একটি চিরন্তন প্রেমের গল্প
প্রিয় বন্ধুরা, ইংরেজিতে আমার প্রথম উপন্যাস ‘অ্যানটার্নাল লাভ স্টোরি’ এখনই আপনার হাতে। আমার উপন্যাসটি প্রকাশের মধ্য দিয়েই তা বাস্তব হয়েছে। স্বপ্ন, স্বপ্ন আমাদের জীবনের অদ্ভুত, আশ্চর্যজনক অঙ্গ।
আমি বিশ্বাস করি যে প্রত্যেক ব্যক্তির অবশ্যই স্বপ্ন দেখতে হবে এবং বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। একজনকে এমন স্বপ্ন দেখতে হবে যা অর্জন কঠিন, এমনকি অসম্ভব বলে মনে হয়। এই জাতীয় স্বপ্ন অর্জনের প্রচেষ্টা আমাদের জীবনকে একটি উত্তেজনাপূর্ণ মিশনে নিয়ে যায়।
আমি যখন গল্প লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম তখন আমার বয়স ছিল বারো বছর। আমি এতটাই উত্তেজিত ছিলাম যে আমেরিকান রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটনের জীবন অবলম্বনে আমি একটি গল্প ‘বিনম্রতা’ (দ্য বিনয়) রচনা করেছি।
কিছু বাধা অতিক্রম করে, আমার গল্পটি দিবালোক দেখে এবং প্রকাশিত হয়েছিল। আমার স্বপ্নগুলি ডানা খুঁজে পেয়েছিল এবং উড়ে উড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। এরপরে আমি আর ফিরে তাকাতে হয়নি এবং অনেক গল্পের জন্ম হয়েছিল। গল্প, শিশুদের উপন্যাস, ডায়মন্ড কমিকস, কবিতা… আমি সৃজনশীল লেখার অনেকগুলি ক্ষেত্রের দিকে ঝুঁকছি।
আজ, আমি যখন পিছনে ফিরে তাকাই, তখন আমার মনে হয় যেন কোনও অদৃশ্য শক্তি আমাকে সেই সমস্ত সৃষ্টিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমার গল্পগুলি একটি বিশাল সংকলনে স্তূপিত হয়েছিল। আমার রচনাগুলি - আমার গল্পগুলি জাতীয় স্তরের সংবাদপত্র এবং পাঞ্জাব কেশারি, নবভারত টাইমস, ফিল্মী দুনিয়া এবং মনোহর কাহানিয়ানের মতো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। গল্প লেখক হওয়ার স্বপ্নটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
আমার চোখের সামনে এখন একটি নতুন স্বপ্ন। আমি aপন্যাসিক হয়ে উঠতে চেয়েছিলাম। আমার প্রথম হিন্দি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল যখন আমার বয়স পনের বছর ছিল। আজ, আমি যখন সেই সময়টির দিকে ফিরে তাকাই, তখন আমি এটি খুব রহস্যময় মনে করি। আমি একের পর এক অনেক উপন্যাস লিখেছি তাই সময় গড়িয়েছে।
এই তারিখ অবধি, এত দীর্ঘ সময়কালে, আমি উপন্যাসগুলি লিখেছি যা সেরা বিক্রেতার হয়ে রয়েছে। অবশ্যই, এটি এত সহজ ছিল না। জীবনে, প্রশংসনীয় কিছুই অর্জন করা সহজ নয়। অসুবিধা ছিল। বাধা ছিল। সাফল্য সংগ্রাম এবং ব্যথা পরে মিষ্টি স্বাদ। প্রথম হিন্দি উপন্যাসের পরে কথাসাহিত্যিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমার কাজ সমৃদ্ধ হয়েছিল।
আমি উল্লেখ করে গর্ববোধ করি যে আমার নব্বইয়েরও বেশি উপন্যাস আজ পর্যন্ত হিন্দিতে প্রকাশিত হয়েছে। আমার নায়ক ‘কমান্ডার করণ সাক্সেনা’ হিন্দি উপন্যাসের জগতে মাইলফলক হয়ে উঠেছে। আমার উপন্যাসগুলির পঞ্চাশেরও বেশি ‘কমান্ডার’ সিরিজের অন্তর্ভুক্ত। স্বপ্ন এমন তৃষ্ণা যা কখনও শেষ হয় না। এখনও পর্যন্ত আমার স্বপ্ন পূরণ করা নতুন স্বপ্নের সূচনা হয়েছিল।
জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ
**মো. মজনুর রশিদ**
আজ (২৪ অক্টোবর) জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংস স্তূপের বিপরীতে শান্তি ও নিরাপত্তার মূল বার্তা নিয়ে গঠিত হয় জাতিসংঘ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯২০ সালে গঠিত লীগ অব নেশনস মূলত ১৯৩৯ সালে বিশ্ব শান্তি রক্ষার্থে ব্যর্থ হয়। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নামে পৃথিবী পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।
যুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। এই যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ হতবাক হয়ে পড়েন এবং বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার নতুন ভাবনায় তৎকালীন বিশ্ব নেতাদেরকে ভাবিয়ে তোলে।
