read.cash Log in
@Safwan more from that month

সন্ধি

গল্প: সন্ধিবিচ্ছেদ! পর্ব: ০২! দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে সামনে থাকা দরজাটা একটুখানি ফাক করে কল্পনা বলে, " মে আই কাম ইন? " সঙ্গে সঙ্গে পিয়ানোর সামনে বসা মানুষটার আঙুলের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কল্পনার বুকে ব্যাথা উঠিয়ে দেওয়া পিয়ানোর সুরটাও মুহুর্তেই বিলীন হয়ে যায়। কল্পনা কানের সহায়তায় খুজতে থাকে সুরটা কিন্তু খুজে পায় না। কল্পনার অন্তরাত্মা চাচ্ছিলো আরো কিছুক্ষন ওই সুর তার বুকে ব্যাথার কারন হোক। কিন্তু হঠাৎ'ই বুকের ব্যাথাটাকে বিলীন করে দিয়ে সুরটাও বিলীন হয়ে যায়। কল্পনা মুখে আলতো সৌজন্যসূলভ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এখনো পায়নি কল্পনা। একটা ইশারা পেলো কল্পনা, পিয়ানোর মুখোমুখি বসে থাকা অচেনা মানুষটি তাকে হাতের ইশারায় ভেতরে প্রবেশ করতে বললো। মুখে কাম ইন, কিংবা আসুন বললে কী হতো? এটা ভেবেই একটু মুখ বাকিয়ে ভেংচি কাটে কল্পনা। ভেংচি কাটা শেষে সটান হয়ে ভেতরে ঢুকে দাঁড়িয়ে পড়ে পিয়ানোবাদকের ঠিক পিছনে। পিয়ানোটা বাইরের দিকে মুখ করে বসানো। হয়তো এই পিয়ানোবাদক বাইরের প্রকৃতি কিংবা আকাশ দেখে দেখে পিয়ানো বাজায়। পিয়ানোটা বাইরের মুখি হওয়ায় দরজা বরাবর পিয়ানোবাদকের পিঠটাই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কল্পনা একটু উঁকিঝুঁকি মারছে পিয়ানোবাদকের মুখটা দেখার জন্য, কিন্তু বারংবার ব্যার্থ হচ্ছে। পিয়ানোবাদক কোনো কথা না বলে আবার নিজের ডানহাতটা শূন্যে তোলে, ইশারায় কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে বাইরে যেতে বলে। পোষাক দেখে মনে হচ্ছে ছেলেটি এই পিয়ানোবাদকের ম্যানেজার। কিন্তু ছেলেটিকে বাইরে পাঠিয়ে দিলো কেনো? আমি একা মেয়ে দেখে কী কোনোপ্রকার সুযোগ নিতে চায় এই পিয়ানোবাদক? পিয়ানো তো বেশ ভালোই বাজায় এর চরিত্রও কী পিয়ানোর সুরের মতোই স্বচ্ছ আর মনোমুগ্ধকর? দাঁড়িয়ে আপনমনে এসব নিয়ে নিজের অন্তরাত্মার সাথে কথা বলছে কল্পনা। এই মাত্রই কোনায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা শান্ত বালকটি তার পাশ দিয়ে নিশ্চুপ হেটে কেবিন প্রস্থান করলো। একদম ভদ্র ছেলে, চেহারায়ই কেমন যেনো ভদ্রতার লেপন লেগে আছে। আচ্ছা ছেলেটার জুতার নিচে কী শক্ত কোনো কিছু নেই? না মানে পাশ দিয়ে হেটে চলে গেলো অথচ আওয়াজই হলো না। আমি জুতোর শব্দ শুনবো বলে কানখাড়া করে পাতলাম কিন্তু শুনতেই পেলাম না। আশ্চর্য! আরে আশ্চর্য তো এই অফিসে ঢোকার পর থেকেই বারবার আশ্চর্য হচ্ছি কেনো আমি? আশ্চর্য! আরো কী কোনো আশ্চর্যবোধক ঘটনা দেখার বাকি আছে আজ? আশ্চর্য! শব্দটা কেমনো যেনো কিউউট মতো তাইনা? আপনমনে ভাবনা রাজ্য শাসন