম, 'তোমাকে ভালোবাসি নাবিল।'
নাবিল ততবারই বলতো, 'তোমাকে আরও অনেক বেশি ভালোবাসতে চাই তৃণা।'
কিন্তু এখন আর নাবিলকে দেওয়ার মত অনেক সময় আমার হাতে নেই। দু'দিন বাদেই বিয়ে। গতকাল রাতেও জানতাম না, পাত্রপক্ষই এবার সময়টাকে কমিয়ে দিয়েছে। সকালে বাবা এসে মুঠোফোনটা নিয়ে গেলেন আর খবরটা দিয়ে গেলেন। নাবিলের সঙ্গে যোগাযোগের সব রাস্তা এই মুহুর্তে বন্ধ।
চোখের জল চোখে শুকায়। বাবার মন তবুও গলেনি। বিয়েটা হয়ে যায়। এবার বাবা বেজায় খুশি আর আমি মৃতপ্রায়।
বিয়ের ফটোশুট করার সময় ফটোগ্রাফার আমাকে বারবার বলতে লাগলেন, 'আপু, একটু হাসুন।'
হাসি কী এতই সস্তা জিনিস, চাইলেই হাসা গেল! আমায় বরং কেউ মন খুলে কাঁদতে বলুক। আমি চিৎকার করে কাঁদতে চাই।
বিব্রতকর পরিস্থিতি সামাল দিতে বাবা পাশ থেকে বললেন, 'পরিবার ছেড়ে দূরে যাচ্ছে। হাসি কী আসে এই মুহুর্তে!'
নাবিলকে হারিয়ে ফেলার শোকে আমি অস্থির। ওদিকে মা সবাইকে বুঝিয়ে চলছেন, পরিবার ছেড়ে যাওয়ার শোকে আমি পাথর।
তারপর আর নাবিলের সঙ্গে কথা হয়নি কোনোদিন। নাম্বারটাও বদলে নিয়েছি। নাবিলের মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমার নেই। সোহানের সঙ্গে আমার সাংসারিক জীবনটা সবার চোখেই বেশ সুখের। কেবল আমিই জানি, কতটা পানসে সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।
সোহানের সঙ্গেই আমার বাকিটা জীবন কাটাতে হবে, এই চিন্তায় আমি সব যন্ত্রণা চাপা দিয়ে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছি। এই মানিয়ে নিতে নিতে কেটে গেলো বেশ ক'টা বছর। বাবার বাড়ি তেমন একটা যাওয়া হয় না। মন টানে না। বাবার উপর জমে থাকা রাগটা এখনো পানি হয়নি। অবশ্য বাবাও চেষ্টা করেননি। তিনি ভাবেন, তিনি যা করেছেন এটাই তার করা উচিৎ ছিলো।
পানসে জীবনের অপূর্ণতা ঘোচাতে আনন্দ হয়ে আসে আমার মেয়ে সম্পূর্ণা। ওকে ঘিরেই এবার আমার জগৎ। ভালো থাকা বলতে আমি এখন কেবল সম্পূর্ণাকেই বুঝি।
মেয়েটা একটু একটু করে কথা বলতে শিখছে, দৌড়ানো শিখছে, বুঝতে শিখছে, দিনে দিনে চোখের সামনে মেয়েটা বড় হয়ে উঠছে। ওকে নিয়েই আমার সময়গুলো ব্যস্ত হয়ে উঠলো।
তারপর যখন সম্পূর্ণার স্কুলে যাওয়া শুরু হলো, ওকে রোজ স্কুলে নিয়ে যেতে এবং বাড়ি নিয়ে আসার দায়িত্বে আমি আরও ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। এই ব্যস্ততার মাঝেই আমি যেন ভালো থাকি। কিন্তু কিছু বছর বাদেই এই ভালো থাকার সময়ে চিড় ধরে বিপদ নেমে আসে। সোহানের চাকুরিটা চলে যায়।
অনেক চেষ্টা চালিয়েও একটা ভালো চাকুরি জোগাড় হচ্ছে না।
বিষয়টা বাবাকে জানালে বাবা ভরসা দিয়ে বললেন, 'চিন্তা করিস না। একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমার এক ছাত্র আছে রবিন, খুবই ভালো জানে আমায়। ও এখন অধ্যাপক হয়ে গিয়েছে।'
'সে কিভাবে সোহানের চাকুরির ব্যবস্থা করে দিতে পারবে?'
'রবিনের বোন বিয়ে দিয়েছে বছর দুয়েক আগে। আমায় খুব করে যেতে বলেছিলো, কিন্তু তখন তোর মা অসুস্থ থাকার কারণে আর যাওয়া হলো না। তারপর মাঝেমধ্যেই ফোন করে যেতে বলে, কিন্তু সময় হয়ে ওঠে না। এবার যাব তাহলে।'
'কিন্তু বাবা এর সঙ্গে সোহানের চাকুরির কী সম্পর্ক?'
'ও হ্যাঁ। সেটাইতো বলতে ভুলে গিয়েছি। ওর বোনকে যার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে, শুনেছি ছেলেটা নাকি খুবই ভালো। অল্প বয়সে অনেক কিছু করে ফেলেছে। বেশ মেধাবী আর অনেক পরিশ্রমী। নিজের একটা আইটি ফার্ম আছে। আমি রবিনকে বললে, ও ঠিক ওর বোনের জামাইকে বলে সোহানের একটা চাকুরির ব্যবস্থা করে দিবে।'
'তাহলে তুমি একটু কথা বলো বাবা। এই মুহুর্তে সোহানের একটা চাকুরি ভীষণ দরকার।'
'চিন্তা করিস না৷ আমি আছি তো।'
বাবা তার প্রাক্তন ছাত্র রবিনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন গত মাসে রবিনের বোনের মেয়ে হয়েছে৷ মেয়ে দেখার অজুহাতে রবিন তার বাসায় আমাদের সপরিবারে আমন্ত্রণ জানান৷ ওখানেই তার বোনাইয়ের সঙ্গে আমাদের প্রয়োজনীয় কথোপকথনের ব্যবস্থা করবেন বলে জানান। চাকুরির বিষয়েও তিনি নিশ্চিত করেন। মাথার উপর থেকে একটা ভারী বোঝা সরে গেলো।
খুব শীঘ্রই সময় করে আমরা বাবা মা'র সঙ্গে রবিনের বাসায় গেলাম। রবিনের বোনাই তখন ওখানে উপস্থিত ছিলেন না। জানা গেলো কিছুক্ষণ বাদেই চলে আসবেন৷ রবিনের বোনের সঙ্গে ততক্ষণে আমার আলাপ বেশ জমে উঠলো।
তিনি আমার মেয়ের নাম জানতে চাইলে বললাম, 'সম্পূর্ণা।'
নামটা শুনে হেসে বললেন, 'আমার মেয়ের নামও সম্পূর্ণা। ওর বাবা রেখেছেন।'
'আমার মেয়ের নাম আমিই রেখেছি। মজার কথা হলো, বিয়ের আগেই ভেবে রেখেছি মেয়ে হলে নাম রাখবো সম্পূর্ণা।' হাসতে হাসতে বললাম।
বেশ খুশি হয়ে তিনি বললেন, 'তাই নাকি! আমার মেয়ের বাবাও তো নাকি বিয়ের আগে ঠিক করে রেখেছিলেন মেয়ের নাম।'
'বাহ্! বেশ মিল তো তার সঙ্গে আমার!' মজার ছলেই কথাটা বললাম আমি।
তিনি হেসে বললেন, 'তাই তো দেখছি।'
'কখন আসবেন তিনি?'
'এই তো এখনই চলে আসবেন।'
খানিক বাদেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। বাবাও চুপ করে রইলেন। মা ভীষণ বিব্রতবোধ করছেন৷
ভদ্রলোক হেসে সালাম দিয়ে বললেন, 'আমি নাবিল।'
রবিন সবাইকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সোহান হাসিমুখে কথপোকথন চালিয়ে যেতে থাকলো। আমার চোখ জুড়ে পুরাতন দৃশ্যেরা জমাট বাধলো। ভেতর জুড়ে স্মৃতিরা জেগে ওঠার যন্ত্রণায় ছটফট করছি প্রতিনিয়ত। বাবা যেন এবার কিছু বলার ভাষাই হারিয়ে ফেললেন।
রবিনের বোন একগাল হেসে নাবিলের উদ্দেশ্য বললেন, 'জানো নাবিল, তৃণা আপুর মেয়ের নামও সম্পূর্ণা। তিনিও নাকি তোমারই মতো আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন। কী অদ্ভুত তাই না বলো?'
নাবিল প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে সম্পূর্ণাকে কাছে টেনে নিয়ে হেসে বললো, 'তোমার নামটা ঠিক তোমার মতই মিষ্টি।'
নাবিলের চোখে চোখ পড়তেই মনে পড়ে গেলো, কথা ছিলো আমাদের দু'জনের ভালোবাসা সম্পূর্ণ করে একজন সম্পূর্ণা আসবে। আর এখন, দু'জনের ভালোবাসার অসম্পূর্ণতা মনে করিয়ে দিতেই দু'জন সম্পূর্ণার আবির্ভাব ঘটলো।
গল্প: সম্পূর্ণা।
লেখা: মাহ্ফুজা রহমান অমি।

ক্রাশ কনফেশন
ক্রাশ কনফেশন
লেখকঃ আফিয়া আপ্পিতা
পর্ব-২
"ক্রাশ কনফেশন এসেছে তোর নামে। অভিহায়ায়ায়ায়ায়ায়া। "
বিকট শব্দে ঘুম ভাঙলো আমার। ছ্যাকা খেয়ে বাসায় এসে বালিশে মুখ গুজে ঘন্টা খানেক কেঁদেছি। কান্না শেষে বালিশ থেকে মুখ তুলে পুরো ঘটনাটা একবার ভেবে হাসি পেয়েছে। তার উপর এই ঘটনায় কলেজ মিস দিয়ে বাসায় ফিরে মরা কান্না জুড়ে দেয়ার ঘটনা মনে পড়তেই হাসিতে ফেটে পড়েছি। ঘন্টা খানেক হেসেছি। হাসি কান্নায় ক্লান্তিতে শরীর বিশ্রাম চাইলো। সাড়া দিতেই ঘুমের দেশে পাড়ি জমালাম। ঘুম ভাঙলো কারো চিৎকারে। চোখ খুলে দেখলাম খাটের পাশে দিতিয়া দাঁড়িয়ে আছে। দিতিয়া আমার বান্ধবী। আমাদের পাশের বিল্ডিংয়ে থাকে। কাঁচা ঘুম ভাঙায় বেশ বিরক্ততে কপাল কুঁচকে এলো আমার। ঘুমজড়ানো কন্ঠে একরাশ বিরক্তি মাখিয়ে বললাম,
"কি হয়েছে? নেতাদের মতো এমন চিৎকার করছিস কেনো! ভাষণ দেয়ার হলে মাইক নিয়ে মাঠে যা। আসনে বসে ভাষণ দে। আমাকে ঘুমোতে দে। "
আমার কথা দিতিয়া না শুনার ভান করে আমার পাশে এসে বসলো। তারপর খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
"জানিস অভিহা? তোর নামে ক্রাশ কনফেশন এসেছে। কনফেশন পড়ে বুঝলাম এক্কেবারে টুরু লাভ।"
দিতিয়ার কথার মাঝে "ক্রাশ" শব্দটা শুনে সকালের কথা মনে পড়ে গেলো। সাথে সাথে ধরপড়িয়ে উঠে বসলাম। এই ক্রাশ নামক আহারের জন্য কত কি সইতে হলো আমাকে! বউ হতে গিয়ে সৎ মায়ের প্রস্তাব পেলাম। নাহ,সকালে যা হলো এর পর ক্রাশ নামক আহার গ্রহন কিংবা আগ্রহ যেখানো উচিত হবে না। না জানি এবার ও কারো সৎ মা হয়ে যাই। কথাটা ভাবতেই দুই গালে দুই চড় দিয়ে ধীর কন্ঠে বললাম,
"তাওবা তাওবা। "
আমাকে গালে চড় দিতে দেখে দিতিয়া তার কপালের বাদামী চামড়া কুঁচকালো। তারপর বলল,
" ক্রাশ কনফেশন আসছে খুশি না হয়ে বাপ্পারাজের মতো নিজেকে আঘাত করছিস কেনো!"
আমি হতাশ গলায় বললাম,
"ওটা ক্রাশ না বইন ওটা বাঁশ। ওই যে ছোট বেলায় পড়ছিলাম বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ। সেই বাগানের বাঁশ হচ্ছে ক্রাশ।"
দিতিয়া হয়তো আমার কথা বুঝতে পারে নি তাই তো তার হরিনী চোখ দুটো হাঁসের ডিমের মতো করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
"কাল অব্দি তুই ক্রাশ শব্দটা শুনলেই ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো লাফাতি। আজ হঠাৎ কি হলো তোর! ক্রাশকে বাঁশ বাগানে নিয়ে গেলি কেনো?"
দিতিয়ার কথায় সকালে গায়ে পরা সাদা রঙের কলেজ ইউনিফর্মটা ঝেড়ে ঠিক করে বিছানা থেকে নামলাম। তারপর ডান হাত উঁচু বাড়িয়ে এসেম্বলির শপথের ভঙ্গিতে বললাম,
"আমি নাবিল ফারুকী এবং আশফিকা খানমের কন্যা অভিহা বিনতে ফারুকী, ইট,সিমেন্ট এবং বালুর তৈরি এই দালাতে উপর দাঁড়িয়ে জাবেদ মল্লিক এবং তানজিনা আক্তারের কনিষ্ঠ কন্যা দিতিয়া মল্লিককে সাক্ষী রেখে শপথ করছি যে আজ এই মুহুর্ত থেকে ক্রাশ নামক বাঁশ বাগানের বাঁশ গ্রহন এবং সেই বাঁশ সম্পর্কিত যে কোন আলোচনা থেকে নিজেকে থেকে বিরত রাখি ব।"
শপথ শেষে হাত নামিয়ে এক লম্বা শ্বাস নিলাম। দিতিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে হা স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি সেদিকে না ঘেটে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। এই মেয়ে থেকে কথা লুকানো দায়। কোন ভাবে যদি সকালের ব্যাপারটা জানতে পারে তবে মজা নিবে। প্রেস্টিজের উপর ট্রাক্টর যাবে একবারে। তারচেয়ে বরং একদিনের জন্য ইগ্নোর কুইন হয়ে যাই। এমন ভাবনা নিয়ে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। ছ্যাকা খেয়ে আর লাঞ্চ করা হয় নি। ফ্রেশ হয়ে বের হলাম ঘন্টাখানেক পর। ছ্যাকা খাওয়ার পর লম্বা শাওয়ার নেয়ায় ছ্যাকা হজম হয়ে ভালো লাগছে। আরেকবার খাবো কি? পরক্ষনেই নিজের দুই গালে চড় দিয়ে বললাম,
"তাওবা তাওবা।"
দিতিয়া খাটে বসা ছিলো আমাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। চোখে মুখে উপচে পড়া কৌতুহল। দিতিয়া স্বভাবে কৌতুহলী। সে সচেতন চোখে আমাকে একবার পরখ করলো তারপর বলল,
"তোর কি হয়েছে বল তো? এমন এলিয়েন এলিয়েন বিহেভ করছিস কেনো!"
আমি দিতিয়াকে এড়িয়ে যেতে টাওয়াল দিতে চুল মুছতে মুছতে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। যেতে যেতে বললাম,
"কিছু হয় নি। তুই বেশি বুঝিস।"
দিতিয়া আবারো আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর বলল,
"আজ শরীর খারাপ থাকায় আমি কলেজ যাইনি। আন্টি বলল তুই গিয়েছিস আবার নাকি ঘন্টাখানেক পরে ফিরে এসেছিস। এসেই নাকি রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়েছিস! শোভা বলল কলেজ যাস নি। সে কথা শুনে আমি খবর জানতে বারান্দা টপকে এসে দেখলাম তুই ইউনিফর্ম পরা অবস্থাতেই ঘুমাচ্ছিস। বল আজ কি হয়েছে? কলেজ না গেলে গিয়েছিস কোথায়?"
গোয়েন্দা গিন্নীর মতো ভাব দিতিয়ার। আমি এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,
"মাথার উপর চাঁদ উঠা সেই বাঁশ বাগানে গিয়েছিলাম আমি। বাগানে গিয়ে দেখলাম সেখানে ভূত পেত্নীর বাস। তারা তাদের ভয়ংকর আচরণের মাধ্যমে মানুষকে লন্ড ভন্ড করে দেয়। আমাকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে।"
বলে ডাইনিংরুমের দিকে পা বাড়ালাম। ছ্যাকা খাওয়ার পর এই মুহুর্তে লাঞ্চ করা অত্যাবশ্যক হয়ে গেছে। এদিকে দিতিয়া হা করে তাকিয়ে আছে। সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
***
বিকেলে দুপুরের খাবার খেয়ে ডোকর দিতে দিতে বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামলাম। বাসার কাছে থাকা দোকান থেকে কাচের বোতলের সেভেন আপ কিনলাম। ক্যাপ খুলে মুখে দিয়ে এলোমেলো হয়ে হাটছি। ভাবটা এমন যেন মদ খাচ্ছি। আজ নিজেকে বাপ্পারাজ মনে হচ্ছে। বাপ্পারাজ যেমন চ্যাকা খেয়ে মদ নিয়ে রাস্তায় হাটে আমিও তেমন করবো। ততক্ষণে দিতিয়া আমার কাছে চলে এসেছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি হাটতে হাটতে হঠাৎ থেমে গেলাম। পিছু ফিরে আমার বাসার দিকে তাকালাম। চোখ ফেরাতেই চোখ গেলো পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদে। সাথেই সাথেই বিল্ডিংয়ের দিকে ফিরে সটান দাঁড়িয়ে গেলাম। বাঁ হাতে সেভেন আপ রেখে ডান হাত স্যালুট জানালাম।
আমার স্যালুট দেয়ার কারণ আমার পাশের বাসার ছাদে কোন পুলিশ আর্মি কিংবা দেশের পতাকা নয়। আমার স্যালুট দেয়ার কারণ শ্যামবতার ভীত। শ্যামবতা হচ্ছে শ্যামবতীর পুংলিঙ্গ। শ্যামবতা আমার জীবনের ক্রাশ নামক বাঁশের প্রথম অধ্যায়। তার শ্যামবর্ণের চেহারায় মুগ্ধ হয়ে নাম দিয়েছিলাম শ্যামবতা। ক্লাস ফাইভ,সিক্স দুই বছর সে আমার ক্রাশ ছিলো। যদিও পরে তা ভয়ে পরিণত হয়েছে।
শ্যামবতাকে আমি জমের মতো ভয় পাই। আমার সামনে যদি একটা রাসেল ভাইপার কিংবা সিংহ আর শ্যামবতাকে দাঁড় করায় তবে আমি শ্যামবতার দিকে তাকিয়ে ভীত চেহারায় ঢোক গিলে পালাবো।
তাকে এত ভয় পাওয়ার কারণটা বলি, ছোট বেলা থেকে আমার মাঝে দস্যিপনা ছিলো চোখে পড়ার মতো। কাউকে ভয় পেতাম না। তখন বাবা ভয়ংকর রাগী আর গম্ভীর শ্যামবতাকে আমার হোম টিউটর হিসেবে নিয়োগ করেন। প্রথম দিন আসার পর আমি তাকে বলেছিলাম, আমার পড়তে ইচ্ছে করে না। প্রেম করতে ইচ্ছে করে। আমি পড়বো না প্রেম করবো। আর শুনেন আমি একদম আপনাকে ভয় পাই না।
সেই কথা বলার সেকেন্ড দশেক পর আটারো বছরের ছেলেটা বারো বছরের আমিটার গালে সর্বশক্তি দিয়ে চড় মেরেছিলেন। এক চড়েই জ্ঞান হারিয়ে ছিলাম আমি। সেই সাথে প্রেম আর ক্রাশের ভুত নেমেছে সেদিন। ক্রাশ নামক প্রথম বাঁশ সেদিনই গ্রহন করেছিলাম। রাতে কাপুনি দিয়ে জ্বর এসেছিলো। সাতদিন বিছানা থেকে উঠতে পারি নি। বিছানা থেকে উঠতেই সবার আগে আমি তার বাসায় গিয়ে সবার সামনে তাকে স্যালুট জানিয়ে বলেছিলাম,"আমি আপনাকে ভয় পাই।" সেই ভয় এখনো আছে। এখনো দেখা হলেই আমি তাকে স্যালুট জানাই। আর তার গার্লফ্রেন্ডকে একশো এক বার মনে মনে পানিতে চুবাই।
শ্যামবতাকে দেখে পুরনো দুঃখ যেন জেগে উঠলো। মনের বাপ্পারাজ বলে উঠলো, তোর জীবন প্রেম আসবে না। আজীবন তুই সিঙ্গেল থাকবি। তোর প্রেম হবে না। তোর জীবনে ক্রাশ নামক বাঁশ আসবে শুধু। প্রেম না করেও ছ্যাকা খাবি। ক্রাশ মা বানাবে,থাপ্পড় দিবে আরো অনেক কিছু করবে। মনের বাপ্পারাজের অভিশাপ শুনে কান্না ফেলো বাসায় চলে এলাম। আবারো ঘন্টাখানেক কাঁদলাম।
*
পরদিন যথারীতি কলেজ যাচ্ছি। প্রদীপের ভয়ে দিতিয়াকে সাথে না নিয়ে একাই যাচ্ছি। মান সম্মানের ব্যাপার। লোক জানাজানি হলে সমস্যা হবে।
বাস স্টপে এসে দাঁড়াতেই কোথা থেকে প্রদীপ ছুটে এলো। বাস স্টপ ভর্তি লোকের সামনে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করলো। তারপর বিনত কন্ঠে বলল,
"কেমন আছেন মা? আশা করি ভালো আছেন। আপনার জন্য সুখবর আছে, কাল মা বাবার সাথে ঝগড়া করে বাসা নানুর বাড়ি চলে গেছে। এই ফাঁকে আপনি বাবাকে বিয়ে করে আমাদের বাসায় চলুন। বাবাও আজ বাসায়। আপনি বাসায় গেলেই আমি কাজি ডাকবো। তারপর সূচনা মানে আপনার পুত্রবধু আপনাকে লাল বেনারসি পরিয়ে আঁচলে মায়ের ফেলে যাওয়া সংসারের চাবি বেধে দিবে। তবে চলুন আর দেরি কেনো! আপনার ছেলেমেয়ে নাতনি অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। চলুন মা।"
বলে আমার হাত ধরে টেনে একটা সিএনজিতে উঠিয়ে দিয়ে নিজেও আমার পাশে এসে বসলো। আমি তখনো ঘটনা বুঝে উঠতে পারি নি। ঘটনা বুঝে উঠে আমি অস্ফুট স্বরে বললাম,
"এটা জীবন নয় এটা বাশ বাগান। হয়াত থাকতে আর কখনো ক্রাশ খাবো না। ভুলে না। তার আগে কচু গাছের সাথে দড়ি বেধে ফাঁসি দিবো।"
ভাবনা কাটিয়ে আমি প্রতিবাদ করতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। তার আগেই গাড়ি থেমে গেলো। প্রদীপ আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে বলল,
"আসুন মা আমরা চলে এসেছি। এটাই আপনার স্বামীর বাড়ি।"
বলে একটা বাড়ির দিকে ইশারা করলো। আমি তাকিয়ে চমকালাম। মনে মনে বললাম,
"তবে কি আমি আজ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিবো ম্যারেজ উইথ মাই লয়েল এন্ড ড্যাশিং ক্রাশ'স ফাদার!"
চলবে...
(রম্য গল্প এটা। সবাইকে হাসানোই মূল্য লক্ষ্য আমার। বাস্তবতা নিয়ে প্রচুর গল্প লিখেছি। বাস্তবতাপ্রেমীরা সেগুলো পড়তে পারেন। এই গল্পে বাস্তবতার ছোঁয়া মিলবেনা তেমন একটা। তাই বাস্তবতা খুঁজবেন না। আর হ্যাঁ আমি সিরিয়াল দেখি না যে সেখান থেকে স্ক্রিপ্ট উঠাবো। স্টার জলসার মতো বাজে চ্যানেল তো নয়ই। তাই আজেবাজে মন্তব্য থেকে বিরত থাকুন। পারলে গঠনমূলক মন্তব্য করুন। খুশি হবো। ধন্যবাদ)
আগের পর্ব
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/853248575480640/
আলো_আধাঁর
#আলো_আধাঁর
লেখা- তোহা কবির
২.
একটু আগে ওর ননদরা ও বাড়ির অন্য মেয়েরা হিয়াকে বাসর ঘরে রেখে গেছে। বলে গেছে ফ্রেস হয়ে নিতে।রাজিবের আসতে অনেক দেরি হবে ও মুরুব্বিদের সাথে কথা বলছে। হিয়া দরজা লাগিয়ে রুমের মাঝে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রুমটাকে পর্যবেক্ষণ করল। খুব সুন্দর সাজানো গোছানো রুম। রুমের প্রতিটা জিনিসে হালকা বৈদেশিক ভাব লক্ষ করা যায়। রুম এবং বারান্দার মাঝের দেয়ালটা কাচেঁর। নীল পর্দা ঝুলছে তাতে। পর্দা সরিয়ে ভিতর থেকেই বারান্দাটা দেখে নিল হিয়া। বারান্দাটা আরও সুন্দর। খুব বড় এবং অনেক রকম ফুলগাছে ভর্তি। একসাইডে বড় একটা দোলনা। অন্য সাইডে একটা গোল টেবিল ও একজোড়া বেতের চেয়ার। হিয়ার মনে হচ্ছে মানুষটা বেশ সৌখিন। তাছাড়া ও শুনেছে রাজিব এস এস সি দিয়েই বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে গেছিল। ফিরেছে এম বি এ শেষ করে একবছর হলো। তাই রুমের সবখানে বিদেশি ছোয়া। বারান্দার দরজা খুলে একবার ভাবলো গিয়ে ভালো করে দেখে আসে পরে কি ভেবে আর ওদিকে না গিয়ে নিজের জিনিসপত্র খোজায় মনোযোগ দিল ও। রুমের এককোণায় ওর লাগেজগুলো রেখে গেছে এ বাড়ির কাজের ছেলেটা। বড় লাগেজটা খুলে সুতির একটা লাল শাড়ি বের করে নিল হিয়া। টয়লেট্রিজের ব্যাগটা নিয়ে ওয়াসরুমে ঢুকল সে। অনেক্ষণ সময় নিয়ে ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসল ও। এখন ক্লান্তি ভাবটা অনেকটা কমেছে ওর। আয়নায় নিজেকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে নিজেকে সাজাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল ও। চোখে মোটা করে কাজল দিল হিয়া। হিয়ার চোখটা এমনিতেই অনেক সুন্দর। মোটা করে কাজল দিলে আরো সুন্দর লাগে। ঠোটেঁ গাঢ় করে লাল লিপস্টিক দিল। চুলটা হাত খোপা করে মাথায় একহাত ঘোমটা টেনে বিছানার মাঝে বসে পরল হিয়া। এতেই হিয়াকে অপরুপ লাগছে। মেক আপের প্রয়োজন নেই ওর। ফর্সা মুখে ঠোঁটের নিচের তিলটা এখন বোঝা যাচ্ছে। একটু আগের ভারি মেক আপে এই তিলটা হারিয়ে গেছিলো যদিও এটিই ওর রুপ বাড়িয়ে দেয় দ্বিগুণ। বসে বসে অপেক্ষা করছিল ও রাজিবের জন্য কিছুটা নার্ভাসনেস ভালোলাগা ভয় এসব সহ একধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ওর ভিতর। এসবের মাঝে হঠাৎ ওর দিয়ার মুখটা মনে পরে গেল। মুখে হাসি রেখে বিদায় দিলেও চোখদুটি ছলছল করছিল ওর। হিয়ারও কান্না পাচ্ছে। না জানি এখন দিয়া কি করছে? হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজে সচকিত হলো হিয়া। আজ থেকে ওর নতুন জীবনের শুরু। মানুষটা কেমন হবে? ওর মনের মতো কি? নাকি.....
বেশি কিছু ভাবতে পারলো না হিয়া সম্পর্কের শুরুর মূহুর্তটা দুশ্চিন্তা দিয়ে শুরু করতে চায়না ও। ঘোমটাটা ঠিকঠাক করে আরষ্ট হয়ে বসে রইল হিয়া। ঘোমটার ফাক দিয়ে খুব সাবধানে রাজিবকে লক্ষ করছে ও। দরজা দিয়ে ঢুকে রাজিব ওর দিকে না এসে আলমারির কাছে গেল। আলমারি খুলে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে সোজা বাথরুমে ঢুকে পড়ল। হিয়া ওভাবেই বসে রইল। প্রায় আধঘন্টা পর বেরিয়ে এল রাজিব। মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিল হিয়া। রাজিব এবার ওর পাশে এসে হাত দিয়ে ফুল সরিয়ে শুয়ে পরল। ওকে দেখে বলল,
এখনো এভাবে বসে আছেন কেন? টায়ার্ড লাগছে না শুয়ে পরুন। আমার তো খুব ঘুম পাচ্ছে আমি তো ঘুমাচ্ছি।
বলেই আর একমুহুর্ত দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পরল ও। কিছু সময় পর ধীরেধীরে নিজের ঘোমটা সরালো হিয়া। অপলক দৃষ্টিতে রাজিবের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষন। মনের ভিতর থেকে কেউ জানান দিল এই ঘুমন্ত রাজপুত্রটা আজ থেকে ওর। শুধুই ওর। কিন্তু আসলে কি তাই? এক অজানা আশংকা এসে আবারও ঘিরে ধরল ওকে। কিন্তু রাজিবের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সমস্ত দুশ্চিন্তা আবারও দুর হয়ে গেল ওর। ফর্সা লম্বাটে মুখ,জোড় ভ্রু,বা চোখের পাশে ছোট্ট একটা তিল,চাপ দাঁড়ি সব মিলিয়ে অসাধারণ সুন্দর রাজিব। তবে বাইরের সৌন্দর্যের সাথে কি ভেতর টাও সুন্দর তার। ভাবতে ভাবতেই একবার রুমের রেডিয়াম ঘড়ির দিকে তাকালো হিয়া। ২:১০ মিনিটের জানান দিচ্ছে ওটা। ঘড়ির উপর থেকে চোখ সরিয়ে রাজিবের মুখের দিকে তাকিয়ে ওভাবেই কখন যে ঘুমিয়ে পরল তা টেরই পেলনা হিয়া।
ভাইকে বাসরে ঢুকিয়ে কিছুক্ষন আত্মীয় বন্ধুদের সাথে গল্প করে নিজের রুমে ঢুকল রিয়াদ। সব মিলিয়ে ভিষন ক্লান্ত ও। কোনোরকমে ড্রেস চেন্জ করে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিতেই তন্দ্রা এসে ঘিরে ধরল ওকে। বন্ধ চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছাদের সেই পরিটার মুখ। সাথে সাথে সমস্ত ঘুম কর্পূরের মতো উবে গেল। থেকে থেকে ছাদের সমস্ত কিছু ওর কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করতে থাকলো। ওর প্রচন্ড কৌতুহল হচ্ছে পরিটার সম্পর্কে জানার জন্য। কাল তো আসবেই সে আর ও ওতো যাবে ওর ভাইয়ের সাথে ঐ বাড়িতে। কি করে পরিটার সাথে কথা বলবে এখন সেটাই চিন্তা করছে। পরিটা কি আদৌ ওর সাথে কথা বলবে। ছাদ থেকে নামার পর ও তো কারো সাথে কথা বলেনি। সারাক্ষণ ওর ভাবীর আচলের একটা কোণা ধরে ঘুরছিল মেয়েটা। ওদের আসার সময় আস্তে করে আচল টা ছেড়ে দিয়েছিল ও। ওর ভাবী গিয়ে যখন মেয়েটার কপালে আলতো করে তার ঠোঁট ছুয়িয়েছিল তখন চোখ দুটি ছলছল করে উঠেছিল কেবল এছাড়া একফোটাঁ পানিও চোখ থেকে পরেনি ওর না বলেছে একটাও কথা। মেয়েটা এখন কি করছে? মেয়েটা কি জানে তার কথা ভেবে পুরো রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিচ্ছে কেউ? আর রিয়াদ ইবা এত কেন ভাবছে ওর কথা? একবার মাত্র দেখেছে ওকে কথাও হয়নি। তাছাড়া যেভাবে দেখেছে সেভাবে দেখলে যে কারোরই মেয়েটাকে নিয়ে খারাপ ধারণা জন্মাবে। তাহলে ওর কেন এমন ধারণা হচ্ছেনা? কেন মনে হচ্ছে মেয়েটার কথা এত? হয়তো ওর প্রফেশনের কারণে। কিন্তু না তাও না। আগে কখনোই কাউকে দেখে এমন অনুভূতি হয়নি ওর। তবে কি এটাই লাভ এ্যাট ফার্স্ট সাইট? শুয়ে শুয়ে এমন নানা কথাই ভাবছিল রিয়াদ। ও কি জানে যার কথা ভেবে ও রাত পার করে দিয়েছে ওর সেই পরি এখন কি করছে? চারিদিকে সিগারেটের ধোয়া দিয়ে এক রহস্যময় ইন্দ্রজালের রচনা করে চলেছে ওর পরি। আর এভাবেই রাতটা শেষ করবে ও।
ঘুম থেকে উঠেই নিজের পাশে ঘুমন্ত মেয়েটার দিকে চোখ গেল রাজিবের। কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ও। লাল সুতির শাড়ি , চোখের কাজল একটু লেপ্টে গেছে, ঠোঁটের লিপস্টিকটা বালিশের ছোয়াঁয় লেপ্টে প্রায় মুছে গেছে আর লম্বা একরাশ কালো চুল বুকের ওপর ছড়িয়ে আছে। সবকিছুই যেন মেয়েটার সৌন্দর্য কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে।আর ঠোটেঁর নিচের তিলটা যেনো ওকে টানছে। এত মিষ্টি একটা মেয়ের সাথে ওর বিয়ে হয়েছে দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল রাজিবের। ও কি করে এই মেয়েটাকে কষ্ট দিবে? কি দোষ মেয়েটার? এই ঘুমন্ত দুটি চোখে হাজারো সপ্ন নিয়ে মেয়েটা ওর কাছে এসেছে। কি করে নিজের হাতে সেই সপ্ন গুলো ভাঙবে ও। নিজের চুল টেনে ছিড়তে ইচ্ছা হচ্ছে ওর। বিয়ের আগে একবার যদি দেখে নিত ওকে। উফ্ কি ভুলটাই না করে ফেলেছে ও। অবশ্য দেখে নিলেই কি বিয়েটা ভাঙা যেতো? কিন্তু এই ভুলের প্রায়াশ্চিত্ত করতে যদি ওকে এই মেয়েটার সাথে সারাজীবন কাটাতে হয়, ওকে দুনিয়ার সমস্ত সুখ এনে দিতে হয় তাহলে তা......
ফোনের রিংটনে চিন্তাটা সম্পূর্ণ করতে পারলনা রাজিব। স্ক্রিনে চিরচেনা একটা নাম দেখে দ্রুত ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে গেল ও। ততক্ষনে হিয়ার ঘুম ভেঙে গেছে। চোখ মেলে নিজের বর্তমান অবস্থা বুঝতে কিছুটা সময় লাগল ওর। অচেনা একটা রুম দেখে প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিল হিয়া। তাড়াতাড়ি পাশ ফিরে তাকালো কিন্তু রাজিবকে দেখতে না পেয়ে একটু লজ্জা পেল। ইস মানুষটা ওর আগেই উঠে পরেছে। বিছানা হাতড়ে নিজের ফোন খোজার চেষ্টা করল। হঠাৎ মনে পরল সেটা ওর হ্যান্ড ব্যাগে রয়েছে। তাই রুমের রেডিয়াম ঘড়ির দিকে তাকালো ও। ৮-৪৫ মিনিট। বেশ বেলা হয়ে গেছে। পাশের ড্রেসারের আয়নায় চোখ পরতেই লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল ও। কি অবস্থা ওর আর এভাবেই মানুষটা দেখেছে ওকে ইস্। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে লাগেজ থেকে একটা শাড়ি বের করে বাথরুমে ঢুকে পরল ও। যাবার আগে একবার বারান্দার দিকে তাকালো ও। কাচেঁর দরজা লাগানো। কারো সাথে কথা বলছে রাজিব কিন্তু কাচেঁর দেওয়াল ভেদ করে রুমে সে শব্দ আসছে না। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কারো কাছে অনুনয় করছে। কিন্তু কার কাছে। হয়তো কোনো বন্ধু। নিজের মনের আশংকা গুলো নিজের মনেই চেপে বাথরুমে ঢুকে পরল হিয়া।
চলবে........
আগের পর্বের লিংক---
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/851699378968893/

🪔🪔" দামোদর মাসের মাহাত্ম্য
🪔🪔" দামোদর মাসের মাহাত্ম্য "🪔🪔
-
সাধাণত লক্ষ্মী পূর্ণিমা থেকে দামোদর ব্রতের মাস শুরু হয়, কিন্তু এ বছর লক্ষ্মী পূর্ণিমার আগেই দামোদর মাস শুরু হলো 'মলমাস' হেতু। তবে আমরা এটাও জানি যে কার্তিক মাসই হলো দামোদর মাস।
-
এই মাস বিশেষ ভাবে কিছু ব্রত আচরণে মধ্য দিয়ে পালন করতে হয়। এই ব্রত পালন করতে হলে কি কি বর্জনীয় জেনে নেই।
-
ধর্মাত্মা ব্যক্তি দামোদর (কার্তিক) মাসে মৎস, মাংস ভক্ষন করবে না।
-
মাসকলাই, বরবটি, শিম,কমলী শাক, পটল, বেগুন, মাছ মাংস,, এসব বর্জন করবে।
-
যারা ১ মাস হবিষ্যান্ন করবে তারা) শ্রীশ্রী হরিভক্তিবিলাসে ১৩ অধ্যায়ের ১০-১৩ নং শ্লোকে হবিষ্যান্নের উপাদান উল্লেখ্য করা হয়েছে যে, নিম্নোক্ত উপাদান গুলো হবিষ্যান্ন তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে।
-
অাতপ চাল,
ঘি,
কাওন,
শ্যামা চাল,
সৈন্ধব লবণ,
ননীপূর্ণ গোদুগ্ধ,
পাকা কলা,
কাচা কলা,
কাচা পাকা পেপে,
অালু,
মরিচ,
গম,
ফল।
-
কিন্তু ফলটা স্কন্ধপুরাণের নাগরখন্ডে অবশ্যই কম বীজ পূর্ণ ফলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
-
হবিষ্যান্ন বর্জনীয় যে সব দ্রব গুলো। তা হলো,
-
মুগ ডাল,
তিল তেল,
বেতো শাক,
সাত্ত্বিক শাক মুলা,
জিরা ও
তেঁতুল।
-
দিনে ২বার সূর্য উদয়ের পরে এবং সূর্যাস্তের অাগে হবিষ্যান্ন গ্রহণ করতে হবে।
-
শরীরে তৈল সাবান কসমেটিক জাতীয় ইত্যাদি ব্যবহার নিষেধ। এসব ব্যবহার না করলে এই একমাস তাহলে অন্তিমে চিন্ময় দেহ প্রাপ্ত হবে। রাতে ফল দুধ কলা কাঁচা বাদাম ভাজা, এসব পেতে পারবে। প্রত্যকটা মাসের মধ্যে এই কার্তিক বা দামোদর মাসটা ভগবানের অতি প্রিয় মাস। সব মাসে যা করি, সমস্যা নাই কিন্তুু এই মাসে এই ব্রত না পালন করে কেউ তাহলে তার মুক্তির অার কোনো পথ নাই নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে অনন্ত কাল।
-
দামোদর মাস বা কার্ত্তিক মাস করলে কি হয়। এই দামোদর মাস কৃষ্ণভক্তের কাছে অতি গুরুত্ব পূর্ণ মাস। কৃষ্ণভক্তদের করণীয় কিছু নিয়ম ও এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে দেওয়া হলো। কার্তিক মাস সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের ত্যাগের মাস বা দামোদর মাস।
-
কার্ত্তিক মাস শ্রীহরির সেবার মাস, কার্তিক মাস বা দামোদর মাস ভক্তগণের কাছে অতীব মাহাত্ম্যপূর্ণ একটি মাস। কেনোনা এই মাসে হরিভক্তির অনুকূল যে কোনো কার্যই সহস্র গুণ অধিক ফলদান করে। ভক্তিভরে স্বল্প পরিমাণ ভগবদ্ সেবা সম্পাদন করলেও ভগবান শ্রীহরি অতিশয় প্রীত হন। বিশেষ করে কার্তিক মাসের অন্যতম একটি ভগবৎ সেবা হচ্ছে ভগবানের মন্দিরে বা গৃহমন্দিরে ভগবানের উদ্দেশ্যে দীপদান।
-
এই সম্বন্ধে বিভিন্ন শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, এই মাসে শ্রীহরি মন্দিরে দীপ দান করলে তাকে আর এই জন্ম মৃত্যুময় জগতে ফিরে আসতে হয় না। “শ্রীহরিভক্তিবিলাস” গ্রন্থের ১৬শ বিলাস অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কার্তিক মাসে দেবালয়ে ভক্তিভাবে দীপদান, অখন্ড দীপাবলীর আয়োজন,বাড়িতে বাড়িতেয় দীপমালা সজ্জা ও আকাশ প্রদীপ দান করলে ভগবান শ্রীহরি প্রীতিলাভ করেন।
-
নিয়ম সেবার কাল ও অক্ষয় পূণ্য অর্জনের মাস। এ মাসে সকলেরই সাত্বিক আহার ভোজন করা উচিত। প্রতিদিন ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের দামবন্ধন লীলা পাঠ করা উচিত। দিনের বেলা ভোগরাগ, প্রসাদ গ্রহণ করা উচিত।
-
স্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে,
-
“অব্রতেন ক্ষিপেদ যন্ত মাসং দামোদর প্রিয়ম।
তির্যগমোনীমবাপ্ লোতি সর্ব ধর্ম বহিস্কৃতঃ।।
স ব্রহ্মহ স গোঘ্নশ্চ স্বর্ণস্তেয়ী সদানুতী।
নকরোতি মুণিশ্রেষ্ঠ যো নঃ কার্ত্ত।।
-
🙏🏻"জয় শ্রীশ্রী দামোদর মাসের জয়"🙏🏻
-
তারিখঃ ১৮-১০-২০২০ ইং।
-
✍ পোষ্ঠটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন। যাতে অনেকে পড়তে ও জানতে পারে ।
-
সনাতন ধর্মীয় অসাধারণ সব পোষ্ট পড়তে ভিজিট করতে হবে নিচের লিঙ্কে।
https://www.facebook.com/profile.php?id=100053096204985
❋
,(-_-),
'\'''''.\'='-.
\/..\\,'
//"")
(\ /
\ |,
,,
"
═════════
🪔 🙏🏻 🐚
🍚
🍏🥭🍎🍌🥒🍉🍓🍇
💐🌺🌿🌷🌻🌹
╰┄┅═════❁•⊰❉⊱•❁═════┅┄╯

অর্জুন কর্তৃক দুর্গাস্তবের কী কারণ ছিল
মহাভারতে ভীষ্মপর্বের ২৩ অধ্যায়ে সঞ্জয় রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, “হে রাজন, শ্রীবাসুদেব দুর্যোধনের সৈন্যদের যুদ্ধ উদ্যত দেখে অর্জুনের কল্যাণ কামনায় বললেন, 'হে মহাবাহু অর্জুন, শত্রুদের পরাজয়ের নিমিত্ত পবিত্র ও সংগ্রাম অভিমুখ হয়ে দুর্গার স্তব কর।”
অর্জুন তখন শ্রীবাসুদেবের বাক্য অনুসারে রথ থেকে নেমে কৃতাঞ্জলিপুটে দুর্গা স্তোত্র আরম্ভ করলেন- “হে কৃষ্ণপিঙ্গলে, কাত্যায়নী, শিখিপুচ্ছধ্বজ ধরে, হে গােপেন্দ্রানুজে, নন্দগােপকুলােদ্ভবে, হে পীতবাসীনি, হে কৃষ্ণে, হে কৈটভনাশিনি, আপনাকে প্রণাম। হে ভগবতি দুর্গে, আপনি স্বাহা, স্বধা, কলা, কাষ্ঠা, সরস্বতী, সাবিত্রী বেদমাতা ও বেদান্ত। আমি বিশুদ্ধ অন্তরে আপনাকে স্তব করছি। আপনার কৃপায় এই মহারণক্ষেত্রে যেন জয়লাভ করতে সমর্থ হই। আপনি ভক্তদের রক্ষার নিমিত্ত দুর্গম পথে, ভয়স্থানে, দুর্গম স্থানে, পাতালে নিত্য বাস করে থাকেন, আর যুদ্ধে দানবদের পরাজিত করে থাকেন। আপনি জৃম্ভনী, মােহিনী, মায়া, হ্রী, শ্রী, সন্ধ্যা প্রভাতী, সাবিত্রী, জননী, তুষ্টি, পুষ্টি, ধৃতি, চন্দ্রসূর্যবিবর্ধিনী, দীপ্তি ও সম্পন্নদের সম্পত্তি। সিদ্ধচারণগণ যুদ্ধক্ষেত্রে আপনাকে দর্শন করে থাকেন।"
হে রাজন, অর্জুনের ভক্তি দেখে ভগবতী দুর্গা অন্তরীক্ষে দর্শন দিয়ে বললেন---
স্বল্পনৈব তু কালেন শত্রুন্ জেষ্যসি পাণ্ডব।
নরস্তমসি দুর্দ্ধর্ষ! নারায়ণসহায়বান্।
অজেয়স্ত্বং রণেহরীণামপি বজ্ৰভূতঃ স্বয়ম্॥
(মহাভারত, ভীষ্মপর্ব ২৩.১৮)
“হে বীর পাণ্ডব, তুমি অল্পকাল মধ্যেই শত্রুদের পরাজিত করবে। কারণ, স্বয়ং নারায়ণ শ্রীকৃষ্ণ তােমার সঙ্গেই রয়েছেন। অতএব, অন্য শত্রুর কী কথা! স্বয়ং বজ্রধারী ইন্দ্রও তােমাকে পরাজিত করতে সমর্থ হবে না।”
একথা বলে দেবী দুর্গা অন্তর্হিত হলেন। পাণ্ডুপুত্র অর্জুন বর পেয়ে জয়লাভে কৃতনিশ্চয় হয়ে রথে আরােহণ করলেন। তারপর কৃষ্ণের শঙ্খধ্বনির সঙ্গে নিজের শঙ্খ ধ্বনিত করতে লাগলেন।
সঞ্জয় বললেন, “হে রাজন, আমি শ্রীব্যাসদেবের কৃপা প্রভাবে জেনেছি, এই অর্জুন ও কৃষ্ণ পূর্বযুগে নর-নারায়ণরূপে ধরাতলে প্রকাশিত হয়েছিলেন। কিন্তু দুষ্টচিত্ত ক্রোধের বশবর্তী আপনার পুত্ররা মােহবশত তাঁদের জানে না। হে রাজন, ব্যাসদেব, নারদ মুনি, কণ্ব মুনি, শ্রীপরশুরাম আপনার পুত্র দুর্যোধনকে অর্জুন ও কৃষ্ণের বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু আপনার কোপন-স্বভাব দুরাত্মা পুত্ররা কালপাশে বদ্ধ হয়ে মােহগ্রস্ত হয়েছে, তাই তাঁদের সময়ােচিত নির্দেশ তারা গ্রহণ করেনি। আমি পরিষ্কার দর্শন করছি যে, যেখানে ন্যায়, তেজ, কোমলতা, লজ্জা, বুদ্ধি ও ধর্ম থাকে, সেখানেই কৃষ্ণ থাকেন; যে স্থানে কৃষ্ণঃ, সেই স্থানেই জয়- যতাে ধর্মস্ততঃ কৃষ্ণ যতাে কৃষ্ণস্ততো জয়।"
এখানে অর্জুনকে দুর্গা নিজেও বলছেন- যেহেতু, স্বয়ং নারায়ণ তথা শ্রীকৃষ্ণ বিদ্যমান (নারায়ণসহায়বান্), সুতরাং অর্জুনের জয় সুনিশ্চিত। কিন্তু শাক্তরা কৌশলে এ প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান। শ্রীমদ্ভগবদগীতাও সর্বশেষ শ্লোকে (১৮.৭৮) বলা হয়েছে---
যত্র যােগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ।
তত্র শ্রীর্বিজয়াে ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম॥
অর্থাৎ, “যেখানে যােগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ এবং যেখানে ধনুর্ধর পার্থ, সেখানেই নিশ্চিতভাবে শ্ৰী, বিজয়, অসাধারণ শক্তি ও নীতি বর্তমান থাকে। সেটিই আমার অভিমত।”
সুতরাং, বিজয়ের জন্য অর্জুন কর্তৃক দুর্গাস্তবের কোনাে আবশ্যকতা বা বাধ্যবাধকতা ছিল না। তাছাড়া, শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জয়-পরাজয়ের তথা কর্মফলের আশা ত্যাগ করে কর্তব্যবােধে ও তাঁর (কৃষ্ণের) সন্তুষ্টিবিধানের জন্য যুদ্ধ করতে বলেছেন। তবুও শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে তা করতে বলেছেন।
প্রশ্ন হলাে, ভগবান তাে স্বয়ং সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলতে পারতেন। আমার স্তুতি করাে। তা না বলে ভগবান কেন অর্জুনকে দুর্গাম্ভতি করতে বললেন? “আমার স্তুতি করাে”, “আমার শরণাগত হও" - এ ধরনের কথা গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বহুবার বলেছেন। যেমন, মন্মনা ভব মদ্ভক্ত মদযাজী মাং নমস্কুরু।
অর্থাৎ “তোমার মনকে আমার ভাবনায় নিযুক্ত করা, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা করাে এবং আমাকে নমস্কার করাে।” তবুও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাধীন দুর্গাদেবী যেহেতু এ জড়জগরূপী দুর্গের অধিকর্ত্রী, পরম বৈষ্ণবী এবং সেই সাথে অসুরনাশিনী, তাই মহাভারতের যুদ্ধের মতাে এমন মহৎ কর্মযজ্ঞে দুর্যোধনাদি কৌরবদের মতাে অসুরদের বিনাশের পূর্বে, জড়জগৎরূপী দুর্গের) অধিকর্ত্রী হিসেবে দুর্গাদেবীকে মর্যাদা দান এবং পরম বৈষবী হিসেবে অর্জুন যেন তাঁর আশীর্বাদ লাভ করতে পারে, সেজন্যই অর্জুনকে তিনি দুর্গাদেবীর স্তুতি করতে বলেছিলেন। এখানেও প্রণিধানযােগ্য বিষয় হচ্ছে, এখানে উল্লিখিত দেবী দুর্গা ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তি মহামায়া নন, বরং যােগমায়ারূপে পরিচিত ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তি, যিনি নন্দপত্নী যশােদার কন্যা (গােপেন্দ্রানুজে, নন্দগােপকুলোদ্ভবে) তথা শ্রীকৃষ্ণের ভগিনীরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
তাছাড়া, কারো স্তবস্তুতি করার অর্থ এই নয় যে, তিনিই তার আরাধ্য। ভগবানের ভক্তরাও দেবতাদের শ্রদ্ধা, পূজা নিবেদন বা স্তুতি করেন। তাতে তাদের ভগবানের প্রতি শ্রদ্ধা বা সমর্পণের কমতি হয় না। তাই অর্জুন দুর্গাদেবীর স্তুতি করলেও তা দোষনীয় নয়।
দেবদেবীগণ যেহেতু ভগবানের প্রতিনিধি, তাই তাঁদের পূজা করা পরােক্ষভাবে ভগবানেরই পূজা করা হলেও তা যথার্থ বিধিসম্মত নয়- অবিধিপূর্বকম্। কারণ, সাধারণত অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন সকামকৰ্মীরাই জড় বিষয় লাভের বাসনায় দেবদেবীদের পূজা করে থাকে। প্রকৃত বিধান হলাে সরাসরি ভগবানের পূজা করা। দেবদেবীদের পূজা যদি কেউ করতেও চান, তবে তার উদ্দেশ্য কোনাে জড়বিষয় লাভের পরিবর্তে কেবল ভগবানের প্রতি ভক্তিলাভ বা তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই করা উচিত; ঠিক যেমন, ব্রজগােপিকারা কৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য কাত্যায়নীর পূজা করেছিলেন। শুধু তাঁরাই নন, অর্জুনও শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টির জন্যই দুর্গাস্তব করেছিলেন। কৃষ্ণ সন্তুষ্টি এই অর্থে, যেহেতু কৃষ্ণ তা চেয়েছিলেন। আর উপরে উল্লেখিত কারণেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা চেয়েছিলেন। যদিও শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে, শত্রুদের পরাজয়ের জন্য দুর্গাস্তব করাে, কিন্তু এটা ছিল অর্জুনকে গীতাজ্ঞান দানের পূর্বে, যখন অর্জুন জানতেন না যে, শ্রীকৃষ্ণই পরমব্রহ্ম, যিনি দুর্গাদেবীরও আরাধ্য। সাধারণত জড়বিষয় সুখ লাভের জন্য মানুষ দুর্গাপূজা করে। অর্জুনও সেখানে একজন সাধারণ মানুষের ভূমিকায় উপনীত ছিলেন, তখনও শ্রীকৃষ্ণের ভক্তরূপে তাঁর প্রতি পূর্ণ শরণাগত হননি। তাই গীতাজ্ঞান দানের পূর্বে দুর্গার শ্রীমুখ থেকেই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কাছে তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশের সূচনা করলেন যে, পাণ্ডবদের যুদ্ধজয়ের তথা সমস্তকিছুর তিনিই মূল কারণস্বরূপ স্বয়ং নারায়ণ। তাই সর্বতােভাবে শ্রীকৃষ্ণেরই শরণাপন্ন হওয়া উচিত। শক্র পরাজয়ের জন্য শ্রীকৃষ্ণের কৃপা-সান্নিধ্যই যে মূল প্রয়ােজন, তা দেবী দুর্গাই বলেছেন। তাই ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণের অন্তিম উপদেশ ছিল---
মন্মনা ভব মদ্ভক্ত মদযাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়ােহসি মে॥১৮.৬৫॥
"তােমার মনকে আমার ভাবনায় নিযুক্ত করাে, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা করাে এবং আমাকে নমস্কার করাে। তাহলে তুমি আমাকে অবশ্যই প্রাপ্ত হবে। এজন্য আমি তােমার কাছে সত্যই প্রতিজ্ঞা করছি, যেহেতু তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়।"
সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মােক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ॥১৮.৬৬॥
“সর্ব প্রকার জড় ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও, আমি তােমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব, তুমি শােক করাে না।"

