কারন করোনা
আজ ১৭ ই সেপ্টেম্বর ২০২০,আজ রূপার একমাত্র ভাই রূপকের বিয়ে।তবে সে যায়নি। ঠিক যায়নি না যেতে পারেনি কিংব বলা যায় ওকে যেতে বারন করা হয়েছে। কারন এখন করোনা এই দূর্যোগে যাওয়া যায় না এই উক্তি দিয়েই তার স্বামী তাকে যেতে দেয় নি। বাসায় তিনটে বাচ্চা আছে, পাছে যদি কিছু হয়ে যায়।সামান্য বিয়ের জন্য নিজের ছেলে মেয়ের জীবন তো আর রিস্ক নেয়া যায় না তাই না?যদিও একই শহরে থাকে তাতে কি, এখন করোনা। . . . রূপা তার বাবা-মায়ের দুই সন্তানের মধ্যে বড় সন্তান।তার থেকে ৪ বছরের ছোট তার ভাই "রূপক"। রূপার সাথে নাম মিলিয়েই রূপক নামটা রাখা, এটা রূপারই পছন্দের নাম।ওর যখন ৪ বছর তখন তার মা-বাবা একটা পুতুলের মতো ছোট বাবু নিয়ে আসে। তার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস ছিল এই ছোট্ট পুতুলটা।যে সারাদিন ঘুমাতো আর কেবল সময় করে কান্না করতো। খুব কম সময়ই চোখ খোলা রাখতো। তারপরেও রূপার যেন এটাই প্রধান কাজ যে সে সবসময় তার পাশে বসে থাকবে। পুতুলটা যা করে সবই যেন ওর ভালো লাগে। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। এক মুহূর্তের জন্যও তাকে একলা ছাড়তে চাইতো না। ঘুমন্ত হোক, কান্না করা হোক বা চোখ খোলা অবস্থায় সবসময় ওর সাথে থাকতো।তেমন কোন ডিস্টার্বও করতো না,সারাদিন শুধু পাশে বসে থাকতো আর রূপক কান্না করলে বা চোখ খুল্লেই মাকে ডেকে নিয়ে আসতো । আস্তে আস্তে সময়ের সাথে সে এটা বুঝতে পারলো যে এটা তার অন্য সব পুতুলের মতো না এটা তার মতোই একটা বাবু। তার মা বলেছে এটা তার ভাই। . . পরিবারের প্রথম সন্তান এবং মেয়ে দুটি কারণেই হয়তো রূপার বাবা রূপাকে বেশিই আদর করতো। দুই সন্তানকে সমান ভাবেই ভালোবাসে কিন্তু তার পরেও রুপার জন্য যেন একটা অন্য রকম টান কাজ করে।ছেলে মেয়েকে সমাজের ভালো পজিশনে পৌঁছানোর জন্য কষ্ট করতে গিয়ে পরিবার থেকে প্রায় অনেকটাই দূরে সরে গিয়েছিল রূপার বাবা। তার এই দূরে সরে যাওয়াটা সফল ও হয়েছে। ছেলে মেয়ে দুটোকেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পেরেছে।রূপা ভালো পজিশনে একটা সরকারি চাকরীও পেয়েছে। তবে চাকরি বেশি দিন করেনি সে। তার স্বামী,সংসার এর কথা চিন্তা করে চাকরীটা ছেড়ে দিয়েছে।একভাবে বলতে গেলে এটা রূপার ইচ্ছে ও ছিল। চাকরীর প্রতি তেমন একটা আকর্ষণ তার ছিল না।তাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও সে একজন গৃহীনি হয়ে রয়ে গেছে।এটা কোনো নতুন বিষয় না, আমাদের দেশে ঘরে ঘরে এমন অনেক ঘটনাই হয়।হয়তো সেটা কারো ইচ্ছেতে আর নয়তো কারো অনিচ্ছাতে। তবে গৃহিণী হওয়াটা আমি খারাপ বা নিন্ম নজরে দেখছি না।গৃহিণী হওয়া আমার মতে সবচেয়ে কঠিন কাজ। কেননা সেখানে কোনো নির্দিষ্ট সময় এবং কাজ ভাগ করা থাকে না। সেখানে সারাক্ষণ এবং সকল কাজ একদম পার্ফেক্ট ভাবে করতে হয়। শারীরিক এবং মানসিক উভয় ভাবেই ওরা সারাক্ষণ কাজে নিয়োজিত থাকে তারা।রোবটের মতো একের পর এক কাজ তাদের মাথায় আসতে থাকে। যাক সে সব কথা। গল্পে ফিরে আসি........ আজ রূপার সেই ছোট বেলার পুতুল, একমাত্র খেলার সাথী, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভালোবাসার মানুষ, তার ছোট্ট ভাইটার বিয়ে। তবে সেখানে রূপার গমন নিষেধ। অনেক স্বপ্ন ছিল তার ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে এটা করবে, সেটা করবে, ভাইকে এমন ভাবে সাজাবে, আরো অনেক কিছু। তবে আজ সব কেবল স্বপ্নই রয়ে গেল। কেননা তার স্বামীর বারন। বিয়েতে বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া যাবে না আর রূপাকেও একা যেতে দিবে না আর উনি তো যাবেই না। কারণ? #কারণ_ করোনা। একই শহরের ৪৫ মিনিটের রাস্তায় একটা ক্যাবে করে, সুরক্ষা নিশ্চিত করেও কি যাওয়া যেত না? কই আগের মতো প্রভাবের গুঞ্জন টা তো নেই,তুমি তো প্রতিদিন বাহিরে যাচ্ছো আমি তো তোমাকে দূর করে দেইনি। আজ তোমার ছেলে মেয়ের জন্য আমায় যেতে দিলে না তবে আমিও তো আমার বাবা - মায়ের মেয়ে। তোমার তো দুজন মেয়ে তবে আমার বাবা-মায়ের তো আমিই একজন।ওদের এই সময়টাতে তো আমাকেই বেশি দরকার ছিল। তুমি কি চাইলেই পারতে না আমাকে পৌঁছে দিতে? এসব ভাবতে ভাবতেই রূপার ভিতর থেকে একটি চাপা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। মেয়েরা হাজার বললেও কখনো আপন হতে পারে না। তারা ঝুলন্ত পথিক হয়েই বেঁচে থাকে। ওদের অর্ধেক জীবন থাকে বাবার, অর্ধেক স্বামীর আর স্বামীর পর তার ছেলের। পরিবারের সকলেই রূপার অনুপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করলেও কেউ একবারও ওর দিকটা ভেবে দেখলো না।যেসব পরিবারে এক ভাই এবং এক বোন থাকে সেসব পরিবারে ভাইয়ের জীবনে বিয়ের মতো সেরা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার বোনের অনুপস্থিতি কতটা কষ্টের সেটা কাউকে বুঝানো যায় না। সেই কষ্টটা কেবল ভাই আর বোনই অনুভব করতে পারে। কথায় আছে, "মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি"। রূপার পরিবারেও এমনটাই হয়েছে। কেননা রূপার অনুপস্থিতিতে রূপার বাবা-মা,ভাই কষ্ট পেলেও তারা বিষয়টা বুঝতে পেরেছে এবং তাকেও সাপোর্ট করেছে। রূপক তো বোনের যাতে মন খারাপ না হয় সে জন্য প্রত্যেক মুহূর্তের খবর ফোনে জানিয়েছে এমন কি ছবি থেকে শুরু করে মেসেঞ্জারে ভয়েস কল, ভিডিও কল সব সময় কিছুনা কিছু একটা করেই গেছে। যাতে করে রূপার মন খারাপ না হয়ে যায়, রূপা যেন রূপকের বিয়েতে আসতে পারেনি বলে কষ্ট না পায়। রূপার অনুপস্থিতিতে রূপার বাবা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলেও রূপাকে বুঝতে না দিয়ে রূপকের সাথে তাল মিলিয়ে গিয়েছেন তিনি।তবে রূপার মামা-মামী,খালা-খালু, চাচা-চাচীরা তাকে স্বার্থপর বলতেও বাদ রাখেনি। একবার ও রূপার দিকটা ভেবে দেখলো না যে রূপার কেমন লাগছে।তার কি একটু ও খারাপ লাগছে না? তার কি কষ্ট হচ্ছে না? কিন্তু না, সেসব ভাবার সময় কোথায়? তারা তো আদালতের রায় ঘোষণা দিয়ে দিল রূপা স্বার্থপর। রূপার বাবার সকল কষ্টই বৃথা এছাড়াও আরো কত কি...... । যদিও ওদের কথায় কারো কিছু যায় আসে না তবে তারপরেও বলছে। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষই আছে যাদের প্রধান কাজই সম+আলোচনা এবং তার পাশাপাশি সমানভাবে সমান দিকে আলগা দরদ দেখানো।আমার মতে এসব মানুষ আমাদের পরিবেশ, সমাজ, জাতি সবকিছুর জন্যই ভয়ংকর ক্ষতিকারক। #কারন_করোনা শব্দ টা এখন বেশ প্রচলিত।মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললেও যে কোনো বিষয়ে অজুহাতের বেলায় এই শব্দটা ব্যবহার করতে ভুলে না। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় করোনার যদি কথা বলার ক্ষমতা থাকতো তাহলে সে বলতো "বিশ্বাস করেন এখানে আমার কোনো দোষ নাই, ওরা মিথ্যে কথা বলছে"। 😂😂 যাক বাক্যটা হাস্যকর হলেও বিষয়টা হাস্যকর না। করোনা কেবল মানুষের জীবন নিয়েই শোকের পরিবেশ সৃষ্টি করে নি। আরো অনেক ভাবেই অনেকের জীবনে প্রভাব ফেলেছে। #কারন_করোনা💔 #লেখা:সামিরা সায়শা
No comments yet