করছিলো কল্পনা। তখনই সামনে বসা পিয়ানোবাদক তার পাশে রাখা কফি মগটা হাতে নেয়। হাতে নিয়ে মুখের কাছেও নেয়। কল্পনা কানখাড়া করে পেতে দেয়, চুমুক কী দিলো? কই আওয়াজ পেলাম না তো! কল্পনা নিজের ডান হাতের তর্জনী আঙুলটা নিজের ডান কানের ছোট ফুটোয় ঢুকিয়ে দু-তিনটে নাড়া মেরে নেয়। কান থেকে আঙুলটা বের করতেই একটা আওয়াজ কানে ভেসে আসে কল্পনার, " হেলো মিস কল্পনা খান চৌধুরি। হাউ আর ইউ? " থমকে যায় কল্পনার চারপাশ, এক মুহুর্তের জন্য কল্পনার পুরো শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম এই যেমন শ্বাসতন্ত্রের ত্যাগ-গ্রহন কার্যক্রম, হৃদপিন্ডের ধুকপুক ধুকপুক কার্যক্রম, রক্তের শিরা-উপশিরা বেয়ে নিস্তব্ধ শো শব্দে বয়ে চলা প্রবাহ সব থেমে যায়। আওয়াজ টা শুনে কল্পনা পাথরের ন্যায়, লোহার ন্যায়, নাকি বরফের ন্যায় স্থির এবং শক্ত হয়ে গেলো সেটা জানে না কল্পনা। তবে এটা সে নিশ্চিত জানে যে এই আওয়াজ তার। কল্পনা আর কিছু ভাবতে যাবে তার আগেই সামনে থাকা পিয়ানোবাদক কফির মগে আলতো এক চুমুক দিয়ে পিছন ফিরে কল্পনার দিকে খানিক এগিয়ে আসে। এতোক্ষন বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা কল্পনার বুকের ধুকপুক ধুকপুক যন্ত্রটা এবার পাগলা হয়ে ওঠে। এতো জোরে জোরে ধুকপুক ধুকপুক সুরে বেজে ওঠে যে কল্পনার হাতে থাকা ফাইলটা হাত থেকে নিচে পড়ে যায় আর কল্পনার হাতটা সোজা বুকে চলে যায়। ঘুমিয়ে পড়া কল্পনার শ্বাসতন্ত্র যেনো আরো গভীর ঘুমে তলিয়ে পড়ে। শ্বাস টেনে তুলতে তীব্র কষ্ট অনুভব করে কল্পনা। আরো কয়েকশো কোটিগুন বেশি কষ্ট অনুভব করে সামনে তার আদিকে দেখে। গত দেড়টা বছর কল্পনার চোখটা শুধু একপলক আদি দেখার জন্য হাতরে মরেছে। তবে আজ যে তার চোখের অপেক্ষার অবসান ঘটবে তা জানা ছিলো না কল্পনার। সামনে থাকা আদি নামক অবয়বটা বেশ পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর আগের মতো চেক শার্টের নিচে ম্যাচিং টি-শার্ট পড়া আদি নেই, প্লেইন ওয়ান কালারড শার্ট পড়া আদি, লাইট ব্লু কালারের শার্টের সাথে একটা কটি জড়ানো আদির গায়ে, চোখে একটা ফ্রেমলেস ফর্মাল গ্লাস। আদিকে এ অবধি এরকম চশমায় দেখেনি কল্পনা সবসময় স্টাইলিশ সানগ্লাস'ই পড়তো আদি। তবে ফর্মাল গ্লাসেও বেশ মানিয়েছে তার আদিকে। একদম কর্পোরেট লুক যাকে বলে। কল্পনা কেনো কাদছে তা কল্পনা জানে না। হয়তো এই চোখের পানিকেই মানুষ আনন্দ অশ্রু বলে আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু আদি এরকম নির্জীব কেনো? কই আমায় দেখে তো ও আমার মতো আনন্দ অশ্রু ফেলছে না। এসে আমায় জড়িয়েও তো ধরলো না। তাহলে কী ও আমার থেকেও বেশি খুশি হয়েছে? আর খুশিতেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমার কী ও'কে কেমন আছো জিজ্ঞেস করা