সে ভাবনা সৃষ্টি করে ধ্বংসের পাথরের উপর দাঁড়িয়ে পৃথিবীর বুকে শান্তি, নিরাপত্তা, সৌহার্দ, স্বাধীনতা ও প্রগতির অঙ্গীকার নিয়ে আজকের জাতিসংঘ। জাতিসংঘ গঠনের সময় জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র ছিলো ৫১টি। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৯৩টি। স্বাধীন জাতিসমূহের সর্ববৃহৎ সংগঠন হলও জাতিসংঘ। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট জাতিসংঘের নামকরণের প্রস্তাব করেন। ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয়। সেই থেকে প্রতি বছর বিশ্বের জাতি রাষ্ট্রসমূহ ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস পালন করে থাকে।
জাতিসংঘ প্রধান ৬টি অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এর ১৬টি বিশেষায়িত সংস্থা রয়েছে। জাতিসংঘের অফিসিয়াল বা দাপ্তরিক ভাষা ৬টি। বর্তমানে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার কাজ করে যাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৯৯ সালে বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
**জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গসংগঠনগুলো হলো-**
**১. সাধারণ পরিষদ**
**২. নিরাপত্তা পরিষদ**
**৩. অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ**
**৪. অছি পরিষদ**
**৫. আন্তর্জাতিক আদালত**
**৬. সচিবালয়।**
জাতিসংঘ সদস্যভুক্ত সকল দেশ সাধারণ পরিষদের সদস্য। সাধারণ পরিষদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি করে ভোটের ক্ষমতা রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্র ১৫টি। যার মধ্যে স্থায়ী সদস্য ৫টি রাষ্ট্র (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীন)। এদের সাংবিধানিক অধিকার ভেটো প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে। ঠবঃড় অর্থ- ‘আমি মানি না’ এবং অস্থায়ী ১০টি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘে কোনো প্রস্তাব পাশ বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থায়ী ৫ টি দেশ এবং অস্থায়ী ৪ দেশসহ মোট ৯টি দেশের সমর্থনের প্রয়োজন পড়ে। তবে স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের কেউ ভেটো দিলে সেই প্রস্তাব পাস বা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। অছি পরিষদের- মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে নাউরু, নিউগিনি, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, ক্যামেরুন, পালাউ, অছি পরিষদভুক্ত একমাত্র অঞ্চল আইসল্যান্ড।
১৯৯৪ সালের পর থেকে সংস্থাটি স্থগিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালত ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধ অপরাধী ও মানবতা বিরোধী অপরাধের শাস্তি এই আদালতের মাধ্যমেই সম্পন্ন করা হয়েছে। এই আদালতের বিচারের মাধ্যমে অনেক যুদ্ধ অপরাধীর বিচার শেষে ফাঁসিও কার্যকর করা হয়েছে। জাতিসংঘ সচিবালয় হলো জাতিসংঘের সকল কর্মকাণ্ডের মূল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এর সদর দপ্তর অবস্থিত। ইউরোপীয় সচিবালয় অবস্থিত জেনেভায়। জাতিসংঘের প্রথম মহাসচিব ট্রিগভেলী, নরওয়ে এবং বর্তমান মহাসচিব হলেন আন্তোনিও গুতেরেস, পর্তুগাল। জাতিসংঘের স্থায়ী পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র দুইটি – ফিলিস্তিন এবং ভ্যাটিকান সিটি।
জাতিসংঘের অন্য অঙ্গসংগঠনগুলো সদস্য রাষ্ট্র ছাড়াও অন্যান্য দেশে নিজেদের সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নানারকম সমস্যার সমাধান, সুবিধা বৃদ্ধি, উন্নত জীবনমান গঠন এবং নিরাপত্তা দানে এ প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে থাকে। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ মানব কল্যাণমূলক কর্মসূচি- ডব্লিউএফপি (প্রধান কার্যালয়- রোম, ইতালি) এ বছর (২০২০ সাল) শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে। যুদ্ধবিগ্রহ, সংঘাত, খরা, ও অনাহারে থাকা মানুষদের জন্য খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মানের নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করে এই সংস্থাটি। এছাড়াও ইউএনএইচসিআর- ১৯৫৪ ও ১৯৮১ সালে, ইউনেস্কো- ১৯৬৫ সালে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী- ১৯৮৮ সালে, মহাসচিব কফি আনান (ঘানা) ও জাতিসংঘ ২০০১ সালে ও আপিসিসি- ২০০৭ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে।
