#হৃদয়ে_রয়েছো_নিভৃত
কলেজে যাওয়ার জন্য বের হবো, তখনই আমার পথ আটকে দাঁড়ালো মা । — “কোথায় যাচ্ছিস না খেয়ে?” — “কোথায় যাচ্ছি জানো না?” — “জানি । যেখানে ইচ্ছা সেখানে যা তুই । কিন্তু অবশ্যই কিছু খেয়ে যেতে হবে ।” আমি আর কথা বাড়ালাম না । ডাইনিং টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা স্যান্ডউইচগুলো থেকে একটা স্যান্ডউইচ হাতে তুলে নিলাম । খেতে খেতেই বেরিয়ে পড়লাম । মা পিছু থেকে জোরে চিৎকার করে বকাঝকা করতে লাগলো আমাকে, কিন্তু আমি গায়ে মাখালাম না । এতো বড় একটা মেয়েকে কেউ বকা দেয়? ফ্ল্যাটের বাইরে এসে খেয়াল করলাম, মোবাইল ফোনটা রেখে এসেছি । নিজের উপর নিজেরই রাগ হলো । ঘুরে দাঁড়িয়ে আবারও চলে এলাম আমাদের এপার্টমেন্টে । দরজা খোলা দেখে বিরক্ত হলাম । মা এতোটা কেয়ারলেস কী করে হয়? দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই মেজাজটা বিগড়ে গেল আমার । সেন্টার টেবিলে এত্তো এত্তো ছবি । সোফায় বসে মা-বাবা দুজনে মিলেই ছবিগুলো দেখছেন । — “তোমরা আবার শুরু করেছো?” রেগে বললাম আমি । দুজনেই চমকে তাকালো আমার দিকে । হঠাৎ করেই আমাকে আশা করেননি তারা । আমি আবারও বললাম, — “বাহ! আমার সামনে এসব করতে না করেছি বলে, আজ-কাল আমার আড়ালে করতেও শুরু করেছো?” বাবা সোফা ছেড়ে উঠে এগিয়ে এলেন আমার কাছে । — “রেগে যাস না, মা! আর কত......” বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, — “এখনই আমার ইচ্ছে নেই ।” মা এবার তেড়ে এলেন । — “তো কখন তোর বিয়ে করতে ইচ্ছে হবে, শুনি? বুড়ি হয়ে গেলে?” আমি মায়ের কথার জবাব না দিয়ে টেবিলের উপর থেকে সব ছবি মেঝেতে ফেলে দিলাম । এরপর নিজের রুম থেকে মোবাইল ফোনটা নিয়ে তাদের দিকে আর না তাকিয়ে চলে এলাম সেখান থেকে । রিকশা কলেজের সামনে থামতেই নেমে গেলাম আমি । ভাড়াটা মিটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই শুনলাম, কয়েকজন শিস বাজাচ্ছে । ভ্রু কুঁচকে ডান পাশে তাকালাম আমি । কয়েকজন ফাজিল ছেলেদের কাজ এটা । আমাকে দেখে শিস বাজাচ্ছে তারা । আমি কিছু বললাম না ওদের । কলেজের ভেতরে চলে গেলাম । ফার্স্ট ইয়ারে প্রথম পিরিয়ডেই আমার ক্লাস । ক্লাসে যাওয়ার আগে জানালার বাইরে থেকেই শুনলাম, ভেতরে একজন ছাত্র সবাইকে আমার ব্যাপারে আগেভাগেই সতর্ক করে যাচ্ছে । আমি নাকি খুব স্ট্রিক্ট, পড়াশোনা ছাড়া আমার ক্লাসে আর অন্য কোনো কিছুই চলবে না, হেন তেন । আমি মুচকি হেসে ক্লাসে ঢুকলাম । সবাই আমাকে দেখেই চুপ হয়ে গেল । ওদের বসতে বলে একবার পুরো ক্লাসে নজর বুলালাম । তখনই খেয়াল করলাম ঐ নতুন ফাজিল টাইপ ছেলেগুলোকে । আমাকে দেখেই তাদের মুখ ছাই-বর্ণ হয়ে গেছে । আমি ইশারায় দাঁড়াতে বললাম ওদের । ওরা দাঁড়ালো । ওদের এমন কাঁচুমাচু ভাব দেখে মনে মনে হাসলাম আমি । কিন্তু মুখটা অসম্ভব রকমের গম্ভীর করে বললাম, — “টিচারকে দেখে শিস বাজানো কি তোমাদের খুব পছন্দের?” কেউ কিছু বলতে পারলো না প্রথমে । আমি ওদের দিকে এগোতে ধরলে ওদের মধ্যে থেকে একজন সাহস করে বললো, — “ম্যাম আপনাকে দেখে আসলে মনেই হয়নি, আপনি আমাদের টিচার ।” আমি বললাম, — “তার মানে তুমি বলতে চাইছো যে, টিচারকে ছাড়া বাকি সব মেয়েকে দেখেই শিস বাজানো, তাদের টিজ করা, এগুলো সব ভালো একটা কাজ?” এবার আর এর জবাবে কেউ কিছু বলতে পারলো না । সেই ছেলেটাই এবার বললো, — “সরি ম্যাম!” — “উহু । অপরাধ করেছো । তাই এর জন্য শাস্তিও পেতে হবে ।” শাস্তির কথা শুনে ওরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো । বোঝাই যাচ্ছে, এখন থেকে তারাও আমাকে সমঝে চলবে । ব্রেক টাইমে আমি মাঠে এসে দাঁড়ালাম । একটু দূরেই বাচ্চারা খেলছে । এইটা একইসাথে স্কুল এবং কলেজ । ফলে বাচ্চাদের খেলা দেখতে দেখতে ভালোই সময় কাটে আমার । বাচ্চাদের থেকে চোখ সরিয়ে মোবাইল অন করলাম । নোটিফিকেশনে বাবার অনেকগুলো মিসড কল দেখলাম । নিশ্চয়ই আমার রাগ ভাঙাতে ফোন করেছিল । আমি বুঝে উঠতে পারি না, এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করার কী আছে! বিরক্তিকর জাস্ট! বাসায় এসে সোজা নিজের রুমে ঢুকলাম । ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই মাকে দেখলাম আমার বিছানায় বসে থাকতে । টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে মাকে বললাম, — “কিছু বলবে মা?” — “তুই বিয়ে করতে কবে রাজি হবি?” — “যেদিন মন চাইবে ।” আমার স্বাভাবিক উত্তর । মা এবার চোখ রাঙিয়ে তাকালেন আমার দিকে । টাওয়েলটা বারান্দায় গিয়ে নেড়ে দিয়ে আবারও ভেতরে এসে মায়ের পাশে বসলাম আমি । জিজ্ঞেস করলাম, — “এতো তাড়া কীসের?” — “তাড়া আছে । বুড়ি হয়ে যাচ্ছিস তুই ।” আমি বললাম, — “আচ্ছা একটা কাজ করো । তোমরা আমার জন্য ছেলে চুজ করতে থাকো আমার যাকে পছন্দ হবে, তার সাথেই বিয়ে ঠিক করবে ।” মা খুশি হলেন খুব আমার কথা শুনে । মায়ের মুখ দেখেই বুঝতে পারলাম তা । তিনি খুশি হয়ে বললেন, — “সত্যি বলছিস?” — “ হ্যাঁ । তিন সত্যি ।” মা চলে গেলে আমি বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম । মনে মনে হাসলাম আমি । মা এতো বোকা কেন? এতো ইজিলি বিশ্বাস করে ফেললো আমার কথা? এরপর কয়েক দিন বাবা-মা মিলে একটু পর পর আমার জন্য একটা করে ছেলে বাছাই করে আনতেন । আমার কাউকেই পছন্দ হতো না দেখেও তারা হাল ছাড়ছিলেন না । মা আমার চালাকি ধরতে না পারলেও বাবা মনে হয় ধরতে পারলেন । কেন জানি সেটাই মনে হলো আমার । বাবা এরপর আর বিয়ে নিয়ে কথা বললেন না । এরপর মা-ও কিছুদিন চেষ্টা করে অবশেষে হাল ছাড়লেন । আমিও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম । অন্তত এখন আর কেউ কানের কাছে বিয়ে বিয়ে করবে না । একদিন রাতে বিছানায় শুয়ে অনলাইনে ঢুকতেই দেখতে পেলাম, একটা ম্যাসেজ রিকুয়েস্ট এসেছে । ম্যাসেজ রিকুয়েস্ট প্রায়ই আসে । কিন্তু আজ সেটা বিশেষভাবে নজরে পড়ার কারণ, আইডির নামটা খুবই পরিচিত । জলদি তা চেক করলাম আমি । প্রোফাইলে ঢুকেই চমকে গেলাম । আইডিটা পিয়ার । এতো কাল পর পিয়ার ম্যাসেজ? ওকে এক্টিভ দেখে সাথে সাথেই ম্যাসেজের রিপ্লাই দিলাম । অনেকক্ষণ কথা বলার পর পিয়া ফোন করলো আমাকে । আমি রিসিভ করতেই জানালো, আগামী পরশু একটা গেট-টুগেদার এরেঞ্জ করেছে ওরা । আমাদের ফেলে আসা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসেই হবে সেটা । অনেক আনন্দিত হলাম শুনে । ওদের সবার সাথে এই কয় বছর কোনোই যোগাযোগ ছিল না । আজ এতোদিন পর সবার সাথে দেখা হবে শুনে, প্রচুর এক্সাইটেড আমি । পিয়া, মিথিলা, রাত্রি সহ সবার সাথে দেখা হবে আবার! ইশ! এতো খুশি কেন লাগছে? আচ্ছা সবাই কি অনেক বদলে গেছে? নাকি আগের মতোই আছে? এসব অনেক কথাই ভাবতে ভাবতে আগামী পরশু দিনের বিকেল বেলার অপেক্ষা করতে লাগলাম আমি । চলবে...
No comments yet