উচিৎ? চিন্তাটা মাথায় আসার সাথে সাথেই আদ্র কাপন ধরা কন্ঠে সামনে থাকা অবয়বটাকে কল্পনা জিজ্ঞেস করে, " কেমন আছো আদি? " আদিলের বুকটা ঠিক মাঝবরাবর কয়েকবার ছিড়েছুড়ে আবার জোরা লেগে যায়। প্রবল যন্ত্রনার সূত্রপাত ঘটে আদিলের বুকে। কেনো এতোদিন পরেও কল্প'র কেমন আছো তুমিতে এতো প্রেমের জোর? কেনো সে জোর আমায় কাবু করে দিচ্ছে? বুকটা কেনো ছিড়ে যাচ্ছে আমার? ভেতরে এসব ভাবতেই আদিলের অকারন রাগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আদিল নিজের চশমাটা চোখ থেকে নামাতে নামাতে রুক্ষ কন্ঠে কল্পনাকে বলে, " মিস কল্পনা খান চৌধুরি কল মি স্যার। এন্ড বী প্রফেশনাল! " কথাটা কল্পনার কানে পৌছায় ঠিকই কিন্তু কথাটা কল্পনার কাছে কেমন যেনো মিথ্যে আর ভুল মনে হয়। তার আদি তাকে এভাবে বলবে তা কীভাবে সম্ভব? আদির তো তাকে জড়িয়ে ধরে বলা উচিত তুমি কেমন আছো কল্প? কিন্তু আদি এটা কী বললো? কল্পনা আবার ঠিক একই প্রশ্ন ছুড়ে মারে আদিলের দিকে তবে এবারের কণ্ঠস্বর আরো আদ্র-ভেজা ছিলো। কল্পনা আবার বলে, " কেমন আছো আদি? " ঠিক একই প্রশ্ন আবার শুনে মাথা খারাপ হয়ে যায় আদিলের। হাতে থাকা কফি মগটা সজোরে সামনের দেয়াল বরাবর ছুড়ে মেরে আদিল চেচিয়ে বলে, " গড ড্যাম স্টপ কলিং মী আদি এন্ড অলসো স্টপ কলিং মী তুমি। জাস্ট কল মী স্যার ইউ স্টুপিড লেডি! " একেতো কফি মগের তীক্ষ্ণ ভাঙন শব্দ তার উপরে আদিলের চিৎকার। আর নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম হয় না কল্পনা। পায়ের নিয়ন্ত্রন সহ পুরো শরীরের ভরের নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে কল্পনা। চারপাশটা কেমন যেনো ঘোরা শুরু করে দেয় তার। কল্পনা নড়বড়ে হয়ে ঢুলে পড়ে যাওয়া ধরতেই ধরে নেয় আদিল। কল্পনার মাথাটা ঠিক আদিলের বুকের বা পাশে স্থির। জীবনে এই প্রথম কল্পনাকে সামনাসামনি দেখলো সে, বুকটা এমনিতেই বেসামাল ছিলো আদিলের। কল্পনার মাথাটা নিজের উপর পেয়ে বুকটা যেনো এবার ক্ষ্যাপা ষাঁড়'ই হয়ে উঠলো। তীব্র গতিতে হৃদযন্ত্রটা স্পন্দিত হচ্ছে আদিলের, শব্দও হচ্ছে খুব। ভাগ্যিস কল্পনার এখন হুশ নেই নাহলে কল্পনার সামনে দেখানো আমার রাগ, কল্পনাকে করা আমার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য সব মিথ্যে প্রমান হতো। এভাবে কফি মগটা ভেঙে চিৎকার করা উচিৎ হয়নি আমার। কল্পনার প্যানিক ডিজঅর্ডার আছে সেটা আমার মাথায় রাখা উচিৎ ছিলো। এসব ভেবে নিজেকে গালমন্দ করতে করতে কল্পনাকে নিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ে আদিল। কী নিষ্পাপ আর স্নিগ্ধ এই চেহারা। কোথাও কী একটুও বেইমানির চিহ্ন আছে? কোথাও কী প্রতারনার ব্রন কিংবা মেছতা আছে এই মুখে? কই নেই তো। আমি তো খুজে পাচ্ছি না। এটা কী আমার চোখে থাকা প্রেমের অন্ধত্ব নাকি