জাতিসংঘের সাথে বাংলাদেশের একটা গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। ১৯৭৪ সালে ১৩৬তম রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে বাংলাদেশ। যদিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ প্রথম সদস্য পদ লাভ করে ১৯৭২ সালে কমনওয়েলথ-এর। জাতিসংঘের মাধ্যমে মায়ানমারের সাথে বঙ্গোপসাগর বিজয় ছিল বাংলাদেশের বড় অর্জন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পূর্ব থেকেই জাতিসংঘের সাথে বাংলাদেশের স্বাধিকার আদায়ের সম্পর্ক তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জাতিসংঘের ভূমিকা ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের শক্তিশালী ভিত্তিমূল। মেহেরপুর জেলায় গঠিত স্বাধীন দেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকারের (শপথ গ্রহণ, ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ সাল) প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘে শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি করে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতসহ আরও কিছু বন্ধু রাষ্ট্র।
২০ অক্টোবর ১৯৭১ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে পত্র লিখে বলেন, ‘আপনারা যদি বিশ্বাস করেন যে, আমার দফতর আপনাদের উপকারে আসবে তাহলে আমি আপনাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবো।থ এই যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় অনিবার্য ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভক্তি ঠেকানো অসম্ভব, এই দুর্ভাবনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের মস্ত শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করে এবং ৪ ডিসেম্বর ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করে। উভয় দেশ জাতিসংঘের মহাসচিবের নিকট আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ এনে পত্র পাঠান। মহাসচিব ৪ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে প্রতিবেদন পেশ করেন। নিরাপত্তা পরিষদের ৯ সদস্য রাষ্ট্রের অনুরোধে ৪ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে জরুরী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সোভিয়েত রাশিয়া ও পোল্যান্ড দাবি জানায় যে, বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে তাদের দেশের বক্তব্য প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে হবে। আমেরিকা ও চীন এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। ফলে প্রস্তাব ভোটে দেওয়া হয় এবং যেকোনো উপায়ে যুদ্ধ বিরতির আহ্বান জানানো হয়। প্রস্তাবের পক্ষে ১১ ভোট এবং ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ভোটদানে বিরত থাকে। রাশিয়া ও পোল্যান্ড বিপক্ষে ভোট দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রয়োগ করায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রক্ষা পায়। মুক্তিকামী জাতির নিকট এমন পরম বন্ধু আর কে হতে পারে। জাতিসংঘের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের ˜ব্যর্থহীন সমর্থন মুক্তিযুদ্ধের বৈশ্বিক বিজয় অর্জন করা সম্ভবপর হয়। জাতিসংঘের তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের স্থায়ী প্রতিনিধি ইয়াকফ মালিক ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন হিসেবে অবহিত করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের মধ্য দিয়ে ইয়াকফ মালিক ও সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অকৃত্রিম বন্ধু। বর্তমান রাশিয়া বাংলাদেশের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। বন্ধুত্বের এমন বন্ধন চিরকালের। জাতিসংঘ সে বন্ধনের আতুর ঘর।
