তোমার নিসা
. গায়ে হলুদের স্টেজ থেকে ওয়াশরুমে যাওয়ার বাহানা করে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে বাস স্ট্যান্ডের সামনে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিসা। লাল পাড়ের কাচা হলুদের মাঝে সবুজ রঙা শাড়িটির কুচি একহাতে চেপে ধরে অন্যহাতে আঁচল টেনে মুখের একাংশ ঢেকে একবার রাস্তার ডান পাশে তো একবার বাম পাশে তাকিয়ে সময় গুনতে লাগল কাঙ্ক্ষিত মানুষটি আসার। সন্ধ্যার আকাশ রাতের কোলে ঢোলে পড়তেই ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত মানুষগুলো যেন দিনশেষে স্বস্তি খুঁজতে নিজের নীড়ে ফেরার উদ্দেশ্যে হুড়মুড়িয়ে পড়ছে মাঝ রাস্তার যান্ত্রিক শক্তির পেছনে। শত শত গাড়ি আসছে আর যাচ্ছে কিন্তু তার মধ্যে একটি গাড়িও নিসার অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারেনি। হঠাৎই রাস্তার বা পাশ থেকে ইউটার্ন নিয়ে ডান পাশে একটি কালো রঙের বাইক আসতে দেখে নিসার বুকটা ধক করে উঠল। চোখেমুখে হাসির ঝলক ফুটিয়ে কয়েক পা সামনে এগিয়ে মুখের আঁচল টেনে অস্পষ্ট স্বরে বলল, "প্রণয়!" "হ্যাঁ, দ্রুত বাইকে উঠো।" নিসা কোনো কথা না বলে তড়িঘড়ি করে বাইকে উঠে বসে পড়ল। কিছুটা দূরে যেতেই বাইক চালানোর ফাঁকে প্রণয় ঘাড় কাত করে বলল, "আমাকে আসতে দেখে এতো অবাক হয়েছিলে যে, কী ভেবেছিলে তোমাকে ঘর থেকে বের করে আমি আর আসব না?" "না,মোটেও না। এসব ভাবা তো দূরে কথা, মনের অজান্তেও কখনো একটিবারের জন্যও এই কথাটি মনে আসেনি।" "যদি এসব ভাবনা মনের কোণে না-ই এসে থাকে তাহলে একটু আগে আমাকে ওমন করে দেখছিলে কেন?" "এটাও বুঝি এখন খুলে বলতে হবে?বাসা থেকে সেই কখন পালিয়ে এসেছি। এতক্ষণে হয়তো বাসায় সবার খবরও হয়ে গিয়েছে আমি ঘরে নেই। আর সেই সুবাদে এদিকে কেউ না কেউ আসবেই আসবে তখন যদি কেউ আমাকে এখানে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখে কী হবে ভাবতে পারছ?তাই তোমাকে দেখে এতটা খুশি হয়েছিলাম।" "তাই বুঝি?" "হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই।এখন বেশি কথা না বলে সামনে তাকিয়ে ঠিকমতো বাইক চালাও তো। নাহলে দেখা যাবে এক্সিডেন্ট করে এখানেই চিৎপটাং হয়ে আছি।" "তোমার মুখে কিছুই আটকায় না নিসা?রাস্তাঘাটে কেউ এরকম কথা কি বলে?" "আচ্ছা ভুল হয়েছে। এবার অন্তত সামনে তাকিয়ে বাইকটা চালাও।" প্রণয় কথা না বাড়িয়ে সামনে তাকিয়ে বাইক চালাতে লাগল। প্রায় ঘন্টা খানেক পর বাইকটি একটি বাড়ির সামনে থেমে গেল।প্রণয় হ্যালমেট খুলে বলল, "চলো ভেতরে।" নিসা বাইক থেকে নেমে শাড়ির আঁচল দুই আঙুলের ফাঁকে পেঁচিয়ে আমতাআমতা করে বলল, "নিশ্চয়ই মা ঘরে আছে এখন যদি হঠাৎ করে আমি ঘরে যাই মা কী ভাববে!" "কী আর ভাববে, এই যে তার যুবক ছেলে অন্যের ঘরের যুবতী মেয়েকে হলুদ সন্ধ্যার আসর থেকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছে। হো হো....." "এই মুহূর্তেও তোমার হাসি পাচ্ছে?