৪১তম বিসিএস প্রিলি প্রস্তুতি
৪১তম বিসিএস প্রিলি প্রস্তুতি
সুশাসন
.
১। 'শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ। - এটি কার উক্তি?
উত্তরঃ সক্রেটিস।
২। শুভর প্রতি অনুরাগ ও অশুভর প্রতি বিরাগই হল নৈতিকতা- কথাটি কে বলেছেন?
উত্তরঃ জি. ই ম্যুর।
৩। কোন বিষয়কে বাস্তবিকভাবে বোঝার সামর্থ্যকে কি বলে?
উত্তরঃ বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধ।
৪। Values are the customs, standards of conduct and principles considered by a culture group of a people or an individuals (মূল্যবোধ হলো সেসব প্রথা, অাচরণের মানদণ্ড এবং নীতি যেগুলো কোন একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, একটি দলের সাম্যে অথবা ব্যক্তি প্রকাশিত বা বাঞ্ছিত বলে বিবেচনা করে)। - সংজ্ঞাটি কার?
উত্তরঃ সমাজকর্ম অভিধান।
৫। কত সালে অামেরিকা সমাজকর্মী সমিতির প্রতিনিধিগণের সম্মেলনে নির্ধারিত সমাজকর্মীদের অাচার-অাচরণের নিয়ন্ত্রণের জন্য গৃহীত মূল্যবোধ ও নীতি অনুমোদিত হয়?
উত্তরঃ ১৯৬০ সালে।
৬। কয়টি মূল্যবোধ সমাজে সর্বদা বিরাজ করে এবং সমাজকে গতিশীল ও ঐক্যবদাধ করে?
উত্তরঃ ৬ টি।
৭। ধর্ম, ঐতিহ্য এবং মানব অাচরণ এ তিনটি থেকে নৈতিকতার উদ্ভব ঘটতে পারে। কথাটি কে বলেছেন?
উত্তরঃ জোনাথন হ্যাইট।
৮। মূল্যবোধ হলো অাবেগিক ও অাদর্শগত ঐক্যের বোধ। উক্তিটি কার?
উত্তরঃ ফ্রাঙ্কেল।
৯। ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের বা ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহারই দুর্নীতি। - এ সংজ্ঞাটি প্রদান করেছে -
উত্তরঃ দুর্নীতি দমন কমিশন।
১০। ই-গভার্ন্যান্সকে SMART সরকার ব্যবস্থা বলে অাখ্যায়িত করেছেন কে?
উত্তরঃ চন্দ্র বাবু নাইডু।
১১। Good governance is a manner in which power is excercised in the management of a country's economic and social reasons for development. উক্তিটি কার?
উত্তরঃ বিশ্বব্যাংক।
১২। বিশেষ মূল্যবোধ কোন ধরণের মূল্যবোধ?
উত্তরঃ কার্যকারিতাভিত্তিক।
১৩। মূল্যবোধকে মোটামুটি কত ভাগে ভাগ করা যায়?
উত্তরঃ ৬ ভাগে।
১৪। Law of the constitution গ্রন্থের রচয়িতা কে?
উত্তরঃ ডাইসী।
১৫। অামলাতন্ত্রের অবস্থানের দিক থেকে এশিয়ায় সবচেয়ে ভাল অবস্থানে অাছে -
উত্তরঃ সিঙ্গাপুর।
১৬। একটি রাষ্ট্র কিভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করে তার দ্বারা সে রাষ্ট্রের নৈতিকতার মান সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায়।- উক্তিটি কার?
উত্তরঃ লাস্কি।
১৭। বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যবস্থাপকদের সংজ্ঞানুযায়ী কোন বয়সসীমার নারী-পুরুষ ৮ ঘণ্টা কাজ না করলে বেকার?
উত্তরঃ ১৮ থেকে ৬৫ বছর।
১৮। দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র ও সাধারণ বক্তব্যকে উপলব্ধি সহকারে লিখতে এবং পড়তে অক্ষম ব্যক্তিই নিরক্ষর। সংজ্ঞাটি কার -
উত্তরঃ ইউনেস্কোর।
১৯। দেশর শতকরা কতজন স্কুলগামী মেয়ে ইভটিজিং এর শিকার হয়?
উত্তরঃ ৬২ জন।
২০। Values are the standard used to judge behavior and to chase among various possible goals (মূল্যবোধ হচ্ছে সম্ভাব্য বিভিন্ন থেকে পছন্দ করার এবং অাচরণ মূল্যায়ণের মানদণ্ড)- সংজ্ঞাটি দিয়েছেন কে?
উত্তরঃ এম স্পেন্সার।
২১। কে মূল্যবোধকে মানুষের ইচ্ছার একটি মানদণ্ড বলেছেন?
উত্তরঃ M R William.
২২। জাতিসংঘ সনদে কতটি গুরত্বপূর্ণ মানবাধিকারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে?/সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ সংখ্যা কতটি?
উত্তরঃ ৩০ টি।
২৩। Modern Moral Philosophy গ্রন্থটির রচয়িতা কে?
উত্তরঃ W. D. Hudson.
২৪। অামলাতন্ত্রের উপর বিশেষ গুরত্ব প্রদান করে রচিত "The Ruling Class' গ্রন্থটি কার?
উত্তরঃ গাইটানো মসকার।
২৫। অাইনের উৎস কতটি?
উত্তরঃ ৬টি।
২৬। নৈতিকতা হলো বিজ্ঞান ও দর্শনের ঐ সকল কাজ যা মানুষের নৈতিক অাচরণ, কর্তব্য এবং বিচার-বিবেচনা নিয়ে বিশ্লেষণ করে। - কার উক্তি?
উত্তরঃ নিউনার ও কিলিং
২৭। মুল্যবোধ হলো ব্যক্তি বা সামাজিক দলের অভিপ্রেত ব্যবহারের সুবিন্যস্ত প্রকাশ। উক্তিটি কার?
উত্তরঃ এম ডব্লিউ পামফ্রে।
২৮। অপরাধ একটি সামাজিক ঘটনা এবং সমাজের 'স্বাভাবিক' রূপ কথাটি কে বলেছেন?
উত্তরঃ এমিল ডুর্খেইম।
২৯। ন্যায় সংরক্ষণের তাগিদে রাষ্ট্র যেসব নীতি স্বীকার করে এবং প্রয়োগ করে তাই অাইন। উক্তিটি করেছেন --
উত্তরঃ অধ্যাপক স্যালমন্ড।
৩০। The British and Irish Ombudsman Association কর্তৃক কার্যকর জন প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য যতটি নীতির কথা বলা হয়েছে -
উত্তরঃ ৬টি।
৩১। Man multiplies like mice in a bran. উক্তিটি করেছেন কে?
উত্তরঃ কনটিলন।
৩২। "সুশাসন মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে নিশ্চিত করে , জনপ্রশাসনে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিতকে শক্তিশালী করে " কার উক্তি ?
উত্তরঃ কফি আনান।
৩৩। "সুশাসন বলতে রাষ্ট্রের সাথে সুশীল সমাজের , সরকারের সাথে শাসিত জনগণের, শাসকের সাথে শাসিতের সম্পর্কে বুঝায়।- কে বলেছেন?
উত্তরঃ ম্যাককরনী
৩৪। শাসক যদি ন্যায়বান হয় তাহলে আইন অনাবশ্যক, আর শাসক যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয় তাহলে আইন নিরার্থক’ – বলেছেন কে ?
উত্তরঃ প্লেটো।
৩৫। ‘সার্বিক উন্নয়নের লক্ষে একটি দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিই হলো গভার্নেন্স’ – ?
উত্তরঃ বিশ্বব্যাংক।
৩৬। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’ –একথা বলেছেন—
উত্তরঃ অধ্যাপক ডাইসি।
৩৭। সুশাসন প্রত্যয়টি উদ্ভাবন করে কে ?
উত্তরঃ বিশ্ব ব্যাংক(1989)। ধারণা দেয় ১৯৯৪ সালে।
৩৮। সুশাসন প্রত্যয়টিকে প্রথম সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয় কে ?
উত্তরঃবিশ্ব ব্যাংক
৩৯। সুশাসনের মূলনীতি প্রকাশ করে কে ?
উত্তরঃ ইউএনডিপি (১৯৯৭)
৪০। WB সুশাসনকে এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করে কবে ?
উত্তরঃআশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে
৪১। IMF সুশাসনকে এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করে কবে ?
উত্তরঃ ১৯৯৬
৪২। সুশাসনের উপাদান কতটি ?
- UNDP এর মতে - ৯টি।
- জাতিসংঘ এর মতে - ৮টি।
- বিশ্বব্যাংকের মতে- ৬টি।
- UNHCR এর মতে- ৫টি।
- AFDB এর মতে- ৫টি।
- IDA এর মতে - ৪টি (ক. দায়িত্বশীলতা খ. স্বচ্ছতা গ. আইনি কাঠামো ও ঘ. অংশগ্রহণ)।
৪৩। "শাসক ও উন্নয়ন"শীর্ষক প্রতিবেদন প্রথম প্রকাশ করে ?
উত্তরঃ বিশ্বব্যাংক (১৯৯২)।
৪৪। "শাসন ও ক্রমবর্ধমান মানবিক উন্নয়ন' শীর্ষক প্রতিবেদন প্রথম প্রকাশ করে?
উত্তরঃ জাতিসংঘ (১৯৯৭)।
৪৫। বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচক প্রকাশ করে কে?
উত্তরঃ ইউএনডিপি।
৪৬। সুশাসন নিশ্চিত করতে 'White paper' প্রকাশ করে কে ?
উত্তরঃ EEC.
৪৭। সুশাসন প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য বিষয় হলো?
উত্তরঃ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।
৪৮। জনগণ ও সরকারের Win Win Game বলা হয় -
উত্তরঃ সুশাসনকে।
৪৯। Power : A New Social Analysis' গ্রন্থটি কার লেখা ?
উত্তরঃ বার্ট্রান্ড রাসেল।
৫০। Something intrinsically valuable or desirable (এমন কিছু যা স্বাভাবিকভাবে মূল্যবান বা অাকাঙ্ক্ষিত তাই মূল্যবোধ)- সংজ্ঞাটি কার?
উত্তরঃ ওয়েস্টার।
৫১। যেসব মূল্যবোধ ব্যক্তি সমাজের নিকট থেকে অাশা করে এবং যা সমাজ ব্যক্তির নিকট থেকে লাভ করে খুশি হয়, সেসব মূল্যবোধই সমাজকর্ম মূল্যবোধ। সংজ্ঞা কে দিয়েছেন?
উত্তরঃ সমাজবিজ্ঞানী স্টুয়ার্ড সিডড।
৫২। নীতিবিদ্যার মূলধারা কয়টি?
উত্তরঃ ৪টি।
৫৩। অাইনের অনুশাসন বলতে প্রধানত দুটি ধারাকে বুঝায়। কি কি?
উত্তরঃ অাইনের প্রাধান্য এবং অাইনের দৃষ্টিতে সাম্য।
৫৪। শারীরিক মূল্যবোধকে সৌন্দর্যবোধ হিসেবে অাখ্যায়িত করেছেন কে?
উত্তরঃ এডওয়ার্ড স্পেন্সার।
৫৫। সামাজিক মূল্যবোধ হলো সমাজ জীবনে বাঞ্ছিত ও অবাঞ্ছিত বিষয়ে সমাজবাসীদের সমবেত ঐক্য। - সংজ্ঞাটি কে দিয়েছেন?
উত্তরঃ ওলসেন।
৫৬। _______হলো সেসব রীতিনীতির সমষ্টি, যা ব্যক্তি সমাজের নিকট হতে পেতে চায় এবং যা সমাজ ব্যক্কির নিকট হতে লাভ করে।
উত্তরঃ মূল্যবোধ।
৫৭। কারাগার যে ধরনের শিক্ষা প্রদান করে তাকে কি বলা হয়?
উত্তরঃ মূল্যবোধ শিক্ষা।
সাদমান রহমান

গল্পঃনির্দোষ
গল্পঃনির্দোষ
লেখকঃরনি হাসান
পর্বঃ৬
আজ দুইটা দিন ধরে রাস্তায় ফুতফাতে নির্ঘুমে রাত কাটিয়ে দিতে হচ্ছে। ঢাকা শহরে এত লোকজন্। তারপরও এখানে একজন কে ও পরিচিত হিসেবে পেলাম না। তাহলে কি আমাকে আবার গ্রামে ফিরে যেতে হবে না না সেটা আর সম্ভব না। গ্রাম থেকে যখন চলে আসছি তখন ঢাকায় একটা না একটা উপায় ঠিক বের হয়ে যাবে। ভাবিনি কখনো এমন একটা পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে!চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে এসব আনমনে চিন্তা করছিলাম এমন সময় পিছন দিক থেকে কেউ একজন রনি বলে ডেকে উঠলো
প্রথমে ভাবলাম এই ঢাকা শহরে কে আমাকে ডাকবে হইত আমার নামে অন্য কাউকে ডাকছে..! বেস সেদিকে সাড়া না দিয়ে চা খেতে মনোযোগ দিলাম। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমানিত হয়ে গেলো চা খাচ্ছি এরমধ্যে পিছন দিক থেকে কাধে হাত রেখে কেউ একজন বলে উঠলো
কিরে কখন থেকে তোকে ডাকছি শুনছিস না কেন (তানরীর স্কুল কালের ফেন্ড)
পিছনে দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করতেই আমার চোখ তো কপালে উঠে গেলো আরে এতো তানবীর স্কুল কালের ফেন্ড। আল্লাহর অসীম দয়া। এই তানবীরই আমাকে একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। চিন্তা মুক্ত হয়ে বলে উঠলাম
দোস্ত আমাকে একটা হেল্প কর প্লিজ আজ দুইদিন ধরে ফুতফাতে থাকতে হচ্ছে। এইদিন অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু বাসা ভাড়া করতে পায়নি একা একজনকে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চাইনা। আল্লাহ রহমতে তোকে যখন পেয়েই গেছি তো আমাকে একটা থাকার ব্যবস্থা করে দে প্লিজ দোস্ত (আমি)
কি ব্যাপার বলতো তুই হুট করে ঢাকায় আসলি এসে তার ও আবার ফুতফাতে থাকছিস সত্যিই করে বলতো অসময়ে ঢাকা আসার কারন কি (তানবীর)
আসলে ঢাকায় আমি আসতে চাইনি কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে এখানে এনেছে (এই বলে গ্রামের পুরো ঘটনাটা বলে ফেললাম)
দোস্ত দুর্জয় তোকে নিয়ে এতবড় একটা গেম খেললো আর তুই ওকে কিছু না বলে চলে আসলি (তানবীর)
চাইলে তার জালিয়াতি বের করতে পারতাম কিন্তু মান সম্মান যা যাওয়ার সেটা তো আগেই শেষ। দুর্জয়কে দোষী সাব্যস্ত করলে তো আমার যে সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে সেটা আর ফিরে আসতো না। তাছাড়া কাকা কাকিমা তারা আমার আপন কেউ না। রাস্তায় নাকি আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছে। এইটা জানার পর তো গ্রামে থাকা কোনো মুডই ছিলো না। কিন্তু যাকে আমার বোন ভাবতাম সে আমাকে এমন বাজে কথা বলছে যেটা মুখে আনাই পাপ। বেস এর পর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম ঢাকায় চলে আসবো। টিসি নিয়ে চলে ও আসছি কিন্তু থাকার কোনো ব্যবস্থাই করতে পারছি না। যার দারুণ আজ নিয়ে প্রায় দুইদিন ফুতফাতে নির্ঘুমে রাত কাটিয়ে দিতে হচ্ছে এখন তুই যদি আমাকে থাকার ব্যবস্থা
না করিস..! তাহলে মহা একটা বিপদে পড়ে যাবো প্লিজ দোস্ত না করিস না ( আমি)
আরে মামা এত চাপ নিবার কিছুই নেই। তাছাড়া তুই যে বিপদে পড়েছিস এসময়ে তোকে হেল্প করতে পারলে নিজেকে অনেক প্রাউট ফিল মনে করবো। যদি ও তোকে আমার সাথে নিলে এতে আমার কিছু সমস্যা হতে পারে কিন্তু তোকে তো আর বিপদের মুখে ফেলে যেতে পারি না। আচ্ছা চল আজ থেকে তুই আমার সাথেই থাকবি। আর হ্যা বাড়িওয়ালার মেয়ের দিকে কিন্তু ভুলে ও তাকাবি না (তানবীর)
কেন..? (আমি)
বাড়িওয়ালার মেয়েটাকে প্রথম দেখলেই ক্রাশ খেয়ে যাবি।কিন্তু মেয়েটা আচরণ একদম ভালো না। যদি তার সামনে কোনো কারনবশত পড়তাম অকারনেই মিস বিহেব করতো। তবে বাড়িওয়ালার মেয়েটা নাকি আগে এমন ছিলো না। সবার সঙ্গেই হেসে খেলে কথা বলতো। যখন এই প্রেম ভালোবাসার নামে শব্দে মেয়েটি প্রতারিত হলো বেস তখন থেকে ছেলেদের একদমই সহ্য করে না। তাই তোকে ও বলছি বাড়িওয়ালার মেয়ের সঙ্গে কথা বলবি তো দুরের বিষয়। তার সামনেই যাবি না (তানবীর)
আচ্ছা ঠিক আছে যাবো না (আমি)
আল্লাহ উপর বিশ্বাস রেখেছিলাম বলেই তানবীরকে তার কারন স্বরুপ পেয়ে গেলাম।নিশ্চয়ই আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখলে সে কখনো নিরাশ হই না। তার প্রমান আজ পেয়ে গেলাম। তারপর তানবীরের সঙ্গে তার ভাড়া নেওয়া বাসায় চলে গেলাম। বাড়িওয়ালার স্ত্রী আমাকে দেখেই তানবীরকে বলল
তোমার সঙ্গে ও কে (বাড়িওয়ালার স্ত্রী)
আন্টি ও আমার বেস্ট ফেন্ড রনি। গ্রাম থেকে এসেছে এখন আমার সঙ্গেই থাকবে। আর আন্টি ও যেহেতু আমার সঙ্গেই থাকবে তার ভাড়াটা ও আপনি মাস শেষে পেয়ে যাবেন সমস্যা নেই (তানবীর)
আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যখন বলছো তাহলে থাকতে পারে কিন্তু প্রতি মাসের ভাড়া আমাকে ঠিকমতো দিতে হইবে নইত এই বাসা তাকে ছাড়তে হবে (বাড়িওয়ালার স্ত্রী)
জি আচ্ছা আন্টি (তানবীর)
প্রথমে ভেবেছিলাম আমার কাছে বাসা ভাড়া ই দিবে না। কিন্তু তানবীর এর সুপারিশ করাই বাড়িওয়ালা রাজি হয়েছে। যাই হক এখন একটু ঘুমানোর দরকার (ঘুমাতে যাবো এরমধ্যে তানবীর বলে উঠলো
দোস্ত তোর ফোনটা দে তো (তানবীর)
আমার ফোন মনে হই চার্জ নেই বন্ধ হয়ে আছে (ফোন দেখিয়ে বললাম)
আচ্ছা ঠিক আছে চার্জে লাগা দরকার আছে (তানবীরের কথা মতো ফোনটাকে চার্জে লাগিয়ে অন করতেই ডেবিল বইনে এই নাম্বার থেকে হাজার টা কল প্লাস মেসেজ ফোন যেন ভরে গেছে প্রথম মেসেজ ছিলো এমন
ভাই প্লিজ তুই বাড়িতে ফিরে আই তোকে ছাড়া পুরা বাড়িটা কেমন শূন্যতায় ভরে গেছে ফিরে আই না ভাই প্লিজ...!(মেসেজের শেষে কান্নার ইমোজি দুইটা)
তারপরেটা
তোর জন্য মা বাবা তারা অনেক কান্না করতেছে। তাদের দিকে তাকিয়ে এড লিস্ট এবার ফিরে আই জিদ করিস না প্লিজ।তুই তো জানিস তোর সঙ্গে আমার ঝগড়া না করলে পেটের ভাত হজম হই না। এখন তুই বাসায় নেই দুদিনের কেমন জানি অন্ধকার নেমে আসছে বাবা মা তাদের মুখে হাসি কোনো আভা নেই। সবসময়ই বিষন্নতার ছাপ তাদের মুখে লেগেই থাকে। তুই তো এটাও জানিস ওরা আমাকে নাহ যতটুকু ভালোবাসে তার থেকে দ্বিগুণ ওরা তোকে ভালোবাসে তুই কি চাইলে পারবি না তোর সব রাগ অভিমান ফেলে আবার আমাদের কাছে ফিরে আসতে
(মেসেজটা পড়তে চোখ থেকে কয়েক ফোটা নোনা জল গড়তে লাগলো। তারপর কোনো কিছু না ভেবে সেই মেসেজটি রিপ্লাই দিলাম
সেটা আর সম্ভব না। আর হ্যা দয়া করে এই নাম্বারে ফোন কিংবা মেসেজ দিবেন না প্লিজ (এই টুকু লিখে ডেবিল বইনে নাম্বারে সেন্ট করলাম বেস সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে কল আসতে লাগলো কল কেটে দিবার পরও কল আসতে লাগলো দেখে উপায় না পেয়ে কল্টা রিসিভ করলাম
হেলো (আমি)
ভাই তুই কই আসছিস (তানিশা কান্না করে বলল আর হ্যা তানিশার ফোন নাম্বারটাই ডেবিল বইনে লিখে save করে রেখেছিলাম)
সরি কে আপনার ভাই। ফোনে এভাবে কান্নাকাটি করছেন কেন যদি কান্নাকাটি করতেই হই। তাহলে ফোন কেটে দিয়ে একাই সারাদিন কান্না করেন রাখছি (ফোনের লাইন্টা কাটতে চেয়েও কেন জানি কাটতে পারলাম না নিরব শ্রোতাদের মতো চুপ হয়ে গেলাম আর তানিশা ওপাশ থেকে বলতে লাগলো
তুই দুইদিন হই বাড়ি ছেড়েছিস আর দুইদিনেই তোর শূন্যতা পুরা বাড়ি ভরে গেছে। আগে তো তোর জ্বালায় কোনো সিয়াল দেখতে পারতাম না। সারাক্ষণই IPL খেলা নইত মুভি দেখেছিস তবুও আমাকে কিছু দেখতে দেসনি। এই নিয়ে তোর সঙ্গে আমার অনেকবারই ঝগড়া লেগে গিয়েছিলো। কিন্তু এখন সারাক্ষণই সিয়াল দেখলেও আমাকে কেউ কিছু বলার মানুষটা নেই এখন তাকেই শুধু খুব মিস করছি। প্লিজ চলে আই না ভাইয়া.. (তানিশা কান্না করে বলল)
(নিরবে শুধু ওপাশ থেকে তানিশার কথা শুনছি)
তুই না রিদিতাকে অনেক ভালোবাসতি সে তোকে এখন অনেক ভালোবাসে। এমন কি আমি মা বাবাকে বলছি তারা রিদিতাকে তোর বউ করে ঘরে এনে দিবে। এবার তো ফিরে আই ভাই কি হলো কথা বলছিস না কেন.. হেলো.. হেলো (তানিশা হেলো হেলো বলতেই কোনো কিছু না বলে ফোনটা কেটে দিলাম। এবং সঙ্গে সঙ্গে সিমটা খুলে ফেললাম এবং যেই সিমটা ভাংতে যাবো অমনি তানবীর এসে বলতে লাগলো
আরে সিমটা ভাংতেছিস কেন দরকার পড়লে খুলে রেখে দে। এমন ও তো পারে সিমটা আবার তোর প্রয়োজনে লেগে গেলো তখন তো আবার সমস্যার সম্মোখিন হতে হবে (তানবীর)
হ্যা তাই তো সিম ভেঙে ফেলার চেয়ে। খুলে রাখাই ভালো। কখন কি প্রয়োজনে পড়ে যায় তা বলা খুব মুশকিল (এসব ভেবে সিমটা আর ভাংলাম না। সযত্নে রেখে দিলাম। তারপর কিছুক্ষন ফোনে ফেসবুকে নিউজ ফিড গেটে ঘুমিয়ে পড়লাম। বিকালে ঘুম থেকে উঠে ছাদে চলে গেলাম। নতুন জায়গা দেখার কৌতূহলটাও এক্টু বেশি। তাই কোনো বনিতা না করে ছাদে পড়ন্ত বিকালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখছিলাম হঠাৎ একটা মেয়েলি কন্ঠে আওয়াজে বলে উঠলো
এই ছেলে তোকে ছাদে আসার পারমিশন কে দিয়েছে (মেয়েটি কিছুটা রাগ করে)
পিছনে তাকাতেই আমার চোখ যেনো কপালে উঠে গেলো এতো দেখছি নির্ঘাত বলিউডের নাইকা। মনে হচ্ছে শুটিং বাদ দিয়ে এখানে অবসরে ঘুরতে আসছে....!!!
!
!
(চলবে)
#যোগ্যতা
জে। বাজারে খুব বেশি লোকজন নেই। আমিও দোকান বন্ধ করে বাড়িতে যাবো ভাবছি। বাজার থেকে আমাদের বাড়ি কাছেই। পায়ে হেঁটে মিনিট পাঁচেক লাগে। হিসেব করে দেখলাম, আজকে একদিনেই দুই হাজার টাকা বাকী পরেছে। এভাবে চলতে থাকলে আমার ব্যবসা শেষ হয়ে যাবে। গ্রামের মানুষ যখন বাকীতে চাল ডাল নেয়, তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি না করতে পারিনা। এই নিয়ে আমার মা সব সময় আমাকে নানান কথা বলেন। আমি প্রতিদিনই বাড়ি থেকে প্রতিজ্ঞা করে আসি,আজকে থেকে বাকী বিক্রি বন্ধ। কিন্তু পারি না। একসময় সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। এখন আর তেমন একটা কষ্ট হয় না। এখন আমার দোকানের অবস্থা খারাপ হলেও ইনকামের আরেকটি উৎস তৈরি হয়েছে। আমার ভাইয়ের সরকারি চাকরি হয়েছে।
দোকান থেকে কিছু চকলেট ও একটা আইসক্রিম নিলাম। এগুলো নীলার জন্য। নীলা আমার মামাতো বোন। আমাদের বাড়িতে থাকে। এবার এইচ. এস. সি. দিবে। আমাদের বাড়ি থেকে কলেজ খুব কাছে তাই বছর দুয়েক থেকে এখানেই থাকে। বেশ লক্ষী মেয়ে। বাড়িতে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ মায়ের সাথেই থাকে। আমার জামা কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে অনেক কাজেই আমাকে সাহায্য করে। যদি দু একদিনের জন্য নীলা ওদের বাড়িতে চলে যায় তখন আমার মায়ের খুব কষ্ট হয়। আমারও খুব কষ্ট হয়। কিন্তু আমার কষ্টের কথাটা কেউ জানেনা। আমি গোপন রাখি। কষ্টের কথা জেনে গেলে কী ভাববে সবাই। এই ভয়ে সব কথা গোপন রাখি। প্রতিদিন চকলেট ও আইসক্রিম গোপনেই নীলাকে দেই।
বাড়ির সামনে এসে পড়েছি। দরজায় নক করলাম। নীলার হাসি মুখ। চকলেট ও আইসক্রিম হাতে দিলাম। নীলা বললো,
- ভাইয়া, এগুলো কি প্রতিদিনই আনতে হয়? মাঝে মাঝে দু একদিন আনলেই তো হয়।
আমিও তাই ভাবছি। মাঝে মাঝে দু একদিন আনলেই তো হয়। কিন্তু আমার মন মানে না।
আজকে মায়ের শরীরটা ভাল নেই। বিছানায় শুয়ে আছেন। আমি কাছে গেলাম। প্রেশার বেড়েছে। নীলাকে জিজ্ঞেস করলাম,
- মাকে ঔষধ দিয়েছো?
- হ্যাঁ দিয়েছি।
মা ঘুমিয়েছে। আমি ফ্রেশ হয়ে খাবার খেতে গেলাম। নীলা আমাদের বাড়িতে আসার পর থেকে খাবার বেড়ে দেয়ার কাজটি মা করেন না। নীলাই করে। এসব কাজ নীলা খুব উপভোগ করে। এ জন্য নীলার প্রতি মা বেশ খুশি। সুযোগ পেলে রান্নার কাজও নীলা করে। নীলা বললো,
- ভাইয়া, কাল সকালে আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসতে পারবে?
আমি বললাম, কেন?
- কলেজ দুদিন বন্ধ তো তাই।
নীলা বাড়ি যাবে শুনেই আমার মনের মধ্যে কেমন যেন করে উঠলো।
খাবার শেষ করে মায়ের রুমে গেলাম। মা ঘুমাচ্ছে। নীলার রুমে উঁকি দিলাম। নীলা পড়ছে। আমাকে দেখে বললো,
- ভাইয়া , কিছু লাগবে?
- না কিছু লাগবে না।
আমি রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। আমার মশাড়িটাও নীলা টাঙ্গিয়ে দেয়।
আমি নীলার উপর অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। কিন্তু এর শেষ কোথায়? নীলা তো একদিন এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। সেদিন কী হবে? সেদিনের কথা মনে হলে বুকের বাঁ পাশে চিনচিনে একটা ব্যাথা অনুভব হয়।
নীলা আমাকে প্রায়ই বলে, ভাইয়া তুমি বিয়ে করে ফেল। তখন ফুফুর সেবা করার জন্য একজন লোক পাওয়া যাবে।
বিয়ে তো আমি করতেই চাই। কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাক মত হচ্ছে না। অনেকবার পাত্রীপক্ষ আমাকে দেখতে এসেছে। আমাকে নাকি পছন্দ হয় না। পছন্দ অবশ্য না হওয়ারই কথা। আমার গায়ের রং কালো। কালো বলতে একদম কুচকুচে কালো। লেখাপড়ার অবস্থা তো আরও খারাপ। দুইবার এস. এস. সি. দিয়েও পাশ করতে পারিনি। সব মিলিয়ে পাত্র হিসেবে বড্ড অযোগ্য আমি। তাই মা হাল ছেড়ে দিয়েছেন। মা এখন আর আমার বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলেন না। আমার ভাইয়ের বিয়ের ব্যাপারে মাকে কথা বলতে শুনেছি। আমার ভাইয়ের নাম দীপু। আমরা যমজ। তবে একটু অন্যরকম যমজ। আমাদের চেহারায় কোন মিল নেই। আমার ভাই দেখতে অনেক সুন্দর। গায়ের রং ফর্সা, উচা লম্বা। তুখোড় মেধাবী ছাত্র । ছোটবেলার কথা মনে উঠলে এখনো হাসি পায়। আমি তো পড়ালেখা একদমই পারতাম না। আর আমার ভাই ক্লাসের ফার্স্ট বয়। দীপু প্রথমে নিজের খাতায় লিখে তারপর আমার খাতা লিখে দিতো। এভাবে প্রায়ই স্যারদের মাইরের হাত থেকে রেহাই পেয়েছি। দুইভাইয়ের সম্পর্ক বন্ধুর মত। আমরা সব সময় একই রকম জামা পরতাম। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো। স্কুল শেষে আমরা দোকানে যেতাম। বাবা দুজনকে পাঁচ টাকা করে দিতেন। টাকা দিয়ে আমরা লজেন্স, আইসক্রিম খেতাম। একদিন একটা বিশাল কান্ড ঘটে গেল। বিকেল বেলা খেলার মাঠে একটা ছেলের সাথে দীপুর মারামারি লেগেছে। আমি মাঠে ছিলাম না। কেউ একজন খবরটা আমার কানে পৌঁছালো। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে মাঠে গেলাম। এরপর দুইভাই মিলে ছেলেটাকে ধোলাই দিয়েছিলাম। এজন্য বাবা আমাদের সাথে অনেক বকাবকি করেছিলেন।
একসময় ক্লাস টেন এ উঠলাম। মা বাবার সব চিন্তা আমাকে নিয়ে। এই ছেলেকে কীভাবে পাশ করানো যায়। দুইজন মাষ্টার রাখা হলো বাসায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। ফেল করলাম। আর আমার ভাই এ প্লাস পেলো। আমার কোনো কষ্টই হচ্ছে না। আমি না পারলেও দীপু তো পেরেছে এতেই শান্তি। মা অনেক কান্নাকাটি করলেন। কিন্তু বাবা আমাকে বললেন,
- আরে পাগল একবার ফেল করলে কিছুই হয়না। তুই আবার পরীক্ষা দিবি।
বাবার কথাতে আমি সাহস পেলাম। আমি আবারো পড়ালেখা শুরু করলাম। আমার ভাই দীপু কলেজে ভর্তি হয়ে গেল। ওর নতুন অনেক বন্ধু তৈরি হলো। তারপরেও আমাদের মধ্যে সম্পর্ক অটুট রইলো। সংসারের খরচ বেড়ে গেল। একটা মাত্র দোকান নিয়ে বাবা হিমশিম খেতে লাগলেন। হাজার কষ্টের মাঝেও বাবা ভেঙে পড়েননি। আমাকে অনেক সাহস দিতেন।
একদিন স্কুল থেকে বাড়ি গিয়ে দেখি বাবা শুয়ে আছেন। বিছানার চারপাশে অনেক লোকজন। মা কাঁদছে। আমি বাবার কাছে গেলাম । দীপু কলেজ থেকে এখনো ফিরেনি। বাবা আমার হাতটি ধরলেন। কী যেন বলতে চাইলেন কিন্তু পারলেন না। বাবার হাত পা কেমন যেন করছে।
বাবা মারা গেলেন। মা চিৎকার দিয়ে কাঁদছেন। আমি কী করবো বুঝতে পারছি না। কিছুক্ষণ পর দীপু আসলো। দুই ভাই গলাগলি বেঁধে কাঁদলাম সারা বিকেল।
বাবাকে হারিয়ে আমরা একদম দিশেহারা। মা চিন্তায় পড়ে গেলেন। কীভাবে সংসার চলবে? আমি দোকানে বসতে শুরু করলাম। দীপুকে বললাম,
- একটুও ভেঙে পড়বি না। বাবা নেই তো কী হয়েছে, আমি আছি না!!
দীপুকে কখনো দোকানে বসতে দেইনি। আমার পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। সকালে পরীক্ষা দিয়ে বিকেলে দোকানে বেঁচা বিক্রি করতাম। খুব কষ্ট হতো। দোকানের অনেক কিছুই আমি বুঝতাম না। বাবা যেসব লোকদের কাছে টাকা পেতেন তাঁরা সবাই যেন উধাও হয়ে গেল।
পরীক্ষায় আমি এবারও ফেল করলাম। খুব কষ্ট লাগলো। বাবার কবরের কাছে গিয়ে কেঁদেছিলাম অনেক্ষণ।
মা বললেন,
- পড়ালেখা এবার বাদ দাও। দোকানটায় ঠিকমত সময় দাও।
আমি সাতপাঁচ না ভেবে মায়ের কথা মত দোকানে নতুন করে মালামাল তুললাম।
দীপু এইচ. এস. সি. তেও এ প্লাস পেলো। সেদিনও আমরা দুইভাই বাবার কবরের কাছে গিয়ে কেঁদেছিলাম অনেকক্ষণ।
দীপু বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেল। আমি পুরো গ্রামে মিষ্টি বিতরণ করেছি। দীপুকে বললাম,
- টাকার জন্য কখনো ভাববি না। যেভাবে হোক পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হবে।
দীপু ঢাকায় চলে গেল।
মাকে বছরে একটার বেশি শাড়ী দিতে পারিনি। আমি একটা জামা দিয়ে পুরো বছর পাড় করেছি। প্রত্যেক মাসের শুরুতেই দীপুকে টাকা পাঠিয়েছি।
আমার ভাই অনার্স, মাষ্টার্স শেষ করেছে।
এখন আমরা অনেক ভালো আছি। বছরখানেক হলো দীপু সরকারি চাকরি পেয়েছে। প্রতিমাসে বাড়িতে টাকা পাঠায়। চাকরির প্রথম বেতন দিয়ে আমাকে একটা দামী মোবাইল কিনে দিয়েছে।
পাত্র হিসেবে আমি অযোগ্য তার আরো একটি কারণ আছে। অনেকেই বলে আমি নাকি একটু বলদ টাইপের। কিন্তু আমি এসব বিশ্বাস করিনা। কারণ আমার ভাই দীপু বলেছে,আমি নাকি মাটির মানুষ। আমার ভাই কখনো মিথ্যা কথা বলে না।
পরেরদিন সকালে মা আমাকে ঘুম থেকে উঠালেন। মা সুস্থ হয়েছেন । সকালের নাস্তা খেয়ে নীলাকে নিয়ে মামা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বিকেলের মধ্যে আবার ফিরতে হবে। একটা রিক্সায় উঠলাম। বিলের মধ্যদিয়ে রাস্তা। রাস্তার দুপাশে থই থই পানি। মৃদু বাতাস বইছে। সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে নীলার মুখে। খুব সুন্দর লাগছে নীলাকে। আমি বললাম,
- কবে আসবে?
- তুমি যেদিন আনতে যাবে।
নীলা আমাকে তুমি করে বলে। আমিও তুমি করে বলি। তবে মায়ের সামনে তুই করে বলি। যখন তুমি করে বলি তখন নীলা হেসে বলে, হঠাৎ করে তুমি হয়ে গেলাম? আমি লজ্জায় আর কিছু বলতে পারিনা।
রিক্সা চলছে। নীলা বললো,
- পরীক্ষা শেষ হলে আমি তো আমাদের বাড়িতেই থাকবো। তখন কী হবে? ফুফুকে কে দেখবে?
আমি কিছু না বলে অন্যদিকে তাকালাম। আমার মনের অবস্থা নীলা বুঝতে পেরেছে হয়তো।
বিলের মাঝে শাপলা ফুঁটেছে। থই থই পানিতে শাপলা দেখতে খুব ভালো লাগছে। নীলা বললো,
- ভাইয়া চলো না শাপলা তুলতে যাই।
- পাগল নাকি? তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আমাকে আবার ফিরতে হবে। দেরি হয়ে যাবে।
আমার কথা শুনে মন খারাপ করলো নীলা। মুখ গোমড়া করে বসে রইলো। নীলার গোমড়া মুখ আমার ভালো লাগছে না। রিক্সা থামাতে বললাম।একটু দূরে একটা নৌকা বাঁধা আছে। নৌকায় উঠলাম দুজন। আমি নৌকা বাইছি , আর নীলা ওর হাত দিয়ে শাপলা ফুল ছুঁয়ে দেখছে। নীলাকে নিয়ে এভাবে কখনো বাইরে বের হইনি। ওর মধ্যে যে এমন একটা শিশুসুলভ মন আছে তা এতদিন বুঝতে পারিনি। মেয়ে মানুষের মধ্যে একধরনের লুকানো সৌন্দর্য থাকে , যা প্রকৃতির কাছে গেলে প্রকাশ পায়।
দুপুরেরদিকে নীলাদের বাড়িতে পৌঁছলাম। আমাকে এটা সেটা খাওয়ানোর জন্য নীলা ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। নীলার এমন আচরণ দেখে মামী না জানি কী মনে করেন।
আমার ফেরার সময় হয়েছে। নীলাকে বললাম, -তাড়াতাড়ি চলে এসো।
নীলা হেসে বললো,
- তুমি এসে নিয়ে যেও।
এই কথাগুলো শুধু তাদেরই বলা যায় , যাদের সাথে গভীর সম্পর্ক থাকে। তবে কি নীলার সাথে আমার গভীর সম্পর্ক আছে? এর উত্তর আমার জানা নেই।
আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাড়িতে না গিয়ে সরাসরি দোকানে গেলাম। আমার মোবাইলটা বেজে উঠলো। দীপু কল করেছে। সপ্তাখানেকের ছুটি আছে। বাড়ি আসতে চায়। আমি বললাম, কালকেই চলে আয়।
দীপু আসবে খবরটা মাকে দিতে হবে।দোকান বন্ধ করে বাড়িতে গেলাম। মামা বাড়ির খবর জানতে চাইলেন মা। আমি বললাম, মা কালকে দীপু আসবে।
মা বললেন, আমিই দীপুকে আসতে বলেছি। এবারের ছুটিতে একটা বিয়ে সাদি দিতে হবে।
আমি তো খুব খুশি । দীপুর বিয়ে নিয়ে আমার অনেক প্ল্যান আছে। কত কিছু করবো! মা বললেন, আমার কাছে বস। আমি মায়ের একদম কাছে গিয়ে বসলাম।
মা যখন গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছু বলেন তখন একদম কাছে ডাকেন। মা বললেন,
-নীলা তো অনেকদিন থেকেই এ বাড়িতে আছে। মেয়ে হিসেবে ও খুব ভালো। দীপুর জন্য আমি ওকে রেখে দিতে চাই। তুই কি বলিস?
দুপুরবেলা যে মেয়েটির নতুন একটি রুপ আমার চোখে ধরা পড়লো, যে মেয়েটির জন্য আমার অন্তরে অনেকখানি জায়গা তৈরি হয়েছে, সেই মেয়েটিকে আমার ভাইয়ের সাথে মা বিয়ে দিতে চায় । দীপু যে শুধু আমার ভাই তা নয়, ও আমার জীবনের অর্ধেক। আমি বুঝতে পারছি না এখন আমার কী বলা উচিত। আমি অনেকক্ষণ মায়ের মায়াভরা মুখখানির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মা আবারো বললেন,
- কিছু বলছিস না যে!
আমি আমতা আমতা করে বললাম,
- ভালই হয়। কিন্তু দীপু ও নীলা এ বিষয়ে কিছু জানে?
- ওরা জানে না। তবে নীলার বাবার সাথে আমার কথা হয়েছে। সে রাজি আছে।
রাজি না হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমার ভাই যোগ্য পাত্র। লাখে একটা।
হঠাৎ করে মা যেন অনেক বেশি সুস্থ হয়ে গেলেন। মায়ের এ অবস্থা দেখে খুব ভালো লাগছে আমার। কাল সকালে আমার ভাই আসবে। বিয়ে হবে আমার ভাইয়ের । আমাকে বসে থাকলে চলবেনা। অনেক কাজ করতে হবে। মায়ের রুম থেকে বের হয়ে একটু খালপাড়ের দিকে গেলাম। একটু পরেই সূর্য ডুববে। চারদিক ঘন অন্ধকারে ঢেকে যাবে। বুকের বাঁ পাশটায় কেমন যেন একটা ব্যাথা অনুভব করছি। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। খালপাড় থেকে একটু দূরে একটি বটগাছ। গাছটির নিচে বসলাম। চারদিক অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। গাছের শিকড়ের উপর শুয়ে পড়লাম। একটি দুটি করে আকাশের তারা গুনছি। রাত গভীর হতে লাগলো। মা বাড়িতে একা। আজ তো নীলা নেই। বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম।
মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
- এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলি?
আমি মায়ের সাথে কখনো মিথ্যে বলিনি। শুধু আজ বললাম। একটু কাজ ছিল তাই বাজারে গিয়েছিলাম।
মা ভাত বাড়লো। আমি আর মা খাচ্ছি। হঠাৎ মা আমার মুখে খাবার তুলে দিলেন। আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। মাও কাঁদছে। মা সর্বশেষ কবে আমাকে খাইয়ে দিয়েছিল আমার মনে নেই। আজ আবার মায়ের হাতে খেলাম।
সকাল হতে না হতেই দীপু চলে এসেছে। ওকে দেখে আমার আনন্দের আর সীমা নেই। দীপুকে জড়িয়ে ধরলাম। মায়ের চোখে পানি। দীপু মায়ের চোখের পানি মুছে দিল। মা অনেক পদের তরকারি রান্না করেছে। দুইভাই খুব মজা করে খাচ্ছি।
মা বললেন,
- দীপু, এবার কিন্তু বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে। এখন আর কোনো অজুহাত দেখালে চলবেনা।
মায়ের কথা শুনে দীপু যেন লজ্জায় লাল হয়ে গেলো।
মা আবারো বললেন,
- আমাদের নীলা অনেক ভাল মেয়ে। দেখতে শুনতেও ভাল। তোমাদের আপত্তি না থাকলে আমি নীলার বাবার সাথে কথা বলবো।
দীপু আমার দিকে তাকালো। আমি বললাম,
- হ্যাঁ , নীলা বেশ শান্ত শিষ্ট। তোর সাথে খুব ভালো মানাবে।
দীপু কিছু বলছে না। মাথা নিচু করে খাচ্ছে।
অবশেষে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হলো। আগামী কাল বিয়ে। তাড়াহুড়ো করে অনুষ্ঠান করা যাবেনা। তাই আমি ও দীপু গিয়ে বউ নিয়ে আসবো। সময় সুযোগ বুঝে অনুষ্ঠান পরেও করা যাবে। এটা মা ও নীলার বাবার সিদ্ধান্ত।
আমি ও দীপু একবিছানায় শুয়ে আছি। ছোটবেলায় আমরা একসাথেই ঘুমিয়েছি। আজ শেষবারের মত এক সাথে ঘুমাচ্ছি। দীপু বললো,
-আমি তো নীলাকে খুব একটা দেখিনি। কেমন মেয়ে বলতো?
আমি হেসে হেসে বললাম,
- অসাধারণ মেয়ে। যেমন চেহারা, তেমন গুণ। তোর সাথে খুব ভালো মানাবে।
দীপু কী যেন ভাবছে। আমি অন্যপাশে ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।
গভীর রাত । সবাই গভীর ঘুমে অচেতন। দীপুর দিকে তাকালাম। নিষ্পাপ একখানা মুখ। এই মুখের সাথে একমাত্র নীলাই মানানসই। নীলার কাছে আমি বড্ড বেমানান। আমার ভাই আমার কলিজার টুকরা। ওর প্রতি আমার কোনো হিংসা নেই। তবুও নিজের মনকে মানিয়ে রাখতে পারিনা।
খুব ভোরে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো আমাদের। বউ আনার জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করেছি। গাড়িটি ইতিমধ্যে এসে হাজির। বিয়ের দিন সকালে নাকি পায়েশ খেতে হয়। মা জোর করে দীপুকে পায়েশ খাওয়ালেন।
সকাল দশটায় আমরা নীলাদের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। এতদিন মামার বাড়ি গিয়েছি। এখন যাচ্ছি ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি। ভাবতেই কেমন যেন একটা লজ্জা লজ্জা ভাব আসে মনের মধ্যে। রাস্তার দু পাশে থই থই পানি। পানিতে দোল খাচ্ছে সাদা সাদা শাপলা ফুল।
বরের সাজে দীপুকে বেশ মানিয়েছে। একদম সিনেমার নায়কদের মত লাগছে।
নীলাদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামলো। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। বিয়েতে জামাইয়ের প্রতি সবার অনেক আগ্রহ থাকে। কিন্তু দীপুর প্রতি আগ্রহটা একটু কম। কারণ জামাইকে সবাই আগে থেকেই চিনে।
আমার মনে উৎসাহের শেষ নেই। আজ যাদের বিয়ে হবে তাঁরা আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি আপন। নীলা এক টুকরা কলিজা, যাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভালোবেসেছিলাম। আর আমার ভাই আরেক টুকরা কলিজা, যার জন্য আমি জীবনও দিতে পারি। দুজন প্রিয় মানুষের বিয়ে হচ্ছে। এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে?
পাঁচ লাখ এক টাকার দেন মোহরে দীপুর সাথে নীলার বিয়ে হল। নিজের অজান্তে আমার চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি পড়লো। এ পানির দিকে কারো নজর নেই। সকলের নজর বর ও কনের দিকে। খাওয়া দাওয়া শেষে এবার ফেরার পালা। গাড়িতে উঠলাম।
গাড়ি চলছে। নীলা এতদিন ফুফুর বাড়িতে গিয়েছে। কিন্তু আজ যাচ্ছে শ্বশুর বাড়ি। আমি ড্রাইভারের পাশের সিটে আর ওরা দুজন বসেছে পিছনে। বধূ সাজে নীলাকে কেমন লাগছে তা আমি দেখিনি। দেখতে ভয় লাগে , বড্ড ভয় লাগে। নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
গাড়ি চলছে। রাস্তার দু পাশে থই থই পানি। পুরো বিল জুড়ে যেন শাপলার সমারোহ। ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললাম। আমি গাড়ি থেকে নামলাম। দীপু জিজ্ঞেস করলো,
- কই যাও?
আমি কিছু বলছি না। রাস্তার পাশে নৌকা বাঁধা আছে। নৌকায় উঠলাম। একটু দূরে ফুটে আছে অনেকগুলো লাল শাপলা। সবগুলো তুললাম। গাড়ির সামনে এসে দীপুকে বললাম,
- এগুলো নতুন দম্পতির জন্য উপহার।
দীপু হেসে হেসে বললো,
- তোর পাগলামি এখনো কমলো না।
আবারো গাড়ি চলছে। শাপলা ফুল দেখে নীলা কী ভাবছে খুব জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সব কিছু জানতে নেই। কিছু ঘটনা চিরদিন অজানা থাকাই ভালো।
বাড়ির সামনে গাড়ি থামলো। বধূ বরণের জন্য মা দাঁড়িয়ে আছেন। বাবার মৃত্যুর পর মাকে এত বেশি খুশি হতে দেখিনি।
আমাদের আসেপাশের বাড়িগুলোতে মিষ্টি বিতরণ করলাম।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলো। একটা রুমকে সাজানো হয়েছে। এটা বাসর ঘর। স্বপ্নের বাসর। দীপু ও নীলাকে সেখানে পাঠানো হয়েছে। আমি মায়ের রুমে গেলাম। মায়ের মুখখানা একটু মলিন। আমাকে কাছে ডাকলেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মা আমাকে একটু আদর করলেই আমার চোখে পানি এসে যায়। কিন্তু আজ পানি আসছে না। দেখলাম মায়ের চোখেই পানি। আমি পানি মুছে দিয়ে বললাম,
- মা, কী হয়েছে?
মা কিছু বলছে না। মায়ের কোলে মাথা রেখে আমি শুয়ে পড়লাম। মা বললেন,
- তুই নীলাকে পছন্দ করিস আমি তা জানি। কিন্তু আমি তোর জন্য কিছু করতে পারিনি বাবা।
মা আবারো কেঁদে ফেললো। আমি বললাম,
- মা, এসব কথা বাদ দাও এখন। তুমি ঘুমিয়ে পড়।
মা বললেন,
-নীলার বাবাকে বলেছিলাম ,নীলাকে দেয়ার জন্য। ওরা দীপুর জন্য রাজি হয়েছে। তুই ভাবিস না, তোর জন্য নীলার চেয়েও সুন্দরী মেয়ে এনে দিব।
আমি কী বলবো বুঝতে পারছি না। শুধু মায়ের চোখ থেকে পানি মুছে দিলাম। মায়ের রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। বাইরে একটু একটু বাতাস বইছে। হাঁটতে হাঁটতে পুকুরপাড়ে চলে গেলাম। এখানেই আমার বাবার কবর। যখন অনেক বেশি কষ্ট হয় তখন এখানে ছুঁটে আসি। কবরের পাশে দাঁড়ালাম। বাবার কাছে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কী সত্যি অযোগ্য? সবাই বলে আমি বলদ, আমি কি সত্যি বলদ? তবে দীপু কি মিথ্যে বলেছে? ও তো বলে আমি নাকি মাটির মানুষ। কবর থেকে কোনো আওয়াজ বের হয়না।
আজ বাবা বেঁচে থাকলে এই গল্পটি ভিন্ন রকম হতে পারতো।
আমি বাবার খুব কাছে বসে আছি। চারদিকে ঘন অন্ধকার। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। আমি বাবাকে বললাম- বাবা,তোমার দীপু অনেক বড় হয়েছে । ও আজকে নতুন জীবন শুরু করেছে। ওর জন্য দোয়া করবে। বাবা কোনো উত্তর দেয় না। হয়তো দেয়, আমি শুনছি না।
চারদিকে শুধু ঝিরিঝিরি বাতাসের শব্দ। যে শব্দ মনের শূন্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
~ রুহুল আমিন

