দুশ্চিন্তা কি? আর মুক্তি পাওয়ার উপায় :
দুশ্চিন্তাঃ
কোন মানুষই দাবী করে বলতে পারবেনা যে, তার জীবনে সমস্যা নেই। সম্পূর্ণ রোগহীন শরীর ও সমস্যা মুক্ত জীবন অবাস্তব। জীবনে আপদ, বিপদ ও সমস্যার অন্ত নেই। জীবনের আরেক নামই সমস্যা। জীবন সংগ্রাম মানেই হলো জীবন সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টা চালানো। সমস্যা আছে এবং থাকবে জেনেই সমাধানের চেষ্টা চালাতে হয়। দুশ্চিন্তা কাকে বলে??? দুঃখ-দৈন্য, আপদ-বিপদ ও দুর্ঘটনার ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তা থেকে উদ্ধারের পথ পাওয়ার জন্য যে পেরেশানি হয় তার ফলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, এরই নাম "দুশ্চিন্তা"। "হায় আমার কি হবে? বাচার কোন উপায় দেখছি না। এর পরিনতি কি হবে?" এ জাতীয় চিন্তাকেই দুশ্চিন্তা বলে। দুশ্চিন্তা এমন এক রোগ যে, একে প্রশ্রয় দিলে চরম হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। হতাশার চরম পর্যায়ে মানুষ আত্মহত্যা করার মত চরম দুর্বলতাও প্রদর্শন করে বসে। দুশ্চিন্তা কিন্তু সমস্যা সমাধানে সামান্যতম সাহায্যও করেনা। বরং সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। ধীরচিত্তে ও স্থির মস্তিস্কে সমাধান খুঁজতে হয়। অস্থির চিত্ত কখনই সমাধান খুঁজে পায়না। দুশ্চিন্তা, চিন্তার ভারসাম্য বিনষ্ট করে বলে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায়না। এমনকি এ রোগ সমাধানের কোন নির্দিষ্ট পথকেই চুরান্তভাবে গ্রহন করতে দেয়না। একেক বার একেক রকম পথ ধরার চেষ্টা করে বলে ব্যক্তি ধৈর্যের সাথে কোন পথে চলতে সক্ষম হয়না। তাই দুশ্চিন্তা হলো চিন্তার বিকৃতরূপ। আল্লাহ তা’আলা তাঁর মুমিন বান্দাহদেরকে দুশ্চিন্তা’র মুসিবত থেকে রক্ষার জন্য এমন কতক মূলনীতির কথা ঘোষণা করেছেন, যা মেনে নিলে শত মুসিবতেও মানসিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলা সম্ভব। ১। “আল্লাহ’র বিনা অনুমুতিতে কোন মুসিবত আসেনা। যে আল্লাহ কে বিশ্বাস করে আল্লাহ তাঁর কালবকে হেদায়েত দান করেন।” (সুরা তাগাবুনঃ১১) ব্যপারটি এমন নয় যে, কোন বিপদ আল্লাহ ঠেকাতে পারলেন না বলে এসে গেল; বরং আল্লাহ বিপদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত করলেই তা আসে। যদি কেউ এই কথা বিশ্বাস করে তাহলে সে অস্থির না হয়ে ধৈর্য ধারন করবে এবং বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আল্লাহ’র কাছেই দোআ করবে। আল্লাহ’র প্রতি সঠিক আস্থা ও বিশ্বাস থাকলে বিপদের সময় কেমন আচরণ করতে হবে, সে বিষয়ে আল্লাহ সঠিক হেদায়েত দান করুক। আমীন। মুসিবত থেকে উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা করাও কর্তব্য। শান্ত মনে ভেবে-চিন্তে চেষ্টা তদবির করতে হবে। সঠিক পদ্ধতিতে যাতে তদবির করা যায়, সে জন্য কাতর ভাবে দোআ-ও করতে হবে। কোন চেষ্টা ফলপ্রসূ না হলেও হতাশ না হয়ে মহান মুনিবের নিকট সঠিক সমাধান চাইতে হবে। ২। “হে রাসুল! আল্লাহ যদি আপনার উপর কোন মুসিবত দেন তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার ক্ষমতা অন্য কারো নেই।” (সুরা ইউনুসঃ১০৭) যত চেষ্টা-তদবিরই করা হোক, মুসিবত থেকে উদ্ধার করার চুড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ’র হাতে। এ অবস্থায় অস্থির হওয়া, হতাশা প্রকাশ করা বা আল্লাহ’র উপর অসন্তুষ্ট হওয়ার দ্বারা মানসিক যন্ত্রণা পাওয়া ছাড়া আর অন্য কোন লাভ হয়না। ৩। আল্লাহ’র উপর ভরসা করাই মুমিনদের কর্তব্য’ ____এ কথাটি বিভিন্ন ভঙ্গিতে বহু সুরায় উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে বারবার তাকিদ দিয়েছেন যে, “তোমরা একমাত্র আমার উপর ভরসা কর।” বৈধ পথে চেষ্টা তদবির অবশ্যই করতে থাকো। তবে ঐ তদবিরের উপর আসল ভরসা যেন না হয় কারণ যদি সে পথে সমাধান না হয় তাহলে