Alien husband
♥#Alien_Husband♥ #পর্ব_১ ঘুম থেকে আড়মোড়া ভাঙ্গতে গিয়ে ব্যাথায় মুখটা বাঁকা হয়ে গেল ইতির। বেকায়দায় ঘুমানোয় এই দশা। একটু নড়তেই ঘাড় কোমর সব ব্যাথায় টনটন করছে। তার উপর আজকে লম্বা বাস জার্নি করতে হবে। ভেবেই বিরক্তি লেগে উঠল। তবে এর আগে দেখা দরকার কয়টা বাজছে। ফোনটা রাতে বালিশের পাশে রেখেই কম্বলের তলে আরামে ঘুম দিয়েছিল। এখন ইতিউতি করে খুঁজেও বালিশের আশেপাশে ফোনটাকে পাওয়া গেল না। গেলটা কোথায়! আরেকটু খুঁজতেই ফোনটাকে কম্বলের তলায় কোমরের কাছে আধমরা অবস্থায় পাওয়া গেল। দেখেই আন্দাজ করে নিল, নিশ্চয়ই ঘুমের মধ্যে নিজের অজান্তেই এলার্ম বন্ধ করে আবার ঘুম দিয়েছিল। চোখ এখনও শীত ঘুমে ঢুলছে। হাতড়ে কোনোমতে লক বাটন টিপে স্ক্রিনের আলো জ্বালাতেই মুখ থেকে আপনাআপনি চিৎকার বেরিয়ে এল। ঘুম পালিয়ে গেল চোখ থেকে। রুমে শুধু কনক টেবিলে বসে পড়ছিল। ওর চিৎকার শুনে ভয় পাওয়া গলায় বলল, কি হয়েছে, ইতি? চিৎকার করছিস কেন? খারাপ স্বপ্ন টপ্ন দেখলি নাকি! ইতি→ আরে, বারোটা সাত বাজে! আমি তের ঘন্টা ঘুমিয়েছি! কনক স্বাভাবিক গলায় বলল, এ আর এমন কি! তুই তো প্রায় বন্ধের সময় এমন লম্বা ঘুম দিস। ইতি আলসি তাড়াতে তাড়াতে বলল, আমাকে ডাকিসনি কেন? ইস্, আজকে বাস জার্নির সময় আর ঘুম আসবে না। না জানি আজকে কি আছে কপালে। মনে হয় বমি করে সব ভাসিয়ে দেব আজকে। কনক→ ডাকলে মনে হয় যেন সাথে সাথে উঠে যাস। তুই যেভাবে এলিয়েনদের মতো পড়ে পড়ে ঘুমাস! মুনিরা আপু তোকে কমপক্ষে দশবার ডেকেছে ক্লাসে যাওয়ার আগে। তিথিও কয়েকবার ডেকে বাড়ির জন্য রওনা হয়ে গেছে। আর বাকি রইলাম আমি। আমি বাবা এসবে নেই। কালকে সিটি (ক্লাস টেস্ট) আছে। তাই একবার ডেকেই ক্ষান্ত দিয়েছি। যাওয়ার আগে বমির ওষুধ খেয়ে নিস। ইতি→ হুম, তাই করতে হবে। ব্রাশে পেষ্ট লাগাতে লাগাতে ইতি বলল, ইস্……! আমার হয়ে মুনিরা আপুকে সরি বলে দিস। এতবার ডাকল! আর আমি পড়ে পড়ে ঘুমালাম। কথাটা শুনে কনক হঠাৎ হাসতে লাগল। ইতি মুখে ব্রাশ পুরে দিয়ে ওর দিকে চোখ পাকিয়ে বলল, এমন দাঁত কেলিয়ে হাসছিস কেন? কনক→ ভাবছি তোর জামাইয়ের কি হবে যদি তুই এভাবে এলিয়েনদের মতো পড়ে পড়ে ঘুমাস। বেচারা অফিসে যাওয়ার আগে দেখবে বউ ঘুমে, অফিস থেকে এসেও দেখবে বউ ঘুমে। ইতি→ এই, আমি মোটেও এমন ঘুমাই না। শুধু… কনক→ শুধু ঘুমের সময় সুনামি হলেও টের পাস না আর কি। চিন্তা কর তো, তোর বর রোমান্স করতে চাচ্ছে আর তুই ঘুমে কাঁদা। নাক ডাকছিস। ইতি নিজের ছোট বালিশটা কনকের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, আমি মোটেও নাক ডাকি না। আর দরকার হলে আমি না হয় একটা এলিয়েনকেই বিয়ে করে নেব। এখন থাম ফাজিল, পড়। তোর না সিটি। আমারও এমনিতে দেরি হয়ে গেছে। এখন আমার হাতে আর একঘন্টাও নাই। কি করে কি করব বুঝতে পারছি না। বলে দাঁতে ব্রাশ ঘষতে ঘষতে ইতি ওয়াশরুমে চলে গেল। কনক নিজের পড়া নোট খাতায় তোলার দিকে মনোযোগ দিয়ে