_দীর্ঘশ্বাস
আখি তাড়াতাড়ি মিরপুর আয় তো, তোর সাথে খুব খুব খুব জরুরী দরকার।।তাড়াতাড়ি আয়।।দেরি করিস না কিন্তু।। আমরা মা মানে আম আমিই অপেক্ষা করছি,তাড়াতাড়ি আয়।।
আমাল ফোন করে একদমে কথা গুলো বলল।।
আমি আমালের কোন কথাতেই না বলার মতো শক্তি পাই না,, তাই আর কথা না বাড়িয়ে আমার রুমমেট প্লাস বান্ধবী কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।।
ফার্মগেট থেকে মিরপুরের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও যারা এই পথে চলাচল করে তারা জানে এই পথঘাট আর গাড়ি সম্পর্কে।।যাইহোক বান্ধবীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম।।
যেতে যেতে বলি আমাল আমার খালাতো ভাই ইনফেক্ট বড় ভাই, কিন্তু কেন জানি না এই বড় ভাই ব্যক্তিটির উপর কোন কারণ ছাড়াই আমি ফিদা।।আমি যে এই মানুষটার উপর ফিদা তা তাকে একবার জানিয়েছিলাম, ফলশ্রুতিতে সে আমাকে বলেছিল থাপ্পড় চিনিস? থাপড়াইয়া গাল লাল করে দিবো।আর যেন এইধরনের কথা না শুনি।। তারপর থেকে আর কোন দিন জানানোর চেষ্টা করিনি যে, আমি তাকে কতটা ভালবাসি।।
ওফফ, শেষ পর্যন্ত মিরপুর এসে পৌছালাম। আমাল আমাদেরকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসল।।এখানে প্রথম থেকেই একটা মেয়ে বসেছিল।আমাল হয়তো কিছু একটা বলতে চায় কিন্তু একটু ইতস্তত করছিল। বুঝলাম আমার বান্ধবীর জন্যই হয়ত এই অস্বস্তি।। তাই তাকে বললাম ভাইয়া তুমি বিনা দ্বিধায় কথা বলতে পারো।।কারণ ও আর আমি একে অপরের অর্ধাঙ্গ।।
না না ওর জন্য কোন সমস্যা হচ্ছে না। আসলে আমি কোথা থেকে কি বলে শুরু করবো তাই বুঝতে পারছি না।।
আচ্ছা আমি সহজ করে দিই।।তুমি বরং এই মেয়েটির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দাও।।
ওর নাম লুবনা,,মূলত ওর জন্যই তোকে ডাকা।।আমরা আজকে বিয়ে করতে চাই।।তুই আমাদের সাথে চল।।
কাউকে প্রচণ্ড পরিমাণে ভালোবাসলে তার সাথে অন্য একটা মেয়েকে দেখেও নিজেকে হয়তো স্বাভাবিক রাখা যায়,,কিন্তু সেই মানুষটা কাউকে বিয়ে করতে চলেছে আর এই কাজে আপনার সাহায্য চাইছে ঐ মুহূর্তে কিভাবে নিজেকে সামলানো যায় আমার জানা নেই।।কিন্তু তবুও আমি নিজেকে সামলেছি, কিভাবে সামলেছি জানি না।।শুধু জানি আমি আমার ভেতরকার ঝড়টাকে একটা #দীর্ঘশ্বাস এর মধ্যদিয়ে থামিয়ে দিয়ে তাকে বলেছিলাম, " খালামনিকে না জানিয়ে বিয়ে করাটা কি ঠিক হবে?"
আমাল--- না হয়তো হবে না, কিন্তু মা ওকে কখনোই মানবে না,আর আমার পক্ষেও ওকে ছাড়া সম্ভব না।।তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওকে লুকিয়ে বিয়ে করার।।
আখি--- কিন্তু ভাইয়া,খালামনি যখন ঘটনাটা জানবে তখন??
আমাল--- তখনকারটা তখন দেখা যাবে।।
আখি--- ভাইয়া, আমাকে সাতদিন সময় দাও, আমি খালামনির সম্মতি নিয়েই তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করি।।কারণ বিয়েটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার,,মা কে না জানিয়ে বিয়ে করাটা খুব একটা ভালো কথা নয়।।খালু মারা যাবার পর খালামনি কতটা কষ্ট করে তোমাকে আজকের এই পর্যায়ে এনেছে তা তুমি সবচেয়ে ভালো জানো।।তাই এই ভূল কাজটা করো না।।
আমাল--- জ্ঞান দিস না।।তোর জ্ঞান শোনার জন্য তোকে ডাকি নি।।
আখি--- বিবেক বুদ্ধি লোপ পেলে জ্ঞান তো শুনতেই হবে ভাইয়া।।আর তাছাড়া রিভেঞ্জ অব নেচার বলে একটা কথা আছে জানো তো?? তুমি যদি এখন খালামনিকে ঠকাও,, জীবন ও তোমাকে ঠিক ততটুকুই ঠকাবে।।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমাল বলল,,"ঠিক আছে সাতদিন সময় নে,,কিন্তু তারপর তুই নিজে সময় ঠিক করে আমাদের বিয়ে দিবি। "
আখি--- আচ্ছা ভাইয়া তাই হবে।।
আমাল মেয়েটির হাত ধরে বের হয়ে বের হয়ে যায়।।
কাউকে প্রচণ্ড ভালোবাসার পর তাকে অন্যকারো হতে দেখলে বুঝি এতোটা কষ্ট হয়,,এতোটা......
আখি তুই নিজেকে সামলা,, প্লিজ।।
আখি--- আ আম আমি আমি আমি নিজেকে সাসামলে নেবো,,আমাকে একটু সময় দে বান্ধবী।। হাত পা কাঁপছে আমার।।এটা একটু স্বাভাবিক হোক,তারপর আমিও স্বাভাবিক হয়ে যাবো।।
মিশু-- আখি,, আমি তোর হাত পায়ের কথা বলিনি,,তোর ভেতরকার কথা বলেছি।।
আখি--- মিশু,,
মিশু-- চল এখান থেকে।।
আরো একটি দীর্ঘশ্বাসকে বাতাসে বিলীন করে চললাম নিজের গন্তব্যে।।
***
সময় বহমান,, সাতদিন পার হয়ে গেছে।।আমি হাজার রকম যুক্তি তর্ক করেও খালামণিকে রাজি করাতে পারি নি।।খালামণির এক কথা,," ওই মেয়েকে আমি যতটুকু চিনেছি ও আমার ছেলেকে ভালো রাখতে পারবে না।।বরং আমার ছেলে আরও মানসিক অশান্তি তে থাকবে।।একজন মায়ের চোখ কখনো ফাঁকি দেওয়া যায় না।।ওই মেয়েকে আমার চেনা হয়ে গেছে।।আর কোন দিন আমাকে এই মেয়ের সম্পর্কে কিছু বলবি না।।"
আমাল ভাইয়াকে সবটা জানানোর পর ভাইয়া আমাকে বলল, "আমি আগে থেকেই জানতাম এমন হবে।।তাই তোকে বলেছিলাম।।এখন বল কি করবি,,কবে আমাদের বিয়ে দিচ্ছিস??"
তোমরা তোমাদের সুবিধা মতো সময় ঠিক করে আমাকে জানিও,আমি চলে আসবো।।
এরপর একটা দিনক্ষণ ঠিক করে ঠিকই ভাইয়া আর ঐ মেয়েটির বিয়ে আমি দিয়েছিলাম,,যা জানাজানি হবার পর খালামণি ও অভিমান করে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।।
***
মাঝে কেটে গেছে পাঁচ পাঁচটি বছর।।জীবন বয়ে চলেছে বহমান নদীর মতো।।চারপাশের সবকিছুই পাল্টেছে,পাল্টাচ্ছে।। শুধু আমার ভেতরটাই ফাঁকা,,একেবারে শূণ্য।।যে শূন্যতার সৃষ্টি পাঁচ বছর আগে হয়েছিল তা আমি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি,, মা বাবা সবাই মিলে চেষ্টা করেছে আমার জীবনের শূন্য জায়গাটা পূরণ করার।।কিন্তু আমি পারি নি,আজও পারিনি সেই জায়গায় অন্যকাউকে বসাতে।। মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা করে ভাইয়া কেমন আছে তার ভালোবাসার মানষটির সাথে? কিন্তু আমি জানার চেষ্টা করি না,কারণ কিছু কিছু কথা হয়তো না জানাই ভালো।।থাক না কিছু ইচ্ছে দীর্ঘশ্বাসের আড়ালে।।আমি তো শুধু দিন রাত আল্লাহর কাছে এটাই দোয়া করি যেন,ভাইয়া খুব ভালো থাকে খুব।।খালামণি ঐ মেয়েটা সম্পর্কে যা যা বলেছিল তা যেন সত্য না হয়,,বরং যেন ঠিক তার উল্টো টা হয়।।ভাইয়া যেন খুব খুব খুব সুখি হয়।।
®Akhi Rahman

গল্পঃ #বেখেয়ালি_ভালবাসা
গল্পঃ #বেখেয়ালি_ভালবাসা
লেখাঃ #সাবেরা_সুলতানা_রশিদ
#পর্ব_১০
২৮.
সৈকত বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রাতের ঘুমন্ত শহর টাকে দেখছে ।
আকাশের তারা গুলো মিটমিট করে জ্বলছে । ঠান্ডা বাতাসে কাপুনি ধরে যাচ্ছে তারপরও সৈকত বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ভাবছে কি করে কি করা যায় !!
যদিও তখন বাবা তার অপূর্ণ ইচ্ছাটা কি সেটা বলে নি । কিন্তু সৈকত সেটা বেশ বুঝতে পেরেছে ।
বাবা তখন মেঘের কথাই বলছিল।
সৈকত ভাবে মেঘ কে এভাবে কষ্ট দেওয়া আমার একদমই উচিত হয়নি।
যে মেয়েটা তার সবকিছু উজাড় করে আমাকে এতটা ভালবাসলো আর আমি তাকে ------!!
শুধুমাত্র বাবার উপর রাগ দেখিয়ে !!
আচ্ছা আমিও যে মেঘকে ভালবাসি সেটা কি মেঘ নিজ থেকে বুঝতে পারে না!??
এতদিন যা করেছি সেটাতো সবটাই বাবাকে ভুল বুঝে করেছি ।
কিন্তু আজ !!?
আমার সব ভুল গুলো ভেঙ্গে দিয়ে যে মানুষটি আমার চোখের সামনে থেকে মিথ্যার জালটা সরিয়ে দিল তাকেই প্রতিনিয়ত কষ্ট দিয়ে যাচ্ছি----
না এটা ঠিক করছি না আমি ।
কিন্তু মেঘ সে কেন আমার উপর জোর খাটাল না!?
কেন এখান থেকে আমার কথা মত চলে গেল??
কেন একবারের জন্যেও বললো না যে সে এ বাড়ি ছেড়ে যাবে না,আমাকে ছেড়ে যাবে না!!?
ধুরঃ কি সব ভাবছি।
দোষটা তো আমারই । আমিই তো ওকে এক প্রকার জোর করেই এ বাড়ি থেকে চলে যেতে বাধ্য করেছি।
ও তো যেতে চাইনি।
আমি সবসময় ওর সাথে ইচ্ছা করেই খারাপ ব্যবহার করেছি।
আমি যে খারাপ সেটা ওকে মানতে বাধ্য করেছি।
সত্যিই মেয়েটা বড্ড বেশী অভিমানী ।
আজ আমার উপর অভিমান করেই বাবা অসুস্থ হওয়া সত্বেও এ বাড়িতে না এসে ঠিক বাবার বাড়িতেই চলে গেল।
অথচ ওখানে যেয়েও যে মেঘ একটা মুহুর্তের জন্য ও ভাল নেই সেটা আগের দিন ক্লিনিকে দেখেই বোঝা গেছে।
হঠাৎ করে গেটের সামনে একটা গাড়ি এসে হর্ন বাজাতেই সৈকতের সব ভাবনার জগৎ বিচ্ছিন্ন হয় ।
সৈকত তাকিয়ে দেখে তার অফিসের এক্যাউনটেন্ট ম্যানেজার রাকিবের গাড়ি ।
এত রাতে রাকিব এখানে !!
কি দরকার ??কখনও তো এভাবে অফিসের কেউ বাড়িতে আসেনি। তাহলে আজ হঠাৎ কি এমন হলো!!?
সৈকত আর দাঁড়িয়ে না থেকে নিজেই নিচে চলে যায়।
—কি ব্যাপার রাকিব সাহেব এতরাতে আপনি এখানে??কোন সমস্যা??
—জ্বি স্যার ।
—কি সমস্যা ?কি হয়েছে খুলে বলুন।
—আসলে স্যার আজ দুপুরে পুলিশ নাকি সুইটি ম্যাডামকে থানায় নিয়ে গেছে।
—হোয়াট!!?কি বলছেন আপনি!!?
—হ্যা স্যার সত্যি । প্রথমে আমিও বিশ্বাস করিনি। কিন্তু যখন থানা থেকে ফোন আসলো তখন বুঝতে পারলাম ঘটনা সত্যে।
—হঠাৎ পুলিশ কেন সুইটিকে এরেস্ট করবে??
—জানিনা স্যার ।
—আপনারা থানায় যোগাযোগ করেন নি??
—আসলে স্যার ঘটনা ঘটেছে দুপুরে । কিন্তু আমি জানতে পেরেছি কিছুক্ষণ আগে ।
—ও।
—পুলিশকে রিকুয়েস্ট করে সুইটি ম্যাম আমাকে ফোন দিয়েছিল। তারপর বললো আপনাকে যেন আমি ঘটনাটা বলি আর সকালে উকিল নিয়ে তাকে জামিনে বের করে আনি।
তাই এ কথা জানানোর জন্য আমার এত রাতে এখানে আসা।
—আচ্ছা ঠিক আছে । আপনি এক কাজ করুন আমার যে আইনজীবী আছেন আমার কথা বলে তার সঙ্গে সব যোগাযোগ করুন।
—ওকে স্যার ।
—আমি আগামীকাল সকালে থানায় যাবো।
—ঠিক আছে স্যার ।তবে আরেক টা কথা স্যার ।
—কি কথা?
—আপনি সেদিন সুইটি ম্যাডামকে টাকা দিতে বলেছিলেন।
—হ্যা ,তো ?
—না মানে সেদিন আমি টাকা দিয়ে ছিলাম। তারপর আজ সকালেও উনি আমার থেকে আগের থেকে দ্বিগুন টাকা নিয়েছেন আপনার কথা বলে ।
এ কথা শোনার পর সৈকতের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে।
একটু চিন্তা করে বলে ঠিক আছে কথাটা বলেছেন এ জন্য ধন্যবাদ ।
—স্যার তাহলে এখন আমি যাই।
—ওকে
সৈকত রুমে এসে ভাবতে থাকে হঠাৎ কি কারণে পুলিশ সুইটিকে এরেস্ট করতে পারে !!?আর সুইটি বা কেন আমাকে না জানিয়ে আবার দ্বিগুন টাকা নিল??
মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
এরেস্ট যদি করার দরকার হয় তাহলে তো সুইটির এক্স হাজবেন্ড কে করা দরকার । সুইটি কে কেন??
অবশ্য বাবা অসুস্থ হওয়ার পরে সুইটির সঙ্গে আর দেখা হয়নি কথাও হয়নি।
অনেক রাত হয়েছে এখন এসব নিয়ে না ভাবলেও চলবে । আগামীকাল সকালে পুলিশ স্টেশনে গেলেই বোঝা যাবে ।
সৈকতে পরনের কাপড়টা চেন্জ করে আলমারি খোলে ।
সৈকত ভুল করে আলমারির অন্য কাবার্ড খোলে।
আরে এটা তো মেঘের কাবার্ড !!
খুলতেই সৈকত অবাক হয়ে যায়
কি ব্যাপার মেঘের সব শাড়ি কাপড় এখানে রাখা তাহলে ও যাওয়ার সময় কি কিছুই নিয়ে যায় নি??
নিবেই বা কি ও তো এখনো ঠিক করে শাড়িটাও পরতে পারেনা।
বিয়ের পরের দিন সকালে শাড়ি পরে হোচট খেয়ে পড়েছিল আমার উপর ।
আবার এইতো সেদিন সিলেটে ঘুরতে গিয়ে আবার পড়ে যাচ্ছিল ।
ভাগ্যিস আমি ধরে ফেলেছিলাম না হলে----
সৈকত দেওয়ালের ছবির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে ।
সৈকত মেঘের শাড়ি গুলোতে হাত বুলায় মনে হচ্ছে শাড়ি গুলোতে মেঘের স্পর্শ খুজে পাচ্ছে।
হঠাৎ সৈকতের চোখ পড়ে সেই খয়েরী রঙের শাড়ীটার দিকে ।
সেদিন রাতে যেটা পরে সুন্দর করে সেজে সৈকতের জন্য অপেক্ষা করছিল।
কিন্তু হঠাৎ মোমবাতির আগুন সব শেষ করে দিল--------
সৈকত হাসতে থাকে সে রাতের মেঘের পাগলামি কথা মনে করে ।
যে কোনদিন পানি ছাড়া কিছু খাইনি আর সে কিনা সেদিন হুইস্কির মতো জিনিস খেয়ে ছিল তাও আবার অর্ধেক বোতলের ও বেশী।
সৈকত শাড়িটা বের করে কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে । কি মনে করে শাড়িটা নাকের কাছে দেয় এই ভেবে যে শাড়িটাই হয়তো মেঘের শরীরের গন্ধ লেগে আছে।
কিন্তু------
সেদিন রাতে উগরানোর পর পরিষ্কার করার পরে আর মেঘের শরীরের কোন গন্ধ এতে অবশিষ্ট নেই যা আছে সব ডিটারজেন্টের গন্ধ।
সৈকত শাড়িটা রেখে আরেকটা শাড়ি খুঁজতে শুরু করে যেটা মেঘকে নিজ হাতে পরিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু কই সেটা!!?
কোথাও তো নেই।
কোথায় গেল শাড়িটা??
মেঘ সঙ্গে করে নিয়ে গেল?
না আমার উপর রাগ করে ওটা কাউকে দিয়ে দিল??
সৈকত শাড়িটা খুজতে খুজতে হঠাৎ চোখ পড়ে একটা ডায়েরির উপর ।
সৈকত ডায়েরিটা হাতে নিয়ে দেখে ডায়েরিটা একটু পুরাতন মতো ।
তারমানে এটা মেঘের ব্যক্তিগত ডায়েরি।
এটা পড়া ঠিক হবে না।
সৈকত ডায়েরিটা উল্টে পাল্টে দেখে রেখে দেয় । আবার কি মনে করে ডায়েরিটা বের করে এনে সোফায় গিয়ে বসে ।
মনে মনে বলেঃ
জানি কারো ব্যক্তিগত কিছু অনুমতি ছাড়া দেখতে হয় না । কিন্তু আজ তোমার অনুমতি ছাড়াই আমি তোমার ডায়েরিটা পড়তে যাচ্ছি জানিনা কি আছে এর ভিতরে । পারলে ক্ষমা করো।
প্রথম পৃষ্টা উল্টেই সৈকত একটু ধাক্কা খায় ।
♣ভবিষ্যতের বর ,♣
“এটা তোমার জন্য আমার পক্ষথেকে লেখা আমার অপূর্ন জীবনের কিছু কথা, কিছু স্মৃতি ,কিছু মধুর মুহূর্ত । অপূর্ণ বললাম কেন জানো??তুমি নেই তাই,যখন তুমি আসবে তখন আমার জীবনটা পূর্নতা পাবে ।
এখন তুমি নেই তাই এটাতে সব কিছু শেয়ার করছি ভবিষ্যতে তোমাকে দিব বলে ।তারপর এর ছুটি তখন তুমি হবে আমার একমাত্র ডায়েরি। প্রতিদিনের সবকিছু আমি তোমার সাথে শেয়ার করবো । রাতে যখন আমরা ঘুমাতে যাবো তখন আমি তোমার বুকের বামপাশে মাথা রেখে শুবো। তারপর তোমার ডানহাতের আঙ্গুলের ফাঁকে আমার বামহাতের আঙ্গুল দিয়ে ধরে, তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার সারাদিনের না বলা কথা গুলো বলবো। জানি তুমি সারাদিন অফিসের কাজ করে এসে ক্লান্ত হয়ে যাবে তারপরও আমি তোমাকে আমার কথা গুলো শেয়ার করবো। ”
এই
মনে থাকবে??
যদি তোমার ঘুম আসে তাহলে কফি করে খাওয়াবো।
আর এরপরও যদি ঘুম আসে তাহলে তোমাকে ----------
এখন বলবো না পরে বলবো । আগে আমার অপূর্ন জীবনটাকে পূর্ণ করো তারপর ----
সৈকত লেখাটুকু পড়ে হাসতে থাকে ।
পাগলি একটা তা না হলে কি কেউ এভাবে লিখতে পারে!!?
সৈকত পৃষ্টা উল্টায় আর পড়তে থাকে ।
এক এক করে পড়তে পড়তে শেষের দিকে চলে আসে ।
মেঘের জীবনের অনেক কথাই সৈকত ডায়েরি তে পাই।
প্রতিদিনের লেখার ডেট আর সময় দিয়ে ডায়েরিটি লেখা।
সৈকত হিসাব করে বিয়ের আগের দিন পর্যন্ত মেঘ ডায়েরি লিখেছে ।
“আজ শেষ ডায়েরি লেখা। আগামী কাল থেকে আমার জীবনের ডায়েরিটা হবে একজন মানুষ। জানিনা সে কেমন হবে তবে যেমনই হোক আমি ভালবাসবো আমার সবটা দিয়ে । খুশি রাখার চেষ্টা করবো তাকে। ”
তারপর মাঝের কিছু পৃষ্টা ফাঁকা পড়ে আছে ।
তারপর আবার লেখা—সৈকত মেঘের দেওয়া তারিখটাতে চোখ বুলায় তারা যেদিন সিলেটে গিয়েছিল সেদিন লেখা—
ভাবিনি আবার কিছু লেখার প্রয়োজন পড়বে !!
কিন্তু পড়েছে তাই লিখছি —
বিয়ের দিন আর বিয়ের রাতে মানুষটাকে দেখে খুব রাগ হয়ছিল।
মনে হয়েছিল মানুষটিকে কখনো মন থেকে মানতেই পারবোনা।
এরাকম মানুষের সাথে ঘর করা হলেও মন থেকে কখনো ভালবাসতে পারবো না।
কিন্তু কখন যে এই বদমেজাজী মানুষটার সাথে থাকতে থাকতে এই মানুষটাকে ভালবেসে ফেলেছি তা নিজেও জানিনা।
আমার নিজের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি তার মধ্যে ।
কিন্তু মানুষটা কেন এমন ??
সবকিছু বুঝেও যেন না বুঝে থাকে ।
কেন এমন??
কেন এত অবহেলা করে ??
মেঘের লেখা গুলো পড়ে সৈকতের বুক থেকে না চাইতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়।
২৯.
ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে সৈকত তার বাবার রুমে যায় ।
চৌধুরী সাহেব তখনও ঘুমাচ্ছেন তাই সৈকত কোন শব্দ না করে বেরিয়ে আসে রুম থেকে।
সৈকত নিচে এসে দেখে বাকি সবাই নাস্তার টেবিলে বসে আছে। সৈকত রোজিকে বলেঃ
—ভাবি বাবা উঠলে বাবাকে সময় মত নাস্তা দিয়ে দিও সাথে ঔষুধ গুলোও মনে করে খাইয়ে দিও।
—ঠিক আছে তোর এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তুই কি এখন অফিসে যাবি?
—হ্যা ভাবি, একটু কাজ আছে।
—আচ্ছা তুই কি বলতো!?
—কেন!আমি আবার কি করলাম!??
—তুই জানিস না তুই কি করছিস??
—না জানিনা। বলো কি করেছি??
—আমরা বাড়িতে এতগুলো মানুষ আমাদের কথার কি কোন দাম নেই তোর কাছে?
—আচ্ছা ভাবি এতঘুরিয়ে পেচিয়ে না বলে সোজাসুজি বললেই তো পারো।
—তোর আজকে অফিস যেতে হবে না।
—কেন !!?
—তুই আজ তোর শ্বশুর বাড়ি যাবি । বিয়ের পর একটা বারের জন্যও ঐবাড়িতে যাসনি। মেঘ তোর উপর অভিমান করে চলে গেছে । এখনো যদি তুই ওকে আনতে না যাস তাহলে কি করে হবে !!?মেঘের বাড়ির সবাই কি মনে করবে বলতো??
—এসেছিল তো আবার চলে গেল কেন??
—এসেছিল মানে!!?
—কেন বাবাকে দেখতে ক্লিনিকে এসেছিলতো । তাহলে আবার চলে যাওয়ার কি দরকার ছিল।
—সৈকত !!হ্যা মেঘ এসেছিল কিন্তু সেটা শুধুমাত্র বাবার অসুস্থতার কথা শুনে । আর নইতো কিন্তু ও আসতো না।
—হুম আসবেই বা কেন!!?আমাকে তো আর মন থেকে ভালবাসে না যে আসবে। (কথাগুলি মনে মনে বলতে থাকে সৈকত)
—আর এমনতো না যে তুই মেঘ কে একবারের জন্যেও থাকতে বলেছিস।
তুই যদি একবার মুখ ফুটে ওকে থেকে যাবার কথা বলতিস তাহলে ও ঠিকই থেকে যেত।
—হুম থাকতো না ছাই।
—তুই কি জানিস ও ক্লিনিক থেকে চলে যাওয়ার আগে বার বার শুধু তোর দিকে তাকাচ্ছিল। তুই তো খেয়াল করিস নি।
আমি জানি তখন ওর মনের ভিতরটা কেমন হচ্ছিল।
—হ্যা তুমি তো সব জানো!!
—এই একদম রাগাবি না। তোরা ছেলেরা কি করেই বা বুঝবি একটা মেয়ে কতটা আশা ভরসা করে থাকে তোদের কাছে ।
বাবার বাড়ির সব কিছু ফেলে নতুন জায়গায় নতুন মানুষদের সাথে তাদের মত করে মানিয়ে নিয়ে চলতে শুরু করে । আর তোরা ছেলেরা শুধু ঘুরে ফিরে কষ্ট দিস। বিয়ের পরে একটা মেয়ের কাছে তার স্বামী হয়ে যায় সব । বলতে পারিস স্বামীকে ঘিরে গড়ে ওঠে তার পুরো জগৎ । স্বামীর খুশী, স্বামীর ভালবাসা পাওয়ার জন্য একটা মেয়ে সবকিছু করতে পারে। আর সেই স্বামী যখন কষ্ট দেয় তখন আর সেই মেয়ের বেচে থাকা আর না থাকা সমান হয়ে যায়।
রোজির কথা গুলো শুনে সৈকতের মেঘের সেই ডায়েরিটার কথা মনে পড়ে । সত্যিই তো মেঘের কত ইচ্ছা কত স্বপ্ন কত আশা ছিল তার স্বামীকে ঘিরে । আর আমি না জেনে না বুঝে মেঘকে শুধু কষ্টই দিয়েছি। একটা দিনের জন্য মেয়েটার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করিনি।
আর মেয়েটাও না কেমন!!কখনও মুখ ফুটে কিছু বলতে চাই না।আমার দেওয়া সব কষ্ট গুলি নিজের ভিতরে কি সুন্দর করে যত্নে লালন করছে।
একটি বারের জন্য অন্যে কাউকে কিচ্ছু বলেনি। এমনকি মেঘের আম্মু পর্যন্ত কথা গুলি জানেনা মনে হয় ।
—কিরে কি ভাবছিস!!!আমার কথা কিছু শুনতে পাচ্ছিস?
রোজির কথাই মৌনতা ভাঙ্গে সৈকতের ।
—হ্যা ভাবি শুনছি বলো ।
—শুনেছিস যখন তখন ভাল। আমি বা আমরা তোর আর কোন কথাই শুনতে চাইনা । তুই আজ এবং তাও এখন নাস্তা শেষ করে সোজা মেঘদের বাসায় যাবি । তারপর কিছুক্ষণ থেকে মেঘকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে আসবি।
আমি মেঘকে ফোন করে দিচ্ছি যেন গুছিয়ে থাকে ।
—না ভাবি, আজ না। আজ আমার একটা জরুরী কাজ আছে । পরে সময় করে কোন একসময় নিয়ে আসবো ।
—তার মানে তুই যাবি না??এতক্ষন ধরে তাহলে তোকে কি বুঝালাম??
—প্লিজ ভাবি একটু বোঝার চেষ্টা করো।
আজ আমার একটা জরুরী কাজ আছে ।
—কি এমন কাজ যেটা বউয়ের থেকেও জরুরী !!?
সৈকত নাস্তা শেষ করে উঠে দাঁড়ায় ।
হঠাৎ ঝিনুক বলে ভাইয়া তুই কিন্তু ভুল করছিস। আমি জানি তোর জরুরী কাজটা কি। কিন্তু মনে রাখিস এখন যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিস সেই এক সময় --------
ঝিনুকের কথা শুনে বাকিরা সবাই একটু অবাক হয়ে যায় ।
ঝিনুকের কাছে আসল ঘটনা জানতে চাইলে ঝিনুক কোন কথা না বলে উঠে চলে যায় ।
রোজি সৈকতের কাছে জানতে চাই কি হয়েছে??ঝিনুক এমন কথা কেন বললো??তুই কাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিস তোর লাইফে !!?
সৈকত মুচকি হেসে বলে ভাবি ছাড়োতো এসব। ঝিনুক ছোট মানুষ ও কি বুঝে না বুঝে কথা গুলো বললো আর তোমরা সে কথা নিয়ে পড়ে আছো। আমার অফিসে যাওয়ার দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাকে যেতে হবে ।
সৈকত রেডি হয়ে দরজা পর্যন্ত পৌছাতেই দারোয়ান এসে সৈকতের সামনে দাঁড়ায় ।
—কি হয়েছে ?কিছু বলবেন??
—ছোট সাহেব একটা লোক এসে এই জিনিসটা তাড়াতাড়ি করে আপনেরে দিতে কইলেন।
—কি জিনিস বলে সৈকত হাত বাড়ায় ।
আরে এটাতো একটা পেনড্রাইভ!!
কে দিল??কি আছে এতে?
—তা তো কইতে পারিনা সাহেব।
—সে লোকটা কোথায়??
—তিনিতো জিনিসটা দিয়েই অনেক আগেই চইল্লা গেছে । তবে জিনিসটা দিয়ে কইলো আপনার কাজে লাগবো।
—আচ্ছা ঠিক আছে আপনি যান।
দারোয়ান চলে যেতেই সৈকত পেনড্রাইভটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে। তারপর হল রুমের একটা সোফাই বসে ব্যাগ থেকে ল্যাপটপটা বের করে অন করে ।
পেনড্রাইভটা ল্যাপটপে দিতেই একটা ফ্লোডার দেখতে পাই( সুইটি ক্রাইম)।
ফ্লোডারের নামটা দেখেই সৈকতের মনে একটা ধাক্কা লাগে ।
এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে ল্যাপটপটা অফ করে নিজের রুমে চলে যায় ।
রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে ফ্লোডার টি ওপেন করতেই একটা ভিডিও ফ্লোডার আর একটা ছবির ফ্লোডার ভেসে ওঠে ।
সৈকত ভিডিও ফ্লোডার টা ক্লিক করতেই
মনে হচ্ছে সুইটির অজান্তে ওর সামনে বসে
কেউ একজন গোপন ক্যামেরায় ভিডিওটা করেছে। যে ভিডিওটা করেছে তাকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু কথা শোনা যাচ্ছে।
—আরে এতদিন পর তুমি কি মনে করে ?(সুইটি)
—কেন এসে মনে হচ্ছে বিরক্ত করলাম। (অগান্তুক)
—তুমি আর বিরক্ত!!?
—তাহলে!!?
—কি বলতে এসেছো সেটা বলো?
—সুইটি প্লিজ ফিরে চলো । কেন এমন করছো ??তুমিতো জানো আমি তোমাকে এখনও ভালবাসি??
—তুমি সেই আগের মতোই আছো রাজু সেই বোকাটাইপের।
সুইটির মুখে নামটা শুনে বুঝা যাচ্ছে যে লোকটা সুইটির সামনে বসে ভিডিওটা করছে তার নাম রাজু।
—হ্যা আমি সেই বোকা টাইপেরই আছি।
—এই জন্যইতো তোমার সঙ্গে আমার যায় না। কোথায় তুমি আর কোথায় আমি??
একবার নিজের দিকে তাকাও আর আমার দিকে তাকাও।
—তুমি যে পথটা বেছে নিয়েছ সেটা ভুল পথ। প্লিজ ফিরে চলো আমার সঙ্গে।
—ভুল!কিসের ভুল? আমার টাকা চাই শুধু টাকা। দিতে পারবে!!?যদি পারো তাহলে যাবো।
—তুমি টাকার নেশায় পাগল হয়ে গেছ।
—হ্যা আমি পাগল হয়ে গেছি । দেখ দেখ এখন আমার কত টাকা বলেই পাশ থেকে ব্যাগটা টেনে বিছানার উপর ঢেলে দেয় ।
—এত টাকা তোমার কাছে কি করে এলো!কে দিল??
—হা হা হা। টাকা কেউ দেয় না। আদায় করে নিতে হয় বুদ্ধি খাটিয়ে ।
—মানে?
—মানে খুব সহজ। তুমি রায়হান চৌধুরীকে চিনো?
—কোন রায়হান চৌধুরী?
—নেতা।
—হ্যাঁ । কেন
—এই টাকা গুলি তার ছেলের কাছ থেকে ফাঁদে ফেলে আদায় করেছি। আরো করবো। আস্তে আস্তে শুধু ডিমান্ড বাড়বে।
—কি বলছো তুমি!!?কি করেছ তুমি তার সাথে??
—তোমার শুনে কি লাভ!?তোমাকে তো বলেছিলাম আমার সঙ্গে থাকতে কিন্তু তুমি কি করলে !!?আসলে তুমি না থেকেই ভালই হয়েছে । তোমার মত নির্বোধ,বোকা আর এরাকম সহজ সরল সত্যবাদী মানুষ থাকলে আমারই সমস্যা হতো ।
—কি করেছ তুমি যার জন্য তোমাকে এতগুলি টাকা দিল?
—কিছুই করিনি। আবার অনেক কিছু করেছি।
—যেমন?
—আজ তোমার কি হয়েছে যে আমার কাজ জানতে চাইছো??এতদিন তো ঘৃনায় মুখ ও দেখতে না। আজ হঠাৎ কি এমন হলো?
—আসলে তেমন কিছু না সুইটি। আমি অনেক ভেবে দেখেছি আমি তোমাকে ভালবাসি আর তুমি টাকা কে। তুমি যেমন টাকার নেশা ছাড়তে পারছো না ঠিক তেমনি আমিও তোমাকে ছাড়তে পারছিনা। তাই ভাবলাম দুজনের কেউ এক জনকে তো কমপ্রোমাইজ করতেই হবে ।
—যদি কমপ্রোমাইজ তুমি করতে চাও তাহলে ঠিক আছে । আর যদি আমাকে করতে বলো তাহলে বলবো দরজা খোলা আছে যেতে পারো।
—রেগে যাচ্ছো কেন। ভালবাসার জন্য এটুকু ছাড় না হয় আমিই দিলাম।
—হা হা হা। খুবই ভাল সংবাদ । তাহলে তুমি একটু বসো আমি একটু কিছু নিয়ে আসি। আজ দুজন মিলে অনেক আড্ডা দিব।
—এখন না সুইট হার্ট । আজ আমার অনেক কাজ। আগে তোমার গল্প টা শেষ করো ।
—কি কাজ(বিরক্তি নিয়ে)।
—তুমি তো জানো বাবা মা এখন আর কেউ তোমাকে মন থেকে মানতে পারবে না। তাই ভাবছি এখন থেকে আমি তোমার কাছে থাকবো ।
— ওয়্যাও গ্রেট!!এই না হলে------
এখন আমি খুব খুশী এতদিনে তাহলে তোমার সুবুদ্ধি হয়েছে। আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম আর তুমি!!?
—আচ্ছা এসব বাদ দাও এখন বলো তারপর কি হলো ?নেতার ছেলেকে কিভাবে ফাসালে ?
—আসলে তেমন কিছুই না। শুধু ড্রিংকসের ভিতরে কয়েকটা ঘুমের ঔষুধ দিয়ে আমার বেড পর্যন্ত নিয়েছিলাম।
—তার মানে তুমি তার সঙ্গে রাত কাটিয়েছ?OMG!!
—আরে না ,তুমি যা ভাবছো তার কিছুই হয়নি। শুধু শুধু সন্দেহ করছো। শোন সুইটি টাকার লোভি হতে পারে কিন্তু চরিত্রহীনা নয়। আসলে সেদিন সৈকত আর আমি অফিসের একটা কাজে বাইরে গিয়েছিলাম । তারপর যে দিন কাজ শেষ হলো সেদিনই আমাদের ফেরার কথা ছিল। কিন্তু আমি আগে থেকেই প্লান করে রেখেছিলাম যে সৈকতকে যেকোন ভাবেই একটা রাত রাখতে পারলেই আমার ফাদে সে পা দিবে ।
—এত না জটিল করে সোজা করে বলো।
—আসলে সেদিন রাতে ড্রিংকে ঘুমের ওষুধ দেওয়ার পর যখন সৈকত প্রায় ঘুমিয়ে যাচ্ছিল ঠিক তখনই আমি ওকে ওর রুম থেকে ধরে আমার রুমে নিয়ে আসি। তারপর আগে থেকে রুমে রাখা গোপন ক্যামেরায় আমি সৈকতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কিছু ছবি তুলি । তারপর সারারাত সৈকত ঘুমিয়ে ছিল আর আমি ওর ঘুম ভাঙ্গার আগে ওর কাছে গিয়ে এমন ভাবে শুইয়ে ছিলাম যাতে সৈকত ঘুম ভেঙ্গে বুঝতে পারে যে-------
—তারপর কি হলো??
—তারপর আর কি যা হবার ছিল তাই হলো। আমার প্লানটাই সাকসেস হলো।
—উনি এত সহজে সব মেনে নিলেন??
—না প্রথমে মানতে চাইনি তারপর একটু ইমোশনাল ব্লাকমেইল করতে হলো।
আর সৈকত তো আমার সম্পর্কে ভাল করে জানেই না। আমি যা বলি সেটাই বিশ্বাস করে । গাধা টাইপের একটা নিজের বুদ্ধি খাটায় না। ওর বাবা যতটা বুদ্ধিমান সে অনুযায়ী ছেলের এক রতিও বুদ্ধি নেই।
—সে তো তোমাকে তার বন্ধু ভাবে বলেই বিশ্বাস করে । যদি কখনও তোমার আসল রুপটা তার সামনে চলে আসে তখন কি করবে??
—বুঝিয়ে দেব অন্যে কিছু বলে ।
সৈকত সম্পূর্ণ ভিডিওটা না দেখেই ল্যাপটপটা রাগে বন্ধ করে দেয় ।
কি দেখলো সে এতক্ষন যাকে সে এতদিন বন্ধু ভেবে সব রকম সাহায্যে সহযোগিতা করছে । সুখে-দুঃখে পাশে থেকেছে আর সেই কিনা!!?
ছিঃছিঃ
এত দিন ওর ঐ ভাল মানুষী মুখোশের পিছনে যে এতটা বিদঘুটে আর বিশ্রী মন মানসিকতার মুখটি লুকিয়ে ছিল তা ভাবতেই আজ সৈকতের কষ্ট হচ্ছে।
ইচ্ছে করছে সুইটিকে কাছে পেলে ----
আসলেই আমি একটা গাধা।
নিজেকে নিজেই গালি দেয় মনে মনে।
আমার আশে পাশে থাকা মানুষ গুল
সবাই বুঝতে পেরেছিল মেয়েটি ভাল না আর আমি!!!???
এই শীতেও রাগে সৈকতের শরীর গরম হয়ে যেতে লাগলো ।
তাড়াতাড়ি করে কোর্ট টা খুলে এসি টা চালু করে বিছানায় বসে মাথা নিচু করে ভাবতে লাগলো ।
কি করা যায় এখন??
মেঘের কথা খুব মনে পড়ছে। এই মুহূর্তে মেঘ পাশে থাকলে খুব ভাল হতো । এই মেয়েটা কি করে যে এত কিছু বুঝতে পারে কে জানে!!?
বাবা আর ঝিনুকের পরে মেঘই তো আমাকে সেদিন ক্লিনিকে সুইটির কথা বলে সাবধান করে দিয়ে ছিল।
তারপরও আমি-----
সৈকতের এ মুহূর্তে ইচ্ছা করছে মেঘের সঙ্গে কথা বলতে ।
কি করে কথা বলবে তার তো মোবাইল নেই।
মোবাইলের কথা মনে হতেই মনে পড়লো মেঘ যে ফোনটা সৈকত কে গিফট করেছিল সেটার কথা।
সৈকত তাড়াতাড়ি করে আলমারি খুলে ফোনটা বের করে ।
আগের দিন অফিস থেকে ফিরে সৈকত মেঘের হাতে ফোনটা তুলে দিয়েছিল।
আর সেটা মেঘ যত্ন করে সৈকতের আলমারি তে রেখে ছিল।
ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে বন্ধ তারমানে চার্জ নেই।
থাকবেই বা কি করে এতদিন তো এমনিতেই পড়ে ছিল।
সৈকত তাড়াতাড়ি করে চার্জারটা বের করে ফোন চার্জে লাগিয়ে ফোনটা অন করে ।
ভাগ্যিস রিসিভ কলে নম্বরটা এখনো আছে ।
সৈকত নম্বরটা ডায়াল করতেই মেঘের নম্বরটা সুইচ অফ বলে।
সৈকতের মনটাই খারাপ হয়ে যায়।
কত আশা নিয়ে আজ ফোনটা ধরল আর সেটি কোন কাজেই আসছে না।
৩০.
সৈকত তাড়াতাড়ি করে ল্যাপটপ পেনড্রাইভ আর মেঘের দেওয়া ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ।
গাড়ি ড্রাইভ করে আর ভাবে আগে একবার থানায় যাওয়ার দরকার রাতে তো সুইটির কুকর্ম না জেনে রাকিবকে বলে ছিলাম উকিল দিয়ে জামিনে বের করে নিয়ে আসতে । কিন্তু এখন সব জেনেশুনে এটা আমি হতে দিতে পারি না।
সৈকত ফোনটা গাড়িতে চার্জে বসিয়ে বার বার মেঘের নম্বরে ট্রাই করছে কিন্তু যতবার কল করছে ততোবারই বলছে সুইচ অফ।
মেঘের উপর মনে মনে খুব রাগ হতে শুরু করে সৈকতের । এই ভেবে যে আগে যখন এ বাড়িতে ছিল সব সময় মেঘ তার
সাইরেনটা সঙ্গে নিয়ে বেড়াত কখন কে কল করছে সব দেখত আর আজ আমি যখন কল করছি এখন নিশ্চয় কোথাও পড়ে আছে । এখন আর সাইরেন নামক যন্ত্রটা বোধহয় আর সঙ্গে রাখে না।
দেখতে দেখতে থানার সামনে এসে গাড়ি থামায় সৈকত।
গাড়ি থেকে নামার আগে একটু ভেবে নেয় যদি পুলিশ তাকে আবার উল্টো জেরা করে যে কি সম্পর্ক আমার এরাকম একটা মেয়ের সাথে তাহলে কি বলবো??
কিছু একটা ভেবে গাড়ি থেকে নেমে সোজা থানার মধ্যে ঢুকে সৈকত।
সৈকত কে দেখেই সবাই স্যালুট দেয়। তারপর পুলিশ কর্মকর্তা তাড়াতাড়ি করে জানতে চাই কি ব্যাপার স্যার আপনি এখানে?
এত কষ্ট করে এখানে আসার কি দরকার ছিল একটা ফোন করতেন আমি আপনার কাছে যেতাম।
সৈকত মুচকি হেসে বলে থাক সেসবের কোন দরকার নেই ।
আসলে আমি একটা কাজে এসেছি
—বলুন স্যার কি করতে পারি আপনার জন্য?
—আমার ম্যানেজার বলছিল আপনারা নাকি আমার অফিসের একটা মেয়েকে এরেস্ট করেছেন তার ব্যপারে ।
—জ্বি স্যার ,সুইটি আসলে তার নামে অনেক গুলো ব্লাকমেইল চিটিংয়ের কেস আছে। এতদিন আমাদের হাতে কোন প্রমান ছিল না তাই তার বিরূদ্ধে কোন রকম ব্যবস্থা নিতে পারি নি । কিন্তু গতকাল কেউ একজন প্রমান গুলো জোগাড় করে আমাদের ফোন করে তাই আমরা এই মেয়েটাকে প্রমানের ভিত্তিতে এরেস্ট করতে পেরেছি।
—আমি কি একটু দেখা করতে পারি?
—হ্যা স্যার অবশ্যই । চলুন আমার সঙ্গে।
—আপনাকে যেতে হবে না ,আমি তার সঙ্গে কিছুক্ষণ একা কথা বলতে চাই।
—ওকে স্যার ,তাহলে আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি।
—ঠিক আছে।
পুলিশ অফিসার ও অন্যেরা কিছু সময়ের জন্য বাইরে যায় ।
সৈকত ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সুইটির দিকে ।
—কেমন আছো সুইটি?
—সৈকত তুমি!আমি জানতাম তুমি আসবে । আমাকে এখান থেকে বের করো সৈকত । এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
—কেন করলে এসব??
—আমি কিছু করিনি বিশ্বাস করো ,সত্যিই আমি কিছু করিনি। আমাকে ফাসানো হচ্ছে। তুমি তো জানোই সব।
—আর কত মিথ্যা বলবে আমাকে??আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। আর তুমি আমার সেই বিশ্বাস টাকে পুজি করেই আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে??
—সৈকত তুমিও আমাকে ভুল বুঝতেছ।
—চুপ আর কথা বলোনা তুমি। আমি তোমাকে বন্ধু মনে করে তোমার পাশে দাড়িয়েছিলাম আর তুমি!!!ছিঃ
আমার ভাবতেও ঘৃণা করছে যে তোমার মতো একটা মেয়েকে আমি বন্ধু রুপে গ্রহণ করেছিলাম। এতো লোভ তোমার এত টাকার নেশা!!? তুমি এতটা নীচে নামতে পারো শুধুমাত্র টাকার জন্য তা ভাবতেও আমার ঘৃণা হচ্ছে।
সুইটি কি বলবে আর কিছু বুঝতে পারছে না। সৈকত কি তাহলে সবটাই জেনে গেছে !!!লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকে সুইটি । চোখ দিয়ে পানি ঝরে । নিজের কৃত কর্মের জন্য আজ তার এ অবস্থা।
শাস্তি তো তাকে পেতেই হবে ।
সৈকত একটু থেমে বলেঃ
—আর কত টাকা চাই তোমার??
বলো আজ যা চাইবে তাই দিব। তবে এখান থেকে তুমি আর কখনও বের হতে পারবেনা। এই নাও ব্লান্ক চেক তোমার ইচ্ছা মত সংখ্যা বসিয়ে নিও। তবে মনে রেখ তোমার এই লোভের জগতে তুমি শুধু একা। আর কেউ নেই তোমার পাশে । এই এখানে তোমাকে দিনের পর দিন মাসের পর মাস একা কাটাতে হবে । তোমার চারিদিকে এখন শুধুই অন্ধকার । তুমি একবারের জন্য তোমার বাবা মার কথা ভাবলে না যে তারা যখন সত্যিটা জানতে পারবে তখন তাদের মনের অবস্থা কেমন হবে ??
সৈকত আর কথা না বাড়িয়ে চলে আসে ।
বাইরে এসে দেখে সৈকতের নিজস্ব আইনজীবী আর রাকিব দাড়িয়ে আছে ।
সৈকতকে দেখেই রাকিব একটা কাগজ হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে ।
—স্যার এই যে সুইটি কি জামিনে বের করার জন্য কাগজ গুলো রেডি করা হয়েছে। এখন শুধু জমা দিলে হবে ।
সৈকত কোন কথা বলছে না। রাগে থমথম করছে । সৈকত কাগজ গুলো নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায় ।
রাকিব কাগজ গুলো দেওয়ার সাথেই সৈকত কাগজ গুলো নিয়ে এক মুহূর্ত দেরি না করে সব টেনে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে ।
রাকিব সৈকতের এমন আচারনে অবাক হয়ে যায় ।
যেই বলে স্যার এটা কি করছেন ??
সৈকত হাত উচু করে থামতে বলে ।
রাকিব বুঝে যায় সৈকত কি বলতে চাইছে ।
রাকিব আর কথা না বলে সরি বলে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে বেয়িয়ে পড়ে ।
সৈকতের অবস্থা আর কেউ কোন কথা বলতে সাহস পাইনা।
সৈকত থানা থেকে বেরিয়ে সোজা গাড়িতে উঠে বসে উদ্দেশ্য মেঘ।
মেঘের বাড়ির সামনে গাড়ি থামাতেই মেঘের আম্মু এগিয়ে আসে ।
সৈকত কে এভাবে হঠাৎ না বলে আসতে দেখে মেঘের আম্মু খুব অবাক হয়ে যায় ।
—সৈকত বাবা তুমি!!!কেমন আছো ?
—জ্বী আমি ভাল আছি । আপনারা কেমন আছেন?
—ভাল আছি। চলো ভিতরে চলো ।
সৈকত তার শ্বাশুড়ীকে অনুসরণ করে ভিতরে প্রবেশ করে ।
মেঘের আম্মু সৈকত কে বসতে দিয়ে তাড়াতাড়ি করে নাস্তার ব্যবস্থা করতে যায়। জামাই যে তার হুট করে এভাবে চলে আসবে ভাবতেও পারেনি।
সৈকত বসে আছে আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। বিয়ের দিন হুপ করে এসে মেঘকে বিয়ে করে নিয়ে চলে গিয়েছিল। তারপর তো সৈকত এর আগে আসে নি । তাই সব কিছু ভাল করে চিনতে পারছে না। সৈকত এদিক ওদিক তাকিয়ে মেঘ কে খুজতে থাকে। কিন্তু বাড়ি এতটাই শান্ত পরিবেশ হয়ে আছে যে মনে হচ্ছে না তৃতীয় আর কেউ বাসায় আছে।
হঠাৎ মেঘের আম্মু ট্রে ভর্তি নাস্তা এনে সৈকতের সামনে দিয়ে বললো নাও বাবা কিছু মুখে দাও।
সৈকত মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল এখন কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না । আমি বাসা থেকে খেয়েই বেরিয়েছি তারপরও আপনি যখন বলছেন বলে হালকা কিছু নিল।
—তোমার আব্বু এখন কেমন আছে?
—জ্বী আলহামদুল্লিলাহ ভাল আছে।
—আর বাকি সবাই?
—সবাই ভালো আছে। কাউকে বাসায় দেখছি না ,আব্বু (শ্বশুর)তো অফিসে তাই না?
—হ্যা তোমার শ্বশুর অফিসে । আর ----
বলতে না বলতেই ফোনটা বেজে ওঠে
তুমি বসো আমি কথা বলে আসি।
সৈকত ঘাড় নেড়ে হ্যা বলে।
সৈকতের আর দেরি সহ্য হচ্ছে না। কখন থেকে বসে আছে অথচ তারই দেখা পাচ্ছে না। এত কষ্ট করে এতদূর থেকে এসে কি হলো !!?অভিমানীর মুখটাই এখনো পর্যন্ত দেখা গেল না।
সৈকতের অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে মেঘকে দেখার জন্য । মনটা আকু বুকু করছে কখন চোখে দেখবে তার প্রিয় মুখটা।
সৈকত উঠে দাঁড়ায় ধীর পায়ে বাড়ির ভিতরের এদিক ওদিক তাকাতে থাকে ।
মনে মনে ভাবছে মেঘ মনে হয় তার রুমেই আছে । কিন্তু এ বাড়িতে মেঘের রুম কোনটা সেটাই তো সে জানেনা।
কেউ নেই যে তার কাছে জিঙ্গাসা করবে।
সৈকত মনে সাহস নিয়ে মেঘের রুমটা খুজতে থাকে একটা রুম থেকে হালকা শব্দে গানের কন্ঠ ভেসে আসছে ।
সৈকত সেই রুমের দিকে এগিয়ে যায় আস্তে আস্তে।
বাতাসে দরজার পর্দা দুলছে সৈকত তাকিয়ে দেখে দেওয়ালে মেঘের ছবি ঝুলছে । ছবিটা দেখে সৈকত মনে মনে নিশ্চিত হয় এটাই মেঘের রুম।
সৈকত রুমে ঢুকে দেখে রুমটা খালি । সাইন্ড বক্সে গান বাজছে ।
হঠাৎ মেঘের আম্মু এসে বলে তুমি এখানে আর আমি তোমাকে---
দেখেছ মেঘের কান্ড !বলে সাইন্ড বক্সটা অফ করে দেয় ।
সৈকত লজ্জা ভেঙ্গে জিঙ্গাসা করেঃ
—মেঘ কোথায় ওকে তো কোথাও দেখছি না।
—ওহ!কথাই কথাই তোমাকে তো বলতে ভুলেই গেলাম রাজু আর মেঘ তো আজ কক্সবাজার গেল ওর কলেজের বন্ধু বান্ধবীদের সাথে। মেঘ প্রথমে যেতে চাইনি একা তারপর আমি রাজুকে বলে ওর সঙ্গে পাঠিয়েছি।
—কিহ!!?ওহ শীট। কখন??
—এইতো ওরাও বের হলো তুমিও আসলে । এই যে কেবল রাজু ফোন করেছিল মেঘের ফোনটা নিতে নাকি মনে নেই।
—রাজু নামটা শুনে সৈকতের সকালের সেই ভিডিও টার কথা মনে পড়ে । এই রাজু সেই রাজু নইতো!!ধূর এখন ওসব ভাবার সময় নেই । এতক্ষন মেঘদের গাড়ি হয়তো বেশী দূরে যায় নি । আমাকে ও এখনি যেতে হবে।
সৈকত কে চুপ থাকতে দেখে মেঘের আম্মু
মনে করে মেঘের যাওয়ার কথা শুনে সৈকত মনে হয় রাগ করেছে ।
—তুমি রাগ করো না বাবা। মেঘ আর তোমার মধ্যে কিছ হয়েছে কিনা আমি জানিনা। আর জানতেও চাই না । তবে এটুকু বলবো মেয়েটা আমার এখানে আসার পর থেকে কেমন জানি হয়ে গেছে । সারাক্ষন মন খারাপ করে থাকে । হাসে না ,খুব কম কথা বলে । সারাক্ষন নিজের রুমে বসে থাকে কি যেন ভাবে ।
তাই গতকাল ওর বন্ধুরা এসে যখন মেঘকে ওদের সঙ্গে যেতে বললো আমি আর তোমার শ্বশুর মেঘকে জোর করে রাজী করিয়েছি। তুমি মেয়েটাকে ভুল বুঝনা।
—না এতে ভুল বোঝার কি আছে । আপনি এক কাজ করুন আপনি মেঘের মোবাইলটা আমার কাছে দিন । আমি নিয়ে যাচ্ছি। আর রাজু ভাইয়ার ফোন নম্বর টা দিন । আমি যোগাযোগ করে নিব।
মেঘের আম্মু সৈকতের কথা শুনে খুব খুশী হয় ।
—তুমি যাবে বাবা ??
—হ্যা যাবো ।
—তুমি দাড়াও আমি এখনি মেঘের মোবাইল আনছি।
—আচ্ছা।
সৈকত মোবাইল নিয়ে তাড়াতাড়ি করে বের হতেই ডান পাশের রুমে চোখ পড়ে
একটা ছবি তে মনে হল সুইটির মত কাউকে দেখতে -------------
(চলবে)
৯ম পর্বের লিংক
https://www.facebook.com/groups/628271060543805/permalink/3317579888279562/

