স্বপ্নপুরী হাই স্কুল
স্বপ্নপুরী হাই স্কুলে এখন রসায়ন ক্লাস। মিসির আলি তরতর করে বোর্ডে লেখা সংকেতগুলো টুকে নিচ্ছে। রসায়ন তার অতি প্রিয় বিষয়। এই আপা খুব ভাল পড়ান। অবশ্য এটা স্কুলের সব টিচারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তার পাশেই হাঁ করে বসে আছে হিমু। সে ক্লাসের পড়া কিছুই ধরতে পারছে না। রসায়নের প্রত্যেক ক্লাসেই তার একই অবস্থা হয়। পড়ানোর শেষে আপা যখন জিজ্ঞেস করলেন- কারো কোন প্রশ্ন? হিমুর হাত সটান আকাশে উঠে গেল। "আপা, পরমাণু জিনিসটা আসলে কী?" আজ নিয়ে বেশ ক'সপ্তাহ ধরে রসায়ন ক্লাস হচ্ছে- অণু পরমাণু বিক্রিয়া শেষ করে এখন আমরা রাসায়নিক গণনার বেশ জটিল বিষয়গুলোর দিকে ঢুকছি। কিন্তু হিমু এখনও সেই পরমাণুতেই আটকে আছে। প্রত্যেক ক্লাসেই তার একই প্রশ্ন- কিন্তু পরমাণু জিনিসটা কী? ভুলে যাবেন না, আমরা কিন্তু এখন বাস্তবে নেই। আমরা আছি স্বপ্নপুরী হাই স্কুলে। এখানে শিক্ষকদের পড়ানোর মধ্যে কোন ত্রুটি নেই- পদার্থ রসায়ন গণিত কোন বিষয় কীভাবে বোঝাতে হয়, তা শিক্ষকরা খুব ভালমত আয়ত্ত করেছেন। শুধু তাই নয়, এখানকার প্রত্যেকটা ছাত্রেরই বাসার পরিবেশ খুব ভাল, কারো জীবনে কোন অর্থকষ্ট নেই, সবাই তাদের বাবা-মা-আত্মীয়-বন্ধুবান্ধবের অপার যত্নের মধ্যে বড় হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধূলা বা বিতর্ক জাতীয় সহ-পাঠ্যক্রম কাজকর্মের সুযোগ, গুরুজনদের কাছ থেকে নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা, মানে একটা শিশুর সুষ্ঠুভাবে গড়ে ওঠার জন্য যতখানি আলোবাতাস যেভাবে প্রয়োজন- স্কুলের প্রত্যেকটা ছাত্রছাত্রীই তা পেয়ে থাকে। বাস্তবে হয়ত হিমুর এই পিছিয়ে থাকার পেছনে আমরা তার জীবন বা পরিবেশের বিভিন্ন জটিলতাকে দায়ী করতে পারতাম। স্বপ্নপুরীতে তার সুযোগ নেই। হিমুকে নিয়ে তাহলে কী করা যায় বলুন তো? ================ আমাদের জগতে হিমুর মত মানুষের ভাগ্য নির্ভর করত তার পরিস্থিতির ওপর। তার ভাগ্য যদি ভাল হত, তাহলে শিক্ষক হয়ত গার্জিয়েন ডেকে বলতেন- দেখুন, হিমু যে চেষ্টা করে না তা নয়। তার চোখমুখ দেখলেই বোঝা যায় সে ক্লাসে মনযোগ দেয়। কিন্তু কোন বিষয়ই সে ঠিক রপ্ত করতে পারছে না। গত সপ্তাহে রসায়নের যে শ্রেণী পরীক্ষাটা হল, সেখানে সে খাতায় শুধু একটা বাক্য বড় বড় করে লিখে জমা দিয়েছে- "কিন্তু পরমাণু জিনিসটা আসলে কী?" এছাড়া বাকি খাতায় আর আঁচড়টি নেই। কথাটা অন্যভাবে নেবেন না। হিমুর মধ্যে যে মেধা নেই তা বলছি না। কিন্তু সবার ভাগ্যে তো আর ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার থাকে না। আমার মনে হয়, আপনাদের ছেলের ন্যাকটা আসলে অন্যদিকে। তাকে একটু চারু ও কারুকলা জাতীয় কোন বিষয়ে পড়াশোনা করিয়ে দেখবেন? হয়ত দেখা যাবে ওদিকে তার মাথা বেশ খোলতাই হয়েছে। এটা হত ছেলেটার ভাগ্য ভাল হলে- ভাগ্য খারাপ হলে ফেল করে ঝরে পড়া ছাড়া আর উপায় থাকত না। জীবনসংগ্রাম আরো অনেকখানি কঠিন হয়ে যেত তার জন্য। অবশ্য হিমু বাস্তবজগতের কেউ না। সে পড়ে স্বপ্নপুরী হাই স্কুলে। ওখানকার হিসাব আলাদা। ================ হিমুর টিচাররা যখন খেয়াল করলেন সে বিজ্ঞান ক্লাসগুলোতে কিছুই ধরতে পারছে না, তারা ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিলেন। রসায়নে তার "মাথা" আছে কি নেই সেটা তাদের দেখার বিষয়বস্তু না। তারা শিক্ষক, তার চেয়ে বড় কথা তারা স্বপ্নপুরী হাই স্কুলের শিক্ষক- তাদের কাজ প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর পরিস্থিতিকে আলাদা আলাদাভাবে বিবেচনা করা, এবং সেই পরিস্থিতিতে শেখানোর শ্রেষ্ঠ উপায়টা খুঁজে বের করা। এর পরের কয়েকদিন ধরে রসায়ন আপা হিমুকে খুব ভালভাবে খেয়াল করলেন। সে ক্লাসে কোন বিষয়গুলো পড়ানোর সময় সবচেয়ে বেশি মনযোগ দেয়, কখন প্রশ্ন করে, প্রশ্নের বিষয়গুলো কী- ইত্যাদি। এভাবে বেশ কিছুদিন পর্যালোচনার পর টিচারের মনে একটা আশ্চর্য সন্দেহ বাসা বাঁধতে শুরু করল। আমরা- মানে সাধারণ মানুষ যারা আরকি- দৈনন্দিন জীবনে কোনকিছু জানতে বা বুঝতে বিভিন্ন শর্টকাটের সাহায্য নেই। বিশেষ করে বিজ্ঞানের মত জটিল বিষয় পড়ার সময় শর্টকাটগুলো আরো বেশি ব্যবহৃত হয়। যেমন ধরুন, সোডিয়াম আর ক্লোরিন বিক্রিয়া করে যে সবসময় লবণ হয়, এই ব্যাপারটা বিজ্ঞানীরা কীভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন? তারা তো আর মহাবিশ্বের যাবতীয় সোডিয়াম ধাতু আর ক্লোরিন গ্যাস একটা প্রকাণ্ড বোতলে ঢুকিয়ে বিক্রিয়া ঘটাননি। তারা যেটা করেছেন- সোডিয়ামের কিছু নমুনা নিয়েছেন, ক্লোরিন গ্যাসের কিছু নমুনা নিয়েছেন, তারপর কিছু শর্তটর্ত মেনে পরীক্ষাগারে এদের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটিয়েছেন। দেখা গেল এই পরীক্ষা যতবারই করা হোক না কেন, ঘুরে ফিরে লবণই উৎপন্ন হচ্ছে। পৃথিবীর যেখানে যত বিজ্ঞানী এই ব্যাপারটা নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, সবযুগে সবকালে তারা একই ফলাফল দেখেছেন।* এজন্য বিজ্ঞানীরা ব্যাপারটাকে প্রকৃতির একটা আইন বলে ঘোষণা দিয়ে দিলেন- সোডিয়াম আর ক্লোরিনের বিক্রিয়ায় লবণ হয়। একই কথা বিজ্ঞানের অন্য যেকোন সত্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য- তামা তাপে প্রসারিত হয়, হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিলে পানি হয়, জীব মাত্রই কোষ দিয়ে গঠিত- প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীরা সীমিত সংখ্যক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে একটা সাধারণ উপসংহার টেনেছেন। এমনিতে এটা বলার মত কোন শর্টকাটই না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এরকমভাবে আমরা হরহামেশাই চিন্তা করি। কোন একটা দোকান থেকে বারবার জিনিস কিনে ঠকলে সিদ্ধান্তে আসি, দোকানটা মোটের ওপর ভাল না। এই সিদ্ধান্তে আসার জন্য দোকানের প্রত্যেকটা জিনিস আলাদা আলাদা করে কিনে দেখার দরকার নেই। বেশ কয়েকবার একটা ব্যাপারের পুনরাবৃত্তি হলেই আমরা সেটাকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে ধরে নেই। এজন্যই যখন আমরা ছোটবেলায় বিজ্ঞান ক্লাসরুমে বসি, শিক্ষক যখন সোডিয়াম আর ক্লোরিন মিলে লবণ হওয়ার গল্প বলেন- আমাদের মাথায় আসে না যে আমরা আসলে যুক্তিতে ছোট্ট একটা লাফ দিচ্ছি। সীমিত নমুনার ভিত্তিতে সাধারণ একটা সিদ্ধান্তে আসছি। লাফটা ধরা যে খুব গুরুত্বপূর্ণ তা বলছি না, কিন্তু তার অস্তিত্ব আছে। মানুষের ইতিহাসে বিশেষ বিশেষ সময় এমন কিছু ক্ষণজন্মা প্রতিভা আসেন, যাদের ক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ মানুষের হিসেব ওভাবে মেলে না। এদের চিন্তাপ্রক্রিয়া এতই স্বচ্ছ যে, বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে এই শর্টকাটগুলোর অস্তিত্ব তারা ধরে ফেলেন। সপ্তদশ শতাব্দীর বিখ্যাত দার্শনিক ডেভিড হিউম এরকম এক উদাহরণ। বিজ্ঞানের সীমিত থেকে সাধারণে যাওয়ার এই যে এক প্রক্রিয়া- দর্শনের জগতে যাকে বলে problem of induction- তা ভদ্রলোককে রীতিমত অস্থির করে তুলেছিল। তার An Enquiry