আমার অনভিজ্ঞতা, ব্যার্থতা? সে যাই হোক। এভাবে ভুলে গেলে চলবে না সবটা। আমার কাছে তুমি, তোমার বাবা অপরাধী। মস্তবড় অপরাধী, তোমার জন্য আমার বাবা আমার কাছে থেকেও নেই। আমার বাবা জীবিত থেকে মৃত শুধু তুমি আর তোমার বাবার জন্য। এতো সহজে তোমাদের ক্ষমা করে দেবো? সহজে বলছি কেনো আমি কোনোদিনই ক্ষমা করবো না তোমাদের। তোমাদের হাসিখুশি জীবনটাকে আমি নরক বানিয়ে দেবো, যেভাবে তোমার বাবা আমার জীবনটাকে বানিয়ে দিয়েছে। কথাগুলো ভেবে আর কল্পনার মাথাটাকে নিজের কোলে রাখতে পারে না আদিল। কল্পনার মাথাটাকে ফ্লোরে ছেড়ে দেয়, একটু ধুপ! শব্দ হয়। আদিল কল্পনাকে ছেড়ে উঠে গিয়ে কাচের কাছে দাঁড়ায়। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ছোট ছোট টানের সাথে বাইরেটা দেখতে থাকে আদিল। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, কী রোমান্টিক ওয়েদার তাইনা? আজ এই মুহুর্তটা অন্যরকম হতে পারতো কল্প। কিন্তু তোমরা হতে দিলে কই? কেনো দিলে না? কী এমন হয়ে যেতো হতে দিলে? আমি কেনো এখনো কল্প থেকে কল্পনা বানাতে পারছি না তোমায়? সিগারেটের ধোয়ার সাথে ভাবনা মিশিয়ে মনের প্রেম অনুভুতি উড়িয়ে দিচ্ছিলো আদিল। তখনই পেছন থেকে আদিলের ম্যানেজার শাকিল দরজা দিয়ে উকি মেরে বলে, " স্যার ম্যামকে সোফায় তুলে দেবো? " শাকিল বাইরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলো। আর শাকিল জানে কে এই কল্পনা, নিজের বসের কল্পই যে এই কল্পনা সেটাও বুঝতে বাকি নেই শাকিলের। গত আটমাসে প্রায় লক্ষাধিক বার তার স্যার কল্পকে নিয়ে তার সাথে আনমনে গল্প করেছে। তাই সবটাই তার কাছে একদম পানির ন্যায় পরিষ্কার। আদিল পেছন ফিরে ঝাঝালো কন্ঠে জবাব দেয়, " না ওখানেই পড়ে থাক। যতক্ষন না আমি ডাকছি ততক্ষন ফিরেও তাকাবি নআ এদিকে, কেবিনে আসা কিংবা আমায় ডাকা তো দূরের কথা। " শাকিল মোটেও চমকায় না আদিলের ব্যাবহারে। ঠিক এই ব্যাবহারটাই সে আশা করেছিলো তার বসের কাছে এই মুহুর্তে। শাকিল স্বাভাবিক কন্ঠে বলে, " ওকে স্যার! " আদিল সিগারেট টানায় ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। আবার সিগারেটের ধোয়ার সাথে ভাবনা মিশিয়ে মনের প্রেম অনুভুতি উড়িয়ে দিতে থাকে আদিল। মনে কোনোপ্রকার প্রেম রাখাই যাবে না। প্রেম মানেই যে বিশ্বাসঘাতকতা, সে আর বোকার মতো প্রেমে বিশ্বাস করে ঠকবে না। বহুবার ঠকেছে সে ভাগ্য, নিয়তি, কাছের মানুষ, দূরের মানুষ সবাই ঠকিয়েছে তাকে। মিনিট পনেরো পরে হুশ ফেরে কল্পনার। কল্পনার মাথাটা কেমন যেনো একজায়গাতেই থমকে আছে। মাথাটা প্রচুর ব্যাথা করছে তার। সাথে বুকটাও ব্যাথা করছে, একদম বুকের গভীর কোথাও একটা অসহনীয় ব্যাথা হচ্ছে। বুকে ব্যাথা উপলব্ধি করতেই খানিক আগের ঘটনা মনে পড়ে কল্পনার। একটা হাত দিয়ে মাথা আরেকটা