মায়াবতী
#মায়াবতী # তিন এবং শেষ , ভাবি আমি তোমার পায়ে ধরি তুমি কাউকে বলো না আমার আর মাহিমের বিয়ে হয়েছে এক বছর হতে চললো। বাবা জানতে পারলে খুন করে ফেলবে। মোহনা ওর কথা শুনে হা করে আছে। জয়ী কি বলছে পাগলের মতো ! জয়ী মোহনার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলেছে। ছোট ভাবি আমি তোমাকে অনেক অপমান করেছি তোমার যা ইচ্ছে তাই বলো, কিন্তু কথাটা কাউকে বলো না। , এবার মোহনা মুখ খুললো বললো, - দেখো আমাকে এই বাড়ির কেউ পছন্দ করে না এটা তুমি ভালো করে জানো। আমার কিছু করার নেই তুমি যা ভালো বোঝ করো। - ভাবি আমি জানি তুমি আমার উপরে রেগে আছো। আমি তোমার ছোট বোনের মতো আমার উপরে তুমি রেগে থেকো না। একটা কিছু করো ভাবি! - ঠিক আছে তুমি ঘুমাও আমি দেখছি কি করা যায়। , মোহনা চিন্তা করতে লাগলো কি করা যায়। কথাটা রাজ কে জানাতে হবে। কিছু হবার আগেই। সারা রাত মোহনা চিন্তা করতে লাগলো কিভাবে সমাধান করা যায়। সকালে মোহনার লাল চোখ দেখে রাজ জিজ্ঞেস করলো, - মোজনা তোমার শরীর খারাপ? -কই নাতো কেন? -তোমার চোখ লাল কেন জ্বর আসেনি তো? - আমার কিছু হয়নি আপনার চিন্তা করতে হবে না। মোহনার কথা শুনে রাজ আর কিছু বললো না। , জয়ীকে মোহনা বলে দিয়েছে তুমি সাবধানে থেকো কেউ যেন জানতে না পারে। পরের দিন মোহনা শ্বাশুড়িকে সব খুলে বললো। তিনি সব শুনে হায় হায় করতে লাগলো। মোহনা বুঝিয়ে বললো, - মা আপনি চিন্তা করবেন না। আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছু হয় না। আর ওদের অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ওদের সাহস হয়নি কিছু বলার। তাছাড়া জয়ী এখন মা হতে চলেছে যেভাবে হোক বাবাকে রাজি করাতে হবে। - ছোট বউমা তুমি তোমার শ্বশুড় কে চেনো না। কিয়ামত ঘটিয়ে ফেলবে। আর বেশি ভয় হচ্ছে বড়ো দুই বউ নিয়ে জানতে পারলে সারা বাড়িতে ঢোল বাজিয়ে ছাড়বে। - মা আপনি কোনও চিন্তা করবেন না। আমি ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না। আপনি এখন জয়ীকে এই নিয়ে কিছু বলবেন না। এমনিতেই ও অনেক টেনশনে আছে। -ঠিক আছে মা আমি বলবো না। আমার মেয়ে কেন এমন করলো আমাকে বলতে পারতো আমি ওর বাবাকে রাজি করাতাম। এখন কি হবে। -মা আপনি এভাবে ভেঙে পড়বেন না আল্লাহ ঠিক একটা উপায় করবেন। , বড়ো দুই বউ নিজদের মতো থাকতে লাগলো। মোহনার সাথে তেমন কথা বলে না। মোহনা ও নিজের মতো থাকে। বাকিটা সময় মোহনা জয়ীর সাথে অথবা শ্বাশুড়ির সাথে গল্প করে কাটায়। জয়ীকে শান্তনা দেয় ধৈর্য ধরতে। , একদিন তাজুল ইসলাম নামায শেষে বাড়িতে এলেন। কিন্তু শরীর টা ভালো লাগছে না। কেমন যেনো বমি বমি ভাব। এসেই বিছানায় শুয়ে পড়লেন। মোহনা শ্বশুড় আসার আগেই প্রতিদিনের মতো খাবার রেডি রাখলো কিন্তু তিনি যখন ঘরে চলে গেলো মোহনার সন্দেহ হলো বাবার শরীর ঠিক আছে তো? ও তাড়াতাড়ি করে তাজুল ইসলামের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো যেয়ে দেখতে পেলো ওনি হড়হড় করে বমি করছে। মোহনা ভয় পেয়ে গেলো কি করবে। ওদিকে শ্বাশুড়ি বাড়িতে নেই ছোট বোনের বাড়িতে গেছে। মোহনা বড়ো দুই জাল কে তাড়াতাড়ি ডাকতে গেলো সব শুনে দুই বোন বললো, - এতে এতো লাফালাফির কি আছে মানুষের মাঝে