ছোট গল্প - ঘুরে দাঁড়ানো।
দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন আমি একবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম।' মেয়েটির কথায় চমকে উঠলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম,
-আপনি?
'জি।' বলেই মেয়েটি একটা অদ্ভুত হাসি দিলো। আত্মহত্যা করতে চাওয়ার অনেক কারণ হতে পারে। প্রথমত ফ্যামিলির চাপে। দ্বিতীয়ত রিলেশনে ব্রেকআপ হলে। অবশ্য আত্মহত্যা করার আরো অনেক কারণ আছে।
মেয়েটির দিকে আরেকবার ভালো করে তাকালাম। নাহ! বয়সে আমার চেয়ে বড় হবে। বিয়েও হয়েছে দেখা যাচ্ছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- কারণ?
'ধর্ষণের শিকার হয়েছিলাম।'
এইবার বেশ অবাক হলাম। খবরের কাগজে গতকাল ঘটে যাওয়া গণধর্ষণের পৃষ্ঠাটা দেখছিলাম। পাশের সিটে বসা মেয়েটি হুট করেই আমার সাথে কথা বলতে শুরু করলো। উনাকে ভালো করে দেখিনি বলেই পড়ছিলাম। নাহয় পড়তাম না।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
- বলেন কী! আপনি কেস করেন নি?
মেয়েটি এইবার মুচকি হাসলো। তারপর বলল,
'আর কেস! ঘটনাটা শুনবেন? বেশ অবাক হবেন কিন্তু।'
আমি কিছুক্ষণ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম,
- আপনার যদি বলতে অসুবিধা না হয় তবে আমার শুনতে অসুবিধা নেই আপু। আমাদের শহরে পৌঁছতে পৌঁছতে আরো অনেক সময় লাগবে।
মেয়েটি আরেকবার মুচকি হেঁসে বলল,
'আচ্ছা ভাই, শুনো তবে।
আমার বাড়ি হচ্ছে গ্রামে। বাবা কৃষক, ক্ষেতে কাজ করেন। মা ঘরে থাকে। আমি বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। বাবার ইচ্ছে ছিলো আমাকে ডাক্তার বানাবে। গ্রামে তখন তেমন ভালো ডাক্তার ছিলো না। তাই বাবার স্বপ্ন তার মেয়ে অনেক বড় ডাক্তার হবে আর গ্রামের মানুষের সেবা করবে।
আমি পড়ালেখায় খুব ভালো ছিলাম। স্কুলে রোল এক সেই প্রথম শ্রেণী থেকে আমিই হয়ে আসছিলাম। এমন করতে করতে ক্লাস নাইনে উঠে গেলাম। বাবার স্বপ্ন তার সাথে স্কুল স্যারদের কথায় সাইন্স নিই।
ক্লাস নাইন আমার বেশ ভালোভাবেই কাটে। কোনো বিষয়ে আঁটকে গেলে স্যারদের সাহায্য নিতাম।
ক্লাস টেন এর শেষের দিকে, মানে ফাইনাল এক্সামের আগে স্যাররা বলেছিলেন বাসায় একটা স্যার রাখার যেন ব্যবস্থা করি। এতে করে আমার রেজাল্ট আরো ভালো হবে।
তখন গ্রামে তেমন শিক্ষিত লোক নেই। পাশের গ্রামের সাজ্জাদ নামের এক ছেলে ছিলো। কীভাবে যেন সে বাবার থেকে আমার যে বাসায় স্যারের দরকার তা জেনে যায়। সে ও ফিজিক্স নিয়ে পড়ছিলো তখন। শেষমেশ বাবার সাথে তার কথা হয় সন্ধ্যা থেকে আমাকে সে পড়াবে।
কথামতো পড়াতে শুরু করলো। পনেরো দিন যেতে না যেতেই সে আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। আমি এই কথা কাউকে বলতেও পারছিলাম না আর সইতেও না। কোনোভাবে বাবা বা মা কাউকে বলার তেমন সাহস হয়নি।
এই সুযোগে সে একদিন তার নোংরা মন মানসিকতার পরিচয় দেয়। জোর করে আমাকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে।'
মেয়েটির চোখ দিয়ে জল পড়তে শুরু করেছে। কেমন যেন আমারো খারাপ লাগতে শুরু করেছে। একটি মেয়ের চোখে জল দেখলে কার খারাপ লাগবে না!
আমি কিছু বলতে যাবো তখন আবার বলতে শুরু করলো।
'সেইদিন আমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বিবেক আমাকে তা করতে দেয়নি। বাবা মায়ের সাথে কথাটা তিন চারদিন পরে শেয়ার করলে তারা আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদে। আমাকে বেঁচে থাকার সাহস জোগায়। তারপর থেকে আর সেই অমানুষের চেহারা দেখিনি। তারপর অনেক বছর কেটে যায়। জানো ভাই! আমি বাবা মায়ের স্বপ্ন পুরোন করেছি।
আজ আমি অনেক বড় ডাক্তার। তারপরও আমি সপ্তাহে দুইদিন গ্রামের মানুষদের ফ্রী তে চিকিৎসা করি।
আমি আটকে দিয়ে বললাম,
- আপনারা কী তখন আইনের সহায়তা নেননি?
উনি হেঁসে বলল,
'নাহ। তখন এসব লজ্জাজনক ব্যাপার বলে বাবা মা আর কিছুই করতে সাহস করে নি। তার উপর আমরা গরীব ছিলাম। ওই লোকটার শেষ খবর শুনবে?'
আমি তাড়াতাড়ি বললাম,
- জি, অবশ্যই।
আপুটা মুচকি হেঁসে বললেন,
'আমি যখন ইন্টারে পড়ছি তখন তাকে কয়েকজন লোক কুপিয়ে হত্যা করে চুরি করেছে বলে। অথচ সে কিছুই চুরি করেনি। গ্রামের মানুষ সহজ সরল। তাদের একটু লজ্জা শরম বেশি। কোনো এক মেয়েকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করাতে তাকে ছুরি দিয়ে ছিন্ন বিন্ন করে দিয়েছিলো। কিন্তু লোকসমাজে বলেছিলো চুরি করতে গিয়ে খুন হয়েছে।'
আমি অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম আপু টির দিকে। তার চোখে মুখে এখন খুশির জোয়ার দেখতে পাচ্ছি। যেন এক সমুদ্র সুখ তিনি অনুভব করছেন। তিনি আমার সামনে দিয়ে বাস থেকে নেমে চলে গেলেন।
যাওয়ার সময় বললেন,
'ভালো থেকো ভাই। জানি না কথাগুলো কেন বললাম। তুমি যে লেখক তা আমি জানি। আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ইচ্ছে করলে লিখতে পারো। ধর্ষিত মেয়েরা হয়তো সাহস পাবে এবং আত্মহত্যার পথে না গিয়ে আমার মতো বাবা মায়ের কথা ভেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবে।
চললাম, কোনো একসময় আবার দেখা হবে।'
~ছোট গল্প - ঘুরে দাঁড়ানো।
~লেখা - মোহাম্মদ নুরুল আজিম চয়ন।

কয়েকটি খুন ও কালো মুখোশ
-মারুফ হুসাইন
৯.
আলিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ধর্ম শিক্ষক চাকরী ছেড়ে চলে গেছেন। স্কুলে নতুন শিক্ষকের প্রয়োজন। কমিটি মিটিংয়ে মতিন মেম্বার শামসুদ্দিনকে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব উঠালেন৷ শামসুদ্দিন ইয়ং জেনারেশনের ছেলে৷ তার পড়াশুনা শুধু আরবির উপরই নয়৷ জেনারাল লাইনেও পড়াশুনা আছে। তাই নতুন শিক্ষক আসা পর্যন্ত তার থেকে ভালো অপশন আর নেই৷ স্কুল কমিটির সদস্যারাও তার সাথে একাগ্রতা প্রকাশ করলেন। সবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে শামসুদ্দিনকেই আপাদত ধর্ম শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে।
আসরের নামাজ শেষে মতিন মেম্বারসহ মাসজিদ কমিটির আরো দুয়েকজন সদস্য মিলে শামসুদ্দিনকে প্রস্তাব দিলেন৷ সে এই প্রস্তাবে রাজি হতে না চাইলেও মাসজিদ কমিটির সদস্যদের অনুরোধে রাজি না হয়ে উপায় ছিলো না৷ তাই সে রাজি হয়ে গেলো৷ আগামিকাল থেকেই তার জয়েন করতে হবে৷
কলিং বেলের আওয়াজে তায়েফের ঘুম ভাংলো। চোখ ঢলতে ঢলতে গেট খুলে দিয়েই সে অবাক হয়ে যায়। সামনে অপর্ণা দাঁড়িয়ে আছে৷ সে চোখ ঢলতে লাগলো৷ 'ঠিকই দেখতেসেন৷' বলে অপর্ণা ভিতরে ঢুকে যায়৷ চারিদিকে চোখ বুলিয়ে সে ঘর দেখতে থাকে। তায়েফ গেট লক করে তার পিছু পিছু এসে বলল, 'আপনি আমার বাসার ঠিকানা পেলেন কোথায়?'
'কাল এক পিচ্চিকে দিয়ে আপনাকে ফলো করিয়েছিলাম।'
'ঠিকানা চেয়ে রাখলেই পারতেন। এতো কষ্ট করানোর কি দরকার ছিলো৷ যদি আমি সরাসরি বাসায় না আসতাম তাহলে তো বেচারা বিপদে পরে যেতো।'
'আচ্ছা বাদ দিন ও কথা।' বলে অপর্ণা ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলো, 'এই নিন! এই নিউজটা দেখেন। আপনার শোয়ের জন্য নতুন কেস খোঁজ করছিলেন। আমার মনে হয়, এটা বেস্ট হবে।'
তায়েফ মোবাইলটা নিয়ে নিউজটা পড়লো। একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে আলিপুরের খুনগুলো নিয়ে বিস্তারিত লেখা হয়েছে৷
'খুনি এখনো ধরা পড়েনি। ইন্টারেস্টিং একটা কেস। পরবর্তী শো'টা এই কেস দ্বারা সাজাতে পারলে অমায়িক একটা কাজ হবে।' অপর্ণা ততক্ষণে একটা চেয়ারে টেনে বসে পরেছে। তার সামনেই তায়েফ দাঁড়িয়ে আছে। সে মোবাইলটা অপর্ণার দিকে এগিয়ে দিলো, 'গুড আইডিয়া। আমি স্যারের সাথে কথা বলে দেখি৷ স্যার কি বলে।'
'আমি কথা বলে নিয়েছি। আপনি কাজ শুরু করতে পারেন। আর এই নিউজটা আলিপুর স্কুলের এক শিক্ষিকা করেছে। তার সাথেও যোগাযোগ করেছি। সে সব ধরণের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে।'
তায়েফ অবাক হয়ে যায়। না বলতেই মেয়েটা তার জন্য এতো কিছু করে দিচ্ছে। মেয়েটা ভুল করছে না তো৷ তার এহেন ভাবনাকে প্রশ্রয় দেয় না৷ সে স্বাভাবিকভাবে বলে, 'এতো কিছু যে আগ বাড়িয়ে করে নিলেন। আমি যদি কাজটা করতে আগ্রহী না হই?'
'আগ্রহী না হলেও সমস্যা নেই৷ তবে আমার মনে হয়েছে আপনি আগ্রহী হবেন। তাই আমি কাজগুলো এগিয়ে রেখেছি।'
তায়েফ কথার কোনো উত্তর পায় না। চুপ করে থাকে। অপর্ণা তায়েফের চোখের দিকে তাকিয়ে একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে মুখ ভেংচে বলে, 'আপনার লজ্জা করছে না একটা অবলা মেয়ের সামনে কতক্ষণ ধরে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন?'
তায়েফ খেয়াল করে আসলেই সে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে কোনো জামা নেই। সে দ্রুত পায়ে হেঁটে পাশের রুমে চলে যায়। গায়ে টি-শার্ট জড়িয়ে ফিরে আসে, 'সরি আমি খেয়াল করিনি। খুব গরম লাগছিলো তাই টি-শার্ট খুলে ঘুমিয়েছিলাম।'
'এই অসময়ে আপনি ঘুমুচ্ছিলেন কেন?'
'কোনো কারণ নেই। এমনি। আচ্ছা আপনি বসুন! আমি চা করে নিয়ে আসি।' বলে তায়েফ রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো।'
মিনিট পাঁচেক পর তায়েফ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ফিরে আসে। একটা কাপ অপর্ণার দিকে এগিয়ে দিলো৷ আপর্ণা তায়েফের হাত থেকে কাপ নিয়ে বলল, 'আপনি কাল সকালে অফিসে গিয়ে স্যারের সাথে কথা বলে দুপুরের মধ্যে আলিপুরের উদ্দেশ্য রওনা দিয়ে দেন।'
'আচ্ছা' বলে তায়েফ চায়ের কাপে চুমুক দেয়৷
দুজনের মাঝে কয়েক মূহুর্তের জন্য নীরবতা নেমে আসে। অপর্ণার মন হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়৷ সে বুঝে উঠে না, দু-দিন ধরে তায়েফের সংস্পর্শে আসলে তার মন খারাপ হয়ে যায় কেনো? সে ভাবে মনের কথা বলে দিবে। কিন্তু বলতে পারে না। কিছু একটা তাকে বলতে বাঁধা দেয়৷ তার মনে হতে থাকে, তার জীবনের সাথে কাউকে জড়ানোটা উচিৎ হবে না।
'কি ভাবছেন?' তায়েফের কথায় অপর্ণার ভাবনায় ছেদ পড়ে।
সে বলে, 'না তো কিছু ভাবছি না।'
'আপনি কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছেন?'
'না তো কি লুকাবো?' অপর্ণার স্বর কাপতে থাকে। সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এবার আর সামলে উঠতে পারে না। সে হাত দিয়ে চেহারা ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। তার এমন আকষ্মিক কান্নায় তায়েফ ঘাবড়ে যায়৷ সে কি করবে বুঝে উঠে না৷ চায়ের কাপটা এক পাশে রেখে হাত টেনে ধরে বলে, 'আপনি কাঁদছেন কেনো?'
তায়েফের হালকা টানেই অপর্ণা তায়েফের বুকে ঢলে পরে৷ তার বুকে মাথা রেখেই ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে। তায়েফের সঙ্কোচ হয়। কিন্তু কিছু বলার উপায় থাকে না৷ সে অপর্ণাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে। জিজ্ঞাসা করে, 'কি হয়েছে বলুন আমাকে?'
অপর্ণা তায়েফের বুক থেকে মাথা সড়িয়ে নেয়। হন্তদন্ত করে চোখ মুছে বলে, ‘না কিছুই হয়নি।’ সে আর বসে থাকে না। খাটের উপর থেকে ব্যাগ নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়৷ তায়েফ তার হাত ধরে টান দিয়ে খাটের উপর বসিয়ে দিয়ে বলে, 'ভালোবাসেন?'
অপর্ণা এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পরে৷ তার অজান্তেই 'হ্যাঁ' মাথা দুলিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে৷
'তাহলে কান্না না করে বলে দিলেই তো পারেন৷ শুধু শুধু চোখের পানি অপচয় করছেন কেনো?' তায়েফ অপর্ণার চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। অপর্ণা এখনো নিচের দিকে তাকিয়ে আছে৷ তায়েফের দিকে তাকানোর সাহস করতে পারছে না। সে নিচের দিকে দৃষ্টি রেখেই বলল, 'আপনি বুঝবেন না। আপনাকে আমি বুঝাতে পারবো না৷'
'আচ্ছা থাক, তা এখন আর বুঝে কি হবে। যা বলার বলেই তো দিয়েছেন।' বলে তায়েফ তার বাহু দু দিকে ছড়িয়ে দেয়৷ অপর্ণা খেয়াল করে না৷ তায়েফ হালকা করে কাশি দেয়। অপর্ণা মাথা তুলে তায়েফের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। তায়েফকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমার বাহু বন্ধনে আবদ্ধ রেখো৷'
জ্যাকি ফার্নান্দেজ কমিশনারের সাথে দেখা করে আসলো৷ কমিশনারই তাকে ডেকেছিলেন। কমিশনার রেগে আছেন৷ পরপর দুইটা খুন হয়ে গেছে৷ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এবং তার ছেলে। কিন্তু এখন পর্যন্ত খুনি অধরা। খুনিকে দ্রুত ধরার জন্য তাগাদা দিলেন। জ্যাকি কমিশনারকে আশ্বস্ত করলো, খুনি বেশীদিন অধরা থাকবে না৷ দ্রুতই গ্রেফতার করে ফেলবে৷ কিন্তু কমিশনার কেস রিপোর্ট শুনে খুশি হতে পারেননি। তাই সে জ্যাকিকে তার মতো করে তদন্ত চালিয়ে যেতে বললেন। এবং একজন আন্ডারগ্রাউন্ড গোয়েন্দা পাঠাবেন বললেন৷ যে আলিপুর গ্রামে থেকে মামলার তদন্ত করে যাবে৷ কিন্তু কেউ জানবে না যে সে গোয়েন্দা অফিসার। এমনকি জ্যাকিও নয়। জ্যাকি ব্যাপারটায় খুশি হতে পারলো না। কিন্তু প্রতিবাদ করার কোনো উপায় নেই। সিনিয়রদের সিদ্ধান্ত।
ভয়ংকরভাবে দুইটা খুন হওয়ায় গ্রামের মানুষের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। খুনিকে দ্রুত ধরতে না পারলে গ্রামের মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে না৷ আর খুনি অবশ্যই পুলিশ থেকে খুব সাবধানে থাকবে৷ পুলিশের সংস্পর্শে আসবে না৷ তাই আন্ডারগ্রাউন্ড অফিসার নিয়োগ দেয়া। যেনো সবার সাথে মিশে গিয়ে তদন্ত করতে পারে। এতে খুনি হয়তো কোনো ভুল করে বসবে।
১০.
গ্রামে আরো একটা হত্যাকান্ড ঘটে গেছে। এবার ভিক্টিম আবুল হাসানাত। ঠিক একইভাবে তাকে মারা হয়েছে৷ হাতুড়ি পেটা করে৷ শরীরের প্রায় অধিকাংশ হাড় ভেংগে ফেলা হয়েছে। মারার পর কালো মুখোশও রেখে গিয়েছে৷ জ্যাকি ফার্নান্দেজ লাশ উদ্ধার করে পোস্টমর্টেম করতে পাঠিয়ে দিয়েছে৷ সে গোপণ সূত্রে জানতে পারে, এই ইউনিয়নের যত অবৈধ কারবার আছে তার অধিকাংশই তার তত্ত্বাবধানে হয়ে থাকে৷ সে ছিলো রাজিবের সবচেয়ে কাছের বন্ধু৷ অবৈধ কাজগুলো তার পৃষ্ঠপোষকতায় হয়ে থাকে৷ পিছন থেকে রাজিব তাকে শেল্টার দিয়ে থাকতো৷ গ্রামের যত বখাটে ছেলে-পেলে আছে সবাই তার কথা মতোই কাজ করে থাকে৷ গ্রামের কিছু মানুষ তাকে মনে মনে ঘৃণা করলেও কারো কিছু বলার সাহস নেই। এমনকি ঘৃণা প্রকাশ করার সাহসটুকুও নেই৷
জ্যাকি ফার্নান্দেজ জিজ্ঞাসা বাদ করার জন্য মতিন মেম্বারের বাড়িতে এসেছে। বাড়ির উঠোনে চেয়ার পেতে তারা বসেছে। মতিন মেম্বারের কপালে চিন্তার ভাজ৷ সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না৷ তার গ্রামে এভাবে খুন হচ্ছে কেনো৷ সে জানালো, এই গ্রামে তাদের কোনো শত্রু নেই৷ গ্রামের যত উন্নয়ন, মানুষের আপদে-বিপদে তারাই এগিয়ে যায়৷ তাদেরকে কেউ খুন করতে পারে এ কথা ভাবাই তো পাপ।
'মেম্বার সাব! গ্রামের কোনো সাধারণ মানুষ তাদেরক খুন করার কথা ভাবতেও পারবে না৷ কিন্তু ব্যাপারটা এমন হতে পারে না, কেউ ক্ষমতার লোভে চেয়ারম্যান ও রাজিব হাসানকে খুন করেছে। আমি যতটুকু শুনেছি আজমির হাসান গত চল্লিশ বছর ধরে চেয়ারম্যানের আসনে একক অধিপত্য বজায় রেখেছে৷ এখন তার অবসর নেয়ার সময় হয়েছিলো। আর তার জায়গায় তার ছেলে রাজিব হাসানকে বসানোর কথা৷ আর তাদের পর গ্রামের সবচেয়ে বেশী ক্ষমতার অধিকারী তো আপনিই। তারা মারা গেলে সুবিধাটা তো আপনারই বেশী হওয়ার কথা।'
'আপনি কি বলতে চাচ্ছেন অফিসার?' মতিন মেম্বার রেগে গেলো।
'রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি তো শুধু সম্ভাবনার কথা বললাম।'
মতিন মেম্বার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো, 'না অফিসার আপনি ভুল করছেন। চেয়ারম্যান সাব আমার বাবার মতো। ছোটবেলা থেকেই তার আদরে বড় হয়েছি৷ আমাদের সব সমস্যায় তিনি বাবার মতো ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আর রাজিব ভাই, আবুল হাসানাত আমার সবচেয়ে কাছের লোক। আমার আজকেই এই অবস্থান তাদের জন্যই। কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, তাদেরকে এভাবে কে মারছে। আমার জানামতে তাদের কোনো শত্রুও নেই।'
জ্যাকি নিজের হাত ব্যাগ থেকে মুখোশটা বের করে দিয়ে বলল, 'খুনি খুন করে নিশানা হিসেবে মুখোশটা রেখে যাচ্ছে। এই মুখোশের ব্যাপারে কিছু বলতে পারবেন?'
মতিন মুখোশটা হাতে নিয়ে দেখলো, 'না অফিসার কিছু বলতে পারছি না৷'
'আজ উঠি। দরকার পরলে আবার আসবো।' বলে জ্যাকি উঠে দাঁড়ালো।
'অফিসার! খুনগুলোর জন্য গ্রামে আতংকে সৃষ্টি হয়েছে৷ সবাই ভয় পাচ্ছে। আপনার কাছে অনুরোধ থাকবে যত দ্রুত সম্ভব খুনিকে ধরুন।'
'আমাদের কাজই এটা।' বলে কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে জ্যাকি আবার ফিরে আসল, 'মেম্বার সাব! একবার ভেবে বলুন তো, আপনারা কারো এমন ক্ষতি করেছেন যার জন্য সে প্রতিশোধ নিচ্ছে?'
'না অফিসার। আমরা বরং মানুষের বিপদে-আপদে এগিয়ে যাই। কারো ক্ষতির কথা আমরা ভাবতেও পারি না।'
'সাবধানে থাকবেন। যদি হত্যাকান্ডগুলো ক্ষমতার লোভে না হয় তাহলে হয়তো আপনিও বিপদে আছেন।' জ্যাকি মতিন মেম্বারকে সাবধান করে দেয়।
শামসুদ্দিন তার কথা অনুযায়ী স্কুলে জয়েন করে নেয়৷ সে স্কুলে আসার আগেই আবুল হাসানাতের মৃত্যুর খবর পেয়েছিলো। তাতে তার কোনো ভাবান্তর হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই সে স্কুলে এসে সবার সাথে পরিচিত হয়ে ক্লাস নেয়া শুরু করেছে। প্রিন্সিপালের কাছে আবুল হাসানাতের মৃত্যুর খবর আসতেই স্কুল ছুটি ঘোষণা করে দেন৷ আবুল হাসানাতও স্কুল কমিটির সদস্য। তাই তার সম্মানার্থে স্কুল ছুটি দিতেই হয়। কিন্তু শামসুদ্দিনের কাছে বিষয়টা ভালো লাগে না৷ জন্ম-মৃত্যু আল্লাহর হাতে৷ কারো মৃত্যু হলেই আরো দুশো ছাত্র-ছাত্রীর পড়া নষ্ট করে ছুটি দেয়ার তো মানে হয় না৷ কিন্তু কাউকে কিছু বলার ক্ষমতা তার নেই৷ তাই সে প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করে স্কুল থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য রওনা দেয়৷ 'শামসুদ্দিন সাব!' পিছন থেকে কারো ডাক শুনতে পায়। মেয়েলি কন্ঠ। খুবই মিষ্টি স্বর। শামসুদ্দিন অবাক হয়৷ এখানে তাকে কোন মেয়ে ডাকতে যাবে। সে পিছনে তাকিয়ে মেয়েটা চিনতে পারে৷ টিচার্স রুমে দেখেছিলো। নাম নূরে আফিয়া৷ হয়তো ইংরেজি শিক্ষক। শামসুদ্দিন নিচের দিকে তাকিয়ে বলে, 'জি ম্যাম বলুন!'
'আপনি তো মাসজিদ সংলগ্নেই থাকেন?'
'হ্যাঁ।' শামসুদ্দিন এখনো মাথা উঁচু করেনি। নিচের দিকে তাকিয়েই কথা বলছে।
'আমার বাসার পথেই তো মাসজিদ। এখান থেকে দশ-পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ। একা যেতে বড্ড বিরক্ত লাগে৷ এখন থেকে আপনার সাথে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।'
'আপমি আমার বদনাম করাতে চাচ্ছেন নাকি?'
'তা কেনো চাইবো?'
'আমি এখানকার ইমাম৷ একজন বেগানা নারীর সাথে আমাকে হাঁটতে দেখলে, কথা বলতে দেখলে গ্রামবাসী আমাকে জুতাপেটা করবে।'
আফিয়া খিলখিল করে হেসে দেয়৷ 'কথা বলছেন, নিচের দিকে তাকিয়ে৷ দেখে মনে হচ্ছে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছেন। ভাজা মাছ উল্টে খেতে পারেন না। কিন্তু কথাতে মনে হচ্ছে মেয়েদের সাথে উঠা-বসা কম নয়। অবশ্য ঢাকাতে আমার বন্ধু মহলেও বেশ কিছু হুজুর ছিলো। মাদ্রাসার পাশাপশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলো। তারা জেনারাললাইনের ছেলেদের থেকেও বেশী নির্লজ্জ ছিলো৷ কোনো রাখ-ঢাক রেখে কথা বলতো না৷ কিন্তু এখানে তো কেউ দেখছে না। ভং ধরে নিচের দিকে তাকিয়ে কথা না বললেও চলে।'
শামসুদ্দিন মুচকি হাসি দেয়, 'উহু, ভং ধরছি না।'
'আচ্ছা বাবা! আপনার বদনাম করিয়ে আমার লাভ নেই। তাই স্কুলে এসে দেখা হলেই কথা হবে৷ আজ যাই৷ বিকেলে আবার আমার মেহমান আসবে৷ তার প্রস্তুতি নিতে হবে৷'
'আচ্ছা৷' বলে শামসুদ্দিন গন্তব্যের দিকে পা বাড়ালো।
অপর্ণা সকাল ৯টার দিকে তায়েফের বাসায় গিয়েছিলো৷ কিন্তু বাসা বাইরে থেকে তালা দেয়া। সে ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলো না, সে কোথায় চলে গেলো? আজ তার আলিপুর যাওয়ার কথা। আর এখন কি না সে গায়েব। অপর্ণা তায়েফের কিছু বুঝে উঠতে পারে না। কোথায় গেছে না গেছে বলে গেলেই তো পারে৷ সে গেইটম্যানকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলো, তায়েফ রাতেও বাসায় ছিল না। গতকাল অপর্ণা যাওয়ার পর যে বের হয়েছে এরপর আর ফিরেনি৷ মোবাইলও বন্ধ। সেদিনই বলেছিলো, মোবাইল নষ্ট হয় গেছে৷ অপর্ণার তায়েফের ব্যক্তিত্ব বুঝে উঠতে পারে না৷ কেমন রহস্যজনক মনে হয়৷ সে তায়েফের বাসায় আর অপেক্ষা করে না৷
অফিসের দিকে রওনা দেয়৷ পথেই ব্যাংক থেকে কিছু টাকা উঠিয়ে মার্কেট থেকে মোবাইল কিনে নেয়। তায়েফকে উপহার দিবে।
অপর্ণা অফিসে পৌছে শাহেন আলমের রুমে চোখ পরতেই তার কলিজায় পানি ফিরে আসে। ভিতরে তায়েফকে দেখতে পায়। শাহেন আলমের সাথে কথা বলছে।
সে একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে তায়েফের বের হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। মিনিট পাঁচেক পর তায়েফ বেরিয়ে আসতেই সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলো কেউ তাদেরকে লক্ষ্য করছে কি না। সে তায়েফকে টান দিয়ে এক পাশে সড়িয়ে নিয়ে বুকে ভর দিয়ে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো, 'রাতে কোথায় ছিলে? আর অফিসে এসেছো একটু জানানো যায়নি? আমি বাসা থেকে ঘুরে আসলাম৷ গেইটম্যান বলল, রাতেও বাসায় ছিলে না।'
তায়েফ অপর্ণা পাগলামি দেখে হেসে দেয়, 'আরে বাবা! ঠান্ডা হও! আমি কি আর জানতাম আপনি আমার বাসায় যাবেন। জানলে তো আর অফিসে না এসে বাসাতেই যেতাম।'
'আচ্ছে সেটা বুঝলাম। কিন্তু রাতে কোথায় ছিলে?'
তায়েফের চেহারা থেকে হাসি চলে যায়, 'অপর্ণা! আমাকে কিছুটা সময় দেও! আমি সব বলবো। আমার একটু সময় চাই।'
'আচ্ছা। ঠিক আছে৷' অপর্ণা তায়েয়ের বুক থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বলে, 'আমার পাগলামিগুলোতে কিছু মনে করো না৷ প্রতিটা মেয়েই দুষ্টু-মিষ্টি পাগলামি করার অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। একটা বয়স পর্যন্ত সেগুলা শুধুই তার বাবা, ভাই আরেকজন পুরুষের কাছে উম্মোচিত হয়। যাকে মেয়েটা খুব আপন ভাবে। কিন্তু যত বয়স বাড়ে, যৌবনের গভীরতায় পৌছায় সেই পাগলামিগুলা বাবা, ভাইয়ের কাছ থেকে আড়াল হতে থাকে৷ মনের ভিতর জমা হয়৷ যখন কাঙ্খিত পুরুষটা পেয়ে যায়, তার মুখামুখি হয়৷ তখন আবার পাগলামিগুলা সব বেড়িয়ে আসে। যা শুধুমাত্র ঐ পুরুষটার জন্যই। ভাই কখনোই ছিলো না। বাবাকেও খুব ছোটবেলা হারিয়েছি৷ তাই নিজের ভিতরের পাগলাটে সত্ত্বাটা কখনোই বেড়িয়ে আসেনি। পাগলামি করার জন্য কাউকে আপন ভাবতে পারিনি। তোমাকে একটু আপন মনে হচ্ছে বলে জমে থাকা পাগলামি সব বেড়িয়ে আসছে। তুমি বিরক্ত হইয়ো না। হলে আমার আর আপন বলতে কেউ থাকবে না।'
তায়েফ অপর্ণার এক হাত মুষ্টি করে ধরে নিয়ে বলে, 'কখনোই বিরক্ত হবো না। কখনোই না।'
অপর্ণা হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। নিজের হাত ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে তায়েফের হাতে দিয়ে কলার ধরে বলে, 'নেন! এখন থেকে মোবাইলে না পেলেই হয়। তখন আপনাকে মজা বুঝাবো!' হালকা কাশির শব্দ পেয়ে অপর্ণা তড়িঘড়ি করে কলার ছেড়ে দেয়। সামনে তাকিয়ে দেখে শাহেন আলম দাঁড়িয়ে আছেন৷ শাহেন আলম কোনো ভণিতা না করে বলে, 'তায়েফ! তোমার সাথে অপর্ণাকেও নিয়ে যাও।'
'কিন্তু স্যার!'
'কোনো কিন্তু নয়। যেটা বলেছি সেটাই করো৷' বলে শাহেন আলম চলে যায়। তখন অপর্ণা ভুরু নাচিয়ে বলে, 'ব্যপার কী? আমাকে নিতে এতো আপত্তি কিসে? অন্য কোনো মতলব আছে বুঝি!'
'না তা নেই।'
'হয়েছে আর বলতে হবে না। আপনি বাসায় যান। আমিও কাপড় গুছিয়ে নিয়ে আপনার বাসায় আসছি। আপনাকে গোছাতে সাহায্য করলাম!'
'লাগবে না। আমি পারবো।'
'হ্যা গতকাল তো দেখেছি, আপনি কেমন গুছাতে পারেন। আল্লাহ কি অবস্থা থাকে বাসার৷ আমি কাল গুছিয়ে দিয়ে আসছি বলেই আপনার ঘর একটু গুছানো হয়েছে৷' বলে অপর্ণা দাঁড়ায় না। নিজের ডেস্কের দিকে চলে যায়। ডেস্কের ড্রয়ার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রগুলো নিয়ে বাসায় চলে যাবে। তায়েফও আর দাঁড়ায় না। বাসার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়৷
চলবে......
পূর্ববর্তী অংশের লিঙ্ক
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/846750862797078/
অপার্থিব#১ম_পর্ব
মিলির ছেলেটা হঠাৎ করেই মারা গেল। মাত্র ছ'মাস বয়স হয়েছিলো ছেলেটার।
ছেলেটা জন্মাবার আগে মিলির দুবার মিসক্যারেজ হয়। অনেকেই এরপর বলেছিলো কোনো বেবি না নিতে। কিন্তু তবুও ও ছেলেটাকে কনসিভ করে। তখন সবাই বলাবলি করতো, এটাও মিসক্যারেজ কেস হবে। সবার ধারণা ভুল প্রমাণ করেই ছেলেটার জন্ম হয়। মিলি ওর নাম রাখে রাতুল।
কি ফুটফুটে সুন্দর ছিলো ছেলেটা। মিলি একবারও ওকে কাছ-ছাড়া করতো না, সবসময়ই কোলে নিয়ে রাখতো। কিন্তু তবুও যে ঘটনাটি কিভাবে ঘটে গেল, কেউ বলতে পারলো না।
রাতুল মারা যাবার একমাস পর, এক সন্ধ্যাবেলায়, বাড়িতে তখন কেউ নেই। মিলি শোবার ঘরে শুয়ে ছিলো, ওর হঠাৎ মনে হলো, বসবার ঘরে যেন ও রাতুলের হাসির শব্দ শুনলো। ছুটে বসবার ঘরে গিয়ে ও দেখলো, কেউ নেই।
রাতে শাহেদ ঘরে ফিরলে ও কথাটা বললো শাহেদকে। শাহেদ হেসেই কথাটা উড়িয়ে দিলো। মাঝরাতে, ওরা যখন ঘুমিয়ে আছে, মিলি বুঝতে পারলো ছোট একটা বাচ্চা শুয়ে আছে ওদের মাঝে। বাচ্চাটার গা থেকে মিষ্টি একটা ঘ্রাণ আসছে, রাতুলের শরীরে এই ঘ্রাণটি পেতো মিলি। ও বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। হেসে উঠলো বাচ্চাটা।
শাহেদ ঘুম ভেঙে বললো, 'এই, কে হাসে?'
মিলি বললো, 'আমাদের রাতুল এসেছিলো। ওই হাসছিলো।' শাহেদ গম্ভীর হয়ে গেলো, কিছু বললো না। ওর চারপাশে তাকালো, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলো না। মিলি বললো, 'তুমি জাগলে দেখেই তো ও চলে গেল। এভাবে ধমকে উঠলে কেন?' শাহেদ বললো, 'রাত হয়েছে, শুয়ে পড়ো।' বলেই অন্যপাশে ফিরে শুয়ে পড়লো সে। সারারাত আর ঘুম এলো না ওর।
সকালে উঠেই বাক্সপেটরা গুছিয়ে মিলিকে নিয়ে শাহেদ ওর শ্বশুরবাড়িতে চলে গেল। একমাস এ বাসাতে থাকবে ওরা।
বিকেলবেলাতে মিলির বাবা শাহেদের কাছে এসে বললেন, 'বাবা, তোমাকে একটা কথা বলবো। মিলি যেন না জানে। কথাটা আমাদের দুজনের মাঝেই রাখতে হবে।' মিলি তখন রান্নাঘরে, ওর মায়ের সাথে নাস্তা তৈরি করছে। রাতুল বললো, 'বলেন, আমি কাউকে বলবো না।'
মিলির বাবা বললেন, 'কথাটা তোমাকে আগেই জানানো দরকার ছিলো, কিন্তু মিলির কথা চিন্তা করেই বলি নি। মিলি যখন পেটে, তখন ওর মায়ের কিছু সমস্যা শুরু হয়। প্রায়ই সন্ধ্যাবেলাতে ওর মা দেখতো, এক লম্বা কালো চাদর পড়া লোক ওর জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু ওই দেখতো, আমরা কিছু দেখতে পারতাম না। অনেক ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়েছি, কোনো লাভ হয় নাই। শেষে একজনের খোঁজ পেলাম, তিনি নাকি এসব ব্যাপারে বেশ অভিজ্ঞ। তাকে নিয়ে আসলাম। তিনি বাসায় এসেই বললেন, 'ভাই, আমার জীবনে আমি অনেক ভয়ঙকর জিনিসের মোকাবেলা করেছি, কিন্তু আপনার বাসায় যে আছে, তার মতো ভয়ঙকর কিছুকে আমি আগে কখনো দেখি নি।'
আমি বললাম, 'এখন কি করবো আমরা?'
তিনি বললেন, 'আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। কিন্তু কাজ যে হবেই, এমন কিছু বলতে পারছি না।'
তিনি খুঁজতে খুঁজতে আমাদের বাড়ির পিছে একটা গাছের কাছে চলে গেলেন। এরপর বললেন, 'এ জায়গাটা খুঁড়েন।'
জায়গাটা খোঁড়া হলো। এরপর যা বের হলো,তা আমরা জীবনেও কল্পনা করতে পারি নাই। দেখলাম, একটা ছোট বাচ্চার মাথার খুলি।'
তখনই ওরা রান্নাঘর থেকে মিলির চিৎকার শুনতে পেলো। (চলবে)
অপার্থিব
#১ম_পর্ব
লেখা_সোয়েব_বাশার