হাত দিয়ে বুক ধরে ছিলো কল্পনা। কিছুক্ষন আগের ঘটনা মনে পড়তেই মাথার হাতটা দিয়ে ফ্লোর স্পর্ষ করে কল্পনা। তারমানে সে এতোক্ষন অজ্ঞান হয়ে ফ্লোরেই পড়েছিলি? এই প্যানিক এট্যাকটাও কী নির্মম তাই না? জায়গা, সময়, পরিস্থিতি না বুঝেই দাওয়াতবিহীন মেহমানের মতো চলে আসে। আমি মাথাঘুরে পড়ে গেলাম অথচ আদি আমায় ধরেও নি? আদি তো জানে আমার প্যানিক ডিজঅর্ডার আছে। তারপরেও...? ফ্লোরেই ফেলে রেখেছে? এতোটা বদলে গেছে আদি? একদিক থেকে ভাবতে গেলে বদলানোটা অবশ্য স্বাভাবিক। তবে আমি ভেবেছিলাম আদি স্বাভাবিক সাধারন হয়ে ভাববে না, আমায় একটু বুঝবে। কিন্তু না আদি স্বাভাবিক'ই ভেবেছে। যাক ভালো তো নিশ্চয়ই আছে। অজান্তেই একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে যায় কল্পনার ভেতর থেকে। পেছন ফিরে তাকায় আদিল। পেছনে তাকিয়ে কল্পনাকে হুশে দেখে আদিল কোমল কন্ঠে বলে, " উঠে চেয়ারে বসো। " আদিলের কণ্ঠস্বর নরম শুনে একটু চমকায় কল্পনা। পরক্ষনেই ভাবে, একটু আগে অজ্ঞান হয়েছি। হয়তো তাই দয়া দেখিয়ে কথা বলছে। খুব দয়ালু মানুষ তো আমার আদি! ফ্লোরের দিকে চোখের মনি স্থির রেখে এসব ভাবছিলো কল্পনা। কল্পনাকে উঠতে না দেখে আদিল আবার বলে, " চেয়ারে উঠে বসতে বললাম তো। " কল্পনা আদিলের দিকে না তাকিয়েই উঠে গিয়ে চেয়ারে বসে। চেয়ারে বসে চোখটা টেবিলের দিকেই স্থির রাখে, কেমন যেনো অস্বস্তি হচ্ছে এই অচেনা আদিকে দেখতে। অথচ কোনো একসময় ঘন্টার পর ঘন্টা ভিডিও কলে একে অপরকে দেখে কাটিয়ে দিতো দুজনে। সেসব এই মুহুর্তে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে কল্পনার কাছে। আদৌ সেগুলো স্বপ্ন ছিলো নাকি কোনো দুঃস্বপ্ন? আদিল টেবিলের দিকে এগিয়ে আসে। টেবিল থেকে পানির গ্লাস নিয়ে ফিল্টার থেকে পানি দিয়ে গ্লাস ভর্তি করে কল্পনার সামনে রেখে বলে, " নাও! " কল্পনা কিছুই বলে না। স্থির হয়ে বসে থাকে, একটুও নড়ে না। এমনকি চোখের পলকও ফেলে না। আদিল আবার বলে, " পানিটা নাও। " এবার কল্পনা বলে, " প্রয়োজন নেই। আমি ঠিক আছি! " আদিল টেবিলে চাপা শব্দের একটা চাপড় মারে। আচমকা এরকম শব্দে আতকে কেপে ওঠে কল্পনা। দাত চেপে আদিল বলে, " নিতে বলেছি নাও। আমি তোমাকে পানিটা অফার করছি না পানিটা নেবার জন্য অর্ডার করছি। আর তুমি আমার অর্ডার মানতে বাধ্য! " আদিল অর্ডারের কথা টেনে আনায় আদেশ পালনে পানির গ্লাসটা টেনে এক চুমুক পানি কোনো মতে গলায় নামিয়ে আবার গ্লাসটা যথারীতি টেবিলে রেখে দেয় কল্পনা। গ্লাস রেখে অভিমানি কন্ঠে আদিলের দিকে তাকিয়ে কল্পনা বলে, " আদেশ পালন করে নিয়েছি স্যার। আর হ্যা ঠিকই আমি আপনার আদেশ পালনে বাধ্য, কারন আমি আপনার কর্মচারী মাত্র! " কল্পনার কথাটা শুনতেই আদিলের বুকটা ছ্যাৎ! করে ওঠে। এতো তাড়াতাড়ি স্যার বলার অভ্যাস করেও