read.cash Log in
@faruk420

এক পশলা বৃষ্টি (পর্ব ১)

__**১+২**___ #এক_পশলা_বৃষ্টি পার্ট: ১ লেখিকা: সুলতানা তমা ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, আমি দুদিকে দুহাত পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে দিয়ে আকাশপানে তাকিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছি। বর্ষাকাল, থেমে থেমে দিন রাত বৃষ্টি হয়েই চলেছে। আর এই বৃষ্টিমুখর দিন গুলোকে উপভোগ না করলে চলে? বৃষ্টি কষ্ট পাবে না? তাইতো আমি আম্মুকে লুকিয়ে লুকিয়ে বৃষ্টিতে ভিজি হিহিহি! আলো: আপুনি আপুনি... (হঠাৎ আলোর ডাকে দুহাত নামিয়ে চোখমুখের পানি মুছতে মুছতে পিছন ফিরে তাকালাম, আলো ছাতা হাতে রাগি চোখে তাকিয়ে আছে) আলো: এই সাত সকালে বৃষ্টিতে ভিজছিস? ঠান্ডা লাগলে কিন্তু আম্মু পানিতে চুবাবে। আমি: বৃষ্টিতে ভিজলে আবার ঠান্ডা লাগে নাকি? আলো: তা হয়তো তোর লাগে না কিন্তু আম্মুর ঝাঁটার বারি তো... আমি: আম্মু উঠে পড়েছে? আলো: হ্যাঁ আর আপনাকে খুঁজছে। আমি: ইশশ এবার কি হবে? আলো: কি আর হবে? প্রতিবার এর মতো আমি বাঁচাবো। আম্মুকে বলেছি তুই ঘুমুচ্ছিস তাই আম্মু রান্না করতে চলে গেছে। আম্মু আমাদের রুমে গিয়ে যদি বিছানায় তোর বদলে কোলবালিশ পায় তাহলে কিন্তু আমাকে আস্ত রাখবে না। তাড়াতাড়ি গিয়ে ভিজে কাপড় গুলো চেঞ্জ করে নে। আমি: ওক্কে সোনা আপি। আলোর গালে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বাসার ভিতরে আসলাম আর সোজা গোসল করতে চলে গেলাম। আমি সাবরিনা সাবা চারু। ছোট বোন আলো আর আব্বু আম্মু এই আমাদের ছোট্ট সংসার। আব্বু ছোটখাটো একটি সরকারি চাকরী করেন, আম্মু গৃহিণী। আমি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি আর ছোট বোন আলো ক্লাস নাইনে পড়ছে। আমাদের আসল বাড়ি ঢাকায় হলেও আব্বুর চাকরীর সুবাদে খাগড়াছড়ি থাকি প্রায় চার বছর ধরে। আর... আব্বু: চারু মা নাশতা করবি আয়। আমি: আসছি আব্বু। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ডাইনিং এর দিকে গেলাম। আব্বু, আম্মু আর আলো নাশতা সামনে নিয়ে বসে আছেন। আমি: কি হলো তোমরা খাচ্ছ না কেন? খাবার সামনে নিয়ে কেউ বসে থাকে? (চেয়ার টেনে বসতে বসতে একটু আলুর পরোটা মুখে পুরে দিলাম। বসার পর লক্ষ করলাম আম্মু আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কি হলো ব্যাপারটা? আব্বুর দিকে তাকালাম, আব্বু আমার চুলের দিকে ইশারা করলেন। যাহ্ চুল দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে তো) আম্মু: এই তুই সাত সকালে গোসল করেছিস কেন? আমি: কারণ কলেজে যাবো সিম্পল। আম্মু: চারু আজ শুক্রবার। (পরোটা হাতে নিয়ে জিহ্বায় কামড় দিলাম, মিথ্যে বলে লাভ হলো না? এবার?) আম্মু: নিশ্চয় বৃষ্টিতে ভিজেছিস। আব্বু: কি যে বলো না, এই সকাল বেলা বৃষ্টিতে ভিজবে? গোসলই করেছে, আসলে আজ যে শুক্রবার সেটা চারু ভুলে গিয়েছিল। আমি: হ্যাঁ একদম তাই। আম্মু: বৃষ্টিতে ভিজার জন্য এতো বকা শুনিস তবুও শোধরাস না, তোকে নিয়ে আর পারছি না। (আম্মু উঠে এসে আমাকে দাঁড় করিয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছে দিচ্ছেন) আম্মু: এত্তো বড় মেয়ে হয়েছে চারপাশ থেকে বিয়ের সমন্ধ আসছে, বিয়ে দিলে বাচ্চাকাচ্চার মা হয়ে যাবে অথচ এখনো নিজের চুল মুছতে শিখেনি। আলো: আচ্ছা আপুনি তুই তো নিজের চুলের পানিই মুছতে পারিস না তোর বাচ্চাকাচ্চার চুল মুছে দিবে কে? আমি: তোর কাছে পাঠিয়ে দিবো। (আম্মু তোয়ালেটা আমার কাধে দিয়ে খেতে বসলেন) আম্মু: এই তুমি ওর বিয়ের ব্যবস্থা করো তো। সেদিন যে এক ঘটক ওর ছবি নিলো কিছু জানিয়েছে? আব্বু: কি জানাবে জানিই তো। আমি: বিয়ে? আম্মু: হ্যাঁ। স্বামীর হাতে চড় থাপ্পড় খেলে এসব বাচ্চামি স্বভাব ছেড়ে দিবি। আমি: বললেই হলো? আমাকে একটা থাপ্পড় দিলে আমি বেডার গাড় মটকে দিয়ে চলে আসবো না? একমনে খাচ্ছি আর এসব বলে যাচ্ছি হঠাৎ শুনশান নীরবতা দেখে আম্মুর দিকে তাকালাম, অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আম্মুর ভাব ভালো না, দুটো পরোটা হাতে নিলাম, আম্মু চামচ হাতে তেড়ে আসতেই দিলাম