আশাবরি
আশাবরি
পর্বঃ৫৯
লেখাঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ
চল্লিশবার কান ধরে ওঠবস শেষে আশাবরি নাক ফুলিয়ে ফুলিয়ে অপমানের উচ্ছ্বসিত কান্না রোধ করে না পেরে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। অভিনব প্রথমে ওর কান্না দেখতে না পেয়ে দাবড়ে বলে ওঠল,
- ও কি? বসে পড়লে কেন? চল্লিশ হলো। সংশোধন পর্ব বাকি আছে যে! শুরু কর।
আশাবরির চোখে পাতা হয়ে কচুপাতার মতো একফোঁটা জল গড়াল অতি সন্তর্পণে। ধমকেও আশার বিকার নেই দেখে অভিনব এবার আড়দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিষয়টা খানিক আঁচ করল। সে ঝুঁকে মেঝেতে ঠেস দিয়ে থাকা আশার হাতটা ধরে তাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করল। আশা এবার যেন আরো ফুলে ফুলে কাঁদল। তার দৃষ্টি স্থবির হয়ে, নিচের দিকে নিবদ্ধ। চাপা-কান্না আর অভিমানে নিটোল ঠোঁটজোড়া স্ফুরিত! উপর্যুপরি ওঠবস করাতে কটিদেশ হতে সারা নিম্নাঙ্গে ব্যথারা দানা বাধল বিধায় আশা ভালো করে ওজন ছেড়ে দাঁড়ালে পারল না। অভিনব আশার দু-হাত নিজের কাঁধে বিছিয়ে দিয়ে নিম্নমুখী আশাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
- কাঁদছ?
- না
- হ্যাঁ কাঁদছ।
আশা গায়কের কাঁধ থেকে দু-হাত ধীরেসুস্থে আলগা করে পায়ের ভর ঈষৎ মেঝেতে ছড়িয়ে দিয়ে অনুরাগ-বিজড়িত কণ্ঠে বলল,
- আপনি সবসময় আমার সঙ্গে এমন করেন৷
আশার অনুযোগের মুখে অভিনব ফিক করে হেসে উঠে বলল,
- আচ্ছা, তাই? যাইহোক,বসো। চোখ মুছো। - জুথিকার ব্যাপারে ভেবো না। আমি ওর সঙ্গে দেখা করব। আমি নিষেধ করলে ওর মুখ খোলার সাহস হবে না। আর যদি খুলেও আধপাগল থেকে পুরো পাগল বানিয়ে পাবনা পাঠিয়ে দেব।
আশাবরি যারপরনাই স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে দুই করতলে মুখ ডলে ঈষৎ ভাঙা কণ্ঠে বলল,
- আপনি ওর সঙ্গে দেখা করবেন?
বলেই একটু যেন তীক্ষ্ণ হয় ভেজা চোখদ্বয়। জানালা গলে ফুড়ুৎ করে একদমকা বাতাস এসে আশাবরির মুখের পাশে ঝুলে পড়া কুন্তলে ফুৎকার দিয়ে যায়। যৎসামান্য সরে যাওয়া ওড়নাটা আবারো মাথার ওপর টেনে দেয় আশা; ভুজঙ্গ শিশুর মতোন অবাধ্য তড়বড়ে কেশপাশ গুঁজে দেয় গুলফাম কানটার অন্তরালে। অভিনব ঘরের কোণায় স্ট্যান্ডে বসানো একটা চকচকে গিটার নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,
- হু,কেন? আবার জড়িয়ে ধরবে মনে করে ভয় পাচ্ছ?
আশার চোখের তারাজোড়া একমুহূর্তের জন্য তড়িদগর্ভের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল। আজন্ম প্রসাধনের ছোঁয়া না পাওয়া শুকনো ওষ্ঠপুট কী দারুণভাবে বসন্তের নবপল্লবের মতো ডিগডিগ করে কেঁপে উঠে! সত্য সত্যই যে তার অবচেতন মন-মস্তিষ্ক এমনটাই ভেবেছে! আবার দেখা হলে ওই পাগল জুথিকা কাছাকাছি না চলে আসে, অযাচিত ঢলাঢলি না শুরু করে! পাগল-ছাগলের বিশ্বাস আছে না-কি! কিন্তু গায়ক কীভাবে তা আন্দাজ করল?
- যাইহোক, গিটারটার তার ঠিক করতে করতে অনুষঙ্গের পাতা উল্টায় অভিনব,তুমি গান গাইতে পার?
আশাবরি মাথা নেড়ে জানায়,সে পারে না।
- শিখবে? তোমার কণ্ঠ কিন্তু ভারী মিষ্টি আর পরিষ্কার।
আশাবরি দিব্যচক্ষে দেখল, গায়ক তাকে গান শেখাচ্ছে আর একটা রাগ ভুল হতেই তার হৃষ্টপুষ্ট পেশিতে দুড়দাড় করে বেতের বাড়ি পড়ছে। সে উচ্চস্বরে ক্রন্দন জুড়ে অনুনয়-বিনয় করছে ছুটি দেওয়ার জন্য।
- কোনো দরকার নেই,একটু জোর গলাতেই বলে আশা,পরক্ষণেই গলা নিচু করে সংশোধন করে,না মানে ইচ্ছে নেই আর কি।
- থাকবে কী করে? অভিনবের কণ্ঠে হালকা শ্লেষ, আমি যে বিষয়টা দুই বছর পড়ে বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিয়েছি। তুমি সেটাই পড়েছ। সামনে আরো পড়বে। ওটা নিয়েই থাকো।
একটু থেমে আবার যোগ করে,
তবে তুমি নিজের ইচ্ছে মতো গান প্র্যাকটিস করো। বিশেষ দিনে আমি তোমার কণ্ঠে গান শুনতে চাইব।
অকস্মাৎ ঝি’র হেঁড়েকন্ঠে ছন্দপতন হয়।
- ভাইজান।নাশতা করতে ডাকে আপনাগো।
আশাবরি ঝি’র পিছুপিছু আগে আগে বেরিয়ে গিয়ে বাঁচে। অভিনব আসে একটু পরে।
সন্ধ্যাটা আশাবরি সবার সঙ্গে এটা-ওটা কাটিয়ে দেয়। নিচতলায় গায়কের ঘরে তার দলবল এসে চিল্লাচিল্লি শুরু করে দেয়। গান-টান বানায় বোধহয়! সেদিকেও ভুলেও পদ বাড়ানোর চেষ্টা করে না আশা। সবার সঙ্গে ভালোমন্দ আলাপচারিতার পাশাপাশি আশাবরি ভাবে আর ভাবে। গায়কের সঙ্গে তার বিয়েটা আসলেই হচ্ছে? ছোট বড় নির্বিশেষে সবার আকারে-ইঙ্গিতের গৃঢ় ব্যঞ্জনা তো তাই বলছে! কিন্তু, কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এটি? কোথায় আকাশের জ্বলজ্বলে তারা আর কোথায় এঁদো জমিনের নাড়া! বাস্তবিক জ্ঞান যাদের নেই তারা ‘পারফেক্ট’ বলে আঙ্গুলি-দ্যোতনা দেখিয়ে দিচ্ছে সহাস্যে বদনে। আর যাদের আছে তারা ছেলের দিকে তাকিয়ে কিংবা যুক্তির খাতিরে মেনে নিচ্ছে। কিন্তু আদপেই কি দামী মধুতে আর সহজলভ্য জল একাকার হবে কখনো?... হবে হয়তো। তবে সেখানে নিঃসীম ভালোবাসার উত্তপ্ত বুদ্বুদের দরকার। সেই বুদবুদ কি তার আছ? বা কখনো হবে? কে জানে! এসব মনে হলে ভালো লাগে না তার। দুনিয়া উলটপালট হয়ে যাক গায়ক তার পাশেই থাকুক এটাই সে চাই মনেপ্রাণে। এটা কি ভালোবাসা না স্বার্থপরের মতো নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তা আশাবরি জানে না।
আচ্ছা,কী হবে বিয়ের পর? আমৃত্যু এ বাড়িতেই থাকবে সে? গায়কের সঙ্গে? অহর্নিশ? রাতেও? পাশাপাশি? এমনটাই তো আবহমানকাল ধরে সমগ্র বিশ্বে চলে আসছে... এটাই তো প্রকৃতির অপরিবর্তিত স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম! ভাবতে গেলেই একটা অজানা ভয় আর আড়ষ্টতায় আশাবরি জান যেন কণ্ঠনালিতে এসে ঠেকে। কেমন যেন অদ্ভুত ভোতা আর বোবা অনুভূতি আশাকে চারিদিক থেকে বূহ্য করে নেয়! সে কী চেয়েছিল আর কী হচ্ছে! সে চেয়েছিল চিরটাকাল একাকী নিঃসঙ্গ কাটিয়ে দিতে। অথচ... কী এক নামহীন, তারাভ্র, অচেনা মায়ার বাহুডোরে আটকে গেল সে!
রাতের খাবারে সবাই উপস্থিত হয়। বিশেষত আশাবরির জন্য নিজ হাতে হরেকরকম পদের খাবার রান্না করেছিলেন জেসমিন আক্তার। মেয়েটা অনেকদিন পর ভালোমন্দ খাবে এই ছিল ভাবনা। তিনি বেছে বেছে আশাবরি পছন্দ করে এমন খাবারগুলোই বিভিন্ন পন্থায় সংগ্রহ করে রান্না করেছেন। মলা আর শিং মাছ খেতে পছন্দ করে সে। মুখ ফুটে কখনো না বললে একদিন দাওয়াতের সময় খাবারের তৃপ্ততা দেখেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন। তার জন্যই গ্রামে খবর দিয়ে পুকুরে হাত জাল ফেলে তরতাজা মাছ আনা হয়েছে। জেসমিন আক্তার দেখলেন, আজও মেয়েটা বড় প্রীত মনে মলা মাছ দিয়ে ভাতের গ্রাস মুখে পুরছে একের পর এক। দেখে দেখে বড় ভালো লাগে তার। আজকালকার মেয়েটা কত রকমের ঢং করে যে খাবার খায়! অথচ এই মেয়েটাকে দ্যাখো!কী অতি সাধারণ অথচ খেদহীন তার মুখাবয়ব, চালচলন, অঙ্গভঙ্গি, বাচনভঙ্গি এমনকি খাওয়ার ভঙ্গিটাও কী বিমল আর সাচ্চা! অথচ এর ওপরই কি-না বারবার বিপদ চড়ে!
সবাইকে খেতে দিয়ে তিনিও পাতে বসে গোটাকতক লোকমা মুখে দিয়ে কথা পাড়লেন,
- সব তো সমাধান হলো। এবার আর অপেক্ষা কেন?
দুলু আর তার আম্মাও আজ এখানে উপস্থিত। দুলু ফোঁড়ন কাটল,
- মামার ঘরছাড়া কন্যা আবার কবে ঘর ছাড়বেই সেই অপেক্ষাই করছি বোধহয়!
অভিনব ভাবল, সর্বনাশ। এই পাজিটা কী করে জানল সে আশাকে সে এই নামে ডাকে! সে তো খুব সাবধানে এবং প্রায় হাতগোনা কয়েকবার এই নামে ডেকেছে! কিন্তু একটু হাসাহাসি পর্ব শেষে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় গুরুভারে দুলুর হাস্যস্পদ কৌতুক চাপা পড়ে গেল। আলী সাহেব খাবার মুখে আমোদিত কণ্ঠে বললেন,
- খারাপ কই? স্যার থেকে শ্বশুর হবার প্রসেসটা আমি ভালোই উপভোগ করছি।
জেসমিন আক্তার সরু চোখে তাকিয়ে ভর্ৎসনা করলেন,
- উপভোগ করার বয়েস আর নেই। একটু শক্ত থাকতে নাতিনাতনি কোলে নেবার ইচ্ছে কি নেই? বলি,মেয়েটাকে বিয়ে দিই,তা করবে না। আইবুড়ো করে রেখে দেবে।
- খবরদার আমার মেয়েকে খেদানোর চেষ্টা করো না।
ইহিতাই কেবল কোনো কথা বলে না। সে মেঘ-গম্ভীর মুখে মৃদু চালে ভাতের গ্রাস মুখে দেয়।
অভিনব বাবা-মায়ের বাগ্বিতণ্ডা শুনে আর নিশ্চুপভাবে সবার মুখদর্শন করে খেয়ে চলে। বোনের অস্বাভাবিক নিরুদ্যম ভাবভঙ্গি দেখে সে বুঝতে পারে,কিছু একটা হয়েছে তার। এমন সময়ে অন্তত দু'টো কথা বলবে না কিংবা নিজের মতামত উপস্থাপন করবে না এমন অচঞ্চল সে নয়।
দুলুর আম্মা বলে ওঠে,
- মা যেটা বলছে। আশা একটা কঠিন সিচুয়েশন পার করে এসেছে৷ এখন আমি মনে করি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়েটা যদি হয় তাহলে ও সবকিছু ভুলে সামনে এগোতে পারবে।
মা সায় দেয়,
- ঠিক বলেছ মা। একলা ও বাড়িতে থাকলে সে ভেঙে পড়বে। তাছাড়া ওর চাকরি-বাকরিও নেই। খুঁজার মতো মানসিক ইচ্ছেও নিশ্চয় এখন নেই। সবমিলিয়ে...
কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে মা অকস্মাৎ একটু ব্যতিব্যস্ত হয়ে আরেকটা কথা পাড়ে,
- আচ্ছা সবাই বললে তো হবে না। আশা কী চায় সেটাও তো দেখতে হবে? আশা? তোমার কি কোনো আপত্তি আছে? দ্যাখো কিন্তু! তোমার ওপরেই সব। পরে কিন্তু বলো না যে জোর করে চাপিয়ে দিয়েছি!
বলেই ঠোঁটে একসুতো হাসির আবির রাঙালেন তিনি৷ সবার নজর এখন আশার উপর। আশার লাজুকলতার ন্যায় নুইয়ে পড়া মুখের দিকে তাকিয়ে সবার মুখে একটা চাপা হাসির বদ্ধ তরঙ্গ খেলছে। সেই তরঙ্গের ওপরকার সূর্যচ্ছটা যেন আশার মুখের ওপর গিয়ে পড়ছে।
আশা খাওয়া বন্ধ করে আনত মস্তকে বাসনের মধ্যখানের ঝোল মাখানো ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে মিনমিন করে বলল,
- আপনারা যা ভালো মনে করেন।
কথাটা বলেই যেন সে বেঁচে গেল। এতক্ষণ তার বুকের বাঁ পাশস্থ হৃৎপিণ্ডটা কেন যেন মুচড়ে ধরে উদ্যতমুষ্টি করে ছিল! বলামাত্রই তাকে নিষ্কৃতি দিল! সে মরতে মরতে বেঁচে গেল!
মা'র মুখে তখনো হাসিটা ঝুলছে,
- বেশ, বিয়েতে তুমি মত দিচ্ছ তো?
আশাবরি ধুকপুক ধুকপুক দুন্দুভি বাজাতে থাকা বুকে খুবই সাবধানে একপলক চোখ তুলে পরক্ষণেই নামিয়ে নিয়ে বুঝা যায় না এমনভাবে বিনয়াবনত মাথা দুলাল।
জেসমিন আক্তারের মুখে বর্ষার চেরিফুলের মতোন একটা প্রসন্ন হাসি ফুটে উঠল। হাসির ছটার তাঁর দুচোখ কোনার প্রসারিত বার্ধক্যের বলিরেখাগুলো এতে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। তিনি খুশি হয়ে কথাবার্তা এগোতে লাগলেন। যেন এখনি না বললে সবকিছু ফসকে যাবে।
- আচ্ছা আচ্ছা। একটা কথা। একটু দম নেন তিনি, অভিনব চাইছে কাছের আত্মীয়দের ডেকে বিয়েটা যাতে সাধাসিধে ভাবে হয়। কেননা,—বুঝতেই পারছ? পরে অবশ্য অনুষ্ঠান করে সবাইকে নেমন্তন্ন করা হবে। তুমি এটা নিয়ে মন খারাপ করবে না তো?
আশাবরি এবারো একইভাবে মাথা দুলিয়ে নিঃশব্দে-দ্যোতনায় বুঝিয়ে দিল, বাহ্যিক চাকচিক্য তার কোনোকালেই পছন্দ ছিল না। যত কম লোক জানল ততই তার লজ্জার দাঁড়িপাল্লা হালকা হলো। কাছের মানুষ আরো কাছে আসবে এতো লোক দেখানোর কী?
- দ্যাখো কী লক্ষ্মী মেয়ে। অভি- তোমার তো প্রতিদিনই ব্যস্ততা...
জেসমিন আক্তারের কথার মধ্যিখানে আলী সাহেব টিপ্পনী কাটলেন,
- ছেলের কি বিয়ে করার সময় হবে?
অভিনব মাথা তুলে নিরাশা-বিরক্ত মিশ্রিত একটা দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বাবার দিকে।
- আহা তুমি চুপ কর। ওর মেজাজটা গরম করে দিও না!
অভিনব বাবার দিকে আরেক পলক একই দৃষ্টি ছড়িয়ে দিয়ে গম্ভীরভাবে বলল,
- সামনের শুক্রবার তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই।
তার কণ্ঠে বাবার প্রতি ক্রোধের গনগনে আঁচ স্ফুটিত হয়। হাজার হোক, বাবা-ছেলেয় যে আদায়-কাঁচকলা তা তো কেউ ভুলেনি আজ অবধি।
মা একটু নীরবে হিসেব করে উৎকণ্ঠিত গলায় বললেন,
- আজই তো রবিবার, এরপর কি—
অভিনব বিরক্তি-নিঃসৃত রনরনে কণ্ঠে বললশ
- এমনিতেই আশাবরির পেছনে অনেক সময় গেছে। প্রচারণা, মিছিল-মিটিং, সমাবেশ, কত কাজ বাকি এখনো। তোমরা ওর কী বুঝবে!
ছেলের এই বাবার সঙ্গে লটখট করাটা আর গেল না। বাপটাও আছে তেমন! সুযোগ পেলেই ছেলের সঙ্গে ঠোকাঠুকি না করলেই কি নয়? তিনি একদলা বিষদৃষ্টি স্বামীর দিকে নিক্ষেপ করে পরক্ষণেই শান্ত-ভীতভাবে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
- বেশ, তবে শুক্রবারই। কাল থেকেই সব প্রস্ততি শুরু। তোমার বন্ধুদের জানিয়ে দিও। বাকিটা আমি দেখছি।
সভাভঙ্গ হলো। আশাবরির মনটা খাঁচায় বন্দি পাখির মতোন কেবল পালাই পালাই করছিল। অনিচ্ছা সত্বেও সে জোরপূর্বক অনুমতি নিয়ে সেদিন রাতেই বাসায় ফিরে গেল। সারাটাপথ সে কেমন একটা ভালোলাগা আর হৃৎ-খচখচানি ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ছিল। বৈকালীন ওই বাসন্তী রঙিন প্রজাপতির মতো এধার-ওধার ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে ইচ্ছে হলো তার। কখনো আবার বুক ঠেলে কান্নার রুদ্ধ ঢেউ উঠল। কান্না এলো। কাঁদল সে। কান্নার জলের মধ্যেও যেন হৃদয় সরোবর জুড়ে অস্পষ্ট এক খুশির নীলোৎপল ভাসে! কেন এই হ্যাঁচড়প্যাঁচড় তা আশা জানে না। মনের এই অনভিপ্রেত আঁকুপাঁকুর সংজ্ঞা সত্যিই আশাবরির জানা নেই।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
বাইরে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল অভিনব। ইহিতা হন্তদন্ত হয়ে তেড়েফুঁড়ে ঘরে ঢুকে ভাইয়ের সুমুখে দাঁড়ালো কঠিন মুখে। অভিনব কাল থেকেই তার মতিগতির অস্বাভাবিকতা লক্ষ করে আসছিল, সে গায়ে পাতলা কালো টিশার্টটা গলিয়ে রুক্ষভাবে শুধাল,
- কী হয়েছে?
ইহিতা নিজের মুঠোবন্দি মোবাইলটা ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল বিনাবাক্যে।
- কী?
বলে অভিনব মাথা উঁচিয়ে মোবাইলটা হাতে তুলে স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। পলে পলে একটি ফেইক একাউন্ট থেকে পাঠানো মেসেজগুলো পড়তে পড়তে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো,দাঁতে দাঁত লেগে কটকট শব্দ উঠল,চোখ হয়ে উঠল বিতৃষ্ণাপূর্ণ।
- এটা জুথিকা।
বলে একটা নিশ্বাস চেপে ফোনটা পুরশ্চ ফিরিয়ে দিল অভিনব।
ইহিতা নিজের ফর্সা মুখটা অমানিশার মতো কালো করে বলল,
- তুমি কি জানতে যে আশা...
- হু জানতাম। অভিনব অতিমাত্রায় নির্লিপ্ত, তবে এটার সত্যতা নেই কোনো। আশাবরি আমাকে বলেছিল ওর মা মারা যাওয়ার সময় একটা কথাই বলেছিল যে ওর বাবা আছে। এটার ব্যাখ্যা কী? দিনের অর্ধেক সময়ই আশার মা সজ্ঞানে থাকতো।
- ভাইয়া তুমি কিছু যাচাই না করেই আমাদের ঘরে...
- ইহিতা, চেঞ্জ ইউর মাইন্ড।—
অভিনবের গলার স্বর তেতে উঠে।
-সব ঠিক হয়ে গেছে। এখন আমি চাইব না পাগল-ছাগলের কথা শুনে তুমি এটা নিয়ে কোনো ঝামেলার সৃষ্টি করো। তোমার জেনে রাখা উচিত, আমারো বোধ-বুদ্ধি আছে।এবং আমি কারো কথা ভেবে চলি না। না নিজের পরিবারের না বাইরের তথাকথিত সমাজের৷ আমি অবশ্যই সবকিছু যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি,নাহলে তোমার কেন মনে হলো হাজার হাজার উত্তম প্রস্তাব ঠেলে আমি আশাকেই বেছে নিলাম? নিশ্চয় বিবেচনা করেই তো! — আর কিছু বলার না থাকলে আসতে পার এবার। আমি বেরোব'খন।
বলে আর কোনো উত্তরের অপেক্ষামাত্র না করে নিজেই দ্রুতলয়ে প্রস্থান করল অভিনব। ইহিতা দ্বিধান্বিত মনে পুরো ঘরময় বিরতিহীন পায়চারি করল মিনিট পনেরো। ভাবল আকাশকুসুম,ভালোমন্দ, উচিত-অনুচিত। ভাইয়ের মুখের ওপর সে বলতে পারল না, তুমি আশাকে প্রাণপণে চাও বলেই তো এখন নানান যুক্তিতর্ক উঠে আসছে! এখন যদি পরিবার থেকেই এমন একজনকে ঠিক করতো তাহলে কি তুমি মেনে নিতে? কিন্তু বলার সেই সাহস ইহিতার নেই। তথাপি ভাইয়ের কথাগুলোও যে মোটেও ফেলনা নয় তা থেকে থেকে একটু হলেও অনুধাবন করতে পারল সে। ঠিকই তো! সবকিছু ঠিকঠাক হবার পর এমন একজনের কথা ধরে সে পুতুল নাচের মতো নাচতে যে কখনোই চাইবে না তার ভাইয়ের পাশে অন্যকেউ দাঁড়াক। সুতরাং ভাইয়ের সিদ্ধান্তই ঠিক ভেবে নিজেকে নিরস্ত করল ইহিতা৷ তবুও যেন মনের খচখচানিটা পুরোপুরি তিরোহিত হতে চাইল না।
একদিনের মধ্যেই বিয়ের যোগাড়যন্ত্র শুরু হলো পুরোদমে। আলোচনা সাপেক্ষে ঠিক করা হলো নিয়মানুযায়ী বৃহস্পতিবার রাত্রে গায়ে হলুদ এবং শুক্রবার জুমার নামাজের পরই হবে আক্দ। সেদিনই ঘরোয়াভাবে নিকটাত্মীয়দের উপস্থিতিতে ছোটখাটো অনুষ্ঠান করে বউ উঠিয়ে আনা হবে। বিয়েকে সামনে রেখে অত্যন্ত জোরদার কেনাকাটা শুরু হলো। ঘরে সারে সারে নব্য ক্রয়কৃত জিনিসপত্রের রাশি জমল। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ছোট করে নিমন্ত্রণ জানানো হলো। অভিনব এসবের কিছুতেই নেই৷ কথায় আছে,যার বিয়ে তার খবর নেই পাড়াপড়শির ঘুম নেই। বিয়ে তার, অথচ তার কোনো রা বিকার নেই। অন্যদিনে অভিনবের বিয়ে শুনে আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে যেম অতর্কিত বোমা বিস্ফোরণ হলো। এক আত্মীয় অন্য আত্মীয়কে দূরালাপনিতে যোগাযোগ করল,‘ হ্যাঁ রে,শুনেছিস! অভির নাকি বিয়ে। মাত্র দাওয়াত দিল। মেয়ের নাকি বাড়িঘর মা বাবা নাই,অনাথ’
‘কী বলো,একদম কেউ নাই?’....
শুনে কেউ বলল, এমনি হবে,গানটান করে কিনা,মিডিয়ায় কাজ করে যারা এমনি তো হয়!
আবার অধিক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা মেকি মন খারাপের ভান করে বলে,‘ছেলেটার কপাল পোড়া, ভালো চরিত্র, অথচ বউটা সব উলটপালট করে দিল। বিয়ে-থা না করে কী করবে? নিজের দিকও তো দেখতে হয়’
থুড়থুড়ে বৃদ্ধ যারা তারা দাওয়াত পেয়ে অভিযোগ করে,সব ভাল,কিন্তু ছেলেটার কী এমন বয়স হলো জেসমিন? একটু দেখেশুনে বিয়ে দেওয়া যেতো না? কোত্থেকে একটা... যাহোক, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। দেখি শুক্রবার পর্যন্ত সয় কি-না!
মোটের ওপর আত্মীয়স্বজনদের মাঝে একটা চাপা কানাঘুঁষা তপ্ত-ভ্যাপসা বাতাসের মতো বারবার ঘুরাফেরা করতে লাগল। ফলশ্রুতিতে দেখা যাদের দাওয়াত দেওয়ার কোনো আলামতই ছিল না তারাই গায়ে পড়ে হালকা অপমানের উদ্দেশ্যে কৌতূহলী হয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করল,
- শুনলাম ছেলের নাকি বিয়ে?
জেসমিন আক্তার অপ্রস্তুত হয়ে কপট হেসে কৈফিয়ত দেন,
- আপনাদেরকেই কল দিতে যাচ্ছিলাম এখন। হুট করে ঠিক হলো কি-না তাই সবাইকে কার্ড পৌঁছে দেওয়াটা হচ্ছে না।
কল রেখে তিনি ফুঁসতে ফুঁসতে আওড়ান,‘উহঃ নির্লজ্জ সব!’
এরিমধ্যে আরেকদফা ভিন্ন কাণ্ড ঘটল। জেসমিন আক্তার চাইলেন, গ্রাম থেকে আশার কোনো নির্ভরযোগ্য আত্মীয় এসে আশাকে সমর্পণ করে যাক। যেভাবেই হোক, তারা আশাকে ছোট থেকে লালন-পালন তো করেছে!
আশা জানাল এমন একজনই আছে,মনির ভাই। যদিও তার সঙ্গে সেই শেষ যোগাযোগ হয়েছিল অনেক আগে। কিন্তু এটা সত্য যে সে আশাকে ছোট থেকেই সে নিজের বোনের নজরে দেখে এসেছে। মা'র জন্য প্রকাশ্যে না পারলেও আড়ালে আবড়ালে তাকে অনেককিছুই তাকে দিতো ঠিক যেমনটা রাইসাকে দিতো।
কিন্তু মায়ের প্রস্তাব অভিনব নাকচ করে দিয়ে বলল,
- নো, নেভার! ওই লোকের সঙ্গে আমার একবার তর্ক হয়েছিল ফোনে৷ আশাবরি তখন তার ভাই জহিরের হাতে বন্দি। সে ছিল ইন্ডিয়ায়।... নাহ হবে না। লাস্ট দুই বছর কোনো খোঁজ নিয়েছে সে? নেয়নি? তাহলে? কী দরকার?
জেসমিন আক্তার ছেলেকে কিছু বুঝিয়ে বলার আগেই আশাবরি ইতস্তত করে সংকোচ ঝেড়ে অকস্মাৎ মুখ খুলল,
- উনি সবসময় আমাকে ভিন্ন চোখে দেখতেন। আমার মনে হয় উনাকে জানানো উচিত।
বলেই আবারো মাথা নিচু করে চুপ করে গেল সে। এটাই তার মুখফুটে প্রথম মতামত এবং চাওয়া। কাজেই অভিনব কিছুটা অসন্তুষ্ট হলেও অগত্যা সায় দিল।
দিন-দুই এভাবেই বৈবাহিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই গেল। ইহিতা যদিও সব দিকে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত। কিন্তু দিনশেষে ঘরে ফিরে তার মুখ দেখে অভিনব নিমিষেই বুঝে নেয় যে, শুরুতে এই বিয়ে নিয়ে সে যতোটাই উদ্যমী ছিল, এখন ঠিক ততটাই চুপসে পড়েছে। এর ভবিতব্য প্রভাব যে খুব একটা সুখকর নয় এবং এর ছটা যে গোড়া থেকেই ইনিয়েবিনিয়ে আশাবরির উপর গিয়ে তাও সহজ অনুমেয়। এ কারণেই সে দিনকয়েক ধরে আশাবরির গ্রামে গুপ্তচর দ্বারা আঁতিপাঁতি করে ইতিবাচক তথ্য সংগ্রহ করেছে। গায়ে হলুদের আগেরদিন অর্থাৎ বুধবার রাতে অভিনব ইহিতাকে জরুরি তলব দিল। ইহিতা স্টুডিও ঘরে এসে ভাইয়ের কাছে বসল নিঃশব্দে। অভিনব ইজিচেয়ারটা ঘুরিয়ে বোনের দিকে মুখ করে বসল। মিনিট এক নিঃশব্দে কাটল। ঘরজুড়ে ঘরির পেন্ডুলাম দুলার শব্দ আর এসির ভোঁতা যান্ত্রিক শব্দ বাদে আর কোনো শব্দ নেই। ডানপাশে গুটিকয়েক মনিটর জ্বলছে। অভিনব কী যেন ভেবে বলা শুরু করল,
- দ্যাখো ইহিতা৷ তুমি জানো আশাবরির কোনোদিক থেকে কোনোপ্রকার খেদ নেই৷ তুমি যে বিষয়টি নিয়ে ভার হয়ে আছ সে বিষয়টি নিয়ে ও নিজেই হীনমন্যতায় ভোগে। ঠিক এই কারণেই সে চায়নি এই বিয়েটা হোক। আচ্ছা, একটা কথা বলো,আশাকে কি তোমার ঘৃণা হয়?
ইহিতা অপ্রতিভ হয়ে সবেগে মাথা সঞ্চালন করে বলল,
- না না,কী বলছ ভাইয়া!— হঠাৎ শুনেছি তো, তাই...
- যাক্ তুমি তোমার উন্নত মনের পরিচয় দিয়েছ। একটু প্রসন্ন হয়ে বলে অভিনব, আমি খবর নিয়েছি। ব্যাপারটা পুরোপুরি গুজবের মতো। আশাবরি ওখানকার তৎকালীন বৌদ্ধ জমিদার বংশের মেয়ে। যেহেতু আশাবরির মায়ের শেষ কথা ছিল, আশাবরির বাবা আছে তাই আমার বিশ্বাস জমিদারের বিপুল সম্পত্তি থেকে আশার আর ওর মা'কে বঞ্চিত করার জন্যই এই খেলা চালা হয়েছে। ভবিষ্যতে আশা চাইলে আমি এটা নিয়ে লড়ব।
- ওমাগো, চোখ পাকিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে ইহিতা, এতো কিছু? আশাবরি মেয়ে না রহস্যের বস্তা? ও জানে এসব?
- নিশ্চই জানে। কিন্তু ও তো কেমন জানো। পৃথিবীটাকে সে নিজের মতোই সহজ ও সরল মনে করে। এ বিষয় নিয়ে আমি এতদিন মাথা ঘামাইনি। এখন দেখছি সেটা বেড়ে যাচ্ছে তাহলে অবশ্যই সত্য সামনে আসবে।
কিন্তু তুমি স্বাভাবিক হও। আশার সঙ্গে থাকো। তোমার ফ্রেন্ডদের খবর দাও। আনন্দ করো। টাকাপয়সা কিছু লাগবে?
ইহিতার বুকের ওপর থেকে একটা বিরাট পাথর যেন গড়গড়িয়ে নেমে যায়৷ থেকে থেকে তার চিকন পাতলা ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির লহর ওঠে সারা মুখাবয়বে ছড়িয়ে পড়ে তার তরঙ্গ। সে আবদারে কণ্ঠে বলে ওঠে,
- লাগবে না,কিন্তু শপিং করার সময় একটা ডায়মন্ড রিং দেখেছি। ওটা লাগবে।
- ডায়মন্ড রিং? চোখ বড় করে অভিনব, ফতুর করবে দেখছি।
- এ্যাঁহ, মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়ায় ইহিতা।
অভিনব প্রতিশ্রুতি দেয়,
- আচ্ছা, এখন না। আরো কিছুদিন পর। বাইরে থেকে এনে দিব।
- আচ্ছা।
পাতলা লিকলিকে বপুটা দুলিয়ে দুলিয়ে মৃদু শিস দিতে দিতে খুশিমনে বেরিয়ে যায় ইহিতা।
গায়ে হলুদের দিন সমস্ত কাজ থেকে ইস্তফা নিয়ে বাড়ির উত্তর পাশের সুইমিংপুলের নীলাভ পানিতে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল অভিনব। পাশে টাপেটোপে আড়ষ্টভাব নিয়ে বসে আশাবরি। অপরিমেয় সংকোচে সে পারতপক্ষে গায়কের মুখোমুখি হয়নি দু'দিন। একটু আগেই আশা বাড়িতে প্রবেশ করতে যেতেই সুইমিংপুলে পা ডুবিয়ে বসে থাকা অভিনব তাকে দূর থেকে দেখে কাছে ডেকে নেয়। আশাবরি পাশে এসে বসতেই অভিনব দুঃখিত গলায় বলে,
- জুথিকার কোনো খোঁজ পাইনি। কোথায় আছে কে জানে।
- কী হবে এখন?
আশার কণ্ঠ আর দৃষ্টি উদ্বিগ্ন। অভিনব চোখ সরিয়ে সুদূরের খোলা আকাশে দৃষ্টি বিছিয়ে ওই প্রসঙ্গ এড়ায়,
- বাদ দাও৷ হানিমুনে কোথায় যাবে? পাহাড়ে না সমুদ্রে? তোমার তো পাসপোর্ট ভিসা নেই,দেশে কোথাও যেতে হবে।
নতুন প্রসঙ্গটা শুরুতে আশাবরি বুঝতে না পেরে আওড়ায়,
- হানিমুন... ওঃ, পরক্ষণেই তার মাথায় বাড়ি খায় বিষয়টা। রাঙ্গা হয়ে বলে, আপনার ইচ্ছে।
- তোমার ইচ্ছে নেই কেন?
লজ্জিত আশা এবার নিজেই তিনশো ষাট ডিগ্রি কোনে প্রসঙ্গের কম্পাস ঘুরায়,
- বান্দরবানের বাড়িটার কাজ শুরু হয়েছে?
কিন্তু এতে কাজ হয় না। অভিনব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জোরপূর্বক আগের প্রসঙ্গেই আশার মুখ থুবড়ায়,
- কেন? ওখানেই হানিমুন করার ইচ্ছে নাকি?—চলছে কাজ৷ মাস ছয় লাগবে আরো।
আশাবরি পুনর্বার এই সংকোচ বিজড়িত অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ এড়ানোর চেষ্টা করে,
- বলছি,নির্বাচনে আপনার মার্কা কী হবে? আপনার তো কোনো পোস্টার আসেনি এখনো!
- ‘সিঙ্গারা। মার্কা হয়ে সিঙ্গারা।’ অভিনব বলে ভীষণ নির্বিকারে,যেন এটাই সত্য!
- সত্যি? গভীর বিস্ময় চোখে নিয়ে শুধায় আশা, লোকে তাহলে বলবে, সিঙ্গারা মার্কায় দিলে ভোট খাবার পাবে দেশের লোক? তাহলে তো চাল মার্কা দেওয়া যায়। কারণ আমাদের প্রধান খাবার ভাত।
- নাহ চাল সাইজে ছোট।
- তাও ঠিক। সিঙ্গারাই ভালো।
অভিনব একটু মুখ শক্ত করে ছদ্ম হতাশার সুরে বলে ওঠে,
- ওহ আল্লাহ, তুমি আমার কপালে জুটাইয়াছ এক গাধী,
সে আমার মাথা খায় নিরবধি।
পাতলা অভিমানে আশাবরি চুপ করে যায়। বুঝতে পারে এ তাকে উদ্দেশ্য করেই বলা।
জানো আশাবরি, হঠাৎ গায়কের সুরটা পাল্টে যায়,কী এক অসহায়ত্বের বীজ বুনে যায় তার কথাগুলো,বলে, মাঝেমাঝে মনে হয় আমি তোমার ওপর অবিচার করেছি। যে দু'টো বছর তোমার পাওয়ার কথা ছিল সেই দু'টো বছর আমি অপাত্রে দান করেছি৷ অথচ এখন সঠিক মানুষটার জন্য সঠিক আয়োজনটা করতে পারছি না।...
আশার ভেতরটা অজানা অপরাধবোধে চিড়বিড়িয়ে ওঠে। সে একটা প্রগাঢ় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে শীতলভাবে বলল,
- বাদ দিন না! আপনিই তো বলেছিলেন অতীত মনে না রাখাই শ্রেয়। তাছাড়া আমার তো কোনো অভিযোগ নেই, আপনি কেন—
কথাটা শেষ না করেই মুখ ঘুরায় আশা। শক্ত মানুষটার মন খারাপি তাকে চিনচিনে যাতনা দেয় এটা তাঁকে কে বুঝাবে?
অভিনবও ফিরতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
- সেটাই,চলো ওঠা যাক। সবাই অপেক্ষা করছে। একটু পরই ডেকোরেশন মেম্বাররা আসবে। টুকটাক কিছু সাজানো-গোছানো হবে।
সন্ধ্যা হতেই আশাবরি বুঝল মুখে যতটা সামান্য বলা হয়েছিল আদপে আয়োজন ততটা সামান্যও নয়! লোকজন যত কম আসবে ভেবেছিল অত কমও নয়! সাধারণের ওপর এতো সুন্দর করে বিয়ের সাজ সাজানো যায় তা তার কল্পনার অতীত ছিল। সারা বাড়িতে ঝাড়বাতি জ্বলছে ঝিকিমিকি করে। অকৃত্রিম ফুলের বাহার চারিদিকে৷ ছাদে নানাবিধ ফুলেল স্টেজ গড়া হয়েছে। সারা সন্ধ্যা একঝাঁক তরুণী আশাকে ঘিরে বসে দুই হাত মেহেদিতে রাঙাল। কদাচিত দু একজন তরুণ প্রেমিক পুরুষ এসে এঘরে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল। মেয়েরা তাদের উর্ধ্বশ্বাসে বিতাড়িত করে। এরা সবা-ই এই পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তরুণ তরুণীদের মাঝে কিন্তু আবার জাত্যভিমান নেই। এই বয়সে তারা কার পাশে কাকে কতটা মানিয়েছে সেটাই বিচার করে। কোন বংশীয়, কার পারিবারিক ইতিহাস কত চমকপ্রদ সেসব এদের কাছে উহ্য। আশাকে ঘিরে পুরো খাট ছেয়ে থাকা তরুণীদের মাঝ থেকে চাপা সুরে সেই আভাসই কানে আসে আশার,
‘আগে এসেছিলাম তখন খেয়াল করিনি। গায়ের রং দেখেছিস! দুধে আলতা! মেকআপ না দিলেও চলবে।’
‘আরে চোখ দেখ না। কাজল লাগবে? খোদায় তো কাজল দিয়েই পাঠিয়েছে’
'‘ ওতেই তো অভিনব ভাই আটকেছে’
যেইজন মেহেদি রাঙাচ্ছিল সে সবার হাস্য পরিহাসে যোগ দিয়ে বলল,
- হাতটা একটু শক্ত মনে হচ্ছে!’
- হবে না? সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছে কি-না! ইট বালু সিমেন্ট নিয়েই তো যত কারবার! ’
- শক্ত বলেই তো একটা বদমায়েশ মরেছে। তুমি হলে কি পারতে?
নানান কথাবার্তা,হাসিঠাট্টা চলে অনবরত। আশাবরি চোখ অবধি ওড়না টেনে দিয়ে চুপটি করে সব কথা শুনে আর মনে মনে গালি কপচায়,নির্লজ্জ বেহায়া আত্মীয়-স্বজন সব।
রাতে মহা আড়ম্বরের গায়ে হলুদ হয়। থমথমে কঠিন মানুষটা দাড়ি-গোঁফ ভর্তি ভেজা হলুদ নিয়ে আড়চোখে আশার দিকে তাকায়। আশার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করে। একে তো সবার শ্যোনদৃষ্টি তার ওপর অন্যদিকে অদ্ভুত ফিনফিনে শাড়িটা সামলাতে সামলাতে সে নাজেহাল। আঁটুনি দেখে মনে হচ্ছে এখনি গা থেকে খসে পড়ে চরম বেইজ্জতি হবে! আশার গালেও হলুদ পড়ে। একফাঁকে অভিনব আশার কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে,
- সবাই দেখছে তো, এমন চিড়বিড় করছ কেন? শাড়ির ভেতরে কি বিছা ঢুকেছে?
এতগুলো লোকের মাঝে ভরসা করার মতো একজন মানুষ পেয়ে আশা নির্দ্বিধায় বিমর্ষ-বিপন্ন কণ্ঠে বলে,
- মনে হচ্ছে খুলে পড়ে যাবে। কী করব?
- পাগলামি বন্ধ কর। কিচ্ছু হবে না।
চোখ কটমটিয়ে খ্যাঁচম্যাঁচ করে কথাটা বলেই কেটে পড়ে গায়ক।
গভীর রাত। মধ্যকাশে কাটা কুমড়োর ফালির মতোন একখানা নব্য চাঁদ নক্ষত্রহীন আকাশের গায়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। চারিদিকে গাঁক গাঁক করে লোকজন কথা বলছে। ছাদে টাঙানো সামিয়ানার পর্দায় ওই পাহাড় ছাড়া বাতাস এসে পতপত করে ঝাপটা দিচ্ছে। আশার চোখ যখন ঘুমের ভারে অবনত, ঢুলুঢুলু তখন ছাদের স্টেজে পাশাপাশি বসে আশার নিভাঁজ পেটের কাছে সূক্ষ্ম চিমটি কাটে অভিনব,
- গাধী, একদম ঝিমুবে না। ক্যামেরার দিকে তাকাও। কেক কাটা বাকি এখনো!
চিমটি খেয়ে আশা হকচকিয়ে জড়োসড়ো হয়ে শিরদাঁড়া টানটান করে বসে। বিয়ে করা যে এতো দহর কষ্টসাধ্য তা কে জানতো! জীবনে যত ধকলই আসুক,দিনশেষে সব বিস্মৃত হয়ে একটু শান্তিতে ঘুমানো যেত! এখন কি সেটাও বিসর্জিত হতে যাচ্ছে নাকি তা নিয়ে আশা সশঙ্কিত।
গায়ে হলুদের রাতে অনেক কষ্টে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে কেক কেটে সবার মুখে তুলে দিল আশা। অভিনবের কাছের বন্ধুরা যারা নিমন্ত্রিত হয়েছিল তারা খোঁচা দিল,
‘এখনও মূল কাজ বাকি ভাবি! ঝিমানো স্বভাব বাদ দিতে হয় যে!’
ছাদের স্টেজে ছোটখাটো অনুষ্ঠানটা শেষ হতেই তাকে আর উপরতলা কি নিচতলা কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। পরিত্যক্ত চিলেকোঠায় একটা পাটি আর বালিশ বিছিয়ে অপূর্ণ ঘুমটা তৃপ্তিভরে পরিপূর্ণ করে নিল সে। ঘুমটা ভাঙল একটু বেলা করে, তুলির হাঁকপাঁকে। তার ঝঞ্ঝাটময় কণ্টকাকীর্ণ জীবনে স্বপ্নের মতো সুন্দর আর অতিন্দ্রীয় আচ্ছন্নতায় একটি দিনের সুখময় অন্তে আরো একটি স্বপ্নময় দিনের সূচনা হলো। এই যুগান্তকারী দিন তার জীবন-সারথিকে ভিন্ন মোড়কে প্রত্যাবর্তিত করবে।
সকাল সকাল অভিনব বিছানা ছেড়ে উঠে চারিদিকের কাজকর্মের হাটহদ্দ জেনে নিল৷ একে-ওকে ছোট-বড় কিছু দরকারি ফরমায়েশ দিয়ে ফিরল ঘুরে ঘুরে। কী এক ভীষণ কাজে ছোটাছুটিতে ব্যস্ত তুলিকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
- দেখ তো আশাবরি কোথায় টাল হয়ে পড়ে আছে। ডেকে দাও আর আমার কাছে একটু আসতে বলো।
তুলি আজ্ঞা নিয়ে চলে গেলে অভিনব পেছনের হলঘরের পাশে বাবুর্চিদের শোরগোলপূর্ণ ডিপোর দিকে এগোল। ওদিকটার একটু খোঁজখবর নেওয়া জরুরি। হঠাৎ তার চোখ কাড়ল দূরের একজন বোরকাওয়ালির ক্ষীণ হাতের ইশারায়। অভিনব সকালের কড়া রোদ্দুরে চোখ কুঁচকে তাকাল সেদিকে,পরক্ষণেই আশেপাশে৷ চারিপাশে অবাধ লোকসমাগম,হাঁকাহাঁকি, ব্যস্ততা বেড়েই চলেছে ধীরে ধীরে। তবে এদিকটা একটি নিরজন আছে। কালেভদ্রে দু'একটা ছেলেপেলের দল দৌড়ে আসে, আবার ফিরে যায় । অভিনব কৌতুহলী হয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে রাখতে এগিয়ে গেল সেদিকে। একপর্যায়ে সামনে এসেই বোরকাওয়ালিকে চিনতে পারল অভিনব। জুথিকা! তার অবিবর্জিত দুঃস্বপ্ন। সে চারদিকে আশু সতর্ক দৃষ্টির জাল বিছিয়ে দিয়ে চাপা উত্তেজিত স্বরে বলল,
- তুমি এখানে কী করছ জুথিকা!—এসো আর সাথে। সবকিছুর হিসাব দিবে তুমি।
বলেই খপ করে বোরকাওয়ালির হাতটা চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে পাছদুয়ার দিয়ে অন্দরে প্রবেশ করে গোপন পথে নিজের ঘরে চলে আসে সে।
- কী চাও তুমি?
আপাদমস্তক বোরকাবৃত জুথিকে জোর ধাক্কায় ঘরে পশিয়ে আস্ফালন করে অভিনব। জুথিকা অবিচল ভঙ্গিতে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ থেকে হিজাব উন্মুক্ত করে বলে,
- তোমার বিয়ে আর আমি আসব না?তা কী করে হয়?
- অনেক সহ্য করেছি তোমার বেলাল্লাপনা। এবার তুমি দেখবে আমি কী করতে পারি৷ ইহিতাকে তুমি কী বলেছ? কেন বলেছ?
রাগে চোখেমুখে অন্ধকার দেখে অভিনব। চোখ দিয়ে তার আগুনের ফুলকি টিকরে টিকরে বেরোয়।
জুথিকার চোখে বাসি অশ্রু জমা হয়।
- এমন করো না। কাতরোক্তিটা করেই জুথিকা অভিনবের একেবারে কাছাকাছি এগিয়ে আসে, আমি শেষবার তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। শেষবার। আল্লাহর কসম।
-তুমি...অভিনব রোষে ফেটে পড়ে কিছু একটা বলতে যেতেই অকস্মাৎ কটাস করে দরজাটা খুলে গেল। দরজার পেছন থেকে ঘুম ফোলা ভারী মুখে বেরিয়ে এলো গতকালের সেই শাড়ি পরিহিতা আশাবরি। এই প্রথম আশাবরিকে দেখে ভয়ে অভিনবের হৃৎপিণ্ডটা কেঁপে উঠল। অন্তত আজকের মাহেন্দ্রক্ষণে আশাবরি কোনোপ্রকার স্নায়বিক আঘাত পাক্ এটা তার অন্তরাত্মা মোটেও প্রত্যাশা করেনি।
চলবে...
আগের পর্ব
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/847374226068075/