যেখানে কি-না আমি টেনশনে মরছি সেখানে তোমার হাসি পাচ্ছে?" " হাসি পাওয়ার মতো প্রশ্ন করো বলেই হাসি পাচ্ছে নয়তো কি পেত?" "মানে!" "তুমি কি ভুলে গিয়েছ ফ্ল্যাটে আমি একা থাকি?" জিহবায় কামড় বসিয়ে নিসা মুখ কাচুমাচু করে বলল, "সত্যি, আমি না ভয়ে,চিন্তায় একবারে ভুলেই গিয়েছিলাম তুমি একা থাকো।" দরজার লক খুলে জুতো একপাশে রেখে প্রণয় নিসার সামনে হাত বাড়ালো। "নীল পাথর, নতুন করে স্বাগতম জানাই আমার ভুবনে। চোখ ধাঁধানো তোমার নীলচে আভা দিয়ে ছড়িয়ে দাও প্রশান্তির হাওয়া এই মন পাজরে।" প্রণয়ের হাতে হাত রেখে নিসা উৎকন্ঠা স্বরে বলল, "বাব্বাহ! এখনের ভেতর তাল মেলানো ছন্দও বানিয়ে ফেলে?" "না,বানিয়েছি বললে ভুল হবে। এটা আমি বানাইনি। হঠাৎ করে মনে আসল সঙ্গে সঙ্গে মুখে বলেছি এই যা এর থেকে বেশি কিছুই না।" "তারপরও বেশ ভালোই হয়েছে। আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?" "কোনোকিছু জিজ্ঞেস করতে অনুমতি আবার কবে থেকে নেয়া শুরু করলে?" মৃদু হেসে নিসা বলল, " তুমি আমায় নীল পাথর বলে ডাকো কেন? নীল পাথর কি তোমার বেশ পছন্দের?" "পছন্দ না হলে কি আর তোমায় ডাকতাম? আর পছন্দ টাও বড় কথা না, আসল কথা হলো...নীল পাথর সবার কাছে থাকে না আর থাকলেও সবার গলায় মানায় না। কেননা নীল পাথর বেশ দামী আর মূল্যবান।যেটা সবার কাম্য নয়,ঠিক যেমনটা তুমি। তোমার থেকে মূল্যবান আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। তোমার জন্ম সবধরনের পুরুষ মানুষের জন্য হয়নি। তোমাকে বোঝার ক্ষমতা সবার মাঝে নেই। তাই তোমাকে সবসময় নীল পাথর বলে ডাকি। শুধুমাত্র আমার মূল্যবান নীল পাথর।" "এতটা গভীরভাবে ভাবো কি করে তুমি?" "আমার গভীর ভাবনা দেখে তুমি আবার আবেগে আপ্লুত হয়ে যেও না। তা নাহলে বিয়ের আগেই নির্লজ্জের মতো রাত কাটবে দু'জনার মাঝে।" নিসা কিছু বলতে যেয়েও পারল না,লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে যে তার। চুপচাপ রুমের ভেতর চলে গিয়ে দরজা ভেতর থেকে ভিড়িয়ে দিল। এদিকে নিসার লাজুক মুখ দেখে প্রণয় মুখ চেপে হেসে পাশের রুমে চলে গেল। . রাতের ঘন আঁধার সরে রোদের হাতছানি মিলতেই ঘুম ভেঙে যায় প্রণয়ের। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠতে নিলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে রাতে নিসার সেই বউ সাজে মনকাড়া লাজুক চাহনির মুহূর্তের কথা। হঠাৎই ভ্রু কুচকে গেল তার। মনে মনে বলল, "ইশ!কী ভুলটাই না করেছি কাল। নিসা কে দেখতে এত সুন্দর লাগছিল আর আমি কিছুই বললাম না!এটা কী করে সম্ভব হলো?না,কাজটা একদমই ঠিক হয় নি। তবে রাতের করা ভুল শুধরে নিতে আজ তো বলতেই পারি। হ্যাঁ, আজই বলব আর এখনই বলব। দেরি হলে যদি অভিমান করে নিসা রাগ করে বসে!" ভেবেই বিছানা ছেড়ে উঠে হাতমুখ ধুয়ে এগুলো নিসার ঘরের দিকে। বাহির থেকে দরজা হালকা ফাঁক করতেই প্রণয় হা হয়ে গেল।