বলল, সব তো রেডিই আছে তাহলে? ইতি কুলি করে নিয়ে বলল, কেন যেন অস্থির লাগছে। ঢাকা শহর বলে কথা। কখন গিয়ে পৌঁছাব বাসস্ট্যান্ডে তার নেই ঠিক। আর বাস তো আমার জন্য বসে থাকবে না। কনক→তা যা বলেছিস। ঢাকা একটা শহর বটে। ইতি ফ্রেশ হয়ে বিছানা গোছানোয় মনোযোগ দিল। কনক পেইজে রুল টানতে টানতে বলল, বিছানাটা বালিশে কম্বলে কি অবস্থা করে রেখেছিস। কোলবালিশটাকেও বিছানায় জায়গা দিস না। ঘুমের মধ্যে লাথি মেরে বিছানা থেকে ফেলে দিস। তোর আসলেই এলিয়েন বিয়ে করা দরকার। ইতি→ খুঁজে দে এলিয়েন। কনক→ হ্যাঁ। তোমাকে যদি ইংল্যান্ডের প্রেসিডেন্টও প্রপোজ করে তাও তুই একসেপ্ট করবি না। বলবি, স্যার, হাসপাতালে সিট বুকিং আছে তো? হাড় গোড় ভাঙ্গলে কোন হাসপাতালে নেব তার নামটা যদি একটু বলতেন। তারপর তাকে ভালো মতো পিটে মাংশের কিমা বানিয়ে সেই হাসপাতালে পাঠিয়ে দিবি। আবার নাকি এলিয়েন খুঁজে দেব। ইতি→ হ, এমন পাগল তুই হবি আরকি। বান্ধবী, এখন কাজের সময়। কথা কম কাজ বেশি। ওকে? কনক→ ওকে, ম্যাম। ইতি দ্রুত রেডি হয়ে নিল। কালো জর্জেটে লাল কাজ করা একটা থ্রিপিস পরে নিল। সুন্দর করে থ্রি লেয়ার কাট চুলগুলোকে উঁচু করে ঝুটি বেঁধে নিয়ে ওড়নাটা সুন্দর করে পরে নিল। কালকেই সব গুছিয়ে রাখা ছিল। তাই তেমন তাড়াহুড়ো হল না। রেডি হয়েই বেরিয়ে গেল। দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে না খেয়েই চলে গেল। কনক যদিও খাওয়ার জন্য বলেছিল ওর কাছ থেকে কিন্তু ইতিই না করে দিয়ে বলল রাস্তায় খেয়ে নেবে। এবার একটু নায়িকার পরিচয়টা জেনে নেই। ততক্ষণে সে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছুক। আফরা আনজুম ইতি। বয়স বিশ চলছে। ঢাকা ভার্সিটির অনার্সের ডিজেস্টার ম্যানেজমেন্ট এন্ড ভুলনেরাবিলি স্টাডিজের স্টুডেন্ট। যদিও দাঁত ভাঙা সাবজেক্ট তবুও এটাতেই পড়ে। সাইকোলজিতে পড়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু ফ্যামিলির ইচ্ছায় এটাতেই ভর্তি হয়েছে। ওরা দুই বোন। ছোট বোনের নাম স্মৃতি। ক্লাস এইটে পড়ে। ওদের মা আফিয়া নওরিন গৃহিনী আর বাবা ফারহান আমিন প্রবাসী। ওদের নিজেদের বাড়ির কাজ চলছে দেখে বর্তমানে বাড়িতেই আছেন। গতকাল ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই আজই বাড়িতে যাচ্ছে। ঢাকা টু ফেনী স্টার লাইনের বাসের টিকেট আগে থেকেই কেটে রেখেছিল। একটায় বাস। তাই তাড়াহুড়ো করেই হল থেকে বেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে রওনা দিল। . . . . ভাগ্য ভালো ওর। পাঁচ মিনিট দেরি করেও বাসের নাগাল পেল। কোনো একটা কারণে বাস একটা বিশে ছাড়বে। ইতি মনে মনে বলল, এটাই হওয়ার ছিল। বাংলাদেশ বলে কথা। যেখানে মানুষরাই লেট সেখানে বাস কি করে আগে ছাড়বে। যাই হোক, বড্ড বাঁচা বেঁচে গেছি। নইলে বাসটা মিসই হতো। এখনো দশ পনের মিনিট হাতে আছে। কিছু খাবার কিনে নেই। পেটে ছুঁচো ইঁদুর সব লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। মনে