লেখনীর শেষ প্রান্তে
মেয়েটা সুন্দরী, তবে চরম আকারের বেয়াদব। আজই মাত্র ওদের বাড়িতে এসেছি, অথচ আমাকে তুই করে ডাকে। বিপদে আছি বলে কিছু বলিনি, নয়তো কষে একটা চড় মারতাম। . দুই গ্রাম পরে আমাদের গ্রাম। আমার বাবা গ্রামের চেয়ারম্যান। গন্জের বাজারে তিনটে দোকানও আছে। আমাকে দোকানে বসতে বললে আমি আজ না কাল বলে এড়িয়ে যেতাম, গতকাল ইচ্ছেমত বকুনি দিছে বাবা। তাই রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি। আর আজকে এই আড়তদারের বাড়িতে কাজের ছেলে হিসেবে ঢুকেছি। তাইতো এই মেয়ের এমন লবনাক্ত ব্যাবহারও আমাকে সহ্য করতে হচ্ছে। মেয়েটি আবার কি জন্য যেন ডাকতেছে, "এই বাবলা, আয় ছিম পারতে যাব" কি সমস্যা মেয়েটার? বাবা মা আমার নাম রেখেছে বাবুল, আর এই মেয়েটা আমাকে বাবলা বলে ডাকতেছে। তবে মেয়েটা সুন্দরী, আর সুন্দরী টাইপের মেয়েরাই বুঝি এমন রগচটা আর অহংকারী হয়। --এই বাবলা, তুই কখনো প্রেম করছিস? --জ্বি না। --কখনো কাউকে পছন্দ করতি? --জ্বি না। আচ্ছা আপনি আমাকে বাবলা বলে ডাকেন কেন? আমার নামতো বাবুল। --বাড়ির কাজের ছেলেদের নাম থাকবে, হাবলা, গাবলা, বাবলা। আচ্ছা যা, তোকে আজ থেকে বাবু বলে ডাকব, "ল" টা বাদ। -- আচ্ছা আমাকে তুই করে বলেন কেন? আমিতো আপনার চেয়ে বড়। --এজন্য কি তুই রাগ করিসরে বাবলা? আচ্ছা, তোকে তুমি করে বলব যদি আমার একটা কাজ করে দিতে পারিস। --কি কাজ? --দুদিন ধরে দুইটা ছেলে আমার পিছন লাগছে, কাল যখন আমাকে স্কুলে দিয়ে আসতে যাবি, তখন ঘুসি মেরে ছেলে দুইটার নাক ফাটিয়ে দিবি। --কি বলেন। আমি ওদের নাক ফাটাব কেন? --কারন আমাকে ওরা ডিস্টাব করে, আর আমি তোর মালিকের মেয়ে তাই। আচ্ছা এখন থেকেই তুমি করে বলি, কি বলো? --আপনার ইচ্ছা। মেয়েটাকে যতটা খারাপ ভেবেছিলাম, তার থেকে একটু ভাল মনে হচ্ছে। এখন ভাবতেছি বাড়ি চলে যাব, গিয়ে আব্বুকে বলব আমাকে এই মেয়ে বিয়ে করালে দোকানে বসব। আচ্ছা এটাকি বেশী নির্লজ্জের মত কাজ হবে??? দরকার হলে দোলাভাইকে দিয়ে বলাব। অ, মেয়েটার নাম লাবন্য। ওকে নিয়ে ওর স্কুলে এগিয়ে দিতে যাচ্ছি। লাবন্য ইশারায় সামনের ছেলেদুটোকে দেখাল। ওদেরকে তো আমি চিনি। দুমাস আগে পাশের গ্রামে ফুটবল খেলা নিয়ে পিটিয়েছিলাম। সারছে, এখন যদি আমাকে একা পেয়ে পিটায় তো আমি কি করব??? ছেলেগুলো মনে হয় আগের মারের কথা মনে করে ভয় পেয়েছে। দ্রুত চলে গেছে আমাকে দেখেই। --বাবুল, তোমাকে দেখে ওরা পালাল কেন??? --মনে হয় ভয় পাইছে। --আমিতো তোমাকে দেখে ভয় পাইনা, আর দুই দুইটা ছেলে ভয় পেল??? যাই হোক, এখন থেকে ছেলেদুটো আর না আসলেই ভাল। --আর আসবেনা। --বাবুল, তুমি আসলে অনেক ভাল। আমি তোমার ছোট, অথচ আমাকে আপনি করে বলতেছো, আর আমি এতদিন কত খারাপ ব্যাবহারই না করলাম তোমার সাথে। কিছু মনে করোনা, আর আজ থেকে তুমিও আমাকে তুমি করে বলবা। . ভাবতেছি মেয়েটা হঠাৎ এমন ভাল হয়ে গেল কেন? এমন ভাল হলেই ভাল, আমার বউ হলেতো ভালই হতে হবে। কয়েকদিন পরের কথা, লাবন্যর সাথে মোটামোটি আমার একটা ভাল সম্পর্ক হয়ে গেল। কয়েকদিন পরে স্কুল থেকে লাবন্যকে নিয়ে ওদের বাড়িতে গিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ। বাবা লাবন্যর বাবার সাথে বসে কথা বলতেছে। বাবা কি করে জানল আমি এখানে? আমাকে দেখেই বাবা