read.cash Log in
@Ostina1 more from that month

আলোর পথের দিক

রাস্তা পার হবার আগ মুহুর্তেই সামনে দিয়ে একটা বি এম ডাবলিউ কার ঝড়ের বেগে গেলো আর কাঁদা গুলো সব ঝড়ের বেগে এসে পরলো নীহার গায়ে। চাপা বিরক্ত নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলো গাড়িটার দিকে। সকাল থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ায় রাস্তার গর্তে পানি জমেছে সেই সাথে রাস্তা কাঁদাময় হয়ে আছে। আজ একটা ইমপোর্টেন্ট লেকচার ছিলো তার ইংলিশ ক্লাসে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হবার এক সপ্তাহ পরই নীহার বাবা আরফাত করিম নীহাকে একটা ইংলিশ ভার্সিটির কোচিং-এ ভর্তি করিয়ে দিলেন। পরিচিত বলেই ঝামেলা ছাড়াই ভর্তি করাতে পেরেছেন। পুরো নাম নীহারিকা তাসনীম। আর্টস থেকেই পড়ালেখা করছে। নীহার বাবার ইচ্ছে নীহা ইংলিশ নিয়ে পড়বে। তাই এতো তাগাদা দিয়ে ভর্তি করানো। বিরক্তি নিয়ে বাসায় ফিরে গেলো নীহা। নীহাকে ঘরে ঢুকতে দেখে লায়লা খাতুন এগিয়ে এসে বললেন, -- "ফিরে এলি যে?" -- "আর বলো না মা। একটা গাড়ি ঝড়ের বেগে সামনে দিয়ে গিয়ে আমার বোরকা নষ্ট করে দিয়েছে। তাই আজ আর যাবো না।" নীহা রুমে এলো। কাধ থেকে ব্যাগটা রেখে বাথরুমে গেলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরেকদফা বিরক্ত প্রকাশ করলো নীহা। কারণ কাঁদায় তার বোরকা, নেকাব, এমনকি হাত মোজা পর্যন্ত ভরে গেছে। সব ধুয়ে গোসল করে বের হলো নীহা। কোচিং-এ যেতে পারেনি তাই তার বান্ধুবি এশাকে হোয়্যাটসএ্যাপ -এ মেসেজ দিলো, "আজকের পড়া সব আমাকে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিস।" মোবাইলটা রেখেই পড়তে বসে গেলো নীহা। বাবার ইচ্ছে সে পাবলিক ভার্সিটিতে ইংলিশ নিয়ে পড়বে। তাই এতো মেহনত করছে। পরেরদিন ক্লাসে বসে এশার সাথে পড়া নিয়ে কথা বলছিলো নীহা। স্যার রুমে প্রবেশ করলো। সবাই সালাম দিলো, "আসসালামু আলাইকুম সিফাত স্যার।" পড়ানো শুরু করে দিলো সিফাত। এবার সে অনার্স কমপ্লিট করেছে। মাস্টার্স এর পাশাপাশি এই ভার্সিটির কোচিংটা সে চালায়। সিফাত পড়া ধরলো নীহার থেকে। কয়েকটা পারলো কিন্তু কয়েকটা পারলো না নীহা। সিফাত রেগে গেলো। নীহার বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, -- "কাল আমি সবাইকে এই পড়া মুখে মুখে পড়য়েছি আর আজকেই ভুলে গেলে। রাবিস কোথাকার। দাড়াও বলছি। বাসায় গিয়ে পড়োনি কেনো?" -- "কাল আমি আসিনি স্যার।" সিফাত এবার আরো ক্ষেপে গেলো। রেগে বললো, -- "আসোনি কেনো? পরীক্ষায় খারাপ হলেতো আমাকেই দোষারোপ করবে। আর নিজেরা নিজেদের মতো করে কোচিং ফাকি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো।" -- "আমি ইচ্ছে করে ক্লাস মিস দেয়নি স্যার। আমি রাস্তায় বের হওয়ার পর একটা গাড়ি সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁদা ছিটকে