মাঝে বমি হতেই পারে। একটু পর ঠিক হয়ে যাবে। , মোহনা আর কিছু না বলে রাজ কে ফোন করে আসতে বললো। জয়ীকে সাথে নিয়ে শ্বশুড়ের কাছে গেলো। সব কিছু ধুয়ে পরিস্কার করলো। এর মধ্যে রাজ চলে আসলো। তাজুল ইসলাম কে হাসপাতালে তাড়াতাড়ি করে নিয়ে গেলো। ওখানে নিলে ডাক্তার বললো উনার পেটে পয়জন ঢুকেছে ঠিক হয়ে যাবে। হাসপাতালে নেওয়ার পর কয়েকবার বমি হলো। মোহনা সব সময় ডাক্তারের সাথে সাথে থাকছে। কখন তাজুই ইসলামে কাছে কখনও ডাক্তারের কাছে। রাজের মাকে ও খবর দেওয়া হয়েছে তিনি এসেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। , মোহনা শান্তনা দিতে লাগলো। বললো কিছু হবে না আল্লাহ আছেন সাথে।তাজুল ইসলামের পেট ওয়াশ করানো হলো স্লাইন চলছে। বড়ো দুই বউ ও এসেছে। তারা এসেই এমন ভাব করতে লাগলো যেন তাদের মতো ভালো মানুষ আর নেই। , এখন আগের থেকে অনেক সুস্থ তাজুল ইসলাম । মোহনা এখন আর হাসপাতালে আসছে না।যদি শ্বশুর বলে তুমি এখানে কেন এসেছো তখন কি বলবে এই ভয়ে। বড়ো দুই বউ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভালো সাজতে লাগলো। , দুই দিন পর তাজুল ইসলাম বাড়িতে এলেন। এখন অনেক সুস্থ। মোহনা শ্বশুড়ের সামনে এলো না।দুর থেকে দেখে চলে গেলো। পরের দিন সবাই দুপুরে খেতে বসলো। এমন সময় তাজুল ইসলাম বললেন, - রাজের মা ছোট বউমা কে ডাকো।আমাদের সাথে খাবে। সবাই তাজুল ইসলামের কথা শুনে মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো। তিনি আবার বললেন, ,- -কি হলো ডাকো। , মোহনা কাছেই ছিল। জয়ী তাড়াতাড়ি করে মোহনা কে নিয়ে আসলো।মোহনা আসতেই তিনি উঠে গিয়ে মাথায় হাত রেখে বললেন, - আল্লাহ অনেক ছোট থাকতে আমার মাকে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। আজ এতো গুলো বছর পর আবার ফিরিয়ে দিলেন। মাগো সত্যি তুই রত্ন। যাকে আমার ছোট ছেলে খুঁজে এনে দিয়েছে আমার কাছে। , তোমরা সবাই অবাক হচ্ছো কেন এমন কথা বলছি কারণ একজন সন্তান ই তাঁর মাকে চিনতে পারে। মেয়েটা এই বাড়ির লক্ষী আর এই লক্ষীকে আমি চিনতে ভুল করেছি। মোহনা ছোট বাচ্চাদের মতো কাঁদতে লাগলো। রাজের চোখে ও পানি। মোহনা পেরেছে বাবাকে খুশি করতে। , সেদিন হাসপাতালে বসে রাজের বাবা বলেছিল, -জানো রাজের মা, আমি এতোদিন রত্ন ছেড়ে কাচের পিছনে ছুটেছি। ছোট বউমা কালো হতে পারে কিন্তু একটা লক্ষী। আমি হাসপাতালে না এলে বুঝতে পারতাম না মেয়েটা কতোটা কর্তব্য পরায়ণ।ও আমার মন জিতে নিলো। আর কেউ ভালোবাসুক বা না বাসুক তাতে কোনও সমস্যা নেই। ও যে আমার মা। আমি ওকে আগলে রাখবো। , রাজের মা ও খুশিতে কাঁদছে। বড়ো দুই বউ হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে। মোহনা জিতে গেলো একটা কালো পেত্নী হয়ে ও।রাগের সাথে ওখান থেকে চলে গেলো। , সবাই এখন খুব খুশি। মোহনা আরো ভালো করে সংসারে মন দিলো। সবই ঠিক এখন শুধু জয়ীর সমস্যা। , সেদিন রাতে মোহনা রাজের কাছে সব কিছু বললো। রাজ বললো, - আমার ভাবতে ও কষ্ট হচ্ছে জয়ী কেন এমন করলো। - আল্লাহ কপালে যা লিখে রেখেছে তাই হয়েছে। এখন এর সমাধান বের করতে হবে। - তুমি বুঝতে পারছো বাবা কোনো দিন মেনে নেবে না। - আচ্ছা আপনি যখন আমাকে বিয়ে করেছিলেন কেউ রাজি ছিল? রাজ হেসে দিয়ে বললো, - তোমার সাথে কথায় কে পারবে। তুমি যখন আগের থেকে জানো সমাধান ও নিশ্চয়ই বের করে রাখছো। - আজ রাতে আমি আপনি আর মা বাবার ঘরে যাবো কথা বলতে তাড়াতাড়ি রাতে চলে আসবেন। - আপনার হুকুম শিরোধার্য। এই কথায় দুইজনই হেসে দিলো। , রাতে তিন জন তাজুল ইসলামের ঘরে বসে আছে। বাইরে জয়ী কান পেতে আছে কি বলে বাবা শোনার জন্য।