হতাশায় ভুগতে বাধ্য হবে। আসলে আল্লাহ’র উপর আস্থা রাখাই হল ভরসা বা তায়াক্কুল। মুমিন কোন অবস্থায়ই আল্লাহ’র উপর আস্থা হারায় না। এ আস্থা রাখতেই হবে যে, আমার মেহেরবান আল্লাহ আমার মঙ্গল-ই করবেন। যদিও আমি বুঝতে পারছিনা যে, আমার মুসিবতের মাধ্যমে আমার কি মঙ্গল হতে পারে। তবে এ আস্থা আছে যে, আল্লাহ অমঙ্গল করেন না। বিতরের নামাজে দোআ কুনুতে এ আস্থার কথাই আমরা প্রতিদিন ঘোষণা করি এ ভাষায়------ “হে, আল্লাহ! তোমার উপর ঈমান রাখছি, তোমার উপর ভরসা করছি এবং তুমি মঙ্গলময় বলেই আমি প্রশংসা করি।” অর্থাৎ, তুমি যা কিছুই কর তাতে আমার মঙ্গল হবে বলেই বিশ্বাস করি। এ বিশ্বাস ছাড়া হতাশার যাতনা থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। ৪। কুরান মজিদে আরো বলা হয়েছে---- “আল্লাহ’র প্রতি অনুরাগী তারা, যারা ঈমান গ্রহন করেছে এবং আল্লাহ’র যিকিরের মাধ্যমে তাদের অন্তর প্রসান্তি লাভ করে। জেনে রাখ, একমাত্র আল্লাহ’র যিকিরেই অন্তরসমূহ শান্তি লাভ করে।” (সুরা রা’দঃ২৮) হাজারো মুসিবতের মধ্যেও আল্লাহকে ডেকে তার দরবারে ধরনা দিয়ে এবং তার নিকট আশ্রয় চেয়েই মনে প্রসান্তি লাভ করা সম্ভব। সুরা ফাতিহায় আমরা বলি “এক মাত্র তোমার ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য চাই” বলার উদ্দেশ্যও তাঁরই আশ্রয় কামনা করা। ইমানদারদের জন্য দুশ্চিন্তা অত্যন্ত মারাত্মক রোগ। কারন, আল্লাহ তা’আলা বিপদ মুসিবত সম্পর্কে কুরানে যে ধারনা দিয়েছেন তা বিশ্বাস করলে দুশ্চিন্তা থাকার কথা নয়। ঈমানের দাবীদার হয়েও দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দিলে ঐ ৪টি মূলনীতিকেই অবিশ্বাস ও অগ্রাহ্য করা হয়। আর দুশ্চিন্তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে___ ১। আমার উপর এই মুসিবত দিয়ে আল্লাহ আমার উপর অবিচার করেছেন। এটা করা মোটেই উচিৎ হয়নি। ২। এ মুসিবত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য আল্লাহ’র দয়ার অপেক্ষা করার ধৈর্য আমার নেই। আমাকেই কিছু করতে হবে এবং যেমন করেই হোক এ থেকে উদ্ধার পেতে হবে। ৩। এ মুসিবতের মধ্যে আমার কোন কল্যান থাকতে পারে, আমি তা স্বীকার করিনা। যারা আমার এ মুসিবতের জন্য দায়ী আমি তাদের ক্ষমা করবনা। সুযোগ পেলেই দেখে নেবো। ৪। সর্বাবস্থায় আল্লাহ কে স্মরণ করেই মনের শান্তি পেতে হবে বলে যা বলা হয় তা কি করে সম্ভব? আমার মনে যাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ রয়েছে তা আমি কেমন করে ভুলব? আর আল্লাহ কে এত ডেকেই কি হবে? আল্লাহ তো সারা দিচ্ছেন না। আর কত ডাকব? এভাবে দুশ্চিন্তা কে প্রশ্রয় দিলে ঈমান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই দুশ্চিন্তা থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে আল্লাহ’র শিখানো নিয়মে মনকে ইতিবাচক কাজ দিন। তাহলে দুশ্চিন্তা মনকে ভরাক্রান্ত করার সুযোগ পাবেনা। দুশ্চিন্তা মারাত্মক মানসিক রোগ। এ রোগ একাগ্রচিত্তে কোন কাজ করতে দেয়না, ঘুমাতে দেয়না, তৃপ্তির সাথে খেতেও দেয়না। ফলে স্নায়বিক বিরাট ক্ষতি সাধন করে। দুশ্চিন্তার ফলে অনেক সময় নিজের উপরই রাগ হয়। মুসিবতের জন্য অন্যদেরকে দায়ী করলে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এমন কি দুশ্চিন্তা আল্লাহ’র উপরও অসন্তুষ্ট হতে বাধ্য করে। আল্লাহ’র প্রতি অভিমান বশত আল্লাহ কে নির্দেশ দেয় যে, “হয় এটা কর না হয় ওটা কর”। এ সবের কোনটাই সুস্থ মনের পরিচয় বহন করেনা তাছাড়া আল্লাহও এরকম অস্থিরতা পছন্দ করেননা। আল্লাহ’র উপর পূর্ণ আত্মসমর্পণই দুশ্চিন্তা থেকে নিস্তার পাওয়ার একমাত্র উপায়। দুশ্চিন্তার মাধ্যমে শয়তান আপনার মনের উপর রাজত্ব কায়েম করছে। শয়তান কে উৎখাত করে আল্লাহ’র রাজত্ব মনের মধ্যে কায়েম করুন। মনে শান্তি পাওয়ার এটাই একমাত্র পথ।
No comments yet