হচ্ছে আস্তো নীল তিমিও হজম হয়ে যাবে পেটে। একটা দোকানের দিকে এগিয়ে গেল ইতি। স্টার লাইন কোম্পানির নিজস্ব দোকান আছে। সেখানেই ইতি এদিক ওদিক তাকিয়ে ওর পছন্দের খাবারগুলো খুঁজতে লাগল। কিন্তু কিছুই পছন্দ হচ্ছে না। হাত বাড়িয়ে এটা ওটা নেড়ে দেখছে শুধু। হঠাৎ একটা ছেলে কোথায় থেকে এসে ওর বাম হাতটা শক্ত করে ধরল। বাম হাতে একটা 'ক্রাউন রিং' রিং ফিঙ্গারে পরা। এই 'ক্রাউন রিং'-টা ও বিজয় মেলা থেকে কিনেছে। খুব পছন্দের আংটিটা। ও বরাবরই রিং ফিঙ্গারে আংটি পরতে পছন্দ করে। তাছাড়া লোকজন যাতে ওকে বিবাহিত ভেবে ওর সাথে বেশি ঝামেলা না করে সেইটাও আরেকটা কারন। ছেলেটা ওর হাতটা উঁচু করে ধরে সেই আংটিটার দিকেই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করে ব্যাপারটা হওয়ায় ইতি একটু চমকে গিয়েছিল। পরে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, এটা কি ধরনের অসভ্যতা? পাবলিক প্লেসে অচেনা মেয়েদের হাত ধরছেন। লজ্জা করছে না? ছেলেটা ওর কথার উত্তর না দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, My Queen. ছেলেটার কথা শুনে ইতি আগা মাথা কিছুই বুঝল না। তবে মনে মনে একটু অবাক হল। তবে যতটা ওর কথা শুনে অবাক হল, তার চেয়ে বেশি অবাক হল ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে। কেমন সবুজাভ নীল ঘোলা চোখ। যেন হাজার তারা ওর চোখে ঝলমল করছে। দেখলে নেশা ধরে যায়। ইচ্ছে করে তাকিয়ে থাকতে। হঠাৎ কাউন্টার থেকে মাইকে যাত্রীদের বাসে ওঠার কথা কানে আসতে ইতির হুঁশ হল। 'আমার বাস' বলেই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল দোকান থেকে। ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ ওর দিকে। তারপর দোকানদারকে বলল, এই কেকটার পাঁচ পিস দিন। . . . . ইতি টিকেট নিয়ে ঘুরে ঘুরে নিজের সিটটা খুঁজে নিল। ওকে সব সময় জানালার পাশে বসতে হয়। না হলে বাসের ভ্যাপসা গরমে ওর বমি পায়। তাই জানালা দেখেই একটা সিট কেটেছে। সি-১। সিট খুঁজে পেয়ে বসে পড়ল ওর কাঁধের ছোট ব্যাগটা নিয়ে। বড় ব্যাগটা বাসের ট্যাংকে দিয়ে দিয়েছে। জানালাটা খুলে একটা লম্বা শ্বাস নিল। এখন শীতকাল। মাঘের শীত। জানে না কতক্ষণ জানালাটা খোলা রাখতে পারবে। বাস দ্রুত চললে হুড়মুড় করে সব ঠান্ডা বাতাস ঢুকে পড়বে। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বলতে লাগল, বাই ঢাকা। একমাসের জন্য তোমার ছুটি। এই ধুলার শহরে থেকে থেকে একেবারে দূষিত হয়ে গেলাম। একমাস বাড়িতে গাছপালার মাঝে থেকে ফ্রেশ হয়ে আসব। কিন্তু একমাস পর আবার সেই একঘেয়ে জীবন। ক্লাস, সিটি। উফ্। ধুর………আগে তো বাড়ি যাই। তারপর আবার ফিরে আসার চিন্তা। বাড়ির কথা ভাবতেই মুডটা ভালো হয়ে গেল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মানুষের ব্যস্ততা দেখতে লাগল। জার্নির সময় এই একটা জিনিসই ওর ভালো লাগে। সেটা হল জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা। গাড়ির