সে কি সঠিক দেখছে না ভুল,এখনো বোধগম্য হচ্ছে না তার।চোখ কচলাতে কচলাতে ধীর পায়ে ঘরের ভেতর এসে নিসার মাথা বরাবর দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে সামান্য ঝুঁকে বলল, "নিসা!নিসা!" প্রথম ডাকের পর দ্বিতীয় ডাক দিতেই ধরফরিয়ে নিসা শোয়া থেকে উঠে বসে পড়ল। এলোমেলো চুলের ভাজে হাত গুঁজে হাই তোলার মাঝে বলল, "সকাল হয়ে গিয়েছে বুঝি?" "বাহিরের ঝলমলে আকাশ যেভাবে চোখে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে, দেখে তো মনে হচ্ছে সকাল হয়েই গিয়েছে।" "কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলার অভ্যাসটা কি তোমার যাবে না?" "অভ্যাস জিনিসটা মানুষ জন্মলগ্ন থেকে নিয়ে আসে জানো না? সে যাই হোক,তোমাকে কিন্তু দেখতে বেশ লাগছে। এসেছিলাম বউ সাজে রাতের সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে কিন্তু,এসে যে তোমার আরেক আগুন রূপ দেখতে পাবো সেটা তো কখনো ভাবিই নি।" প্রণয়ের কথা শুনে নিসা বুঝতে পারল না তার এই আগুন রূপের বর্ননা কিসের ভিত্তিতে দিয়েছে সে। তাই নিসা নিজেই এর রহস্য উদঘাটন করতে ঘাড় নিচু করে নিজের মাথা থেকে পা অবধি ভালো করে তাকাতেই তার চোখ যেন ছানাবড়া হয়ে যায়! একবার নিজের পরনের জামার দিকে তো একবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বিছানার একপাশে থাকা কাঁথা টি ঝট করে হাতে তুলে নিয়ে নিজেকে ঢেকে ফেলল নিসা। "আরে আরে,কাঁথা মুড়ি দিলে কেন?বেশ তো লাগছিল দেখতে। আর সবচেয়ে ভালো লাগছিল তোমার ওই বুকের মাঝের লম্বা ভাজ টা। জাস্ট পাগল করে দেয়ার মতো। তাই ভাবছি এখন থেকে তোমাকে আমার কাপড় পড়িয়েই রাখব। তাতে হবে কী,তোমার জন্য আলাদা কাপড় কিনে টাকা নষ্ট করার প্রয়োজন পড়বে না আবার কারণে অকারণে তোমার প্রেমে পাগল হতে সময়ও লাগবে না। কী বলো?" "প্রণয়!" নিসা মুখ গোমড়া করতেই প্রণয় বিছানার একপাশে বসে বলল, "তোমার জামার প্রয়োজন আমাকে বলোনি কেন?আমি না-হয় নানান ঝামেলায় কাপড়ের কথা ভুলে গিয়েছি কিন্তু তুমি যখন রাতে চেঞ্জ করবে ভেবেছিলে তোমার তো একটিবারের জন্যও হলেও মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন ছিল আমাকে, তাই না?" "বলে কী হবে তুমি কি ওতো রাতে আমার জন্য মার্কেটে গিয়ে কাপড় এনে দিতে?না-কি তুমি কাপড় কিনবে বলে দোকানদাররা তোমার জন্য না ঘুমিয়ে দোকান খুলে বসে থাকত?" "সেই চিন্তা তো তোমার না,আমার কি করতাম আর কি না করতাম সেটা না'হয় আমার উপরই ছেড়ে দিতে।" এইটুকু বলে প্রণয় এগুলো পড়ার টেবিলের কাছে। একটি খাকি প্যাকেট নিসার সামনে ধরে বলল, . . চলবে..... তোমার_নিসা পর্ব - ১ . (তোমার_নিসা গল্পটি প্রথমে একটু বোরিং লাগলেও ধীরে ধীরে এর কাহিনী বুঝতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। তাই প্রথম পর্ব পরেই হতাশ হবেন না।)
No comments yet