বিশ্ব শান্তি ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে জাতিসংঘের ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি বহু নেতিবাচক ভূমিকাও রয়েছে। অধিকিন্তু জাতিসংঘ বর্তমানে অনেকটা পুতুল সংগঠনে পরিণত হয়েছে। কয়েকটি দেশের ইচ্ছা আর অনিচ্ছার সংগঠনে পরিণত হয়েছে বিশ্ব সংগঠনটি। এছাড়াও বহু দেশের স্বাধীনতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা অত্যন্ত দুঃখজনক। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যার ইতিবাচক কোনো সমাধান আনতে জাতিসংঘ পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এছাড়াও, বহু বছর ধরে ফিলিস্তিনদের ওপর ইযরাইল রাষ্ট্রের নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, বাড়ি দখল, জমি দখল, গুম, অত্যাচার প্রভৃতি বন্ধে জাতিসংঘ পুরোপুরিই ব্যর্থ ও ক্ষমতা রাষ্ট্রের নিকট কুক্ষিগত।
মধ্য প্রাচ্যের অস্থিরতা এবং সংঘাত প্রশোমনে জাতি রাষ্ট্রসমূহের ভূমিকা বিতর্কিত ও হিংসাক্তক। ইউক্রেন, সিরিয়া, মিশর, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, কাশ্মীর, লাদাখ, ফকল্যান্ড দ্বীপ, লেবানন, উপজাতি ও সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর সুরক্ষা, আর্মেনিয়া- আজারবাইজান সমস্যা, আফ্রিকার ক্ষুধা নিবারণ, জঙ্গি তৎপরতা, উগ্রবাদের উত্থান, মেক্সিকো, কিউবা, তিব্বত, পরিবেশ বিপর্যয়, কোরিয়া ও ইরান সমস্যা, পারমানবিক হুমকি, রাশিয়া- আমেরিকার মৌন সংঘাত প্রভৃতি বিষয় সমূহে জাতিসংঘের ভূমিকা অকার্যকর হিসেবে প্রমাণ মিলেছে বাস্তবে। এসব বিষয়ের যৌক্তিক সমাধান ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ক্ষেত্রসমূহে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্ববাসী প্রত্যাশা করে।
**মো. মজনুর রশিদ**
**চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,**
**বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সম্পাদক, বাংলাদেশ স্কাউটস গোপালগঞ্জ জেলা রোভার।**
সোর্সঃ https://thecampustoday.com/
একাদশের অনলাইন ক্লাসে নেই মফস্বলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা, সঙ্কট প্রযুক্তির
করোনার প্রাদুর্ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেশের সব কলেজে গত ৪ অক্টোবর থেকে অনলাইনে একাদশ শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে এতে মফস্বল এলাকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ একেবারের হাতেগোনা। নোয়াখালী জেলার হাতিয়া দ্বীপের হাতিয়া ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘৪ অক্টোবর থেকে অনলাইনে একাদশের ক্লাস শুরু হলেও আমরা এখন পর্যন্ত ক্লাস করতে পারিনি। অথচ শহর অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছে। এতে করে আমরা পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছি।’
শুধু দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার কামরুল নয়, করোনাকালে মফস্বল এলাকার একাদশের অনলাইনে ক্লাসের চিত্রটি কমবেশি এমনই। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইন ক্লাসে অংশ নিচ্ছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত মফস্বল এলাকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবাবে স্মার্টফোন নেই। এছাড়াও নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় একটা বড় অংশের অনলাইন ক্লাসে অংশ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার অনেক কলেজে এখনও অনলাই ক্লাস শুরু করতে পারেনি।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া একাদশ শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না রেখে অনলাইনে চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাদের পক্ষে সম্ভব হবে, তারাই এ কার্যক্রমে অংশ নেবেন। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে এসব ক্লাসের লেকচারগুলো ইউটিউব বা ওয়েবসাইটে আপলোড করতে অনুরোধ করা হয়েছে।