নিলে কল্প? বোধহয় তাড়াতাড়ি অভ্যাস আয়ত্ত আনাটাও তোমার অভ্যাস। তাইতো আমার অভাব বোধ করোনি কখনও। ভালো! খুব ভালো! যত তাড়াতাড়ি সবটা মানিয়ে নিতে পারবে ততই ভালো। আদিল হেটে কাচের দেয়ালের কাছে এগিয়ে যায়। গিয়ে আরেকটা সিগারেট জ্বালায়। কল্পনা অবাক অপলক তাকিয়ে থাকে আদিলের দিকে। সিগারেটে একটা লম্বা পটু টান দিয়ে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে আদিল বলে, " আমার বাবা যদি মারাও যেতো না কল্পনা তাহলেও এতোটা কষ্ট পেতাম না জানো। কিন্তু এখন প্রত্যেকটা মুহুর্তে বাবা থেকেও না থাকার অভাবটা অনুভব করি। ভীষন অনুভব করি, অনুভব করে দুমড়ে-মুচড়ে যাই। " থেমে যায় আদিল। আদিলের কথার এমাথা-ওমাথা কিছুই খুজে পায়না কল্পনা। কৌতুহলের পাহাড় নিয়ে তাকিয়ে থাকে আদিলের পানে। আদিল বলে, " বাবা মারা গেলে নাহয় মনকে বুঝিয়ে দিতাম যে বাবা নেই। মেনেও নিতাম বাবার মৃত্যুটাকে। কিন্তু এখন কীভাবে মেনে নেই যে আমার বাবা থেকেও নেই? আমার বাবা এখন শুধুই একটা জড় পদার্থ। কীভাবে মেনে নেই যে আমার বাবা প্যারালাইজড? তাও তোমার বাবার কারনে? " কথা বলতে বলতেই আদিল নিজের চেয়ারটা ডানহাতে উঠিয়ে সজোরে ফ্লোরে ছুড়ে মারে। চেয়ারটা ভেঙে ৪-৫ ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় ভয়ে কেপে ওঠে কল্পনা। সাথে মাত্রাতিরিক্ত পরিমানে অবাকও হয়। আদিলের বাবাও প্যারালাইজড? এটা ভেবে অবাক হবার সীমা লঙ্ঘন করে ফেলে কল্পনা। আদিল দাঁড়িয়ে কাপছে। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। চোখের ভেতরে চারপাশে যে পানিগুলো জমে আছে তা দেখে মনে হচ্ছে তাজা রক্ত। বেশ ভয় পাচ্ছে কল্পনা। আদির এমন হিংস্ররুপ কখনও আবিষ্কার করেনি কল্পনা। আজ আবিষ্কারের পরে যেনো ভয়ে তার কলিজার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। আদিল কল্পনার দিকে এগিয়ে এসে টেবিলে ভর দিয়ে কল্পনার মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে, " কখন কষ্টে পাগল হয়ে যাই জানো? যখন আমি আমার বাবার রুমে যাই। বাবার চোখ দুটোর দিকে তাকাই, বাবা আমার সাথে চোখ দিয়ে কথা বলে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে আওয়াজ বের করতে পারে না। আর আওয়াজ বের না হওয়ায় বাবা যখন অসহায় হয়ে পড়ে। তখন বাবার ওই অসহায় মুখটা দেখে আমি কষ্টে পাগল হয়ে যাই। আমি আমার বাবাকে অসহায় দেখেও কিচ্ছু করতে পারি না! " কথা শেষ করতেই আদিল এবার টেবিলে লাথি মারে। সাথে সাথে লম্বা প্রশস্ত টেবলিটা নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খানিক লাথির বিপরীতে সরে যায়। আর কল্পনাও ভয়ে চোখ বন্ধ করে কেপে ওঠে। আদিল চিৎকার করে বলতে থাকে, " আমার বাবা এতোটাই অসহায় যে আমার সাথে কথা অবধি বলতে পারে না। আর আমিও এতোটা