ভেতর তাকিয়ে দেখল ড্রাইভার উঠে গেছে গাড়ি স্টার্ট দেয়ার জন্য। তখনই পেট ক্ষুধায় শব্দ করে উঠল। ইতি মনে মনে বলল, হায় হায়। কিছুই তো কেনা হল না। খুব যে ক্ষিধে পেয়েছে। এখন দুই তিন ঘন্টা এই ক্ষিধে নিয়ে থাকতে হবে। এর আগে তো বাস কোথাও থামবে না। এখন কি হবে! সব হয়েছে ঐ ছেলেটার জন্য। চেনা নেই শোনা নেই কোথা থেকে এসে খপ করে হাত ধরে বসল। নইলে ততক্ষণে কিছু একটা কিনে নেয়া যেত। কিন্তু…… গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে ওর পাশের সিটে একজন বৃদ্ধ যাত্রী এসে বসল। ও মন খারাপ করে জানালা দিয়ে বাইরের দোকান গুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। কত খাবার দোকানে! সবগুলো ওর দিকে জুলুজুলু চোখে তাকিয়ে আছে কিন্তু ও কিছু কিনতেও পারছে না, খেতেও পারছে না। ওর ভাবনার মাঝেই বাসটা আস্তে আস্তে নড়তে শুরু করল। গেটের দিকে এগিয়ে যেতেই বাসটাকে কোনো কারনে থামানো হল। চারপাশের লোকজনের কথা কানে আসতে জানা গেল একজন যাত্রী নাকি উঠতে পারেনি। তাই বাস থামানো হয়েছে। ইতি জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেখল ঐ ছেলেটা দৌঁড়ে আসছে বাসের দিকে। দেখতে দেখতে উঠেও পড়ল বাসে। ইতি পাত্তা দিল না। এমনিতেই ছেলেটার উপর রাগ উঠে গেছে। আর এত মানুষের সামনে ঝামেলা করতে চায় না। কিন্তু ছেলেটাকে পাত্তা দিতে না চাইলেও একটা ব্যাপার ও এড়াতে পারল না। তা হল ওর হার্টবিট। কেন যেন ও হার্টবিট শুনতে পাচ্ছে। এত জোরে শুনছে যে আশে পাশের মানুষও যেন শুনছে। ইতি পাশে তাকিয়ে দেখল বৃদ্ধ লোকটি চুপ করে বসে আছে। সকল যাত্রী উঠতেই বাস পুরো দমে চলতে শুরু করল। চলন্ত বাসের মধ্যেই ছেলেটা এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের সিট খুঁজতে লাগল। ওর সিট ডি-৩। সিটের কাছে গিয়ে একবার ইতির দিকে তাকাল, আরেকবার নিজের সিটের দিকে। ইতি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ছেলেটা কাঁধের ব্যাগটা হাত নিয়ে ইতির পাশে বসা বৃদ্ধ লোকটির কানে কি যেন ফিসফিস করে বলল। শুনেই বৃদ্ধলোকটি মুচকি হেসে নিজের সিট ছেড়ে দিয়ে ছেলেটির সিটে গিয়ে বসল। আর ছেলেটা ইতির পাশে বসে পড়ল। ইতির এত কিছুর দিকে হুঁশ ছিল না। পেটটা বার বার মোচড় দিয়ে ওকে ক্ষিধের কথা জানান দিচ্ছে। এখন শুধু ভাবছে কনকের কথা না শুনে কি ভুলটাই না করেছে। ভাবতে ভাবতে নিজের পেটের দিকে তাকাল। তারপর ফোনটা বের করে দেখল কয়টা বাজে। হঠাৎ মনে হল হার্টবিটের শব্দটা বেড়ে গেছে। ও নিজের বুকের বাম পাশে হাত দিল। তারপর মনে হল পাশে বসা বৃদ্ধ লোকটি জিন্স পরেছে। একটু অবাক হয়ে পাশে তাকাতেই ইতি ভয় পেয়ে গেল। বৃদ্ধ লোকটার বদলে দোকানে দেখা হওয়া সেই অদ্ভুত চোখের ছেলেটা সিটে হেলান দিয়ে ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ইতি কাঁপা গলায় বলল, আপনি এখানে!!!!! ছেলেটা হালকা মুচকি হেসে আবার বলল, My Queen. চলবে……
No comments yet