পেইন্টিং
পেইন্টিং
লেখকঃ আবু তালহা মো. ওয়াসি
পর্বঃ০২
সিয়াম সাহেব তার অফিসের কলিগ তালেব চৌধুরীকে ফোন করলো। তালেব চৌধুরী সিয়ামের চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র হলেও অফিসের সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক তার সাথে সিয়ামের। তালেব চৌধুরী একজন সখের গোয়েন্দা। তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার জুড়ি নেই। এইতো সেইদিন সিয়ামদের অফিসের স্টক থেকে প্রোডাক্ট গায়েব হওয়ার সমস্যাকে কী চমৎকার ভাবেই না তিনি সমাধান করলেন। নানা গবেষণা ও ধারণাকে কাজে লাগিয়ে শেষমেশ অপরাধীকে ধরে ফেললেন।
"ক্রিংক্রিং"
" হ্যালো"
"হ্যালো তালেব ভাই আমি সিয়াম। আপনার সাথে একটু কথা ছিল।
" হুমম বলো।"
সিয়াম সাহেব এখন পর্যন্ত ঘটা সব ঘটনা তাকে খুলে বললো।
"আচ্ছা ওই পেইন্টিংটা নিয়ে আমার বাসায় আসো।এরপর দেখি কী করা যায়।
" আচ্ছা তালেব ভাই আমি আজ বিকালেই আসছি।"
"আচ্ছা।"
"আআআআআ--"
বাথরুম থেকে ডলি চিৎকার দিয়ে উঠলো।সিয়াম দৌড়ে বাথরুমের কাছে গেল।
"কী হয়েছে ডলি।"
সিয়াম জোরে দরজা ধাক্কানো শুরু করলো।
"ডলি দরজা খুললো।"
সিয়াম জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলো। অনেকক্ষণ পর ডলি দরজা খুললো।
"ডলি কী হয়েছিলো। চিৎকার দিয়ে উঠলে যে।আর দরজা কেন খুলছিলে না।"
"কই না তো।আমি আবার কখন চিৎকার করলাম।"
"আমি আর তন্ময় শুনলাম।তাই না তন্ময় বাবা?"
"হুমম আম্মু আমিও শুনেছি।" ৪ বছরের ছেলে তন্ময় বলে উঠলো।
"তোমার ঘাড়ের পাশে লাল কী ওটা। ওমা এতো রক্ত! তুমি ব্যাথা পেলে কখন?"
" কই। ওও। কী জানি? জানি না কখন এমন হয়েছে।আচ্ছা আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি তোমরা ফ্রেশ হয়ে আসো কেমন।"এই বলে ডলি চলে গেল। সিয়াম হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। কী যে হচ্ছে তার সাথে কে জানে?
সিয়াম ফ্রেশ হয়ে তন্ময়কে কোলে নিয়ে ডাইনিং রুমে আসলো। হঠাৎ সিয়াম দেখতে পেল ডলি সোফায় বসে পেইন্টিংটা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে।
"ডলি এই ডলি।"সিয়াম ডেকে উঠলো।
" হ্যা হ্যা বলো।"
"কী দেখছিলে পেইন্টিংটাতে।আর বিড়বিড় করে কী বলছিলে।"
"কই কিছু নাতো। আমি কী কথা বলবো। এই পেইন্টিংটা কেন জানি দেখলে মনে হয় শুধু দেখতেই থাকি তাইনা।
ডলি আবার বিড়বিড় করে কী জানি বলছে।
" এই ডলি এই। কী হয়েছে তোমার?"
"হুমম। কিছু না। আমি খাবার বাড়ছি। তোমরা বসো?"
সিয়াম খাচ্ছে। হঠাৎ ডলির দিকে তাকিয়ে দেখে সে পেইন্টিংটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তন্ময় বেচারা কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে খাইয়ে দেওয়ার জন্য ডলি সেদিকে খেয়ালই নেই।
"ডলি এই ডলি।"
"হুমম "
"কী হয়েছে তোমার?"
"সে হারিয়ে গেছে। তাকে আর কখনো পাওয়া যাবে না।" ডলি বলে উঠলো।
" কে হারিয়ে গেছে?"
"কে-কেউ না।"এই বলে সে চুপচাপ তন্ময়কে খাওয়ানো শুরু করলো।
লাঞ্চ শেষে ডলি ও তন্ময় ঘুমিয়ে গেলে সিয়াম পেইন্টিংটা নিয়ে তালেব চৌধুরীর বাসায় গেলেন।
" টিংটিং"
"কে?"
"তালেব ভাই আমি সিয়াম।"
তালেব চৌধুরী দরজা খুললো।
"এসেছো তাহলে। অনেকক্ষণ ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।"
"সরি তালেব ভাই। একটু দেরী হয়ে গেল।"
"আসো বসো।"
সিয়াম ও তালেব সাহেব সোফায় বসলেন।
"তোমার ঘটনা শুনে আমি বিভিন্ন দিক দিয়ে স্টাডি করলাম। এরকম অদ্ভূত কেইসের বিষয়ে অনেক বই পড়েছি। বিভিন্ন রাইটার বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে প্যারানর্মাল কনসেপ্ট টাকে বর্ণনা করেছেন। তুমি যা বলেছ তাকে এখনো প্যারানর্মাল ইভেন্ট বলা যায় না। উই নিড সাম মোর এভিডেন্স। ছবিটা দেখাও তো।"
"এই নিন তালেব ভাই।"
"হুমম বেশ ইন্টারেস্টিং তো ছবিটা। কী সুন্দর কারুকার্য। মেয়েটার জামায় এই লাল রঙটাতো ছবিটাকে আরো সুন্দর করে দিয়েছে।"
"লাল রঙ!"
"হুমম এই যে। " তালেব সাহেব পেইন্টিংটাতে সেই জায়গাটি দেখালো।"
"তালেব ভাই এটাতো আগে ছিলো না।"
"কী বলছো কী। দেখে তো মনে হশ এটাও আর্টের একটা পার্ট।
"এটা সত্যিই ছিল না।"
"আচ্ছা আমরা এককাজ করতে পারি। তুমি যা বলছো তা যদি সত্যিই কোন প্যারানর্মাল ইভেন্ট হয়ে থাকে তাহলে আজ রাত আমাকে এই ছবিটা দিয়ে যাও। আমি এই ছবিটাকে পাহাড়া দিব। দেখি আদৌও কোন অদ্ভূত ঘটনা ঘটে নাকি আমার সাথে।"
"না তালেব ভাই এতে ক্ষতি হতে পারে। রনি অলরেডি খুন হয়েছে। এখন এই ছবির সাথে একা থাকার কোন প্রশ্নই ওঠে না।"
"আরে কিচ্ছু হবে না।সমস্যা নেই।"
সিয়াম কিছু বলতে যাবে তখন তার ফোন বেজে উঠলো।
"ক্রিংক্রিং"
"হ্যালো।"
"হ্যালো সিয়াম সাহেব। আমি ইন্সপেক্টর ফরহাদ বলছি। আপনার বন্ধু রনির লাশটা পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করে তার লাশটা নিখোঁজ হয়ে গেল।"
"মানে?"
"আপনি এক্ষুনি থানায় আসতে পারবেন ওখানেই আপনাকে সব খুলে বলবো?"
"আচ্ছা আমি আসছি।"
ফোন রাখতেই তালেব চৌধুরী জিজ্ঞেস করলো
" কী হয়েছে?"
"ইন্সপেক্টর সাহেব ফোন দিয়েছিলো। রনির লাশ নাকি পাওয়া যাচ্ছে না।আমাকে ডেকেছে।আমার এক্ষুনি যেতে হবে তালেব ভাই।"
"আচ্ছা আমিও আসছি তোমার সাথে।"
"চলেন ভাই।"
"আরে সিয়াম তুমি।কখন এলে?"
তালেব সাহেবের স্ত্রী আফরোজা বেগম জিজ্ঞেস করলেন।
"এইতো আপা একটু আগে। তালেব ভাইয়ের কাছে একটা কাজে এসেছি।"
"কী কাজ?"
"ওতোসতো তোমার জানা লাগবে না। আমরা দুজন একটু বাইরে যাচ্ছি। তুমি ছেলেদের দেখে রেখ।" তালেব সাহেব বিরক্তির সাথে বললেন।
"আচ্ছা আচ্ছা।"
সিয়াম ও তালেব চৌধুরী দুজনই দ্রুত পুলিশ স্টেশনে গেল।
"আসসালামু আলাইকুম ইন্সপেক্টর সাহেব।"
"ওয়ালাইকুম আসসালাম সিয়াম সাহেব। উনি কে?"
"উনি তালেব চৌধুরী। আমার অফিসের বড় ভাই।"
"আচ্ছা আচ্ছা। আপনারা বসুন।"
"ইন্সপেক্টর সাহেব রনির লাশ নিখোঁজ হলো কীভাবে?"
" ওর লাশটা আমাদের মর্গ রুমে ছিলো।পোস্ট মর্টেম করার পর সেখানেই ছিল। হঠাৎ আজকে সকালে মর্গের ইনচার্জ দেলোয়ার মিয়া এসে বললেন মর্গের একটা লাশ পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা বললাম পাওয়া যাচ্ছে না মানে। মৃত লাশ কীভাবে হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যায়। সে তখন উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করে।সে নাকি রাতে মর্গ রুমে কার গানের আওয়াজ ও হাটার আওয়াজ শুনেছে।আর সেসব শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গেছে।তার কথা শুনে আমি চেক করতে যাই।সত্যি সত্যিই রনির লাশ আর পাওয়া যাচ্ছে না।আমরা লাশটা খোজার চেষ্টা করছি।"
সিয়াম ও তালেব সাহেব দুজনই হা করে তাকিয়ে রইলেন।
"আচ্ছা দেলোয়ার মিয়াকে একটু ডাকা যাবে? তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার ছিলো?"
"জ্বী আচ্ছা।" ইন্সপেক্টর সাহেব টেলিফোনে ফোন করে দেলেয়ার মিয়াকে আসতে বললেন।
কিছুক্ষণ পর দেলোয়ার মিয়া আসলেন।
"আসসালামু আলাইকুম স্যার।"
"ওয়ালাইকুম আসসালাম। আপনাকে একটা জরুরী কাজে ডেকেছি। ওনারা আপনার থেকে কিছু কথা জানতে এসেছে।"
" জ্বী স্যার বলুন।"
"দেলোয়ার মিয়া আপনি কোথায় বসে মর্গ রুমটাকে পাহাড়া দেন?
" রুমের গ্লাসের গেটের বাইরে বসে স্যার।"
"আপনি কালকে রাতে থেকে যা যা দেখেছেন সব বলুন।"
"আমি কালকে রাতে মর্গের সব লাশ চেক করার পর গেটের বাহিরে এসে বসি। অন্যান্য দিন আমার ক্লান্তি না লাগলেও কালকে কেন জানি আমার অনেক ক্লান্তি লাগছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো মর্গ রুমের ভেতরে কে জানি গান গাচ্ছিলো আর হাটছিলো। আমি ভেতরে চেক করে দেখি কেউ নাই। বাহিরে এসে আবার সেই গান আর হাটার আওয়াজ।এভাবে চলতে চলতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম বুঝতে পারি নি। সকালে উঠে মর্গ রুমে যেয়ে দেখি একটা বেডের চাদর নিচে পড়া আর লাশ নাই। অথচ আগের রাতে মর্গের সব বেডে লাশ ছিল।"
"আপনি রাতে গাজা বা মদ খেয়েছিলেন নাকি দেলোয়ার মিয়া?" ইন্সপেক্টর ফরহাদ জিজ্ঞেস করলেন।
"না স্যার বিশ্বাস করুন আমি এসব খাই না।"
"আচ্ছা আপনি এখন আসতে পারেন।"
"জ্বী স্যার আসসালামু আলাইকুম। "
"সবই তো শুনলেন আপনারা। সে কাল রাতে গভীর ঘুমে ঘুমাচ্ছিলো তখন কেউ লাশটা চুরি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো রনির লাশ কে চুরি করলো?"
"আমরা জানি না স্যার।" সিয়াম বললো
"আচ্ছা আমরা দেখছি ব্যাপারটা।আপনারা কিছু জানলে অবশ্যই জানাবেন।আপনারা আসতে পারেন।"
"আচ্ছা স্যার আসসালামু আলাইকুম। "
"ওয়ালাইকুম আসলাম। "
সিয়াম ও তালেব সাহেব যে যার বাসায় চলে গেল। সিয়াম দ্বিধায় পড়ে গেল তালেব চৌধুরীর কাছে পেইন্টিংটা দিয়ে তিনি ঠিক করলেন কিনা।বাসায় যেতেই ডলি জিজ্ঞেস করলো
"তুমি পেইন্টিংটা কোথায় নিয়ে গিয়েছো?"
ডলির এরকম আকস্মিক প্রশ্ন করায় সিয়াম হকচকিয়ে উঠলো।
"আমি আবার পেইন্টিংটা কোথায় নিয়ে যাব?"
"তুমি মিথ্যা বলছো। তুমিই নিয়ে গিয়েছো!"
ডলিকে এতো ক্ষিপ্ত হতে আগে কখনো দেখেনি সিয়াম।
"শান্ত হও ডলি। আমি পেইন্টং কোথাও নেই নি। আমি তো তালেব ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।উনি অফিসের একটা কাজ নিয়ে আলোচনা করতে আমাকে ডেকেছিলেন।"
"ওওও আচ্ছা।" ডলি হতাশ হয়ে বললো
" সমস্যা নেই। পেইন্টিংটা খুজে দেখ ভালো করে।না পেলে আমার কাছে পেইন্টিংটার ফটো আছে। অন্য কোন আর্টিস্ট দিয়ে বানিয়ে নিব।"
ডলি সিয়ামের কথায় সন্তুষ্ট হয়ে অন্য রুমে চলে গেল।
রাত ১০ টার সময় সিয়াম তালেব সাহেবকে ফোন করলেন।
"হ্যালো তালেব ভাই।"
"হ্যা সিয়াম বলো।"
" আপনি জোরাজোরি করায় পেইন্টিংটা আপনার বাড়িতে রেখে আসলাম। রাত হয়ে গেছে। কিছু খেয়াল করলেন কী?"
"না এখনও সেরকম কিছু পাইনি। তুমি টেনশন করো না। আমি আজ রাত পেইন্টিংটা পাহাড়া দিব। কালকে তোমাকে জানাবো।"
"আচ্ছা তালেব ভাই। বি কেয়ারফুল।"
"ডোন্ট ওয়ারি। এভরিথিং উইল বি অলরাইট।গুড নাইট।"
"গুড নাইট তালেব ভাই।"
সিয়াম ফোন রেখে দিলেন।
তালেব সাহেব সারারাত জাগার জন্য দু কাপ কফি খেয়ে নিলেন। পেইন্টিংটাকে তার বিছানার পাশে রেখে টিভি দেখতে লাগলেন। তার স্ত্রী আফরোজা আর দুই ছেলে রাফসান ও রাকিব অন্য একটি রুমে ঘুমাচ্ছে। তালেব চৌধুরী টিভির ফাঁকেফাঁকে পেইন্টিংটার ওপর নজর রাখছে।টিভি দেখতে দেখতে অনেক রাত হয়ে গেল। তালেব সাহেব ঘড়িতে দেখলেন রাত ২ টা বাজে। তিনি টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লেন। হঠাৎ তার গায়ে কে যেন জোরে ধাক্কা দিয়ে উঠলো। তালেব সাহেব ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসলেন। তিনি তার বিছানায় রনির লাশটিকে দেখতে পেলেন।
"এ কী করে সম্ভব। রনির লাশ আমার বেডে আসলো কী করে? ওর লাশ তো নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।"
হঠাৎ তালেব সাহেব কার জানি গানের আওয়াজ ও পায়ে হেটে আসার আওয়াজ শুনতে পেলেন।
"কে? কে গান গায়?"
তালেব সাহেব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন।কে যেন মেয়েলি কন্ঠে বলে উঠলো "আমি।"
গানের আওয়াজ ও হাটার আওয়াজ ক্রমশ বেড়েই চলছে। হঠাৎ করে গানের আওয়াজ ও হাটার আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। তালেব চৌধুরী দেখলেন তার বেডে রনির লাশটি নেই। তাহলে কী তার এতক্ষণ হ্যালোসিনেশন হচ্ছিলো। তালেন সাহেব কিছুই বুঝতে পারলেন না।
"তালেব তালেব।" কে যেন তালেব সাহেবকে ডেকে উঠলো।
"কে?"
"আমি। এসো আমার কাছে।"
তালেব চৌধুরী লক্ষ করলেন আওয়াজটা বাথরুম থেকে আসছে। সে ভয়ে ভয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।বাথরুমের দরজা খুলে সে কাউকে দেখতে পেলেন না। হঠাৎ বাথরুমে দরজা বাইরে থেকে লক হয়ে গেল আর বাথরুমের লাইট অফ হয়ে গেল।
"ক্রিংক্রিং"
সকাল ৮ টায় সিয়ামের ফোন বেজে উঠলেন।
"হ্যালো।"
"হ্যালো সিয়াম। আমি আফরোজা। তালেবকে খুন করা হয়েছে।তালেব আর নেই।"
এই বলে আফরোজা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
"বলেন কী আপা।তালেব ভাইকে খুন করা হয়েছে!"
"হুমম। ও কালকে অন্যরুমে ঘুমিয়েছিলো।বললো কী না কী জরুরী কাজ।সকালে উঠে দেখি ওর রুমের বাইরে রক্ত।তারপর ওর রুমে যেয়ে দেখি--"
আফরোজা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
"আচ্ছা আপা। আমি আসছি। আমি পুলিশকে ফোন করে দিচ্ছি। তারা আসবে।"
"আচ্ছা আসো।"
আফরোজা বেগম কাঁদতে কাঁদতে ফোন কেটে দিলেন। ডলি জিজ্ঞেস করলো
"কী হয়েছে?"
" তালেব ভাইকে কে যেন খুন করেছে। আফরোজা ভাই ফোন দিয়ে বললো।আমি এক্ষুনি তালেব ভাইয়ের বাসায় যাব।"
"সো স্ট্রেঞ্জ। প্রথমে রনি ভাই এখন আবার তালেব ভাই। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।"
"আমারো একই কথা। এত তাড়াতাড়ি অদ্ভূতভাবে দুটো খুন হয়ে গেল আর আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।যাইহোক আমি তালেব ভাইয়ের বাসায় যাব।তুমি তন্ময়কে নিয়ে সাবধানে থেকো।"
"আচ্ছা।"
সিয়াম পুলিশকে ইনফর্ম করে তালেব সাহেবের বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।
--(চলবে)--
গল্পের প্রথম পর্বের লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/844821749656656/
কবিতাঃ অবিচার
কবিতাঃ অবিচার
পড়ন্ত বিকেল অার এক রুপবতী মেয়ে
হায়েনারা পাশ মাড়িয়ে দেখে খারাপ চোখে চেয়ে
ধর্ষিত মেয়ের ক্লাম্ত নিথর দেহ পড়ে থাকে মাঠে প্রান্তরে
হায়েনারা নাগালের বাইরে,
কোন এক অচেনা বন্দরে।
গলা টিপে হত্যা করা হয় মানবতা
তদন্তে অপরাধীর মুখোস উম্মোচিত হয় লোকসম্মুখে
অর্থের লোভে উকিলরা লড়ে যায় নিঃসংকোচে
ব্যথা দেয় বিচারকের নিরবতা।
ছোট্ট শিশুগুলো অনাহারে মারা যায়
মানুষ সম্পদের মোহে অপরকে ঠকায়।
মূল্যহীন প্রেমিকের অবুঝ ভালোবাসা প্রেমিকার কাছে পরাজিত হয়ে হৃদয়ের ক্ষত বাড়ে
শোক অসুখে মরদেহ তার ভেসে উঠে খরস্রোতা নদীর পাড়ে।
শরতের সন্ধ্যায় ফ্যানের সাথে একটি ঝুলন্ত লাশ
বিবাহিত নারীর অার্তনাদ অার নির্দয় স্বামীর সুখ বিলাস
বৃদ্ধাশ্রমে দম্পতির শোকের প্রলাপ ব্যথা দেয় মনে
বিকেলবেলা পার্কের বেঞ্চিতে বসে বউয়ের সাথে খুনসুঁটি
অামি হতাশ হয়ে দেখি গিয়ে রেস্টুরেন্টে পায়ে গুটি গুটি,
স্বামী ভালবেসে যায় নির্জনে।
অামি প্রতিরাতে শুনি চাকরি না পাওয়া তরুণের অাহাজারি,
সম্পর্ক ভাঙনের হাহাকার
অামি তাকিয়ে দেখি কত ব্যভিচার অার অনাচার
ধর্ম নিয়ে মানুষ রাজনীতি করে;
মানুষের সাথে মানুষ দ্বন্দে জড়ায়;
কত নিরপরাধ প্রাণ অকালে ঝরে যায়
তবুও ধর্মান্ধদের বিবেক নাড়া দেয় না বলে আমি হতাশ।
~রাজীব আহমেদ সুজন
রৌদ্রছায়া
রৌদ্রছায়া
৫.
মঞ্জুরী হা করে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে।টিভিতে বাচ্চাদের একটা কার্টুন দেখাচ্ছে। মঞ্জুরী মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেই কার্টুন দেখছে। মনে হচ্ছে তার মুখটা আরেকটু বড় হলে পুরো টিভিটাই সে গিলে ফেলত।কিন্তু আফসোস, মাঞ্জুরীর মুখটা টিভি গেলার পক্ষে যথেষ্ট বড় নয়!
রোদ্দুরে পিঠ জানালার ঠিক গা ঘেঁষে বসে মাথা নুইয়ে সরোজ বই পড়ছে।এমন পৌষের দুপুরে আদুরে রোদে বসে প্রিয় বই পড়ার মতো আনন্দ আর কিসে আছে?
তবে নানান কারণে বইয়ে সে ঠিক মতো মন দিতে পারছে না।তারমধ্য অন্যতম একটি হল মঞ্জুরী টিভির ভলিউম খুব বাড়িয়ে দিয়েছে । বাড়িতে লোকজন না থাকলে সে সবসময় এভাবেই টিভি দেখে।তাছাড়া ওপরের ঘরে একজন লোক রয়েছে। যদিও বেচারার পুরোপুরি সুস্থ নয়,এক পা অচল।তবুও বলা তো যায় না। হুট করে যদি এখানে চলে আসে!তখন তো সর্বনাশ হয়ে যাবে।
এসব ভেবে সে বই পড়ায় মন দিতে পারছে না।
আবদুর রহমান তার হাতে বাড়ির চাবি তুলে দিয়ে চলে যাওয়ার পর হতে সে এবাড়িতেই আছে।
এবাড়ির ঠিক পেছনেই তাদের বাড়ি।তাই দু'বাড়ির মাঝে যাতায়াতের কোন অসুবিধা নেই । তবে সরোজ এখানে আসে খুব কম।এবাড়ির লোকগুলো একটু পাগলাটে ধরনের।কোনো এক অজানা কারনে রুবিনা তাকে একদম সহ্য করতে পারেন না। দেখলেই কেমন ফোসফাস করতে থাকেন। তাছাড়া নেহাল চৌধুরীর মেয়ে তিনটির মাথাও বোধহয় হালকা গন্ডগোল আছে। কোনো রকম কারণ ছাড়াই এরা দিনরাত হাসে,আর হাসতেই থাকে ।তবে এবাড়ির বড় বউ টিকে তার খুব পছন্দ। ভারি ভালো মেয়ে। ভালো লাগার আরেকটি কারণ হলো একমাত্র সায়মা ভাবিই তাকে তার ঠিক নামটা ধরে ডাকে।
এছাড়া অন্য সবাই তাকে রুবিনার দেয়া নামেই ডাকে।এবাড়িতে যেদিন সে প্রথম এল, তখন সে খুব ছোট। রুবিনা তাকে কাছে ডাকলেন। ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার নাম কি বাবু?'
সে তখন মাথা নেড়ে চোখ মুখ উজ্জ্বল করে বলল,'আমার নাম সরোজ।'
রুবিনা ভুরু কুঁচকালেন।,'সরোজ! নামটায় কেমন যেন একটা ছেলে ছেলে ভাব আছে। এমন ছেলে ছেলে নাম শুনে বড় হতে থাকলে একসময় আপনাতেই স্বভাব ছেলেদের মতো হয়ে যাবে।
শোন বাবু,তোমাকে আজ থেকে আমি সরোজু ডাকব,আর কেউ ডাকুক বা না ডাকুক।আমি ডাকব, কেমন? '
সরোজ সেদিন বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে ছিল।
তারপর এই নামই বিশেষ ভাবে অনুমোদন প্রাপ্ত হল সকলের কাছে।
সরোজ বইয়ে মন দিতে চেষ্টা করলো। তার পড়নে হালকা আকাশী রঙা ফুলহাতা জামা।এই নির্জন দুপুরেও তার মাথায় বড় করে ঘোমটা দেয়া।যখনই বেখেয়ালে মাথার কাপড় টা খসে যাচ্ছে সাথে সাথেই সে আবার জড়িয়ে নিচ্ছে।
বারবার এই একই কাজের পুনরাবৃত্তি দেখে মঞ্জুরী একবার বিরক্ত হয়ে বলল,'আফু,আপনে মাথার কাপড় সরান না কেন? এইখানে তো আমি আর আপনে ছাড়া আর কেউ নাই।মাথায় কাপড় না দিলে সমস্যাটা কি?
মাইয়া হয়া মাইয়া লোকের সামনে আবার কিসের পর্দা? '
সরোজ ছোট একটা নিশ্বাস ফেললো।সব কথা সবাইকে বোঝানো যায় না।মঞ্জুরীও সেই সবারই দলে।সরোজ খুবই ক্ষীণ স্বরে বলল,'তুমি বুঝবে না মঞ্জুরী।'
মঞ্জুরী কিছু বলল না। সে বোধহয় কথাটা শুনতেও পায় নি।কারণ সরোজু কে প্রশ্ন করেই সে আবার টিভি দেখায় মন দিয়েছে।
বা-পা টা বিছানায় তুলে ডান-পা নিচে ঝুলিয়ে সাফওয়ান বিছানায় বসে আছে।সে একইসাথে ভীষণ বিরক্ত ও রাগান্বিত।সবাই বিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়োনোর পর পরই মাঞ্জুরীকে ডেকে সে বলেছিল কড়া লিকার দিয়ে এককাপ চা দিতে।অথচ এখন বাজে দুইটা সাইত্রিশ। এখন পর্যন্ত মঞ্জুরীর কোন দেখা নেই!
সকাল থেকেই তার মাথাটা ধরেছে।বুবু ভীষণ ব্যাস্ত ছিল তাই বুবুকে জানায় নি।পরে হয়তো দেখা যাবে এই এক কারণে বুবু আর বিয়েতেই যাচ্ছে না।এমনিতেই সাফওয়ান যেতে পারছে না বলে সে খুব মন খারাপ করেছে।
বুবু বলেছিল কোন এক সরোজ না আরোজ কাকে যেন রেখে যাবে। তারও কোন পাত্তা নেই। এরা সব করছে টা কি?
এখন এই খোড়া পা নিয়ে বিছানায় বসে থেকে সে কি করতে পারে ? অন্য কেউ হলে হয়তো এখান বসেই গলা উঁচিয়ে মঞ্জুরী... মঞ্জুরী বলে চেচাঁত।কিন্তু চেচাঁমেচি করা সাফওয়ানের স্বভাবে নেই।সে চাইলেও কারো সাথে গলা উঁচিয়ে কথা বলতে পারে না।সে কথা বলে শান্ত গলায়, নম্র স্বরে।
তবে এখন কি করা যায়?এরা কি তাকে দুপুরে খেতেও দেবে না ?
পড়া থামিয়ে সরোজ হঠাৎ বই থেকে মুখ তুলে মঞ্জুরীর দিকে তাকালো।আতঙ্কিত হয়ে বলল,মঞ্জুরী....।'
মঞ্জুরী টিভি থেকে মুখ ফেরাল। এদিকে তাকিয়ে হাই তুলতে তুলতে দায়সারা ভাবে বলল,'কি হইছে আফু? চিল্লান কেন? এতদিন পর শান্তিতে একটু টিভিডা দেখতাছি......হের মদ্যেও ডিসটাব।'
-'মঞ্জুরী, তুমি দুপুরের খাবার ওপরে পাঠিয়েছো তো?' সরোজ ফের আতঙ্কিত স্বরে বলল।
মঞ্জুরী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সে শুকনো ঢোক গিলল।, 'হায় আল্লাহ! আমার তো খেয়াল নাই।ভাইজান তো ঠিক দুইটায় দুপুরের খানা খায়।এখন কি হইবো, আফু?'
সরোজ ততক্ষণে রান্নাঘরে ছুট লাগিয়েছে।রান্নাঘরে গিয়ে সে তাড়াহুড়ো করে খাবার বাড়তে লাগলো। মাথার কাপড়টা কখন খসে পড়েছে সে টের পায় নি। হঠাৎ সে শুনতে পেল একজোড়া পায়ের শব্দ রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। সরোজ বিশেষ ভাবলো না। এই নির্জন দুপুরে মঞ্জুরী ছাড়া আর কে এখানে আসবে?
সে আরকিছু ভাবার সময় পেল না। হঠাৎ রান্নাঘরে সেই দীর্ঘদেহী সুদর্শন যুবা পুরুষটি এসে দাঁড়ালো। একদম মুখোমুখি চোখেচোখ রেখে।
সরোজর শরীরে হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল।ভীত হরিণির মতো অস্থির হয়ে সে এদিকওদিক চাইতে লাগলো।সে এখন পালাবে কোথায়? পালানোর পথেই যে লোকটা দাঁড়িয়ে!
হাত থেকে পানির গ্লাস টা পড়ে ঝনঝন শব্দ তুলে চারিদিকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল।সে অস্থির হয়ে মাথা নিচু করে কাঁপা কাঁপা হাতে মাথার কাপড় টানতে লাগলো।
সাফওয়ান হঠাৎ কিছু বুঝে উঠতে পাড়লো না। ধীরে ধীরে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। মেয়েটা বিদ্যুৎের গতিতে বেড়িয়ে গেল।
সাফওয়ান স্তম্ভিত হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো।নিচে তাকিয়ে দেখল পুরো মেঝেতে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এবং এক জায়গায় কয়েক ফোটা রক্ত।রক্ত দেখে সাফওয়ানের মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগলো। সে বুঝতে পারলো না মেয়েটা এতো মরিয়া হয়ে ছুটল কেন?
সে কি এমন বিপদজনক কেউ যাকে দেখে ভাঙা কাঁচের টুকরোর ওপর পা দিয়েই দৌড় পালাতে হবে?
-'ভাইজান, ভাইজান। 'গলা ফাটিয়ে চেচাঁতে চেচাঁতে মঞ্জুরী রান্নাঘরে এসে দাঁড়ালো। চঞ্চল হয়ে বলল,'ওহ, আপনি এইখানে?
কাটা পা নিয়া আপনি বেড় হইছেন কেন? অক্ষণ ঘরে চলেন।ভাবি জানলে আমার খবর আছে। আপনি অক্ষণি ঘরে যান।আপনার খাবার আমি দিয়া আসতাছি।'
সাফওয়ান কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে গেল। কিছু না বলে চুপচাপ হেটে নিজের ঘরে চলে গেল।
সরোজ দ্রুত পায়ে হেটে বাড়ি ফিরে এল।শীতের দুপুরে তাদের রৌদ্রমাখা ছোট্ট বাড়িটা কেমন খাঁ খাঁ করছে।ঘরে এসেই সে দরজাটা শক্ত করে বন্ধ করে বিছানায় বসে পড়লো। ঝরঝর করে কাঁদতে লাগলো। একটা ছেলে তাকে দেখে ফেলেছে। তার তো অনেক গুনাহ হয়েছে।এখন সে কি করবে।সরোজ দু'হাতে নিজের মুখ খামচে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো।তারপর হঠাৎ দু'হাতে মুখ জড়ো করে বলতে লাগলো, 'আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দাও,আমাকে মাফ করে দাও।'তারপর অনবরত বলতেই লাগলো।
______________
পুরো ঘর জুড়ে নিকষ আঁধার।থমথমে ভাব।মাঝে মাঝে শুধু আরামকেদারা টায় হালকা শব্দ হচ্ছে।
দরজায় হঠাৎ একটা মরমর শব্দ উঠল।তারপর সেটা ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগলো। কে এসেছে ঠিক বোঝা গেল না।
সাফওয়ান শূন্য দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।অবাক করা হলেও সত্যি যে,এই মূহুর্তে ঘরে কে এসেছে সে বিষয়ে সাফওয়ান বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করছে না। কেন করছে না তা সে নিজেও জানে না।হঠাৎ করেই নিজেকে তার ভীষণ অসুস্থ মনে হচ্ছে।শরীর ও মন দুই'ই ভীষণ রকমের খারাপ। খুব খারাপ কোন অসুখ কি তার হয়েছে? কিন্তু কি অসুখ?
সেই দুপুর-বিকেলের সন্ধিক্ষণের আগ পর্যন্তও তো সে ভালো ছিল। তারপর হঠাৎ কি হল?
নিজেকে এত অসহায় মনে হচ্ছে কেন? এতটা শূন্য, এতটা বিবশ কেন লাগছে?
কেউ একজন মাথায় হাত রাখল।রিনরিনে গলায় বলল, ' সাফওয়ান......, সাইফু...ঘুমিয়ে পড়েছিস?'
সাফওয়ান ভান করতে জানে না।সে বোনের হাতটা ধরে নিজের হাতের মধ্যে পুরে নিল।আদুরে গলায় বলল, 'বুবু, দেখ তো আমার কপাল জ্বর আছে কিনা? '
-'ওমা!কি বলিস এসব? হুটহাট কারণ ছাড়া জ্বর হতে যাবে কেন? তুই আমার হাতটা ছাড়।আমি বাতি জ্বালিয়ে আসছি।'
-'বাতি জ্বালাতে হবে না বুবু।তুই পাশে বসে থাক।'
-'কিরে বাবু,কি হয়েছে তোর।শরীর খারাপ লাগছে? '
-'উহু।'
সায়মা হঠাৎ মুচকি হাসলো। বলল,'মায়ের জন্য মন কেমন করছে?'
সাফওয়ান ঝুম হয়ে রইল।
-'মন খারাপ করাই তো স্বাভাবিক। তুই কি কখনো মাকে ছাড়া কোথাও থেকেছিস একা?
মা তো ভাবছিল তুই আরো আগেই যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠবি।এখনো কেন কিছু বলছিস না, সেই ভেবে মা কালরাতে কল করে খুব কাঁদল।'
সাফওয়ানের সাড়া না পেয়ে সায়মা এবার কথা থামিয়ে চুপ করে ভাইয়ের শিয়রের কাছে বসে রইল।
সে ভাবতে চেষ্টা করলো, 'কিছু কি ঘটেছে? তার সহজ সরল ভাইটার হঠাৎ করে এমন বিমর্ষ হয়ে যাবার কারণ কি ?'
___________
কাল বৌভাত। এঘরে নিভৃতে বসে থেকেও পুরো বাড়ির উৎসবের আমেজ টা সাফওয়ান টের পাচ্ছে।সে জানালার পাশে বসে আছে। বাইরে কি অপুর্ব সৌন্দর্যে ঘেরা দৃশ্য ।পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট বাড়ি।দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন একটা স্থির বিন্দু।সে তাকিয়ে আছে। কাল সারারাত সে এখানে বসেই কাটিয়েছে। অসুস্থ মন নিয়ে কি সুস্থ থাকা যায়?
সাফওয়ান ঠিক করেছে সে এখন নিচে যাবে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। এর মধ্যে খুঁজলে ওই মেয়েটাকে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে!
পেয়ে গেলে সে কি করবে?
নাহ! বেশি কিছু নয়।শুধু একটু কথা বলবে। সাফওয়ানের ধারনা একবার খোলাখুলি কথা বলতে পারলেই তার ভেতরের এই অস্বস্তিজনক অবস্থাটা কেটে যাবে।
চলবে........
অদ্রিজা আহসান
আগের পর্বের লিংক :
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/852075352264629/?app=fbl

আমি_রোদেলা
#আমি_রোদেলা
#পর্ব_১৫
-আমারও তোমাদের সাথে থাকতে ইচ্ছে করছে , কিন্তু কি করবো বললো ? এত তাড়াহুড়ো করে এসেছি কাউকে আমার কাজ ঠিক মতো বুঝিয়ে দিয়ে আসতে পারি নি ।
-ঠিক আছে কাল তুমি যাও । কিন্তু দুদিন পর ফিরে আসবে । আমার একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয় বুবু ।
- তুমি ভেবোনা রোদেলা বড় হয়েছে । অনেক কিছুই না বললেও বুঝতে পারে । সেদিন না হয় ব্যাপারটা হটাৎ করে সামনে আসায় নিজেকে সামলাতে পারে নি ।
- আমরা ও তো চাইনি সেটা । কিন্তু সেদিন কি যে হয়েছিলো সাদির কথায় নিজেকে ঠিক রাখতে পারি নি । আর রফিকের উপর তো আগে থেকেই রাগ জমে ছিলো ।
- বুঝলাম , দুজনের ঝগড়ায় তোমরা রোদেলার কথাই ভুলে গিয়েছিলে । একটা মেয়েকে নিজের সন্তানের মত করে গড়ে তুলবে বলে এনেছো । সেই সন্তান কে ই তোমাদের অশান্তির কারণ বানিয়ে দিলে । কি দোষ ছিলো ওর বলতো ?
আমি ওয়াশ রুম থেকে বের হতেই দুজন কথা বন্ধ করে দিলেন । আমি বুঝতে দিলাম না যে আমি তাদের শেষ কথা টুকু শুনেছি ।
- আম্মু তুমি নামাজ পড়েছো ?
- না , এখনো পড়া হয়নি । আমরা যাচ্ছি তুমি নামাজ পড়ে খেতে আসো ।
- ঠিক আছে ।
খালামনি আম্মু বেরিয়ে যেতেই , আমি খাটে গিয়ে বসে পরলাম । আমার মাথায় তখন একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে , সেই সন্তান কে ই তোমাদের অশান্তির কারণ বানিয়ে দিলে । আমার জন্যই তাহলে আব্বু আম্মুর ডিভোর্স হয়েছে ? কিন্তু আমি কেন , কিছুই জানিনা । আমি ঠিক করতে পারছিলাম না কোন সমস্যা টা নিয়ে আগে ভাববো । আমার নিজের পরিচয় না আব্বু আম্মুর সমস্যা । বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর খেয়াল হলো আমি নামাজ পড়ার জন্য ওযু করে বের হয়েছি । নামাজ শেষ করে খাবার টেবিলে গেলাম । আম্মু আর খালামনি আগে থেকেই বসে আছে । আমাকে দেখে খালামনি জানতে চাইলেন ,
- এতক্ষন কি করছিল ? নামাজ পড়তে এতো সময় লাগে বুঝি ।
- হুম , তুমি কি কাল সত্যি চলে যাবে ?
- হ্যা , তবে দুদিন পর আবার ফিরে আসছি ।
কথাটা শুনে আমি এতো খুশি হলাম যে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে খালামণিকে জড়িয়ে ধরলাম ।
- তুমি আমার লক্ষী খালামনি ।
- খালামনি কে এতো আদর ! আমি যে তোমার খালামণিকে রাজি করলাম কই আমাকে তো আদর দিলে না ।
কথা গুলো বললে আম্মু একটু হাসলেন ।
আমি অবাক হয়ে আম্মুর দিকে তাকিয়ে আছি , কারণ আম্মু কখনো এভাবে মজা করে কথা বলে না । আম্মু সবসময় একটা গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করে রাখেন উনার চারপাশে ।
- কি হলো হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন ? আমি কি খারাপ কিছু বলেছি ?
আমি আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম ।
- না কিছু না ।
- রাজিয়া কত বছর পর তুমি খাবার টেবিলে হেসে কথা বলেছো মনে আছে ? তোমার মেয়ে কেন আমিই তো অবাক হয়েছি ।
- কেন আমি বুঝি এভাবে কথা বলতে পারি না ।
- পার আমার ও চাই তুমি এভাবেই হাসি খুশি থাকো ।
- আম্মু তোমাকে হাসলে অনেক সুন্দর লাগে । তুমি কেন সবসময় এমন থাক না ।
- হয়েছে আর তেল মারতে হবে না । এবার খাও ।
- আম্মু তুমি কি বললে তেল মারা , তুমি এই শব্দ গুলো জানো ?
- আমি বুঝতে পারছি না আজ তুমি আমার কথায় এত অবাক হচ্ছ কেন বলো তো ?
- কারণ তুমি সব সময় খুব নিয়ম মাফিক কথা বলো । আর গত কয়েক বছরে আমাদের এভাবে সামনা সামনি বসে কোন কথা হয়নি । শেষে কবে তোমার সাথে খাবার টেবিলে বসে মজা করে কথা বলেছি আমি সত্যি ভুলে গেছি ।
- আমি সরি , এখন থেকে এমন আর কখনো হবে না আমি প্রমিস করছি ।
- রাজিয়া মনে থাকে জেনো , যা অতীত হয়ে গেছে সেটাকে সেখানেই থাকতে দাও । আমাদের উচিত বর্তমান কে সুন্দর ভাবে ব্যবহার করা , যেতে অতীত এসে বর্তমান কে জেনো নষ্ট না করে দেয় ।
- ঠিক বলেছো বুবু ।
রাতের খাবার শেষ করে ,আম্মু আর খালামনির সাথে কথা বলে আমি আমার রুমে চলে এলাম । হটাৎ আমার মনে হলো তুহিন সাহেবর সাথে তো আমি কথা শেষ না করেই ফোন রেখে
দিয়েছিলাম । টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি পাঁচটা মেসেজ এসেছে ।
-- আজ আপনার সাথে কথা বলে মনে হলো , আপনার সাথে গল্প করা যায় । আর কেন জেনো মনে হয় আপনি আমার গল্প শুনবেন ।
-- কি আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে নাতো । আমি কিন্তু সত্যি বলছি ।
-- কি হলো চুপ হয়ে আছেন যে ? কিছু বলছেন না যে ।
-- আপনি কি খুব বিরক্ত হয়েছেন ? আমাকে কি আপনি হ্যাংলা ভাবছেন ?
-- আপনি মনে হয় সত্যি বিরক্ত হয়েছেন । আমি সরি , প্রথম পরিচয়ে এতো কথা বলা আমার উচিত হয়নি । সরি ...
মেসেজ গুলো পড়বার পর আমার খুব খারাপ লাগতে লাগলো । আমার তো উচিত ছিল উনাকে জানানো যে , পরে কথা বলবো । আমি একটু ব্যস্ত ।
আমার কি এখন উচিত হবে উনাকে মেসেজ
করা । কি ভাবলো উনি আমার সম্পর্কে । নিশ্চয় ভাবছে আমরা ওর এতো উপকার করলাম তার বিনিময় আমার সামান্য কথা শুনার তার সময় হলো না । না কাজটা আমি মোটেও ঠিক করি নি । আমার এখনই সরি বলা উচিত । আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম রাত সাড়ে এগারটা বাজে । এতো রাতে মেসেজ করা কি ঠিক হবে ? না করেই ফেলি কাল যদি আবার ভুলে যাই ।
-- আমি সত্যি অনেক দুঃখিত , তখন খালামনি চলে আসতে আপনার সাথে আর কথা বলা হয়নি ।
আমার উচিত ছিল সেটা আপনাকে জানানো ,কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম । সত্যি আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত ।
এটুকু লিখে বেশ কয়েক বার পড়লাম । পাঠাবো ? কিছুক্ষন ভাবলাম তারপর ঠিক করলাম লিখেছি যখন পাঠিয়ে দেই ।
মেসেজ পাঠানোর কিছুক্ষন পরেই এর উত্তর
এলো ।
- -দেরিতে হলেও আপনি উত্তর দিলেন তাহলে , আমি তো ভেবেছিলাম আপনি ইচ্ছে করেই কথা বলছেন না ।
-- তা কেন হবে , আপনার সাথে কথা বলার মাঝখানে খালামনি চলে এলো । তাই..
-- আমি কিন্তু রাগ করেছি , কিঞ্চিৎ অপমান বোধ ও করেছি এমন করে কথার মাঝখানে চুপ হয়ে যাওয়াতে ।
-- আমি সত্যি দুঃখিত ।
-- এভাবে দুঃখিত বললে তো হবে না ।
-- তা আমাকে কি করতে হবে ?
-- আপনি আমাকে কাল কফি খাওয়াবেন তারপর ভেবে দেখা যাবে ।
-- এটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না ।
-- সেটা আপনি বুঝবেন । আপনি সত্যি ই যদি দুঃখ প্রকাশ করতে চান । নয়তো আমার কিছু বলার নেই ।
-- ঠিক আছে , তবে কাল পারবো না । তার পর দিন । তা কোথায় খেতে চাচ্ছেন ?
-- সেট না হয় যেদিন খাওয়াবেন , সেদিন বলি ।
-- ঠিক আছে , সেদিন কিন্তু আমি বিল দিবো । আজকের মত আবার বলবেন না তো , জমা রইলো ।
-- ঠিক আছে বলবো না । পরশু আমাদের দেখা হচ্ছে ।
-- হুম
--আপনার ওই হুম আর ওহ এই দুটো শব্দ প্লীজ আমার সাথে কথা বলার সময় ব্যাবহার করবেন
না ।
-- কেন বলুন তো ?
-- আমার একদমই ভালো লাগে না ।
-- হুম , চেষ্টা করবো ।
-- আবারও ।
-- সরি অভ্যাস বসত লিখে ফেলেছি ।
-- আজ রাখি , শুভ রাত্রি ।
-- শুভ রাত্রি ।
ফোনটা রেখে আমি চিন্তা করতে লাগলাম তুহিন সাহেবের সাথে কি আমি একটু বেশিই খোলামেলা ভাবে কথা বলে ফেলছি না । এটা করা আমার মোটেও উচিত হচ্ছে না । এভাবে একদিনের পরিচয়ে একটা মানুষের সাথে দ্বিতীয় বার দেখা করতে যাওয়া একে বারেই ঠিক হচ্চে না । আমার উচিত এখন আমার নিজের সমস্যা গুলোতে ফোকাস করা । ওগুলোর একটা সমাধান আমাকে করতেই হবে । আমাকে জানতেই হবে আব্বু আম্মুর ঝামেলায় আমার কি ভূমিকা ছিলো । কিন্তু কার কাছ থেকে জানা যাবে । আব্বুর কাছে জানতে চাইবো ?
আমি বসে আছি ওয়েল ফুডে । আজ মনে হয় আমি একটু আগেই চলে এসেছি , আমার আসার কথা ছিল পাঁচটায় । এখন ঘড়িতে চারটা পঞ্চান্ন বাজে । আমি যেখানে বসেছি এখন থেকে পুরো রাস্তা দেখা যাচ্ছে । ওয়েটার এসে জিগ্যেস করে গেলো কি নিবো । বললাম একজনের জন্য অপেক্ষা করছি । ছেলেটি কিছু না বলেই মুখ কালো করে চলে গেছে । আমার কেমন জেনো অস্বস্তি হতে লাগলো , এখানে বসার জায়গা খুব সীমিত । আর আমি কিছু দিতে না বলেই বসে আছি । ছেলে টিকে ডেকে বললাম আমাকে এক পিস পেস্টি দিতে । আমি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি সময় জেনো যাচ্ছেই না । তুহিন সাহেব এলেন ঠিক পাঁচটা পনেরো তে ।
- সরি , অফিস থেকে একটু আগেই বের হতে চেয়েছিলাম । একটা কাজ পরে গেলো সেটাও সময় মত শেষ করেছিলাম কিন্তু রাস্তায় জ্যাম ছিলো । জ্যামে আটকা পরে দেরি হয়ে গেলো । আমি সত্যি সরি ।
- ঠিক আছে । কফির অর্ডার করবো ?
- আপনি কি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন ? কটায় এখানে এসেছেন ?
- আপনি কি নিবেন বলুন ?
-আপনি রাগ করে আছেন তাইনা । বললাম তো সরি । রাস্তায় জ্যাম ছিলো সত্যি বলছি ।
- আমি রাগ করতে যাবো কেন ? আমি আপনাকে কফি খাওয়াতে এসেছি রাগ করতে নয় ।
- আজ আমি আপনার পছন্দে খাবো ।
- আমি দুটা ক্যাপেচিনো একটা পেস্টি অর্ডার করলাম ।
খাবার আসতেই তুহিন সাহেব জানতে চাইলো ।
- পেস্টি একটা যে ?
- আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে একটা খেয়েছি । এখন আর খাবো না ।
- যাক আপনাকে তাহলে আমার বদলে পেস্টি সঙ্গ দিয়েছে ।
- বলতে পারেন ।
- আপনি মনে হয় হাসতে পছন্দ করেন না ।
- কেন বলুন তো ?
- আমাদের এই নিয়ে দুবার দেখা হলো আপনি কিন্তু একবার ও হাসেন নি ।
- হাসার মত কিছু ঘটে নি তাই হাসবার প্রয়োজন বোধ করি নি ।
- আপনি এমন গম্ভীর হয়ে কথা বলছেন কেন ?
- আপনার খাওয়া শেষ হলে আমি যাব ।
- এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন ? আমি তো ভেবেছি আপনার সাথে কিছুক্ষণ হাঁটবো গল্প করবো ।
চলবে ......
✍️রেহানা হক রেনু
গত পর্বের লিংক -১৪
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/853008455504652/

#আমি_রোদেলা
#আমি_রোদেলা
#পর্ব_১৪
বাসায় আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে গেলো , আমি বাসায় ঢুকতেই মিনু খালামনি জানতে চাইলেন ,
- এতো দেরি করলি কেন ? আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল ।
- আমি তো তাড়াতাড়ি ই ফিরতে চেয়েছিলাম । কিন্তু তুহিন সাহেব দেরি করিয়ে দিলো ।
- তুহিন সাহেব টা আবার কে ?
- যার কাছে আমার ফোনটা ছিলো ।
- জিগ্যেস করিস নি ফোনটা সে পেলো কোথায় ?
- পাবে আবার কোথা থেকে আমার ব্যাগ থেকেই নিয়েছে ।
- তারমানে তুই একটা চোরের সাথে সময় কাটিয়ে এসেছিস । তোর সাহস তো কম নয় যদি তোকে কিছু করতো ?
- খালামনি তুমি না ।
বলেই আমি হাসতে লাগলাম ।
- কিরে পাগলের মত হাসছিস কেন ? চোরদের কোন বিশ্বাস আছে নাকি ?
- ভদ্রলোক চোর নন , আমি ও তোমার মতো তুহিন সাহেবকে চোরের লীডার ভেবেছিলাম ।
- মানে কি ?
- তুহিন সাহেব হলেন , কবির আঙ্কেল আর রামিসা আন্টির একমাত্র পুত্র , বুঝলে ।
- কোন কবির আঙ্কেল ?
- ভুলে গেলে যাদের বাসায় আমি ছিলাম দুদিন আগে ।
- ওহ , বুঝলাম । কিন্তু তুই কবির আঙ্কেল ,রামিসা আন্টি বলছিস তাহলে তুহিনকে ভাইয়া না ডেকে সাহেব বলছিস কেন ?
- তাইতো , কিন্তু উনার সাথে তো ভাইয়া ডাকার মত কোন পরিচয় হয়নি ।
- সাহেব ডাকলে কেমন জেনো অপরিচিত অপরিচিত মনে হয় না ।
- কি যে বলো খালামনি , ভদ্রলোক তো
অপরিচিতই ।
- তুই ওর বাবা মাকে কি সুন্দর করে আঙ্কেল আন্টি ডাকছিস । আর তাদের ছেলেকে ভদ্রলোক , ব্যাপারটা কেমন না । তা ছেলেটা কি করে ?
- একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরী করে ।
- দেখতে কেমন বলতো ?
- ভালোই তো , কিন্তু তুমি এতো কিছু জানতে চাইছো কেন বলতো ?
- ছেলেটি কি বিবাহিত ?
- না । বিবাহিত হলে তো আন্টি বলতো ।
- কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক নেই তো ?
- খালামনি তুমি কি ভাবছো বলতো ? তুমি যদি বিয়ের কথা চিন্তা করে থাকো , তাহলে মাথা ওই চিন্তা বাদ দিয়ে দাও ।
- কেন ? বড় হয়েছিস বিয়ে তো করতেই হবে ।
- বিয়ে কেন করতে হবে ? তুমি আর মা ওতো বিয়ে করেছিলে লাভ কি হলো । আমার ওসবের দরকার নেই । আমি সারা জীবন তোমাদের সাথেই থাকতে চাই ।
- বললেই হলো নাকি ? তোর মা তোর জন্য ছেলে দেখছেন । আর শোন আমাদের সাথে যা হয়েছে তা তোর সাথে হতে যাবে কেন ?
- আম্মু ছেলে দেখছেন মানে কি ?
- বারে তোকে বিয়ে দিতে হবে না ।
- আম্মু তোমাকে বলেছে ?
- হুম ।
- খালামনি সত্যি করে বলতো , আম্মু হঠাৎ আমার বিয়ের জন্য এতো তারা হুর করছেন কেন ? কদিন হয়নি উনাদের ডিভোর্স হয়েছে এর মধ্যে আমার বিয়ে ?
- তোর বিয়ের চিন্তা আগে থেকেই ছিলো । আর তোর আব্বু আম্মুর ব্যাপারটা তো আরো আগেই হয়ে যেতো তোর আব্বুই তো কোন না কোন বাহানা দেখিয়ে পিছিয়ে নিয়ে গেছে । নয়তো দু বছর আগেই ডিভোর্স হয়ে যেত ।
- আমার এগুলো শুনতে ভালো লাগছে না , আমি রুমে গেলাম । এই নাও তোমার ফোন , কেউ ফোন দেয়নি তোমার নম্বরে । আর হ্যা তোমার ফোনে ব্যালেন্স নেই । তুমি মিষ্টিকে ইকটু আমার রুমে পাঠাও ।
মিষ্টি এসে জানতে চাইলো ,
- আফা কিছু লাগবো ?
মিষ্টির দিকে একটা ছোট কাগজ আর টাকা দিয়ে বললাম
- এখানে দুটো নাম্বার আছে দুটোতেই টাকা রিচার্জ করবি । নম্বরের পাশে টাকার পরিমাণ লিখা
আছে । আর শোন নীচ থেকে এসে আমার জন্য ভালো করে এক কাপ লিকার চা বানিয়ে দিবি । দেখিস নীচে গিয়ে আবার গল্প করতে শুরু করিস না ।
- কি যে কন আফা , আমার গফ করার টাইম নাই । যামু আর আমু ।
- ঠিক আছে এখন যা । খালামণিকে আমার রুমে একটু আসতে বলিস ।
- বড় খালাম্মা তো রান্না করতাছে ।
- ঠিক আছে তাহলে থাক ।
- যাবার আগে খালামণিকে জানিয়ে যাস যে তুই বাইরে যাচ্ছিস ।
- ঠিক আছে ।
মিষ্টি চলে যেতে আমি ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন বের করলাম ,চার্জে দেবার জন্য । ফোন হাতে নিয়ে দেখি ফুল চার্জ । তুহিন সাহেব তাহলে ফোন চার্জ করে রেখেছিলেন আগে থেকে । ফোনের স্কিনে দুটো মেসেজ এসেছে দেখাচ্ছে । মেসেজ দুটো তুহিন নাম দিয়ে সেইভ করা নম্বর থেকে এসেছে । আমার কন্ট্যাক্ট লিস্টে ওই নামে কেউ থাকার তো কথা না , কারণ আমি খুব কম মানুষের সাথেই ফোনে যোগাযোগ করি , তাহলে । আমি প্রথম মেসেজ টা ওপেন করলাম,
--ঠিক মতো বাসায় পৌঁছেছেন কি না , জানালে খুশি হবো ।
দ্বিতীয় মেসেজ ,
--সরি , আপনাকে না জিগ্যেস করেই আমার নম্বর টা সেইভ করে দিয়েছি ।
আমি মেসেজ দুটো কয়েক বার পড়লাম । উত্তর দেয়া কি ঠিক হবে ? না দিলে ও তো অভদ্র ভাববে , যে আমি একজন অকৃতজ্ঞ মানুষ । আমি মেসেজের উত্তর দিলাম ।
--জী , আমি ঠিক মত বাসায় পৌঁছে গিয়েছি ।
মেসেজ দেবার সাথে সাথেই উত্তর এলো ।
-- এটুকু জানাতে আপনার এত সময় লাগলো ? আমি তো চিন্তায় ছিলাম ।
--সরি , বাসায় ফিরে খালামনির সাথে কথায় ব্যস্ত ছিলাম ।কিছুক্ষণ আগেই আপনার মেসেজ
দেখেছি ।
-- সরি , বলার কিছু নেই , আমি কিন্তু এখনও সি আর বি তে বসে আছি ।
-- ওহ
-- শুধুই ওহ , জানতে চাইবেন না , কেন আমি এখানে এখন ও বসে আছি ?
-- আমার কি জানতে চাওয়া উচিত ?
-- আপনার কি কোন ব্যাপারই জানার কৌতূহল নেই ?
-- না ।
-- কেন বলুনতো ?
-- কেন আবার , আমি এমন ই ।
-- আমি কিন্তু এমন নই , আমার সব কিছুতেই একটু বেশি কৌতূহল ।
-- ওহ
-- বারবার ও ওহ , আপনি কি আমার সাথে কথা বলতে বিরক্ত বোধ করছেন ?
-- ঠিক তা নয় , কথার উত্তর কি দেবো তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না । তাই ওহ লিখা ।
-- আমি ভেবেছিলাম আপনি বিরক্ত হচ্ছেন । আসলে হয়েছে কি , সুন্দর কোন কিছুই একা উপভোগ করে মজা পাওয়া যায় না । এখানের পরিবেশটা অনেক সুন্দর লাগছে , তাই কারো সাথে কথা বলতে মন চাচ্ছিলো । ভাবলাম আপনার সাথেই কথা বলি ।
-- আমি ই কেন ? আপনার তো আরও বন্ধু আছে তাইনা ।
-- তা আছে ।
-- তাহলে আমি কেন ?
-- তা তো জানি না ।
-রোদেলা ফোনে কি করছিস সেই কখন থাকে ?
মিনু খালা কখন রুমে এসেছেন খেয়াল করি নি ।
- তুমি কখন এসেছো ?
- বেশ কিছুক্ষণ হলো । বললি না তো ফোনে কি করছিস ?
- তুহিন সাহেবের সাথে মেসেজে কথা বলছিলাম ।
- তুহিন মানে তোর ফোন যার কাছে ছিলো । একটু আগেই না দেখা করে এলি । আবার কি কথা ?
- জানতে চাইছেন আমি ঠিক মতো বাসায় পৌঁছেছি কি না ।
- ছেলে টা তো ভালোই দায়িত্ববান মনে হচ্ছে ।
- হুম ।
- শোন তোর সাথে আমার কথা আছে ।
- কি খালামনি ? জরুরী কিছু ।
- না , তেমন জরুরী নয় । কাল সকালে খালামনি চলে যাচ্ছি ।
- মানে কি ? তুমি চলে যাচ্ছ ।
- এতো অবাক হচ্ছিস কেন ? আমি কি সারাজীবন এখানে থাকবো নাকি । আমার কাজ আছে না ।
- অবাক হবো না । দুই দিন হয়নি এসেছো এরই মধ্যে তুমি চলে যাবে । আর তোমার কি কাজ শুনি ? তুমি কি চাকরী করো নাকি ?
- হুম , করি তো ।
- চাকরী করো ! কোথায় কি কাজ ? এই বয়সে কেন তুমি চাকরী করবে ? তুমি না তোমার ভাইয়ের কাছে ছিল ?
- বাহব্বা এতো প্রশ্ন এক সাথে । কোনটার উত্তর দেব বলতো ?
- আগে বলো কেন তুমি চাকরী করো ?
- সময় কাটানো আর নিজের খরচের জন্য ।
-কি কাজ ? খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয় ।
- না , তেমন বেশি পরিশ্রম করতে হয় না । কাজটা করতে আমার খুব ভালোই লাগে । একটা আশ্রমে কাজ করি । তোর বাদল নানার কথা মনে আছে ? তোর মায়ের চাচা হন ।
- নাম মনে আছে একবার কি দুবার দেখা হয়েছিলো ।
- উনার একটা আশ্রম আছেন , ওখানে কিছু বয়স্ক মানুষ আর কিছু এতিম বাচ্চা আছে । আমার কাজ ওদের দেখাশুনা করা । মাস শেষে বেতন পাই আর ওখানেই থাকি ।
- কিন্তু আম্মু যে বলেছিলো , তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে থাকবে ।
-ওখানেই ছিলাম , ভাইয়ের দুটো বাচ্চা রেখে ভাবী মারাগেলেন । বাচ্চাদের দেখা শোনার জন্য ই আমি গিয়েছিলাম । ছয়মাস পর ভাই আবার বিয়ে করলো তাই ওখানে তো আমার কোন কাজ নেই ।
- তাহলে তুমি এখানে চলে আসোনি কেন ?
- আসতাম কিন্ত তোর মা তো আমাকে যেতে দিতে চায়নি । আমি জোর করেই গিয়েছিলাম । যাবার সময় তোর মা একটা কথাই বলেছিলো বুবু তোমাকে ফিরে আসতেই হবে দেখো । বিয়ের পর যে মেয়েদের বাপের বাড়ি থেকে না সেটা আমি ভুলে গিয়েছিলাম বুঝলি । তোর মা সত্যি
বলেছিল ।
- তাহলে আসোনি কেন এখানে ? তুমি জানো আমি তোমাকে কত মিস করেছি ?
- আমার ও তো একটা আত্মসম্মান বোধ আছে । যেখান থেকে একবার চলে এসেছি সেখানে আবার ফিরে আসি কি ভাবে বল । ঠিক তখন বাদল চাচার সাথে দেখা । উনি তো আমার ব্যাপারে আগে থেকেই জানতেন । চাকরির প্রস্তাব টা পেয়ে , আর না করি নি ।
- তুমি আমাদের কখনই আপন ভাবো নি তাইনা ।
- কি যে বলিস ? তুই হলি আমার একমাত্র মেয়ে , আমার জান ।তোকে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে , সব কিছু ফেলে ছুটে এসেছি ।
-তোমাকে কে খবর দিলো ?
- তোর মা ফোন দিয়ে জানতে চাইলো , তুই আমাকে ফোন করেছিস কি না । বললাম না , তোর মায়ের গলা শুনে মনে হয়েছিল কিছু ঘটেছে । জিগ্যেস করতে বললো এই এই ঘটেছে । রাত দশটা বাজে তুই তখনও ঘরে আসিস নি । ফোন ও ধরছিস না । শুনে তো আমার কলিজা শুকিয়ে গিয়েছিল । রাতটা কোন রকম কাটিয়ে ভোরের গাড়িতে এখানে এসেছি । এসে দেখি তোর মায়ের অবস্থা ও খারাপ , সাদি আর ওর বউ ছিলো সারা রাত । আমি এসেছি দেখে ওর ফিরে গেছে । যাই করিস রোদেলা , তোর মাকে বলতে না পারিস , খালামনি কে অন্তত বলিস । তুই জানিস যেখানেই থাকি আমার মন সবসময় তোর কাছেই থাকে ।
খালামনি কথা শুনে আমি কান্না করে দিলাম । খালামনি ও আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক ক্ষণ কান্না করলেন । আমি চুপিচুপি বললাম ।
- আমি ও তোমাদের অনেক ভালোবাসি খালামনি ।
- কি হয়েছে দুজন জড়িয়ে ধরে কান্না করছো কেন?
আম্মু কখন এসে আমার রুমের দরজায় দাঁড়িয়েছেন টের পাইনি । আম্মুর কথা শুনে আমি খালামনি কে ছেড়ে , চোখ মুছে নিলাম ।
- আম্মু তুমি কখন এসেছো ?
- আমি তো সেই কখনই এসেছি , এসে ফ্রেস
হলাম । তোমাদের সারা শব্দ না পেয়ে এখানে এলাম । এসে দেখি দুজন জড়িয়ে ধরে কান্না
করছি । ব্যাপার কি ? আমাকে বলা যায় ।
- আম্মু খালামনি নাকি কাল চলে যাবে ।
বলেই আমি আম্মু আর খালামণিকে রুমে রেখে ওয়াশ রুমে গেলাম মুখে পানি দিতে । নামাজ ও পড়া হয়নি , ওযু করতে হবে ।
রাজিয়া সুলতানা এসে বোনের পাশে বসলেন । বসেই জানতে চাইলেন ,
- বুবু তুমি তো আমাকে জানাও নি , যে তুমি কাল চলে যাবে ?
- তোমাকে জানতাম তুমি তো সেই সকালে বেরিয়ে গেছো । ভেবেছিলাম তুমি বাসায় ফিরলে জানাবো ।
- এসেছো তো মাত্র কদিন হলো । কিছুদিন থাকো আমার কথা না হয় বাদ দিলাম , তোমার মেয়ের জন্য কটা দিন থেকে যাও । রোদেলার মন ভালো নেই , দেখতে ওকে স্বাভাবিক মনে হলে ও ওর জন্য এটা একটা বড় ধাক্কা ছিল । তুমি পাশে থাকলে ও ভালো থাকবে ।
- সেটা তো আমি ও বুঝি । রাজিয়া তুমি ও মেয়েটাকে একটু সময় দাও । মেয়ে বড় হলে নাকি মা মেয়ে বন্ধু হয়ে যায় । কিন্তু তোমরা দুজন দুজনের মধ্যে খানে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছো । এবার মনে হয় এটা ভাঙার সময় এসেছে ।
- বুবু তুমি তো সবাই জানো । আমি ওকে অনেক ভালোবাসি কিন্তু সেটা আমি কিছুতেই প্রকাশ করতে পারি না । ওর সামনে গেলেই আমি কেমন জেনো কঠোর হয়ে যাই ।
- তোমার এই কঠোর স্বভাবের জন্যই রোদেলা তোমাকে এড়িয়ে চলে । কোন কিছু তোমার সাথে শেয়ার করতে দ্বিধা বোধ করে ।
- বুবু তুমি আর কটা দিন থেকে যাও না ।
চলবে ........
গত পর্বের লিংক -১৩
https://www.facebook.com/groups/bdofficials/permalink/851272952344869/

