read.cash Log in
@Luma

সুয়েজ খাল

প্রোফেশনটা নাবিক হ‌ওয়ার সুবাদে সুয়েজ খাল অতিক্রম হ‌ওয়ার সুযোগ হয়েছে।তাই ভাবলাম সুয়েজ খাল সম্পর্কে কিছু লিখে ফেলি। মিশরের একটি প্রবাদ হচ্ছে, "আপনি পৃথিবীর যেখানেই থাকুন, আপনি সুয়েজ খাল দ্বারা উপকৃত হচ্ছেন।" গোটা পৃথিবীতে সুয়েজ খাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার করনেই এই প্রবাদের সৃষ্টি।কেননা এটি ভূমধ্যসাগর‌ ও লৌহিত সাগর যুক্ত করার মাধ্যমেই ইউরোপ আমেরিকা ও আফ্রিকাকে এশিয়ার সাথে যুক্ত করেছে।ফলে ইউরোপ আমেরিকা এবং আফ্রিকার পন্যবাহী জাহাজ এই পথেই যাতায়াত করে।আর এই খাল নির্মানে প্রান গিয়েছে লাখ লাখ মানুষের। সুয়েজ খালের প্রকৃত নাম "হে সুয়েজ ক্যানেল"। আরবীতে এর নাম "কানাত আল সুয়াইস"। মিশরের সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত একটি কৃত্রিম সামুদ্রিক খাল।যা ভূমধ্যসাগরকে লৌহিত সাগরের সাথে যুক্ত করেছে।প্রায় ৪ হাজার বছর পূর্বে মিশরের অধিপতি ফারাও নেকো লক্ষাধিক দাস নিয়ে শুরু করে ন খাল কাটা। কিন্তু কুসংস্কারের কারনে খাল কাটা বন্ধ করেন তিনি।এরপর নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিশর অভিযানে আসার পর ভূমধ্যসাগরকে লৌহিত সাগরের সাথে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের চেয়ে লৌহিত সাগরের উচ্চতা ১০ মিটার বেশি থাকায় খরচ বেশি হবে বিধায় খাল খননের চিন্তা বাদ দেয়া হয়। এরপর ১৮৫৪ সালে মিশরীয় শাসক সারিদ পাশার অনুমতি পেয়ে বিভিন্ন দেশের প্রকৌশলীরা মিলে নকশা তৈরি করেন। সুয়েজ খাল খননের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন ফরাসি প্রকৌশলী "ফারদিনান্দ দি লেসেন্স"।এরপর ১৮৫৯ এর এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয় এর খনন।১০ বছর খনন কাজের পর ১৮৬৯ এর নভেম্বর মাসে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।১০ বছরে প্রান হারায় ১লাখ ২০ হাজার শ্রমিক। মিশরীয়রা অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হলে ব্রিটিশরা ৪০ লাখ পাউন্ড স্টার্লিং এর বিনিময়ে সুয়েজ খালের বেশিরভাগ শেয়ার কিনে নেয়। ব্রিটিশ শিল্পপতি রথচাইল্ড এতে বিনিয়োগ করেন। এভাবেই চতুরতার সাথে ব্রিটেন সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণে আনে।১৯২২ সালে মিশর স্বাধীনতার পর থেকে সুয়েজের ওপর ইঙ্গ ফরাসি নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় আধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। মিশরের সুয়েজ খাল জাতীয় করনের দাবিতে গণ আন্দোলনের শুরু হয়। যার নেপথ্যে মিশরের ইসলাম পন্থী রাজনৈতিক দল "ব্রাদারহুড" নেতৃত্ব দেয়। ব্রিটিশ সরকারের চাপে মিশরের সরকার হাসান আল বান্নাকে গ্রেফতার করে।তবে গণ আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সেনা প্রত্যাহার করে। এরপর আবার গণ আন্দোলনের মুখেই ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই সুয়েজ খাল জাতীয় করনের ঘোষনা দেয় মিশরীয় শাসক "গামাল আবদেল নাসের"। সুয়েজ খাল জাতীয় করনের পর ক্ষিপ্ত হয়ে ইঙ্গ ফরাসি ইজরাইল বাহিনী সম্মিলিত হামলা চালায় মিশরের উপর। ২৯ অক্টোবর ইসরাইল সিনাই উপদ্বীপে এবং ৩১ অক্টোবর কায়রোতে বিমান হামলা চালায় ইঙ্গ ফরাসি বাহিনী। মিশরের উপর এই অন্যায় হামলার প্রতিবাদ জানায় সারা বিশ্ব। এবং মিশরের বন্ধু রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন জানায় হামলা বন্ধ না করলে পাল্টা হামলার হুমকি দেয়। বৈশিক প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে ১২ নভেম্বর ১৯৫৬ তারিখে হামলা বন্ধ করে ব্রিটিশ ফরাসি ইজরাইল বাহিনী।এই হামলার করনে সুয়েজ খালে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৭ সালের এপ্রিলে তা আবার চালু হয়।১৯৬৭ সালে আরব ইজরাইল যুদ্ধের কারনে সুয়েজ খাল আবারও বন্ধ হয়ে যায়।১৯৭৫ সালে মিশর ইজরাইল শান্তি চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ ৮ বছর পর তা আবারও খুলে দেওয়া হয়। এই খাল তৈরির আগে কোনো জাহাজ ইউরোপ থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় আসতে হলে আফ্রিকা মহাদেশের গ্রেট হোপ বা উত্তমশা অন্তরীপ ঘুরে আসতে হতো।যার ফলে ভারত উপমহাদেশ থেকে ইউরোপে যেতে সময় লাগতো ৪০-৪৫ দিন। এইখালের কারনে দুই মহাদেশের দুরত্ব ৭ হাজার কিলোমিটার কমে গিয়েছে। আগে যেখানে লাগতো ৪০-৪৫ দিন এখন সেখানে লাগে ২০ দিন। বর্তমানে এখানে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার বাইপাস খনন করা হয়েছে যার ফলে জাহাজ গুলোর অপেক্ষা সময় ১৮ ঘন্টা থেকে ১২ ঘন্টায় এসেছে। ধারনা করা হচ্ছে ২০২৩ সালের মধ্যে দৈনিক ৯৭ টি জাহাজ যাতায়াত করবে এই খাল দিয়ে।এবং মিশরের অর্থনীতিতে যোগ হবে ১৩২০ কোটি ডলার। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী এই খালের ভিতর দিয়ে যেতে পারবে যেকোনো যুদ্ধ জাহাজ। আজ এখানেই শেষ। ইনশাআল্লাহ আবার‌ও নতুন কোনো দেশ বা জায়গা নিয়ে লিখব উৎসাহ পেলে।আমি এখন আমেরিকা থেকে ইন্ডিয়ায় যাচ্ছি। দোয়া করবেন যেন ভালোভাবে পৌঁছাতে পারি। ধন্যবাদ 😊

2 comments

Log in to join in Reading is open to everyone. Replying needs an account.