অসহায় যে আমি আমার বাবার অসহায়ত্বটা দুর করতে পারি না। আমার বাবার এই অবস্থার জন্য তোমার বাবা দ্বায়ী, তুমি আর তোমার বাবা দ্বায়ী শুধু। হ্যা তোমরাই দ্বায়ী, তোমাদের জন্য আমি আমার বাবার সাথে কথা বলতে পারি না। " কথা শেষ করে আবার টেবিলে লাথি মারে আদিল। টেবিলটা আবার লাথির বিপরীতে খানিক সরে যায়। কল্পনাও নিয়মমাফিক ভয়ে কেপে উঠে চোখ বন্ধ করে নেয়। আদিল ভ্রু কুচকে রক্তচক্ষু নিয়ে কল্পনার দিকে ঝুকে কল্পনাকে প্রশ্ন করে, " নিজের বাবাকে ওভাবে পাথরের ন্যায় প্রাণহীনভাবে পড়ে থাকতে দেখে কেমন লাগে তুমি জানো? যখন নিজের বাবার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে আর কথা বলতে পারো না তখন কেমন লাগে সেটা তুমি জানো? অনুভব করতে পারো? পারো না। না পারো না! পারবে কীভাবে? কীভাবে? " কন্ঠ জড়িয়ে আসে আদিলের। থেমে যায় আদিল। আদিলের চেঁচামেচির কারনে এতোক্ষন চোখ বন্ধ করে ভয়ে খিটে বসেছিলো কল্পনা। আদিল চিৎকার থামাতেই কল্পনা কান্নাভাঙা কাপা কন্ঠে বলে, " পারি আমি। হ্যা আমিও অনুভব করতে পারি। নিজের বাবা যখন প্রানহীনভাবে পড়ে থাকে তখন কেমন ব্যাথা হয়, কোথায় কোথায় ব্যাথা হয়, ঠিক কী পরিমানে ব্যাথা হয় সেটা আমি জানি। কারন আমার বাবাও ছয়মাস যাবৎ প্যারালাইজড স্যার! " পিলে চমকে ওঠে আদিলের। কল্পনার বাবাও প্যারালাইজড? আদিল কল্পনাকে জিজ্ঞেস করে, " কী বললে তুমি? " কল্পনা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে, " বললাম যে হ্যা স্যার আমার বাবাও প্যারালাইজড! " - " না ওটা না। তোমার বাবা কতদিন যাবৎ প্যারালাইজড? " - " ছয়মাস! " চুপ হয়ে যায় আদিল। কল্পনা বসে নিঃশব্দে কাদতে থাকে। আদিল চোখ ফিরিয়ে নেয় কল্পনার দিক থেকে। কেনো যেনো কল্পনার কান্না দেখে বুক ফেটে খান খান হয়ে যাচ্ছিলো তার। আদিল পকেট থেকে নিজের রুমাল বের করে কল্পনার সামনে রাখে। কল্পনা রুমাল তোলে না। আদিল নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, " কেমন আছে উনি এখন? " কল্পনা আদিলের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে, " ভালোই আছে। তবে আপনার বাবার মতো ভালো নেই বোধহয়। কারন আমি আপনার মতো নিজের বাবাকে এক্সপেনসিভ ট্রিটমেন্ট বা মেডিসিন তো দিতে পারি না তাই! " আদিল দাত চেপে বলে, " এভাবে পিঞ্চ করে আমার সাথে কথা বলবে না। তোমার বাবা যেটা করেছিলো উনি প্যারালাইজড না হলে আমি নিজেই ওনাকে প্যারালাইজড করে দিতাম। যাক উপরওয়ালাই আমার হয়ে করে দিয়েছে সেটা। " নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার সমন্ধ্যে এই কথা শুনে রক্ত গরম হয়ে যায় কল্পনার। কল্পনাও দাত চেপে বলে, " উনি আমার বাবা হন স্যার। আপনি আমায় যা খুশি তা বলতে পারেন ঠিকই। কিন্তু আমার বাবাকে নিয়ে একটা খারাপ কথা বলার