দৌড়। আম্মুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি এটাই অনেক, চামচের বারি তো খেতে হয়নি। খাটের মাঝখানে বসে একটা বালিশ কোলে নিলাম, মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডাটা অন করলাম। মেসেঞ্জার আর নোটিফিকেশন এর টুংটাং শব্দে কান একদম জ্বালাপালা হয়ে যাচ্ছে, কয়েকদিন হলো ফেবুতে আসা হয়না তাই এই অবস্থা। মেসেঞ্জারে ঢুকলাম, উর্মি বার্মা আইডি থেকে অনেক গুলো মেসেজ, "এই তুই ফেবুতে আসিস না কেন?" "কাল তো কলেজ বন্ধ আমাদের এখানে আসিস আড্ডা হবে" "রিপ্লে দিচ্ছিস না কেন? বেঁচে আছিস নাকি উপারে চলে গেছিস? নাকি কোনো রাজকুমার এসে তোকে নিয়ে গেছে?" সাথে অনেক গুলো হাসির ইমুজি। আর একটা মেসেজও পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে না। ফোনটা হাত থেকে রেখে দিলাম আর বিছানাচাদরটা টেনে গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। উর্মির মেসেজটার কথা ভাবছি, রাজকুমার? সত্যিই কি কোনো রাজকুমার আসবে আমার জীবনে? আব্বু আম্মু তো রাজকুমারই খুঁজছেন কিন্তু ওরা সবাই তো সুন্দরের পূজারী, আমার গায়ের রঙ শ্যামলা দেখেই ওরা পালায়। আচ্ছা ফর্সা আর বড়লোক হলেই কি রাজকুমার হওয়া যায়? আব্বু যে কেন সুন্দর আর বড়লোক ছেলে খুঁজেন বুঝিনা, আমার তো শুধু একটা রাজকুমার চাই। হউক না রাজকুমারের গায়ের রঙ কালো কিংবা শ্যামলা, চেহারাটায় একটা মায়া মায়া ভাব থাকলেই চলবে। রাজকুমারের চোখ দুটো হবে গভীর, যে চোখের গভীরতায় বারবার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হবে। গাল ভরতি খোঁচা খোঁচা দাড়ি থাকবে, ঠোঁটের কোণে সবসময় একটা মিষ্টি হাসি লেগেই থাকবে। চুলগুলো হবে এমন যেন হালকা মৃদু বাতাসেই চুলগুলো এলোমেলো হয়ে দোলে। আর বুক হবে লোমহীন যে বুকে মাথা রেখে আমি কাটিয়ে দিবো হাজারটা শতাব্দী। আর আমাকে ভালোবাসবে প্রচুর। আলো: আপুনি? (হঠাৎ আলোর ডাকে হকচকিয়ে উঠলাম) আলো: কিরে একা একা শুয়ে শুয়ে হাসছিস যে? ভূতে... আমি: এই চুপ। আলো: বুঝি বুঝি সব বুঝি। আমি: ঘোড়ার ডিম বুঝো তুমি, কেন এসেছিস বলে চলে যা। আলো: যাচ্ছি যাচ্ছি, যে বিয়ের সমন্ধটা ছিল এইটাও ক্যান্সেল। শ্যামলা বলে ছেলে না করে দিয়েছে। আমি: ছেলেটার ফোন নাম্বার আছে তোর কাছে? আলো: না। কিন্তু কেন? আমি: ফোন করে বলতাম কোনো ধবল রোগীকে বিয়ে করে নিতে। কথাটা বলে দুবোন এক সাথে ফিক করে হেসে দিলাম। আমার মতে যে ছেলে মেয়েরা বিয়ের জন্য ফর্সা মেয়ে বা ছেলে খুঁজে তাদের উচিত ধবল রোগীদের বিয়ে করা। সন্ধ্যার আকাশ, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আজ সারাদিন ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলাম। আর এখন জানালার পাশে বসে সন্ধ্যার অপরূপ সৌন্দর্য দেখছি। একে তো সন্ধ্যা তার উপর আবার গুড়িগুড়ি বৃষ্টি, দুটোয় মিলেমিশে পাহাড়ের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে হাজারগুণ বেশি। খাগড়াছড়ি সত্যিই খুব সুন্দর এলাকা। খাগড়াছড়িকে বলা হয় রূপের রাণী, কথাটা মুটেও মিথ্যে নয়, সত্যিই রূপের রাণী এই খাগড়াছড়ি। বছর চারেক হলো এখানে আছি, খাগড়াছড়ির বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি, প্রকৃতি প্রেমী তো। আমরা দুবোন এতোটাই প্রকৃতি প্রেমী যে আব্বুকে সোজা বলে দিয়েছি এই সৌন্দর্যময় খাগড়াছড়ি ছেড়ে আর কোথাও যাবো না, আব্বু আমাদের খুব ভালোবাসেন তো ব্যস এখানে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর বানিয়ে নিলেন। পাহাড়ের টিলার উপর ছোট একটি বাড়ি আমাদের। বাড়ির সামনে দুবোনের সখের ছোটখাটো একটি ফুলের বাগান। বাগান, ঘরের বারান্দা কিংবা জানালা থেকে দূরে তাকালে যতো দূর চোখ যাবে শুধু পাহাড় চোখে পড়বে। সবুজে ঘেরা পাহাড়ের সৌন্দর্য ঘরে বসে দেখতে পাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ আছে তা আর কিছুতে নেই। পাহাড়ের দিকে চোখ পড়লেই মনে হবে যেন পাহাড় দুহাত মেলে ডাকছে তার কাছে, সবুজে ঘেরা পাহাড়ের দিকে একবার চোখ পড়লে আর চোখ ফেরাতে যেন ইচ্ছে করে না। আম্মু: চারু চারু... (হঠাৎ আম্মু আসলেন, জানালার কাছ থেকে সরে আসলাম) আম্মু: আযান হচ্ছে শুনছিস না? নামাজ কে পড়বে? আমি: যাচ্ছি। আম্মু: প্রকৃতি প্রেমী হয়ে জান্নাতে যেতে পারবে না, জান্নাতে যেতে হলে নামাজ পড়তে হবে। আমি: যাচ্ছি তো। আম্মু চলে গেলেন, আমিও ওযু করতে ওয়াশরুমের দিকে গেলাম। নামাজ শেষে বাগানের ছোট দোলনাটায় আলো আর আমি বসে আছি। সন্ধ্যার পর বৃষ্টি একটু থেমেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারপাশে শুনশান নীরবতা। আলো: আপুনি চলো রুমে যাই, ভয় লাগছে। আমি: কেন? আলো: কি অন্ধকার দেখেছ চারপাশ? আকাশে শুধু মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে একটা তারাও নেই। আমি: অন্ধকারই তো ভালো। ব্যস্ত এই নগরীতে এতো নীরবতা কখনো দেখতে পাস? রাতের আধারেই শুধু নীরবতা নেমে আসে এই পাহাড়ের বুকে। আলো: অনেক দিন হলো কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না চলো কোথাও ঘুরে আসি। আমি: এখন গেলে আম্মু রেগে যাবে, তোর পরীক্ষা হয়ে যাক তারপর যাবো। আলো: আম্মু তো এমনিতেই খুব রেগে আছে। আমি: কেন? আলো: এইযে তোমার এই বিয়ের সম্বন্ধটাও ক্যান্সেল হয়ে গেল। এই নিয়ে নয়টা হলো। (কালো মেয়েদের নিয়ে বাবা মায়ের এই এক জ্বালা, সবাই সুন্দর চেহারা খুঁজে, কালো রঙের মেয়েরা যেন মানুষই না) আলো: আপুনি কিছু বলছ না যে? আমি: আব্বুকে তো অনেক বুঝালাম কিন্তু আব্বু বুঝতে নারাজ। তুই আব্বুকে বলিস আমি সুন্দর চেহারার মানুষ চাইনা কিংবা যার অনেক টাকা আছে তাকেও চাইনা। আমি সুন্দর মনের একটা মানুষ চাই। বড়লোক রাজকুমার হয়তো আমাকে নিয়ে মাসে দু চারবার লন্ডন, কানাডা কিংবা নেপাল ঘুরে আসবে কিন্তু এসবে আমি তৃপ্তি পাবো না। আমি চাই খুব সাধারণ একজন মানুষ, যে আমাকে সবটুকু উজাড় করে দিয়ে ভালোবাসবে। যে শত ব্যস্ততার মাঝে একটুখানি সময় বের করে হুট করে কোনো এক বিকেলে এসে বলবে "চলো ফুটপাত ধরে হাটতে হাটতে দশ টাকার বাদাম খেয়ে আসি" আলো: আপু এজন্যই তোমাকে এতো ভালোবাসি। তুমি খুব সাধারণ সহজসরল একটা মানুষ। কিন্তু তোমার এই সাধারণতার মাঝে যে এক অসাধারণতা লুকিয়ে আছে তা কি তুমি জানো? যে তোমার এই অসাধারণতা খুঁজে নিতে পারবে সে সত্যিই খুব ভাগ্যবান হবে। আর আমি দোয়া করি তুমি যেমন চেয়েছ আল্লাহ্‌ যেন তোমাকে তেমনি একজন মানুষ দান করেন। (মৃদু হেসে আলোর নাক টেনে দিলাম) আমি: অনেক হয়েছে পাকনি বুড়ি এবার রুমে চল নাহলে আম্মু আবার বকা দিবে। আলো: চলো। রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় এসে শুলাম। আলো বিছানায় শুতেই ঘুমের রাজ্যে চলে গেল কিন্তু আমার চোখে কিছুতেই ঘুম আসছে না। মোবাইল হাতে নিয়ে ডাটা অন করলাম। অকারণেই নিউজফিড ঘাটাঘাটি করছি... সকালে ফোনের রিংটোনে ঘুম ভাঙ্গলো, ঘুম ঘুম চোখে মোবাইলটা খুঁজে ফোন রিসিভ করলাম। আমি: হ্যালো। আরিয়া: কিরে তুই এখনো ঘুমুচ্ছিস? কলেজে আসবি না? আমি: হ্যাঁ আসবো তো। আরিয়া: কখন? কয়টা বাজে সে খেয়াল আছে? (ঘুম ঘুম চোখে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম, নয়টা বায়ান্ন বাজে? লাফ দিয়ে উঠলাম) আমি: রাখ রাখ আসছি। আরিয়া: তাড়াতাড়ি। তাড়াহুড়ো করে রেডি হয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়েই বেড়িয়ে পড়লাম। কিন্তু ড্রয়িংরুমে আসতেই আম্মু এসে সামনে দাঁড়ালেন। আমি: কি? আম্মু: কিছু না খেয়ে কোথায় যাচ্ছিস? আমি: অনেক দেরি হয়ে গেছে আম্মু, তুমিই তো ডাকোনি। আম্মু: নামাজ পড়ার জন্য অনেক বার ডেকেছি তুই উঠিসনি, ভাবলাম শরীর খারাপ নাকি। কিন্তু... আমি: ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে নিবো টাটা। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে হাটছি আর গুণগুণ করে গান গাইছি। কলেজ এইতো কাছেই হেটেই যাওয়া যায়। আনমনা হয়ে হাটছি আর রাস্তার পাশের লতাপাতার গাছ গুলোকে আলতো হাতে ছুঁয়ে দিচ্ছি। হঠাৎ কোথা থেকে যেন পানি এসে পড়লো আমার উপর, ময়লা পানিতে আমার ড্রেস একদম ভিজে গেছে। কিছু বুঝতে না পেরে পাশ ফিরে তাকালাম, একটা বাইক খুব স্পীডে গিয়ে সামনে থামলো। তারমানে এই বাইকওয়ালা নিজেকে নায়ক ভাবতে ভাবতে বাইক চালাচ্ছিল আর ভাঙ্গা রাস্তায় জমে থাকা পানি... হর্ন এর শব্দে ছেলেটার দিকে তাকালাম। ইচ্ছে হচ্ছে কাছে গিয়ে গলা চেপে ধরি। দুহাতে হেলমেট খুলে ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, ইচ্ছে হচ্ছে... এইতো পেয়েছি, রাস্তার পাশে এক টুকরো ইট পেলাম ব্যস ছুড়ে মারলাম ছেলেটার দিকে। ভাগ্য খারাপ ইটের টুকরোটা ছেলেটার উপর পড়লো না, ছেলেটা রাগি চোখে তাকিয়ে চলে গেল। নিজে দোষ করলো আবার নিজেই রাগ দেখাচ্ছে যত্তোসব। কিন্তু এবার আমার কি হবে? বাসায় এসে কলিংবেল বাজালাম। আম্মু: চারু একি অবস্থা তোর? (আম্মু দরজা খুলে আমাকে দেখেই প্রশ্ন করলেন) আমি: আর বলো না এক বজ্জাত ছেলে নিজেকে নায়ক ভাবতে ভাবতে রাস্তায় বাইক চালাচ্ছিল, ভাঙা রাস্তায় ময়লা পানি জমে ছিল ব্যস... আম্মু: হয়েছে আজ আর কলেজে যেতে হবে না। আমি: না আম্মু সামনে পরীক্ষা এখন ক্লাস মিস দিলে চলবে না। চেঞ্জ করে চলে যাবো, প্রথম ক্লাস মিস হবে আরকি। আম্মু: ঠিক আছে তাড়াতাড়ি যা তাহলে। রুমে এসে ড্রেস চেঞ্জ করে নিলাম। আর ফ্রেশ হয়ে আবারো কলেজের দিকে রওনা দিলাম। কলেজের গেইটে আসতেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো, দৌড়ে ক্লাসে আসলাম। আরিয়া আর উর্মি আমাকে দেখেই ইশারায় ডাকলো, ওদের কাছে এসে বসলাম। উর্মি: ভিজে গেছিস তো। আমি: এসব কিছুনা। আরিয়া: তোর তো আবার বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভালো লাগে। (আরিয়ার কথা শুনে মুচকি হাসলাম) আরিয়া: এত দেরি করলি যে? প্রথম ক্লাস তো সেই কখন শেষ। আমি: আর বলিস না এক বজ্জাত ছেলে... উর্মি: কি? (ওদের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালাম আর সব বললাম। ফাজিল দুইটা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে) আমি: তোরা হাসছিস? উর্মি: আমিতো ভাবছি সিনেমার মতো না আবার ছেলেটার সাথে তোর প্রেম হয়ে যায়। আমি: সিনেমা আর বাস্তব কি এক? তাছাড়া ওসব প্রেমের ধারেকাছে আমি নেই বাবা। আরিয়া: বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই কিন্তু সিনেমা বানানো হয়। আর প্রেম? কখন কিভাবে হয়ে যাবে বুঝতেই পারবি না। উর্মি: এই ছেলেটা দেখতে কেমন ছিলরে? সুন্দর তো? (উর্মির কথা শুনে ছেলেটার মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠলো। হেলমেট যখন খুলেছিল তখন হালকা হিমেল বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে দুলছিল, আর চোখ দুটো...) আরিয়া: কিরে কি হলো? আমি: কিছুনা। উর্মি: ওসব বাদ দে, বৃষ্টি হচ্ছে একটা গান... আমি: পারবো না। আরিয়া: বৃষ্টির দিনে তোর কন্ঠে গান না শুনলে একদমই ভালো লাগে না। উর্মি: ঠিক তাই। স্যার আসতে যখন দেরি করছে তাহলে একটা গান গেয়ে শুনা প্লিজ! আমি: আমার কর্কশ কন্ঠে গান শুনে যে কি ভালো লাগে তোদের তোরাই জানিস। আরিয়া: তোর কন্ঠে কি জাদু আছে তা তুই নিজেও জানিস না। উর্মি: আমাদের জন্য গাইবি না? আমি: আমার দুইটা কলিজার জন্য না গাইলে কার জন্য গাইবো? (মিষ্টি হেসে গান শুরু করলাম) এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন, কাছে যাব কবে পাব ওগো তোমার নিমন্ত্রণ? যুঁথি বনে ওই হাওয়া করে শুধু আসা-যাওয়া, হায় হায়রে দিন যায়রে ভরে আধারে ভুবন! কাছে যাব কবে পাব ওগো তোমার নিমন্ত্রণ? এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন, কাছে যাব কবে পাব ওগো তোমার নিমন্ত্রণ? শুধু ঝড়ে ঝড়ো ঝড়ো আজ বারি সারাদিন, আজ যেন মেঘে মেঘে হলো মন যে উদাসীন! আজ আমি ক্ষণে ক্ষণে কী যে ভাবি আনমনে, তুমি আসবে ওগো হাসবে কবে হবে সে মিলন... হঠাৎ উর্মির ইশারায় গান বন্ধ করলাম। পুরো ক্লাস জুড়ে নীরবতা, সবাই দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। আরে সেই ছেলেটা তো, এখানে কি করছে? উনি কি আমাদের নতুন টিচার? অদ্ভুত এক মুগ্ধতায় উনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আচ্ছা এতো মুগ্ধতা নিয়ে উনি তাকিয়ে আছেন কেন? তবে কি উনি এতক্ষণ আমার গান শুনছিলেন? হবে হয়তো, উনি এখনো মুগ্ধ নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, মুগ্ধতার রেশ যেন কাটছেই না... চলবে😍 (আবারো নতুন গল্প নিয়ে ফিরে আসলাম সবার মাঝে❤ গল্পের ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং অবশ্যই ভুল গুলো কমেন্টে ধরিয়ে দিবেন) #এক_পশলা_বৃষ্টি পার্ট: ২ লেখিকা: সুলতানা তমা অনেকক্ষণ ধরে উনি আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকায় আমার কেমন যেন অসস্তিবোধ হচ্ছে, ক্লাসের সবাই একবার উনার দিকে তাকাচ্ছে তো আবার আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমি উনার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মাথা নিচু করে জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলাম। উর্মি আমার অবস্থা বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়ালো। উর্মি: গুড মর্নিং স্যার। (স্যার শব্দটা শুনে বেশ কিছুটা অবাক হয়েই উনার দিকে তাকালাম) স্যার: গুড মর্নিং। (উর্মির কথায় যেন উনার হুশ ফিরলো, ক্লাসে ঢুকে সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন। উনি এখনো আড়চোখে আমাকে দেখে যাচ্ছেন) উর্মি: বুঝলাম না স্যার তোর দিকে এভাবে তাকিয়ে ছিলেন কেন? আরিয়া: গান শুনে মুগ্ধ হয়ে হয়তো। আমি: স্যার? উর্মি: হ্যাঁ আমাদের নতুন টিচার, ইংলিশ... আমি: কিন্তু এ তো সেই ছেলে যে রাস্তায়... উর্মি: এবার বুঝলাম স্যার কেন তোর দিকে এভাবে তাকিয়ে ছিলেন। আরিয়া: প্রথম দেখা রাস্তার মাঝে এভাবে হুট করে তারপর, দ্বিতীয় দেখায় মনোমুগ্ধকর ভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, বাহ্ বেশ সুন্দর ভাবে এগুচ্ছে। (দুইটা মিলে ফিক করে হেসে দিলো। ইচ্ছে হচ্ছে দুইটাকে...) আমি: কিসব বলছিস? উনি আমাদের টিচার, টিচারকে নিয়ে এসব ভাবা বা মজা করে বলা কিন্তু বেয়াদবি। স্যার: এইটা কি হাসি ঠাট্টার জায়গা? (স্যারের ধমক শুনে তিনজন কেঁপে উঠে সামনে তাকালাম। ওরে বাবা এতো স্যার নয় যম) স্যার: কথা বলার বা হাসাহাসি করার ইচ্ছে থাকলে বাইরে যেতে পারো, আমার ক্লাসে এসব চলবে না। উর্মি: স্যার তো নয় যেন আস্ত একটা রাক্ষস। (উর্মি ফিসফিস করে কথাটা বলতেই ফিক করে হেসে দিলাম, পরক্ষণেই মনে হলো আমাদের সামনে একজন রাক্ষস স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। স্যার তো আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন) স্যার: ক্লাস করতে এসেছ নাকি হাসতে এসেছ? (স্যার আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, মুখ কাছুমাছু করে বসে আছি) স্যার: আর তোমার কলেজ ড্রেস কোথায়? (এবার বেডাকে শায়েস্তা করা যায়, উঠে দাঁড়ালাম) আমি: বলবো স্যার? স্যার: হ্যাঁ বলতেই তো বলেছি। আমি: রাস্তার কথা ভুলে গেলেন? সবার সামনে বলবো আপনি যে বেপরোয়া ভাবে বাইক... স্যার: বসো। (দাঁত খিচিয়ে ধমক দিয়ে বসতে বলে চলে গেলেন, ব্যস হয়েছে) স্যার: সকালে তো তোমাদের সাথে আমার পরিচয় হলো, আমি স্নিগ্ধ, তোমাদের ইংলিশ টিচার। (স্নিগ্ধ? খুব সুন্দর নাম। আর আমার সাবজেক্ট এর টিচার তারমানে এই স্যারকে একটু বেশি জ্বালানো যাবে হিহিহি। আবার হেসে ফেললাম? তাড়াতাড়ি মুখ চেপে ধরে সামনে তাকালাম, স্যার আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দেখে মাথা নিচু করে ফেললাম) স্যার: আজ যেহেতু প্রথম ক্লাস তাই আজ কোনো পড়াশোনা নয়, আজ সবাই মিলে গল্প করবো। বাহ্ এমন রাগি স্যার আবার গল্প করতেও জানেন? স্যার সবার সাথে এইটা ওইটা নিয়ে কথা বলছেন। আমি জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছি, ইচ্ছে হচ্ছে ছুটে বাইরে গিয়ে দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজি। উর্মি, আমি আর আরিয়া তিনজন মিলে হাটছি, হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে ডাকলো। স্যার: এই মেয়ে? (পিছনে তাকিয়ে দেখি স্নিগ্ধ স্যার, কিন্তু ডাকছেন কাকে? আমরা তিনজন তো এখানে) স্যার: ডাকছি শুনতে পাচ্ছ না? আরিয়া: তোকে ডাকছে চারু। (স্যারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি বুক ধুকপুক ধুকপুক করছে, ক্লাসে হাসার জন্য হয়তো আবারো ঝারি দিবে) স্যার: সরি তোমার নাম জানা নেই তাই এই মেয়ে বলে ডাকতে হলো। আমি: সাবরিনা সাবা চারু, সবাই চারু নামেই ডাকে। স্যার: অনেক লম্বা নাম। যাই হউক যে জন্য ডেকেছি, সরি। আমি: কেন স্যার? স্যার: আসলে আজ এই কলেজে প্রথম দিন আর আজই আসতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাড়াহুড়ো করে আসতে গিয়ে বাইক স্পীডে চালাতে হয়েছিল আর রাস্তায় তোমার উপর ময়লা পানি... আমি: ইট'স ওকে স্যার। স্যার: আমি কিন্তু তখনি তোমায় সরি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি ইট ছুড়ে মারায় রেগে গিয়ে আর বলিনি। আমি: আসলে আমারো আজ কলেজে আসতে দেরি হয়েছিল তাই তখন রেগে গিয়ে ইট ছুড়ে মারি। স্যার: হুম সাহস আছে বলতে হয়। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ফাঁকা রাস্তায় একটা ছেলেকে ইট ছুড়ে মারলে ভয় হয়নি? আমি: নিজেকে রক্ষা করার জন্য মারপিটও করতে জানি। স্যার: কিন্তু পড়ালেখায় তো ঢেঢ়স। আমি: মানে? স্যার: ক্লাসে এত হাসাহাসি করা ভালো নয়, সামনে পরীক্ষা পড়ালেখায় মন দাও। তোমার সাবজেক্ট কি? আমি: ইংলিশ। স্যার: বাহ্ ভালো। আচ্ছা ভালো থেকো আর আবারো সরি। আমি কিন্তু বেপরোয়া ভাবে বাইক চালাই না। স্যার মৃদু হেসে চলে গেলেন। যতোটা বদমেজাজি ভেবে ছিলাম ততোটাও না। দাঁড়িয়ে স্যারের চলে যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম হঠাৎ ফাজি দুইটা এসে আমাকে ঝাপটে ধরলো। উর্মি: এই স্যার কি বললো? আরিয়া: প্রথম দিনই তোকে ডেকে নিয়ে কথা বললো? আমি: সরি বলেছেন রাস্তার ওই ঘটনার জন্য। উর্মি: তাই বল আমরা আরো ভাবলাম... আমি: ইশশ কি করে যে তোরা পারিস? স্যার হন উনি আমাদের, শ্রদ্ধা করতে শিখ। আরিয়া: হুম শ্রদ্ধা করি তো। কিন্তু স্যার বলে কি তাকে ভালোবাসা যাবে না? স্যার বিয়ে করবে না কখনো? আমি: এই চুপ এসব কি বলছিস? আরিয়া: দেখ প্রত্যেক স্যার মেডামই কিন্তু বিয়ে করেন, স্নিগ্ধ স্যারও বিয়ে করবেন। এরেঞ্জ ম্যারেজ হলে উনার পরিবার যাকে পছন্দ করবে তাকে বিয়ে করবে। হয়তো মেয়েটা এই কলেজের ছাত্রী হবে না কিন্তু অন্য কোনো কলেজের ছাত্রী তো নিশ্চয় হবে। কিন্তু ছাত্রী তো, তারমানে স্যার কোনো ছাত্রীকেই বিয়ে করবেন। আমি: তোদের সাথে কথায় পারা জাস্ট অসম্ভব। উর্মি: স্যারের সাথে কিন্তু তোকে সেই মানাবে। ফাজি মেয়ে দুইটা। চলে আসলাম ওদের কাছ থেকে, কেন যে ওদের মাথায় এসব ঘুরপাক খাচ্ছে কে জানে। বাগানের দোলনায় বসে আছি, বিকেলের মৃদু বাতাস বেশ ভালো লাগছে। আনমনা হয়ে বাগানের ফুল গুলো দেখছিলাম হঠাৎই চোখের সামনে স্নিগ্ধ স্যার এর মুখটা ভেসে উঠলো। মুগ্ধনয়নে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে উনার তাকিয়ে থাকার মুহূর্তটা কিছুতেই ভুলতে পারছি না। কেন এমন হচ্ছে? কেন আমি উনার ভাবনা এক মুহূর্তের জন্য মন থেকে সরাতে পারছি না? বারবার শুধু উনার মুখটা আমার দুচোখের সামনে ভেসে উঠছে। আলো: আপুনি? (হঠাৎ আলোর ডাকে কেঁপে উঠলাম) আলো: দুচোখ বন্ধ করে কি বিড়বিড় করছিস? আমি: কিছু না। আলো: আম্মু আর আব্বু ডাকছেন, চল। আমি: হুম চল। আব্বু বিছানায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছেন আর আম্মু পাশে বসা। দুজন একসাথে আমাকে ডেকেছেন কেন বুঝতে পারছি না। আব্বু: চারু বস, আলো তুইও বস। (চেয়ারে বসতে বসতে আব্বুর দিকে তাকালাম) আমি: আব্বু তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? আব্বু: হ্যাঁ রে মা হঠাৎ করে শরীরটা খারাপ লাগছে, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চলে এসেছি। আম্মু: চারু কিছু কথা ছিল তোর সাথে। আমি: হ্যাঁ বলো। আম্মু: অনেক গুলো বিয়ের সমন্ধ তো আসলো, আমরা শিক্ষিত সুন্দর বড়লোক ছেলে খুঁজেছি কিন্তু ওরা তোর গায়ের রঙ শ্যামলা বলে... আমি: আম্মু আমি বুঝতে পারছি না তোমরা এখনি কেন আমার বিয়ে নিয়ে ভাবছ। আমিতো পড়াশোনা করছি, পড়াশোনা শেষ করে চাকরী... আব্বু: এত সময় আমার হাতে নেই মা। আমি: মানে? আম্মু: তোর আব্বুর শরীর আজকাল ভালো যাচ্ছে না, ভয় পাচ্ছেন উনি যদি কিছু হয়ে যায়... আমি: আম্মু কি বলছ এসব? আব্বু: তোর দাদা দাদী বেঁচে নেই, আমার কোনো ভাই নেই, বড় ছেলেও নেই যে আমি মারা গেলে তোদের ভাই তোদের দেখাশোনা করবে। আছেন একমাত্র তোদের মামা, আমার কিছু হয়ে যাওয়ার আগেই আমি তোর বিয়েটা দিতে চাই। তারপর