এসে আমার বোরকায় পড়েছিলো। তাই আর আসিনি।" -- "তো এমনিতে ড্রেস পড়েই তো আসতে পারতে। পড়ালেখা থেকে বোরকায় কাঁদা বেশি ইমপোর্টেন্ট হয়ে গেছে?" সিফাত কথাটা বলে ঘুড়ে চলে যাচ্ছিলো। মিনমিনে স্বরে উত্তর এলো, -- "জ্বী। পড়ালেখা থেকে আমার পর্দা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।" সিফাত ফিরে দাঁড়ালো। ঝাঝানো স্বরে বললো, -- "কিভাবে বড় হয়ে গেলো?" বিরক্তে কপাল কুচকে গেছে সিফাতের। একেতো কাল আসেনি। আবার পড়াও পারেনি। এখন মুখে মুখে কথা বলছে। মেয়ে বিধায় বেঁচে গেছে। ছেলে হলে ঠাটিয়ে লাগাতো। নীহা একটু উঁচু স্বরেই বললো, -- "কাল যদি আমি মারা যাই কবরে রাখার পর আমাকে জিজ্ঞেস করবে না আমি কতটুকু পড়ালেখা করেছি। আমি কতটা কষ্ট করে ক্লাস এটেন্ড করেছি। আমি কোন উচ্চপদে চারকি করছি। আমি গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট করেছি কিনা? কবরে রাখার সাথে সাথেই আমার থেকে দুনিয়ায় ভালো কি কাজ করেছি সে হিসাব নিবে। পর্দার আমলের হিসাব নেবে। সালাত কয় ওয়াক্ত ত্যাগ করেছি সেই হিসাব নিবে। তাই আমি পর্দাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।" সিফাত চুপ হয়ে গেলো। লক্ষ করলো মেয়েটা খুব গর্ব করেই কথাগুলো বলছে। নীহা আবার বললো, -- "আপনি বলছেন এমনিতেই ড্রেস পরে আসতে। যদি আমি কাল মারা যেতাম? তখন তো সবাই আমাকে দেখতো। ফাতেমা (রাঃ) মৃত্যুর আগে বলে গেছিলেন তাঁকে যেনো রাতে কবর দেয়া হয়। কারণ দিনের বেলা তাঁকে কাফনের কাপড়ে রাখার পরেও বেগানা পুরুষ তাঁর দৈহিক দৈঘ্য প্রস্থ আঁচ করতে পারবে। তাই তিনি বলে গেছেন রাতেই যেনো কবর দেয়া হয়। তিনি জান্নাতের সর্দার হয়ে এই কথা বলে গেছেন যাতে তাঁর বাবার উম্মাতেরা এসব আমল করতে পারে। আমি সেটাই করছি। আর এইজন্য আমার কাছে পর্দা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে কাল।" নীহা নিচের দিকে তাকিয়েই কথা গুলো বললো। সিফাতের মেজাজ এখন একেবারে ঠান্ডা পানি হয়ে গেছেন। নীহা আবার বললো, -- " আপনি, আপনারা আমাকে জঙ্গি, মোল্লা, হুজুরনি, জামাত, শিবির যা ইচ্ছা ভাবতে পারেন। হোয়াটএভার ইউ গাইজ থিং এবাউট মি আই ডোন্ট কেয়ার। আমি আপনাদের কমেন্টকে ভয় পাইনা। আমি কবরের কঠিন আযাবকে ভয় করি।" আর কিছু বললো না সিফাত। নিজের মতো ক্লাস চালিয়ে গেছে। দেখতে দেখতে নীহার ভর্তি পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে এসেছে। সিফাত আর কখনো নীহার সাথে বা কোনো মেয়ের সাথে কথা বলেনি। একদিন শুধু নীহাকে তার বাবা এবং বাসার ঠিকানা জিজ্ঞেস করেছিলো। তখন ব্যাচ শেষ হয়ে গেছে। পরীক্ষা হয়ে গেছে। নীহা তার স্বপ্নের জায়গায় এসেছে। সিফাত এখন শুধু সাতটায় একটায় ব্যাচ পড়ায়। আর দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অফিসে থাকে। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করছে। এবার নীহা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। বেশ ভালোই যায় তার দিন। কিছুদিন আগে একটা বিয়ের প্রপোজাল এসেছে। আরফাত সাহেব প্রপোজালে রাজি। নীহাও অমত করেনি। কারণ তারা বলেছে নীহাকে বিয়ের পর পড়াবে আর ছেলেও মাশাল্লাহ দ্বীন মেনে চলে। নীহা এতেই খুব খুশি। বিয়ের দিন খুব সুন্দরভাবে বিয়ে হলো। নীহা বসে আছে তার স্বামীর বিছানায়। দরজার কেচ কেচ আওয়াজে নীহা একটু নড়েচড়ে বসে। একজন পুরুষ সামনে আসতেই নীহা সালাম দেয়। সেও সালাম নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, -- "অজু আছে তোমার?" -- "জ্বী।" -- "আসো নামাজ পড়ে নেই।" দুজনে নামাজ পড়ে নেয়। নীহার সামনে এসে বসলো তার স্বামী। বসেই জিজ্ঞেস করলো, -- "আমাকে চিনেছো?" নীহা একটু অবাক হলো। কিন্তু সেটা প্রকাশ করলো না। বলল, -- "না। আমাদের আগে দেখা হয়েছে? আপনি আমাকে চিনতেন?" -- " হ্যাঁ। আমি তোমার ইংলিশ স্যার আরহাম সিফাত।" সিফাত মুচকি হাসছে। নীহা চোখ তুলে সিফাতের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো। দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো, - - "স..স্যা..স্যার।" -- "এভাবে তোতলাচ্ছো কেন?" - - "স্যার আপনি?" সিফাত ভ্রু কুচকে তাকালো। বললো, -- "আমি তোমার স্যার নই। এখন থেকে তোমার স্বামী।" -- "আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে?" সিফাত উপরের দিকে তাকিয়ে বললো, - - "হায় আল্লাহ এই মেয়ের দেখছি বুদ্ধি লোপ পেয়েছে।" নীহার দিকে তাকিয়ে বললো, -- "জ্বী আমাদের একটু আগেই বিয়ে হয়েছে। এবং আমি আপনাকে মোহরানা দিয়ে দিয়েছি। এখন আপনি আমার লিগেলি ওয়াইফ।" -- "স্যার।" সিফাত উঠে এসে নীহার কোমড় ধরে কাছে টেনে এনে বললো, -- "স্যার স্যার করছো কেন?" - - "স্যার বাবা হয়ত ভুল করে এখানে বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। আমি বাবাকে বলে দেবো যে আপনি.....।" পুরো কথা শেষ করার আগেই সিফাতের আগ্রাসী ওষ্ঠ মিলিয়ে দেয় নীহার ওষ্ঠের মাঝে। নীহা চোখ খিচে সিফাতের শার্ট খামছে ধরে। একটুপর ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললো, -- "স্যার এসব ঠিক হচ্ছে না।" -- "আর একবার স্যার বললে খবর আছে তোমার।" নীহা বোকার মতো তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো, - - "তো কি বলবো?" -- "নাম ধরে ডাকবে। সিফাত বলে।" -- "স্যারের নাম ধরে ডাকতে নেই।" নীহা আতঙ্কে মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে পড়েছে। আর সিফাত সেটা উপভোগ করছে। এই মেয়ে এতোটা বোকা সেটা তার জানা ছিলো না। মনে মনে হাসলো। সিফাত নীহাকে কোলে তুলে নিলো। গম্ভীর হয়ে বললো, - - "তোমার খবর করতে হবে দেখছি। এভাবে মানবে না।" নীহারের উপর পুরো শরীরের ভার ছেড়ে দিলো। নীহা আবার বললো, -- "স্যার এসব ঠিক হচ্ছে....।" আর কিছু বলতে পারলো