শিশু নির্যাতন পর্ব 2
১। "যে ব্যক্তির প্রাক্তন তার বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের দায়ে থানায় রিপোর্ট করেছিলেন তিনি-ও বলতেন- "আমার বাবা মা আমাকে ছোটবেলায় মারধোর করতেন এবং এতে আমি একেবারেই ব্যথিত নই!" ২। "আমি যখন শিশু ছিলাম তারা আমাকে একা কাঁদতে রেখে চলে যেতেন রুম থেকে যতক্ষন না আমার ঘুম এসে যেতো এবং এটা এতটাই খারাপ ছিল যে আমি এর থেকে এখনো বের হতে পারিনি।" - বলছেন সেই পুরুষটি যিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোস্যাল নেটওয়ার্কিং করেন, যে কারণে তার রাতে ঘুম হয় না একদম! ৩। “তারা আমাকে ছোটো বেলায় শাস্তি দিতেন এবং আমি ঠিক আছি!” - বলছেন সেই মানুষটি, যে নিজের করা ভুলের শাস্তি হিসেবে নিজেকে নিজেই নিজে ঘৃণা করতেন। ৪। "বাল্যকালে তারা আমার উপর অত্যাচারী আচরণ করতেন এবং আমি 'শিক্ষা' নামক মানসিক দুর্বলতায় ভুগি!" - বলছেন সেই মহিলা যে এখনো বুঝতে পারে না কেনো তার সঙ্গীরা বেলাশেষে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে। ৫। "আমি যখন ছোটবেলায় দুরন্তপনা করতাম তখন আমার বাবা আমাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য একা ঘরে আটকে রাখতেন। আর আমি এটার প্রশংসা করি!" - বলছেন সেই মহিলা যে মাত্রাতিরিক্ত দুঃশ্চিন্তায় ভুগছেন এবং বুঝতে পারে না কেনো সে ছোটো কোন জায়গায় আবদ্ধ থাকতে ভয় পায়। ৬। "আমি যখন ছেলেমানুষী করতাম তখন আমার বাবা-মা আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার বা অচেনা কাউকে দিয়ে দেবার ভয় দেখাতেন এবং আমি এতে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়িনি!" - বলছেন সেই মহিলা যে একটু ভালোবাসার জন্য আকুল হয়ে থাকে এবং বারবার বিশ্বাসঘাতক সঙ্গীদের কে ক্ষমা করে দিচ্ছে যাতে সে একাকি না হয়ে যায়। ৭। "আমার বাবা - মা আমাকে কেবলমাত্র চোখের ইশরাতেই নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং দেখুন তার ফলাফল কতো ভালো এসেছে!" - বলছেন সে নারী যে নির্ভয়ে কখনো কোনো "ক্ষমতাসম্পন্ন" লোকের সাথে চোখ চোখ মেলাতে পারেন না। ৮। "ছোটবেলায়, আমি খুব কঠিন নিয়মে বড়ো হয়েছি আর আজ আমি একজন ভালো মানুষ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক!" - বলছেন সে ব্যক্তি যার প্রতিবেশী তার বিরুদ্ধে মাতাল হয়ে স্ত্রীকে মারার ও চেঁচামেচি করার অভিযোগ তুলেছে। ৯। "আমার বাবা মা আমাকে জোর করে ক্যারিয়ার গড়তে পারি এমন বিষয়ে পড়তে বাধ্য করেছিলেন, আর এটা কতটা ভালো হয়েছে তাতো আপনারা দেখতেই পারছেন!" - বলছেন সেই ব্যক্তি যে কি না প্রত্যেকদিন শুক্রবারের মরিয়া হয়ে স্বপ্ন দেখে কারণ সে যে কাজ করছে তা তার মনঃপুত নয়। ১০। "আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার সব খাবার শেষ পর্যন্ত আমাকে টেবিল থেকে উঠতে দেওয়া হতো না এবং আমাকে জোর করে খাওয়ানো হতো, তারা সহনশীল বাবা-মায়ের মতো ছিলেন না!" - বলছেন সেই মহিলা যে বুঝতে পারে না কেন সে খাদ্যের সাথে স্বাস্থ্যকর একটা সম্পর্ক গড়তে পারে না? কেনই বা সে তার কৈশোরে খাবারের অনীহায় ভুগছিল! ১১। "আমার মা আমাকে তার চেঁচামেচির প্রতি শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছিলেন কঠোরভাবে।" - বলছেন সেই মহিলা যে দিনে পাঁচটি নিকোটিনের ধোঁয়া টানে, নিজের উদ্বিগ্নতা নিয়ন্ত্রণ করতে। ১২। "আমি আমার বাবা-মার প্রত্যেকটা আঘাত এবং শাস্তি কে ধন্যবাদ জানাই কেননা তা না হলে আমার কি হতো আমি জানিনা!" - বলছেন সেই ব্যক্তি যে কখনোই একটা সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেনি এবং যার ছেলে তাকে প্রতিনিয়ত মিথ্যা কথা বলে কারণ তাকে ভয় পায়। ১৩। অতঃপর আমরা এমন একটা জীবনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আমরা দাবি করি যে আমরা ভালো মানুষ এবং কখনো পূর্বে মানসিকভাবে আঘাত পাইনি, কিন্তু বাস্তবিকভাবে, আমরা এমন একটা সমাজে বসবাস করি যেটা সহিংসতাপূর্ণ এবং আঘাতপ্রাপ্ত মানুষ দ্বারা পরিপূর্ণ। অনুবাদকের কিছু কথা: লেখাটা অনুবাদ করতে করতে গিয়ে মনের মধ্যে একটা পাথরের মত ওজন মনে হলো, খুব কষ্ট লাগলো। মনে হলো এইতো আমরা সবাই, এইতো বেলাশেষে আমাদের সবার জীবনের অংশবিশেষ! হয়তো কেউ এমনভাবে নিজেকে এর সাথে মিশিয়ে নিয়েছেন এবং মেনে নিয়েছেন যে তাদেরকে প্রাপ্ত বয়সে এসে পূর্বের কথা বোঝানো কষ্ট হবে। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়তবা ভালো কিছু করতে পারব, যদি না আমরা আমাদের অতীতকে সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে পারি এবং আমাদের সন্তানকে ভিন্নভাবে একটা সুন্দর ও সহনশীল ভবিষ্যৎ দিতে পারি। ভালো থাকবেন সবাই, শুভ কামনা।
No comments yet