Rape history
আমি দেখিনি তবে শুনেছি সেই ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাসরঘর সাজিয়ে প্রতিরাতে একজন ছাত্রীকে ধষর্ণ করা হতো,
এই ভাবে একশত ধষর্ণ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে মিষ্টি বিতরণ করে উল্লাস করেছিলো ক্ষমতাসীন দলের সোনার ছেলে "জসিম উদ্দিন "
এরও একটা বিচার হয়েছিলো, তবে ফাঁসি হয় নি।
প্রকাশ্যে দিবালোকে রাস্তায় রামদা দিয়ে খাদিজা কে কুপিয়ে তার মাথা কয়েক ভাগ করে সিলেটের বদরুল,
খাদিজার ভাগ্য ভালো মরতে মরতে বেঁচে গেছে। বদরুলেরও একটা বিচার হয়েছিলো, তবে খুব বেশি হয় নি।
২০১৮ সালে বরিশালের মা-মেয়েকে এক সাথে ধষর্ণ করে মাথা নেড়া করে দেয় প্রভাবশালী তুফান, তুফানেরও একটা বিচার হয়েছিলো, তবে ফাঁসি হয় নি।
সংরক্ষিত এলাকা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এর ভিতরে তনুকে ধষর্ণ করার পর হত্যা করা হয়, কিন্তু তনুর ধষর্ণকারী কেউ গ্রেফতার হয় নি।
৩১শে ডিসেম্বর ২০১৮ নোয়াখালীর সুবর্ণচরে দিনের বেলা যুবতী মেয়ের সামনে তার মাকে দল বেঁধে ধষর্ণ করার পর প্রহার করা হয়,
১৭ কোটি মানুষ এর সাক্ষী, ধর্ষক রুহুল আমীনের ফাঁসির দাবি উঠলেও, ফাঁসি কিন্তু হয় নি।
কিছুদিন আগে ঢাকার এক আবাসিক এলাকায় ৭ বছরের শিশুকে ধষর্ণ করার পর শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়, ধষর্ক আটক, তবে তারও কিন্তু ফাঁসি হবে না।
গত কয়েক বছর আগে দেখলাম ৩ শিশুর যৌনাঙ্গ ব্রেড দিয়ে কেটে ধষর্ণ করে হত্যা করা হয়,
সেই ধষর্কও গ্রেফতার হয়েছে, তবে ফাঁসি হয় নি।
সিলেটের এম.সি কলেজে ছাত্রাবাসে নিয়ে স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ৫-৬ জন মিলে গনধর্ষন করা হলো।
এর বিচার ই বা কি হতে পারে? কে দিবে নিরাপত্তা ?
যেখানে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রী কে কেড়ে নিয়ে স্বামীর সামনে গনধর্ষন করা হয়।
সর্বশেষ নোয়াখালী বেগমগঞ্জ উপজেলা এক অসহায় নারীকে শ্লীলতাহানি করে মোবাইলে তার ভিডিও ধারণ করে অনলাইন ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
অসহায় সেই নারী কখনও পিশাচ গুলোকে ভাই ডাকছেন, কখনও বাবা ডাকছেন, কখনও আবার আল্লাহকে স্মরণ করছেন।
এই ভাবে আরো কতো মা-বোনেরা ধষর্ণ হচ্ছে তার হিসাব কে রাখে ?
ধষর্করা জেলে যায় ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে আবার বেরিয়ে আসে।
এই ভাবে আরো কতো ঘটনা দৃষ্টি চোক্ষুর আড়ালে থেকে যাই।
আমরা সবাই ধষর্কের ফাঁসি চাই, কিন্তু দেশে কি সেই আইন আছে?
ধষর্কের শাস্তি হিসেবে জনসম্মুখে মাত্র তিন চারটা মৃত্যুদন্ড দিয়ে দেখুন,
ধষর্নতো দূরের কথা, কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না কোনো কুলাঙ্গার।
সর্বশেষ একটি কথাই বলতে চাই, ধষর্কের শাস্তি জনসম্মুখে মৃত্যুদন্ড চাই।।।।

: A Gateway to English Literature
✅ ✅ ৪১ তম বিসিএস প্রিলি প্রস্তুতি। ১ মার্ক নিশ্চিত করুন।
ইংরেজিতে কোটেশন আসে ১ টা । তাই বিসিএস, বিজেএস সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বহুবার আসা + অন্যান্য সম্ভাব্য উক্তিগুলো নিম্নে দেওয়া হলো, আশা করি এর বেশি পড়তে হবেনা।।
সংকলনেঃ S M Shamim Ahmed.
Author: A Gateway to English Literature.
►► Quotation of William Shakespeare :
☑️ "I am a man more sinned against than sinning." (আমি যতটা অন্যায় করেছি তার চেয়ে বেশি অন্যায় আমার সাথে করা হয়েছে।)
(King Lear, W.Shakespeare)
☑️"My love is richer than my tongue." (আমার ভালোবাসা মুখে বোঝানো সম্ভব নয়। )
(King Lear, W. Shakespeare)
☑️"Cowards die many times before their deaths; " (ভীরুরা মরার আগে বার বার মরে কিন্তু সাহসীরা মরে একবার।)
(Julius Caesar, W.Shakespeare )
☑️Uneasy lies the head that wears a crown--William Shakespeare. (মুকুট পরিহিত ব্যক্তি শান্তিতে ঘুমাতে পারে না।)
(King Henry-4, W. Shakespeare )
☑️"There is nothing good or bad but thinking makes it so." (ভালো বা মন্দ বলতে পৃথিবীতে কিছুই নেই, চিন্তাই কোন কিছুকে ভালো বা মন্দ বানায়।)
( Hamlet ,William Shakespeare )
☑️"Some are born great, some achieve greatness, and some have greatness thrust upon them." কেউ কেউ খ্যাতিমান হয়ে জন্মায়, কেউ কেউ খ্যাতি অর্জন করে এবং কারো কারো উপর খ্যাতি চাপিয়ে দেয়া হয়।
(Twelfth Night, William Shakespeare)
"All the world's a stage
And all the men and women are merely players." (সমগ্র পৃথিবীটাই রঙ্গমঞ্চ এবং সকল নর-নারূ এ মঞ্চের অভিনেতা-অভিনেত্রী।)
(As You Like It, William Shakespeare)
☑️ "Brevity is the soul of wit" ( সংক্ষিপ্ততা রসিকতার প্রাণ। )
(Hamlet, Shakespeare)
☑️"Sweet are the uses of adversity". (দুঃখের প্রয়োজনীয়তা মধুর।)
( As You like It, Shakespeare)
☑️"And every fair from fair sometime declines
By chance, or nature's changing course, untrimmed;"
( আর প্রতিটি সৌন্দর্যই একসময় ধসে যায় প্রিয়তমা,
দূর্ঘটনাক্রমে কিংবা প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে।)
( Sonnet 18,William Shakespeare )
☑️"The miserable have no other medicine but only hope." (কেবল আশা করা ছাড়া হতভাগ্যদের আর কোন ঔষুধ নাই।)
(Measure for Measure ,William Shakespeare )
☑️"To be or not to be that is the question" (এই উক্তিটি দ্বারা Hamlet-এর সিদ্ধান্তহিনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।)
(Hamlet ,William Shakespeare )
☑️“Veni, Vidi, Vici.” আসলাম, দেখলাম, জয় করলাম।
(Julius Caesar ,William Shakespeare )
☑️”Frailty (noun), thy name is woman.” (চাতুরতা, তোমার আরেক নাম নারী।)
( Hamlet ,William Shakespeare )
►► Quotation of John Keats:
☑️" Heard melodies are sweet ; those unheard are sweeter, "
(শোনা সুর বড়োই মধুর কিন্তু না শোনা সুর মধুরতর/
যার হাতের রান্না খাইনি, সে বড় রাঁধুনি ; যাকে কভু দেখিনি, সে বড় সুন্দরি / মানুষ অজানাকে জানতে চায়। )
(Ode on a Grecian Urn,John Keats)
☑️ “Beauty is truth, truth beauty."
( সুন্দরই সত্য;সত্যই সুন্দর।)
(Ode on a Grecian Urn,John Keats)
☑️ "A thing of beauty is a joy forever:"
(সুন্দর জিনিস চিরকালই আনন্দায়ক / আনন্দের।)
( “Endymion,” Book I.,John Keats)
☑️"Nothing is real till it is experienced,"
(না আঁচালে বিশ্বাস হয় না।)
(John Keats)
►► Quotation of Francis Bacon:
☑️ "It is impossible to love and to be wise" → প্রেমে পড়ার পর নিজেকে জ্ঞানী ভাবা অসম্ভব / জ্ঞানীরা প্রেমে পড়ে না।
(Of Love; Francis Bacon )
☑️"Wives are youn men's mistresses, companions for middle age, and old men's nurses. "(স্ত্রীরা যুবকদের যৌনসাথী, মাঝ বয়সীদের সঙ্গী আর বৃদ্ধদের সেবিকা।)
(Francis Bacon)
☑️"A good friend is another himself." ( একজন ভালো বন্ধু হলো নিজেরই অন্য সত্ত্বা। )
( Francis Bacon )
☑️ "Opportunity makes a thief" ( সুযোগই মানুষকে চোর বানাই।)
( Francis Bacon )
►► Quotation of Alexander Pope:
"Fools rush in where angels fear to tread" (কত হাতি গেল তল, মশা বলে কত জল । )
(An Essay on Criticism, Alexander Pope )
"A little learning is a dangerous thing "অল্পবিদ্যা ভয়ংকর
(An Essay on Criticism, Alexander Pope )
"To err is human, to forgive is divine " (মানুষ মাত্রই ভুলের অধীন; আর ক্ষমা স্বর্গীয়।)
(An Essay on Criticism, Alexander Pope )
►► Quotation of P.B.Shelley:
☑️ If winter comes,can spring be far behind ?" (শীত যদি আসে,বসন্ত কি দূরে থাকতে পারে। ?)
(Ode to the West Wind, P.B.Shelley)
☑️"Our sweetest songs are those that tell of the saddest thought.(মোদের মধুর সঙ্গীতগুলোই তা, যা বেদনার কথা বলে / বিরহের গানই হলো মধুর গান।)
(To A Skylark, P.B. Shelley).
►► অন্যান্যঃ
☑️Childhood shows the man
(যারে নয়ে হয় না, তারে নব্বইয়েও হয় না )
(John Milton, Paradise Regained)
☑️ "He prayth best who loveth best.
All things both great and small "
(জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।)
(The Rime of the Ancient Mariner,Samuel Taylor Coleridge )
☑️”Full many a flower is born to blush unseen,and waste its sweetness on desert air.” (পথের ধারে নাম না জানা শত ফুল যে ফুটে; ফুলদানিতে তাদের কয় জনের স্থান জুটে?///
এই পৃথিবীর পরে
কত ফুল ফোটে আর ঝরে,
সে কথা কি কোনদিন
কখনো কারো মনে পড়ে?)
( Thomas Gray)
☑️"For God's sake hold your tongue and let me love."
("দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর,
ভালবাসিবারে দে মোরে অবসর")
(The canonization, John Donne )
☑️”Man's conscience is the oracle of God.” (মানুষের বিবেক ঈশ্বরের যাজক।
(Lord Byron)
☑️"Self preservation is the first law of nature." (বিপদে প্রথমে নিজেকে বাঁচানোই প্রকৃতির প্রথম আইন।)
(Samuel Butler)
☑️"Man is born free and everywhere he is in chains"( মানুষ স্বাধীন হতে জন্মলাভ করে কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলাবদ্ধ।)
(Rousseau)
"Justice delayed is justice denied" (বিলম্ব বিচার বিচারের নামে প্রহসন।)
( Gladstone)
☑️"Justice hurried is justice buried"( তাড়াহুড়া করে বিচার করা মানে ন্যাযবিচারকে কবর দেওয়া।)
(Gladstone)
☑️"Pain is the outcome of sin" (যন্ত্রণা হলো পাপের ফল।)
(Gautam Buddha )
☑️" I disapprove of what you say, but I will defend to death your right to say it. ( আমি তোমার কথা না মানতে পারি কিন্তু আমৃত্যু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষা করব।)
( Voltaire)
☑️"Eternal vigilance is the price of liberty." (স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন।)
(Thomas Jefferson )
☑️”Eureka! Eureka! (I have found it)"
(Archimedes)
☑️"Riches are not end of life, but an instrument of life."( সম্পদ জীবনের লক্ষ্য নয় , জীবনধারণের উপকরণ মাত্র । )
( H.W. Beecher)
☑️"Man is by nature a political animal"(মানুষ জন্মগতভাবেই রাজনৈতিক জীব।)
( Aristotle )
☑️"Government of the people, by the people, for the people"
( Abraham Lincoln)
☑️"Know thyself." (নিজেকে জানো।)
(Socrates )
☑️Eyes are useless when the mind is blind.→ মনে আলো না থাকলে চোখের আলো অর্থহীন হয়ে পড়ে
অভাগা যেদিকে চায়,সাগর শুকিয়ে যায়।
☑️Once unlucky, always unlucky.
☑️”Beauty is only skin deep.”( বাইরের রুপ দিয়ে ভিতরের বিচার চলেনা ।)
☑️”Faults are thick where love is thin.” (যার দেখতে নারি,তার চলন বাঁকা । )
(যদি টাইপিং মিস্টেক হয়, ক্ষমা প্রার্থী)
......To be continued
Wʀɪᴛᴛᴇɴ & Eᴅɪᴛᴇᴅ Bʏ : S M Shamim Ahmed

"মা"
আজ সোবহান সাহেবের দ্বিতীয় বিয়ে।
মানুষের প্রথম বিয়ে যেমন ধুমধাম করে হয় দ্বিতীয় বিয়ে তেমন হয় না। সোবহান সাহেবের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। বিয়েতে রসকস নেই, বাদ্য-বাজনা নেই, সাদামাটা বিয়ে!
তারিন অবশ্য চেয়েছিল বাবার বিয়ে খুব আয়োজন করে হোক। বিয়েতে ঘর ভর্তি লোকজন আসুক। সানাই বাজার সাথে সাথে ফুফুরা ভাইয়ের গায়ে হলুদ মাখুক। তারিনের ছোট দুই ভাই বোন 'রৌদ্র' এবং 'রোদেলা' আনন্দ উৎসাহে ছোটাছুটি করুক। বড় মেয়ে হিসেবে যে দায়িত্বটা পালন করবে বলে ভেবে রেখেছিল সেই দায়িত্বটা আর পালন করা হলো না।
বিয়ের দিনে সকাল থেকে সোবহান সাহেব গম্ভীর হয়ে আছেন। আগে কখনও তাকে এতটা গম্ভীর থাকতে দেখা যায়নি। উনার প্রথম স্ত্রী শাহনাজ বেঁচে থাকতে তিনি মন খুলে হাসতেন। সেই হাসির শব্দ বাড়ির সামনের চায়ের দোকান থেকে শোনা যেত। সকালবেলা নিউজপেপারের গুরুত্বপূর্ণ খবর বাড়ির সবাইকে উচ্চস্বরে পড়ে শুনাতেন। শুক্রবার বড় রকমের বাজার করে আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করে খাওয়াতেন। এখন আর তিনি হাসেন না, প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না। হঠাৎ হঠাৎ বড় মেয়েকে 'তারু' 'তারু' বলে ডাক দিয়ে আগের মতো বলেন না, "মামুনি তোর কোনো কাজ না থাকলে আমাকে এক কাপ চা করে দে!"
সুন্দর সময় সুন্দর হয়ে চলে গেছে, দিন বদলে গেছে। শাহনাজ বেগমের মৃত্যুর সময়কাল একবছর দু’মাস পেড়িয়ে গেছে। সোবহান সাহেবও একসময় স্ত্রী শোক ভুলে দ্বিতীয় বিয়েতে মত দিয়েছেন।
তারিন আজ চোখে গাঢ় করে কাজল পরল। ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপিষ্টিক দিল। বিয়ে বাড়িতে যাওয়ার সময় আগেও যেমন হালকা সাজগোজ করতো আজও তেমনি করল। হোক না সেটা তার বাবার বিয়ে তাতে কী আসে যায়? সে আলমারির ড্রয়ার খুলে মায়ের ছোট কানের দুল জোরা বের করে পরল। মায়ের পছন্দের কালো রঙের শাড়ির সাথে সবুজ শালটা শরীরে জড়াল। এখন মায়ের শরীরের গন্ধ যেন ধীরে ধীরে তার নাকে স্পষ্ট হয়ে আসছে।
বাইরে সানাই বেজে উঠেছে। সানাইয়ের লোকজন কে খবর দিল? তারিনের মেজ ফুফু এই কাজটা করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মেজ ফুফু হাসিখুশি, রসিক মানুষ। তার রসিকতার মাত্রা এতই তীব্র যে তার স্বামীর মৃত্যুর দ্বিতীয় দিনই নাকি পাড়াপড়শির সাথে তাকে হাসিতামাশা করতে দেখা গেছে। তবে সেটা কতটুকু সত্যি তারিন জানে না। আজ তো ফুফুর ভাইয়ের বিয়ে।
আশ্বিন মাসের হালকা শীত। অথচ আষাঢ় মাসের মত টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। তারিনের হৃদয়ের ভিতরে ঝড়-তুফান বইছে। সেই অবস্থায় ঘর থেকে বের হয়ে সে বলল, "ফুফু বাবা বউ নিয়ে এসে পড়েছেন নাকি?"
ফুফু বললেন, "বাহ ! তারিন তোকে তো খুব সুন্দর লাগছে। কপালে টিপ পরলি না কেন? কালো শাড়ির সাথে লাল একটা টিপ পরতি।"
তারিন হেসে বলল, "ফুফু শুধু সানাই বাজছে কেন? ব্যন্ডপার্টি কই?"
ফুফু উৎসাহিত কন্ঠে বললেন, "তুই সবকিছু এত সহজভাবে মেনে নিচ্ছিস আমার খুবই ভালো লাগছে তারিন। তোর জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে হলে চাচা-ফুফুদের সাথে ঝগড়া করতো। বাবার গায়ে থুঁ থুঁ ছিটাত।"
"যার হায়াত শেষ হয়ে গেছে সে চলে গেছেন ফুফু। তাই বলে জীবন তো আর থেমে থাকবে না। বাবা একজন পুরুষ মানুষ তার মানসিক এবং শারীরিক উভয় শান্তির প্রয়োজন।"
ফুফু তারিনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বললেন, "তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে তুই হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেছিসরে তারিন। তোর এখন বয়স কত?"
"সেপ্টেম্বরের পনেরো তারিখ ঊনিশ বছর পূর্ণ হবে।"
"রৌদ্র আর রোদেলা কে 'নীলিমা' আপন করে নিলেই আমি তোর জন্যেও ভালো ছেলে দেখব।"
"আমাদের নতুন মায়ের নাম বুঝি নীলিমা?"
"হ্যাঁ।"
"সুন্দর নাম। আমাদের পুরোনো মায়ের নাম ছিল 'শাহনাজ'। পুরোনো মায়ের পুরোনো দিনের নাম। নতুন মায়ের নামটাও নতুন।" - বলেই সে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল।
তারিনের সাথে ফুফুর কথার মাঝখানেই সোবহান সাহেবের বিয়ের গাড়ি চলে এল। তারিন একবার বাবার বিয়ের গাড়ির দিকে তাকিয়ে দূরে মায়ের কবরস্থানের দিকে চোখ রাখল। তার চোখ ছলছল করে উঠল।
'নীলিমা বেগম' বউ হয়ে বাড়িতে পা রাখার পর থেকে তারিন বাবার সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা বন্ধ করে দিল। ভার্সিটির সেমিস্টারের টাকা পয়সা সংক্রান্ত বিষয় ছাড়া আর কোনো কথা শেষ কবে বলেছে তার মনে পরল না। সময় সময়ের মত পাড় হয়ে গেলেও সে তার গর্ভধারিনী মায়ের স্থানটা অন্য কাউকে দিতে পারছে না। রৌদ্র আর রোদেলা অন্যকাউকে যখন আম্মু বলে ডাকে তার সমস্ত শরীর শিউরে উঠে। রোদেলা রৌদ্রের চেয়ে এক বছরের ছোট আর তারিন রৌদ্রের চেয়ে ন'বছরের বড়। রোদেলার জন্মের পর থেকেই শাহনাজ বেগম অসুস্থ দিন কাটিয়েছেন। এমন কোনো অসুখ বাকী ছিল না যে তার শরীরে বাসা বাঁধেনি। সেই অসুস্থ শরীরে ছোট ছেলেমেয়েকে নিয়ে তিনি স্কুলে যেতেন, সেখান থেকে প্রাইভেট টিউটর এর কাছে পড়তে নিয়ে যেতেন। বাসায় এসে আবার রান্নাবান্নাসহ সব কাজকর্মগুলো করতেন।
তারিন ছোটবেলা থেকেই বদমেজাজি এবং অলস প্রকৃতির মেয়ে। কখনও এক গ্লাস পানি ঢেলে খেতেও যেন খুবই কষ্ট হত তার। সকালে নাশতা না করে কলেজে চলে যেত। রাতের খাবার খেতে খেতে বারোটা-একটা বাজিয়ে দিত। শাহনাজ বেগম অসুস্থ গলায় বড় মেয়েকে নিজের শরীরের খেয়াল রাখতে বলতেন, ভাই বোনদের পড়াশুনার খোঁজ খবর নিতে বলতেন, বাড়ির ছোটবড় কাজকর্মে হাত দিতে বলতেন। সেই কথা কোনোদিনও গুরুত্ব সহকারে সে শোনেনি!
কিন্তু আজ সে সবই পারে একা একা করতে। একটা বছর ধরে সে রোদেলা আর রৌদ্রকে স্কুলে দিয়ে আসছে। রান্নাবান্না করতে গিয়ে তরকারিতে লবন কম দিচ্ছে বা হলুদ বেশী দিয়ে ফেলছে। ভার্সিটির ক্লাশ করে দুটো টিউশুনি করে বাসায় ফিরছে। দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে রাতেরবেলা কাঁদতেও ভুলে যাচ্ছে। কান্না না করতে পারার যন্ত্রনাটা আরো যন্ত্রনাময় হয়ে শরীরে বাসা বাঁধতে বাঁধতে একসময় তাকে পাথর করে দিয়েছে। আজ সে হাসিমুখে তাই নতুন মায়ের বরন করেছে।
শাহনাজ বেগমের মৃত্যুর পর থেকে শুধু যে তারিন বদলে গেছে তা কিন্তু নয়। বদলে গেছে বাড়ির অবস্থা। বদলে গেছেন সোবহান সাহেব। বদলে গেছে তারিনের চাচা আর ফুফুদের ব্যবহার। রৌদ্র আর রোদেলা'র দিকে তো তাকানোই এখন কষ্টকর। প্রায় ছ'মাস ধরে সোবহান সাহেবকে বিয়ে করানোর জন্য তার ভাই বোনেরা জীবন দিয়ে দিচ্ছেন। এতদিন কী ভেবে তিনি রাজি হননি কে জানে?
হয়ত কারনটা ছিল তারিন। এতবড় মেয়ের সামনে তার বিয়ে করাটা কি লজ্জাকর ছিল? নাকি শাহনাজের স্মৃতি তাকে ডুকরে ডুকরে খেত? একটা সময় গিয়ে তিনি রাজি যখন হয়েই গেলেন আগে রাজি হলে কী এমন অপরাধ হত? এমন হাজারটা প্রশ্ন মনে জেগে উঠে তারিনের।
বাবার বিয়ের কারনে নয়, তার মন খারাপের কারন আজ ভিন্ন। নীলিমা বেগমকে শাহনাজ বেগমের শাড়ী চুড়ি দেওয়া হয়েছে। সেগুলো সে পরে বাসার মধ্যে হাঁটবেন। চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজ করবেন। এই ঘর এই সংসার তিনি আপন করে নেবেন। যা তাকে প্রত্যেক মুহূর্তে কষ্ট দিবে। যেই কষ্টের কাছে তার মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ বলে মনে হবে। মৃত্যুর কথা মনে হতেই হাসপাতালে মায়ের অসুস্থ অক্সিজেন মাক্স লাগানো চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠল। মায়ের বলা শেষ কথাগুলো কানের কাছে যন্ত্রের মত বাজতে থাকল। তারিন যে মাকে কথা দিয়েছিল, ভাই বোনদের ছেড়ে কোনো অবস্থায় কোথাও যাবে না।
রৌদ্র আর রোদেলা'র সকাল-বিকেল 'আম্মু' ডাককে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করল সে। ছোট মানুষ ওরা। কি দরকার এই বয়সে 'মা' আর 'সৎ মায়ের পার্থক্যর পোঁকা মাথার ভিতর ঢুকিয়ে দেওয়ার? বহুদিন পর ওরা কাউকে 'আম্মু' ডাকতে পেরে যেন আনন্দের সীমা নেই। সেই আনন্দ সে নষ্ট করতে চাচ্ছে না। তবে 'নীলিমা' বেগমকে সে আন্টি বলেই সম্বোধন করে।
'নীলিমা বেগম' স্কুল শিক্ষিকা মানুষ। সোবহান সাহেবের সাথে বিয়ের আগে তিনি অন্যের স্ত্রী ছিলেন। তার আট বছরের 'জেরিন' নামের এক মেয়েও আছে। বিয়ের রাতে শুধু এক ঝলক তারিন তাকে দেখেছে। তবে পূর্বের স্বামীর সাথে নীলিমা বেগমের কেন ডিভোর্স হল মাঝেমধ্যে সেই বিষয়টা তার জানতে খুব ইচ্ছে করে। তিনি বাড়িতে আসার পর থেকে তারিন যান্ত্রিক জীবন ইচ্ছে করেই অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। ভাই বোনদের চোখে চোখে রাখলেও তাদের সব দায়িত্ব 'নীলিমা বেগমকে' বুঝিয়ে দিয়েছে।
দিনদিন তারিনের সৎ মা সম্পর্কে যে ধারণা ছিল সব তার উল্টো হতে লাগল। তিনি রৌদ্র এবং রোদেলাকে খেয়াল রাখার পাশাপাশি তারিনকেও 'আম্মু' 'আম্মু' করত। তারিনের এইসব বিষয় তখন অভিনয় মনে হত। প্রত্যেক সৎ মা শুরুর দিকে ভালো থাকলেও একটা সময় গিয়ে ঠিকি আসল চেহারা দেখিয়ে দেন।
দিনের পর মাস পেড়িয়ে গেল। নীলিমা বেগমের আসল চেহারার পরিবর্তন এল না। বরং সংসারের প্রতি তার দায়িত্ব কর্তব্য যেন ভালোবাসায় পরিনত হচ্ছে। কারন ছাড়াই তিনি তারিনের ঘরে চলে আসতেন। কখনও শরীরের খবর নিতেন তো কখনও পড়াশুনার খবর নিতেন। একদিন রাতে কী মনে করে তিনি চিরুনী নিয়ে তারিনের ঘরে গিয়ে বললেন, "তোমার চুলের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে। এসো আমি চুলে তেল লাগিয়ে দেই। কাল আবার সেম্পু করে ফেলো।"
তারিন সাথে সাথে রেগে গিয়ে বলল, "আপনাকে না বলেছি আমার কাছ থেকে দূরে থাকবেন। বলেছি কী বলিনি?"
"বলেছ।"
"তাহলে হুটহাট করে আমার ঘরে ঢুকে পড়েন কেন? রৌদ্র আর রোদেলার খেয়াল রাখছেন সেই যথেষ্ট।"
"তুমিও আমার মেয়ে। তোমার খেয়ালও রাখা দরকার।"
তারিন ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল, "আমার কাছ থেকে দূরে থাকবেন আন্টি। আমার মায়ের জায়গা নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করবেন না।"
"শুধু শুধু আমি তোমার মায়ের জায়গা নিতে চাইব কেন? যিনি তোমার মা ছিলেন তিনিই তোমার মা থাকবেন। সেটা ইহকালে হোক কিংবা পরকালে। আমি শুধু চাই তোমার ভাই বোনদের মত তুমিও আমাকে আপন করে নাও।"
"রৌদ্র আর রোদেলা এখনও ছোট তাই 'মা' আর 'সৎ মায়ে'র পার্থক্য বোঝে না। যেদিন বুঝতে পারবে সেদিন আর আপনাকে মায়ের জায়গা দিবে না।"
"তারিন পার্থক্য তুমিও বোঝো না। মা তো মা হয়। সৎ মা বলতে কিছু নেই, সবসময় রক্তের সম্পর্কই সবকিছু না।"
"যথেষ্ট জ্ঞান দিয়েছেন। এবার আপনি আসতে পারেন।"
নীলিমা বেগম সেদিনের মতো চলে এলেন। তারিন তখনও রাগে ফোপাঁতে লাগল।
আজ সকালে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ছে! ভার্সিটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্য তারিন রিকশায় উঠে শালটা শরীরে ভালো করে জড়িয়ে নিল। আনমনে নানারকম তার ভাবনা চলে আসছে। মা তাকে সবসময় বড়দের সাথে তর্ক করতে নিষেধ করেছেন সেই কথা গতরাতে সে রাখতে পারে নি। তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। নীলিমা বেগম তো সব সৎ মা'য়ের মতন নাও হতে পারেন। এমনটা কী হতে পারে না?
সে ভার্সিটি থেকে ফিরল দুপুরবেলা। বাড়িতে আট ন'বছরের এক মেয়ে কান্নাকাটি করছে। নীলিমা বেগম তার সামনে ভাত নিয়ে বসে খাওয়ানোর চেষ্টায় আছেন।
"লক্ষী সোনা চাঁদের কণা মামুনি আমার। এই যে 'মা' ভাত মেখেছি এখন ভাত মুখে দাও। আর যাবে না আম্মু তোমাকে ছেড়ে।"
"প্রমিজ?"
"তিন প্রমিজ।"
মেয়েটি ভাত মুখে তুলল। তারিনের বুঝতে বাকি রইল না মেয়েটি নীলিমা বেগমের মেয়ে। তার অসম্ভব রাগ লাগল। সোবহান সাহেব বহুদিন পর বসার ঘরে বসে পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছেন। তারিন ঝড়ের গতিতে তার সামনে গিয়ে বলল, "এসব কী হচ্ছে বাবা বাড়িতে? ওই মেয়েটা কে?"
বাবা তারিনের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলেন,
"তুমি তাকে চেনো না, সে কে?"
"না চিনি না।"
"তোমার আন্টির মেয়ে। মাকে ছাড়া থাকতে পারে না তাই সে নিয়ে এসেছে। রোদেলার ঘরে থাকবে তোমাকে বিরক্ত করবে না।"
"এখন থেকে এই বাড়িতেই থাকবে?"
"হ্যাঁ"
"তুমি তোমার প্রথম স্ত্রী'কে ভুলে যেতে পারো বাবা। আমি আমার মা'কে ভুলে যেতে পারি না। এভাবে আমি একই ছাদের নিচে থাকতে পারব না।"
"আমি তোমার মা'কে ভুলে গেছি কথাটা ভুল। বরং তোমার মা মারা যাওয়ার পর থেকে আমি কীভাবে বেঁচে আছি। সবকিছু কিভাবে মেনে নিচ্ছি তা কখনও তুমি বুঝতে চাওনি।"
"তা তো দেখতেই পাচ্ছি বাবা। তোমার নতুন স্ত্রী, নতুন মেয়ে আর নতুন সংসার দেখে।"
সোবহান সাহেব চুপ হয়ে আবার পত্রিকার পাতা মুখের সামনে ধরলেন। তারিন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। কান্নার নিঃশ্বাসের সাথে সাথে বলতে লাগল, "মা! আমাকেও তুমি নিয়ে যাও মা! তোমার কাছে আমাকেও নিয়ে যাও।"
রোদেলার রাতে ঘুম আসছে না। সে কিছুক্ষণ বিছানায় টেডিবিয়ার নিয়ে এপাশ-ওপাশ করল। তারপর বড় বোনের ঘরের দরজায় টোকা দিল। তারিন বলল, "কে?"
"আমি আপু"
"আমার ঘরে আসতে তোর আবার দরজা টোকা দিতে হয় নাকি? আয় ভিতরে আয়।"
রোদেলা ভিতরে এল।
"তোমার মেজাজ খিটখিটে থাকে আপু তাই কোনো কথা বলতে ভয় করে।"
তারিন অবাক হয়ে বলল, "কখন দেখলি আমার মেজাজ খিটখিটে?"
"সেদিন রাতে আম্মুর সাথে চেঁচামেচি করেছ আজ আবার আব্বুর সাথে।"
তারিন চুপ করে থেকে বলল, "তোর হাতের টেডিবিয়ার টা তো সুন্দর। কে কিনে দিয়েছেন, বাবা?"
"না। আমাদের যে নতুন বোনটা এসেছে সে কিনে দিয়েছে। ওর নাম জেরিন। জানো ওর অনেকগুলো পুতুল।"
তারিন তখন অদ্ভুত একটা কাণ্ড করে বসল। রোদেলার গালে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে বলল, "নতুন বোন কিরে? ও আমাদের বোন টোন কিছু না। ওর বাবা মা আর আমাদের বাবা মা কি এক?"
রোদেলা তখন চাঁপা স্বরে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে গেল।
তারিন এখন ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে। সে নিজের কথা ভেবে নিজেই অবাক হয়। এইতো কিছুদিন আগের কথা। কত সুন্দর একটা পরিবার ছিল তার। রোদেলাকে মারার জন্য বাবা তাকে খুবই বকাঝকা করলেন। জেরিনকে পরিবারের সদস্য হিসেবে মেনে নিতে বললেন। তখন সে নিশ্চুপ হয়ে রইল। আজকাল প্রায়ই তার আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসে। কিন্তু ভাইবোনদের কথা ভেবে সেই ইচ্ছেকে আবার মনের মাঝে দাফন করে ফেলে।
বহুদিন পর তার মনের মাঝে সামান্য চিন্তা এল নীলিমা আন্টি মানুষ হিসেবে ভালো। কিন্তু তাকে 'মা' ডাকা সম্ভব নয়। কিভাবে সম্ভব হবে? সবকিছু তো সবার জন্য এত সহজ নয়। অনেকেই অনেক কিছু মেনে নিতে পারে আবার অনেকে পারে না। তারিন তার একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন মানুষটাকে হারিয়ে ফেলেছে। সেই মানুষটাকে যে নামে ডাকত সেই নামে কি অন্য কাউকে ডাকা যায়?
জেরিনকে নিয়ে আজ পরিবারের সদস্য পাঁচজন থেকে ছ'জন হয়েছে। রৌদ্র, রোদেলা এবং জেরিন একই ঘরে পড়াশুনা করতো, নানারকম খেলনা নিয়ে খেলতো আবার একজন আরকজনের জামা টান দিয়ে ছুটাছুটি করে হিহি করে হাসিতে বাড়ি মাথায় তুলত। তারিনকে ওরা কেউই বিরক্ত করতো না। হঠাৎ করেই যেন সে একা হয়ে যায়, নিজের মাঝে শূন্যতা অনুভব করে। নীলিমা আন্টি পূর্বের মতই তার ঘরে এসে কিছু লাগবে কিনা জানতে চেয়ে চলে যান। তারিন যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখনই সোবহান সাহেবও একবার তার ঘরে আসেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘুমন্ত মেয়েকে দেখেন। তারপর কাঁথাটা শরীরে টেনে দিয়ে চুপিচুপি চলে যান। তারিন না ঘুমিয়ে এই ব্যপারটা ঠিকি বুঝতে পারে।
একসময় তারিন আরও বুঝতে পারে এই পরিবারে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু সবকিছু থেকেও কী যেন নেই। সেই সবকিছুর মাঝে তারিন মায়ের ঘ্রাণ, মায়ের বকুনি আর ভালোবাসা খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই শূন্যতা কি কখনো সে কাটিয়ে উঠতে পারবে? নীলিমা বেগম যে স্কুলের শিক্ষিকা সেই স্কুলেই রৌদ্র আর রোদেলা পড়ে। আর হ্যাঁ জেরিনও! শাহনাজ বেগমের মৃত্যুর পর ভাই বোনদের স্কুল বদলানোর পাশাপাশি আজ বদলে গেছে পড়াশুনা, খাবার এবং ঘুমানোর রুটিন। যিনি চলে গেছেন তিনি সাংসারিক মহিলা ছিলেন আর যিনি সংসারে এসেছেন তিনি চাকুরিজীবী। সবকিছুতে পরিবর্তন আসাটাই স্বাভাবিক।
এক পড়ন্ত বিকেলে তারিন মন খারাপ করে পার্কে খানিকটা সময় একা একা হাঁটল। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা পেড়িয়ে গেল। তখনই তার মনে হল মা আজ বেঁচে থাকলে এত বেলা পর্যন্ত বাইরে থাকার জন্য কত কথাই না শুনাতেন। মাগরিবের আযানের পরপরই সে বাড়িতে ঢুকল। সাথে সাথে নীলিমা বেগম তাকে খানিকটা কড়া গলায় বললেন, "তারু তুমি প্রতিদিন টিউশুনি করে পাঁচটার মধ্যে বাড়িতে ফিরে আসো। আজ এত দেরি করলে কেন?"
"আপনি জেনে কী করবেন? আর আপনি আমাকে 'তারু' নামে ডাকবেন না। তারু নামে শুধু আমাকে কাছের মানুষরা ডাকে।"
"একটা কথা মন দিয়ে শোনো। তুমি আমাকে পছন্দ করো না তাতে আমার অসুবিধা নেই। তুমি ভার্সিটি আর টিউশুনি ছাড়া অন্য কোথাও গেলে অবশ্যই আমাকে ফোন করে জানাবে এবং নিজের ফোন সবসময় খোলা রাখবে।"
"আপনার চিন্তা হয় বুঝি?"
"অবশ্যই হয়। আমি এই বাড়িতে শুধু তোমার বাবার বউ হয়ে আসিনি তোমাদের ও মা হয়ে এসেছি।রৌদ্র, রোদেলা, জেরিন এবং তুমি সবাইকে আমি সমান চোখেই দেখি।"
"তাহলে তো আমারও জেরিনকে রৌদ্র আর রোদেলা'র মত সমান চোখে দেখা উচিৎ।"
"সেটা তোমার উপর নির্ভর করছে। ফ্রেশ হয়ে এস। খাবার দিচ্ছি।"
"আমি খাব না।" - তারিন অভিমানী কন্ঠে বলল।
"জিদ করোনা তারু। চলো একসাথে নাশতা খাই। তোমার তিনজন ভাই বোন একসাথে খাবার খায়। তোমার কি তাদের সাথে খেতে ইচ্ছে করে না? সবসময় মন মরা হয়ে থেকো না। হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করো। কারো জীবন পারফেক্ট হয় না। অনেক সময় অনেক কিছু ভাগ্যের কারনে মেনে নিতে হয়। আমিও নিয়েছি। তুমিও নাও।"
আজ তারিন নীলিমা বেগমের সাথে আর তর্ক করেনি। সে হাতমুখ ধুয়ে সত্যি সত্যি ভাইবোনদের সাথে নাশতার টেবিলে বানানো সমুচা আর পিজা খেল। শাহনাজ বেগম এত ভালো খাবার তৈরি করতে পারতেন না। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা তিনি রং চা ছাড়া অন্যকিছু বানাতেনও না। তবুও তারিনের মনে হল, "ইস! একবার যদি মা আবার ফিরে আসতেন। আরেকবার যদি তার বানানো রং চা খেতে পারতাম।"
তারিন তর্ক করা কমিয়ে দিল। দিনদিন নীলিমা বেগমের প্রতি মায়া জন্মাল। নীলিমা বেগম সারাদিন স্কুলে ক্লাশ নিয়ে বাসায় এসে আবার সংসারের কাজ করতেন। তার কখনও কখনও ইচ্ছে করত আন্টিকে সাহায্য করতে কিন্তু কী ভেবেই আবার করা হত না। মনে মনে বলত, "কি দরকার? সংসার এখন তার। সে যা ইচ্ছে করুক আমার কী?"
একদিন রান্নাঘর থেকে জোরে আওয়াজ এল। নীলিমা বেগম 'উঁহ' করে কেমন একটা শব্দ করলেন। তারিন ছুটে এসে বলল, " হাত কীভাবে পুড়লেন?"
"ভাতের মাড় হাত ফসকে পড়ে গেল কীভাবে বুঝতে পারলাম না।"
তার বলার মাঝেই তারিন ঠাণ্ডা পানি ফ্রিজ থেকে বের করে তার হাতে ঢালল। ডিম ভেঙে সাদা অংশ হাতে মাখিয়ে দিয়ে বলল, "দাঁড়ান দেখছি আমার ঘরে হয়ত মলম আছে।"
"হাত ঠিক আছে তারিন। ফোস্কা পড়েনি।"
"আরেকটু হলেই তো পড়ে যেত। আপনি এখন বিশ্রাম নিন।"
"সমস্যা নেই তুমি পড়তে যাও। ভাতের মাড় গালতে হবে। তরকারিটা চুলোয় বসাতে হবে।"
"ভাতের মাড় আমিও গালতে পারি। তাছাড়া আমার আজ তেমন পড়াশুনা নেই। বাকি রান্নাও করে দিচ্ছি। আপনি বরং বসার ঘরে বসুন।"
এই কথার পরও নীলিমা বেগম দাঁড়িয়ে রইল। তারিন ভাতের মাড় গেলে তেলের কড়াইয়ে কাটা পিঁয়াজ ছেড়ে দিল। হঠাৎ কী মনে করে বলে উঠল, "মা বেঁচে থাকতে এসব ছোটখাটো কাজ আমি করতাম। করতে না চাইলেও মা জোড় করে করাতেন। বলতেন, মেয়ে মানুষকে সংসারের সব কাজকর্ম শিখতে হয়। আপনি আসার পর থেকে অভিমানে আর রান্নাঘরে আসা হয় না।"
"অনেক মিস করো মা'কে তাই না?"
"খুব মিস করি।"- বলতে গিয়ে তারিন কেঁদে ফেলল। জল ভরা চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝড়ল। নীলিমা বেগম শাড়ির আঁচল দিয়ে তারিনের চোখের জল মুছে দিতে যাবে ওমনি তারিন তার দিকে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জরিয়ে ধরে কিছুক্ষণ হাউমাউ করে কাঁদল।
জেরিন ছোট ছোট বিষয়গুলোতে খুব রাগ করে। সে আজকাল সুযোগ পেলেই তারিনের ঘরে এসে বোনকে এটা-ওটা গল্প শুনায়। সেই গল্পের মাঝে থাকে তার স্কুল বান্ধবীদের গল্প, আর্ট ক্লাশের গল্প, বানিয়ে বানিয়ে রুপকথার রাজা-রানির গল্প। তারিন শুনতে না চাইলেও সে বকরবকর করতে থাকে। সেদিন রোদেলার সাথে তার কি হল কে জানে? তারিনের ঘরে এসে সে গাল ফুলিয়ে বসে রইল। তারিন তখন বলল, "কী হয়েছে?"
"তারু আপু আমি তোমার কাছে ঘুমোবো।"
"কেন?"
"রোদেলার সাথে রাগ করেছি।"
"কেন রাগ করেছ?"
"কারনটা বলব না।"
"আচ্ছা।"
"তুমি কি তোমার সাথে আমাকে ঘুমোতে নিবে না?"
"নিবো।"
জেরিন হাত পা ছড়িয়ে তারিনের গা ঘেষে ঘুমোল। সে কিছু বলল না।
জেরিনের বাবা মাঝেমধ্যে মেয়েকে দেখতে আসেন। যখন আসেন এক গাদা চকলেট নিয়ে আসেন। সেই চকলেট জেরিন ভাই বোনদের ভাগ করে দেয়। তারিন অবাক হয়ে সবকিছু দেখে একা একা ভাবে, "আমি কি পারিনা জেরিনকেও রোদেলার মত ভালোবাসতে?"
অজানা একটা মায়া তখন জেরিনের জন্যও তার জন্ম নেয়। সকাল-বিকাল সে তারিনকে যতবার 'আপু' 'আপু' করে ততবার 'রৌদ্র' আর 'রোদেলা'ও করে না। রৌদ্র সেই কথা বলা শেখার পর থেকেই চুপচাপ স্বভাবের ছেলে। তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় এখন ভাত খাবে? সে শুধু 'ঘাড়' নাড়িয়ে ' হ্যাঁ ' সূচক জবাব দেয়। বাকিসময় পড়াশুনা করেই সময় কাটায়। পরীক্ষায় রেজাল্টও খুব ভালো করে। তার বন্ধু টন্ধু তেমন নেই বললেই চলে।
নীলিমা বেগম কখনও কখনও কারো সাথে ফোনে কথা বলার সময় বলেন, "আমার ছেলে এবারও ফাষ্ট হয়েছে।" - আবার কখনও বলেন, "আজ আমার বড় মেয়ের শরীরটা ভালো না। আজ কোনভাবেই স্কুলে যাওয়া সম্ভব না।"
এসব শুনতে প্রথম দিকে তারিনের যে খারাপ লাগাটা কাজ করতো এখন আর করে না। সে একটা সময় সব মেনে নিলেও চার দেয়ালের মাঝে মায়ের অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ানো ভুলে যায়নি।
সোবহান সাহেব একদিন মেয়ের কাছে এসে বললেন, "তারু আমরা নতুন একটা বাসা নিয়েছি। তোমার ভাই বোনদের স্কুলের কাছে। তুমিসহ আমরা সবাই সেখানে উঠতে চাই। তোমার এই বিষয়ে কিছু বলার আছে?"
"নতুন বাসা কেন বাবা? এই বাড়ির বারান্দা থেকে মায়ের কবরটা দেখা যায়। সব স্মৃতি মা'য়ের এখানে। আমি কোথাও যাব না।"
"তারু আমি বুঝি তুমি তোমার মা'কে খুব ভালোবাসতে। কিন্তু আমাদের এই বাসাটা খুব ছোট। শহর থেকেও বেশ দূরে। তোমার ভাইবোনদের স্কুল থেকে যাওয়া আসা করতে কষ্ট হয়। কথা দিচ্ছি, প্রতি শুক্রবার তোমাকে নিয়ে এসে তোমার মায়ের কবর জেয়ারত করে যাব।"
"নতুন বাসাটা কি অনেক বড়?"
"হ্যাঁ, বড়। তোমার নীলিমা আন্টিও চান সেখানে উঠতে। এই বাড়িতে তোমাকে তোমার মায়ের স্মৃতি সারাক্ষণ কষ্ট দেবে। রোদেলা আর জেরিন বড় হচ্ছে। তাছাড়া রৌদ্ররও আলাদা একটা ঘর দরকার।"
তারিন চুপ করে রইল। সোবহান সাহেব বিষন্ন গলায় বললেন, "চুপ করে আছ যে? তুমি কি বুঝতে পেরেছ কী বলছি? তুমি কি যেতে চাচ্ছ না মা?"
"আমি বুঝতে পেরেছি বাবা। তুমি যাওয়ার প্রস্তুতি নাও।"
হয়তো তারিন সেদিন আবারও জিদ করতে পারত। বলতে পারত, "মা'য়ের স্মৃতি রেখে আমি কোথাও যাব না। কিন্তু সে তা করেনি। সেদিন তার কষ্টের চেয়ে রৌদ্র আর রোদেলার সুখ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নীলিমা বেগম বা সোবহান সাহেব কেউই বুঝবেন না আজ তারিন পৃথিবীর কোথাও গিয়ে শান্তি পাবে না। বাসা ছাড়ার জন্য গোছগাছ শুরু হল। তারিনের শরীরটা খারাপ লাগছে। মন খারাপ হয়ে আছে। শরীর প্রাণ শূন্য হয়ে আছে। মায়ের জিনিসগুলো গুছাতে দেখে তার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হল। নীলিমা বেগম বললেন, "কী হয়েছে? তোমার শরীর কি খারাপ লাগছে?"
তারিন যন্ত্রের মতো বলল, "না"
পরক্ষনেই আবার বিড়বিড় করে বলল, "আমি মরে যাচ্ছি না কেন? যেখানে সবচেয়ে আপন মানুষটাই নেই সেখানে বেঁচে থেকে কী লাভ?"
শেষবার বাড়ির দিকে আর কবরস্থানে চোখ বুলিয়ে তারিন ব্যগ হাতে বাড়ি থেকে বের হল।
নতুন বাসায় আসার পর থেকে জ্বরের ঘোরে শুধু 'মা' 'মা' বলে ডেকেছে সে। যখনই চোখ মেলে তাকিয়েছে নীলিমা বেগমকে পাশে দেখেছে। তার শরীরের অবস্থা দিনদিন আরও অবনতি হল। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। ডেঙ্গু জ্বর তার শরীরকে দূর্বল করে দিয়েছে। নীলিমা বেগম অস্থির হয়ে উঠলেন। রাত জেগে তার পাশে বসে থাকতেন। বাথরুমে ধরে ধরে নিয়ে যেতেন। নিজের হাতে স্যুপ খাইয়ে দিতেন। তারিন যখন মুখ ফিরিয়ে নিত তিনি কানের কাছে ফিসফিস করে বলতেন, "খেয়ে নাও মা। দিনরাত তোমার জন্য দোয়া করছি। আল্লাহ সুস্থ করে দিবেন। আমি তোমার পাশেই আছি। নিজেকে কখনো একা ভেবো না।"
তারিন সুস্থ হয়ে উঠল। এক বিকেলে হাসিমুখে নীলিমা আন্টিকে বলল, "আমার ছোঁট মাছ দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে করছে।"
নীলিমা বেগম ছোঁট মাছ রান্না করে তারিনকে মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দিলেন।
প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়। তারিন সবসময় তার মায়ের বৈশিষ্ট্যগুলো নীলিমা আন্টির মাঝে খুঁজে বেড়িয়েছে। যা বাস্তব হবার নয়। তারিনের মা যেমন ছিলেন তেমন তিনি নন। কিন্তু তার ভালোলাগা চাইলেই ভালো লাগাতে পারে সে। হ্যাঁ জেরিনকেও আপন করে নিতে পারে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। তারিনও না হয় নিল। নিজের জন্য না হোক নিজের ভাইবোনদের জন্য কিংবা বাবার জন্য। যখন থেকে সবকিছু সে মেনে নিতে পারবে তখন থেকে তার সব কষ্ট ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর তারিনের রাতে ঘুম হয় না। ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমোতে হয়। আজ ঘুমের ঔষধ খেয়েও তার ঘুম আসছে না বরং ঘুম কেটে যাচ্ছে। রোদেলা আর জেরিনের পড়ার শব্দ কানে আসছে। অসময়ে ওদের পড়ার শব্দ যন্ত্রের মতন কানে বাজে। সাধারণত ঘুম না আসলে মানুষের মাঝে বিরক্তি ভাব চলে আসে তারিনের ক্ষেত্রেও তাই হল। আগামীকাল তার 'ফরহাদের' সাথে দেখা করতে হবে। অনেকদিন ভালোবাসার মানুষটার সাথে কথা হয় না। পাশাপাশি পার্কে বসে বাদাম খাওয়া হয় না।
সে চকলেট রঙের কাঁথাটা শরীরে জড়িয়ে আবার শুয়ে পরল। মনে মনে বলল, "আমার কীসের এত কষ্ট?"
কষ্ট নেই দুঃখ নেই এমন একটা ভাব করে সে পাশ ফিরল। ঘুম না আসলে তার আজ আরও ঘুমের ঔষধ খেতে হবে।
"তারু" "তারু" - বহুদিন পর সোবহান সাহেব আবার তাকে ডাকছেন।
তারিন সাথে সাথে উঠে বসল। বাবা কি আজ পূর্বের মত আবার চা খেতে চাইবে? তারিনকে 'মামুনি' বলে ডাকবে? সে খাট থেকে নামতে গিয়ে খাটের পাশে আলমারির সাথে ধাক্কা খেল। 'রোদেলা' আর 'জেরিনের' পড়ার শব্দ হঠাৎ করেই থেমে গেল। সে বাবার শোবার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘরের মাঝে নীলিমা বেগমকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি কি আজ তার ছোট দুই মেয়ের ঘরে ঘুমোচ্ছেন?
তারিন বলল, "বাবা ডেকেছ?"
"ঘুম আসছে না মামুনি। এক কাপ চা খাওয়াতে পারবি?"
তারিনের চোখ আনন্দে ভরে উঠল। সে সাথে সাথে বলল, "পারব বাবা।"
তারাহুরো করে 'চা' বানাতে গিয়ে সে চায়ের কেটলি নিচে ফেলে দিল। নীলিমা বেগম শব্দ শুনে রান্না ঘরে ছুটে আসলেন। কেটলি তুলতে গিয়ে ভুল করেই তারিন বলে উঠল, "কেটলি পরে গেছে 'আম্মু'। দেখো না, বাবা এই অসময়ে চা খেতে চাইলেন।"
নীলিমা বেগম এবং তারিন দু'জনেই খানিকটা সময় চুপ হয়ে রইলেন। তারিন কাঁপা গলায় বলল, "সরি আন্টি। আমি ঘুমানোর জন্য আজ ঘুমের ঔষধ খেয়েছি। মাথায় কোনো কাজ করছে না।"
নীলিমা বেগম কিছু না বলে চলে গেলেন। সোবহান সাহেব চা খেতে চেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। তারিন আস্তে করে 'বাবা' বলে ডাক দিল। সেই ডাক সে নিজেও ঠিকমত শুনল না। নীলিমা বেগম রৌদ্র'র ঘরে ঘুমোলেন। তারিন ঠাণ্ডা চা নিয়ে সারারাত ঘুমন্ত বাবার পাশে বসে রইল। শেষ রাতের দিকে তার চোখ জুড়ে ঘুম নেমে এল। তখন সে নিজের ঘরে চলে এল।
পাঁচ বছর পর।
আজ তারিনের বিয়ে। তার পছন্দের ছেলে ফরহাদের সাথেই তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। এত জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের কথা কখনোই সে ভাবেনি।
'রোদেলা' আর 'জেরিন' হুট করেই যেন বড় হয়ে গেছে। বিয়ের দিন একই রকম বেগুনী শাড়ি পড়ে দু'জনে একইভাবে চুল বেঁধেছে। কে বলবে আজ? এরা দু'বোন আলাদা বাবা মায়ের সন্তান। লোক চোখের বাইরে মানুষ একে অন্যের সাথে অনেক কিছু বললেও নীলিমা বেগমের সামনে কেউ প্রশ্ন করার সাহস জন্মাতে পারেনি। তারিন লাল বেনারশী পরে অস্থির হয়ে বসে আছে। যেন এখুনি সে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। নীলিমা বেগম তার পাশে এসে বসলেন। তার হাতে গয়নার বাক্স। তিনি বাক্স খুলতে খুলতে বললেন, "এগুলো তোমার মায়ের সব গয়না তারু। এতদিন সব যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম। তোমার বাবার কাছে শুনেছি তোমার মা তোমার আর রোদেলার বিয়ের জন্য এগুলো বানিয়েছিলেন। তাছাড়া তার সোনার জিনিসের শখও নাকি ছিল অনেক। এখন সময় এসেছে এগুলো তোমাকে দেয়ার।"
তারিন বলল, "কিন্ত আমরা তো তিন বোন, নিয়ম অনুযায়ী এগুলো তিন ভাগ হবে আন্টি।"
"কি বলছ তারু? তোমার বাবা আজ তোমাকে এগুলো দিয়ে দিতে বলেছেন।"
"অনেক কিছু বদলে গেছে আন্টি। সবকিছুই এখন আমাদের তিন বোনের আর হ্যাঁ আপনি চাইলে আপনার ছেলে রৌদ্রের বউ এর জন্যও এগুলো রেখে দিতে পারেন।"
নীলিমা বেগমকে তারিন কখনও কাঁদতে দেখেনি। তবে সেদিন সে শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছলেন। তিনি বললেন, "আমি একটু আসছি তারু।"
কিছুক্ষন পর তিনি ফিরে এলেন এক জোড়া সোনার বালা হাতে নিয়ে।
"তারু এই সোনার বালা অনেক পুরনো ডিজাইনের। আমার মা আমাকে দিয়েছিলেন। আর আমার মা'কে আমার নানী। বলতে পারো জেরিনের বিয়ের জন্য রেখেছিলাম। আমি তো সোনার জিনিস একদমই পরি না। আজ থেকে এগুলো তোমার।- বলতে বলতে তিনি বালা তারিনের হাতে ঢুকিয়ে দিলেন।
তারিন বলল, " কিন্তু আন্টি।"
"কোনো কিন্তু নয়। বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে এগুলোর অধিকার এখন তোমার।"
তারিনের অল্পতেই কান্না পায়। তাই সে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই বলল, "আন্টি আজকের এই দিনে আমি কি আপনাকে একবার 'আম্মু' বলে ডাকতে পারি? আজ যে খুব ইচ্ছে হচ্ছে।"
"শুধু আজ নয়। তুমি চাইলে সারাজীবন ডাকতে পারো।"
বলেই নীলিমা বেগম তারিনকে জড়িয়ে ধরল। আজ বহুদিন পর তার মনে হচ্ছে সত্যি কষ্ট অনেক কমে গেছে। মায়ের জন্য বুকের বাম পাশে যে চিনচিনে ব্যথাটা হত সেটা আজ আর অনুভূতি হচ্ছে না। কষ্টগুলো তো এমনই হয়, যখন আমরা অন্যের কষ্ট ভাগ করে নেই তখন নিজেদের কষ্ট কমে যায়।
তারিনের বিদায়ের সময় জেরিন এমন ভাবে কাঁদছিল যেন সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে। রোদেলা অনেক চাপা স্বভাবের মেয়ে, কান্না করলেও কাউকে দেখাবে না। আর রৌদ্র বাবার মতন কষ্ট পেলে আরও বেশী চুপ হয়ে যায়। এক এক করে সবার কাছ থেকে বিদায় নিলো সে। সোবহান সাহেব অশ্রুশিক্ত চোখে মেয়ের বিয়ের গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
শ্বশুর বাড়ির গাড়িতে উঠার আগে আবার একবার ফিরে তাকিয়ে তারিন পরিবারকে দেখে নিল। বাবা, রৌদ্র, রোদেলা আর জেরিন আজ সবাইকে খেয়াল রাখার জন্য মা আছেন। হোক না সে 'সৎ মা'। আজ যে তিনি পরিবারের সবচেয়ে আপন।
"মা"
শাদবিন শাকিল
(বিঃ দ্রঃ এই গল্পটার কিছু অংশ ২০১৭ সালে আমার লেখা 'সৎ মা' গল্প থেকে নেয়া হয়েছে)