জানা গেছে, প্রতিবছর জুলাই মাস থেকে কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু এ বছর করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় বদলে গেছে শিক্ষা ক্যালেন্ডার। তিন মাস দেরিতে হলেও গত ৩ অক্টোবর একাদশ শ্রেণিতে নতুন ভর্তি করা শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। অথচ মফস্বলের কলেজগুলো বা শিক্ষার্থীদের এ ব্যাপারে তেমন কোনো প্রস্তুতিই নেই। আবার মফস্বলের যেসব শিক্ষার্থী রাজধানীর কলেজগুলোতে ভর্তি হয়েছে, তাদেরও গ্রামে বসে অনলাইনে ক্লাস করার সুযোগ নেই।
এমনই একজন শিক্ষার্থী নোয়াখালী জেলার সূর্বনচরের রাকিব হোসেন। তিনি মিরপুর বাংলা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। দেশের করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ার থাকছেন নিজ এলাকায়। রাকিব দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এলাকার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। কখনো কখনো ক্লাসে জয়েনই করতে পারি না। আবার ক্লাসে জয়েন করতে পারলেও সাউন্ড সিস্টেম ক্লিয়ার থাকে না। অনলাইন ক্লাস করতে খুব সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ রকম চলতে থাকলে শহরের শিক্ষার্থীদের থেকে আমরা পিছিয়ে যাবো।’
এদিকে শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনলাইনে ক্লাস হলেও মফস্বলের কলেজেগুলোয় তেমনভাবে অনলাইন ক্লাস নেওয়া হচ্ছে না। কিছু কিছু প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিউশন ফি আদায় করতে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মানতে অনেকটা নামকাওয়াস্তে অনলাইন ক্লাস নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে অনেকটা পিছিয়ে। মফস্বলের নেটওয়ার্ক কাঠামো খুব দুর্বল থাকায় পূর্বে রেকর্ড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পেইজে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাস আপলোড দেওয়া হলেও তেমন কোন সাড়া পাওয়া যায় না।
জানা যায়, অনলাইন ক্লাসে মফস্বলের শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকলেও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের স্মার্টফোন বা অনলাইন ক্লাসের জন্য অন্য কোনো ডিভাইস না থাকায় ক্লাস করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। যার ফলে প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থীর অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হওয়ার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার ইন্টারনেটের উচ্চদাম ও গতি দুর্বল থাকায় অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া মফস্বলের শিক্ষকরাও তথ্য-প্রযুক্তিতে খুব একটা দক্ষ নয়। এমনকি অনেক শিক্ষকেরই স্মার্টফোনও নেই। যার ফলে মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমান অনলাইন ক্লাস অনেকটা নির্দেশনার মধ্যেই বন্দি হয়ে আছে।
যদিও বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইজ) প্রধান পরিসংখ্যানবিদ আলমগীর হোসেন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘দেশের কতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নিতে সক্ষম বা কতজন শিক্ষার্থী স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করেন তার কোন পরিসংখ্যান তাদের হাতে নেই।’
নোয়াখালী জেলার দ্বীপ অঞ্চল হাতিয়া ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী কামরুল বলেন, ‘আমাদের দ্বীপ অঞ্চলে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা খুবই দুর্বল, এর উপর বেশির শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন বা অনলাইনে ক্লাস করার মত ডিভাইস নেই। যার ফলে আমারা অনলাইন ক্লাসের সুফল পাচ্ছি না। আমি শিক্ষামন্ত্রীর কাছে বিনীতভাবে আবেদন করছি যেন আমরাও অনলাইন ক্লাস করতে পারি শহরের শিক্ষার্থীদের মতো, সেই ব্যবস্থা করে দিন।’
হাতিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, ‘আমাদের কলেজের প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীর ফোন আছে। এরমধ্যে বেশিরভাগই বাটন ফোন ব্যবহার করে। কারণ বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পরিবার নিম্নবৃত্ত। কলেজের মাসিক বেতনও ঠিকমতো তারা দিতে পারে না। ইন্টারনেট কেনার টাকা কোথায় পাবে? আমরা নিজেরাও অনলাইনে ক্লাস নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হই। নেটওয়ার্ক থাকে না। আর প্রশিক্ষন না থাকায় সকল শিক্ষক ও অনলাইনে ক্লাস নিতে পারে না। তারপরও যখন সরাসরি অনলাইনে ক্লাস নিই, তখন দুই থেকে তিন শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী থাকে না। তবে পরে আরো ১০ শতাংশ দেখে।’
এদিকে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই ছুটি আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। মার্চ মাস থেকেই সংসদ টেলিভিশনে মাধ্যমিকের ক্লাস এবং এপ্রিল মাস থেকে প্রাথমিকের ক্লাস প্রচার করা হচ্ছে। মূলত মে মাস থেকেই শহরাঞ্চলের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে ক্লাস শুরু করে, কিন্তু শহরাঞ্চলের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও তাদের কেউ কেউ আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু করে। ফলে এখনো বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাসের বাইরে রয়ে গেছে। অবশ্য টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রাথমিক-মাধ্যমিকের ক্লাস প্রচার করা হলেও সেগুলোতে শিক্ষার্থীদের খুব একটা আগ্রহ নেই।
ভোলার আলতাজের রাহমান ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মো. জাহানজেব আলম দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরই স্মার্টফোন নেই। এছাড়াও নিয়মিত বিদ্যুৎ থাকে না। আর বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর পরিবার নিম্নবৃত্ত হওয়ায় তাদের সন্তাদের অনলাইন ক্লাসের ডিভাইস কিনে দিতে পারছে না। তারপরও আমরা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। অনেকে সুফল পাচ্ছে, আবার অনেকে পাচ্ছে না।’
এদিকে, শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাকালের এই অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা দিন দিন বিরাট বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রাম-শহর ও ধনী-দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বৈষম্য চরম আকারে বাড়ছে। শহরের শিক্ষার্থীরা টেলিভিশনের ক্লাস না দেখলেও অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস করছে। এমনকি পরীক্ষাও দিচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও স্কুল-কলেজের অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি ধনী পরিবারের সন্তানরা অনলাইন বা সরাসরি প্রাইভেট পড়ছে। এতে তারা পুরো সিলেবাসই শেষ করতে পারছে। অন্যদিকে গ্রামের ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা এসব সুবিধার বাইরে রয়েছে। ফলে শিক্ষায় বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মু. জিয়াউল হক দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কত ভাগ শিক্ষার্থীকে এই পাঠদান সুবিধা দিতে পারছি তার কোন ধারণা আমার জানা নেই। তবে করোনার প্রভাবে ঝিমিয়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা এই কার্যক্রম নিঃসন্দেহে কিছুটা হলেও গতিশীল করবে। আর যেহেতু এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি, তাই একাদশ শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না রেখে অনলাইনে ক্লাস শুরুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাদের পক্ষে সম্ভব হবে, তারাই অনলাইনের এই ক্লাস করবে। তবে আমি সব কলেজ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব, তারা যেন ক্লাসগুলো ইউটিউব বা ওয়েবসাইটে আপলোড করে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনমতো সময়ে ক্লাসগুলো দেখতে পারে।’