রাজের মায়ের বুক কাপছে। অনেকটা জোর করে মোহনা ধরে এনেছে। তাজুল ইসলাম তিন জনকে এক সাথে দেখে একটু অবাক হলো। বললো, - -কি ব্যাপার তিনজন এক সাথে । - আপনার সাথে গল্প করতে এলাম বাবা। তাজুল ইসলাম অনেক গল্প করতে লাগলো। তার ছোট বেলার গল্প বাবা মায়ের গল্প। মোহনা কিভাবে শুরু করবে ভাবতে লাগলো। সবার বুক কাঁপছে। হটাৎ করে মোহনা বললো, -বাবা একটা কথা বলবো? -হ্যা বলো তখন থেকে আমি একাই বকে চলছি।( হা হা হা) - আসলে বাবা জয়ীর কথা বলছিলাম। - কেনো জয়ী কিছু করেছে তোমার সাথে? - না না বাবা, আসলে বাবা আমার হাতে খুব ভালো একটা ছেলে আছে জয়ীকে দেখে ওদের খুব পছন্দ হয়েছে। অনেক ভালো পরিবার বাবা। খানদানি বংশের ছেলে। ওদের খুব ভালো মানাবে। আপনি যদি রাজি থাকেন ছেলের পরিবার থেকে জয়ীকে দেখতে আসবে। , কথা শেষ হতেই ঘরে সবাই চুপ করে আছে। তাজুল ইসলামের উওর শুনবার জন্য। বাইরে জয়ী আল্লাহ আল্লাহ করছে। মোহনা মনে মনে আল্লাহ কে ডেকে যাচ্ছে। তাজুল ইসলাম কিছু সময় পর বললেন, - এই না হলে মা। সন্তান বলার আগেই সব বুঝতে পারে। আমি ও কিছু দিন ধরে ভাবছি এই তিন গাধা কে বলবো জয়ী বড়ো হয়েছে তোদের কোনো চিন্তা আছে ওকে নিয়ে। ঠিক আছে মা ওদের আসতে বলো আমি নিজেই ওদের সাথে কথা বলবো। , সবাই ভিষণ খুশি। তাজুল ইসলাম এতো তাড়াতাড়ি করে রাজি হবেন কেউ ভাবতে ও পারেনি।মোহনা বাইরে আসতেই জয়ী জড়িয়ে ধরলো। বললো, - তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা আমার কাছে জানা নেই কিন্তু আজ তুমি আমার মায়ের পরে জায়গা করে নিলে। -সব কিছু করার মালিক আল্লাহ, ।ওইযে উপরে একজন বসে আছেন তাঁর কাছে শুকরিয়া আদায় করো। , রাতে রাজ শুয়ে শুয়ে ছটপট করছে। মোহনা এখনও আসে নি।তাজুল ইসলামের ঘরে সবার ঘরে গল্প করছে। ওকে জড়িয়ে না ধরলে রাজের ঘুম আসেনা।অনেক অভিমান নিয়ে শুয়ে রইলো। একটু পর মোহনা এসে বুঝতে পারলো রাজ রেগে আছে। পিছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরে বললো, - বাবার সাথে গল্প করতে করতে দেরি হয়ে গেছে সরি। -লাগবে না সরি যাও। -ওমা! কি রাগ সাহেবের। ঠিক আছে জয়ীর কাছে গিয়ে ঘুমাই। এই বলেই চলে যেতে লাগলো। রাজ হাত টেনে ধরে বললো,- - আমাকে ছেড়ে গেলে খুন করে ফেলবো। তুমি জানোনা তোমাকে ছাড়া আমার ঘুম আসেনা। -জয়ীর বিয়ে নিয়ে কথা বলছিলাম। জানো বড়ো দুই ভাইয়া ও রাজি। - ভালো তো শেষ মেষ ঘটকালি শুরু করে দিলে। -আপন মানুষের জন্য একটু আধটু করতে হয়। - তাই বুঝি তাহলে আমার জন্য ও একটা করো। - ওমা কেনো? - কি আর করার আমার বউ ঘটকালি করলে আমাকে কে দেখবে? এই কথা শুনতেই মোহনা রাজ কে বুকে কিল দিতে লাগলো। রাজ হেসে দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলো।রাজের ভালোবাসার কাছে মোহনা হারিয়ে যেতে লাগলো। সমুদ্রের অতল গভীরে। , (সমাপ্ত)
No comments yet