না। নীহার খবর করতে ব্যস্ত সিফাত। সিফাতের ভালোবাসায় নীহা বোকা হয়ে গেলো। পাঁচ বছর পেরিয়েছে দুজনের বিয়ের। একটা মেয়ে হয়েছে। নাম রেখেছে স্নেহা জান্নাত। মেয়েটা এখন ক্লাস টু তে পড়ে। এখনো মাঝে মাঝে মা মেয়ে দুজনে মিলে সিফাতকে স্যার বলে ডেকে মাথা খারাপ করে দেয়। মেয়েকে ধমক দিলে মেয়ে হেসে কুটিকুটি হয়ে যায়। আর নীহাকে তো সিফাত ভালোবাসার সাগরে ডুবিয়ে রাখে সেদিন। মেয়েকে ঘুম পারিয়ে নীহা রুমে এলো। বারান্দায় বসতেই সিফাত কাধে মাথা রাখলো নীহার। ফিরে গেলো সেই আগের স্মৃতিতে। নীহা জিজ্ঞেস করলো, -- "আচ্ছা আপনি আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছেন কেনো?" -- "সেদিন বাসায় এসে তোমার বলা কথাগুলো অনেক ভেবেছি। তারপর হাদিসের বই, কিছু আলমদের লেকচার শুনেছি। সেদিন বুঝলাম আমরা নামে মুসলিম। শুধু মসলিমের একটা ট্যাগ লাগিয়ে রেখেছি। অথচ প্রকৃত মুসলিম নই।" নীহা হাসলো। সিফাত জিজ্ঞেস করলো, -- "আচ্ছা তুমি সেদিন আমার দিকে না তাকিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলে কেনো?" -- "ইসলামে বলেছে বেগানা নর- নারীর বিপরীত লিঙ্গের দিকে যদি ভুলবশত চোখ পরে যায় সেটা গুনাহ নয়। কিন্তু যদি কেউ সৌন্দর্য উপভোগের জন্য বারবার সেই নর বা নারীর দিকে তাকায় সেটা হলো চোখের জেনা (পরকিয়া)। আর রাসূল (সাঃ) যুবক এবং যুবতিদের এই জেনা থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন। অথচ এখনকার সমাজে চোখে চোখে প্রেম করে। প্রথম দেখায় প্রেম হয়ে যায়। লাভ এট ফার্স্ট সাইট হয়ে যায়। অথচ তারা জানে না যদি ভালোলাগার দৃষ্টি নিয়ে একজন গায়েরে মাহরাম অপর জনের দিকে তাকায় তা হলো শয়তানের তীর থেকে ছোড়া বিষ মাখানো তীর।" -- "সেদিন তোমার সেই কথাগুলো আমার জীবনে আলোর পথের দিক হিসেবে কাজ করেছে। নিজেকে প্রকৃত মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলার চেষ্টায় লেগে যাই। আর যার জন্য এই পথে আসা তাকে কি করে ভুলে যাই। তাই তাকেও আমার করে নিয়েছি। যাতে আমাকে সাহায্য করতে পারে।" নীহা মুচকি হাসলো। সিফাত নীহাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে কপালে উষ্ণ পরশ দিলো। বললো, -- "তুমি হলে আমার আলোর পথের দিক।" -- "তাই বুঝি স্যার।" -- "মনে হচ্ছে আজকে খুব বেশি ভালোবাসা চাও। এভাবে না বলে সোজাসাপটা বললেই হতো। ভালোবাসা দিয়ে দিতাম। আমার সব ভালোবাসা তো তোমার জন্যই।" - - হুহ ঢং। শুনুন আমি মাত্র উছিলা ছিলাম। শুকরিয়া আল্লাহকে করুন। তিনি আপনাকে ভালোবাসেন বলে হেদায়েত দান করেছেন।" -- "সেটা তো করি সবসময়। এখন তোমাকে একটু ভালোবাসতেই চাই। আসো আসো।" -- "না।" -- "উহ! বললেই হলো যেনো।" -- "স্যার।" -- "হুশ।" -- "সমাপ্ত।" -- @TheRandomRewarder

No comments yet

Log in to join in Reading is open to everyone. Replying needs an account.