আলোর দায়িত্ব নাহয় তোর মামা... আমি: জানিনা আব্বু তোমার কি হয়েছে হঠাৎ করে এতোটা ভয় কেন পাচ্ছ তবে তোমরা যা সিদ্ধান্ত নিবে আমি তাতেই রাজি। তোমরা যা করবে আমার ভালোর জন্যই তো করবে। আম্মু: অবশ্যই আমরা তোর ভালো চাই। চোখের সামনে ভালো ছেলে থাকতে আমরা এত খুঁজেছি। আলো: কে আম্মু? আম্মু: তোদের মামাতো ভাই সাইফুল। তোর মামা চান তোকে সাইফুলের বউ করে নিতে। আমি: তোমরা যা ভালো মনে করো করতে পারো আমার আপত্তি নেই। আম্মু: ঠিক আছে। ভাইয়ারা সবাই আগামী সপ্তাহে আসছেন। আমরা ফোনে কথাবার্তা বলে বিয়ের তারিখ ঠিক করে রাখবো আর ওরা আসলে পর বিয়ে হবে। আমি: ঠিক আছে। আব্বু: চারু মা? (উঠে চলে আসছিলাম আব্বু পিছু ডাকলেন) আমি: হ্যাঁ আব্বু। আব্বু: তুই খুশি তো? (আব্বুর কথা শুনে মৃদু হাসলাম। যারা আমাকে এতো ভালোবাসে তাদের খুশিতে আমি খুশি নাহয়ে পারি?) আমি: হ্যাঁ খুশি। কিন্তু আব্বু বিয়ের পর আমি কুমিল্লা চলে গেলে আমার পড়াশোনা? আম্মু: এসব বিষয়ে সাইফুলের সাথে তুই কথা বলে নিস। আমি: ঠিক আছে আম্মু। মিষ্টি হেসে চলে আসলাম। বারান্দার রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে মেঘলা আকাশ দেখছি। আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে, জানিনা কথাটা যতোবার মনে পড়ছে ততো বারই কেন স্নিগ্ধ স্যার এর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনকে আনমনেই প্রশ্ন করলাম, বলতে পারিস কেন এমনটা হচ্ছে? কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না। রাত আনুমানিক একটা, প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে সাথে দমকা বাতাস আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আমি জানালার গ্রীলে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। বিদ্যুৎ চমকানোর ফলে অন্ধকার রুমটা বারবার আলোকিত হয়ে উঠছে। দমকা বাতাসে আমার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। স্নিগ্ধ স্যার এর কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে, উনার রাগী মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। কেন এমন হচ্ছে এই প্রশ্ন নিজের মনকে বারবার করেও কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, কি হয়ে গেল হঠাৎ করে আমার? আমিতো এতোটা চুপচাপ ছিলাম না। কেন করছি আমি এমন? আব্বু আম্মু যা চাচ্ছেন তা আমি কেন খুশি মনে মেনে নিতে পারছি না। চারু ভুল করছিস বড্ড ভুল করছিস। যারা তোর জন্য এত ভাবে তাদের মনে কষ্ট দেওয়া একদমই ঠিক হবে না। নিজের বাবা মা'কে কষ্ট দিয়ে কখনো সুখী হওয়া যায় না। অনেক হয়েছে আর মন খারাপ করে থাকবো না, স্নিগ্ধ স্যার এর কথাও ভাববো না। আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে, বিয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে আমায়। নিজের মনকে কঠোর ভাবে কথাগুলো বলে চুপচাপ এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। ভোরবেলা আম্মুর ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো, আড়মোড়া দিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসলাম। আম্মু: কিরে নামাজ পড়বি না? আমি: হ্যাঁ পড়বো তো। আম্মু: তাড়াতাড়ি পড়ে নে। আর হ্যাঁ বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেললাম, আগামী শুক্রবার। (আর মাত্র চারদিন বাকি বিয়ের?) আম্মু: কিরে কিছু বলছিস না যে? আমি: কি বলব? আম্মু: মন খারাপ হচ্ছে? মন খারাপ করার কোনো প্রয়োজন নেই মা, তোর মামা আর মামী তোকে অনেক যত্নে রাখবে। আর সাইফুল তো খুব ভালো ছেলে দেখিস তোকে অনেক ভালোবাসবে। আম্মু আমার কপালে চুমু দিয়ে চলে গেলেন। আর মাত্র চারদিন আছি এই বাড়িতে? আব্বু, আম্মু, আলো সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হবে? উর্মি আর আরিয়া ওদের ছাড়া আমি থাকবো কিভাবে? কুমিল্লা চলে গেলে যে ওদের সাথে দেখাই হবে না, আমার রোজ কলেজে যাওয়ার কারণ ওরা, এই দুইটা যে আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড। নাশতা খেতে বসেছি হঠাৎই আমার রুম থেকে ফোনের রিংটোন এর শব্দ ভেসে আসলো, এই সময়ে কে ফোন