Concerning Human Understanding কে আধুনিক ফিলোসফি অফ সায়েন্সের ভিত্তিপ্রস্তর বললে খুব অত্যুক্তি করা হবে না। হিউমের মত এই মানুষগুলোর সাথে আমাদের পার্থক্যটা কোথায় লক্ষ্য করুন। কোনদিন যদি কোন পাঁড় সিনেমাবোদ্ধা বন্ধুকে নিয়ে সিনেমা দেখতে বসেন- খেয়াল করবেন, সে যেসব জিনিস লক্ষ্য করছে আপনি সেগুলো করছেন না। হয়ত নিজেকে জাহির করার জন্য সে আপনাকে শুনিয়েই বলবে- দেখলি তো, ক্যামেরাটা এতক্ষণ ছিল ওয়াইড শটে। পট করে কিন্তু আমরা ক্লোজআপে চলে গেলাম। পরিচালক ব্যাটা আমাদের মনযোগ নিয়ে খেলা করছে, সে চায় আমরা এই সিনে বাকের ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাই। আপনি এসব কিছুই খেয়াল করছেন না, আপনি শুধু পর্দার ওপর পাত্রপাত্রীদের কাজকর্ম কথাবার্তা দেখছেন। ক্যামেরার পেছনে যে আলাদা একটা জগত আছে, সেখানে যে একগাদা মানুষ বিশালরকম একটা ধাপ্পাবাজি করে একের পর এক দৃশ্য আপনার চোখের সামনে মেলে ধরছেন- সেটা আপনার মাথাতেই নেই। হিউম কিন্তু শুধু পর্দার ওপর কী হচ্ছে সেটা খেয়াল করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি তার তীক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিজ্ঞান-চলচ্চিত্রের ক্যামেরার পেছনের ঘটনাও ধরে ফেলেছিলেন। এজন্যই ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে। এই ব্যাপারগুলো চিন্তা করে স্বপ্নপুরীর সেই রসায়ন আপা সন্দেহ করলেন- আমাদের হিমু কি তাহলে সে ধরণের একজন মানুষ? এমন কি হতে পারে যে, সে রসায়নের কিছু বোঝে না তার কারণ সে আর দশটা মানুষের মত এই শর্টকাটগুলোকে গ্রহণ করতে পারছে না? চলচ্চিত্র বাদ দিয়ে সে ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল দেখছে? এইটুকু বুঝতে পেরে পরদিনই আপা হিমুকে স্বপ্নপুরী হাই স্কুলের দর্শন ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ==================== একজন সাধারণ মানুষ যেখান থেকে চিন্তা শুরু করে, হিমু আসলে তার আরো অনেক গভীর শিকড় থেকে ভাবা শুরু করত। এজন্যই প্রথমে বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে সে বারবার হোঁচট খাচ্ছিল, কারণ বিজ্ঞানচিন্তার কলকব্জাটাই সে মানতে পারছিল না। এর কারণ মেধার কমতি নয়, বরং অতিরিক্ত মেধা। পরমাণু যে আসলে কী, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তরও পরে হিমু পেয়েছিল- যদিও সে পর্যন্ত আসতে তার পেছনের দর্শন যুক্তিবিদ্যা জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে অনেক কিছু পড়তে হয়েছে। হিমু এখন স্বপ্নপুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকাবুকো দর্শন প্রফেসর। বিজ্ঞানের দর্শন বিষয়ে তার কাজ পৃথিবীর সামনের সারির বিজ্ঞান ও দর্শন সাময়িকীগুলোতে বের হয়েছে। রসায়ন আপা আজ তাকে দেখলে খুব খুশি হতেন। মাঝে মধ্যে দু'য়েকটা সেমিস্টারে ছুটি পেলে সে স্বপ্নপুরী হাই স্কুলে রসায়নের দর্শন নিয়ে ক্লাস নেয়। যাইহোক, অন্য প্রসঙ্গে বলি- "অমুকের মাথা ভাল না" কথাটা ইদানিং ক'বার শুনেছেন? *লেখার সহজতার স্বার্থে একটা জটিল জিনিসকে আমি একদম যাচ্ছেতাই করে বললাম। অবশ্যই সোডিয়াম-ক্লোরিনের বিক্রিয়ায় যে লবণ হয়, এটা বের করার জন্য খালি ধাতু আর গ্যাস নিয়ে বসে থাকলে হবে না- ইলেকট্রন দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে আয়নিক বন্ধের কাহিনীও পড়তে হবে। কিন্তু সেখানেও শর্টকাটটা কিন্তু থেকেই যায়, সীমিত পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সাধারণ সিদ্ধান্ত।
No comments yet