গল্পঃ নীল ডায়েরি
রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম হঠাৎ একটা কিছু পড়ে থাকতে দেখলাম।
মনে হচ্ছে একটা ডায়েরি, কাছে গিয়ে একটা নীল রং এর ডায়েরি
অন্য মানুষের ডায়েরি পড়তে আমার খুব ভালো লাগে।
যার জন্য অনেকের ডায়েরি চুরি করে পড়েছি তাই ডায়েরিটা তুলে নিয়ে ব্যাগে রেখে দিলাম বাসায় গিয়ে পড়বো বলে।
বাসায় এসে হাতমুখ ধুলাম রাতে খাবার খেয়ে উপরে গিয়ে কাজ করতে লাগলাম।
কিন্তু হঠাৎ ডায়েরিটার কথা মনে পড়াতে আর কাজে মন বসলো না।
তাই ডায়েরিটা খুলে নিয়ে বসলাম দেখি ডায়েরিটা অনেক পুরাতন।
প্রথম থেকে পড়তে শুরু করলাম,,,
আজ এই স্কুলের প্রথম দিন শহর থেকে গ্রামে এসেছি না জানি কেমন পাপ করেছিলাম যে এখানে আসতে হলো। যাইহোক কি আর করার এখন এখানেই তো আমাকে ২ বছর থাকতে হবে।
বাবার বদলি হওয়ার কারনে সব হলো।
ক্লাসে গেলাম সবার সাথে বন্ধুত্ব করলাম কিন্তু আমার চোখ গেল একটা মেয়েরউপর
কেমন যেন তার চোখ দুটোতে খুব মায়া ভরা অনেক ভালো লাগতে শুরু করলো।
যদিও আমি ক্লাস করা ওতোটা পছন্দ করতাম না কিন্তু মেয়েটার জন্য আমি প্রতিদিন ক্লাসে
যাওয়া শুরু করলাম।
মেয়েটাও নতুন ছিল সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল মেয়েটা খুব কম নকথা বলতো।
এভাবে চলতে থাকলো কখন যে ভালোলাগা থেকে ভালোবাসাতে পরিনত হলো নিজেও জানি না।
যেদিন ও আসতো না সেদিন আমার একটু ও ভালো লাগত না এভাবে চলতে থাকে।
মনে মনে আমি অনেক ভালোবেসে ফেলেছি তাই আমি ওকে প্রপোজ করতে চাই কিন্তু কোন ভাবেই বলা হয় না।
ভাবলাম চিঠি লিখে নিজের ভালোবাসার নকথা জানাবো ওই দিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগে চিঠি লিখলাম কিন্তু আমার আর দেওয়ার সাহস হলো না।কিন্তু তারপরও ওর কথা ভাবতেই খুব ভালো লাগতো।
ধীরে ধীরে এসএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আসতে লাগলো।
পড়াশোনায় মোটামুটি ভালোই ছিলাম কিন্তু ওর কথা ভাবতে বসলে আর পড়াশোনা হতো না।
এভাবেই চলতে লাগলো কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই আমার আম্মু আমাকে ছেড়ে পৃথিবী থেকে চলে গেলো
আমার কথা গুলো শেয়ার করার মতো আর কেউ থাকলো না আর ভালো লাগতো না।
খুব একা একা মনে হতো না তারপর কিছুদিন পর স্বাভাবিক হলাম আবার আগের মতো হয়ে গেলাম।
এস এস সি পরীক্ষার মধ্যে আমার মনের কথা বলতে চাইলাম।
প্রাকটিকাল পরীক্ষা মধ্যে ডাক দিলাম ওকে কিন্তু আমার কথা ও শুনলো না।
চলে গেল আমার সামনে দিয়ে।
কিছুদিন পর শুনি ওর নাকি বিয়ে হয়ে গেছে মখারাপ লাগতে লাগলো কিন্তু আমার কিছু করার নাই।
হাই স্কুল থেকে কলেজে উঠলাম বসে রয়েছি।
সন্ধ্যার দিকে খবর আসলো যে আমার বাবা নাকি এক্সিডেন্ট করছে।
আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল আমি হাসপাতালে গিয়ে আব্বুর কাছে গেলাম।
আমি যাওয়ার পর আমার বাবা শুধু একটা কথাই বললো তোকে দেখে রাখার মতো আর কেউ রইলো না রে এখন থেকে তোকে একাই চলতে হবে রে তারপর আব্বুর চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
অনেক কান্না পেতে লাগলো কারন আমার জীবনে কিছুই আর থাকলো না।
আমার বটগাছ টাও আর থাকলো নাআমার কোন আত্বীয় স্বজন নেই। আর থাকলেও আমি জানতাম না কারো সাথেই আমার পরিচয় ছিলো না তাই বাবার মৃত্যতে বাবার শুধু কিছু কলিগ ই এলো।
অনেক দিন রুম থেকে বের হলাম না।
এইচএসসি তে রেজাল্ট একটু খারাপই হলো ইউনিভার্সিটি তে উঠলাম।
একাই চলাফেরা করতাম আমার কোন বন্ধু ছিল না
পড়াশোনা করতাম আর একটা পার্ট টাইম জব করতাম যদিও আব্বুর পেনশন এর টাকায় আমার চলে যেতো।
কিছুদিন পর ভার্সিটির কাছে ওখানে একটা বটগাছ ছিলো ওইখানে বসে একটু পড়তেছিলাম
তখনই একটা মেয়ে এসে বললো...
-হাই কেমন আছেন...??
আমি দেখলাম তবুও মনে হলো আমাকে ডাকছে না কারন আমার আশে পাশে আরো অনেকই ছিলো
আর আমাকে কেই বা ডাকবে।
কিন্তু মেয়েটা আমার কাছে এসে বসলো আর বলতে লাগলো...
-আচ্ছা আমি যে কথা বলতেছি আপনার কানে যায় না
-আসলে আমি এই ইউনিভার্সিটির কাউকেই চিনি না আর কারো সাথে তেমন কথাও বলি
না তাই আমাকে আবার কে ডাকবে।
-কিন্তু আজ থেকে আমি ডাকবো।
-কেনো
-কারন আজ থেকে আমি তোমার বন্ধু।
-ওহ
-হুম আচ্ছা এখন চলোক্লাসে যাব মাসে ২ দিন ক্লাস করো কিনা সন্দেহ আর তোমার নাম্বার দাও।
-নাম্বার দিয়ে কি হবে৷
-প্রয়োজন হলে কল দিবো
-কিভেবে নাম্বার টা দিয়ে দিলাম আমার মনে পড়ছে না।
এভাবেই আকাশি আর আমার ফ্রেন্ডশীপ টা অনেক গাঢ় হয় ও সবসময় আমার কেয়ার করতো।
একদিন ও আমাকে ওর ভালোবাসার কথা বলে বসলো।
আমি ওকে অনেক নিষেধ করলাম কিন্তু ও ওর জেদে অটুট থাকলো।
এভাবে আমাদের ভালোবাসা চলতে থাকলো আমার ওর সাথে থাকতে ভালোই লাগতো।
কেনই বা লাগবে না ও অনেক ভালো মেয়ে।
কিন্তু ওর বাসার লোক ওতোটা পছন্দ করতো না।
একদিন আকাশি আমাকে ফোন দিয়ে বললো
- এই বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলছে প্লিজ তুমি কিছু করো
-আমি কি করবো এখন
-তুমি আমার বাবার সাথে কথা বললো।
আমি আকাশিদের বাসায় গেলাম আকাশী তখন ছিল না আকাশীর আব্বু আমার সামনে বসলো।
আমি আংকেল কে আমাদের ভালোবাসার কথা বললাম।
তখন আংকেল আমাকে বললো আমি তোমাকে আমার মেয়ে কেন দিবো তোমার অনাথের কাছে আমার মেয়ে কেনো দিবোকথাটা আমার বুকে এসে বিধলো।
আমি আকাশীর বাসার থেকে চলে এলাম রাস্তায় এসে দাড়িয়ে আছি এমন সময় ও ফোন দিল
-কি হলো আব্বুকে বলছো আমাদের কথা
-নাহ্ বলার সুয়োগ পাই নি।
-কেনো কি হয়েছে ?
-কারন আমি তোমাকে ভালোবাসি না। (বলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু তবুও বলে দিলাম)
-কি বলছো তুমি এসব।
-হুম আমি ঠিকি বলছি।
-তুমি পাগল হয়ে গেছো নাকি।
-নাহ আমি পাগল হয় নি।
ও কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু আমি ফোন কেটে দিলাম তারপর সিমটা ভেঙে ফেললাম।
কিছুদিন পর ওর বিয়ে হয়ে গেলো আমি ও সময়ের সাথে নিজের গা টা ভাসিয়ে দিলাম।
দেখতে দেখতে কয়েক বছর চলে গেল এখন একটা কোম্পানিতে চাকরি করি।
একদিন আমার কলিগ বললো কি ব্যাপার বয়স তো হলো বিয়ে করবেন না
-হুম করবো কিন্তু আমাকে মেয়ে দিবে কে
-আমি দেখে দিবো।
-হুম দিলে মন্দ হবে না।
তারপর ওই ভাই একটা মেয়ে ঠিক করলো শুনেছি মেয়েটারো কেউ নেই তাই কোর্ট ম্যারেজ করে নিলাম।
মেয়েটার নাম তিথি বাসায় ই বিয়ে উপলক্ষে কলিগদের পার্টি দিলাম।
বাসর ঘরে ঢোকার সাথে ও আমাকে সালাম করলো।
আমি ওকে খাটের উপর বসালাম ঘোমটা তুললাম অনেক মায়াবী চেহারা যে কেউ তাকিয়ে থাকতে চাইবে।
আমি তারপর ওর পাশে গিয়ে বললাম....
-আমার কাছে কি তোমার কোন চাওয়া আছে ?
-হুম আছে।
-কি চাও বলো।
-সারাটি জীবন আমাকে ভালোবাসবেন।
-শুধু এতোটুকুই।
-হুম এতোটুকুই এবার চলেন নফল নামাজ পড়ে নি।
-হুম চলো
তারপর থেকে ও আমার পৃথিবী আর আমি ওর পৃথিবী। কখনো কোন অভিমান হতো না।
প্রতি সপ্তাহে আমরা বেড়াতে যেতাম এভাবেই চলতে লাগলাম আমরা দুজন দুজনা।
একদিন বাসায় আসার পর ও খুব লজ্জা পাচ্ছিলো তারপর আমাকে জানালো যে
আমি বাবা হতে চলেছি।
ভাষায় বোঝাতে পারবো না যে আমি কতোটা খুশি।
আমি ওর প্রচুর খেয়াল করতাম তারপর একদিন ডেলিভারির সময় হলো
কিন্তু ওটিতে যাওয়ার আগে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল ওকে।
আমি ওকে অভয় দিলাম
-কিচ্ছু হবে না দেখো তোমার।
ও আমাকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছিল না তবুও যেতে তো হবে।
তিন ঘন্টা পর ডাক্তার বের হয়ে এলো আর আমি ডাক্তারের কাছে গেলাম ।
-আপনার একটা কন্যা হয়েছে কিন্তু আমি দুঃখিত আমরা আপনার স্ত্রী কে বাচাতে পারি নি।
কথায় আছে অতি সুখ কখনো কপালে সয় না
আমি বসে পড়লাম কথাটা শুনে আবার একা হয়ে পড়লাম।
কিন্তু আমার মেয়েটার জন্য আমাকে শক্ত হতে হবে আমি ওকে মানুষ করতে লাগলাম
তারপর আর কিছু লেখা দেখলাম না।
(বর্তমান)
তিনবছর পর আমি বাসে করে আমার এক আত্বীয় বাড়িতে যাচ্ছি সাথে ডায়েরিটা আছে.।
হঠাৎ বাসে একটা মধ্যে বয়স্ক লোক উঠলো এবং আমার কাছে বসলো।
আমি ডায়েরিটা বের করলাম পড়ার জন্য।
লোকটা হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলো....
-এই ডাইরি তুমি কোথায় পেলে
-ওহ এটা আমি তিন বছর আগে রাস্তায় পেয়েছিলাম কিন্তু আপনি কি চিনেন এই ডায়রিটা।
-আসলে এটা আমার ডায়েরি।
-আচ্ছা এসব কি সত্যি।
-হুম
-আচ্ছা আপনার মেয়ে কোথায়
কথাটা বলতেই লোকটার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো তারপর বলতে শুরু করলো
-আসলে আমার বোধহয় কপালে সুখ ছিল না।আরিয়া নাম রেখিছিলাম মেয়েটার।
যখন আমার মেয়ের বয়স দশ আমার মেয়ের ব্রেন টিউমার ধরা পড়লো।
ডাক্তার বললো আর ৬ মাস আছে ওর বেঁচে থাকর।
আমি ওকে কিছু বললাম না কিন্তু মেয়েটা বার বার আমাকে বলতো বাপি আমার না মাথা ব্যাথা করে।
আমি কাদতে চেয়েও কাদতে পারতাম না শুধু ওকে বুকে জরিয়ে ধরে রাখতাম।
তারপর এক বৃষ্টির রাতে ও আমাকে একা করে দিয়ে চলে গেল।
তারপর আমার হাত থেকে ডায়েরিটা নিলো আর যশোরে নেমে পড়লো।
আমার চোখ যতদুর পর্যন্ত যায় আমি লোকটাকে দেখতে লাগলাম
তারপর উনি ভীরের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন আজানায়।
কিছু কিছু গল্পের সমাপ্তি হয় না তবুও সেখানেই ইতি টেনে সমাপ্ত করে দিতে হয়।
…………………সমাপ্ত…………………
গল্পঃ নীল ডায়েরি

অন্তরাক্ষী
দিনটা শুরুই হয়েছিল একটু অন্যভাবে। নাশতা খেতে খেতে সিমিন বললো--
‘আজকে সব সাদা জিনিস ধোবো...সাদা কিছু থাকলে দাও।’
‘যা ছিল ওয়াশিং মেশিনে দিয়েছি। সাদা একটা মন ছাড়া আর কিছুই নেই।’
ভেবেছিলাম আমার কথায় সিমিন খুশী হবে কিন্তু হলো না। তাহলে কী আমার ভান সে বুঝতে পারে? হয়তো পারে। তা না হলে এ রকম হচ্ছে কেন? সেদিন রাতে একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শুনতে পেলাম, সিমিন কার সাথে যেন কথা বলছে--
‘কী খুঁজছো?’
‘ভালোবাসা।’
‘পেয়েছো?’
‘না।’
‘কোথায় রেখেছিলে?’
‘তোমার মনের মধ্যে।’
‘তাহলে পাচ্ছো না কেন?’
‘জানি না, ওখানেই তো রেখেছিলাম...।’
রাত দুপুর। ডিম লাইট জ্বলছে। এদিক-ওদিক তাকালাম। দরজা-জানালা ভালো করে ঠেলে-ঠুলে দেখলাম। খাটের নীচেও উঁকি দিলাম। আলমীরা খুললাম। বারান্দায় গেলাম; কাউকেই তো দেখছি না। আমরা ছ’তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকি। আশেপাশে আর কোনো বিল্ডিংও নেই। তাহলে সিমিন কথা বললো কার সাথে? আমার নড়াচড়ার শব্দে কথা বন্ধ করে দিয়েছে। একবার মনে হচ্ছে জিজ্ঞেস করি। আবার মনে হচ্ছে; আমার হ্যালুসিনেশান হয়নি তো? হতেও পারে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষ ঘুমের ঘোরে কত কিছু দ্যাখে! কত কিছু শোনে! সকাল হলো কিন্তু সিমিনের ঘটনাটি আমার মাথা থেকে গেল না।
আমাদের বিয়ের বয়স দু’বছরের একটু বেশী। সিমিন অষ্ট্রেলিয়াতে এসেছে মাত্র এক বছর চার মাস। শুরু থেকেই বিবাহিত জীবনটা ভালো যাচ্ছিল না। একদিনের জন্যও নিজেদেরকে সুখী দম্পতি মনে হয়নি। কেন যে বাবা-মায়ের কথায় বিয়েটা করেছিলাম? এত দিন ভাবতাম সমস্যা শুধু আমারই; এখন দেখি সিমিনও নতুন সমস্যা তৈরী করেছে। রাত দুপুরে পরপুরুষের সাথে প্রেমালাপ করে। হাতে-নাতে ধরতে হবে; নইলে ‘তোমাকে বিয়ে করে জীবনটা মাটি হয়ে গেল’ টাইপ কান্নাকাটি জুড়ে দিবে। নিজেকে নির্দোষ প্রমানের চেষ্টা করবে। ওৎ পেতে আছি।
চার/পাঁচ দিন পর হঠাৎ আবার সেই কথোপকথন। যথারীতি কাউকেই খুঁজে পেলাম না। কিন্তু সিমিন প্রায়ই আজকাল গভীর রাতে একটি ছেলের সাথে কথা বলে। ছেলেটির কণ্ঠ শুনতে পাই। কিন্তু তাকে খুঁজে পাইনা। মোবাইলে কথা বলে কিনা তাও চেক করলাম। না, তা না। এর মধ্যে একদিন ওদের কথোপকথন ছিল আমার আর ফিওনার গোপন সব বিষয়। ফিওনা আমার সাথে পড়ত, পরবর্তীতে এ্যাফেয়ার...সে অনেক কথা। সপ্তাহখানিক আগেও ডেইট করেছি। কিন্তু এসব তো কেউ জানে না। সিমিন জানলো কিভাবে? অনেক চিন্তা-ভাবনা করেও কোনো কুল-কিনারা পেলাম না। যখন নিশ্চিত হলাম যে ফিওনা কিছু বলেনি তখন ভয়ে-বিস্ময়ে হাত-পা ঠান্ডা হবার যোগাড়। সিমিনকে ‘রাতের বেলা কথা বলার’ ঘটনাটি জিজ্ঞেস করবো ভেবেছিলাম; তা বাদ দিলাম। না দিয়ে উপায় কি? আমার যে আরো গোপনীয় ব্যাপার আছে...। কি জিজ্ঞেস করতে কী বলে ফেলে ঠিক আছে? সিমিনকে ধরতে গিয়ে যদি নিজেই ধরা পড়ে যাই?
শুনেছি এসব নাকি প্যারাসাইকোলজিক্যাল বিষয়। পীর-ফকিরদের এই সব ক্ষমতা থাকে। ইংরেজীতে এদেরকে বলে মেন্টালিষ্ট। এরা নানা রকম অদ্ভুত কাজ-কর্মও করতে পারে। তাই বেশ কিছু বই-পত্র যোগাড় করলাম। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সারাদিন একটা পর একটা বই পড়ছি আর সিমিনকে খেয়াল করছি। রাতের বেলা সিমিন অন্য জগতের কারো সঙ্গী হয়ে যায়। সকাল হলেই স্বাভাবিক। কিছুই বলে না। এমনকি ফিওনা সম্পর্কেও না। আমার ঘুম হারাম হয়ে গেল। রাতের পর রাত জেগে শরীর মন কোনোটাই ভালো নেই। এ কোন শাস্তির মধ্যে পড়লাম? মানসিক শাস্তি যে এত ভয়ংকর হতে পারে; কোনো দিন চিন্তাই করিনি। সিমিন সেই অন্য মানুষটার সঙ্গে কথা বলে, গল্প করে। ওদের একদিনের কথোপকথন:
‘...ছেলেটাকে সে অনেক ভালোবাসতো।’
‘মানে?’
‘মানে ভালোবাসতো।’
‘তুমি এটা কি বললে? ভালোবাসার কি অতীতকাল হয়?’
‘হয়।’
‘না, হয় না। ভালোবাসা আংশিক কিংবা অতীত হয় না। যে ভালোবাসে সে সবসময়ই বাসে। ভালোবাসা জীবনব্যাপী হয়।’
গভীর মনোযোগে আড়ি পেতে ওদের আলাপ শুনছিলাম। হঠাৎ ছেলেকণ্ঠটা নিরব হয়ে গেল। সিমিনও নিশ্চুপ। আমাকে চমকে দিয়ে সিমিন জিজ্ঞেস করলো--
‘ফিওনা প্রেগনেন্ট। আমাকে দেশে পাঠিয়ে ওকে বিয়ে করবে, তাই না?’
হতবাক হয়ে গেলাম। স্বীকার করতে সাহস পেলাম না।
‘ওর সাথে তুমি লিভ টুগেদার করতে, তাই তো?’
‘তুমি জানলে কীভাবে?’
‘মনের চোখ সবই দেখে।’
‘কিন্তু রাতের বেলা তুমি কথা বলো কার সাথে?’
সিমিন কোনো উত্তর দিল না। আমার মেরুদন্ডের ভিতর দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। মনে হলো অদৃশ্য কিছু একটা আমাকে ঘিরে ফেলেছে। ভয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে কিন্তু পারছি না। কিছুক্ষণ পর সিমিন আবার প্রশ্ন করলো--
তুমি কি জানো বিয়ের গয়নাগুলো দিয়ে আমি কি করেছি?’
‘না।’
‘একটা সোনার গ্লাস বানিয়েছি।’
‘কেন?’
‘ভেবেছিলাম, কোনো এক পূর্নিমা রাতে সোনার গ্লাসে বিষ খাবো...। কিন্তু না; তা করবো না। কঠিন কিছু একটা করবো; যাতে তোমার মতো মানুষের একটা জন্মের শিক্ষা হয়।’
[ 'অন্তরাক্ষী' নামে ২০১১ সালে দৈনিক প্রথমআলোতে আমার লেখা এই অনুগল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল]

গল্প: আগামী।
'বউমা। নাতি নাতনির মুখ না দেখেই আমরা ওপারে চলে যাব, এটাই কী তোমরা চাইতেছো? পাঁচ বছর তো হইলো এবার একটা চিন্তা ভাবনা করো। আমাদেরও তো বয়স হয়েছে।'
শ্বাশুড়ির কথায় একটুও মন খারাপ হয়নি। বরং সাফিনের উপর বেজায় রাগ হলো। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য যতবার বলেছি, ততবারই সাফিন বিভিন্ন অজুহাতে বিষয়টা এড়িয়ে গিয়েছে। সবার ধারণা আমরা ইচ্ছে করেই বাচ্চা নিচ্ছি না। আসল কারণ কেউ জানে না।
'সাফিন, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে?'
আমার বলার ভঙ্গিতেই সাফিন বুঝে নিয়েছে, আমি বেশ রেগে আছি৷
একগাল হেসে সাফিন আমার পাশে এসে বলে, 'জ্বি, বেগম সাহেবা। আপনার মূল্যবান কথা শ্রবণ করার জন্য এই বৎস প্রস্তুত।'
'শোনো, একদম ঢং করবে না। ডাক্তারের কাছে কবে যাচ্ছি আমরা?'
'আগামী মাসে। এ মাসে হাতে একদমই সময় নেই গো।'
'তোমার এই আগামী মাস কখনোই আসবে না, আমার ভালো করে জানা আছে।'
'ডাক্তারের কাছে গিয়েই বা কী হবে?'
'কী হবে এটা তুমিও জানো। অবান্তর প্রশ্ন করো না।'
সাফিন চুপ করে রইলো। আমি সাফিনের হাতের মধ্যে হাত গুঁজে দিয়ে বললাম, 'আমাদের নিশ্চিত হওয়া দরকার আমরা আসলেই কখনো বাবা-মা হতে পারব কী না। যদি না পারি সেটা সবাইকে জানিয়ে দিলে আর কেউ অযথা প্রশ্ন করে মন খারাপ করে দিবে না এবং কেউ প্রত্যাশায়ও থাকবে না।'
আমার হাতটা চেপে ধরে সাফিন প্রশ্ন করলো, 'যদি সমস্যাটা আমার হয়, তবে কী তুমি আমায় ছেড়ে চলে যাবে?'
'পাঁচ বছরে এই আমাকে চিনলে সাফিন?'
সাফিন চুপ করে তাকিয়ে রইলো। আমি সাফিনের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে বললাম, 'তুমি ছাড়া আমি, এমন কথা আমি কখনো কল্পনায়ও আনি না।'
'তোমাকে খুব ভালোবাসি তৃষ্ণা।'
'যদি সমস্যাটা আমার হয় তখনো কী বাসবে?'
'আজীবন।'
'সত্যি করে বলো তো, সমস্যাটা তোমার হতে পারে, শুধু এই ভয়েই কী তুমি ডাক্তারের কাছে যেতে চাওনি?'
'আমার কেন যেন মনে হয়, সমস্যাটা আমারই। আর আমি তোমাকে হারাতে চাই না।'
'এসব ভাবার কোনোই দরকার নেই। আমরা চলো সামনের সপ্তাহেই ডাক্তারের কাছে যাই। বাবা-মা অস্থির হয়ে উঠেছেন। প্রায়ই আমাকে প্রশ্ন করেন।'
সাফিন রাজি হলে আমরা পরের সপ্তাহে ডাক্তারের কাছে যাই। পরিক্ষা নিরীক্ষা শেষ হলে জানা যায়, সমস্যাটা আসলে সাফিনের নয়, আমার। যদিও ডাক্তার পুরোপুরি হতাশ করেননি। বলেছেন, সম্ভাবণা রয়েছে তবে খুব কম। কিন্তু আমি ডাক্তারের এই কথাটাকে কেবল সান্ত্বনা হিসেবেই ভাবছি।
সাফিনকে নিয়ে ভয় হচ্ছে না। কিন্তু শ্বশুর শ্বাশুড়িকে নিয়ে খুব চিন্তা হচ্ছে। তাদের ছেলের সমস্যা নেই জানলে নিশ্চয়ই তারা আমার বিপরীতে কোনো সিদ্ধান্ত নিবেন। বংশের ধারা বহল রাখলে নতুন সদস্য তো তারা চাইতেই পারেন, তাদেরই বা কী দোষ!
তবে কী সাফিনের ভালোবাসা ভাগ হয়ে যাবে! ভাবতেই চোখ জোড়া ছলছলিয়ে উঠলো। সাফিন আমার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে৷ এতদিন ওর চোখ জুড়ে শঙ্কা দেখেছি। আর এখন ওর জুড়ে স্বস্তি দেখছি। যেন কোনো কলঙ্কের দায় থেকে মুক্তি পেয়েছে সাফিন।
বাড়ি ফিরলাম। সাফিনকে বললাম, বাবা-মাকে বিষয়টা জানানো প্রয়োজন। সাফিন বললো, পরে জানানো যাবে। তাই আর এ নিয়ে এখন কিছু ভাবছি না৷
নিজের মধ্যে কেমন একটা অসম্পূর্ণতা অনুভব করছি। দিন যত যেতে লাগলো অস্থিরতা বাড়তে লাগলো। শ্বশুর শ্বাশুড়িকে বিষয়টা জানালে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন তারা। আমাকে তারাই পছন্দ করে বেশ আগ্রহ করে এ বাড়িতে নিয়ে আসেন। আমার কষ্ট হয়, এমন সিদ্ধান্ত নিতেও তারা বেশ হিমসিম খাচ্ছে।
শ্বাশুড়ি মা বললেন, 'চিন্তা করো না। আল্লাহ নিশ্চয়ই নিরাশ করবেন না৷ তাকে ডাকো।'
আমিও এই কথাই বিশ্বাস করি। সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই সুখবর দিবেন৷
দেখতে দেখতে আরও একটা বছর কেটে গেলো। কিন্তু ভালো খবরের দেখা মিলছে না। ইদানীং সাফিন বেশ দেরি করে বাড়ি ফেরে। সবসময় ব্যস্ত থাকে, সবকিছুতে যেন ওর তাড়াহুড়ো। সকালের নাস্তাটাও প্রায়ই না করে বের হয়। অথচ আগে আমার হাতের নাস্তা দিয়েই ওর দিন শুরু হতো।
'তৃষ্ণা। অফিসের কাজের জন্য কয়েকদিন আমাকে ঢাকার বাহিরে থাকতে হবে।'
'আমাকেও নিয়ে চলো না।'
'অফিসের আরও সহকর্মীরা যাচ্ছে৷ তোমায় নিয়ে যেতে পারছি না। তুমি দয়া করে মন খারাপ করো না। তবে কথা দিচ্ছি, কাজ শেষ করে এসে তোমায় নিয়ে ঘুরতে যাব।'
'তোমায় ছাড়া থাকতে খারাপ লাগবে সাফিন। অভ্যেস নেই তো।'
সাফিন আমায় ওর বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললো, 'আমি যতদূরেই থাকি না কেন, আমার চিন্তা চেতনা জুড়ে সবসময় তুমিই আছো।'
সাফিন চলে গেলে বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করে। রাতে ঘুমও হয় না ঠিকঠাক। সাফিনকে কল করলেও তেমন কথা হয় না, কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত সময় পার করছে।
টানা পাঁচ দিন পর বাড়ি ফেরে সাফিন। বেশ ফুরফুরে লাগছে ওকে। ওর চোখে মুখে একটা খুশি লেগে আছে। সাফিন মুখে খুব বললেও আমার কেন যেন মনে হচ্ছে না, ও এতদিন আমার জন্য মন খারাপ করেছে। বরং কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে আমি ছাড়া ওর সময়টা আরও ভালো কেটেছে।
তারপর থেকে সাফিনকে সবসময় বেশ খুশি খুশি লাগে। মানুষ প্রেমে পড়লে যেমন তার ভেতরকার খুশি তার চেহারায় ফুটে ওঠে, সাফিনের বেলাও ঠিক তেমন মনে হচ্ছে। হয়তো অফিসে পদোন্নতি হতে চলছে খুব শীঘ্রই। আমাকে সারপ্রাইজ দিবে বলেই হয়তো বিষয়টা লুকিয়ে রেখেছে। আমি উপরওয়ালার কাছে খুব প্রার্থনা করছি, যেন সাফিনের মনোবাসনাটা পূর্ণ হয়।
সাফিনের প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফেরা, সারাদিন ফোনে ব্যস্ত থাকা, বাড়ি ফিরলেও ফোন নিয়ে পড়ে থাকা, কখনো কখনো বাড়িই না ফেরা, ওর এই ব্যস্ততাগুলো আমার থেকে ওকে ক্রমশ দূরে নিয়ে যাচ্ছে। আমায় নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার কথা তো বেমালুম ভুলে বসে আছে। তবে কী সাফিন তার ভেতরের দুঃখ ভোলার জন্য নিজেকে ব্যস্ত রাখার প্রয়াস চালাচ্ছে! বাবা না হওয়ার দুঃখটা যে অনেক বড় একটা যন্ত্রণা।
কেটে যাচ্ছে সময় বিষন্নতায়। সাফিনকে কাছে পাই খুব কম সময়। দিন রাত খেটে চলছে অফিসের পেছনে। এত কষ্ট করে কী লাভ! কী হবে এত টাকা দিয়ে! আমাদের তো কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
'বউমা, সাফিন বাড়ি ফিরেছে?'
'না, মা। আজ মনে হয় ফিরবে না।'
'কী যে হয়েছে ছেলেটার! নিজের দিকে খেয়াল নেয় না একটুও।'
চুপ করে রইলাম। সাফিনকে কল করলে দেখি নাম্বার বন্ধ। অন্ধকার গিলে খাচ্ছে আমায়। এখন যেন একা থাকতেই আমার অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে।
পরদিন সকালে সাফিন ফোনে জানায়, 'অফিসের কাজে সাত দিনের জন্য চট্টগ্রাম যাচ্ছে। সঙ্গে সহকর্মী আরিফ সাহেব যাচ্ছেন।'
জিজ্ঞেস করলাম, 'ব্যাগ গুছিয়ে রাখবো। এসে নিয়ে যাবে?'
'দরকার হবে না। ওখানে গিয়ে ব্যবস্থা করে নিব।'
শেষ কবে সাফিন ফোনে আমার সঙ্গে একটু সময় নিয়ে কথা বলেছে, আমি একদম ভুলে গিয়েছি। ব্যস্ততার অজুহাতে আমি আমাকে সামলে নিচ্ছি।
পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলো, সাফিন আমাকে একবারের জন্যও মনে করেনি। আমি ফোন করলেও কথা বলার যেন তার সময়ই নেই।
বেশ কয়েকদিন যাবৎ শরীরটা একদম ভালো লাগছে না। ভাবলাম, সাফিন ফেরার আগে ডাক্তার দেখিয়ে আসি। শ্বাশুড়ি মা'কে সঙ্গে নিয়ে বের হলাম।
ডাক্তার বললেন, পরদিন এসে টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে যেতে। ডাক্তারের ওখান থেকে বের হয়ে আমি আর শ্বাশুড়ি মা কেনাকাটা করার উদ্দেশ্যে শপিংমলে এলাম। হঠাৎ সাফিনের সহকর্মী আরিফ সাহেবের সঙ্গে দেখা।
কুশল বিনিময় শেষে জিজ্ঞেস করলাম, 'কবে এলেন চট্টগ্রাম থেকে।'
আমার কথায় আরিফ সাহেব বিস্মিত হলেন।
'চট্টগ্রাম তো যাইনি ভাবী।'
'কেন আপনি আর আপনার সাফিন ভাই কয়েকদিন আগেইতো চট্টগ্রামে গেলেন অফিসের কাজে! সাফিন তো এখনো ফেরেনি।'
'কী বলেন ভাবী! সাফিন ভাই তো সাত দিনের জন্য ছুটি নিয়েছেন অফিস থেকে।'
আমার চোখ কপালে উঠলো। সাফিন আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবে না। আরিফ সাহেবেরই হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে।
'সাফিনতো এর আগেও একবার অফিসের কাজে ঢাকার বাহিরে গিয়েছিলো।'
'ভাবী আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। সাফিন ভাইকে কিংবা আমাকে এখনো অফিস ঢাকার বাহিরে কোথাও পাঠায়নি।'
মাথা ঘুরিয়ে এলো। সাফিন তাহলে মিথ্যা বলেছে আমার সঙ্গে। কিন্তু কেন! সন্দেহের কাটা বইছে মস্তিষ্ক জুড়ে। শরীরটা আরও খারাপ লাগছে। অপেক্ষা করতে লাগলাম সাফিনের ফেরার।
ডাক্তারের কাছ থেকে রিপোর্ট আনতে গিয়ে জানলাম, সত্যিই এবার আমি মা হতে চলছি। মুহুর্তেই যেন সব মন খারাপেরা দূরে সরে গেলো। খুশিতে চোখে জল জমে গেলো। আগামীকাল সাফিন বাড়ি ফিরবে। তখন ওকে এই খুশির খবরটা নিজেই জানাবো। তার আগে আর কাউকে জানাবো না বলে ঠিক করেছি। ও নিশ্চয়ই ভীষণ খুশি হবে। আমাদের মধ্যেকার সব দূরত্ব ঘুচবে।
পরদিন সাফিন বাড়ি ফেরে। সাফিনের চালচলন সবই আমার কাছে সন্দেহজনক লাগে। যেন এ এক অন্য সাফিন, আমার সাফিন নয়। বারবার মনে হয় সাফিন কিছু লুকাচ্ছে। এদিকে খবরটা জানানোর জন্য ভেতরে ভেতরে ছটফট করে চলছি কিন্তু সঠিক সময়টাই যেন পাচ্ছি না।
সাফিন ওয়াশরুমে গেলে আমি ওর ফোনটা হাতে নেই। এত বছরে আমি কখনোই ওর ফোন এভাবে সন্দেহ নিয়ে ধরিনি। আজ প্রথমবার সাফিনের ফোনে তল্লাশি চালাচ্ছি। মনে মনে প্রার্থনা করে চলছি, যেন আমার সব সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হয়।
কিন্তু ম্যাসেজের বাক্সে চোখ রাখতেই কেঁপে উঠলাম। একটার পর একটা করে ম্যাসেজগুলো পড়ে চলছি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে। নিজের চোখেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
সাফিন হয়তো ভেবেছে আমি কখনোই ওকে সন্দেহ করতে পারি না। তাই ফোনের একটা ফোনকল, ম্যাসেজও ডিলিট করেনি। আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না, সাফিন অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে। এতদিন আমাকে বোকা বানিয়ে সাফিন ওর সময়গুলো অন্য কারো সঙ্গে কাটিয়েছে।
সাফিন ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আমার হাতে ওর ফোন দেখতেই আঁতকে ওঠে। আমার চোখ ভিজে জল গড়াচ্ছে। সাফিন অপরাধীর মত চুপ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
চোখের জল মুছে প্রশ্ন করলাম, 'বিয়ে করেছো নাকি শুধুই সময় কাটিয়েছো?'
মাথা নিচু করে উত্তর দিলো মাহিন, 'বিয়ে করেছি। তুমি অনুমতি দিলে এ বাড়িতে নিয়ে আসব।'
তীরের মত বিধলো কথাটা বুকের মধ্যে। এই সাফিনকে আমি দিনের পর দিন এতটা বিশ্বাস করে গিয়েছি।
'আমি মা হতে পারব না বলেই কী এমনটা করেছো নাকি আরও কারণ আছে?'
'তৃষ্ণা, আমাকে ভুল বুঝো না। সবারই তো বাবা হতে ইচ্ছে করে।'
'সবার মা হতে বুঝি ইচ্ছে করে না! অথচ তুমি আমাকে একসময় হারানোর ভয় পেতে। কিন্তু তুমি অপেক্ষা করতে পারলে না।'
'অপেক্ষা করেই বা কী হত? লাভ হতো কোনো?'
চোখে টলমল করে উঠলো জলেরা। ভেতরে যন্ত্রণারা ছটফট করছে। ভাঙচুর হচ্ছে ভেতর জুড়ে।
'তুমি তোমার স্ত্রী'কে এ বাড়িতে নিয়ে আসতে পারো।'
কথাটা বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে পানির ট্যাপটা ছেড়ে দিলাম। হাউমাউ করে কাঁদার শব্দ আর বাহিরে বের হচ্ছে না। এ কষ্ট কোনো সান্ত্বনাই আটকাতে পারবে না।
চোখ মুখ ধুয়ে বের হয়ে দেখি সাফিন বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছে। নিজের সবকিছু গুছিয়ে ব্যাগে ঢুকালাম।
শ্বাশুড়ি আর শ্বশুর বারবার প্রশ্ন করে চলছেন, 'কী হয়েছে বউমা? কেন এমন করছো? কোথায় যাচ্ছো?'
শান্ত গলায় বললাম, 'বাড়িতে আপনার নতুন বউমা আসছে আর পুরাতন বিদায় নিচ্ছে।'
ডাক্তারের থেকে পাওয়া রিপোর্টের কাগজটা শ্বশুরের হাতে দিয়ে বললাম, 'এটা আপনার ছেলেকে দিবেন। বলবেন, তার বিয়েতে এটা আমার প্রথম উপহার। আর দ্বিতীয় উপহারের কাগজটা খুব শীঘ্রই পাঠিয়ে দিবো, যাতে স্বাধীনভাবে সংসারটা সে করতে পারে।'
শ্বাশুড়ি আমাকে আটকানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হলেন। আমার সামনের সময় কাটিয়ে দেওয়ার জন্য একজন সঙ্গী আমি পেয়ে গিয়েছি, আমার শত কষ্টের মাঝেও সে সুখের বার্তা হয়ে জীবনে এসেছে। তাকে ঘিরেই আমার আগামী।
গল্প: আগামী।
লেখা: মাহ্ফুজা রহমান অমি।