দিলো? আম্মু: মনে হয় সাইফুল ফোন করেছে, আমার থেকে তোর নাম্বার নিয়েছিল। আমি: ওহ। আম্মু: যা কথা বল গিয়ে। এতদিন তো ভাই বোন হিসেবে কথা বলেছিস, এখন এই কয়দিন কথা বললে দুজনের মধ্যে থাকা জড়তাটা কেটে যাবে। আমি: হুম। আম্মুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে রুমের দিকে পা বাড়ালাম। ফোনের স্কিনে সাইফুল নামটা ভেসে উঠেছে, হুট করে কি কথা বলবো বুঝতে পারছি না। এতদিন ভাইয়া ডেকে এসেছি আর এখন কিনা ধ্যাত। কিন্তু ফোন রিসিভ না করলেও তো ঝামেলা। আমি: হ্যালো। ভাইয়া: কেমন আছিস? আমি: হুম ভালো। তুমি কেমন আছ? ভাইয়া: ভালো। (কি বলব বুঝতে পারছি না তাই চুপ করে রইলাম) ভাইয়া: কিছু বলছিস না যে? আমি: না এমনি। ভাইয়া: তোকে একটা কথা বলার ছিল। আমি: হ্যাঁ বলোনা শুনছি আমি। ভাইয়া: কিন্তু ফোনে কিভাবে... আমি: তাহলে পরে বইলো। ভাইয়া: হ্যাঁ চারদিন পর আসছি তো খাগড়াছড়িতে তখন নাহয় সামনাসামনি বলবো। আমি: ঠিক আছে। ভাইয়া: ব্যস্ত তুই? আমি: এইতো কলেজে যাবো এখন। ভাইয়া: ঠিক আছে। ফোন কেটে দিলো, হাফ ছেড়ে যেন বাঁচলাম। কিন্তু ভাইয়া কি বলতে চায়? আর ফোনে কেন বললো না? সামনাসামনি বলবে বললো, তবে কি প্রপোজ করবে? ভালোবাসে বলবে? হবে হয়তো। অবশেষে সাইফুল ভাইয়া আমার জীবনের রাজকুমার হতে চললো। ম্লান হেসে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এলোমেলো পায়ে হাটছি, কিছুই যেন ভালো লাগছে না। সবকিছু কেমন যেন হুট করে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকা আমিটা হঠাৎ করে এমন চুপসে গেলাম কেন? বিয়ে ঠিক হয়েছে বলে? এইটা তো হওয়ারই ছিলো, অনেকদিন ধরেই তো বিয়ের কথা চলছে। তাছাড়া মেয়ে হয়ে জন্মেছি যখন বিয়ে করে তো পরের ঘরে যেতেই হবে। অন্য কোথাও তো না নিজের মামা মামীর কাছেই তো যাচ্ছি তাহলে এত কষ্ট হচ্ছে কেন আমার? নাকি এইটা... হঠাৎ করে গুড়িগড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। তাড়াতাড়ি ব্যাগে হাত দিলাম কিন্তু ছাতা তো আনিনি। বেড়োনোর সময় ছাতা আনতে ভুলে গেছি, মাথা একদম নষ্ট হয়ে গেছে আমার কিন্তু এবার কি করবো? দৌড়ে রাস্তার পাশের বড় একটি গাছের নিচে এসে দাঁড়ালাম। গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে, একদম ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছি। নিচু হয়ে হাতের পানি ঝেড়ে ছাড়াচ্ছিলাম হঠাৎ আর বৃষ্টি পড়ছে না অনুভব করে অবাক হলাম। কিন্তু বৃষ্টি তো এখনো থামেনি তাহলে আমার উপর পড়ছে না কেন? মাথা তুলে পাশে তাকাতেই চমকে উঠলাম, স্নিগ্ধ স্যার? ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে। ছোট ছাতা, ভিজে যাচ্ছি বলে উনি আর একটু এগিয়ে আসলেন আমার কাছে। উনার এতো কাছে দাঁড়াতে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে আমার। আমিতো রাতে নিজেকে শক্ত করে নিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম আর উনার কথা ভাববো না। কিন্তু... স্যার: বর্ষাকাল তার উপর পাহাড়ি রাস্তা, ছাতা নিয়ে বের হবে না? ভাগ্যিস আমি... আমি: আপনি চলে যান, বৃষ্টি কমলে আমি চলে যাবো। স্যার: ততোক্ষণে কাক ভেজা হয়ে যাবে। ভেজা অবস্থায় কলেজে যাবে নাকি? (একটু দূরে সরে আসলাম, বুকের ধুকপুকানিটা হঠাৎ কেন যেন খুব বেড়ে যাচ্ছে) স্যার: আচ্ছা মেয়ে তো তুমি, ভিজে যাচ্ছ বলে উপকার করতে আসলাম আর তুমি... স্যার আমার আর একটু কাছে এসে ছাতাটা ভালোভাবে আমার মাথার উপর ধরলেন। ছাতা আনিনি তার উপর আবার উনাকে চলে যেতে বলেছি, সবকিছুর জন্য উনি রাগি কন্ঠে কথা শুনাচ্ছেন আমায়। কিন্তু উনার কোনো কথা আমার কান অব্ধি পৌছাচ্ছে না, আমি এক দৃষ্টিতে উনাকে দেখছি। এতো কাছ থেকে উনাকে কখনো দেখবো ভাবিনি। ঠান্ডা হিমেল বাতাসে উনার চুলগুলো হালকা দোলছে, চোখ দুটোতে রাগ যেন উপচে পড়ছে কিন্তু তবুও চোখের বিশাল গভীরতা বুঝা যাচ্ছে, ফর্সা গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পড়নে কালো রঙের টি-শার্ট। সবকিছু মিলে একদম আমার স্বপ্নের রাজকুমারের মতো...

No comments yet

Log in to join in Reading is open to everyone. Replying needs an account.