অধিকারও কিন্তু আপনার নেই! " আদিল চেচিয়ে বলে, " শুধু তুমি কিংবা তোমার বাবা না। তোমার বংশের প্রত্যেককে নিয়ে কথা বলার অধিকার আমার আছে। আর আমি বলবোও, সো ডোন্ট ডেয়ার টু টক টুমি লাইক দিস ওয়ে মিস কল্পনা খান চৌধুরি। একটু আগেই তুমি তোমার মরনসেতুর অনুমতিপত্রে সই করেছো। ভুলে যেও না সেটা! " কল্পনা চোখ বন্ধ করে নেয়। আর কোনো কথা বলে তর্কে জড়ায় না কল্পনা। কিছুক্ষন দুজনেই নিশ্চুপ থাকে। নিরবতার পর্ব শেষ করে কথা বলার সুচনা করে আদিল বলে, " আরিফ কী করছে ইদানীং? " - " আউটসোর্সিং। " - " ওর সাথে কথা আছে আমার এখন বাসায় গিয়ে ওকে অফিসে পাঠিয়ে দিও। আর হ্যা যে ফ্ল্যাটে তোমরা থাকছো সেটা তোমাদের লাইফস্টাইল অনুযায়ী যায় না। আবাসিকে একটা বড় ফ্ল্যাটের ব্যাবস্থা করে দিয়েছি একটু বাদে শিফটিং এর লোক যাবে শিফট হয়ে যেও। আর তোমায় গাড়ি দেওয়া হচ্ছে সাথে ওয়ান কার স্কট মানে এখন থেকে ২৪ ঘন্টা তোমার সাথে ৮ জন বডিগার্ড থাকবে। কাল থেকে অফিসে এসো আজ যেতে পারো! " বলেই কাচের দেয়ালের দিকে এগোয় আদিল। কল্পনা বলে, " আমি বা আমার ফ্যামিলি কোথায় থাকছে সে খোজ রাখেন তাহলে আপনি? আমরা কোথায় থাকি, না থাকি তাতে আপনার কী স্যার? আমি কোথাও শিফট হবো না। আমি চাইনা আপনি আমায় কিংবা আমার পরিবারকে দয়া দেখান! " আদিল তেড়ে এসে দাত খিটে বলে, " দয়া আমি তাদের দেখাই যাদের প্রতি মনের টান অনুভব করি। তোমার প্রতি কোনো টান নেই আমার। সো দয়া দেখানোর কোনো কারনও নেই। তুমি এসব তোমার চাকরির খাতিরে পাচ্ছো। আমার পিএ একটা ছোট ফ্ল্যাটে থাকবে সেটা আমার স্ট্যাটাসের সাথে যায় না। সো তুমি এটা কোনোভাবেই ভেবো না যে আমি তোমায় নিয়ে বা তোমাদের নিয়ে ভাবছি। ভুলে গেছি আমি তোমায়। ৮ মাসের লিগ্যাল এগ্রিমেন্ট পেপার সাইন করেছো তো?... ওয়েলকাম টু হেল মিস কল্পনা খান চৌধুরি। এই ৮ মাস তুমি নরকে থাকবে নরকে!, যে নরক থেকে তুমি চাইলেও বেরোতে পারবে না। " - " আমার কোনো বডিগার্ড লাগবে না। সাধারনভাবে চলাফেরা করতে চাই আমি! " - " তোমায় আমার বিজনেস রাইভাল রা অপহরন করে আমার কোম্পানির কনফিডেন্সিয়াল ইনফরমেশন হাতিয়ে নিতে পারে তাই তোমায় বডিগার্ড দেওয়া হচ্ছে। আর এটাও আমি তোমায় অফার করছি না বরং অর্ডার করছি। সো জাস্ট ফলো মাই অর্ডারস এন্ড লীভ নাউ। আর হ্যা কাল থেকে আমি অফিসে আসি কিংবা না আসি তুমি ঠিক শার্প আর শার্প সকাল আটটার মধ্যে আমার কেবিনে থাকবে। যদি এক মিলি সেকেন্ডও লেট হয় না? কেবিনের বাইরে না সোজা অফিসের বাইরে সূর্যের নিচে কানে ধরে এক পায়ে দাড় করিয়ে রাখবো। সো মাইন্ড ইট, নাউ লীভ! " কল্পনা আর কোনো কথা না বলে আদিলের কেবিন থেকে বেড়িয়ে যায়। চলবে!

No comments yet

Log in to join in Reading is open to everyone. Replying needs an account.