বলে ওঠল, ঐযে আপনাদের বাড়ির কাজের ছেলেটা চলে এসেছে। আমি নিশ্চুপ দাড়িয়ে, লাবন্যও কৌতুহল নিয়ে দাড়িয়ে আছে। লাবন্যর বাবা বলতেছে, তুমি আমাদের সাথে পরিচয় গোপন করেছো কেন বাবা? যাও, তোমার বাবা নিতে এসেছে, আর দোকানে বসতে হবেনা। বাবা বলতেছে না, দুএক বছর কাজের ছেলে থাকুক, দোকানে বসার চেয়ে এই কাজটা ভাল। . বিকেলে রওনা দেয়ার আগে লাবন্যর সাথে দেখা করতে গেলাম। লাবন্য বলতেছে, --এরকমটা আপনি না করলেও পারতেন,। এখন আমার লজ্জা করতেছে, কি ব্যাবহারই না করছি আপনার সাথে। --আমাদের বাড়িতে যাবে লাবন্য? --কেন, লজ্জা দেওয়ার জন্য? --লজ্জাই নারীর ভূষন, তবে একেবারে নেয়ার কথা বলতেছি। অনেকক্ষন নীচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। হঠাৎ বলল, বাবা জানেন। --তোমার মতামত কি??? --আমার কোন মতামত নেই। লাবন্যর বাবা মনে হয় রাজী হবে। রাজী থাকলে কাজীর ব্যাবস্থাও হয়ে যাবে। এখন শুধু দোলাভাইকে দিয়ে বাবাকে রাজী করাব। তাই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম . বাড়িতে আসার পর থেকেই লাবন্যর প্রেমে বিভোর হতে থাকলাম। সারাক্ষনই লাবন্যর কথাই মনে পড়ে। তবে বাবাকে কিছুতেই রাজী করতে পারলামনা। বাবা নাকি তার বন্ধুকে কথা দিয়েছে, পাশের গ্রামের মেম্বারের মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। এক প্রকার জোর করেই আমাকে এই বিয়েতে বাধ্য করা হচ্ছে। এবার আর পালানোর সুযোগ পাচ্ছিনা। . মেম্বারের মেয়েকে দেখতে আসলাম। মেয়েটি মোটামোটি সুন্দরই। আমাকে আর মেয়েটিকে আলাদা রোমে কথা বলার ব্যাবস্থা করে দেয়া হল। মেয়েটির সরল উক্তি, দেখুন আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবনা, আমি আরেকজনকে ভালবাসি। মনে মনেতো আমি মহাখুশি। আমিও লাবন্যকে ভালবাসি। আমি মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম, তাহলে আমি আপনার আর আমার বাবার সামনে গিয়ে কি বলব? --গিয়ে বলবেন, মেয়ে আমার বিশাল পছন্দ হয়েছে। আমি ওকেই বিয়ে করব। -- মানে? আপনিতো বললেন আপনি আমাকে বিয়ে করতে পারবেননা, আপনি আরেকজনকে ভালবাসেন। --হে, এজন্যই আপনি বিয়েতে রাজী হবেন। --বুঝলামনা। --বিয়ের দিন আমি পালাব। আমি যাকে ভালবাসি, সে আমাকে নিতে আসবে। আপনি বিয়েতে রাজি না হলে পালাতে সমস্যা হবে। আমাকে বাড়ির বাইরে যেতে দিচ্ছেনা। . মেয়েটার মাথায় বুদ্ধি আছে। বাবাও বুঝবে এবার ছেলের ভালবাসা মেনে না নেয়ার মজাটা। আমিও ভদ্র ছেলের মত গিয়ে বললাম বাবা মেয়ে আমার পছন্দ হয়েছে, আমি ওকেই বিয়ে করব। বাবাও মহা খুশি। . পাগড়ি মাথায় আর রোমাল মুখে দিয়ে বসে আছি জামাই সেজে। ঐ দিকে কন্যা সাজানো হচ্ছে। আচ্ছা, মেয়েটা এখনো পালালনা কেন? শেষ পর্যন্ত না জানি ওকেই আমার বিয়ে করতে হয়। হঠাৎ লাবন্যর বাবাকে দেখে আমি থমকে গেলাম। মেম্বারের সাথে দাড়িয়ে হেসে হেসে কথা বলতেছে। তাহলেকি আমার লাবন্যও এসেছে এখানে? একটু পরেই লাবন্যকেও দেখতে পেলাম। মনে হচ্ছে নীচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। কিছুই ভাবতে পারছিনা। এমন হচ্ছে কেন আমার সাথে। লাবন্য আমাকে দেখেছে কিনা বুঝতে পারছিনা। একবারও আসেনি এদিকে। নাকি লাবন্য সবকিছু জানে? লাবন্যর কোন আত্মীয় হবে হয়তো মেম্বারের মেয়েটা। বাবা হঠাৎ রেগেমেগে আগুন। মেম্বারের সাথে উচ্চকন্ঠে কথা বলতেছে। কেমন মেয়ে জন্ম দিয়েছো বিয়ের দিন মেয়ে পালিয়ে যায়? তোমার মান সম্মান থাকতে না পারে। আমারতো মান সম্মান আছে। মেম্বারের মেয়ে কাজ সেরে ফেলছে। একটা চিন্তা থেকে মুক্তি হওয়া গেল। বিয়েটা আর এখন করতে হয়নি। বাবা আমার কাছে এসে বলতে লাগল, এই বাবুল ওঠ, দুনিয়ায় মেয়ের অভাব নেই। আমি আজকের মধ্যেই তোকে বিয়ে করাব। --কি বলছো বাবা? চেনা নেই জানা নেই, হঠাৎ কোন মেয়েকে বিয়ে করব আমি? --বিয়ের পরে চিনে নিবি, এখন ওঠ। আমি তারাতারি দোলাভাইকে সব বললাম। দোলা ভাই বলল দাড়া আমি দেখতেছি। এবার আর দোলাভাইয়ের কথা ফেলতে পারেনি বাবা। বাবা নিজেই গিয়ে লাবন্যর বাবার হাতে ধরল। ভাই তোমার মেয়েকে আমি আমার পুত্রবধূ করতে চাই। লাবন্যর বাবা বলল, এভাবে হঠাৎ বিয়ে? তারপর আমার মেয়েরও অনুমতির দরকার আছে। লাবন্য বলে উঠল, না বাবা আমি এখন বিয়ে করবনা, সামনে আমার পরীক্ষা। আমি আগে লেখাপড়া শেষ করতে চাই। . আমার চেহারায় রক্তশূন্যতা দেখা দিচ্ছে লাবন্যর কথা শোনে। লাবন্য কি অভিমান করেছে আমার সাথে? আমি লাবন্যর সাথে কথা বলার অনুমতি চাইলাম। খালি একটি রোমে আমরা। নীচের দিকে দৃষ্টি দিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে আছে লাবন্য। আমিও কি বলে শুরু করব বুঝতে পারছিনা।তবুও বলতেতো হবেই। লাবন্য আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। --আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবনা। সামনে আমার পরীক্ষা। --তুমি বিয়ের পড়েও পড়তে পারবে। আমি সে ব্যাবস্থা করে দেব। --আপনাকে আমার পছন্দ নয়। আমি আরেকজনকে ভালবাসি। --না লাবন্য, এ হতে পারেনা। আমি তোমাদের বাড়ি থেকে আসার সময় বলে এসেছি তোমাকে আমাদের বাড়িতে একেবারে নিয়ে আসব। -- সতীনের সংসারে আনার ইচ্ছে ছিল??? --কি বলছ এসব? --ঠিকই বলছি। আমাকে ভালবাসলে আপনি এখানে বিয়ে করতেননা,,, (চোখ থেকে জল ঝরাচ্ছে লাবন্য) --দেখো লাবন্য, আমাকে বাবা জোর করে বিয়েতে রাজী করিয়েছে। মেম্বারের মেয়েকেও জোর করে বিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমারও এই বিয়েতে মত নেই। মেম্বারের মেয়ে পালিয়েছে সেটা আমার সাথে পরিকল্পনা করেই পালিয়েছে। কারন আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে পারিনা, আমাকে বিশ্বাস করো লাবন্য। --সত্যি আমাকে ভালবাসোতো??? --হ্যা, সত্যি সত্যি তিন সত্যি। --আচ্ছা তোমাকে বিয়ে করতে পারি এক শর্তে। --কি শর্ত? --আমি তোমাকে বাবলা বলে ডাকব। --কেন? বাবলা ডাকবা কেন? আমার নামতো বাবুল। -- তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবনা। --কি বলছ? আচ্ছা, আগের মত বাবু ডাকা যায়না? "ল" টা বাদ দিয়ে -- হুমমমম, ডাকা যায়। তবে আমাদের বাড়িতে গেলে আমার সাথে ছিম পারতে যেতে হবে। আমার খুশির সানাই বেজেই গেল। . আমি দাড়িয়ে আছি ঝুড়ি নিয়ে। লাবন্য গাছ থেকে ছিম পারতেছে। হঠাৎ লাবন্য ডাকল, এই বাবলা এদিকে আসো, ছিম রাখব ঝুড়িতে। --আবার বাবলা??? --আচ্ছা কয়দিন পরতো আমাদের একটা বাবু হবে। এখনকি তোমাকে বাবু ডাকা যায়? বলো তুমি। না, ওকে নিয়ে আর পারলামনা। লাবন্যর কাছে আমি বাবলা হয়েই রইলাম....... . লেখনীর শেষ প্রান্তে,,,,,,,☺️
No comments yet